pytheya.blogspot.com Webutation

১ মে, ২০১৭

মূসা: কোরাণিক ক্যানভাসে নবী মূসা।


মিসরের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ফেরাউন। হঠাৎ করে তিনি মৃত্যুবরণ করলেন। কিন্তু তিনি কোন উত্তরাধিকারী না রেখে যাওয়ায় এক অমিসরীয় ব্যক্তি তার স্থলাভিষিক্ত হন। তার প্রকৃত নাম ছিল কাবুস, জন্মস্থান- বলখ। যৌবণে সে ভাগ্যান্বেষণে বের হয় এবং একসময় বেউশাহমা শহরে এসে পৌঁছে। সেখানে এক ভবঘুরে যুবক হামানের সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। দু‘জনের প্রকৃতি ও চরিত্র একই হওয়ায় তাদের মধ্যে দ্রুত সখ্যতা ও বন্ধুত্ব গড়ে উঠে।

একসময় তারা ঘুরতে ঘুরতে মিসর রাজ্যে উপনীত হয়। ঐ সময় দু‘জনের কারও কাছে একটা কানাকড়িও ছিল না। খরবুজার মৌসুম। রাস্তার পাশে একটি ক্ষেতে সুপক্ক খরবুজা শোভা পাচ্ছে। মালিক ক্ষেতে মজুর দিয়ে কাজ করাচ্ছেন। কাবুস ও হামান নিজেদের ক্ষুধার কথা বলে মালিকের কাছে একটি খরবুজা চাইল। এতে মালিক বিরক্তি প্রকাশ করে বললেন, ‘তোমরা সুস্থ্য সবল যুবক, চেয়ে খাচ্ছ কেন? কাজ করে নিজেদের খাবার জোগাড়ের চেষ্টা কর।’
তারা বলল, “এ মুহুর্তে আমরা কি কাজ করব?’
মালিক বললেন, “আমার এই ক্ষেতের কিছু খরবুজা বাজারে নিয়ে বিক্রি করে দাও।”

কাবুস হামানকে ঐ ক্ষেত মালিকের কাছে জামিনস্বরূপ রেখে কিছু খরবুজা নিয়ে বাজারে গেল এবং অল্পসময়ে সেগুলি বিক্রি করে এসে মালিককে মূল্য বুঝিয়ে দিল। এতে ঐ মালিক সন্তুষ্ট হয়ে তাদেরকে দু‘টি খরবুজা খেতে দিলেন এবং শ্রমের মূল্য হিসেবে কাবুসকে কিছু অর্থও প্রদান করলেন। সাথে সাথে তিনি তাদেরকে স্থায়ীভাবে কাজে নিয়োগ করারও প্রস্তাব দিলেন। যদিও প্রস্তাবটি ভাল ছিল, তথাপি তারা তাতে অসম্মতি জানিয়ে বিদায় নিল এবং মিসরের রাজধানী অভিমুখে যাত্রা করল।

মিসরের রাজদরবার। একটি কাজের আশায় কাবুস ফেরাউনের সাক্ষাৎপ্রার্থী হল। কেননা সে জানতে পেরেছিল সিংহাসনে অধিষ্ঠিত এই ফেরাউন একজন প্রজাহিতৈষী, দয়ালু ও ন্যায়পরায়ণ। যখন দরবারে তার ডাক পড়ল, যথারীতি অভিবাদন জানিয়ে সে বলল, ‘হে মহানুভব রাজ্যাধিপতি! কোন কাজকর্ম না থাকায় আমি আমার ভরণ-পোষণে অপারগ হয়ে পড়েছি। অনুগ্রহ করে আমার জন্যে একটি কাজের ব্যবস্থা করে দিন।’

কাবুসের বাচনভঙ্গি ও জড়তাহীন বাক্য ফেরাউনের দৃষ্টি ও মনোযোগ আকৃষ্ট করল। তিনি বললেন, ‘হে যুবক! কি কাজ তুমি জান?’
‘হে আমার প্রভু!' কাবুস বলল, 'যে কোন কাজই আমি করতে পারব।'
এসময় প্রধান উজিরের কাছে এক ব্যক্তি খবর নিয়ে এল যে, রাজকবরস্থানের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মৃত্যুবরণ করেছে। উজির ফেরাউনকে একথা জানালে তিনি বললেন, ‘আমরা তোমাকে রাজ করবস্থানের কর্তৃত্বভার দিতে পারি।তুমি কি এ দায়িত্বভার নিতে চাও?”
কাবুস আনন্দের সাথে এ প্রস্তাবে সম্মতি দিয়ে দিল।

কাবুস ছিল সুচতুর ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী। কবরস্থানের কর্তৃত্বভার পাবার পরপরই সে নগরময় এমন ঘোষণা দিল - ‘এখন থেকে কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে কেউ কোন লাশ দাফন করতে পারবে না এবং প্রতিটি দাফনের জন্যে কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ “দাফন ফি” হিসেবে প্রদান করতে হবে।’

ঐ বৎসর হঠাৎ করেই নগরীতে মহামারী দেখা দিল। কাবুস লাশের আমদানী বেশী দেখে, দাফন ফি দ্বিগুণ করে দিলেন। ফলে এ বাবদ অজস্র অর্থ আমদানী হতে লাগল। বৎসর শেষে তিনি মোটা অঙ্কের অর্থ রাজকোষে জমা দিলেন। রাজকর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট হয়ে তাকে পদোন্নতি দিয়ে কোতওয়াল পদে নিয়োগ দিল। এসময় তিনি প্রধান উজিরের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুললেন। আর নানারকম উপঢৌকন পেয়ে উজির ফেরাউনের কাছে কোতওয়াল কাবুসের বিভিন্ন সাফল্য তুলে ধরতে লাগলেন।

হঠাৎ-ই প্রধান উজির মারা গেলেন। ফেরাউন পূর্ব থেকেই কোতওয়াল কাবুসের যোগ্যতার প্রতি আস্থাশীল ছিলেন। সুতরাং তিনি এই পদে অন্য কাউকে নির্বাচিত না করে তাকেই নিয়োগ দেন। আর অচিরেই কাবুস তার যোগ্যতা ও বিচক্ষণতার প্রমান দিতে সক্ষম হন।

মিসরে কয়েক বৎসর যাবৎ খরা ও দুর্ভিক্ষ চলছিল। কাবুস প্রজাদের দুরাবস্থার কথা ভেবে ফেরাউনের কাছে এক বছরের খাজনা মওকুফের আবেদন তুলে ধরেন। এতে সম্রাট তার যুক্তি মেনে নিয়ে ঐ বছর খাজনা মওকুফ করেন। তারপর যখন সারা দেশে এই মর্মে এক সরকারী ঘোষণা প্রচার করা হল, তখন সর্বসাধারণ কাবুসের নামে ধন্য ধন্য করতে লাগল।

হঠাৎ করে ফেরাউন মৃত্যুবরণ করলেন।সিংহাসনের কোন উত্তরাধিকারী না থাকায় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের এক জরুরী বৈঠকে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তক্রমে প্রধান উজির কাবুসকেই রাজ মুকুট পরিয়ে দেয়া হল।

কাবুস সিংহাসনে উপবিষ্ট হয়ে প্রথমেই বন্ধু হামানকে প্রধান উজির পদে নিয়োগ দিলেন। অতঃপর পূর্ববর্তী এক প্রজাহিতৈষী শাসক রামেসিসের নাম ধারণ করে নিজেকে “ফেরাউন ২য় রামেসিস” হিসেবে ঘোষণা করলেন।

যতদিন পর্যন্ত ইউসূফ সরকারী পদে ছিলেন ততদিন মিসরে ইস্রায়েলীদের অবস্থা খুব ভাল ছিল। তাদের আহার, বাসস্থান ও চাকুরী ছিল এবং তাদের প্রতি মিসরীয়রাও আন্তরিকপূর্ণ ব্যাবহার করত। কিন্তু তার মৃত্যুর পর যতই দিন যেতে লাগল অবস্থারও পরিবর্তন হতে থাকল। মিসরীয়রা তাদেরকে বিদেশী হিসেবে বিবেচনা করতে লাগল।

অন্যদিকে ইয়াকুবের সময়ে মিসরে ইস্রায়েলীদের সংখ্যা যাই থাকুক না কেন খুব শীঘ্রই এই সংখ্যা বৃদ্ধি পেল। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণ এই যে, ‘বংশবৃদ্ধি ও পৃথিবী পরিপূর্ণ করাতে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল। পরবর্তীতে এই সংখ্যা বৃদ্ধিই তাদের কাল হল। মিসরের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত নতুন এই শাসক ইউসূফ সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। তিনি ইস্রায়েলীদের সংখ্যা তাড়াতাড়ি বৃদ্ধির কারণে সরকারী নিরাপত্তার বিষয়ে রাজনৈতিক সমস্যা মনে করে আতঙ্কিত হন। সুতরাং তিনি তাদেরকে দাসত্বের কাজে লাগানোর নুতন আদেশজারি করে দিলেন। আর এই কাজে তাদেরকে বাধ্য করতে কঠোর লোক পরিচালনার জন্যে লাগান হল।

ইস্রায়েলীদেরকে ইট তৈরী, পাথর কাটা ও বহন ইত্যাদি কাজে লাগান হয় এবং তাদের দ্বারাই ফেরাউন দু’টি নগরী, রামেসিস এবং প্রীতম, (অধুনা তানিস ও কানতির) উত্তরাঞ্চলের রাজধানী হিসেবে তৈরী করেন।
                                                         
ফেরাউন এক স্বপ্ন দেখলেন। তিনি দেখেন তার প্রাসাদের একস্থানে হঠাৎ আগুন জ্বলে উঠল। আর তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত প্রাসাদ পুড়িয়ে দিল। এই স্বপ্নের অর্থ কি, তা জানতে ফেরাউন গণকদের ডাকলেন। তারা বলল, “হে ফেরাউন! ইস্রায়েল বংশে এমন একসন্তান জন্মগ্রহণ করবে যার কারণে আপনার রাজত্ব ধ্বংসের সম্মুখীণ হবে।”

ইব্রীয়দের কোন সন্তানের দ্বারা রাজ্যে বিপর্যয় সৃষ্টি হবে জানতে পেরে ফেরাউন কোনরকম কালক্ষেপণ করলেন না। তিনি সত্ত্বর ইব্রীয় ধাত্রীদের প্রতি এক শাহী ফরমান জারী করলেন, যেন তারা জন্মের সময় কন্যা সন্তানদের বাঁচিয়ে রেখে পুত্র সন্তানদেরকে হত্যা করে ফেলে। এই আদেশ জারি করে ফেরাউন বেশ উৎফুল্ল বোধ করলেন। কেননা, জারিকৃত এই আদেশের ফলে রাজ্যের নিরাপত্তার বিষয়টি সংহত হবার পাশাপাশি ইস্রায়েলীদের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে সরকারী নিরাপত্তার রাজনৈতিক সমস্যারও সমাধান হয়ে গেল।

এদিকে ধাত্রীরা পুত্রসন্তানদের হত্যার ঐ আদেশ যথাযতভাবে পালন করল না। তখন ফেরাউন ধাত্রীদেরকে দরবারে তলব করলেন। তখন তাদের দু‘জন প্রতিনিধি শিফ্রা ও পূয়া তার সম্মুখে হাজির হল। ফেরাউন তাদেরকে বললেন, “কেন তোমরা আমার আদেশ পালন করছ না?”
তারা বলল, “হে ফেরাউন! ইব্রীয় স্ত্রীলোকেরা মিসরীয়দের মত না, ধাত্রী তাদের কাছে পৌঁছে যাবার আগেই তারা সন্তান প্রসব করে ফেলে।”

এতে ফেরাউন সকল ইস্রায়েলীদের প্রতি এক কঠোর আদেশ জারি করেন, যেন তারা তাদের নবজাতক সকল পুত্রসন্তানকে হত্যা করে। আর যেহেতু কন্যাসন্তানদের দিক থেকে কোনরকম বিপদের আশঙ্কা ছিল না, তাই তাদের সম্পর্কে এবারও তিনি নিশ্চুপ রইলেন। এদিকে ফেরাউনের ঐ আদেশে কত মা সন্তানহীনা হয়েছিল তা আমাদের জানা নেই। তবে আমরা এমন একজনকে জানি, যার সন্তান সকলের দৃষ্টির সম্মুখে নির্বিঘ্নে লালিত-পালিত হয়েছিল। আর তা ছিল কেবলই খোদার এক অনুগ্রহ-

“দেশে ফেরাউন ফেঁপে উঠেছিল অহংকারে; সে সেখানকার লোকদেরকে বিভিন্ন শ্রেণীতে ভাগ করেছিল। এক শ্রেণীকে নিপীড়ন করছিল তাদের পুত্রদের হত্যা করে ও কন্যাদের বাঁচিয়ে রেখে। নিঃসন্দেহে সে ছিল বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের একজন। সেদেশে যারা নিপীড়িত হচ্ছিল আমি চাইলাম তাদেরকে অনুগ্রহ করতে, তাদেরকে নেতৃত্ব দিয়ে সেই দেশে [প্যালেস্টাইনে] প্রতিষ্ঠিত করতে এবং ফেরাউন, হামান ও তাদের সৈন্যদলকে দেখিয়ে দিতে তারা সেই শ্রেণীর কাছ থেকে যা [বিপর্যয়] আশঙ্কা করত।” -(২৮:৪-৬)

ইব্রীয়দের নবজাত সকল পুত্রসন্তানদেরকে হত্যার আদেশ জারিকালীন সময়ে মূসা জন্মগ্রহণ করে। সে ছিল লেবী বংশের ইমরানের পুত্র। হারুণ ও মরিয়ম নামে তার দু’ভাইবোনও ছিল। হারুণ তার চেয়ে বছর পাঁচেকের মত বড় ছিল। যাহোক, পুত্রসন্তান জন্ম নিলেও মূসার মাতা ইউহানিব ফেরাউনের আদেশ মত কাজ করলেন না। কারণ তার কাছে খোদার এক প্রত্যাদেশ পৌঁছে গিয়েছিল-

সেইমত [পরিকল্পণা  অনুসারে] আমি মূসার মায়ের কাছে প্রত্যাদেশ পাঠালাম, “তাকে বুকের দুধ দাও। তারপর যখন তার জন্যে তোমার দুর্ভাবনা হবে, তখন তাকে নদীতে ভাসিয়ে দিতে ভয় পেয় না, আর দুঃখ করবে না। আমি ঠিকই তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব, আর তাকে রসূলদের একজন করব।”-(২৮:৭)

প্রথম তিন মাস মূসার মা তার সন্তানকে গৃহমধ্যে লুকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন। অত:পর প্রতিবেশীদের কারণে তার দূর্ভাবণা হল। কেননা, তাদের অগোচরে তাকে আর গৃহমধ্যে লুকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। তাই বাধ্য হয়ে প্রত্যাদেশ অনুসারে তাকে নদীতে ভাসিয়ে দিতে ছোট একটা নলবনের ঝুড়ি এমনভাবে তৈরী করলেন যেন তার মধ্যে পানি ঢুকতে না পারে। তারপর এক কাক ডাকা ভোরে শিশু মূসাকে বুকে, কাপড়ের মধ্যে লুকিয়ে দ্রুতপায়ে নীলনদের দিকে চললেন। ছোট ছোট পায়ে কন্যা মরিয়ম তাকে অনুসরণ করে গেল।

নদের তীরে পৌঁছে মাতা তার সন্তানকে অতিযত্নে নলের ঐ ঝুড়িতে রেখে নদীতে ভাসিয়ে দিলেন। আর তা ভেসে যেতে লাগল স্রোতে। মূসার মা তাকিয়ে আছেন ঝুড়ির দিকে। তার অন্তর হাহাকার করে উঠল, তার বুক যে খালি হয়ে গেল! আর তিনি তো তাকে ফিরিয়ে আনতেই যাচ্ছিলেন, কিন্তু খোদা তার বুকে শক্তি দিলেন, ফলে তার বিশ্বাস ফিরে এল-

‘আর মূসার মায়ের বুক খালি হয়ে গেল। সে যাতে বিশ্বাস রাখতে পারে সেজন্যে আমি তার বুকে শক্তি দিলাম। তা না হলে, সে তো তাকে ফিরিয়ে আনতেই যেত। -(২৮:১০)

মায়ের মন সন্তানকে নদীর বুকে ফেলে রেখে ফিরে যেতে চাচ্ছিল না। আর তাই মূসার মা ঝুড়ির দিকে নজর রেখে পিছে পিছে চলছিলেন। কিন্তু যখন বেলা বেড়ে গেল, তিনি আর এগিয়ে যেতে সাহস করলেন না কারও সন্দেহের উদ্রেক হবে ভেবে। তাই তিনি কন্যা মরিয়মকে বললেন, "তাকে অনুসরণ কর।" সুতরাং সে দূর থেকে তাকে লক্ষ্য রাখল যেন কেউ বুঝতে না পারে। -(২৮:১১)

ঝুড়ি ভেসে যাচ্ছে স্রোতে, আর মরিয়ম দূরে পাড়ে থেকে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তার সাথে সাথে এগিয়ে চলেছে তার প্রাণপ্রিয় ছোট্ট ভাইটির ভাগ্যে কি ঘটে তা দেখার জন্যে।

ফেরাউনের এক স্ত্রী বিবি আছিয়া নদীতে স্নান করতে এলেন। তারপর তিনি যখন পানিতে নামলেন, ঝুড়িটি ভেসে ভেসে তার কাছে চলে এল। তখন কৌতুহলী হয়ে তিনি সেটি খুললেন এবং ভিতরে ভীত শিশুটিকে দেখলেন। এতক্ষণ পর্যন্ত ঝুড়ির মধ্যে মূসা চুপচাপ ছিল। কিন্তু এখন অপরিচিত লোক দেখে কান্নাকাটি শুরু করে দিল। এই সুন্দর শিশুটির কান্না বিবি আছিয়ার হৃদয় স্পর্শ করল। সুতরাং তিনি চারিদিকে তাকিয়ে তার মায়ের খোঁজ করলেন। কাউকে আশেপাশে দেখতে না পেয়ে তিনি একজন ধাত্রীকে দিয়ে তাকে স্তন্যপানের চেষ্টা করলেন। কিন্তু মূসা কিছুতেই কিছু খেতে চাইল না।

চার বছর বয়সী মরিয়ম কি দূর্দান্ত বুদ্ধিমতীই না ছিল! ওরা যেন বুঝতে না পারে তার জন্যে সে দূর থেকে তাদের কার্যকলাপ লক্ষ্য করতে লাগল। তারপর শিশুটিকে ফেরাউন পরিবারের পালনের ইচ্ছে দেখে সে আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল এবং নিজের পরিচয় গোপন রেখে ফেরাউন পত্নীকে বলল, “আমি কি আপনাদেরকে এমন এক পরিবারের লোকদের দেখাব, যারা একে লালন করবে, একে বড় করবে আপনাদের হয়ে, আর এর ওপর মায়া করবে?”

মূসা কিছুতেই কিছু খেতে চায়নি, কারণ তা ছিল খোদার পরিকল্পণা। -আর আমি আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম যেন মূসা বুকের দুধ না খায় যতক্ষণ না (তার বোন এসে) বলে, “আমি কি আপনাদেরকে এমন এক পরিবারের লোকদের দেখাব, যারা একে লালন করবে, একে বড় করবে আপনাদের হয়ে; আর এর ওপর মায়া করবে?”-(২৮:১২)

বিবি আছিয়া নিঃসন্তান ছিলেন। সুতরাং তিনি এই শিশুটিকে নিজের সন্তানের মত লালন-পালনের ইচ্ছায় তাকে প্রাসাদে নিয়ে গেলেন। -অতঃপর ফেরাউন পরিবার মূসাকে কুড়িয়ে নিল, যাতে সে তাদের শত্রু ও দুঃখের কারণ হয়ে যায়। নিশ্চয় ফেরাউন, হামান, ও তাদের সৈন্যবাহিনী অপরাধী ছিল। -(২৮: ৮)

ইতিমধ্যে বিবি আছিয়া পরিস্কার বুঝতে পেরেছিলেন ফেরাউনের জারীকৃত আদেশে কোন ইব্রীয় মা তার এই সন্তানকে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে। আর ইব্রীয় সন্তান বলে ফেরাউনও তাকে প্রথমেই হত্যা করতে চাইবেন। সুতরাং বিবি আছিয়া প্রাসাদে ফিরেই বিষয়টি সুরহা করতে ফেরাউনের কাছে গিয়ে বলল- “এ শিশু হবে আমার ও তোমার নয়ন মনি, তাকে হত্যা কোরও না। এ আমাদের উপকারে আসতে পারে; অথবা আমরা তাকে পুত্র হিসেবেও গ্রহণ করতে পারি।” -(২৮: ৯)

প্রকৃতপক্ষে পরিণাম সম্পর্কে তাদের কোন ধারণা ছিল না। তাদের তো আর অদৃশ্যের জ্ঞান নেই, সুতরাং তারা কি করে জানবে যে এই শিশু একদিন তাদের শত্রূ ও দু:খের কারণ হবে! এই স্ত্রীর প্রতি ফেরাউনের ভালবাসা ছিল, আর তাই তাকে খুশী করতে তিনি শিশুটিকে হত্যা করা থেকে বিরত রইলেন এই ভেবে যে, ইব্রীয়দের এই একটা মাত্র সন্তান জীবিত থাকলে কি আর হবে!

বিবি আছিয়া মরিয়মের দেয়া ঠিকানায় ধাত্রীর খোঁজে লোক পাঠালেন। মূসার মায়ের বুক এমনিতেই খালি হয়ে ছিল। তাই ঐ প্রস্তাবে তিনি তৎক্ষণাৎ রাজী হয়ে গেলেন। এভাবে মূসার নিজের মা তার ধাত্রী হিসেবে এল। বিবি আছিয়া তাকে বললেন, “আমরা এই শিশুটিকে অন্য একজন ধাত্রীকে দিয়ে স্তন্যপানের চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু সে কিছুতেই তা পান করেনি। সুতরাং তুমি যদি তাকে স্তন্যপান করাতে পার তবে উপযুক্ত সম্মানী পাবে। ধাত্রী সেবার বিনিময়ে দৈনিক এক দিনার করে ভাতা এবং রাজকীয় অন্যান্য সুযোগ সুবিধাও তোমাকে দেয়া হবে ”

তারপর মূসার মা তার স্তন মূসার মুখে দিতেই সে তা পান করতে শুরু করে দিল। এতে দাসীদের মনে সন্দেহ ঢুকেছিল এবং তারা তাকে প্রশ্নও করেছিল। কিন্তু মূসার মা ঐসব প্রশ্ন সযত্নে এড়িয়ে গেলেন। ফলে রাজপরিবারে তাদের আসন স্থায়ী হল। -এভাবে আমি তাকে [মূসা] তার জননীর কাছে ফিরিয়ে দিলাম, যাতে তার নয়ন জুড়ায়, তার কোন দুঃখ না থাকে আর যাতে বুঝতে পারে যে, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। অবশ্য অনেক মানুষই এ জানে না। -(২৮: ১৩)

স্তন্য ছাড়ানোর পর মূসাকে ফেরাউন পরিবার নিজেদের কাছে নিয়ে গেল। তারপর একদিন এক ঘটনা ঘটল, মূসা ফেরাউনের কোলে বসে প্রস্রাব করে দিল। এতে ফেরাউন রেগে গিয়ে তার দিকে তীব্রদৃষ্টি হানতেই সে তার দাঁড়ি ধরে গালে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিল। ফেরাউন হতভম্ব হয়ে তাড়াতাড়ি তাকে কোল থেকে নামিয়ে দিলেন। আর এরপর এক হতভাগা গণক গণনা করে ফেরাউনকে জানিয়ে দিল যে, অদূর ভবিষ্যতে তার রাজ্যে এক বিপর্যয় নেমে আসবে। আর যারা দ্বারা সেই বিপর্যয়ের সৃষ্টি হবে, সে রাজপরিবারের সদস্য না হয়েও রাজপরিবারের মধ্যেই লালিত-পালিত হবে।

মূসা চিহ্নিত হল। ফেরাউন তার চড় মারার বিষয়টিও ভুলে যাননি। তিনি মূসাকে হত্যা করতে চাইলেন। কিন্তু স্ত্রী বাঁধা সৃষ্টি করলেন, বললেন, “তাকে সন্তানের মত লালন-পালন করছি কি হত্যা করার জন্যে? গণনায় তো ভুলও হতে পারে।”
স্ত্রীর কথা ফেরাউন অস্বীকার করতে পারলেন না। কিন্তু তার মনে ভয় ঢুকেছিল। সুতরাং তিনি বললেন, “তবে তাকে আমরা অন্যভাবে পরীক্ষা করে দেখতে পারি।”

তখন ফেরাউনের নির্দেশে একটি পাত্রে কিছু মূল্যবান পাথর, হীরা-মনিমুক্তা ও অপর একটি পাত্রে জলন্ত অঙ্গার আনা হল। ফেরাউন বললেন, “যদি সে ঐ শিশু হয়, তবে অবশ্যই মনিমুক্তা হাতে তুলে নেবে, অঙ্গার স্পর্শ করবে না।”
তার স্ত্রী বললেন, “সে তো কেবল নির্বোধ এক শিশু, জলন্ত অঙ্গারের ঔজ্বল্যে আকৃষ্ট হয়ে তাই নিতে হাত বাড়াবে, আগুনে পুড়ে যাবার জ্ঞান তার নেই।”

শিশু মূসার সামনে পাত্র দু‘টি রাখা। সে মাতা আছিয়ার দিকে একনজর তাকিয়ে দেখে হাত বাড়াল মনিমুক্তার পাত্রের দিকে। বিবি আছিয়া আতঙ্কিত হলেন। আর ঐ সময়ই ফেরেস্তা জিব্রাইল মূসার হাত টেনে নিয়ে অঙ্গারের পাত্রের উপর রাখল। তখন সে পাত্র থেকে এক টুকরো অঙ্গার হাতে তুলে নিয়েই তা মুখের মধ্যে চালান করে দিল। বিবি আছিয়া ছুটে গিয়ে দ্রুত সেটি তার মুখের ভিতর থেকে বের করে ফেললেন, আর ক্ষোভের সাথে বললেন, “আমি কি পূর্বেই বলিনি এ এক নির্বোধ শিশু?”

এভাবে, আল্লাহ মূসাকে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটালেন, যাতে সে খোদাদ্রোহীর গৃহে নির্বিঘ্নে লালিত-পালিত হয়। আর হলোও তাই, যখন সারা দেশে ইব্রীয় পুত্রসন্তানগণ নিহত হচ্ছিল, তখন সে রাজপরিবারের আরাম-আয়েশ ও আদর-যত্নে বয়সের সিঁড়ি অতিক্রম করে চলেছিল। আর ফেরাউন ও তার স্ত্রীও পরম ঔৎসুক্যের সাথে তাকে লালন-পালন করে যেতে লাগলেন।

তবে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মূসার জিহ্বা যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল, ফলে পরিণত বয়সে তিনি পরিস্কার করে কথা বলতে পারতেন না। এ কারণে নব্যুয়ত প্রাপ্তির সময় ভ্রাতা হারুণকে তিনি তার সাহায্যকারী হিসেবে চেয়েছিলেন, যাতে লোকদের কাছে খোদার বানী উপস্থাপনে তার শারিরিক ত্রুটি কোনরকম ঘাটতির কারণ না হয়।

রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে সমস্ত উচ্চশিক্ষার সুযোগ মূসা লাভ করেছিলেন। ফলে তিনি নিজেকে সৎকর্মপরায়ন হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ পান। আর সম্ভবত: তার নিজ মাও তাকে অতি যত্নের সাথে তার পূর্বপুরুষদের জীবন গাঁথা এবং খোদার মনোনীত বংশ হিসেবে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা বলে থাকবেন, যা হয়ত: তার মনে দাগ কেটেছিল- তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করেছিল- তার মনে কোন স্বপ্ন জাগিয়ে তুলেছিল- ‘যখন মূসা সাবালক ও প্রতিষ্ঠিত হল তখন আমি তাকে হিকমত ও জ্ঞানদান করলাম। এভাবে আমি সৎকর্মপরায়নদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি।’-(২৮:১৪)

মূসার বয়স যখন ত্রিশ বৎসর তখনি হঠাৎ তার জীবনে সমস্যা এসে উপস্থিত হয়। ফেরাউন নিজেকে জনগণের পালনকর্তা ও উপাস্যের আসনে বসিয়েছিলেন। মিসরীয়রা ও অসহায় ইস্রায়েলীদের কিছু তাকে উপাস্য হিসেবে উপাসনাও করত। অতঃপর মূসা জ্ঞান-বুদ্ধি লাভ করার পর সত্যধর্মের কিছু কিছু কথা মানুষকে বলতে শুরু করলেন। এতে অনেকে তার অনুসারী হয়ে গেল। তখন কর্মচারীরা ফেরাউনকে জানাল- “হে ফেরাউন! মূসা আপনাকে উপাস্য বলে স্বীকার না করতে লোকদেরকে মদদ দিচ্ছেন। তিনি বলছেন- সমগ্র জগতের স্রষ্টা আল্লাহই একমাত্র উপাস্য, সকলের প্রতিপালক।”

একথা শুনে ফেরাউন তীব্র রাগান্বিত হলেন এবং তাতে মূসা তার শত্রু হয়ে গেলেন। তিনি হয়ত: মূসাকে প্রকাশ্য হত্যার কোন আদেশ জারি করতেন। কিন্তু তার স্ত্রী তার সে আদেশ পালনে বাঁধা সৃষ্টি করবে ভেবে তাকে গোপনে হত্যার পরিকল্পণা করলেন। কিন্তু তার এই গোপন পরিকল্পণাও প্রকাশ হয়ে পড়ল। বিবি আছিয়া তাকে বললেন, “পুত্রস্নেহ দিয়ে তাকে বড় করে তুললাম কি হত্যা করার জন্যে? লোকেরা তার বিরুদ্ধে অনর্থক অপবাদ দিচ্ছে, আর ইতিপূর্বেও তারা তা করেছিল।”
ফেরাউন বললেন, “এবার তার সম্পর্কে তাদের বক্তব্য পুরোপুরি মিথ্যে নয়।”
তখন স্ত্রী তার কাছে মিনতি করে বললেন, “তাকে আপনি হত্যা করবেন না। সে এখনও ছেলেমানুষ, বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে নিশ্চয়ই তার কার্যকলাপের পরিবর্তণ হবে।”

স্ত্রী আছিয়ার অনুরোধে ফেরাউন তাকে হত্যা করা থেকে বিরত হলেন বটে, কিন্তু তাকে শহর থেকে বহিঃস্কারের আদেশ জারি করে দিলেন।

শহর থেকে বহি:স্কারের আদেশ জারির কারণে মূসা শহরের বাইরে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করতেন এবং মাঝে মাঝে গোপনে নগরীতে প্রবেশ করতেন। এ সময়েরই কোন একদিন তিনি যখন শহরে প্রবেশ করলেন, তখন দেখতে পেলেন একজন ইস্রায়েলীর উপর একজন মিসরীয় জুলুম করছে। ইস্রায়েলী লোকটি মূসাকে দেখতে পেয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে তার সাহায্য চাইল। তখন তাকে সাহায্য করতে মূসা এগিয়ে গেলেন। ইস্রায়েলী বলল, “এ আমার সংগ্রহ করে আনা জ্বালানী জোরপূর্বক নিতে চাচ্ছে।”

মিসরীয়টি ছিল ফেরাউনের প্রধান বাবুর্চি। সে মূসাকে উপেক্ষা করল এবং নিজের কর্তৃত্ব জাহির করতে মূসাকে শুনিয়ে বলল, “এ জ্বালানী রাজকীয় চূলার জন্যেই নেয়া হচ্ছে।”

ফেরাউনের পোষ্যপুত্র হিসেবে রাজদরবারে, প্রাসাদে বা বাইরে- সর্বত্র সর্বসাধারণের কাছে মূসা সম্মানের পাত্র ছিলেন। উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীরা পর্যন্ত তাকে সমীহ করে চলত। সুতরাং এই মিসরীয়র উচিৎ ছিল তাকে দেখেই এই ন্যাক্কারজনক কাজ থেকে বিরত হওয়া। অথচ, সে তো তা করলই না, বরং তাকে আমলে না এনে ঐ ইস্রায়েলীকে অমানুষিক নির্যাতনে মারতে শুরু করল।

মূসা প্রচন্ড রেগে গেলেন। আর ঐ মিসরীয়কে সজোরে এক ঘুসি মারলেন। তার এক ঘুসিতেই সে ছিটকে পড়ল। মূসা ইস্রায়েলীকে বললেন, “যাও, তোমার লাকড়ি নিয়ে চলে যাও।”
তখন ইস্রায়েলী তার লাকড়ি তুলে নিয়ে চলে গেল। আর সে চলে গেলে, মূসা মিসরীয়র প্রতি নজর দিলেন। কিন্তু এ-কি! এ লোক তো এখনও উঠেনি! সুতরাং তাকে তুলতে মূসা এগিয়ে গেলেন এবং তারপর বিষ্মিত ও ভীত হয়ে পড়লেন এটা দেখতে পেয়ে যে, তার ঐ এক ঘুষিতেই ঐ কিবতী ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে।

মিসরীয়কে প্রাণে মারার কোন ইচ্ছে মূসার ছিল না। ইস্রায়েলীকে জুলুম থেকে রক্ষার করার জন্যেই তিনি তাকে একটা ঘুসি মেরেছিলেন, কিন্তু এতেই সে মারা গেল! মূসা অনুভব করলেন ঘুষির জোর আরও অনেক কম মাত্রাই ঐ কিবতীর জন্যে প্রযোজ্য ছিল। সুতরাং তার বাড়াবাড়িতে ঐ মিসরীয়র মৃত্যু হওয়ায় তিনি দুঃখিত হয়ে আক্ষেপ করে বললেন, “শয়তানের বুদ্ধিতে এ ঘটল! সে তো প্রকাশ্য শত্রু ও বিভ্রান্তকারী!” -(২৮:১৫)

তারপর তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে দু‘হাত বাড়িয়ে খোদাকে উদ্দেশ্যে করে বললেন, “হে আমার প্রতিপালক! আমি তো আমার নিজের উপর জুলুম করে ফেলেছি, সুতরাং তুমি আমাকে ক্ষমা কর।” তারপর তিনি তাকে ক্ষমা করলেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।-(২৮:১৬)

অতঃপর মূসা এদিক ওদিক তাকিয়ে আশেপাশে কাউকে দেখতে না পেয়ে তাড়াতাড়ি শোষক ঐ লোকটির লাশ বালির মধ্যে কবর দিয়ে দিলেন। তারপর খোদার উদ্দেশ্যে বললেন, “হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমার উপর যে অনুগ্রহ করেছ তার শপথ, আমি কখনও কোন অপরাধীকে সাহায্য করব না।” -(২৮:১৭)
ঘটনাস্থল থেকে মূসা সরে পড়লেন।

মিসরীয় লোকটিকে হত্যার সময় সেখানে অন্য কোন লোক উপস্থিত ছিল না। ফলে হত্যার ঘটনা প্রকাশ পাবার কোন আশঙ্কা ছিল না। আর ঐ ইস্রায়েলীর তো কিবতীর মৃত্যুর কথা জানতে পারার কথা নয়। আর জানলেও তো তার এ ঘটনা প্রকাশ করার কথাই না, কারণ তাকে রক্ষা করতে গিয়েই তো ঐ দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু তবুও মূসা ভয়ে ভয়ে ছিলেন এবং ভীতচকিত হয়ে চারিদিক দেখতে দেখতে ঐ শহরেই রাতটা পার করে দিলেন।

মূসা সর্বদা মনে মনে দৃঢ়ভাবে এই আশা পোষণ করতেন যে, তার নিজের লোকেরা তাকে সর্বদা উদ্ধারকর্তা হিসেবে গ্রহণ করবে এবং তাকে সবসময় সমর্থন করে যাবে, কিন্তু পরের দিনের ঘটনায় তিনি বুঝতে পারলেন ইস্রায়েলীদের সম্পর্কে তার ধারণা কতটাই না ভুল।

তারপর ভয়ে চারধার দেখতে দেখতে সে শহরে তার সকাল হয়ে গেল। (সে শুনতে পেল) আগের দিন যে লোকটি তার সাহায্য চেয়েছিল সে তার সাহায্যের জন্যে চিৎকার করছে। মূসা তাকে বলল, “তুমি তো স্পষ্টই একজন ঝগড়াটে লোক।” -(২৮:১৮)

তার এ কথায় ইস্রায়েলী সন্দেহে পড়ল, সে ভাবল মূসা তার উপর রেগে গিয়েছেন। সুতরাং মূসা যখন তাদের দু’জনের শত্রুকে মারতে উদ্যত হলেন, তখন [ঐ ইস্রায়েলী ভাবল মূসা তাকেই মারতে যাচ্ছেন], এতে সে বলে উঠল, “হে মূসা! গতকাল তুমি যেভাবে একটা লোককে খুন করেছ সেভাবে আমাকেও খুন করতে চাও না-কি? তুমি তো পৃথিবীতে স্বেচ্ছাচারী হতে চলেছ, তুমি কি একজন সংশোধনকারী হতে চাও না?”-(২৮:১৯)

ইস্রায়েলীর মুখে একথা শুনে মূসা ভীত হলেন। তিনি ভাবলেন নিশ্চয়ই ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেছে। নইলে গোপন ঐ বিষযটি সে জানল কি করে? সে যখন এসব ভাবছে, ঐ সময় সুযোগ বুঝে ঐ কিবতী সঁটকে পড়ল আর মনে মনে বলল- “তাহলে এই কথা! দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা! কত ধানে কত চাল বুঝবে এবার বাবা!”
কোনরকম বিলম্ব না করে ঐ মিসরীয় রাজ দরবারে ছুটে গেল এবং হত্যার বিষয়ে ফেরাউনকে অবহিত করল।

মূসার বিরুদ্ধে হত্যার এই অভিযোগ পেয়ে ফেরাউন উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন। অনতি বিলম্বে তিনি তাকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিলেন। আর নির্দেশ পেয়ে রক্ষীরা সাথে সাথেই শহরের অলিতে গলিতে তার খোঁজে ছড়িয়ে পড়ল। আর তারা মনে মনে বলতে লাগল- “এতবড় কান্ড ঘটিয়ে এই মূসাটা পালাবে কোথায়?”
তারা শহরের প্রধান প্রধান সড়কে নিশ্চিদ্র পাহারা বসিয়ে দিল।

এদিকে গ্রেফতারী পরোয়ানা সম্পর্কে মূসা কিছুই জানতেন না। কিন্তু তার এক হিতাকাঙ্খী এবং ফেরাউনের বিশ্বস্ত এক রাজকর্মচারী ইউশূয়া ইবনে নূন মূসা সম্পর্কে গৃহীত সরকারী সিদ্ধান্তের কথা জানতে পেরে- শহরের দূরপ্রান্ত থেকে ছুটে এসে [মূসাকে খুঁজে পেয়ে] বললেন, “হে মূসা! ফেরাউনের পরিষদবর্গ তোমাকে হত্যা করার জন্যে ষড়যন্ত্র করছে। সুতরাং তুমি বাইরে চলে যাও। আর আমি তোমার ভালোর জন্যেই বলছি।”-(২৮:২০)
[একথা শুনে] ভীত-চকিত অবস্থায় সে [মূসা] সেখান থেকে বের হয়ে গেল আর বলল, “হে আমার প্রতিপালক! সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়ের হাত থেকে তুমি আমাকে রক্ষা কর।”-(২৮:২১)

মূসা যখন মিসর থেকে [মদিয়ানের অভিমুখে]বের হয়েছিলেন, তখন তার সাথে পাথেয় বলতে কিছুই ছিল না এবং গন্তব্যস্থান সম্পর্কেও তার কোন ধারণা ছিল না। ঐ সঙ্কটময় অবস্থায় তিনি আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করে বলেছিলেন, “আশাকরি আমার প্রতিপালক আমাকে পথ দেখাবেন।” -(২৮:২২)

যে অঞ্চলে মূসা পলায়ন করেছিলেন, তা ছিল লোহিত সাগরের অপর তীরবর্তী পার্বত্য মরুএলাকা। ধারণা করা হয়, তিনি তিন কোনাকার সীনয় উপদ্বীপ পার হয়ে পূর্বদিকের আকাবা উপসাগরের কাছে মদিয়ানে গিয়েছিলেন, যেখানে ইব্রাহিম ও কটুরার বংশধরগণ বাস করত।

ইয়েমেনের মালভূমি বা জর্দানের পূর্বাঞ্চল হল মদিয়ান। এই অঞ্চলটি ছিল সমুদ্র তীরবর্তী ঘনজঙ্গল সমৃদ্ধ। এ কারণে এই অঞ্চলের অধিবাসী বা মদিয়ান সম্প্রদায়কে বলা হত আইকাবাসী [আইকা শব্দের অর্থ ঘনবৃক্ষরাজী শোভিত অঞ্চল]। লুতের সম্প্রদায়কে ধ্বংসের পর আল্লাহ এই আইকাবাসীদের ধ্বংস করেছিলেন। কারণ তারা ছিল অসৎ এবং বৃক্ষ ও দেব-দেবীর পূজাকারী। এই সম্প্রদায়ের কাছে সতর্ককারীরূপে আল্লাহ হযরত শোয়েবকে পাঠিয়ে ছিলেন। কিন্তু তারা শোয়েবকে অস্বীকার করেছিল, ফলে ধ্বংস তাদের অনিবার্য পরিণতি হয়ে দাঁড়ায়, যেমন ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল অতীতে আ’দ ও সামুদ জাতি, লূত ও নূহের সম্প্রদায়।

শ্যাম দেশ। প্রায় আট মঞ্জিল (এক মঞ্জিল = ১৬ মাইল) পথ অতিক্রম করে মূসা মদিয়ানের প্রান্তরে এসে পৌঁছিলেন। ইতিমধ্যে সাতদিন অতিবাহিত হয়েছে। এই সাতদিনে তার একমাত্র আহার্য ছিল বৃক্ষপত্র। তীব্র ক্ষুধা আর ক্লান্তি নিয়ে তিনি সম্মুখে এগিয়ে চলছিলেন। দুপুর গড়িয়ে গেছে। একসময় মূসা মাঠের মধ্যে একটা কূয়ো দেখতে পেলেন। তিনি এগিয়ে কূয়োর ধারে পৌঁছে দেখলেন একদল রাখাল তাদের পশুগুলোকে নিয়ে সেখানে জটলা করে আছে। সেইসময় দু‘টি মেয়ে পানি তুলে গামলা ভরতে কূয়োর কাছে গেল। কিন্তু কয়েকজন রাখাল এগিয়ে এসে তাদেরকে তাড়িয়ে দিল। তখন তারা রাখালদের পিছনে সরে গিয়ে তাদের পশুগুলো আগলাতে লাগল। এই ব্যাপার দেখে মূসা মেয়ে দু‘টির কাছে গিয়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাদের ব্যাপারটা কি? -(২৮:২৩) পশুগুলো আগলে দাঁড়িয়ে রয়েছ কেন? এগুলোকে পানি পান করাও?”

মেয়ে দু‘টি মূসার বেশভূষা লক্ষ্য করে বুঝতে পারল লোকটি বিদেশী- সম্ভবতঃ মিসরীয়। তারা নত মুখে সরল স্বীকারোক্তি করল, বলল, “রাখালেরা তাদের পশুগুলোকে সরিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত আমরা আমাদের পশুগুলোকে পানি খাওয়াতে পারছিনে।” -(২৮:২৩) তারপর মূসার চোখে মুখে আরও কিছু জিজ্ঞাসার চিহ্ন লক্ষ্য করে নীচুস্বরে তারা আরও যোগ করল- “আমাদের কোন ভাই নেই, আর আমাদের পিতা বৃদ্ধ,-(২৮:২৩) সুতরাং তিনিও একাজ করতে পারেন না। তাই আমাদেরকেই এই পশুগুলোর দেখভাল করতে হয়।”
“ও এই ব্যাপার!”

মূসা এগিয়ে গিয়ে কূয়োর কাছ থেকে রাখালদের তাড়িয়ে দিলেন। তারপর কূয়োর মুখ থেকে ভারী পাথরখানা একাই সরিয়ে দিয়ে ওদের পশুগুলোকে পানি তুলে খাওয়াতে লাগলেন। মেয়ে দু‘টি চুপচাপ দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে তার কার্যকলাপ লক্ষ্য করতে লাগল।

পশুগুলোর পানি পান শেষ হলে মেয়ে দু‘টি সেগুলোকে তাড়িয়ে তাদের গৃহ অভিমূখে চলে গেল। আর মূসা ফিরে গিয়ে নিকটেই একটা গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিলেন। অার তারপর নিজের অবস্থা ও অভাব খোদার সামনে তুলে ধরে বললেন, “হে আমার প্রতিপালক! যে অনুগ্রহই তুমি আমার প্রতি করবে আমি কেবল তাই-ই চাই।”-(২৮:২৪)

মেয়ে দু‘টি ছিল হযরত শোয়েবের কন্যা। যখন তারা তাদের বাড়ীতে ফিরে গেল, তাদের পিতা সকাল সকাল তাদেরকে গৃহে ফিরতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, “আজ তোমরা এত তাড়াতাড়ি কি করে ফিরে এলে?”
তারা বলল, “আজ রাখালদের হাত থেকে একজন মিসরীয় আমাদেরকে রক্ষা করেছেন, আর তিনি পানি তুলে আমাদের ভেড়াগুলোকেও পান করিয়েছেন।”
শোয়েব দেখলেন, লোকটি অনুগ্রহ করেছে, তাকে এর প্রতিদান দেয়া উচিৎ। তাই তিনি তাদেরকে বললেন, “লোকটি কোথায়? তোমরা তাকে ফেলে এলে কেন? তাকে ডেকে এনে কিছু খেতে দাও।”

ক্ষুধা ও ক্লান্তিতে মূসা তখনও বৃক্ষতলে বসে আছেন এমন সময় দু‘কন্যার মধ্যে একজন লজ্জায় জড়সড় পায়ে তার কাছে ফিরে এসে বলল, “আপনি যে আমাদের পশুগুলোকে পানি পান করিয়েছেন তার প্রতিদান দেবার জন্যে আমার পিতা আপনাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।” -(২৮:২৫)মেয়েটির একথা শুনে মূসা বুঝতে পারলেন আল্লাহর সাহায্য এসে পড়েছে। সুতরাং তিনি কোন কথা না বলে উঠে দাঁড়ালেন এবং মেয়েটির পিছে পিছে তাদের বাড়ীতে গেলেন।

মেয়েটি তার পিতার সাথে মূসার পরিচয় করে দিল। অত:পর কথাবার্তার একপর্যায়ে মূসা তাদের পিতাকে তার এখানে আগমনের সকল ঘটনা খুলে বললেন। খাদ্য পরিবেশনের ফাঁকে কন্যাদ্বয়ও মূসার সবকথা মনোযোগ সহকারে শুনল। সবকিছু শোনার পর হযরত শোয়েবও বুঝতে পারলেন মূসা এই মূহূর্তে নিরাশ্রয়ী-তার আশ্রয়ের প্রয়োজন। আর তিনি ইচ্ছে করলেই মূসাকে অতিথি হিসেবে আশ্রয় দিতে পারেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পারলেন মূসা অন্যের গলগ্রহ হবার ভয়ে এই আতিথেয়তা গ্রহণ করবেন না-চলে যাবেন। সুতরাং তিনি ঐ প্রস্তাব না দিয়ে কেবলমাত্র মূসাকে আশ্বস্ত করে শুধু এইটুকু বললেন, ‘ভয় কোরও না, তুমি সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়ের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছ।’-(২৮:২৫)

কন্যারা তার পিতাকে ভালভাবে জানত এবং বুঝত। আর মূসা সম্পর্কে তাদেরও যথেষ্ট ধারণা হয়েছিল। কিন্তু আশ্রয় না পেলে এই অচেনা বিদেশ-বিভূয়ে মূসা বিপদে পড়তে পারেন। উপরন্তু কন্যাদ্বয়ও কোন অবস্থাতেই মূসাকে হারাতে চাইছিল না। সুতরাং বুদ্ধিমতী জৈষ্ঠ্য কন্যা সফুরা পিতার নিকট আহল্লাদি কন্ঠে এক প্রস্তাব পেশ করলে, ‘হে আমাদের পিতা! তুমি তাকে কাজের লোক হিসেবে নাও-সে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত তোমার কাজের লোক হিসেবে সে কিন্তু ভালই হবে।’-(২৮:২৬)

কন্যার এই প্রস্তাব শুনে হযরত শোয়েব বুঝতে পারলেন এই যুবককে সে পছন্দ করেছে। আর তিনিও ভেবে দেখলেন-এই যুবকের সাথে যদি তার কন্যার বিবাহ হয় তবে ভালই হবে। সে উপযুক্ত পাত্র। তাছাড়া তার কন্যার রাখা প্রস্তাব শুনে সে নিরুত্তর ছিল। তাই কোন ভণিতা না করে তিনি সরাসরি লেন-দেনের পথই বেঁছে নিলেন-মূসাকে তার কন্যাদের একজনের সাথে বিবাহের প্রস্তাব দিলেন- “আমি আমার দু‘কন্যার মধ্যে একজনকে তোমার সঙ্গে বিবাহ দিতে চাই এই শর্তে যে, তুমি আট বৎসর আমার কাজ করবে। যদি দশ বৎসর পুরো করতে চাও -তাও করতে পার। আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনে। আল্লাহর ইচ্ছেয় তুমি আমাকে একজন ভাল লোক হিসেবেই পাবে।”-(২৮:২৭)
মূসা বুঝলেন এ প্রস্তাব আল্লাহর ইচ্ছেয় এসেছে। সুতরাং তিনি তাতে রাজী হয়ে গেলেন, বললেন, “আপনার ও আমার মধ্যে এই চুক্তিই রইল। এই-দুই মেয়াদের যে-কোন একটি আমি পুরো করলে আমার বিরুদ্ধে আর কিছু বলার থাকবে না। আমরা যা বললাম, আল্লা তার স্বাক্ষী রইলেন।”-(২৮:২৮)

মূসা হযরত শোয়েবের জৈষ্ঠ্যা কন্যা সফুরাকে বিবাহ করেন এবং শর্তানুযায়ী শ্বশুবের পশুপাল চরানোর কাজে লেগে যান। মূসা তার এই স্ত্রী সফুরার মাধ্যমে দু‘টি পুত্রসন্তান জন্মলাভ করেছিলেন।

মদিয়ানে মূসা চাকুরীর নির্দিষ্ট আট বৎসর বাধ্যতামূলক এবং দু‘বৎসর ঐচ্ছিক মেয়াদ পূর্ণ করলেন। অর্থাৎ সর্বমোট দশ বৎসর একজন মেষপালকের জীবন-যাপন করেন। সম্ভবতঃ এই মদিয়ানেই মূসা তার মায়ের শিক্ষার বিষয়ে ধ্যান করার এবং মিসরীয় শিক্ষা বোঝার সুযোগ পেয়েছিলেন। তাছাড়া তিনি মরুঅঞ্চলের লোকদের জীবন-যাত্রা, খাদ্য এবং পানির উৎস সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করেছিলেন, যা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তীতে তার এই জ্ঞান তাঁহ প্রান্তরে ইস্রায়েলীদের দীর্ঘ ও কষ্টকর বন্দী জীবন যাপন কালে পরিচালিত করতে সাহায্য করেছিল। অবশ্য আল্লাহর প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সাহায্য সবসময়ই ছিল।

একজন মিসরীয়কে হত্যার অপরাধে ফেরাউনের কর্মচারীরা মূসার খোঁজ করছিল। এই কারণে তিনি মিসর ত্যাগ করেছিলেন। দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়ার ফলে এখন সেই আশঙ্কা আর অবশিষ্ট ছিল না। তাই মেয়াদ শেষ করে তিনি শ্বশুর শোয়েবকে বললেন, “এখন আমি মিসরে, নিজ সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে যেতে চাই।”
শোয়েব বললেন, “তুমি তোমার মেয়াদ পূর্ণ করেছ। সুতরাং এখন আমার বলার তো কিছু নেই। তুমি যখন ইচ্ছে যেতে পার।”

শ্বশুরের অনুমতি পাবার পর স্ব-পরিবারে মূসা মিসরের পথে যাত্রা করলেন। পথিমধ্যে শ্যাম অঞ্চলে দুর্বৃত্তের আশঙ্কা থাকায় তিনি পরিচিত পথ ছেড়ে অখ্যাত পথ অবলম্বণ করেন। তখন ছিল শীতকাল। স্ত্রী সফুরা ছিলেন অন্ত:সত্ত্বা, আর তার প্রসবকালও ছিল নিকটবর্তী। পথ হারিয়ে মূসা যখন তূর পাহাড়ের পশ্চিমে ও ডানদিকে চলে এলেন, তখন সন্ধ্যা সমাগত। সুতরাং একস্থানে তাঁবু টানিয়ে পরিবারসহ আশ্রয় নিলেন তিনি।

কনকনে শীতের রাত। এরই মধ্যে মধ্যরাতে হঠাৎ স্ত্রীর প্রসব বেদনা শুরু হয়ে গেল। এসময় মূসা আগুন জ্বালাতে চাইলেন। তখনকার দিনে আগুন জ্বালাতে চকমকি পাথর ব্যাবহার করা হত। কিন্তু মূসা এই পাথর ব্যাবহার করে আগুন জ্বালাতে ব্যর্থ হলেন। এই হতবুদ্ধি অবস্থার মধ্যে তিনি হঠাৎ তাঁবুর বাইরে এসে তূর পাহাড়ের দিকে আগুন দেখতে পেলেন। তখন তিনি তার স্ত্রীকে বললেন, “তুমি থাক, আমি আগুন দেখেছি, সম্ভবত: আমি সেখান থেকে তোমার জন্যে আগুন আনতে পারব বা সেখান থেকে পথের দিশা পাব।” -(২০:১০)

মরুর বুকে নির্জন এই রাতের আঁধারে তাকে একাকী ফেলে মূসা কোথাও যাক তা তার স্ত্রী সফুরা চাচ্ছিল না। সে ভিতর থেকে তাকে ডেকে বলল, “তোমাকে এই রাতের বেলা কোথাও যেতে হবে না, তুমি আমার কাছেই থাক।”

তখন মূসা ভিতরে এসে তার স্ত্রীকে বললেন, “একটু অপেক্ষা কর, আমি আগুন দেখেছি, সম্ভবতঃ আমি সেখান থেকে তোমার জন্যে খবর (ধাত্রী) আনতে পারব, কিংবা একখন্ড জলন্ত কাঠ যাতে তুমি আগুন পোহাতে পার। ”-(২৮:২৯)

মূসা আগুন লক্ষ্য করে তূর পাহাড়ের দিকে এগিয়ে গেলেন। তারপর যখন তিনি আগুনের কাছে পৌঁছিলেন তখন এক বিষ্ময়কর দৃশ্য দেখতে পেলেন। তিনি দেখতে পেলেন আগুন দাউ দাউ করে একটি সতেজ ও সবুজ জলপাই বৃক্ষের উপর জ্বলছে কিন্তু আগুনের কারণে গাছের কোন শাখা বা পাতা পুড়ছে না। মূসা এই বিষ্ময়কর দৃশ্য কিছুসময় পর্যন্ত দাঁড়িয়ে উপভোগ করলেন এবং অপেক্ষা করতে থাকলেন এই ভেবে যে, আগুনের কোন স্ফূলিঙ্গ মাটিতে পড়লে তিনি তা তুলে নেবেন। বেশকিছু সময় অতিবাহিত হবার পরও যখন এমন হল না, তখন তিনি কিছু ঘাস ও খড়কুটো একত্রিত করলেন এই ভেবে যে সেগুলিতে আগুন ধরিয়ে যেন তিনি তা নিয়ে যেতে পারেন।

খড়কুটো হাতে মূসা যখন আগুনের কাছে এগিয়ে যেতে থাকলেন, তখন ঐ আগুন গাছের এক শাখা থেকে অন্য শাখায় পিছিয়ে গেল। মূসা অবাক হয়ে আগুনের দিকে তাকিয়ে থেকে সামনে এগিয়ে গেলেন। তখন উপত্যকার ডান পাশের পবিত্র জায়গার একগাছ থেকে তাকে ডাকা হল, “হে মূসা! ” -(২০:১১)

এই আওয়াজ চারিদিক থেকে সমভাবে ধ্বণিত হল। মূসা তার ডাকের উৎস দেখতে না পেয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। আওয়াজ এল, ‘আমিই আল্লাহ, বিশ্বজগতের প্রতিপালক। যারা আগুনের আলোর জায়গায় ও তার চারপাশে আছে তারাই ধন্য। বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ পবিত্র ও মহিমান্বিত।-(২৭:৮-৯)

আমিই তোমার পালনকর্তা, অতএব তুমি তোমার জুতা খুলে ফেল, কারণ তুমি এখন পবিত্র তোয়া উপত্যকায় রয়েছে। আর আমি তোমাকে মনোনীত করেছি, অতএব যা প্রত্যাদেশ করা হচ্ছে তা তুমি মন দিয়ে শোন।

আমিই আল্লাহ, আমি ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই। অতএব, আমার উপাসনা কর ও আমাকে স্মরণ করে নামাজ কায়েম কর। সময় (কেয়ামত) ঠিকই আসবে, আমি এর কথা গোপন রাখতে চাই, যেন প্রত্যেকেই নিজ নিজ কর্ম অনুযায়ী ফল লাভ করে। সুতরাং যে ব্যক্তি (সেই) সময়ে বিশ্বাস করে না, বরং নিজ প্রবৃত্তি অনুসরণ করে, সে যেন তোমাকে সেই (বিশ্বাস) থেকে ফিরিয়ে না দেয়, দিলে তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে। -(২০:১২-১৬) তোমার সম্প্রদায়কে অন্ধকার থেকে আলোয় আন আর ওদেরকে অতীতের কথা স্মরণ করিয়ে দাও।’-(১৪:৫)

মূসা বলল, “হে আমার প্রতিপালক! আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দাও। আর আমার কাজ সহজ করে দাও। আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে দাও। যেন ওরা আমার কথা বুঝতে পারে। আমার আত্মীয়দের মধ্যে হতে আমার জন্যে একজন সাহায্যকারী দাও। আমার ভাই হারুনকে। তার মাধ্যমে আমার হাতকে শক্তিশালী করে দাও এবং তাকে আমার সাহায্যকারী হিসেবে দাও। যাতে আমরা বেশী করে তোমার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষনা করতে পারি এবং বেশী করে তোমায় স্মরণ করতে পারি। তুমি তো আমাদের অবস্থা সবই জান।”-(২০:২৫-৩৫)

তিনি বললেন: হে মূসা, তুমি যা চেয়েছ তা তোমাকে দেয়া হল। আমি তোমার প্রতি আরও একবার অনুগ্রহ করেছিলাম। যখন আমি তোমার মাতাকে নির্দেশ দিয়েছিলাম যে, তুমি (মূসাকে) সিন্দুকে রাখ, অতঃপর তা দরিয়ায় ভাসিয়ে দাও, অত:পর দরিয়া তাকে তীরে ঠেলে দেবে। তাকে আমার শক্র ও তার শক্র উঠিয়ে নেবে। আমি তোমার প্রতি মহব্বত সঞ্চারিত করেছিলাম আমার নিজের পক্ষ থেকে, যাতে তুমি আমার দৃষ্টির সামনে প্রতি পালিত হও।

যখন তোমার ভগিনী এসে বলল: আমি কি তোমাদেরকে বলে দেব কে তাকে লালন পালন করবে। অতঃপর আমি তোমাকে তোমার মাতার কাছে ফিরিয়ে দিলাম, যাতে তার চক্ষু শীতল হয় এবং দুঃখ না পায়।

তুমি এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলে, অত:পর আমি তোমাকে এই দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দেই; আমি তোমাকে অনেক পরীক্ষা করেছি। অতঃপর তুমি কয়েক বছর মাদইয়ান বাসীদের মধ্যে অবস্থান করেছিলে; হে মূসা, অত:পর তুমি নির্ধারিত সময়ে এসেছ এবং আমি তোমাকে আমার নিজের জন্য তৈরী করে নিয়েছি। -(২০:৩৬-৪১)
“হে মূসা! তোমার ডান হাতে ওটা কি?”
সে বলল, “এটা আমার লাঠি, আমি এর ওপর ভর দিয়ে চলি, আর এ দিয়ে ভেড়ার পাতা পাড়ি, আর এছাড়া এর আরও অনেক কাজ আছে।”-(২০:১৭-১৮)

এই লাঠিটি বেহেস্তী লাঠি ছিল। আদম বেহেস্ত থেকে আসার সময় এই লাঠিটা সাথে নিয়ে এসেছিলেন। এর মাথায় দু‘টি ডাল ছিল। অন্ধকারে ঐ ডালগুলি থেকে আলো বিচ্ছুরিত হত। আদমের পর লাঠিটা পুরুষানুক্রমে অধ:স্তন ওয়ারিসদের মধ্যে চলে আসতে থাকে। হযরত মূসা, শোয়েবের কন্যা সফুরাকে বিবাহের পর শ্বশুরের কাছ থেকে অন্যান্য জিনিসের সাথে এই লাঠিটিও উপহার হিসেবে পেয়েছিলেন। প্যালেস্টাইনের উদ্দেশ্যে ইস্রায়েলীদের নিয়ে মিসর ত্যাগের পর, যাত্রাপথে মূসার মৃত্যু হলে ইস্রায়েলীরা সাক্ষ্য তাম্বুর সাথে পবিত্র এই লাঠিটিও মাতৃভূমিতে বয়ে নিয়ে গিয়েছিল।

তিনি বললেন, “হে মূসা, তুমি এটা ছোড় তো!”
তারপর সে ওটা ছুড়ল, সঙ্গে সঙ্গে তা সাপের মত ছুটোছুটি করতে লাগল।-(২০:১৯-২০) আর যখন সেটা সাপেরমত ছুটোছুটি করতে লাগল, সে পিছন দিকে না তাকিয়ে উল্টো দিকে দৌঁড়াতে থাকল। তাকে বলা হল, “মূসা, ফিরে এস, ভয় পেয় না। তুমি তো নিরাপদেই আছ।” -(২৮:৩১-৩৫)

(মূসা ফিরে এলে) তিনি বললেন, “তুমি এটাকে ধর, ভয় কোরও না, আমি এটাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেব।”-(২০:২১)
তারপর সে সেটা ধরলে তা আগের অবস্থায় ফিরে এল। তখন তিনি বললেন, “তোমার হাত বগলে রাখ। সেটা নির্মল উজ্জল হয়ে বের হয়ে আসবে।”
“(এবার) তোমার হাত দু‘টো বুকের উপর চেপে ধরে ভয় দূর কর।”
[অত:পর তিনি বললেন] এ দু’টি তোমার প্রতিপালকের দেয়া প্রমাণ, ফেরাউন ও তার প্রধানদের জন্যে। ওরা অবশ্যই সত্যত্যাগী সম্প্রদায়।-(২৮:৩২) [সুতরাং] ফেরাউনের কাছে যাও, সে সীমালংঘন করেছে।-(২০:২৪)

মূসা বলল, “হে আমার পালনকর্তা, আমি তাদের এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছি। কাজেই আমি ভয় করছি যে, তারা আমাকে হত্যা করবে। আমার ভাই আমার চেয়ে ভাল কথা বলতে পারে, সুতরাং তাকে আমার সাহায্যকারী হিসেবে পাঠাও, সে আমাকে সমর্থন করবে। আমি অবশ্য আশা করছি, ওরা আমাকে মিথ্যেবাদী বলবে।”
[তিনি বললেন] “আমি তোমার ভাইকে দিয়ে তোমার হাত শক্ত করব আর তোমাদের দু‘জনকে প্রাধান্য দেব। ওরা তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আমার নিদর্শণের বদৌলতে তোমরা ও তোমাদেরকে যারা অনুসরণ করবে তারাই জয়ী হবে।”-(২৮:৩২-৩৫) [সুতরাং] তুমি ও তোমার ভাই আমার নিদর্শনাবলীসহ যাও এবং আমার স্মরণে শৈথিল্য করো না।-(২০:৪১)

নব্যূয়ত নিয়ে মূসা তার স্ত্রীর কাছে প্রত্যাবর্তণ করেন। ইতিমধ্যে তার স্ত্রী সফুরা অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে এক পুত্রসন্তান প্রসব করে ফেলেছিল এবং মূসার ফিরে আসতে বিলম্ব দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পুন: পুন:পথের দিকে দৃষ্টিপাত করছিল।

মূসা তাম্বুর মধ্যে প্রবেশ করলেন। স্ত্রীর কোলে সন্তান দেখে খুশী হয়ে উঠলেন তিনি। এগিয়ে গিয়ে সন্তানকে কোলে তুলে নিলেন। তারপর সকল ঘটনা স্ত্রীকে সবিস্তারে বর্ণণা করলেন। তারপর স্ত্রী সুস্থ্য হলে এক সকালে মূসা পরিবার নিয়ে মিসর অভিমুখে যাত্রা করলেন।

এদিকে হারুণকে আল্লাহ প্রত্যাদেশের মাধ্যমে মূসার আগমন ও অবস্থানের সংবাদ জানিয়ে দিয়েছিলেন। সুতরাং তিনি তাদেরকে অভ্যর্থণা জানিয়ে এগিয়ে নিতে শহরে ঢোকার সদর রাস্তার ধারে অপেক্ষা করতে লাগলেন। সন্ধ্যা হয়ে এল অথচ মূসাদের দেখা নেই। অবশেষে তিনি সন্ধ্যারাত পর্যন্ত অপেক্ষা করে ফিরে এলেন পরদিন পুনঃরায় আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে।

মূসা স্ব-পরিবারে মিসরে প্রবেশ করলেন। অত:পর যখন তারা শহরের উপকন্ঠে এসে পৌঁছিলেন, তখন মধ্যরাত। সদর রাস্তা পরিত্যাগ করে অত্যন্ত সংগোপনে, অনুমানের উপর ভর করে আপনগৃহ অভিমুখে চললেন। একসময় তারা তাদের গৃহদ্বারে এসে পৌঁছিলেন।

বহু পরিচিত গৃহদ্বার। মূসা এগিয়ে গিয়ে দ্বারে মৃদু করাঘাত করলেন। দ্বার খোলা হল। এক গৃহপরিচারিকা দ্বারে দাঁড়িয়ে ঔৎসুক্য দৃষ্টিতে তাদেরকে দেখছিল। মূসা নিজেকে মুসাফির হিসেবে পরিচয় দিলেন ।

ইস্রায়েলীরা নবীর বংশধর, অতিথিপরায়ণ। সুতরাং তাদেরকে অভ্যর্থনা জানিয়ে ভিতরে নিয়ে বসান হল। ইতিমধ্যে হারুণ এক মুসাফিরের আগমন সংবাদে তার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। মূসাকে দেখেই তাকে চিনতে পেরে জড়িয়ে ধরলেন তিনি। এদিকে স্ব-পরিবারে মূসার আগমন সংবাদে মূসার মাতাও অন্দর থেকে ছুটে এলেন। মূসা সকল ঘটনা মাতা ও তার ভ্রাতাকে সবিস্তারে বর্ণনা করলেন।

মূসার জন্যে একটি বড় সমস্যা ছিল তার সম্প্রদায়, ইস্রায়েলীদের বোঝান যে, তারা এই কাজ করতে পারে এবং যেন তা তারা করে। এমনিতে একটি জাতি হিসেবে তারা তাদের জীবনের উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলেছিল। তার উপর দাসত্ব তাদের আত্মবিশ্বাস এবং উৎসাহ কেড়ে নিয়েছিল। মূসা এসব বুঝতেন। তাই তিনি ভাই হারুণের সাথে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে নিলেন।

হারুণ সর্বপ্রথম বৃদ্ধনেতাদেরকে সমবেত করলেন। আর মূসা তাদেরকে আল্লাহ যা বলেছিলেন তার সবই জানালেন। আর তাদের সামনে সেই অলৌকিক কাজগুলি করে দেখালেন, আর বললেন, “হে আমার সম্প্রদায়! যদি তোমরা আল্লাহতে বিশ্বাস করে থাক, যদি তোমরা আত্মসমর্পণকারী হও, তবে তোমরা তাঁরই উপর নির্ভর কর।”

বৃদ্ধনেতারা যখন শুনলেন যে, খোদা তাদের দুঃখ-দুর্দশা দেখেছেন এবং তাদের কথা ভেবেছেন তখন তারা নত হয়ে তাঁর উদ্দেশ্যে অন্তরের ভক্তি জানাল এবং বলল, “আমরা আল্লাহর উপর নির্ভর করলাম, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে অত্যাচারী সম্প্রদায়ের উৎপীড়নের পাত্র কোরও না। আর তোমার অনুগ্রহে আমাদেরকে অবিশ্বাসী সম্প্রদায়ের হাত থেকে রক্ষা কর।”

অতঃপর মূসা ও হারুণ অন্যান্য ইস্রায়েলীদেরকে উৎসাহিত করতে তাদেরকেও এসব কথা জানালেন, মিসর যে তাদের ত্যাগ করা উচিৎ আর তারা যে তা করতে পারে- তা তাদেরকে বোঝালেন। কিন্তু তাদের অধিকাংশ মূসার কথায় কান দিল না ফেরাউন ও তার কর্মধ্যক্ষদের ভয়ে। এতে মূসা হতাশ হয়ে ক্ষোভের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি ফেরাউন ও তার পরিষদবর্গকে পার্থিব জীবনে যে শান-শওকত ও ধন-দৌলত দান করেছ তা দিয়ে, হে আমাদের প্রতিপালক, ওরা তোমার পথ থেকে মানুষকে বিপথে চালিত করেছে।’

বনি ইস্রায়েলীরা সবাই নিয়মিত নিজেদের নির্ধারিত উপাসনালয়েই এবাদত করত। কেননা, মূসা পূর্ববর্তী উম্মতদের প্রতি এরূপই নির্দেশ ছিল। কিন্তু ফেরাউনের কর্মচারীরা প্রায়শ: তাদের ঘরবাড়ী ও উপাসনালয়গুলো বিনষ্ট করে দিত। এই কারনে অধিকাংশ ইস্রায়েলী তাম্বুতে বাস করত।

আল্লাহ সর্বজ্ঞ, দ্রষ্টা। এখন তিনি বিষয়টি লক্ষ্য করে মূসা ও হারুণকে প্রত্যাদেশ পাঠালেন, “মিসরে তোমাদের সম্প্রদায়ের জন্যে বাড়ী বানাও, আর তোমাদের বাড়ীগুলোকে কেবলা কর, নামাজ পড় ও বিশ্বাসীদেরকে সুসংবাদ দাও।”

ফেরাউন ও তার পরিষদবর্গের নির্যাতনের ভয়ে তার সম্প্রদায়ের একদল ছাড়া আর কেউ তাদের উপর বিশ্বাস স্থাপন করল না। নিশ্চয়ই ফেরাউন দেশে স্বেচ্ছাচারী ও উচ্ছৃংখল ছিল। মূসা বলেছিল, “হে আমার সম্প্রদায়! যদি তোমরা আল্লাহতে বিশ্বাস করে থাক, যদি তোমরা আত্মসমর্পণকারী হও, তবে তোমরা তাঁরই উপর নির্ভর কর।”

তারপর তারা বলল, “আমরা আল্লাহর উপর নির্ভর করলাম, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে অত্যাচারী সম্প্রদায়ের উৎপীড়নের পাত্র কোরও না। আর তোমার অনুগ্রহে আমাদের অবিশ্বাসী সম্প্রদায়ের হাত থেকে রক্ষা কর।”
আমি মূসা ও তার ভাইকে প্রত্যাদেশ পাঠালাম, “মিসরে তোমাদের সম্প্রদায়ের জন্যে বাড়ী বানাও, আর তোমাদের বাড়ীগুলোকে কেবলা কর, নামাজ পড় ও বিশ্বাসীদের সুসংবাদ দাও।”

মূসা বলল, “হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি ফেরাউন ও তার পরিষদবর্গকে পার্থিব জীবনে যে শান-শওকত ও ধন-দৌলত দান করেছ তা দিয়ে হে আমাদের প্রতিপালক, ওরা তোমার পথ থেকে (মানুষকে) বিপথে চালিত করে।”-(১০:৮৩-৮৮)

অত:পর আল্লাহ মূসাকে তার উপর অর্পিত দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন, "তুমি ও তোমার ভাই আমার নিদর্শণ নিয়ে যাও, আর আমাকে স্মরণ করতে আলস্য কোরও না; তোমরা দু‘জন ফেরাউনের কাছে যাও সে তো সীমালংঘন করে চলেছে। তোমরা তার সাথে নম্রভাবে কথা বলবে। হয়তোবা সে উপদেশ গ্রহণ করবে, বা ভয়ও পেতে পারে।”-(২০:৪২-৪৪)

তারা বলল, “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের আশঙ্কা হয় সে আমাদের যাওয়া মাত্রই আমাদেরকে শাস্তি দেবে বা অন্যায় ব্যাবহার করে সীমালংঘন করবে।”
তিনি বললেন, “ভয় কোরও না; আমি তো তোমাদের সঙ্গেই রয়েছি। আমি সবই শুনি সবই দেখি। অতএব, তোমরা তার কাছে যাও ও বল, ‘আমরা দু‘জন প্রতিপালকের রসূল, সুতরাং আমাদের সাথে বনি ইস্রায়েলদের যেতে দাও, আর তাদের কষ্ট দিও না। আমরা তো তোমার প্রতিপালকের কাছ থেকে নিদর্শণ এনেছি, আর যারা সৎপথ অনুসরণ করবে তাদের জন্যে শান্তি। নিশ্চয়ই আমাদের প্রতি প্রত্যাদেশ প্রেরণ করা হয়েছে। যে ব্যক্তি মিথ্যে আরোপ করবে বা মুখ ফিরিয়ে নেবে তার জন্যে তো রয়েছে শাস্তি।”-(২০:৪৫-৪৮)

ইস্রায়েলীদেরকে নিয়ে মিসর ত্যাগে ফেরাউনের অনুমতি পেতে এক কাক ডাকা ভোরে মূসা ও হারুণ ফেরাউনের প্রাসাদ অভিমুখে রওনা দিলেন। অতঃপর তারা যখন প্রাসাদের দ্বার সম্মুখে উপনীত হলেন, প্রহরী তাদেরকে অন্দরে প্রবেশে বাঁধা দিল, বলল, ‘তোমরা তোমাদের পরিচয় দাও।’
মূসা বললেন, “আমরা তো আল্লাহ প্রেরিত রসূল।”

দ্বাররক্ষীরা অবাক হল। তারা তো এতদিন পর্যন্ত ফেরাউনকেই ইলাহ জেনে তার উপাসনা করে আসছে। তাহলে এই ইলাহটা কে? সুতরাং তারা গম্ভীরস্বরে বলল, “ফেরাউনই আমাদের রব। তিনি ব্যতিত অন্য ইলাহর খবর আমরা জানি না।”

মিসরীয়রা ফেরাউনকে উপাস্য হিসেবে মান্য করত। এটা এই কারণে নয় যে ফেরাউন নিজেকে উপাস্য হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন, আর তার শাস্তির ভয়ে লোকেরা তাকে দেবতা হিসেবে মান্য করত, বরং এটা এই কারণে যে, তাদের বিশ্বাসই ছিল এমন।

মিসরীয়রা বিশ্বাস করত ফেরাউনের মত অসীম ক্ষমতার অধিকারী হওয়া কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব না, কেবল দেবতাদের পক্ষেই সম্ভবপর। এ কারণে তারা নিজেরাই ফেরাউনকে বলত “দেবশ্রেষ্ঠ”। আর তারা তার গুণকীর্তণ করত এই বলে-“তিনিই সূর্য্য, নিজ আলোকে সব আলোকিত করেছেন।” মন্দিরে দেবমূর্ত্তির পাশাপাশি ফেরাউনের মূর্ত্তি থাকত। শুধু সাধারণ মানুষই নয় উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা পর্যন্ত ফেরাউনকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করত।

অবশ্য ফেরাউনকে দেবতা হিসেবে মান্য করার পিছনে পুরোহিতদের অবদানও কম ছিল না। তারা ফেরাউনের প্রতি জনগণের আজ্ঞানুবর্তিতা দাবী করত। তারা বলত: “বাধ্য হলে পাবে দেবতার আশীর্বাদ, অন্যথায় দেবতারা দেবেন অভিশাপ। -ফেরাউনের ইচ্ছেকে যারা অমান্য করবে তাদের ভাগ্যে থাকবে অনাবৃষ্টি, শক্রর আক্রমণ আর দেবতা ওসিরিসের শাসন দন্ড।”

মিসরীয়রা মনে করত পুরোহিতরা দেবদেবীদের সেবা করে, খেতে দেয়- তাদের মূর্ত্তির সামনে আহার্য নিয়ে রাখে, সুতরাং তারা দেবদেবীদের সাক্ষাৎ পায়, তারা শুধু উৎসর্গীত দ্রব্যই দেবদেবীকে পৌঁছে দেয় না, লোকজনের প্রার্থণাও তাদের কাছে নিবেদন করতে পারে। এই কারণে তাদের কথা মানে দেবতাদেরই কথা; দেবতারা তাদের মাধ্যমেই জনগণকে নির্দেশ দেয়। তাই লোকেরা তাদের কথা নির্বিবাদে মেনে নিত।

মূসা প্রহরীদেরকে বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর কথা বললেন। কিন্তু রক্ষীরা তার বা হারুণের কোন কথাই আর শুনতে রাজী হল না। অগত্যা তারা প্রাসাদের সম্মুখেই অবস্থান নিলেন।

এক সূদীর্ঘ সময় মূসা ও হারুণকে প্রাসাদের সম্মুখে অবস্থান করতে হয়েছিল। প্রতিদিন ভোরে তারা প্রাসাদের সম্মুখে অবস্থান নিতেন এবং সন্ধ্যায় ফিরে যেতেন। একদিন এক উচ্চপদস্থ কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে দু‘জন লোককে প্রাসাদের সম্মুখে অবস্থান নিতে দেখে নিতান্ত কৌতুহলবশতঃ তাদের পরিচয় জিজ্ঞেস করলেন। মূসা বললেন, “আমরা আল্লাহ প্রেরিত রসূল। তাঁর নির্দেশে আমরা ফেরাউনের কাছে এসেছি, বনি ইস্রায়েলীদেরকে এদেশ থেকে মুক্ত করে নিয়ে যেতে তার অনুমতির জন্যে।”

মূসার বক্তব্যের দৃঢ়তা দেখে কর্মচারীটি বিষ্মিত হল, সে দ্রুত এ বিষয়ে ফেরাউনকে অবহিত করল, বলল- “মূসা ও হারুণ নামের দু‘ব্যক্তি এমন এক বিষয় নিয়ে এখানে এসেছে, যা রীতিমত বিষ্ময়কর। আর তারা আপনার সাক্ষাৎপ্রার্থী হয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ প্রাসাদের সম্মুখে অপেক্ষমান।”

ফেরাউন কৌতুহলী হলেন। সুতরাং মূসা ও হারুণকে দরবারে হাজির করা হল। মূসার পায়ে চপ্পল, হাতে লাঠি আর গায়ে বিদেশী পোষাক। ফেরাউন তাদের দু’জনকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নিয়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাদের আগমণের উদ্দেশ্য কি?”

তারা বললেন, “আমাদেরকে বিশ্বজগতের প্রতিপালক পাঠিয়েছেন [তোমার কাছে] যেন তুমি বনি ইস্রায়েলকে আমাদের সাথে এদেশ ছেড়ে চলে যেতে দাও।”

ফেরাউন তৎক্ষণাৎ ইস্রায়েলীদের মিসর ছাড়তে অনুমতি দিলেন না, যদিও তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি তার উদ্বেগের কারণ ছিল এবং সেইসময় তিনি তাদের সংখ্যা কমানোর জন্যে ব্যস্ত ছিলেন। কারণ, তারা ছিল দাস এবং শত সহস্র ভূমি দাস ছিল তার কাছে একটি অর্থকরী সম্পদ। অবশ্য ফেরাউন এটা চাননি যে, এই লোকেরা তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে জয়ী হোক, আবার এটাও চাননি এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে তিনি স্বেচ্ছায় ছেড়ে দেবেন, যারা বিনামূল্যে তার দাসত্ব করে। তাই তিনি ও তার পরিষদবর্গ মূসার বক্তব্য শুনে তাদেরকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করতে লাগলেন।

ফেরাউন ও তার পরিষদবর্গ বললেন, “আমাদের মতই যারা এমন দু‘জনের উপর আমরা কেমন করে বিশ্বাস করব যে তাদেরকে বিশ্বজগতের প্রতিপালক পাঠিয়েছেন? আর বিশেষ করে যাদের সম্প্রদায় আমাদের দাসত্ব করে?”

ফেরাউন ২য় রামেসিস মূসাকে লালন-পালন করেন র্অথাৎ মূসা তার পালিত পুত্র। কিন্তু দীর্ঘদিন তার অনুপস্থিতি এবং অপরিচিত বেশভূষার কারণেই প্রথম দেখায় তিনি তাকে চিনতে পারেননি। অতঃপর তাকে চিনতে পেরে ধূর্ত ফেরাউন মূসার ব্যক্তিত্বকে খাট করে তাকে নৈতিকভাবে দুর্বল করে ফেলতে, তার গোষ্ঠি ও ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে অভিযোগ উত্থাপন করলেন, বললেন, “যখন তুমি ছোট ছিলে আমরা কি তোমাকে আমাদের মধ্যে রেখে লালন-পালন করিনি? তুমি কি তোমার জীবনের বহু বৎসর আমাদের মধ্যে কাটাওনি? আর তোমার সেই কাজটা যা তুমি করেছিলে! তুমি তো অকৃতজ্ঞ হে।” -এই উক্তি দ্বারা ফেরাউন ইঙ্গিতে মূসাকে একথা বোঝাতে চেষ্টা করলেন যে, “যে সম্প্রদায়ের মাঝে সে লালিত-পালিত ও যৌবনে পদার্পণ-তাদেরই একজনকে অহেতুক হত্যা যেমন জুলুম তেমনি নিমকহারামী ও কৃতঘ্নতা।”

মূসা ফেরাউনের ইঙ্গিত ঠিকই ধরতে পারলেন, বুঝতে পারলেন কোন ঘটনার কথা তিনি বলতে চাইছেন। তিনি মনে মনে বললেন- “একজন মিসরীয়কে হত্যার অপরাধে কোন সাক্ষ্য প্রমান ছাড়াই তোমরা আমার বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করেছিলে। অথচ দীর্ঘদিন ধরে তোমরা অসংখ্য ইস্রায়েলী নারী, পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করে চলেছ। আর তা তোমাদের দৃষ্টিতে অপরাধ বলে বিবেচিত হচ্ছে না।”

ফেরাউনের এসব কূট তর্ক এবং অভিযোগ সম্বলিত প্রতিবন্ধকতার সমাধান প্রক্রিয়ার জ্ঞান আল্লাহ মূসাকে দিয়েছিলেন। তাই তার কথার উত্তরে তিনি বললেন, “যখন পথভ্রষ্ট ছিলাম তখন আমি ঐ কাজটি করেছি। তারপর যখন তোমাদের ভয়ে ভীত হলাম, তখন তোমাদের কাছ থেকে পালিয়ে গেলাম। অত:পর আমার প্রতিপালক আমাকে জ্ঞান দান করেছেন। আর আমাকে রসূলদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করেছেন। এই তো তোমার সেই অনুগ্রহ যে, বনি ইস্রায়েলকে তুমি দাসে পরিণত করেছ!
-হে ফেরাউন! আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালকের প্রেরিত রসূল। “রাব্বুল আলামিন” আল্লাহ সম্পর্কে সত্য বলা ছাড়া আমার কোন অধিকার নেই। আমি তোমাদের কাছে এনেছি তোমাদের প্রতিপালকের স্পষ্ট নিদর্শণ। সুতরাং বনি ইস্রায়েল সম্প্রদায়কে আমার সাথে যেতে দাও।”

ফেরাউন বললেন, “হে মূসা! কে তোমাদের প্রতিপালক? ‘রাব্বুল আলামিন’ সে আবার কে?”
উত্তরে মূসা আল্লাহর পরিচিতি তুলে ধরলেন তাঁর ঐ সকল কাজের কথা বলে, যা সমগ্র সৃষ্টি জগতে পরিব্যপ্ত এবং কেউ ঐ সকল কাজ নিজে অথবা কোন মানব করেছে বলে দাবী করতে পারে না। তিনি বললেন, “তিনি আকাশ ও পৃথিবী এবং উভয়ের মধ্যেকার সবকিছুর প্রতিপালক, যদি তোমরা বিশ্বাস করতে পার।”
ফেরাউন তার পার্শ্ববর্গদের লক্ষ্য করে বললেন, “তোমরা শুনছ তো?”
মূসা বললেন, “তোমাদের প্রতিপালক তিনি যিনি প্রত্যেক বস্তুুকে তার যথাযোগ্য আকৃতি ও প্রকৃতি দান করেছেন এবং পথ প্রদর্শণ করেছেন।”
ফেরাউন বললেন, “তাহলে আগের আমলের লোকেদের কি হাল হবে?”

ফেরাউন আশা করছিলেন মূসা হয়ত: এর উত্তরে বলবেন, “তারা সবাই পাপী এবং জাহান্নামী।”-এতে তিনি মিসরীয়দের বলবেন, “দেখ, সে কেমন বেওকূফ! সে তোমাদের সকল পিতৃপুরুষ, সকল মিসরীয়দেরকে জাহান্নামী মনে করে।”-এতে নিশ্চয়ই সকলে তার বিরুদ্ধে ক্ষেপে যাবে। কিন্তু মূসা বিজ্ঞজনোচিত উত্তর দিলেন, বললেন, “এর জ্ঞান আমার প্রতিপালকের কাছে এক কিতাবে রয়েছে। আমার প্রতিপালক ভুল করেন না বা ভুলেও যান না, যিনি তোমাদের জন্যে প্রসারিত করেছেন পৃথিবীকে আর তাতে তোমাদের জন্যে দিয়েছেন চলার পথ। তিনি আকাশ থেকে বৃষ্টি নামান আর তা দিয়ে জোড়ায় জোড়ায় উদ্ভিদ উৎপন্ন করেন, যার একটার সাথে আরেকটার মিল নেই। তোমরা খাও আর তোমাদের পশুদের চরাও; নিশ্চয়ই এসবের মধ্যে নিদর্শণ রয়েছে বিবেক সম্পন্নদের জন্যে।”

পরিষদবর্গকে লক্ষ্য করে ফেরাউন বললেন, “তোমাদের কাছে এই যে রসূল পাঠান হয়েছে এ তো এক বদ্ধপাগল!”
মূসা বললেন, “তিনি পূর্ব ও পশ্চিম এবং এ দু‘য়ের মধ্যেকার সবকিছুর প্রতিপালক যদি তোমরা তা বুঝতে!”
ফেরাউন কঠিনস্বরে বললেন, “তুমি যদি আমার পরিবর্তে অন্য কাউকে উপাস্যরূপে গ্রহণ কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাকে কারাগারে আটক রাখব।”
মূসা বললেন, “আমি তোমার কাছে স্পষ্ট নিদর্শণ আনলেও?”
ফেরাউন বললেন, “যদি তুমি কোন নিদর্শণ এনে থাক সত্যবাদী হলে তা হাযির কর।”

তখন মূসা তার লাঠি ফেরাউনের সিংহাসনের সম্মুখে মাটিতে ছুঁড়ে ফেললেন। সাথে সাথে সেটি সাক্ষাৎ এক অজগর সাপ হয়ে ফণা তুলে দাঁড়িয়ে গেল। এ দেখে ফেরাউন তো তার পা সঙ্গে সঙ্গে সিংহাসনের উপরে তুলে নিলেন। পরিষদবর্গ উৎকন্ঠিত হয়ে চিৎকার করে উঠলেন। তখন মূসা এগিয়ে এসে সাপের লেজের দিকটা ধরলেন- তৎক্ষণাৎ সেটি আবার লাঠি হয়ে গেল।

এতক্ষণে পরিষদবর্গ স্বস্তরি নিঃশ্বাস ফেললেন, বললেন, “এ তো যাদু!”
এই নিদর্শণকে যাদু বলে উড়িয়ে দেয়াতে মূসা তার ২য় নিদর্শণ উপস্থাপন করতে তার হাত বগলের নীচে কাপড়ের ভাঁজের মধ্যে রাখলেন। আর যখন তিনি তার তা বের করলেন তৎক্ষণাৎ দর্শকদের সামনে তা উজ্জ্বল শুভ্র মনে হল। তারা বললেন, “দুই-ই যাদু একটি অপরটির মত। আমরা একটিকেও মানিনে।”

ফেরাউন এতক্ষণ মূসার কার্যকলাপ মনোযোগের সাথে লক্ষ্য করছিলেন। তার মন মূসার আনীত নিদর্শনাবলীকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছিল। কিন্তু তিনি অন্যায় ও অহঙ্কার করে পরিষদর্বগরে ন্যায় নিদর্শণসমূহ প্রত্যাখ্যান করলেন এবং সম্প্রদায়ের প্রধানদেরকে বললেন, “আমি তো দেখছি এ একজন ওস্তাদ যাদুকর! এ তোমাদেরকে তোমাদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দিতে চায়। এখন তোমরা কি বুদ্ধিপরামর্শ দাও?”
মূসা বললেন, “সত্য যখন তোমাদের সামনে এসেছে তখন সে সম্পর্কে তোমরা কেন এমন বলছ? এ-কি যাদু? যাদুকররা তো সফল হয় না।”
পরিষদবর্গ বললেন, “আমরা আমাদের পিতৃপুরুদেরকে যে মতে পেয়েছি তুমি কি তার থেকে সরিয়ে নেবার জন্যে আমাদের কাছে এসেছ? এবং যেন দেশে তোমাদের দু’জনের প্রতিপত্তি হয়, সেইজন্যে? তোমাদের দু’জনকে আমরা বিশ্বাস করিনে।”
তারা ফেরাউনকে বললেন, “তাকে ও তার ভাইকে কিছু সময় দেন। আর শহরে শহরে যোগানদারকে পাঠান। তারা আপনার সামনে সকল ওস্তাদ যাদুকরদেরকে হাযির করুক।”

সৃতরাং ফেরাউন বললেন, “হে মূসা! তুমি কি যাদুবলে আমাদেরকে দেশ থেকে বিতাড়িত করার মানসে আমাদের কাছে এসেছ? বেশ, তোমার যাদুর মতই আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। সুতরাং আমাদের ও তোমার মধ্যে মোকাবেলার জন্যে স্থান-কাল নির্ধারণ কর, আমরা কেউই তার খেলাফ করতে পারব না, আর তুমিও করবে না।”
মূসা বললেন, “তোমাদের নির্ধারিত দিন হল উৎসবের দিন, আর সেদিন লোকজন জমায়েত হবে বেলা এক প্রহরের সময়।”
ফেরাউন তার কর্মচারীদের (যোগানদার) ডেকে বললেন, “তোমরা আমার কাছে ঝানু যাদুকরদেরকে নিয়ে এস।”
তারপর তিনি দরবার ছেড়ে চলে গেলেন।

নির্ধারিত দিনে নির্দিষ্ট সময়ে যথাস্থানে মূসা ও হারুণ উপস্থিত হলেন। দিনটি ছিল উৎসবের, ফলে আগে থেকেই প্রচুর লোক জমায়েত হয়েছিল। এদিকে ফেরাউনের যাদুকররাও হাযির হয়েছিল। তারা ছিল ৭২ জন। একসময় ফেরাউনের তরফ থেকে লোকদের উদ্দেশ্যে বলা হল- “তোমরাও একত্রিত হও যেন, ওরা বিনয়ী হলে আমরা ওদের সমর্থন করতে পারি।”

ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা উপস্থিত জনতা সমবেত হল। ফেরাউন, মূসা ও হারুণের প্রতি ইঙ্গিত করে যাদুকরদের উদ্দেশ্যে বললেন, “এরা দু‘জন নিশ্চয়ই যাদুকর, তারা যাদুবলে তোমাদেরকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিতে চায় এবং তোমাদের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে একেবারে নস্যাৎ করতে চায়। অতএব তোমরা তোমাদের যাদুর তোড়জোড় ঠিকঠাক কর, তারপর সাঁরি বেঁধে দাঁড়াও। আজ যে জিতবে সেই-ই হবে সফলকাম।”

“আজ যে জিতবে সেই-ই হবে সফলকাম।”- ফেরাউনের একথাতে যাদুকরেরা এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারল না যে, তারা বিজয়ী হলে পুরস্কার পাবে কিনা! সুতরাং তাদের দু‘জন প্রতিনিধি(যান্নি ও যাম্ব্রি) ফেরাউনের কাছে গিয়ে বলল, “আমরা যদি বিজয়ী হই, আমরা পুরস্কার পাব তো?”
তিনি বললেন, “অবশ্যই এবং তোমরা হবে আমার খুব কাছের লোক।”

যাদুকরেরা নিজেদের স্থানে ফিরে এসে নিজেদের মধ্যে আলাপ করল ও গোপনে পরামর্শ করল। মূসা তাদেরকে বললেন, “দুর্ভোগ তোমাদের! তোমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যে আরোপ কোরও না। করলে তিনি তোমাদেরকে সমূলে ধ্বংস করবেন। যে মিথ্যে বানায় সে ব্যর্থ হয়।”
যাদুকরেরা মুসার বক্তব্যকে উপেক্ষা করল। তারপর নিজেদের স্থিরচিত্ততা ও চিন্তাহীনতা ফুটিয়ে তুলতে মূসাকে বলল, “হে মূসা! প্রথমে তুমি ছুঁড়বে, না আমরা ছুঁড়ব?”
মূসা ভদ্রজনোচিত জবাব দিলেন, “বরং তোমরাই ছোঁড়।”
সুতরাং যাদুকরেরা তাদের কাজ শুরু করে দিল এবং তাদের দড়িদড়া ও লাঠিসোটা একযোগে মাটিতে নিক্ষেপ করল ও বলল, “ফেরাউনের ইজ্জতের শপথ, আমরা নিশ্চয়ই বিজয়ী হব।”

যখন তারা ছুঁড়ল, লোকদের চোখে ভেল্কি লাগল এবং তারা ভয় পেয়ে গেল যেন তারা ভোঁজ বাজি দেখছে। ওদের যাদুর ফলে মনে হল সব দড়াদড়ি ও লাঠিসোটাগুলো সাপ হয়ে ইতস্তত: ছুটোছুটি করতে লাগল। এসময় মূসার মনেও ভয় ঢুকে গেল। তখন আল্লাহ তাকে সাহস যোগালেন, বললেন, “ভয় কোরও না তুমিই হবে প্রবল।”
সুতরাং মূসা যাদুকরদেরকে বললেন, “তোমরা যা এনেছ তা যাদু, আল্লাহ তাকে মিথ্যে প্রতিপন্ন করবেন। আল্লাহ তো ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারীদের সার্থক করেন না। তিনি তাঁর বাণী অনুযায়ী তাঁর সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করবেন, অপরাধীরা তা অপছন্দ করলেও।”

মূসার প্রতি আল্লাহ হুকুম করলেন, “তুমি তোমার লাঠি ছোঁড়। ওরা যা করেছে তা এ গিলে ফেলবে। যাদুকর যেখানেই থাকুক, সফল হবে না।”
তখন মূসা তার লাঠি ছুঁড়লেন। সেটা মাটিতে পড়ে স্থির হবার আগেই বিরাট সাপ হয়ে ফণা তুলে দাঁড়িয়ে গেল। অত:পর ওদের ভূয়া সৃষ্টিকে দ্রুততার সাথে একে একে গ্রাস করে ফেলতে লাগল। যাদুকরেরা শত চেষ্টা করেও তাদের সৃষ্টিকে টিকিয়ে রাখতে পারল না, তাদের যাদুতে তৈরী সকল ছোটবড় সাপকে মূসার সাপ সাবাড় করে দিল। ফলে সত্য প্রতিষ্ঠা পেল আর যাদুকরেরা যা করেছিল তা মিথ্যে প্রমানিত হল। তারা সেখানে হার মানল ও অপদস্থ হল।

সবকিছু অবলোকনের পর যাদুকররা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করল এটা কোন যাদু নয়। যাদু হলে তাদের যাদুকে মূসা এভাবে বিনাশ করতে পারত না। তাদের মধ্যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তণ হল। তারা তৎক্ষণাৎ আল্লাহর উদ্দেশ্যে সিজদা করল। উপস্থিত লোকেরা তাদের কার্যকলাপ দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। তা লক্ষ্য করে তারা ঘোষণা করল, ‘আমরা বিশ্বাস করলাম বিশ্বজগতের প্রতিপালকের উপর, যিনি মূসা ও হারুণেরও প্রতিপালক।’

যাদুকরদের কথা শুনে ফেরাউনের মাথায় এসময় দ্রুত চিন্তা চলতে লাগল। তিনি ভাবছিলেন  কিভাবে উপস্থিত লোকদেরকে মূসার উপর ঈমান আনার আগেই বিভ্রান্তিতে ফেলা যায় আর একই সাথে মূসাকেও শায়েস্তা করা যায়। তিনি দ্রুতই সিদ্ধান্ত নিলেন। তারপর ধূর্ত ও বিজ্ঞ রাজনীতিকের মত মূসা ও যাদুকরদের উপর বিদ্রোহমূলক অপবাদ আরোপ করলেন। তিনি যাদুকরদেরকে বললেন, ‘কি! আমি তোমাদেরকে অনুমতি দেবার আগেই তোমরা তাঁর উপর বিশ্বাস করলে? নিশ্চয়ই এ (মূসার প্রতি ইঙ্গিত করে) তোমাদের নেতা যে তোমাদেরকে যাদু শিক্ষা দিয়েছে। তোমরা শহরের লোকদেরকে এখান থেকে বের করে দেবার জন্যে ষড়যন্ত্র করেছ। এ তো নিশ্চিত একটা ষড়যন্ত্র! আচ্ছা, তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে এর ফল কি! আমি অবশ্যই তোমাদের হাত-পা উল্টো দিক থেকে কাটব, তারপর তোমাদের সকলকে শূলে চড়াব। তখন তোমরা জানতে পারবে আমাদের (তার ও আল্লাহ) মধ্যে কার শাস্তি কত কঠিন ও কতক্ষণ স্থায়ী?’

যাদুকরদের প্রতিনিধি দু‘জনের একজন দৃঢ়স্বরে বলল, ‘আমাদের কাছে যে স্পষ্ট যুক্তি-প্রমাণ এসেছে তার উপরে, আর যিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তার উপরে আপনাকে আমরা প্রাধাণ্য দেব না। সুতরাং আপনি যা হুকুম করতে চান, করেন। আপনি তো হুকুম চালাতে পারেন এই পার্থিব জীবনটুকুর উপর। আমরা আমাদের প্রতিপালকের উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছি। আমাদের অপরাধ, আর আপনার জবর-দস্তির জন্যে আমরা যে যাদু করেছি, তা যেন তিনি ক্ষমা করেন। আল্লাহ তো মঙ্গলময় ও চিরস্থায়ী।’

অপরজনও ক্ষোভের সাথে বলল, ‘আমরা আমাদের প্রতিপালকের কাছে ফিরে যাব। আমাদের প্রতিপালকের নিদর্শণ আমাদের কাছে যখন এসেছে তখন আমরা তাতে বিশ্বাস করবই। আপনি এর জন্যে আমাদের ওপর শুধু শুধু দোষারোপ করছেন।’ সে উর্দ্ধপানে চাইল এবং বলল-‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে ধৈর্য্য দান কর এবং মুসলমান হিসেবে আমাদের মৃত্যু ঘটাও।’

মূসা তার অনুসারী তার সম্প্রদায়ের লোকদেরকে নিয়ে ফিরে চললেন। লোকেরা তাকে বলল, ‘এখন কি হবে?’
তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা কর, আর ধৈর্য্য ধারণ কর, দুনিয়া তো আল্লাহরই! তিনি তাঁর দাসদের মধ্যে যাকে ইচ্ছে তার উত্তরাধিকারী করেন, আর সাবধানীদের জন্যেই তো রয়েছে শুভপরিনাম।’
তারা বলল, ‘আমাদের মঝে তোমার আসার আগেও, আবার আসার পরেও, আমরা কেবল নির্যাতিত হচ্ছি।’
তিনি বললেন, ‘শীঘ্রই তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের শত্রু ধ্বংস করবেন ও দেশে তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন। তারপর তিনি লক্ষ্য করবেন তোমরা কি কর।’

এদিকে মূসারা চলে গেলে কিবতী সম্প্রদায়ের প্রধানগণ ফেরাউনকে বললেন, ‘আপনি কি মূসা ও তার দলবলকে রাজ্যে অনাসৃষ্টি করতে দেবেন, না আপনাকে ও আপনার দেবতাদেরকে বর্জন করতে দেবেন?’
ফেরাউন বললেন, “তাদের চেয়ে আমাদের জোর অনেক বেশী, আমরা ওদের পুরুষদেরকে হত্যা করব আর ওদের মহিলাদেরকে বাঁচিয়ে রাখব।” -তিনি তার দরবারে এক অনির্ধারিত বৈঠক আহবান করলেন।

মূসার বিজয়ের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি পর্যালোচনা  এবং তার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া প্রশমনের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনার জন্যে ফেরাউনের আহবায়িত বৈঠকে তিনি পরিষদবর্গকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আমাকে অনুমতি দাও, আমি মূসাকে খুন করি, আর তখন সে তার প্রতিপালকের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করুক। দেখি তার প্রতিপালক তাকে কি করে রক্ষা করে। নইলে আমার আশঙ্কা সে তোমাদের ধর্মকে পাল্টে দেবে বা পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করবে।”-(৪০:২৫-২৬) ফেরাউন ইস্রায়েলী মহিলাদেরকে বাঁচিয়ে রেখে পুরুষদেরকে হত্যার করার ইতিপূর্বকার বক্তব্য এখন পুরোপুরি চেপে গেলেন। কারণ ইস্রায়েলীদের পুত্রসন্তান হত্যা করে কন্যাসন্তান জীবিত রাখার আদেশ এমনিতেই জারী রয়েছে। সুতরাং এখন তাদের পুরুষদেরকে হত্যা করতে গেলে রাজ্যে বিশৃংখলা সৃষ্টি হবে। তাছাড়া এমনিতেই তারা তার জন্যে এক অর্থকরী সম্পদ- বিনামূল্যের দাস। তার কাছে এখন এটা পারিস্কার যে, সমস্যা মূসার দলবল নয় বরং মূসা নিজে।

ফেরাউনের স্ত্রী বিবি আছিয়া কাছেই উপবিষ্ঠ ছিলেন। তিনি মূসার উপর ঈমান এনে ইতিমধ্যে মুমিনদের দলভূক্ত হয়েছিলেন। এখন মূসাকে হত্যার ফেরাউনের এই পরিকল্পনা শুনে তিনি বললেন, “তোমরা কি একজনকে এজন্যে হত্যা করবে যে, সে বলে, আমার পালনকর্তা আল্লাহ, অথচ সে তোমাদের পালনকর্তার কাছ থেকে স্পষ্ট প্রমানসহ তোমাদের কাছে আগমন করেছে? যদি সে মিথ্যেবাদীই হয়, তবে তার মিথ্যেবাদীতা তার উপরেই চাপবে, আর যদি সে সত্যবাদী হয়, তবে সে যে শাস্তির কথা বলেছে, তার কিছু না কিছু তোমাদের উপর পড়বেই। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারী মিথ্যেবাদী সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শণ করেন না। হে আমার সম্প্রদায়! আজ এ দেশে তোমাদেরই রাজত্ব, দেশময় তোমরাই বিচরণ করছ; কিন্তু আমাদের উপর আল্লাহর শাস্তি এসে গেলে কে আমাদেরকে রক্ষা করবে?”-(৪০:২৮-২৯)

বিবি আছিয়া, “হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের জন্যে পূর্ববর্তী সম্প্রদায় সমূহের মতই বিপদসঙ্কূল দিনের আশঙ্কা করি যেমন নূহের সম্প্রদায়, আদ, সামুদ ও তাদের পরবর্তীদের অবস্থা হয়েছিল। আল্লাহ বান্দাদের প্রতি কোন জুলুম করার ইচ্ছে করেন না। হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের জন্যে প্রচন্ড হাঁক-ডাকের দিনের আশঙ্কা করি, যেদিন তোমরা পিছন ফিরে পলায়ন করবে; কিন্তু আল্লাহ থেকে তোমাদের রক্ষাকারী কেউ থাকবে না। আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তার কোন পথপ্রদর্শক নেই। ইতিপূর্বে ইউসূফ তোমাদের কাছে সুষ্পষ্ট প্রমাণাদিসহ এসেছিল, অতঃপর তোমরা তার আনীত বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করতে। অবশেষে যখন সে মারা গেল, তখন তোমরা বলতে শুরু করলে, আল্লাহ ইউসূফের পর আর কাউকে রসূল করে পাঠাবেন না। এমনিভাবে আল্লাহ সীমালঙ্ঘণকারী, সংশয়ী ব্যক্তিকে পথভ্রষ্ট করেন। যারা নিজেদের কাছে আগত কোন দলীল ছাড়াই আল্লাহর আয়াত সম্পর্কে বিতর্ক করে, তাদের এই কাজ আল্লাহ ও মুমিনদের কাছে খুবই অসন্তোষজনক। এমনিভাবে আল্লাহ প্রত্যেক অহঙ্কারী- স্বৈরাচারী ব্যক্তির অন্তরে মোহর এঁটে দেন।’-(৪০:৩০-৩৫)

ফেরাউন তার সম্প্রদায়কে বললেন, “আমি যা বুঝি তোমাদেরকে তাই বোঝাই, আর আমি তোমাদেরকে মঙ্গলের পথই দেখাই।”

বিবি আছিয়া বললেল, ‘হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আমার অনুসরণ কর। আমি তোমাদেরকে সৎপথ প্রদর্শণ করব। হে আমার সম্প্রদায়, পার্থিব এ জীবন তো কেবল উপভোগের বস্তু, আর পরকাল হচ্ছে স্থায়ী বসবাসের গৃহ। যে মন্দ কর্ম করে সে কেবল তার অনুরূপ প্রতিফল পাবে, আর যে পুরুষ অথবা নারী মুমিন অবস্থায় সৎকর্ম করে, তারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে। তথায় তাদেরকে বেহিসাব রিজিক দেয়া হবে।’-(৪০:৩৮-৪০)

কিবতী সম্প্রদায়ের প্রধানগণ বললেন, “ফেরাউনই আমাদের রব। আমরা তাকেই মানি। আর আপনাকেও তার দিকে এবং আমাদের সমাজে ফিরে আসতে হবে।”
বিবি আছিয়া বললেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়, ব্যাপার কি, আমি তোমাদেরকে ডাক দেই মুক্তির দিকে, আর তোমরা আমাকে দাওয়াত দাও জাহান্নামের দিকে! তোমরা আমাকে দাওয়াত দাও, যাতে আমি আল্লাহকে অস্বীকার করি এবং তাঁর সাথে শরীক করি এমন বস্তুকে, যার কোন প্রমাণ আমার কাছে নেই। আমি তোমাদেরকে দাওয়াত দেই পরাক্রমশালী, ক্ষমতাশীল আল্লাহর দিকে। এতে সন্দেহ নেই যে, তোমরা আমাকে যার দিকে দাওয়াত দাও, ইহকালে ও পরকালে তার কোন দাওয়াত নেই। আমাদের প্রত্যাবর্তণ আল্লাহর দিকে এবং সীমালঙ্ঘনকারীরাই জাহান্নামী। আমি তোমাদেরকে যা বলছি, তোমরা একদিন তা স্মরণ করবে। আমি আমার ব্যাপার আল্লাহর কাছে সমর্পণ করছি। নিশ্চয় বান্দারা আল্লাহর দৃষ্টিতে রয়েছে।”-(৪০:৪১-৪৪)

ফেরাউন বললেন, “হে আমার সম্প্রদায়! মিসর রাজ্য কি আমার নয়? এই নদীগুলো যে আমার পায়ের নীচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে, তোমরা কি তা দেখছ না? এই হতচ্ছড়া মূসা, যে কিনা পরিস্কার করে কথা বলতে পারে না, তার চেয়ে কি আমি ভাল নই? সে নবী হলে কেন তাকে স্বর্ণবালা দেয়া হল না, কেনই বা ফেরেস্তা তার সঙ্গে আসে না?” এভাবে ফেরাউন তার সম্প্রদায়কে বোকা বানালেন। ওরা তার কথা মেনে নিল। ওরা তো ছিল এক সত্যত্যাগী সম্প্রদায়। -(৪৩:৫১-৫৪)

বিবি আছিয়া বললেন, ‘হে আমার পালনকর্তা! আপনার সন্নিকটে জান্নাতে আমার জন্যে একটা গৃহ নির্মাণ করুন, আমাকে ফেরাউন ও তার দুস্কর্ম থেকে উদ্ধার করুন এবং আমাকে জালেম সম্প্রদায় থেকে মুক্তি দিন।’-(৬৬:১১)
ফেরাউন বললেন, ‘হে হামান, তুমি আমার জন্যে ইট পোড়াও আর এক মস্ত উঁচু প্রাসাদ বানাও যেন সেখান থেকে আমি মূসার উপাস্যকে উঁকি মেরে দেখতে পাই। তবে, আমি তো মনেকরি সে মিথ্যে বলছে।’-(৪০:৩৬-৩৭)

ফেরাউন বিবি আছিয়াকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তা পরে তিনি আর কার্যকরী করতে পারেননি।

ফেরাউন এবং তার উপদেষ্টা হামান কঠোরভাবে মূসার সাথে ইস্রায়েলীদের যেতে দেবার দাবী প্রত্যাখ্যান করলেন এবং কর্মধাক্ষ্যদের নির্দেশ দিলেন, ‘তোমরা তাদের উপর আরও ভারী কাজ চাপিয়ে দাও, যাতে তারা মিথ্যে কথায় কান না দিয়ে কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে।’

এই নির্দেশের পর কর্মধাক্ষ্যরা হিব্রুদের নির্দেশ দিলেন- ‘তোমরা শুধু বেশী পরিমানে ইটই তৈরী করবে না, উপরন্তু ইট তৈরী করতে এতদিন যে খড় দেয়া হত, এখন থেকে তা তোমাদের নিজেদেরই সংগ্রহ করতে হবে।’
তখন তারা ফেরাউনের কাছে অভিযোগ করে বললেন, ‘কোন খড়কুটো আমাদেরকে দেয়া হচ্ছে না, অথচ আরো বেশী করে ইট তৈরী করতে বলা হচ্ছে।’
ফেরাউন বললেন, ‘তোমরা আসলে অলস, খুব কুঁড়ে। যাও, যাও, কাজ কর গিয়ে।’

হিব্রু পরিচালকরা বুঝলেন তারা বিপদে পড়েছেন। সুতরাং তারা মূসা ও হারুণকে ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, ‘আমাদের এই অবস্থার জন্যে তোমরাই দায়ী। তোমরাই আমাদেরকে ফেরাউন ও তার কর্মচারীদের কাছে একটা দুর্গন্ধের মত করে তুলেছ। তাইতো তারা আমাদের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে, আমাদের প্রতি অতিমাত্রায় কঠোর হয়েছে।’

এই পরিস্থিতিতে মূসা বা হারুণ লোকদেরকে কোন আশার বাণী শোনাতে পারলেন না। সুতরাং ইস্রায়েলীরা বুঝে নিল কোন উপায় নেই। কাজেই অত্যাচারের ভয়ে খড়ের বদলে নাড়া সংগ্রহ করতে তারা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। তাদের এই দুরাবস্থা দেখে মূসা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন, “হে আমাদের প্রতিপালক! ওদের ধন-সম্পদ নষ্ট করে দাও, ওদের হৃদয়ে মোহর করে দাও, ওরা তো কঠিন শাস্তি না দেখা পর্যন্ত বিশ্বাস করবে না।’
তিনি বললেন, ‘তোমাদের দু’জনের প্রার্থনা গ্রহণ করা হল, সুতরাং তোমরা শক্ত হও, আর যারা জানে না তোমরা কখনও তাদের পথ অনুসরণ করবে না।’-(১০:৮৯)

সর্বশেষ আয়াতে আল্লাহ মূসা ও হারুণকে তাদের দোয়া কবুলের সুসংবাদের পাশাপাশি এ বিষয়েও সতর্ক করেছেন যে, তারা যেন নিজেদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের কাজে নিয়োজিত থাকেন এবং দোয়া কবুল হওয়ার প্রতিক্রিয়া যদি দেরীতেও প্রকাশ পায়, তবুও যেন জাহেলদের মত তাড়াহুড়ো না করেন। প্রায় চল্লিশ বৎসর পর এই দোয়া কবুলের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পেয়েছিল।

ইস্রায়েলীদের উপর কঠিন পরিশ্রম চাপিয়ে ফেরাউনের উপদেষ্টা হামন তাদেরকে দিয়ে প্রচুর ইট তৈরী করিয়েছিলেন। সাথে সাথে তিনি ফেরাউনের কাঙ্খিত সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণের জন্যে পঞ্চাশ হাজার রাজমিস্ত্রি জোগাড় করেছিলেন। মুজুর, কাঠ ও লোহার কাজ যারা করেছিল তাদের সংখ্যা ছিল এর অতিরিক্ত। প্রাসাদটি এত উচ্চ নির্মিত হয়েছিল যে ঐ যুগে সারা বিশ্বে এরকম আর দ্বিতীয়টি ছিল না। ফেরাউন নীলনদে ডুবে মরার পর এই প্রাসাদ ভূমিকম্পে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল।-..আর ধ্বংস করে দিয়েছি সেসব কিছু যা তৈরী করেছিল ফেরাউন ও তার সম্প্রদায় এবং ধ্বংস করেছি যা কিছু তারা সুউচ্চ নির্মাণ করেছিল।-(৭:১৩৭)

এদিকে ইস্রায়েলীদের নিয়ে মিসর ত্যাগের জন্যে ফেরাউনের সম্মতি আদায়ে মূসার সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবার পর আল্লাহ মিসরীয়দের উপর ফেরাউনের এই প্রতিরোধ ভাঙ্গার জন্যে চল্লিশ বৎসর ধরে একে একে অনেকগুলি আঘাত হানেন। এসব আঘাত হানার পূর্বে তিনি প্রতিবারই মূসা ও হারুণকে ফেরাউনের কাছে পাঠিয়েছিলেন তার সম্মতি আদায়ের জন্যে। প্রত্যেকটি আঘাত আসার পরে ফেরাউন হিব্রুদের যাবার অনুমতি দেন, কিন্তু মূসা যখনই আল্লাহর অনুমতিতে সেই আঘাত নিবারণ করেন, তখনই তিনি তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন, যতক্ষণ না আরও কঠিন আঘাত হানা হয়।

বন্যার প্রথম আঘাতে মিসরীয়দের অনাহারের কষ্টের পর, খোদার করুণায় কয়েক বৎসর ধরে দেশে প্রচুর ফসল উৎপন্ন হয়। তাতে হঠাৎ করে তাদের গৃহে প্রাচুর্য ফিরে আসে। তখন তারা ভেবে নেয় তা দেবতাদের কৃপা। সুতরাং তাদেরকে খুশী করতে ফেরাউনের কর্মচারীরা সর্বত্র এই ঘোষণা দিল- ‘তোমরা সাড়ম্বরে নিজ নিজ দেবতার পূজা কর।’ তাতে দেশের সর্বত্র পূজার আয়োজন শুরু হল।

তৎকালীন সময়ে মিসরে বিভিন্ন দেবদেবীর উপাসনা করা হত। কিছু দেবতা বিশেষ এলাকা ও বিশেষ সম্প্রদায়ের জন্যে এবং কিছু সর্বসাধারণের জন্যে নির্ধারিত ছিল। তাদের উপাস্য দেবতাসমূহের ক্ষমতাও সীমাবদ্ধ বলে বিশ্বাস করা হত। যেমন- পরকালীন বিষয় ও নভ:মন্ডল সম্পর্কিত দেবতা, দেহস্রষ্টা দেবতা, দেহে প্রাণদানকারী দেবতা, আয়ূ নির্ধারণকারী দেবতা, দু:খ-যাতনা দূরকারী দেবতা, জীবিকাদাতা দেবতা প্রভৃতি। আর সূর্যদেব ছিল উপাস্য দেবতা সমূহের শীর্ষে।

মিসরীয়দের এই বিশ্বাস ছিল যে, মানুষ ও অন্যান্য সৃষ্টির লালন-পালনের দায়িত্ব সূর্য্য দেবতার। আর সিংহাসনের অধিকারী ব্যক্তি এই দেবতারই প্রতিচ্ছবি। তাই সমগ্র জগতের প্রতিপালনের ভার ও অধিকার মিসরাধিপতির। এই কারণেই সিংহাসনে অধিষ্ঠিতদের উপাধি হত ‘ফারাও’ যা পরির্তিত হয়ে হয়েছিল ফেরাউন।

সর্বত্র সাড়ম্বরে পূজার আয়োজন চলছে। সকলে নিজ নিজ দেবতার পূজা নিয়ে ব্যস্ত। থেবসের মন্দিরটিও এই উপলক্ষ্যে সাজানো হয়। কেননা এটি দেশের প্রধান ধর্মমন্দির। দু‘পাশে সারি সারি স্ফিংসের মূর্ত্তির মাঝখানে তৈরী পথ এই মন্দিরের প্রবেশ দ্বারে গিয়ে ঠেকেছে। মন্দিরের সামনে ফেরাউনের মূর্ত্তি রাখা, তার উচ্চতা ও পরিসর মানুষের আকারের চেয়ে ৫-৬ গুণ বড়। মন্দিরের চত্বরে প্রবেশের জন্যে দু‘টি মিনারের মাঝখানে সংকীর্ণ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে হয়।

চত্বরের শেষভাগে রয়েছে একটি প্রায়ান্ধকার বিশাল হলঘর। বহু সংখ্যক স্তম্ভ ধরে রয়েছে ঐ কক্ষের ছাদ। এই সব স্তম্ভের কোনটা প্যাপিরাসের গুড়ির মত, কোনটা তাল গাছের গুড়ির মত, আবার কোনটা দেখলে মনে হবে যেন বৃক্ষকান্ডের উপরিভাগে যেন ফুলের কুঁড়ি ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে। প্রতিটি স্তম্ভের উচ্চতা ২৩ মিটার। ছাদে গাঢ় নীল রঙের পেক্ষাপটে সোনালী রঙের তারকারাজী অঙ্কিত। আর মিনারে, দেয়ালে এবং স্তম্ভে ফেরাউন এবং বিভিন্ন পশুমস্তক সম্বলিত বিভিন্ন দেবতার বিরাটাকার মূর্ত্তি খোঁদাই করা ছিল।

মূসা মিসরীয়দের কার্যকলাপ লক্ষ্য করে আল্লাহর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘হে আল্লাহ! এই নির্বোধেরা তো তোমার করুণা ও রহমতের শোকর আদায় করছে ঐ মূর্ত্তিগুলোর কাছে। এরা তো তোমার শাস্তি থেকে বিন্দুমাত্র শিক্ষা গ্রহণ করেনি!

অত:পর ফেরাউন ও তার সমর্থকদের উপর আল্লাহ ২য় আঘাত হানেন পঙ্গপালের আক্রমণ দিয়ে যেন তারা বুঝতে পারে- আর যেন তারা ঠিকপথে ফিরে আসে। কিন্তু তারা ছিল অবিশ্বাসী আর অপরাধী সম্প্রদায়। তাই এক নির্দিষ্ট কালের জন্যে হানা আঘাতে প্রতিবারই তারা জর্জরিত হয়েছে অন্যদিকে ইস্রায়েলীরা বিপদমুক্ত থেকেছে- এ দেখেও তারা কিছুই বুঝতে চেষ্টা করেনি বরং তাদের হামবড়া ভাব থেকে গেল। ফলে তারা একের পর এক আঘাতের শিকার হয়, যার প্রত্যেকটি পূর্বের তুলনায় জোরালো ছিল।

মিসরীয়দের উপর নেমে আসা এ সকল আঘাত এবং ফেরাউন ও তার সমর্থকদের প্রতিক্রিয়ায় কোরআন -আমি তো ফেরাউন-সমর্থকদেরকে দুর্ভিক্ষ ও খাদ্যাভাব দিয়ে আঘাত করেছি যেন তারা বুঝতে পারে। যখন তাদের কোন ভাল হত তারা বলত, ‘এ তো আমাদের প্রাপ্য।’ আর যখন কোন খারাপ হত তখন তারা তা মূসা ও তার সঙ্গীদের উপর চাপাত। তাদের ভাল-মন্দ আল্লাহর হাতে কিন্তু তাদের অনেকেরই তা জানা নেই। তারা বলত, ‘আমাদের যাদু করার জন্যে যে কোন নিদর্শণ তুমি আমাদের কাছে হাযির কর না কেন, আমরা তোমাকে বিশ্বাস করব না।’

তারপর আমি তাদেরকে বন্যা, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ, ও রক্ত দিয়ে কষ্ট দেই। এগুলো পরিস্কার নিদর্শণ, কিন্তু তাদের হামবড়া ভাব রয়ে গেল। আর তারা তো ছিল এক অপরাধী সম্প্রদায়। আমি ওদেরকে যে নিদর্শণ দেখিয়েছি তার প্রত্যেকটি পূর্বের নিদর্শণের তুলনায় উৎকৃষ্ট ছিল। আমি ওদেরকে শাস্তি দিয়েছিলাম যেন ওরা (ঠিক পথে) ফিরে আসে।-(৪৩:৪৮)

আর যখন তাদের উপর শাস্তি আসত তখন তারা বলত, ‘হে মূসা! তুমি তোমার প্রতিপালকের কাছে আমাদের জন্যে প্রার্থনা কর। তোমার সঙ্গে যে কথা আছে সেভাবে যদি তুমি আমাদের শাস্তি দূর কর, আমরা তো তোমার উপর বিশ্বাস করবই, আর বনি-ইস্রাইলীদেরকেও তোমার সাথে যেতে দেব।’

যখনই তাদের উপর সেই শাস্তি, যা নির্ধারিত ছিল নির্দিষ্টকালের জন্যে- দূর করা হত, তখনই তারা তাদের কথার খেলাপ করত। সেজন্যে আমি তাদের উপর প্রতিশোধ নিয়েছি। আর যে সম্প্রদায়কে দুর্বল মনে করা হত তাদেরকে আমি আমার আশীর্বাদপুষ্ট রাজ্যের (প্যালেস্টাইনের) পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের (জর্দান নদীর) উত্তরাধিকারী করেছি।-(৭:১৩০-১৩৭)

ইব্রাহিম তার প্রতি খোদার ভালবাসার প্রতিদানে খোদাকে তার প্রথমজাত সন্তান ইসমাইলকে দিয়ে দেন। খোদা ঐ দান প্রহণ করেও করুণাবশত: তা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু খোদাকে অবিশ্বাস এবং তাঁর করুণা অস্বীকার করে ফেরাউন স্বেচ্ছাচারিতা করে যাচ্ছিলেন ইব্রীয় সকল পুত্রসন্তানদেরকে হত্যার মধ্য দিয়ে। সুতরাং খোদা এখন তাঁর করুণা তুলে নিলেন অবিশ্বাসী মিসরীয় সম্প্রদায়ের উপর থেকে। ফলে তাদের সকল প্রথমজাত [মানব ও পশু] সন্তান ফিরে গেল খোদার কাছে।

রাতের প্রথমভাগে এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটায় প্রতিটি মিসরীয়র গৃহে এমনকি ফেরাউনের রাজপ্রাসাদেও কান্নার রোল পড়ে গেল। এই ঘটনায় দেশের প্রতিটি গৃহে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। জীবিতরা মনে করল তারাও হয়তোবা মারা পড়বে। আর তাই ইস্রায়েলীদেরকে দেশ ছেড়ে যেতে অনুমতি দেয়া হল। ঐ রাতেই মূসা ও হারুণকে প্রাসাদে ডেকে এনে ফেরাউন বলেছিলেন, ‘তোমরা আমার মন পরিবর্তনের আগে ইস্রায়েলীদের নিয়ে আমার লোকদের মধ্যে থেকে বের হয়ে যাও। আর আমাদের জন্যে প্রার্থনা কোরও।’

মূসাকে খোদা আগেই ফেরাউন অনুমতির বিষয়টি জানিয়ে নিস্তারপর্ব পালনের আদেশ দিয়েছিলেন। অত:পর দেশ ছেড়ে যাবার অনুমতি পাওয়ার পর, মূসার প্রতি আল্লাহর নির্দেশ এল, ‘আমার দাসদের নিয়ে এই রাতেই বেরিয়ে পড়, আর ওদের জন্যে সাগরের মাঝখানে কোন শুকনো পথ অবলম্বণ কোরও। ভয় পেয় না যে, কেউ পিছন থেকে এসে তোমাকে ধরে ফেলবে, ঘাবড়ে যেও না।’ -(২০:৭৭)

এই নির্দেশের পর মূসা রাতেই ইস্রায়েলীদের সংগঠিত করে যাত্রার প্রস্তুতি শুরু করলেন। মুক্তির আনন্দে এসময় ইস্রায়েলীরা ছিল উত্তেজিত, উৎকন্ঠিত। তারা তাড়াহুড়ো করে নিস্তার পর্বের ভোজ খেল। তাদের পরনের কাপড় ছিল কোমরে গুটান, পায়ে ছিল জুতা এবং হাতে লাঠি।

প্রথমেই মূসা কফিনে রক্ষিত ইউসূফের লাশের সন্ধান করলেন। মিসর থেকে চলে যাবার সময় হযরত ইউসূফ তার লাশ সঙ্গে নিয়ে যেতে ইস্রায়েলীদের কাছ থেকে ওয়াদা করিয়ে নিয়েছিলেন। আর মূসা একজন নবী ও রসূল। সুতরাং তিনি পূর্ববর্তী নবীদের বৃত্তান্ত এবং তার উপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পর্কে সম্যক সচেতন ছিলেন।

মূসা বৃদ্ধ নেতাদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনাদের মধ্যে কে ইউসূফের লাশের সন্ধান দিতে পারেন?’
কেউই পুর্ণাঙ্গ কোন তথ্য দিতে পারল না। এসময় এক বৃদ্ধা বলল, ‘আমি সন্ধান দিতে পারি।’
মূসা- ‘তবে শীঘ্রই আমাকে সেখানে নিয়ে চল।’
বৃদ্ধা- ‘আমার সম্পর্কে কোন সিদ্ধান্ত না দেয়া পর্যন্ত আমি তা করতে পারি না।’
মূসা- ‘তোমার সম্পর্কে আবার সিদ্ধান্ত কিসের?’
বৃদ্ধা- ‘আমাকে না নিয়ে তুমি বেহেস্তে যাবে না এই ওয়াদা।’

তার এই হটকারী দাবী শুনে মূসা নির্বাক হয়ে গেলেন। এসময় জিব্রাইল এসে বলল, ‘এই বৃদ্ধার আল্লাহর প্রতি, পূর্ববর্তী পয়গম্বর সমূহের প্রতি, আখেরাতের প্রতি ও তোমার প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে। সর্বোপরি সেই একমাত্র মহিলা যে ইউসূফের লাশের সন্ধান রেখেছে। সুতরাং তার মর্যাদা আল্লাহর কাছে কম নয়।’

সুতরাং মূসা বৃদ্ধাকে বললেন, ‘কে বেহেস্ত লাভ করবে এবং কে করবে না এর ফয়সালা একমাত্র আল্লাহর হাতে। তবে আমি বলছি- সেই সৌভাগ্যবানদের তালিকায় আমার নাম থাকলে, সেখানে তোমার নামও থাকবে।’
বৃদ্ধা বললেন, ‘সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর। এখন আমার সঙ্গে এস।’

ইউসূফের লাশের সিন্দুকটি মাতৃভূমিতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার লক্ষ্যে যত্ন সহকারে রক্ষিত হয়েছিল। কিন্তু যুগের পর যুগ অতিক্রম হওয়াতে এবং এর রক্ষণাবেক্ষণকারীদের মৃত্যুতে ইস্রায়েলীরা এই সিন্দুক সম্পর্কে একসময় সম্পূর্ণ অজ্ঞ হয়ে পড়েছিল।

বৃদ্ধা মূসাকে সঙ্গে নিয়ে একটি ক্ষুদ্র জলাশয়ের কাছে এসে থেমে পড়লেন। অতঃপর অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললেন, ‘এই জলাশয়ের পানি সেচন করে মাটি খুঁড়লেই ইউসূফের লাশের সিন্দুক পাওয়া যাবে।’

মূসার নির্দেশে লোকেরা পানি সেচনের কাজে লেগে গেল এবং একসময় তারা মাটির নীচ থেকে সিন্দুকটা তুলে নিয়ে এল।

ইস্রায়েলী নারীদের অধিকাংশ মূসার উপর কখনও পরিপূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করেনি। তারা পরিবারের সঙ্গে দেশত্যাগে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল বটে, কিন্তু কখনও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে চায়নি যে, তাদের এই যাত্রা স্থায়ী। এ কারণে তারা চলে যাবার সময় মিসরীয়দেরকে তাদের নিজস্ব বিশ্বাস দ্বারা সহজে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছিল এবং বোঝাতে পেরেছিল যে, তারা স্থায়ীভাবে দেশত্যাগ করছে না, তারা কেবলমাত্র একটা ধর্মীয় উৎসব পালন করতে যাচ্ছে এবং শীঘ্রই ফিরে আসবে। আর তারা তাদের কাছ থেকে স্বর্ণালংকার ও অন্যান্য উপহার চেয়ে নিয়েছিল এই শর্তে যে, ফিরে এসে সেগুলি ফেরৎ দেবে।

সকলের মধ্যে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। কেননা তারা উপলব্ধি করছিল তাদের মহা পরিবর্তনের সুযোগ এখন এসেছে। তাদের কায়মনোবাক্যে আল্লাহর কাছে নিবেদন করা প্রার্থনার উত্তর এতদিনে এসেছে, দীর্ঘ চার‘শ ত্রিশ বৎসরের বন্দীত্বের দিন আজ শেষ হয়েছে। তারা এখন স্বাধীন এবং ‘প্রতিজ্ঞাত দেশের’ পথে।

যাত্রার জন্যে প্রস্তুত ইস্রায়েলীরা মহিলা ও শিশুসহ ছিল কয়েক লক্ষ। মূসা এই বিরাট দলকে তাদের সহায় সম্পদ নিয়ে দ্রুত যাত্রার জন্যে সংগঠিত করেছিলেন। তারপর তিনি সকলকে নিয়ে রাতের মধ্যভাগেই বেরিয়ে মরু এলাকার মধ্যে দিয়ে লোহিত সাগরের দিকে এগিয়ে চললেন।

ফেরাউন ইস্রায়েলীদের চলে যাবার অনুমতি দিলেও পরদিন সকালে তিনি তার ভুল বুঝতে পারলেন, যখন কর্মচারীরা এসে তাকে জানাল, ‘হে  ফেরাউন, সকল বনি ইস্রায়েলীরা মূসার নেতৃত্বে রাতে মিসর ত্যাগ করেছে।’
তখনি ফেরাউন মনে মনে অাক্ষেপ করলেন, ‘এ আমি কি করলাম? আমি যে আমার সব দাস হারালাম!’ তিনি তৎক্ষণাৎ বনি ইস্রায়েলীদের পশ্চাৎধাবণের সিদ্ধান্ত নিলেন এবং অতঃপর প্রতিটি এলাকা থেকে সৈন্য সংগ্রহ করতে শহরময় ঘোষণাকারী পাঠিয়ে দিলেন।

ঐ সকালেই শহরে শহরে ফেরাউনের পক্ষ থেকে এই ঘোষণা দেয়া হল- ‘বনি ইস্রায়েলীদেরকে অবশ্যই ধরে আনতে হবে। এভাবে তাদেরকে দেশ ত্যাগের সুযোগ দেয়া হবে না। তারা আমাদেরকে কষ্ট দিয়েছে, আর আমাদেরকে রাগান্বিত করেছে। তাছাড়া তাদেরকে ধরা খুব একটা কঠিনও না।-‘বনি ইস্রায়েলী তো একটা ক্ষুদে দল আর দেখ তারা আমাদের উত্যক্ত করে আসছে। অথচ আমরা সংখ্যায় অনেক বেশী, আর যথেষ্ট হুসিয়ার।’-(২৬:৫৩-৫৬)

ইস্রায়েলীরা দেশ ত্যাগ করেছে জানতে পেরে মিসরীয়রাও ক্ষুব্ধ হল। কেননা, তারা তাদের অলঙ্কার চেয়ে নিয়েছিল ফিরিয়ে দেবার নামে। আর তাই তারা অতি অল্পসময়ে অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জ্বিত হয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিল।

এভাবে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ফেরাউন তার সৈন্যবাহিনী ও রথ যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত করলেন। আর পরের দিন সকালে ৭০ হাজার অশ্বারোহীসহ প্রায় সাত লক্ষ সেনা নিয়ে ইস্রায়েলীদের পিছু নিলেন। আর তারা সূর্যোদয়ের সময় তাদের পশ্চাৎধাবন করল।-(২৬:৬০) এভাবে খোদা ফেরাউনের দলকে তাদের বাগ-বাগিচা ও ঝরণাসমূহ থেকে বহি:স্কার করলেন এবং [বহি:স্কার করলেন] ধন-ভান্ডার ও মনোরম স্থানসমূহ থেকে।-(২৬:৫৭-৫৮) তারা যাচ্ছে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে, কিন্তু তারা তা জানে না।তারা পিছনে ফেলে গেল কত উদ্যান ও প্রস্রবণ, কত শস্যক্ষেত্র ও সুরম্যস্থান, কত সুখের উপকরণ, যাতে তারা খোশগল্প করত। এমনিই হয়েছিল।-(৪৪:২৫-২৮)

মিসর থেকে কনানে যাবার পথ ছিল ভূমধ্যসাগরের তীর দিয়ে উত্তর পূর্বদিকে। এই পরিচিত পথ সাধারণতঃ ভ্রমনকারীরা ব্যাবহার করত। মূসা এ পথে গেলেন না, কেননা এ পথ সরাসরি তাদেরকে অমালেকীয়দের দেশে নিয়ে যেত। যারা একটি অসভ্য, মূর্ত্তিপূজক, ভয়ঙ্কর, হিংস্র ও যুদ্ধপ্রিয় উপজাতি ছিল। আর ফেরাউনের পশ্চাৎধাবণের কথা তিনি জানতেন। সম্মুখে অমালেকীয় এবং পশ্চাতে ফেরাউনের বাহিনীর আক্রমণ, অনভিজ্ঞ ইস্রায়েলীদেরকে পরিবারসহ যমের দূয়ারে পৌঁছে দিত। তদুপরি খোদার কোন পরিকল্পণা থাকবে যা তার জানা নেই। সুতরাং মূসা বিনাবাক্যব্যয়ে খোদা নির্দেশিত পথ অনুসরণ করলেন।

৩য় দিনের যাত্রা শেষে ইস্রায়েলীরা যখন সাগরের মোহনায় এসে পৌঁছিল তখন প্রায় সন্ধ্যা। আর তখনই দু’দল পরষ্পরকে দেখতে পেল। ইস্রায়েলীরা দেখল তারা ফাঁদে আটকা পড়েছে। তাদের দু’দিকে সমুদ্র, একদিকে পর্বত এবং পিছনে ফেরাউনের সৈন্য। মূসার অনুগত সঙ্গীরা আৎকে বলে উঠল, ‘আমরা তো ধরা পড়ে গেলাম।’
মূসা বললেন, ‘কিছুতেই না, আমার সঙ্গে আছেন আমার প্রতিপালক, তিনিই আমাদেরকে পথ দেখাবেন।’-(২৬:৬০-৬২)

এই অবস্থায় নিশ্চিত মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে ইস্রায়েলীরা রেগে গিয়ে বলল, ‘ও মূসা, মিসরে কি কবর দেবার জায়গা ছিল না যে তুমি এই মরুএলাকায় আমাদের মারতে নিয়ে এসেছ?’
অন্যেরা বলল, ‘হে মূসা! এই মরুভূমিতে মরার চেয়ে মিসরীয়দের গোলামী করা কি আমাদের পক্ষে ভাল ছিল না?’

ইস্রায়েলীদের কিছু মূসাকে হত্যা করতে চাইল, অন্যেরা মিসরে ফিরে যাবার জন্য প্রস্তুত হল। এই পরিস্থিতিতে মূসা অসীম ধৈর্য্য সহকারে খোদার নির্দেশের অপেক্ষা করতে লাগলেন। অতঃপর আমি মূসাকে আদেশ করলাম, ‘তোমার লাঠি দ্বারা সমুদ্রকে আঘাত কর।’ ফলে, তা বিদীর্ণ হয়ে গেল এবং প্রত্যেক ভাগ বিশাল পর্বতসদৃশ হয়ে গেল। আমি সেথায় অপরদলকে পৌঁছিয়ে দিলাম।-(২৬: ৬৩-৬৪)

এদিকে ফেরাউন তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে সাগরতীরে পৌঁছে দেখলেন সাগরের পানি দু’ভাগ হয়ে দু‘দিকে পর্বত সদৃশ হয়ে মাঝ দিয়ে একটি পথ তৈরী করেছে, আর ইস্রায়েলীরা সেই পথে হেঁটে সমুদ্র পার হচ্ছে।

ফেরাউনের সৈন্যবাহিনী থেমে গিয়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে এই অদ্ভূত দৃশ্য দেখছিল। ফেরাউন সগর্বে তাদেরকে বললেন, ‘এসব আমার প্রতাপেরই লীলা।’
আক্রোশ বশত: তিনি তৎক্ষণাৎ নিজের রথ সমুদ্রের পথে চালিয়ে দিলেন এবং সেনাবাহিনীও তাকে অনুসরণ করল। কিন্তু তারা ইস্রায়েলীদের নাগাল পেল না। সমুদ্রে প্রবেশ করতেই সাগরের পানি দু’দিক থেকে এসে তাদেরকে ঢেকে ফেলল।-(২০:৭৮) তাদের জন্যে ক্রন্দন করেনি আকাশ ও পৃথিবী এবং তারা অবকাশও পায়নি।-(৪০:২৯)

এদিকে ফেরাউন যখন ডুবে যেতে লাগলেন তখন তিনি ভীত হয়ে আল্লাহর প্রতি ঈমান এনে বললেন, ‘আমি ঈমান আনলাম, আর কোন মাবুদ নেই সেই আল্লাহ ছাড়া- যার উপরে বনি ইস্রায়েলী বিশ্বাসী -আমিও তাদের শামিল- যারা তাঁর প্রতি আত্মসমর্পণকারী।’-(১০:৯০)

আল্লাহ বান্দার তওবা ততক্ষণ পর্যন্তই কবুল করে থাকেন যতক্ষণ না মৃত্যুর উর্দ্ধশ্বাস আরম্ভ হয়ে যায়। অর্থাৎ প্রাণ হরণের নিমিত্তে ফেরেস্তা সম্মুখে এসে উপস্থিত হয়। এসময়টি ঐ বান্দার জন্যে আখেরাতের হুকুম-আহকাম শুরু হবার মূহূর্ত। কাজেই সে সময়কার কোন আমল (ঈমান বা কূফর) গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে তা গ্রহণ করা হয়নি, কেননা কোরআনে বলা হয়েছে- ‘কেয়ামতের দিন (সে ফেরাউন) তার লোকজনের পুরোভাগে থেকে অগ্রসর হবে এবং দোজখে যাবার কালে তাদের নেতৃত্ব দেবে।’-(১১:৯৮) আর তাই আল্লাহ তাকে অগ্রাহ্য করে বললেন, ‘এখন এ কথা বলছ! অথচ তুমি ইতিপূর্বে নাফরমানী করছিলে এবং পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভূক্ত ছিলে। অতএব এখন আমি তোমাকে টিকিয়ে রাখব তোমার লাশের মাধ্যমে, যেন তুমি নিদর্শণ হতে পার তাদের জন্যে-যারা তোমার পরে আসবে। তবে নিশ্চয়ই মানবজাতির অনেকেই আমার নিদর্শণাবলী সম্পর্কে গাফেল।’-(১০:৯১-৯২)

এভাবে ইস্রায়েলীরা নিরাপদে সমুদ্র পার হয়ে আরবভূমিতে প্রবেশে করল। আর তারা দাসত্ব ও মৃত্যুর থেকে মুক্তি পেল। তাদের অধিকাংশ সমস্ত ঘটনার জন্যে খোদার কাছে অন্তর ঢেলে কৃতজ্ঞতা জানাল। কিন্তু সাগর পার হবার পরও ইস্রায়েলীরদের একাংশের ফেরাউন ভীতি কমল না। তখন মূসা তাদেরকে জানালেন, ‘ফেরাউন পানিতে ডুবে মারা পড়েছে।’
তারা বলল, ‘আমরা স্বচক্ষে তার লাশ না দেখা পর্যন্ত তা বিশ্বাস করতে পারি না।’ তখন খোদা তার লাশকে পানির উপর ভাসিয়ে দিলেন এবং ঢেউ তা কূলে বয়ে নিয়ে এল। তখন ইস্রায়েলীরা স্বচক্ষে ফেরাউনের লাশ অবলোকন করল এবং তাদের ভীতি দূর হল।

ওদিকে ফেরাউনের লাশ তার কর্মচারীরা উদ্ধার করে নিয়ে গেল এবং তারা তাকে মমী করে রাখল মিসরের লাকসর এলাকা থেকে নীলনদের সরাসরি ওপারে, থেবসের নেক্রোপলিশ কবরখানায়- লোকচক্ষুর অন্তরালে। বর্তমানে মমীটি সংরক্ষিত রয়েছে মিসরের যাদুঘরে, রাজকীয় মমীর কামরায়। এভাবে খোদা হাজার হাজার বৎসর পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে ফেরাউনর লাশ প্রদর্শনীর জন্যে রাখলেন যেন তারা এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে পারে।

সাগর পার হয়ে আরবভূমিতে প্রবেশের সাথে সাথেই মিসর ত্যাগের মহাগুরুত্বপূর্ণ কাজটি শেষ হল। প্রকৃত পক্ষে তা ছিল জাতি হিসেবে হিব্রুদের আরম্ভের চিহ্ন। তারা এখন সীমিত লক্ষ্যের একটি ভ্রাতৃগোষ্ঠী নয়, বরং এখন একটি মানুষের মহাদল। খোদার বিশেষ কাজের জন্যে একটি নূতন জাতি।

মিসরে বসবাসকালে ইস্রায়েলীরা মিসরীয়দের সামাজিক, রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতির অনেক কিছুই শিখেছিল। ঐ উন্নত দেশে বসবাসের ফলে তারা অনেক বিষয়ে দক্ষ হয়ে উঠেছিল। একত্রে অত্যাচারিত হয়ে তারা দু:খ-কষ্ট ও পরিশ্রম ভাগাভাগি করে নিতে শিখেছিল। তদুপরি তারা ধর্মীয় সত্য জানতে পেরেছিল। মিসরীয়দের অগভীর ও অর্থহীন পশু ও দেবদেবী পূজার ধর্মের বিপরীতে, তাদের এক খোদাতে বিশ্বাসের শক্তি ও পরাক্রম কি, তা তারা পরিস্কার বুঝতে পেরেছিল।

ইস্রায়েলীরা যে পথ দিয়ে যাচ্ছে, তা কনানে যাবার সংক্ষিপ্ত পথ নয়। মূসা ইস্রায়েলীদেরকে জানিয়েছিলেন যে তাদেরকে তাঁহ প্রান্তরে সীনাইয়ের তূর পর্বতে যেতে হবে এবং সেখান থেকে উত্তর দিকে প্রতিজ্ঞাত দেশ কনানে।

যাত্রার এক পর্যায়ে তারা এমন একগোত্রের সংস্পর্শ্বে এল, যারা ছিল মূর্ত্তিপূজক। তারা তাদের দেবদেবীদের দেখতে পেল এবং তৎক্ষণাৎ মূর্ত্তিপূজার প্রতি আকৃষ্ট হল। তারা দেখল ঐসব লোক কি সুন্দর একটা দৃষ্টবস্তুকে সামনে রেখে এবাদত-বন্দেগী করে যাচ্ছে, অথচ খোদার কোন সত্ত্বা তাদের সামনে নেই।

আর আমি বনি-ইস্রায়েল সম্প্রদায়কে সাগর পার করিয়ে দেই। তারপর তারা এক জাতির সংস্পর্শে এল যারা মূর্ত্তিপূজা করত। তারা বলল, ‘হে মূসা! ওদের দেবতার মত আমাদের জন্যেও এক দেবতা গড়ে দাও।’
মূসা বললেন, ‘তোমরা তো এক আহম্মকের জাত। এসব কাজ, যা লোকে করছে, তা তো ধ্বংস করা হবে, আর তারা যা করছে তাও ভিত্তিহীন।’ -(৭:১৩৮-১৩৯)

কিন্তু লোকেরা বিষয়টি মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারল না। তারা ইনিয়ে বিনিয়ে বিষয়টি আবারো মূসার কাছে তুলে ধরল। তখন মূসা ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, ‘কি! আল্লাহকে ছেড়ে তোমাদের জন্যে আমি অন্য উপাস্য খুঁজে বেড়াব, যখন তিনি শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন তোমাদেরকে বিশ্বজগতের উপর?-(৭:১৪০) তারপর তিনি বুঝতে পারলেন এই আহম্মক জাতির উপর রাগ করে লাভ নেই তাদেরকে বোঝাতে হবে। সুতরাং তিনি সূর নরম করে বললেন, “ঐ সময়ের কথা স্মরণ কর, যখন ফেরাউনের লোকেরা তোমাদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তি দিত, তারা তোমাদের পুত্রসন্তানদেরকে হত্যা করত এবং বাঁচিয়ে রাখত কন্যাদেরকে। আর খোদা তাদের হাত থেকে তোমাদেরকে মুক্তি দিয়েছেন। এতে তোমাদের প্রতি তোমাদের পরওয়ারদেগারের বিরাট পরীক্ষা রয়েছে।”-(৭:১৪১)

এসময় মদিয়ান থেকে মূসার মূসার স্ত্রী-সন্তান ও শ্বশুর তার সঙ্গে দেখা করতে এলেন।  শ্বশুর শোয়েব লক্ষ্য করলেন তাঁবু ফেলে বিশ্রামকালে প্রতিদিন সকালে লোকেরা বিচারের জন্যে মূসার কাছে আসে আর তাদের অভিযোগ নিয়ে সন্ধ্যে পর্যন্ত তার চারধারে দাঁড়িয়ে থাকে। এ দেখে তিনি তাকে বললেন, ‘এভাবে চললে থাকলে তো তুমি ক্লান্ত হয়ে পড়বে।’
মূসা বললেন, ‘আল্লাহর ইচ্ছে জানার জন্যেই লোকেরা আমার কাছে আসে। আমি তাদের বিবাদ মীমাংসা করি এবং আল্লাহর বিধান ও নির্দেশ বুঝিয়ে দেই।’

তিনি বললেন- ‘তুমি বরং কিছুলোককে নেতা হিসেবে নির্বাচিত কর, যারা সৎ এবং দায়িত্বশীল। তারপর তাদেরকে বিধি ও ব্যবস্থার শিক্ষা দাও। অত:পর যোগ্যতা অনুযায়ী তাদেরকে সহস্রপতি, শতপতি, পঞ্চাশপতি, দশপতি নিযুক্ত কর। যারা দশপতি তারা ছোটখাট ব্যাপারগুলো দেখাশোনা করবে। আর সমস্যার গুরুত্ব বুঝে স্তর অনুযায়ী নেতারা ব্যবস্থা নেবে। অন্যদিকে তুমি কেবল বিশেষ বিশেষ সমস্যাগুলো দেখবে। এতে একদিকে তুমি বিশ্রাম পাবে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিবিড় মনোযোগ দিতে পারবে।’

তখন শ্বশুরের পরামর্শে মূসা ইস্রায়েলীদেরকে দল, উপদলে বিভক্ত করে প্রত্যেক গ্রুপের জন্যে একজন করে দলপতি নির্বাচন করলেন। এভাবে সহস্রপতি, শতপতি, পঞ্চাশপতি, দশপতি নিযুক্ত হল। ঠিক হল তারা ছোটখাট সমস্যা মোকাবেলা করবে, আর মূসা শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ বিষয়গুলি দেখবেন।

সীন প্রান্তরের বিস্তীর্ণ মরুভূমি পার হয়ে, অবশেষে ইস্রায়েলীরা ৩য় মাসে সীনাই পর্বতের কাছাকাছি পৌঁছিল। এসময় জিব্রাইল ব্যবস্থা আনতে যাবার কথা মূসাকে জানাল। সে একথা বলেছিল যে, সীনাই পর্বতের নির্দিষ্ট স্থানে ত্রিশ রাত্রির অতন্দ্র সাধনা ও দয়াময় আল্লাহর আরাধনায় লিপ্ত থাকাকালে তাকে এক কিতাব দান করা হবে- সৎকর্মীদের প্রতি নেয়ামত পূর্ণ করার জন্যে, প্রত্যেক বস্তুর পূর্ণ বিবরণের জন্যে, হেদায়েতের জন্যে এবং করুণার জন্যে- যাতে তারা স্বীয় পালনকর্তার সাথে সাক্ষাতে বিশ্বাসী হয়।

সুতরাং মূসা তার ভাই হারুণকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আমার অনুপস্থিতে সম্প্রদায়ের মধ্যে তুমি আমার প্রতিনিধিত্ব করবে, লোকদের সঙ্গে ভাল ব্যাবহার করবে আর যারা ফ্যাসাদ করে তাদেরকে অনুসরণ করবে না।’-(৭:১৪২)

তারপর তিনি ব্যবস্থা আনতে সকলকে পিছনে ফেলে একাকী তূর পর্বতের দিকে রওনা দিলেন। আর হারুণ ইস্রায়েলীদেরকে নেতৃত্ব দিতে থাকলেন। একসময় ইস্রায়েলীরা সীনাই পর্বতমালার পাদদেশ থেকে কিছুদূরে এসে পৌঁছিল এবং সেখানে ছাউনি ফেলল।

সীনাই পর্বতমালা। জাঁকাল ও ভক্তি জাগান এই পর্বতমালায় অনেক পাহাড় ও চূঁড়া রয়েছে। প্রতিশ্রুত সময় অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে এসে মূসা এই পর্বতমালার পাদদেশে পৌঁছিলেন। শুনশান নিরবতা, সূর্য্যর শেষ আলো ছড়িয়ে পড়েছে পর্বতমালার বিভিন্ন অংশে। এক অতিপ্রাকৃতিক দৃশ্য। মূসা প্রতিশ্রত সময় অনুযায়ী নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে গেলেন এবং অপেক্ষায় রইলেন এশী নির্দেশণার।

আর মূসা যখন আমার প্রতিশ্রুত সময় অনুযায়ী নির্ধারিত স্থানে হাজির হল ও তার প্রতিপালক তার সাথে কথা বললেন তখন সে বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে দেখা দাও, যেন আমি তোমাকে দেখতে পারি।’
তিনি বললেন, ‘তুমি আমাকে কখনও দেখতে পাবে না, বরং তুমি পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাক, যদি তা নিজের জায়গায় স্থির থাকে তবে তুমি আমাকে দেখতে পাবে।’

যখন তার প্রতিপালক পাহাড়ে জ্যোতিষ্মান হলেন তখন সেই পাহাড় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল আর মূসা সঙ্গাহীন হয়ে পড়ে গেল। জ্ঞান ফিরে পাবার পর সে বলল, ‘প্রশংসা তোমার, আমি অনুতপ্ত হয়ে তোমার কাছে ফিরে এলাম, আর আমিই প্রথম বিশ্বাস স্থাপন করছি।’-(৭:১৪৩)

আল্লাহ মূসাকে ব্যবস্থা দিলেন। ইস্রায়েলীদের জন্যে মূসার উপর অবতীর্ণ দীর্ঘ ও বিস্তৃত এই ব্যবস্থাকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়।

(ক)  নীতিগত ব্যবস্থা: যা সংক্ষেপে দশ আজ্ঞায় বর্ণনা করা হয়েছে।
(খ)  সামাজিক বিচার ব্যবস্থা: এই অংশে রয়েছে সামাজিক আইন, যেমন, সম্পত্তি আইন প্রয়োগ, বিচারালয়ের নিয়ম, অপরাধীকে শাস্তিদান ইত্যাদি। এখানেও অনেক বিস্তারিত বিষয় রয়েছে।
(গ)  ধর্মীয় আচার-বিধি ও উৎসবাদি: এতে রয়েছে উপাসনার বিস্তারিত বিবরণ, যেমন ত্যাগ স্বীকার, ব্যবস্থা পালনের নিয়ম, পবিত্র মাস এবং এই প্রকার অনেক বিষয়। এই নুতন জাতি যাদের একমাত্র উদ্দেশ্য একেশ্বরবাদের ধারা বয়ে নিয়ে যাওয়া, তাদের জীবন-যাপনের সকল দিক এই আদেশগুলিতে রয়েছে।

ব্যবস্থা আনতে গিয়ে মূসা সর্বমোট ৪০দিন, সীনাই পর্বতে অনুসারীদের থেকে আলাদা ছিলেন। ‘আমি মূসাকে (প্রথমে) প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম ত্রিশ রাত্রির এবং (পরে) তার সঙ্গে যোগ দিয়ে তা পূর্ণকরি আরও দশরাত্রি। এভাবে তার প্রতিপালকের নির্ধারিত সময় চল্লিশ রাত্রি পুরো হয়।’(৭:১৪২) এই দশ রাত্রি বৃদ্ধি সম্ভবতঃ এ কারণে যে, ব্যবস্থা দানকালে মূসার প্রতি রোজা রাখার নির্দেশ ছিল এবং একমাস রোজা রাখার পর তিনি আল্লাহর অনুমতি ব্যতিরেকে ইফতার করে ফেলেছিলেন।

খোদা পূর্ববর্তী অনেক সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার পর মূসাকে কিতাব দিলেন, যা ছিল মানুষের জন্যে জ্ঞানবর্তিকা, হেদায়েত ও রহমত স্বরূপ, যাতে তারা স্মরণ রাখে।-(২৮:৪৩) আল্লাহ কর্তৃক মূসাকে এই ব্যবস্থা দানের বিষয়টি শুধু হিব্রু ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই নয়, বরং ইতিহাসের অন্যতম ঘটনা। মানব ইতিহাসে এই ব্যবস্থার গুরুত্ব যে কত ছিল তা মূল্যায়ণ করা অসম্ভব হবে। ইস্রায়েলীদের কাছে তো বটেই এমনকি সমগ্র মানব সমাজের জন্যে তা ছিল অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ এবং অবশ্য পালনীয় আল্লাহর চুড়ান্ত বাক্য। মানুষের আধ্যাত্মিক কর্তব্য হিসেবে এগুলির উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এগুলি বর্তমানেও প্রত্যেক দেশের মানুষের আইন-কানুনের, জীবন-যাত্রার অংশ বিশেষ।

কিতাব প্রদান শেষে আল্লাহ স্বাক্ষ্যতাম্বুর যাবতীয় খুঁটিনাটি মূসাকে বুঝিয়ে দিলেন। এরপর তাকে দশ আজ্ঞার দু‘টি সাক্ষ্যফলক দিলেন, যা ছিল প্রস্তর নির্মিত এবং যার উভয় পিঠে আজ্ঞাগুলি তিনি খোঁদাই করে লিখে দিয়েছিলেন। সবশেষে তিনি বললেন, ‘হে মূসা! আমি তোমাকে বাণী দিয়ে ও তোমার সাথে কথা বলে মানুষের মধ্যে তোমাকে প্রাধান্য দিয়েছি। সুতরাং আমি যা দিলাম তা গ্রহণ কর ও ধন্য হও। আর আমি তোমার জন্যে ফলকে লিখে দিলাম প্রত্যেক বিষয়ের উপদেশ ও প্রত্যেক বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যা। সুতরাং এগুলো শক্ত করে ধর আর তোমার সম্প্রদায়কে গ্রহণ করতে নির্দেশ দাও। আমি শীঘ্রই সত্যত্যাগীদের বাসস্থান তোমাকে দেখাব।’-(৭:১৪৪-১৪৫)

কিন্তু হে মূসা! নিজের সম্প্রদায়কে পিছনে ফেলে তুমি তাড়াহুড়ো করে কেন আগেই হাজির হলে?’
মূসা বললেন, ‘ওরা ঐ তো আমার পিছনে আসছে। আর হে আমার প্রতিপালক! আমি তাড়াতাড়ি তোমার কাছে এলাম তুমি সন্তুষ্ট হবে বলে।’
তিনি বললেন, ‘তোমার চলে আসার পর তোমার সম্প্রদায়কে আমি পরীক্ষা করেছি, আর সামেরী তাদেরকে ভুল পথে নিয়ে গেছে।’-(২০:৮৩-৮৫) সুতরাং হে মূসা! তুমি আর দেরী না করে এখনই নীচে নেমে যাও।’

তারপর যখন মূসা কিতাব ও সাক্ষ্যফলক দু‘টি হাতে করে উঠে দাঁড়ালেন। তখন আল্লাহ বললেন, ‘আমি যা দিলাম তা শক্ত করে ধর, আর তারমধ্যে যা আছে তা মনে রেখ, যেন তোমরা সাবধান হয়ে চলতে পার।’-(২:৯২)

মূসা দ্রুত পায়ে পাহাড় থেকে নীচে নেমে এলেন। অত:পর ছাউনির কাছাকাছি পৌঁছে বাছুরটা ও লোকদের নাচানাচি দেখতে পেলেন।

মূসার দীর্ঘ অনুপস্থিতির সময় ইস্রায়েলীরা এক অবিশ্বাস্য কাজ করে বসল। তার কি হয়েছে না হয়েছে তা না জেনেই তারা সিদ্ধান্ত নিল যে, তারা এই পর্বত থেকে চলে যাবে। তাদের অনেকে এমনকি মিসরেও ফিরে যেতে চাইল। এ কারণে যে কোন মূল্যে তারা তাদের অগ্রগামী হবার জন্যে একজন দেবতা পেতে চাইল। সুতরাং তারা স্বর্ণময় এক গো-বৎস তৈরী করে তার পূজায় রত হল। দূর্ভাগ্যবশতঃ এসময় হারুণ তাদেরকে নিবৃত্ত করতে ব্যর্থ হলেন।

দেবতার বিষয়ে সামেরী অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। সে ইস্রায়েলীদেরকে একথা বোঝাতে সক্ষম হয় যে, মিসরীয়দের কাছ থেকে চেয়ে আনা স্বর্ণ অপরের ধন। তাই তা তাদের জন্যে অবৈধ, আর তা তাদের কাছ থেকে দূর করা আবশ্যক। তখন ইস্রায়েলী মেয়েরা তাদের সঙ্গে থাকা মিসরীয়দের কাছ থেকে পুন:রায় ফিরিয়ে দেবার প্রতিশ্রুতিতে চেয়ে আনা সমস্ত স্বর্ণালংকার নিয়ে এল। তারপর সেগুলি তারা একটা গর্তে ছুঁড়ে ফেলল। এরপর হারুণের উপস্থিতিতে তাতে আগুন ফেলে দেয়া হল যাতে ঐ সোনা গলে একটা তালে পরিণত হয়। হারুণ সমবেত লোকদেরকে বললেন, ‘মূসা ফিরে এসে এই স্বর্ণ সম্পর্কে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’

মেয়েরা ভগ্ন হৃদয়ে অলঙ্কারের পরিণতি লক্ষ্য করছিল। আর কিছু অতি উৎসাহী জনতা শোরগোল তুলছিল। সেইসময় সামেরী তার হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে হারুণকে বলল, ‘আমিও কি এগুলো নিক্ষেপ করব?’
হারুণ মনে করলেন তার হাতেও হয়ত: মিসরীয়দের কোন অলঙ্কার রয়েছে, তাই তিনি তা নিক্ষেপ করতে আদেশ দিলেন। সামেরী বলল, ‘আমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হোক।’ আপনি আমার জন্যে এ মর্মে দোয়া করলেই শুধু আমি নিক্ষেপ করব-নতুবা নয়।’

সামেরীর কপটতা ও কুফর হারুণের জানা ছিল না। তাই তিনি দোয়া করলেন। তখন সে তার হাতের বস্তু ঐ আগুনে ছুঁড়ে ফেলল। বস্তুত: তার হাতে কোন অলঙ্কার ছিল না, ছিল ফেরেস্তা জিব্রাইলের পায়ের নীচের কিছু মাটি। সে এই বিষ্ময়কর ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিল যে, জিব্রাইলের অশ্বের পা মাটিতে যেখানে পড়ে সেখানে তখুনি ঘাস উৎপন্ন হয়। এতে সে বুঝে নিয়েছিল যে তার পায়ের নীচের মাটিতে জীবনের স্পন্দন নিহিত আছে। নিতান্ত কৌতুহল বশে সে ঐ মাটির কিছুটা সংগ্রহ করে নিজের কাছে রেখেছিল। তারপর যখন মিসরীয়দের কাছ থেকে চেয়ে আনা স্বর্ণে যখন আগুন ধরিয়ে দেয়া হল, তখন শয়তান সামেরীকে প্ররোচিত করল এই মাটি তারমধ্যে নিক্ষেপ করতে। তার মনে বাসনা ছিল হারুণের অনুপস্থিতিতে এই স্বর্ণ দিয়ে সে মিসরীয়দের দেবতার মত একটি দেবতা তৈরী করবে। আর তার মনের বাসনা পূর্ণ করার মানসে সে হারুণের দোয়াও কাজে লাগাল।

হারুণ যখন ঐ স্থান পরিত্যাগ করলেন তখন সামেরী উপস্থিত অন্যান্যদের সহায়তায় ঐ স্বর্ণ দিয়ে গো-বৎসের আকারে (মিসরীয় দেবতা ওপিষ) এক দেবতা তৈরী করল। আগুনে সামেরীর নিক্ষিপ্ত জিব্রাইলের অশ্বের পদতলের মাটির গুনে এই দেবমূর্ত্তি জীবন্ত গরুর মত আচরণ ও হাম্বা স্বরে ডাকতেও লাগল।
সামেরী বলল, ‘এটাই হল খোদা। মূসা এঁর সাথে কথা বলতে তূর পাহাড়ে গেছেন, আর এদিকে ইনি সশরীরে এখানে এসে হাজির হয়েছেন।’

সামেরীর কথা শুনে লোকেরা বিপুল উৎসাহে সেটার অর্চণা শুরু করে দিল। কিন্তু তারা এটা দেখল না যে, ওটা তাদের সাথে কথা বলে না, আর কোন পথও দেখায় না। তথাপি তারা ওটার অচর্ণা শুরু করল। প্রকৃতই তারা ছিল সীমালংঘনকারী।

তিন দিনের এক উৎসবে লোকেরা যাত্রার প্রস্তুতির জন্যে স্বর্ণময় ঐ গো-বৎসের পদতলে পশু উৎসর্গ করল। হারুণ যখন দেখলেন যে, সামেরীর কারণে বনি-ইস্রায়েলীদের এক বিরাট অংশ গরু-বাছুরের মূর্ত্তিপূজা শুরু করেছে। তখন তিনি তাদের কাছে গেলেন এবং বললেন, ‘এ তোমাদের খোদা নয়, পথভ্রষ্টতা তোমাদেরকে পেয়ে বসেছে। এ তো অলংকারাদি দিয়ে তৈরী একটি মূর্ত্তিমাত্র। তোমাদের খোদা হলেন মহান আল্লাহ।’
তারা বলল, ‘মূসা কোথায় গেছেন? তিনি তো আমাদের থেকে ত্রিশ দিনের জন্যে বিদায় নিয়েছিলেন। এখন চল্লিশ দিন পার হওয়ার পথে।’
হারুণ এ প্রশ্নেরও কোন জবাব দিতে পারলেন না। তখন সামেরী বলল, ‘তিনি পথ ভুলে গিয়েছেন, তার অনুসন্ধান করা দরকার।’
হারুণ বললেন, ‘পথ পেতে হলে আমার কথা শোন। হে আমার সম্প্রদায়! এ দিয়ে তো তোমাদেরকে কেবল পরীক্ষা করা হচ্ছে। তোমাদের প্রতিপালক করুণাময়। সুতরাং তোমরা আমাকে অনুসরণ কর ও আমার আদেশ মেনে চল।’
কিন্তু অধিকাংশই তার কথায় কান দিল না। তারা পরিস্কারভাবে জানিয়ে দিল, ‘যতক্ষণ না মূসা ফিরে আসেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা একেই উপাস্য বলে মানতে থাকব এবং এর পূজাঅর্চণা থেকে কিছুতেই বিরত হব না।’ -(২০:৯০-৯১)

এই পরিস্থিতিতে হারুণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন। নিতান্ত অপারগ হয়ে তিনি বনি-ইস্রায়েলীদের একাংশ নিয়ে পথভ্রষ্টদের থেকে পৃথক হয়ে গেলেন এবং মূসার ফিরে আসার অপেক্ষায় রইলেন।

সীন প্রান্তরে মূসার সামান্য অনুপস্থিতিতে ইস্রায়েলীরা মূসার আদেশ অমান্য করে প্রতিমা তৈরী করল এবং পূজা করল। এই কাজ প্রমাণ করে যে, মিসরীয় প্রতিমার প্রতি তারা কত গভীরভাবে ঝুঁকে ছিল। এই ধরণের কাজ, যে কোন সময় করা ছিল একটি সামগ্রীক পাপ। উপরন্তু, এটা সেইসময় যখন সীনাইয়ের তূরপর্বতে মূসাকে কিতাব দেয়া হচ্ছে, তখন সেই সীনাইয়েরই পাদদেশে বসে তার সম্প্রদায় মূর্ত্তিপূজার জন্যে দোষী সাব্যস্ত হচ্ছে। এই সময় ইস্রায়েলীদের এই পাপ করা সত্যিই বড় দুঃখজনক ছিল। নেতা হিসেবে মূসাকে এ সমস্ত সমস্যার মোকাবেলা করতে হয়েছিল। এই অভিযোগকারী এবং বিদ্রোহী মহাজনতাকে পরিচালিত করতে গিয়ে মূসা যে অসাধারণ ধৈর্য্য, বিচক্ষণতা ও স্বার্থহীনতার মনোভাব দেখিয়েছিলেন তা নি:সন্দেহে ইতিহাসে এক মহানেতৃত্বের আদর্শ।

এই সংকটময় পরিস্থিতির সময় মূসা ইস্রায়েলীদের মাঝে ফিরে এলেন। তিনি এসে তাদের পাপ দেখলেন। মাত্র দশ দিনের বিলম্বে তাদের এমন কাজ করা দেখে রাগে ও দুঃখে বললেন, ‘আমার অবর্তমানে  তোমরা  আমার  হয়ে কত খারাপ কাজই না করেছ। তোমাদের প্রতিপালকের আদেশকে এগিয়ে নিয়ে আসার জন্যে কেন তাড়াহুড়ো করলে?’-(৭:১৫০) ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমাদের প্রতিপালক কি এক উত্তম প্রতিশ্রুতি দেননি? তার প্রতিশ্রুতির কাল কি বিলম্বিত হয়েছে, না তোমরা চেয়েছ তোমাদের উপর আল্লাহর গজব পড়ুক,  আর সেজন্যেই কি আল্লাহর অঙ্গীকার ভঙ্গ করলে?’

তারা বলল, ‘আমরা তোমাকে দেয়া অঙ্গীকার স্বেচ্ছায় খেলাপ করিনি; তবে আমাদের উপর লোকেদের অলংকারের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল, আর আমরা তা আগুনে ছুঁড়ে ফেলে দেই, ঐভাবে সামেরীও ফেলে দেয়। তারপর সে ওদের জন্যে একটা গো-বৎস তৈরী করল, যা গরুর মত শব্দ করতে থাকে। সে বলল, ‘এ তোমাদের উপাস্য আর মূসারও উপাস্য, কিন্তু, মূসা ভুলে গেছে।’
মূসা বললেন, ‘তবে কি তোমরা ভেবে দেখ না যে ওটা তোমাদের কথায় সাড়া দেয় না, আর তোমাদের কোন খারাপ বা ভাল করার ক্ষমতাও রাখে না?’-(২০:৮৬-৮৯)

মূসা তার ভ্রাতা হারুণকে কাছে ডাকলেন। তিনি ধারণা করলেন তার ভ্রাতা স্বীয় দায়িত্ব পালন করেনি, নুতবা এ অপকর্ম কেন? তিনি হারুণের উপর খুবই রুষ্ট হলেন। কঠিনস্বরে তাকে বললেন, ‘তুমি যখন দেখলে ওরা ভুল পথে যাচ্ছে তখন কিসে তোমাকে নিবৃত্ত করল আমাকে অনুসরণ করতে? তবে কি আমার হুকুম তুমি মাননি?’-(২০:৯২-৯৩)

রাগে অন্ধ হয়ে হাতের ফলকগুলো ছুঁড়ে ফেললেন মূসা। তারপর আক্রোশ নিয়ে হারুণের দাঁড়ি ও চুল ধরলেন। হারুণ অতি নরম ভাষায় তাকে বললেন, ‘হে আমার ভ্রাতা! আমার কথা শোন, আমার দাঁড়ি ও চুল ছেড়ে দাও। আমি এই আশংকা করেছিলাম যে, তুমি বলবে, ‘তুমি বনি ইস্রায়েলীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছ, আর তুমি আমার কথার মর্যাদা দাওনি।’-(২০:৯৪) হে আমার সহোদর ভাই! লোকেরা তো দুর্বল মনেকরে আমাকে প্রায় খুন করে ফেলেছিল আর কি! তুমি আমার সাথে এমন কোরও না যাতে শত্রুরা আনন্দিত হয়। আর আমাকে সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভূক্ত কোরও না।’-(৭:১৫০)

‘হে ভ্রাতা! আমি দায়িত্ব পালনে অলসতা করিনি। আমি তাদের নিবৃত্ত করতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু তারা আমার কথায় কান দেয়নি। আর ঐ সময় আমি তাদের ঔদ্ধত্যের জবাব দিতে গেলে বনি-ইস্রায়েলীদের মধ্যে বিভক্তি আসত, আর আমি এ বিষয়টিকেই সবচেয়ে বেশী ভয় করেছি। তাই আমি তোমার ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলাম। আমার বিশ্বাস ছিল, তুমি এসে তাদেরকে সত্য পথে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে। এই কারণে আমি বেশী বাড়াবাড়ি করিনি।

হারুণের কথায় মূসার রাগ কমে এল। তিনি বুঝতে পারলেন, এ ব্যাপারে প্রকৃত দোষী  সে নয়। দোষী হল সামেরী। তাই তিনি তৎক্ষণাৎ তাকে তলব করলেন। সামেরীও সম্মুখে এগিয়ে এল। তাকে দেখতে পেয়ে মূসা জিজ্ঞেস করলেন- ‘হে সামেরী! তোমার ব্যাপার কি?’

অধোবদনে সে বলল, ‘আমি সেইসময় যা দেখতে পেয়েছিলাম তা ওরা কেউ দেখেনি। আমি জিব্রাইলকে দেখতে পেয়েছিলাম। আর সেইসময় আমি তার পদচিহ্ন থেকে একমুঠো ধূলি নিয়েছিলাম। পরে তা ঐ আগুনে ফেলে দেই। আর আমার আত্মা আমাকে প্ররোচিত করেছিল এভাবে।-(২০:৯৫-৯৬) অত:পর তা দিয়ে যখন গো-বৎসের আকারে একটি দেবতা তৈরী করা হল, তখন তা জীবন্ত হয়ে গেল এবং গরুর মত হাম্বা স্বরে ডাকতেও লাগল। আর লোকেরা সেটাকে পূজা করতে শুরু করে দিল।’

সামেরী যখন জন্মগ্রহন করেছিল তখন সকল ইস্রায়েলী পুত্রসন্তান হত্যার ফেরাউনের আদেশ বলবৎ ছিল। নিজের চোখের সামনে সিপাহীদের হাতে স্বীয় পুত্রের মৃত্যু দৃশ্য দেখার ভয়ে তার জননী তাকে জঙ্গলের একটি গর্তে রেখে উপর থেকে ঢেকে দিয়ে এসেছিল। এসময় আল্লাহর নির্দেশে জিব্রাইল তাকে দেখাশুনা করেছিল। এ কারণেই হয়তোবা সে তাদের মাঝে জিব্রাইলকে দেখে তাকে চিনে ফেলেছিল। সাগর পাড়ি দেবার পর সীনাই পর্বতের কাছাকাছি পৌঁছিলে মূসাকে ব্যবস্থা আনতে তূর পর্বতে গমণের আদেশ শোনানোর জন্যে জিব্রাইল অশ্বপৃষ্ঠে সওয়ার হয়ে এসেছিল।

যাহোক সামেরীর কথা শুনে মূসা তীব্র রাগান্বিত হলেন। তিনি তাকে হত্যা করতে চাইলেন। কিন্তু জিব্রাইল তাকে তা করতে নিষেধ করল তার অতীত কর্মের কারণে। মিসরে বনি ইস্রায়েলীদেরকে দেশত্যাগে সংগঠিত করতে সে বিরাট ভূমিকা পালন করেছিল। আর তাই মূসা ঘৃণার সাথে সামেরীকে বললেন, ‘দূর হয়ে যাও! আর তোমার জন্যে এই সাব্যস্ত হল যে, তুমি তোমার জীবদ্দশায় সকলকে বলবে যে, ‘আমি অস্পৃস্য’ এবং তোমার জন্যে রইল এক নির্দিষ্টকাল, যার ব্যতিক্রম হরে না। আর তুমি তোমার উপাস্যকে দেখে যাও যার পূজায় তুমি ব্যস্ত ছিলে, আমরা তাকে পুড়িয়ে ছারখার করে দেব। একমাত্র আল্লাহই তো তোমাদের উপাস্য, তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোন উপাস্য নেই, সকল বিষয়ই তাঁর জ্ঞানায়ত।’-(২০:৯৭-৯৮)

মূসা ইস্রায়েলীদের কাছ থেকে গো-বৎসটি ছিনিয়ে নিয়ে আগুনে পোড়ালেন। স্বর্ণ আগুনে গললেও পুড়ে ছাই হয়ে যায় না, কিন্তু জিব্রাইলের পদধূলির কারণে গো-বৎসটি যেহেতু জীবন্ত হয়েছিল তাই তা পুড়ে ছাই হয়ে গেল।

মূসা এই ছাই পানিতে মিশিয়ে সামেরীসহ পূজাকারীদের সকলকে তা খাইয়ে দিলেন। এরপর তিনি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে ও আমার ভ্রাতাকে ক্ষমা কর। তুমি আমাদেরকে আশ্রয় দাও আর তুমিই তো শ্রেষ্ঠ দয়ালু।’

তিনি বললেন, ‘যারা গো-বৎসকে উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে, তাদের উপর তাদের পরওয়ারদেগারের পক্ষ থেকে পার্থিব জীবনেই গজব ও লাঞ্ছনা এসে পড়বে। এমনিভাবে আমি অপবাদ আরোপ কারীদেরকে শাস্তি দিয়ে থাকি। আর যারা মন্দ কাজ করে, তারপরে তওবা করে নেয় এবং ঈমান নিয়ে আসে, তবে নিশ্চয় তোমার পরওয়ারদেগার তওবার পর অবশ্য ক্ষমাকারী, করুণাময়।’

মূসার রাগ যখন কমল তখন তিনি ফলকগুলো তুলে নিলেন। যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে চলে, তাদের জন্যে তাতে লেখা ছিল পথের নির্দেশণা ও করুণা।-(৭:১৫১-১৫৪)

এদিকে দেবমূর্ত্তিকে পুড়িয়ে ছাই করে পানিতে মিশিয়ে পূজাকারীদের সকলকে তা খাইয়ে দেবার পর পূজাকারীদের যারা আন্তরিকভাবে তওবা করেনি, তারা পেটের মধ্যে অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করতে থাকল। আর তাদের চেহারা বিকৃত হয়ে পড়ল। তখন তারা অনুতপ্ত হল এবং বুঝতে পারল তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে। তারা মূসাকে খুঁজে নিয়ে বলল, ‘হে মূসা! এখন আমাদের প্রতিপালক যদি আমাদেরকে দয়া না করেন বা ক্ষমা না করেন তবে তো আমাদের সর্বনাশ।’-(৭:১৪৯) অবশ্য তাদের কিছু তখনও আন্তরিকভাবে লজ্জিত না হয়ে বরং যারা হারুণের অনুসারী হিসেবে পূজায়রত হয়নি তাদেরকে ঈর্ষা করে যেতে লাগল।

মূসা আল্লাহর কাছে ইস্রায়েলীদের হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। তিনি জানালেন, “তাদেরকে ক্ষমা করা সম্ভব না কারণ পাপ তাদের অভ্যান্তরে প্রবেশ করেছে। সুতরাং তারা যেন নিজেদের মধ্যে একে অপরকে হত্যা করে।’
তারা বলল, “আমরা অনুতাপ করছি এবং আমরা আনন্দের সাথে মরতে প্রস্তুত যদি খোদা আমাদের ক্ষমা করেন।”
খোদা মূসাকে জানালেন, “যা তুমি তাদের খাইয়ে দিয়েছ তা তাদের দেহ থেকে বেরিয়ে গেলেই কেবল তারা ক্ষমা পাবে।”
তখন মূসা তাদেরকে ডেকে বললেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়! গো-বৎসকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে তোমরা নিজেদের উপর ঘোর অত্যাচার করেছ, সুতরাং তোমরা সৃষ্টিকর্তার দিকে ফিরে যাও, আর তোমাদের আত্মাকে সংহার কর। তোমাদের সৃষ্টিকর্তার কাছে এই হবে কল্যাণকর। তিনি তোমাদের প্রতি ক্ষমাপরবশ হবেন। তিনি তো ক্ষমাপরবশ, পরম দয়ালু।’-(২:৫৪)

তারা আন্তরিকভাবে অনুতাপ করতে থাকল, যদিও তাদের মধ্যে কিছু ছিল যারা কেবল যন্ত্রণা ও মৃত্যু ভয়ে অনুতাপ করছিল। আকাশ অন্ধকারে ঢেকে গেল, আর তারা খোদার আদেশ মত একে অপরকে হত্যা করতে শুরু করল। তরবারী কেবল অপরাধীর উপর কাজ করল, তথাপি ৭০ হাজার গোবৎস পূজাকারী পড়ে গেল। এসময় নারী ও শিশুদের আহাজারীতে আবারও মূসা ক্ষমা পেতে খোদার কাছে হাত পাতলেন। তখনি আকাশ পরিস্কার হল এবং খোদা তাদেরকে ক্ষমার সু-সংবাদ দিলেন। যাতে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে।-(২:৫২) ৭০ ব্যক্তি ব্যতিত বাকীরা সূস্থ্য হয়ে গেল।

ইস্রায়েলী নারীরাও তাদের অলঙ্কার দ্বারা দেবতা তৈরীতে অপরাধ বোধে ভুগতে লাগল। তারা তাদের অবশিষ্ট অলঙ্কারাদি খুলে ফেলল, আর কখনও তারা তা পরেনি।

এদিকে সামেরী এক ঘৃণ্য জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিল এবং মৃত্যুর পূর্বমুহুর্ত পর্যন্ত সে এই জ্বরে আক্রান্ত ছিল। যে কেউ তাকে স্পর্শ্ব করত সেই ঐ জ্বরে আক্রান্ত হত। এ কারণে সে সকলকে তার কাছ থেকে দূরে থাকতে অনুরোধ করত। শেষপর্যন্ত সে লোকসমাজ থেকে বিতাড়িত হয়ে জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছিল এবং অতি অসহায় অবস্থায় সে মৃত্যুবরণ করেছিল।

তূরপাহাড় থেকে মূসা তার জাতির জন্যে তাওরাত কিতাব (ভাষা-ইব্রাণী) নিয়ে এসেছিলেন। অতঃপর তিনি তা ইস্রায়েলীদের সামনে পেশ করে বললেন, ‘আল্লাহ তোমাদের হেদায়েতের জন্যে এই কিতাব দান করেছেন।’
বনি-ইস্রায়েলীরা ছিল সন্দেহপ্রবণ, বক্রস্বভাবী। তারা বলল, ‘হে মূসা! এটা যে আল্লাহর কিতাব তা আমরা কিভাবে বুঝব? আল্লাহ আমাদের নিজেই বলে দিন যে, এটা তাঁর বাণী, তবেই আমরা বিশ্বাস করব? এরও তো সম্ভবনা রয়েছে যে, কিতাবটি তুমি নিজে লিখে আমাদের সামনে রেখেছ, আর আল্লাহ প্রদত্ত বলে চালিয়ে দিচ্ছ।’

তাদের এই আপত্তিতে মূসা বড়ই অস্বস্তিতে পড়লেন। তিনি ইস্রায়েলীদেরকে বললেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা কেন আমাকে কষ্ট দাও, অথচ তোমরা জান যে, আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রসূল।’
অতঃপর তারা যখন বক্রতা অবলম্বণ করল, তখন আল্লাহ তাদের অন্তরকে বক্র করে দিলেন। আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শণ করেন না।-(৬১:৫)

কিন্তু ইস্রায়েলীরা তাদের রসূল প্রদত্ত কিতাবকে ঐশী কিতাব হিসেবে মেনে নিতে রাজী হল না। মূসা ব্যাথিত হলেন। এই নির্বোধ লোকেরা কি অপবাদই না তার উপর আরোপ করছে? তিনি সমস্যা সমাধানার্থে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন। আল্লাহ বললেন, ‘হে মূসা! বনি-ইস্রায়েলীদের মধ্যে থেকে নির্ভরশীল কিছু ব্যক্তিকে বেঁছে নিয়ে তূর পাহাড়ে যাও, আমি তাদেরকে আমার বাণী শুনিয়ে দেব, যাতে তাদের বিশ্বাস হয় এ আমারই কিতাব।’

মূসা বনি-ইস্রায়েলীদেরকে বললেন, ‘তোমরা তূর পাহাড়ে উপস্থিত হলে আল্লাহ নিজেই তাঁর বাণী তোমাদেরকে শুনিয়ে দেবেন। তোমরা এখানে কয়েক লক্ষ লোক। সকলে সেখানে সমবেত হয়ে ভীড় করার কোন অর্থ হয় না। বরং তোমাদের মধ্যে থেকে নেতৃস্থানীয় কিছু লোকসহ সেখানে উপস্থিত হওয়াকে শ্রেয় মনেকরি। তারা ফিরে এসে যদি এই কিতাবের সত্যতা সম্পর্কে সাক্ষ্য প্রদান করে, তবে একে আল্লাহর কিতাব বলে গ্রহণ করতে তোমাদের আর কোন আপত্তি থাকার কথা নয়।’
সকলে এই প্রস্তাব পছন্দ করল।

মূসা ইস্রায়েলীদের মধ্যে থেকে নেতৃস্থানীয়দেরকে বেঁছে নিলেন, প্রতি গোত্র থেকে ৬জন করে মোট ৭০জন [মূসা ও হারুণ বাদে]। অত:পর তিনি তাদেরকে পবিত্র করলেন। তারপর তাদেরকে নিয়ে তূরপর্বতের দিকে চললেন। সমস্ত পর্বত এসময় ধোঁয়ায় ঢাকা ছিল। যখন তারা পর্বতের কাছাকাছি পৌঁছিলেন তখন ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেল। মূসা বুঝলেন হয়ত: লোকেদের গো-বৎসের পূজার কারণে আল্লাহ এখনও নারাজ। তাই তিনি তাদেরকে এই ভূমিকম্পের মধ্যে ফেলেছেন। তাই তিনি আকাশের দিকে দু‘হাত বাড়িয়ে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করলেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! ইচ্ছে করলে এর আগেই তুমি এদেরকে ও আমাকে ধ্বংস করতে পারতে আমাদের মধ্যে যারা নির্বোধ তারা যা করেছে সেজন্যে কি তুমি আমাদেরকে ধ্বংস করবে? এ তো তোমার পরীক্ষা যা দিয়ে তুমি যাকে ইচ্ছে বিপথগামী কর আর যাকে ইচ্ছে সৎপথে পরিচালিত কর। তুমিই তো আমাদের অভিভাবক। সুতরাং তুমি আমাদেরকে ক্ষমা কর ও আমাদের প্রতি অনুগ্রহ কর। আর তুমিই তো সর্বশ্রেষ্ট ক্ষমাকারী। আর আমাদের জন্যে নিশ্চিত কর ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ। আমরা তো তোমার কাছেই ফিরে আসব।-(৭:১৫৫)

মূসার এই প্রার্থণা শুনে যাদের অন্তরে দেবতাদের প্রতি তখনও মহব্বত ছিল তারা লজ্জিত হল ও তওবা করল। তখন ভূমিকম্প থেমে গেল। আল্লাহ মূসাকে জানালেন, ‘আমার শাস্তি যাকে ইচ্ছে দিয়ে থাকি। আমার অনুগ্রহ সে তো প্রত্যেক জিনিসে ছড়িয়ে আছে। তাই আমি তাদের জন্যে তা নিশ্চিত করি যারা সংযম পালন করে, যাকাত দেয় ও আমার নিদর্শণগুলোয় বিশ্বাস করে।’-(৭:১৫৬)

মূসা সকলকে নিয়ে পর্বতের পাদদেশে এক নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে সমবেত করলেন। কোন অবস্থাতেই তাদেরকে আর সম্মুখে অগ্রসর হতে বা পর্বত স্পর্শ করতে অনুমতি দেয়া হয়নি। অত:পর তূর পর্বত থেকে বজ্রনিনাদে একে একে দশ আজ্ঞা ধ্বনিত হল-

 - খোদা ব্যতিত অপর কাউকে উপাস্য স্থির কোরও না।
 - প্রতিমা পূজা কোরও না।
 - অসৎ উদ্দেশ্যে খোদার নাম নিয়ো না।
 - বিশ্রামবারকে পবিত্ররূপে মান্য কোরও।
 - পিতামাতাকে সমাদর কোরও।
 - নরহত্যা কোরও না।
 - ব্যভিচার কোরও না।
 - চুরি কোরও না।
 - প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে মিথ্যে সাক্ষ্য দিও না।
 - প্রতিবেশীর কোন বস্তুতে লোভ কোরও না।

এ আওয়াজ চারিদিক থেকে সমভাবে ধ্বনিত হচ্ছিল। এসময় ইস্রায়েলীরা উপরে পর্বতে এবং আকাশের দিকে তাকিয়ে শব্দের উৎস খুঁজে ফিরল। কিন্তু তারা কাউকে দেখল না। তারা কেবল দেখল সমগ্র পর্বত ঘন ধোঁয়ায় ঢাকা। সুতরাং তাদের মনে জিজ্ঞাসা আর কপালে তার চিহ্ন ফুটে উঠল। তারা একে অপরের মুখ পানে চাইল। অত:পর মূসাকে বলল, ‘আমাদেরকে আল্লাহকে সাক্ষাৎ দেখাও।’-(৪:১৫৩)

এই জগতে জীবিত অবস্থায় আল্লাহকে দেখার ক্ষমতা কারও নেই। কেননা তাঁর সত্ত্বা অসীম এবং মানুষের দৃষ্টি সসীম। সুতরাং মানুষের সসীম দৃষ্টি তাঁর অসীম সত্ত্বাকে চতুর্দিক থেকে বেষ্টন করে কখনও দেখতে পাবে না। তাই মূসা এবিষয়ে লোকদেরকে নিবৃত্ত করতে চেষ্টা করলেন, বললেন, ‘তোমাদের এই দাবী হটকারী ও মূর্খতাপূর্ণ। সুতরাং এ থেকে নিবৃত্ত হও। তাঁকে কেউ কখনও দেখতে পাবে না। দেখছ না ইতিপূর্বে আমি তাকে দেখতে চাওয়ায় তাঁর নূরের সামান্য তাজ্জ্বালীতে এ তূর পাহাড়ের একাংশ গলে পড়েছে।’

কিন্তু ইস্রয়েলীরা ছিল নিতান্তই বক্রস্বভাবী। তাই মূসার আবেদন তাদের হৃদয় গলাতে পারল না। তারা তাদের দাবীতে অনড় রইল। তারা বলল, ‘হে মূসা! কষ্মিনকালেও আমরা তোমাকে বিশ্বাস করব না, যতক্ষণ না আমরা আল্লাহকে প্রত্যক্ষ দেখতে পাব।’-(২:৫৫) তাদের এ দাবীর সাথে সাথেই বজ্রপাত তাদেরকে পাকড়াও করল। এতে তারা সকলেই তৎক্ষণাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল- দৃশ্যতঃ মৃতে পরিণত হল।

বজ্রপাতে মূসাও জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। পরে জ্ঞান ফিরে পেয়ে তিনি দেখতে পেলেন তূর পাহাড়ের পাদদেশ একটি মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। এতে তিনি বড়ই ব্যাথিত ও বিচলিত হলেন। কারণ এই লোকেরা ছিল বনি-ইস্রায়েলীদের বিশেষ বিশেষ লোক। অধিকন্তু, তিনি তাদের ছাড়া ফিরে গিয়ে জাতির লোকদের কাছে কি জবাব দেবেন? তারা এমনিতেই বক্র স্বভাবের; তারা তো তার বিরুদ্ধে অপবাদ দেবে যে, তিনি প্রতারণা করে তাদের নির্বাচিত নেতৃস্থানীয় লোকগুলোকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে ফেলেছেন। আর শুধু এতেই  তারা ক্ষান্ত হবে না বরং তারা তাকে হত্যা করে প্রতিশোধ নেবার জন্যেই প্রস্তুত হবে। তাই তিনি আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করলেন, ‘হে আল্লাহ! এরা নির্বোধ। তুমি তাদেরকে মাফ করে দাও। যদি তারা মৃত অবস্থায় এখানে পড়ে থাকে, আর আমি একা ফিরে যাই, তবে তো ইস্রায়েলীরা আমার বিরুদ্ধে অপবাদ দেবে। আর তারা তো পূর্ব থেকেই আমাকে সন্দেহের চোখে দেখে।’

আল্লাহ তো মহাক্ষমাশীল, দয়াময়। কোরআনে তিনি বলেন- আর অত:পর তোমরা বজ্রাহত হয়েছিলে এবং তোমরা তা প্রত্যক্ষ করেছিলে। অত:পর আমি মৃত্যুর পর তোমাদের পূনরুজ্জীবিত করলাম, যেন তোমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।’-(২:৫৬)

সত্তুরজন প্রতিনিধি মূসার সাথে স্বীয় সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে এল। অতঃপর তারা বনি-ইস্রায়েলীদের সামনে পূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করল। বর্ণনা করল তূরপাহড়ে যাবার পর তারা কি কি করেছে, আর আল্লাহ তাদের সাথে কি আচরণ করেছেন। তারা এ কথাও বলল যে, মূসা যা কিছু বলেছেন সবই সত্য এবং বাস্তব। তার কথায় এবং কাজে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। তিনি আমাদের সামনে যে কিতাব নিয়ে এসেছেন নিঃসন্দেহে তা আল্লাহ প্রেরিত। তাদের এই সাক্ষ্যের পর বনি ইস্রায়েলীরা কিতাবের আহকামসমূহ মনোযোগ সহকারে শুনল।

ইস্রায়েলীরা সীন প্রান্তরে এক বৎসরের বেশী ছিল। ঐসময় তারা ব্যবস্থার বিস্তারিত বিষয়গুলি শিখে নিচ্ছিল, যা তাদেরকে দৈনিন্দন জীবন-যাত্রায় পালন করতে হবে। এই সময়ের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল তাম্বু নির্মাণ, যার উদ্দেশ্য হল মানুষের মাঝে দয়াময় খোদার উপস্থিতি। বৎসলেল ও অহলীয়াব ছিলেন এই নির্মাণ কাজের প্রদান দায়িত্বে, কিন্তু প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি লোকেরা স্বেচ্ছায় দিল। স্বর্ণ, রৌপ্য, তাম্র, ছাগ ও মেষ চর্ম, লিলেন এবং অন্যান্য ভাল ভাল জিনিষপত্র এই তাম্বুতে ব্যাবহার করা হয়েছিল।

একটি আয়তাকার স্থানে তাম্বুটি স্থাপন করা হয়েছিল যার চারিদিকে ১৫০ ফুট দৈর্ঘ্য, ৭৫ ফুট প্রস্থ ও একটি অতিরিক্ত তাম্বুর দেয়াল দিয়ে ঘেরাছিল। প্রবেশ করা হত পূর্বদিক দিয়ে। মূল অংশ ছিল ৪৫ ফুট দৈর্ঘ্য এবং ১৫ ফুট প্রস্থ বিশিষ্ট। এটি দু’ভাগে বিভক্ত ছিল, পূর্বপ্রান্তে অর্থাৎ সম্মুখের দিকে ছিল পবিত্রস্থান এবং পশ্চিম প্রান্তে ছিল মহাপবিত্র স্থান। পবিত্রস্থানটি ছিল ১৫ ফুট প্রস্থ, ১৫ ফুট উচ্চ এবং ৩০ ফুট দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট। এই অংশে ছিল দর্শণ রুটির টেবিল, স্বর্ণের বাতি অর্থাৎ দীপাধার ও ধূপবেদী।

দর্শণ রুটির টেবিল শিটীম কাঠের নির্মিত, যা ছিল ৩ ফুট দীর্ঘ, ২ ফুট ৩ ইঞ্চি প্রস্থ ও ২ ফুট ৩ ইঞ্চি উচ্চ এবং নির্মল স্বর্ণে মোড়ান। তার চারিদিকে চারি অঙ্গুলি বা ৩ ইঞ্চি পরিমিত পার্শ্ব কাঠ, যার চারিদিক স্বর্ণের নিকেলে নির্মিত। পার্শ্ব কাঠের কাছে চারিপায়ায় চারটি স্বর্ণের কড়া বসান। প্রতি পার্শ্বস্থ দু‘টি কড়ার মধ্যে দিয়ে প্রবেশ করান হয়েছে স্বর্ণপাতে মোড়ান শিটীম কাঠের দু‘টি বহন দন্ড। এই টেবিলে দর্শণ রুটি রাখার জন্যে রয়েছে নির্মল স্বর্ণ নির্মিত থালা, রয়েছে স্বর্ণের চামুচ ও অন্যান্য স্বর্ণ নির্মিত প্রয়োজনীয় সামগ্রী।

দীপাধার হচ্ছে নির্মল স্বর্ণ নির্মিত সাতটি প্রদীপের একটি দীপবৃক্ষ। বৃক্ষটি- কান্ড, শাখা, গোলাধার, কলি ও পুস্প -সব মিলে অখন্ড। দীপবৃক্ষের এক পার্শ্ব হতে তিনটি শাখা এবং অপর পার্শ্ব  হতে আরও তিনটি শাখা নির্গত হয়েছে। প্রতিটি শাখায় রয়েছে বাদাম পুস্পের ন্যায় তিন গোলাধার, এক কলি ও এক পুস্প, আর কান্ডে রয়েছে চারি গোলাধার, তাদের কলি ও পুস্প। আবার প্রতিটি শাখার নীচে রয়েছে একটি করে কলি। আর সবকিছু তৈরী হয়েছে এক তালন্ত পরিমান স্বর্ণ দ্বারা।

ধূপবেদী হল শিটীম কাঠের ১ ফুট ৬ ইঞ্চি দীর্ঘ, ১ ফুট ৬ ইঞ্চি প্রস্থ ও ৩ ফুট উচ্চ চতুস্কোণ এবং তার শৃঙ্গ সকল তার সাথে অখন্ড এবং সম্পূর্ণ নির্মল স্বর্ণের পাতে মোড়া। তা বহনার্থে ছিল চারিকোনে স্বর্ণের কড়া, প্রতি পার্শ্বের দু‘টি কড়ার মধ্যে দিয়ে প্রবেশ করেছে শিটীম কাঠের বহনদন্ড যা সম্পূর্ণ নির্মল স্বর্ণে মোড়া।

মহাপবিত্র স্থানের আয়তন ১৫ ফুট প্রস্থ, ১৫ ফুট উচ্চ এবং ১৫ ফুট দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট ছিল, এই স্থানকে পবিত্রস্থান থেকে আলাদা করা হয়েছিল একটি সুন্দর ও দামী পর্দার সাহায্যে। এই অংশকে সম্পূর্ণ অন্ধকার রাখা হত এবং বৎসরে মাত্র একবার মহাপ্রায়শ্চিত্তের দিন, মহাঈমাম, লোকদের প্রায়শ্চিত্তের জন্যে সেখানে প্রবেশ করতেন। এই অংশে ছিল আল্লাহর উপস্থিতির চিহ্নস্বরূপ নিয়ম সিন্দুক।

নিয়ম সিন্দুক হল শিটীম কাঠের একটি বাক্স। এই বাক্স ছিল ৩ ফুট ৯ ইঞ্চি দীর্ঘ, ২ ফুট ৩ ইঞ্চি প্রস্থ ও ২ ফুট ৩ ইঞ্চি উচ্চ, যার অভ্যন্তর ও বহির্ভাগ খাঁটি স্বর্ণপাতে মোড়া। সিন্দুকের চারি পায়াতে রয়েছে চারটি স্বর্ণের কড়া। আর স্বর্ণ মোড়ান শিটীম কাঠের দু‘টি বহন দন্ড সিন্দুকের দুই পার্শ্বস্থ ঐ কড়াতে প্রবেশ করান ছিল। এই সিন্দুকে মূসাকে আল্লাহ প্রদত্ত দশ আজ্ঞার সেই প্রস্তর ফলক দু’টি রাখা হয়েছিল।

সিন্দুকের উপরে ছিল একটি পাপাবরণ। পাপাবরণ হল ৩ ফুট ৯ ইঞ্চি দীর্ঘ এবং ২ ফুট ৩ ইঞ্চি প্রস্ত একটি পেটান স্বর্ণের ফলক, যার দু‘প্রান্তে অখন্ড দু‘টি করূব মুখোমুখি উর্দ্ধে পক্ষ বিস্তার করে ঐ পাপাবরণকে আচ্ছাদিত করে রেখেছে। করূবদ্বয়ের দৃষ্টি নিবদ্ধ ঐ পাপাবরণের দিকে।

সমস্ত আসবাবপত্রসহ তাম্বুটি ইস্রায়েলীদের মাতৃভূমিতে যাবার সময় নিয়ে যেতে হয়েছিল। কনানে পৌঁছে এটিকে পুন:স্থাপন করা হয়েছিল এবং তাদের প্রার্থনার জন্যে তা ব্যাবহার করা হত। এই তাম্বুর সাধারণ গঠন পরিকল্পণাই ছিল শলোমনের অতিসুন্দর জেরুজালেমের এবাদতখানার জন্যে নমুনা। সরুবাব্বিল ও হেরোদ উভয়ই ঐ এবাদতখানার পুন:নির্মাণের সময় এর অনুকরণ করেছিলেন।

দ্বিতীয় বৎসরের প্রথম মাসের প্রথম দিনে আবাস তাম্বুটি দাঁড় করানো হল। সেইসময় সেটি মেঘে ঢেকে গেল। আর মূসা, হারূণ ও তার পুত্রদেরকে ঈমাম হিসেবে অভিষেক করে সেবা কাজে বহাল করলেন।

তাম্বু দাঁড়িয়ে যাবার পর তার উদ্বোধনীতে কারুণও উপস্থিত হল, জাঁকজমকপূর্ণ পোষাকে সু-সজ্জিত একটি খচ্চরের পিঠে করে আর তার পশ্চাদুসরণ করছিল মূল্যবান পোষাক পরিহিত তার সেবক দল।

কারুণ ছিল মূসার চাচাত ভাই আর সে ফেরাউনের অনুগ্রহে প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক হয়েছিল। মূসার পিতামহ কাহত ছিলেন কারুণেরও পিতামহ। কাহতের দু‘পুত্রের একজন ইয়াসহুর- যার পুত্র কারুণ। আর অপর পুত্র ইমরান হলেন মূসার পিতা। অন্যান্য বনি-ইস্রায়েলী অপেক্ষা সে অধিক পাককিতাব জানত, আর তার কন্ঠও ছিল সুমধুর। এই কারণে তাকে মুনাওয়ারও বলা হত। কিন্তু  সে ছিল অত্যাচারী।

কারুণ ফেরাউনের রাজ-দরবারের উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছিল। ফেরাউন তাকে বনি-ইস্রায়েলীদের জিম্মাদার নিয়োগ করেছিলেন। খোদার অনুগ্রহে সরকারী দায়িত্বের ক্ষমতাবলে সে বিরাট ধন-সম্পদের মালিক হয়েছিল। খোদা তাকে এত সম্পদ ছিয়েছিলেন যে, সেগুলো গুদামে রেখে তালাবদ্ধ করে চাবিগুলি একত্রিত করলে তা একজন শক্তিশালী মানুষের পক্ষে বহন করা কঠিন ছিল।-[২৮:৭৬] এই চাবিগুলো ছিল চামড়ার তৈরী, প্রতিটি এক আঙ্গুল পরিমান লম্বা।

যাহোক, কারুণ তার লোকজন নিয়ে সেখানে উপস্থিত হওয়ার সাথে সাথে উপস্থিত লোকদের রূখ পরিবর্তন হয়ে গেল। তারা তাদের দিকে মনোনিবেশ করল। তার মনি-মানিক্য খঁচিত পোষাক-পরিচ্ছদ এবং তার সেবকদের চাকচিক্যপূর্ণ আড়ম্বর দেখে বনি-ইস্রায়েলীদের অনেকে, যারা পার্থিব জীবন কামনা করত, তারা আফসোস করে বলল, হায়, কারুন যা প্রাপ্ত হয়েছে, আমাদেরকে যদি তা দেয়া হত! নিশ্চয় সে বড় ভাগ্যবান ।’
তবে যাদেরকে আল্লাহ জ্ঞান দিয়েছিলেন তারা এই আফসোস শুনে বলল, ‘ধিক তোমাদেরকে, যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে তাদের জন্যে আল্লাহর পুরস্কারই শ্রেষ্ঠ, আর ধৈর্য্যশীল ছাড়া কেউ এ পাবে না।’-[২৮-৭৯-৮০]

কারুণের আগমন ভঙ্গি মূসাকে একথা বুঝাতে চেষ্টা করল যে, ‘যদি তোমার নেতৃত্বের ধারা এভাবে জারী থাকে তাহলে তুমিও জেনে রাখ যে, একদল মানুষ আমাকে অনুসরণ করছে। আর আমি তাদের নেতা; অধিকন্তু আমি অগনিত হীরা-মানিক্যের মালিক। সুতরাং আমি তোমা অপেক্ষা উত্তম, তোমার অনুসরণ করা আমার জন্যে অত্যাবশ্যক নয়।’

এদিকে মূসাও বুঝতে পারলেন যে, কারুণ ভাল উদ্দেশ্য নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়নি। তাই তিনি তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি যা করছ এর পিছনে কি কারণ রয়েছে?’
সে বলল, ‘হে মূসা! তুমি নব্যুয়ত লাভ করে আমা অপেক্ষা অধিক মর্যাদার অধিকারী হয়েছ। তবে জেনে রাখ, আমিও পার্থিব সম্পদের দিক দিয়ে তোমার উপর প্রাধান্য লাভ করেছি। সুতরাং এ সম্প্রদায়ে আমার মর্যাদা তোমার চেয়ে কম নয়। সুতরাং তুমি যেরূপ সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব করছ তদ্রুপ আমিও কেন নেতৃত্বের অধিকারী হব না?’

কারুণ এভাবে স্বীয় অভিমত ব্যক্ত করলে মূসা বললেন, ‘এ বিষয়ে তো আমার কোন হাত নেই। আল্লাহর পক্ষ থেকে যা কিছু হচ্ছে, আমরা তা মেনে নিচ্ছি। এ ব্যাপারে তিনিই সর্বেসর্বা। তিনি যাকে ইচ্ছে নেতৃত্ব দান করেন, আবার যাকে ইচ্ছে নেতৃত্ব থেকে দূরে রাখেন।’

কারুণ তার এ জবাবে সন্তুষ্ট হল না, বরং সে খোদার কিতাবকে মূসার নিজের লেখা কিতাব বলে প্রমাণ করে  মূসাকে তার নেতৃত্ব থেকে হটিয়ে দিতে চাইল। সুতরাং সে কিতাবের বিস্তারিত জেনে নিল তারপর সে তার গোত্রের [লেভী] লোকদের ডেকে নিয়ে বলল, “মূসা যে আইন চালু করেছে, তা পালন করা অসম্ভব। ও আমার সম্প্রদায়!”, সে বলল, “তোমরা কি দেখছ না, যে আইন মূসা খোদার নামে তৈরী করেছে, তা কেবল পুরোহিত হারুণকে বিত্তশালী করবে? আর তাতে কয়েক বৎসরের মধ্যে সকল ইস্রায়েলীকে ভিক্ষের থালা হাতে তার দুয়ারে গিয়ে দাঁড়াতে হবে?” তারপর সে মূসার শরিয়তী আইনগুলো কিভাবে লোকদের জীবন-যাত্রায় বিপর্যয় সৃষ্টি করবে তা এক গল্পের [শরিয়তের কিছু আইন কাট-পেস্ট করে তৈরী] মাধ্যমে ব্যাখ্যা করল এভাবে:

“ধর, ইস্রায়েলী এক গরীব বিধবা তার দুই যুবতী কন্যা নিয়ে কোন রকমে দিনগুজরান করছে। স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বলতে যা ঐ বিধবার ছিল, তা হল এক খন্ড জমি, একটা গরু ও একটা গাধা। আবাদ করার মানসে ঐ মহিলা যখন তার জমি চাষ করতে গেল, তাকে বলা হল, শরিয়তী আইনে গাধা আর গরু একসাথে জুড়ে চাষ করা তার জন্যে বৈধ নয়। -(ডিউট্রোনোমি, ২২:১০); তারপর বীজ বোনার সময় তাকে বলা হল- একই জমিতে দু’জাতের বীজ বোনাও তার জন্যে বৈধ নয়। -(লেভিক্টাস, ১৯:১৯) যখন সে ফসল কাটতে গেল, বলা হল- ক্ষেতের কিনারার ফসল কাটাও তার জন্যে অবৈধ। -(লেভিক্টাস, ২৩:২২), সবকিছু নিয়মমত করে যখন সে ফসল মাড়াই করল, পুরোহিত হারুণ তার অংশ [উৎপন্ন ফসলের এক দশমাংশ] নিতে হাজির হল। -(লেভিক্টাস, ২৩:১০)

জমি আবাদে শরিয়তের এতসব বাঁধা-বিপত্তি এবং উৎপন্ন ফসলের ভাগ-বাটোয়ারায় বিরক্ত হয়ে ঐ বিধবা তার জমি বিক্রি করে দিল। তারপর সে ঐ জমি বিক্রির টাকায় কয়েকটা ভেড়ার বাচ্চা কিনে পুষতে লাগল। কিন্তু যখন সেগুলো বাচ্চা দিল, পুরোহিত হারুণ গিয়ে সবগুলো বাচ্চা তার প্রাপ্য বলে দাবী করল; এরপর বছর শেষে সে আবারো ঐ বিধবার নিকট যাকাতের অংশ [রাখালের লাঠির নীচ দিয়ে যাওয়া প্রতিটি দশম পশু] নিতে হাজির হল। -(ডিউট্রোনোমি, ১৮:৪), তখন ঐ মহিলা ক্ষোভের সাথে বলল, “এই পুরোহিতের এতসব দাবী আমার পক্ষে আর পূরণ করা সম্ভব না, ওগুলো জবাই করে খাওয়াই বরং আমার জন্যে উত্তম।”

তারপর যখন সে সেগুলো জবাই করল, তখন হারুণ গিয়ে তার কাঁধের মাংস, দুই চোঁয়াল এবং কলিজা নিতে হাজির হল।-(ঐ আয়াত- ৩), ঐ মহিলা এতে ক্ষিপ্ত হয়ে চিৎকার করে বলল, “ও পুরোহিত! এতই যদি তোমার চাহিদা হয়, তবে আমি পুরোটাই খোদাকে উৎসর্গ করলাম।”
উত্তরে হারুণ বলল, “সেক্ষেত্রে পুরোটাই আমার।” -(গণণাপুস্তক, ১৮:১৪), আর সে ঐ বিধবা ও তার কন্যা দু;টোকে বঞ্চিত ও সম্পূর্ণ নি:স্ব করে, সবটা মাংস নিয়ে চলে গেল।” -(গণণাপুস্তক R. ১৮:২-৩; তানখ, কোরাহ, ৪-৬).

“এখন, ও আমার সম্প্রদায়!” কোরাহ বলল, “এই আইনগুলো, যা তোমাদেরকে কয়েক বছরের মধ্যে ঐ বিধবার মত পুরোপুরি নি:স্ব এক ভিক্ষুকে পরিণত করে ফেলবে, আর বিত্তশালী করে তুলবে কেবল ঐ পুরোহিত হারুণকে- তা খোদার কাছ থেকে এসেছে বলে কি তোমরা বিশ্বাস কর? না, কখনো না, বরং মূসা নিজে সেগুলো তোমাদের জন্যে লিখে এনেছে, ও আমার সম্প্রদায়! তারা তো কেবল তোমাদের মাল-সম্পদ চুরি করে নিজেদেরকে সম্পদের মালিক বানাতে চায়।”

কারুণের এসব কথা শুনতে পেয়ে মূসা তার কাছে এসে বললেন, ‘কি কারণে তুমি এসব বলে বেড়াচ্ছ? আর কেন বা তুমি হারুণের নামে এমন অপবাদ দিচ্ছ? হারুণ তোমার কি ক্ষতি করেছে?”
লেবীরা বলল, “খোদা আমাদের মাঝে রয়েছেন, অথচ তুমি কেবল হারুণ আর তার সন্তানদেরকে তাঁর সেবা কাজে নিয়োজিত করেছ। তুমি সব কাজে সীমা ছাড়িয়ে গেছ।”
মূসা কিছু বলার আগে কারুণ বলে বসল, ‘ও মূসা! ভাল কথা, আল্লাহ তোমাকে তূরপর্বতে ডেকে নিয়ে নব্যুয়ত দান করেছেন, বেশ, মেনে নিলাম, কিন্তু তোমার ভাই হারুণ তো আমাদের মাঝেই ছিল-তার নেতৃত্বের লক্ষণ কি?’
তিনি বললেন, ‘আল্লাহই তাকে আমার সাহায্যকারী হিসেবে দিয়েছেন।’
কারুণ বলল, “কসম আল্লা, তুমি কোন যৌক্তিক কারণ বা প্রমাণ না দিলে আমি কখনও এ বিশ্বাস করব না।”
তখন মূসা বললেন, “আগামী কাল সকালে আমি এর প্রমাণ দেব।”

পরদিন সকালে মূসা বারগোত্র প্রধান ও হারুণকে একটি করে লাঠি আবাস তাম্বুর মধ্যে সাক্ষ্য সিন্দুকের পাশে রাখতে নির্দেশে দিলেন। ঐসময় হারুণের নেতৃত্বের লক্ষণ হিসেবে তার মরা লাঠিতে ফুল ফুঁটল।

এরপরও কারুণের চোখেমুখে হিংসার মনোভাব লক্ষ্য করে মূসা শান্তস্বরে তাকে বললেন, ‘হে কারুণ, আল্লাহ তোমাকে অগনিত ধন-সম্পদ ও অর্থের মালিক বানিয়েছেন, তোমাকে ইজ্জত ও সম্মান দান করেছেন। সুতরাং এর হক আদায় কর। ফকীর, মিসকীন ও দরিদ্রদিগকে যাকাত প্রদান কর ও অন্যান্য ভাবে দান খয়রাত কর।’ এই কথা বলে মূসা তাকে স্বরণ করিয়ে দিলেন যে নেতৃত্ব থেকে দূরে রাখলেও আল্লাহ তাকে প্রচুর সম্পদের মালিক বানিয়েছেন। সুতরাং তার উচিৎ এইসব ফালতু চিন্তা বাদ দিয়ে বরং ঐসব অনুগ্রহের জন্যে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা।”

আর মূসার অনুসারীরা তাকে বলল, ‘হে কারুণ, দেমাগ করবেন না, আল্লাহ দাম্ভিকদের পছন্দ করেন না। আল্লাহ যা আপনাকে দিয়েছেন তা দিয়ে পরলোকের কল্যাণ অনুসন্ধান করেন এবং ইহলোকে আপনার বৈধ সম্ভোগকে উপেক্ষা করবেন না। আপনি সদয় হন, যেমন আল্লাহ আপনার প্রতি সদয়। আর পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবেন না। আল্লাহ ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারীদের ভালবাসেন না।’-[২৮:৭৬-৭৭]

‘যার যেমন বোধ’-ঐশী বিধান অনুসারে সম্পত্তির একদশমাংশ গরীবের মধ্যে বিলিয়ে দিয়ে তার প্রতি পরকালের জন্যে কিছু সঞ্চয়ের উপদেশ শুনে কারুণ মনে করল মূসা তার সম্পদের এক বিরাট অংশ নিয়ে যেতে চাচ্ছেন-যাকাত এবং দানের মাধ্যমে। তাই সে অহংকার ও ঔদ্ধত্য সহকারে বলল, ‘হে মূসা, আমি সম্পদ অর্জন করার বিভিন্ন কৌশল শিখেছি। আমি এই ধন আমার নিজস্ব জ্ঞান-গরিমা দ্বারা প্রাপ্ত হয়েছি।-[২৮:৭৮] নানা কৌশল অবলম্বন করে এই সমস্ত ধন-সম্পদ সঞ্চয় করেছি। সুতরাং ধন-সম্পদ বিষয়ে আমার গৌরব অনর্থক নয়। যা আমি স্বীয় শ্রম ও কৌশল ব্যাবহার করে অর্জন করেছি তা সম্পর্কে কথা এই যে, এ আমার প্রতি দয়া করা হয়েছে এ সঠিক নয়। আমি নিজে পরিশ্রম করে অর্জন করেছি হেতু এর সম্পূর্ণ স্বত্ত্ব আমার। সুতরাং এতে অন্য কারও হক থাকে কিভাবে?’

যাত্রাপথ
সুতরাং কোনভাবে মূসাকে জব্দ করতে না পেরে সে তাকে ভীত ও লোক সমক্ষে লজ্জিত ও হেয় করার জন্যে এক ঘৃণ্য পরিকল্পণা করল- মূসাকে ব্যভিচারের অপবাদ দিতে চাইল। তাই সে এক দু:শ্চরিত্রা নারীর সাথে এই মর্মে চুক্তি করল যে, সে নারীকে মোটা অংকের অর্থ প্রদান করবে আর উক্ত নারী মূসার বিরুদ্ধে দশপতির কাছে ব্যভিচারের অভিযোগ দায়ের করবে, বলবে যে, মূসা তার সাথে ব্যভিচার করেছেন। কারুণ এই চুক্তির উপর উক্ত নারীকে অর্থ প্রদান করল আর সেই মহিলা অত:পর চুক্তিমত দশপতির কাছে গেল। তারপর দশপতি, পঞ্চাশপতি, শতপতি, সহস্রপতি হয়ে অভিযোগটি মূসার দরবারে পৌঁছিল।

মূসা ঐ নারীর অভিযোগ শুনে স্তম্ভিত হলেন। তিনি বুঝতে পারলেন তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়েছে। তিনি তৎক্ষণাৎ সিজদায় পড়লেন এবং আল্লাহর কাছে মুনাজাত শেষে উক্ত নারীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘আমি তোমাকে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি তুমি সত্যি করে বল, কি কারণে তুমি আমার বিরুদ্ধে এই অপবাদমূলক কথা বলছ?’
সে বলল, ‘যেহেতু আপনি আমাকে আল্লাহর কসম দিয়েছেন, সেহেতু মিথ্যে বলা যাবে না। প্রকৃত ঘটনা হল এই- কারুণ আমাকে মোটা অংকের অর্থ প্রদান করেছেন যেন আমি আপনার সম্পর্কে এমন বলি। এখন আমি দয়াময় আল্লাহর কাছে আমার অপরাধের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তওবা করছি।’
মূসা সাথে সাথে সিজদায় পড়ে আল্লাহর কাছে কারুণের বিচার প্রার্থনা করলেন। আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন, ‘জমিনকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যেন সে তোমার নির্দেশ মত কাজ করে।’
এদিকে কারুণও মূসার অপদস্থতা স্বচক্ষে দেখার জন্যে নিজেকে আড়াল করে সহস্রপতির সাথে মূসার মজলিসে গিয়েছিল। কিন্তু ঐ নারী সবকিছু স্বীকার করাতে পালিয়ে এসে তার তাম্বুতে আশ্রয় নিল।

পরদিন মূসা কারুণের তাম্বুর কাছে এসে সেখানে উপস্থিত ইস্রায়েলীদেরকে বললেন, ‘তোমরা এই দুষ্ট লোকের তাম্বুর কাছ থেকে সরে যাও। তার কোন জিনিষ তোমরা ছুঁয়োনা; যদি তা কর তবে তার পাপের জন্যে তোমরাও ধ্বংসের অধীন হবে।’

লোকেরা তার তাম্বুর কাছ থেকে সরে গেল। মূসা বললেন, ‘এই ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর কিতাব ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রকারী।’

মূসা জমিনকে নির্দেশ দিলেন, ‘হে জমিন! কারুণকে তার ধন-সম্পদ ও সহায়-সম্বলসহ গ্রাস কর।’
তৎক্ষণাৎ কারুণের তাম্বুর নীচের মাটি দু‘ভাগ হতে শুরু হল। কারূণ চীৎকার করে লাফ দিয়ে তার তাম্বুর বাইরে বেরিয়ে এল। কিন্তু সে পালিয়ে যেতে পারল না। জমিন তাকে, তার পরিবারের সমস্ত লোক এবং তার সহায়-সম্পদ সবকিছু ধীরে ধীরে গিলে ফেলতে শুরু করল।

জমিন তাকে হাঁটু পর্যন্ত গ্রাস করে ফেলল। মূসা জমিনের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তাকে আরও শক্ত ভাবে ধরো।’
এভাবে জমিন যখন তাকে গলা পর্যন্ত গ্রাস করল, মূসা চিৎকার করে বললেন, ‘হে কারুণ, এখনও সময় আছে- আল্লাহর উপর ঈমান আন আর যাকাত প্রদান করার ওয়াদা কর।’
সে বলল, ‘হে মূসা, আমি তোমার কথায় জীবন থাকতে আমার সম্পদের এক কানা-কড়িও বিলিয়ে দেব না।’
মূসা জমিনকে আদেশ করলেন, ‘তাকে গ্রাস করে ফেল।’

কারুণ, তার আবাস তাম্বু, ধন-ভান্ডার, সমস্তকিছু জমিনের ফাঁটলের মধ্যে দেখতে দেখতে অদৃশ্য হয়ে গেল। উপস্থিত ইস্রায়েলীরা এই দৃশ্যে ভীত হয়ে চীৎকার করে ছুটে পালাল। তারা ভাবল জমিন হয়ত: তাদেরও গিলে ফেলবে। কাজ শেষে জমিনের উপরকার ফাঁটলটা আবার বন্ধ হয়ে গেল।

এভাবে আল্লাহ কারুণকে ও তার গৃহকে মাটির নীচে মিলিয়ে দিলেন। তার পক্ষে এমন কোন দল ছিল না যারা আল্লাহর শাস্তির বিরুদ্ধে তাকে সাহায্য করতে পারত। আর সে নিজেও আত্মরক্ষা করতে পারেনি। আগের দিন যারা তার মত হতে চেয়েছিল তারা তখন বলতে লাগল, ‘দেখ! আল্লাহ তাঁর দাসদের মধ্যে যার জন্যে ইচ্ছে জীবনের উপকরণ বাড়ান ও যার জন্যে ইচ্ছে, তা কমান। যদি আল্লাহ আমাদের উপর সদয় না হতেন তবে আমাদেরকেও তিনি মাটির নীচে মিলিয়ে দিতেন। দেখ! অবিশ্বাসীরা সফল হয় না।’-(২৮:৮১-৮২)

কারুণ নিহত হবার পর ইস্রায়েলীরা বেঁকে বসল। তারা মূসাকে বলল, “ও মূসা! আমরা এই কিতাব কখনও গ্রহণ করতে পরব না।”
মূসা বললেন, “তোমাদের ৭০জন প্রতিনিধি এ কিতাবের সত্যায়ন করেছে এবং তারা নিজেদেরকে তার সত্যতার সাক্ষ্যবহনকারী হিসেবেও ঘোষণা দিয়েছে, এরপরও কি তোমরা বলছ যে, তা খোদার নয়?”
তারা বলল, “আমরা এ কিতাব গ্রহণ করতে পারছিনে, কারণ, তার আইনগুলো পালন করা কঠিন।”
তারা কিতাব পরিবর্তন করার দাবী করল।

এসময় ক্ষমাশীল ও দয়ালু খোদা তাঁর বেঁছে নেয়া এই অবাধ্য জাতির জন্য এক অভূতপূর্ব কাজ করলেন। [যাতে করে, আল্লাহ ও তাঁর রসূলদের সাথে ইস্রায়েলীদের আচার ও ব্যবহার, পরবর্তীতে অন্যান্য জাতির বিচার্য হয়।], তিনি তাদের সাথে সরাসরি কথা বললেন এবং এই নির্দেশ দিলেন, “আমার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এ কিতাব খুব মজবুতির সাথে গ্রহণ কর, আর এর আহকামসমূহ স্মরণ কর, যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার।”-(২:৬৩)

ছয় লক্ষ [গননা পুস্তক, ১:৪৬ অনুসারে, ৬,০৩,৫৫০ জন] ইস্রায়েলী স্বকর্ণে খোদার এই আদেশ শুনল। আর তার উত্তরে তারা সকলে [কতজন বাদ ছিল তা জানা যায়নি তবে সুনিশ্চিত ৭২জন তাদের সাথে ছিল না] বলল, “আমরা শুনলাম, আর অমান্য করলাম।”-(২:৯৩)

আল্লাহ অধিকাংশ ইস্রায়েলীদের অন্তরে কিতাবের প্রতি শৈথিল্য দেখতে পেলেন। সুতরাং তিনি জিব্রাইলকে নির্দেশ দিলেন- তূর পাহাড়টিকে তুলে তাদের মাথার উপর ঝুলন্ত অবস্থায় রেখে দিতে।তখন সে পাহাড়কে তুলে তাদের মাথার উপর এমনভাবে রাখল যে, দেখলে মনে হচ্ছিল তা এক ঝুলন্ত ছাদ এবং তারা অনুমান করেছিল যে, তা তাদের উপর পড়বে। আর তাদের সকলকে একসাথে নিষ্পেষিত করে দেবে। -(৭:১৭১)

এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে তা ইস্রায়েলীদের কল্পণাতেও ছিল না। তারা স্পষ্ট বুঝতে পারল, তূর পর্বত তাদের জীবনের ইতি টেনে দিতে যাচ্ছে। তখন জীবন-মরণের ঐ প্রান্তে দাঁড়িয়ে তারা খোদার নিকট তাওরাত গ্রহণ করার পূর্ণ প্রতিশ্রুতি দিল। তারা ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে, ক্রন্দন করতে করতে বলল, “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা অঙ্গীকার করছি, তোমাকে ছাড়া অন্য কারো উপাসনা করব না, পিতামাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতীম ও দীন-দরিদ্রের প্রতি সদ্ব্যবহার করব, সৎ কথাবার্তা বলব ও সকলকে সদুপোদেশ দেব, নামাজ প্রতিষ্ঠা করব এবং যাকাত আদায় করব।”-(২:৮৩)

খোদা তাদের অঙ্গীকার গ্রহণ করলেন এবং বললেন, ‘আর তোমরা পরস্পর খুনোখুনি করবে না এবং নিজদিগকে দেশ থেকে বহি:স্কার করবে না।’-(২:৮৪) তারা এতেও পূর্ণ প্রতিশ্রুতি প্রদান করল এবং বলল, “কেবল তুমি আমাদের সাথে থেক।”

তখন আল্লাহ বললেন, “নিশ্চয় আমি তোমাদের সঙ্গে আছি, যদি তোমরা নামাজ প্রতিষ্ঠিত কর ও যাকাত প্রদান কর এবং আমার রসূলগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর, তাদের সম্মান কর এবং উত্তম ঋণ প্রদান কর- তবে আমি তোমাদের দোষ অবশ্যই মোচন করব এবং তোমাদের বেহেস্তে দাখিল করব, যার নীচে নদীসমূহ প্রবাহিত, এরপরও কেউ অবিশ্বাস করলে সে সত্যপথ হারাবে।” -(৫:১২)

আল্লাহ অত:পর জিব্রাইলকে পাহাড় সরিয়ে নেবার নির্দেশ দিলেন, তখন সে তা সরিয়ে পুন:রায় স্বস্থানে রাখল। আর বনি-ইস্রায়েলও বিপদমুক্ত হল।

ইস্রায়েলীদের প্রতিশ্রুতি পালনের বিষয়টি সোজা ও সহজ করার জন্যে তাদের বার গোত্রের বারজন প্রধান নিয়োগ করা হল। প্রত্যেক গোত্র প্রধানকে দায়িত্ব দেয়া হল যেন, সে নিজে খোদাকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি পালন করার পাশাপাশি নিজগোত্রের লোকেরাও যাতে তা পালন করে সে ব্যাপারেও পুরো খোঁজখবর রাখবে।

দ্বিতীয় মাসের বিশ দিনের দিন সাক্ষ্য তাম্বুর উপর থেকে মেঘ সরে গেল। তখন ইস্রায়েলীরা সিনাই মরুএলাকা থেকে যাত্রা শুরু করল। খোদার আদেশ অনুসারে এই প্রথমবারের মত তারা যাত্রাপথে পা বাড়াল। সেই মেঘ পারণ মরু এলাকায় এসে স্থির হয়ে না দাঁড়ান পর্যন্ত তারা চলতেই থাকল।

আবাস-তাম্বুর উপর থেকে যখন মেঘ সরে যেত তখন ইস্রায়েলীরা যাত্রা শুরু করত। আর যেখানে সেই মেঘ স্থির হয়ে দাঁড়াত সেখানেই তারা তাম্বু ফেলত। মেঘ সরে গেলেই তারা যাত্রা শুরু করত- তা দিনেই হোক বা রাতে। আর যতদিন মেঘ আবাস তাম্বুর উপরে থাকত তা সে দু‘দিন হোক বা এক মাস কিম্বা তার বেশী সময়, ইস্রায়েলীরা তাম্বু ফেলে সেখানেই অবস্থান করত, যাত্রা করত না।

যখনই ইস্রায়েলীরা সাক্ষ্য-সিন্দুকটি নিয়ে রওনা হত তখন মূসা বলতেন, ‘হে খোদা! তোমার শত্রুরা সব ছড়িয়ে পড়ুক আর যারা তোমাকে ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখে তারা তোমার সামনে থেকে পালিয়ে যাক।’ আর যখনই মেঘ থেমে যেত তিনি বলতেন, ‘হে খোদা, আমাদের মাঝে তুমি ফিরে এসো।’

ইস্রায়েলীদের যাত্রা ছিল উত্তরমুখী এবং কনানের দক্ষিণ সীমায় শেষ হল। এখানে পৌঁছানোর পর মূসাকে নির্দেশ দেয়া হল পবিত্র ভূমি কনান দেশে (সিরিয়ায়) প্রবেশ করতে এবং আগাম জানিয়ে দেয়া হল আল্লাহ এই পবিত্র ভূমির আধিপত্য তাদের ভাগ্যে লিখে দিয়েছেন- যা বাস্তবায়িত হবে। ‘তোমরা এই জনপদে প্রবেশ কর এবং যেখানে ইচ্ছে যাও ও যা ইচ্ছে খাও, ‘মাথা নীচু করে প্রবেশ কর’ (কর্মজনিত আদব) আর বল, ‘ক্ষমা চাই’ (বাক্যজনিত আদব) আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করব; আর যারা সৎকর্ম করে তাদের জন্যে আমার দান বাড়িয়ে দেব।’-(২:৫৮)

সুতরাং মূসা শিবির স্থাপনের পর প্রত্যেক বংশ থেকে একজন করে, নেতৃস্থানীয় বারজনকে কনান দেশে পাঠালেন, যেন তারা গিয়ে ঐ দেশের প্রয়োজনীয় খবরাখবর নিয়ে আসে। দেশের ভূমি, এর উর্বরাশক্তি এবং উৎপন্ন ফসল, দেশের শহরগুলি ও লোকদের প্রকৃতি ইত্যাদি জানাই ছিল প্রকৃত উদ্দেশ্য। যাত্রার পূর্বে মূসা তাদেরকে বলে দিয়েছিলেন, ‘তোমরা সেখানে যা কিছু দেখতে পাবে, তা প্রথমে আমাকে জানাবে। আমার অনুমতি ব্যতিত কারও কাছে কোনকিছু বর্ণনা করবে না।’

প্রতিনিধি দলটি রওনা হল এবং দেশের একদম উত্তর সীমা পর্যন্ত গিয়ে অন্যপথ দিয়ে ফিরে এল। এই যাত্রায় চল্লিশ দিন সময় লেগেছিল যা এই ছোট দেশটি দেখার জন্যে যথেষ্টই ছিল। যাত্রা পথে, এক পর্যায়ে শহরের বাহিরে পথিমধ্যে অমালিকা সম্প্রদায়ের আউজ বিন উনূক নামক এক ব্যক্তির সাথে তাদের সাক্ষাৎ হয়েছিল। আউজ তাদের সাথে কথাবার্তা বলার পর বুঝতে পারল যে, তারা তাদের সাথে যুদ্ধ করতে এসেছে। তখন সে রাগান্বিত হয়ে তাদের বারজনকে একাই বন্দী করে রাজদরবারে হাজির করল এবং রাজাকে তাদের অভিসন্ধি সম্পর্কে অবহিত করল। সুতরাং তাদেরকে আটক রাখা হল এবং দরবারে তাদের সম্পর্কে পরামর্শ চলল। উপদেষ্টাদের কেউ কেউ বলল, ‘তাদেরকে হত্যা করা হোক।’
আবার কেউ কেউ বলল, ‘তাদেরকে মুক্তি দেয়া হোক।’
অবশেষে সিদ্ধান্ত হল তাদেরকে মুক্তি দেয়া হবে, যেন তারা ফিরে গিয়ে তাদের সম্প্রদায়ের কাছে অমালিকাদের দৈহিক আকৃতি ও শক্তির কথা বর্ণনা করতে পারে। আর যেন তাদের যুদ্ধের সাধ একেবারেই মিটে যায়। ফলে তারা মুক্ত হল।

মুক্তিলাভ করে ফিরে আসার সময় দেশটির উর্বরাশক্তি সম্বন্ধে ব্যাখ্যা দেয়ার জন্যে, প্রতিনিধি দলটি স্কোল থেকে কতকগুলি থোকাসহ আঙ্গুর ফলের একটা ডাল কেটে নিয়ে এসেছিল। যা দু‘জনে একটা লাঠিতে ঝুলিয়ে এনেছিল। এছাড়া তারা কিছু ডালিম ও ডুমুর এনেছিল।

প্রতিনিধি দলটি ফিরে এসে মূসার কাছে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করল। তারা বলল, ‘দেশটা সত্যিই দুধ-মধুতে ভরা, কোন কিছুরই অভাব নেই সেখানে। এই হল সেখানকার ফল (থোকা শুদ্ধ আঙ্গুর লতা, ডালিম, ডুমুর প্রভৃতি ফল তারা মূসার সম্মুখে রাখল।)’ তার পর তারা বলল-‘কিন্তু যারা সেখানে বাস করে তাদের গায়ে শক্তি বেশী এবং তাদের শহরগুলোও বেশ বড় বড় আর প্রাচীর বেষ্টিত। অনাকের বংশের লোকদেরও আমরা সেখানে দেখেছি । অমালেকীয়েরা বাস করছে নেগেভে; হিত্তীয়, যিবূষীয় ও ইমোরীয়েরা পাহাড়ী এলাকায়, আর কনানীয়দের বাস সমুদ্রের কাছে এবং জর্দান নদীর কিনারা ধরে।’

কিন্তু শক্তিশালী লোকদের কথা শুনলেও মূসার মধ্যে এর কোন প্রভাব পড়ল না। কেননা পূর্বেই আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে তাকে বিজয় ও সাফল্যের বাণী শুনিয়ে রেখেছিলেন। সুতরাং তিনি নিশ্চিত ছিলেন অমালিকাদের শক্তি ও প্রকান্ড অবয়ব কোনই কাজে আসবে না। তিনি মোকাবেলার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে সকলকে আদেশ দিলেন।

বনি-ইস্রায়েলীরা প্রতিদ্বন্দ্বী সম্প্রদায়ের এত বড় শক্তি ও দৈহিক প্রকান্ডতার কথা জানতে পারলে যুদ্ধ করতে রাজি হবে না, কেননা, শত শত বৎসর গোলামী করে তারা হীনমন্যতায় ভুগছিল এবং তাদের আত্মবিশ্বাসের এতটুকুও অবশিষ্ট ছিল না। এটা মূসা জানতেন। সুতরাং তিনি প্রতিনিধি দলের বারজনকেই এইবলে সতর্ক করে দিলেন যেন তারা কোন অবস্থায়ই বনি-ইস্রায়েলীদের কাছে অমালিকা সম্প্রদায়ের দৈহিক শক্তি ও প্রকান্ডতার কথা বর্ণনা না করে- যেন তা সম্পূর্ণ গোপন রাখে।

কিন্তু, শেষপর্যন্ত কাজ হল মূসার নির্দেশের পরিপন্থী। যদিও তারা প্রকাশ্যভাবে কাউকে কিছু বলেনি। কিন্তু প্রত্যেকে স্বীয় বন্ধুর কাছে গোপনে অমালিকাদের শক্তিমত্তার কথা বর্ণনা করল, দু‘জন ছাড়া। এরা ছিল, ইউশায়া ইবনে নূন (মূসার ভগ্নি মরিয়মের স্বামী) ও কালেব বিন ইউকেনা। আস্তে আস্তে এ সম্পর্কে সকল ইস্রায়েলীই অবগত হয়ে পড়ল এবং অমালিকাদের দৈহিক শক্তি ও আকৃতি সম্পর্কে রীতিমত আলোচনা শুরু হল। লোকেরা তাদের সম্পর্কে অতিরঞ্জিত তথ্য ছড়িয়ে দিল। কেউ কেউ বলতে লাগল, ‘তারা এক একজন এক‘শ হাত লম্বা ও ষাট হাত চওড়া।’
কেউ কেউ বলল, ‘তাদের কেউ সমুদ্রে নামলে পানি তার হাঁটু সমান হয়।’
কেউ কেউ এদেরকেও ছাড়িয়ে গেল। তারা বলল, “তারা সমুদ্র থেকে মাছ ধরে সূর্য্যর আগুণে সেঁকে খায়।”

তবে প্রতিনিধিদের বারজনই একমত ছিল যে, দেশটি ভাল এবং তারা একান্তভাবেই তা পেতে চায়। তাই যখন দেশটি দখল করার কথা উঠল- তারা দু’দলে বিভক্ত হয়ে গেল।

প্রতিনিধি দলের দশজন সীমালংঘন করল। তারা বলল, ‘শহরগুলি প্রাচীর বেষ্ঠিত এবং এর লোকগুলি ভীমাকায় যোদ্ধা, সেইজন্যে দেশটি দখল করা সম্ভব নয়।’
সাধারণ ইস্রায়েলীরা নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ল। তারা যুদ্ধ সম্পর্কে কোন চিন্তাই মাথায় আনতে চাইল না। তারা পরস্পর বলতে লাগল, ‘লোহিত সাগর পার হয়ে এসে এখন এদের হাতে যুদ্ধে মরার কি অর্থ হতে পারে?’

তখন মূসা বললেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা স্মরণকর আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি তোমাদের মধ্যে থেকে নবী করেছেন, তোমাদেরকে এ রাজ্যের অধিপতি করেছেন আর বিশ্বে যা কাউকে দেননি তা তোমাদেরকে দিয়েছেন। হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহ তোমাদের জন্যে যে পবিত্র ভূমি নির্দিষ্ট করেছেন সেখানে প্রবেশ কর আর পিছু হোটও না, হোটলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পড়বে।’
তারা বলল, ‘হে মূসা! সেখানে এক দুর্দান্ত সম্প্রদায় রয়েছে, আর তারা সেখান থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত আমরা সেখানে প্রবেশ করব না। তারা সেখান থেকে বের হয়ে গেলে আমরা প্রবেশ করব।’-(৫:২০-২২)

দলের দু’জন, কালেব ও ইউশায়া বনি-ইস্রায়েলীদের দুর্বল মনোভাব দেখে তাদেরকে উৎসাহিত করতে বললেন, “সমগ্র বিশ্ব আল্লাহর হাতের মুঠোয় রয়েছে। তাঁর অনুমতি ব্যতিত কেউ কারও ক্ষতি করতে বা উপকার করতে পারে না। সুতরাং অমালিকাদের প্রকান্ড দেহ ও শক্তি কোনই কাজে আসবে না, যেহেতু আল্লাহর সাহায্যের ওয়াদা আমাদের সাথে রয়েছে। সুতরাং‘তোমরা প্রবেশ দ্বারে তাদের মোকাবেলা কর। প্রবেশ করতে পারলেই তোমাদের জয় হবে। আর তোমরা বিশ্বাসী হয়ে আল্লাহর উপরই নির্ভর কর।’-(৫:২৩)

কালেব ও ইউশায়ার প্রচুর চেষ্টা সত্ত্বেও অধিকাংশ ইস্রায়েলী দেশটি দখলে রাজী হল না। তারা যখন তাদের নবী মূসার কথাই বিশ্বাস করছে না, তখন অন্যদের কথা কি করে বিশ্বাস করবে? তারা মূসাকে স্পষ্ট জানাল, “হে মূসা, যতদিন তারা সেখানে থাকবে ততদিন আমরা সেখানে প্রবেশ করব না। সুতরাং তুমি ও তোমার প্রতিপালক যাও ও গিয়ে যুদ্ধ কর।”-(৫:২৪)

তদুপরি তারা যখন শুনল শহরে প্রবেশের সময় তাদেরকে ‘হিত্তাতুন’- ক্ষমা চাই বলতে বলা হয়েছে, তখন তারা ব্যঙ্গ করে বলতে লাগল ‘হিন্তাতুন’-গম গম। খোদায়ী বিধানের এই শব্দগত ও অর্থগত বিকৃতি সাধনের কারণে তাদের উপর আল্লাহ অসন্তুষ্ট হলেন। তাছাড়া প্রতিনিধিদলের দশজন সীমালঙ্ঘণ করেছিল ছিল। এই কারণে তিনি আকাশ থেকে শাস্তি পাঠান। তারা বজ্রপাতে মারা পড়ল।

কিন্তু তারা (দশ প্রতিনিধি) সীমালংঘন করেছিল তারা তাদেরকে যা বলা হয়েছিল তার বদলে অন্যকথা বলল। সেজন্যে সীমালংঘনকারীদের উপর আমি আকাশ থেকে শাস্তি পাঠালাম, কারণ তারা ছিল সত্যত্যাগী।’-(২:৫৯)

এরকম পরিস্থিতিতে মূসা আর কি করবেন? তিনি আল্লাহর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমি ও আমার ভ্রাতা ব্যতিত অন্যকারও উপর আমার কর্তৃত্ব নেই; সুতরাং তুমি আমাদের ও সত্যত্যাগী সম্প্রদায়ের মধ্যে ফয়সালা করে দাও।’
আল্লাহ বললেন, ‘তবে এ চল্লিশ বৎসর তাদের জন্যে নিষিদ্ধ রইল। তারা পৃথিবীতে উদ্ভ্রান্তের মত ঘুরে বেড়াবে। সুতরাং তুমি সত্যত্যাগী সম্প্রদায়ের জন্যে দুঃখ কোরও না।-(৫:২৫-২৬)

খোদা মুসাকে পিছন ফিরে মরুএলাকায় ফিরে যেতে বললেন। নির্দেশমত ইস্রায়েলীরা এগিয়ে গেল এবং আরবীয় মরুভূমির সিনাই উপত্যকার তাঁহ প্রান্তরে পৌঁছিল। আর খোদা তাদেরকে মরুর ঐ প্রান্তরে আঁটকে দিলেন। এখন এখান থেকে তারা অমালিকাদের দেশেও যেতে পারবে না আবার ইচ্ছে করলে মিসরেও ফিরতে পারবে না। আর তাদের উপর আরোপ করা হল লাঞ্ছনা ও পরমুখাপেক্ষিতা। তারা আল্লাহর রোষানলে পতিত হয়ে ঘুরতে থাকল। এমন হল এ জন্যে যে, তারা আল্লাহর বিধি-বিধান মানত না এবং নবীগণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করত। তার কারণ, তারা ছিল নাফরমান, সীমালঙ্ঘনকারী।-(২:৬১)

তাঁহ অর্থ পথভ্রষ্ট হয়ে ঘোরা। কনান দেশটি দেখতে যে চল্লিশ দিন লেগেছিল, সেই চল্লিশ দিনের প্রতিদিনের জন্যে এক বৎসর করে মোট চল্লিশ বৎসর ইস্রায়েলীরা এই প্রান্তরে নজর বন্দী ছিল। তারা চাইত এখান থেকে বেরিয়ে মিসরে ফিরে যেতে। সারাদিন ঘুরে ঘুরে সন্ধ্যায় তারা নিজেদেরকে ঐস্থানেই পেত যেখান থেকে সকালে রওনা হয়েছিল। এই প্রান্তটির দৈর্ঘ্য ছিল ত্রিশ ফারসেক অর্থাৎ নব্বুই মাইল আর প্রস্থ ছিল নয় ফারসেক বা সাতাশ মাইল।

প্রতিটি বিষয়ে ইস্রায়েলীদের আল্লাহর উপর নির্ভর করা উচিৎ ছিল কেননা, তিনি তাদের প্রতিটি প্রয়োজনে সাহায্য করেছেন। কিন্তু এই বিশ্বাস রক্ষা করতে তারা ব্যর্থ হল। এ কারণে তাদেরকে কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হয়েছিল। শুধুমাত্র কালেব ও ইউশায়া ছাড়া বিশ বৎসরের অধিক বয়সের সকলকেই চল্লিশ বৎসর ধরে অমানুষিক দু:খ-কষ্টের মধ্যে প্রান্তরে ঘুরে একসময় মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল। অবিশ্বস্ত দশজন চর অবশ্য পূর্বেই মারা পড়েছিলেন। যে যাত্রা কমপক্ষে দুই বৎসরের মধ্যে শেষ হত, অবিশ্বস্ততার শাস্তিস্বরূপ তাদেরকে চল্লিশ বৎসর প্রান্তরের গোলক ধাঁধাঁয় ঘুরে অতিবাহিত করতে হল।

প্রত্যেকের জন্যেই বৎসরগুলি ছিল অতি কঠিন। তাদের জন্যে পরতে পরতে অপেক্ষা করছিল দুঃখ-কষ্ট ও মৃত্যু। মূসার ভাগ্য ছিল আরও খারাপ। নেতা হিসেবে তাকে এই বিদ্রোহী জনগোষ্ঠির নিন্দা ও দুর্ব্যাবহার সহ্য করতে হয়েছিল। তাদের কষ্ট আর মৃত্যু স্বচক্ষে অবলোকন করতে হয়েছিল প্রতিনিয়ত।

তবে আল্লাহ মূসা বা ইস্রায়েলীদেরকে পরিত্যাগ করেননি। তারা প্রায়ই সমস্যায় পড়ত আর তিনি তাদেরকে সবসময় সঠিক সমাধান দিতেন এবং প্রয়োজনীয় সবকিছু যুগিয়ে দিতেন। চরম দুঃসময়ে তিনি ইস্রায়েলীদের প্রতি যে সমস্ত নিয়ামত বর্ষণ করেছিলেন তা হল-

--উন্মুক্ত প্রান্তরের রৌদ্রতাপ থেকে রক্ষার জন্যে একখন্ড মেঘ তাদের মাথার উপর রেখেছিলেন, যা ছাতার মত তাদেরকে ছায়া প্রদান করত। তারা যেদিকে যেত মেঘখন্ডও তাদের সথে সাথে চলত।
--তারা পিপাসায় কাতর হলে তিনি পাথর থেকে পানির প্রস্রবণ বের করে দিতেন।
-আকাশ থেকে মান্না-সালোয়া খাদ্য হিসেবে দিয়েছিলেন।
--অন্ধকার রাতে কাজকর্ম ও চলাচল করার জন্যে আকাশ থেকে একটি মিনার (অগ্নি স্তম্ভ) ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন।
-তাদের পোষাক-পরিচ্ছদ ছিঁড়ত না। এমনকি শিশু বড় হওয়ার সাথে সাথে তার দেহের পোষাকও প্রয়োজনমত প্রশস্ত হয়ে যেত।

তাঁহ প্রান্তরে পৌঁছেই পানের পানির অভাবে লোকেরা খুবই বড় ধরনের বিদ্রোহ করল। জনমানব শুন্য এই মরু প্রান্তরের কোথাও পানির কোন নামগন্ধ ছিল না। মানুষ পিপাসায় কাতর হয়ে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছিল। লোকেরা সমবেত হয়ে মূসাকে ঘিরে ধরল, বলল, ‘আমাদের জন্যে পানের পানি ব্যবস্থা কর, এখনই।’
মূসা বললেন, ‘তোমরা আমার সঙ্গে কেন ঝগড়া করছ, আর কেনইবা আল্লাহকে পরীক্ষা করে দেখছ?’
তারা বলল, ‘আমরা যাতে পানির অভাবে মারা যাই সেজন্যেই কি তুমি আমাদেরকে আমাদের পরিবার-পরিজন ও পশুপালসহ মিসর থেকে নিয়ে এসেছ? আমাদের বল, আল্লাহ কি আমাদের সঙ্গে আছেন, না নেই?’

তাদের অভিযোগ শুনে মূসা আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে বললেন, ‘হে আল্লাহ! আমি এই অসহিষ্ণু জনগোষ্ঠি নিয়ে কি করব? পানের পানি না পেলে তো তারা আমাকে হত্যার জন্যে পাথর ছুঁড়বে। তুমি তো দয়াময়, সর্বক্ষমতার অধিকারী। সুতরাং তুমি তাদের জন্যে পানির ব্যবস্থা করে দাও।’
আল্লাহ বললেন, ‘তোমার লাঠি দ্বারা পাথরে আঘাত কর।’
তখন মূসা ও হারুণ লোকদেরকে এক জায়গায় একত্রিত করলেন, এই নিশ্চয়তা দিয়ে যে, তাদের জন্যে পানির ব্যবস্থা করা হবে।

যে পাথরে আঘাত করে মূসা পানির প্রস্রবণ সৃষ্টি করলেন, তা ছিল এক বর্গহাত বিশিষ্ট একটি পাথরের টুকরো। এটা ঐ পাথর খন্ড যেটা একদা গোসলের সময় তার কাপড় নিয়ে দৌঁড় দিয়েছিল। এই পাথরের চারধারে মূসা চারবার আঘাত করেছিলেন। আর প্রতি আঘাতে এক এক পার্শ্ব থেকে তিনটি করে (দু‘টি কোনা এবং কর্ণদ্বয়ের ছেদবিন্দু থেকে) ঝর্ণা বের হয়েছিল। এসময় আল্লাহ ইস্রায়েলীদেরকে বলেছিলেন, ‘আল্লাহর দেয়া জীবিকা থেকে তোমরা পানাহার কর আর পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে বেড়িও না।’

মূসার সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন একদল মানুষ আছে যারা অন্যদেরকে সত্যের পথ দেখায় ও ন্যায়বিচার করে। আর তাদেরকে আল্লাহ বার গোত্রে বিভক্ত করেছিলেন। বারটি ঝর্ণা থেকে ইস্রায়েলীদের এই বার গোত্র তাদের প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করতে লাগল।

‘মূসার সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন একদল মানুষ আছে যারা অন্যদেরকে সত্যের পথ দেখায় ও ন্যায়বিচার করে। আর তাদেরকে আমি বার গোত্রে বিভক্ত করেছিলাম।’-(৭:১৫৯) আর যখন মূসা তার স¤প্রদায়ের জন্যে পানি চাইল, আমি বললাম, ‘তোমার লাঠি দিয়ে পাথরে আঘাত কর।’
আর সেখান থেকে বারটি ঝর্ণা বইতে লাগল। প্রত্যেক গোত্র নিজ নিজ পানি পান করার জায়গা চিনে নিল। (আমি বললাম), ‘আল্লাহর দেয়া জীবিকা থেকে তোমরা পানাহার কর আর পৃথিবীতে ফ্যাসাদ করে বেড়িও না।’-(২:৬০)

ইস্রায়েলীরা মূসা ও হারুণের বিরুদ্ধে আবারও অভিযোগ উত্থাপন করল। তারা বলল, ‘মিসরে থাকতেই আমরা কেন মরলাম না? সেখানে আমরা মাংসের হাঁড়ি সামনে নিয়ে পেট ভরে মাংস খেতাম। আর এখন মাংস দূরের কথা অনাহারে মরতে বসেছি আমরা।’

লোকদের এই অভিযোগ সম্বলিত প্রশ্নবানে জর্জরিত মূসা আল্লাহর কাছে আর্জি পেশ করলেন। আল্লাহ বললেন, ‘তুমি তাদের জানাও যে আগামীকাল থেকেই তারা মাংস খেতে পারবে। আর তারা তা খাবে তাদের ইচ্ছেমত পেট ভরে।’
মূসা বললেন, ‘তাদের গরু-ভেড়া সব জবাই করলেও তো তা তাদের পক্ষে যথেষ্ট হবে না।’
তিনি বললেন, ‘তা তুমি স্বচক্ষেই দেখবে। আল্লাহ তো ক্ষমতায় মহান। কাল থেকে তোমরা সন্ধ্যা বেলায় খাবে পেট ভরে মাংস-সালোয়া (ভারুই পাখির মাংস) এবং সকালে খাবে রুটি-মান্না।’

পরদিন হাজারে হাজারে ভারুই পাখি ইস্রায়েলীদের ছাউনি এলাকা ছেয়ে ফেলল। পরে সমুদ্রের দিক থেকে একটা বাতাস বইল, আর সেই বাতাস ঐসব পাখি ঠেলে এনে ছাউনির চারপাশে বিশাল এলাকা জুড়ে এমনভাবে ফেলে দিল যে, সেগুলো মাটি ঢেকে ছড়িয়ে রইল। লোকেরা অনায়াসে ঐ পাখি ধরে আনতে লাগল।
আর মান্না প্রতিদিন রাত্রে আকাশ থেকে শিশিরের মত করে মাটিতে পতিত হত। যা ছিল সাদাটে মাছের আঁশের মত পাতলা এবং দেখতে ছিল পড়ে থাকা তুষের মত, আর স্বাদ ছিল মধু দেয়া পিঠের মত। সূর্যের তাপে এটা গলে যেত। প্রত্যুষে বনি- ইস্রায়েলীরা এই মান্না সংগ্রহ করত এবং যাতা কিম্বা হামান দিস্তায় গুঁড়ো করে রুটি বানিয়ে সেঁকে খেত।

ইস্রায়েলীদের উপর নির্দেশ ছিল-প্রতিদিন প্রতি জনের জন্যে যে পরিমান খাদ্যের প্রয়োজন, (যা নির্ধারিত ছিল এক ওমর বা এক কেজী আট’শ গ্রাম) তারা প্রত্যেকে শুধুমাত্র ততটুকুই সংগ্রহ করবে এবং পরের দিনের জন্যে তার কোন কিছুই রেখে দেবে না। কেবলমাত্র বিশ্রামবারের আগের দিন তারা প্রত্যেকে দ্বিগুণ পরিমান সংগ্রহ করবে। কারণ বিশ্রামবারের দিন কোন মান্না-সালোয়া আল্লাহ পাঠাবেন না। কিন্তু তারা ভাবল প্রতিদিন খাদ্য সংগ্রহের পরিবর্তে একদিনে যদি বেশী পরিমানে খাদ্য সংগ্রহ করে রাখা যায় তাহলে বেশ কিছুদিন বসে বসে খাওয়া যাবে, আর দৈনিন্দন খাদ্য সংগ্রহের পরিশ্রম থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে। তারা তাদের পরিকল্পণা মত একদিন প্রত্যেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্য সংগ্রহ করল এবং দিনের প্রয়োজন মেটানোর পর অবশিষ্টাংশ পরদিনের জন্যে রেখে দিল। পরদিন প্রত্যুষে তারা মান্না সংগ্রহের জন্যে বের হল না। অত:পর তারা খাবার তৈরীর সময় দেখল জমাকৃত সমস্ত মান্না নষ্ট হয়ে গেছে। সুতরাং সেদিন তাদের অনাহারে থাকতে হল। এভাবে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে ইস্রায়েলীরা তাঁর কোন অনিষ্ট করতে পারেনি-বরং নিজেদেরই অনিষ্ট করল।

‘আমি তোমাদের উপর মেঘ দ্বারা ছায়া প্রদান করেছিলাম এবং তোমাদের জন্যে মান্না-সালোয়া প্রেরণ করেছিলাম, (বলেছিলাম) তোমাদের যে জীবিকা দান করলাম সেই পবিত্র বস্তু হতে খাও এবং তারা আমার নির্দেশ অমান্য করে (আমার) কোন অনিষ্ট করেনি, বরং নিজেদেরই অনিষ্ট করেছিল।’-(২:৫৭)

মূসার নির্দেশে হারুণ এক ওমর পরিমান মান্না তুলে রেখেছিলেন পরবর্তী বংশধরদের জন্যে যাতে তারা দেখতে পায় মহান আল্লাহ মিসর থেকে ইস্রায়েলীদের বের করে আনার পর মরু এলাকায় কি খাবার তাদেরকে খেতে দিয়েছিলেন। এই মান্না একটি পাত্রে সাক্ষ্য তাম্বুর মধ্যে দর্শণ রুটির টেবিলের উপর রাখা হয়েছিল।

বনি-ইস্রায়েলীদের প্রতি আল্লাহর এত এত অনুগ্রহের পরও তারা বারবার তাদের অবাধ্যতা প্রকাশ করেছে। তাদেরকে সমস্যার মধ্যে নিয়ে আসার জন্যে মূসাকে দোষারোপ করেছে। অনেকে অনেকবার খোলাখুলিভাবে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। এমনকি তারা মিসর ছেড়ে আসার জন্যে দুঃখ প্রকাশও করেছে এবং অনেকে সেখানে ফিরে যাবার ইচ্ছেও প্রকাশ করেছে- যেখানে তারা গরুর মাংস, রসূন, পেঁয়াজ ও তরমুজ ইত্যাদি খেতে পারত।

প্রতিদিন মান্না-সালোয়া খেতে খেতে ইস্রায়েলীদের একসময় মুখে অরুচি এসে গেল। তারা সমবেতভাবে মূসার কাছে এসে ক্ষোভের সাথে বলল, ‘মান্না ছাড়া আমাদের চোখে আর কিছুই পড়ছে না। হে মূসা! একই রকম খাবারে আমরা কখনও ধৈর্য্য রাখতে পারব না, সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের কাছে আমাদের জন্যে প্রার্থনা কর, তিনি যেন শাক-সবজি, কাঁকুড়, গম, রসূন, ডাল ও পেঁয়াজ আমাদের জন্যে মাটিতে উৎপন্ন করেন।’

বার বার এই বিদ্রোহী লোকদের আশ্বস্ত করতে করতে মূসা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাই এসময়  তিনি রাগান্বিত হয়ে বললেন, ‘তোমরা কি ভাল জিনিস (মান্না-সালোয়া) রেখে খারাপ জিনিসের সাথে তা বদল করতে চাও? তবে যে কোন শহরে যাও। তোমরা যা চাও তা সেখানে পাবে।’

তাহ্ প্রান্তরের সীমান্তবর্তী এলাকায় একটি শহর ছিল। মূসা এই শহরটি নির্দেশ করেই তার এই উক্তি করেছিলেন। যদিও তিনি জানতেন চল্লিশ বৎসর পূর্ণ হবার পূর্বে ইস্রায়েলীরা শতচেষ্টা করেও আবদ্ধ ঐ প্রান্তর থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে না।

লোকেরা গুণ গুণ করতে থাকল। তখন মূসা শান্তস্বরে সমবেত ইস্রায়েলীদেরকে বললেন, ‘স্মরণ কর, আল্লাহর সেই অনুগ্রহ- তোমাদের প্রতি। এই অনুগ্রহ তিনি করেছিলেন ফেরাউনের লোকজনের হাত হতে তোমাদেরকে মুক্ত করতে। তারা তোমাদের উপর নিদারুণ নিপীড়ন চালাত; তোমাদের পুত্র সন্তানদেরকে হত্যা করত এবং জীবিত রাখত তোমাদের কন্যাদেরকে।’

‘আর তোমরা যখন বলেছিলে, ‘হে মূসা! একই রকম খাবারে আমরা কখনও ধৈর্য্য রাখতে পারব না, সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের কাছে আমাদের জন্যে প্রার্থনা কর, তিনি যেন শাক-সবজি, কাঁকুড়, গম, রসূন, ডাল ও পেঁয়াজ আমাদের জন্যে মাটিতে উৎপন্ন করেন।’
মূসা বলল, ‘তোমরা কি ভাল জিনিস (মান্না-সালোয়া) রেখে খারাপ জিনিসের সাথে তা বদল করতে চাও? তবে যে কোন শহরে যাও। তোমরা যা চাও তা সেখানে পাবে।’-(২:৬১)
মূসা বলেছিলেন তার লোকজনদিগকে, ‘স্মরণ কর, আল্লাহর সেই অনুগ্রহ- তোমাদের প্রতি। এ অনুগ্রহ তিনি দিয়েছিলেন ফেরাউনের লোকজনের হাত হতে তোমাদের মুক্ত করতে। তারা তোমাদের উপর নিদারুণ নিপীড়ন চালাত; তোমাদের পুত্রসন্তানদের হত্যা করত এবং জীবিত রাখত তোমাদের নারীদের।’-(১৪:৬)

একসময় ইস্রায়েলীরা আল্লাহর বেঁধে দেয়া চল্লিশ বৎসর মরুপ্রান্তরে অতিবাহিত করল। তারপর খোদার নির্দেশে তারা যাত্রা শুরু করল।

বনি ইস্রায়েলীরা একসময় কা‘দেশ বর্ণিয়তে এসে পৌঁছিল এবং সেখানে ছাউনি ফেলল। এসময় মরিয়ম মারা গেলেন এবং তাকে ঐ স্মরণীয় জায়গায় সমাহিত করা হল।

ইস্রায়েলীরা তাদের কনান দেশে যাত্রার শেষ পর্যায়ে এসে পড়ল। তাদের যাত্রাপথের দেশসমূহের মধ্যে ছিল ইদোমীয়দের দেশ। সময় বাঁচানোর জন্যে তারা ঐ দেশের মধ্যে দিয়ে যাবার জন্যে তাদের অনুমতি চাইল এবং এই নিশ্চয়তাও দিল যে, যাত্রা শান্তিপূর্ণ হবে অর্থাৎ তাদের কোন প্রকার ক্ষতি করা হবে না।

মূসার দূতেরা ইদোমরাজের কাছে এই সংবাদ নিয়ে গেল, ‘আমাদের পূর্বপুরুয়েরা মিসরে গিয়েছিলেন। অতঃপর আমরা অনেক বৎসর সেখানে বাস করেছি। আমরা সেখানে অত্যাচারিত ও লাঞ্ছিত হচ্ছিলাম। অতঃপর আল্লাহ নিজ দয়া ও করুণার দ্বারা আমাদেরকে সেখান থেকে উদ্ধার করে এনেছেন।
--আমরা এখন আপনার রাজ্যের সীমানায়, কা‘দেশে আছি। আপনি আপনার দেশের মধ্যে দিয়ে আমাদেরকে যেতে অনুমতি দিন। আমরা কোন শস্যক্ষেত কিম্বা আঙ্গুর ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে যাব না, কিম্বা কোন কূয়ো থেকে পানি পান করব না। আমরা রাজপথ দিয়ে চলে যাব এবং আপনার রাজ্য পার না হওয়া পর্যšডানে কি বায়ে পা বাড়াব না।’

কিন্তু ইদোমরাজ বললেন, ‘না, তোমরা আমাদের দেশের মধ্যে দিয়ে যেতে পারবে না। আর যদি তোমরা এখান দিয়ে যাবার চেষ্টা কর তবে আমরা যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হব।’
ইস্রায়েলীরা উত্তরে জানাল, ‘আমরা সদর রাস্তা ধরে যাব। আমাদের কিম্বা আমাদের পশুপালের দ্বারা যদি কোন ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয় তবে আমরা তার ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেব। আমরা শুধু পায়ে হেঁটে পার হয়ে যেতে চাই, আর কিছু নয়।’
কিন্তু তারা বলল, ‘না এ দেশের মধ্যে দিয়ে তোমাদের যাওয়া চলবে না।’
তারা তাদের সৈন্যবাহিনী নিয়ে ইস্রায়েলীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এগিয়ে এল।

সুতরাং ইস্রায়েলীদেরকে উত্তর দিক যাবার আগে অনেক দক্ষিণে, পরে পূর্বে এবং শেষে উত্তরে প্যালেস্টাইনে যেতে হয়েছিল।

পেট্রা। হেরাপর্বতের পাদদেশে এক সুন্দর শহর। ইস্রায়েলীরা এখানে এসে ছাউনি ফেলল। এখানে আল্লাহ মূসাকে বললেন, ‘হারুণকে নিয়ে তুমি হেরাপর্বতে ওঠো।’

আল্লাহর নির্দেশমত মূসা ও হারুণ পর্বতে আরোহণ করলেন। সেখান থেকে উত্তরদিকে কনান দেশ দেখা যাচ্ছিল। তারা উভয়ে উৎফুল্ল হলেন। এসময় আল্লাহ মূসাকে বললেন, ‘যে দেশ আমি ইস্রায়েলীদের দিতে যাচ্ছি সেখানে হারুণের যাওয়া হবে না।’

পাহাড়ের উপরই হারুণ মারা গেলেন। সুতরাং মূসা সেখানেই তাকে সমাহিত করলেন। অতঃপর নিচে নেমে এসে বনি-ইস্রায়েলীদেরকে তার মৃত্যুর কথা জানালেন। ঈমাম হিসেবে  হারুণের স্থলাভিষিক্ত হলেন তার পুত্র ইলিয়াস।

এদিকে ইস্রায়েলীরা হারুণের স্বাভাবিক মৃত্যুকে গ্রহণ করে নিতে পারল না। তারা তার মৃত্যুর জন্যে মূসাকে দোষী সাব্যস্ত করে ফেলল। আর তাদের একদল কোন ভণিতা না করেই মূসাকে স্পষ্টতঃ বলল, ‘আপনি নিজেই যে তাকে হত্যা করেননি তাই বা কে জানে। আর তিনি তো আমাদের কাছে আপনার অপেক্ষা নরম ছিলেন।’

লোকদের কথায় মূসা দুঃখ পেলেন। তিনি তাদের অপবাদ থেকে মুক্তি পাবার জন্যে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করলেন। আল্লাহ ফেরেস্তাদের নির্দেশ দিলেন, তারা যেন হারুণের লাশকে বনি-ইস্রায়েলীদের সামনে উপস্থিত করে।

ফেরেস্তারা হারুণের লাশকে বনি-ইস্রায়েলীদের সম্মুখে উপস্থিত করল। এসময় লাশটি মাটি থেকে সামান্য উপরে ঝুলন্ত অবস্থায় ছিল। আর বনি-ইস্রায়েলীরা দেখল যে, সেই লাশে হত্যার কোন চিহ্ন নেই। মূসা হত্যার অপবাদ থেকে রেহাই পেলেন।
হারুণের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে লোকেরা ত্রিশদিন শোক পালন করল।

হেরাপর্বত থেকে যাত্রা করে আকাবা উপসাগরের পথ ধরে ইস্রায়েলীরা মরুভূমিতে প্রবেশ করল। এটি ছিল একটি জনশুণ্য বিশাল প্রান্তর। সেখানে ছিল বালির পর বালির পাহাড়, আর ঝোপ জঙ্গলে ভরা। তার উপর ছিল মরুসাপের ভয়। এখানে আবার লোকেরা বিরক্ত হয়ে অভিযোগ শুরু করল। এবারও তাদের অভিযোগ ছিল খাবার নিয়ে। তারা মূসাকে বলল, ‘এই বাজে খাবার আমরা আর দু‘চোখে দেখতে পারছিনে।’

এই অবাধ্যতার দরুন ইস্রায়েলীদের অনেকে বিষাক্ত সাপের দংশনে মারা যেতে লাগল। অন্যেরা ভীত হয়ে মন পরিবর্তন করে আল্লাহর কাছে দয়া ভিক্ষে চাইল। আল্লাহ তো দয়া ও করুণার আধার। তিনি মূসাকে নির্দেশ দিলেন, ‘একটি পিতলের সাপ তৈরী করে একটি লাঠির সাহায্যে সেটাকে উঁচুতে তুলে ধরে রাখ, যেন সর্পে দংশিত ব্যক্তি সেদিকে তাকিয়ে জীবন রক্ষা পেতে পারে।’

শেষপর্যন্ত ইদোমের দক্ষিণ ও পূর্বদিকের মরুভূমিতে এক দীর্ঘ সময় ধরে কঠিন যাত্রার অবসান হল। এখন ইস্রায়েলীরা মরুসাগর ও জর্দান নদীর উপত্যকার পূর্বদিক দিয়ে উত্তর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। অর্ণোন নদী পর্যন্ত তারা কোন বাঁধা পায়নি। মরুসাগরের পূর্বপার্শ্বে মাঝামাঝি স্থানে এই নদী এসে সাগরে মিশেছে। এই অঞ্চল ছিল অতি উর্বর ও সুন্দর অঞ্চলের একটি। বিশেষভাবে এটি ছিল ইস্রায়েলীদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়, যারা দীর্ঘদিন অনুর্বর মরুভূমিতে অভ্যস্ত ছিল। অঞ্চলটি সীহোন নামে পরিচিত, ইমোরীয়দের বাসস্থান। ইস্রায়েলীরা শান্তিপূর্ণ ভাবে দেশের মধ্যে দিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু অসভ্য যুদ্ধপ্রিয় ইমোরীয় জাতি সেই অনুরোধ রাখল না। উপরন্তু হিষবোনের রাজা সীহোন তার সৈন্য-সামন্ত নিয়ে এগিয়ে এসে যহসে ছাউনি ফেলল। তখন খোদা মূসাকে প্রতিপক্ষকে মোকাবেলার আদেশ দিলেন। ফলে ইস্রায়েলীরা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল এবং অাক্রমণকারীদেরকে পারাজিত করল।

সীহোনের মধ্যে দিয়ে উত্তর দিকে গেলে প্রথমে ওগরাজ্য পড়ল। বাশনের রাজা ওগের শাসিত শহর, দূর্গ দিয়ে ঘেরা। তারা শক্তিশালী যোদ্ধা ছিল। ইস্রায়েলীদের আগমনের সংবাদে ওগের নেতৃত্বে সৈন্যবাহিনী ইদ্রিয়ী শহরে এসে ছাউনি ফেলল। কিন্তু ইস্রায়েলীরা এখন আরও অভিজ্ঞ এবং সীহোন বিজয়ের কারণে তারা আত্মবিশ্বাসী ও প্রত্যয়ী। তারা উৎসাহী হয়ে যুদ্ধ শুরু করল এবং বিজয়ী হল। তারা ওগের ষাটটি প্রচীর বেষ্টিত শহর ও সাথে উর্বরা দেশ দখল করে নিল।

বাশন বিজয়ের পরে ইস্রায়েলীরা পূর্বদিকে মোয়াবে এসে উপস্থিত হল। তারা যে সবেমাত্র দু’টি যুদ্ধে জয়লাভ করেছে এবং তাদের সঙ্গে রয়েছে এক জীবšদেবতা এ কথা মোয়াবরাজ বালাক শুনে অতিশয় ভীত হলেন এবং প্রতিবেশী দেশ মদিয়ানের বৃদ্ধনেতাদেরকে জানালেন, ‘গরু যেমন করে মাঠের ঘাস চেঁছে পুঁছে খেয়ে নেয় এই দলটাও তেমনি করে আমাদের চারপাশের সমস্তকিছু খেয়ে নেবে।’

বালাক মদিয়ানের বৃদ্ধনেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে ফোরাৎ নদীর পূর্বে পথোর শহরে বসবাসকারী একজন ধর্মীয়নেতা বল‘আম বিন বাউরার কাছে জরুরী সংবাদ পাঠাল- ‘মূসা তার অনুসারীদের এক বিরাট বাহিনী নিয়ে আমাদের হত্যা করতে এবং এই এলাকা থেকে আমাদের বিতাড়িত করতে এসেছে। আপনি এসে এই আক্রমণের বিরুদ্ধে তাদের উপর অভিশম্পাৎ বর্ষণ করুন, যাতে সে তার লোক-লস্করসহ ফিরে চলে যায়।’

মোয়াবকে সাহায্য করতে সম্মতি আদায়ের লক্ষ্যে নেতৃবর্গ বল‘আমের জন্যে মূল্যবান উপহার সামগ্রী নিয়ে এল। বল‘আমের দোয়া কবুল হত। সে ইসমে আজম জানত। সব শুনে সে বলল, ‘আমি যা জানি তোমরা তা অবগত নও। আমি আল্লাহর রসূল ও তার অনুসারীদেরকে কি করে বদদোয়া করতে পারি? আর তা করলে তো আমার ইহকাল ও পরকাল বিনষ্ট হবে! তোমরা ফিরে যাও।’
কাজেই মোয়াবীয় নেতারা ফিরে গিয়ে বালাককে বলল, ‘তিনি আমাদের সাথে আসতে অস্বীকার করেছেন।’
তখন বালাক পূর্বের চেয়ে সংখ্যায় বেশী এবং আরও সম্মানিত অন্য নেতাদের পাঠালেন। তারা আরও বেশী বেশী উপহার সামগ্রীসহ দ্বিতীয়বার আরও জরুরী নিমন্ত্রণ নিয়ে এল। তারা  বল‘আমকে বলল, ‘বালাক বলেছেন- কোন কিছুই যেন আপনাকে তার কাছে যেতে বাঁধা না দেয়। তিনি আপনাকে সম্মানের অধিকারী করবেন এবং আপনার আদেশ অনুসারেই সবকিছু  করবেন।’
বল‘আম বলল, ‘বালাক যদি সোনা-রূপাতে পূর্ণ তার রাজপ্রাসাদটাও দেয়, তবুও আমি খোদার আদেশের বাইরে কোন কাজ করতে পারব না।’

এদিকে বল‘আমের স্ত্রী মূল্যবান উপহার সামগ্রী দেখে লোভে পড়ল। তখন তার বারবার অনুরোধে এবং আগত নেতৃবর্গ তার পদতলে ক্রন্দন করে প্রাণিপাত করতে থাকলে সে অত:পর সম্মত হল। আগত নেতৃবর্গ এই সংবাদ বালাককে জানাতে দ্রুত রওনা হয়ে গেল। আর বল‘আমও প্রস্তুতি নিয়ে তার গাধার পিঠে সমাসীন হয়ে অভিশাপ দেবার উদ্দেশ্যে সেইদিকে চলল, যেখানে ইস্রায়েলীরা তাঁবু ফেলেছিল।

অনেক দূর অগ্রসর হবার পর একসময় বল‘আমের গাধার পথরোধ করল ফেরেস্তা জিব্রাইল। সম্মুখে পথের মাঝে ফেরেস্তাকে দেখে গাধা পথ ছেড়ে ক্ষেতের মধ্যে নেমে পড়ল। এতে বল‘আম মারধোর করে তাকে আবার পথে নিয়ে এল। কিছুদূর চলার পর জিব্রাইল আবার দুই আঙ্গুর ক্ষেতের গলিপথে দাঁড়াল। গলির দু‘ধারেই প্রাচীর ছিল ফলে তাকে এড়িয়ে যেতে গাধাকে একদিকের প্রচীরগাত্র ঘেঁসে যেতে হল। এতে প্রাচীরে ঘর্ষণ লেগে বল‘আমের পায়ের একস্থানের চামড়া ছঁেড় গেল। সে রাগান্বিত হয়ে গাধাকে আবার প্রহার করল। কিছুদূর চলার পর জিব্রাইল পথের মাঝে এমন একস্থানে দাঁড়াল যে গাধা ডানে কি বামে সরে তাকে এড়িয়ে যেতে পারল না। তখন সে বাধ্য হয়ে ভূমিতে বসে পড়ল। ফলে বল‘আম গাধাকে মারধোর করল, কিন্তু সে আর চলতে চাইল না। অনেকক্ষণ ধরে মারধোর চলল। একসময় বল‘আম ক্লাšহয়ে পড়ল, আর তখনই আল্লাহ গাধার বাকশক্তি দিলেন। গাধা বলল, ‘হে বল‘আম! আমি কি আপনার সেই গাধা নই যার উপর আপনি দীর্ঘদিন ধরে সওয়ার হচ্ছেন? আমি আপনার কি করেছি যে এই নিয়ে আমাকে তিন তিন বার মারধোর করলেন। আপনি কি বুঝতে পারছেন না, যতই আপনি আমাকে সামনের দিকে নেবার চেষ্টা করছেন, ফেরেস্তা আমাকে ততই ধাক্কা দিয়ে পিছনের দিকে নিচ্ছেন?’

পশুর জবান খুলে যাবার এই আশ্চর্য ঘটনায়ও বল‘আমের বোধোদয় হল না। সে গাধার পিঠ থেকে নেমে, ক্লান্ত শরীরে নিকটস্থ এক গাছের ছায়ায় বসল। এ সময় সেখানে পূর্ব থেকেই এক বৃদ্ধের বেশে ইবলিস বসে ছিল। দু‘জনের আলাপ চরিতের এক পর্যায়ে সকল বিষয়ে অবগত হয়ে ইবলিস বলল, ‘শয়তানই একটা ভাল কাজ থেকে আপনাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে। কেননা গাধা কথা বলে এমন আজব কাহিনী কেউ কি কখনও শুনেছে? নিশ্চয়ই শয়তান গাধার মুখে ভর করে আপনাকে নিষেধ করেছে। সুতরাং এই শহর ও শহরবাসীর মঙ্গলের জন্যে বনি ইস্রায়েলীদের বিপক্ষে বদদোয়া করাটাই আপনার উচিৎ। এতে আক্রমণকারী ইস্রায়েলীরা পরাজিত হয়ে পলায়ণ করবে এবং বালাকরাজের নেতৃত্বে শান্তির রাজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠ হবে। তখন আপনি মানুষকে সত্য পথে আহবান করলে তারা আপনার আহবানে সাড়া দেবে।’
ইবলিসের কথায় প্রলুব্ধ হয়ে বল‘আম তার গাধাকে সেখানে ফেলে রেখে পদব্রজেই রওনা হল।

বালাক তার সেনাবাহিনী নিয়ে রাজ্যের শেষ সীমানায় অর্ণোন নদীর তীরে অপেক্ষা করছিলেন। বল‘আম সেখানে এসে পৌঁছিল। বালাক তার আগমন সংবাদ পেয়ে অভ্যর্থণার জন্যে ছুটে এলেন। পরদিন সকালবেলা সেনাবাহিনী ইস্রায়েলীদের মোকাবেলায় এগিয়ে গেলে বালাক তাকে সঙ্গে নিয়ে রামোৎবাল পর্বতে আরোহণ করলেন। সেখান থেকে তারা মরু এলাকার দিকে মুখ ফেরালেন। ঐতো দূরে নীচে ইস্রায়েলীদের তাম্বু দেখা যাচ্ছে। বল‘আম বদদোয়া শুরু করল।

মদিনীয়দের মোয়াবীয়দের সাথে ষড়যন্ত্র ইস্রায়েলীদের নিরাপত্তার জন্যে হুমকীস্বরূপ ছিল। ফলে এই বিরোধী জাতিকে দমন করতে মূসা প্রত্যেক গোত্র থেকে এক হাজার করে যোদ্ধা মনোনীত করেছিলেন। এই যোদ্ধারা বালাকের সেনাবাহিনীর এগিয়ে আসার সংবাদে ইউশায়ার নেতৃত্বে অগ্রসর হল।

১ম দিনের যুদ্ধে বনি ইস্রায়েলীরা সুবিধে করতে পারল না। এদিকে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যাওয়াতে ইউশায়া স্বাক্ষ্য তাম্বুর সম্মুখে সিজদায় পড়ে থাকলেন। এতে ইস্রায়েলীদের দিকে জয়ের পাল্লা ঘুরে গেল। এ দেখে বল‘আম জোরে শোরে ইস্রায়েলীদের বিরুদ্ধে বদদোয়া শুরু করল। কিন্তু যতবারই সে মূসা ও ইস্রায়েলীদের নাম নিতে চাইল, ততবারই তাদের পরিবর্তে তার নিজের সম্প্রদায়ের নাম তার মুখ থেকে বের হল। এতে তার সম্প্রদায়ের লোকেরা বলল, ‘হে বল‘আম! এ-কি? আপনি তো বনি-ইস্রায়েলীদের পরিবর্তে আমাদের নামে বদদোয়া শুরু করে দিয়েছেন।’
সে বলল, ‘আল্লাহর ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমার কি করার আছে?’

বনি ইস্রায়েলীদের নাম নিজ মুখে উচ্চারণে ব্যর্থ হবার পরও বল‘আমের বোধোদয় হল না।  সে প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকল। ফলে তার জ্বিহবা মুখ গহব্বর থেকে বেরিয়ে বুকের উপর নেমে এল। তখন সে ভীত ও বিবেকহীন হয়ে পড়ল। এই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ স্বীয়  নিদর্শণসমূহ দান করেছিলেন, অথচ সে তা পরিহার করে বেরিয়ে গেল। আর তার পিছনে লেগেছে শয়তান, ফলে সে পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে পড়ল। অবশ্য আল্লাহ ইচ্ছে করলে তার মর্যাদা বাড়িয়ে দিতেন সেসকল নিদর্শণসমূহের দৌলতে। কিন্তু সে যে অধঃপতিত এবং নিজের রিপুর অনুগামী হয়ে রইল।

বল‘আম বুঝতে পারল যে বনি-ইস্রায়েলীদের জন্যে তার ইহকাল ও পরকাল- উভয়ই ধ্বংস হয়েছে, তখন তাদেরকে ধ্বংস করার প্রত্যয় ব্যক্ত করল সে। আর মোয়াবীয়দেরকে পরামর্শ দিল-‘যুদ্ধ দ্বারা বনি ইস্রায়েলীদেরকে ধ্বংস করা যাবে না, যাবে কেবলমাত্র ব্যভিচার দ্বারা। কেননা, আল্লাহর কাছে ব্যভিচার অত্যন্ত ঘৃণিত কাজ। যে জাতির মাঝে তা অনুপ্রবেশ করে, তাদের উপর গজব ও অভিসম্পাৎ বর্ষিত হয়, সে জাতি কখনও বিজয় কিম্বা কৃতকার্যতা অর্জন করতে পারে না। সুতরাং তোমাদের স্ত্রী ও কন্যাদিগকে সুন্দর করে সাঁজিয়ে হাতে শোভনীয় বস্তু দিয়ে ইস্রায়েলীদের তাম্বুতে পাঠিয়ে দাও।’

আর তুমি তাদেরকে শুনিয়ে দাও, সে লোকের অবস্থা, যাকে আমি নিজের নিদর্শণসমূহ দান করেছিলাম, অথচ সে তা পরিহার করে বেরিয়ে গেছে। আর তার পিছনে লেগেছে শয়তান, ফলে সে পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে পড়েছে। অবশ্য আমি ইচ্ছে করলে তার মর্যাদা বাড়িয়ে দিতাম সেসকল নিদর্শণসমূহের দৌলতে। কিন্তু সে যে অধ:পতিত এবং নিজের রিপুর অনুগামী হয়ে রইল। সুতরাং তার অবস্থা হল কুকুরের মত, যদি তাকে তাড়া কর তবুও হাঁপাবে আর যদি ছেড়ে দাও তবুও হাঁপাবে। এ হল সেসব লোকের উদাহরণ যারা মিথ্যে প্রতিপন্ন করেছে আমার নিদর্শণসমূহকে। অতএব তুমি বিবৃত কর এসব কাহিনী যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে। তাদের উদাহরণ অতি নিকৃষ্ট, যারা মিথ্যে প্রতিপন্ন করেছে আমার আয়াতসমূহকে এবং তারা নিজেদেরই ক্ষতিসাধন করেছে।-(৭:১৭৫-১৭৭)

মোয়াবীয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবশেষে ইস্রায়েলীরা জয়লাভ করল। এসময় জিব্রাইল মূসাকে জানাল-‘অমালিকা স¤প্রদায়ের বল‘আম নামক এক ব্যক্তির দোয়ার কারণে যুদ্ধের প্রাথমিক ফলাফল ইস্রায়েলীদের বিপক্ষে যাচ্ছিল। ঐ ব্যক্তি ইসমে আযম জানত। অতঃপর ইউশায়ার দোয়ার ফলে আল্লাহ তার ইসমে আযমসহ সকল মর্যাদা ছিনিয়ে নেন। ফলে পরবর্তীতে ইস্রায়েলীরা বিজয়ী হয়েছে। তবে বল‘আমের সকল সম্মান ও মর্যাদা ছিনিয়ে নিলেও এখনও তার তিনটি আবেদন মহান আল্লাহর দরবারে কবুল হবার সুযোগ রয়েছে।’

ইউশায়া মূসার কাছ থেকে এসব কথা জানার পর বল‘আমের সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে সকল কথা বললেন। বল‘আম যুদ্ধে ইস্রায়েলীদের হাতে বন্দী হয়েছিল।

সবশুনে বল‘আম অত্যন্ত ব্যাথিত হয়ে পড়ল। ইউশায়া তাকে মুক্তি দিয়ে দিলেন। তখন সে বাড়ী ফিরে গেল।

বাড়ীতে ফিরে বল‘আম তার স্ত্রীকে বলল, ‘আমি পাপ করেছি। আল্লাহ আমার সম্মান ও মর্যাদা ও ইসমে আযম সবকিছু কেড়ে নিয়েছেন।’
স্ত্রী বলল, ‘তুমি সারাজীবন আল্লাহর এবাদত করে তাঁর প্রিয়জন হবার মত যেসব গুন বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছ, তার কি কিছুই অবশিষ্ট নেই?’
সে বলল, ‘এখনও তিনটি দোয়া কবুল হবার সুযোগ অবশিষ্ট রয়েছে।’
স্ত্রী বলল, ‘তবে তুমি আমার জন্যে এই মুহুর্তে একটি দোয়া কর। তিনি যেন আমাকে অপরূপ রূপ সৌন্দর্য দান করেন।’
সে বলল, ‘এমনিতেই তো তুমি সুন্দরী। তিনটি দোয়াই পরকালের জন্যে থাকতে দাও।’
স্ত্রী পীড়াপীড়ি করতে লাগল। বলল, ‘দু‘টি দোয়া তো তোমার অবশিষ্ট থাকছে।’

স্ত্রীকে খুব ভালবাসত বল‘আম। তার পীড়াপীড়িতে অবশেষে নিরুপায় হয়ে সে আল্লাহর দরবারে পত্নীর জন্যে দোয়া করল। তৎক্ষণাৎ তার রূপ-সৌন্দর্য ঘর আলোকিত করে ফেলল। কিন্তু এই দোয়ার ফলে বল‘আমের উপর আল্লাহর ক্রোধ আপতিত হয়ে তার চেহারা সম্পূর্ণ কাল হয়ে গেল।

অতঃপর কুৎসিৎ স্বামীকে লুকিয়ে তার স্ত্রী নিত্যই পরপুরুষের সাথে অবৈধ দৈহিক মিলনে লিপ্ত হতে লাগল। অতঃপর একদিন বল‘আমের চোখে ধরা পড়ল সে। বল‘আম ক্রুদ্ধ হয়ে স্ত্রীর জন্যে বদদোয়া করল। এতে তার স্ত্রী কুৎসিৎ হয়ে গেল। এতে তার সন্তানেরা তাদের মায়ের জন্যে স্বভাবজাত প্রীতিবশতঃ কান্নাকাটি করতে লাগল। ফলে সে বাধ্য হয়ে স্ত্রীর সৌন্দর্য পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনতে দোয়া করল। স্ত্রীর রূপ পূর্বাবস্থায় ফিরে এল বটে, কিন্তু এতে তার তিন তিনটি দোয়ার সুযোগ নষ্ট হয়ে গেল। হতভাগ্য বল‘আম রিক্তহস্তে জাহান্নামে প্রবেশের জন্যে দুনিয়ায় তার অবশিষ্ট দিনগুলি অতিবাহিত করতে লাগল।

এদিকে মোয়াবের পর মদিয়ান সহজেই ইস্রায়েলীদের করতলে এল। এইসময় বল‘আমের সম্প্রদায় তার পরামর্শ মত কাজ করল। আর নারীরা সুসজ্জ্বিত হয়ে ইস্রায়েলী সেনাদের মাঝে এল। এই সকল নারীদের মধ্যে একজন ছিল কাসী বিনতে সূয়ার। সে ছিল রূপেগুনে অতুলনীয়া। অতঃপর সে যখন বনি-ইস্রায়েলীদের এক নেতা জমজম বিন শাল্লুমের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল, তখন জমজম তাকে দেখে তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ল। শাল্লুম তার হাত ধরে মূসার কাছে নিয়ে এল এবং বলল, ‘হে মূসা! তুমি এই নারী সম্পর্কে কি বল, এ কি আমার জন্যে অবৈধ?’

মূসা জমজমকে ভাল করে লক্ষ্য করলেন। তার আক্রমণাত্মক ঔদ্ধত্য আচরণ দেখে বুঝলেন এই ব্যক্তি মহা অনর্থ ঘটানোর জন্যে প্রস্তুত। তিনি কঠিন সিদ্ধাšনিতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু কি মনে করে নিজেকে সংযত করলেন। তারপর শান্তস্বরে উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ, অবৈধ। কখনও এই নারীর কাছে গমনের চেষ্টা কোরও না।’
সে বলল, ‘হে মূসা! তুমি এই সুন্দরী নারী সম্পর্কে আমাকে যে হুকুম দিয়েছ তা কখনও আমি মানতে প্রস্তুত নই।’

জমজম ঐ নারীকে নিয়ে স্বীয় তাম্বুর মধ্যে প্রবেশ করল এবং অনন্তর তার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হল। আল্লাহ অসন্তুষ্ট হলেন এবং এক মহামারী গজবের আকারে নেমে এল ইস্রায়েলীদের উপর। দ্রুত তা বিস্তারলাভ করল। দেখতে দেখতে ৭০ হাজার বনি-ইস্রায়েলী এই মহামারীতে মারা পড়ল। মূসার দেহরক্ষী হারুণের পৌত্র, পিনহস জানতে পারল সম্ভবতঃ জমজমের ব্যভিচারের দরুণ এই মহামারীর আবির্ভাব। সে তৎক্ষণাৎ তলোয়ার হাতে জমজমের তাম্বুতে প্রবেশ করল এবং তাকে ও ঐ নারীকে হত্যা করল। তারপর সকলকে বলল, ‘এই ব্যক্তির ব্যভিচারের কারণে আল্লাহ আমাদের সকলকে ধ্বংস করছেন।’

ঐ নারী কাসী ও জমজমের কর্তিত দেহখন্ডগুলোকে লোকেরা জনসম্মুখে টানিয়ে রাখল। এই হত্যার পর বনি-ইস্রায়েলীদের প্রতি আবির্ভূত মহামারি দূর হয়ে গেল। যাহোক এতকিছুর পরেও মূসাদের উদ্দেশ্য সফল হয়েছিল, তারা মোয়াব দেশ পার হল। এভাবে একসময় জর্দান পার হয়ে, প্রতিজ্ঞাত দেশ কনানে তারা প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিল।

মদিনীয়দের পরাজিত করতে সমর্থ হওয়ায় ইস্রায়েলীদের জর্দান নদীর পূর্বপাশে একটি নিরাপদ নিশ্চিত অবস্থা এনে দিল। ফলে পরবর্তীতে তারা জর্দান নদীর অন্যপারে এসে বিজয়ের প্রস্তুতি নিতে সমর্থ হয়েছিল।

সীহোন থেকে ওগ, মোয়াব এবং মদিয়ান পর্যন্ত দখল করা এই অঞ্চলটি ছিল একটি উর্বর ভূমি যা পশু পালনের জন্যে সকলের কাছে আকাংখার বিষয় ছিল এবং কৃষি কাজের জন্যেও ভাল ছিল। জর্দানের পূর্বদিক জয় করার পর রুবেন, গাদ ও মনশি: বংশের এক অংশ প্রধানত: যাদের পশু পালনে আগ্রহ ছিল, তারা মূসার কাছে আবেদন করেছিল যে, প্রতিজ্ঞাত দেশে তাদের অংশ হিসেবে এই অঞ্চলে যেন তারা বসতি স্থাপন করতে পারে। তাদের অনুমতি দেয়া হয়েছিল এই শর্তে যে, তাদের যোদ্ধারা জর্দান পার হয়ে গিয়ে অন্য বংশগুলির বাসস্থানের জন্যে দেশ জয়ে তাদেরকে সাহায্য করবে। এই শর্ত গ্রহণযোগ্য ছিল যেহেতু বারটি বংশের সকলেই পূর্ব প্যালেস্টাইন দখলে সাহায্য করেছিল।

যেহেতু দুই অথবা তিন বংশ এ ব্যবস্থায় রাজী হয়েছিল তাই তারা তাদের স্থায়ী বাসস্থান হিসেবে মরুসাগর ও জর্দান নদীর পূর্বের অঞ্চল উত্তরে গালীল সাগর পর্যন্ত  একসময় দখল করে নিয়েছিল।

মূসা বনি-ইস্রায়েলীদের মত প্রচন্ড একগুয়ে জাতিকে অত্যন্ত ধৈর্য্য সহকারে সংশোধনে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। একসময় আল্লাহর পক্ষ থেকে ডাক এল তার ইহজগতের  ব্যস্ততাকে পাশ কাটিয়ে পরজগতের অসীমতার পথে যাত্রার। আর তাই আল্লাহর নির্দেশে আজরাইল স্বয়ং তার জান কবচ করার কাজে পৃথিবীতে এল। সে মূসার সম্মুখে মানবাকৃতিতে উপস্থিত হয়ে বলল, ‘হে মূসা! প্রভুর ডাক এসেছে, কবুল কর।’

চল্লিশ বৎসরের বন্দী জীবন শেষে প্রতিজ্ঞাত দেশে প্রবেশের প্রথম ধাপ সমাপ্ত হয়েছে মাত্র। এখন আসল কাজগুলো পড়ে রয়েছে সামনে। অনেক দায়িত্ব, অনেক পরিকল্পণা, খুঁটিনাটি বিষয়-মূসা আজরাইলের কথাকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। তাই তার কথাকে ঠাট্টা মনে করে ভীষণ রাগান্বিত হলেন। তিনি তাকে জোরে এক চপোটাঘাত করলেন। চড়ের প্রচন্ডতায় আজরাইলের চক্ষু কোটর থেকে বের হয়ে এল। অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে সে প্রভুর দরবারে ফিরে গিয়ে বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আপনার এই বান্দা মৃত্যু চায় না, অধিকন্তু সে আমাকে মারধোর করে মুখের আকৃতি বদলে দিয়েছে।’

আল্লাহ তার চক্ষু ঠিক করে দিলেন। তারপর তাকে নির্দেশ দিলেন, ‘পুন:রায় তার কাছে যাও। আর তাকে জিজ্ঞেস কর, সে কি চায়।’
ফেরেস্তা পুনঃরায় মূসার কাছে এসে বলল, ‘হে মূসা, তুমি কি চাও? দীর্ঘায়ূ? তাহলে কোন ষাঁড়ের কোমরের উপর হাত রাখ, এতে তোমার হাতের নিচে যতগুলি লোম থাকবে, আল্লাহর ইচ্ছায় তুমি ততবৎসর আরও আয়ূ লাভ করবে।’
মূসা- ‘অতঃপর কি হবে?’
আজরাইল- ‘মৃত্যু, কেননা জীবমাত্রই মৃত্যুর সাধ গ্রহণ করবে। সকলকেই তাঁর কাছে প্রত্যাবর্তিত হতে হবে।’

মূসা বুঝতে পরলেন প্রকৃতই আল্লাহর ডাক এসেছে। তিনি তৎক্ষণাৎ আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করলেন, ‘হে আল্লাহ! মৃত্যুর আগে তুমি আমাকে পবিত্র ভূমির নিকটবর্তী কোরও। জর্দান পার হয়ে গিয়ে ঐ চমৎকার দেশটা আমাকে দেখতে দিয়ো।’
আল্লাহ বললেন, ‘যথেষ্ট হয়েছে। এ বিষয়ে আমাকে আর বোলও না। তুমি পিসগার চূঁড়ায় আরোহণ করে উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিমে দৃষ্টি ফেরাও। জর্দান নদী অতিক্রম করা তোমার হবে না। সুতরাং উত্তরাধিকারী মনোনীত কর, যে নেতৃত্ব দিয়ে যে দেশটা তুমি দেখতে যাচ্ছ তা ইস্রায়েলীদেরকে দিয়ে অধিকার করাবে।’

প্রভুর অভিপ্রায় জানতে পেরে মূসা আর অগ্রসর না হয়ে ইস্রায়েলীদেরকে নিয়ে বৈৎপিয়োরের উল্টোদিকের উপত্যকায় তাম্বু ফেললেন।

হারুণের মৃত্যুরপর তিন বৎসর অতিবাহিত হয়েছে। ইতিমধ্যে মূসা জেনেছেন তার জীবনেরও শেষসময় এসে গেছে। তাই তিনি জরুরী কাজগুলি দ্রুত সম্পন্ন করতে লাগলেন। যেমন- লেবী গোত্রের জন্যে নগর মনোনীত করা, প্রতিজ্ঞাত দেশের সীমানা ঠিক করা, লোকগণনা করা এবং উত্তরাধিকারী নেতা নির্বাচন করা প্রভৃতি।

উত্তরাধিকারী হিসেবে মূসা তার বিশ্বস্ত সহচর যিনি তার যোগ্যতা ও বাধ্যতা বিভিন্নভাবে প্রমান করতে পেরেছিলেন সেই ইউশায়াকে মনোনীত করলেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশও তাকে দিলেন। কারণ এ বিষয়ে খোদার অনুমোদন ছিল।

সকল কাজ শেষে মূসা ইস্রায়েলীদের উদ্দেশ্যে বিদায়ী ভাষণ দেয়ার জন্যে তাদেরকে সমবেত করলেন। তার এই বিদায়ী ভাষণ বা বক্তৃতামালা ছিল ভাবগম্ভীর, বেদনাপূর্ণ ও একটি স্মরণীয় ঘটনা। তার মূল্যবান বক্তৃতার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ইস্রায়েলীদের এ বিষয়ে বুঝতে সাহায্য করা যে, মহান আল্লাহ তাদের জন্যে কত কি করেছেন, তাঁর উপর তারা কতটা নির্ভরশীল ছিল এবং সারা জীবনের জন্যে তাঁর কাছে তাদের শর্তহীন বাধ্য থাকা কত প্রয়োজন। বক্তৃতার প্রধান বিষয় হচ্ছে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর প্রতি অবাধ্যতার শাস্তি এবং বাধ্যতার পুরস্কার। আল্লাহর প্রতি বাধ্যতাই হচেছ ন্যায়, সত্য ও মুক্তির পথ।

মূসা ইস্রায়েলীদের উদ্দেশ্যে যে বিদায়ী ভাষণ দেন তা ছিল এমন-

‘হে বনি ইস্রায়েল!
আমি তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালক খোদার সমস্ত নিয়ম ও নির্দেশ পৌছে দিয়েছি। তোমরা যত্ন ও নিষ্ঠার সঙ্গে যথাযথভাবে তা পালন করবে। স্মরণ রাখবে একমাত্র তিনিই আসমান এবং জমিনের অধিপতি।
-হে বনি ইস্রায়েল!
শোন, তোমাদের উপাস্য, তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ এক এবং অদ্বিতীয়।  তিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই। তোমরা প্রত্যেকে তোমাদের সমস্ত অন্তর, সমস্ত প্রাণ ও সমস্ত শক্তি দিয়ে তোমাদের প্রভু, খোদাকে ভালবাসবে, কেবল তাঁরই সেবা করবে।

একদিকে লোহিত সাগর থেকে প্যালেস্টীয়দের দেশের সাগর পর্যন্ত এবং অন্যদিকে মরুএলাকা থেকে ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত তোমাদের দেশের সীমানা খোদা নিজেই স্থির করে দেবেন। সেই দেশে যারা বাস করছে তাদের সঙ্গে কিম্বা তাদের দেবদেবতাদের সঙ্গে কোন চুক্তি করবে না। তা করলে তারা তোমাদেরকে পাপের পথে নিয়ে যাবে- তোমরা তাদের দেবদেবতাদের ফাঁদে আটকা পড়ে ধ্বংস হয়ে যাবে।

--হে বনি ইস্রায়েল!
তোমরা নির্দোষ কিম্বা সৎ কিম্বা তোমাদের সংখ্যাধিক্যের জন্যেই যে খোদা তোমাদের দিকে মনোযোগ দিয়েছেন এবং অন্যান্য জাতিদেরকে তোমাদের সম্মুখ থেকে বিতাড়িত করে তাদের দেশটা তোমাদের অধিকারে এনে দিচ্ছেন তা কিন্তু নয় বরং তিনি ইব্রাহিম, ইসহাক ও ইয়াকুবের কাছে যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তা পূর্ণ করার জন্যেই এই চমৎকার দেশটা যেখানে দুধ, মধু কোনটারই অভাব নেই তা দিচ্ছেন।

--হে বনি ইস্রায়েল!
তোমাদের প্রতি মহান খোদার দয়া ও করূণার কথা স্মরণ কর। স্মরণ কর, চল্লিশটা বৎসর কিভাবে তোমাদের এক বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে মরুএলাকার মধ্যে দিয়ে তিনি পরিচালিত করেছেন। এই দীর্ঘ সময়ে তোমাদের পরিধেয় পোষাক নষ্ট হয়নি এবং পদ যুগলও ভারী হয়ে যায়নি। তোমাদের দর্প চূর্ণ করতে এবং বাধ্যতা পরীক্ষায় ফেলে দেখতে তিনি এসব কাজ করেছেন। তোমরা ক্ষুধার্ত হলে- আকাশ থেকে খাদ্য মান্নার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, যে মান্নার কথা তোমাদের বা তোমাদের পূর্বপুরুষদের অজানা ছিল। তোমরা পিপাসার্ত হলে পাথর থেকে নির্ঝরিণীর সৃষ্টি করে দিয়েছেন। এভাবে তিনি তোমাদেরকে এই শিক্ষা দিতে চেয়েছেন যে, মানুষ কেবল রুটিতেই বাঁচে না, কিন্তু তাঁর মুখের প্রত্যেকটি কথাতেই বাঁচে। কাজেই তোমরা তাঁর আদেশ পালন করবে, তাঁর পথে চলবে এবং তাঁকে ভক্তি করবে।

--হে বনি ইস্রায়েল!
খোদা বলেছেন- ‘যদি তোমরা আমার বিধিপথে চল, আমার আজ্ঞাসমূহ পালন কর, তবে আমি যথাকালে তোমাদেরকে বৃষ্টি দান করব; তাতে ভূমি শস্য উৎপন্ন করবে ও বৃক্ষ সকল স্ব-স্ব ফল দেবে। তোমাদের শস্য মর্দ্দনকাল দ্রাক্ষা চয়নকাল পর্যন্ত থাকবে ও দ্রাক্ষা চয়নকাল বীজ বপনকাল পর্যন্ত থাকবে; এবং তোমরা তৃপ্তি পর্যšঅন্ন ভোজন করবে, ও নিরাপদে নিজ দেশে বাস করবে। আর আমি দেশে শান্তিপ্রদান করব। তোমরা শয়ন করলে কেহ তোমাদেরকে ভয় দেখাবে না; এবং আমি তোমাদের দেশ হতে হিংস্র জন্তুদেরকে দূর করে দেব; ও তোমাদের দেশে তরবারী ভ্রমণ করবে না। আর তোমরা নিজেদের শত্রুগণকে তাড়িয়ে দেবে, তোমাদের পাঁচজন এক শত জনকে এবং একশত দশ সহস্রকে ও তারা তোমাদের সম্মুখে তরবারীতে পতিত হবে। আর আমি তোমাদের প্রতি প্রসন্নবদন হব, তোমাদেরকে ফলবন্তও বহুবংশ করব ও তোমাদের সাথে আমার নিয়ম স্থির করব। আর তোমরা সঞ্চিত পুরাতন শস্য ভোজন করবে ও নুতনের সম্মুখ হতে পুরাতন শস্য বের করবে। আর আমি তোমাদের মধ্যে আপন আবাস রাখব, আমার প্রাণ তোমাদেরকে ঘৃণা করবে না। আর আমি তোমাদের মধ্যে গমনাগমন করব ও তোমাদের খোদা হব এবং তোমরা আমার প্রজা হবে।’

--হে বনি ইস্রায়েল!
তোমরা সেখানে পানাহারে তৃপ্ত হবার পর খোদা প্রদত্ত ঐ চমৎকার দেশটার জন্যে তাঁর প্রশংসা করবে। তোমরা সতর্ক থাকবে যেন শয়তান তোমাদেরকে তাঁর আদেশ-নির্দেশ ভুলিয়ে না দেয়। আর যদি তোমরা কখনও তাঁকে ভুলে গিয়ে দেবদেবতার পিছনে যাও এবং তাদের সেবায় ও পূজায় লিপ্ত হও, তবে আমি এ কথা নিশ্চয় করে বলছি যে, তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে। তোমাদের বাসস্থান ও ক্ষেত-খামারের সবকিছুতেই তোমরা অভিশপ্ত হবে। তোমরা বুনবে অনেক কিন্তু কাটবে কম।

--হে বনি ইস্রায়েল!
অত:পর কোন দলের সাথে বিরোধ উপস্থিত হলে প্রথমে তাদেরকে সন্ধির জন্যে আহবান করবে, যদি তারা সে আহবানে কর্ণপাত করে এবং সন্ধি করতে রাজী হয়, তবে তাদেরকে করদমিত্ররূপে গ্রহণ করবে, যদি তারা না শুনে, তবে তাদের সাথে যুদ্ধ করবে, যুদ্ধে তারা পরাজিত হলে তাদের পুরুষদের হত্যা করবে। স্ত্রী, পুত্র, বালক-বালিকাদের দাস-দাসীরূপে ব্যাবহার করবে এবং তাদের ধন-সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নেবে।

--হে বনি ইস্রায়েল!
জর্দান নদী পার হয়ে যাওয়া আমার হবে না। আমার অবর্তমানে ইউশায়াই তোমাদের নেতৃত্ব দেবে।

ক্ষণকাল বিরতি নিয়ে মূসা বললেন, ‘আমি তোমাদের মধ্যে বেঁচে থাকতেই যখন তোমরা খোদার বিরুদ্ধে এত এত বিদ্রোহ করেছ তখন আমার অবর্তমানে আরও কত বেশী করেই না তা করবে!’- ব্যবস্থা পুস্তক হাতে নিয়ে তিনি উঁচুতে তুলে ধরলেন এবং বললেন, ‘এখন থেকে এই ব্যবস্থা পুস্তকটা সাক্ষ্য সিন্দুকের পাশেই রাখা থাকবে। আর সেখানে তা থাকবে তোমাদের বিরুদ্ধে স্বাক্ষী হয়ে।’

ইস্রায়েলীরা মূসার অবর্তমানে নিজেদের অবস্থা ভেবে চিন্তিত হল। তারা কান্নাকাটি করতে লাগল। মূসা তাদেরকে সান্তনা দিলেন, বললেন, ‘খোদা বলেছেন, ‘আমি তাদের ভ্রাতৃদিগের মধ্য হতে তোমার মতই একজন পয়গম্বর উত্থিত করব এবং তার মুখে আমার বাণী প্রকাশ করব। সে তোমাদেরকে আমি যা আদেশ করব তাই-ই শুনাবে এবং এ অবশ্যই ঘটবে যে, তার মুখ নি:সৃত আমার সেই বাণী যারা শুনবে না তাদেরকে আমি শুনতে বাধ্য করব।’

মৃত্যুর পূর্বে ইস্রায়েলীদের প্রতি মূসার শেষ আশীর্বাদবাণী  ছিল এই-

‘প্রভু সিনাই থেকে এলেন,
তিনি সেয়ীর থেকে তাদের উপর আলো দিলেন;
তার আলো পারণ পাহাড় থেকে ছড়িয়ে পড়ল।
তিনি লক্ষ লক্ষ পবিত্র স্বর্গদূতের মাঝখান থেকে এলেন;
তার ডান হাতে রয়েছে তাদের জন্যে
এক জীবন্ত আইন গ্রন্থ।’

পিসগা। মোয়াবের সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ। পাদদেশে মূসা ও ইউশায়া। তারা উভয়ে চূঁড়ার দিকে দৃষ্টি ফেললেন। পাথরের এক স্তম্ভ যেন শির উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আকাশ ভেদ করে। মূসা ইউশায়াকে বললেন, ‘তুমি শক্তিশালী হও ও মনে সাহস আন, কারণ তোমাকেই এই বিদ্রোহী জাতিকে নেতৃত্ব দিতে হবে এবং সেই দেশে নিয়ে যেতে হবে, যে দেশটা তাদেরকে দেবার প্রতিজ্ঞা খোদা তাদের পূর্বপুরুষদের কাছে করেছিলেন। আর তোমাকেই সেই দেশটা সম্পত্তি হিসেবে এদের মধ্যে বন্টন করতে হবে। ভয় কোরও না, নিরুৎসাহিত হইও না। সর্বশক্তিমান খোদা তোমার সহায় হবেন।’

মূসা ইউশায়াকে বিদায় করে দিয়ে একাকী এই পর্বতে আরোহণ করলেন। সেখান থেকে তিনি আগ্রহ আর উত্তেজনা নিয়ে প্রতিজ্ঞাত দেশের সমৃদ্ধি দেখতে লাগলেন। দেখলেন জর্দান নদীর গভীর খাদের পশ্চিম দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে ইস্রায়েলীদের ভবিষ্যৎ বাসভূমি, যেখানে তিনি কখনই যেতে পারবেন না। তার অন্তরে আফসোস থাকলেও আত্মতৃপ্তিও ছিল। কেননা তিনি রেখে যাচ্ছেন এক শক্তিশালী জাতিকে যারা প্রতিজ্ঞাত ঐ দেশে প্রবেশের অপেক্ষায়।

মূসার শেষ দেখাটা হয়েছিল বিকেলে যখন বিদায়ী সূর্য্য তার আলো কনানের বিশেষ বিশেষ এলাকার উপর ফেলেছিল। দেখা শেষে আল্লাহ তার মনে ঐ দেশের গৌরবময় দর্শণ সতেজ থাকতেই তার জীবনাবসান করেছিলেন। তারপর ফেরেস্তারা তাকে বৈৎ পিয়োরের সম্মুখস্থ উপত্যকাতে সমাহিত করেছিল। এই কারণে তার সমাধি আজ পর্যন্ত কেউই সনাক্ত করতে পারেনি।

ঐশ্বরিক শক্তির প্রভাব বাদ দিয়ে সাধারণ ইতিহাসের আলোকে বিচার করলেও পৃথিবীর নথিপত্রে মূসার মত এমন ব্যক্তি দুর্লভ যিনি নিজের ও মানবজাতির ভাগ্যের মুক্তির জন্যে এত বেশী ও স্থায়ী প্রভাব ফেলেছেন।

সমাপ্ত।
সংশোধিত নয়।

# একজন বলল, “সামান্য পরিচয়ে শোয়েব কন্যা কি করে মূছার বিষয়ে সার্টিফিকেট দিল তার পিতাকে? আ মিন তার শক্তি সামর্থ্য ও চরিত্র সম্পর্কে?

@ আমি বললাম, “কোরআন দু’জন নারীকে বুদ্ধিমতীর সার্টিফিকেট দিয়েছে। তাদের একজন মূসার ভগ্নি মরিয়ম ও অপরজন শোয়েব কন্যা সফুরা।

মরিয়মের বিষয়টি ছিল- সে তার ভ্রাতা মূসাকে নদীতে ভাসিয়ে দেবার পর তার মাতার কথানুসারে তাকে অনুসরণ করছিল এমনভাবে যাতে কেউ বুঝতে না পারে। তারপর ফেরাউন পত্নী মূসাকে তুলে নিলেও সে এগিয়ে যায়নি যতক্ষণ না সে বুঝতে পারল তারা তাকে পালন করতে চায়। তারপর সে এগিয়ে গেল আর ছোট ভাইটির অমঙ্গলের আশংকায় নিজের পরিচয় গোপন রেখে ফেরাউন পত্নীকে বলেছিল, “আমি কি আপনাদেরকে এমন এক পরিবারের লোকদের দেখাব, যারা একে লালন করবে, একে বড় করবে আপনাদের হয়ে, আর এর ওপর মায়া করবে?” -আর এমনটি সে করেছিল যখন তার বয়স মাত্র চার বছর।

আর সফুরার বিষয়টি- মূসা যে শক্তিশালী তা কূয়োর মুখ থেকে ভারী পাথরখানা একাই সরিয়ে দেয়াতে সে বুঝতে পেরেছিল। আর বিশ্বস্ততা? -দু‘জন যুবতীর প্রতি তার ব্যাবহার ও দৃষ্টি তাকে এ বিষয়ে নিশ্চিত ধারণা দিয়েছিল। আর এ কথা তো সত্য যে, মেয়েরা জন্মগতভাবেই পুরুষের চাহনি সনাক্ত করার ক্ষমতা লাভ করে থাকে।

# আরেকজন বলল, “নবীগণের নরহত্যা বিষয়ে বিষয়ে বিতর্ক হইতেছিলো। একজন মুমিন মুসলমান বলিলো, “মূসা নবীর শারীরিক শক্তি ৪০/৪২ জন পুরুষের সমান ছিল, তিনি কাউকে চড় মারিলেই সে মৃত্যুবরণ করিত।”

নবীদের ব্যাপক খুন-খারাবির কথা শুনিয়া আমি ভাবিত হইয়া পড়িলাম। অত:পর ভাবিতে ভাবিতে নিজ বাটিতে ফিরিয়া আসিয়া নেটে সার্চ দিতে বসিয়া পড়িলাম। যাহা জালে উঠিয়া আসিলো তাহা একশব্দে চমৎকার বটে। “ইসলামিক কাহিনীগুলো ব্যাপক বিনোদনের উৎস”- এমনটা এখন আমি স্বীকার করিতে বাধ্য হইলাম। কাসাসূল আম্বিয়াতে রহিয়াছে-

“রাস্তার উপরে শাহি মহলের বাবুর্চি কাবুনের সাথে সামুরা নামক এক কাঠুরিয়ার ভীষণ ঝগড়া হচ্ছে। মুসা সেখানে উপস্থিত হয়ে পড়লে সামুরা ঘটনাটা বলে তার নিকট সাহায্য চাইল। মুসা এই অন্যায় সহ্য করতে না পেরে সক্রোধে কাবুনকে ঘুষি মারলেন। আল্লাহর মর্জি, লোকটি সেই ঘুষিতেই প্রাণত্যাগ করিল।”-(পৃষ্ঠা ২৭৬, কাসাসূল আম্বিয়া)

“অতঃপর আবার খিজির বললেন, হে মুসা, আমি যে বালকটিকে হত্যা করেছি, ঐ বালকটির ভিতরে নাস্তিকতার বীজ নিহিত ছিল, অথচ তারা পিতামাতা অত্যন্ত ধার্মিক। তজ্জন্য আমি বালকটিকে নিষ্পাপ অবস্থায়ই হত্যা করলাম, যাতে সে নিজেও বেহেশতি হয় এবং পিতামাতার বেহেশতি হওয়ার নসিবও যেন অক্ষুণ্ন থাকে।”-(পৃষ্ঠা ৩১৮, কাসাসূল আম্বিয়া)

অনেক মুসলমান ভাই দাবী করিয়া থাকেন, তাহাদের নবীরা নিষ্পাপ। কিন্তু বাইবেল ও কোরআণিক স্বাক্ষ্য ভিন্নরূপ বলিয়া আমার নিকট প্রতীয়মান হইতেছে। কেননা, কোরআন অনুসারে বলা যায়, মূসা নবী একজন নরহত্যাকারী, খিযির নবী নিষ্পাপ এক শিশু হত্যাকারী। অনান্যরা গণহত্যা, ধর্ষণ ও নানাবিধ অসামাজিক কার্যকলাপের সহিত জড়িত ছিলেন।

যাহা হউক, সকল ধর্মগ্রন্থগুলি নরহত্যা গুরুতর অপরাধ বলিয়া রায় দিয়াছে। হত্যাকারী ইহলৌক ও পরলৌকে শাস্তির আওতাধীন হইবে। কিন্তু আমরা দেখিতে পাইতেছি নবী মূসা ও খিযির ইহলৌকিক শাস্তিটা এস্কেপ করিয়া গিয়াছেন, এমনি করিয়া পরলৌকিক শাস্তিটাও তাহারা এস্কেপ করিয়া যাইতে সক্ষম হইবেন বলিয়া আপনি মনে করেন কি?

# বাঙ্গালীর মেধা ব্যাপক সত্যি বলতে কি আমি শিহরিত, পুলকিত। একজন এমন প্রশ্ন ও মন্তব্য করেছেন- মুহাম্মদের জন্মেরও শত শত বছর আগ থেকে তৌরাতের কাহিনী প্রচলিত এবং লিখিত আকারে সংরক্ষিত। সেই কিতাবে যীশুর আগের সকল নবীর বর্ণনা পুংখানুপুংখ রূপে বর্ণিত। এর বহু শত বছর পরে এসে মুহাম্মদ ইহুদি খৃষ্টানদের কাছ থেকে সেইসব কাহিনী শুনেছেন। সেই সব নবীদের নাম জেনেছেন। আর অত:পর সেই সব কাহিনীগুলোর আংশিক কোরানে উল্লেখিত হয়েছে। 

এখন মূল কিতাবের কাহিনীর চেয়ে শুনে লেখা কাহিনী বেশী বিশুদ্ধ হয় কিভাবে? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোন কবিতার বইয়ের মূল পান্ডুলিপির চাইতে কি তার কবিতা শুনে যদি কেউ সেটা লেখে সেটা কি বেশী শুদ্ধ হবে?

আপনাদের মারত্মক বিশ্বাস এতটাই আপনাদের বোধ বুদ্ধি ভোতা করে দিয়েছে যে, আপনারা নকল কিতাবকে মূল পান্ডুলিপির চাইতে বেশী বিশুদ্ধ বলে রায় দিচ্ছেন। মুসলমানদের সমস্যা কিন্তু এখানেই। নকল কিতাবকে মূল পান্ডুলিপির চাইতে বেশী বিশুদ্ধ বলে ধরে নিয়ে, পরে যখন দেখে মুল পান্ডুলিপির সাথে তাদের নকল কিতাবের মিল নেই, তখন তারস্বরে প্রচার শুরু করে দেয় মূল কিতাব বিকৃত বা ভ্রান্ত। এইভাবে আগে মানুষকে ঠকানো যেত, বর্তমানের ইন্টারনেটের যুগ এভাবে এত কাঁচা কৌশলে ঠকানো যায় না। 

মনে রাখবেন, তৌরাত কিতাবের কাহিনী শুনে মুহাম্মদ নবিদের কাহিনী তার কোরানে ঢুকিয়েছেন, কোরানের কাহিনী শুনে কেউ তৌরাত কিতাবে কোন কাহিনী ঢুকায় নি। সুতরাং কোন কিতাবের বর্ণনা ও তথ্য নিখুত ও বেশী বিশুদ্ধ হবে? তৌরাতের নাকি কোরানের?

তারস্বরে একটা মিথ্যাকে সবাই মিলে সত্য বলে প্রচার চালালে তা কি সত্য হয়ে যাবে? সেই যুগ কি আর আছে? কিন্তু আপনাদেরকে বুঝাবে কে, এ কাজ স্বয়ং আল্লাহরও দু:সাধ্য।