ইহুদি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ইহুদি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

২৩ মার্চ, ২০১২

Abraham: ইব্রাহিমের আনুগত্য পরীক্ষা।


একরাতে ইব্রাহিম (Abraham) স্বপ্ন দেখলেন। তিনি দেখলেন আল্লাহ তাকে আদেশ করছেন- ‘হে ইব্রাহিম! তুমি তোমার সব চেয়ে প্রিয় বস্তুকে আমার নামে কোরবাণী কর।’ 

এই স্বপ্ন দেখে তিনি পরদিন তার পাল থেকে অনেকগুলো উট কোরবানী করে দিলেন। রাতে তিনি আবারও ঐ একই স্বপ্ন দেখলেন। তখন তিনি অনেক ভেবে আল্লাহর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘হে আল্লাহ, পুত্র ইসমাইল ছাড়া আমার তো আর কিছু এত অধিক প্রিয় নেই।’ 
৩য়দিন তিনি স্বপ্নে দেখলেন যে, পুত্র ইসমাইলকেই তিনি কোরবানী করছেন। পয়গম্বরদের স্বপ্ন ওহীও বটে। সুতরাং ইব্রাহিম বুঝে নিলেন আল্লাহর পক্ষ থেকে পুত্রকেই কোরবানী করার হুকুম হয়েছে। 

অবশ্য আল্লাহ ইচ্ছে করলে এ হুকুমটি ফেরেস্তার মাধ্যমেও নাযিল করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি, কেননা তাঁর ইচ্ছে ছিল ইব্রাহিমের আনুগত্যের পূর্ণ পরীক্ষা নেয়া।

স্বপ্নের মাধ্যমে প্রদত্ত আদেশকে মানব মনের পক্ষে ভিন্ন অর্থ করার যথেষ্ট অবকাশ ছিল। কিন্তু ইব্রাহিম তা পরিহার করে আল্লাহর আদেশের সম্মুখে মাথা নত করে দিলেন। তিনি তার প্রিয় পুত্র ইসমাইলকে উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। আর তিনি তো জানতেনই আল্লাহ সর্বক্ষমতার অধিকারী। তিনি ইচ্ছে করলেই মৃতকেও জীবিত করতে পারেন। 

ইব্রাহিম, হাজেরা ও ইসমাইল।
হিব্রোণ থেকে ইব্রাহিম মক্কাতে হাজেরার গৃহে গেলেন এবং স্ত্রীকে জানালেন, পুত্র ইসমাইলকে তিনি সফরে তার সঙ্গে নিয়ে যেতে চান। পিতার সঙ্গে কাজ করার মত বয়স হয়েছিল এসময় ইসমাইলের। সে অতি আনন্দের সাথে তার পিতার সঙ্গে যাবার জন্যে প্রস্তুত হল।

পিতা-পুত্র গৃহ থেকে বেরিয়ে যেতেই ইবলিস এক বৃদ্ধের বেশে হাজেরার গৃহদ্বারে উপস্থিত হল। অতঃপর দ্বারে করাঘাত করে সে অপেক্ষা করতে লাগল। 
হাজেরা দ্বার খুলল। 

বৃদ্ধ-‘মা, তোমার ছেলেটি কোথায়।’
হাজেরা - ‘সে তার পিতার সফর সঙ্গী হয়েছে।’
বৃদ্ধ-‘তোমার স্বামী তোমাকে মিথ্যে বলেছে। সফরে নয়, সে তো তাকে জবাই করতে নিয়ে যাচ্ছে। কি নিষ্ঠুরতা! মা, সন্তানকে জীবিত দেখতে চাইলে এখনও সময় আছে- তাদেরকে ফেরাও।’
হাজেরা -‘আমি তোমার কথা বিশ্বাস করিনে।’
বৃদ্ধ-‘আফসোস নি:ষ্পাপ ছেলেটির জন্যে আরও আফসোস নির্বোধ এই নারীর জন্যে। আমি সত্য বলছি কি-না তা জানতে শীঘ্রই তোমার স্বামীকে ডেকে এনে তাকে কসম দিয়ে জিজ্ঞেস কর।’

একথা শুনে হাজেরা একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কঠোরস্বরে বলল, ‘নিশ্চয় তুমি অভিশপ্ত শয়তান। সুতরাং তোমার কথা সত্য হলেও আমি তা শুনব না।’ 
নীচু হয়ে সে একটা মাটির ঢিলা হাতে তুলে নিল। ‘দূর হও, শয়তান।’- রুদ্ররোষে সে ঢিলটা ছুঁড়ে মারল ইবলিসকে লক্ষ্য করে।
ইবলিস পালিয়ে গেল।

যাত্রার প্রস্ততি। 
গাধা! কুলীন পশুকূলের মধ্যে তার অবস্থান পৃথিবীর কোথাও নেই, অন্ত্যজ শ্রেণীতেই তার অবস্থান সর্বত্র। কেননা, বেওকুফ এ পশুর পিঠে যতই বোঝা চাপিয়ে দাও মুখে রা নেই। আমাদের দেশে ধোপার বাহন ছাড়া ভিন্নমুখী কোন ব্যবহার তার আছে বলে কেউ বোধহয় শোনেনি। কিন্তু তাতে কি, অতীতে অনেক জ্ঞানী-গুনী, নবী-রাসূলগণ তাকে বাহন হিসেবে ব্যাবহার করেছেন। যেমন-ইব্রাহিম, আমাদের আদি পিতা তার প্রিয় পুত্রকে কোরবানী করতে নিয়ে যেতে গাধাকেই বাহন হিসেবে ব্যাবহার করেছিলেন।  

সুসজ্জিত দু‘টি গাধার পিঠে সওয়ার হয়ে পিতা পুত্র পথ চলেছেন। কিছুদূর অগ্রসর হবার পর পুত্র তার পিতাকে বলল, ‘হে পিতা! আমরা কোথায় যাচ্ছি?’
পিতা উত্তর দিলেন, ‘আমরা একটা কোরবাণী করতে যাচ্ছি।’
পুত্র- ‘আমাদের সঙ্গে তো কোন পশু নেই। আমরা কি কোরবাণী করতে যাচ্ছি?’ 
পিতা-‘উৎসর্গের জিনিষ আল্লাহই জুগিয়ে দেবেন।’

মাথার উপর সূর্য্য, তার উপর মরুর তীব্র দাবাদাহ, একসময় পিতাপুত্র বিশ্রামের জন্যে একস্থানে থামলেন। ক্লান্তিতে ইব্রাহিমের তন্দ্রার মত এল। ইসমাইল বসে রইল দূরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। ধূ-ধূ বালু চারিদিকে! কে যেন এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। 

হজ্জ্বের সময় শয়তানের প্রতিকৃতিতে পাথর নিক্ষেপ।
গাধায় সওয়ার হয়ে এক বৃদ্ধ সেখানে এসে থামল। অতঃপর ইসমাইলকে বলল, ‘ওহে বৎস! তোমরা কোথায় যাচ্ছ?
ইসমাইল- ‘আমরা একটা কোরবানী করতে যাচ্ছি।’
বৃদ্ধ- ‘নির্বোধ বালক! তোমার পিতা তোমাকেই জবেহ করতে নিয়ে চলেছে। দেখছ না তোমাদের সাথে কোন পশু নেই?’
ইসমাইল- ‘তুমি এসব কিভাবে জানতে পারলে? নিশ্চয় তুমি শয়তান।’
ইসমাইল এক টুকরো পাথর তার দিকে ছুঁড়ে মারল। বৃদ্ধরূপী ইবলিস তৎক্ষণাৎ অদৃশ্য হল। এ কারণে হজ্জ্বের সময় প্রতিদিন সাতবার করে শয়তানের প্রতিকৃতিকে লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করা হজ্জ্বের একটা বিধি।

এদিকে তন্দ্রার মধ্যে ইব্রাহিম শুনতে পেলেন, ‘হে ইব্রাহিম তোমার সন্তান তোমার দূরভিসন্ধি জানতে পেরেছে এবং এখন সে তোমাকে প্রতারক হিসেবে ঘৃণা করতে শুরু করেছে।’
তিনি ধড়মড় করে উঠে বসলেন এবং দেখলেন তার পুত্র এক পাশে বসে তারই পানে চেয়ে আছে। তার মুখ নির্ভয়, নিরুদিগ্ন, নিসংশয়। তিনি বুঝতে পারলেন অভিশপ্ত শয়তান তাকে বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করেছে। 

তারা পুনঃরায় যাত্রার প্রস্ততি নিতে লাগলেন। এসময় ইসমাইল বলল, ‘হে পিতা! তুমি আমাকেই কোরবানী করতে নিয়ে চলেছ-না?’
অবাক হয়ে পুত্রের মুখপানে ক্ষণকাল তাকিয়ে রইলেন তিনি। তারপর বললেন, ‘হ্যাঁ, একথা সত্য।’ 
তিনি সকল কথা পুত্রকে খুলে বললেন। অতঃপর তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এখন তুমি কি বল?’
পিতৃভক্ত ইসমাইল বলল, ‘তুমি যা স্বপ্নাদিষ্ট হয়েছ তা পালন কর। আল্লাহ ইচ্ছে করলে, দেখবে আমি ধৈর্য্য ধরতে পারি।’
তারা দু’জনই আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলেন।

পিতাপুত্র পুনঃরায় রওনা হলেন। তারপর এক পাহাড়ের পাদদেশে এসে পৌঁছে সেখানেই থামলেন। ইসমাইল বুঝতে পারল এটাই নির্দেশিত স্থান-মিনা পাহাড়।
ইসমাইল আনন্দের সঙ্গে পিতাকে প্রস্তুতি নিতে বলল। এরপর নিজে প্রস্তুত হয়ে পিতাকে অনুরোধ করে বলল, ‘এবার আমার হাত, পা বেঁধে দাও।’

বাঁধা শেষ হল। তখন ইব্রাহিম পুত্রকে কাত করে শুইয়ে দিলেন। তারপর তার কন্ঠদেশে তরবারী চালালেন। কিন্তু তরবারীর তীক্ষ্ণধার তার গলায় আঁচড় কাটল না। ইব্রাহিম আশ্চর্য হলেন। তিনি তরবারীর তীক্ষ্ণতা সম্পর্কে সন্ধিহান হয়ে পড়লেন। 
ইসমাইল বলল, ‘হে পিতা, তোমার স্নেহদৃষ্টিই হয়তঃ বাঁধা সৃষ্টি করছে। সুতরাং তুমি তোমার চোখ বেঁধে নাও।’

পুত্রের কথামত ইব্রাহিম তার চোখ বেঁধে নিলেন। তারপর তরবারী চালালেন এবং সফল হলেন। নিশ্চয়ই এ ছিল ইব্রাহিমের জন্যে এক স্পষ্ট পরীক্ষা। আর তাই আল্লাহ ইসমাইলকে সরিয়ে নিয়ে কোরবাণী করার জন্যে দিলেন এক মহান জন্তু-দুম্বা। 

ইসমাইলকে উৎসর্গের জন্যে শোয়ানো হয়েছে।
এদিকে কোরবানী করার পর ইব্রাহিম কম্পিত হস্তে দ্রুত চোখের বাঁধন সরিয়ে ফেললেন। অত:পর তিনি যা দেখলেন তা তার কাছে প্রত্যাশিত ছিল না। তিনি দেখলেন যে, তার তরবারীতে একটি দুম্বা কোরবাণী হয়েছে এবং হাত-পা বাঁধা অবস্থায় তার পুত্র পাশে শায়িত। 

আল্লাহ তার প্রিয় পুত্রকে ফিরিয়ে দিয়েছেন দেখে ইব্রাহিম আবেগে আপ্লুত হলেন এবং আল্লাহকে অশেষ কৃতজ্ঞতা জানালেন। তখন আল্লাহ বললেন, ‘হে ইব্রাহিম! তুমি তো স্বপ্নের আদেশ সত্যিই পালন করলে।’ 

বিশ্বাসের এই পরীক্ষায় ইব্রাহিম উর্ত্তীর্ণ হওয়ায় আল্লাহ তাকে পুরস্কৃত করেন। আজ তিনি ইহুদি, খ্রীষ্টান ও মুসলিমদের আদি পিতা; সকলেই তাকে শ্রদ্ধাভরে স্বরণ করে। তার উপর শান্তি বর্ষিত হোক। এভাবে আল্লাহ সৎ-কর্মপরায়ণদেরকে পুরস্কৃত করে থাকেন। বস্তুত: ইব্রাহিম ছিলেন আল্লাহর এক বিশ্বাসী দাস। আল্লাহ তাকে ইসহাকের সুখবর দিয়েছিলেন, তিনিও ছিলেন একজন নবী, সৎকর্মপরায়ণদের একজন।

এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ- ইব্রাহিম বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এক সৎকর্ম পরায়ণ পুত্র দাও।’ 
আমি তাকে এক ধীর স্থির পুত্রের খবর দিলাম। তারপর যখন তার পিতার সঙ্গে কাজ করার মত বয়স হল তখন ইব্রাহিম তাকে বলল, ‘বাছা! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, তোমাকে আমি কোরবাণী করছি, এখন তোমার কি বলার আছে?’
সে বলল, ‘পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে তাই করুন। আল্লাহ ইচ্ছে করলে, আপনি দেখবেন আমি ধৈর্য্য ধরতে পারি।’
তারা দু’জনে যখন আনুগত্য প্রকাশ করল ও ইব্রাহিম তার পুত্রকে (কোরবাণী করার জন্যে) কাত করে শুইয়ে দিল। তখন আমি তাকে ডেকে বললাম, ‘হে ইব্রাহিম! তুমি তো স্বপ্নের আদেশ সত্যিই পালন করলে।’ 

নিশ্চয়ই এ ছিল এক স্পষ্ট পরীক্ষা। আমি (তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে) কোরবাণী করার জন্যে দিলাম এক মহান জন্তু এবং তাকে রেখে দিলাম পরবর্তীদের মাঝে (স্মরণীয় করে), ইব্রাহিমের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। এভাবে আমি সৎ-কর্মপরায়ণদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি। সে ছিল আমার এক বিশ্বাসী দাস। আমি তাকে ইসহাকের সুখবর দিয়েছিলাম, সে ছিল এক নবী, সৎকর্মপরায়ণদের একজন।(৩৭:৯৯-১১২)

সমাপ্ত।
ছবি: Wikipedia, bibleartists.wordpress.

১২ মার্চ, ২০১২

Qibla: নামাজের কেবলার পরিবর্তন।


মক্কাতে কা‘বা এবং বায়তুল মুকাদ্দাসকে কেবলা (Qibla) করে নামাজ পড়া হত। কিন্তু হিযরতের পর বায়তুল মুকাদ্দাসকেই কেবলা করা হয়েছিল। এতে ইহুদিরা বলতে শুরু করল, ‘দেখ! মুহম্মদ আমাদের দ্বীন স্বীকার করে না, অথচ আমাদের কেবলামুখী হয়ে নামাজ পড়ছে।’

আর মক্কাতে এখবর পৌঁছিলে কুরাইশরা বলতে লাগল, ‘দেখ! মুহম্মদ কি সব বিষ্ময়কর কর্মকান্ড করছে। সে নিজেকে ইব্রাহিমের অনুসারী হবার দাবী করে, অথচ তার কেবলা মানছে না। তার কাজে ও কথায় কোন মিল নেই।’

বায়তুল মুকাদ্দাস,  জেরুজালেম।
সহসা হিজরী ২ সনের রজব মাসে (যেখানে বর্তমানে মসজিদে কিবলায়তান রয়েছে) এই আয়াত নাযিল হলঃ

‘নিশ্চয়ই আমি তোমাকে বার বার উর্দ্ধদিকে মুখ তুলে তাকাতে দেখেছি। সেজন্যে আমি তোমাকে এমন একটি কেবলার দিকে মুখ ফেরাব, যাতে তুমি খুশী হবে। অতএব তুমি মসজিদুল হারামের দিকে তোমার মুখ ফেরাও। তোমরা যেখানেই থাক না কেন যখন প্রার্থনা করবে, তার দিকে মুখ ফেরাবে। যারা আহলে কিতাবে, তারা অবশ্যই জানে যে এটাই ঠিক পালনকর্তার পক্ষ থেকে। আল্লাহ বেখবর নন, সে সমস্ত কর্ম থেকে যা তারা করে।(২:১৪৫)

আর যে স্থান থেকে তুমি বের হও, নিজের মুখ মসজিদে হারামের দিকে ফেরাও- নিঃসন্দেহে এটাই হল তোমার পালনকর্তার পক্ষ থেকে নির্ধারিত বাস্তব সত্য। বস্তুতঃ তোমার পালনকর্তা তোমাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অনবহিত নন।(২:১৪৯)

আর তোমরা যেখান থেকে বেরিয়ে আস এবং যেখানেই অবস্থান কর সেদিকেই মুখ ফেরাও, যাতে করে মানুষের জন্যে তোমাদের সাথে ঝগড়া করার অবকাশ না থাকে। অবম্য যারা অবিবেচক তাদের কথা আলাদা। কাজেই তাদের আপত্তিতে ভীত হইও না।(২:১৫০)

আল আকসার সম্মুখ প্রাঙ্গন।
কেবলার এই পরিবর্তনে ইহুদিরা নানারকম মন্তব্য করতে লাগল। কেউ কেউ বলতে লাগল, ‘এই দেখ, মুহম্মদ তার কেবলা পরিবর্তন করল। এতদিনে কি তাহলে ভুল কেবলায় ছিল?’

কেউ কেউ বলল, ‘কিসে মুসলমানদের ফিরিয়ে দিল তাদের ঐ কেবলা থেকে, যার উপর তারা ছিল?’
কেউ কেউ বলল, ‘তাহলে যারা জেরুজালেমের বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে কেবলা করে এবাদত করেছে এবং ইতিমধ্যে মারা গিয়েছে তাদের কি হবে?

তাদের এই সমস্ত কথাবার্তার জবাবে আল্লাহ জানালেন যে, পূর্ব পশ্চিম তো আল্লাহরই। তাছাড়া তিনি মুহম্মদ যে কেবলার উপর ছিলেন তাকে এইজন্যে কেবলা করেছিলেন যাতে এটা প্রতীয়মান হয় যে, কে রসূলের অনুগামী থাকে এবং কে পিঠটান দেয়। তিনি এমন নন যে কারও ঈমান নষ্ট করে দেবেন। তিনি তো মানুষের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল, করুণাময়। 

মসজিদ ই কিবলাতাইন বা দু'কিবলার মসজিদ।
কোরআনের আয়াতটি এই -‘এখন নির্বোধেরা বলবে, কিসে মুসলমানদের ফিরিয়ে দিল তাদের ঐ কেবলা থেকে, যার উপর তারা ছিল? তুমি বল, ‘পূর্ব পশ্চিম আল্লাহরই। তিনি যাকে ইচ্ছে সরলপথে চালান।’ 

তুমি যে কেবলার উপর ছিলে, আমি তাকে এজন্যেই কেবলা করেছিলাম, যাতে একথা প্রতীয়মান হয় যে, কে রসূলের অনুগামী থাকে আর কে পিঠটান দেয়। নিশ্চয় এটা কঠোর বিষয়, কিন্তু তাদের জন্যে নয়, যাদেরকে আল্লাহ পথপ্রদর্শণ করেছেন। আল্লাহ এমন নন যে তোমাদের ঈমান নষ্ট করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল, করুণাময়। (২:১৪২,১৪৪)

সমাপ্ত।
ছবি: atlastours.net, seetheholyland.net, islamiclandmarks.

৮ মার্চ, ২০১২

Muhammad: ইহুদি রমনীর হত্যা প্রচেষ্টা।


মদিনা থেকে বিতাড়িত ইহুদিরা তাদের স্বগোত্রীয় লোকদের কাছে খায়বরে আশ্রয় নিয়েছিল। খায়বর শব্দের অর্থ সুরক্ষিত স্থান। এখানে অনেকগুলি সুরক্ষিত দূর্গ ছিল যাদের মধ্যে 'আল কামুস' ছিল প্রধান।

আল কামুস।
খায়বরের ইহুদিরা পূর্ব থেকেই মুসলমানদের বিরুদ্ধে সক্রিয় ও দুর্দমনীয় বিদ্বেষ পোষণ করত এবং তাদের স্বগোত্রীয় লোকদের আগমনে এই অনুভূতি একটি প্রবল শক্তিতে রূপান্তরিত হল। তারা একটি প্রাচীন চুক্তির মাধ্যমে বনি গাতাফানদের বেদুইন দল ও অন্যান্য গোত্রের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হল এবং মুসলমানদের ধ্বংস সাধনের নিমিত্তে একটি সম্মিলিত দল গঠনের চেষ্টা চালাতে লাগল।

মুহম্মদ (Muhammad) তাদের ক্ষতিসাধনকারী শক্তি সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। ফলে তাদের সম্মিলিত শক্তি প্রয়োগের কু-ফল এড়ানোর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরী হয়ে পড়ল। সুতরাং হুদাইবিয়া থেকে ফিরে আসার কয়েক সপ্তাহ পরে, ৭ম হিজরীর মুহররম মাসের প্রথমদিকে চৌদ্দশত সৈন্যের এক বাহিনী খায়বরের বিরুদ্ধে প্রেরিত হল।

আল কামুস।
মুসলমানরা ইহুদিদের কাছে সন্ধির শর্তাদি প্রদান করল। কিন্তু তারা তা অস্বীকার করল। ফলে, অবরোধ আরোপ করা হল এবং তাদের প্রবল বাঁধা সত্ত্বেও একটির পর একটি দূর্গের পতন হতে লাগল। আল কামুস দূর্গটি ছিল সর্বাপেক্ষা দুর্ভেদ্য। অবশেষে তারও পতন হল।
অতঃপর ইহুদিরা ক্ষমাপ্রার্থনা করল।

মুহম্মদ ছিলেন কোমলমতি, অত্যন্ত ক্ষমাশীল এবং দয়ালু। সুতরাং ইহুদিরা ক্ষমা পেল। মুহম্মদ তাদেরকে তাদের জমি জমা ও স্থাবর সম্পত্তি ভোগ-দখলের নিশ্চয়তা প্রদান করলেন (সদাচরনের উপর) এবং একই সঙ্গে তাদের নিজস্ব ধর্ম পালনেরও স্বাধীনতা দিলেন। কিন্তু যেহেতু তারা নিয়মিত করসমূহ থেকে অব্যাহতি পেয়েছে, কাজেই এখন থেকে প্রজাতন্ত্রের সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা ভোগের জন্যে তিনি তাদের উপর প্রজাতন্ত্র কর আরোপ করলেন- এই করের পরিমাণ নির্ধারিত হয়েছিল উৎপন্ন শস্যের অর্ধেক।

এই খায়বরে অবস্থানের সময় এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটল। জয়নব নাম্মী এক ইহুদি রমনী বিশ্বাসঘাতকতা করে মুহম্মদ ও তার কয়েকজন শিষ্যকে বিষাক্ত খাদ্য পরিবেশন করল। সে রন্ধনকৃত মাংস নিয়ে কয়েকজন ইহুদি পুরুষসহ মুসলিম সেনাছাউনিতে এসে মুহম্মদের খেদমতে উপস্থিত হয়ে বিনয় সহকারে বলেছিল, ‘হে রসূল আল্লাহ! আপনার জন্যেই এই সামান্য হাদয়া (উপঢৌকন) এনেছি, আপনি এ গ্রহণ করবেন কি?’
মুহম্মদ কখনও কোন মুসলিম কি অমুসলিমদের উপঢৌকন ফেরৎ দিতেন না। কাজেই তিনি ধন্যবাদের সাথে তা গ্রহণ করলেন। অতঃপর সেই আহারের সামান্য ভক্ষণের পরই একজন শিষ্য (বশর) অজ্ঞান হয়ে পড়ল। মুহম্মদ জ্ঞান হারালেন না বটে, কিন্তু বিষের ক্রিয়া তার শরীরের গভীরে প্রবেশ করল এবং পরবর্তীকালে তিনি এই বিষক্রিয়ায় মারাত্মকভাবে ভুগেছিলেন এবং শেষপর্যন্ত তারফলে তার মৃত্যু ঘটেছিল। 

অন্যান্য ইহুদি ও জয়নবকে ডাকা হল। জয়নব অপরাধ স্বীকার করে বলল, ‘খাদ্যে বিষ মিশ্রিত করেছি আমি। আর হ্যাঁ, এ কাজ জেনে শুনেই করেছি।’ -তার চোখেমুখে জিঘাংসার মনোবৃত্তি ফুটে উঠল। সে বলে চলল-‘হে মুহম্মদ! আপনার জন্যে আমার পিতা, পিতৃব্য এবং স্বামী যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন। আপনি নিজেকে পয়গম্বর বলে দাবী করাতেই আমার এই সর্বনাশ ঘটেছে।’
মুহম্মদ হাস্য সহকারে বললেন, ‘তুমি যা চেয়েছ, তা হল না। আল্লাহ প্রেরিত রসূল আমি। সুতরাং তাঁর ইচ্ছে ব্যতিত কখনও কেউ আমাকে হত্যার কাজে সফল হতে পারবে না।’

অতঃপর ইহুদি পুরুষদেরকে জিজ্ঞেস করা হল, ‘তোমরা কি উদ্দেশ্যে এই কার্যে সহযোগিতা করতে প্রবৃত্ত হয়েছিলে?’
তারা সমস্বরে উত্তর করল, ‘আমাদের মনে হয়েছিল আপনি যদি ভন্ড ও মিথ্যেবাদী হন, তাহলে এই বিষের বিন্দুমাত্র আপনার জিহ্বা স্পর্শ করা মাত্রই আপনি পঞ্চত্বপ্রাপ্ত হবেন, আর আমরাও স্বস্তিলাভ করব। পক্ষান্তরে যদি আপনি সত্য সত্যই আল্লাহর নবী হন, তাহলে এ বিষ আপনার প্রাণনাশ করতে পারবে না।’
সত্যধর্ম ইসলামকে পৃথিবীর বুক থেকে মুছে ফেলতে য়ড়যন্ত্রে লিপ্ততা, আল্লাহ ও তার রসূলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিরুদ্ধাচারণ ও অস্ত্রধারণ, তারপর পরাজয়ের পর এই ঘৃণ্য চক্রান্ত -মুসলিম যোদ্ধাগণ ইহুদিদের ভবিষ্যৎ পরিণতি সম্পর্কে অত:পর খুব একটা সন্ধিহান ছিলেন না।

কিন্তু ঘৃণ্য এই অপরাধ সত্ত্বেও ইহুদি পুরুষেরা ক্ষমা পেল। শিষ্যরা নিশ্চিত ছিলেন জয়নবের বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ডাদেশ ঘোষিত হবে। জয়নবের নিজের ধারণাও এর বিপরীত ছিল না। কিন্তু সেও ক্ষমা পেল। শুধু ক্ষমা নয়, শিষ্যদের আপত্তি উপেক্ষা করে এই জঘন্য অপরাধ সত্ত্বেও তাকে তার স্বজাতীদের মধ্যে অক্ষত অবস্থায় বাস করার অনুমতি দেয়া হল। 

তিন দিনের দিন বশরের মৃত্যু হল। এসময় অবশ্য ইচ্ছাপূর্বক নরহত্যার অপরাধে জয়নবকে প্রাণদন্ডাদেশ দেয়া হয়েছিল। 

সমাপ্ত।
ছবি: Internet, flickr.

৪ মার্চ, ২০১২

Banu Qaynuqa: ইহুদি গোত্র বনি কাইনুকার মদিনা থেকে নির্বাসন।



ইহুদি গোত্র বনি কাইনুকা (Banu Qaynuqa) র বেশীরভাগ লোক ছিল কারিগর। তারা স্ব-ধর্মাবলম্বী লোকদের মত দেশদ্রোহী, দুর্বিনীত ও কলহপ্রিয়। তারা তাদের চরম নৈতিক শৈথিল্যের জন্যেও বিখ্যাত ছিল। একদিন এক গ্রাম্য তরুণী বাজারে দুধ বিক্রি করতে এল। ইহুদি তরুণেরা তার সঙ্গে অশ্লীল আচরণ করল। একজন মুসলমান পথচারী বালিকার পক্ষ গ্রহণ করলে যে দাঙ্গার সুত্রপাত হল তাতে অশ্লীল আচরণকারী নিহত হল। ফলে উপস্থিত ইহুদিরা মুসলমানটাকে হত্যা করে ফেলল।

বনি কাইনুকার বাসস্থান।
এই ঘটনায় উত্তেজিত মুসলমানরা অস্ত্রধারণ করল এবং এক বন্য দৃশ্যের অবতারণা ঘটল। রক্তের স্রোত প্রবাহিত হল এবং উভয়পক্ষের বহুলোক নিহত হল। দাঙ্গার প্রাথমিক খবর পেয়েই মুহম্মদ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলেন এবং তার শিষ্যদের উন্মত্ততা আয়ত্তে আনলেন। তিনি অবিলম্বে দেখতে পেলেন যে দেশদ্রোহ ও উচছৃঙ্খলতাকে যদি প্রশ্রয় দেয়া হয় তবে এক ভয়াবহ পরিণতি নেমে আসবে। ইহুদিরা প্রকাশ্যে ও জ্ঞাতসারে চুক্তির শর্তাদি লংঘন করছে। কঠোর হস্তে এ সবের পরিসমাপ্তি ঘটান প্রয়োজন। নইলে শান্তি ও নিরাপত্তা চিরতরে বিদায় হবে। ফলে তিনি তৎক্ষণাৎ বনি কাইনুকা গোত্রের আবাসস্থলে গেলেন এবং বললেন- "O Jews, beware lest God bring on you the like of the retribution which he brought on Quraysh. Accept Islam, for you know that I am a prophet sent by God. You will find this in your scriptures and in God's covenant with you." -(Guillaume 363) এভাবে মুহম্মদ তাদেরকেইসলাম গ্রহণ করে তাদেরকে সুনির্দিষ্টভাবে মুসলিম কমনওয়েলথের অন্তর্ভূক্ত হতে কিম্বা মদিনা ত্যাগ করতে নির্দেশ দিলেন।
ইহুদিরা অত্যন্ত আপত্তিকর ভাষায় এই নির্দেশের জবাব দিল, ‘হে মুহম্মদ, তোমার লোকেরা কুরাইশদের উপর বিজয়ী হয়েছে বলে গর্বিত হইও না। যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী নয় এমন লোকদের সঙ্গেই তুমি যুদ্ধ করেছ। আমাদের সঙ্গে তুমি যদি বোঝাপড়ায় আসতে চাও, তবে আমরা তোমাকে দেখিয়ে দেব আমরা কেমন বাপের ব্যাটা (Muhammad, do you think that we are like your people? Do not be deluded by the fact that you met a people with no knowledge of war and that you made good use of your opportunity. By God, if you fight us you will know that we are real men!)।’-(Guillaume 363)
তারা তাদের দূর্গে আশ্রয় নিল এবং মুহম্মদের নির্দেশ অগ্রাহ্য করল। 

বনি কাইনুকাদেরকে দমন করা একটি অপরিহার্য কর্তব্য ছিল। তাই কালবিলম্ব না করে দূর্গ অবরোধ করা হল। কয়েকদিনের মধ্যেই ইহুদিরা বুঝতে পারল এই মোকাবেলা তাদের জন্যে ফলপ্রসূ হবে না। পনের দিন পরে তারা আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নিল এবং দুর্গের ফটক খুলে দিল। অতঃপর তারা মুহম্মদকে বলল- ‘হে রসূল আল্লাহ! আপনি আমাদের সম্পর্কে যে সিদ্ধান্ত নেবেন আমরা তাতেই সম্মত আছি।’

প্রথমে তাদেরকে কঠোর শাস্তি দেয়া হবে বলে মনস্থ করা হয়েছিল কিন্তু মুহম্মদের চরিত্রের কোমলতা বিচারের অনিবার্য রায় জয় করল এবং কাইনুকা গোত্রের লোকদেরকে শুধুমাত্র নির্বাসিত করা হল।

Abd-Allah ibn Ubayy was attempting to stop the expulsion, and Muhammad's insistence was that the Qaynuqa must leave the city, but was prepared to be lenient about other conditions; Ibn Ubayy argument was that presence of Qaynuqa with 700 fighting men can be helpful in the view of the expected Meccan onslaught. -(William Montgomery Watt)

Muhammad divided the property of the Banu Qaynuqa, including their arms and tools, among his followers, taking for the Islamic state a fifth share of the spoils for the first time. 

The Banu Qaynuqa left first for the Jewish colonies in the Wadi al-Kura, north of Medina, and from there to Der'a in Syria, west of Salkhad. In the course of time, they assimilated with the Jewish communities, pre-existing in that area, strengthening them numerically.

সমাপ্ত।
ছবি: islamiclandmarks.

২ মার্চ, ২০১২

Jews: মুহম্মদ ও কোরআন এবং মদিনার ইহুদিদের প্রতিক্রিয়া।


মদিনার ইহুদিরা (Jews) ছিল বিত্তশালী ও স্বাচ্ছন্দ্যশীল। তাদের কাছে যখন ইসলামের দাওয়াত পৌঁছিল, তখন তাদের অধিকাংশই মুখ ফিরিয়ে নিল। ফলে আল্লাহ শাস্তি হিসেবে তাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য হ্রাস করে দেন। এতে তারা দরিদ্র হয়ে পড়ে। তখন মূর্খদের মুখ থেকে এ জাতীয় কথাবার্তা বের হল যে, আল্লাহর ধন-ভান্ডার ফুরিয়ে গেছে অথবা আল্লাহ কৃপণ হয়ে গেছেন। 

এর উত্তরে এই আয়াত নাযিল হল- আর ইহুদিরা বলে, আল্লাহর হাত বন্ধ হয়ে গেছে। তাদের হাত বন্ধ হোক। এ কথা বলার জন্যে তাদের প্রতি অভিসম্পাৎ। বরং তাঁর উভয় হাত উন্মুক্ত। তিনি যেরূপ ইচ্ছে ব্যয় করেন। তোমার প্রতি পালনকর্তার পক্ষ থেকে যে বাণী অবতীর্ণ হয়েছে, তার কারণে তাদের অনেকের কুফর ও অবাধ্যতা পরিবর্ধিত হবে।(৫:৬৪)

ইহুদিরা বিরোধিতা করতে মুসলমানদেরকে বলল, ‘আমরা তোমাদের চাইতে শ্রেষ্ঠ ও সম্ভ্রান্ত। কারণ আমাদের নবী ও আমাদের গ্রন্থ, তোমাদের নবী ও তোমাদের গ্রন্থের পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছে।’
মুসলমানরা বলল, ‘আমরাই তোমাদের চাইতে শ্রেষ্ঠ। কেননা, আমাদের নবী সর্বশেষ নবী এবং আমাদের গ্রন্থ সর্বশেষ গ্রন্থ। এ গ্রন্থ পূর্ববর্তী সকল গ্রন্থকে রহিত করে দিয়েছে।’

এই কথোপকথনের পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াত নাযিল হল- তোমাদের আশার উপরও ভিত্তি নয় এবং আহলে কিতাবীদের আশার উপরও না। যে কেউ মন্দ কাজ করবে, সে তার শাস্তি পাবে এবং সে আল্লাহ ছাড়া নিজের কোন সমর্থক বা সাহায্যকারী পাবে না।(৪:১২৩)

মুহম্মদ জনসমক্ষে ঘোষণা করলেন, ‘আমরা যাবতীয় মূলনীতিতে ও এবং অধিকাংশ শাখাগত বিধিবিধানে ইব্রাহিমী ধর্মের অনুসারী।’
একথা শুনে ইহুদিরা আপত্তি উত্থাপন করে বলল, ‘আপনারা উটের মাংস খান, তার দুধ পান করেন। অথচ এগুলো ইব্রাহিমের প্রতি হারাম ছিল।’
মুহম্মদ বললেন, ‘এগুলো তার প্রতি হারাম ছিল না।’
তারা বলল, ‘আমরা সেইসব বস্তুই হারাম মনে করি যা নূহ ও ইব্রাহিমের আমল থেকেই হারাম হিসেবে আমাদের কাছে পৌঁছেছে।’

এরই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াত নাযিল হল-তাওরাত নাযিল হওয়ার পূর্বে ইয়াকুব যেগুলো নিজেদের জন্যে হারাম করে নিয়েছিল, সেগুলো ব্যতিত সমস্ত আহার্য বস্তুই বনি ইস্রায়েলীদের জন্যে হালাল ছিল। তুমি বলে দাও, ‘তোমরা যদি সত্যবাদী হয়ে থাক, তাহলে তাওরাত নিয়ে এস এবং তা পাঠ কর।’(৩:৯৩)
বল, ‘আল্লাহ সত্য বলেছেন, এখন সবাই ইব্রাহিমের ধর্মের অনুগত হয়ে যাও, যিনি ছিলেন একনিষ্ঠভাবে সত্য ধর্মের অনুসারী। তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন না।’(৩:৯৫)

কয়েকজন ইহুদি ঈমাম ‘তোমাদেরকে অতি সামান্য পরিমান জ্ঞানই প্রদান করা হয়েছে।’  কোরআনের এই আয়াত প্রসঙ্গে আপত্তির সূরে বলল, ‘এই আয়াত দ্বারা কি শুধু আপনাদের অবস্থাই বর্ণনা করা হয়েছে, না এতে আমাদেরকেও অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে?’
মুহম্মদ বললেন, ‘সকলকেই।’
এতে তারা আপত্তির সূরে বলল, ‘আমাদেরকে তো আল্লাহ কর্তৃক তাওরাত প্রদান করা হয়েছে যা সকল বস্তুর (রহস্য) বর্ণনাকারী।’
তিনি বললেন, ‘এও আল্লাহর জ্ঞানের তুলনায় অতি নগণ্য। আর তাওরাতে যেসব জ্ঞান রয়েছে সে সম্পর্কেও তোমরা পুরোপুরি অবহিত নও। আল্লাহর জ্ঞানের তুলনায় যাবতীয় আসমানী গ্রন্থ এবং সমস্ত নবীগণের সমষ্টিগত জ্ঞানও অতিশয় কিঞ্চিৎকর ও নগণ্য।’

এই বক্তব্যের সমর্থনেই এই আয়াত নাযিল হল-পৃথিবীতে যত বৃক্ষ আছে, সবই যদি কলম হয় এবং সমুদ্রের সাথেও সাত সমুদ্র যুক্ত হয়ে কালি হয়, তবুও তাঁর বাক্যাবলি লিখে শেষ করা যাবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।(৩১:২৭)

ইহুদি এক ঈমাম বললেন, ‘আল্লাহ কোন মানুষের প্রতি কোন কিছু অবতীর্ণ করেননি।’
মুহম্মদ এ শুনে বললেন, ‘ঐ গ্রন্থ কে নাযিল করেছেন, যা মূসা নিয়ে এসেছিল?’
ইহুদি ঐ ঈমাম চুপ করে রইলেন। মুহম্মদ বললেন, ‘আল্লাহ নাযিল করেছেন।’

ইহুদি ঈমামের উপরোক্ত উক্তি ছিল ক্রোধ ও বিরক্তির বহিঃপ্রকাশ, যা স্বয়ং তাদের পালিত ধর্মেরও পরিপন্থি ছিল। পরবর্তিতে ইহুদিরা ক্ষেপে গিয়ে তাকে  অবশ্য ধর্মীয় পদ থেকে অপসারিত করেছিল।

এ সংক্রান্ত আয়াত-তারা আল্লাহকে যথার্থ মূল্যায়ণ করতে পারেনি, যখন তারা বলল, আল্লাহ কোন মানুষের প্রতি কোন কিছু অবতীর্ণ করেননি।’
তুমি জিজ্ঞেস কর, ঐ গ্রন্থ কে নাযিল করেছে, যা মূসা নিয়ে এসেছিল? যা জ্যোতি বিশেষ এবং মানবমন্ডলীর জন্যে হেদায়েত স্বরূপ, যা তোমরা বিক্ষিপ্ত পত্রে রেখে লোকদের জন্যে প্রকাশ করছ এবং বহুলাংশকে গোপন করছ। তোমাদেরকে এমন অনেক বিষয় শিক্ষা দেয়া হয়েছে, যা তোমরা এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরা জানত না।’
তুমি বলে দাওঃ আল্লাহ নাযিল করেছেন।’
অতঃপর তাদেরকে তাদের ক্রীড়ামূলকবৃত্তিতে ব্যাপৃত থাকতে দাও।(৬:৯১)

পূর্ববর্তী নবীদের আমলে সদকার বস্তু কোন মাঠে বা পাহাড়ের উপর রেখে দেয়া হত। আর তা কবুল হলে আগুন এসে তা পুড়িয়ে ফেলত। কিন্তু মুহম্মদের নব্যুয়তে এসে এটা গরীব দুঃখীদের মধ্যে বিলিয়ে দেবার নির্দেশ হয়। এ কারণেই ইহুদিদের কিছু ব্যক্তি মুহম্মদকে অস্বীকার করে বলল, ‘আপনি যদি নবীই হতেন, তবে এমন মু‘জেযাপ্রাপ্ত হতেন, যাতে আকাশ থেকে আগুন এসে সদকার বস্তু গ্রাস করে ফেলত।’
অধিকন্তু তারা ধৃষ্টতা প্রদর্শণ করে আল্লাহর প্রতি অপবাদ আরোপ করে আরও বলল, ‘আল্লাহ আমাদের কাছ থেকে এমন প্রতিজ্ঞা নিয়েছেন যে, আমরা যেন এমন লোকের প্রতি ঈমান না আনি, যার সদকা এভাবে কবুল না হবে।’

এরই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতসমূহ নাযিল হয়- সে সমস্ত লোক যারা বলে যে, আল্লাহ আমদিগকে এমন কোন রসূলের উপর বিশ্বাস না করতে বলে রেখেছেন, যতক্ষণ না তারা আমাদের কাছে এমন কোরবানী নিয়ে আসবেন, যাকে আগুন গ্রাস করে নেবে।’
তুমি তাদের বলে দাও, ‘তোমাদের মাঝে আমার পূর্বে বহু রসূল নিদর্শনসমূহ এবং তোমরা যা আব্দার করেছ তা নিয়ে এসেছিল, তখন তোমরা কেন তাদের হত্যা করলে যদি তোমরা সত্য হয়ে থাক।’(৩:১৮৩)

আল্লাহ তাদের কাছ থেকে প্রতিজ্ঞা নিয়েছেন-ইহুদিদের এই দাবী যেহেতু আদৌ প্রমান ভিত্তিক ছিল না, কাজেই কোরআন তার কোন উত্তর না দিয়ে তাদের নিজেদের বক্তব্যের দ্বারাই তাদেরকে ধরাশায়ী করেছে এভাবে- তোমরা যদি তোমাদের দাবীতে সত্যবাদী হয়ে থাক, তবে যে সব নবী-রসূল তোমাদের কথামত এ মু‘জেযাও দেখিয়েছিল, তখন তোমরা তাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করনি কেন? কেন তাদেরকে হত্যা করেছ?

আল্লাহ জানতেন যে, ইহুদিরা শুধুমাত্র বিদ্বেষ ও হঠকারীতাবশতঃই এসব কথা বলছে, মু‘জেযা প্রকাশিত হলেও এরা ঈমান গ্রহণ করত না। তাই মুহম্মদকে সান্তনা দেয়া হয়েছে এভাবে- তাছাড়া এরা যদি তোমাকে মিথ্যে প্রতিপন্ন করে, তবে তোমার পূর্বেও এরা এমন বহু নবীকে মিথ্যে প্রতিপন্ন করেছে যারা নিদর্শণসমূহ নিয়ে এসেছিল এবং এনেছিল সহীফা ও প্রদীপ্ত গ্রন্থ।(৩:১৮৪)

ইহুদিরা বলল, ‘আমরা আল্লাহর সন্তান ও তাঁর প্রিয়জন।’
এ কথা শুনে মুহম্মদ বললেন, ‘তবে তিনি তোমাদেরকে পাপের বিনিময়ে কেন শাস্তি দেবেন? বরং তোমরাও অন্যান্য সৃষ্ট মানবের অন্তর্ভূক্ত সাধারণ মানুষ।’

এ সংক্রান্ত কোরআনের আয়াত- ইহুদি ও খ্রীষ্টানরা বলে, আমরা আল্লাহর সন্তান ও তাঁর প্রিয়জন। তুমি বল, তবে তিনি তোমাদেরকে পাপের বিনিময়ে কেন শাস্তি দান করবেন? বরং তোমরাও অন্যান্য সৃষ্ট মানবের অন্তর্ভূক্ত সাধারণ মানুষ। তিনি যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছে শাস্তি প্রদান করেন।(৫:১৮)

আর ইহুদিদের অধিকাংশ বলল, ‘আমরা শুধু তাওরাতের প্রতিই ঈমান আনব, অন্যান্য গ্রন্থের প্রতি নয়।’
তাদের বক্তব্যের সারমর্ম হল- মূসার প্রচারিত ধর্ম রহিত হয়ে যায়নি। কাজেই মুহম্মদের নব্যুয়ত অস্বীকার করলেও তারা অবিশ্বাসী নয়। সুতরাং যদি কোন পাপের কারণে তারা দোযখে চলেও যায়, তবে অল্পদিনের মধ্যেই তারা মুক্তি পাবে।
কিন্তু তারা ঈসা ও মুহম্মদের নব্যুয়ত অস্বীকার করার কারণে অবিশ্বাসী। আর অবিশ্বাসী কিছুদিন পরেই দোযখ থেকে মুক্তি পাবে এমন কথা কোন আসমানী কিতাবে নেই।
ইহুদিদের এই উক্তি এবং তাদের এই যুক্তিহীন দাবীর জবাবে কোরআন বলছে- যখন তাদেরকে বলা হয়, আল্লাহ যা পাঠিয়েছেন তা মেনে নাও, তখন তারা বলে, ‘আমরা মানি যা আমাদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে। সেটি ছাড়া সবগুলোকে তারা অস্বীকার করে। অথচ এ গ্রন্থটি সত্য এবং সত্যায়ন করে ঐ গ্রন্থের যা তাদের কাছে রয়েছে। 
বলে দাও তবে তোমরা ইতিপূর্বে পয়গম্বরদের হত্যা করতে কেন যদি তোমরা বিশ্বাসী ছিলে? সুস্পষ্ট মু‘জেযাসহ মূসা তোমাদের কাছে এসেছে। এরপর তার অনুপস্থিতে তোমরা গো-বৎস বানিয়েছ। বাস্তবিকই তোমরা অত্যাচারী।(২:৯১-৯২)

তারা বলে, ‘আগুন আমাদিগকে কখনও স্পর্শ করবে না; কিন্তু গনাগনতি কয়েকদিন।’
বলে দাও, ‘তোমরা কি আল্লাহর কাছ থেকে কোন অঙ্গীকার পেয়েছ যে, আল্লাহ কখনও তার খেলাফ করবেন না- না তোমরা যা জান না তা আল্লাহর সাথে জুড়ে দিচ্ছ। হ্যাঁ, যে ব্যক্তি পাপ অর্জণ করেছে এবং সে পাপ তাকে পরিবেষ্ঠিত করে নিয়েছে, তারাই দোযখবাসী। তারা সেখানেই চিরকাল থাকবে। পক্ষান্তরে যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তারাই জান্নাতের অধিবাসী। তারা সেখানেই চিরকাল থাকবে।’(২:৮০-৮২)

১ম আয়াতে যা আমাদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে-এই উক্তি থেকে প্রতিহিংসা বোঝা যায়। আয়াতের পরিস্কার অর্থ হচ্ছে যে, যেহেতু অন্যান্য গ্রন্থ আমাদের প্রতি নাযিল করা হয়নি, কাজেই আমরা সেগুলোর প্রতি ঈমান আনব না।
আল্লাহ তাদের এই উক্তি খন্ডনে বলেছেন- অন্যান্য গ্রন্থের সত্যতা ও বাস্তবতা যখন অকাট্য দলীল দ্বারা প্রমানিত; তখন তা অহেতুক অস্বীকার করার কোন কারণ নেই।
-অন্যান্য গ্রন্থসমূহ হচ্ছে তাওরাত, ইঞ্জিল প্রভৃতি। কোরআন এদের প্রত্যেকটির সত্যায়ন করে। সুতরাং কোরআনকে অস্বীকার করলে এগুলিকেও অস্বীকার করা হয়।
-সকল আসমানী কিতাবে নবীদের হত্যা করা নিষিদ্ধ। তাদের সম্প্রদায় কয়েকজন নবীকে হত্যা করেছে অথচ তারা বিশেষভাবে তাওরাতের শিক্ষা প্রচার করত।- এভাবে তারা কি তাওরাতের সাথেই কুফর করেনি?

আব্দুল্লাহ বিন সরিয়া নামক জনৈক ইহুদি মুহম্মদকে জিজ্ঞেস করল, ‘কোন ফেরেস্তা আপনার কাছে ওহী নিয়ে আগমন করে?’
তিনি বললেন, ‘জিব্রাইল।’
ইহুদি তৎক্ষণাৎ বলল, ‘এই কারণেই আমরা আপনার উপর ঈমান আনতে পারছিনে। জিব্রাইল আমাদের শত্রু, সে মানুষের উপর আযাব নিয়ে হাজির হয়। সে আমাদের কয়েকটি সম্প্রদায় ধ্বংস করেছে। নেবু চাঁদ নেজ্জার যখন জেরুজালেম ধ্বংস করল, তখন সে কিছুই করেনি। সে কি বনি ইস্রায়েল বংশে ওহী নিয়ে আসতে পারত না?
ফেরেস্তা মিকাইল শান্তি, সমৃদ্ধি ও রিজিক নাযিল করে। তাই জিব্রাইলের পরিবর্তে মিকাইল ওহী নিয়ে এলে আমরা আপনার প্রতি ঈমান আনব।’

এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতসমূহ নাযিল হল- তুমি বলে দাও, যে কেউ জিব্রাইলের শত্রু হয়- যেহেতু সে আল্লাহর আদেশে এই কালাম তোমার অন্তরে নাযিল করেছে, যা সত্যায়নকারী তাদের সম্মুখস্ত কালামের এবং মুমিনদের জন্যে পথ প্রদর্শক ও সুসংবাদদাতা। যে ব্যক্তি আল্লাহ, তদীয় ফেরেস্তাকূল তাঁর রসূল এবং জিব্রাইল ও মিকাইলের শত্রু, নিঃসন্দেহে তারা আল্লাহর শত্রু।(২:৯৭-৯৮) 

সুতরাং মুহম্মদ ঐ ইহুদি ব্যক্তিকে বললেন, ‘যদি জিব্রাইল এই কারণে কারও শত্রু হয়- যেহেতু সে আল্লাহর আদেশে এই কালাম আমার অন্তরে নাযিল করেছে, যা সত্যায়নকারী তাওরাতের এবং মুমিনদের জন্যে পথ প্রদর্শক ও সুসংবাদদাতা, তবে সেই ব্যক্তি যে আল্লাহ, তদীয় ফেরেস্তাকূল, তাঁর রসূল এবং জিব্রাইল ও মিকাইলের শত্রু, নিঃসন্দেহে সে আল্লাহরও শত্রু।’

আর যখন কেবলার পরিবর্তন হল, তখন ইহুদিরা নানারকম মন্তব্য করতে লাগল। কেউ কেউ বলতে লাগল, ‘এই দেখ, মুহম্মদ তার কেবলা পরিবর্তন করল। এতদিনে কি তাহলে ভুল কেবলায় ছিল?’
কেউ কেউ বলল, ‘কিসে মুসলমানদের ফিরিয়ে দিল তাদের ঐ কেবলা থেকে, যার উপর তারা ছিল?’
আবার অনেকে বলল, ‘তাহলে যারা জেরুজালেমের বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে কেবলা করে এবাদত করেছে এবং ইতিমধ্যে মারা গিয়েছে তাদের কি হবে?

তাদের এই সমস্ত কথাবার্তার জবাবে আল্লাহ জানালেন যে, পূর্ব পশ্চিম তো আল্লাহরই। তাছাড়া তিনি মুহম্মদ যে কেবলার উপর ছিলেন তাকে এইজন্যে কেবলা করেছিলেন যাতে এটা প্রতীয়মান হয় যে, কে রসূলের অনুগামী থাকে এবং কে পিঠটান দেয়। তিনি এমন নন যে কারও ঈমান নষ্ট করে দেবেন। তিনি তো মানুষের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল, করুণাময়।

কোরআনের আয়াতটি এই -‘এখন নির্বোধেরা বলবে, কিসে মুসলমানদের ফিরিয়ে দিল তাদের ঐ কেবলা থেকে, যার উপর তারা ছিল? তুমি বল, ‘পূর্ব পশ্চিম আল্লাহরই। তিনি যাকে ইচ্ছে সরলপথে চালান।’ 
তুমি যে কেবলার উপর ছিলে, আমি তাকে এজন্যেই কেবলা করেছিলাম, যাতে একথা প্রতীয়মান হয় যে, কে রসূলের অনুগামী থাকে আর কে পিঠটান দেয়। নিশ্চয় এটা কঠোর বিষয়, কিন্তু তাদের জন্যে নয়, যাদেরকে আল্লাহ পথপ্রদর্শণ করেছেন। আল্লাহ এমন নন যে তোমাদের ঈমান নষ্ট করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি অত্যন্ত  স্নেহশীল, করুণাময়। (২:১৪২,১৪৪)

হুইয়া বিন আখতাব নামক এক ইহুদি সূরা বাকারার প্রারম্ভের খন্ড বর্ণমালা আলিফ, লাম, মীম -এই অক্ষরগুলোর পাঠ শুনে বলল, ‘আবজাদের হিসেব অনুযায়ী এই অক্ষরগুলোতে মুহম্মদী ধর্মের স্থায়িত্বকালের বর্ণনা দেয়া হয়েছে।’

সে মুহম্মদের কাছে আগমনপূর্বক বলল, ‘আপনার পূর্বে বহু নবী পাঠান হয়েছে, কিন্তু আপনাকে ব্যতিত আল্লাহ আর কাউকেও রাজ্যের আয়ূ ও উম্মতের দানাপানির সময় সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেননি।’ সে বলল, ‘আলিফ-এক, লাম-ত্রিশ, মিম-চল্লিশ -মোট একাত্তুর বৎসর এই ধর্মের স্থায়িত্বকাল। সুতরাং এমন সংকীর্ণ ধর্মে কোন জ্ঞানী সম্পৃক্ত হতে পারে না।’

এসময় এই আয়াত নাযিল হয়-তিনি (আল্লাহ) তোমার প্রতি এমন কিতাব অবতীর্ণ করেছেন যে কিতাবের কিছু আয়াত সুস্পষ্ট অর্থবোধক, যেগুলো কিতাবের মূলনীতি আর অপর কিছু আয়াত সুষ্পষ্ট অর্থবোধক নয় (যার জ্ঞান আল্লাহই ভাল জানেন) এবং খন্ড বর্ণমালাগুলো সেই আয়াতসমূহের অন্তর্ভূক্ত। সুতরাং যাদের অন্তরে কুটিলতা রয়েছে তারা অনুসরণ করে ফিৎনা বিস্তার এবং অপব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে তন্মধ্যকার রূপকগুলোর। আর সেগুলোর ব্যাখ্যা আল্লাহ ব্যতিত কেউ জানে না।(৩:৭)

সমাপ্ত।

Jews: ইহুদিদের প্রকৃতি, কপট মুসলিম এবং কোরআনের বাণী।


প্রাচীনকাল থেকেই ইহুদিরা (Jews) কখনও স্বজনপ্রীতির বশবর্তী হয়ে এবং কখনও নাম-যশ ও অর্থের লোভে ফতোয়াপ্রার্থীদের মনমত ফতোয়া তৈরী করে দিত। বিশেষতঃ অপরাধের শাস্তির ক্ষেত্রে এটিই ছিল তাদের সাধারণ প্রচলিত পদ্ধতি। কোন ধনী ব্যক্তি অপরাধ করলে তারা তাওরাতের গুরুতর শাস্তিকে লঘু শাস্তিতে পরিবর্তন করে দিত। 

মুহম্মদের মদিনায় আগমনের পর সঠিক ইসলামী জীবন-ব্যবস্থা ইহুদিদের সামনে এল। এসময় তারা একে একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে ব্যাবহার করতে চাইল। মুহম্মদের শরীয়তে একদিকে যেমন নমনীয়তা ছিল, অন্যদিকে অপরাধ দমনের জন্যে যুক্তিযুক্ত বিধি-ব্যবস্থাও ছিল। যেসব ইহুদি তাওরাতের কঠিন শাস্তিসমূহকে পরিবর্তন করে সহজ করে নিত, তারা এ জাতীয় মোকদ্দমায় মুহম্মদকে বিচারক নিযুক্ত করতে প্রয়াস পেত- যাতে একদিকে নরম বিধি-বিধান দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় এবং অন্যদিকে তাওরাত পরিবর্তন করার অপরাধ থেকেও অব্যহতি পাওয়া যায়। কিন্তু এই ব্যাপারেও তারা একটি দুঃস্কৃতির আশ্রয় নিত। তা এই যে, নিয়মিত বিচারক নিযুক্ত করার পূর্বে কোন না কোন পন্থায় তারা মোকদ্দমার রায় ফতোয়া হিসেবে জেনে নিতে চাইত তাদের গোত্রের সেইসব লোকদের মাধ্যমে যারা নিজেদেরকে মুসলমানদের কাছে মুসলমান হিসেবে জাহির করত। উদ্দেশ্য, এই রায় তাদের আকাঙ্খিত রায়ের অনুরূপ হলে বিচারক নিযুক্ত করবে, অন্যথায় নয়। 

আবার মুহম্মদ বা মুসলমানদের কেউ যদি তাদের কাছে এ বিষয়ে তাওরাতের বিধান জানতে চাইতেন, তবে ঐসব ইহুদি যাদের অন্তর মুসলমান না, কিন্তু নিজেদেরকে মুসলমান হিসেবে জাহির করত মুসলমানদের কাছে শুধুমাত্র গুপ্তচরবৃত্তির মানসে, তারা মুহম্মদকে বিভ্রান্ত করতে মিথ্যে বলত। আর যদি তাদের কেউ সত্য প্রকাশ করতই, তাহলে অন্যরা তাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলত-‘আল্লাহ তোমাদের জন্যে যা প্রকাশ করেছেন তা বলে দিচ্ছ? এতে তো শেষ বিচারের দিনে তিনি ও মুসলমানরা তোমাদের বিপক্ষে স্বাক্ষী হবেন এবং পালনকর্তার সামনে তোমাদেরকে মিথ্যে প্রতিপন্ন করবেন। তোমরা কি তা উপলব্ধি কর না?’
এরই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াত নাযিল হয়েছিল- হে রসূল, তাদের জন্যে দুঃখ কোরও না, যারা দৌঁড়ে গিয়ে কুফরে পতিত হয়; যারা মুখে বলেঃ আমরা মুসলমান, অথচ তাদের অন্তর মুসলমান না এবং যারা ইহুদি, মিথ্যে বলার জন্যে যারা গুপ্তচরবৃত্তি করে। তারা অন্যদলের গুপ্তচর যারা তোমাদের কাছে আসেনি। তারা বাক্যকে স্বস্থান থেকে পরিবর্তন করে। তারা বলে, যদি তোমরা এই নির্দেশ পাও, তবে তা গ্রহণ করে নিও এবং যদি এই নির্দেশ না পাও, তবে বিরত থেক।

আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করতে চান তার জন্যে আল্লাহর কাছে তুমি কিছুই করতে পারবে না। এরা এমনিই যে আল্লাহ এদের অন্তরকে পবিত্র করতে চান না। তাদের জন্যে রয়েছে দুনিয়াতে লাঞ্ছনা ও পরকালে বিরাট শাস্তি।(৫:৪১)

যখন তারা মুসলমানদের সাথে মিলিত হয়, তখন বলে আমরা মুসলমান হয়েছি। আর যখন পরস্পরের সাথে নিভৃতে অবস্থান করে, তখন বলে, পালনকর্তা তোমাদের জন্যে যা প্রকাশ করেছেন, তা কি তাদের কাছে বলে দিচ্ছ? তাহলে যে তারা এ নিয়ে পালনকর্তার সামনে তোমাদেরকে মিথ্যে প্রতিপন্ন করবে। তোমরা কি তা উপলব্ধি কর না?(২:৭৬)

ইহুদিদের যারা নিজেদেরকে মুসলমান হিসেবে জাহির এবং মুহম্মদের কাছে আসা যাওয়া করত, তারা ছিল বনি কুরাইজা, বনি নাজির ও বনি কাইনুকার কতিপয় লোক। মুহম্মদ মনে করেছিলেন এসব গোত্রের কিছু লোক মুসলমান হলে অপরাপরদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছান সহজ হবে। সুতরাং তিনি তাদের সাথে সৌজন্যমূলক ব্যাবহার করতে থাকলেন এবং তাদের ছোট বড় সকলকে সম্মান করতে লাগলেন। এমনকি তাদের দ্বারা কোন অসঙ্গতিপূর্ণ কাজ সংঘটিত হলেও ধর্মীয় কল্যাণের কথা চিন্তা করে সেগুলির প্রতি ভ্রুক্ষেপ করলেন না।

অন্যদিকে ঐসব লোকেরা প্রকৃতপক্ষে কপট ও বর্ণচোরা ছিল, অর্থাৎ তারা নিজেদেরকে মুসলমান হিসেবে প্রচার করলেও তাদের অন্তরে ঈমান ছিল না। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মুহম্মদকে সতর্ক করে এই আয়াতসমূহ নাযিল হয়েছিল- হে নবী! আল্লাহকে ভয় কর এবং অবিশ্বাসী ও কপট বিশ্বাসীদের কথা মানবে না। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। তোমার পালনকর্তার পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ হয়, তুমি তার অনুসরণ কর। নিশ্চয় তোমরা যা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে খবর রাখেন। তুমি আল্লাহর উপর ভরষা কর। কার্যনির্বাহীরূপে আল্লাহই যথেষ্ট।(৩৩:১-৩)

সমাপ্ত।

১ মার্চ, ২০১২

Medina Charter: মদিনা ও তার পার্শ্ববর্তী গোত্রসমূহকে সন্ধিবদ্ধ করেছিল।


নবীজীর আগমনের পর মদিনায় তিনটি স্বতন্ত্রদলের অস্তিত্ব প্রকাশ লাভ করল। মোহাজির, আনসার ও ইহুদি। প্রথম দলটির নবীজীর> প্রতি আনুগত্য ছিল সীমাহীন। তারা আরব ঐতিহ্যের বিপরীত দিকের ধর্মের জন্যে তাদের আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল। আল্লাহর কাজে তারা সাহসিকতার সঙ্গে সর্বপ্রকার দুঃখ-দুর্দশার মোকাবিলা করেছিল, যাবতীয় প্রলোভনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। তাদের অনেকেই নিঃসম্বল অবস্থায় মদিনায় এসেছিল।

প্রাচীন মদিনা নগরী।
দ্বিতীয়, আনসাররা তাদের মোহাজির ভাইদেরকে আন্তরিকতার সঙ্গেই গ্রহণ করেছিল। তারা তাদের মধ্যে সম্পত্তি বন্টন করে দিয়েছিল। নবীজী অত্যন্ত জ্ঞানবতার সঙ্গে ধর্মীয় ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠিত করেছিল। যা ঈর্ষা বিদ্বেষের বিকাশকে বন্ধ করেছিল এবং তাদের মধ্যে উদার দানশীলতার প্রতিযোগীতার জন্ম দিয়েছিল, কে আল্লাহ ও তার রসূলের জন্যে সর্বাধিক ত্যাগ স্বীকার করতে পারে।

আনসারদের একাংশ পৌত্তলিকতার জন্যে গোপন পূর্বানুরাগ বজায় রেখেছিল। এই দলের নেতা ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই। তিনি প্রতিপত্তিশালী ছিলেন এবং তার একটি শক্তিশালী সমর্থক দল ছিল। তিনি মদিনায় রাজত্বলাভের উচ্চাভিলাষ পোষণ করতেন। কিন্তু, নবীজীর আগমন তার পরিকল্পণাকে নস্যাৎ করেছিল। কেবলমাত্র লৌকিক উদ্দীপনা তাকে ও তার সমর্থকদের নামমাত্র ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য করেছিল।

এই দল সামান্যতম সুযোগ পেলেই মুসলমানদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে প্রস্তুত ছিল। কাজেই নবীজীকে তাদের উপর তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হয়েছিল। তিনি তাদের প্রতি সর্বোত্তম ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করতেন এবং আশা পোষণ করতেন যে, শেষপর্যন্ত তারা ইসলামের পতাকাতলে সমবেত হবে। অতঃপর এই আশা অবশ্য পরিণতি দ্বারা পরিপূর্ণভাবে সমর্থিত হয়েছিল।

৬২২ সিই, মদিনার আশেপাশের গোত্রসমূহ।
তৃতীয় দল ইহুদিরা ছিল সবচেয়ে মারাত্মক বিপদের কারণ। কুরাইশদের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল এবং তাদের দল উপদলসমূহ বিভিন্ন স্থানে বিস্তৃত হয়েছিল ও তারা ইসলামের ঘোর বিরোধী ছিল। তারা তাদের পুরাতন শত্রু আওস ও খাজরাজ গোত্র তাদের পৃষ্ঠপোষক তাদের প্রতিশোধ গ্রহণকারী হতে পারে; আরবদের জয় করতে ও ইহুদি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় তাদের সাহায্য করতে পারে এই উদ্দেশ্য নিয়ে নবীজীর অভ্যর্থনায় উদাসীনতার সঙ্গে মদিনাবাসীদের সাথে যোগ দিয়েছিল এবং কিছুকালের জন্যে শান্ত মনোভাব গ্রহণ করেছিল।

মদিনায় আগমনের পর মুহম্মদ মদিনা ও তার পার্শ¦বর্তী এলাকা যে বিভিন্ন জাতি ও বিরোধী উপাদান নিয়ে গঠিত তাকে একটি সুশৃঙ্খল সন্ধিবদ্ধ জাতিতে ঐক্যবদ্ধ করাকে অন্যতম প্রথম কর্তব্য বলে মনে করলেন। এই লক্ষ্য সামনে রেখে তিনি মদিনার বিভিন্ন জাতির লোকদের মধ্যে সনদ প্রদান করলেন। যার মাধ্যমে মুসলমানদের অধিকার ও কর্তব্যসমূহ, মুসলমান ও ইহুদিদের পারস্পরিক অধিকার ও কর্তব্যসমূহ সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ হল। ইহুদিরা সাময়িকভাবে সনদের দুর্দমনীয় বৈশিষ্ট্যের জন্যে নিরূৎসাহিত হলেও আনন্দের সঙ্গে চুক্তি গ্রহণ করেছিল। বিবেকের স্বাধীনতা সম্বলিত এই মদিনা সনদের (Medina Charter) বর্ণনা ছিল এরূপ-
পরম করুণাময়, দাতা ও দয়ালু আল্লাহর নামে- 
আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ মুহম্মদ কর্তৃক এই সনদ প্রদান করা হচ্ছে যে-

ক) মদিনায় বসবাসরত বিভিন্ন ধর্মাবলস্বী, বিভিন্ন গোত্রের বিক্ষিপ্ত জনমন্ডলী এক উম্মত বা জাতি বলে বিবেচিত হবে।

খ) সনদের অন্তর্ভূক্ত কোন সম্প্রদায় শত্রু কর্তৃক আক্রান্ত হলে সম্মিলিতভাবে তা প্রতিহত করা হবে।
গ) সনদের অন্তর্ভূক্ত সম্প্রদায়ের কেউ কুরাইশদের সাথে গোপনে সন্ধিচুক্তিতে আবদ্ধ হবে না, কেউ তাদের কোন লোককে আশ্রয় দেবে না, তাদের কোন পরিকল্পনায় সহায়তা করবে না।

ঘ) বহিঃশত্রু কর্তৃক মদিনা আক্রান্ত হলে স্বাধীনতা রক্ষায় সকলে সম্মিলিতভাবে যুদ্ধ করবে এবং প্রত্যেক সম্প্রদায় নিজেদের যুদ্ধব্যয় বহন করবে।
ঙ) সকল সম্প্রদায় স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে। কেউ কারও ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে না।

চ) কোন অমুসলমানের অপরাধ তার ব্যক্তিগত অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। ব্যক্তির অপরাধের জন্যে তার জাতি বা সম্প্রদায়ের অধিকার খর্ব করা যাবে না।

ছ) মুসলমানরা সাধারণতন্ত্রের অন্যান্য সম্প্রদায়ের প্রতি সর্বদা সদাচারণ, স্নেহপূর্ণ আচরণ করবে, তাদের মঙ্গলের চেষ্টা করবে। কোন প্রকারে তাদের অনিষ্টের সংকল্প পোষণ করবে না।
জ) উৎপীড়িতকে রক্ষা করা হবে। যদি ঘনিষ্ট আত্মীয় নিন্দনীয় হয় তাহলেও তাকে কেউ সমর্থন করবে না।

ঝ) প্রত্যেক সম্প্রদায়ই নিজেদের স্বত্ত্বাধিকারের মর্যাদা রক্ষা করবে।
ঞ) নরহত্যা বা রক্তপাত মদিনাতে হারাম বলে গণ্য হবে।
ট)  রক্তপণ পূর্ববৎ বহাল থাকবে।

ঠ) হযরত মুহম্মদ নবপ্রতিষ্ঠিত সাধারণতন্ত্রের প্রধান বলে বিবেচিত হবেন। সাধারণভাবে যেসব বিবাদ-বিসম্বাদের সমাধান সম্ভব নয়, তা তার উপর ন্যস্ত হবে। আল্লাহর বিধানমতে তিনি সেসবের সমাধান করবেন।

-আল্লাহর নামে এ এক চিরস্থায়ী প্রতিজ্ঞা, যে বা যারা এ ভঙ্গ করবে তাদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাৎ।

আরবদের যে নৈরাজ্যমূলক প্রথার ক্ষেত্রে ব্যথিত ও ক্ষতিগ্রস্থ লোকদের নিজেদের বা তাদের জ্ঞাতিদের শক্তির উপর নির্ভর করতে হত প্রতিশোধ গ্রহণ বা বিচারের প্রয়োজন মেটানোর জন্যে সেই প্রথার প্রতি এভাবে মরণাঘাত হানা হল। এই সনদ মুহম্মদকে জাতির প্রধান প্রশাসকে পরিণত করল, এ যেমন তার প্রেরিত পুরুষ সূলভ ভূমিকার দ্বারা তেমনি তিনি ও তার জনগণের মধ্যেকার চুক্তির দ্বারা সাধিত হয়েছিল।

মদিনার উপকন্ঠে বসতি স্থাপনকারী বনি নাজির, বনি কুরাইজা ও বনি কাইনুকা প্রমুখ ইহুদি বংশ সমূহকে প্রথমে এই সনদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি, কিন্তু অল্পকাল পরেই তারাও সকৃজ্ঞ চিত্তে এ সনদের শর্তাদি গ্রহণ করেছিল। 

সমাপ্ত।
ছবি: in.groups.yahoo. Muhamad and the people of the book.

David: শনিবারে সীমালংঘনকারী সমুদ্র উপকূলের বসতি।

সীক্লগে দাউদ (David) বেশ কয়েক বৎসর ছিলেন। তালুতের হাত থেকে পালিয়ে বেড়ানোর এক পর্যায়ে দাউদ গাদের রাজা আখীশের কাছে আশ্রয় প্রার্থণা করলে সে থাকবার জন্যে জায়গাটা তাকে দিয়েছিল। এই সীক্লগের সমুদ্রকূলে ইস্রায়েলীদের এক জনবসতি ছিল। সেখানে সত্তুর হাজারের মত ইহুদি বাস করত। ইস্রায়েলীদের কাছে শনিবার ছিল বিশ্রামবার এবং পবিত্র দিন। এদিন তাদের কোন পার্থিব কাজ করা নিষিদ্ধ ছিল।  Halakha অনুসারে, Shabbat is observed from a few minutes before sunset on Friday evening until the appearance of three stars in the sky on Saturday night. 

Sabbath “দশ আজ্ঞা“র ৪র্থ নম্বর, যাতে বলা হয়েছে- “বিশ্রামবারকে পবিত্র বলে মান্য কোরও।” Violating the Sabbath was a serious offense, and the person who worked on the Sabbath was to be ‘cut off from among his people’ -(Exodus 31:14 ).
During their wandering in the wilderness the Israelites brought to trial a man found gathering wood on the Sabbath. He was stoned to death according to the commandment of the Lord for profaning the Sabbath -(Numbers 15:32-36)

যা হোক, যা বলছিলাম- খোদা দাউদের উপর জবুর কিতাব (ভাষা-ইউনানী) নাযিল করেছিলেন, যাতে ১৫০টি সূরা ছিল। যার প্রত্যেকটি দোয়া, হামদ বা খোদার গুণকীর্তনে পরিপূর্ণ ছিল (তবে এগুলিতে হালাল-হারাম বা ফরজ কর্তব্যাদির বর্ণনা নেই।)।

সীক্লগে থাকার সময় দাউদ তার উপাসনার জন্যে সমুদ্র উপকূলে একটা উপাসনালয় তৈরী করে নিয়েছিলেন। সেখানে তিনি এই যবুর কিতাব পাঠ করতেন। তার কন্ঠ ছিল সুমধুর, পশু-পক্ষী, কীট-পতঙ্গ, গাছপালা ও পাহাড়সমূহ তার কিতাব পাঠ শুনে মোহিত হয়ে যেত। তারাও দাউদের সাথে সাথে খোদার পবিত্র মহীমাকীর্তণ করত।

খোদা স্বীয় সৃষ্টিসমূহের মধ্যে প্রত্যেক সৃষ্টির প্রয়োজন অনুপাতে তার জীবনের লক্ষ্য অনুযায়ী বুদ্ধি ও উপলব্ধি ক্ষমতা দান করেছেন। যেসব জিনিসকে আমরা বুদ্ধি বিবর্জিত ও অনুভূতিহীন বলে মনেকরি, প্রকৃতপক্ষে সেগুলোও জ্ঞান-বুদ্ধি ও চেতনা-অনুভূতি বিবর্জিত নয়। এসব বিষয় সেগুলোর মাঝে সেই অনুপাতেই দেয়া হয়েছে যেটুকু তাদের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্যে প্রয়োজন। সবচেয়ে কমবুদ্ধি ও চেতনা-উপলব্ধি রয়েছে মাটি, পাথর প্রভৃতি জড় পদার্থের মাঝে- যাদের না আছে প্রবৃদ্ধি, না স্থান থেকে কোথাও যাওয়া কিম্বা চলাচলের প্রয়োজন। এগুলোর চাইতে সামান্য বেশী রয়েছে উদ্ভিদের মধ্যে, যার অস্তিত্বের লক্ষ্যের মাঝে প্রবৃদ্ধি এবং ফলদান প্রভৃতি অন্তর্ভূক্ত। এরপর পশুপক্ষী, যাদের জীবনের উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রবর্তণ ও চলাফেরা করে খাবার আহরণ, ক্ষতিকর বিষয় থেকে আত্মরক্ষা ও বংশবৃদ্ধি প্রভৃতি বিষয়- অর্থাৎ প্রত্যেক বস্তু (জড় বা জীব) নিজ নিজ অস্তিত্ব অনুযায়ী বুদ্ধি ও অনুভূতির অধিকারী। কোরআনে অসংখ্য উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি আমাদের গোচরীভূত করেছে- যেমন: হযরত মূসার নির্দেশে জমিন কারূণকে গ্রাস করেছিল, হযরত হেযকীলের নির্দেশে হাঁড়সমূহ মাংস ও চামড়া পরিধান করেছিল ইত্যাদি: আবার, এক পাহাড়ী ছাগল ইউনূচকে প্রতিদিন দুধ পান করিয়ে যেত যখন তিনি অসুস্থ্য ছিলেন, এক দাঁড় কাক ইলিয়াসের জন্যে খাবার বয়ে নিয়ে আসত, ইত্যাদি।

যবুর পাঠরত দাউদ।
দাউদের পাঠশুনে নিকটবর্তী জলাশয়ের মাছ ঝাকে ঝাকে পানির উপর ভেসে উঠত। কিন্তু বিশ্রামবার অর্থাৎ শনিবার ছাড়া এসব মাছ আসত না। মাছ দেখে একদল ইহুদির লোভ বেড়ে গেল।শরীয়তমতে শনিবার বিশ্রামবার বলে এদিন যাবতীয় জাগতিক কাজকর্ম নিষিদ্ধ ছিল। সুতরাং মাছ ধরাও নিষিদ্ধের অধীন হওয়ায় তারা বুদ্ধি করে এক ফন্দি বের করল। তারা শনিবারে মাছ জাল দিয়ে আটকে রেখে পরদিন শিকার করত। এতে একদল বিরোধিতা করে বলল, ‘তোমরা খোদার সাথে বুদ্ধি খাটাচ্ছ। শিকারের আয়োজন করা ও শিকার করা একই কথা, তোমরা এ কাজ থেকে বিরত থাক নইলে তোমাদের সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই।’

২য় দল বলল, ‘তারা যা করে করুক, তাতে আমাদের কি আসে যায়। তাদেরকে বাঁধা দিয়ে তাদের সাথে শত্রুতা বাড়াবার কি প্রয়োজন?’
অন্যেরা বলল, ‘খোদা যাদেরকে ধবংস করবেন বা কঠোর শাস্তি দেবেন, কেন তোমরা তাদেরকে অনর্থক উপদেশ দিচ্ছ?’
১ম দল, ২য় ও ৩য় দলকে বলল, ‘তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি কর্তব্য পালনের জন্যে, আর হয়তঃ তারা তাঁকে ভয় পেলেও পেতে পারে।’

এভাবে ইস্রায়েলীরা তিনভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ল। এরপর লোকেরা যখন নিষিদ্ধ কাজে বাড়াবাড়ি করতে লাগল তখন খোদার কঠোর নির্দেশ এসে গেল- ‘তোমরা ঘৃণিত বানর হও।’ আর খোদা ঘোষণা করে দিলেন যে, তিনি কেয়ামত পর্যন্ত এমন লোকদেরকে তাদের চেয়ে শক্তিশালী করতে থাকবেনই যারা তাদেরকে কঠিন শাস্তি দিতে থাকবে। আর নিশ্চয়ই তিনি শাস্তিদানে তৎপর। আর তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালুও বটে।’

যারা খোদার আদেশ মেনে নিজেদেরকে খারাপ কাজ থেকে দূরে রেখেছিল তারা ব্যতিত সকলে কূৎসিত বানরে রুপান্তরিত হয়ে যায় এবং তিন দিন জীবিত থাকার পর সকলে একই সাথে মৃত্যুবরণ করে। 

এ সম্পর্কে কোরআনে বলা হয়েছে- আমি পর্বত ও পক্ষীসমূহকে দাউদের অনুগত করে দিয়েছিলাম, তারা আমার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করত। এ সমস্ত আমিই করেছিলাম।-(২১:৭৯)

And you had already known about those who transgressed among you concerning the sabbath, and We said to them, "Be apes, despised." And We made it a deterrent punishment for those who were present and those who succeeded [them] and a lesson for those who fear Allah.-(2:65-66) এমন্ সংক্ষিপ্ত বর্ণনা রয়েছে সূরা বাকারায়, কিন্তু সূরা আল আরাফে এ ঘটনার পুরো বর্ণনা দেয়া হয়েছে-

সমুদ্র তীরবর্তী অধিবাসী তারা শনিবারে সীমালংঘন করত। শনিবার পালনের দিন তাদের কাছে পানির উপর মাছ ভেসে আসত, কিন্তু যেদিন তারা শনিবার পালন করত না সেদিন ওরা তাদের কাছে আসত না। যারা সত্য ত্যাগ করেছিল তাদেরকে আমি এভাবে পরীক্ষা করেছিলাম। আর যখন তাদের একদল বলেছিল, ‘খোদা যাদেরকে ধবংস করবেন বা কঠোর শাস্তি দেবেন, কেন তোমরা তাদেরকে অনর্থক উপদেশ দিচ্ছ?’ 

তারা বলেছিল, ‘তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি কর্তব্য পালনের জন্যে, আর হয়তঃ তারা তাঁকে ভয় পেলেও পেতে পারে।’ 

তাদেরকে যে উপদেশ দেয়া হয়েছিল তারা যখন তা ভুলে গেল, তখন যারা খারাপ কাজ থেকে নিজেদেরকে দূরে রেখেছিল তাদেরকে আমি উদ্ধার করেছিলাম। আর যারা সীমালংঘন করে সত্য ত্যাগ করেছিল তাদেরকে আমি কঠোর শাস্তি দিয়েছিলাম। তারা যখন নিষিদ্ধ কাজে বাড়াবাড়ি করতে লাগল তখন আমি তাদেরকে বললাম, ‘ঘৃণিত বানর হও।’ 

আর প্রতিপালক ঘোষণা করে দিলেন যে, তিনি কেয়ামত পর্যন্ত এমন লোককে তাদের চেয়ে শক্তিশালী করতে থাকবেনই যারা তাদেরকে কঠিন শাস্তি দিতে থাকবে। আর নিশ্চয়ই প্রতিপালক শাস্তিদানে তৎপর। আর তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালুও।’-(৭:১৬৩-১৬৭)

সমাপ্ত।
ছবি: platytera.blogspot, brighmorningstar.blog.

Moses: কোরাণিক ক্যানভাসে নবী মূসা।

Abu Hena Mostafa Kamal  01 May, 2017 মি সরের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ফেরাউন। হঠাৎ করে তিনি মৃত্যুবরণ করলেন। কিন্তু তিনি কোন উত্তরাধিকারী ন...