কুরাইশ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কুরাইশ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

১৮ মার্চ, ২০১২

Prophecy: মূসার অন্তিম ভাববাণীর পূর্ণতা লাভ।


বনি বকররা বনি খোজাদের আক্রমণ করে বসল। বনি খোজারা মুসলমানদের সঙ্গে তাদের রক্ষণাবেক্ষণে চুক্তিসূত্রে আবদ্ধ ছিল। কুরাইশরা হুদাইবিয়ার সন্ধি ভঙ্গ করে গোপনে বনি বকরদেরকে যোদ্ধা ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করল। তাদের সহযোগিতায় পুষ্ট হয়ে বনি বকররা বনি খোজাদেরকে আক্রমণ করল রাতের বেলায়। এতে অধিকাংশ খোজা নিহত হল এবং অল্পকিছু পলিয়ে গেল। 

কুরাইশরা ভেবেছিল নৈশ অভিযানে বনি বকরদেরকে গোপনে সাহায্য করার এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ সূদূরে অবস্থানরত মুহম্মদ বা মুসলমানরা কখনও জানতে পারবেন না। কিন্তু তাদের ভাবনাকে মিথ্যে প্রমাণিত করে পালিয়ে যাওয়া ঐসব বনি খোজারা অতিকষ্টে মদিনায় এসে পৌঁছিল। অতঃপর মুহম্মদের কাছে অভিযোগ করল এবং ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দান করে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করল। তারা তাদের অভিযোগে বলেছিল, ‘হে রসূলুল্লাহ! কুরাইশরা আপনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তারা আপনার সেই সূদৃঢ় প্রতিজ্ঞাপত্রখানা বাতিল করে দিয়েছে। রজনীর অন্ধকারে অতর্কিতভাবে তারা বনি বকরদের সাথে আমাদের ‘অরক্ষিত’ আবাসগুলি আক্রমণ করেছে এবং আমাদেরকে শায়িত ও উপবিষ্ট অবস্থায় নির্দয়ভাবে হত্যা করেছে।’

কুরাইশ ও বনি বকরের এই পৈচাশিক অত্যাচারের ও মিত্র খোজা বংশের এই মর্মন্তুদ হত্যাযজ্ঞের কথা শ্রবণে মুহম্মদ যার পর নাই মর্মাহত হলেন। এ ঘটনার পর এই আয়াতসমূহ নাযিল হল-‘সম্পর্কচ্ছেদ করা হল আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে সেই মুশরিকদের সাথে, যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলে।’(৯:১) 
সুতরাং মুহম্মদ অভিযানের সিদ্ধান্ত নিলেন এবং গোপনে যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরু করলেন।

এদিকে বনি খোজাদের কিছু লোকের পালিয়ে মদিনায় গমনের সংবাদ কুরাইশদের কাছে শীঘ্রই পৌঁছে গেল। তারা বদর, ওহোদ ও আহযাব যুদ্ধে মুসলমানদের গায়েবী সাহায্য লাভের বিষয়টি আঁচ করে এমনিতে হীনবল হয়ে পড়েছিল। তার উপরে চুক্তিভঙ্গের বর্তমান ঘটনায় তাদের কাছে মুসলমানদের যুদ্ধ প্রস্তুতির আশঙ্কা বৃদ্ধি পেয়েছিল। অতঃপর মুহম্মদ ও মুসলমানদের পূর্ণ নীরবতা তাদের এই আশঙ্কাকে আরও ঘনীভূত করল। সুতরাং কুরাইশ দলপতি আবু সুফিয়ান মুহম্মদ ও মুসলমানদের মনোভাব জানতে তাড়াতাড়ি মদিনায় হাজির হলেন। 

মদিনায় এসে আবু সুফিয়ান স্বীয় কন্যা, নবী পত্নী উম্মে হাবিবার হুজরায় উপনীত হলেন। পিতাকে দেখে হাবিবা তাড়াতাড়ি হযরত যে বিছানায় উপবেশন করতেন তা গুটিয়ে রাখলেন। এ দেখে আবু সুফিয়ান বললেন, ‘এই বিছানার মর্যাদা কি তোমার পিতার চাইতেও বেশী।’
তিনি বললেন, ‘এই শয্যায় আল্লাহর রসূল উপবেশন করেন, আর তুমি হলে মুশরিক।’
কন্যার এই উত্তর শুনে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘মুহম্মদ আমার এই স্নেহের কন্যাটিকে যাদুর জালে আবদ্ধ করে আমার প্রতি এরূপ বীতশ্রদ্ধ করে রেখেছে!’

কন্যার হুজরা থেকে বেরিয়ে আবু সুফিয়ান মদিনায় ইতস্ততঃ এদিক সেদিক ঘুরলেন। কোথাও কোন যুদ্ধ প্রস্তুতি নেই- নিশ্চিত হয়ে তিনি অতঃপর মুহম্মদের দরবারে হাযির হলেন। মুহম্মদ আবু সুফিয়ানের মদিনায় আগমনের উদ্দেশ্য জিজ্ঞেস করলেন, বললেন, ‘কি উদ্দেশ্য নিয়ে আপনার এখানে আগমন?’
তিনি বললেন, ‘হুদাইবিয়ার সন্ধি আমাদের পক্ষ থেকে ভেঙ্গে গিয়েছে। সুতরাং পুনঃরায় সন্ধি স্থাপনের উদ্দেশ্য নিয়ে আমি আগমন করেছি।’

মুহম্মদ তার কথার কোন উত্তর না দিয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এতে তার মনোভাব বুঝতে পেরে শঙ্কিত হয়ে তিনি দরবার থেকে বেরিয়ে গণ্যমান্য কয়েকজন সাহাবীর কাছে আবেদন রাখলেন যেন তারা মুহম্মদের কাছে চুক্তি বলবৎ রাখার সুপারিশ করেন। কিন্তু তারা সবাই কুরাইশদের পূর্ববর্তী ও উপস্থিত ঘটনাবলীর তিক্ত অভিজ্ঞতার দরুন প্রস্তাবটি নাকচ করে দিলেন। ফলে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে মক্কায় ফিরে এলেন আবু সুফিয়ান।

আবু সুফিয়ানের মক্কায় প্রত্যাবর্তণের পর এই সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল যে, সন্ধি নবায়িত হয়নি। ফলে মক্কা ও তার আশে পাশের সর্বত্র যুদ্ধভীতি ছড়িয়ে গেল।

৮ম হিজরীর ১৮ই রমজান। পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে দশ সহস্য সৈন্য সংগ্রহ শেষে মুহম্মদ মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। এরূপে মূসার ভবিষ্যৎ (Prophecy) বাণী পূর্ণ হল, ‘দশ সহস্র ন্যায়নিষ্ট সহচরসহ তিনি এলেন। 

মক্কার উপকন্ঠে ‘মার উজ-জহরান’ নামক গিরি উপত্যকায় শিবির স্থাপিত হল। অতঃপর মুহম্মদ দূত মারফত কুরাইশদের কাছে তিনটি বিকল্প প্রস্তাব পাঠালেন। 

- হয় তোমরা বনি খোজা গোত্রকে উপযুক্ত রক্তপণ দিয়ে এই অন্যায়ের প্রতিকার কর। অথবা,
- বনি বকর গোত্রের সাথে সকল সম্বন্ধ ছিন্ন কর। অথবা,
- হুদাইবিয়ার সন্ধি বাতিল হয়েছে বলে ঘোষণা কর।

কুরাইশরা জানত না যে, মুসলমানরা প্রস্তুত হয়ে মক্কার উপকন্ঠে উপস্থিত হয়েছেন। সুতরাং তারা উৎসাহের সাথে দূতকে জানিয়ে দিল, ‘আমরা তৃতীয় শর্তটিই মেনে নিলাম।’

মুসলিম শিবিরে রাতের খাবার তৈরীর জন্যে আগুন জ্বালান হল। নিকটবর্তীতে এই আগুন দেখে কুরাইশরা অবাক হল। সুতরাং তারা আবু সুফিয়ানকে প্রকৃত তথ্য জানতে প্রেরণ করল।

‘মুসলিম মুজাহিদরা এত কাছে এসে পড়েছে!’-আবু সুফিয়ান বিষ্ময়ের আর শেষ রইল না। তিনি মুসলিম বাহিনীর তাঁবুর চারিদিকে ঘুরেফিরে দেখতে লাগলেন। এসময় অগ্নিশিখার উজ্জ্বল আলোকে প্রহরীরা তাকে চিনে ফেলল। তারা সঙ্গোপণে তার পিছু নিল এবং অতঃপর বন্দী করে মুহম্মদের কাছে নিয়ে এল। মুহম্মদ আবু সুফিয়ানকে নিঃশর্ত ক্ষমা করে মুক্তি দিলেন। ক্ষমার এই মহত্ত্বে মুগ্ধ হয়ে তিনি তখনি ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং অতঃপর মক্কায় ফিরে এলেন।

সুবেহ সাদেকের শুভপ্রভা পূর্ব গগণে প্রতিভাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মরুর উপত্যাকার শিখর দেশ হতে বেলালের কন্ঠের সুমধুর আজানধ্বনি চারিদিকে মুখরিত হল। অতঃপর সকলে জামাতে সমবেত হয়ে ফজরের নামাজ সমাপন করলেন। নামাজ অন্তে বিভিন্ন গোত্রের বীররা স্বতন্ত্রদলে বিভক্ত হয়ে মক্কার দিকে যাত্রা করতে আরম্ভ করলেন। আবু সুফিয়ান, পিতৃব্য আব্বাসের সাথে উপত্যাকার একটা চূঁড়ায় বসে চকিত ও স্তম্ভিত দৃষ্টিতে তা দেখছিলেন। একসময় সেনাপতি সা‘দ ইবনে ওবায়দা পাশ দিয়ে যাত্রার সময় আবু সুফিয়ানকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘আজ ভীষণ সংঘর্ষের দিন, আজ মক্কার সম্ভ্রম নষ্ট হবে।’
আবু সুফিয়ান দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বসে রইলেন। অবশেষে মোহাজিররা সম্মুখে উপস্থিত হলেন। মুহম্মদ এই দলে ছিলেন। তাকে দেখেই আবু সুফিয়ান চিৎকার করে বললেন, ‘মুহম্মদ, তুমি কি তোমার স্বজনকে হত্যা করার আদেশ দিয়েছ?’
তিনি উত্তর করলেন, ‘না।’
তখন আবু সুফিয়ান সাদের দর্পোক্তির কথা নিবেদন করে ফ্যাল ফ্যাল করে তার মুখপানে চেয়ে রইলেন। মুহম্মদ বজ্রগম্ভীর স্বরে উত্তর দিলেন, ‘সা‘দের কথা সত্য নয়, আজ প্রেম ও করুণার দিন, আজ কা’বার সম্ভ্রম চির প্রতিষ্ঠিত হবার দিন।’

সঙ্গে সঙ্গে অশ্ব সাদী হরকরা ছুটে গিয়ে সা‘দকে হুকুম শুনিয়ে দিলেন যে, এই প্রকার উক্তি করার জন্যে তাকে পদচ্যূত করা হয়েছে। সা‘দ নীরবে নবনিয়োজিত সেনাপতির হস্তে পতাকা অর্পণ করে তার বশ্যতা স্বীকার করে নিলেন। 

মুহম্মদ আবু সুফিয়ানকে বললেন, ‘আপনি মক্কাবাসীদের অভয় দিন, আজ তাদের প্রতি কোনই কঠোরতা হবে না। আমার পক্ষ হতে নগরময় ঘোষণা করে দিন-

-যে ব্যক্তি অস্ত্র ত্যাগ করবে -তাকে অভয় দেয়া হল।
-যে ব্যক্তি কা’বায় প্রবেশ করবে- সে অভয় প্রাপ্ত।
-যারা নিজেদের গৃহদ্বার বন্ধ করে রাখবে তাদের কোন ভয় নেই।
-যারা আবু সূফিয়ানের গৃহে প্রবেশ করবে তারা অভয়প্রাপ্ত।

মুহম্মদ মক্কাবাসীর প্রতি যে, অভয়বাণী প্রেরণ করলেন, সেই সংবাদ মুসলিম বাহিনীর সমস্ত সৈন্যকেও জানিয়ে দেয়া হল।

সৈন্যদের প্রতি যেরূপ আদেশ ছিল সেইরূপ তারা বিভিন্ন পথে মক্কায় প্রবেশ করলেন। আবু জেহেল পুত্র ইকরামা ও উমাইয়ার পুত্র সাফওয়ান গোত্র প্রধান হিসেবে সামান্য প্রতিরোধ করেছিলেন ফলে কিছু সংখ্যক মুসলমান নিহত হয়েছিলেন। তৎক্ষণাৎ সেনাপতি খালিদ ইবনে ওয়ালিদকে কৈফিয়ত দেবার জন্যে হাজির করা হল। খালিদ উপস্থিত হয়ে নিবেদন করলেন, ‘মহাত্মন! আমি আপনার আদেশ প্রতিপালন করার যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু এরা কোন মতেই নিরস্ত হল না। তারা প্রথমে আমাদের আক্রমণ করে এবং দু‘জন মুসলমানকে হত্যা করে ফেলে। তখন অগত্যা আমাকেও অস্ত্র চালনা করতে হয়েছিল। কিন্তু হে রহমাতুল-লিল-আল আমিন! আপনি তদন্ত করে দেখুন, যাতে এই সংঘর্ষে অধিক প্রাণহানি না হয়, সেজন্যে আমি সর্বদাই যৎপরোনাস্তি সংযত ও সঙ্কুচিত হয়ে সৈন্য চালনা করেছি।’

এই দু‘একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া প্রায় বিনা প্রতিরোধেই মুহম্মদ মক্কায় প্রবেশ করেছিলেন।

সমাপ্ত।

১২ মার্চ, ২০১২

Hijrat: মুসলমানদের আবিসিনিয়ায় হিজরত।


উত্তরোত্তর অনুসারীরদের দুঃখ-দুর্দশা অসহনীয় হয়ে উঠল। এতে মুহম্মদ মর্মাহত হয়ে তার শিষ্যদেরকে আবিসিনিয়ায় আশ্রয় নেবার জন্যে পরামর্শ দিলেন, যতদিন না কুরাইশদের অন্তরে আল্লাহ পরিবর্তন আনেন। 

ম্যাপ আবিসিনিয়া।
আবিসিনিয়ায় নাজ্জাসী নামের এক খ্রীষ্টান ব্যক্তি শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। মুহম্মদ ঐ রাজ্যের ধর্মপরায়ণতা, সহিষ্ণুতা ও আতিথেয়তার কথা শুনেছিলেন এবং নিশ্চিত ছিলেন তার শিষ্যরা সেখানে নিরাপত্তা লাভ করবে। 

মুহম্মদের উপদেশ গ্রহণ করে পনেরজনের একটি দল ৬১৫খ্রীঃ আবিসিনিয়ায় উপস্থিত হলেন। এই দলে যারা ছিলেন তারা হলেন, ওসমান ও তার স্ত্রী রোকাইয়া, জোবায়ের, মূসাব, আব্দুর রহমান, আবু হোজায়ফা ও তার স্ত্রী ছাহলা, আবু সালমা ও তার স্ত্রী উম্মে সালমা, ওসমান ইবনে মায়উন, আমর বিন রাবিয়া ও তার স্ত্রী লায়লা, আবু ছাবরা, হাতেব, আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ ও হাসসান। এদের হিযরতের পর এই আয়াত নাযিল হল-যারা নির্যাতিত হওযার পর আল্লাহর জন্যে গৃহ ত্যাগ করেছে, আমি অবশ্যই তাদেরকে দুনিয়াতে উত্তম আবাস দেব এবং পরকালের পুরস্কার তো সর্বাধিক।(১৬:৪১)

ওসমানের নেতৃত্বে প্রথম দলটি প্রেরণের পর আবু তালিব পুত্র আলীর ভ্রাতা জাফরের নেতৃত্বে ৮৩ জনের দ্বিতীয় আর একটি দল আবিসিনিয়ায় হিযরত  (Hijrat) করলেন। জাফর সম্রাট নাজ্জাসীকে মুহম্মদের একটি পত্র দিয়েছিলেন। যা ছিল-

‘পরম করুণাময় আল্লাহর নামে-
আল্লাহর রসূল মুহম্মদের নিকট থেকে হাবসার অধিপতি নাজ্জাসী সমীপে-

আমি সেই আল্লাহর প্রশংসা করি যিনি ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই, যিনি সমগ্র জগতের মালিক। তিনি পবিত্র, শান্তি ও নিরাপত্তা প্রদানকারী। আমি অঙ্গীকার করি যে, মরিয়ম পুত্র ঈসা আল্লাহর তরফ থেকে আগত এমন একটি আত্মা ও কলেমা যা সকল প্রকার কলুষ ও কালিমামুক্ত বিবি মরিয়মের সত্ত্বায় প্রবেশ করান হয়েছিল এবং ঈসা, বিবি মরিয়মের গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আল্লাহ তাকে স্বীয় কুদরতে তেমনিভাবে জাত করেছিলেন যেমনিভাবে আদমকে নিজ হস্তে সৃষ্টি করেছিলেন। 

আমি আপনাকে সেই অদ্বিতীয় আল্লাহর প্রতি আহবান করি, যার কোন শরীক নেই, আপনিও আমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেন এবং আল্লাহর নির্দেশ পালন করার ব্যাপারে আমার সহযোগী হোন। আমি যে আল্লাহর তরফ থেকে প্রেরিত রসূল এই সত্যে পরিপূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে আমার প্রতি অনুগত হোন। একান্ত শুভ কামনার বশবর্তী হয়েই নিষ্ঠার সাথে এই পয়গামপূর্ণ আহবান গ্রহণ করা আপনার দায়িত্ব। আপনার মাধ্যমে আপনার প্রজাদের প্রতিও আমার সেই একই আহবান। 

আমি আমার পিতৃব্যপুত্র জাফরকে অপর কয়েকজন মুসলমানসহ আপনার কাছে প্রেরণ করেছি। যখন এরা আপনার দরবারে পৌঁছিবে, তখন রাজকীয় অহমিকা পরিত্যাগ করে তাদের সাথে সৌজন্যমূলক ব্যাবহার করবেন।

যারা সঠিক পথ অবলম্বণ করেছে, তাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক।’

(মোহর):  মুহম্মদ-রসূল-আল্লাহ।

এদিকে মুসলমানরা পালিয়ে গেছেন দেখে কুরাইশরা ক্রোধান্বিত হল। পলাতকদের ধরে আনার জন্যে তারা তৎক্ষণাৎ একদল লোক জেদ্দা বন্দরের দিকে পাঠিয়ে দিল। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়ে ফিরে এল। 

হিজরত রুট ম্যাপ।
কুরাইশরা পরামর্শ সভা আহবান করল। এই সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে আব্দুল্লাহ ইবনে আবু রাবিয়া ও আমর ইবনে আ'সের সমন্বয়ে এক প্রতিনিধি দল প্রেরিত হল আবিসিনিয়ায়। 

প্রতিনিধিরা রাজদরবারে উপস্থিত হয়ে উপঢৌকনাদি পেশ করলেন। নাজ্জাসী তাদের আগমনের কারণ জিজ্ঞেস করলেন। তারা বললেন, ‘হে রাজন! আমাদের দেশের কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল ধর্মদ্রোহী আপনার রাজ্যে পালিয়ে এসেছে। এরা তাদের পূর্বপুরুষদের ধর্ম পরিত্যাগ করেছে এবং একটি নুতন ধর্ম গ্রহণ করেছে। তা না আমাদের ধর্ম, না আপনাদের। আমাদের গোত্র প্রধানেরা তাদেরকে উপযুক্ত শাস্তি প্রদানের জন্যে ফিরে পেতে আপনার সহযোগিতা চান। আর অবশ্যই তাদের কার্যকলাপের বিচার তারাই উত্তমরূপে করতে পারবেন। কাজেই আমরা আপনার কাছে এসেছি। দয়া করে তাদেরকে আমাদের হস্তে সমর্পণ করুন।’

সভাষদরা তাদের দাবীকে উত্তম ও ন্যায়তঃ, খুবই সঙ্গতঃ বটে, ঘোষণা করলেও বাদশা তা অগ্রাহ্য করে আশ্রয় গ্রহণকারীদের ডেকে পাঠালেন। তিনি বললেন, ‘অপর পক্ষের বক্তব্য না শুনে আমি হুকুম দিতে পারিনে। তাদেরকে দরবারে হাজির করা হোক।’

বাদশা আশ্রয় গ্রহণকারীদের কাছে প্রশ্ন রাখলেন, ‘এই ধর্মটি কি, যার জন্যে তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তী ধর্ম ত্যাগ করেছ এবং আমার ধর্ম কিংবা অন্য কোন জাতির ধর্ম গ্রহণ করনি?’

আবু তালিবপুত্র, আলীর ভ্রাতা জাফর তাদের মুখপাত্র হিসেবে জবাব দিলেন-

‘হে রাজন! 
আমরা মুর্খতা ও বর্বরতার মধ্যে নিমগ্ন ছিলাম, আমরা মূর্ত্তিপূজা করতাম, ব্যভিচারে লিপ্ত ছিলাম, আমরা মৃত প্রাণীর মাংস খেতাম, আমরা অশ্লীল বাক্য উচ্চারণ করতাম; আমরা মনুষ্যত্বের প্রত্যেকটি অনুভূতি, অতিথি ও প্রতিবেশীদের প্রতি দায়িত্ব একেবারে জলাঞ্জলি দিয়েছিলাম, আমরা ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতির বাইরে কোন আইন জানতাম না।

--এসময়ে আমাদের মধ্যে আল্লাহ এমন একজন মানুষ পাঠালেন যার জন্ম, সত্যবাদিতা, সততা ও বিশুদ্ধতা সম্পর্কে আমরা অবগত ছিলাম; যিনি আল্লাহর একত্বের দিকে আমাদের আহবান জানালেন এবং তাঁর সঙ্গে কোন বস্তুর শরিক স্থাপন না করতে শিক্ষা দিলেন; সত্যকথা বলতে, বিশ্বস্ততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে, দয়ালু হতে এবং প্রতিবেশীর অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে নির্দেশ দিলেন; নারী জাতির বিরুদ্ধে দুর্ণাম না রটাতে, এতিমের ধন আত্মসাৎ না করতে তিনি আদেশ দিলেন; তিনি পাপসমূহ ও অনিষ্ট থেকে দূরে থাকবার জন্যে নামাজ কায়েম করতে, জাকাত দিতে ও রোজা রাখতে আমাদের আদেশ দিয়েছেন। 

--আমরা তার কথায় বিশ্বাস স্থাপন করেছি, তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছি এবং এক আল্লাহর এবাদত ও কোন কিছুর সঙ্গে তাঁর শরিক স্থাপন না করার নির্দেশ মেনে নিয়েছি। এ কারণে আমাদের লোকেরা আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, আমাদের উপর জুলুম করেছে যেন আমরা এক আল্লাহর এবাদত পরিত্যাগ করে কাষ্ঠ, প্রস্তর ও অন্যান্য দ্রব্যের পূজায় পুনঃরায় ফিরে যাই।

 --তারা আমাদের উপর অত্যাচার করেছে, আমাদের ক্ষতিসাধন করেছে। তাদের মধ্যে আমাদের নিরাপত্তার একান্ত অভাব লক্ষ্য করে আমরা আপনার রাজ্যে এসেছি এবং আশা রাখি তাদের অত্যাচার থেকে আপনি আমাদেরকে রক্ষা করবেন।’ 

সম্রাট বিষ্ময় বিমুগ্ধ হলেন, তিনি বললেন, ‘তোমাদের নবী যে প্রত্যাদেশ লাভ করেছেন, তার কোন অংশ আমাকে শুনাতে পার?’ 

জাফর ঈসা ও তার মাতা মরিয়ম সংক্রান্ত আয়াত সুললিত কন্ঠে পাঠ করতে শুরু করলেন- ‘যখন সে (মরিয়ম) তার পরিবারবর্গ হতে পৃথক হয়ে নিরালায় পূর্বদিকে একস্থানে আশ্রয় নিল, অতঃপর ওদের হতে নিজেকে আড়াল করার জন্যে সে পর্দা করল। অতঃপর আমি তার কাছে রূহকে (ফেরেস্তা) পাঠালাম। সে তার কাছে মানবাকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করল। মরিয়ম বলল, ‘তুমি যদি আল্লাহকে ভয় কর, তবে আমি তোমা হতে দয়াময়ের স্মরণ নিচ্ছি।’
সে বলল, ‘আমি তো কেবল তোমার প্রতিপালকের প্রেরিত, তোমাকে এক পবিত্র পুত্র দান করার জন্যে।’ 
মরিয়ম বলল, ‘কেমন করে আমার পুত্র হবে, যখন আমাকে কোন পুরুষ স্পর্শ করেনি এবং আমি ব্যভিচারিণীও নই?’ 
সে বলল, ‘এরূপেই হবে। তোমার প্রতিপালক বলেছেন, এ আমার জন্যে সহজসাধ্য এবং আমি ওকে এ জন্যে সৃষ্টি করব যেন সে হয় মানুষের জন্যে এক নিদর্শণ ও আমার কাছে থেকে এক অনুগ্রহ; এ তো এক স্থিরীকৃত ব্যাপার।’

অতঃপর সে গর্ভে সন্তান ধারণ করল ও তৎসহ এক দূরবর্তী স্থানে চলে গেল। অনন্তর সে প্রসব বেদনায় এক খর্জ্জুর বৃক্ষের দিকে গমন করল, সে বলতে লাগল, ‘হায়! এর পূর্বে যদি আমি মরে যেতাম ও লোকের স্মৃতি হতে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হতাম।’
ফেরেস্তা তার নিম্নপার্শ্ব হতে আহবান করে তাকে বলল, ‘তুমি দুঃখ কোরও না, তোমার পাদদেশে তোমার প্রতিপালক এক নহর সৃষ্টি করেছেন। তুমি তোমার দিকে খর্জ্জুর বৃক্ষের কান্ড নাড়া দাও, তা তোমাকে সুপক্ক তাজা খর্জ্জুর দান করবে। সুতরাং আহার কর, পান কর ও চক্ষু জুড়াও। মানুষের মধ্যে যদি কাউকে দেখ, তখন বোলও, আমি দয়াময়ের উদ্দেশ্যে মৌনতা অবলম্বনের মানত করেছি, সেজন্যে আমি কোন মানুষের সাথে কথা বলব না। 

অতঃপর সে সন্তানকে নিয়ে তার সম্প্রদায়ের কাছে হাজির হল। ওরা বলল, ‘হে মরিয়ম! তুমি তো এক অদ্ভূতকান্ড করে বসেছ। হে হারুনের ভগ্নি! তোমার পিতা অসৎ ব্যক্তি ছিল না, তোমার মাতাও ব্যভিচারিণী ছিল না।’
অতঃপর মরিয়ম ইঙ্গিতে সন্তানকে দেখাল। ওরা বলল, ‘যে দোলনার শিশু তার সাথে আমরা কেমন করে কথা বলব?’
সে (ঈসা) বলল, ‘আমি তো আল্লাহর দাস। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন, আমাকে নবী করেছেন। আমি যেখানেই থাকি না কেন, তিনি আমাকে আশীষভাজন করেছেন, তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যতদিন জীবিত থাকি ততদিন নামাজ ও যাকাত আদায় করতে ও মায়ের প্রতি অনুগত থাকতে এবং তিনি আমাকে উদ্ধত ও হতভাগ্য করেননি। আমার প্রতি শান্তি ছিল, যেদিন আমি জন্মলাভ করেছি ও শান্তি থাকবে যেদিন আমার মৃত্যু হবে ও যেদিন জীবিত অবস্থায় আমি পুনরুত্থিত হব।’ 
এ-ই মরিয়ম তনয় ঈসা।(১৯:১৬-৩৪)

সম্রাট মুগ্ধকন্ঠে বললেন, ‘খ্রীষ্টের বাণী যেখান থেকে এসেছে, এই বাণীও সেখান থেকে এসেছে। কুরাইশ দূতেরা তোমরা চলে যাও, তোমাদের প্রার্থনা না-মঞ্জুর।’

প্রতিনিধিরা সেদিনকার মত রাজসভা পরিত্যাগ করে চলে এলেও পরদিন পুনঃরায় দরবারে হাযির হয়ে বললেন, ‘হে সম্রাট! এই নুতন ধর্মাবলম্বীরা খ্রীষ্ট সম্বন্ধে অত্যন্ত জঘণ্য ধারণা পোষণ করে, তারা তাকে ঈশ্বরপুত্র বলে স্বীকার করে না।’ 

পুনঃরায় মুসলমানদের ডেকে পাঠান হল। নির্ভীক চিত্তে জাফর বললেন, ‘হে সম্রাট! আমাদের পয়গম্বর যিশুখ্রীষ্ট সম্বন্ধে যা শিক্ষা দিয়েছেন আমরা তাই বিশ্বাস করি। তিনি বলেছেন- ‘হে কিতাবধারীরা! তোমরা তোমাদের ধর্ম সম্পর্কে বাড়াবাড়ি কোরও না ও আল্লাহ সম্বন্ধে সত্য বল। মরিয়ম পুত্র ঈসা মসীহ আল্লাহর রসূল আর তাঁর বাণী ও তাঁর রূহ যা তিনি মরিয়মের কাছে পাঠিয়েছিলেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তার রসূলে বিশ্বাস কর আর বোলও না তিন (আল্লাহ)। 

তোমরা নিবৃত্ত হও এ তোমাদের জন্যে কল্যাণকর। আল্লাহই তো একমাত্র উপাস্য। তাঁর সন্তান হবে? তিনি এর অনেক উর্দ্ধে। আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সব আল্লাহরই। কর্মবিধায়ক হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট। মসীহ আল্লাহর দাস হওয়াকে হেয় জ্ঞান করেনি, আর কাছের ফেরেস্তাও নয়। যারা তাঁর উপাসনা করতে লজ্জা বা অহংকারবোধ করে তাদের সকলকে তিনি তাঁর কাছে একত্র করবেন।(৪:১৭১-১৭২)
কারও পক্ষে এই কাজটা মোটেই সম্ভব নয়, আল্লাহ তাকে কিতাব, বিধান ও নব্যুয়ত দান করবেন আর সে মানব সমাজকে বলবে, ‘তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে আমার বান্দারূপে গণ্য হও। বরং তারা বলবে, ‘তোমরা আল্লাহর বান্দা বনে যাও। কারণ, তোমরা কিতাব শেখাচ্ছ আর তা নিজেরাও যে পড়ছ।’(৩:৭৯)

যারা বলে, ‘আল্লাহই মরিয়ম পুত্র মসীহ, তারা নিঃসন্দেহে অবিশ্বাসী। অথচ মসীহ বলেছিল, ‘হে বনি ইস্রায়েল! তোমরা আমার প্রতিপালক ও তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহর উপাসনা কর।’ অবশ্য যে কেউ আল্লাহর অংশী করবে নিশ্চয় আল্লাহ তার জন্যে জান্নাত নিষিদ্ধ করবেন ও আগুনে হবে তার বাসস্থান। আর অত্যাচারীকে কেউ সাহায্য করবে না।’ যারা বলে, ‘আল্লাহ তো তিনের মধ্যে একজন’, তারা নিশ্চয় অবিশ্বাসী। 

এক উপাস্য ভিন্ন অন্যকোন উপাস্য নেই। তারা যা বলে তা থেকে নিবৃত্ত না হলে তাদের মধ্যে যারা অবিশ্বাস করেছে তাদের উপর অবশ্যই নিদারুণ শাস্তি নেমে আসবে। তবে কি তারা আল্লাহর দিকে ফিরবে না ও তাঁর কাছে ক্ষমা চাইবে না? আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। মরিয়ম পুত্র মসীহ তো কেবল একজন রসূল, তার পূর্বে কত রসূল গত হয়েছে আর তার মাতা সতী ছিল। তারা দু’জনেই খাওয়া দাওয়া করত। দেখ, ওদের জন্যে আমি আয়াত কিরূপ পরিস্কার করে বর্ণনা করি। আরও দেখ, ওরা কিভাবে সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।’(৫:৭২-৭৫)

নাজ্জাসী বললেন, ‘শুনে সুখী হলাম যে আমাদের ধর্মে ও তোমাদের ধর্মে বিশেষ কোন পার্থক্য নেই। তোমরা নির্বিঘ্নে এখানে বাস করতে থাক, তোমাদের কোন ভয় নেই। পর্বত পরিমান স্বর্ণের বিনিময়েও আমি তোমাদেরকে কারও হাতে তুলে দেব না।’ 

কুরাইশদের দাবী বাদশা প্রত্যাখ্যান করলেন এবং প্রতিনিধি দলের শেষ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে তারা বিভ্রান্ত হয়ে মক্কায় ফিরে এলেন।

সমাপ্ত।
ছবি: Wikipedia, aksumabyssinians.

৭ মার্চ, ২০১২

Muhammad: মুহম্মদ তার প্রভু কর্তৃক তিরস্কৃত হলেন।


মুহম্মদের ব্যক্তিত্বের বিনয় নম্রতা, আত্মার মহত্ত্ব ও হৃদয়ের পবিত্রতা, চরিত্রের তপশ্চর্যা, অনুভূতির সূক্ষ্মতা ও কোমলতা এবং কঠোর কর্তব্যপরায়ণতা, যা তাকে আল-আমিন উপাধিতে বিভূষিত করেছিল তা সমন্বিত হয়েছিল তার আত্মসমীক্ষার কঠোর বোধের সঙ্গে- যা ছিল তার চরিত্রের বিশিষ্টতা। একবার তিনি মক্কার কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে ধর্ম বিষয়ে কথাবার্তা বলছিলেন, তখন একজন অন্ধ, বিনয়ী বিশ্বাসীকে তার সঙ্গদান থেকে বিমুখ করেছিলেন। তিনি সর্বদা অনুশোচনার সঙ্গে এ ঘটনার পুনরুল্লেখ করতেন এবং এ ব্যাপারে আল্লাহর অনুমোদনের কথা ঘোষণা করতেন।

বর্ণিত অন্ধ ব্যক্তিটি ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে মকতুম। তিনি অন্ধ হওয়ার কারণে এটা জানতে পারেননি যে, মুহম্মদ (Muhammad) অন্যের সাথে আলোচনায় রত রয়েছেন। তিনি মসজিদে প্রবেশ করেই তাকে কোরআনের একটি আয়াতের পাঠ জিজ্ঞেস করেন এবং কয়েকবার আওয়াজ দেন।

মুহম্মদ কুরাইশ নেতৃবর্গকে উপদেশ দিচ্ছিলেন। এই নেতৃবর্গ ছিলেন ওতবা ইবনে রাবিয়া, আবু জেহেল ইবনে হাশেম ও তার পিতৃব্য আব্বাস। মুহম্মদের বিরক্তির কারণ ছিল প্রথমতঃ আব্দুল্লাহর প্রশ্নটি ছিল মামুলি, আর তিনি তার এই মামুলি প্রশ্নের তাৎক্ষণিক জবাবের জন্যে পীড়াপীড়ি করছিলেন। তিনি সাচ্চা মুসলমান ছিলেন এবং সদাসর্বদা মজলিসে উপস্থিত থাকতেন। সুতরাং তার এ প্রশ্ন অন্যসময়ও রাখতে পারতেন।

অতঃপর এই আয়াত নাযিল হল- ‘সে (মুহম্মদ) বিরক্ত হল, মুখ ফিরিয়ে নিল, কারণ তার কাছে এক অন্ধ এসেছিল। তুমি ওর সম্বন্ধে কি জান? সে হয়তঃ পরিশুদ্ধ হত বা উপদেশ নিত ও উপদেশ থেকে উপকার পেত। যে নিজেকে পরিশুদ্ধ না করে, তবে তাতে তোমার কোন দোষ হত না। অথচ যে কিনা তোমার কাছে ছুটে এল, আর এল ভয়ে ভয়ে, তাকে তুমি অবজ্ঞা করলে, কখনও (তুমি এমন করবে) না এ এক উপদেশবাণী।(৮০:১-১১)

অতঃপর যখনই মুহম্মদ ঐ ব্যক্তিকে দেখতে পেতেন তখনি তাকে সম্মান দেখানোর জন্যে কাজ ফেলে এগিয়ে যেতেন এবং বলতেন, ‘সেই ব্যক্তিকে বারবার অভিনন্দন যার জন্যে প্রভু আমাকে তিরস্কার করেছেন।’ 

এই অন্ধ ব্যক্তিকে মুহম্মদ দু‘বার মদিনার গভর্ণর করেছিলেন।

সমাপ্ত।

৪ মার্চ, ২০১২

Hateb ibn Abi Baltaya: গায়িকা সারা ও আবী বালতায়ার কাহিনী।



মুহম্মদ যখন পৌত্তলিক কুরাইশ ও তাদের মিত্র বনি বকরদের বিরুদ্ধে খুবই গোপনে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, সেইসময় সারা নাম্নী এক গায়িকা মদিনায় আগমন করল। তাকে মুহম্মদের কাছে হাযির করা হলে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি হিযরত করে মদিনায় এসেছ?’
সে বলল, ‘না।’
তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তবে কি তুমি মুসলমান হয়ে এসেছ?’
সে এবারও বলল, ‘না।’
তিনি বললেন, ‘তাহলে কি উদ্দেশ্যে আগমন করেছ?’

সে বলল, ‘আপনারা মক্কায় সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোক ছিলেন। আপনাদের মধ্যে থেকে আমি জীবিকা নির্বাহ করতাম। কিন্তু আপনারা এখানে চলে এলেন, তারপর মক্কার বড় বড় সর্দাররা বদর যুদ্ধে নিহত হল, ফলে আমার জীবিকা নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়েছে। আমি ঘোর বিপদে পড়ে ও অভাবগ্রস্থ হয়ে এখানে আপনাদের কাছে এসেছি।’

মুহম্মদ বললেন, ‘তুমি মক্কার পেশাদার গায়িকা। সেই যুবকেরা কোথায় গেল, যারা তোমার গানে মুগ্ধ হয়ে টাকা-পয়সা বৃষ্টির মত বর্ষণ করত?’
সে বলল, ‘বদর যুদ্ধের পর মক্কার উৎসবপর্ব ও গান-বাজনার জৌলুস খতম হয়ে গেছে। এ পর্যন্ত আমি কোন আমন্ত্রণ পাইনি।’

মুহম্মদ আব্দুল মুত্তালিব বংশের লোকদেরকে তাকে সাহায্য করার জন্যে অনুরোধ করলেন। তারা তাকে নগত অর্থ ও পোষাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি দিয়ে বিদায় দিল।

মদিনাতে সর্বপ্রথম হিজরতকারীদের মধ্যে একজন ছিলেন হাতেব ইবনে আবী বালতায়া (Hateb ibn Abi Baltaya)। তিনি ছিলেন ইয়েমেনী বংশোদ্ভূত, পরবর্তীতে মক্কায় এসে বসবাস শুরু করেছিলেন। মক্কায় তার স্বগোত্রের কেউ ছিল না। তার পরিবার যখন মুসলমান হয়, তখন পরিবারের মধ্যে কেবল তিনিই মদিনায় হিযরত করেন এবং তার স্ত্রী ও সন্তানেরা মক্কায় রয়ে গিয়েছিল। 

মুহম্মদের হিযরতের পর পৌত্তলিক কুরাইশরা মক্কায় বসবাসকারী অবশিষ্ট মুসলমানদের নানাভাবে উত্যক্ত ও নির্যাতন করত। হিযরতকারীদের যাদের সন্তানেরা মক্কায় ছিল তারা তাদের আত্মীয়-স্বজনের কারণে কিছুটা নিরাপদ ছিল। কিন্তু হাতেব যখন দেখতে পেলেন তার সন্তান-সন্তুতিদের শত্রুর নির্যাতন থেকে রক্ষা করার মত কেউ নেই, তখন তিনি ভাবলেন মক্কাবাসীদের প্রতি কিছুটা অনুগ্রহ প্রদর্শণ করলে হয়তঃ তার সন্তানদের প্রতি জুলুম বন্ধ হবে। আর এসময় গায়িকা সারার মক্কায় ফেরৎ যাত্রাকে তিনি একটি সুবর্ণ সুযোগ মনে করলেন।

হাতেব মুনাফেক ছিলেন না। তিনি নিশ্চিত বিশ্বাসী ছিলেন যে, মুহম্মদকে আল্লাহ বিজয় দান করবেন। এই তথ্য ফাঁস হলে তার কিম্বা ইসলামের কোন ক্ষতি হবে না। তাই তিনি যুদ্ধের তথ্য ফাঁস করে দিয়ে মক্কাবাসীদের নামে একটি পত্র লিখে সারার হাতে সোপর্দ করলেন। 

এদিকে মুহম্মদ জিব্রাইলের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারলেন। তখন তিনি আলী, আবু মুরসাদ ও যুবায়ের ইবনে আওয়ামকে তার পশ্চাৎধাবনের নির্দেশ দিলেন। এই দল তাকে ‘রওযায়ে খাক’ নামক স্থানে উটে সওয়ার অবস্থায় গমনরত দেখতে পেয়ে আটক করলেন। অতঃপর তাকে বলা হল- ‘তোমার কাছে যে পত্র রয়েছে তা বের কর।’
সে বলল, ‘আমার কাছে কারও কোন পত্র নেই।’

তারা তার উটকে বসিয়ে দিলেন। এরপর তার মালামাল তল্লাসী করলেন। কিন্তু কোন পত্র মিলল না। এই দলের প্রত্যেকে নিশ্চিত ছিলেন মুহম্মদের সংবাদ কখনও ভ্রান্ত হতে পারে না। তাই তারা তাকে ভীতি প্রদর্শণ করলেন, বললেন, ‘হয় পত্র বের কর, নতুবা পত্রের খোঁজে আমরা হয়তঃ তোমাকে বিবস্ত্র করে ফেলব।’
তখন সে পায়জামার ভিতর থেকে পত্রটি বের করে দিল। আর আলী বাহিনী পত্রসহ মহিলাকে নিয়ে মদিনায় ফিরে এলেন।

পুরো ঘটনা জানতে পেরে ওমর ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে মুহম্মদকে বললেন, ‘এই ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর রসূল ও সকল মুসলমানের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। সুতরাং অনুমতি দিন আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেই।’
মুহম্মদ বললেন, ‘সে কি বদর যোদ্ধাদের একজন নয়? আল্লাহ বদর যোদ্ধাদেরকে ক্ষমা করার ও জান্নাতের ঘোষণা দিয়েছেন।’

হাতেবকে ডেকে আনা হল। মুহম্মদ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওহে হাতেব, কিসে তোমাকে উদ্বুদ্ধ করল এ কাজ করতে?’
তিনি বললেন, ‘ইয়া রসূলুল্লাহ! আমি আমার সন্তানদের নিরাপত্তার কথা ভেবেই একাজ করেছি। আমি ব্যতিত অন্য কোন মোজাহির এমন নেই যার স্বগোত্রের লোক মক্কায় বিদ্যমান নেই। আমি ভেবেছিলাম মক্কাবাসীদের প্রতি একটু অনুগ্রহ করলে তারা হয়তঃ আমার সন্তান-সন্তুতিদের কোন ক্ষতি করবে না। তবে আমি এই কাজ ইসলাম ও মুসলমানদের ক্ষতি করার জন্যে করিনি। আমার তখনও দৃঢ়বিশ্বাস ছিল এবং এখনও আছে যে, বিজয় আপনার নিশ্চিত, মক্কাবাসীরা জেনে গেলেও তাতে কোন ক্ষতি হবে না।’

সব শুনে মুহম্মদ উপস্থিত সকলকে বললেন, ‘হাতেব সত্য বলেছে। অতএব তার ব্যাপারে তোমরা ভাল ছাড়া মন্দ বোলও না।’
ওমর বললেন, ‘আল্লাহ ও তাঁর রসূলই সত্য জানেন।’

অতঃপর হাতেব ও মুসলমানদের প্রতি উপদেশ সমম্বলিত কোরআনের এই আয়াতসমূহ নাযিল হল-‘মুমিনেরা, তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধুরূপে গ্রহণ কোরও না। তোমরা তো তাদের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও, অথচ তারা, যে সত্য তোমাদের কাছে আগমন করেছে, তা অস্বীকার করেছে। তারা রসূলকে ও তোমাদেরকে বহিস্কার করে এই অপরাধে যে, তোমরা তোমাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস রাখ। যদি তোমরা আমার সন্তুষ্টি লাভের জন্যে এবং আমার পথে জেহাদ করার জন্যে বের হয়ে থাক, তবে কেন তাদের প্রতি গোপনে বন্ধুত্বের পয়গাম প্রেরণ করছ? 

তোমরা যা গোপন কর এবং যা প্রকাশ কর, তা আমি খুব জানি। তোমাদের মধ্যে যে এটা করে, সে সরলপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। তোমাদেরকে করতলগত করতে পারলে তারা তোমাদের শত্রু হয়ে যাবে এবং মন্দ উদ্দেশ্যে তোমাদের প্রতি বাহু ও রসনা প্রসারিত করবে এবং চাইবে যে, কোনরূপে তোমরাও অবিশ্বাসী হয়ে যাও। তোমাদের স্বজন- পরিজন ও সন্তান-সন্তুতি কেয়ামতের দিন কোন উপকারে আসবে না। তিনি তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করবেন। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা দেখেন।’(৬০:১-৩)

সমাপ্ত।

Moses: কোরাণিক ক্যানভাসে নবী মূসা।

Abu Hena Mostafa Kamal  01 May, 2017 মি সরের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ফেরাউন। হঠাৎ করে তিনি মৃত্যুবরণ করলেন। কিন্তু তিনি কোন উত্তরাধিকারী ন...