মূসা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মূসা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

১১ নভেম্বর, ২০১২

Religion with God: খোদায়ী ধর্ম, ইসলাম, মুসলমান ও কোরআন।

Islam does never claim to be a new religion brought by Prophet Mohammed into Arabia in the seventh century, but rather to be a re-expression in its final form of the true religion of Almighty God, Allah, as it was originally revealed to Adam and subsequent prophets.-এর স্বপক্ষে আমরা দেখাতে পারি নিম্নোক্ত আয়াতগুলি- 

তুমি আল্লাহর বিধানে পরিবর্তণ পাবে না এবং আল্লাহর রীতিনীতিতে কোনরকম বিচ্যুতিও পাবে না।-(৩৫:৪৩) তিনি তোমাদের জন্যে দ্বীনের ক্ষেত্রে সে পথই নির্ধারিত করেছেন, যার আদেশ দিয়েছিলাম নূহকে, যা আমি প্রত্যাদেশ করেছি তোমার (মুহম্মদের) প্রতি এবং যার আদেশ দিয়েছিলাম ইব্রাহিম, মূসা ও ঈসাকে এ মর্মে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং তাতে অনৈক্য সৃষ্টি কোরও না।-(৪২:১৩)

অত:পর মুহম্মদের মাধ্যমে তা পরিপূর্ণতা লাভ করে- 
“This day have I perfected your religion for you, completed My favour upon you, and have chosen for you Islam as your religion.” -(৫:৩)

আর কোরআন ঘোষণা করেছে- 
"নিঃসন্দেহে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য দ্বীন একমাত্র ইসলাম।-(৩:১৯) তারা কি আল্লাহর দ্বীনের পরিবর্তে অন্য দ্বীন তালাশ করছে?-(৩:৮৩) যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম তালাশ করে, কষ্মিনকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্থ।"-(৩:৮৫) 

-উপরের এই আয়াতসমূহ থেকে একথা সুস্পষ্ট যে, ইসলাম আল্লাহর মনোনীত ধর্ম (Religion with God)। সকল নবী-রসূল আদম, নূহ, ইব্রাহিম, ইয়াকুব, ইউসূফ, মূসা, দাউদ, ঈসা ও মুহম্মদ- সকলেই ছিলেন এই ধর্মের প্রবক্তা, অনুসারী ও প্রচারক। আর সর্বশেষ রসূল মুহম্মদের মাধ্যমে এই ধর্ম পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। এখন আমরা দেখি এ ধর্মটি কি-

খোদায়ী এই ধর্মের তাৎপর্য এর নামের মধ্যেই নিহীত। সালাম (সালামা) শব্দটি প্রাথমিক অর্থে শান্তিতে থাকা, কর্তব্য সম্পাদন করা, দেনাশোধ করা, পরিপূর্ণ শান্তির মধ্যে অবস্থান করা বোঝায়; আর গৌণ অর্থে যার সঙ্গে শান্তি স্থাপিত হয় তার কাছে আত্মসমর্পন করা বোঝায়। অর্থাৎ ইসলাম অর্থ-শান্তি, অভ্যর্থনা, নিরাপত্তা, পরিত্রাণ।

আর মুহম্মদ তার পিতৃব্য আবু তালিবকে তার ধর্ম কি তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন- ‘হে আমার পিতৃব্য, এই ধর্ম আল্লাহর, তার ফেরেস্তাদের, তার নবীদের এবং আমাদের পূর্বপুরুষ ইব্রাহিমের ধর্ম।'
এখন আমরা দেখি কোরআন আরববাসীদের এবং সমগ্র মানবজাতিকে কি জ্ঞাত করছে- এটা এমন একটি গ্রন্থ, যা আমি অবতীর্ণ করেছি, খুব মঙ্গলময়, অতএব এর অনুসরণ কর এবং ভয় কর-যাতে তোমরা করুণাপ্রাপ্ত হও। এ এজন্যে যে, যাতে তোমরা বলতে না পার, ‘গ্রন্থ তো শুধু আমাদের পূর্ববর্তী দু‘সম্প্রদায়ের প্রতিই অবতীর্ণ হয়েছে এবং আমরা সেগুলোর পাঠ ও পঠন সম্পর্কে কিছুই জানতাম না।’ কিম্বা বলতে না পার- ‘যদি আমাদের প্রতি কোন গ্রন্থ অবতীর্ণ হত, আমরা এদের চাইতে অধিক পথপ্রাপ্ত হতাম।’
অতএব, তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমান, হেদায়েত ও রহমত এসে গেছে।(৬:১৫৬-১৫৭)

এ সেই কিতাব যাতে কোন সন্দেহ নেই। এ যে ধর্মভীরুদের জন্যে সঠিক পথের সন্ধান। যারা অদৃশ্যে যারা বিশ্বাস করে, নামাজ কায়েম রাখে, আমি যে রুজী তাদেরকে দান করি তা থেকে খরচ করে এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে সেসব বিষয়ের উপর যা কিছু তোমার উপর যা নযিল হয়েছে এবং সেসব বিষয়ের উপর যা তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে। আর আখিরাত সম্পর্কে যারা আস্থাবান। এরাই তাদের পালনকর্তার পথগামী -এরাই যথার্থ সফলকাম।’(২:১-৫)

মুসলমান কারা? যারা বলে, ‘আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা কিছু অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের উপর, ইব্রাহিম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব এবং তাদের সন্তানবর্গের উপর, আর যা কিছু পেয়েছেন মূসা ও ঈসা এবং অন্যান্য নবী রসূলরা তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে। আমরা তাদের কারও মধ্যে পার্থক্য করি না। আর আমরা তাঁরই অনুগত।’(৩:৮৪) 

নিঃসন্দেহে যারা মুসলমান হয়েছে এবং যারা ইহুদি, নাসারা ও সাবেইন (তাদের মধ্যে থেকে) যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি ও কিয়ামত দিবসের প্রতি এবং সৎ কাজ করেছে, তাদের জন্যে রয়েছে সওয়াব তাদের পালনকর্তার কাছে। আর তাদের কোন ভয়-ভীতি নেই, তারা দুঃখিতও হবে না।(২:৬২)

আর হে নবী, যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজসমূহ করেছে, তুমি তাদেরকে এমন জান্নাতের সুসংবাদ দাও, যার পাদদেশে নহরসমূহ প্রবহমান থাকবে। যখনই তারা খাবার হিসেবে কোন ফল প্রাপ্ত হবে, তখনই তারা বলবে, ‘এ তো অবিকল সেই ফলই যা আমরা ইতিপূর্বেও লাভ করেছিলাম। বস্তুতঃ তাদেরকে একই প্রকৃতির ফল প্রদান করা হবে এবং সেখানে তাদের জন্যে শুদ্ধাচারিনী রমণীকূল থাকবে। আর সেখানে তারা থাকবে অনন্তকাল। (২:২৫) সৎকর্ম শুধু এই নয় যে, পূর্ব কিম্বা পশ্চিম দিকে মুখ করবে, বরং বড় সৎকাজ হল এই যে, ঈমান আনবে আল্লাহর উপর, কেয়ামত দিবসের উপর, ফেরেস্তাদের উপর এবং সমস্ত নবী-রসূলদের উপর, আর সম্পদ ব্যয় করবে তাঁরই মহব্বতে আত্মীয়-স্বজন, এতিম মিসকীন, মুসাফির-ভিক্ষুক ও মুক্তিকামী ক্রীতদাসের জন্যে। আর যারা নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দান করে এবং যারা ক্রীত প্রতিজ্ঞা সম্পাদনকারী এবং অভাবে, রোগে-শোকে ও যুদ্ধের সময় ধৈর্য্য ধারণকারী, তারাই হল সত্যাশ্রয়ী, আর তারাই পরহেজগার।-(২:১৭৭) 

মুসলমান তারাই যারা স্বচ্ছলতায় ও অভাবের সময় ব্যয় করে, বস্তুতঃ আল্লাহ সৎকর্মশীলদেরই ভালবাসেন। তারা কখনও কোন অশ্লীল কাজ করে ফেললে কিম্বা কোন মন্দ কাজে জড়িত হয়ে নিজের উপর জুলুম করে ফেললে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজের পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ছাড়া আর কে পাপ ক্ষমা করবেন? তারা নিজের কৃতকর্মের জন্যে হটকারিতা প্রদর্শণ করে না এবং জেনে শুনে তাই করতে থাকে না।-(৩:১৩৪-১৩৫) 
আল্লাহর অস্তিত্ব ও একত্বের তথ্যাদিসহ খোদায়ী ধর্ম ইসলাম নিয়ে সর্ব প্রথম হযরত আদম দুনিয়াতে পদার্পণ করেন। তার তিরোধানের পর তার বংশধরের মধ্যেও দীর্ঘকাল এই তথ্যের চর্চা প্রচলিত ছিল। কালক্রমে প্রাথমিক যুগের আচার অভ্যাস, সভ্যতা-সংস্কৃতি প্রভৃতি সর্ববিষয়ের ব্যাপক পরিবর্তণ সূচিত হওয়ার পর হযরত নূহ আগমন করেন এবং মানুষকে ঐসব তত্ত্বের প্রতি আহবান জানান যা আদম তার বংশধরদের প্রতি জানিয়েছিলেন।

নূহের পর একে একে এলেন ইব্রাহিম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব, ইউসূফ। অতঃপর মূসা ও হারুণের বংশে এলেন অনেক পয়গম্বর। এলেন তালুত, দাউদ, শলোমন, ইলিয়াস, ইউনূচ, অরামিয়া প্রমুখ। সকলেই আল্লাহর একত্বের বাণী প্রচার করেছিলেন।

দীর্ঘকাল পরে এলেন জাকারিয়া, ইয়াহিয়া, ঈসা এরাও সকলে আল্লাহর একত্বের ঐ একই বাণী প্রচার করেছিলেন। সবশেষে এলেন মুহম্মদ আল্লাহর একত্বের ঐ একই বাণী নিয়ে। তার উপরে নাযিল হল সর্বশেষ ঐশী কিতাব কোরআন। 
মোটকথা, আদমের পর মানুষ যখনই আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যূত হয়েছে, তখনি পথহারা এসব মানুষকে সত্যের পথে ফিরিয়ে আনতে আল্লাহ নবী বা রসূল প্রেরণ করেছেন এবং তারা তাঁর একত্বের বাণী ঐসব বিপথগামী মানুষের মাঝে প্রচার করেছেন।  আদম থেকে মুহম্মদ পর্যন্ত একলক্ষ চব্বিশ হাজার পয়গম্বর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাষায় এবং বিভিন্ন দেশে জন্মগ্রহণ করেন এবং তারা সবাই আল্লাহর একত্বের একই বাণী প্রচার করেন। এসকল রসূলদের অধিকাংশেরই পরস্পর দেখা সাক্ষাৎ পর্যন্ত হয়নি। তাদের আবির্ভাবকালে গ্রন্থ রচনা ও প্রকাশনার জ্ঞানও বিকাশ সাধিত হয়নি যে, এক পয়গম্বর অন্য পয়গম্বরের গ্রন্থ ও রচনাবলী পাঠ করে একাত্মতা প্রকাশ করবেন। এছাড়া এমনও হয়েছে যে, একজন অন্যজন থেকে শতাব্দীর পর শতাব্দী অতিক্রমের পর জন্মগ্রহণ করেছেন। সুতরাং জাগতিক কোন উপকরণাদির মাধ্যমে পূর্ববর্তী পয়গম্বরদের অবস্থা তাদের জানা থাকারও কথা ছিল না। এমতাবস্থায় কেবলমাত্র আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত হবার অর্থাৎ নবূয়্যত প্রাপ্তির পর ওহী লাভ করেই তারা পূর্বসূরীদের যাবতীয় অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞাত হয়েছেন এবং আল্লাহর একত্ব ও সেসব অতীত তথ্য সম্বলিত আল্লাহর বাণী বিপথগামী মানুষের মাঝে প্রচার করেছেন।

আমি তোমার প্রতি ওহী পাঠিয়েছি, যেমন করে ওহী পাঠিয়েছিলাম নূহের প্রতি এবং সে সমস্ত নবী রসূলদের প্রতি যারা তার পরে প্রেরিত হয়েছে। আর ওহী পাঠিয়েছি, ঈসমাইল, ইব্রাহিম, ইসহাক, ইয়াকুব ও তার সন্তানবর্গের প্রতি এবং ঈসা, আইয়ূব, ইউনূচ, হারুণ ও শলোমনের প্রতি। আর আমি দাউদকে দান করেছি যবুর কিতাব। এছাড়া এমন রসূল পাঠিয়েছি যাদের ইতিবৃত্ত আমি তোমাকে শুনিয়েছি ইতিপূর্বে এবং এমন রসূল পাঠিয়েছি যাদের বৃত্তান্ত তোমাকে শোনাইনি। আর আল্লাহ মূসার সাথে কথপোকথন করেছেন সরাসরি। সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শণকারী রসূলদের প্রেরণ করেছি, যাতে রসূলদের পরে আল্লাহর প্রতি অপবাদ আরোপ করার মত কোন অবকাশ মানুষের জন্যে না থাকে। আল্লাহ প্রবল পরাক্রমশালী, প্রাজ্ঞ। -(৪:১৬৩-১৬৫)

আমি তাওরাত অবতীর্ণ করেছি। এতে হেদায়েত ও আলো রয়েছে। আল্লাহর আজ্ঞাবহ পয়গম্বর, দরবেশ ও আলেমরা এর মাধ্যমে ইহুদিদের ফয়সালা দিতেন। কেননা তাদেরকে এই  খোদায়ী গ্রন্থের দেখা শোনা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল এবং তারা এর রক্ষণাবেক্ষণে নিযুক্ত ছিল।.. আমি এই গ্রন্থে তাদের প্রতি লিখে দিয়েছি যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চক্ষুর বিনিময়ে চক্ষু, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান, দাঁতের বিনিময়ে দাঁত এবং যখমসমূহের বিনিময় সমান যখম। অতঃপর যে ক্ষমা করে, সে পাপ থেকে পবিত্র হয়ে যায়। যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদানুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই অত্যাচারী।

আমি তাদের পিছনে মরিয়ম তনয় ঈসাকে প্রেরণ করেছি। সে পূর্ববর্তী তাওরাতের সত্যায়নকারী ছিল। আমি তাকে ইঞ্জিল প্রদান করেছি। এতে হেদায়েত ও আলো রয়েছে। এটি পূর্ববর্তী গ্রন্থ তাওরাতের সত্যায়ন করে, পথপ্রদর্শণ করে এবং এটি আল্লাহভীরুদের জন্যে হেদায়েত ও উপদেশবাণী। ইঞ্জিলের অধিকারীদের উচিৎ, আল্লাহ তাতে যা অবতীর্ণ করেছেন, তদানুযায়ী ফয়সালা করা। যারা আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদানুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই পাপাচারী।

আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি সত্য গ্রন্থ, যা পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহের সত্যায়নকারী এবং সেগুলোর বিষয় বস্তুর রক্ষণাবেক্ষণকারী। অতএব তুমি তাদের পারষ্পারিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদানুযায়ী ফয়সালা কর এবং তোমার কাছে যে সৎপথ এসেছে তা ছেড়ে তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ কোরও না।

আমি তোমাদের প্রত্যেককে একটি আইন ও পথ দিয়েছি। যদি আল্লাহ চাইতেন, তবে তোমাদের সবাইকে এক উম্মত করে দিতেন, কিন্তু এরূপ করেননি- যাতে তোমাদের যে ধর্ম দিয়েছেন, তাতে তোমাদের পরীক্ষা নেন। অতএব দৌঁড়ে কল্যাণকর বিষয়াদি অর্জন কর। তোমাদের সবাইকে আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তণ করতে হবে। অতঃপর তিনি অবহিত করবেন সে বিষয়, যাতে তোমরা মতবিরোধ করতে।-(৫:৪৪-৪৮)

কোন ঐশীগ্রন্থ নাযিল হলেই কি মানুষ তা সরল মনে গ্রহণ করেছে? না, তারা বাক বিতন্ডা করেছে সংশ্লিষ্ট রসূলগণের সাথে, এমন কি কাউকে কাউকে হত্যা করেছে। খুব অল্পসংখ্যকই নির্বিবাদে মেনে নিয়েছে এবং ঈমান এনেছে আল্লাহ ও ঐ রসূলের উপর। আল্লাহ তো সর্বজ্ঞাতা, তাই সর্বশেষ কিতাব কোরআনের সত্যতার স্বপক্ষে তিনি নিজেই সাক্ষ্য দিয়েছেন। কেননা তিনি জানতেন পৌত্তলিক, ইহুদি ও খ্রীষ্টানেরা এই কিতাবকে অস্বীকার করবে :
 
নিশ্চয় এটা সম্মানিত কোরআন, যা আছে এক গোপন কিতাবে।-(৫৬:৭৭-৭৮) এটা লিখিত আছে সম্মানিত, উচ্চ পবিত্র পত্রসমূহে, লিপিকারের হস্তে, যারা মহৎ পূত চরিত্র।-(৮০:১৩-১৬) নিশ্চয় এ কোরআন আমার কাছে সমুন্নত অটল রয়েছে লওহে মাহফুজে।-(৪৩:৪) 

আমি সত্যসহ এ কোরআন নাযিল করেছি এবং সত্যসহ এটা নাযিল হয়েছে।-(১৭:১০৫) এটা বিশ্ব পালনকর্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। তবুও কি তোমরা এই বাণীর প্রতি শৈথিল্য প্রদর্শণ করবে? এবং একে মিথ্যে বলাকেই তোমরা তোমাদের ভূমিকায় পরিণত করবে?-(৫৬:৮০-৮২)

এই কোরআন মানুষের জন্যে হেদায়েত এবং সত্যপথযাত্রীদের জন্যে সুস্পষ্ট পথনির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী।-(২:১৮৫) নিশ্চয় এই কোরআন একজন সম্মানিত রসূলের (জিব্রাইল) আনীত এবং এবং এটা কোন কবির কালাম নয়; তোমরা কমই বিশ্বাস কর এবং এটা কোন অতীন্দ্রিয়বাদীর কথা নয়; তোমরা কমই অনুধাবণ কর। এটা বিশ্বপালনকর্তার কাছ থেকে অবতীর্ণ। সে যদি আমার নামে কোন কথা রচনা করত, তবে আমি তার দক্ষিণ হস্ত ধরে ফেলতাম, অতঃপর কেটে দিতাম তার গ্রীবা। তোমাদের কেউ তাকে রক্ষা করতে পারত না। এটা আল্লাহ ভীরুদের জন্যে অবশ্যই একটা উপদেশ। আমি জানি যে, তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ মিথ্যারোপ করবে। নিশ্চয় এটা অবিশ্বাসীদের জন্যে অনুতাপের কারণ। নিশ্চয় এটা নিশ্চিত সত্য।-(৬৯:৪০-৫১) তারা কি লক্ষ্য করে না কোরআনের প্রতি? পক্ষান্তরে এটা যদি আল্লাহ ব্যতিত অন্য কারও পক্ষ থেকে হত, তবে এতে অবশ্যই বহু বৈপরীত্য দেখতে পেত।-(৪:৮২) 

এই কোরআন শয়তানরা অবতীর্ণ করেনি। তারা এ কাজের উপযুক্ত নয় এবং তারা এর সামর্থ্যও রাখে না। তাদেরকে তো শ্রবণের জায়গা থেকেও দূরে রাখা হয়েছে।-(২৬:২১০-২১২) 

আমি এই কোরআনে মানুষের জন্যে সব দৃষ্টান্তই বর্ণনা করেছি, যাতে তারা অনুধাবন করে। আরবী ভাষার এই কোরআন বক্রতামুক্ত, যাতে তারা সাবধান হয়ে চলে।(৩৯:২৭-২৮)

এই কোরআন তো বিশ্বজাহানের পালনকর্তার নিকট থেকে অবতীর্ণ। বিশ্বস্ত ফেরেস্তা একে নিয়ে অবতরণ করেছে তোমার অন্তরে, যাতে তুমি ভীতি প্রদর্শণকারীদের অন্তর্ভূক্ত হও, সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়। নিশ্চয় এর উল্লেখ আছে পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে।(২৬:১৯২-১৯৬)
এই কোরআন বনি ইস্রায়েলীরা যেসব বিষয়ে মতবিরোধ করে তার অধিকাংশ তাদের কাছে বর্ণনা করে।(২৭:৭৬) 

এই কোরআন এমন গ্রন্থ, যা আমি অবতীর্ণ করেছি বরকতময়, পূর্ববর্তী গ্রন্থের সত্যতা প্রমানকারী এবং যাতে তুমি মক্কাবাসী ও পার্শ্ববর্তীদেরকে ভয় প্রদর্শণ কর।..(৬:৯২)

নিশ্চয় যারা কোরআন আসার পর তা অস্বীকার করে, তাদের মধ্যে চিন্তা-ভাবনার অভাব রয়েছে। এটা অবশ্যই এক সম্মানিত গ্রন্থ। এতে মিথ্যের প্রভাব নেই, সামনের দিক থেকেও নেই এবং পিছনের দিক থেকেও নেই। এটা প্রজ্ঞাময়, প্রশংসিত আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। (৪১:৪১-৪২) আমি যদি একে অনারব ভাষায় কোরআন করতাম, তবে অবশ্যই তারা বলত, এর আয়াতসমূহ পরিস্কার ভায়ায় বিবৃত হয়নি কেন? কি আশ্চর্য যে, কিতাব অনারব ভাষায় আর রসূল আরবী ভাষায়!’(৪১:৪৪)

তারা আল্লাহকে সঠিক মূল্যায়ণ করতে পারেনি, যখন তারা বলল, ‘আল্লাহ কোন মানুষের প্রতি কোন কিছু অবতীর্ণ করেননি।’
তুমি জিজ্ঞেস কর, ‘ঐ গ্রন্থ কে নাযিল করেছেন, যা মূসা নিয়ে এসেছিল? যা জ্যোতি বিশেষ এবং মানবমন্ডলীর জন্যে হেদায়েতস্বরূপ, যা তোমরা বিক্ষিপ্ত পত্রে রেখে লোকদের জন্যে প্রকাশ করছ এবং বহুলাংশকে গোপন করছ। তোমাদেরকে এমন অনেক বিষয় শিক্ষা দেয়া হয়েছে যা তোমরা এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরা জানত না।’
তুমি বলে দাও, ‘আল্লাহ নাযিল করেছেন।’
অতঃপর তাদেরকে ক্রীড়ামূলক বৃত্তিতে ব্যাপৃত থাকতে দাও।-(৬:৯১) 

সমাপ্ত।

২ নভেম্বর, ২০১২

Pharaoh: থেবসের নেক্রোপলিশ কবরখানায় ফেরাউন।


ফেরাউন (Pharaoh) ইস্রায়েলীদের চলে যাবার অনুমতি দিলেও পরপরই তিনি তার ভুল বুঝতে পারলেন, যখন পরদিন সকালে তার কর্মচারীরা এসে জানাল, ‘হে  ফেরাউন, সকল বনি ইস্রায়েলীরা মূসার নেতৃত্বে রাতে মিসর ত্যাগ করেছে।’
একথা শুনে ফেরাউন মনে মনে ভাবলেন, ‘এ আমি কি করলাম? আমি যে আমার সব দাস হারালাম!’ 

কর্ণাক মন্দিরে প্রবেশ পথ, প্রাচীন থেবস।
তিনি তৎক্ষণাৎ বনি ইস্রায়েলীদের পশ্চাৎধাবণের সিদ্ধান্ত নিলেন এবং অতঃপর প্রতিটি এলাকা থেকে সৈন্য সংগ্রহ করতে শহরময় ঘোষণাকারী পাঠিয়ে দিলেন। 

ঐ সকালেই শহরে শহরে ফেরাউনের পক্ষ থেকে এই ঘোষণা দেয়া হল-‘বনি ইস্রায়েলীদেরকে অবশ্যই ধরে আনতে হবে। এভাবে তাদেরকে দেশ ত্যাগের সুযোগ দেয়া হবে না। তারা আমাদেরকে বিভিন্নভাবে উত্যক্ত করেছে, কষ্ট দিয়েছে, আর আমাদেরকে রাগান্বিত করেছে। তাছাড়া তাদেরকে ধরা খুব একটা কঠিনও না, তারা তো একটা ক্ষুদে দল, আর আমরা তো সংখ্যায় অনেক বেশী, আর যথেষ্ট হুসিয়ার!’

ইস্রায়েলীরা দেশ ত্যাগ করেছে জানতে পেরে মিসরীয়রাও ক্ষুব্ধ হল। কেননা তারা তাদের অলঙ্কার চেয়ে নিয়েছিল ফিরিয়ে দেবার নামে। আর তাই তারা অতি অল্পসময়ে অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জ্বিত হয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিল। 

এভাবে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ফেরাউন তার সৈন্যবাহিনী ও রথ ইস্রায়েলীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত করলেন। তারপর তিনি সত্তুর হাজার অশ্বারোহীসহ প্রায় সাত লক্ষ সেনা নিয়ে পরবর্তী দিন সূর্যোদয়ের সময় ভীতসন্ত্রস্ত পলায়নপর ইস্রায়েলীদের পশ্চাৎধাবন করলেন।এভাবে আল্লাহ ফেরাউনের দলকে তাদের বাগ-বাগিচা ও ঝরণাসমূহ থেকে বহিঃস্কার করলেন এবং বহিঃস্কার করলেন তাদের ধন-ভান্ডার ও মনোরম স্থানসমূহ থেকে। তারা যাচ্ছে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে, কিন্তু তারা তা জানে না। আর পিছনে ফেলে যাচ্ছে কত উদ্যান ও প্রস্রবণ, কত শস্যক্ষেত্র ও সুরম্যস্থান, কত সুখের উপকরণ, যাতে তারা খোশগল্প করত। এমনিই হয়েছিল।

প্রাচীন থেবস।
এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ-তারপর ফেরাউন শহরে শহরে লোক যোগাড় করতে পাঠাল এ বলে যে, ‘বনি ইস্রায়েলী তো একটা ক্ষুদে দল অথচ এরা আমাদের উত্যক্ত করে আসছে। আমরা তো সংখ্যায় অনেক বেশী, আর যথেষ্ট হুসিয়ার!’(২৬:৫৩-৫৬)
অতঃপর আমি ফেরাউনের দলকে তাদের বাগ-বাগিচা ও ঝরণাসমূহ থেকে বহিঃস্কার করলাম এবং ধন-ভান্ডার ও মনোরম স্থানসমূহ থেকে।(২৬:৫৭-৫৮)

আর সূর্যোদয়ের সময় তারা তাদের পশ্চাৎধাবন করল।(২৬:৬০) তারা ছেড়ে গিয়েছিল কত উদ্যান ও প্রস্রবণ, কত শস্যক্ষেত্র ও সুরম্যস্থান, কত সুখের উপকরণ, যাতে তারা খোশগল্প করত। এমনিই হয়েছিল। (৪৪:২৫-২৮)

ইস্রায়েলীরা যখন সাগরের তীরে এসে পৌঁছিল তখন প্রায় সন্ধ্যা। তারা দেখল তাদের দু’দিকে পর্বত, সামনে সমুদ্র এবং পিছনে ফেরাউনের সেনাবাহিনী। এই অবস্থায় নিশ্চিত মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে তারা ভীষণ ভাষায় মূসাকে আক্রমণ করল। তাদের একদল মূসাকে বলল, ‘হে মূসা! আমরা তো ধরা পড়ে গেলাম! এখন আমাদের কি হবে?’
অন্যেরা অভিযোগের সূরে বলল, ‘ওহে মূসা, মিসরে কবর দেবার জায়গা নেই বলেই কি তুমি এই মরুএলাকায় আমাদের মরবার জন্যে এনেছ?’

কেউ কেউ বলল, ‘হে মূসা! মিসরে থাকতেই কি আমরা তোমাকে বলিনি যে, আমাদের এখানেই থাকতে দাও, আমরা মিসরীয়দের গোলামীই করব? এই মরুভূমিতে মরার চেয়ে মিসরীয়দের গোলামী করা কি আমাদের পক্ষে ভাল ছিল না?’
মূসা বললেন, ‘ভয় কোরও না, তোমরা কেবল শান্ত থাক। ওরা আমাদের কিছুই করতে পারবে না। সর্বশক্তিমান আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন। তিনিই আমাদেরকে পথ দেখাবেন।’ 
সাগরের পানি দু’ভাগ হয়ে তাদের জন্যে একটি পথ তৈরী হল। 
ইস্রায়েলীরা কিন্তু মূসার কথায় শান্ত হল না। তাদের কিছু তাকে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করতে চাইল, আর কিছু আবার মিসরে ফিরে যাবার জন্যে প্রস্তুত হল। এই পরিস্থিতিতে মূসা অসীম ধৈর্য্য সহকারে আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষা করতে লাগলেন। অবশেষে মূসা আদেশ পেলেন- ‘তোমার লাঠি দ্বারা সমুদ্রকে আঘাত কর।’

নির্দেশমত মূসা তার লাঠি দিয়ে সমুদ্রকে আঘাত করলেন- অবাক বিষ্ময়ে ইস্রায়েলীরা দেখল সাগরের পানি দু’ভাগ হয়ে দু‘দিকে পর্বত সদৃশ হয়ে গেল। আর মাঝ দিয়ে তাদের জন্যে একটি পথ তৈরী হল। তারা সেই পথে হেঁটে সমুদ্র পার হতে লাগল। 

এদিকে ফেরাউন ও তার সৈন্যবাহিনী এসময়ই সমুদ্রতীরে এসে হতভম্ব হয়ে পড়লেন। তারা ভেবে পাচ্ছিলেন না-কিভাবে সমুদ্রের বুকে এই পথ তৈরী হল। নিজের মত সৈন্যবাহিনীকে এভাবে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ফেরাউন সম্বিত ফিরে পেলেন। তিনি সগর্বে সেনাদেরকে বললেন, ‘এসব আমার প্রতাপেরই লীলা।’

এ সংক্রান্ত কোরআনের আয়াতসমূহ- ‘ওরা সূর্যোদয়ের সময় তাদের পিছু নিল। তারপর যখন দু’দল পরষ্পরকে দেখতে পেল তখন তাদের সঙ্গীরা বলে উঠল, ‘আমরা তো ধরা পড়ে গেলাম।’ 
মূসা বলল, ‘কিছুতেই না, আমার সঙ্গে আছেন আমার প্রতিপালক, তিনিই আমাদেরকে পথ দেখাবেন।’(২৬:৬০-৬২)

অতঃপর আমি মূসাকে আদেশ করলাম, ‘তোমার লাঠি দ্বারা সমুদ্রকে আঘাত কর।’ ফলে, তা বিদীর্ণ হয়ে গেল এবং প্রত্যেক ভাগ বিশাল পর্বতসদৃশ হয়ে গেল। আমি সেথায় অপরদলকে পৌঁছিয়ে দিলাম। (২৬:৬৩-৬৪)

ইস্রায়েলীদের যাত্রাপথ ও লোহিত সাগর ক্রসিং পয়েন্ট।
ফেরাউন তৎক্ষণাৎ নিজের রথ সমুদ্রের পথে চালিয়ে দিলেন এবং সেনাবাহিনীকেও আদেশ করলেন তাকে অনুসরণের জন্যে। ইস্রায়েলীদের ধরার জন্যে সেনারা যতই তাদের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল, ততই তাদের রথের চাকা মাটিতে ডেবে যেতে লাগল, ফলে তারা ইস্রায়েলীদের নাগাল পেল না, এতে তাদের মনে হতাশা জাগল। ইতিমধ্যে সাগরের পানি দু’দিক থেকে এসে তাদের রথ ও অশ্বরূঢ়দিগকে আচ্ছাদন করল, তাতে ফেরাউন ও তার যে সকল সৈন্য ইস্রায়েলীদের পশ্চাতে সমুদ্রে প্রবিষ্ট হয়েছিল তাদের একজনও অবশিষ্ট রইল না। 

এদিকে ফেরাউন যখন ডুবে যেতে লাগলেন তখন তিনি ভীত হয়ে আল্লাহর প্রতি ঈমান এনে বললেন, ‘আমি ঈমান আনলাম, আর কোন মাবুদ নেই সেই আল্লাহ ছাড়া- যার উপরে বনি ইস্রায়েলী বিশ্বাসী -আমিও তাদের শামিল- যারা তাঁর প্রতি আত্মসমর্পণকারী।’

আল্লাহ বান্দার তওবা ততক্ষণ পর্যন্তই কবুল করে থাকেন যতক্ষণ না মৃত্যুর উর্দ্ধশ্বাস আরম্ভ হয়ে যায়। অর্থাৎ প্রাণ হরণের নিমিত্তে ফেরেস্তা সম্মুখে এসে উপস্থিত হয়। এসময়টি ঐ বান্দার জন্যে আখেরাতের হুকুম-আহকাম শুরু হবার মূহূর্ত। কাজেই সে সময়কার কোন আমল (ঈমান বা কূফর) গ্রহণযোগ্য নয়। সুতরাং আল্লাহ তাকে অগ্রাহ্য করে বললেন, ‘এখন এ কথা বলছ! অথচ তুমি ইতিপূর্বে নাফরমানী করছিলে এবং পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভূক্ত ছিলে। অতএব এখন আমি তোমাকে টিকিয়ে রাখব তোমার লাশের মাধ্যমে, যেন তুমি নিদর্শণ হতে পার তাদের জন্যে-যারা তোমার পরে আসবে। তবে নিশ্চয়ই মানবজাতির অনেকেই আমার নিদর্শণাবলী সম্পর্কে গাফেল।’

ফেরাউন রামেসিস ২য়, মমী।
এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ-‘ফেরাউন তাদের ধাওয়া করছিল নিজের লোক লস্করসহ এবং সমুদ্র্র তাদের ঢেকে ফেলল।’(২০:৭৮) তাদের জন্যে ক্রন্দন করেনি আকাশ ও পৃথিবী এবং তারা অবকাশও পায়নি।(৪০:২৯)

‘আমি পার করে নিলাম বনি-ইস্রায়েলীকে সমুদ্রের মধ্যে দিয়ে। ফেরাউন ও তার লোকলস্কর তাদেরকে ধাওয়া করছিল- বিদ্রোহ ও আক্রোশ বশতঃ শেষপর্যন্ত যখন সে ডুবে যেতে বসল, বলল; আমি ঈমান আনলাম আর কোন মাবুদ নেই সেই আল্লাহ ছাড়া- যাঁর উপরে বনি ইস্রায়েলী বিশ্বাসী -আমিও তাদের শামিল-যারা তাঁর প্রতি আত্মসমর্পণকারী।’

আল্লাহ বললেন, ‘কি? তুমি বিদ্রোহ করেছ, নীতিভ্রষ্টতার কারণ হয়েছ। এখন আমি তোমাকে টিকিয়ে রাখব তোমার লাশের মাধ্যমে। যেন তুমি নিদর্শণ হতে পার তাদের জন্যে-যারা তোমার পরে আসবে। তবে নিশ্চয়ই মানবজাতির অনেকেই আমার নিদর্শণাবলী সম্পর্কে গাফেল।’ (১০:৯০-৯২)

সমাধিক্ষেত্রে নেয়া হচ্ছে ফেরাউনের মমী।
কোরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ফেরাউন ও তার সঙ্গীদের চরম পরিণতি-জাহান্নাম। আয়াতটি এই- ‘কেয়ামতের দিন (ফেরাউন) তার লোকজনের পুরোভাগে থেকে অগ্রসর হবে এবং দোজখে যাবার কালে তাদের নেতৃত্ব দেবে।’(১১:৯৮)

এভাবে ইস্রায়েলীরা নিরাপদে সমুদ্র পার হল। আর তারা দাসত্ব ও মৃত্যুর থেকে মুক্তি পেল। তাদের অধিকাংশ সমস্ত ঘটনার জন্যে আল্লাহর কাছে অন্তর ঢেলে কৃতজ্ঞতা জানাল।

ইস্রায়েলীদের এই মহা উদ্ধার সংক্রান্ত কোরআনের আয়াতসমূহ- আমি অনুগ্রহ করেছিলাম মূসা ও হারুণের প্রতি। তাদেরকে ও তাদের সম্প্রদায়কে উদ্ধার করেছি মহাসঙ্কট থেকে। আমি তাদেরকে সাহায্য করেছিলাম, ফলে তারাই ছিল বিজয়ী।(৩৭:১১৪-১১৬)

পানিতে ডুবে মরার পর ফেরাউনের লাশ পানির উপর ভেসে উঠল এবং ঢেউ তাকে বয়ে এনে কূলে তুলে দিল। অত:পর তার লাশ রাজকর্মচারীরা উদ্ধার করল এবং সেই লাশকে তারা মমী করে রাখল মিসরের লাকসর এলাকা থেকে নীলনদের সরাসরি ওপারে, থেবসের নেক্রোপলিশ কবরখানায়- লোকচক্ষুর অন্তরালে। বর্তমানে মমীটি সংরক্ষিত রয়েছে মিসরের যাদুঘরে, রাজকীয় মমীর কামরায়। এভাবে আল্লাহ হাজার হাজার বৎসর পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে ফেরাউনর লাশ প্রদর্শনীর জন্যে রাখলেন যেন তারা এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে পারে।

সমাপ্ত।

ছবি: Wikipedia, whc.unesco, unionoffaiths, biblebelievers, bible.ca.

২০ মার্চ, ২০১২

Moses: মূসার বিদায়ী ভাষণ।


মূসা বনি-ইস্রায়েলীদের মত প্রচন্ড একগুয়ে জাতিকে অত্যন্ত ধৈর্য্য সহকারে সংশোধনে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। একসময় আল্লাহর পক্ষ থেকে ডাক এল তার ইহজগতের  ব্যস্ততাকে পাশ কাটিয়ে পরজগতের অসীমতার পথে যাত্রার। আর তাই আল্লাহর নির্দেশে আজরাইল স্বয়ং তার জান কবচ করার কাজে পৃথিবীতে এল। সে মূসার সম্মুখে মানবাকৃতিতে উপস্থিত হয়ে বলল, ‘হে মূসা! প্রভুর ডাক এসেছে, কবুল কর।’

চল্লিশ বৎসরের বন্দী জীবন শেষে প্রতিজ্ঞাত দেশে প্রবেশের প্রথম ধাপ সমাপ্ত হয়েছে মাত্র। এখন আসল কাজগুলো পড়ে রয়েছে সামনে। অনেক দায়িত্ব, অনেক পরিকল্পণা, খুঁটিনাটি বিষয়-মূসা আজরাইলের কথাকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। তাই তার কথাকে ঠাট্টা মনে করে ভীষণ রাগান্বিত হলেন। তিনি তাকে জোরে এক চপোটাঘাত করলেন। চড়ের প্রচন্ডতায় আজরাইলের চক্ষু কোটর থেকে বের হয়ে এল। অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে সে প্রভুর দরবারে ফিরে গিয়ে বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আপনার এই বান্দা মৃত্যু চায় না, অধিকন্তু সে আমাকে মারধোর করে মুখের আকৃতি বদলে দিয়েছে।’

আল্লাহ তার চক্ষু ঠিক করে দিলেন। তারপর তাকে নির্দেশ দিলেন, ‘পুনঃরায় তার কাছে যাও। আর তাকে জিজ্ঞেস কর, সে কি চায়।’
ফেরেস্তা পুনঃরায় মূসার কাছে এসে বলল, ‘হে মূসা, তুমি কি চাও? দীর্ঘায়ূ? তাহলে কোন ষাঁড়ের কোমরের উপর হাত রাখ, এতে তোমার হাতের নিচে যতগুলি লোম থাকবে, আল্লাহর ইচ্ছায় তুমি ততবৎসর আরও আয়ূ লাভ করবে।’
মূসা- ‘অতঃপর কি হবে?’
আজরাইল- ‘মৃত্যু, কেননা জীবমাত্রই মৃত্যুর সাধ গ্রহণ করবে। সকলকেই তাঁর কাছে প্রত্যাবর্তিত হতে হবে।’

মূসা বুঝতে পরলেন জ্রিব্রাইল তার সাথে ঠাট্টা করেনি, প্রকৃতই আল্লাহর ডাক এসেছে। তিনি তৎক্ষণাৎ জ্রিব্রাইল ও আল্লাহর নিকট নিজের কর্মের দরুন অপরাধী হিসেবে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। অত:পর আল্লাহ তাকে ক্ষমা করলে তিনি ফরিয়াদ করলেন, ‘হে আল্লাহ! মৃত্যুর আগে তুমি আমাকে পবিত্র ভূমির নিকটবর্তী কোরও। জর্দান পার হয়ে গিয়ে ঐ চমৎকার দেশটা আমাকে দেখতে দিয়ো।’
আল্লাহ জানালেন, ‘জর্দান নদী অতিক্রম করা তোমার হবে না। সুতরাং তুমি পিসগার চূঁড়ায় আরোহণ করে উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিমে দৃষ্টি ফেরাও। আর উত্তরাধিকারী মনোনীত কর, যে নেতৃত্ব দিয়ে যে দেশটা তুমি দেখতে যাচ্ছ তা ইস্রায়েলীদেরকে দিয়ে অধিকার করাবে।’
প্রভুর অভিপ্রায় জানতে পেরে মূসা আর অগ্রসর না হয়ে ইস্রায়েলীদেরকে নিয়ে বৈৎপিয়োরের উল্টোদিকের উপত্যকায় তাম্বু ফেললেন।

মূসা জেনে গিয়েছেন তার জীবনের শেষ সময় এসে গেছে, তাই তিনি জরুরী কাজগুলি দ্রুত সম্পন্ন করতে লাগলেন। যেমন- লেবী গোত্রের জন্যে নগর মনোনীত করা, প্রতিজ্ঞাত দেশের সীমানা ঠিক করা, লোকগণনা করা এবং উত্তরাধিকারী নেতা নির্বাচন করা প্রভৃতি। 

ম্যাপে নবী মূসার সমাধি।
উত্তরাধিকারী হিসেবে মূসা তার বিশ্বস্ত সহচর যিনি তার যোগ্যতা ও বাধ্যতা বিভিন্নভাবে প্রমান করতে পেরেছিলেন সেই ইউশায়াকে মনোনীত করলেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশও তাকে দিলেন। তিনি তাকে জানিয়েছিলেন- ‘অত:পর কোন দলের সাথে বিরোধ উপস্থিত হলে প্রথমে তাদেরকে সন্ধির জন্যে আহবান করবে, যদি তারা সে আহবানে কর্ণপাত করে এবং সন্ধি করতে রাজী হয়, তবে তাদেরকে করদমিত্ররূপে গ্রহণ করবে, যদি তারা না শুনে, তবে তাদের সাথে যুদ্ধ করবে, যুদ্ধে তারা পরাজিত হলে তাদের পুরুষদের হত্যা করবে। স্ত্রী, পুত্র, বালক-বালিকাদের দাস-দাসীরূপে ব্যাবহার করবে এবং তাদের ধন-সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নেবে। 

সকল কাজ শেষে মূসা (Moses) ইস্রায়েলীদের উদ্দেশ্যে বিদায়ী ভাষণ দেয়ার জন্যে তাদেরকে সমবেত করলেন। তার এই বিদায়ী ভাষণ বা বক্তৃতামালা ছিল ভাবগম্ভীর, বেদনাপূর্ণ ও একটি স্মরণীয় ঘটনা। তার মূল্যবান বক্তৃতার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ইস্রায়েলীদের এ বিষয়ে বুঝতে সাহায্য করা যে, মহান আল্লাহ তাদের জন্যে কত কি করেছেন, তাঁর উপর তারা কতটা নির্ভরশীল ছিল এবং সারা জীবনের জন্যে তাঁর কাছে তাদের শর্তহীন বাধ্য থাকা কত প্রয়োজন। বক্তৃতার প্রধান বিষয় হচ্ছে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর প্রতি অবাধ্যতার শাস্তি এবং বাধ্যতার পুরস্কার। আল্লাহর প্রতি বাধ্যতাই হচেছ ন্যায়, সত্য ও মুক্তির পথ। 

মূসা ইস্রায়েলীদের উদ্দেশ্যে যে বিদায়ী ভাষণ দেন তা ছিল এমন-

‘-হে বনি ইস্রায়েল! 
আমি তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালক খোদার সমস্ত নিয়ম ও নির্দেশ পৌছে দিয়েছি। তোমরা যত্ন ও নিষ্ঠার সঙ্গে যথাযথভাবে তা পালন করবে। স্মরণ রাখবে একমাত্র তিনিই আসমান এবং জমিনের অধিপতি।
--হে বনি ইস্রায়েল! 
মূসার সমাধি কমপ্লেক্স।
শোন, তোমাদের উপাস্য, তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ এক এবং অদ্বিতীয়। তিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই। তোমরা প্রত্যেকে তোমাদের সমস্ত অন্তর, সমস্ত প্রাণ ও সমস্ত শক্তি দিয়ে তোমাদের প্রভু, খোদাকে ভালবাসবে, কেবল তাঁরই সেবা করবে। 

একদিকে লোহিত সাগর থেকে প্যালেস্টীয়দের দেশের সাগর পর্যন্ত এবং অন্যদিকে মরুএলাকা থেকে ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত তোমাদের দেশের সীমানা খোদা নিজেই স্থির করে দেবেন। সেই দেশে যারা বাস করছে তাদের সঙ্গে কিম্বা তাদের দেবদেবতাদের সঙ্গে কোন চুক্তি করবে না। তা করলে তারা তোমাদেরকে পাপের পথে নিয়ে যাবে- তোমরা তাদের দেবদেবতাদের ফাঁদে আটকা পড়ে ধ্বংস হয়ে যাবে।

--হে বনি ইস্রায়েল!
তোমরা নির্দোষ কিম্বা সৎ কিম্বা তোমাদের সংখ্যাধিক্যের জন্যেই যে খোদা তোমাদের দিকে মনোযোগ দিয়েছেন এবং অন্যান্য জাতিদেরকে তোমাদের সম্মুখ থেকে বিতাড়িত করে তাদের দেশটা তোমাদের অধিকারে এনে দিচ্ছেন তা কিন্তু নয় বরং তিনি ইব্রাহিম, ইসহাক ও ইয়াকুবের কাছে যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তা পূর্ণ করার জন্যেই এই চমৎকার দেশটা যেখানে দুধ, মধু কোনটারই অভাব নেই তা দিচ্ছেন।

মূসার সমাধি, জেরিকো।
--হে বনি ইস্রায়েল!
তোমাদের প্রতি মহান খোদার দয়া ও করূণার কথা স্মরণ কর। স্মরণ কর, চল্লিশটা বৎসর কিভাবে তোমাদের এক বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে মরুএলাকার মধ্যে দিয়ে তিনি পরিচালিত করেছেন। এই দীর্ঘ সময়ে তোমাদের পরিধেয় পোষাক নষ্ট হয়নি এবং পদ যুগলও ভারী হয়ে যায়নি। তোমাদের দর্প চূর্ণ করতে এবং বাধ্যতা পরীক্ষায় ফেলে দেখতে তিনি এসব কাজ করেছেন। তোমরা ক্ষুধার্ত হলে- আকাশ থেকে খাদ্য মান্নার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, যে মান্নার কথা তোমাদের বা তোমাদের পূর্বপুরুষদের অজানা ছিল। তোমরা পিপাসার্ত হলে পাথর থেকে নির্ঝরিণীর সৃষ্টি করে দিয়েছেন। এভাবে তিনি তোমাদেরকে এই শিক্ষা দিতে চেয়েছেন যে, মানুষ কেবল রুটিতেই বাঁচে না, কিন্তু তাঁর মুখের প্রত্যেকটি কথাতেই বাঁচে। কাজেই তোমরা তাঁর আদেশ পালন করবে, তাঁর পথে চলবে এবং তাঁকে ভক্তি করবে।
 
--হে বনি ইস্রায়েল!
খোদা বলেছেন- ‘যদি তোমরা আমার বিধিপথে চল, আমার আজ্ঞাসমূহ পালন কর, তবে আমি যথাকালে তোমাদেরকে বৃষ্টি দান করব; তাতে ভূমি শস্য উৎপন্ন করবে ও বৃক্ষ সকল স্ব-স্ব ফল দেবে। তোমাদের শস্য মর্দ্দনকাল দ্রাক্ষা চয়নকাল পর্যন্ত থাকবে ও দ্রাক্ষা চয়নকাল বীজ বপনকাল পর্যন্ত থাকবে; এবং তোমরা তৃপ্তি পর্যন্ত অন্ন ভোজন করবে, ও নিরাপদে নিজ দেশে বাস করবে। আর আমি দেশে শান্তি প্রদান করব। তোমরা শয়ন করলে কেহ তোমাদেরকে ভয় দেখাবে না; এবং আমি তোমাদের দেশ হতে হিংস্র জন্তুদেরকে দূর করে দেব; ও তোমাদের দেশে তরবারী ভ্রমণ করবে না। আর তোমরা নিজেদের শত্রুগণকে তাড়িয়ে দেবে, তোমাদের পাঁচজন এক শত জনকে এবং একশত দশ সহস্রকে ও তারা তোমাদের সম্মুখে তরবারীতে পতিত হবে। আর আমি তোমাদের প্রতি প্রসন্নবদন হব, তোমাদেরকে ফলবন্ত ও বহুবংশ করব ও তোমাদের সাথে আমার নিয়ম স্থির করব। আর তোমরা সঞ্চিত পুরাতন শস্য ভোজন করবে ও নুতনের সম্মুখ হতে পুরাতন শস্য বের করবে। আর আমি তোমাদের মধ্যে আপন আবাস রাখব, আমার প্রাণ তোমাদেরকে ঘৃণা করবে না। আর আমি তোমাদের মধ্যে গমনাগমন করব ও তোমাদের খোদা হব এবং তোমরা আমার প্রজা হবে।’

--হে বনি ইস্রায়েল!
তোমরা সেখানে পানাহারে তৃপ্ত হবার পর খোদা প্রদত্ত ঐ চমৎকার দেশটার জন্যে তাঁর প্রশংসা করবে। তোমরা সতর্ক থাকবে যেন শয়তান তোমাদেরকে তাঁর আদেশ-নির্দেশ ভুলিয়ে না দেয়। আর যদি তোমরা কখনও তাঁকে ভুলে গিয়ে দেবদেবতার পিছনে যাও এবং তাদের সেবায় ও পূজায় লিপ্ত হও, তবে আমি এ কথা নিশ্চয় করে বলছি যে, তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে। তোমাদের বাসস্থান ও ক্ষেত-খামারের সবকিছুতেই তোমরা অভিশপ্ত হবে। তোমরা বুনবে অনেক কিন্তু কাটবে কম।
--হে বনি ইস্রায়েল! 
জর্দান নদী পার হয়ে যাওয়া আমার হবে না। আমার অবর্তমানে ইউশায়াই তোমাদের নেতৃত্ব দেবে।

ক্ষণকাল বিরতি নিয়ে তিনি আরও বললেন, ‘আমি তোমাদের মধ্যে বেঁচে থাকতেই যখন তোমরা খোদার বিরুদ্ধে এত এত বিদ্রোহ করেছ তখন আমার অবর্তমানে আরও কত বেশী করেই না তা করবে!’- ব্যবস্থা পুস্তক হাতে নিয়ে তিনি উঁচুতে তুলে ধরলেন এবং বললেন, ‘এখন থেকে এই ব্যবস্থা পুস্তকটা সাক্ষ্য সিন্দুকের পাশেই রাখা থাকবে। আর সেখানে তা থাকবে তোমাদের বিরুদ্ধে স্বাক্ষী হয়ে।’ 
 
ইস্রায়েলীরা মূসার অবর্তমানে নিজেদের অবস্থা ভেবে চিন্তিত হল। তারা কান্নাকাটি করতে লাগল। মূসা তাদেরকে সান্তনা দিলেন আর জানিয়ে দিলেন ঈসা ও মুহম্মদের আগমন বাণী। তিনি বললেন, ‘খোদা বলেছেন, ‘আমি তাদের ভ্রাতৃদিগের মধ্য হতে তোমার মতই একজন পয়গম্বর উত্থিত করব এবং তার মুখে আমার বাণী প্রকাশ করব। সে তোমাদেরকে আমি যা আদেশ করব তাই-ই শুনাবে এবং এ অবশ্যই ঘটবে যে, তার মুখ নিঃসৃত আমার সেই বাণী যারা শুনবে না তাদেরকে আমি শুনতে বাধ্য করব।’

ইস্রায়েলীদের প্রতি মূসার শেষ আশীর্বাদবাণী ছিল এই-

‘প্রভু সিনাই থেকে এলেন,
তিনি সেয়ীর থেকে তাদের উপর আলো দিলেন;
তার আলো পারণ পাহাড় থেকে ছড়িয়ে পড়ল।
তিনি লক্ষ লক্ষ পবিত্র স্বর্গদূতের মাঝখান থেকে এলেন;
তার ডান হাতে রয়েছে তাদের জন্যে
এক জীবন্ত আইন গ্রন্থ।’

পিসগা। মোয়াবের সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ। পাদদেশে মূসা ও ইউশায়া। তারা উভয়ে চূঁড়ার দিকে দৃষ্টি ফেললেন। পাথরের এক স্তম্ভ যেন শির উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আকাশ ভেদ করে। মূসা ইউশায়াকে বললেন, ‘তুমি শক্তিশালী হও ও মনে সাহস আন, কারণ তোমাকেই এই বিদ্রোহী জাতিকে নেতৃত্ব দিতে হবে এবং সেই দেশে নিয়ে যেতে হবে, যে দেশটা তাদেরকে দেবার প্রতিজ্ঞা খোদা তাদের পূর্বপুরুষদের কাছে করেছিলেন। আর তোমাকেই সেই দেশটা সম্পত্তি হিসেবে এদের মধ্যে বন্টন করতে হবে। ভয় কোরও না, নিরুৎসাহিত হইও না। সর্বশক্তিমান খোদা তোমার সহায় হবেন।’

মূসা ইউশায়াকে বিদায় করে দিয়ে একাকী এই পর্বতে আরোহণ করলেন। সেখান থেকে তিনি আগ্রহ আর উত্তেজনা নিয়ে প্রতিজ্ঞাত দেশের সমৃদ্ধি দেখতে লাগলেন। দেখলেন জর্দান নদীর গভীর খাদের পশ্চিম দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে ইস্রায়েলীদের ভবিষ্যৎ বাসভূমি, যেখানে তিনি কখনই যেতে পারবেন না। তার অন্তরে আফসোস থাকলেও আত্মতৃপ্তিও ছিল। কেননা তিনি রেখে যাচ্ছেন এক শক্তিশালী জাতিকে যারা প্রতিজ্ঞাত ঐ দেশে প্রবেশের অপেক্ষায়।

মূসার শেষ দেখাটা হয়েছিল বিকেলে যখন বিদায়ী সূর্য্য তার আলো কনানের বিশেষ বিশেষ এলাকার উপর ফেলেছিল। দেখা শেষে আল্লাহ তার মনে ঐ দেশের গৌরবময় দর্শণ সতেজ থাকতেই তার জীবনাবসান করেছিলেন। তারপর ফেরেস্তারা তাকে বৈৎ পিয়োরের সম্মুখস্থ উপত্যকাতে সমাহিত করেছিল। এই কারণে তার সমাধি আজ পর্যন্ত কেউই সঠিকভাবে সনাক্ত করতে পারেনি।

ঐশ্বরিক শক্তির প্রভাব বাদ দিয়ে সাধারণ ইতিহাসের আলোকে বিচার করলেও পৃথিবীর নথিপত্রে মূসার মত এমন ব্যক্তি দুর্লভ যিনি নিজের ও মানবজাতির ভাগ্যের মুক্তির জন্যে এত বেশী ও স্থায়ী প্রভাব ফেলেছেন। 

সমাপ্ত।
ছবি: Wikipedia.

১৪ মার্চ, ২০১২

Bani Israel: তাঁহ প্রান্তরে নজর বন্দীত্বের কারণ।


দ্বিতীয় মাসের বিশ দিনের দিন সাক্ষ্য তাম্বুর উপর থেকে মেঘ সরে গেল। তখন ইস্রায়েলীরা (Bani Israel) সিনাই মরুএলাকা থেকে যাত্রা শুরু করল। খোদার আদেশ অনুসারে এই প্রথমবারের মত তারা যাত্রাপথে পা বাড়াল। সেই মেঘ পারণ মরু এলাকায় এসে স্থির হয়ে না দাঁড়ান পর্যন্ত তারা চলতেই থাকল।

মিসর থেকে প্যালেস্টাইনের পথে বনি ইস্রায়েলী (রুট ম্যাপ)।
আবাস-তাম্বুর উপর থেকে যখন মেঘ সরে যেত তখন ইস্রায়েলীরা যাত্রা শুরু করত। আর যেখানে সেই মেঘ স্থির হয়ে দাঁড়াত সেখানেই তারা তাম্বু ফেলত। মেঘ সরে গেলেই তারা যাত্রা শুরু করত- তা দিনেই হোক বা রাতে। আর যতদিন মেঘ আবাস তাম্বুর উপরে থাকত তা সে দু‘দিন হোক বা এক মাস কিম্বা তার বেশী সময়, ইস্রায়েলীরা তাম্বু ফেলে সেখানেই অবস্থান করত, যাত্রা করত না। 

যখনই ইস্রায়েলীরা সাক্ষ্য-সিন্দুকটি নিয়ে রওনা হত তখন মূসা বলতেন, ‘হে খোদা! তোমার শত্রুরা সব ছড়িয়ে পড়ুক আর যারা তোমাকে ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখে তারা তোমার সামনে থেকে পালিয়ে যাক।’ আর যখনই মেঘ থেমে যেত তিনি বলতেন, ‘হে খোদা, আমাদের মাঝে তুমি ফিরে এসো।’

ইস্রায়েলীদের যাত্রা ছিল উত্তরমুখী এবং কনানের দক্ষিণ সীমায় কা’দেশ বর্ণিয়তে শেষ হল। এখানে পৌঁছানোর পর মূসাকে নির্দেশ দেয়া হল পবিত্র ভূমি কনান দেশে (সিরিয়ায়) প্রবেশ করতে এবং আগাম জানিয়ে দেয়া হল আল্লাহ এই পবিত্র ভূমির আধিপত্য তাদের ভাগ্যে লিখে দিয়েছেন- যা বাস্তবায়িত হবে। 

সুতরাং মূসা শিবির স্থাপনের পর প্রত্যেক বংশ থেকে একজন করে, নেতৃস্থানীয় বারজনকে কনান দেশে পাঠালেন, যেন তারা গিয়ে ঐ দেশের প্রয়োজনীয় খবরাখবর নিয়ে আসে। দেশের ভূমি, এর উর্বরাশক্তি এবং উৎপন্ন ফসল, দেশের শহরগুলি ও লোকদের প্রকৃতি ইত্যাদি জানাই ছিল প্রকৃত উদ্দেশ্য। যাত্রার পূর্বে মূসা তাদেরকে বলে দিয়েছিলেন, ‘তোমরা সেখানে যা কিছু দেখতে পাবে, তা প্রথমে আমাকে জানাবে। আমার অনুমতি ব্যতিত কারও কাছে কোনকিছু বর্ণনা করবে না।’

প্রতিনিধি দলটি রওনা হল এবং দেশের একদম উত্তর সীমা পর্যন্ত গিয়ে অন্যপথ দিয়ে ফিরে এল। এই যাত্রায় চল্লিশ দিন সময় লেগেছিল যা এই ছোট দেশটি দেখার জন্যে যথেষ্টই ছিল। যাত্রা পথে, এক পর্যায়ে শহরের বাহিরে পথিমধ্যে অমালিকা সম্প্রদায়ের আউজ বিন উনূক নামক এক ব্যক্তির সাথে তাদের সাক্ষাৎ হয়েছিল। আউজ তাদের সাথে কথাবার্তা বলার পর বুঝতে পারল যে, তারা তাদের সাথে যুদ্ধ করতে এসেছে। তখন সে রাগান্বিত হয়ে তাদের বারজনকে একাই বন্দী করে রাজদরবারে হাজির করল এবং রাজাকে তাদের অভিসন্ধি সম্পর্কে অবহিত করল। সুতরাং তাদেরকে আটক রাখা হল এবং দরবারে তাদের সম্পর্কে পরামর্শ চলল। উপদেষ্টাদের কেউ কেউ বলল, ‘তাদেরকে হত্যা করা হোক।’ 
আবার কেউ কেউ বলল, ‘তাদেরকে মুক্তি দেয়া হোক।’ 

অবশেষে সিদ্ধান্ত হল তাদেরকে মুক্তি দেয়া হবে, যেন তারা ফিরে গিয়ে তাদের সম্প্রদায়ের কাছে অমালিকাদের দৈহিক আকৃতি ও শক্তির কথা বর্ণনা করতে পারে। আর যেন তাদের যুদ্ধের সাধ একেবারেই মিটে যায়। 
তারা মুক্ত হল।

এই দল মুক্ত হয়ে যখন ফিরে আসছিল তখন আল্লাহ তাদেরকে ঐ শহরে প্রবেশের সময় কর্মজনিত ও বাক্যজনিত আদবের সাথে প্রবেশ করতে বলে দিয়েছিলেন, বলেছিলেন, ‘তোমরা এই জনপদে প্রবেশ কর এবং যেখানে ইচ্ছে যাও ও যা ইচ্ছে খাও, ‘মাথা নীচু করে প্রবেশ কর’ (কর্মজনিত আদব) আর বল, ‘ক্ষমা চাই’ (বাক্যজনিত আদব) আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করব; আর যারা সৎকর্ম করে তাদের জন্যে আমার দান বাড়িয়ে দেব।’ 
এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াত-‘যখন আমি বললাম, ‘তোমরা এ জনপদে প্রবেশ কর এবং যেখানে ইচ্ছে যাও ও যা ইচ্ছে খাও, মাথা নীচু করে প্রবেশ কর আর বল, ‘ক্ষমা চাই’ আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করব; আর যারা সৎকর্ম করে তাদের জন্যে আমার দান বাড়িয়ে দেব।’(২:৫৮)

থোকাসহ আঙ্গুর ফলের একটা ডাল কেটে নিয়ে এসেছিল।
মুক্তিলাভ করে ফিরে আসার সময় দেশটির উর্বরাশক্তি সম্বন্ধে ব্যাখ্যা দেয়ার জন্যে, প্রতিনিধি দলটি স্কোল থেকে কতকগুলি থোকাসহ আঙ্গুর ফলের একটা ডাল কেটে নিয়ে এসেছিল। যা দু‘জনে একটা লাঠিতে ঝুলিয়ে এনেছিল। এছাড়া তারা কিছু ডালিম ও ডুমুর এনেছিল। 

প্রতিনিধি দলটি ফিরে এসে মূসার কাছে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করল। তারা বলল, ‘দেশটা সত্যিই দুধ-মধুতে ভরা, কোন কিছুরই অভাব নেই সেখানে। এই হল সেখানকার ফল (থোকা শুদ্ধ আঙ্গুর লতা, ডালিম, ডুমুর প্রভৃতি ফল তারা মূসার সম্মুখে রাখল।)’ 
তারা বলে চলল-‘কিন্তু যারা সেখানে বাস করে তাদের গায়ে শক্তি বেশী এবং তাদের শহরগুলোও বেশ বড় বড় আর প্রাচীর বেষ্টিত। অনাকের বংশের লোকদেরও আমরা সেখানে দেখেছি। 
--অমালেকীয়েরা বাস করছে নেগেভে; হিত্তীয়, যিবূষীয় ও ইমোরীয়েরা পাহাড়ী এলাকায়, আর কনানীয়দের বাস সমুদ্রের কাছে এবং জর্দান নদীর কিনারা ধরে।’
১২ প্রতিনিধি ও তাদের আনীত ফল।
কিন্তু শক্তিশালী লোকদের কথা শুনলেও মূসার মধ্যে এর কোন প্রভাব পড়ল না। কেননা পূর্বেই আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে তাকে বিজয় ও সাফল্যের বাণী শুনিয়ে রেখেছিলেন। সুতরাং তিনি নিশ্চিত ছিলেন অমালিকাদের শক্তি ও প্রকান্ড অবয়ব কোনই কাজে আসবে না। তিনি মোকাবেলার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে সকলকে আদেশ দিলেন। 

বনি-ইস্রায়েলীরা প্রতিদ্বন্দ্বী সম্প্রদায়ের এত বড় শক্তি ও দৈহিক প্রকান্ডতার কথা জানতে পারলে যুদ্ধ করতে রাজি হবে না, কেননা শত শত বৎসর গোলামী করে তারা হীনমন্যতায় ভুগছিল এবং তাদের আত্মবিশ্বাসের এতটুকুও অবশিষ্ট ছিল না। এই আশঙ্কার কথা মূসার মনে উদয় হল। সুতরাং তিনি প্রতিনিধি দলের বারজনকেই এইবলে সতর্ক করে দিলেন যেন তারা কোন অবস্থায়ই বনি-ইস্রায়েলীদের কাছে অমালিকা সম্প্রদায়ের দৈহিক শক্তি ও প্রকান্ডতার কথা বর্ণনা না করে- যেন সম্পূর্ণ গোপন রাখে। 

কিন্তু, শেষপর্যন্ত কাজ হল মূসার নির্দেশের পরিপন্থী। যদিও তারা প্রকাশ্যভাবে কাউকে কিছু বলেনি। কিন্তু প্রত্যেকে স্বীয় বন্ধুর কাছে গোপনে অমালিকাদের শক্তিমত্তার কথা বর্ণনা করল, দু‘জন ছাড়া। এরা ছিল, ইউশায়া ইবনে নূন (মূসার ভগ্নি মরিয়মের স্বামী) ও কালেব বিন ইউকেনা। আস্তে আস্তে এ সম্পর্কে সকল ইস্রায়েলীই অবগত হয়ে পড়ল এবং অমালিকাদের দৈহিক শক্তি ও আকৃতি সম্পর্কে রীতিমত আলোচনা শুরু হল। লোকেরা তাদের সম্পর্কে অতিরঞ্জিত তথ্য ছড়িয়ে দিল। কেউ কেউ বলতে লাগল, ‘তারা এক একজন এক‘শ হাত লম্বা ও ষাট হাত চওড়া।’
কেউ কেউ বলল, ‘তাদের কেউ সমুদ্রে নামলে পানি তার হাঁটু সমান হয়।’

সাধারণ ইস্রায়েলীরা নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ল। তারা যুদ্ধ সম্পর্কে কোন চিন্তাই মাথায় আনতে চাইল না। তারা পরস্পর বলতে লাগল, ‘লোহিত সাগর পার হয়ে এসে এখন এদের হাতে যুদ্ধে মরার কি অর্থ হতে পারে?’ 
তবে প্রতিনিধিদের বারজনই একমত ছিল যে, দেশটি ভাল এবং তারা একান্তভাবেই তা পেতে চায়। তাই যখন দেশটি দখল করার কথা উঠল- তারা দু’দলে বিভক্ত হয়ে গেল। 

ইউশায়া ইবনে নূন ও কালেব বিন ইউকেনা।
প্রতিনিধি দলের দশজন সীমালংঘন করল। তাদেরকে যা বলা হয়েছিল তার বদলে তারা অন্যকথা বলল। তারা বলল, ‘শহরগুলি প্রাচীর বেষ্ঠিত এবং এর লোকগুলি ভীমাকায় যোদ্ধা, সেইজন্যে দেশটি দখল করা সম্ভব নয়।’
দলের দু’জন, কালেব ও ইউশায়া বলল, ‘দেশটি দখল করা সম্ভব। আমরা বিশ্বাসী হয়ে আল্লাহর উপরই নির্ভর করব। প্রবেশ দ্বারে তাদের মোকাবেলা করব। অতঃপর তওবা, তওবা বলতে বলতে প্রবেশ করব। জয় আমাদের হবেই হবে। কেননা আল্লাহ বলেদিয়েছেন- ‘তোমরা এই জনপদে প্রবেশ কর এবং যেখানে ইচ্ছে যাও ও যা ইচ্ছে খাও, ‘মাথা নীচু করে প্রবেশ কর’ আর বল, ‘ক্ষমা চাই’ আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করব; আর যারা সৎকর্ম করে তাদের জন্যে আমার দান বাড়িয়ে দেব।’ 

ইস্রায়েলীরা যখন শুনল শহরে প্রবেশের সময় তাদেরকে ‘হিত্তাতুন’- ক্ষমা চাই বলতে বলা হয়েছে, তখন তারা ব্যঙ্গ করে বলতে লাগল ‘হিন্তাতুন’-গম গম। খোদায়ী বিধানের এই শব্দগত ও অর্থগত বিকৃতি সাধনের কারণে তাদের উপর আল্লাহ অসন্তুষ্ট হলেন। তাছাড়া প্রতিনিধিদলের দশজন সীমালঙ্ঘণকারী ছিল। এই কারণে তিনি আকাশ থেকে শাস্তি পাঠিয়েছিলেন।  
অবিশ্বস্ত বেশকিছু ইস্রায়েলীর সঙ্গে এই দশজন বজ্রপাতে মারা পড়েছিল। 

এ সংক্রান্ত কোরআনের আয়াত- কিন্তু তারা (দশ প্রতিনিধি) সীমালংঘন করেছিল তারা তাদেরকে যা বলা হয়েছিল তার বদলে অন্যকথা বলল। সেজন্যে সীমালংঘনকারীদের উপর আমি আকাশ থেকে শাস্তি পাঠালাম, কারণ তারা ছিল সত্যত্যাগী।’(২: ৫৯)

কালেব ও ইউশায়ার প্রচুর চেষ্টা সত্ত্বেও অধিকাংশ ইস্রায়েলী দেশটি দখলে রাজী হল না। তখন মূসা তার সম্প্রদায়কে বললেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা স্মরণ কর আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি তোমাদের মধ্যে থেকে নবী করেছিলেন, তোমাদেরকে রাজ্যের অধিপতি করেছিলেন ও বিশ্বে যা কাউকে দেননি তা তোমাদেরকে দিয়েছিলেন। হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহ তোমাদের জন্যে যে পবিত্রভূমি নির্দিষ্ট করেছেন সেখানে প্রবেশ কর, আর পিছু হটিও না, পিছু হোটলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পড়বে।’ 
তারা বলল, ‘হে মূসা! সেখানে এক দুর্দান্ত সম্প্রদায় রয়েছে, আর তারা সেখান থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত আমরা কখনও সেখানে প্রবেশ করব না। তারা সেখান থেকে বের হয়ে গেলেই আমরা প্রবেশ করব।’ 

এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ-‘মূসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা স্মরণকর আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি তোমাদের মধ্যে থেকে নবী করেছিলেন, তোমাদেরকে রাজ্যের অধিপতি করেছিলেন ও বিশ্বে যা কাউকে দেননি তা তোমাদেরকে দিয়েছিলেন। হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহ তোমাদের জন্যে যে পবিত্র ভূমি নির্দিষ্ট করেছেন সেখানে প্রবেশ কর আর পিছু হোটও না, হোটলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পড়বে।’ 
তারা বলল, ‘হে মূসা! সেখানে এক দুর্দান্ত সম্প্রদায় রয়েছে, আর তারা সেখান থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত আমরা সেখানে প্রবেশ করব না। তারা সেখান থেকে বের হয়ে গেলে আমরা প্রবেশ করব।’(৫:২০-২৩)

কালেব ও ইউশায়া বনি-ইস্রায়েলীদের দুর্বল মনোভাব দেখে তাদেরকে উৎসাহিত করতে বললেন, ‘সমগ্র বিশ্ব আল্লাহর হাতের মুঠোয় রয়েছে। তাঁর অনুমতি ব্যতিত কেউ কারও ক্ষতি করতে বা উপকার করতে পারে না। সুতরাং অমালিকাদের প্রকান্ড দেহ ও শক্তি কোনই কাজে আসবে না, যেহেতু আল্লাহর সাহায্যের ওয়াদা আমাদের সাথে রয়েছে।’ 

কিন্তু বনি ইস্রায়েলীরা যখন তাদের নবী মূসার কথাই বিশ্বাস করছে না, তখন তাদের কথা কি করে বিশ্বাস করবে? তারা মূসাকে স্পষ্ট জানাল, ‘হে মূসা, যতদিন তারা সেখানে থাকবে ততদিন আমরা সেখানে প্রবেশ করব না। সুতরাং তুমি ও তোমার প্রতিপালক যাও ও গিয়ে যুদ্ধ কর।’ 

এরকম পরিস্থিতিতে মূসা আর কি করবেন? তিনি আল্লাহর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমি ও আমার ভ্রাতা ব্যতিত অন্যকারও উপর আমার কর্তৃত্ব নেই; সুতরাং তুমি আমাদের ও সত্যত্যাগী সম্প্রদায়ের মধ্যে ফয়সালা করে দাও।’ 
আল্লাহ বললেন, ‘তবে এ চল্লিশ বৎসর তাদের জন্যে নিষিদ্ধ রইল। তারা পৃথিবীতে উদ্ভ্রান্তের মত ঘুরে বেড়াবে। সুতরাং তুমি সত্যত্যাগী সম্প্রদায়ের জন্যে দুঃখ কোরও না।    
-- এখন তোমরা পিছন ফিরে আকাবা উপসাগরের পথ ধরে মরুএলাকার দিকে রওনা হয়ে যাও।’ 
নির্দেশমত ইস্রায়েলীরা এগিয়ে গেল এবং সিনাই উপত্যকার তাঁহ প্রান্তরে পৌঁছিল। 

এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ-‘যারা ভয় করেছিল তাদের মধ্যে দু’জন, যাদের উপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছিলেন, বলল, ‘তোমরা প্রবেশ দ্বারে তাদের মোকাবেলা কর। প্রবেশ করতে পারলেই তোমাদের জয় হবে। আর তোমরা বিশ্বাসী হয়ে আল্লাহর উপরই নির্ভর কর।’ 
তারা বলল, ‘হে মূসা, যতদিন তারা সেখানে থাকবে ততদিন আমরা সেখানে প্রবেশ করব না। সুতরাং তুমি ও তোমার প্রতিপালক যাও ও গিয়ে যুদ্ধ কর।’ 
সে বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমার ও আমার ভাই ছাড়া অন্যকারও উপর আমার কর্তৃত্ব নেই; সুতরাং তুমি আমাদের ও সত্যত্যাগী সম্প্রদায়ের মধ্যে ফয়সালা করে দাও।’ 
আল্লাহ বললেন, ‘তবে এ চল্লিশ বৎসর তাদের জন্যে নিষিদ্ধ রইল। তারা পৃথিবীতে উদ্ভ্রান্তের মত ঘুরে বেড়াবে। সুতরাং তুমি সত্যত্যাগী সম্প্রদায়ের জন্যে দুঃখ কোরও না।’(৫:২০-২৬)

আল্লাহ ইস্রায়েলীদেরকে সিনাই উপত্যকার ঐ প্রান্তরেই আঁটকিয়ে দিলেন। শুধু তাই নয়, তাদের উপর অর্পণ করা হল লাঞ্ছনা ও পরমুখাপেক্ষিতা। এমন হল এজন্যে যে, তারা আল্লাহর বিধিবিধান মানত না এবং তারা ছিল নাফরমান, সীমালঙ্ঘনকারী। এখন এখান থেকে তারা অমালিকাদের দেশেও যেতে পারবে না আবার ইচ্ছে করলে মিসরেও ফিরতে পারবে না। 
ইস্রায়েলীরা ঐশী রোষানলে পতিত হয়ে ঘুরতে থাকল। 

এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ- আর তাদের উপর আরোপ করা হল লাঞ্ছনা ও পরমুখাপেক্ষিতা। তারা আল্লাহর রোষানলে পতিত হয়ে ঘুরতে থাকল। এমন হল এ জন্যে যে, তারা আল্লাহর বিধি-বিধান মানত না এবং নবীগণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করত। তার কারণ, তারা ছিল নাফরমান, সীমালঙ্ঘনকারী।(২:৬১)

এ সম্পর্কে যবুরে আছে-
‘তখন তোমাদের পিতৃপুরুষেরা আমার পরীক্ষা করল, 
আমার বিচার করল, আমার কর্মও দেখল।
চল্লিশ বৎসর পর্য্যন্ত আমি সেই জাতির প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলাম,
আমি বলেছিলাম, এরা ভ্রান্তচিত্ত; এরা আমার পথ জ্ঞাত হল না।
অতএব আমি আপন ক্রোধে শপথ করলাম, 
             এরা আমার বিশ্রাম স্থানে প্রবেশ করবে না।’(৯৫:৯-১১)

তাঁহ অর্থ পথভ্রষ্ট হয়ে ঘোরা। কনান দেশটি দেখতে যে চল্লিশ দিন লেগেছিল, সেই চল্লিশ দিনের প্রতিদিনের জন্যে এক বৎসর করে মোট চল্লিশ বৎসর ইস্রায়েলীরা এই প্রান্তরে নজর বন্দী ছিল। তারা চাইত এখান থেকে বেরিয়ে মিসরে ফিরে যেতে। সারাদিন ঘুরে ঘুরে সন্ধ্যায় তারা নিজেদেরকে ঐস্থানেই পেত যেখান থেকে সকালে রওনা হয়েছিল। এই প্রান্তটির দৈর্ঘ্য ছিল ত্রিশ ফারসেক অর্থাৎ নব্বুই মাইল আর প্রস্থ ছিল নয় ফারসেক বা সাতাশ মাইল।

সমাপ্ত।
ছবি: bible.ca, gardenofpraise, jameswilkins.

৪ মার্চ, ২০১২

Muhammad: প্রতিশ্রুত পয়গম্বর মুহম্মদ প্রাচীন ধর্মগ্রন্থসমূহে।


মুহম্মদ (Muhammad) ছিলেন প্রতিশ্রুত পয়গম্বর অর্থাৎ আল্লাহ যে তাকে দুনিয়ায় পাঠাবেন তা দুনিয়াতে সকল পয়গম্বর প্রেরণের পূর্বেই নির্ধারিত হয়েছিল। সৃষ্টি তত্ত্বের স্বাভাবিক নিয়মে যা অনিবার্য, আবির্ভাবের পূর্বে তা-ই প্রতিশ্রুত। আদম, নূহ, মূসা, ইব্রাহিম, ঈসা প্রমুখ পূর্ববর্তী সকল পয়গম্বর ও তত্ত্বদর্শী মহাপুরুষই জানতেন সেই নিশ্চিত অনাগত একদিন আসবেন। তাই তারা প্রত্যেকেই মুহম্মদের আগমন সমন্ধে ভবিষ্যৎবাণী করে গেছেন। বেদ-পূরাণ, জিন্দাবেস্তা, দিঘা-নিকায়া প্রভৃতি প্রধান প্রধান ধর্মগ্রন্থ এবং ঐশী গ্রন্থসমূহে মুহম্মদের গুণগান ও তার আগমনের ভবিষ্যৎবাণী বিঘোষিত হয়েছে।

হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বেদ-পূরাণ এবং উপনিষদ ৫/৬ হাজার বৎসর আগে এক মহাপুরুষের আগমন বার্তা ঘোষণা করে তার জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যত ঘটনা ঘটেছে তার বিস্তারিত ভবিষ্যৎবাণী বর্ণনা করেছে। ঐসব গ্রন্থে বলা হয়েছে একমাত্র তিনিই হবেন মানব মুক্তির দূত। সকল মানুষকেই তার মুখ নিঃসৃত বাণী গ্রহণ করে তার আদর্শে আদর্শবান হতে হবে। এছাড়া মানব মুক্তির কোন পথ খোলা নেই। হিন্দু ধর্মগ্রন্থের সেই কলি অবতার হচ্ছেন শেষ নবী মুহম্মদ। এখন আমরা দেখি ঐসব গ্রন্থে কি রয়েছে-

উত্তরায়নবেদ:  
লা-ইলাহা হরত্তি পাপম
ইলাহ ইলাহা পরম পাদম
জন্ম বৈকুন্ঠ অপঃ ইন্যুতি
ও জপি নামো মুহামদম।

অর্থ : লা-ইলাহার (এক আল্লাহর) আশ্রয় ব্যতিত পাপমুক্তির কোন উপায় নেই। ইলাহ (আল্লাহ) এর আশ্রয়ই প্রকৃত আশ্রয়। বৈকুন্ঠে জন্মলাভের আশা করলে ইলাহর (আল্লাহর) আশ্রয় নেয়া ছাড়া কোন উপায় নেই। আর এজন্যে মুহম্মদের প্রদর্শিত পথ অনুসরণ অপরিহার্য।

অর্থবেদীয় উপনিষদ :  
অস্য ইল্ললে মিত্রাবরূণো রাজা
তম্মাৎ তানি দিব্যানি পুনস্তং দুধ্যু
হবয়ামি মিলং কবর ইল্লালাং
অল্লোরসূল মহম্মদ কং
বরস্য অল্লো অল্লাম ইল্লল্লোতি ইল্লাল্লা \৯\

অর্থ : যথাসময়ে জনৈক মহাপুরুষ আবির্ভূত হবেন। একমাত্র তিনিই হবেন মানব মুক্তির দূত। সকল মানুষকেই তার মুখনিঃসৃত বাণী গ্রহণ করে তার আদর্শে আদর্শবান হতে হবে। এছাড়া মানব মুক্তির কোন পথ খোলা নেই। সেই আল্লাহর রসূল মুহম্মদকে প্রণতি জানাই।
ভবিষ্যৎ পূরাণ :  
এত স্লিন্নস্তরে ম্লেচ্ছআচার্যেন সবন্বিতঃ।
মহামদ ইতি খ্যাতঃ শিষ্য শাখা সমন্বিতঃ \৫\
নৃপশ্চৈব মহাদেবং মরুস্থ'ল নিবাসিনম
গঙ্গা জলৈশ্চ সংস্নাপ্য পঞ্চগব্য সমন্বিতৈঃ
চন্দনাদি ভিরভ্যর্চ তুষ্টাব মনসা হরম \৬\
নমস্তে গিরিজানাথ মরুস্থল নিবাসিনে 
ত্রিপুরা সুরনাশায় বহুমায়া প্রবর্তিনে \৭\

অর্থঃ যথাসময়ে মুহম্মদ নামে জনৈক মহাপুরুষ আবির্ভূত হবেন। যার নিবাস হবে মরুস্থলে আরব দেশে। সাথে স্বীয় সহচরবৃন্দও থাকবেন।
হে মরুর প্রভূ, হে জগত গুরু, আপনার প্রতি আমাদের স্তুতিবাদ, আপনি জগতের সমুদয় কুলুষাদি ধ্বংসের উপায় অবগত আছেন। আপনাকে প্রণতি জানাই। 

ভোজরাজ উবাচ :  
ম্লেচ্ছৈ গুপ্তায় শুদ্ধায় সচ্চিদানন্দ রূপিণে।
ত্বংমাং হি কিঙ্করং বিদ্ধি শরনার্থ মুপাগতম \৮\

অর্থ : হে মহাত্মা, আমরা আপনার দাসানুদাস। আমাদেরকে আপনার পদমূলে আশ্রয় প্রদান করুন।

অলোপনিষদ :  
হোতার মিন্দ্রো হোতার মিন্দ্রো মহাসুরিন্দ্রাঃ।
অল্লো জ্যেষ্ঠং শ্রেষ্ঠং পরমং পূর্ণং ব্রহ্মাণ অল্লাম
অল্লো রসূল মহমদ কং বরস্য অল্লো অল্লাম 
আদল্লাহ্ বুকমে ককম অল্লাবুক নিখাতকম \৩\

অর্থ : ‘আল্লাহ সকল গুণের অধিকারী। তিনি পূর্ণ ও সর্বজ্ঞানী। মুহম্মদ আল্লাহর রসূল।  আল্লাহ আলোকময়, অয়, এক, চির পরিপূর্ণ এবং স্বয়ম্ভূ।’

অথর্ববেদ :   
ইদং জনা উপশ্রুত নরাশংসস্ত বিষ্যতে।
ষষ্টিং সহস্র নবতিংচ কৌরম আরুশ মেষু দবহে \১\

অর্থ : ‘হে মানবজাতি, মনোযোগ দিয়ে শোন, ‘প্রসংশিত জন’ লোকদের মধ্যে থেকে উত্থিত হবেন। আমরা তাকে ষাট হাজার শত্র“র মাঝে পেলাম। (মুহম্মদ নামের অর্থ প্রশংসিত জন আর তৎকালীন আরববাসীর সংখ্যা ছিল প্রায় ষাট হাজার।)’

দিঘা-নিকায়া :
মানুষ যখন গৌতম বুদ্ধের ধর্ম ভুলে যাবে, তখন আর একজন বুদ্ধ আসবেন, তার নাম ‘মৈত্তেয়’ অর্থাৎ শান্তি ও করুণার বুদ্ধ।

দ্যা গসপেল অব বুদ্ধা :
আনন্দ বুদ্ধকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার মৃত্যুর পর কে আমাদেরকে উপদেশ দেবে?’
বুদ্ধ বললেন, ‘আমিই একমাত্র বুদ্ধ বা শেষ বুদ্ধ নই। যথাসময়ে আর একজন বুদ্ধ আসবেন। আমার চেয়েও তিনি পবিত্র ও অধিকতর আলোকপ্রাপ্ত। তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্মমত প্রচার করবেন।’ 
আনন্দ জিজ্ঞেস করলেন, ‘তাকে আমরা চিনব কি করে?’ 
বুদ্ধ বললেন, ‘তার নাম হবে মৈত্রেয়।’ 

এই মৈত্রেয়ই মুহম্মদ। কোরআনে তার সম্পর্কে বলা হয়েছে তিনি ‘রহমাতুল্লিল আলামিন, ‘অর্থাৎ সমগ্রবিশ্বের জন্যে মূর্তকরুণা ও আশীর্বাদ।

স্পিতাম জরথুস্ত্র প্রবর্তিত পার্শী ধর্মের মূল গ্রন্থ জিন্দাবেস্তা ও দশাতির। এই গ্রন্থগুলো মূলত: তার বিজনে ধ্যানের ফলে অর্জিত জ্ঞান (দ্বৈতবাদ) ও পিতৃপুরুষদের ধর্মমত সমূহের সমষ্টি এবং সুপ্রাচীন কিছু ভাববাণী। এই কারণে এইসব গ্রন্থসমূহেও শেষনবী মুহম্মদের আগমনবার্তা সম্বন্ধে কিছু ভবিষ্যৎবাণী সংযুক্ত হয়েছে।

জিন্দাবেস্তা :
আমি ঘোষণা করছি, হে স্পিপতাম জরথুস্ত্র, পবিত্র আহমদ (ন্যায়বানদিগের আশীর্বাদ) নিশ্চয়ই আসবেন, যার কাছ থেকে তোমরা সৎ চিন্তা, সৎ বাক্য, সৎকার্য এবং বিশুদ্ধ ধর্ম লাভ করবে।’

দশাতির : 
যখন পার্শীরা নিজেদের ধর্ম ভুলে গিয়ে নৈতিক অধঃপতনের চরম সীমায় উপনীত হবে, তখন আরব দেশে এক মহাপুরুষ জন্মগ্রহণ করবেন, যার শিষ্যেরা পারস্য দেশ এবং দুর্ধর্র্ষ পারস্যিক জাতিকে পরাজিত করবে। নিজেদের উপাসনালয়ে অগ্নিপূজা না করে তারা ইব্রাহিমের কা’বাগৃহের দিকে মুখ করে প্রার্থনা করবে, সেই কা’বা প্রতিমা মুক্ত হবে। সেই মহাপুরুষের শিষ্যেরা বিশ্ববাসীর পক্ষে আশীর্বাদস্বরূপ হবে। তারা পারস্য, মদিয়ান, তুস, বলখ, প্রভৃতি পারস্যবাসীদের যাবতীয় পবিত্রস্থান অধিকার করবে। তাদের পয়গম্বর একজন বাগ্মীপুরুষ হবেন এবং তিনি অনেক অদ্ভূত কথা বলবেন। 

তাওরাত : 
‘তোমাদের প্রভু খোদা তোমাদের ভ্রাতৃদিগের মধ্যে হতে আমার মতই একজন পয়গম্বর উত্থিত করবেন; তার কথা তোমরা মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করবে।’

(খোদা বলেছেন) ‘আমি তাদের ভ্রাতৃদিগের মধ্য হতে তোমার (মূসার) মতই একজন পয়গম্বর উত্থিত করব এবং তার মুখে আমার বাণী প্রকাশ করব। তিনি তোমাদেরকে আমি যা আদেশ করব তাই-ই শুনাবেন এবং এ অবশ্যই ঘটবে যে, তার মুখনিঃসৃত আমার সেই বাণী যারা শুনবে না তাদেরকে আমি শুনতে বাধ্য করব।’

আর খোদার মনোনীত পুরুষ মূসা তার তিরোধানের পূর্বে এই বলে বনি ইস্রায়েলীদেরকে আশীর্বাদ করলেন-খোদা

‘প্রভু সিনাই থেকে এলেন,
তিনি সেয়ীর থেকে তাদের উপর আলো দিলেন;
তার আলো পারণ পাহাড় থেকে ছড়িয়ে পড়ল।
তিনি লক্ষ লক্ষ পবিত্র স্বর্গদূতের মধ্যে থেকে এলেন;
তার ডান হাতে রয়েছে তাদের জন্যে
এক জীবন্ত আইনগ্রন্থ।’
ইঞ্জিল :
ইঞ্জিলে পেশ করা হয়েছে ঈসার একান্ত মৌলিক ও তাৎপর্যময় বক্তব্য। হযরত ঈসা ও তার শিষ্যদের মধ্যে শেষ বিদায়ের লগ্নে এক ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ ও আবেগময় পরিবেশে তার শেষ ভাষণটি দেন। এই শেষ ভাষণের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচেছ এতে মানবজাতির যে ভবিষ্যৎ ঈসার চোখে ফুটে উঠেছিল, তার বর্ণনা। এই ভাষণে শিষ্যবর্গের জন্যে তো বটেই, গোটা মানবজাতির জন্যেও তার যে সুগভীর মমত্ববোধ ও দরদ, তা ফুটে উঠেছে। তার নির্দেশ ও বিধান এবং তার তিরোধাণের পর মানবজাতিকে কোন দিশারী বা পথ নিদের্শককে অনুসরণ করতে হবে, সেই ব্যাপারেও তার এই ভাষণে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য উপস্থাপিত হয়েছে। যেমন-

--‘যদি আমাকে প্রেম কর, তবে আমার আজ্ঞাসকল পালন করবে। আর আমি পিতার কাছে নিবেদন করব, আর তিনি আর এক সহায় তোমাদেরকে দেবেন।’
--‘কিন্তু সেই সহায় পবিত্র আত্মা, যাকে পিতা আমার নামে পাঠিয়ে দেবেন এবং আমি তোমাদেরকে যা বলেছি, সেই সকল স্মরণ করিয়ে দেবেন।’
--‘তিনি আমার বিষয়ে সাক্ষ্য দেবেন।’
--‘আমার যাওয়া তোমাদের পক্ষে ভাল, কারণ আমি না গেলে সেই সাহায্যকারী তোমাদের কাছে আসবেন না। কিন্তু আমি যদি যাই তবে সেই সাহায্যকারীকে তোমাদের কাছে পাঠিয়ে দেব। তিনি এসে দুনিয়াকে পাপের সম্বন্ধে, নির্দোষিতার সম্বন্ধে এবং মহান আল্লাহর সম্বন্ধে চেতনা দেবেন।

--পরন্তু তিনি (আহমদ) যখন আসবেন, তখন পথ দেখিয়ে তোমাদেরকে সমস্ত সত্যে নিয়ে যাবেন, কারণ তিনি আপনা হতে কিছু বলবেন না, কিন্তু যা-যা শোনেন, তাই বলবেন এবং আগামী ঘটনাও তোমাদেরকে জানাবেন। তিনি আমাকে মহিমান্বিত করবেন।’ 

এসব বাণী দ্বারা ঈসা এ মর্মেই ভবিষ্যৎবাণী করেছেন যে, পরবর্তীকালে আল্লাহ আর একজন মানুষকে দুনিয়ায় প্রেরণ করবেন। তিনি হবেন একজন পয়গম্বর। তিনি মানুষের কাছে পৌঁছে দেবেন ঐশী বাণী।

ঈসা আরও বলেছিলেন, খোদা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন ইব্রাহিমের কাছে- Behold, in your seed I will bless all the tribes of the earth; and as you have broken in pieces the idols, O Abraham;, even so shall your seed do."- [Barnabas ch-43]

নবী মুহম্মদ যে জগৎবাসীর জন্যে মূর্ত্তিমান করুণাস্বরূপ (ie.the Messiah for all), তা ব্যাখ্যা করতে ঈসা তার শিষ্যদের বলেছিলেন, ”Everyone that works, works for an end in which he finds satisfaction. Wherefore ..God, truly because he is perfect, has not need of satisfaction, seeing that he has satisfaction himself. And so, willing to work, he created before all things the soul of his Messenger (Muhammad), for whom he determined to create the whole, in order that the creatures should find joy and blessedness in God, whence his Messenger should take delight in all his creatures, which he has appointed to be his slaves. And wherefore is this, so save because thus he has willed?

Every prophet when he is come has borne to one nation only the mark of the mercy of God. And so their words were not extended save to that people to which they were sent. But the Messenger of God, when he shall come, God shall give to him as it were the seal of his hand, insomuch that he shall carry salvation and mercy to all the nations of the world that shall receive his doctrine. He shall come with power upon the ungodly, and shall destroy idolatry, insomuch that he shall make Satan confounded;.......[Barnabas ch-43]The Messenger of God is a splendour that shall give gladness to nearly all that God has made, for he is adorned with the spirit of understanding and of counsel, the spirit of wisdom and might, the spirit of fear and love, the spirit of prudence and temperance, he is adorned with the spirit of charity and mercy, the spirit of justice and Piety, the spirit of gentleness and patience, which he has received from God three times more than he has given to all his creatures.-[Barnabas ch-44]

কোরআন :
কোরআন মুহম্মদ সম্পর্কে উপরোক্ত সমস্ত ভবিষ্যৎবাণী সম্বন্ধে উল্লেখ করেছে- ‘এবং যখন আল্লাহ সমস্ত পয়গম্বরদের সমক্ষে এ চুক্তি করলেন যে, ‘নিশ্চয়ই আমি যে সমস্ত বাণী তোমাদেরকে দিয়েছি তা সত্য, অতঃপর একজন রসূল আসবেন এবং তিনি এসে তোমাদের কাছে যা আছে তার সত্যতা প্রমাণ করবেন; তোমরা তার কথায় বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং তাকে সাহায্য করবে।’ 
তিনি বললেন, ‘তোমরা এ ব্যাপারে আমার কথা স্বাীকার করলে তো?’  
তারা বলল, ‘আমরা স্বীকার কললাম।’ 
তখন তিনি বললেন, ‘তাহলে স্বাক্ষী থাক। আমিও তোমাদের সাথে স্বাক্ষী থাকলাম।’-(৩:৮০)

Jesus Messiah for the Jews only but Muhammad the Messiah for all. Thus Qur'an declares-  ”এবং আমি তাকে নিখিল বিশ্বের জন্যে মূর্ত্তিমান করুণাস্বরূপ পঠিয়েছি।”-(২১:১০৭)

সমাপ্ত।

Moses: কোরাণিক ক্যানভাসে নবী মূসা।

Abu Hena Mostafa Kamal  01 May, 2017 মি সরের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ফেরাউন। হঠাৎ করে তিনি মৃত্যুবরণ করলেন। কিন্তু তিনি কোন উত্তরাধিকারী ন...