pytheya.blogspot.com Webutation

৩১ মার্চ, ২০১৩

Barnabas: খৃষ্টধর্মের প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা।


বার্নাবাস (Barnabas) সাইপ্রাসে এক ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বা বার-নেব শব্দটির অর্থ ‘সান্ত্বনার পুত্র’ বা ‘প্রেরণার পুত্র’। তার প্রকৃত নাম জোসেস বা জোসেফ।  বার্নাবাস নামটি যীশুর শিষ্যদের দেয়া। যদিও ৪টি গসপেলে তার সম্পর্কে সামান্যই উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু নিউ টেষ্টামেন্টের অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য গ্রন্থ থেকে প্রমাণ মেলে যে যীশুর অন্তর্ধানের পর তিনি তার শিষ্যদের নেতা হয়েছিলেন। কনস্টান্টিনোপালের প্যার্টিয়ার্ক সেইন্ট ফটিয়াসের (Photius) মতে প্রেরিতদের কার্যাবলি (Acts of the Apostles) বার্ণাবাসের লেখা-(Quaest. in Amphil., পৃ. ১২৩), যদিও বর্তমানে অধিকাংশ লোকের বিশ্বাস সেটি লুকের লেখা। যাইহোক, বার্নাবাস সেই ব্যক্তি যিনি যীশুর প্রকৃত শিক্ষা অবিকল ভাবে টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা চালান, বিশেষ করে টারসসের পল সহ অন্যান্যদের নতুন কিছু সংযোজনের বিরোধিতা করেন। 

সাইপ্রাসের ম্যাপ।
পলীয় চার্চ একসময় যখন ত্রিত্ববাদ গ্রহণ করে তখন এ মতবাদের বিরোধী সকল প্রমাণ নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা কালে The Travels and Teachings of the Apostles- এর মত গ্রন্থও ধ্বংস করে ফেলা হয়। ফলে বার্নাবাস ও যিশুর অনান্য সাক্ষাৎ শিষ্যদের সম্পর্কে লেখা প্রথম দিককার অধিকাংশ গ্রন্থই বিলুপ্ত হয়। ত্রিত্ববাদ নীতির কারণেই ৪টি গৃহীত গসপেল থেকে আশ্চর্যজনক ভাবে যীশুর ধর্মপ্রচার কালীন সময়ে বার্নাবাসের উল্লেখ পাওয়া যায় না। আর তাই, লূকের মতে যীশুর অন্তর্ধানের পর তার শিষ্য ও অনুসারীদের নেতৃত্বদানের যোগ্যতা যে বার্নাবাস ছাড়া দ্বিতীয় আর কারো ছিল না, সে বার্নাবাস নিজে, পলের সাথে মতবিরোধ ও সঙ্গ ত্যাগের পরপরই ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে যায়। 

যীশুর ধর্মপ্রচারের গোড়া থেকেই বার্নাবাস তার সঙ্গে ছিলেন। তার গসপেল থেকে যীশুর প্রতি তার অতুলনীয় আনুগত্য ও ভালোবাসার প্রমাণ পাওয়া যায়। বার্নাবাস শুধু যীশুর সার্বক্ষণিক সহচরই ছিলেন না- তিনি তার মহান শিক্ষা আত্মস্থ ও স্মরণ রেখেছিলেন। তিনি অত্যল্পকালের মধ্যেই বিশেষ খ্যাতি লাভ করেছিলেন, কারণ তিনি যীশুর কাছ থেকে লব্ধ শিক্ষা অন্যদের কাছে পৌঁছে দিতে সক্ষম ছিলেন। যীশুর শিষ্য ও অনুসারীরা তার নাম দিয়েছিলেন তা থেকে বক্তা হিসাবে তার শক্তিমত্তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আর আমরা দেখতে পাই তার লিখিত গসপেল, তা নিয়ে যত বিতর্কই হোক না কেন, সেটি ক্যাননিক্যাল গসপেল তথা স্বীকৃত চারটি গসপেল থেকে ভিন্ন এবং অনেক বেশী তথ্য ও ব্যাখ্যা সমৃদ্ধ, যা তাকে অন্যান্য গসপেল লেখকদের থেকে অধিকতর জ্ঞানী হিসেবে, জেসাসের শিক্ষার ধারক ও বাহক হিসেবে বোদ্ধাদের সহজ স্বীকৃতি এনে দিয়েছে।

Barnabas.
যীশুর সাথে সাক্ষাতের পর বার্নাবাস তার সকল সম্পদ বিক্রি করে দেন এবং সেই অর্থ যীশুর অনুসারীদের ব্যবহারের জন্যে প্রদান করেন। তাকে যে সব নাম দেওয়া হয়েছিল তিনি তার সবগুলোতেই পরিচিত ছিলেন। এ থেকে তার প্রতি যীশু ও তার শিষ্যদের স্নেহ ও ভালোবাসার পরিচয় মেলে। যীশুর শিষ্যরা জুডাসের স্থলে এমন একজনকে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেন যিনি একবারে জনের দীক্ষিত করার সময় থেকে যীশুর সার্বক্ষণিক সহচর ছিলেন। তারা এ জন্যে দু’জনকে মনোনীত করেন। একজন হলেন যোসেফ যাকে বার্নাবাস বলা হত। তার আর এক নাম ছিল জাষ্টাস (Justus) অন্যজন হলেন: ম্যাথিয়াস -প্রেরিতদের কার্য (১:২২-২৩)। যীশুর জীবনকালে তার সঙ্গী হিসাবে নিউ টেষ্টামেন্টে যে যোসেফের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি বার্নাবাস ছাড়া আর কেউ নন। কারণ এসময় শুধুমাত্র তাকেই যোসেফ নামে ডাকা হত। গুডস্পীড বলেন, সুতরাং সকল সম্ভাবনা যার প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বার্নাবাস, কেননা ভয়ংকর বিষ পান করেও তার কোন অসুবিধা হয়নি। যদি তাই হয়, তাহলে এটাই প্রতীয়মান হয় যে বার্নাবাস যদি যীশুর প্রথম সারির ১২ জন শিষ্যের একজন নাও হয়ে থাকেন তবে প্রথম ৭০ জন শিষ্যের মধ্যে অবশ্যই তিনি একজন ছিলেন। 

Clement of Alexandria.
যীশুর মাতা মেরী যখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত তখন তিনি ১২ জন শিষ্যের সকলকেই ডেকে পাঠান। যারা এসেছিলেন, তাদের মধ্যে বার্নাবাস ছিলেন অন্যতম। আলেকজান্দ্রিয়ার ক্লিমেন্টও (Clement of Alexandria) সব সময়ই বার্নাবাসকে ১২ জন শিষ্যের একজন হিসেবে উল্লেখ করে গেছেন। এমনটি হতে পারে যে যীশু এসোনী সম্প্রদায় কর্তৃক লালিত পালিত হয়েছিলেন এবং জানা যায় যে বার্নাবাস সেকালের গোঁড়া ইহুদীবাদের শ্রেষ্ঠতম শিক্ষক জামালিয়েল (Gamaliel)-এর একজন ছাত্র ছিলেন। সুতরাং যীশু বার্নাবাসের সাক্ষাতের অর্থ ছিল এই যে, এসোনীদের রহস্যময় অধ্যাত্মবাদী শিক্ষা ও মন্দিরের গোঁড়া ইহুদীবাদের সমন্বয় ঘটেছিল। নিঃসন্দেহে তা উভয়ের মধ্যে সম্প্রীতি সৃষ্টিতে অবদান রেখেছিল। যেহেতু বার্নাবাস ছিলেন একজন লেভীয় পুরোহিত সে কারণে তিনি ধর্মপ্রাণ যোদ্ধাদের (Zealots) একটি ডিভিশনের কমান্ডার হয়ে থাকতে পারেন। 
আসলে বার্নাবাস সম্পর্কে খুব সামান্যই জানা যায়। সর্বশেষ ঐতিহাসিক গবেষণায় ধীরে ধীরে তার ব্যাপারে অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে যেহেতু তিনি ছিলেন যীশুর সার্বক্ষণিক সহচর। এখন একটা বিষয়ে সকলেই একমত যে যীশুর ‘লাষ্ট সাপার’ বা শেষ সন্ধ্যা ভোজ বার্নাবাসের বোনের বাড়িতেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল। 
Albert Schweitzer.
আলবার্ট শোয়েইটজার (Albert Schweitzer) “দি কিংডম অব গড অ্যান্ড প্রিমিটিভ ক্রিশ্চিয়ান বিলিফ” গ্রন্থে লিখেছেন: প্ররিতদের কার্য (Acts) থেকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায় যে যীশুর শিষ্য ও গ্যালীলির বিশ্বাস স্থাপনকারীরা জন মার্কের মায়ের বাড়িতে মিলিত হয়েছিলেন যিনি বার্নাবাস ও পলের প্রথম ধর্মপ্রচার সফরে তাদের সঙ্গী হয়েছিলেন-প্রেরিতদের কার্য (১২:২৫) ... তাদের সাক্ষাতের স্থানটি ছিল উপরের ঘর অর্থাৎ যেটি ছাদের ঠিক নীচেই অবস্থিত ছিল।-প্রেরিতদের কার্য (১:১২-১৪)। যীশুর সকল সহচরের উপস্থিতির ফলে সেটি ছিল এক বড় সমাবেশ। এটি ছিল সেই কক্ষ যে কক্ষে ইহুদীদের পর্ব (Pentecost) উপলক্ষে একই স্থানে সকল বিশ্বাস স্থাপনকারী একত্র হয়েছিলেন-প্রেরিতদের কার্য (২:১)। যীশু যে স্থানে তার শিষ্যদের নিয়ে “লাষ্ট সাপার” (Last Supper)-এ মিলিত হয়েছিলেন, তার সাথে এ স্থানটি কি করে অভিন্ন বলে শনাক্ত করা গেল?

যীশু যখন বেথানী (Bethany) থেকে তার দু’জন শিষ্যকে তার জন্য ইহুদী পর্বের ভোজ (Passover) আয়োজনের নির্দেশ দিয়ে শহরে প্রেরণ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন যে পানি ভরা কলস বহনকারী এক ব্যক্তি তাদের সাথে সাক্ষাৎ করলে তাদের তাকে অনুসরণ করতে হবে। সেই ব্যক্তি তাদের একটি বাড়িতে নিয়ে যাবেন যার উপর তলাটি কম্বল বিছানো। সেখানেই তাদের খাবার প্রস্তুত করতে হবে। আমরা এই মূল্যবান তথ্যটি পাই মার্কের গসপেল থেকে -মার্ক (১৪:১৩-১৫), যার উৎস হলেন জন মার্ক। মথি শুধু এটুকু বলেছেন যে যীশু শহরে কাউকে জানানোর জন্য দু’জন শিষ্যকে প্রেরণ করেন- “প্রভু বললেন, আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে; আমি ঐ বাড়িতে শিষ্যদের নিয়ে পর্বের দিন পালন করব”-মথি (২৬:৮) থিওডোর জায়ন (Theodor Zahn) সেই মত পোষণকারীদের মধ্যে অন্যতম প্রথম যিনি বলেন যে যীশু যে বাড়িতে শেষ খাবার গ্রহণ করেন তা মার্কের মায়ের বাড়িটির সাথে অভিন্ন ছিল এবং সেখানে যীশুর শিষ্যরা গ্যালীলি থেকে আগত বিশ্বাস স্থাপনকারীদের সাথে মিলিত হয়েছিলেন।

যদিও শোয়েইটজার বলেছেন যে সেই বাড়িটি জন মার্কের মায়ের, তিনি কিন্তু একথা স্মরণ করিয়ে দেননি যে মার্কের মা ছিলেন বার্নাবাসের বোন। যেহেতু বার্ণবাস তার যা কিছু সম্পদ ছিল তার সবই বিক্রি করে দিয়েছিলেন, সেহেতু ধারণা করা হয় যে তিনি জেরুজালেমে থাকার সময় তার বোনের বাড়িতে যথেষ্ট বড় ঘর ছিল যা সকল শিষের স্থান সংকুলানের উপযুক্ত ছিল। নিউ টেষ্টামেন্টে এসব বিষয় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখিত না হওয়ার কারণ সম্ভবত এটাই যে যীশুর শিষ্যরা তাদের সাক্ষাতের স্থানকে গোপন রাখতে চেয়েছিলেন। কেননা সেটা ছিল এমন এক সময় যখন নিজেদের ধর্ম বিশ্বাসের কারণে তাদের উপর নির্যাতন চলছিল।

এখন প্রশ্ন জাগে যে বার্নাবাস সুস্পষ্টভাবে তার বোনের বাড়িতে যে কোন সমাবেশের মেজবান হওয়া সত্ত্বেও গৃহীত ৪টি বাইবেলের ‘লাষ্ট সাপারের’ বর্ণনায় তার নাম উল্লেখিত হয়নি কেন? হয় তার নাম উল্লেখিত ছিল কিন্তু পরে অপসারণ করা হয়েছে অথবা সোজা কথায় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। এটা সম্ভব যে কারাগারে থাকার কারণে সেখানে উপস্থিত হওয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। লিখিত বর্ণনায় দেখা যায়, বারাব্বাস (Barabbas) নামক এক ব্যক্তি একদল লোক নিয়ে রোমানপন্থী ইহুদীদের আক্রমণ করেন। আর এ সংঘর্ষ ঘটেছিল ইহুদী পর্ব উপলক্ষে আয়োজিত ভোজের অত্যল্পকাল পূর্বে। এ সংঘর্ষে ইহুদীদের নেতা নিহত হন, কিন্তু বারাব্বাস আটক হন ও তাকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। এ সংঘর্ষের ঘটনাবলী বিশদভাবে পরীক্ষাকারী হেইনরিখ হলজম্যান (Heinrich Holtzman) বলেন, গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের মধ্যে বিখ্যাত বারাব্বাসও ছিলেন যিনি ছিলেন নিশ্চিতভাবে একজন দেশপ্রেমিক ও একজন রাজনৈতিক ‘নবী’। যীশুর সাথে প্রায় একই সময় তারও বিচার অনুষ্ঠিত হয়। 

যেহেতু বার্নাবাস একজন লেবীয় পুরোহিত ছিলেন এবং যীশুর শিষ্যদের মধ্যে ছিলেন প্রধান, সে কারণে তিনি ধর্মপ্রাণ যোদ্ধাদের একটি ডিভিশনের প্রধান হয়ে থাকতে পারেন। মরু সাগর পুঁথি (Dead Sea Scrolls) থেকে আমরা জানতে পারি যে, এই ৪টি ডিভিশন ছিল এসোনী সম্প্রদায়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং তারা বিদেশী আগ্রাসনকারী ও তাদের সমর্থকদের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিল। শুধু একদল ধর্মপ্রাণ যোদ্ধাদের পক্ষেই সে সময় রোমান পন্থী ইহুদীদের উপর সংগঠিত আক্রমণ চালানো সম্ভব। সুতরাং এটা হতে পারে যে বারাব্বাস ও বার্নাবাস এক এবং অভিন্ন ব্যক্তি ছিলেন। এটা খুবই সম্ভব যে পলের কাহিনির অংশ নয় এমন কোন ঘটনার সাথে জড়িত হিসেবে বার্নাবাসের নাম উল্লেখ থাকলে পলীয় চার্চ অন্যান্য সংশোধনীর সাথে তা হয় অপসারণ, নয় পরিবর্তন করেছে। তারা এ প্রক্রিয়া সকল ক্ষেত্রে অনুসরণ করতে পারেনি, কারণ নিউ টেষ্টামেন্টে বার্নাবাসের উল্লেখ রয়েছে। প্রেরিতদের কার্য থেকে জানা যায়, চার্চের গোড়ার দিকের দিনগুলোতে বার্নাবাস পলকে যে সমর্থন দিয়েছিল, তিনি সেটা না করলে খৃষ্ট ধর্মের ইতিহাসে পলের কোন স্থান থাকত কিনা সন্দেহ।

যীশুর অন্তর্ধানের পর তার নিকট অনুসারীদের ভাগ্যে কি ঘটেছিল, সে ব্যাপারে কোন বিবরণ পাওয়া যায় না। মনে হয় যীশুর কথিত ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার পর তাদের অনেকেই বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। কিছুকাল পরে তারা জেরুজালেমে আবার জড়ো হতে শুরু করেন। ১২ জন শিষ্য এবং ৭০ জন ঘনিষ্ঠ অনুসারীর মধ্যে কতজন ফিরে এসেছিলেন তা জানা যায় না। এটা নিশ্চিত যে যারা ফিরে এসেছিলেন তারা ছিলেন বিশ্বাসী, আন্তরিক ও সাহসী এবং যীশুর জন্যে তাদের ছিল সুগভীর ভালোবাসা। যীশুর ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে বার্নাবাসের অবস্থান শিষ্যদের ছোট দলটির মধ্যে তাকে বিশিষ্ট করে তুলেছিল। তারা ইহুদী হিসেবেই জীবন যাপন করতেন এবং যীশু তাদের যে শিক্ষা দিয়েছিলেন তা পালন করতেন। তারা নবীগণের বিধান অনুসরণ করতেন যা “ধ্বংস নয়, পরিপূর্ণ করার জন্যই” যীশু আগমন করেছিলেন-মথি (৫:১৭)। সেকারণে তাদের কারো কাছেই যীশুর শিক্ষা নতুন কোন ধর্ম ছিল না। তারা ছিলেন ধর্মনিষ্ঠ ইহুদী এবং প্রতিবেশীদের সাথে তাদের পার্থক্য ছিল যীশুর প্রচারিত বাণীতে তাদের বিশ্বাস। 

যে সকল ইহুদী মুসার বাণীকে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্যে ব্যবহার করছিল এবং যারা শঙ্কিত হয়ে পড়েছিল যে যীশুর অনুসারীদের সমর্থনের অর্থ হবে অনিবার্যরূপে নিজেদের সম্পদ, শক্তি ও অবস্থানের জন্যে ক্ষতিকর, সেসব ইহুদীদের কারণেই যীশুর অনুসারী ও ইহুদীদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। উচ্চ শ্রেণীর ইহুদীরা তাদের বিশেষ স্বার্থ ও শত শত বৎসর ধরে ভাগকৃত সুযোগ সুবিধা রক্ষার জন্যে রোমানদের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিল। এর ফলে তারা এমনকি নিজেদের ধর্ম থেকেও সরে গিয়েছিল। যাদের কথা ও কাজের ফলে তাদের কৃতকর্ম প্রকাশ হয়ে পড়ার আশংকা ছিল, এমন ব্যক্তিদের উপর নির্যাতন চালানোর জন্যে এ সব ইহুদী রোমানদের সক্রিয়ভাবে সমর্থন দিয়েছিল। তাই দেখা যেত যে যীশুর একজন অনুসারী যখন তাঁকে গ্রহণ করেছে, সেখানে একজন ইহুদী তাকে প্রত্যাখ্যান করছে। একদিকে রোমানরা তাদের রাজনৈতিক শক্তির প্রতি হুমকি বলে তাদের তাড়া করে ফিরত, অন্যদিকে নিজেদের ‘ধর্মীয় কর্তৃত্ব’ খর্ব হবে এ আশংকায় ইহুদীরাও তাদের খুঁজে বেড়াত।

পরবর্তী বছরগুলোতে যীশুকে স্বীকার করতে অনিচ্ছুক ইহুদী ও যীশুর অনুসারীদের মধ্যকার ব্যবধান ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। ৭০ সনে টাইডাসের জেরুজালেম অবরোধের সময় যীশুর অনুসারীরা নগর ত্যাগ করে। ১৩২ সনে বার কোয়াচাবা (Bar Coachaba) বিদ্রোহের সময়ও একই ঘটনা ঘটে।

Aristides.
যীশুর আবির্ভাব তার বৈশিষ্ট্য ও ঈশ্বরের সাথে সম্পর্কের বিষয় পরবর্তীকালে বিপুল আলোচনা- ব্যাখ্যার উৎস হলেও তার আদি অনুসারীদের মধ্যে এ সব ব্যাপারে কোন প্রশ্ন দেখা দেয়নি। যীশু ছিলেন একজন মানুষ যিনি ছিলেন একজন নবী এবং এমনই এক ব্যক্তি যিনি ঈশ্বরের কাছে থেকে অনেক কিছু লাভ করেছিলেন। তারা কোন প্রশ্ন ছাড়াই তাকে গ্রহণ করেছিলেন। যীশুর কথায় বা পৃথিবীতে তার অবস্থানকালীন জীবনে এমন কিছু ছিল না যাতে এ ধারণার কোন ব্যত্যয় হয়। আরিষ্টাইডস (Aristides) এর মতে, গোড়ার দিকের খৃষ্টানরা ইহুদীদের চাইতে অনেক বেশি পরিমাণে একেশ্বরবাদী ছিল।

এই বিশ্বস্ত অনুসারী চক্রের মধ্যেই টারসসের পল বা পৌল (Paul of Tursus) বিচরণ করেছিলেন। তিনি কখনোই যীশুর সাথে সাক্ষাৎ করেননি, কিংবা যীশুর ঘনিষ্ঠ শিষ্যদের কারো সাথেই তিনি সংশ্লিষ্ট ছিলেন না। বরং যীশুর একজন বড় শত্রু হিসেবেই তিনি পরিচিত ছিলেন। তিনি ষ্টিফেন (Stephen) এর প্রতি পাথর নিক্ষেপ সতর্ক দৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। ষ্টিফেন ছিলেন ধর্ম ও পবিত্র আত্মায়, (Holy Ghost) পূর্ণ বিশ্বাসী -প্রেরিতদের কার্য (৬:৫) এবং সেই ক্রমবর্ধমান সংখ্যক ভক্তদের একজন যিনি যীশুর অন্তর্ধানের পর তার অনুসারীদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন। পলের নিজের শিক্ষক জামালিয়েল ষ্টিফেনকে রক্ষা করার চেষ্টা করলে তাকেও পাথর ছুঁড়ে হত্যা করা হয়। 

জানা যায় যে পল, যাকে তখন সল (Saul) বলে ডাকা হত, সে সময় চার্চের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড অত্যাচার চালানোর জন্যে দায়ী ছিলেন। তিনি গির্জাগুলো ধ্বংস করেন এবং ঘরে ঘরে প্রবেশ করে নারী ও পুরুষদের টেনে হিঁচড়ে বের করে এনে কারাগারে বন্দী হিসেবে নিক্ষেপ করেন -প্রেরিতদের কার্য (৮:১-৩)। পলের নিজের স্বীকারোক্তি: “আপনারা শুনেছেন .....কি প্রচণ্ড অত্যাচার আমি চালিয়েছি ঈশ্বরের চার্চের উপর এবং সেগুলোকে ধ্বংস করেছি, আমি আমার স্বদেশীয় অনেকের চাইতে ইহুদী ধর্মের কাছ থেকে লাভবান হয়েছি, কারণ আমি আমার পূর্বপুরুষদের চাইতেও অনেক বেশি ধর্মান্ধ।"-গালাতীয়ান্স (১:১৩-১৫) এবং প্রেরিতদের কার্য (৯:৪১)-এ এ সম্পর্কে বলা হয়েছে: ”পল যীশুর অনুসারীদের হুমকি প্রদান ও হত্যা চালিয়ে যেতে থাকলেন। তিনি প্রধান পুরোহিতের কাছে গেলেন এবং তার কাছে দামেস্কের সিনাগগগুলোর কাছে চিঠি লিখে দেওয়ার আবেদন জানালেন যাতে যীশুর অনুসারী কাউকে পাওয়া গেলে তা সে নারী বা পুরুষ যেই হোক না কেন, তাকে যেন জেরুজালেমে নিয়ে আসতে পারেন।” 
এই দামেস্ক যাত্রাপথে পল যীশুকে স্বপ্নে দেখেছিলেন এবং পরিণতিতে তার অনুসারীতে পরিণত হয়েছিলেন বলে কথিত আছে। 
ধর্মান্তরিত হওয়ার পর পল দামেশকে যীশুর অনুসারীদের সাথে অবস্থান করেন এবং “সরাসরি সিনাগগগুলোতে গমন করে যীশু ঈশ্বরের পুত্র” বলে প্রচার করতে থাকেন প্রেরিতদের কার্য (৯:২০)। এর ফলশ্রুতিতে তিনি অত্যাচারের স্বাদ লাভ করতে শুরু করলেন যার সাথে নিকট অতীতে তিনি নিজেই জড়িত ছিলেন। যদি তিনি যীশুর বর্ণনা করতে গিয়ে সত্যই তাঁকে ‘ঈশ্বরের পুত্র’ বলে আখ্যায়িত করে থাকেন, তাহলে সম্ভবত তা ইহুদীদের ক্রুদ্ধ করে তোলায় সহায়ক হয়েছিল। যেহেতু তারা ছিল ঈশ্বরের একত্বে বিশ্বাসী সে কারণে ঈশ্বরের একটি পুত্র থাকার ধারণাটি তাদের কাছে অত্যন্ত ঘৃণ্য ছিল। 

এরপর পল দামেস্ক ত্যাগ করেন। তিনি যীশুর অন্যান্য অনুসারীদের সাহচর্য সন্ধানের পরিবর্তে আরবের মরুভূমিতে গমন করেন। সেখানে তিনি ৩ বৎসর লুকিয়ে থাকেন। মরুভূমির নির্জনবাস শেষে পল জেরুজালেমে ধর্ম প্রচারকদের কাছে আগমন করেন। তার আকস্মিক আগমনের ঘটনা বিস্ময় সৃষ্টির চাইতে সন্দেহ সৃষ্টি করে বেশি।পল যীশুর অনুসারীদের প্রতি যে নির্যাতন চালিয়েছিলেন, তার স্মৃতি তখনও তাদের মনে জাগরুক ছিল। আর তাই যীশুর শিষ্যদের পক্ষে পলকে তাদের মধ্যে গ্রহণ করার কোন কারণ ছিল না। তিনি যে তাদের উপর নির্যাতন চালিয়েছিলেন শুধু তাই নয়, তিনি আরো দাবি করেছিলেন যে যীশুর শিক্ষা সম্পর্কে তিনি জ্ঞাত অথচ তিনি তাকে কোন দিন দেখেননি ও তার সাথে কখনোই অবস্থান করেননি। এমনকি যীশুর ঘনিষ্ঠ শিষ্যদের সাথেও তিনি কখনো থাকেননি। যীশুর জীবিতকালে যারা তার ঘনিষ্ঠ সাহচর্য পেয়েছিলেন, তাদের কাছ থেকে কিছু জানা ও শেখার বদলে পল তাদের শিক্ষা প্রদান করতে চাইলেন। পল পরে গালাতীয়দের কাছে লেখা তার চিঠিপত্রে তার এ পদক্ষেপের যৌক্তিকতা বর্ণনা করে বলেন: ভাইসব, আমি এ মর্মে প্রত্যয়ন করছি যে আমার দ্বারা প্রচারিত গসপেল কোন মনুষ্য রচিত নয়। আমি কোন মানুষের কাছ থেকে এটি লাভ করিনি কিংবা কেউ আমাকে এটা শিক্ষাও দেয়নি, এটি হল যীশুর প্রত্যাদেশ থেকে প্রাপ্ত।-গালাতীয় (১:১০-১২) 
এভাবেই পল যীশুর সাথে নিজের সম্পৃক্ততার দাবি করেন যা যীশুর জীবৎকালিন ঘনিষ্ঠ অনুসারীরা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। পল তাকে যে শিক্ষা দেয়া হয়েছি বলে দাবি করেন তা স্বয়ং যীশুর মুখ থেকে ধর্ম প্রচারকদের শোনা শিক্ষার সাথে মিলিয়ে দেখা হয়নি। এটা বোঝা যায় যে তারা ধর্মান্তরের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেছিলেন এবং তার কথিত “প্রত্যাদেশ” কে নির্ভরযোগ্য বলে গণ্য করেননি। অনেকে সম্ভবত সন্দেহ করেছিলেন যে তিনি যীশু অনুসারীর ছদ্মবেশে গুপ্তচর চাড়া আর কিছু নন।

এন্টিওক নগরী।
পলকে গ্রহণ করা হবে কিনা এ নিয়ে এক তিক্ত বিরোধের সৃষ্টি হয় এবং এর ফলাফল ছিল পূর্ব নির্ধারিত। এমতাবস্থায় জামালিয়েলের ছাত্র হিসেবে বার্নাবাস তার সহপাঠী  পলের পক্ষে হস্তক্ষেপ ও প্রচারণা শুরু করেন। যীশুর অনুসারীদের তার সহপাঠী পলের পক্ষে হস্তক্ষেপ ও প্রচারণা শুরু করেন। যীশুর অনুসারীদের সর্বসম্মত বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি পলকে তাদের দ্বারা গ্রহণ করান। এ থেকে ধর্ম প্রচারকদের উপর বার্নাবাসের প্রভাবের মাত্রা এবং যীশুর জীবিত থাকা অবস্থায় তার সাথে তার সুগভীর ঘনিষ্ঠতার আভাস পাওয়া যায়। পল অবশ্যই এ কথা উপলব্ধি করেছিলেন যে শুধুমাত্র বার্নাবাসের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার বলেই তিনি গৃহীত হয়েছেন, নিজের প্রচেষ্টায় নয়। এর ফলে সম্ভবত তিনি অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তাই, এ ঘটনার পর পরই তিনি যে তার নিজের শহর টারসসে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সম্ভবত তার অন্যতম কারণ ছিল এটাই। অবশ্য এ কথাও জানা যায় যে তার জীবন বিপদাপন্ন হওয়ার কারণেই তিনি জেরুজালেম ত্যাগ করেন। 

রোমান ইহুদীদের নির্যাতনের কারণে যীশুর বহু অনুসারী দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েন। পল ও তার অনুসারীদের নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্যে ধর্ম প্রচারক এন্টিওকের (Antioch) উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। তৎকালীন রোমান সাম্রাজ্যে রোম ও আলোকজান্দ্রিয়ার পর এন্টিওক ছিল তৃতীয় বৃহত্তম নগরী। এক সময় তা ছিল গ্রীক সাম্রাজ্যের রাজধানী এবং ব্যবসা ও বাণিজ্য কেন্দ্র হিসাবে নগরটি বিকশিত হয়েছিল। সম্পদের প্রচার্যে স্ফীত জনগণ বিলাসী হয়ে ওঠে। শিগগিরই তাদের অধঃপতন ঘটে এবং এন্টিওক নৈতিকতাহীন জীবনযাত্রার নগরী বলে কুখ্যাতি লাভ করে।

Libanius.
এরকম একটি নগরে গায়ে শুধু কম্বল জড়ানো ক্ষুদ্র একদল আগন্তুক সহজ, সরল ও সততাতার সাথে ঈশ্বর ভীতিপূর্ণ জীবন যাপন শুরু করে। নৈতিকতাহীন জীবন-যাপনে ক্লান্ত নগরবাসীরা তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ভিড় জমাতে শুরু করে। কিন্তু অধিকাংশ লোকের কাছেই তারা ছিল অবজ্ঞা ও উপহাসের পাত্র। এসব নগরবাসী তাদের ‘খৃষ্টান’ বলে ডাকত। সামান্য কিছু লোকের কাছে এ শব্দটি ছিল শ্রদ্ধাব্যাঞ্জক, কিন্তু অন্যরা এ শব্দটিকে ঘৃণা ও অবজ্ঞা করত। এসময় পর্যন্ত যীশুর অনুসারীরা নাজারিনি (Nazarene) নামেই পরিচিত ছিলেন। হিব্রু এ শব্দটির মূল অর্থ “রক্ষা করা বা ‘প্রহরা দেওয়া।’ এভাবেই এ বিশেষণটি যীশুর শিক্ষার রক্ষক ও অভিভাবক হিসাবে তাদের ভূমিকার ইঙ্গিত বহন করছিল। 
Jerome.

লাইবেনিয়াস (Libanius) বলেছেন যে এন্টিওকের ইহুদীরা দিনে তিনবার প্রার্থনা করত এবং প্রতি প্রার্থনায় “নাজারিনিদের উপর ঈশ্বরের অভিশাপ”প্রেরণ করত। অন্য এক ঐতিহাসিক প্রফেরী (Prophery) তাদের জীবন পদ্ধতিকে “বর্বর, নতুন ও অদ্ভুত ধর্ম” বলেন বর্ণনা করেছেন। সেলসাস (Celsus) বলেন, জেরোমের (Jerome) মতে খৃষ্টানদের “গ্রীক ভণ্ড ও প্রতারক” বলে আখ্যায়িত করা হত। কারণ গ্রীক মন্দিরের পুরোহিতরা যে আলখেল্লা পরিধান করতেন তারাও সেই একই গ্রীক আলখেল্লা পরিধান করতেন। 
যীশুর অনুসারীরা এ ধরনের বিরোধিতার সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও এ অদ্ভুত নবাগতদের কাছে লোকজনের আসা যাওয়া অব্যাহত ছিল এবং তাদের সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তাদের আগ্রহ দেখে উৎসাহিত হয়ে এন্টিওকের যীশু অনুসারীদের চারপাশের পৌত্তলিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সত্য বাণী ও যীশুর শিক্ষা প্রচারের জন্যে একজন ধর্ম প্রচারককে প্রেরণের জন্যে জেরুজালেমে ধর্মপ্রচারকদের কাছে খবর প্রেরণ করেন। যীশুর শিষ্যরা এ কাজের জন্যে বার্নাবাসকেই সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি মনোনীত করেন। এভাবে বার্নাবাস হলেন খৃষ্টধর্মের ইতিহাস প্রথম মিশনারি বা ধর্ম প্রচারক। 

মানুষের সেবায় বার্নাবাস।
বার্নাবাস এন্টিওক গমন করেন এবং অকল্পনীয় সাফল্য লাভ করেন। তার প্রচেষ্টায় “বহু সংখ্যক লোক যীশুর প্রচারিত ধর্ম গ্রহণ করে”-প্রেরিতদের কার্য, (১১:১৪)। এর কারণ বার্নাবাস ছিলেন একজন সৎ লোক এবং ঈশ্বর ও পবিত্র আত্মায় দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী। এক বছর পর তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছেন যে এন্টিওকের বাইরে তার কর্মকাণ্ড প্রসারিত করার সময় এসেছে। তার নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল যে এ কাজে পল তার ভাল সাহায্যকারী হবেন। তিনি টারসস গমন করেন এবং পলকে নিয়ে ফিরে আসেন। এভাবে পল সেসব লোকের কাছে ফিরে এলেন যারা তারই হাতে নির্যাতিত হয়েছিল এবং তিনি পুনরায় বৈরিতা ও বিরোধিতার সম্মুখীন হন। আরেকবার বার্নাবাস হস্তক্ষেপ করলেন এবং এন্টিওকের যীশু অনুসারী সমাজে পল গৃহীত হলেন। এ ঘটনা থেকে যীশু অনুসারী সমাজে বার্নাবাসের গুরুত্ব ও মর্যাদার বিষয়টি পুনরায় প্রমাণিত হয়। মনে হয়, বার্নাবাস তার সাবেক সহপাঠীর শুধু ভালটুকুই দেখেতে পেয়েছিলেন এবং মনে করেছিলেন, যে ধর্মীয় আবেগ ও উদ্দীপনা পলকে একজন অত্যাচারীতে পরিণত করেছিল তা যদি যীশুর ধর্মীয় প্রচারের কাজে লাগান যায় তা হলে তিনি অসাধারণ ও অমূল্য অবদান রাখবেন।

কিন্তু সকল যীশু অনুসারী এ দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একমত হতে পারেননি। পিটার সরাসরি পলের বিরোধিতায় অবতীর্ণ হন। পলের অতীত কার্যকলাপের কথা স্মরণ করে এ বৈরিতা আরো জোরাল হয়ে উঠার পাশাপাশি আরো দু’টি বিষয়ে মত পার্থক্য দেখা দেয়। যীশুর শিক্ষা কার কাছ থেকে গ্রহণ করা হবে এবং শিক্ষা দেয়া হবে সে ব্যাপারে তারা একমত হতে পারলেন না। পিটার মত প্রকাশ করেন যে ইহুদীদের কাছে প্রচারিত ধর্ম পুনরুজ্জীবনের জন্যই যীশুর আগমন ঘটেছিল। সে কারণে তার শিক্ষা শুধুমাত্র ইহুদীদের মধ্যেই প্রচার হবে। অন্যদিকে পল শুধু যে ইহুদী ও অন্যদের সহ সকলের কাছেই ধর্ম প্রচারের পক্ষ মত প্রকাশ করেন তাই নয়, উপরন্তু বলেন যে যীশুর অন্তর্ধানের পর তিনি তার কাছ থেকে অতিরিক্ত নির্দেশনা লাভ করেছেন। তিনি আরো বলেন যে সময় ও পরিস্থিতির দাবির সাথে যীশুর শিক্ষার প্রয়োজনীয় সমন্বয় সাধন করতে হবে। বার্নাবাস উভয় পক্ষের মধ্যবর্তী অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি মত দিলেন যে তাদের শুধু সে শিক্ষাই দান করা উচিত যা যীশু শিক্ষা দিয়ে গেছেন। তবে তিনি বলেন, এ শিক্ষা তার কাছেই প্রচার করা উচিত যার এতে কল্যাণ হবে এবং যে সাড়া দেবে, সে ইহুদীই হোক আর অ-ইহুদীই হোক। বার্নাবাস ও পিটার যীশুর কাছ থেকে যে শিক্ষা লাভ করেছিলেন তাকে তারা ইহুদী ধর্মের (Judaism) অব্যাহত ও সম্প্রসারিত রূপ হিসাবেই গণ্য করতেন। তারা স্বয়ং যীশুর কাছ থেকে যা শুনেছিলেন তার সাথে পলের শিক্ষার যেখানে মিল ছিল না, সে অংশটি গ্রহণ করতে পারেননি। তারা বিশ্বাস করতেন যে পলের নয়া ধর্মমত সম্পূর্ণরূপেই তার একান্ত নিজস্ব সৃষ্টি। আলবার্ট শোয়েইটজার (Albert Schweitzer) তার ‘Paul and his Interpreters’ গ্রন্থে বলেছেন যে, পল কখনই তার গুরুর (যীশু) বাণী ও নির্দেশ প্রচার করেননি।

মনে হয়, বার্নাবাস আশা করেছিলেন যে, এ দুই চরমপন্থী নমনীয় হবেন এবং বিশেষ করে পল যীশুর অনুসারীদের সাহচর্য থেকে যীশুর শিক্ষার পূর্ণ উপলব্ধি ও রূপায়ণের মধ্য দিয়ে অর্জিত জ্ঞানের স্বার্থে নিজের ধারণা পরিত্যাগ করতেন। পলের প্রতি এ পর্যায়ে বার্নাবাসের সমর্থন যে কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা স্পষ্ট বোঝা যায়। কারণ বার্নাবাস ধর্ম প্রচারকারীদের সর্বসম্মত বিরোধিতার মুখে পলকে আশ্রয় প্রদান ও রক্ষা করেছিলেন। সম্ভবত এ কারণেই বার্নাবাসের জীবনের এ পর্যায়টি ধর্ম প্রচারকদের কর্মকাণ্ডে বিশদ ভাবে বর্ণিত হয়েছে।

ম্যাপে লুকাওনিয়ার অবস্থান।
প্রেরিতদের কার্য, (১৩:১-২) তে বার্নাবাস ও পলের মধ্যে সম্পর্ক বিষয়ে বলা হয়েছে: “এন্টিওকের চার্চে বার্নাবাস ও সিমেওনের মত কতিপয় ধর্মগুরু ও শিক্ষক ছিলেন যাদেরকে সাইরিনের নাইজার (Niger of Cyrene) ও মানায়েনের লুসিয়াস (Lucius of Manaen) বলে আখ্যায়িত করা হত যাদের কে হেরোদ দি টেট্রার্ক (Herod the Tetrarch) এবং সলের (Saul) সাথে প্রতিপালন করা হয়েছিল। যখন তারা ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা ও উপবাস করলেন তখন পবিত্র আত্মা বললেন: বার্নাবাস ও সলকে আমার সে কাজের জন্যে পৃথক কর যে কাজের জন্যে আমি তাদের আহ্বান করেছি।” 
এসব অনুসারীদের নামের তালিকায় লূক বার্নাবাসকে প্রথম ও পলকে শেষে স্থান দিয়েছেন। একত্রে কাজ করার জন্যে নির্বাচিত হওয়ার পর তারা বার্নাবাসের বোনের পুত্র জন মার্ককে নিয়ে যীশুর শিক্ষা প্রচারের জন্যে গ্রীস যাত্রা করেন। যোসেফের ঔরসে জন্মলাভকারী মেরীর পুত্র জেমসকে এন্টিওকে যীশুর অনুসারীদের প্রধান নির্বাচিত করা হয়। পিটারও সেখানেই থেকে যান। 
Jupiter.
Mercurius.
প্রেরিতদের কার্য-তে (Acts) আছে যে কয়েকটি স্থানে তাদের প্রতি পাথর নিক্ষেপ করা সত্ত্বেও এ দুই ধর্ম প্রচারক সামগ্রিক ভাবে সফল হন। সত্যানুসারী ব্যক্তি হিসেবে তাদের খ্যাতি দূর-দূরান্তরে ছড়িয়ে পড়ে। তারা যখন লুকাওনিয়া (Lycaonia) পৌঁছে এবং একজন পঙ্গুকে রোগমুক্ত করেন তখন গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে: মানুষের ছদ্মবেশে ঈশ্বরগণ আমাদের কাছে নেমে এসেছেন। তারা বার্নাবাসকে জুপিটার (Jupiter) নামে এবং পলকে মার্কারিয়াস (Mercurius) নামে আখ্যায়িত করে।

তখন জুপিটারের পুরোহিতরা.....গরু ও মালা নিয়ে তোরণদ্বারে এল এবং সেগুলোকে জবাই করল। বার্নাবাস ও পল যখন এটা শুনতে পেলেন, তারা তাদের পোশাক ছিঁড়ে ফেলে কাঁদতে কাঁদতে লোকজনের কাছে দৌঁড়ে গেলেন। তারা বললেন. তোমরা এ সব কী করছ? আমরা তোমাদেরই মত সাধারণ মানুষ, আমরা তোমাদের কাছে ঈশ্বরের কথা প্রচার করতে এসেছি যিনি স্বর্গ, পৃথিবী ও সমুদ্র সহ বিশ্বমণ্ডলের সকল কিছু সৃষ্টি করেছেন।-প্রেরিতদের কার্য, (১৪:১১-১৫) 
নগরদ্বারে জুপিটারের পুরোহিত,
বার্নাবাস ও পল।
গ্রীসের অধিবাসীদের এই প্রতিক্রিয়া যদি স্বাভাবিক হয়ে থাকে তবে তা ছিল বাস্তব সমস্যার ইঙ্গিত বহনকারী যার সম্মুখীন হয়েছিলেন বার্নাবাস ও পল। একজন প্রকৃত ইহুদী যীশুর শিক্ষাকে মুসার প্রচারিত ধর্মেরই পুনর্ব্যক্ত রূপ বলে তাৎক্ষণিক ভাবে স্বীকার করবে। কিন্তু বহু মূর্তিপূজকের কাছেই সেটি নতুন ও অদ্ভুত এবং কিছুটা জটিল বলে মনে হবে। অধিকাংশ পৌত্তলিক তখন পর্যন্ত বহু ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিল। তারা মনে করত, ঈশ্বরগণ মানুষের সাথে অবাধ মেলা মেশা করে, তাদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং মানব জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে ছিল তাদের একজন ঈশ্বরের অনুরূপ এবং এ অর্থে তারা যীশুকে গ্রহণ করতে সম্ভবত প্রস্তুত ছিল। সেখানে আরো একজন ঈশ্বরের স্থান ছিল। যাহোক, যীশুর প্রকৃত শিক্ষা তাদের সকল ঈশ্বরকে নাকচ করে দেয় ও এক ঈশ্বরের কথা ব্যক্ত করে। বহু পুতুল পূজারির কাছেই এ কথা গ্রহণযোগ্য ছিল না। অধিকন্তু, যীশুর ধর্মশিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল আচরণ বিধি যা কেউ অনুসরণ করতে চাইলে তার জীবনধারাই পাল্টে যেত। এটা একজন ইহুদীর পক্ষেই সম্ভব ছিল, পৌত্তলিকের পক্ষে নয়। ইহুদীদের সুদখোর জাতি হিসেবে গণ্য করা হত, অ-ইহুদীদের সবাই তাদের পছন্দ করত না। “ইহুদী নয় এমন জনসমাজের মধ্যে ইহুদীদের প্রতি ঘৃণা এতই প্রবল ছিল যে তাদের যৌক্তিক বা প্রয়োজনীয় কিছু করতে দেখলেও যেহেতু ইহুদীরা সেটা করছে শুধু সে কারণেই জনসমাজ তা করতে অস্বীকৃতি প্রকাশ করত।”-The Nazarenes, John Toland, পৃ.৬।
 
কোন রকম আপোশ না করে গ্রীসে যীশুর প্রচারিত ধর্মের অনুসরণে জীবন-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় বার্নাবাসের মত নিষ্ঠা ও দৃঢ়তা আর কারও ছিল না। পল ইতিমধ্যেই যীশুর শিক্ষা পরিবর্তনে তার ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি এখন গ্রীক জনসাধারণের রুচি অনুযায়ী যীশুর শিক্ষার সমন্বয় সাধন অত্যাবশ্যক বলে মনে করলেন। গ্রীস তখন ছিল রোমান সাম্রাজ্যের অংশ। রোমান দেবতা গ্রীকের দেবতাদের সঙ্গে সাদৃশ্যযুক্ত ছিলেন এবং তাদের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা ছিল গ্রীক দেবতাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের মতই একটি ভ্রান্ত ধারণা। পল এর আগে কিছু দিন রোমে কাটিয়েছিলেন এবং তিনি রোমান নাগরিক ছিলেন। সম্ভবত রোমান জীবনধারা তার নিজস্ব বিচারবোধকে প্রভাবিত করেছিল। রোমান সাম্রাজ্যের মধ্যে সাধারণ জনগণের উপর গ্রেকো- রোমান (Graeco-Roman) ধর্মের জোরাল প্রভাব সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন। এটা সুস্পষ্ট যে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে নিজেদের শিক্ষার পরিবর্তন ঘটান ছাড়া তাদের ধর্ম রীতি পরিবর্তন করা সহজ হবে না। 

অন্যদিকে বার্নাবাস জানতে যে তার স্রষ্টার ইচ্ছা নয় যে তিনি তার আইনের এক বিন্দুমাত্র বিরূপ বা পরিবর্তন করেন। সেকারণে তিনি তার ধর্মমতের কোন পরিবর্তনের ব্যাপারে অনড় ছিলেন। খৃষ্টধর্ম প্রচারের এপর্যায়ে বিতর্কের প্রধান উৎস অধ্যাত্ম দর্শন (Metaphysical) সম্পর্কিত ছিল না। বুদ্ধিজীবীদের সূক্ষ্ম যুক্তি, তর্ক ও চুলচেরা- বিশ্লেষণের বিকাশ আরও পরবর্তী কালের ঘটনা। বার্নাবাস ও পলের মধ্যে যে সব বিষয় নিয়ে মত পার্থক্য সৃষ্টি হয়ে ছিল তা ছিল মানুষের প্রাত্যহিক জীবন ও জীবন ধারা সম্পর্কিত। পল তার ও বার্নাবাসের গ্রীসে আগমনের পূর্বে সেখানে প্রচলিত ও পালিত আচার প্রথার আকস্মিক পরিবর্তন ঘটাতে ইচ্ছুক ছিলেন না। তাই তিনি পশুর মাংস হালাল হওয়া সম্পর্কিত এবং পশু কুরবানি বিষয়ে মুসার প্রচলিত বিধান পরিত্যাগের ইচ্ছা পোষণ করেন। এমনকি তিনি খতনা সংক্রান্ত ইবরাহিম এর প্রতিষ্ঠিত নিয়মও বাতিলের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। যীশুর শিক্ষার এসব দিক প্রবর্তন ও বাস্তবায়নের বাস্তব সমস্যার সম্মুখীন হওয়ার প্রেক্ষিতে পল ও বার্নাবাসের মধ্যকার ব্যবধান বিদূরিত হওয়ার পরিবর্তে আরো ব্যাপকতর হয়ে ওঠে। 
এ পর্যায়ে দু’জনের মধ্যে যে সব মতপার্থক্যের কথা বলা হয়েছে, সম্ভবত তা সঠিক নয়। পল ও বার্নাবাস উভয়েই যীশুর জীবনাদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বাস্তব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন। একেশ্বরবাদের শিক্ষা সমর্থন করা অত্যাবশ্যক ছিল। কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে পৌত্তলিকদের আচার অনাচরণের চাইতে পৃথক ও বৈশিষ্ট্যময় আচার-আচরণের একটি পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন ছিল। স্পষ্টতই দৈনন্দিন জীব নাচারের মধ্য দিয়েই সেই বৈশিষ্ট্যমন্ডিত আচার-আচরণ পর্যায়ক্রমে গৃহীত ও আত্মকৃত হতে পারত। কোন পৌত্তলিক সম্প্রদায়ের পক্ষেই যীশুর সকল শিক্ষা ও আচরণ রাতারাতি গ্রহণ করে ফেলা সম্ভব ছিল না। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, পল ও বার্নাবাস কোন স্থানেই দীর্ঘদিন অবস্থান করেননি। স্বল্প সময়ের মধ্যে যীশুর সামগ্রিক শিক্ষা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। সেকারণেই তারা প্রথমে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর শিক্ষা প্রদান করতেন। তাদের ইচ্ছা ছিল, পরবর্তীকালে ফিরে এসে পুনরায় তারা তাতে সংযোজন করবেন এবং আরো নির্দেশনা প্রদান করবেন। বার্নাবাস যেখানে যীশুর সমগ্র শিক্ষা প্রচার করতে আগ্রহী ছিলেন, পল সেখানে প্রয়োজন মত প্রচারের পক্ষপাতী ছিলেন। কারণ তিনি তার নিজের যে নয়া ধর্মমত গড়ে তুলছিলেন, সেখানে সেগুলোর আর প্রয়োজন ছিল না। যা হোক, তারা জেরুজালেম প্রত্যাবর্তনের পর পৃথক যুক্তিতে নিজ নিজ কর্মকাণ্ডের যৌক্তিকতা প্রদর্শন করেন। তারা যৌথভাবে যে সব অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়েছিলেন তারও বর্ণনা দেন। তা সত্ত্বেও তাদের মত পার্থক্য বহাল রইল এবং শেষ পর্যন্ত তাদের পথ পৃথক হয়ে যায়।
বলা হয়ে থাকে যে পল জন মার্ককে ভবিষ্যৎ কোন সফরে সাথে নেয়ার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেন। অন্যদিকে বার্নাবাস জনকে তাদের সফর সঙ্গী করার ব্যাপারে চাপ সৃষ্টি করেন। আর এ কারণেই তাদের মধ্যে বিভেদ দেখা দেয়। প্রেরিতদের কার্য, (১৫:৩৯-৪০)-এ বলা হয়েছে, তাদের মধ্যে বিরোধ এত তীব্র হয়ে ওঠে যে তারা একে অপরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান এবং এর পর বার্নাবাস মার্ককে নিয়ে সাইপ্রাস সফরে যান যেটি ছিল বার্নাবাসের জন্মভূমি। জন মার্কের বার্নাবাসের সফর সঙ্গী হওয়ার ঘটনা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে তার ও তার মামার ধর্ম বিশ্বাস একই রকম ছিল। পল যে তাকে সঙ্গী রাখতে চাননি, সম্ভবত এটা তার অন্যতম কারণ। বাইবেলে এ বিষয়ের পর বার্নাবাসের উল্লেখ করা হয়নি বললেই চলে। 
কৌতূহলের বিষয় যে প্রেরিতদের কার্য-এ উল্লেখিত আছে, “পবিত্র আত্মা” (Holy Ghost) বার্নাবাসকে মনোনীত করলেও পল তাকে প্রত্যাখ্যান করেন। মনে হয়, পল উপলব্ধি করেছিলেন যে, তার আর বার্নাবাসের প্রয়োজন নেই। তার প্রথম দিনকার দিনগুলোতে যখন জানাজানি হয়ে যায় যে তিনি যীশুর সঙ্গী ছিলেন না তখন কেউ তার উপর আস্থাশীল ছিল না। কিন্তু যখন তিনি খৃষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করলেন, তখন বিষয়টি আগের মত থাকেনি। তার খ্যাতি এতটাই হয়েছিল যে তিনি কোন ভীতি বা প্রত্যাখ্যানের আশঙ্কা ছাড়াই নিজের ধর্মমত প্রচার করতে পারবেন বলে উপলব্ধি করেছিলেন। এমনকি যীশুর শিক্ষা বহির্ভূত কিছু প্রচার করলে বার্নাবাস তার বিরোধিতা করতে পারেন, এ ধরনের সম্ভাবনাকেও তিনি আমলে আনেননি। উপরন্তু পল ছিলেন একজন রোমান নাগরিক। তিনি অবশ্যই রোমানদের ভাষা শিখেছিলেন। সম্ভবত তিনি গ্রীক ভাষাতেও কথা বলতেন। কারণ তিনি যে এলাকায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেখানকার সরকারী ভাষা ছিল গ্রীক। তিনি গ্রীসের খৃষ্টান সম্প্রদায়ের কাছে যেসব পত্র লিখেছিলেন তা অবশ্যই তাদের মাতৃভাষায় লেখা হয়েছিল। এর অর্থ তিনি গ্রীস ও সম্ভবত ইতালিতেও ভাষার কোন সমস্যা ছাড়াই সফর করেছিলেন। অন্যদিকে বার্নাবাস এ দু’ভাষার কোনটিই বলতে পারতেন না। জন মার্ক গ্রীক ভাষা জানতেন। তাই, গ্রীসে বার্নাবাসের প্রথম ধর্মপ্রচার সফরে তিনি তার দোভাষী হিসেবে কাজ করেছিলেন। বার্নাবাস যদি সেখানে একা যেতেন, তাহলে তার কথা কেউ বুঝতে বা তিনিও কারো কথা বুঝতে পারতেন না। সুতরাং মার্কের সাথে সফরে যেতে পলের অস্বীকৃতি ছিল বার্নাবাস যাতে তার সাথে ভ্রমণে না যান, সেটা নিশ্চিত করার প্রয়াস। দু’জনের পৃথক হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে ম্যাকগিফার্ট (McGiffert) বলেন: 
ম্যাপ সালামিস, সাইপ্রাস।
McGiffert.
"বার্নাবাস, ইহুদী নয় এমন জনসমাজের মধ্যে যার ধর্ম প্রচারের কাজ জেরুজালেমে স্বীকৃতি লাভ করেছিল.... তার ফিরে আসা, নিজকে পৃথক করে নেয়া ছিল এক আশ্চর্য ঘটনা। সকল প্রকার আইন থেকে খৃষ্টানদের মুক্তিদানের পলের মতবাদের প্রতি বার্নাবাসের পূর্ণ সমর্থন ছিল না.....প্রেরিতদের কার্য-এর এ লেখক, পল ও বার্নাবাসের মধ্যে সম্পর্কছেদের ঘটনাকে মার্ককে নিয়ে মত পার্থক্যের পরিণতি বলে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু প্রকৃত কারণ নিহিত ছিল আরো গভীরে.....খৃষ্টান হিসেবে পলের জীবন শুরুর পর গোড়ার দিকের বৎসরগুলোতে পলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও অন্তরঙ্গ যিনি ছিলেন, তিনি বার্নাবাস। বার্নাবাস জেরুজালেমের চার্চের সদস্য ছিলেন.....তার বন্ধুত্ব পলের জন্যে ছিল অনেক বেশি কিছু এবং নিঃসন্দেহে তা খৃষ্টানদের মধ্যে পলের সুনাম ও প্রভাব বৃদ্ধিতে ব্যাপক অবদান রেখেছিল। খৃষ্টানদের মনে যখন পলের নির্যাতনের স্মৃতি জাগরূক ছিল সেই দিনগুলোতে বার্নাবাস পলের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন।"-History of Christianity in the Apostolic Age, পৃ.২১৬, ২৩১, ৪২৪-৫।

পলের প্রতি বার্নাবাসের মনোভাবের পরিবর্তন ঘটেছিল পলের সাথে সফরকালে অর্জিত অভিজ্ঞতার কারণে। পল তার মত পরিবর্তন করবেন এবং যীশুর একজন প্রকৃত অনুসারী হবেন বলে বার্নাবাস যে আশা পোষণ করেছিলেন, প্রথম সফরেই তা অপসৃত হয়েছিল। সম্ভবত, শুধুমাত্র ইহুদীদের উদ্দেশ্যে প্রচারিত ধর্ম প্রচারের চেষ্টার অসারতা এবং তা যে ফলপ্রসূ হচ্ছে না, তা উপলব্ধি করতে পেরে বার্নাবাস তা ত্যাগ করেন। তবে তার আগে পর্যন্ত জনসাধারণের মধ্যে যীশুর ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে সম্ভাবনা পরিলক্ষিত হয়েছিল। কিন্তু সে চেষ্টা চালানোর পর বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায় যে, তা সম্ভব ছিল না। সে তুলনায় এন্টিওকে তার সাফল্য ছিল অনেক বেশি। কেননা সেখানে জনসাধারণ যীশুর অনুসারীদের কাছে আগমন করে খৃষ্টধর্মে তাদের ধর্মান্তর করার অনুরোধ জানাচ্ছিল। পক্ষান্তরে তিনি ও পল গ্রীসে গিয়ে সেখানকার অধিবাসীদের খৃষ্টান হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছিলেন। 
বার্নাবাস সাইপ্রাসে ফিরে আসার পর তার কী ঘটেছিল সে ব্যাপারে কোন লিখিত বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে কিছু কিছু সূত্র থেকে জানা যায়, যীশুর শিক্ষার অনুসারী অন্য বহু ব্যক্তির মত তিনিও শহীদ হয়েছিলেন। এ তথ্য এমন-

সালামিস, সাইপ্রাস।
খৃষ্টান ঐতিহ্য ও বিশ্বাস মতে ৬১ এডিতে বার্নাবাস যখন সাইপ্রাসের সালামিসে এক সিনাগগে গসপেলের শিক্ষাদান করছিলেন, তখন সেখানে সিরিয়া ও সালামিসের বেশ কিছু ইহুদি উপস্থিত ছিল। অত:পর তারা যখন দেখল বার্ণাবাস সিনাগগকে বিতর্কিত করছেন, তখন তারা তার উপর ঝাপিয়ে পড়ে। তাকে সিনাগগ থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করে আনে এবং শারিরিক নানা অত্যাচারের পর পাথর ছুঁড়ে হত্যা করে। জন মার্কের উপস্থিতিতেই এসব ঘটে।পরে সকলের অলক্ষ্যে মার্ক তার মৃতদেহ সমাহিত করে। এভাবে তার এ সমাধি অজ্ঞাতই রয়ে যায়। পরবর্তীতে কনস্টান্টিনার (সালামিস, সাইপ্রাস) আর্চবিশপ অ্যান্থেমিস (Anthemios) তাকে স্বপ্নে দেখেন এবং তার সমাধি একটি করুব (Carob) গাছের নীচে রয়েছে জানতে পারেন। পরের দিন অ্যান্থেমিস সমাধিটা খুঁজে পান। অত:পর সেটি খুঁড়ে তার বুকের উপর রাখা তার লেখা একটি বাইবেলও পাওয়া যায়। ঐ বাইবেলটি অবশ্য লুকিয়ে ফেলা হয় এবং প্রচার করা হয় সেটি তার নয়, ম্যাথুর লেখা ছিল। 

ইতিহাস ও বাইবেলের বহু পৃষ্ঠা থেকে বার্নাবাসকে মুছে ফেলার চেষ্টা সত্ত্বেও এটা পরিদৃষ্ট হয় যে তিনি খৃষ্টধর্মের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাবার মত কেউ নন। চার্চের গোড়ার দিকে তিনি যীশুর কাছ থেকে যা শিখেছিলেন তা প্রকাশ্য সমর্থন ও শিক্ষাদানের জন্যে স্বেচ্ছায় এগিয়ে এসেছিলেন এমন এক সময় যখন যীশুর অতি ঘনিষ্ঠ শিষ্যগণও যীশুর সাথে তাদের সম্পর্কের কথা স্বীকার করতে ভীত ছিলেন। যীশুর প্রতি বার্নাবাসের আনুগত্যের বিষয়টি তার শত্রু-মিত্র সকলেই স্বীকার করতেন। যীশু তার বোনের বাড়িতেই জীবনের শেষ আহার গ্রহণ করেন এবং সে বাড়িটি যীশুর অন্তর্ধানের পর তার অনুসারীদের সাক্ষাৎ ও সভাস্থল হিসেবেই ছিল। ধর্ম প্রচারকারী ও যীশুর অন্যান্য অনুসারীদের উপর বার্নাবাসের প্রভাবের প্রমাণ খোদ বাইবেলেই রয়েছে। তাকে বলা হত একজন নবী, একজন শিক্ষক এবং লূক তাকে একজন ধর্ম প্রচারকারী হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন। পলের প্রতি তার সমর্থন ছিল প্রশ্নাতীত। সর্বোপরি তাকে স্মরণ করা হয় এমন এক ব্যক্তি হিসেবে যিনি যীশুর বাণী সম্পর্কে কোন আপোষ বা পরিবর্তনে রাজি হননি। 

বার্নাবাসকে এখনও সাইপ্রাসের অর্থডক্স চার্চের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্মরণ করা হয়। ১১ই জুন তার মৃত্যু দিবস বা 'ফিস্ট ডে' (Feast Day) হিসেবে পালিত হয়ে থাকে। সবশেষে আমরা খৃষ্টধর্মে বার্নাবাসের গুরুত্ব সম্পর্কে এ ঐশী নির্দেশের কথা আমাদের স্মরণে আনব: “যদি সে তোমাদের কাছে আসে, তাকে স্বাগত জানাও (If he Comes unto you, receive him)।” -কলেসিয়ানদের কাছে পত্র (৪:১০)

সমাপ্ত।

উৎস: Jesus- A Prophet of Islam by Muhammad Ata-Ur-Rahim.
ছবি: Wikipedia, hilltopshepherd.wordpress, breastfeedingandhr.blogspot, orthodxwiki, liturgyandmusic.wordpress, 1st-art-gallery, allposters, welcometohosanna.

১৯ মার্চ, ২০১৩

রাবেয়া বসরী: এক নারী সূফীর কাহিনী।

রাবেয়া আল বসরী (Rabi'a al Basri)-র জন্ম ইরাকের বসরায়, কায়েস বিন আদি গোত্রের এক শাখা গোত্র আল আতিকে। এ কারণে তাকে রাবেয়া al Adawiyya বা al Qaysiyya-ও বলা হয়। তার জন্মসন সুনির্দিষ্ট নয়। ধারণা করা হয় ৭১৩ থেকে ৭১৭ সনের মধ্যে কোন এক সময় তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি তার পিতামাতার ৪র্থ সন্তান। একারণে তার নাম রাখা হয় রাবেয়া অর্থাৎ ৪র্থ। তার পিতা ইসমাঈল ছিলেন হত দরিদ্র। যে রাত্রিতে তার জন্ম হয়, সেই রাতে তাদের গৃহে কুপি জ্বালানোর মত সামান্য তেলও ছিল না। তার মাতা প্রতিবেশী কারও কাছ থেকে কিছুটা তেল ধার করে আনতে তার পিতাকে অনুরোধ করেন। তার পিতা নিজের অভাব-অভিযোগের কথা খোদার কাছে ব্যক্ত করতেন বটে, কিন্তু প্রতিবেশী কারও কাছ থেকে কিছু চাইতে ভীষণ লজ্জা বোধ করতেন। তাই তিনি স্ত্রীকে খুশী করতে এসময় গৃহ থেকে বেরিয়ে গেলেও কিছু সময় বাইরে ঘোরাফেরা করে খালি হাতে ফিরে আসেন। তাকে শূন্য হাতে ফিরে আসতে দেখে বুদ্ধিমতী স্ত্রী সবই বুঝতে পারেন, তাই তাকে অধিকতর লজ্জায় ফেলতে কোন প্রশ্ন করেননি।

বর্তমান বসরা নগরী, রাতে।
এদিকে নিজের অক্ষমতা ও অপরগতার কথা খোদার কাছে ব্যক্ত করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েন ইসমাঈল। রাতে স্বপ্নে দেখেন এক ব্যক্তি তাকে বলছেন, তুমি পত্র মারফৎ বসরার আমীরকে জানাও যে সে নবীজীর নামে প্রতিদিন রাতে একশত ও প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে চারশত বার দুরুদ পাঠ করত, কিন্তু গত বৃহস্পতিবার সে তা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ কারণে সে যেন তোমাকে চার’শত দিনার সদকা হিসেবে দিয়ে দেয়।

সকালে ঘুম থেকে উঠে ইসমাঈল এই অদ্ভূত সপ্নের কথা স্ত্রীকে বললেন। সবশুনে স্ত্রী বলল, নিশ্চয়ই আমাদের এই সন্তান পূণ্যবতী। সুতরাং তুমি অবশ্যই পত্র নিয়ে আমীরের কাছে যাবে। ইসমাঈল যেতে অনিচ্ছুক ছিলেন, কিন্তু স্ত্রীর পীড়াপীড়িতে তিনি আমীরের বাটিতে গেলেন। ঐ সময় বসরার আমীর ছিলেন ঈসা জাদান (Isa Zadhan)।

ইসমাঈল তার পত্রটি একজন কর্মচারীর হাতে দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন। এদিকে আমীর ঐ অদ্ভূত পত্র মনোযোগ দিয়ে পড়লেন। কেউ তার একান্ত ব্যক্তিগত কোন কর্ম ব্যর্থতার কথা পত্র মারফত স্মরণ করিয়ে দিতে পারে -এ ছিল তার নিকট চরম বিষ্ময়ের। তিনি তৎক্ষণাৎ ইসমাঈলকে ডেকে নিয়ে তার হাতে ৪০০ দিনার অর্পণ করলেন এবং বললেন যে, আগামীতে যদি তিনি কখনও কোন কিছুর প্রয়োজন বোধ করেন, তবে যেন অনুগ্রহ করে আমীরকে তা একবার অবহিত করেন। 

প্রাপ্ত দিনারে রাবেয়াদের পরিবারের অভাব অভিযোগ সাময়িক দূর হল। কিন্তু কিছুদিন পর তার মাতা মারা গেলেন। তারপর সে কৈশর পেরুনোর আগেই তার পিতাও মারা গেলেন। এরপর এল দূর্ভিক্ষ। এলাকায় হানা দিল একদল দূর্বৃত্ত। তারা গ্রাম থেকে নারী ও শিশুদের ধরে নিয়ে বাজারে বিক্রি করে দিল। রাবেয়াকে কিনে নিল এক ধনী ব্যক্তি এবং তাকে গৃহস্থলীর কাজে লাগিয়ে দিল। গৃহকর্তার বাড়ীতে অনেক রাত পর্যন্ত খানা-পিনার আসর বসত। অত:পর গভীর রাতে আসর শেষে সকলে বিদায় নিলে রাবেয়ার ফুসরত মিলত। এরপর সে বাকী রাতটুকু প্রার্থনা ও মোনাজাতের মধ্যে অতিবাহিত করত। এমনিই চলছিল।

একদিন অনেক রাতে গৃহকর্তার ঘুম ভাঙ্গল। তিনি বাড়ীর বাইরে এসে পায়চারি করতে লাগলেন। হঠাৎ তার নজরে এল রাবেয়ার কুঠিরে আলো জ্বলছে। এতরাতে তার কুঠিরে আলো জ্বলছে দেখে তিনি অবাক হলেন। কৌতুহলী হয়ে তিনি এগিয়ে গেলেন। তারপর নিকটবর্তী হলে তিনি রাবেয়ার প্রার্থনার ক্ষীণ শব্দ শুনতে পেলেন। তিনি তার প্রার্থনায় মনোযোগ দিলেন। তার কানে ভেসে এল রাবেয়ার সকরুণ প্রার্থনা -"Lord! You know well that my keen desire is to carry out Your commandments and to serve Thee with all my heart, O light of my eyes. If I were free I would pass the whole day and night in prayers. But what should I do when you have made me a slave of a human being"?

গৃহকর্তা ফিরে এলেন। মেয়েটির ধর্মনিষ্ঠা তাকে বিষ্মিত করেছে। তিনি বাকী রাতটুকু তার চাল-চলন, আচার –আচরণের সাথে তার ধর্মনিষ্ঠা মিলিয়ে দেখলেন। এতে কোনভাবেই এমন একটি মেয়েকে দিয়ে বান্দীর কাজ করাতে তার বিবেক সায় দিল না। সুতরাং তিনি সকালে রাবেয়াকে ডেকে বললেন, ’তোমাকে দাসত্বের শৃংখল থেকে আমি মুক্ত করে দিলাম। তুমি স্বাধীন ভাবে যেখানে ইচ্ছে সেখানে চলে যেতে পার। আর যদি তোমার কোথাও যাবার জায়গা না থকে, তবে তুমি আমার এখানেও থাকতে পার, সেক্ষেত্রে তোমার যাবতীয় ব্যয়ভার আমার কাঁধেই থাকবে।’ 

নির্জনে একাকী খোদার নিকট অন্তর ঢেলে প্রার্থনা করার সাধ রাবেয়ার সব সময় ছিল। তাই তিনি বিনয়ের সাথে চলে যাবার ইচ্ছে প্রকাশ করলেন। গৃহকর্তা তার ইচ্ছেতে সম্মান জানিয়ে সম্মতি দিলেন। তবে রাবেয়া কোথায় গিয়েছিলেন তা পরিস্কার নয়। হয়ত: তিনি কোন মরু এলাকায় গিয়েছিলেন অথবা তার পিতৃবাড়ীতে ফিরে গিয়ে একাকী বাস করেছিলেন। অবশ্য জীবনের শেষ কয়েকটি বৎসর তার জেরুজালেমে কেটেছিল বলে জানা যায়।

রাবেয়া আজীবন কুমারী ছিলেন। তার সুনামের জন্যে অনেকেই তাকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এমনকি তার পাণিপ্রার্থীদের তালিকায় বসরার আমীরও ছিলেন। তবে সকল প্রস্তাবই রাবেয়া অতি বিনয়ের সাথে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন এ কথা বলে যে তিনি তার ইহলৌকিক এ ক্ষুদ্র জীবন তার সৃষ্টিকর্তার তরে উৎসর্গ করে দিয়েছেন।

রাবেয়ার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল দিকে দিকে। তার কিছু নি:স্বার্থ নারী ও পুরুষ সেবকও জুটে গিয়েছিল। সম্ভবত: এরাই তার প্রয়োজনীয় সকল কিছুর আঞ্জাম দিত। এদেরই একজন হলেন হাসান আল বসরী।

রাবেয়ার সম্পর্কে অনেক কথাই প্রচলিত আছে। এগুলোর অনেক কাহিনী মিথ বা অতিরঞ্জিত হলেও হতে পারে। যেমন এক কাহিনী- একবার রাবেয়া হজ্জ্বের উদ্দেশ্যে এক কাফেলার সাথে যাত্রা করেছিলেন। কিন্তু পথিমধ্যে মরুর দাবাদহে তার গাধা প্রাণত্যাগ করে। তার সঙ্গীরা ঐ সময় তার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু রাবেয়া তাদের সাহায্য গ্রহণ করেননি, খোদার প্রতি তার অগাধ আস্থা ও বিশ্বাসের কারণে। তিনি তপ্ত মরুর পথ ধরে পায়ে হেঁটেই রওনা দেন। একসময় দিক হারিয়ে ক্ষুধা ও ক্লান্তি  জনিত কারণে মরুর বুকে অচেতন হয়ে মুখ থুবড়ে পড়েন। পরে জ্ঞান ফিরলে উঠে পথ চলতে শুরু করেন। কথিত আছে এসময় কা'বাকে তুলে এনে তার সামনে হাযির করা হয়েছিল। তিনি তখন বলেছিলেন, ’আমি পাথরের এই গৃহ দেখতে আসিনি। আমি গৃহের মালিকের সাক্ষাতে এসেছি।’
যাইহোক, তিনি মক্কাতে পৌঁছান এবং হজ্জ্ব সম্পন্ন করেই ফিরে আসেন। 

রাবেয়া বসরীর সমাধি।
অনেক বুজুর্গ ও সূফী ব্যক্তি রাবেয়ার সাক্ষাতে আসতেন। একদিন এমনি দু’জন মুসাফির তার বাটীতে এলেন। তাদেরকে বসান হয়েছিল সমাদরের সাথে। অতিথি দু'জন ক্ষুধার্ত ছিলেন। তারা দেখলেন দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে কিন্তু গৃহকর্তী তাদের আপ্যায়নের কোন ব্যবস্থা করছেন না। একসময় তারা অধৈর্য্য হয়ে বলেই ফেললেন- ’মা খাবার কি কিছু আছে?’
রাবেয়া তখন একটি পাত্রে দু’খানি রুটি এনে তাদের সামনে তা রাখলেন। অতিথিরা বুঝতে পারছিলেন না রুটি দু’খানি তাদের দু’জনের নাকি একজনের। এ কারণে তারা কেউই রুটির দিকে হাত বাড়ালেন না।

এ সময়ই দ্বারদেশে এক ভিখিরী হাঁক দিল-’মা জননী বড়ই ক্ষুধার্ত, দু’দিন ধরে অনাহারে আছি।’
রাবেয়া এ সময় ঐ রুটি দু’খানি তুলে নিয়ে ঐ ভিখিরীকে দিয়ে দিলেন। এতে অতিথিদ্বয় অবাক হলেন।

কিছুসময় পর এক দাসী এক পাত্রে রুটি ও এক পাত্রে কিছু মাংস নিয়ে এসে বলল, ’আমার কর্ত্রী এগুলি আপনার জন্যে পাঠিয়েছেন।’
রাবেয়া রুটির পাত্রটি হাতে নিয়ে সেগুলি গুনে দেখলেন। তারপর দাসীকে বললেন, ’এগুলি আমার নয় তুমি ফিরিয়ে নিয়ে যাও।’
দাসী সেগুলি নিয়ে চলে গেল। অতিথিদ্বয় এ ঘটনায় আরো অবাক হলেন।

 Mount of Olives.
কিছুসময় পর ঐ দাসী আবার এল, বলল, ’তিনি আরও দু’খানি রুটি দিয়েছেন এবং বিনীতভাবে এগুলি আপনাকে গ্রহণ করতে অনুরোধ করেছেন।’
এবার রাবেয়া সেগুলি নিলেন এবং অতিথিদের তা থেকে খেতে দিলেন।
এসময় অতিথিদ্বয় নিজেদের কৌতুহল আর চাপা রাখতে পারলেন না। তারা সমস্বরে বললেন, ’মা, কেন আপনি প্রথমবার এগুলো ফিরিয়ে দিলেন এবং পরে তা গ্রহণ করলেন?’

রাবেয়া বললেন, ’আপনারা ক্ষুধার্ত জেনেও আমি আপনাদেরকে আপ্যায়ন করতে পারছিলাম না। কারণ, ঘরে মাত্র দু’খানি রুটি ছিল, যা দিয়ে আপনাদের দু’জনের ক্ষুধা নিবারণ সম্ভব ছিল না। তাই আমি আপনাদেরকে খেতে দেইনি। কিন্তু যখন আপনারা চেয়ে বসলেন, আমি তখন নিতান্ত বাধ্য হয়ে রুটি দু’খানি আপনাদের সম্মুখে রেখেছিলাম। ঐ সময়ই ভিখিরী এল এবং তার ক্ষুধার কথা জানাল। তৎক্ষণাৎ আমার মনে পড়ল, খোদা বলেছেন দানের দশগুন পাওয়া যাবে। আর আমি তা পাবার আশায় সঙ্গে সঙ্গে রুটি দু’খানি তাকে দান করে দিলাম। 

Christian Church of the Ascension.
তারপর ঐ দাসী রুটি ও মাংস নিয়ে এল। আমি তখন রুটি গুনে দেখলাম সেগুলি খোদা আমার জন্যে পাঠিয়েছেন কিনা তা জানতে। কিন্তু রুটি ছিল আঠারটা, সুতরাং আমি নিশ্চিত হলাম ঐ রুটি আমার নয়, তাই তা ফেরৎ পাঠিয়ে দিলাম। পরে যখন দাসী ফিরে এল আরও দু’খানি রুটি নিয়ে, তখন আমি তা গ্রহণ করলাম।’

রাবেয়া দীর্ঘদিন বেঁচে ছিলেন। অনেকের মতে মৃত্যুর সাত বৎসর পূর্বে তিনি জেরুজালেমে আসেন এবং মাউন্ট অলিভে বসবাস করতে থাকেন। অত:পর নব্বুয়ের কাছাকাছি বয়সে ১৮৫হিজরী বা ৮০১সনে পরলোক গমন করেন। তার ভক্তগণ একটা সমাধি সৌধ তৈরী করেন যার উপস্থিতি এখনও রয়েছে মাউন্ট অলিভের চূড়ায় অবস্থিত Christian Church of the Ascension-এর নিকটে। 

সমাপ্ত।
ছবি: Wikipedia.

১৫ মার্চ, ২০১৩

Blindmen: অন্ধের হস্তীদর্শণ ও বুদ্ধের উপদেশ- একটি বিক্ষিপ্ত ভাবনা।

ছোট এক গ্রামে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মাবলম্বী অনেকগুলি পরিবার বাস করত। ধর্ম ভিন্ন হওয়ায় তাদের ধর্মীয় আচার-আচরণ যেমন ছিল ভিন্ন, তেমনি ভিন্ন ছিল তাদের দেবতাগুলিও। এমন কি কারো কারো একাধিক দেবতাও ছিল। এই সব লোকদের মধ্যে কোন একতা ছিল না। সর্বদাই তাদের মধ্যে বিবাদ লেগে থাকত তাদের দেবতা ও ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে। কেননা প্রত্যেকেই তাদের নিজ নিজ ধর্ম এবং ধর্মীয় বিশ্বাসকে শ্রেষ্ঠ বলে প্রচার করত।  

বুদ্ধ.
এইসব লোকজন একদিন দল বেঁধে বুদ্ধের কাছে এল সত্যিকারভাবে খোদাকে দেখতে কেমন তা জানতে। বুদ্ধ (Buddha) তখন তার শিষ্যদেরকে একটা হাতী এবং কয়েকজন অন্ধ ব্যক্তিকে আনতে বললেন। তখন তার শিষ্যরা বড় একটা হাতী ও ছয়জন অন্ধব্যক্তিকে নিয়ে এল। বুদ্ধ অন্ধদেরকে বললেন, ’হাতী দেখতে কেমন তা-কি তোমরা জান?’
তারা বলল, ’না, কারণ আমরা কখনও হাতী দেখিনি।’
তখন বুদ্ধ বললেন, ’তোমাদের সামনে একটা হাতী রাখা আছে, সেটা দেখে তবে আমাদেরকে জানাও।’

অন্ধেরা ভাবল, আমাদের দৃষ্টি নেই তো কি হয়েছে, হাত তো আছে। হাত দিয়েই আমরা হাতীর আকার, আকৃতি ও প্রকৃতি জানতে পারব। তারা অনেকক্ষণ ধরে হাতী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করল, তারপর ঘোষণা করল- ’আমাদের হাতী দেখা শেষ হয়েছে।’
বুদ্ধ তখন বললেন, 'তোমাদের এক একজন করে গ্রামবাসীদেরকে জানাও হাতী দেখতে কেমন।’

ছয় অন্ধের হস্তীদর্শণ।
১ম ব্যক্তি হাতীর পা ধরে ছিল, সুতরাং সে বলল, ’হাতী দেখতে একদম গাছের মত।’
২য় ব্যক্তি হাতীর পেট ধরে ছিল, তাই সে বলল, ’হাতী আর কিছুই না, এটা এমন যেন একটা দেয়াল।’
৩য় ব্যক্তি হাতীর কান ধরে ছিল, তাই সে বলল, ’প্রকৃতপক্ষে হাতী একটা হাত পাখার মত।’

৪র্থ ব্যক্তি হাতীর লেজ ধরে ছিল, তাই সে বলল, ’দড়ি যেমন হাতী তেমন।’
৫ম ব্যক্তি হাতীর দাঁত ধরে ছিল, তাই সে বলল, ’হাতী হচ্ছে একটা বর্শার মত।’
৬ষ্ঠ ব্যক্তি ধরে ছিল হাতীর শুঢ়, তাই সে বলল, ’সাপ আর হাতী খুবই সদৃশ।’

সব শুনে বুদ্ধ গ্রামবাসীদের উদ্দেশ্যে বললেন, ’ছয় অন্ধের সকলেই হাতীটি দেখল, কিন্তু দূর্ভাগ্য, তাদের সকলের বর্ণনাই ভিন্ন হল। যাইহোক, তোমরা এখন বল এদের মধ্যে কার উত্তরটা সঠিক?’
গ্রামবাসী বলল, ’তাদের কারো উত্তরই সঠিক নয়। যদিও তারা সত্য বলেছে।’

বুদ্ধ বললেন, 'তোমরা ঠিকই বলেছ, কিন্তু কেন এমন হল? কারণ তারা প্রত্যেকে হাতীর ভিন্ন ভিন্ন অংশ দেখেছে। অন্ধ হওয়াতে তারা কেউই পূর্ণ হাতীকে দেখতে সমর্থ নয়। এমনিই খোদা এবং ধর্ম। যে যেমন খোদা ও তাঁর গুণাবলি দেখেছে বা জেনেছে, সে তেমনি করেই নিজের বিশ্বাস তৈরী করে নিয়েছে, গড়ে নিয়েছে নিজের দেবতা। সুতরাং তোমাদের কারও উচিৎ নয় অন্যের ধর্ম ও বিশ্বাসে আঘাত করা।’

-বুদ্ধের উপদেশ আমরা শুনলাম। কিন্তু এই উপদেশে কি আমাদের পেট ভরবে, আমাদের চাহিদা মিটবে? তবে কি আমরা প্রকৃত সত্য তথা সত্যের সত্য খুঁজব না? অবশ্যই খুঁজব এবং যতক্ষণ না পাব খুঁজে ফিরব। আর তাই আমরা এ বিষয়ে অর্থাৎ 'সত্য কি?' সে সম্পর্কে রাজা বিক্রমাদিত্য ও দিবাকরের কথোপকথনটাও জেনে রাখব-  

রাজা বিক্রমাদিত্য.
বিক্রমাদিত্য: 'সত্য কি? যা বারবার বলা হয়, যা জোর দিয়ে বলা হয়, যা মান্যবরেরা বলেন বা অধিকাংশ লোক যা সমর্থন করেন?’
দিবাকর: 'কোনটিই না। প্রত্যেকের নিজস্ব সত্যের সংজ্ঞা রয়েছে আর তা শর্তাধীন।’
বিক্রমাদিত্য: 'তবে যা প্রচলিত রয়েছে? সেগুলো তো আমাদের পিতৃপুরুষ প্রতিষ্ঠিত, আর তা কি সময়ের পরীক্ষা পার করে আসেনি?'

দিবাকর: 'পরীক্ষা করলে কি পিতৃপুরুষদের প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি সত্য ধারণ করে? যদি না করে, 'I am not here to justify it for the sake of saving the traditional grace of the dead, irrespective of the wrath I may have to face'তিনি আরও বললেন, 'All doctrines are right in their own respective spheres- but if they encroach upon the province of other doctrines and try to refute their view, they are wrong. A man who holds the view of the cumulative character of truth never says that a particular view is right or that a particular view is wrong.'
-জটিল কথাবার্তা? তাহলে বরং আমরা রিফ্রেশের জন্যে জন গুডফ্রের অন্ধের হাতী দেখা নিয়ে লিখিত কবিতাটি শুনি-

The Blind Men and the Elephant.
                              ---John Godfrey Saxe.

John Godfrey Saxe.
IT was six men of Hindustan
To learning much inclined,
Who went to see the Elephant
(Though all of them were blind),
That each by observation
Might satisfy his mind.

The First approached the elephant,
And happening to fall
Against his broad and sturdy side,
At once began to bawl:
"God bless me!- but the Elephant
Is very like a wall!"

The Second, feeling of the tusk,
Cried: "Ho!- what have we here
So very round and smooth and sharp?
To me 't is mighty clear
This wonder of an Elephant
Is very like a spear!"

The Third approached the animal,
And happening to take
The squirming trunk within his hands,
Thus boldly up and spake:
"I see," quoth he, "the Elephant
Is very like a snake!"

The Fourth reached out his eager hand,
And felt about the knee.
"what most this wondrous beast like
Is mighty plain," quoth he;
"T is clear enough the Elephant 
Is very like a tree!"

The Fifth, who chanced to touch the ear,
Said: "E'en the blindest man
Can tell what this resembles most;
Deny the fact who can,
This marvel of an Elephant
Is very like a fan!"

The Sixth no sooner had begun
About the best to grope,
Than, seizing on the swinging tail
That fell within his scope,
"I see," quoth he, "the Elephant
Is very like a rope!"

And so these men of Hindustan
Disputed loud and long,
Each in his own opinion
Exceeding stiff and strong,
Though each was partly in the right,
And all were in the wrong!

So, oft in theologic wars
The disputants, I ween,
Rail on in utter ignorance
Of what each other mean,
And prate about an Elephant
Not one of them has seen!

কবিতাটিতে কি দেখলাম? পাদ্রি, পুরোহিত ও ঈমামদের নিজস্ব মতাদর্শ অন্ধ ও অজ্ঞের মত আঁকড়ে থাকার বিষয়ে আক্ষেপ করে বুদ্ধ যেমন বলেছিলেন-
"How they cling and wrangle, some who claim
For preacher and monk the honored name!
For, quarreling, each to his view they cling. 
Such folk see only one side of a thing."

ঠিক এমনি একটু উপদেশের কথা (moral) জুড়ে দিয়েছেন মি: গুডফ্রে তার কবিতার শেষ ৬ পংক্তির মাধ্যমে। কি! বোঝা গেল? যেখানে যাবেন সেখানেই উপদেশ। জ্ঞানী-গুণিদের সকলেই উপদেশ দেন্নেওয়ালা। উপদেশের হাত থেকে আমাদের মত নিম্নবুদ্ধি বৃত্তিক সাধারণ মানুষদের রেহাই নেই।

এক অন্ধ পথ দেখাছে পাঁচ অন্ধকে।
যাইহোক, জ্ঞানী-গূণিদের থেকে আমরাই বা কম কিসে? সুতরাং এখন আমরা আমাদের নিজস্ব মতামত দেই। প্রথমেই বলি অন্ধদের নিয়ে এতসব আলোচনা কেন? এরা কি কোন কাজের? এক অন্ধ তো আরেক অন্ধকেই পথ দেখাতে পারে না। কি সত্যি না? ধরেন, একজন অন্ধ পথ দেখাচ্ছে আরও পাঁচজনের। তারা একে অন্যের পিছে লাঠি আঁকড়ে ধরে সাঁরিবদ্ধ ভাবে পথ চলছে। তো সামনে এক গর্ত পড়ল। কি হল? সকলেই সেই গর্তে পড়ল একজনের উপর আরেকজন। যিশুও এমনটা বলেছেন, "If a blind person leads a blind person, both of them will fall into a hole."-Jesus, gospel of Thomas, 34. তাই বলছিলাম অন্ধরা সমাজের একটা জঞ্জাল ছাড়া কিছুই নয়।

তবে অন্ধেরা জঞ্জাল হলেও অন্ধের হাতী দেখার গল্পটি কিন্তু জঞ্জাল নয়। এ গল্পটি তো এখন রূপক হিসেবে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ঢুকে পড়েছে। পদার্থ বিজ্ঞানে এটা ওয়েভ পার্টিকেল ডুয়ালিটিতে উপমা হিসেবে দেখান হয়েছে। আবার বায়োলজিতে, পলিক্লোনাল বি সেল রেসপন্সের ক্ষেত্রে এটা একটা চমৎকার উপমা হিসেবে কাজ করে।

যাইহোক, আমাদের মত সাধারণ মানুষ যারা কেবল উপরের কবিতাটুকুই পড়েছি তাদের প্রতিক্রিয়া এখন আমরা দেখি-

--This is a fascinating and touching allegory of the presence of God.
-- It is showing people how stupid mankind can be.
-- It is anti-scholastic.
-- It is just a tale copied by Rumi from Sanai- ইত্যাদি।.

সব শেষে আমরা এই অন্ধের হাতি দেখা গল্পটি উল্টিয়ে দেই, দেখি কেমন হয়-

ছয় অন্ধ হাতী নিজেদের মধ্যে আলোচনা করল মানুষ কেমন দেখতে তা তারা সরেজমিনে পরীক্ষা করে দেখবে। তারা বিষয়টি মাহুতকে জানালে মাহুত তাদের সামনে শুয়ে পড়ল। The first blind Elephant felt the man and declared, "Men are flat." After the other Elephants felt the man, they agreed.

সমাপ্ত।

বি:দ্র: অনেকেই অন্ধকে জঞ্জাল বলাতে ক্ষেপে গেছেন আমার উপর, বলেছেন, 'হোমার কি জন্মান্ধ ছিল না? সে কি ইলিয়াদ রচনা করেনি? হলিউড বলিউডে অন্ধদের নিয়ে কি কম ছবি হয়েছে? সেসব কি বক্স অফিস মাতিয়ে ছাড়েনি? আপনে মিয়া, দুই খান চক্ষু নিয়া কি এমন ছিঁড়ে আঁটি বেঁধে ফেলেছেন, শুনি?'
--'ভাই-রে, মাফ কইরা দেন, ভুলে  কইয়া ফালাইছি।'

ছবি: Wikipedia, innovent.tv.