pytheya.blogspot.com Webutation

২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১২

Aisha: বিবি আয়েশার উপর অপবাদ আরোপ।

শেষরাত্রি। বিবি আয়েশা (Aisha) তার সওয়ারীর মধ্যে নিদ্রামগ্ন। তার কানে কারও চিৎকার ভেসে আসছে। তিনি ধড়মড় করে উঠে বসলেন। একজন ঘোষণাকারীর কন্ঠ রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে ভেসে এল-‘কাফেলা কিছুক্ষণের মধ্যে এখান থেকে রওনা হয়ে যাবে। সুতরাং প্রত্যেকেই যেন নিজ নিজ প্রয়োজন সেরে প্রস্তুত হয়।’ -মুহম্মদ যখন কোন অভিযানে যেতেন তখন তিনি কোন না কোন স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। বনি মুস্তালিকদের বিরুদ্ধে অভিযানে তিনি বিবি আয়েশাকে সঙ্গে নিয়েছিলেন। 

এই ঘোষণা শুনে বিবি আয়েশা তার সওয়ারী থেকে নামলেন। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে হবে। তার নিদ্রার রেশ এখনও কাটেনি ঠিকমত। অগোছাল পায়ে তিনি একটু দূরে নির্জণ স্থানে গেলেন। অতঃপর যখন তিনি ফিরছিলেন, গলায় হারের অস্তিত্বহীনতা অনুভব করলেন। অজান্তেই তার হাত গলায় উঠে এল। না, নেই! মুহুর্তেই ঘুমের রেশ সম্পূর্ণ কেটে গেল তার, বুঝতে পারলেন হারটি কোথাও ফেলে এসেছেন। তিনি বিশেষ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। কারণ হারটি ছিল তার বড় বোন আসমার। সুতরাং হার খুঁজতে খুঁজতে পুনঃরায় সেখানে গেলেন তিনি।

এদিকে আয়েশার হাওদা-পর্দা বিশিষ্ট আসনটিকে (ইতিপূর্বে পর্দার বিধান অবতীর্ণ হওয়ায় এ ধরণের আসনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল) উটের পিঠে সওয়ার করে নিয়ে কাফেলাটি রওনা হয়ে গেল। আয়েশার হালকা-পাতলা গড়নের কারণে সওয়ারী বাহকরা বুঝতে পারল না যে তিনি সওয়ারীর মধ্যে নেই।

এদিকে আয়েশা ফিরে এসে দেখতে পেলেন কাফেলাটি চলে গেছে। তিনি চিন্তা ও দুর্ভাবনায় অধীর হয়ে পড়লেও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিলেন। অহেতুক এদিক সেদিক ছুটোছুটি বা কাফেলার পশ্চাৎধাবণ না করে সেখানেই চাদর গায়ে জড়িয়ে বসে রইলেন এই ভেবে- নিশ্চয়ই সওয়ারী বাহকদের এই-ভুল শীঘ্রই ধরা পড়বে এবং হযরত কিছু একটা ব্যবস্থা করবেন। সময় ছিল শেষরাত্রি, একসময় তিনি নিদ্রার কোলে ঢলে পড়লেন। 

ইতিমধ্যে প্রভাত হল এবং সেখানে সাফওয়ান নামক জনৈক সাহাবী উপস্থিত হলেন। সেনাবাহিনীর লোকেরা ভুল করে কোন কিছু ফেলে রেখে গেল কি-না সেটা দেখার জন্যেই তিনি মুহম্মদের নির্দেশে পিছনে রয়ে গিয়েছিলেন। 

তখন পর্যন্ত প্রভাত রশ্মি ততটা উজ্জ্বল হয়ে ফুটে ওঠেনি। সাফওয়ান দূর থেকে একজন মানুষকে নিদ্রামগ্ন দেখতে পেলেন। কাছে এসে তিনি বিবি আয়েশাকে চিনে ফেললেন কারণ পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বেই তিনি তাকে দেখেছিলেন। যাহোক তাকে এরূপ অবস্থায় দেখে তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলেন। অত্যন্ত বিচলিত অবস্থায় তার মুখ থেকে-‘ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাহে রাজেউন’ উচ্চারিত হয়ে গেল। এই বাক্য বিবি আয়েশার কানে যাবার সাথে সাথে তিনি জাগ্রত হয়ে গেলেন এবং সাফওয়ানকে দেখে মুখ ঢেকে ফেললেন। সাফওয়ান রসূলুল্লাহর স্ত্রীকে কোন কিছু জিজ্ঞেস করা সমীচীন হবে কি-না ভেবে কিছুক্ষণ দোদুল্যমনতায় ভুগলেন। অবশেষে তাকে কোন কিছু জিজ্ঞেস না করে তিনি দ্রুত তার উটটি তার কাছে এনে বসিয়ে দিলেন। অত:পর বিবি আয়েশা তাতে সওয়ার হলে তিনি উটের রশি ধরে হেঁটে মদিনার পথে রওনা দিলেন।

একসময় মদিনার উপকন্ঠে এসে তারা কাফেলার দেখা পেলেন। সাফওয়ানের উটে সওয়ারী বিবি আয়েশা-এই দৃশ্যে সকলেই অবাক হল, মুহম্মদও উদ্বিগ্ন হলেন। সাফওয়ান সকল কথা খুলে বললেন।

আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই মুহম্মদের সংস্পর্শে থেকেও কখনও শুদ্ধ-বুদ্ধ হতে পারলেন না। তার মধ্যে সবসময় মুহম্মদকে হেয় প্রতিপন্ন করার চিন্তা ও প্রচেষ্টা কাজ করেছে। সুতরাং মদিনায় পৌঁছে তিনি আয়েশা ও সাফওয়ানের ঘটনাটিকে একটা সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করলেন। তিনি বিবি আয়েশার চরিত্রের উপর কলঙ্ক আরোপ করলেন এবং তার এই রটনা সুকৌশলে লোকদের মাঝে ছড়িয়ে দিলেন। এতে নিন্দুকেরা কানাঘুসা শুরু করল।

মুনাফেকদের সাথে এই রটনায় কিছু মুমিন মুসলমানও সামিল হয়ে পড়লেন। এদের মধ্যে অগ্রণী ছিলেন কবি হাসসান বিন সাবেত (শিরীর স্বামী), আবু বকরের আশ্রিত মিসতাহ-বিন-উসামা এবং হাসনা বিনতে জহস-মুহম্মদের স্ত্রী জয়নবের ভগ্নি। হাসনা, ভগ্নি জয়নবকে মুহম্মদের কাছে গৌরবান্বিত করার মানসে এই সুযোগ নিলেন।

মুহম্মদ যদিও আয়েশাকে এই রটনা সম্পর্কে কিছুই জানতে দেননি কিন্তু তিনি সবকিছু অবগত হলেন। নিদারুণ দুঃখ আর লজ্জায় স্বামীর অনুমতি নিয়ে পিতৃগৃহে চলে গেলেন তিনি। এ বিষয়ে কোন ওহী নাযিল না হওয়ায় মুহম্মদও কি করবেন বুঝতে পারছিলেন না। আর এদিকে আয়েশা পিতৃগৃহে কাঁদতে কাঁদতে শুকিয়ে যাচ্ছিলেন।

অতঃপর একদিন মুহম্মদ আবু বকরের গৃহে গিয়ে আয়েশাকে বললেন, ‘হে আয়েশা, লোকে তোমার সম্বন্ধে যা বলছে তা নিশ্চয়ই শুনেছ। যদি তুমি এ ব্যাপারে কোনরূপ দোষী থাক; তবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, দয়ালু।’ 

এসময় আবু বকর ও তার স্ত্রী বিষন্ন মুখে নিরব হয়ে একপাশে গৃহকোণে বসে রইলেন। আয়েশা উত্তর করলেন, ‘ইয়া রসূলুল্লাহ! আমি ভালকরে কোরআন পড়িনি, আমি ছেলেমানুষ, এখনও আমার জ্ঞান পরিপক্ক নয়, তবুও আমি আপনার কথার তাপর্য বুঝতে পারছি। আল্লাহর কসম, এ-ব্যাপারে আমি কখনও তাঁর কাছে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাইব না, কেননা আমি নির্দোষ। দোষ করে তা অস্বীকার করা যেরূপ অন্যায়, দোষ না করে তা স্বীকার করাও তদ্রুপ অন্যায়। এতে আমি মিথ্যেচারিনী হব, কেননা আল্লাহ জানেন প্রকৃত ঘটনা।

--তাছাড়া এভাবে ক্ষমা চাইলে লোকের কাছে নিশ্চয়ই আমার মর্যাদা বাড়বে না। সবাই মনে করবে দোষ সত্যিই করেছিলাম, পরে ক্ষমা চেয়ে মাফ পেয়েছি, আবার যদি বলি আমি মোটে দোষী নই, তাও কেউ বিশ্বাস করবে না। আমি এখন সম্পূর্ণ নিরুপায়, নিঃসহায়। কাজেই আমি কিছুই বলতে চাইনে, কেবল ইউসূফের পিতা বিপদে পড়ে যা বলেছিল, আমি শুধু তাই বলব- ‘আমি ধৈর্য্য ধরে থাকব, একমাত্র আল্লাহই আমার ভরসা।’

আয়েশার বিরুদ্ধে মুনাফেক আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই রটিত অপবাদের গুজব একমাস চালু থাকার পর এই আয়াত নাযিল হলঃ ‘যারা সম্ভ্রান্ত স্ত্রীলোকদের সম্বন্ধে কুৎসা রটনা করে এবং চারটি প্রমাণ উপস্থাপন করতে না পারে, তাদেরকে আশিটি দোররা মারবে এবং কখনও তাদের সাক্ষ্যকে সত্যি বলে গ্রহণ করবে না, কারণ তারা সীমালঙ্ঘনকারী।’(২৪:৪)
নিশ্চয়ই যারা এ মিথ্যে অপবাদ রটনা করেছে, তারা তোমারই দলভূক্ত লোক। একে তুমি অশুভ বলে মনে কোরও না, পরন্তু এরমধ্যে তোমার জন্যে কল্যাণ নিহিত আছে। অপরাধকারীদের প্রত্যেকে তাদের কাজের জন্যে যথাযোগ্য শাস্তি ভোগ করবে, যে সর্বাপেক্ষা এ কাজে আগ্রহশীল, তাকে গুরুতর শাস্তিদানের ব্যবস্থা করা হবে।(২৪:১১)

উপরের আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে মুহম্মদী শরীয়তের শাস্তির কিছুটা বর্ণনা প্রয়োজন। মুহম্মদী শরীয়ত অপরাধের শাস্তিকে তিনভাগে বিভক্ত করেছে-

ক) হদঃ যে সব অপরাধের শাস্তিকে কোরআন আল্লাহর হক হিসাবে নির্ধারণ করেছে, সেসব শাস্তিকে হদ বলা হয়। সব দন্ডনীয় অপরাধের ক্ষেত্রে ন্যায়ের অনুকূলে সুপারিশ শ্রবণ করা যায়। কিন্তু হদের ক্ষেত্রে সুপারিশ করা এবং শ্রবণ করা দুই-ই নাজায়েজ বা অবৈধ।

শরীয়তে হদ চারটি। প্রতিটির শাস্তিই নির্মম এবং কোন অবস্থায় তা পরিবর্তণ ও লঘু করা যায় না এমন কি কেউ তা ক্ষমা করারও অধিকারী নয়। হদগুলি এই-

১.  ডাকাতিঃ এর শাস্তি ডান হাত বা বাম পা কর্তন করা। তবে ডাকাত যদি গ্রেফতারের পূর্বে তওবা করে এবং তার আচার-আচরণ দ্বারা সেটি নিশ্চিত হওয়া যায়, তবে সে হদ  থেকে রেহাই পাবে। কিন্তু গ্রেফতার পরবর্তী তওবা ধর্তব্য নয়।

২. চুরিঃ অন্যের মাল হেফাজতের জায়গা থেকে বিনা অনুমতিতে গোপনে নিয়ে যাওয়াকেই সংজ্ঞা দৃষ্টে ও সাধারণ পরিভাষায় চুরি বলা হয়। এর শাস্তি ডান হাত কব্জি থেকে কর্তন করা।

৩. ব্যভিচারঃ এর শাস্তি এক‘শ বেত্রাঘাত (অবিবাহিতের বেলায় প্রযোজ্য) অথবা প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা (বিবাহিতের বেলায় প্রযোজ্য)।

৪. ব্যভিচারের অপবাদঃ এর শাস্তি আশিটি বেত্রাঘাত।

বিঃদ্রঃ মদ্যপান ও শুকরের মাংস ভক্ষণের কোন শাস্তি কোরআন নির্ধারণ করেনি। কিন্তু  হাদিসে এর শাস্তির বর্ণনা পাওয়া যায়।

খ) কেসাসঃ যে সব শাস্তিকে কোরআন বান্দার হক হিসেবে জারি করেছে, সেগুলোকে কেসাস বলা হয়। কেসাসের শাস্তিও হদের মত কোরআন নির্ধারণ করেছে। যেমন- প্রাণের বদলে প্রাণ, জখমের বদলে সমান জখম। কিন্তু এখানে বান্দার হক প্রবল হওয়ার কারণে হত্যাকারীকে নিহতের উত্তরাধিকারীদের এখতিয়ারে ছেড়ে দেয়া হয়। তারা ইচ্ছে করলে কেসাস গ্রহণ করতে পারে অথবা ক্ষমা করে দিতে পারে। 

গ) তা‘যীরঃ যে সব অপরাধের শাস্তি কোরআন নির্ধারণ করেনি, সে জাতীয় শাস্তিকে বলা হয় তা‘যীর তথা দন্ড। দন্ডগত শাস্তিকে লঘু থেকে লঘুতর, কঠোর থেকে কঠোরতর এবং ক্ষমাও করা যায়। এ ব্যাপারে বিচারকের ক্ষমতা প্রবল। 
উল্লেখ্য- উপরোক্ত সকল ক্ষেত্রেই সন্দেহের সুযোগ অপরাধীরা ভোগ করতে পারবে।

এখন আবার প্রসঙ্গে ফিরে আসি। উপরের আয়াত নাযিল হওয়ার পরে সকলের প্রতি অপবাদের হদ প্রয়োগ করা হল-এমনকি জয়নবের ভগ্নি হাসনাও রেহাই পাননি। 

অতঃপর মুসলমানদেরকে উপদেশ দিয়ে এই আয়াতসমূহ নাযিল হয়েছিল- ‘হে বিশ্বাসী পুরুষ এবং নারীরা, তোমরা যখন এ কুৎসা কাহিনী শুনলে, তখন আপনজনদের কথা মনে করে কেন বললে না যে, এ সুস্পষ্ট মিথ্যে কথা?’ এবং যদি তোমাদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ না থাকত এবং দুনিয়া ও আখেরাতে তাঁর করুণাই না প্রকাশ পেত, তবে তোমরা (আয়েশার সম্বন্ধে) যে সব (কুৎসিৎ) আলোচনায় যোগ দিয়েছিলে, তার জন্যে নিশ্চয়ই তোমাদেরকে কঠিন শাস্তি দেয়া হত। তোমরা এমন বিষয়ে আলোচনা করতে আরম্ভ করলে যার সম্বন্ধে তোমরা কিছুই জানতে না? তোমাদের কাছে বিষয়টি খুব হালকা মনে হয়েছিল, কিন্তু আল্লাহর কাছে তা গুরুতর ছিল’ এবং যখন তোমরা তা শুনলে তখন কেন বললে না যে, এ সম্বন্ধে কোন মন্তব্য করা আমাদের সাজে না, সমস্ত গৌরব আল্লাহর, নিশ্চয়ই এ একটি মস্ত বড় অপরাধ।’ আল্লাহ তোমদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা যদি বিশ্বাসী হও, তবে ভবিষ্যতে যেন এরূপ কর্ম আর না কর।’(২৮:১২-১৭)

আয়েশা ও সাফওয়ান দোষমুক্ত হলেও কুৎসাকারীদের উপর সাফওয়ানের আক্রোশ কমল না। কবি হাসসানকে তিনি গুরুতর আহত করলেন। আর আবু বকর কসম খেলেন মিসতাহকে তিনি আর কখনও সাহায্য করবেন না। 

আবু বকরের এই কসমের পর এই আয়াত নাযিল হল-এবং তোমাদের মধ্যে যারা সঙ্গতি সম্পন্ন, তারা যেন তাদের আশ্রিতজনকে, দরিদ্রদেরকে এবং যারা আল্লাহর পথে পালিয়ে গেছে, তাদেরকে কোনরূপ সাহায্য করবে না বলে প্রতিজ্ঞা না কর। তাদের উচিৎ সকলকে ক্ষমা করা এবং (প্রতিজ্ঞা থেকে) ফিরে দাঁড়ান; আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করেন, এই কি পছন্দ কর না? আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু।’(২৪:২২) 

অতঃপর আবু বকর প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করলেন ও বললেন যে, যতদিন তিনি জীবিত থাকবেন ততদিন কোন অবস্থাতেই মিসতাহকে সাহায্য করতে ভুলবেন না।

হদ প্রয়োগের পর অপবাদ আরোপকারী সকলেই তওবা করে নিয়েছিলেন এবং আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করেছিলেন। অন্যদিকে হাসসান ও মিসতাহ উভয়ই বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী, আর আল্লাহ বদর যোদ্ধাদের জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছিলেন এই কারণে বিবি আয়েশার সামনে কেউ হাসসানকে মন্দ বললে তিনি তা পছন্দ করতেন না, এমনকি কোন কারণে হাসসান তার কাছে এলে তিনি স্বসম্ভ্রমে তাকে আসন দিতেন। সুতরাং অতঃপর কেউই তাদেরকে আর মন্দ বলেনি।

সমাপ্ত।

Bismillah: সকল প্রসংশা একমাত্র আল্লাহর।


মুহম্মদ: দুপুরবেলা। প্রখর রোদ্রতাপের মধ্যে আবু বকর ঘর থেকে বের হয়ে মসজিদে এলেন। ওমর তাকে দেখে বললেন, ‘হে আবু বকর, এই অসময়ে ঘর থেকে বের হলেন যে?’
আবু বকর সামান্য ইতস্ততঃ করে বললেন, ‘সত্যি বলতে কি, ভীষণ ক্ষুধার্ত বোধ করার কারণে ঘর থেকে বের হয়েছি।’
ওমর স্বতঃস্ফূর্তভাবে বললেন, ‘আমিও বের হয়েছি ঐ একই কারণে।’
এসময় মুহম্মদ মসজিদে এসে তাদেরকে দেখে বললেন, ‘এই অসময়ে তোমরা বের হয়েছ কেন?’

অতঃপর তারা যখন ঘর থেকে বের হবার কারণ বললেন তখন হযরত হেসে বললেন, ‘আসলে, শুধু ক্ষুধার কারণে আমিও ঘর থেকে বের হয়েছি। কিন্তু আমার সঙ্গে এস।’
অতঃপর তিনি মসজিদ থেকে বেরিয়ে চিৎকার করে ডাকলেন, ‘আবু আইয়ূব তুমি কোথায়?’

আবু আইয়ূব ঐসময় কাছেই তার খেজুর বাগানে কাজ করছিলেন। হযরতের ডাক শুনে তাড়া তাড়ি ছুটে এলেন, বললেন, ‘হযরতকে খোশ আমদেদ এবং খোশ আমদেদ তাদের জন্যেও যারা তার সঙ্গে এসেছেন।’
অতঃপর বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! এটা তো সেইসময় নয় যখন আপনি সাধারণতঃ ঘর থেকে বাইরে আসেন।’ আবু আইয়ূব প্রতিদিনই হযরতের জন্যে খাবার রাখতেন। নির্ধারিত সময়ে তিনি না এলে আইয়ূবের পরিবারের সদস্যরা তা থেকে আহার করতেন।
‘তুমি ঠিকই বলেছ।’- মুহম্মদ বললেন।

আবু আইয়ূব আল আনসারীর সমাধি, ইস্তাম্বুল।
আইয়ূব এগিয়ে গিয়ে একটা খেজুরের কাঁদি কাটলেন যাতে পাকা ও আধা পাকা খেজুর ছিল। অতঃপর যখন তা মুহম্মদের সম্মুখে আনয়ন করলেন তখন তিনি বললেন, ‘তুমি এটা কাটবে এ অভিপ্রায় আমার ছিল না। তুমি কি শুধু কিছু পাকা খেজুর আনতে পারতে না?’

আইয়ূব বললেন, ‘হে রসূলুল্লাহ! অনুগ্রহ করে এ কাঁদি থেকে খেজুর খান। আমি আপনাদের জন্যে একটা ছাগল জবাই করারও ইচ্ছে পোষণ করছি।’
হযরত বললেন, ‘তুমি যদি তাই করতে চাও, তাহলে এমন একট জবাই কর যা দুধ দেয় না।’
আইয়ূব একটা খাসি জবাই করলেন। অর্ধেকটা পাক করলেন আর বাকীটা করলেন কাবাব। আর তার স্ত্রী রুটি ছাঁকলেন। 

খাবার তৈরী শেষে আইয়ূব যখন তা সকলের সামনে পেশ করলেন, তখন হযরত এক টুকরো মাংস একটা রুটির উপর রাখলেন ও বললেন, ‘এটা ফাতিমার জন্যে। সে এ ধরণের খাবার অনেক দিন যাবৎ খায়নি।’

‘রুটি আর মাংস, পাকা খেজুর ও আধপাকা খেজুর’-হযরতের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে নামল এবং তিনি বলতে লাগলেন-‘এত সুন্দর নেয়ামতের জন্যে রোজ হাশরে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে। সুতরাং খাবার এলে খাবারে হাত দিয়ে বলবে, ‘সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর।’ এবং খাওয়া শেষে বলবে-‘সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর, তিনি আমাদের যথেষ্ট দিয়েছেন এবং যিনি তাঁর রহমত আমাদের উপর বর্ষণ করেছেন।’


ইব্রাহিম: স্ত্রী ও সন্তানদের মরুভূমিতে নির্বাসনের পর ইব্রাহিম যখন তার পরিবারের খোঁজে পুনঃরায় সেখানে গেলেন, তখন তাদের বেঁচে থাকা দেখে আনন্দে আপ্লুত হলেন। সেখানে তাদের থাকার সু-ব্যবস্থা এবং জীবিকা অর্জণের সু-বন্দোবস্ত দেখে আল্লাহর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলেন। অতঃপর তিনি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন- যে সর্বশক্তিমান, দয়ালু আল্লাহ তার সন্তান, পরিবারকে নির্জন মরুভূমিতে আহার্য জুটিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছেন, তাঁর কোন অনাহারী বান্দাকে আহার না করিয়ে তিনি কখনও আহার গ্রহণ করবেন না।

থাকার সু-ব্যবস্থা এবং জীবিকা অর্জণের সু-বন্দোবস্ত দেখে
হিব্রোণে ফিরে এসে ইব্রাহিম তার গৃহ সংলগ্নকরে একটি মেহমানখানা নির্মাণ করলেন। তিনি সারা বৎসরই প্রায় রোজা রাখতেন। এ কারনে প্রতিদিন সন্ধ্যায় একজন অতিথি ডেকে এনে ঐ মেহমান খানায় তার সঙ্গে আপ্যায়ণ করতেন।

প্রতিদিনের মত একজন অতিথির খোঁজে ইব্রাহিম পথের ধারে বসে আছেন। সন্ধ্যা প্রায় সমাগত কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন অতিথির দেখা নেই। অতঃপর জনৈক অচেনা লোকের সাথে তার সাক্ষাৎ হল। তিনি তাকে সমাদর করে নিজ গৃহে নিয়ে এলেন।

খাবার পরিবেশন করা হয়েছে। যখন উভয়ে খাবার খেতে শুরু করবেন তখন ইব্রাহিম আগন্তুক মুসাফিরকে বললেন, ‘বলুন, আল্লাহর নামে শুরু করছি।’
অতিথি লোকটি ছিল পৌত্তলিক। সুতরাং সে বলল, ‘আল্লাহ কাকে বলে আমি জানি না।’

তার এ কথায় ইব্রাহিম রাগান্বিত হয়ে তাকে তাড়িয়ে দিলেন। যখন সে বের হয়ে গেল তখুনি জিব্রাইল উপস্থিত হল এবং তাকে বলল, ‘আল্লাহ বলেছেন-আমি ঐ ব্যক্তির কুফরী জানা সত্ত্বেও তাকে সারা জীবন আহার্য ও পানীয় দিয়ে আসছি। আর তুমি তাকে একবেলা খাবার দিতে পারলে না?’

একথা শুনে ইব্রাহিম তৎক্ষণাৎ ঐ ব্যক্তিকে খুঁজতে বের হয়ে পড়লেন। অবশেষে তাকে খুঁজে পেয়ে গৃহে ফিরিয়ে আনলেন। কিন্তু খাবার সময় ঐ ব্যক্তি বেঁকে বসল। বলল, ‘আপনি প্রথমে আমাকে তাড়িয়ে দিলেন-পরে আবার সাধাসাধী করে কেন নিয়ে এলেন তা না জানা পর্যন্ত আমি খাবার স্পর্শ করব না।’

ইব্রাহিম ঘটনা বর্ণনা করলেন। এতে পৌত্তলিক লোকটির মধ্যে ভাবান্তর হল-তার চক্ষু অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। ক্ষণকাল মৌণতা অবলম্বনের পর সে বলল, ‘তিনি সত্যিই পরম দয়ালু। Bismillahআল্লাহর নামে শুরু করছি।’
সে খাবার খেতে শুরু করল।

সমাপ্ত।
ছবি: Wikipedia, lds.org.