pytheya.blogspot.com Webutation

৩০ মার্চ, ২০১২

Mary: সর্বোচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন নারী।

ইসলামের ইতিহাসে অনেক মহিয়সী নারী রয়েছেন যারা স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন-বিবি রহিমা-আইয়ূবের স্ত্রী, বিবি সারা-ইব্রাহিমের স্ত্রী, বিবি আছিয়া- ফেরাউনের স্ত্রী (মূসার পালিত মাতা), বিবি সফুরা-মূসার স্ত্রী, বিবি মরিয়ম-মূসার ভগ্নি, বিবি খাদিজা-মুহম্মদের স্ত্রী ও বিবি ফাতিমা-মুহম্মদের কন্যা। তদুপরি মুসলিমগণ সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল যে, এই সকল আগত এবং বিশ্বজগৎ ধ্বংস পর্যন্ত অনাগত সকল নারীগণের মধ্যে সর্ব্বোচ্চ সম্মানীয় আসনটি মরিয়ম বা মেরীর -ঈসা মসিহের মাতার। কোন মুসলিম কল্পনাতেও কখনও এই স্থানটিতে অন্য কাউকে বসানোর সাহস করবে না, কেননা তারা এই আসনে মেরীকে বসাননি-এটা খোদা নির্ধারিত।

ঈসা মসীহের মাতা মেরী (Mary) বা মরিয়মের পিতার নাম ছিল ইমরান। আল্লাহ আদম, নূহ এবং ইব্রাহিমের সস্তানদেরকে এবং ইমরানের সন্তানদেরকে বিশ্ব-জগতের উপর মনোনীত করেছেন। আর বংশানুক্রমে এরা ছিলেন একে অপরের বংশধর। 

ইমরান এবাদতখানার বার ঈমামের একজন ছিলেন। আর তার স্ত্রী ছিলেন হান্না বিনতে ফাতুয। তাদের কোন সন্তানাদি ছিল না। তাই একটি সন্তানের জন্যে তাদের আকুতিও কম ছিল না। হান্না সর্বদাই খোদার কাছে প্রার্থনা করতেন এবং মনের বাসনা জানাতেন- ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাকে একটি সন্তান দান কর, যেন তাকে দেখে আমার নয়ন জুড়ায় এবং অন্তর খুশী হয়।’ 

বন্ধ্যা এই নারীর আকূল আকুতিতে খোদা মনোযোগ দিলেন। হান্না গর্ভধারণ করলেন। এতে কৃতজ্ঞচিত্তে তিনি আল্লাহকে স্মরণ করে বললেন, ‘হে আমার প্রতিপালক, নিশ্চয় আমার গর্ভে যা আছে, তা একান্তভাবে তোমার জন্যে উৎসর্গ করলাম। সুতরাং তুমি আমার নিকট হতে এটা কবুল কর। নিশ্চয়ই তুমি শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞ।’ হান্না যখন গর্ভবতী সেইসময় তার স্বামী ইমরান পরলোকগমন করলেন। 

হান্না একটি কন্যা সন্তান প্রসব করলেন।
যথাসময়ে হান্না একটি কন্যা সন্তান প্রসব করলেন। অত:পর তিনি তার এই সন্তানের জন্যে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলেন এবং বললেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমি কন্যা সন্তান প্রসব করেছি! আর আমি তার নাম রাখলাম-মরিয়ম এবং আমি তাকে ও তার বংশধরকে বিতাড়িত শয়তান হতে তোমার আশ্রয়ে সমর্পণ করলাম।’

‘হে আমার প্রতিপালক, আমি কন্যা সন্তান প্রসব করেছি! -হান্নার এই কথায় বিষ্ময় ফুটে উঠেছে। অর্থাৎ তিনি তার চাওয়া এবং পাওয়ার মধ্যে ব্যবধান লক্ষ্য করেছেন। কেননা মনে মনে তিনি একটি পুত্র সন্তানই কামনা করেছিলেন, যাকে তিনি খোদার ঘরের সেবা কাজের জন্যে দেবেন। আর প্রসবের পূর্ব পর্যন্ত তার ধারণাও ছিল তার গর্ভে পুত্রসন্তান রয়েছে, কিন্তু তিনি প্রসব করেছেন কন্যাসন্তান। ধারণার বিপরীত দেখেই তার কন্ঠে এই বিষ্ময়ের সূর। কেননা তিনি সন্দিহান হলেন এ কথা ভেবে যে কন্যা সন্তান দিয়ে এবাদতখানার সেবাকাজ করানো যাবে কিনা।

হান্না যা প্রসব করেছিলেন, আল্লাহ তা সম্যক অবগত ছিলেন এবং পুত্রসন্তানও এই কন্যার তুল্য নয়। কিন্তু হান্না তা জানবেন কিভাবে? যাহোক হান্নার প্রার্থণা আল্লাহ শুনেছিলেন। আর আল্লাহ তো শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞ। তিনি মেরীকে ভালভাবেই গ্রহণ করেন এবং ভালভাবেই তাকে মানুষ করেন।

এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ- নিশ্চয়ই আল্লাহ আদমকে ও নূহকে এবং ইব্রাহিমের সস্তানদেরকে ও ইমরানের সন্তানদেরকে বিশ্ব-জগতের উপর মনোনীত করেছেন। বংশানুক্রমে এরা একে অপরের বংশধর এবং আল্লাহ শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞ। যখন ইমরানের স্ত্রী বলেছিল-‘হে আমার প্রতিপালক, নিশ্চয় আমার গর্ভে যা আছে, তা একান্তভাবে তোমার জন্যে উৎসর্গ করলাম। সুতরাং তুমি আমার কাছ হতে এটা কবুল কর। নিশ্চয়ই তুমি শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞ।’

অতঃপর যখন সে তাকে প্রসব করল, তখন সে বলল- ‘হে আমার প্রতিপালক! আমি কন্যা সন্তান প্রসব করেছি।’ সে যা প্রসব করেছে, আল্লাহ তা সম্যক অবগত এবং পুত্রও এ কন্যার তুল্য নয়, ‘এবং আমি তার নাম রাখলাম-মরিয়ম এবং আমি তাকে ও তার বংশধরকে বিতাড়িত শয়তান হতে তোমার আশ্রয়ে সমর্পণ করলাম।’
অতঃপর তার প্রতিপালক তাকে ভালভাবেই গ্রহণ করেন এবং তাকে ভালভাবেই মানুষ করেন।(৩:৩৩-৩৭)

হান্না তার প্রতিজ্ঞা ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। সুতরাং স্তন্যত্যাগ করার পর মেরীকে তিনি এবাদতখানায় নিয়ে এলেন। এসময় সকল ঈমামেরা শিশু মরিয়মের বিষয়টি অবগত হলেন। যেহেতু শিশুটি এবাদতখানার জন্যে উৎসর্গিত তাই তার লালন-পালনকে সকলে বরকতময় সেবা বলে মনে করলেন এবং তারা প্রত্যেকেই শিশুটির লালন-পালনের ভার নিতে চাইলেন। এসময় জাকারিয়া যিনি ছিলেন ঈমামদের একজন, ঘোষণা করলেন, ‘মেরীর লালন-পালনের ব্যাপারে আমিই সর্বাপেক্ষা হকদার।’ -তার এই দাবী করার কারণ ছিল এই যে, তার স্ত্রী এলিজাবেথ ছিলেন মেরীর মাতা হান্নার সহোদরা।

এদিকে অন্যরা মেরীর লালন-পালনের অধিকারী হওয়ার দাবী পরিত্যাগে সম্মত ছিলেন না। এ কারণে তাদের কেউই আত্মীয়তার কারণে সর্বাপেক্ষা হকদার- জাকারিয়ার এই দাবী মানতে রাজী হলেন না। সুতরাং সকলে বাদানুবাদে লিপ্ত হলেন। অবশেষে তারা ভাগ্য পরীক্ষার দ্বারা বিষয়টির সমাধানের সিদ্ধান্ত নিলেন। 

অতীতে ভাগ্য পরীক্ষা করা হত বেশ কয়েকটি পদ্ধতিতে। যেমন ডাইস নিক্ষেপ করে বা তীর ছুঁড়ে। মেরীর ক্ষেত্রে ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছিল এবাদতখানার পুকুরে কলম ছোঁড়ার মাধ্যমে। শর্ত ছিল যার কলম বাতাসের বিপরীতে চলবে সেই মরিয়মের লালন-পালনের ভার পাবে।

ভাগ্য পরীক্ষার দ্বারা জাকারিয়াই শিশু মরিয়মের লালন-পালনের ভার লাভ করলেন। তার তত্ত্বাবধানে এবাদতখানা সংলগ্ন একটি কক্ষে মরিয়মের থাকার ব্যবস্থা হল।

এ বিষয়ে Book of Chamis জানায়- As soon as she had recovered from her child bed, she carried her infant daughter to Jerusalem, and presented her to the priests, as a child dedicated to Allah. Zachariah, a priest whose wife was related to Hanna, was desirous of taking the child home with him; but the other priests, who were all eager for this privilege (for, on account of his piety, Amram had stood high in repute among them), protested against it, and forced him to cast lots with them for the guardianship of Mary. 

They proceeded, therefore, twenty-nine in number, to the Jordan, and flung their arrows into the river, on the understanding that he whose arrow should rise again, and remain on the water, should bring her up. By the will of Allah, the lot decided in favor of Zachariah, who then built a small chamber for Mary in the Temple, to which no one had access but himself;--Book of Chamis, by Husein ibn Muhammed. 

এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াত, ‘মরিয়মের ভার কে গ্রহণ করবে-এর জন্যে তারা কলম (তীর) নিক্ষেপ করেছিল এবং তারা (জাকারিয়া ও অন্যরা) বাদানুবাদ করেছিল।(৩:৪৪) আর বাইবেলে রয়েছে- [L]et every one of them bring his rod, and he by whom the Lord will show a sign will be the husband of Mary.-Gospel of James 8:6

মেরী আস্তে আস্তে শৈশব ছেড়ে কৈশরে পদার্পণ করল। সে এবাদতখানার খেদমত শেষে অবশিষ্ট সময়ে পরম করুণাময় আল্লাহর এবাদতে কাটিয়ে দিত। হযরত জাকারিয়া তার খোঁজখবর নেবার জন্যে মাঝে মাঝে তার কক্ষে প্রবেশ করতেন। আর তিনি যখনই যেতেন তখনই তার কাছে নানা রকম খাদ্য-সামগ্রী দেখতে পেতেন। একদিন তিনি দেখতে পেলেন মেরী এমনসব ফল ভক্ষণ করছে যা ঐ মৌসুমে পাওয়া যায় না। তিনি বিস্মিত হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে মরিয়ম! এসব তুমি কোথায় পেলে?’
সে বলল, ‘এগুলি আল্লাহর নিকট হতে। তিনি যাকে ইচ্ছে অপরিমিত জীবিকা দান করেন।’
এ বিষয়ে বাইবেলে রয়েছে- And Mary was in the Temple nurtured like a dove and received food from the hand of an angel.-Gospel of James.

আল্লাহর শক্তি-সামর্থ্যরে উপর জাকারিয়ার পূর্ণ বিশ্বাস ছিল। কিন্তু অসময়ে ও অস্থানে দান করার তাঁর অপার মহিমা এই প্রথম তিনি প্রত্যক্ষ করলেন। তার কোন সন্তানাদি ছিল না। আর ইতিপূর্বে কখনও তিনি খোদায়ী মহিমা প্রত্যক্ষ করেননি। তাই এ যাবৎ সাহস করে একটি সন্তানের জন্যে কোন দোয়া করেননি। কিন্তু এখন তার মনে সুপ্ত আকাঙ্খা জেগে উঠল। তিনি তার বৃদ্ধ বয়সের কথা এবং স্ত্রীর বন্ধ্যাত্বের কথা জেনেও তখনি সেখানে দাঁড়িয়ে দয়াময় আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করলেন- ‘হে আমার পালনকর্তা! তোমার কাছ থেকে আমাকে এক পুত-পবিত্র সন্তান দান কর- নিশ্চয় তুমি প্রার্থণা শ্রবণকারী। হে আমার পালনকর্তা, আমাকে একা রেখ না, তুমি তো উত্তম ওয়ারিস।’

এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ, এবং তিনি (আল্লাহ) তাকে জাকারিয়ার তত্ত্বাবধানে রেখেছিলেন, যখনই জাকারিয়া কক্ষে তার সঙ্গে দেখা করতে যেত, তখনই তার কাছে খাদ্য সামগ্রী দেখতে পেত, সে বলত- হে মরিয়ম! এসব তুমি কোথায় পেলে?’

সে (মরিয়ম) বলত- ‘ওগুলি আল্লাহর নিকট হতে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছে অপরিমিত জীবিকা দান করেন।’
সেখানেই জাকারিয়া তার পালনকর্তার কাছে প্রার্থণা করলেন, বললেন, ‘হে আমার পালনকর্তা! তোমার কাছ থেকে আমাকে পুত-পবিত্র সন্তান দান কর- নিশ্চয়ই তুমি প্রার্থণা শ্রবণকারী।(৩:৩৭-৩৮)
শলোমনের মন্দির।
মেরী বা মরিয়ম এবাদতখানার পূর্বদিকের একটি কক্ষে থাকত। যখন সে যৌবন প্রাপ্ত হল তখন সে নিজেকে অড়াল করার জন্যে পর্দা করল। একদিন আল্লাহ তার কাছে ফেরেস্তা জিব্রাইলকে পাঠালেন। ফেরেস্তা তার কাছে মানবাকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করল। মরিয়ম তার কক্ষে একজন পরপুরুষকে দেখে নিজের শ্লীলতাহানীর আশঙ্কায় ভীত হয়ে বলল, ‘তুমি যদি আল্লাহকে ভয় কর, তবে আমি তোমা হতে দয়াময়ের স্মরণ নিচ্ছি।’

‘যদি আল্লাহকে ভয় কর’- এ কথা শ্রবন মাত্রই জিব্রাইল আল্লাহর নামের সম্মানার্থে কিছুটা পিছনে সরে গেল। অতঃপর বলল,‘আমি তো কেবল তোমার প্রতিপালকের প্রেরিত, তোমাকে এক পবিত্র পুত্র দান করার জন্যে। 
হে মরিয়ম! নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে মনোনীত করেছেন ও তোমাকে পবিত্র করেছেন এবং বিশ্বজগতের নারীগণের উপর তোমাকে আসীন করেছেন। 
হে মরিয়ম! তোমার প্রতিপালকের আরাধনা কর এবং সিজদা কর ও রুকুকারীগণের সাথে রুকু কর। এটা অদৃশ্যলোকের সংবাদ-যা তোমাকে ঐশী বাণী দ্বারা জানাচ্ছি।

হে মরিয়ম! আল্লাহ তার একটি কথার দ্বারা তোমাকে সুসংবাদ দিচ্ছেন- তার নাম মরিয়ম-নন্দন ঈসা মসীহ, সে ইহলোকে ও পরলোকে সম্মানিত এবং সান্নিধ্যপ্রাপ্তগণের অন্যতম। সে দোলনায় থাকা অবস্থায় ও পরিণত বয়সে মানুষের সাথে কথা বলবে এবং সে হবে পূণ্যবানদের একজন।’

মরিয়ম বলল, ‘কেমন করে আমার পুত্র হবে-যখন আমাকে কোন পুরুষ স্পর্শ করেনি এবং আমি ব্যভিচারিনীও নই?’
সে বলল, ‘এরূপেই হবে। তোমার প্রতিপালক বলছেন- ‘এ আমার জন্যে সহজসাধ্য এবং আমি ওকে এই জন্যে সৃষ্টি করব যেন সে হয় মানুষের জন্যে এক নিদর্শণ ও আমার নিকট হতে এক অনুগ্রহ’- এ তো এক স্থীরকৃত ব্যাপার।’

মরিয়ম বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! কিরূপে আমার পুত্র হবে? কোন পুরুষ তো আমাকে স্পর্শ করেনি!’
জিব্রাইল বলল, ‘এরূপে আল্লাহ যা ইচ্ছে সৃষ্টি করেন, যখন তিনি কোন কার্যের মনস্থ করেন, তখন তিনি বলেন ‘হও‘। ফলতঃ তখনই তা হয়ে যায়। তিনি তাকে গ্রন্থ ও বিজ্ঞান এবং তাওরাত ও ইঞ্জিল শিক্ষা দেবেন এবং তাকে ইস্রায়েল বংশীয়গণের জন্যে রসূল করবেন।’

জিব্রাইল মরিয়মকে জেসাসের সুসংবাদ দিচ্ছে।
এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ; আর দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন ইমরান তনয়া মরিয়মের, যে তার সতীত্ব বজায় রেখেছিল। অতঃপর আমি তার মধ্যে আমার পক্ষ থেকে রূহ ফুঁকে দিয়েছিলাম এবং সে তার পালনকর্তার বাণী ও কিতাবকে সত্যে পরিণত করেছিল। সে ছিল বিনয় প্রকাশকারীনীদের একজন।(৬৬:১২)

যখন সে (মরিয়ম) তার পরিবারবর্গ হতে পৃথক হয়ে নিরালায় পূর্বদিকে একস্থানে আশ্রয় নিল। অতঃপর ওদের হতে নিজেকে আড়াল করার জন্যে সে পর্দা করল। অতঃপর আমি তার কাছে রূহকে (ফেরেস্তা) পাঠালাম। সে তার কাছে মানবাকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করল। মরিয়ম বলল, ‘তুমি যদি আল্লাহকে ভয় কর, তবে আমি তোমা হতে দয়াময়ের স্মরণ নিচ্ছি।’

সে বলল, ‘আমি তো কেবল তোমার প্রতিপালকের প্রেরিত, তোমাকে এক পবিত্র পুত্র দান করার জন্যে।(১৯:১৬-১৯) হে মরিয়ম! নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে মনোনীত করেছেন ও তোমাকে পবিত্র করেছেন এবং বিশ্বজগতের নারীগণের উপর তোমাকে আসীন করেছেন। 

হে মরিয়ম! তোমার প্রতিপালকের আরাধনা কর এবং সিজদা কর ও রুকুকারীগণের সাথে রুকু কর। এটা অদৃশ্য লোকের সংবাদ-যা তোমাকে ঐশীবাণী দ্বারা জানাচ্ছি।(৩:৪২-৪৪) 
হে মরিয়ম! আল্লাহ তার একটি কথার দ্বারা তোমাকে সুসংবাদ দিচ্ছেন-তার নাম মরিয়ম-নন্দন ঈসা মসীহ, সে ইহলোকে ও পরলোকে সম্মানিত এবং সান্নিধ্যপ্রাপ্তগণের অন্যতম। সে দোলনায় থাকা অবস্থায় ও পরিণত বয়সে মানুষের সাথে কথা বলবে এবং সে হবে পূণ্যবানদের একজন।(৩:৪৫-৪৬)

মরিয়ম বলল, ‘কেমন করে আমার পুত্র হবে-যখন আমাকে কোন পুরুষ স্পর্শ করেনি এবং আমি ব্যভিচারিনীও নই?’
সে বলল, ‘এরূপেই হবে। তোমার প্রতিপালক বলছেন-এ আমার জন্যে সহজসাধ্য এবং আমি ওকে এ জন্যে সৃষ্টি করব যেন সে হয় মানুষের জন্যে এক নিদর্শণ ও আমার নিকট হতে এক অনুগ্রহ; এ তো এক স্থীরকৃত ব্যাপার।’(১৯:২০-২১)

সে মরিয়ম বলেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! কিরূপে আমার পুত্র হবে এবং কোন পুরুষ তো আমাকে স্পর্শ করেনি।’
সে  বলল, ‘এরূপে আল্লাহ যা ইচ্ছে সৃষ্টি করেন, যখন তিনি কোন কার্যের মনস্থ করেন, তখন তিনি বলেন ‘হও’। ফলতঃ তখনই তা হয়ে যায়। তিনি তাকে গ্রন্থ ও বিজ্ঞান এবং তাওরাত ও ইঞ্জিল শিক্ষা দেবেন এবং তাকে ইস্রায়েল বংশীয়গণের জন্যে রসূল করবেন।’(৩:৪৭-৪৯)

গর্ভধারণের পর মরিয়মের দিন কাটছিল অস্থিরতার মধ্যে, একথা ভেবে যে, সে একাকী কিভাবে এই পরিস্থিতির মোকাবেলা করবে। আর এই  বিষয়টি সে কাউকে বলতেও পারছিল না, কেননা বললেও কেউ তাকে বিশ্বাস করবে না। তার আপনজন বলতে কেউ ছিল না। পিতা তো তার জন্মের পূর্বেই ইন্তেকাল করেছিলেন আর মাতাও ইতিমধ্যে মারা গিয়েছেন।

প্রসবকাল যতই নিকটবর্তী হচ্ছিল মরিয়ম ততই নিজেকে আরও বেশী করে পর্দার অন্তরালে গুটিয়ে নিয়েছিল। অত:পর তার প্রসবকাল নিকটবর্তী হল। এসময় সে লোকলজ্জার হাত থেকে বাঁচতে একদিন অতি প্রত্যুষে এবাদতখানা ছেড়ে অজানার উদ্দেশ্যে যাত্রা করল। অত:পর দূরবর্তী এক টিলার উপর এসে পৌঁছিল। ইহুদিয়া প্রদেশের বেথেলহেমে অবস্থিত এই টিলাটি ছিল এক পরিত্যাক্ত আস্তাবল। প্রসব বেদনায় কাতর মরিয়ম ঐ আস্তাবলের উঠোনের উপর এক খেজুর গাছের দিকে যেতে থাকল। 

মেরী ঐ খেজুর গাছের নীচে আশ্রয় নিল। অত:পর ভীত সন্ত্রস্ত নয়নে ইতস্তত: চারিদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে লাগল। একদিকে প্রসব বেদনা, অন্যদিকে লোকলজ্জা, তার উপর ক্ষুধা ও ক্লান্তি- নিজের একাকীত্ব, নিরাশ্রয়ী ও অসহায় অবস্থার কথা ভেবে মেরী একেবারে ভেঙ্গে পড়ল। সে খোদার কাছে ফরিয়াদ করল-মনে মনে বলতে লাগল, ‘হায়! এর পূর্বে যদি আমার মৃত্যু হত বা লোকের স্মৃতি হতে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হতাম।’ 

ঐসময় ফেরেস্তা তার নিম্নপার্শ্ব হতে আহবান করে তাকে বলল, ‘তুমি দুঃখ কোরও না, তোমার পাদদেশে তোমার প্রতিপালক এক নহর সৃষ্টি করেছেন। তুমি তোমার দিকে খর্জুর বৃক্ষের কান্ডে নাড়া দাও, তা তোমাকে সুপক্ক তাজা খেজুর দান করবে। সুতরাং আহার কর, পান কর ও চক্ষু জুড়াও। মানুষের মধ্যে যদি কাউকে দেখ, তখন বোলও- আমি দয়াময়ের উদ্দেশ্যে মৌনতাবলম্বনের মানত করেছি, সেজন্যে আমি কোন মানুষের সাথে কথা বলব না।’ -এভাবে আল্লাহ তার আহার ও পানের সুব্যবস্থা করলেন, তাকে সান্তনা দিলেন এবং বাৎলে দিলেন লোকলজ্জার হাত থেকে রক্ষা পাবার উপায়।
মেরী দেখল তার পাদদেশে সত্যিই এক নহর-স্বচ্ছ পানি প্রবহমান। সে উপরে খেজুর গাছের দিকে দৃষ্টি দিল, দেখল, গাছে কাঁদি ভরা সুপক্ক খেজুর। যদিও এটা খেজুরের মৌসুম ছিল না। আল্লাহ কত দয়াময়! সে উঠে গাছটিতে হাল্কা নাড়া দিল।  

এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ- অতঃপর সে (মরিয়ম) গর্ভে সন্তানধারণ করল ও তৎসহ এক দূরবর্তী স্থানে চলে গেল। অনন্তর সে প্রসব বেদনায় এক খেজুর বৃক্ষের দিকে গমন করল, সে বলতে লাগল-হায়! এর পূর্বে যদি আমি মরে যেতাম ও লোকের স্মৃতি হতে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হতাম।’(১৯:২২-২৩)
এবং আমি মরিয়ম তনয় ও তার মাতাকে এক নিদর্শণ দান করেছিলাম এবং তাদেরকে এক অবস্থানযোগ্য স্বচ্ছ পানি বিশিষ্ট টিলায় আশ্রয় দিয়েছিলাম। (২৩:৫০) 

ফেরেস্তা তার নিম্নপার্শ্ব হতে আহবান করে তাকে বলল- ‘তুমি দুঃখ কোরও না, তোমার পাদদেশে তোমার প্রতিপালক এক নহর সৃষ্টি করেছেন। তুমি তোমার দিকে খেজুর বৃক্ষের কান্ডে নাড়া দাও, তা তোমাকে সুপক্ক তাজা খেজুর দান করবে। সুতরাং আহার কর, পান কর ও চক্ষু জুড়াও। মানুষের মধ্যে যদি কাউকে দেখ, তখন বোলও-আমি দয়াময়ের উদ্দেশ্যে মৌনতাবলম্বনের মানত করেছি, সেজন্যে আমি কোন মানুষের সাথে কথা বলব না।’(১৯:২৪-২৬)

আর এ কাহিনী খৃষ্টানদের হাতে বিকৃত হতে হতে এ পর্যায়ে এসে ঠেকেছে- “.... Then the child Jesus, with a joyful countenance, reposing in the bosom of His mother, said to the palm: O tree, bend thy branches, and refresh my mother with thy fruit. And immediately at these words the palm bent its top down to the very feet of the blessed Mary; and they gathered from it fruit, with which they were all refreshed. And after they had gathered all its fruit, it remained bent down, waiting the order to rise from Him who bad commanded it to stoop. Then Jesus said to it: Raise thyself, O palm tree, and be strong, and be the companion of my trees, which are in the paradise of my Father; and open from thy roots a vein of water which has been hid in the earth, and let the waters flow, so that we may be satisfied from thee. And it rose up immediately, and at its root there began to come forth a spring of water exceedingly clear and cool and sparkling. And when they saw the spring of water, they rejoiced with great joy, and were satisfied, themselves and all their cattle and their beasts. Wherefore they gave thanks to God.” -Gospel of Pseudo-Matthew chapter 20

জেসাসের জন্ম।
ইস্রায়েলীরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মৌনাতাবলম্বণের মানত করত। যদিও আল্লাহ এ ধরণের কোন নির্দেশ কখনও দেননি। তথাপি এটাকে তারা তাদের এবাদতের অন্তর্ভূক্ত করেছিল। সম্ভবত: এ কারণে যে তারা জানত মানুষ মূলত: পাপ অর্জন করে তাদের কথা ও কর্ম দ্বারা। আর আল্লাহর দুই ফেরেস্তা মানুষের মুখ থেকে নির্গত সমস্ত কথাবার্তাই লিপিবদ্ধ করে যা স্বাক্ষী হিসেবে শেষ বিচারের দিন উপস্থাপন করা হবে। সুতরাং মৌনতাবলম্বণের দ্বারা তারা ঐ দিনের জন্যে কথার পাপ থেকে মুক্ত থাকত। কিন্তু কথাবার্তা ত্যাগ করা প্রকৃতপক্ষে কোন এবাদতই নয়। তাছাড়া সারাদিন সাধারণ কথাবার্তাও ত্যাগ করা মানুষকে সমস্যার সম্মুখীনই করত মাত্র। এ কারণে মুহম্মদের শরীয়তে এ ধরণের মানত বা এবাদতকে উৎসাহিত করা হয়নি।

মেরী আস্তাবলে আশ্রয় নিয়েছিল এবং সেখানেই সে সন্তান প্রসব করল। নবজাতককে নিয়ে মাতাকে কোন সমস্যায় পড়তে হল না। আস্তাবলটি ছিল আশ্রয়যোগ্য, কাছেই নহর এবং গাছে সুপক্ক খেজুর। এভাবে ইহুদার বেথেলহেমে ঈসার জন্মের মধ্যে দিয়ে পাক কিতাবের এ আযাত পূর্ণ হল-

‘হে বৈৎলেহেম-ইফ্রাথা, 
তুমি ইহুদার সহস্রগণের মধ্যে ক্ষুদ্র বলে অগণিতা, 
তোমা হতে ইস্রায়েলের মধ্যে কর্তা হবার জন্যে আমার উদ্দেশ্যে এক ব্যক্তি উৎপন্ন হবেন; 
প্রাক্কাল হতে, অনাদিকাল হতে তার উৎপত্তি।’---(মীখা-৫:২)

মূসার শরীয়তমত সন্তানকে প্রভু খোদার সম্মুখে উপস্থিত করার সময় হল। কারণ শরীয়তে ছিল-‘প্রথমে জন্মেছে এমন প্রত্যেকটি পুত্রসন্তানকে প্রভুর বলে ধরা হবে।’ 

মেরী সন্তানকে নিয়ে জেরুজালেমের এবাদতখানায় এল। অতঃপর ইহুদি নিয়মমতে কোরবাণী দেবার কথা শরীয়তে যেমন ছিল- ‘এক জোড়া ঘুঘু কিংবা দু‘টো কবুতরের বাচ্চা।’- তেমনি তা কোরবাণী দিল। এসময় নিয়মমত শিশুটির খৎনা করান হল এবং খোদার আদেশ মত তার নাম রাখা হল ঈসা। সকল কাজে হান্নাহ নামের একজন বৃদ্ধা তাকে সহযোগীতা করেন। এই হান্নাহ ছিলেন আঁশের বংশের পনুয়েলের মেয়ে। সাত বৎসর স্বামীর সাথে সংসার করার পর চুরাশি বৎসর বয়স পর্যন্ত তিনি এবাদতখানায় থেকে বিধবার জীবন কাটাচ্ছিলেন। এবাদতখানা ছেড়ে তিনি কোথাও যেতেন না আর রোজা ও প্রার্থণার মধ্যে দিয়ে রাত্রিদিন অতিবাহিত করতেন। তিনি মেরীকে চিনতেন ও ভালভাবে জানতেন কেননা মেরীও এবাদতখানায় থাকতেন এবং এক যুগেরও বেশী সময় ধরে এবাদতখানার সেবাকাজ করছিলেন।
নাসারতের পথে মেরী, শিশু জেসাস ও ইউসূফ।
শরীয়ত মত সমস্তকিছু শেষ করে মেরী আস্তাবলেই ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নেন, কেননা ৪০ দিনের পূর্বে অশুচি অবস্থায় তিনি তার এবাদতখানা সংলগ্ন তার কক্ষে থাকতে পারেন না। তিনি যখন এবাদতখানা থেকে বেরিয়ে যাবেন তখনই তার ইউসূফের সাথে দেখা, তখন তিনি তার সঙ্গে গালীলের নাসারতে নিজ বাড়ীতে আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে ফিরে গেলেন।

ঈসা ও মেরী সম্পর্কিত কোরআনের আরও কয়েকটি আয়াত- এবং সেই নারীর কথা স্মরণ কর, যে তার কামপ্রবৃত্তিকে বশে রেখেছিল, অতঃপর আমি তার মধ্যে আমার রূহ ফুঁকে দিয়েছিলাম এবং তাকে ও তার পুত্রকে বিশ্ববাসীর জন্যে নিদর্শণ করেছিলাম। তারা সকলেই তোমাদের ধর্মের; একই ধর্মে তো বিশ্বাসী সবাই এবং আমিই তোমাদের পালনকর্তা, অতএব আমার বন্দেগী কর এবং মানুষ তাদের কার্যকলাপ দ্বারা পারস্পারিক বিষয়ে বিভেদ সৃষ্টি করেছে।(২১:৯১-৯৩)

মেরী নাসারতে নিজ গ্রামে স্বীয় সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গেলেন। তার কুমারী অবস্থায় সন্তান হবার খবর আর গোপন রইল না। মুখরোচক এই খবর অতি দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ল। প্রতিবেশী ও অন্যান্য লোকেরা ছুটে এল। তারা এসে তাকে ভর্ৎসনা করতে লাগল; তারা তার পিতামাতার পবিত্রতা উল্লেখ করে তাকে লজ্জায় ফেলতে চাইল। তারা বলল- ‘হে মরিয়ম! তুমি তো এক অঘটন ঘটিয়ে বসেছ। হে হারুণ ভগ্নি! তোমার পিতা অসৎ ব্যক্তি ছিল না, তোমার মাতাও ব্যভিচারিনী ছিল না।’

এখানে লক্ষ্যনীয় লোকেরা মেরীকে উত্যক্ত করতে কি অদ্ভূত পন্থাই না অবলম্বণ করেছে! তারা তাকে মেরী বা মরিয়ম না বলে হারুণ ভগ্নি সম্বোধন করছে। একথা তাকে উপলব্ধি করতে যে, সে হারুণ ভগ্নি মরিয়ম একজন পবিত্রা মহিলা ছিলেন অথচ সেই একই নামের হয়ে সে মেরী একজন বেশ্যা- বিবাহ ব্যাতিরেকেই সন্তান জন্মদাত্রী। একই নাম অথচ কতটা না বৈসাদৃশ্য, একটা পবিত্র নামের কতটা না অবমাননা!

মেরী লোকদের কোন কথার উত্তর না দিয়ে চুপচাপ বসে রইলেন। কেননা তিনি জানতেন সত্য বললেও লোকেরা তার কথা বিশ্বাস করবে না। আর এ কারণে এই পরিস্থিতির মোকাবেলায় তিনি পূর্বেই ফেরেস্তার পরামর্শ মত মৌণতাবল্বণের মানতের মধ্যে ছিলেন। এদিকে মেরীর নিরুত্তর ভঙ্গি লোকদের ক্রুদ্ধ করল। সুতরাং তারা তাকে আরও উত্যক্ত করতে লাগল। তখন বিচলিত হয়ে তিনি ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন, তিনি আজ মৌণাতাবলম্বণের মানত করেছেন, তাই তার পক্ষে কোন মানুষের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব নয়। কিন্তু লোকেরা তার ইশারা বুঝতে পারলেও তা আমলে নিল না। বরং তারা আরও বেশী করে নিন্দা করতে লাগল তাকে। ফেরেস্তার ঐ উপদেশ কাজে না লাগাতে তিনি আরও বেশী বিচলিত হলেন, তখন হঠাৎ তার মনে পড়ল ফেরেস্তার অপর একটি কথা- সে দোলনায় থাকা অবস্থায় ও পরিণত বয়সে মানুষের সাথে কথা বলবে এবং সে হবে পূণ্যবানদের একজন।(৩:৪৬) সুতরাং তিনি তাদেরকে ইঙ্গিতে তার সন্তানকে দেখিয়ে দিলেন, যেন তাদের যা কিছু জানার তা তার কাছ থেকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেয়। 
লোকেরা মেরীর ইঙ্গিত ঠিকই বুঝতে পারল। আর একে আর এক তামাশা মনে করে ভীষণভাবে ক্রুদ্ধ হল। তারা বলল, ‘যে দোলনার শিশু তার সাথে আমরা কেমন করে কথা বলব?’

কোন কিছুতেই লোকেরা তাকে নিস্কৃতি দিচ্ছে না দেখে মেরী নত মস্তকে নীরবে কাঁদতে লাগলেন। তার অশ্রু গড়িয়ে ঈসার গায়ে পড়ল। সে ঐ সময় তার মায়ের কোলে বসে দুধ পান করছিল। মেরীর অশ্রুজল শিশু ঈসার শরীর স্পর্শ করা মাত্র সে স্তন ছেড়ে দিল। তারপর তার মায়ের ক্রন্দনরত নত মুখটা কিছুক্ষণ দেখল। লোকেরা তার নিরাপরাধ মাতাকে কি মানসিক নির্যাতনই না করেছে! এখন সে পূর্বে এবং বাম দিকে পাশ ফিরে, লোকদের দিকে মনোযোগ দিল।

অতঃপর তর্জণী খাড়া করে বলল, ‘আমি তো আল্লাহর দাস। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন, আমাকে নবী করেছেন। আমি যেখানেই থাকি না কেন তিনি আমাকে আশীষ ভাজন করেছেন, তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যতদিন জীবিত থাকি ততদিন নামাজ ও যাকাত আদায় করতে এবং মায়ের প্রতি (লক্ষণীয় যে সে পিতার উল্লেখ করল না। এতেই ঈঙ্গিত রয়েছে যে, সে পিতা ছাড়াই আলৌকিকভাবে অস্তিত্ব লাভ করেছে।) অনুগত থাকতে এবং তিনি আমাকে উদ্ধ্যত ও হতভাগ্য করেননি। আমার প্রতি শান্তি ছিল-যেদিন আমি জন্মলাভ করেছি ও শান্তি থাকবে যেদিন আমার মৃত্যু হবে ও যেদিন জীবিত অবস্থায় আমি পুনরুজ্জীবিত হব। --নিশ্চয় আল্লাহ আমার পালনকর্তা ও তোমাদের পালনকর্তা। অতএব তোমরা তাঁর এবাদত কর। এটাই সরল পথ।’

স্বীয় বক্তব্য পেশ করে শিশু ঈসা পুনঃরায় মায়ের দুধপান করতে লাগল।(এখানে একথা উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয় যে, যে বয়সে সাধারণতঃ শিশুরা কথা বলে সেই বয়সের পূর্বপর্যন্ত শিশু ঈসা অবশ্য আর কখনও কথা বলেনি।)

এদিকে সম্প্রদায়ের আগত লোকেরা এক দুগ্ধপোষ্য শিশুর কথা বলার এই আশ্চর্য ঘটনায় ভয়ে ও বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে পড়ল। তদুপরি এই শিশু নিজেকে রসূল হিসেবে দাবী করায়, তার মায়ের নির্দোষীতার সাক্ষী দেওয়ায়, তারা নিশ্চিত হল মেরীর ধার্মিকতা ও পবিত্রতার বিষয়ে। তারা নিজেদের আচরণের কারনে লজ্জিত হল এবং আর কোন কথা না বলে একে একে বিদায় নিল। 

এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ- অতঃপর সে (মরিয়ম) সন্তানকে নিয়ে তার সম্প্রদায়ের কাছে হাজির হল, ওরা বলল- হে মরিয়ম! তুমি তো এক অদ্ভূত কান্ড করে বসেছ। হে হারুণ ভগ্নি! তোমার পিতা অসৎ ব্যক্তি ছিল না, তোমার মাতাও ব্যভিচারিনী ছিল না।’
অতঃপর মরিয়ম ইঙ্গিতে সন্তানকে দেখাল। ওরা বলল, ‘যে দোলনার শিশু তার সাথে আমরা কেমন করে কথা বলব?’

সে (ঈসা) বলল, ‘আমি তো আল্লাহর দাস। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন, আমাকে নবী করেছেন। আমি যেখানেই থাকি না কেন তিনি আমাকে আশীষভাজন করেছেন, তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যতদিন জীবিত থাকি ততদিন নামাজ ও যাকাত আদায় করতে এবং মায়ের প্রতি অনুগত থাকতে এবং তিনি আমাকে উদ্ধত ও হতভাগ্য করেননি। আমার প্রতি শান্তি ছিল-যেদিন আমি জন্মলাভ করেছি ও শান্তি থাকবে যেদিন আমার মৃত্যু হবে ও যেদিন জীবিত অবস্থায় আমি পুনরুজ্জীবিত হব।’(১৯:২৭-৩৩) ‘নিশ্চয় আল্লাহ আমার পালনকর্তা ও তোমাদের পালনকর্তা। অতএব তোমরা তাঁর এবাদত কর। এটা সরল পথ।’(১৯:৩৬)

অন্যদিকে, ২য় শতকের Injilu't Tufuliyyah or the Gospel of the Infancy of Jesus Christ-এ এঘটনা বর্ণিত হয়েছে এভাবে-

"He relates that Jesus spake even when he was in the cradle and he said to his mother, "Mary, I am Jesus the son of God, that word which thou didst bring forth according to the celebration of the angel Gabriel to thee, my Father has sent me for the salvation of the world." -Syriac Infancy Gospel 1:2-3

এদিকে মেরীর সম্প্রদায়ের বাইরে অন্য ইস্রায়েলী এক দুগ্ধপোষ্য শিশুর কথা বলার, নিজেকে রাসূল হিসেবে দাবী করার এবং তার মায়ের নির্দোষীতার সাক্ষী দেওয়ার কথা শুনে তা বিশ্বাস করল না, বরং তারা হাস্য-কৌতুক করতে লাগল। এই কাহিনী তাদের কাছে আজগুবি ও অবিশ্বাস্য ছিল। কেননা, তারা মানব সন্তান জন্মানোর উপকরণ সম্পর্কে বিশেষভাবে অবগত ছিল। আর লোকেরা যে অবিশ্বাস করবে একথা পূর্ববর্তী নবীদের কিতাবেও তো ছিল-

‘হে অবজ্ঞাকারিগণ দৃষ্টিপাত কর,
আর চমকে উঠ এবং অন্তর্হিত হও;
যেহেতু তোমাদের সময়ে আমি এক কর্ম করব,
সেই কর্মের কথা যদি কেউ তোমাদের কাছে বর্ণনা করে,
তোমরা কোনমতে বিশ্বাস করবে না।’----(হবক্কুক ১:৫)

আর তাই এসময় ঐসব লোকেরা মেরীর উপর অশ্লীল অপবাদ আরোপ করল। তারা বলল, ‘আসলে শিশুটি হচ্ছে ঐ ছুতোর ব্যাটারই জারজ সন্তান।’
এ সব পথভ্রষ্ট ইস্রায়েলীদের সম্পর্কে কোরআনে এই আয়াত বিধৃত হয়েছে- আর তাদের কুফরী এবং মরিয়মের প্রতি মহা অপবাদ আরোপ করার কারণে।(৪:১৫৬)

যার প্রতি ইস্রায়েলীরা ইঙ্গিত করছে সে হল মেরীর চাচাত ভাই ইউসূফ। সে ছিল কাঠ মিস্ত্রি। এবাদতখানার সেবাকাজে সে যখনই আসত, মেরীর সঙ্গে দেখা করত। যাহোক, ইউসূফ অতি সৎলোক ছিল। সে মেরীকে অপদস্তের হাত থেকে রক্ষা করতে তাকে বিবাহ করেছিল। 

সমাপ্ত।

বি:দ্র: বাইবেল সম্পর্কে যাদের ধারণা পরিস্কার, তারা হয়ত: লক্ষ্য করেছেন যে, আমি আমার উপরের আর্টিকেলে ঈসা মসিহ বা জেসাসের জন্মসন সম্পর্কে কোন কথা লিখিনি। আসলে আমি সযত্নে এড়িয়ে গেছি বিষয়টি। কেননা তার জন্মসন নির্ধারণে যে সব তথ্য আছে আমাদের হাতে, তা যথেষ্ট গোলমেলে।

বাইবেলে (নূতন নিয়মে) জেসাসের জন্ম সময়ের বেশ কয়েকটি ঘটনা আছে যা তার জন্ম সন নির্ধারণে সূত্র হিসেবে কাজ করে। বাইবেলের এক লেথক ম্যাথুর বর্ণনা অনুসারে জেসাসের জন্ম হেরোদের রাজত্ব কালে, যার মৃত্যু হয়েছিল ৪ বিসিতে। অবশ্য অনেক পন্ডিতের মতে তার মৃত্যুকাল ৪-১বিসি। এই ঘটনা জেসাসের জন্মকাল নির্দেশ করে ঘটনার কিছু পূর্বে। বাইবেল পন্ডিতগণের মতে ঐ সনটা ৬-৪ বিসির কোন একটি। 

ম্যাথুর বর্ণনায় অবশ্য আরো একটি ঐতিহাসিক ঘটনার বর্ণনা রয়েছে যা জেসাসের জন্মসন নির্ধারণে ব্যবহার করা যেতে পারে। এটা হ্যালির ধূমকেতু। যাকে বাইবেলে উদিত নতুন নক্ষত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা পূর্বদেশ (চীন) থেকে কয়েকজন জ্ঞানী লোককে পরিচালনা দিয়ে জেসাসের নিকট নাকি পৌঁছে দিয়েছিল। এই ধূমকেতুর কথা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়েছে চীনের হান ডাইন্যাস্টির সময়কালে। এই সূত্র থেকে জানা যায়, ধূমকেতুটি ৭০ দিন ধরে ৬ বিসিতে দেখা গিয়েছিল ।

আবার, বাইবেলের অন্য এক লেথক লুকের বর্ণনা অনুসারে জেসাসের জন্ম রোমান রাজত্বকালের এমন একটা সময়ে যখন রোমীয় শাসনকর্তা কূরীণিয় লোক গণনা করেছিলেন। আর প্রথম শতাব্দীর ইহুদি ইতিহাসবিদ ইউসূফ (Josephus) বলেন ঐ গণনা হয়েছিল ৬ এডিতে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, একটা সূত্র থেকে পাওয়া তখ্যের উপর ভিত্তি করে কোন সিদ্ধান্তে এলে অন্য সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য নেয়া ঐ সিদ্ধান্তটিকে মিথ্যে প্রমান করে। মূলত: নতুন নিয়মের চারজন লেখকের কেউই যিশুর সাক্ষাৎ শিষ্য নন। আর তাই তাদের লেখায় এসব ভুল রয়ে গেছে। মূলত: এসব কারনেই আমি তার জন্মসন এড়িয়ে গেছি, একই সাথে এড়িয়ে গেছি তার জন্মের সঙ্গে ঐসব ঘটনার যোগসূত্রগুলি। 

সুতরাং এটা প্রমাণিত যে, জেসাসের জন্মের উপর ভিত্তি করে সন গণনার এই যে বিসি/এডি লেবেল তা আসলে গোলমেলে- ভুলের উপর প্রতিষ্ঠিত। প্রকৃতপক্ষে সন গণনার এই বিসি/এডি লেবেলের ধারণা দেন Dionysius Exiguus নামের এক ধর্মোন্মাদ ব্যক্তি ৬ষ্ঠ শতকে। তার মতে জেসাসের জন্মের উপর ভিত্তি করেই সন গনিত হওয়া উচিৎ। আর এভাবেই তা প্রচলিত হয়। অন্যদিকে তিনি হেরোদের মৃত্যুর সনটি সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হওয়ায়, জেসাসের জন্মসনটি ভুল নির্ধারিত হয়।
------------
ছবি: Wikipedia, templemount, mikosblog-mikosan.blogspot, udayton.edu.

Jesus: খোদার আশীর্বাদপুষ্ট রাজ্যে আশীর্বাদস্বরূপ।


হযরত ঈসার জন্মস্থান প্যালেষ্টাইন দেশটি পৃথিবীর কেন্দ্রস্থলে, দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ায় অবস্থিত এবং ভূ-মধ্য সাগরের পশ্চিম তীরের দক্ষিণ অংশ নিয়ে গঠিত। মোট আয়তন ১০,০০০ বর্গমাইল। প্রথমদিকে এই অঞ্চলকে কনান বা নিম্নভূমি বলা হত। এর পশ্চিম সীমানায় ভূ-মধ্য সাগর, উত্তরে লেবাননের পর্বতশ্রেণী, পূর্বে আরবীয় মরুভূমি এবং দক্ষিণে শুস্ক আধা মরুভূমি অঞ্চল যা নেগেভ বা দক্ষিণাঞ্চল নামে পরিচিত। যদিও প্যালেষ্টাইন একটি ছোট দেশ, তথাপি প্রাকৃতিক বিষয়গুলির অধিকাংশই এখানে বর্তমান- বরফে ঢাকা পর্বতমালা ও অসহ্য গরমের নিম্নভূমি, মরুভূমি, উর্বরা সমভূমি, পাথরে ঢাকা অনুর্বর ভূমি ও সবুজ উপত্যকা সবই এখানে রয়েছে। প্রকৃতি প্যালেষ্টাইনকে উত্তর দক্ষিণ বরাবর ৪টি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বিভক্ত করেছে। পশ্চিম সীমা ভূমধ্য সাগরে আরম্ভ হয়ে পূর্বদিকে এই অঞ্চলগুলি হল-

(ক) সমুদ্রতীরবর্তী সমভূমি  
(খ) পশ্চিমের উচ্চভূমি
(গ) জর্দান নদীর উপত্যকা
(ঘ) পূর্বের উচ্চভূমি।

প্রাচীন প্যালেষ্টাইন।
(ক) সমুদ্র তীরবর্তী সমভূমি: পশ্চিমের সমুদ্র ও পূর্বের গালীল, শমরিয় ও ইহুদিয়ার পর্বত মালার মধ্যে এই সমতল ভুমি অবস্থিত। উত্তর দিকে এই ভূমি সরু থেকে চওড়া হতে হতে দক্ষিণ দিকে শেষপর্যন্ত পঁচিশ-তিরিশ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সমুদ্রতীরের এই সরু এলাকা প্রাকৃতিক দিক দিয়ে তিনটি অংশে বিভক্ত- উত্তরে আক্কা ও সোরের সমভূমি, তারপরেই কর্মিল পর্বতে আরম্ভ হয়েছে সুন্দর বিখ্যাত শারোণ প্রান্তর আর দক্ষিণে অবস্থিত বড় এবং অতি উর্বর প্যালেষ্টাইন সমভূমি। এই সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে বেশ কিছু শহর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উত্তর দিক থেকে এই শহরগুলি হল-সীদোন, সোর, যাফো, কৈশরিয়া, লুড, ঘষা, অস্কিলোন, অসদোদ, ইক্রোণ ইত্যাদি। 

(খ) পশ্চিমের উচ্চভূমি: উচ্চভূমি নামক এই মালভূমি উত্তরে লেবানন পর্বতমালায় আরম্ভ হয়ে দক্ষিণে আরব মরুভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত। এই অঞ্চল গালীল, শমরিয় ও ইহুদিয়া এই তিনটি অংশে বিভক্ত। উত্তরে গালীল এবং দক্ষিণে শমরিয়ার মধ্যে সমভূমি এসদ্রায়োলন, পশ্চিমের বিস্তৃত মালভূমির একমাত্র অঙ্গন।  

গালীল: গালীলের আনুমানিক আয়তন ১৫০০ বর্গমাইল। এখানে ইষাখর, সবুলুন, আঁশের, নপ্তালী এবং শেষে দান বংশের লোকেরা বাস করত। হযরত ঈসা এখানেই বড় হয়েছেন। এর উল্লেখযোগ্য শহরগুলি হল-নাসারত, কান্না, কফরনাহুম, কা‘দেশ, শুলেম নাইন, বৈৎসৈদা ও ঐণ-দোর। 

শমরিয়: শমরিয় এসদ্রায়োলনের দক্ষিণে এবং ইহুদিয়ার উত্তরে অবস্থিত যার পূর্বদিকে জর্দান নদী এবং পশ্চিম দিকে শারোণ প্রান্তর অবস্থিত। এর আনুমানিক আয়তন ১৫০০ বর্গমাইল। হযরত ইব্রাহিম ও অন্যান্য পিতৃপুরুষেরা এখানে বসবাস করতেন পরবর্তীতে এটি উত্তরাঞ্চলের দশ বংশের বাসস্থান হয়। এখানেই রয়েছে-এবল ও গরীষীম পর্বত, শিখিম, বৈথেল, অয়, দোথন, শীলোহ, মগিদ্দো, যিষ্রিয়েল এবং শমরিয়া শহর।
ইহুদিয়া: ইহুদিয়া তৈরী করেছে পশ্চিম অঞ্চলের উচ্চভূমির নীচু অংশ যার আয়তন ১৫০০ বর্গমাইল। এই অংশটি তিনটি ভাগে বিভক্ত-পূর্ব অঞ্চলের পাহাড় বা মরুভূমি, শেফেলা যা পশ্চিম অঞ্চলের পাহাড়সমূহ নীচু হয়ে প্যালেষ্টাইন পর্যন্ত গেছে এবং দক্ষিণ ইহুদিয়া। এটি সমস্ত দেশের কেন্দ্রস্থল আর জেরুজালেম এখানেই অবস্থিত।

(গ) জর্দান নদীর উপত্যকাঃ এই অঞ্চলটি সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও অদ্বিতীয় ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য মন্ডিত। এই বিরাট গিরিসংকট উত্তরের তাউরাস পর্বত থেকে আরম্ভ করে গোটা দেশের মধ্যে দিয়ে ৫৫০ মাইল গিয়ে প্যালেষ্টাইনের দক্ষিণ মরুভূমিতে শেষ হয়েছে যা সমুদ্র সমতল থেকে প্রায় ২৬০০ ফুট নীচু। এই উপত্যকাটি তিনটি অংশে বিভক্ত। উত্তরদিক থেকে এগুলি হল-

গালীল সাগরঃ  যা গীনেষরৎ হ্রদ, তিবরিয়া সাগর এবং কিন্নেরৎ হ্রদ হিসেবে পরিচিত।
জর্দান উপত্যকাঃ  এটা উত্তরের গালীল সাগর থেকে দক্ষিণে মরুসাগর পর্যন্ত গভীর নিম্নগামী অঞ্চল যা ঝোর নামেও পরিচিত। এরই পাশ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে জর্দান নদী। এই নদীর পানি ৬১০ ফুট নীচে মরুসাগরে পড়ছে। আর দ্রুত এই পতনের জন্যে এই নদীর নাম জর্দান বা অবতরণকারী।

মরুসাগর: সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৩০০ ফুট নীচু এ হ্রদটি ১০ মাইল চওড়া ও ৫০ মাইল লম্বা। গভীর কুজ্ঝটিকায় ঢেকে থাকা এই হ্রদের পানিতে প্রচুর পরিমানে খনিজ লবন থাকায় কোন উদ্ভিদ বা প্রাণী এখানে পাওয়া যায় না।

(ঘ) পূর্বের উচ্চভূমি: জর্দানের পূর্বের পাহাড় ও সমতলভূমি। এটি অনেকটা পশ্চিমের পার্বত্য অঞ্চলের মত যাকে ট্রান্স-জর্দানীয়া বলা হয়। ঈসার পূর্বে এখানে (যা দিকাপলী নামেও পরিচিত) বেশকিছু বৃহৎ ও প্রসিদ্ধ শহর গ্রীক ও রোমানরা তৈরী করে।

ঈসার সময়ে প্যালেস্টাইন ছিল রোম রাজ্যের অধীন। রোমের সম্রাট ছিলেন অগাস্ত কৈসর আর পন্তীয় পীলাত নামে একজন রোমীয় প্যালেস্টাইনের শাসনকর্তা ছিলেন। প্যালেস্টাইনের বেশীরভাগ লোক ছিল গোঁড়া ইহুদি; তবে শমরিয়রা ছিল শঙ্কর। শমরিয়দের আদি পুরুষেরা ইহুদি হলেও অ-ইহুদিদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার দরুণ তারা এরূপ শঙ্কর জাতির সৃষ্টি করেছিল। এ কারণে গোঁড়া ইহুদিরা তাদের ঘৃণা করত এবং তাদের মধ্যে ধরা ছোঁয়ার বাঁছ-বিচার ছিল। 

রোমের অধীনে ছিল বলে ইহুদি নেতাদের হাতে বিশেষ কোন ক্ষমতা ছিল না। কাউকে মৃত্যুদন্ড দেবার অধিকার তাদের ছিল না। সেজন্যে মৃত্যুদন্ডযোগ্য অপরাধীর বিচার করার প্রয়োজন হলে তা রোমীয়দের আইন অনুসারেই করা হত, ইহুদিদের নিয়মমত নয়। মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত ব্যক্তিকে রোমীয়রা হাতে ও পায়ে পেরেক বিঁধে ক্রুসের উপর গেঁথে দিত। তারপর ক্রুসটা মাটিতে খাড়া করে প্রোথিত করত। ছোট বড় দু‘টো কাঠের টুকরো দ্বারা ইংরেজী টি (T) অক্ষরের মত করে এই ক্রুস তৈরী হত। 

দুনিয়ার অন্যান্য সমস্ত জাতিদের মধ্যে ইহুদিরা ব্যতিক্রমী এবং সৌভাগ্যবান। জাতি হিসেবে তারা ছিল চরম একগুয়ে এবং বক্রস্বভাবী। ব্যতিক্রমী একারণে যে খোদা তাদের মাঝে একাদিক্রমে রসূল প্রেরণ করেছেন, আর সৌভাগ্যবান একারণে যে তারা অনেক মহান নবীর সাহচর্য্য লাভ করেছিল, যাদের অনেকেই ঐশীগ্রন্থ নিয়ে এসেছিলেন। আর ঐসব মহান নবীর কাছে দেয়া ওয়াদার কারণেই খোদা সর্বদা তাদের মাঝে একেশ্বরবাদীর ধারা রক্ষণের প্রচেষ্টা করেছেন।

যখনই বনি ইস্রায়েল সরল ও সত্যপথ থেকে বিচ্যূত হয়েছে, তখনই একজন নবী বা রসূল তাদের মাঝে প্রেরিত হয়েছে, যারা প্রতিমাপূজার কূ-ফল সম্পর্কে তাদেরকে সতর্ক করেছেন এবং সত্যপথে ফিরিয়ে আনতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু যেহেতু ইহুদি জাতিটি ছিল, নাফরমান, একগুয়ে ও বক্রস্বভাবী, ফলে তাদের অধিকাংশ ঐসব রসূলদের বাণীতে কর্ণপাত করেনি এবং তাদের উপরও বিশ্বাস স্থাপন করেনি; বরং তারা রসূলগণের অধিকাংশকে নানাপ্রকার ক্লেশ দিয়েছে, নতুবা হত্যা করেছে। ফলে তারা কখনও আল্লাহর স্বরূপ সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান লাভ বা সম্যক অবহিত হয়নি, হবার চেষ্টা করেনি বা হতে পারেনি। এই কারণে খোদা শেষ চেষ্টাস্বরূপ তাদের মাঝে এমন একজন রসূল প্রেরণ করতে চাইলেন, যিনি হবেন খোদায়ী কিছু গুণ বা কর্মের অধিকারী; যেন ইস্রায়েলীরা তার কাছ থেকে খোদার স্বরূপ সম্পর্কে সম্যক অবহিত হয় এবং আর যেন একেশ্বরবাদ থেকে কখনই বিচ্যূত না হয়। এই খোদায়ী কিছু গুণ সম্পন্ন রসূল ছিলেন মরিয়ম তনয় হযরত ঈসা মসীহ।
নবী অরামিয়ার কিতাব থেকে আমরা খোদার ঐ শেষ প্রচেষ্টার ইচ্ছে সম্পর্কে জানতে পাই।

‘এই জন্যে দেখ, আমি তাদেরকে জ্ঞাত করব,
একটিবার তাদেরকে আমি আমার হস্ত ও পরাক্রম জ্ঞাত করব,
তাতে তারা জানবে যে, আমিই খোদা।’(অরামিয়া ১৬:২১)

মসিহ ঈসা (Jesus) ইঞ্জিল কিতাব নিয়ে এসেছিলেন। ইতিপূর্বে ইহুদিরা যে সব ঐশীগ্রন্থ বা কিতাব পেয়েছিল তা হল তাওরাত, যবুর এবং বেশ কয়েকটি সহীফা। 

মসিহ ঈসা।
ইহুদিদের প্রতি খোদার আদেশ ছিল যেন তারা তাদের ঐশী গ্রন্থের নির্দেশসমূহ মেনে চলে এবং মান্য করে রসূলগণকে। শরীয়ত অনুসারে সৎ জীবন-যাপন করা এবং পশু কোরবাণী দেয়া ছিল তাদের খুবই প্রয়োজনীয় কাজ। তাদের একমাত্র এবাদতখানা ছিল জেরুজালেমে। এখানেই সকল এলাকা থেকে ইস্রায়েলীরা এসে বৎসরে তিনবার একসঙ্গে মিলিত হত। এসব উৎসবের প্রত্যেক দিন ঈমামেরা ও সাধারণ ইহুদিরা এবাদতখানায় প্রবেশ করত এবং এবাদত শেষে তাদের পাপ মোচনের জন্যে পশু কোরবাণী দিত। জেরুজালেমের এবাদতখানা তাদের একমাত্র এবাদতখানা হলেও দেশের শহরগুলোতে ও গ্রামে গ্রামে অনেক ‘সিনাগগ’ বা মজলিসখানা ছিল। কেবল তাই নয়, তারা দুনিয়ার অন্যান্য যে সমস্ত দেশে থাকত, সেখানেও তারা তাদের জন্যে সিনাগগ তৈরী করে নিয়েছিল। এই সমস্ত সিনাগগে তারা স্রষ্টার এবাদত করত কিন্তু পশু কোরবাণী দিত না।  

ইহুদিদের মধ্যে পদ অনুসারে বিভিন্ন রকমের ঈমাম ও ধর্মনেতা ছিলেন। সকল ঈমামের উপরে ছিলেন মহাঈমাম। তার নীচে থাকতেন কয়েকজন (এগার জন) প্রধান ঈমাম। এই প্রধান ঈমামেরা ছিলেন বর্তমান মহাঈমামের পূর্ববর্তী মহাঈমাম ও অন্যান্য সম্মানিত ঈমাম। এই সকল ঈমাম বা আলেমদেরকে সাহায্য করার জন্যে লেবী গোত্রের লোকেরা নির্বাচিত ছিল। তাছাড়া কিতাব তাওরাত শিক্ষা দেবার জন্যে কিছু সংখ্যক সাধারণ ঈমাম বা আলেমও ছিলেন।

ইহুদিদের মধ্যে ফরীশী ও সদ্দুকী নামে দু‘টি দল কালক্রমে উৎপত্তি লাভ করেছিল। ফরীশীরা ছিল খুবই গোঁড়া। তারা ধর্মীয় নিয়ম কানুনের প্রত্যেকটি খুঁটি-নাটি মেনে চলতে চেষ্টা করত। তারা বিশ্বাস করত মৃতেরা পুনঃরায় জীবিত হবে আর তারপর বিচারের সম্মুখীণ হবে এবং কৃতকর্মের ফল হিসেবে বেহেস্ত বা দোযখে নীত হবে। কিন্তু সদ্দুকীরা গ্রীক ও রোমান সংস্কৃতির ছোঁয়ায় বেড়ে উঠেছিল। এ কারণে তাদের ধর্মীয় ব্যাপারে বেশী গোঁড়ামী ছিল না। তারা গ্রীকদের মত রূহ ও ফেরেস্তায় বিশ্বাস করত না, বিশ্বাস করত না মৃতেরা আবার জীবিত হবে এবং জবাবদিহীতার জন্যে বিচারের সম্মুখীণ হবে।

ধর্মীয় ও সামাজিক বড় বড় সমস্যার মীমাংসার জন্যে ইহুদিদের একটা মহাসভা ছিল। এই মহাসভার মোট সদস্য সংখ্যা ছিল সত্তুর, যাদের প্রত্যেকেই ছিলেন আলেম ও সম্মানিত ঈমামদের একজন। মহাঈমাম এই সত্তুর জনেরই একজন এবং পদাধিকার বলে হতেন এই মহাসভার প্রধান। 

নিজেদের স্বভাব চরিত্রের অধ:পতনের কারণে ইহুদিরা চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিল। খোদা তাদেরকে তাদের মাতৃভূমি থেকে উৎখাত করে জাতিগণের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং তাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন চরম অপমান ও শাস্তি। এসময় যারা সত্যপথে থাকার প্রচেষ্টায় নিয়ত: সংগ্রামে লিপ্ত ছিল, তারা অধঃপতিত স্বজাতিদের দেখে মনে কষ্ট পেলেও এই আশা তাদেরকে উদ্দীপিত করত বা মনকে সান্তনা দিত যে, একদিন মসীহ (ত্রাণকর্তা বা উদ্ধারকারী) তাদের মাঝে আগমন করবেন এবং তাদেরকে তাদের পাপ এবং দুঃখ-কষ্ট থেকে ত্রাণ বা উদ্ধার করবেন।

ঈসা মসীহর ধরণীতে আগমন পূর্ব নির্ধারিত ছিল। পূর্ববর্তী নবীদের অনেককেই খোদা তার আগমন সম্পর্কে অবহিত করেছিলেন। তাদের উপর নাযিলকৃত সহীফাগুলোতে তাই তার আগমন, জীবন-যাপন ও উর্দ্ধগমন সম্বন্ধে অনেক কথাই দেখতে পাওয়া যায়, যা মেরী, মরিয়ম তনয় ঈসা মসীহ দুনিয়াতে আসার পরে পূর্ণ হয়েছিল। 

সমাপ্ত।
ছবি: bible-history, asecular, salaam.co.uk.

Julius Caesar: জুলিয়াস সিজার ও ক্লিওপেট্টা।


রোমের আগ্রাসন মূলক যুদ্ধ ও রোমক সেনাবাহিনীর যোদ্ধারা ভাড়াটে সৈনিক ছিল বলে সেনাপতিদের ক্ষমতা অত্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছিল। অভিজ্ঞ সেনাপতিরা সিনেটের নির্দেশানুযায়ী নিজেরাই নিজেদের বাহিনী গঠন করত। যোদ্ধারা তাদের কাছ থেকে বেতন এবং লুন্ঠিত মালের অংশ পেত। সৈন্যরা শুধুমাত্র সেনাপতির আদেশ পালন করত এবং সর্বদাই তাদের আদেশ মত যুদ্ধ করতে প্রস্তুত থাকত।

 পো নদী।
দাস মালিকদের অনেকেই মনে করত যে, একজন শক্তিশালী সেনাবাহিনীর অধিনায়ক, কন্সুল ও সিনেটের চেয়ে যোগ্যতর রূপে দাস ও দরিদ্রের বিরুদ্ধতা প্রতিরোধ করতে সক্ষম। রোমে তাই সেনাপতিদের শাসন কায়েম হোক এটাই তারা চাইত। বিভিন্ন যুদ্ধে বিজয়ী এবং ৭১ খ্রীঃপূঃ দাস বিদ্রোহকে নির্মমভাবে যিনি দমন করেছিলেন সেই পম্পেইকে এ কাজের উপযুক্ত বলে তাদের মনে হয়েছিল।

এদিকে একই ভাবে রোমের শাসন ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিলেন জুলিয়াস সিজার (Julius Caesar)। তিনি এসেছিলেন এক সম্ভ্রান্ত পরিবার থেকে। ৫৮ খ্রীঃপূঃ তিনি কন্সুল পদে নির্বাচিত হয়ে গলিয়া প্রদেশের শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। 

গলীয়দের আত্মসমর্পণ।
গল জাতি পো নদীর অববাহিকায় এবং আধুনিক কালের ফ্রান্সে বসতি স্থাপন করেছিল। গলদের অনেক উপজাতি পরস্পর পরস্পরের শত্রু ছিল। সিজার যখন গলিয়ার শাসনকর্তা হন তখন শুধুমাত্র পো নদীর অববাহিকা আর ভূ-মধ্য সাগরীয় উপত্যকার কিছু অংশ রোমকদের অধিকারে এসেছিল।

গলিয়াতে প্রায় ৮ বৎসর ধরে যুদ্ধ চলল। এই যুদ্ধে সিজার নিজেকে এক প্রতিভাবান সেনাপতিরূপে উপস্থাপন করতে সমর্থ হন। গলরা নিজেদের স্বাধীনতার জন্যে নির্ভিকভাবে যুদ্ধ করেছিল, কিন্তু তাদের বিশৃঙ্খল বাহিনী যুদ্ধে অভিজ্ঞ রোমক লোগিওর আক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারেনি। রোমকরা গলদের সারাদেশ দখল করে নেয় এবং কয়েক লক্ষ যুদ্ধবন্দীকে দাসরূপে বিক্রি করে দেয়। 

‘ইয়াক্তা এস্ত আলেয়া।’ 
রোমক সেনাবাহিনী গলদের পবিত্রস্থান যেখানে দেবতাকে নিবেদন করার উদ্দেশ্যে আনীত স্বর্ণ সঞ্চয় করে রাখা হত, তা লুট করেছিল। সিজার ঐ লুটের মাল দিয়ে সেনাদের বেতন বাড়িয়ে দিলেন একই সঙ্গে তিনি তাদেরকে ভূ-সম্পত্তি বন্টন করার প্রতিশ্রুতিও দান করলেন। এভাবে সিজারের হাতে এল সম্পূর্ণ আজ্ঞানুবর্তী ও শক্তিশালী এক সেনাবাহিনী এবং প্রচুর ধন-সম্পদ।

৪৯ খ্রীঃপূঃ সিজার তার বাহিনী নিয়ে রোম আক্রমণের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন এবং গলিয়ার দক্ষিণ সীমানায় অবস্থিত রুবিকন নদীর তীরে এসে পৌঁছিলেন। সেনাবাহিনীসহ এই সীমানা অতিক্রম করে যাবার অর্থ-প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা। সিজারের সম্মুখে তখন দু‘টি পথ: হয় রোম শাসন করা, নয়ত: কলঙ্কিত মৃত্যুদন্ড লাভ।

সিজার অনেকক্ষণ ধরে ভাবলেন, তারপর সমস্ত চিন্তা ঝেড়ে ফেলে তিনি উচ্চারণ করলেন: ‘ইয়াক্তা এস্ত আলেয়া।’ অর্থাৎ দান চালা হয়ে গেছে। তার বাহিনী নিয়ে তিনি সম্মুখে অগ্রসর হলেন। এ থেকেই এ বাগ্বিধির উৎপত্তি: To Cross the Rubicon- অর্থ যা থেকে আর পিছানো যাবে না এমন বিপদজনক কোন কাজের সিদ্ধান্ত নেয়া।

৪৮ খ্রীঃপূঃ দু‘বাহিনী পরস্পর পরস্পরের মুখোমুখী হল।
সিনেটের সৈন্যবল সিজারের অপেক্ষা বেশী থাকলেও তা বিভিন্ন প্রদেশে ছড়ানো ছিল। সিনেট তখন পম্পেই এর উপর ভার দিলেন সিজারকে প্রতিরোধ করার। কিন্তু সিজার এত দ্রুত রোম আক্রমণ করেছিলেন যে, পম্পেই প্রতিরক্ষার কোন আয়োজনই করার সুযোগ পাননি। সুতরাং প্রায় কোন প্রতিরোধের সম্মুখীন না হয়ে সিজার রোম এবং সমগ্র ইটালী দখল করে নিলেন।
ইতিমধ্যে পম্পেই বলকান উপদ্বীপে বিরাট এক বাহিনী গঠন করে ফেলেছেন। 

পম্পেই ও জুলিয়াস সীজারের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই শুরু হল। সিজারের বাহিনী পম্পেইকে মোকাবেলায় এগিয়ে গেল। অবশেষে ৪৮ খ্রীঃপূঃ দু‘বাহিনী পরস্পর পরস্পরের মুখোমুখী হল। এশিয়া মাইনরে ফারসালাসের এই যুদ্ধে (Battle of Pharsalus) পম্পেই নিহত হলে জুলিয়াস সীজার রোমের একচ্ছত্র অধিপতি হলেন। এই বিজয়ের পর সিজার মাত্র তিনটি শব্দে তার বিজয় সংবাদ রোমে পাঠিয়েছিলেন: Veni, vidi, vici.- অর্থ -এলাম, দেখলাম, জয় করলাম।  এই বিজয়ের পরপরই সীজারের জীবনে ক্লিওপেট্টা (Cleopatra) জড়িয়ে পড়ে। 

জুলিয়াস সিজার ও ক্লিওপেট্টা।
৬৯ খ্রীঃপূঃ আলেকজান্ডারের সেনাপ্রধান টলেমির পরিবারে ক্লিওপেট্টার জন্ম। সে কেবল দেখতেই সুন্দরী ছিল না, তার বুদ্ধিমত্তাও ছিল অসাধারণ। নগ্ননৃত্য আর খোলামেলা যৌনতার কারণে অল্প বয়সেই সে আলোচিত হয়ে উঠেছিল।

৫১ খ্রীঃপূঃ ত্রয়োদশ টলেমির সাথে ক্লিওপেট্টার বিবাহ হয়। সে মারা গেলে চতুর্দশ টলেমি তাকে বিবাহ করে। তাদের কারও সাথেই ক্লিওপেট্টার দাম্পত্য জীবন সুখের ছিল না। ধারণা করা হয় ১২ বৎসর বয়সেই সে কুমারীত্ব বিসর্জন দিয়েছিল। মিসরে সিংহাসন নিয়ে লড়াই শুরু হলে সে রোমে জুলিয়াস সিজারের কাছে পালিয়ে যায়। সেখানে সে নিজেকে নাটকীয়ভাবে তুলে ধরে।

একটি মোড়ান পারস্যিয়ান কার্পেট এনে সিজারের সম্মুখে অতি সাবধানে নামিয়ে রাখা হল। সিজার বুঝতে পারলেন এরমধ্যে বিশেষ কিছু রয়েছে। একজন ক্রীতদাসকে তিনি সেটা খুলতে বললেন।

এন্টনি ও ক্লিওপেট্টা।
কার্পেটের ভিতরের প্রান্ত যখন বেরিয়ে পড়ল, তখন সীজারের পদতলে গড়িয়ে এসে থামল এক অর্ধনগ্ন তরুণী। সীজার বিষ্মিত হলেন। আর তার বিষ্মিত দৃষ্টির সম্মুখে দাঁড়িয়ে পড়ল লজ্জাবনত ২১ বৎসরের অপরূপা সুন্দরী, ক্লিওপেট্টা। বলা বাহুল্য, ৫২ বৎসর বয়সী সিজার ক্লিওপেট্টার প্রেমে পড়ে গেলেন। প্রেমের দেবী ভেনাসের স্থলে ক্লিওপেট্টার মূর্ত্তি স্থাপন করা হল। 

সিজার ক্লিওপেট্টাকে বিবাহ করলেন। ফলে ক্লিওপেট্টা শুধু রানীই হল না, প্রতিশ্রুতি পেল তার সন্তান হবে রোমের সম্রাট। অতঃপর সিজারিয়ান নামে তার একটি সন্তানও হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সিজারের মৃত্যুর কিছুদিন পরেই পুত্রটি মারা যায়।

৪৫ খ্রীঃপূঃ গুপ্তঘাতকের হাতে সিজার নিহত হন। তার মৃত্যুর পর রোম সাম্রাজ্য, সাম্রাজ্য পরিষদের সদস্য অক্টোভিয়াস (সিজারের আত্মীয়), এন্টনি (সিজারের প্রাক্তন সহকারী) ও লেগিডাসের মধ্যে বিভক্ত হয়। সিরিয়া ও প্রাচ্যদেশ এন্টনির অধীনে ছিল। 

অক্টোভিয়াস সীজার অগাষ্টাস।
মিসরের নুতন সম্রাট হলেন মার্ক এন্টনি (Mark Antony)। এসময় ক্লিওপেট্টা আবারও রোমে পাড়ি জমাল এন্টনিকে ফাঁদে ফেলার জন্যে। এন্টনি অশ্লীলতা ও নিষ্ঠুর বিষয়ের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। তাকে কাবু করার জন্যে ক্লিওপেট্টাকে বহুকৌশল খাটাতে হয়েছিল এবং শেষপর্যন্ত সে জয়ী হয়েছিল। এসময় এন্টনি ও অক্টোভিয়াসের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই চলছিল। অবস্থা খারাপ দেখে এন্টনি ক্লিওপেট্টাকে সঙ্গে নিয়ে মিসরে পালিয়ে এলেন। এখানে তাদের জমজ সন্তানের জন্ম হল। 

এন্টনির প্রথমা স্ত্রী অক্টোভিয়া ছিল অক্টোভিয়াসের বোন। এন্টনি তাকে পরিত্যাগ করলে অক্টোভিয়াস এন্টনির রাজ্য আক্রমণ করলেন। এই যুদ্ধে এন্টনি পরাজিত ও ক্লিওপেট্টা গ্রেফতার হয়। এসময় এন্টনি ক্লিওপেট্টার আত্মহত্যার খবর শুনে নিজের বুকে ছুরি বসিয়ে আত্মহত্যা করেন। বাস্তব ছিল ঐ সময় ক্লিওপেট্টা আত্মহত্যা করেনি।

গ্রেফতারের পর ক্লিওপেট্টাকে বলা হয়েছিল রোমের রাস্তায় নগ্ন হয়ে হাঁটার জন্যে। ক্লিওপেট্টার সঙ্গে সবসময় ছোট একটা বিষাক্ত সাপ থাকত। সেটিকে সে তার অলঙ্কারের মধ্যে লুকিয়ে রাখত। পরে ঐ সাপের দংশনে সে আত্মহত্যা করেছিল।
সিনেটরগণ অক্টোভিয়াসকে ‘অগাষ্টাস’ (পবিত্র) উপাধিতে ভূষিত করে এবং অক্টোভিয়াস সীজার অগাষ্টাস নামে অক্টোভিয়াস রোমের একচ্ছত্র সম্রাট হলেন। 

সমাপ্ত।
ছবি: commons.wikimedia, mawdizzle, twcenter, 123rf, todayifoundout, redrampant.

Gladiator: গ্লাডিয়েটর বিদ্রোহ ও স্পার্তাকাসের কাহিনী।


যুদ্ধে বন্দী লক্ষ লক্ষ দাস এবং রোমের অধিনস্থ প্রদেশগুলোয় নিষ্ঠুর অত্যাচার চালাবার ফলে রোমে দাসের সংখ্যা অত্যধিক পরিমানে বেড়ে যায়। ফলে শত শত দাসদাসী কেনাবেচার বাজার গড়ে ওঠে। সবচেয়ে বড় বাজার ছিল ইজিয়ান সাগরের মধ্যে দেলোস দ্বীপে: এই বাজারে দিনে ১০ হাজার পর্যন্ত দাসদাসী ক্রয়-বিক্রয় হত। এইসব দাসদের বেশীর ভাগই ইটালীতে রপ্তানি হত। আর তাদেরকে ব্যাবহার করা হত কৃষিকাজে, খনিতে, জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বা জাহাজের মাঝিমাল্লা হিসেবে।

দেলোস দ্বীপ।
রোমান দাস মালিকেরা বলত যন্ত্র তিন প্রকার- নীরব যন্ত্র- যথা- গাড়ি, লাঙ্গল; সরব যন্ত্র- যেমন- ষাঁড়; আর সবাক যন্ত্র-তথা দাস। দাস হবার পর লোকের নিজের আর কোন নাম থাকত না, তাকে নতুন নামে ডাকত সবাই, আর প্রায়শ:ই সেই নাম হত অবজ্ঞাপূর্ণ ও লাঞ্ছনাদায়ক।

দাস অত্যন্ত সস্তা ছিল বলে, দাস মালিকেরা তাদের দিয়ে অসম্ভব কষ্টসাধ্য কাজ করাত। গ্রীষ্মের প্রখর রৌদ্রে দৈনিক ১৮ ঘন্টা ক্ষেতে বা খনিতে কাজ করত তারা। অপর্যাপ্ত আহার, অত্যধিক পরিশ্রম এবং কোন চিকিৎসা না থাকায় মাত্র কয়েক বৎসর দাস জীবন-যাপন করলেই একজন শক্ত সামর্থ্য যুবক পঙ্গু হয়ে যেত। অকর্মণ্য দাসদের জনমানব শুণ্য কোন দ্বীপে ফেলে আসা হত, সেখানেই অনাহারে একসময় প্রাণ ত্যাগ করত তারা। তাদের শুন্যস্থান পূরণ হত নতুন দাসদের দ্বারা, বাজারে কোন সময়ই দাসের কোন অভাব ছিল না।

দাসদের মধ্যে যারা ক্ষিপ্র, চটপটে ও শক্তিশালী ছিল তাদেরকে রোমবাসীগণ অস্ত্রচালনা শিক্ষা দিত এবং পরে তাদের একজনকে অন্যজনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে বাধ্য করত।এই দাসদের বলা হত গ্লাডিয়েটর (Gladiator)।

গ্লাডিয়েটরদের দ্বন্দ্বযুদ্ধ দেখার জন্যে অ্যাম্ফিফেয়াত্রোন বা অ্যাম্ফিথিয়েটার (Amphitheatre) তৈরী করা হয়েছিল ইটালী ও তার পার্শ্ববর্তী সকল প্রধান প্রধান শহরে। অ্যাম্ফিফেয়াত্রোন দেখতে ছিল সার্কাসের মঞ্চের মত। এর ঠিক কেন্দ্রস্থলে থাকত বালুময় উন্মুক্তস্থান, যাকে বলা হত আরেনা (arena)। এই আরেনার চতুর্দিকে ধাপে ধাপে দর্শকদের বসার স্থান ছিল। 

অ্যাম্ফিফেয়াত্রোন
উৎসবাদির সময়ে এই গ্লাডিয়েটরদের দ্বৈরথ অনুষ্ঠিত হত বিনোদনের জন্যে। দাস মালিকেরা তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে ঐ পৈচাশিক দ্বৈরথ উপভোগ করত। দ্বৈরথে পরাজিত কিন্তু তখনও জীবিত- এধরণের গ্লাডিয়েটরদের ভাগ্য দর্শকদের উপর ছেড়ে দেয়া হত। দর্শকরা হাত তুললে তার জীবন রক্ষা পেত, আর যদি তারা হাতের বৃদ্ধা আঙ্গুল নীচের দিকে করত, তাহলে বিজয়ী তাকে হত্যা করত। পরে ভৃত্যেরা আঙটা পরানো লাঠি দিয়ে মৃতদেহকে আরেনার বাইরে টেনে নিয়ে যেত। সিংহ, বাঘ ও অন্যান্য হিংস্র পশুদের সাথেও গ্লাডিয়েটরদের এধরণের যুদ্ধ করতে হত।

পরাজিতের ভাগ্য জানার অপেক্ষায়।
কাপূয়া শহরে গ্লাডিয়েটরদের জন্যে একটা বড় শিক্ষা কেন্দ্র ও কারাগার ছিল। ৭৪ খ্রী:পূর্বাব্দে বন্দীরা সেখানে এক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় এবং বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিতে থাকে। কারাগারের প্রহরী এই ষড়যন্ত্রের কথা জানতে পারে। তা সত্ত্বেও বেশকিছু বন্দী পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পলাতকগণ ভিসুভিয়াস পর্বতের চূঁড়ার আশ্রয় নেয়। এই পলাতক গ্লাডিয়েটরগণ স্পার্তাকাসকে নিজেদের নেতা নির্বাচিত করে। 

স্পার্তাকাস তার প্রচন্ড শক্তি, সাহস ও বুদ্ধির জন্যে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি ছিলেন বলকান দ্বীপের অধিবাসী, রোমকগণ তাকে বন্দী করে নিয়ে অসে। বন্দী অবস্থায় পলায়ন করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেলে তাকে গ্লাডিয়েটরদের দলে ফেলা হয়। 

বিদ্রোহী গ্লাডিয়েটরদের অস্ত্র বলতে কিছু ছিল না। প্রথম দিকে নিজেদের দূর্দান্ত সাহস শক্তি আর বুদ্ধি দিয়ে তারা দাস মালিকদের ঘরবাড়ি ও খামার লুটপাট করত। এভাবে লুটপাটের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তারা নিজেদের সুসংবদ্ধ ও অস্ত্রবলে বলীয়ান করে। নিকটবর্তী এলাকার দাসরা এসে স্পার্তাকাসের দলে যোগ দিল। তাদের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে উঠল স্থানীয়রা। তখন তিন হাজার রোমক সৈন্য এসে পলাতকদের আশ্রয়স্থল ঘিরে ফেলল। 

পাহাড় থেকে নীচে নামার একমাত্র পায়ে চলা পথ রোমকগণ অবরোধ করেছিল। তাদের ধারণা ছিল, ক্ষুৎ পিপাসায় কাতর হয়ে বিদ্রোহীরা আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু বিদ্রোহীরা স্পার্তাকাসের নেতৃত্বে আঙ্গুর লতা দিয়ে মই বুনে তার সাহায্যে রাতের বেলায় পাহাড়ের অত্যন্ত খাঁড়া দিকটা দিয়ে নীচে নামে, যেদিকটাতে কোন পাহারা ছিল না। অত:পর তারা অতর্কিতে রোমক বাহিনীর উপর ঝাপিয়ে পড়ে তাদের সকলকে হত্যা করে।

লতার দঁড়ির সাহায্যে রাতে নীচে নামে।
বিদ্রোহীদের এই সাফল্যের সংবাদ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সমগ্র ইটালী হতে দলে দলে দাস এসে স্পার্তাকাসের দলে যোগ দেয়। তারা তাদের দুর্ভাগ্য আর নিয়তি বলে মেনে নেয়নি।

স্পার্তাকাসের নেতৃত্বে হাজার হাজার দাস সঙ্ঘবদ্ধ হল। নানান ভাষাভাষী এইসব দাসদের মধ্যে স্পার্তাকাস কঠোর শৃঙ্খলা স্থাপন করেন। রোমক সেনাবাহিনীর অনুকরণে তিনি পদাতিক বাহিনী, অশ্বারোহী বাহিনী ও গুপ্তচর ব্যবস্থা গঠন করেন। অন্যদিকে দিনরাত্র কর্মকার তাদের শিবিরে নানা ধরণের অস্ত্রপাতি তৈরীতে নিয়োজিত থাকে।

স্পার্তাকাস তার সেনাবাহিনীকে উত্তরাভিমুখে চালনা করেন। তখন তার বিরুদ্ধে রোমক সিনেট উভয় কন্সুলকে প্রেরণ করেন। স্পার্তাকাস উভয় কন্সুলের রোমক বাহিনীকে একে একে পরাজিত করেন এবং সমগ্র ইটালী অতিক্রম করে পো নদীর উপত্যকায় এসে উপস্থিত হন। এখান থেকে তিনি তার বাহিনী নিয়ে বিপরীত মুখে যাত্রা করেন।

দ্বন্দ্বরত দুই গ্লাডিয়েটর।
বিদ্রোহীদের প্রত্যাবর্তণের সংবাদ পেয়ে দাস মালিকেরা ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। তারা তাড়াহুড়ো করে বিশাল সৈন্য সমাবেশ করে। এই বাহিনীর সেনাপতি ছিলেন ক্রান্সুস নামের খুবই ধনাঢ্য এক ব্যক্তি। ইতিমধ্যে সিনেট স্পেন ও বলকান উপদ্বীপ থেকেও সেনাবাহিনী তলব করে।

এদিকে রোমের উপকন্ঠে পৌঁছে স্পার্তাকাস দেখলেন যে, রোম অবরোধ করার শক্তি তার নেই। সুতরাং তিনি তার বাহিনীকে ইটালীর দক্ষিণাঞ্চলের দিকে চালিত করলেন। পথে ক্রান্সুসের বাহিনী তাদের পথ অবরোধ করে, কিন্তু স্পার্তাকাসের বাহিনী সেই বাঁধা ছিন্ন ভিন্ন করে বেরিয়ে যায় এবং দক্ষিণ পশ্চিম অন্তরীপ অভিমুখে যাত্রা করে। স্পার্তাকাসের হয়ত: সিলিলি গিয়ে সেখানে দাস বিদ্রোহ ঘটানোর পরিকল্পণা ছিল। কিন্তু সমুদ্রে ঝড় ওঠায় তা আর সম্ভব হয়নি, যদিও সিসিলি তাদের অবস্থান থেকে খুব একটা দূরে ছিল না। 

হিংস্র পশুর উপস্থিতিতে দ্বন্দ্বরত দুই গ্লাডিয়েটর।
স্পার্তাকাসের নেতৃত্বে বিদ্রোহীরা অন্তরীপে পৌঁছুলে রোমান সেনাপতি ক্রান্সুস এগিয়ে এসে অন্তরীপে যাতায়াতের একমাত্র পথ সংকীর্ণ যোজকটি দখল করে বসে এবং এক উপকূল হতে অন্য উপকূল পর্যন্ত সমস্ত জায়গায় গভীর পরিখা খনন করে উঁচু উঁচু বাঁধ বাঁধে। এরফলে বিদ্রোহীরা ফাঁদে আটকা পড়ে এবং তাদের মধ্যে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এসময় বিদ্রোহীদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দিতে গিয়ে স্পার্তাকাস বললেন যে- ‘অনাহারে কাপুরুষের মত মৃত্যুবরণ করার চেয়ে তীরের আঘাতে বীরের মত মরা অনেক ভাল।’ 

দুর্বিসহ ঠান্ডার মধ্যে স্পার্তাকাস রোমকদের আক্রমণ করে বসলেন। তার বাহিনী এক জায়গায় পরিখা ভরাট করে ফেলে ও বাঁধ দখল করে নেয়; অত:পর রোমক বাহিনীকে ছিন্ন করে বেরিয়ে যায়। 

রোমানদের সাথে স্পার্তাকাসের শেষ যুদ্ধ হয় ৭১ খ্রীঃপূঃ। এসময় বলকান উপদ্বীপ থেকে সেনাবাহিনী চলে আসে ইটালীতে। আবার পম্পেইর নেতৃত্বে স্পেন থেকেও সেনাবাহিনী এসে পৌঁছায়। 

এই যুদ্ধে স্পার্তাকাসের প্রচন্ড আক্রমণের মুখে দু‘জন রোমান সেনাপতি নিহত হয়। অবশ্য স্পার্তাকাস নিজেও আহত হয়েছিলেন। তার এক পা কাটা পড়ে, তখন তিনি এক পায়ে দাঁড়িয়েই যুদ্ধ করেছিলেন। 

বিদ্রোহীরা মহাসাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেছিল। কিন্তু রোমানদের শক্তিসামর্থ খুবই বেশী থাকায় তারা এই যুদ্ধে বিজয়ী হতে পারেনি।

যুদ্ধে ৬ বা ৭ হাজার বিদ্রোহী বন্দী হয়েছিল। এই বন্দীদের মধ্যে অবশ্য স্পার্তাকাস ছিলেন না। যুদ্ধক্ষেত্রে রোমকরা তাকে এমন টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলেছিল যে, পরে তাকে আর সনাক্ত করা যায়নি।

রোমকরা বন্দীদের সকলকে ক্রুস বিদ্ধ করে কাপুয়া থেকে রোমগামী রাস্তার দু‘ধারে ক্রুসগুলি পুতে দিল। পথিক এবং উল্লাসরত রোমানদের সম্মুখে ৬ বা ৭ হাজার বন্দী প্রচন্ড যন্ত্রণার মৃত্যূ প্রতীক্ষায় ক্রুসের উপর ঝুলে রইল।

সমাপ্ত।

বি:দ্র: যারা Spartacus, Season 1-5 এর সকল পর্বগুলি দেখেননি তারা দেখে ফেলেন, নইলে মিস করবেন।
উৎস: হিস্ট্রি অব দা এন্সিয়েন্ট ওয়ার্ল্ড -ফিওদর করোভকিন। হিস্ট্রি অব গ্রীস -গ্রোট।
ছবি: Wikipedia, greek-islands.

২৯ মার্চ, ২০১২

Rome: রোমক সভ্যতার উৎপত্তি ও বিকাশ।

রোম (Rome) নগরী, কিম্বদন্তী অনুযায়ী এটি ৭৫৩ খ্রীঃপূঃ ইটালীর তিবর (টাইবার) নদীর তীরস্থ বাম পার্শ্ববর্তী টিলাগুলোর উপরে, মোহনা থেকে ২৫ কিমি দূরে সৃষ্টি হয়েছিল এবং পরবর্তীতে এটির সাম্রাজ্য ভূ-মধ্য সাগরীয় অঞ্চলে ব্যাপকভাবে প্রসারিত হয়ে উত্তর দিকে ইউরোপ পর্যন্ত দূর-প্রাচ্যে বিস্তারলাভ করেছিল। আর শতাব্দীর পর শতাব্দী এটি সভ্য জগতের উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। 

নেকড়ে মাতার দুধপানরত রোমলুস ও রেমুস।
কিম্বদন্তী রয়েছে, ল্যাটিন ভাষাভাষী রাজ্যের কোন একটির রাজা নিজের এক আত্মীয়ার দু‘ই শিশু পুত্র সন্তান রোমলুস ও রেমুসকে তিবর নদী গর্ভে বিসর্জন দেবার হুকুম জারী করেন। কেননা, তার ভয় ছিল এরা বড় হয়ে তার সিংহাসন কেড়ে নেবে। বিসর্জন দেবার পরে তিবর নদীতে বন্যা আসায় যে ঝুড়িতে করে শিশু দু‘টিকে পানিতে ভাসিয়ে দেয়া হয়, তা বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে এক গাছের ডালে আঁটকে যায়। এভাবে শিশু দু‘টির প্রাণ বাঁচে। তারপর তারা একটি নেকড়ে বাঘের হাতে পড়ে এবং নেকড়ে মায়ের দুধ খেয়েই তারা বড় হচ্ছিল। পরে এক রাখাল তাদের দেখতে পেয়ে স্বগৃহে নিয়ে এসে দু‘ভাইকে মানুষ করতে থাকে। ভ্রাতৃদ্বয় যথারীতি (গল্প কাহিনীতে যেমন হয়) অমিত বিক্রম যোদ্ধারূপে বড় হয়ে ওঠে। তারপর ঐ রাজার বিরুদ্ধে তারা বিদ্রোহ পরিচালনা করে রাজাকে হত্যা করে। অত:পর তারা উভয়ে নগর পত্তন করতে চায়, কিন্তু কোথায় নগর গড়া হবে এবং কে তার পরিচালনার ভার নেবে তাই নিয়ে দু‘ভাইয়ের মধ্যে বিবাদ শুরু হয়। এই বিবাদে রোমলুস রেমুসকে হত্যা করে।

প্রাচীন রোম নগরী।
যে স্থানে রাখাল দু‘শিশু পুত্রকে খুঁজে পেয়েছিল তার নিকটে পত্তন হয় রোম নগরী, ল্যাটিন ভাষায় যাকে বলা হয় রোমা। যতদূর জানা যায়, খ্রী:পূ: ৭৫৩ অব্দে রোম নগরীর পত্তন হয়েছিল এবং এদিন থেকেই রোমকগণ বৎসর গণনা শুরু করেছিল। রোমের ক্যাপিটালিজম টিলার উপরে নেকড়ে জননীর মূর্ত্তি তৈরী করে রাখা হয়েছিল, এখন সেটি জাদুঘরে সংরক্ষিত হচ্ছে।

যা হোক, রোম নগরী মোট সাতটি টিলার উপরে ছড়িয়ে সৃষ্টি হয়েছিল। এ নগরীর অবস্থান নানান দিক থেকে সুবিধাজনক ছিল। নগরের চতুষ্পার্শ্বে ছিল উর্বর শস্যক্ষেত; তিবর নদীর মোহনায় ছিল বন্দর; সেখান থেকে রোমের ভিতর দিয়ে রাস্তা চলে গিয়েছিল ইতালীর গভীরে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সওদাগর ও কারিগরেরা এসে ধীরে ধীরে বসত করতে শুরু করল রোমে। 

খ্রী:পূ: ৬ষ্ঠ শতকের শেষভাগে এক নিষ্ঠুর রাজা শাসন করত রোম। একসময় রোমবাসী তাকে দেশ থেকে বিতাড়িত করে। এরপরে প্রতি বৎসর অনুষ্ঠিত একটি জনসভায় পাত্রিৎসিউ তথা পিতৃবংশীয়দের মধ্য থেকে দু‘জন শাসক- এদের বলা হত কন্সুল- নির্বাচন করা হত। এক বৎসরের জন্যে এই কন্সুলদ্বয় রোমের শাসনভার পরিচালনা করতেন। বিচার কার্য চালানোর ভারও ছিল তাদের উপরে এবং যুদ্ধবিগ্রহের সময় তারা সেনাপতি হতেন। অন্যান্য পদস্থ ব্যাক্তিরা অবশ্য এসব কাজে তাদেরকে সাহায্য করত, এই লোকজনও আবার প্রতি বৎসর অনুরূপ এক জনসভায় পাত্রিৎসিউদের মধ্য থেকেই নির্বাচিত হত এক বৎসর মেয়াদী কাজ করার জন্যে। এই এক বৎসর সর্বাপেক্ষা উচ্চ পদস্থ ব্যক্তি রূপে গণ্য হতেন সিনেটের সভ্যগণ যাদের তারা ডাকত সিনেটর বলে।

রোমের ৭টি টিলা।

সিনেটের ক্ষমতা ছিল অসীম। যুদ্ধবিগ্রহ যখন নেই অর্থাৎ শান্তির সময়ে সমস্ত প্রকার কাজকর্ম কন্সুলেরা সিনেটের পরামর্শ নিতে বাধ্য থাকত। কোষাগার, যুদ্ধ ও দেশের শান্তি রক্ষা ইত্যাদি সমস্ত দায়িত্ব সিনেটই বহন করত। কোন সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে জনসভা আহবান করে তা জনগণকে জানিয়ে দেয়া হত এবং জনগণ তা মান্য করত।

উত্তর ইতালীতে বসবাসকারী গল উপজাতি খ্রী:পূ: ৪র্থ শতাব্দীর প্রারম্ভে রোম আক্রমণ করল। লম্বা, ঝাঁকড়া চুলো এবং প্রকান্ড তরবারী এবং বিরাটাকার ঢাল দ্বারা সুসজ্জ্বিত বিশাল দেহের অধিকারী গলরা দেখতে ছিল ভয়াল দর্শণ। তাদের প্রচন্ড আক্রমণে রোমক সেনাবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। রোম দখল করে তারা নগর লুন্ঠন করে এবং আগুন দিয়ে পুড়িয়ে নগর ধ্বংস করে দেয়।

রোমবাসীদের কিছূ দূর্গে আশ্রয় নিয়েছিল। তখন গলরা দূর্গ অবরোধ করল। এই অবরোধের একপর্যায়ে তারা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে দূর্গে প্রবেশ করতে চাইল। কিন্তু যখন প্রবেশে ব্যর্থ হল, তখন তারা শর্ত দিল, যদি ৩০০ কিলোগ্রামের বেশী স্বর্ণ মুক্তিপণ হিসেবে দেয়া হয়, তবে তারা নগর ছেড়ে চলে যাবে। যখন সোনা ওজন করা হচ্ছে, সে সময় গলদের নেতা পশুরি সমেত পাল্লার উপরে নিজের ভারী তরবারীটি চাপিয়ে দেয়। রোমবাসীরা এর প্রতিবাদ করে উঠলে সে উত্তর দিয়েছিল: ‘পরাজিতদের কপালে দুঃখই থাকে।’

গলদের রোম আক্রমণ।

খ্রী:পূ: ৩য় শতকে রোম প্রজাতন্ত্র অত্যন্ত শক্তিশালী, সুসংগঠিত ও যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী সেনাবাহিনী গঠন করল। এই সেনাবাহিনী মূলত: কৃষকদের নিয়েই গঠিত হয়েছিল, কেননা সামরিক বাহিনীতে কেবল সেইসব লোকজনদেরই নেয়া হত, যাদের নিজেদের চাষের জমি আছে।

রোমক সেনাবাহিনীতে নিয়মানুবর্তিতা ছিল অত্যন্ত কড়া। অস্ত্র হারিয়ে ফেললে, কিম্বা প্রহরারত অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়লে তার শাস্তি ছিল মৃত্যূদন্ড। তাছাড়া উচ্চপদস্থ ব্যক্তির হুকুম তার অধীনস্থ সৈনিককে বিনা প্রশ্নে পালন করতে হত।

যুদ্ধের সময় সৈন্যদলের প্রথম সারিতে থাকত হালকা অস্ত্রে সজ্জ্বিত যোদ্ধারা। সম্মুখবর্ত্তী শত্রুবাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করার জন্যে তারা ধনুর্বাণ, পাথর এবং ছোট ছোট আকারের বল্লম ছুঁড়ে মারত। তারপরেই তারা পিছনে হটে গিয়ে সামনে যাবার জন্যে জায়গা করে দিত ভারী অস্ত্রে সজ্জ্বিত পদাতিকদের। বিপক্ষীয়দের উপর বল্লম নিক্ষেপ করে এই পদাতিকেরা উন্মুক্ত তরবারী হাতে শত্রুর উপর ঝাপিয়ে পড়ত। অশ্বারোহী দল পদাতিকদের রক্ষা করত উভয় পার্শ্বে- ডান ও বাম দিকে। যুদ্ধে জয়ী হলে এরা পরাজিত শত্রুদের পিছন পিছন তাড়া করে ছুটে যেত।

পিরুসের ইটালী অভিযানের রুট ম্যাপ।
খ্রী:পূ: ৩য় শতকের প্রথমার্ধে ইটালীর দক্ষিণে অবস্থিত গ্রীক শহরগুলো রোম দখল করে নেয়। তারপর ধীরে ধীরে সমগ্র অ্যাপেনাইন উপদ্বীপ দখল করে। অ্যাপেনাইন উপদ্বীপে কমপক্ষে ১২টি জাতি বাস করত এবং তাদের নিজেদের মধ্যে প্রায়ই শত্রুতা লেগে ছিল। তাদের সাথে রোমের সংগ্রাম চলেছিল ২০০ বৎসরেরও বেশী সময় ধরে। রোমের সেনাবাহিনী অস্ত্রশস্ত্র, যুদ্ধবিদ্যার জ্ঞান ও নিয়ম শৃঙ্খলার দিক থেকে শত্রু অপেক্ষা উন্নততর ছিল; প্রতিবেশী উপজাতিগুলোর বাহিনী সুশৃঙ্খলাবদ্ধ না হওয়ায় রোমের যুদ্ধাভিযান তারা প্রতিহত করতে পারেনি।

বিজিত অঞ্চলে রোম উপনিবেশ গড়ে তোলে। পরবর্তীতে এই উপনিবেশগুলো তাদের আধিপত্যের খুঁটি হিসেবে কাজ করতে থাকে। তাছাড়া সিনেট ‘Divide and Rule’ -এই নীতিতে বিশ্বাসী হয়ে বিজিত জাতিগুলোর মধ্যে ঝগড়া বিবাদ জিইয়ে রাখত, যাতে করে তারা সম্মিলিতভাবে রোমের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে না পারে।  

পিরুস তার সেনাবাহিনী নিয়ে ইটালীতে।
রোম যখন ইটালীর দক্ষিণে গ্রীক শহরগুলোর সাথে সংগ্রামে লিপ্ত ছিল, তখন বলকান উপদ্বীপের ছোট একটি রাজ্যের রাজা পিরুস গ্রীকদের সাহায্য করার জন্যে সেখানে উপস্থিত হন। পিরুসের সৈন্যবাহিনীতে ২২ হাজার পদাতিক, ৩ হাজার অশ্বারোহী এবং ২০টি হাতি ছিল। যুদ্ধে হস্তীযুথ রোম সেনাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং পায়ের তলায় পিষে তাদের বহু সৈন্য হত্যা করে ফেলে। আর হাতির পিঠে চড়ে তাদের সৈন্যরা রোমকদের উপর শর ও বল্লম নিক্ষেপ করে মহাত্রাস সৃষ্টি করে। রোমক বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায়।

পিরুসের বাহিনী পরপর কয়েকটি যুদ্ধে জয়ী হয় ঠিকই, কিন্তু যুদ্ধে যে বিপুল পরিমাণে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তাতে পিরুস আর্ত্তনাদ করে উঠেছিল: ‘আর একটি মাত্র যুদ্ধের পরই দেখছি আমার আর কোন বাহিনীই থাকবে না!’ -তার এই আক্ষেপ থেকেই ‘Pyrrhic Victory’ -এই প্রবচনটি এসেছে, যার অন্তর্নিহিত অর্থ হল: বিপুল ক্ষতির বিনিময়ে অর্জিত জয়, যখন জয়ের আনন্দ বা অর্থ থাকে না।

পরপর কয়েকটি যুদ্ধে পরাজয়ের পরও রোমকরা দুর্বল হয়নি, তারা  নতুন করে আরও সৈন্য সমাবেশ করেছিল। এই কারণে লোকে রোমের সাথে তুলনা করত হিদ্রার- যার একটি মাথা কেটে নিলে সেইস্থানে দু‘টো করে মাথা গজিয়ে উঠত। সর্বশেষ যুদ্ধে রোমকরা হাতির পায়ের নীচে বড় বড় পেরেক পোতা তক্তা ফেলে এবং জলন্ত ফেঁসো বাঁধা তীর দিয়ে হাতিগুলোকে এমন তাড়া করেছিল যে, ভয় পেয়ে ঐ দৈত্যাকার জন্তুগুলো নিজের সৈন্যদের পদতলে পিষ্ট করে দৌঁড়ে পালায়। এভাবে পিরুসের বাহিনী তছনছ হয়ে গেল। এই যুদ্ধের পর কিছু গ্রীক শহর বিনা যুদ্ধে রোমক বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। অন্যগুলো রোমানরা প্রচন্ড আক্রমণে দখল করে নেয়।

কার্থেজ নগরী।
আফ্রিকা মহাদেশের উত্তরাংশে সমুদ্রোপকূলে ফিনিসীয়রা কার্থেজ (Carthage) নগরীর পত্তন করেছিল। সমুদ্রের মধ্যে অনেকদূর পর্যন্ত প্রসারিত প্রস্তরময় অন্তরীপে এই নগরী অবস্থিত ছিল। উঁচু উঁচু মিনার সমেত পাথরের তৈরী দুর্ভেদ্য দূর্গপ্রাকার শহরটিকে বহি:শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করত।

সমুদ্রপথে বাণিজ্যের জন্যে কার্থেজের খ্যাতি ছিল। গভীর সমুদ্রের উপর নির্মিত তার বন্দরে সর্বদা জাহাজের ভীড় লেগে থাকত, আর সমুদ্রতীরের দোকান পসারীতে জিনিসপত্রের প্রাচুর্য ছিল দেখবার মত। জাহাজের মাঝিমাল্লা এবং বন্দরের খালাসীরা ছিল দাস। অত্যন্ত শক্তিশালী নৌবাহিনী ও বিশাল সৈন্যদল ছিল কার্থেজের। সৈন্যরা প্রধানত: ছিল ভাড়াটে যোদ্ধা। কার্থেজবাসীরা সমুদ্রোপকূলবর্তী বহু এলাকা ও দ্বীপ নিজেদের অধিকারে এনেছিল। সমগ্র পশ্চিম ভূ-মধ্যসাগরীয় অঞ্চলে প্রভূত্ব স্থাপনের চেষ্টা করেছিল তারা।

খ্রী:পূ: ২৬৮ অব্দে রোম সিসিলি দ্বীপ দখলের চেষ্টা করলে কার্থেজ ও রোমের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যায়। এই যুদ্ধকে বলা হয় পুনিক যুদ্ধ। যুদ্ধ চলেছিল বিশ বৎসরেরও অধিক এবং পরিশেষে রোম জয়লাভ করে। সিসিলি, সার্দিনিয়া ও কোর্সিকো দ্বীপগুলো রোমের অধীনে চলে আসে। পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করল কার্থেজ। স্পেনকে কব্জা করে নিল তারা। সেখানে এই অভিযান পরিচালনা করলেন তরুণ সেনাপতি হানিবল। হানিবলের সৈন্য পরিচালনার কৌশল এবং অসাধারণ শৈর্য্যবীর্যের কাহিনী ছড়িয়ে পড়ল সর্বত্র। 

হানিবলের সেনাবাহিনী আল্পস পবর্তমালা পার হচ্ছে।
স্পেনে অভিযানের কারণে খ্রী:পূ: ২১৮ অব্দে, রোম কার্থেজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে ২য় পুনিক যুদ্ধ শুরু হয়। তখন হানিবল তার বাহিনী নিয়ে তুষারাবৃত পার্বত্যপথ দিয়ে আল্পস পর্বত অতিক্রম করে ইটালীতে গিয়ে পৌঁছুলেন; রোমকদের জন্যে এ ছিল একেবারে কল্পনার বাইরে। কার্থেজ বাহিনীর অর্ধেকই পর্বত অতিক্রম করার পথেই প্রচন্ড ঠান্ডায় মৃত্যূমুখে পতিত হয়েছিল। যারা বেঁচে ছিল তাদের নিয়ে হানিবল ইটালীর পো নদীর অববাহিকায় উপস্থিত হলেন। সেখানে উত্তর ইটালীর অধিবাসী দুর্ধর্ষ গল উপজাতী হানিবলের সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগ দিল। হারান শক্তি ফিরে পাবার পর হানিবল ধীরে ধীরে উত্তর থেকে দক্ষিণ ইটালী অভিমুখে অভিযান শুরু করলেন। পথিমধ্যে তিনি ছোট খাট বাঁধা অতিক্রম করে কানে এসে পৌঁছুলেন, সেখানে সম্মিলিত রোমান বাহিনী অপেক্ষা করছিল। 

কানে অপেক্ষারত রোমান বাহিনীতে ছিল ৮০ হাজার পদাতিক ও ছয় হাজার অশ্বারোহী সেনা। অন্যদিকে হানিবলের সাথে ছিল চল্লিশ হাজার পদাতিক ও দশ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য। রোমানরা তাদের পদাতিক বাহিনীকে চতুর্ভুজ আকারে সারিবদ্ধভাবে বিন্যস্ত করেছিল। আর অশ্বারোহী সেনা পদাতিক বাহিনীর দু‘পাশে পার্শ্ববাহিনী হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিল। হানিবল যখন দেখলেন যে, রোমান পদাতিকের সংখ্যা তার দ্বিগুন, তখন তিনি এক দু:সাহসিক পরিকল্পণা গ্রহণ করলেন। নিজের বাহিনীকে তিনি এমনভাবে অর্ধাচন্দ্রাকারে বিন্যাস করলেন যে, পিঠের দিকটা রইল রোমানদের মুখোমুখি, আর দু‘পাশে রাখলেন শ্রেষ্ঠ কিছু পদাতিক ও অশ্বারোহী বাহিনী।

হানিবলের সমরাভিযানের রুট ম্যাপ।
রোমান পদাতিক বাহিনী সামনে এসে আঘাত করল। কার্থেজ বাহিনীর মধ্যভাগে আঘাত করে রোম বাহিনী অগ্রসর হয়ে ঢুকে পড়ার ফলে তাদের উভয় পার্শ্ব অরক্ষিত হয়ে গেল। আর ঠিক সেই সময় হানিবলের পার্শ্ববাহিনীর সবচেয়ে শক্তিশালী সেনারা দু‘পাশ থেকে শত্রুর উপর ঝাপিয়ে পড়ল। কার্থেজের অশ্বারোহী বাহিনী রোমের অশ্বারোহী বাহিনীকে পিছন দিক থেকে আক্রমণ করল। রোমের পদাতিক বাহিনীর বিন্যাস এতে ভেঙ্গে গিয়ে সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। ওদিকে হানিবলের সেনারা সেসময় রোমান বাহিনীকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। রোমানরা পরাজিত হল। হানিবল ৭০ হাজারের মত রোমান সৈন্য বন্দী করল।

রোম পরাজিত হওয়ায় ইটালীর বহু শহর হানিবলের পক্ষে চলে আসে। রোমের অবস্থা তখন সঙ্কটজনক হয়ে দাঁড়ায়। এতদসত্ত্বেও রোমান সিনেট হানিবলের কাছে কোন সন্ধির প্রস্তাব পেশ করেনি। সুতরাং কার্থেজ বাহিনী নিয়ে হানিবল রোমের একদম কাছে চলে এলেন। হানিবল দেখলেন, কান যুদ্ধ শেষে তার বাহিনীর যে শক্তি অবশিষ্ট আছে, তা দিয়ে বিশাল দুর্ভেদ্য এই নগরীকে দখল করা একেবারেই অসম্ভব। সুতরাং তিনি ইটালীর দক্ষিণ দিকে সরে গেলেন।

কানের যুদ্ধ শেষ হবার ১২ বৎসর পর রোমানরা সিসিলি থেকে আফ্রিকার দিকে অভিযান শুরু করল। এই অভিযানে রোমান সেনাপতি ছিলেন সসিপিও। এই সময় হানিবল ছিলেন ইটালীতে। তিনি দেখলেন কার্থেজকে রক্ষা করতে হলে তার এখন ইটালী ছেড়ে যাওয়া অপরিহার্য। 

খ্রী:পূ: ২০২ অব্দে কার্থেজের অনতিদূরে জাম্মা শহরের কাছে রোমান ও কার্থেজ বাহিনী একে অপরের মুখোমুখি হল। এবারের যুদ্ধে রোমানদের অশ্বারোহী বাহিনী কার্থেজের চেয়ে অনেক বেশী ছিল। রোমান ও কার্থেজীয় পদাতিক বাহিনীর মধ্যে যখন সূদীর্ঘ ও প্রচন্ড যুদ্ধ চলছিল, সেইসময় (খ্রী:পূ: ২০১ অব্দে) হানিবলের বাহিনীকে পিছন থেকে আক্রমণ করল রোমান অশ্বারোহী বাহিনী এবং তাদেরকে ছিন্নভিন্ন করে দিল। 

এই পরাজয়ের ফলে রোমের কাছে কার্থেজ তার যুদ্ধ জাহাজ সমর্পণ ছাড়াও বিশাল অঙ্কের যুদ্ধপণ দিতে বাধ্য হল; কার্থেজের আধিপত্য প্রায় আর কোথাও রইল না। অন্যদিকে এই বিজয়ের ফলে রোমানদের সামনে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে আরও নতুন নতুন অঞ্চল দখলের পথ উন্মুক্ত হয়ে গেল। যুদ্ধ শেষে রোমান সিনেট হানিবলকে আত্মসমর্পণ করতে নির্দেশ দেয়। হানিবল রোমানদের হাতে ধরা দিতে চাননি; তিনি মধ্যপ্রাচ্যের কোথাও আশ্রয় নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি, নিজ গৃহের চতুর্দিক রোমান সেনা পরিবেষ্টিত দেখে তিনি বিষপানে আত্মহত্যা করেন।

নৌবাহিনী ও পদাতিক বাহিনী হারানোর পর কার্থেজ আর রোমের কাছে বিপদজনক ছিল না। কিন্তু কার্থেজরা তাদের নৌবাণিজ্য আগের মতই চালু রেখেছিল এবং পুন:রায় সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠছিল, যা রোমান অভিজাত ও বণিক সম্প্রদায়ের হিংসার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তারা কার্থেজকে ধ্বংস করে তাদের নৌবাণিজ্য দখলে নিতে চাইল। সুতরাং কার্থেজকে ধ্বংসের উদ্দেশ্যে রোমক বাহিনী খ্রী:পূ: ২য় শতকের মধ্যভাগে পুন:রায় আফ্রিকার মাটিতে পা রাখল এবং অবরোধ করল কার্থেজ। শুরু হল ৩য় পুনিক যুদ্ধ।

ধ্বংসের পর কার্থেজ নগরী।
এ ছিল একটা অসম শক্তির যুদ্ধ। তবুও কার্থেজীয়রা নিজেদের মাতৃভূমি রক্ষার জন্যে ৩ বৎসর যাবৎ দূর্গ মধ্যে অবরুদ্ধ থেকে বীরত্বের সাথে লড়াই করে গেল। যখন তাদের রসদ ফুরিয়ে গেল এবং আর দূর্গ মধ্য থেকে নিক্ষেপের কোন অস্ত্রপাতি রইল না, তখন সমস্ত কার্থেজীয় মেয়েরা তাদের লম্বা চুল কেটে ফেলে সেই চুল দিয়ে পাথর নিক্ষেপের জন্যে দড়ি তৈরী করে দিয়েছিল যোদ্ধাদের।

দীর্ঘ ৩ বৎসর অবরোধের কারণে অনাহারে দুর্বল হয়ে গেল কার্থেজীয়রা। এই সময় সুযোগ বুঝে রোমানরা অভিযান চালাল। রোমান বাহিনী নগরীতে ঢুকে পড়ে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট শুরু করে দিল। একসপ্তাহ ধরে তারা এই লুটপাট ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল; এমনকি রাত্রেও তারা সংযোগকৃত অগ্নির ঐ অশুভ আলোয়ও তা করেছিল।

রোমের সিনেটের আদেশে কার্থেজকে পৃথিবীর বুক থেকে নিচিহ্ন করে দেয়ার পর, বন্দী ৫০ হাজার কার্থেজবাসীকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হল।

এদিকে ভূমধ্য সাগরের পশ্চিম উপকূলবর্তী অঞ্চলে নিজেদের অধিকার বিস্তার করে ক্ষান্ত হল না রোমানরা। তারা বলকান উপদ্বীপ ও এশিয়া মাইনরেও অভিযান চালায়। প্রাচ্য অভিমুখে রোমের অগ্রসরণের ফলে পূর্ব ভূমধ্য সাগরীয় অঞ্চলের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ও বিশাল সাম্রাজ্যের সাথে তাদের যুদ্ধ বাঁধে। সিরিয়া সম্রাটের ছিল বিরাটায়তনের সেনাদল, হস্তী বাহিনী, তীক্ষ্ণ অস্ত্রযুক্ত রথচক্র এবং উষ্ট্র বাহিনী। বহুজাতির লোক নিয়ে এই বাহিনী গঠিত হয়েছিল। এশিয়া মাইনরে রোমক বাহিনীর সাথে যুদ্ধে সিরীয় সম্রাট পরাজিত হন ফলে তার সাম্রাজ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বহু রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

দীর্ঘ বল্লম সজ্জিত ফালাঙ্গোস।
বলকান উপদ্বীপে রোম তার ‘Divide and Rule’ পলিসি সঠিকভাবে কাজে লাগিয়েছিল। মেসিডোনিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের সময় রোম, গ্রীকদেরকে স্বপক্ষে টেনে এনেছিল এই আশ্বাস দিয়ে যে, তারা তাদেরকে স্বাধীনতা দিয়ে দেবে।

শক্তি পরীক্ষায় মেসিডোনিয় ফালাঙ্গোস ও রোমান লেগিও মুখোমুখি হল। দীর্ঘ বল্লম সজ্জিত ফালাঙ্গোস ছিল অজেয়। রোমক বাহিনীর প্রথম আক্রমণ প্রতিহত করে তারা পাল্টা আক্রমণ চালায় এবং রোমীয়দের পিছু হটিয়ে দিতে শুরু করে। কিন্তু এর ফলে তারা নিজেরা কিছুটা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়, আর সেই সুযোগে রোমের ক্ষিপ্রগতির সৈন্যরা মেসিডোনিয় বাহিনীর বুহ্য ভেদ করে ভিতরে ঢুকে পড়ে। সুদীর্ঘ বল্লম তখন আর কোন কাজে দেয়নি এবং মেসিডোনিয়রা পরাজয় বরণ করে।

মেসিডোনিয় সাম্রাজ্যের পতনের পর গ্রীকেরা নিজের স্বাধীনতা ফিরে পাবার চেষ্টা করল। তখন রোম তাদের বাঁধা অগ্রাহ্য করে খ্রীঃপূঃ ১৪৬ অব্দে গ্রীসের উপর নিজের প্রভূত্ব স্থাপন করল। রোমকদের ইচ্ছের বিরুদ্ধতা করার শাস্তিস্বরূপ রোম, গ্রীক সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র কোরিন্থ নগরী একেবারে ধ্বংস করে দেয়।

 ত্রিউম্ফুস।
রোমের বিজয়ী সেনাপতিরা সংবর্ধিত হত ত্রিউম্ফুসের মাধ্যমে। মেসিডোনিয়া বিজয়ী রোমান সেনাপতির জন্যেও ত্রিউম্ফুসের আয়োজন হল। এই ত্রিউম্ফুস দেখার জন্যে সব রাস্তাতেই যেখান থেকে শোভাযাত্রা দেখা সম্ভব, সেখানেই জনতা সমবেত হয়েছিল।


প্রথমদিন ভোরবেলা অন্ধকার থাকতেই লুন্ঠিত প্রস্তরমূর্ত্তি ও ছবিভর্ত্তি ২৫০টি গাড়ি আসতে শুরু করল।পরের দিন নগরের পথে পথে সবচেয়ে সুন্দর ও মূল্যবান মেসিডোনিয় অস্ত্র-শস্ত্র বোঝাই করা গাড়ি দেখা গেল। তামা ও লোহার তৈরী অস্ত্রগুলো ঝকঝক করছিল। সেগুলোর মাঝখানে তরবারী ও বল্লমের খোঁচা খোঁচা মাথা দেখা যাচ্ছিল। এর পিছু পিছূ সাড়ে সাতশ' ঘট ভর্তি রৌপ্য মুদ্রা নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। চারজন করে লোক একেকটা ঘড়া বইছিল। তারও পিছনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছির রৌপ্যনির্মিত বিশালাকার ভারি ভারি পেয়ালা ও পাত্র।

৩য় দিন নিয়ে আসা হল বলিদানের জন্য ১২০টি মোটাসোটা বৃহদাকার ষাঁড়, তাদের শিং সোনালী রঙে রঞ্জিত। দূরে দেখা গেল, নিয়ে আসছে স্বর্ণমুদ্রা ভর্ত্তি ৭৭টি ঘড়া, আগেরগুলো যেমন ছিল সেরকমই আকারে বৃহৎ। এসবের পিছনে পিছনে আসছিল লোকজন, তাদের মাথার উপরে মূল্যবান প্রস্তর খঁচিত খাঁটি সোনার তৈরী বিরাটাকার পাত্র আর থালাগুলো তারা উর্দ্ধে তুলে ধরেছিল। এসবেরও পিছনে আসছিল মেসিডোনিয় সম্রাটের রাজশকট, তাতে রাজার অস্ত্রশস্ত্র ভর্তি, আর তার উপরে শোভা পাচ্ছিল তার রাজমুকুট।

এই রথের পিছনে নিয়ে আসা হচ্ছিল রাজার সন্তানদের -দুই রাজকুমার ও এক রাজকুমারীকে। তাদের বয়স এত কম যে, কি দু:খের দিন শুরু হয়েছে তাদের জন্যে সেকথা বূঝতে পারার কথা নয়। তাদের পিছুপিছু আসছিলেন কাল পোষাক পরিহিত সম্রাট। এই সর্বনাশে তিনি যেন বোধশক্তি রহিত হয়ে গেছেন।

অত্যন্ত অলংকৃত জাঁকজমকপূর্ণ শকটে চড়ে চলেছিলেন স্বর্ণখঁচিত লাল পোষাক পরিহিত রোমান সেনাপতি। আর তাঁর পশ্চাতে চলেছিল তার সৈন্যদল, হাতে তাদের তেজপাতা গাছের ডাল, মুখে গান।

সমাপ্ত।


ছবি: Wikipedia, livius, mclaughlinbibleministries, daviddarling.
উৎস: হিস্ট্রি অব দা এন্সিয়েন্ট ওয়ার্ল্ড -ফিওদর করোভকিন। হিস্ট্রি অব গ্রীস -গ্রোট। এন্সিয়েন্ট মনার্কী -শিলথন।