কোরআন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কোরআন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

১৮ ডিসেম্বর, ২০১২

Sinner: পাপীষ্ঠ ও অবিশ্বাসীরা কেন ঐশী রোষানলে পড়ে না।


সাধারণ মানুষ চিরকাল বলে এসেছে, ন্যায় এবং ধর্মের পথ সম্মানের বটে কিন্তু তা কঠিন এবং বিপদসঙ্কূল। কিন্তু অন্যায় এবং পাপের পথে সুখ এবং সম্ভোগ সহজেই লাভ করা যায়। রাষ্ট্রীয় বিধানের কিছু ধমক আর সাধারণ মানুষের কিছু নিন্দাবাদ ব্যতিত অন্যায় এবং পাপের পক্ষে ভয় করার কিছু নেই। মানুষ একথাও জানে এবং তারা বলেও এসেছে যে, সততার পথে লাভের আশা কম, অসততাতেই লাভ। অসৎকে মানুষ সুখী বলেছে। তাকে তারা তাদের সম্পদ ও শক্তির জন্যে প্রকাশ্যে কিম্বা গোপনেও সম্মান করেছে। দুর্বল ও দরিদ্রকে তারা অবজ্ঞা করেছে। কিন্তু তথাপি এ কথাও সত্য যে, মানুষ অসৎকে কখনও ভাল এবং সৎকে মন্দ বলেনি।

কিন্তু ন্যায় এবং অন্যায়ের বিচারে কিছু মানুষের ধারণা বেশ অদ্ভূত। খোদার সম্বন্ধে তারা বলেঃ খোদার রীতিনীতি বড়ই আশ্চর্যজনক। তিনিই ভাগ্য-নিয়ন্তা-আর তাই যারা সৎ এবং ধর্ম পরায়ণ তাদের ভাগ্যে তিনি বন্টন করেন দু:খ এবং দুর্দশা; কিন্তু যারা অসৎ তাদেরকে তিনি আশীর্বাদ করেন সুখ এবং আনন্দ দিয়ে।

আবার দেবতায় বিশ্বাসী মানুষেরা বলে: -ভিক্ষু বেশে দেবতা হাজির হন ধনীর দরজায়, আর অভয় দিয়ে বলেন, কোন পাপেই তাদের দুশ্চিন্তার কোন কারণ নেই। কেননা দেবতারা ধনীর নিজের কিম্বা তাদের পিতৃ-পিতামহের পাপের প্রায়শ্চিত্তের ব্যবস্থা করে দেবেন। কেবল কিছু খরচ করলেই তাদের চলবে। দেবতাদের নামে উৎসর্গ করুক তার সম্পদের কিছু কিম্বা দিয়ে দিক একটা ভোজ, তাহলেই তাদের পাপের মার্জনা হয়ে যাবে। বলুক তারা তাদের শত্রু কে? হোক না সে শত্রু ন্যায়পরায়ণ। ধনীর আব্দারে সেই ন্যায়পরায়ণকে অচিরে ধ্বংস করে দেবে দেবতা তার বরপুত্র ধনীর স্বার্থে। মন্ত্র পড়ে তারা প্রেতযোনীকে আটকে দিতে পারে, পারে তারা যেমন ইচ্ছে তেমনি করে তাদের দ্বারা কার্য সাধন করতে। এ ব্যাপারে কবিদের তারা সাক্ষী মানে-

পাপের প্রাচুর্য লাভে আমাদের শঙ্কার কোন কারণ নেই,
ওর সড়ক যেমন স্বচ্ছন্দ, ওর মঞ্জিল তেমনি সন্নিকট
এসো, সত্যের পথকে আমরা পরিহার করি,
ও পথে দেবতারা সঙ্কটের কাঁটাজাল বিস্তার করে দিয়েছে।
আর সে সড়কের চড়াই বড় খাড়া।----------- হিসিয়ড।

তারা কবি হোমারের উল্লেখ করেও দেখিয়ে দেয়, কিভাবে মানুষ সহজেই দেবতাদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে এবং কিভাবে সহজেই দেবতারা তাদের আদর্শ থেকে বিচ্যূত হয়ে পড়েন-

দেবতাদের বিচ্যুতির পথে টেনে নামানো এমন কোন শক্ত ব্যাপার নয়;
মানুষ যদি কিছু পাপ করে থাকে আর দেবতা হয়ে থাকেন ক্রোধান্বিত,
তাহলে একটু প্রার্থনা, কিছু শূরার উপঢৌকন, আর ভাজা চর্বির লোভনীয় গন্ধ
এটাই হবে যথেষ্ট সেই দেবতার ক্রোধকে প্রশমিত করতে।----------- হোমার: ইলিয়াদ।

এই ভিক্ষুর দল বহু কিতাবের উল্লেখও করেন। তাদের মতে চন্দ্র এবং মিউজের যারা সন্তান, সেই মিউজিয়াস এবং অর্ফিয়ূস লিখিত গ্রন্থেও এ কথার সাক্ষ্য রয়েছে। আর এই সমস্ত কিতাবে বর্ণিত ক্রিয়া-প্রক্রিয়ার মহড়া দিয়ে এরা ব্যক্তিমাত্রকে নয়, সমস্ত নগরবাসীকে একথা বিশ্বাস করায় যে, যজ্ঞ, ভোজ আর বিসর্জনের হুল্লোড় দ্বারাই মৃত কিম্বা জীবিত সবারই পাপের প্রায়শ্চিত্ত তারা করে দিতে পারেন। এভাবেই তারা যাগ-যজ্ঞ ও যাদু দ্বারা নরকের যন্ত্রণা থেকে আমাদের রেহাই দেবার প্রতিশ্রুতি দেন। তাদের প্রতিশ্রুতিকে আমাদের অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে, কারণ তাদের অবজ্ঞা করলে আমাদের জন্যে চরম পরিণতি যে অপেক্ষা করছে- এ কথা বলতে তারা ভুলেন না।

ন্যায় ও অন্যায়ের এই চিত্র এবং অন্যায় সম্পর্কে মানুষ, খোদা বা দেবতাদের বিচার প্রণালীর কথা তরুণদের মনে যখন জাগে, তখন তাদের চিন্তা কোন দিকে ধাবিত হবে? তরুণদের মধ্যে যাদের বুদ্ধি তীক্ষ্ণ এবং বাতাসে ভেসে চলা মধুকরের ন্যায় পুষ্প থেকে পুষ্পে মধু আহরণ করার মেজাজ, তারা ন্যায় অন্যায়ের এই বোধ থেকে জীবনের কোন আদর্শকে নির্বাচিত করবে? জীবনের সর্বোত্তম ভোগকেই তারা তাদের চরম আদর্শ বলে বিবেচনা করবে, নয় কি?

একথা বলা এ কারণে যে, মানুষ মনে করে, সত্যিকারভাবে সৎ হয়েও সৎ বলে প্রচারিত না হলে সততার কোন লাভ নেই। এমন ক্ষেত্রে সৎ এর ভাগ্যে নিশ্চিতভাবে জুটবে দু;খ, কষ্ট এবং লাঞ্ছনা। অপরদিকে অসৎ হয়েও সৎ বলে পরিচিত হতে পারলে স্বর্গসুখ প্রাপ্তি অনিবার্য। কাজেই সত্যের চেয়ে অসত্যের মাহাত্ম্য যখন অধিক এবং অসত্যই যখন সুখ লাভের উত্তম মাধ্যম, তখন অসত্যের ধ্যানকেই জীবনের লক্ষ্য বলে স্থির করাকে মানুষ শ্রেয় বলে গণ্য করে। কারণ, সে মনে করে সুখ লাভের পথ হচ্ছে নিজের চারিদিকে ন্যায়ের একটি আবরণ তৈরী করা এবং সেই আবরণের আড়ালে ধূর্ত শেয়ালের ন্যায় নিজের স্বার্থ সাধনের জন্যে ওঁৎ পেতে অপেক্ষা করা। অবশ্য ধূর্ততা ঢেকে রাখা বেশ কঠিন।

এভাবে বুদ্ধির কৌশল এবং শক্তির জোরে স্বার্থ সাধন করা এবং দন্ডভোগ থেকে রেহাই পাওয়া খুব অসম্ভব কিছু না। কিন্তু কথা উঠবে, মানুষকে প্রতারিত করা সম্ভব হলেও খোদা বা দেবতাকে প্রতারিত করা সম্ভব নয়। তাদের উপর শক্তি প্রয়োগও অসম্ভব। এর জবাব এই যে, দেবতা থাকলে তো দেবতার ভয়! আর থাকলেও মানুষের জন্যে দেবতাদের ভাবনার গরজই বা কি? আর যদি তাদের শির:পীড়ারও কিছু থাকে তবুও চিন্তার কোন কারণ নেই। কেননা দেবতাদের কথা আমরা পুরাকাহিনী এবং কবিদের কাছ থেকেই পেয়েছি। আর তারা বলেছেনঃ বলিদান, প্রশংসামূলক অর্চণা এবং উপঢৌকন দেবতাদের ঠিক রাখার জন্যে যথেষ্ট।

উপরের আলোচনা থেকে আমরা দেখলাম অন্যায়ের পথই হচ্ছে উত্তম পথ, লাভের পথ। সততার লাভ কেবল পরকালের দন্ড থেকে রেহাই পাওয়া। কিন্তু অন্যায়ের লাভ থেকে আমরা সততার কারণে বঞ্চিত হতে বাধ্য। অন্যদিকে অসৎ হলে একদিকে যেমন আমরা জীবনের কোন উপভোগ থেকে বঞ্চিত হব না, তেমনি কবিদের কথা সত্য হলে, প্রার্থনা এবং প্রতারণায় দেবতাকূলকেও খুশী করা আমাদের অসম্ভব হবে না। অবশ্য কাপুরুষ বলতে পারে, নরকের কথাও আমাদের ভাবতে হবে। সেখানে অন্যায়ের প্রতিফল আমাদের কিম্বা আমাদের বংশধরদের ভোগ করতে হবে। এর উত্তর হচ্ছে, প্রায়শ্চিত্তের দেবতার অভাব নেই সেখানেও। এরূপ দেবতাদের শক্তিও কম নয়।

সুতরাং মানুষ কেন চরম অন্যায়ের বদলে ন্যায়কে জীবনের আদর্শ বলে গ্রহণ করবে? ন্যায়ের কিছু আবরণ সৃষ্টি করতে সক্ষম হলেই অন্যায় পথে দেবতা এবং মানুষ উভয়কেই আমরা জয় করতে পারি-ইহকাল এবং পরকাল উভয়ের সুখ আমরা নিজেদের জন্যে নিশ্চিত করতে পারি।

মানুষ ন্যায়বান কিম্বা সৎ কি নিজের ইচ্ছা সহকারে হয়? অবশ্য প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত কোন ব্যক্তি বা যথার্থ সত্যের জ্ঞানে জ্ঞানীর কথা আলাদা। আসলে কাপুরুষ, বৃদ্ধ এবং দুর্বল- অর্থাৎ অন্যায়ের পথ অবলম্বণে যারা অক্ষম তারাই অন্যায়ের বিরুদ্ধাচারণ করে এবং ন্যায়ের কথা বলে।

এখন কেউ যদি বলে অন্যায়ের চেয়ে ন্যায় উত্তম, তবে পরিফলের দিক থেকে তাকে একথাও বলতে হবে, কি কারণে সে একটিকে পূণ্য এবং অপরটিকে পাপ বলে বিবেচনা করছে। তবে এখানে খ্যাতির প্রশ্নটি বাদ দিতে হবে এবং ন্যায় অন্যায়ের নিজস্ব সার্থকতার ভিত্তিতে বিচার করতে হবে। কারণ তা না করলে অন্যায়কে অন্ধকারের আড়ালে রাখা হবে। আর তাতে ন্যায় বলতে বোঝাবে অপরের স্বার্থ সাধন আর অন্যায় হবে দুর্বলকে আঘাত করে সবলের নিজের স্বার্থোদ্ধার।

কিমেরা।
'অন্যায় যদি ন্যায় বলে প্রতিভাত হতে পারে, তাহলে অন্যায়ীর সব অন্যায় হচ্ছে লাভজনক।'- উপরের আলোচনা থেকে আপাত: দৃষ্টিতে এই বাক্যটি সত্য বলে প্রতিভাত হলেও প্রকৃতপক্ষে কি তাই? আমরা মানুষের চরিত্রকে পুরোন উপাখ্যানের জন্তু যেমন- কিমেরা, সিলা, সর্বিয়াসের সঙ্গে তুলনা করে উপরের উক্তির তাৎপর্যটি দেখি।

কিমেরা (Chimaera):ছাগ, সিংহ এবং সর্প-তিন জন্তুর দেহ বিশিষ্ট বিকটাকার দানব। গ্রীক উপাখ্যানে আছে কোরিন্থের রাজপুত্র বেলারোফন এই দানবকে তার পক্ষ যুক্ত অশ্ব দ্বারা হত্যা করে।
সিলা (Seylla):সামুদ্রিক দানব।
সার্বিয়াস (Cerberus):তিনটি কিম্বা পঞ্চাশটি মুন্ডু বিশিষ্ট পাতালপুরীর দেবতা হেডিসের প্রহরী কুকুর।

সিলা।
বেশ জটিল বহু মাথা বিশিষ্ট একটা জন্তু কল্পণা করি। এ জন্তুর যেমন বুনো মাথা আছে, তেমনি পোষা মাথা আছে। জন্তুটার মস্তকদেশ এইগুলি দিয়ে গঠিত। আর তার কি অদ্ভূত ক্ষমতা যে, সে ইচ্ছামত এগুলোকে হিংস্র কিম্বা বাধ্য স্বভাবে পরিণত করে ফেলতে পারে।

এবার একটা সিংহের কল্পণা করি। সিংহের পরে একজন মানুষকে কল্পণা করি। বহুমাথা জন্তুর আকৃতি অবশ্যই প্রকান্ড। তারপরেই সিংহের আকার। এবার তিন জন্তুকে মিলিয়ে একটা জন্তুতে পরিণত করি। এবার এই গোটা জন্তুর উপর তিন জন্তুর এক জন্তুর, ধরি, মানুষের বহিরাকার বসিয়ে দেই- যেন যে দর্শকের পক্ষে বহিরাকার ভেদ করা সম্ভব হবে না, সে যেন একে মানুষ বলেই গণ্য করে।

সার্বিয়াস।
এবার তাহলে আমরা বলব, অন্যায় সাধনে লাভ এবং ন্যায় সাধনে লোকসান- এমন অভিমতের অর্থ দাঁড়ায় এই বহু মাথা জন্তুকে যেমন ইচ্ছে তেমন করার স্বাধীনতা দেয়া এবং এই জন্তুর এবং সিংহের চরিত্রকে শক্তিশালী করা, আর এর ভিতরের মানুষটিকে বুভূক্ষ ও অসহায় করে রাখা, যাতে পরিণামে এই জন্তুর দল দুর্বল মানুষটাকে নিয়ে যেমন খুশী তেমন করতে পারে। এ কথার অর্থ দাঁড়াবে, এই তিন শক্তির মধ্যে কোন আপোষ বা মিত্রতা স্থাপন না করা; বরং তাদের পরস্পরকে দ্বন্দ্বমান, গর্জনকারী এবং পরস্পরকে ভক্ষণকারী অবস্থায় রেখে দেয়া।

অপরদিকে ন্যায় সাধনেই লাভ- এ কথা বলার অর্থ হচ্ছে আমাদের সকল কথা এবং কাজ এমন হওয়া উচিৎ যাতে আমাদের অন্তরের মানুষটি শক্তিশালী হতে পারে, যেন সে বহু মাথা জন্তুটার দিকে কৃষকের ন্যায় সতর্ক দৃষ্টি রাখতে পারে। কৃষক দেখবে, আমাদের অন্তরের পোষা স্বভাবগুলি উৎসাহিত হতে পারে, যেন বন্য স্বভাবের বৃদ্ধি না ঘটে। সিংহকে বশ করে তার শক্তিকে সে সহায় করবে এবং সকলের স্বার্থ রক্ষার্থে তার নিজের সঙ্গে অপর দুই বন্য শক্তির এবং দুই বন্য শক্তির পরস্পরের মধ্যে আপোষ স্থাপন করবে।

সুতরাং সকলদিক আলোচনার পর আমরা জানলাম-অন্যায়ের চেয়ে ন্যায় উত্তম। কারণ, ন্যায় এবং উত্তমতা পরিফলে মানুষের জন্যে এই লোকে এবং পরলোকে আশীর্বাদ বা পুরস্কার বয়ে আনে এবং অন্যায় ও অধমতা পরিফলে বয়ে অনে অপমান ও শাস্তি। তাছাড়া খোদার নিকট ন্যায় এবং অন্যায়ের যথার্থ চরিত্র অপরিজ্ঞাত নয়। খোদা ন্যায় এবং অন্যায়ের যথার্থ চরিত্রকে জানে এবং এরা উভয়ে যদি তাঁর পরিচিত হয় তবে এদের একজন তাঁর মিত্র এবং অপরজন তাঁর শত্রু বলে বিবেচিত হবে এবং খোদার নিকট থেকে তাঁর মিত্র যা কিছু উত্তম তাই লাভ করবে। এর একমাত্র ব্যতিক্রম হতে পারে অতীতে কৃত কোন অপরাধের দন্ডের ক্ষেত্রে।

সুতরাং ন্যায়বান যদি দরিদ্র হয়, যদি সে অসুস্থ্য হয় কিম্বা অনুরূপ অপর কোন দুর্ভাগ্য দ্বারা যদি সে আক্রান্ত হয়, তাহলে এরূপ দুর্ভাগ্য তার এই জীবন কিম্বা পরজীবনের মঙ্গলেরই উৎস। কারণ, যে মানুষ ন্যায়কে বরণ করেছে এবং ন্যায়ের অনুসরণে যে মানুষ মানুষের সাধ্যমত ফেরেস্তায় পরিণত হওয়ার চেষ্টা করেছে, সে মানুষকে খোদা কোনক্রমেই অবজ্ঞা করতে পারেন না। অপরদিকে যে অন্যায়কারী তার ক্ষেত্রে এর বিপরীতটাই সত্য।

তবে অন্যায়কারীর জন্যে পরকালে শাস্তি নিশ্চিত হলেও এইলোকে সব সময়ে যে সে শাস্তির আওতায় আসবে এমন নয়। কেন নয়, তা জানতে আমরা আসমানী কিতাব এবং রসূলগণের বক্তব্যের প্রতি নজর দেব। প্রথমে আমরা নজর দেব ঈসা মসিহের বক্তব্যে-

প্রথমত: ঈসা সমবেত লোকদেরকে বললেন, ‘একজন লোক জমি চাষ করে সেখানে উৎকৃষ্ট গমের বীজ বুনলেন। এরপর সেই লোকের শত্রু এসে ঐ জমিতে শ্যামা ঘাসের বীজ বুনে চলে গেল। ফলে গমের চারা যখন বেড়ে উঠে ফল ধরল, তখন তার মধ্যে শ্যামা ঘাসও দেখা গেল। তা দেখে বাড়ীর গোলামেরা এসে মনিবকে বলল, ‘আপনি কি জমিতে উৎকৃষ্ট বীজ বুনেননি? তবে শ্যামা ঘাস কোথেকে এল?’
তিনি বললেন, ‘কোন শত্রু এ করেছে।’
গোলামেরা বলল, ‘তবে আমরা গিয়ে ঘাসগুলি তুলে ফেলব কি?’
তিনি বললেন, ‘না, ঘাস তুলতে গিয়ে তোমরা হয়তঃ ঘাসের সাথে গমের চারাও তুলে ফেলবে। ফল পাকা পর্যন্ত ওগুলি একসঙ্গে বাড়তে দাও। যারা ফসল কাটে, আমি তখন তাদের বলব, যেন তারা প্রথমে শ্যামা ঘাসগুলি জড় করে আগুনে পোড়াবার জন্যে আঁটি আঁটি করে বাঁধে, আর তারপরে গম আমার গোলায় জমা করে।’

এ থেকে কি জানলাম আমরা? পাপীষ্ঠের সাথে সৎ লোকও শাস্তির মধ্যে পড়ে যেতে পারে এ কারণে খোদা অসৎ মানুষকে শাস্তি দানে ফেরেস্তাদেরকে বিরত রাখেন।

দ্বিতীয়ত: ঈসা বললেন, ‘কোন এক ব্যক্তির আঙ্গুর ক্ষেতে একটা ডুমুর গাছ লাগান হয়েছিল। একবার ঐ মালিক এসে ফলের খোঁজ করলেন; কিন্তু পেলেন না। তখন তিনি মালীকে বললেন, ‘দেখ, তিন বৎসর ধরে এই ডুমুর গাছে আমি ফলের খোঁজ করছি। কিন্তু কিছুই পাচ্ছিনে। সুতরাং তুমি গাছটি কেটে ফেল। কেন এ শুধু শুধু জমি নষ্ট করবে?’
মালী উত্তর দিল, ‘হুজুর, এই বৎসরও গাছটাকে থাকতে দিন। আমি ওর চারপাশে খুঁড়ে সার দেব। তারপর যদি ফল ধরে তো ভালই, তা না হলে আপনি ওটা কেটে ফেলবেন।’

অর্থাৎ দুনিয়াতে কর্মরত ফেরেস্তাগণ খোদাকে নিরন্তন শান্ত রাখেন পাপাচারী পাপ থেকে ফিরবে এই আশায়। আর এরই প্রতিফলন রয়েছে কোরআনে যে- আল্লাহ কোন জনপদ ধ্বংস করেন না, যে পর্য়ন্ত না তার কেন্দ্রস্থলে তাঁর রসূল প্রেরণ না করেন এবং তিনি কোন জনপদকে ততক্ষণ ধ্বংস করেন না যতক্ষণ না সেখানকার অধিবাসীগণ সীমালঙ্ঘন না করে।-২৮:৫৯

তৃতীয়ত: আবার অদৃশ্যলোকের একদল ফেরেস্তা পাপীষ্ঠদের কৃতকর্মের জন্যে খোদার কানের কাছে নিরন্তর করুণা ভিক্ষা করে যাচ্ছে। ঐ ফেরেস্তাগণও সর্বদা আশা করে মানুষ তাদের পাপের পথ থেকে ফিরবে। নবী আইয়ূবের সহিফায় রয়েছে-

যখন মানুষ পাপের পথে চলে, তখন ফেরেস্তাগণ চিৎকার করে বলেন-
‘হে খোদা! দোযখের শাস্তি থেকে তাকে রেহাই দাও।’
সে খোদার কাছে প্রার্থনা করে আর তিনি তাকে দয়া করেন,
খোদা মানুষের জন্যে বারবার এসব করেন।-----------আইয়ূবের সহিফা।

সর্বশেষ ঐশী কিতাব কোরআনেরও এর সমর্থণ রয়েছে-‘যারা আরশ ধারণ করে আছে এবং যারা এর চতুর্দিক ঘিরে আছে, তারা তাদের প্রতিপালকের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে- প্রশংসার সাথে এবং তাতে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং বিশ্বাসীদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে বলে- ‘হে আমাদের প্রতিপালক! প্রত্যেক বিষয় তোমার দয়া ও জ্ঞানের অন্তর্ভূক্ত আছে, অতএব যারা তওবা করে ও তোমার পথ অবলম্বণ করে, তুমি তাদের ক্ষমা কর এবং জাহান্নামের শাস্তি হতে রক্ষা কর। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি তাদের স্থায়ী জান্নাতে উপস্থাপিত কর, যার প্রতিশ্রুতি তুমি তাদের দিয়েছ এবং তাদের পিতামাতা, পতি-পত্নী ও সন্তান-সন্তুতিদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করেছে তাদেরও। নিশ্চয় তুমি মহাপরাক্রান্ত, বিজ্ঞানময় এবং তুমি তাদের শাস্তি হতে রক্ষা কর, সেদিন যাকে শাস্তি হতে রক্ষা করবে তাকে তো অনুগ্রহই করবে, এ সেই মহান সফলতা।’----------(কোরআন, ৪০:৭-৯)

সমাপ্ত।

ছবি: thanasis, timelessmyths, bloodbrothersgame.wikia.

২০ এপ্রিল, ২০১২

Yathrib: ইসলামের প্রচার ও প্রসারের সূত্রপাত।


নব্যুয়তের একাদশ বৎসর। একদিন মুহম্মদ বিষন্ন অথচ আশান্বিত হৃদয়ে মক্কায় আগত আধা ব্যবসায়ী আধা তীর্থযাত্রীদের মধ্যে প্রচার কাজ চালাচ্ছেন। এসময় দূর ইয়াসরিব থেকে আগত ছয়জন লোকের একটি দলের সঙ্গে তার দেখা হল। তিনি তাদেরকে কিছুক্ষণের বিশ্রামের মাঝে তার কথা শ্রবণের অনুরোধ করলেন। তারা বসলেন এবং মনোযোগ সহকারে তার কথা শুনলেন। তারা শেষ নবীর আবির্ভাবের কথা জেনেছিলেন আর তারা তা জেনেছিলেন তাওরাতের অনুসারী ইহুদিদের কাছ থেকে। তারা প্রায়ই তাদেরকে বলত, ‘শেষ নবীর আবির্ভাবের সময় অত্যাসন্ন, আমরা তার সহযোগিতায় আমাদের হারান মর্যাদা পুনরুদ্ধার করব।’
তারা তাদের কথা স্মরণ করে ও মুহম্মদের আন্তরিকতা ও বক্তব্যের সত্যতায় বিমুগ্ধ হয়ে একে অন্যকে বললেন, ‘দেখ, তারা যেন আমাদের আগে সত্যপথ গ্রহণ করে প্রথম মর্যাদায় অভিষিক্ত না হয়।’ 

তারা মুহম্মদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন এবং দেশে ফিরে তড়িৎগতিতে প্রচার করলেন যে, আরবদের মধ্যে একজন প্রেরিত পুরুষের আবির্ভাব ঘটেছে যিনি এক আল্লাহর পথে মানুষকে আহবান করছেন এবং তাদের মধ্যে শতাব্দীব্যপী আত্মঘাতী কলহ দূর করতে সচেষ্ট হয়েছেন। 

পরের বৎসর ৬২১ খ্রীঃ এ ইয়াসরিববাসীরা পুনঃরায় এলেন এবং সেই শহরের দু’টি প্রধান গোত্র আওস ও খাজরাজের প্রতিনিধি হিসেবে আরও ছয়জনকে সঙ্গে নিয়ে এলেন। যে স্থানে আগের বৎসর ছয়জন দীক্ষা নিয়েছিলেন সেখানেই নতুন এই ছয়জনও মুহম্মদের কাছে বায়াত হলেন। যে পর্বতের পাদদেশে এই শপথ হয়েছিল তার নামানুসারে এই শপথের নাম হল ‘আকাবার প্রথম শপথ।’ তারা যে শপথ গ্রহণ করেছিলেন তা ছিল- 

-আমরা আল্লাহর সঙ্গে কোন বস্তুর শরীক করব না; 
-চুরি করব না; 
-ব্যভিচার করব না; 
-আমাদের শিশু সন্তানদের হত্যা করব না; 
-সর্বপ্রকার অশোভন ও অশ্লীল কাজ থেকে দূরে থাকব। 
-সকল ভাল কাজে আমরা মুহম্মদের নির্দেশ মেনে চলব এবং 
-সুখে-দুঃখে তার প্রতি অনুগত থাকব।
স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের সময় এই লোকগুলো মুহম্মদকে বললেন, ‘কোরআন পাঠদানে সক্ষম এমন কাউকে আমাদের সঙ্গে দিলে ভাল হত।’ 
মুহম্মদ তখন মেসহাব বিন ওমরকে তাদের সঙ্গে দিলেন। এই মেসহাবের পিতার ছিল অগাধ ধন-সম্পত্তি। অতি মূল্যবান বস্ত্র পারিধান করে মেসহাব যখন মক্কার পথে বের হতেন তখন তার অগ্রে পশ্চাতে আর্দালী চলত। ইসলামে দীক্ষিত হবার পর তিনি এখন কপর্দকহীন কাঙ্গাল। যখন তিনি কোরআনের শিক্ষকরূপে মদিনায় যাচ্ছেন, তখন তার পরিধেয় কেবল এক টুকরো ছেঁড়া কম্বল। 
ওহোদ যুদ্ধে এই মেসহাব শহীদ হয়েছিলেন।

মেসহাব ভক্তগণের সঙ্গে মদিনায় গমন করলেন। সেখানে তিনি আসাদ বিন জোরারার বাড়ীতে অবস্থান গ্রহণ করলেন। ভক্তরা তাদের প্রতিজ্ঞা পূর্ণভাবেই প্রতিপালন করতে লাগলেন। অধিকন্তু কোরআনের পবিত্র শিক্ষার মাহাত্ম্যে তাদের মধ্যে একটা নতুন জীবনের সূত্রপাত হল।

আনসারদের মধ্যে মহাত্মা সা‘দ বিন মু‘আজের নাম সর্বজন বিদিত। এই সা‘দ ও ওছায়দ নামক আর একব্যক্তি তখন আশহাল গোত্রের প্রধান সমাজপতি। ক্রমান্বয়ে মদিনায় ইসলামের প্রভাব বৃদ্ধি দর্শণ করে তারা বিচলিত হয়ে পড়লেন। তারা ইসলামের মূলোচ্ছেদ করার পরামর্শে লিপ্ত হলেন। সা‘দ ওছায়দকে বললেন, ‘আরে সর্বনাশ! এই লোক এখানে এসে আমাদের নিরীহ লোকগুলিকে একেবারে গোমরাহীর মধ্যে টেনে নিয়ে গেল, আর এখন আমাদের মধ্যে জালপাতার ব্যবস্থা করছে। তুমি গিয়ে তাদেরকে ভীতি প্রদর্শণ করে এস, যাতে আমাদের এদিকে তারা আর কখনও না আসে। না হলে এর পরিণাম তাদের জন্যে কখনই প্রীতকর হবে না। আমি নিজেই এর উচিৎ ব্যবস্থা করে আসতাম, কিন্তু হতভাগা আসাদটা আমার খালাত ভাই, তাই তুমি যাও।’
প্রধান দলপতির কথায় ওয়াছদ সর্বপ্রকার অস্ত্র-শস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে তার সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন এবং আসাদ ও মেসহাবকে একটা কূপের কাছে খুঁজে পেলেন। ওয়াছদ উগ্রমূর্ত্তি ধারণ পূর্বক কঠোর ভাষায় তাদেরকে বললেন, ‘দুরাত্মা! আমাদের দেশে এসেছ কেন? আমাদের সহজ সরল লোকগুলিকে প্রবঞ্চিত করতে? শীঘ্র এখান থেকে চলে যাও, যদি প্রাণের মায়া থাকে!’
এসময় মেসহাব ধীর, নম্র অথচ অবিচলিত কন্ঠে বললেন, ‘জনাব! একটু স্থির হয়ে বসুন, আমাদের বক্তব্য শ্রবণ করুন। যদি তা আপনার জ্ঞান ও বিবেক অনুসারে সত্য ও যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেন, তবে তা গ্রহণ করবেন। আর যদি তা মন্দ প্রতিপন্ন হয়, তাহলে না হয় আপনি আমাদের বিরুদ্ধাচারণ করবেন।’

উগ্র ব্যাবহারের এমন নম্র ও যুক্তিযুক্ত উত্তর পেয়ে ওয়াছদ মনে মনে একটু লজ্জিত হলেন।  তিনি প্রস্তাবে সম্মতি জ্ঞাপন করে সেখানে বসলেন। মেসহাব তখন স্পষ্ট, প্রাঞ্জল ও ধীর গম্ভীর ভাষায় ইসলামের স্বরূপ এবং তার সত্যতা ও শিক্ষা উত্তমরূপে বুঝিয়ে দিলেন এবং উপসংহারে কোরআনের কতকগুলি আয়াত পাঠ করলেন। কোরআন শ্রবণ করে ওয়াছদ বিমোহিত হলেন, এরপর সেখানেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। চলে আসার সময় তিনি মেসহাবকে বললেন, ‘আমাদের সমাজপতি সা‘দকে কৌশলে আপনাদের কাছে পাঠিয়ে দেব, আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি ইসলাম গ্রহণ করলে, আশহাল গোত্রের মধ্যে আর কেউই ইসলামের বিরুদ্ধাচারণ করতে অগ্রসর হবে না।’ 
ওয়াছদ সোজা সা‘দের কাছে ফিরে গেলেন। সা‘দ তখন তার সভাগৃহে লোকজনসহ অবস্থান করছিলেন। ওয়াছদকে দেখেই তিনি গম্ভীরস্বরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি করে এলে?’
ওয়াছদ বললেন, ‘আমি তাদের সাথে কথাবার্তা বললাম। বিচলিত হবার কিছু নেই। আমি তাদের নিষেধ করেছিলাম, তারা বলল-আপনি যা বলেন আমরা তাই করব। ফেরার পথে শুনলাম আপনাকে অপদস্ত করার জন্যে হারেছ বংশের লোকেরা আপনার খালাত ভাই আসাদকে হত্যা করতে বের হয়েছে।’
এ কথায় সা‘দ অসন্তুষ্ট গলায় বললেন, ‘তুমি দেখছি কিছুই করে আসতে পারনি।’
তিনি আসাদের বিপদের সংবাদে অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জ্বিত হয়ে মেসহাবের কাছে গমন করলেন।

সা‘দ উলঙ্গ তরবারী হাতে অকুস্থলে উপস্থিত হয়ে আসাদকে সম্বোধণ করে বললেন, ‘এসব কি হচ্ছে? কি বলব! তোমার সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক না থাকলে এতক্ষণ তোমার মাথা মাটিতে গড়াগড়ি দিত। ফাঁদ পেতে আমাদের বোকা লোকগুলিকে মজাতে বসেছ তোমরা!’

বিজ্ঞ মেসহাব আগের মত নম্র ও যুক্তিযুক্ত কথায় তার উত্তেজনা প্রশমিত করে ফেললেন। আলোচনা, উপদেশ ও কোরআন শ্রবণের পর সা‘দ আগ্রহ ও ভক্তি সহকারে ইসলাম গ্রহণ করলেন।

এদিকে সা‘দ কি করে আসেন তা জানার জন্যে লোকেরা আগ্রহ ও উত্তেজনা সহকারে অপেক্ষা করছিল। অতঃপর সা‘দ ফিরে এলেন। লোকেরা তাকে কিছু জিজ্ঞেস করার পূর্বেই তিনি বললেন, ‘হে আশহাল বংশীয়রা! সত্যি করে বল, তোমরা আমাকে কেমন লোক বলে মনে করে থাক?’
তারা বলল, ‘তুমি আমাদের প্রধান, আমাদের ভক্তিভাজন দলপতি। তোমার জ্ঞানের গভীরতা, তোমার সিদ্ধান্তের সমীচীনতা এবং তোমার ন্যায়নিষ্ঠা সর্বজন বিদিত।’ 
তিনি বললেন, ‘তবে শোন! তোমাদের এই পৌত্তলিকতার, এই অনাচার ও অবিচারের এবং এই অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের ধর্মের সাথে-সর্বোপরি তোমাদের সাথে আমার আর কোন সম্বন্ধ নেই। যতক্ষণ না তোমরা এক অনাদি, অনন্ত ও বিশ্বচরাচরের একমাত্র স্রষ্টা আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন না কর, ততক্ষণ তোমাদের সাথে আমার কোন কথাবার্তাও নেই।’

উভয়পক্ষ হতে ইসলাম সম্বন্ধে তুমুল আলোচনা শুরু হল। অবশেষে সকলে ইসলামের সত্যতা ও মহাত্ম্য স্বীকার করল এবং সেই একদিনে- আশহাল গোত্রের সকল নর-নারী গোত্র প্রধানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ইসলাম গ্রহণ করল। পরবর্তীতে মেসহাব ও অন্যান্যদের অতি আগ্রহের সাথে প্রচারের ফলে কয়েক মাসের মধ্যে ইসলাম প্রায় প্রত্যেক গোত্রের মাঝে স্থান করে নিল।

মদিনায় প্রচুর ইহুদি বাস করত কিন্তু সেখানকার পৌত্তলিকরা মূসার শরীয়ত গ্রহণ করেনি। কিন্তু মুহম্মদের শরীয়ত আগমনের পর লোকেরা দলে দলে তা গ্রহণ করতে লাগল। এর কারণ কোরআনে বিধৃত হয়েছে। ‘মরিয়ম তনয় ঈসা যখন বললেন- ‘হে ইস্রাইল বংশীয়রা, নিশ্চয়ই আমি আল্লাহ কর্তৃক তোমাদের কাছে প্রেরিত হয়েছি-আমার সম্মূখে তাওরাতের যা আছে- আমি তার সত্যতা ঘোষণা করছি এবং আমার পরে আহমদ নামে যে রসূল আসবেন, আমি তার আগমনের সুসংবাদ দান করছি।’

কিন্তু যখন (সেই আহমদ) স্পষ্ট যুক্তি প্রমাণসহ আগমন করল, তখন তারা বলল-এগুলি তো স্পষ্ট যাদু। দেখ সেই ব্যক্তি অপেক্ষা অত্যাচারী কে? যে আল্লাহর প্রতি মিথ্যে দোষারোপ করে থাকে অথচ তাকে ইসলামের দিকে আহবান করা হচ্ছে! আর আল্লাহ অত্যাচারী জাতিকে হেদায়েত করেন না। তারা (সেই অত্যাচারীরা) সঙ্কল্প করে যে, আল্লাহর জ্যোতিকে মুখের ফুৎকারে নিবিয়ে দেবে, কিন্তু আল্লাহ নিজের জ্যোতিকে পূর্ণে পরিণত করবেনই- যদিও ঈশ্বরদ্রোহীগণের কাছে এ প্রীতিকর না হয়। তিনি সেই (আল্লাহ), যিনি আপন রসূল (আহমদ)কে হেদায়েত ও সত্যধর্ম দিয়ে প্রেরণ করেছেন, যেহেতু তাকে অন্য সমস্ত ধর্মের উপর জয়যুক্ত করবেন, যদিও অংশীবাদীগণের কাছে এ অপ্রীতিকর হয়।’-(৩:৪৯-৫১)

পরের বৎসর (৬২২ খ্রীঃ-নব্যুয়তের ত্রয়োদশ বৎসরে) ইয়াসরিববাসীদের মধ্যে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তারা তাদের পৌত্তলিক নাগরিকসহ মোট পাঁচ শতাধিক লোক মক্কায় আগমন করলেন। এদের মধ্যে সত্তুরজন মুসলিম, মুহম্মদকে তাদের কাছে যাবার আমন্ত্রণ জানানোর জন্যে এসেছিলেন। কিন্তু আগত পৌত্তলিকরা তাদের সাথীদের অভিপ্রায় সম্পর্কে কিছুই জানত না। গভীর রাত্রে যখন সবাই ঘুমে অচেতন তখন এই নবদীক্ষিতরা যেখানে প্রথম শপথ গ্রহণ করেছিলেন সেখানে পাহাড়ের পাদদেশে সমবেত হলেন। পিতৃব্য আব্বাসকে সঙ্গে নিয়ে মুহম্মদ সেখানে উপস্থিত হলেন। আব্বাস তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি তবে ইসলামের অগ্রগতিতে খুবই আগ্রহ অনুভব করতেন। তিনি আলোচনার উদ্বোধন করে পরিস্কারভাবে ইয়াসরিববাসীদের বুঝিয়ে দিলেন যে, ইসলাম গ্রহণ করে ও রসূলকে তাদের দেশে আমন্ত্রণ জানিয়ে তারা কি ধরনের বিরাট ঝুঁকি নিচ্ছেন। তারা সকলে একযোগে উত্তর দিলেন যে, বিপদের গুরুত্ব  সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন হয়েই তারা ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তারা বললেন, ‘হে আল্লাহর নবী, আপনি বলুন এবং আপনার ও আপনার প্রভুর জন্যে যে কোন শপথ করান।’

মুহম্মদ অভ্যস্ত পথে কোরআনের কতিপয় আয়াত আবৃত্তি করে আলোচনা শুরু করলেন, তারপর তিনি উপস্থিত সকলকে আল্লাহর উপাসনা করার জন্যে আহবান জানালেন এবং ইসলামের আশীর্বাদ সম্পর্কে আলোচনা করলেন। প্রথম শপথটি পুনঃরায় উচ্চারিত হল এবং সেই সঙ্গে এটি যুক্ত হল যে, তারা বিপদের ক্ষণে তাকে ও তার লোকজনদের রক্ষা করবেন।
তারা বললেন, ‘যদি আমরা আল্লাহর কাজে মৃত্যুবরণ করি তবে আমাদের পুরস্কার কি? ‘
তিনি জবাব দিলেন, ‘পরকালে শান্তি।’
তারা বললেন- ‘যখন আপনার সুদিন আসবে তখন কি আপনি আমাদেরকে পরিত্যাগ করে আপনার গোত্র মাঝে ফিরে আসবেন না?’
তিনি মৃদু হেসে বললেন, ‘না, কখনও না। তোমাদের রক্ত আমার রক্ত, আমি তোমাদের, তোমরা আমার।’
‘তাহলে এবার আপনার হাত দিন।’ -প্রত্যেকে তার হাতে হাত রেখে শপথ (বায়াত) নিলেন।

প্রকৃতপক্ষে এই ‘বায়াত’ বা ক্রয়-বিক্রয় মুহম্মদের সাথে হয়নি। এ সংক্রান্ত কোরআনের আয়াতসমূহ-‘যারা তোমার সাথে বায়াত করছে, তারা (তোমার সাথে নয় বরং) প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সাথে বায়াত করছে (প্রকৃতপক্ষে) তাদের হাতের উপর আল্লাহরই হাত আছে। অতঃপর যে ব্যক্তি এ প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করবে, তার কূ-ফল সেই ভোগ করবে এবং আল্লাহর সাথে তার যে (আদান- প্রদানের) প্রতিজ্ঞা হল- যে ব্যক্তি তা রক্ষা করবে, আল্লাহ শীঘ্রই তার মহান পুরস্কার দান করবেন।’(২৬:৯)

এই বায়াতের উল্লেখিত ‘ক্রয়-বিক্রয়’- উভয়পক্ষ কিসের আদান প্রদান করলেন? কোরআন জানায়- ‘হে মুমিনেরা, আমি কি তোমাদেরকে এমন এক বাণিজ্যের কথা বলে দেব?- যা তোমাদেরকে ক্লেশজনক আযাব হতে মুক্তি প্রদান করবে? (বলছি, অনুধাবণ কর)- তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে এবং রসূলের প্রতিও এবং তাঁর সন্তোষ লাভের জন্যে নিজেদের ধনপ্রাণ লুটিয়ে দিয়ে জেহাদ করতে থাকবে, এ তোমাদের পক্ষে কল্যাণকর-যদি তোমরা জ্ঞানী হও, (তবে এই শিক্ষার তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারবে)।’ 

এই অংশটুকু হচ্ছে বিক্রেতা মুসলিম বান্দার বিক্রেয় পণ্য। তিনি নিজের ধন-প্রাণ সমস্তই আল্লাহর হাতে সমর্পন করবেন। বিনিময়ে তার প্রাপ্য কি হবে কোরআনই তার উত্তর দিচ্ছে- ‘আল্লাহ তোমাদের পাপপুঞ্জ ক্ষমা করবেন এবং তোমাদেরকে এমন কাননে প্রবিষ্ট করাবেন, যার তলদেশ দিয়ে বহু নির্ঝরিণী বয়ে যাচ্ছে এবং আদন কাননে পবিত্র সৌধসমূহ (তোমরা পাবে) এ অতীব সফলতা।’
হ্যাঁ, আর একটা (জিনিষ আছে) যাকে তোমরা অত্যন্ত ভালবেসে থাক- আল্লাহর নিকট হতে সাহায্য প্রাপ্তি ও ত্বরিৎ বিজয়লাভ (এও তোমরা পাবে) সমস্ত বিশ্বাসীকে এ সুসংবাদ পৌঁছে দাও।-(২৮:১০)

এই বায়াত বা ক্রয়-বিক্রয়ের স্বরূপ সম্বন্ধে কোরআনে সূরা তওবায় বলা হয়েছেঃ ‘আল্লাহ মুমিনদের কাছ থেকে তাদের প্রাণ ও ধন সমস্তই (এই প্রতিদানের বিনিময়ে) ক্রয় করে নিলেন যে- পরিবর্তে তারা বেহেস্ত পাবে। তারা এ (বায়াতের) জন্যে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করবে এবং (তার অবশ্যম্ভবী ফলস্বরূপ) তারা অন্যকে মারবে ও নিজেরা নিহত হবে, এ তাঁর (আল্লাহর) ন্যায়সঙ্গত ওয়াদা। এই ওয়াদা তাওরাত, ইঞ্জিল ও কোরআন (সমস্ত গ্রন্থেই) বিদ্যমান রয়েছে। (আর ভেবে দেখ) আল্লাহ অপেক্ষা কে অধিক স্বীয় প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করতে পারে? অতএব (হে বায়াতকারী মুসলমানরা!) তোমরা আল্লাহর সাথে যে ক্রয় বিক্রয় করলে, তারজন্যে আনন্দিত হও এবং (জেনে রেখ যে) এই (তোমার মুসলিম জীবনের) চরম সফলতা।’-(৯:১১১)

শপথপর্ব প্রায় শেষ এসময় দূর থেকে এই ঘটনা প্রত্যক্ষণ করা এক আরবের কন্ঠ রাতের বাতাসে ভেসে এল-‘মক্কাবাসীরা! তোমরা নিদ্রা যাচ্ছ, আর এদিকে হতভাগাটা তার নাস্তিক দলটাকে নিয়ে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ষড়যন্ত্র করছে।’

সমবেত লোকদের মধ্যে সহসা আতঙ্ক দেখা গেল। কিন্তু মুহম্মদের দৃঢ়চিত্ততা অবিলম্বে তাদের সাহস ফিরিয়ে আনল। এরপর মুহম্মদের নির্দেশমত ইয়াসরিব বাসীরা তাদের মধ্যে থেকে বারজন লোক নির্বাচন করলেন- সকলের অনুমোদনক্রমে নির্বাচিত, মুহম্মদের এই প্রতিনিধিরা হলেন-খাজরাজ বংশের আবু এমামা আসাদ বিন জোরারা, সা‘দ বিন রবি, আব্দুল্লাহ বিন রওয়াহা, রাফে বিন মালেক, বারা বিন মা‘রুর, আব্দুল্লাহ বিন আমর এবং আওস বংশের ওয়াছদ বিন হোজায়র, সা‘দ বিন খাইছামা, আব্দুল হাইছাম বিন তাইয়েহান।
আকাবার দ্বিতীয় শপথ সম্পন্ন হল।

মক্কার ঐ গুপ্তচর এই সম্মেলনের খবর সারা শহরে ছড়িয়ে দিয়েছিল। মুহম্মদ ও তার অনুসারীদের দুঃসাহস দেখে হতবাক হয়ে কুরাইশরা সদলবলে কাফেলার গমনপথ রূদ্ধ করে শপথ গ্রহণকারী ব্যক্তিদেরকে দাবী করল। কিন্তু ইয়াসরিব (Yathrib) বাসীদের কেউই তাদের প্রশ্নের না কোন উত্তর দিলেন বা তাদেরকে অন্য কোনভাবে সহযোগিতা করতে রাজী হলেন। ফলে কোন কোন ব্যক্তি শপথ নিয়েছেন তা জানতে ব্যর্থ হয়ে কুরাইশরা কাফেলাকে উৎপীড়ন না করেই যেতে দিতে বাধ্য হল। কিন্তু, তাদের এই ব্যাবহার মুহম্মদ ও তার অনুসারীদের উপর প্রচন্ড উৎপীড়নেরই পূর্বাভাস হিসেবে দেখা দিয়েছিল।

সমাপ্ত।

৬ মার্চ, ২০১২

Jinn: জ্বীনদের ইসলামের দীক্ষা।


অন্যান্য আসমানী কিতাব, কিতাব আকারে একবারে সংশ্লিষ্ট রসূলকে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কোরআনের ক্ষেত্রে তা হয়নি। ২৬শে রমজান দিবাগত রাত্রিতে (শবে কদরের রাত) সমগ্র কোরআন লওহে মাহফুজ থেকে তুলে নিয়ে পৃথিবীর উর্দ্ধাকাশে ছড়িয়ে দেয়া হয়। এভাবে পূর্ণ কোরআন মুহম্মদের নব্যুয়তের পূর্বেই অদৃশ্যলোক থেকে দৃশ্যলোকে আগমন করে। (এর কারণ এই যে, জিব্রাইল বা অন্যান্য ফেরেস্তা যারা দুনিয়ার কাজে নিয়োজিত, তাদের অদৃশ্যলোকে যারার ক্ষমতা নেই।) অতঃপর জিব্রাইল সাড়ে তেইশ বৎসর ধরে প্রয়োজন অনুসারে একটু একটু করে মুহম্মদের কাছে তা পৌঁছে দেন। এ সংক্রান্ত কোরআনের আয়াতসমূহ-নিশ্চয় আমি এই কোরআন অবতীর্ণ করেছি লায়লাতুল কদরে। লায়লাতুল কদর সম্পর্কে তুমি কি জান? লায়লাতুল কদর হল হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। এই রাতে প্রত্যেক কাজের জন্যে ফেরেস্তারা স্বীয় পালনকর্তার নির্দেশে অবতীর্ণ হয়। শান্তিই শান্তি, যা ফজরোদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। (৯৭:১-৫)

জ্বীন?
মুহম্মদের নব্যুয়ত লাভের পূর্বে জ্বীন (Jinn) জাতি উর্দ্ধাকাশে ফেরেস্তাদের আলোচনা শুনে সেগুলি তাদের মত করে অতীন্দ্রবাদীদের কাছে পৌঁছিয়ে দিত। তার নব্যুয়ত লাভের পর ওহীর হেফাজতের জন্যে জ্বীন জাতিকে আকাশের সংবাদ সংগ্রহ থেকে নিবৃত্ত রাখা হয়।

কোন জ্বীন সংবাদ শ্রবণের মানসে উর্দ্ধাকাশে গেলে, তাকে উল্কাপিন্ড নিক্ষেপ করে বিতাড়িত করা হতে লাগল। জ্বীনদের কেউ কেউ এই নূতন পরিস্থিতির কারণ উৎঘাটনে সচেষ্ট হল এবং তাদের বিভিন্ন দল পৃথিবীর বিভিন্ন ভূ-খন্ডে ছড়িয়ে পড়ল। তাদের একদল হিজাজেও পৌঁছিল। এদিন তায়েফ থেকে ফেরার পথে মুহম্মদ জায়েদসহ নাখালায় অবস্থান করছিলেন। তিনি যখন ফজরের নামাযের কোরআন পাঠ করছিলেন, তখনই জ্বীনদের এই দলটি সেখানে পৌঁছেছিল। দলে সাত থেকে নয়জন জ্বীন ছিল। তারা মুহম্মদের কোরআন পাঠ একাগ্রচিত্তে শ্রবণ করল। অতঃপর ফিরে গিয়ে তারা তাদের রিপোর্ট পেশ করল। তাদের রিপোর্ট ছিল এমন-

‘হে আমাদের সম্প্রদায়! আমরা এমন এক কিতাব শুনেছি, যা মূসার পর অবতীর্ণ হয়েছে। এ কিতাব পূর্ববর্তী সব কিতাবের সত্যায়ন করে, সত্যধর্ম ও সরলপথের দিকে পরিচালিত করে। হে আমাদের সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর দিকে আহবানকারীর কথা মান্য কর এবং তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। তিনি তোমাদের গোনাহ মার্জনা করবেন।

আমরা বিষ্ময়কর কোরআন শ্রবণ করেছি; যা সৎপথ প্রদর্শণ করে। ফলে আমরা তাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছি। আমরা কখনও আমাদের পালনকর্তার সাথে কাউকে শরীক স্থাপন করব না এবং আরও বিশ্বাস করি যে, আমাদের পালনকর্তার মহান মর্যাদা সবার উর্দ্ধে। তিনি কোন পত্নী গ্রহন করেননি এবং তাঁর কোন সন্তান নেই। আমাদের মধ্যে নির্বোধেরা আল্লাহ সম্পর্কে বাড়াবাড়ির কথাবার্তা বলত। অথচ আমরা মনে করতাম, মানুষ ও জ্বীন কখনও আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যে কথা বলতে পারে না।

আমরা আকাশ পর্যবেক্ষণ করেছি, অতঃপর দেখতে পেয়েছি যে, কঠোর প্রহরী ও উল্কাপিন্ড দ্বারা আকাশ পরিপূর্ণ। আমরা আকাশের বিভিন্ন ঘাঁটিতে সংবাদ শ্রবণার্থে বসতাম। এখন কেউ সংবাদ শুনতে চাইলে সে জ্বলন্ত উল্কাপিন্ডকে ওঁৎ পেতে থাকতে দেখে। আমরা জানি না পৃথিবীবাসীদের অমঙ্গল সাধন করা অভীষ্ট, না তাদের পালনকর্তা তাদের মঙ্গল সাধন করার ইচ্ছে রাখেন। আমাদের কেউ কেউ সৎকর্মপরায়ণ এবং কেউ কেউ এরূপ নয়। আমরা ছিলাম বিভিন্ন পথে বিভক্ত। আমরা বুঝতে পেরেছি যে, আমরা পৃথিবীতে আল্লাহকে পরাস্ত করতে পারব না এবং পলায়ন করেও তাঁকে অপারগ করতে পারব না।

আমরা যখন সুপথের নির্দেশ শুনলাম, তখন তাতে বিশ্বাস স্থাপন করলাম। অতএব, যে তার পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস করে, সে লোকসান ও জোর-জবরের আশঙ্কা করে না। আমাদের কিছু সংখ্যক আজ্ঞাবহ এবং কিছু সংখ্যক অন্যায়কারী। যারা আজ্ঞাবহ হয় তারা সৎপথ বেঁছে নিয়েছে। আর যারা অন্যায়কারী, তারা তো জাহান্নামের ইন্ধন। আর এই প্রত্যাদেশ করা হয়েছে যে, তারা যদি সৎপথে কায়েম থাকত, তবে আমি তাদেরকে প্রচুর পানি বর্ষণে সিক্ত করতাম, যাতে এই ব্যাপারে তাদেরকে পরীক্ষা করি। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তিনি তাকে উদীয়মান আযাবে পরিচালিত করবেন এবং এই ওহীও করা হয়েছে যে, মসজিদসমূহ আল্লাহকে স্মরণ করার জন্যে। অতএব তোমরা আল্লাহর সাথে কাউকে ডেক না।’

এই সংবাদের ভিত্তিতে পরবর্তীতে আরও প্রায় নয়শত জ্বীন ইসলাম গ্রহণ করেছিল। মুহম্মদ এ সংবাদ অবগত হন সূরা জ্বীন নাযিল হওয়ার পর। 

এ সংক্রান্ত কোরআনের আয়াতসমূহ- নিশ্চয় আমি নিকটবর্তী আকাশকে তারকারাজীর দ্বারা সুশোভিত করেছি এবং তাকে সংরক্ষিত করেছি প্রত্যেক অবাধ্য শয়তান থেকে। ওরা উর্দ্ধ জগতের কোন কিছু শ্রবণ করতে পারে না এবং চারদিক থেকে তাদের প্রতি উল্কা নিক্ষেপ করা হয়, ওদেরকে বিতাড়নের উদ্দেশ্যে। ওদের জন্যে রয়েছে বিরামহীন শাস্তি। তবে কেউ ছোঁ মেরে কিছু শুনে ফেললে জ্বলন্ত উল্কাপিন্ড তার পশ্চাৎধাবন করে।(৩৬:৬-১০)

যখন আমি একদল জ্বীনকে তোমার প্রতি আকৃষ্ট করেছিলাম, তারা কোরআন পাঠ শুনছিল। তারা যখন কোরআন পাঠের জায়গায় উপস্থিত হল, তখন পরস্পর বলল, ‘চুপ থাক।’
অতঃপর যখন পাঠ সমাপ্ত হল, তখন তারা তাদের সম্প্রদায়ের কাছে সতর্ককারীরূপে ফিরে গেল। তারা বলল, ‘হে আমাদের সম্প্রদায়! আমরা এমন এক কিতাব শুনেছি, যা মূসার পর অবতীর্ণ হয়েছে। এ কিতাব পূর্ববর্তী সব কিতাবের সত্যায়ন করে, সত্যধর্ম ও সরলপথের দিকে পরিচালিত করে। হে আমাদের সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর দিকে আহবানকারীর কথা মান্য কর এবং তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। তিনি তোমাদের গোনাহ মার্জনা করবেন।’(৪৭:২৯-৩১)
 
আমরা বিষ্ময়কর কোরআন শ্রবণ করেছি; যা সৎপথ প্রদর্শণ করে। ফলে আমরা তাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছি। আমরা কখনও আমাদের পালনকর্তার সাথে কাউকে শরীক স্থাপন করব না এবং আরও বিশ্বাস করি যে, আমাদের পালনকর্তার মহান মর্যাদা সবার উর্দ্ধে। তিনি কোন পত্নী গ্রহন করেননি এবং তাঁর কোন সন্তান নেই। আমাদের মধ্যে নির্বোধেরা আল্লাহ সম্পর্কে বাড়াবাড়ির কথাবার্তা বলত। অথচ আমরা মনে করতাম, মানুষ ও জ্বীন কখনও আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যে কথা বলতে পারে না।’
অনেক মানুষ অনেক জ্বীনের আশ্রয় নিত, ফলে তারা জ্বীনদের আত্মরম্ভিতা বাড়িয়ে দিত। তারা ধারণা করত, যেমন তোমরা মানবেরা ধারণা কর যে, মৃত্যুর পর আল্লাহ কখনও কাউকে পুনরুত্থিত করবেন না।

--‘আমরা আকাশ পর্যবেক্ষণ করেছি, অতঃপর দেখতে পেয়েছি যে, কঠোর প্রহরী ও উল্কাপিন্ড দ্বারা আকাশ পরিপূর্ণ আমরা আকাশের বিভিন্ন ঘাঁটিতে সংবাদ শ্রবণার্থে বসতাম। এখন কেউ সংবাদ শুনতে চাইলে সে জ্বলন্ত উল্কাপিন্ডকে ওঁৎ পেতে থাকতে দেখে। আমরা জানি না পৃথিবীবাসীদের অমঙ্গল সাধন করা অভীষ্ট, না তাদের পালনকর্তা তাদের মঙ্গল সাধন করার ইচ্ছে রাখেন। আমাদের কেউ কেউ সৎকর্মপরায়ণ এবং কেউ কেউ এরূপ নয়। আমরা ছিলাম বিভিন্ন পথে বিভক্ত। আমরা বুঝতে পেরেছি যে, আমরা পৃথিবীতে আল্লাহকে পরাস্ত করতে পারব না এবং পলায়ন করেও তাঁকে অপারগ করতে পারব না। 

আমরা যখন সুপথের নির্দেশ শুনলাম, তখন তাতে বিশ্বাস স্থাপন করলাম। অতএব, যে তার পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস করে, সে লোকসান ও জোর-জবরের আশঙ্কা করে না। আমাদের কিছু সংখ্যক আজ্ঞাবহ এবং কিছু সংখ্যক অন্যায়কারী। যারা আজ্ঞাবহ হয় তারা সৎপথ বেঁছে নিয়েছে। আর যারা অন্যায়কারী, তারা তো জাহান্নামের ইন্ধন। আর এই প্রত্যাদেশ করা হয়েছে যে, তারা যদি সৎপথে কায়েম থাকত, তবে আমি তাদেরকে প্রচুর পানি বর্ষণে সিক্ত করতাম, যাতে এ ব্যাপারে তাদেরকে পরীক্ষা করি। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তিনি তাকে উদীয়মান আযাবে পরিচালিত করবেন এবং এই ওহীও করা হয়েছে যে, মসজিদসমূহ আল্লাহকে স্মরণ করার জন্যে। অতএব তোমরা আল্লাহর সাথে কাউকে ডেক না।’
আর যখন আল্লাহর বান্দা তাঁকে ডাকার জন্যে দন্ডায়মান হল, তখন অনেক জ্বীন তার কাছে ভীড় জমাল।(৭২:১-২০)

সহল ইবনে আব্দুল্লাহ একস্থানে একব্যক্তিকে নামাজ আদায় করতে দেখতে পেলেন। তার গায়ে ছিল একটা পশমের জোব্বা। জোব্বার চাকচিক্যে সহল অভিতূত হলেন। যখন ঐ ব্যক্তির নামাজ শেষ হল, তখন সহল তাকে সালাম জানালেন। ঐ ব্যক্তি তাকে তার দিকে অবাক হয়ে তাকাতে দেখে বলল, ‘তুমি কি এই জোব্বার চাকচিক্য দেখে অবাক হচ্ছ? জোব্বাটি সাত‘শ বৎসর ধরে আমি ব্যাবহার করছি। এই জোব্বা পরিধান করে আমি ঈসার সাথে সাক্ষাৎ করেছি। অতঃপর এই জোব্বা গায়েই আমি মুহম্মদের দর্শণ লাভ করেছি। যে সব জ্বিন সম্পর্কে সূরা জ্বীন অবতীর্ণ হয়েছে- আমি তাদেরই একজন।’- Sifat al-Safwah by Ibn al-Jawzi.

সমাপ্ত।
ছবি: Jinnstudy.blogspot.

Moses: কোরাণিক ক্যানভাসে নবী মূসা।

Abu Hena Mostafa Kamal  01 May, 2017 মি সরের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ফেরাউন। হঠাৎ করে তিনি মৃত্যুবরণ করলেন। কিন্তু তিনি কোন উত্তরাধিকারী ন...