pytheya.blogspot.com Webutation

২৯ জুলাই, ২০১৫

মওলিদ: নবী মুহম্মদের জন্মদিন কোনটি?



অারব উপদ্বীপের পশ্চিমে অবস্থিত হেজাজ অঞ্চলের মক্কা নগরীতে নবী মুহম্মদ জন্মগ্রহণ করেন। তার সঠিক জন্ম তারিখটি জানা যায় না। এর কারণ এই যে, ঐ সময় আরবদের মাঝে কোন সুনির্দিষ্ট বর্ষপঞ্জি প্রচলিত ছিল না। ফলে ঐতিহসিক ও জ্যোতির্বিদদের যারা এ বিষয়ের উপর কাজ করেছেন, তারা মতামত হিসেবে নবীজীর জন্মের অনেকগুলো সম্ভাব্য তারিখ দিয়েছেন। আর এই মতের ভিন্নতার কারণেই, বিশ্বকোষ ব্রিটেনিকা একটা সন্দেহজনক তারিখ দিয়ে, জন্মসনের স্থানে একটি প্রশ্নবোধক টিহ্ন এঁকে রেখে দিয়েছে। এতে এটা পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে, বিশ্বজগৎ নিশ্চিত নয়, কোন তারিখে নবী মুহম্মদ, যিনি সর্বশেষ নবী হিসেবে পরিচিত, ধরায় আগমন করেছিলেন।

সাধারণভাবে ধরা হয় নবীজীর জন্মদিন বা মওলিদ হস্তী বৎসরের (অর্থাৎ যে বৎসর আবিসিনীয় সম্রাট আবরাহা কা’বা আক্রমণ করেছিলেন তার হস্তী বাহিনী নিয়ে।) ১২ই রবিউল আওয়াল, যদিও বৎসর এবং তারিখ দু’টোর ক্ষেত্রেই মতের ভিন্নতা রয়েছে। তবে অধিকাংশ মুসলিম এটা জানে না যে, সঠিক তারিখটির ব্যাপারে বিতর্ক সবসময়ই ছিল এবং ১২ই রবিউল আওয়াল কোন সর্বজন স্বীকৃত তারিখ নয়। আর সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় পাওয়া ফলাফল হস্তী বৎসরের ব্যাপারে যে তথ্য দিয়েছে তা সাধারণভাবে আমাদের জানা তথ্যকে বিতর্কিত করেছে এবং ঐ ভিন্ন মতটিকেই প্রকারন্তে আরও ওজনদার করেছে। গবেষণায় দেখা যায়, হস্তী বৎসরটি নবীজীর জন্মের প্রায় ১৭-১৮ বৎসর পূর্বের। আর হেকলও এ বিষয়ে এমনিতর ভিন্ন মতামত উল্লেখ করেছেন সিরা পা্ঠ্যতে যে, ঐ ঘটনা ছিল নবীজীর জন্মের ১৫ বৎসর পূর্বের বা এমনকি তার জন্মের ৩০-৭০ বৎসর পূর্বেরও হতে পারে।

‘সহীহ সিত্তা’ বলে খ্যাত হাদিসের ৬টি গ্রন্থের কোনটিতে এমন কোন হাদিস নেই যেটি সুনির্দিষ্ট করবে নবীজীর জন্ম তারিখটি। বরং তাতে এ সংক্রান্ত একমাত্র যে হাদিসটি রয়েছে তা কেবল নির্দিষ্ট করেছে দিনটি, তারিখটি নয়-

আবু কাতাদা বর্ণনা করেন যে, এক বেদুইন নবীজীর কাছে সোমবার দিন বোজা রাখার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তাতে নবীজী উত্তর করেছিলেন- “ঐটি সেইদিন যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছিলাম এবং সেইদিন যেদিন কোরআনের অবতরণ শুরু হয়েছিল।” -সহীহ মুসলিম।

আর দিনের যে সময়টাতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন তা আমরা জানতে পারি-সিদি আল-গাউস আবদ আল-আজিজ আল-ধাব্বাগ, আল-ইবরিজ এর বর্ণনা থেকে। তিনি উল্লেখ করেছেন-“তিনি (নবীজী) জন্মগ্রহণ করেন, রাতের শেষ তৃতীয়াংশে, আর সর্বশক্তিমান আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।”

সুতরাং নবীজী সোমবার জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু কোন মাসের কোন সোমবার? আর বৎসরই বা কোনটি? এটা জানতে আমাদেরকে অন্য উৎসের দিকে নজর দিতে হবে। তথাপি মান সম্পন্ন উৎস হিসেবে হাদিসের যে কিতাবগুলো রয়েছে তাতে কোন সুনির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ নেই। হ্যাঁ, একটা বর্ণনা পাওয়া যায় যার সত্যতা অবশ্য বিতর্কিত, তা হল- সূয়াদ বিন ঘাপলা বর্ণনা করেন- “নবীজী এবং আমি একই বৎসরে, হস্তী বৎসরে জন্মগ্রহণ করি।” সুনান আল-বায়হাকি, ভলিয়্যূম-১, পৃষ্টা-৭৯। আরও কিছু সূত্রও অবশ্য নির্দেশণা দেয় যে, তিনি ঐ বৎসর জন্মগ্রহণ করেন। সুতরাং, হাদিসের মূল ও বর্ধিত কিতাব থেকে আমরা এ পর্যন্ত দু’টো তথ্য কুড়িয়ে পেলাম-
এক. তিনি সোমবার জন্মগ্রহণ করেন,
দুই. তিনি হস্তী বৎসরে জন্মগ্রহণ করেন।

আবার, ইতিহাসের কিতাবগুলোতে দৃষ্টি দিলে আমরা নবীজীর অনেকগুলো জন্ম তারিখ দেখতে পাই। ইবনে ইসহাক (মৃত্যু-১৫০ হিজরী)- গোড়ারদিককার নবীজীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জীবনীকারদের অন্যতম। তিনি হাদিস বা অপর গ্রহণযোগ্য কোন সূত্র ছাড়াই উল্লেখ করেছেন যে, নবীজী হস্তী বৎসরের ১২ই রবিউল আওয়াল, সোমবার জন্মগ্রহণ করেন। ইবনে ইসহাক ও নবীজীর জন্মকালের মধ্যে প্রায় ২০০ বৎসরের ব্যবধান রয়েছে, সুতরাং এই দিনটি স্বীকার করে নিতে হলে আমাদের আরও কিছু প্রমাণ অবশ্যই দরকার।

প্রথমদিককার গুরুত্বপূর্ণ আরেকজন ঐতিহাসিক ইবনে সা’দ (মৃত্যু-২৩০ হিজরী) তার তাবাকাতে নবীজীর জন্ম তারিখ সম্পর্কে কয়েকজন প্রাথমিক বর্ণনাকারীর অভিমত তুলে ধরেছেন। ক্রম অনুসারে সেগুলি হল-

১. হস্তী বৎসরের ২রা রবিউল আওয়াল, সোমবার।
২. হস্তী বৎসরের ১০ই রবিউল আওয়াল, সোমবার।
৩. সোমবার, কোন সুনির্দিষ্ট তারিখ নেই।
৪. হস্তী বৎসরে, কোন সুনির্দিষ্ট তারিখ নেই।

এখানে মজার ব্যাপার লক্ষ্যণীয় এই যে, ইসলামের গোড়ার দিকের এই প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে সা’দ সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে ১২ই রবিউল আওয়ালকে তার তালিকায় স্থানই দেননি। অবশ্য শেষ দু’টি অপশনও সঠিক এবং কোন সুনির্দিষ্ট তারিখের সাথে তা বিরোধপূর্ণও নয়। কিন্তু প্রথমদিককার তথ্য দাতারা যারা এতটুকু তথ্য দিয়েছেন, তাদের এসব উদ্ধৃতি উল্লেখ থেকে এটা সহজেই অনুমান করা যায় যে, তাদের কারো নবীজীর সঠিক জন্মতারিখ জানা ছিল না, আর তাই তারা কেবল ততটুকু তথ্যই দিয়েছেন যতটুকু তারা জানেন।

মধ্যযুগের সুপ্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক ইবনে কাছিরও (মৃত্যু-৭৭৪ হিজরী) নবীজীর জন্মতারিখ সম্পর্কে তার স্মারকগ্রন্থ আল-বিদায়া ওয়াল নিহায়াতে অনেকগুলো অভিমত নথিবদ্ধ করেছেন। তিনি বর্ণনা করেন যে, বেশিরভাগ পন্ডিতই বিশ্বাস করেন নবীজী রবিউল আওয়াল মাসে জন্মগ্রহণ করেন, কিন্তু সুনির্দিষ্ট তারিখের ব্যাপারে তারা ভিন্ন মত পোষণ করেন। ঐসব অভিমতগুলোর কিছু হল-

ক). ২রা রবিউল আওয়াল: এ অভিমত হল গোড়ার দিকের সিরা পন্ডিতগণের অন্যতম আবু মা’সার আল-সিন্ধীর (মৃত্যু-১৭১ হিজরী) এবং বিখ্যাত মালিকি জুরিষ্ট ও পন্ডিত, ইবনে আবদ আল-বারের (মৃত্যু-৪৬৩হিজরী)। সম্ভাব্য অপশন হিসেবে এ্ই তারিখ আরও লিপিবদ্ধ হয়েছে আল-ওয়াকিদি (মৃত্যু-২০৭ হিজরী) কর্তৃক, হাদিস বর্ণনাকারী হিসেবে তার দূর্বলতা স্বত্ত্বেও তিনি ইসলামের প্রথমদিককার স্বনামধণ্য ঐতিহাসিকদের একজন হিসেবে স্বীকৃত।

খ). ৮ই রবিউল আওয়াল: এই অভিমতটি আন্দালুসিয়ান পন্ডিত ইবনে হাজম (মৃত্যু-১২৮ হিজরী) এবং গোড়ার দিককার আরো কিছু পন্ডিতদের। ঈমাম মালিক (মৃত্যু-১৭৯ হিজরী) এই মতটির কথা উল্লেখ করেছেন আল-জুহুরী (মৃত্যু-১২৮ হিজরী) ও মুহম্মদ বিন জুবায়েরের মতামত হিসেবে। অন্যদের মধ্যে ইবনে আবদ আল-বার ১ম মতটির পক্ষে রায় দিলেও স্বীকার করেছেন যে, এই মতটি অধিকাংশ ঐতিহাসিকদের অভিমত। নবীজীর জীবনীর উপর প্রথম প্রবন্ধ লেখকদের একজন ইবনে ধাইয়াও (মৃত্যু-৬১০ হিজরী) এই তারিখটিকে সবচেয়ে জোরালো মত হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

গ). ১০ই রবিউল আওয়াল: নবীজীর বংশধর এবং শিয়া ঈমামগণের একজন, আবু জাফর আল-বাকিরের (মৃত্যু-১১৪ হিজরী) অভিমত হিসেবে ইবনে আসাকির (মৃত্যু-৫৭১ হিজরী) এটি বর্ণনা করেছেন। আর এটা বিখ্যাত স্কলার এবং সাহাবীগণের ছাত্র, আল-শাবি (মৃত্যু-১০০ হিজরী)-এরও অভিমত এবং আল ওয়াকিদির (মৃত্যু-২০৭ হিজরী) নিজেরও।

ঘ). ১২ই রবিউল আওয়াল: এই অভিমতটি ইবনে ইসহাকের (মৃত্যু-১৫০ হিজরী), যিনি কোন সূত্র ছাড়াই এটি উল্লেখ করেছেন। অন্য উৎসে এটি উল্লেখ করা হয়েছে জাবির ও ইবনে আব্বাসের অভিমত হিসেবে, কিন্তু এ্ই বিষয়ের উপর তাদেরকে নিয়ে কোন ইসনাদ প্রাইমারী সোর্স বুকে পাওয়া যায়নি।

ঙ). ১৭ই রবিউল আওয়াল: এই তারিখটি কিছু শিয়া পন্ডিতদের অভিমত এবং অধিকাংশ সুন্নী পন্ডিত এটি বাতিল করে দিয়েছেন কোনরূপ যুক্তিগ্রাহ্য যুক্তি প্রদান ব্যতিরেকেই।

চ). ২২শে রবিউল আওয়াল: এই অভিমতটি ইবনে হাজমের (মৃত্যু-১২৮ হিজরী) নামে আরোপিত।
ছ). হস্তী বৎসরের ১২ই রমযান: প্রথমদিককার পন্ডিতগণের এমনই অভিমত ছিল বলে ইবনে আসাকির এটি বর্ণনা করেছেন।

জ). হস্তী বৎসরের রমযান মাসে: এই অভিমতটি প্রথমদিককার সুপরিচিত ঐতিহাসিক আল জুবায়ের বিন আল-বক্করের (মৃত্যু-২৫৬ হিজরী) অভিমত, যিনি সর্বপ্রথম এবং বহুল স্বীকৃত মক্কার ইতিহাস রচনা করেন। আর প্রাথমিক কিছু পন্ডিতও তার সাথে এ ব্যাপারে সহমত পোষণ করেছেন।

এই হচ্ছে নবীজীর জন্ম তারিখের ব্যাপারে সবচেয়ে জোরালো মতামতগুলির অন্যতম। তথাপি কোনভাবেই এ্ই তালিকাকেও সুসম্পন্ন বলে অভিমত দেয়া যাচ্ছে না একারণে যে, আধুনিক কালের একজন গবেষণাকারী এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, সঠিক তারিখটির ব্যাপারে সাঁরির প্রথমে থাকবে ৯ই রবিউল আওয়াল। আর আমাদের মত অল্প বিদ্যার লোক এটি খুব সহজভাবেই গণনা করবে এভাবে-

আমরা জানি, একটি চান্দ্র মাস প্রায় ২৯.৫দিন, সুতরাং চান্দ্র বৎসর =২৯.৫x১২=৩৫৪ দিনে যা প্রচলিত গ্রেগোরিয়ান বৎসরের চেয়ে (৩৬৫-৩৫৪)=১১দিন কম।
অাবার, ২০১৫ গ্রেগোরিয়ান বৎসর=১,৪৩৬ হিজরী সন।
আর, আমরা জানি, নবীজী ৫৩-৫৪ বৎসর বয়সের সময় হিজরত করেন।
সুতরাং নবীজীর জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত মোট চান্দ্র বৎসর= হিজরী বৎসর+৫৪ (সনের নীচের সীমা পেতে ৫৪ বৎসর ধরা হল)= ১,৪৩৬+৫৪ = ১,৪৯০ বৎসর।
এই ১৪৯০ চান্দ্র বৎসর, সমান গ্রেগোরিয়ান বৎসরের থেকে মোট ১,৪৯০x১১ বা, ১৬,৩৯০ দিন বা, ১৬,৩৯০/৩৫৪ = ৪৬.৩ অর্থাৎ প্রায় ৪৬ বৎসর কম।

সুতরাং ১,৪৯০ চান্দ্র বৎসরের সমতুল্য গ্রেগোরিয়ান বৎসর = ১,৪৯০-৪৬ = ১,৪৪৪ বৎসর।
অতএব, নবীজীর জন্ম বৎসর = ২,০১৫-১,৪৪৪ = ৫৭১ সিই। আর যদি আমরা ধরি যে, নবীজী ৫৩ বৎসর বয়সে হিজরত করেছিলেন, তবে এটি হবে ৫৭২ সিই।

অন্যদিকে নবীজীর জন্মদিন সোমবার হস্তী বৎসরের রবিউল আওয়াল মাসে এবং যেহেতু ৮ ও ১০ তারিখ সর্বাধিক সমর্থিত বলে আমরা ইতিমধ্যে জানতে পেরেছি, তাই ক্যালেন্ডার থেকে সহজেই আমরা পিছনের দিকে গণনা করে দেখতে পাই সোমবারটি পড়ে ঐ মাসের ৯ তারিখে।

অর্থাৎ ৫৭১ সিই্= হিজরী পূর্ব ৫৪ সোমবার ৯ই রবিউল আওয়াল এবং সংশ্লিষ্ট গ্রেগোরিয়ান তারিখ ২০শে এপ্রিল ৫৭১ সিই। আর এই তারিখ প্রথম সুপারিশ করেন মিশরীয় এ্যাস্ট্রোনোমার মুহম্মদ পাশা আল-ফালাকি (১৩০২/১৮৮৫)।তবে গণনার এসব রীতিতে যে সমস্যা রয়েছে তা এই যে, গ্রেগোরিয়ান ও হিজরীর মধ্যে রূপান্তরের সুনির্দিষ্ট কোন পদ্ধতি নেই, ফলে যে কনভার্সান এসব ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে তা পুরোপুরি নির্ভুল নয়।

আরেকটি ভিন্ন গণনা দেখিয়েছে যে, নবীজীর জন্মদিন, সোমবার, ১৭ই জুন, (১২ই রবিউল আওয়াল) ৫৬৯ সিই এবং এটি অামাদের সময়ের বিখ্যাত মুসলিম স্কলার মুহম্মদ হামিদুল্লাহ (২০০২) কর্তৃক সুপারিশকৃত।.

যাহোক, আরও যেসব ভিন্ন মতামত রয়েছে তার উল্লেখ আমরা পাই মুহম্মদ হুসেন হেকলের বর্ণনায়। তার রচিত নবীজীর জীবনীতে নবীজীর জন্ম মাস রবিউল আওয়াল ও রমযান ছাড়াও মুহররম, সফর বা রজবও হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। তাছাড়া তিনি ফরাশী ওরিয়েন্টালিষ্ট এর উদ্ধৃতি দিয়ে আরও উল্লেখ করেছেন যে, সবচেয়ে সম্ভাব্য সময় আগস্ট ৫৭০ সিই, যা রজবের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। আর আর্টিকেলের শুরুতেই আমরা বলেছি যে, হেকল তার সিরাতে হস্তী বৎসরটি নবীজীর জন্মের ১৫ বৎসর পূর্বের বা এমনকি তার জন্মের ৩০-৭০ বৎসর পূর্বেরও হতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন, যা সম্প্রতিক ভূ-তাত্ত্বিক গবেষণার ফলাফলের সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

যাহোক, উপরে উপস্থাপিত সমস্ত তথ্য বিশ্লেষণে আমরা দেখতে পাচ্ছি, নবীজীর সুনির্দিষ্ট জন্ম তারিখের ব্যাপারে অনেকগুলো অভিমত রয়েছে যার কিছু মাসের ব্যাপারে ভিন্ন এবং অবশিষ্টগুলো এমনকি বৎসরের ব্যাপারেও। তবে ঐতিহাসিক এবং স্কলারগণের এক বড় অংশ এ বিষয়ে একমত যে, নবীজী হস্তী বৎসরের যা ৫৭০ (বা ৫৭১) সিই’র সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ রবিউল আওয়াল মাসের কোন এক সোমবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আর এই তথ্যকে আমলে নিলে আমরা আরো দেখতে পাই যে, রবিউল আওয়াল মাসে রয়েছে অর্ধ ডজনের কাছাকাছি অভিমত। সত্যি বলতে কি, এসব তারিখগুলোর মধ্যে দু’টি তারিখ-৮ই এবং ১০ই ছিল ইসলামের প্রথম পাঁচ শতাব্দী পর্যন্ত জনপ্রিয় অভিমত। আর এ দু’য়ের মধ্যে বিশেষত: পরের মতামতটিই মূল্যায়িত হত বেশী।

তাহলে এখন এই প্রশ্ন দাঁড়ায়, ১২ই রবিউল আওয়ালকে অধিকাংশ লোক নবীজীর জন্মদিন হিসেবে উৎযাপন করে যাচ্ছে কেন? তবে কি অধিকাংশ লোক মতের এত ভিন্নতা সম্পর্কে অবগত নয়?

এর উত্তরে বলা যায়, প্রকৃত তারিখটি কোন সাহাবা বা নবীজীর স্ত্রীদের কারও জানা ছিল না এবং “১২ই রবিউল আওয়াল” অন্য দিনগুলোর মতই একটি, তবে ইবনে কাছির কিন্তু একথাটি উল্লেখ করেছেন- “…আর এটাই এ বিষয়ে সবচেয়ে কমন মতামত, তবে আল্লাই এ বিষয়ে ভাল বলতে পারবেন।” যদিও এই অভিমত ইসলামের প্রথম কয়েক প্রজন্মের স্কলারদের কারও নামে আরোপিত হয়নি। এদিকে ইবনে রজব আল-হাম্বলিও তার লাতি’ফ আল-মা’রিফ (পৃষ্ঠা ১৮৫) গ্রন্থে লিখেছেন- “অধিকাংশ লোকের অভিমত যে, তিনি (নবীজী) সপ্তাহের ২য়দিন (সোমবার) ১২ই রবিউল আওয়াল জন্মগ্রহণ করেন.... হস্তী বৎসরে।” আর ইতিমধ্যেই আমরা বলেছি, ইবনে ইসহাকও এই তারিখটির কথা উল্লেখ করেছেন (কোন সূত্র ছাড়াই)। তবে নিম্নে বর্ণিত ফ্যাক্টর দু’টোও এসবের সাথে কাজ করে থাকতে পারে বলে আমাদের ধারণা-

প্রথমত: ইবনে ইসহাকের নিজস্ব জনপ্রিয়তা। তার সিরা গ্রন্থ নবীজীর জীবনালেখ্য সম্পর্কিত তথ্যের প্রাথমিক উৎস। আর তাই তার গ্রন্থটি অন্য অভিমতগুলোকে উপেক্ষা করে একটি স্টান্ডার্ড রেফারেন্স হিসেবে পরবর্তীতে অনেক স্কলারই তাদের লেখায় ব্যাবহার করেছেন সিম্পলি কপি-পেস্ট করে যা তারিখ নির্ধারণে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।

দ্বিতীয়ত: প্রথমবারের মত একদল লোক যখন নবীজীর জন্মদিন হিসাবে দিনটি উৎযাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করে, তখন সম্ভবত: তারা অতটা বিচার বিশ্লেষণ না করেই ১২ তারিখটি বেঁছে নিয়েছিল। তারপর যখন মিলাদ-উন-নবী উৎযাপন বিস্তার লাভ করল, এই দিনটিও একই সাথে অধিকাংশের স্বীকৃতি লাভ করেছিল। আর এ ধারণা এটাও ব্যাখ্যা করে যে, কেন অাবদ আল-বার হিজরী ৫ম শতাব্দীতে মওলিদ (মিলাদ-উন-নবী) উৎযাপনের ধারণা গড়ে ওঠার পূর্বে উল্লেখ করেন যে, ঐতিহাসিকদের মধ্যে অধিকাংশের অভিমত ৮ই রবিউল আওয়াল এবং কেন ইবনে কাছির আরও তিন’শ বৎসর পর যখন মিলাদ-উন-নবী সর্বসাধারণের উৎসব হিসেবে পরিচিত হয়ে গিয়েছিল, উল্লেখ করেন যে, ১২ই রবিউল আওয়াল অধিকাংশের অভিমত।

এ পর্যন্ত উপস্থাপিত তথ্যের সার সংক্ষেপ হল- নবীজীর জন্মের সঠিক তারিখটি ক্লাসিক্যাল স্কলারদের মধ্যে সর্বদাই বিতর্কের বিষয় ছিল। সহিহ হাদিসের কিতাবগুলোতে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা হয়নি,আর এ থেকে প্রমানিত হয় তারা একে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করেননি যেমনটা পরবর্তীরা করেছেন।

অধিকাংশ শিয়া স্কলার ১৭ই রবিউল আওয়াল এবং অধিকাংশ সুন্নী স্কলার ১২ই রবিউল আওয়াল নবীজীর জন্মতারিখ বলে বিশ্বাস করেন। আর এ কারণেই উভয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সম্মান জানাতে ১২-১৭ রবিউল আওয়ালকে ঐক্য সপ্তাহ হিসেবে নির্ধারণ করেছে ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান।

সমাপ্ত।
সংশোধিত নয়।

উৎস:
সহিহ বুখারী,
সহিহ মুসলিম,
সুনান বায়হাকি,
মালিক বিন আনাস, আল-মুয়াত্তা,
ইবনে ইসহাক, সিরাত রসূল আল্লাহ,
ইবনে সা’দ আল-তাবাকাত আল-কবির,
ইবনে কাছির, আল-বিদায়া ওয়াল নিহায়া,
ইবনে আসাকির, তারিখ মদিনাত দামাস্ক,
মওলিদ না মওলুদ- ইসলামিক এনসাইক্লোপিডিয়া,
আল ওয়াকিদি, কিতাব আল তারিখ ওয়াল মাঘাজি,
ইবনে রজব আল হাম্বলি, আল-লাতিফ আল-মারিফ,
ইবনে হাজম, আল-ইহকাম ফি উসূল আল-আহকাম,
ইবনে হজর আল-অাসকালানি, ফতেহ আল-বারী ফি সারহ সহিহ আল-বুখারী,
আল-জুরায়ের আল-বক্কর, আল-মুনতাখব মিন কিতাব আযওয়াজ আল-নবী,
Dr. Yasir Qadhi, The Birth-date of the Prophet and the history of the Mawlid, muslimmatters.org/2009/03/13/
Vaiz Zade Khorasani, Muhammad (1996). "Muhammad brithday, Unity Week and 9th International Islamic Unity Conferance" . Mishkat (51): 4–43.

১৮ জুলাই, ২০১৫

Christopher: The Patron Saint of Travelers.

প্রথমদিকে ক্রিস্টোফারকে রিপ্রোবাস (Reprobus) নামে ডাকা হত। তিনি ছিলেন সাড়ে সাত ফুট উচ্চতার একজন কনানাইট (Canaanite) with a fearsome face. While serving the king of Canaan, he took it into his head to go and serve "the greatest king there was". 

He went to the king who was reputed to be the greatest, but one day he saw the king cross himself at the mention of the devil. On thus learning that the king feared the devil, he departed to look for the devil. He came across a band of marauders, one of whom declared himself to be the devil, so 
Reprobus decided to serve him. But when he saw his new master avoid a wayside cross and found out that the devil feared Christ, he left him and enquired from people where to find Christ. 

He met a hermit who instructed him in the Christian faith. 
Reprobus asked him how he could serve Christ. When the hermit suggested fasting and prayer, Reprobus replied that he was unable to perform that service. The hermit then suggested that because of his size and strength Reprobus could serve Christ by assisting people to cross a dangerous river, where they were perishing in the attempt. The hermit promised that this service would be pleasing to Christ.

ক্রিস্টোফার-১
After Reprobus had performed this service for some time, a little child asked him to take him across the river. During the crossing, the river became swollen and the child seemed as heavy as lead, so much that Reprobus could scarcely carry him and found himself in great difficulty. When he finally reached the other side, he said to the child: "You have put me in the greatest danger. I do not think the whole world could have been as heavy on my shoulders as you were." 

ছেলেটি বলল, “ও, 
রিপ্রোবাস! যে ভার আমি বয়ে চলেছি এতদিন তাইতো তোমার কাঁধে তুলে দিলাম আজ। আজ থেকে তোমার নাম হল ক্রিস্টোফার- খৃষ্টবাহন।
রিপ্রোবাস অবাক হয়ে বলল, “কে তুমি?”
সে বলল, “আমিই খৃষ্ট, আজ থেকে যার সেবায় নিয়োজিত হলে তুমি।” ছেলেটি অদৃশ্য হয়ে গেল।

এরপর কি হল, তা জানার আগে আমরা দেখে নেই ক্রিস্টোফারকে নিয়ে সুকুমার রায় রচিত এই কিংবদন্তিটি-

“তার নাম অফেরো। অমন পাহাড়ের মত শরীর, অমন সিংহের মত বল, অমন আগুনের মত তেজ, সে ছাড়া আর কারও ছিল না। বুকে তার যেমন সাহস, মুখে তার তেমনি মিষ্টি কথা। কিন্তু যখন তার বয়স অল্প, তখনই সে তার সঙ্গীদের ছেড়ে গেল; যাবার সময় বলে গেল, "যদি রাজার মত রাজা পাই, তবে তার গোলাম হয়ে থাকব। আমার মনের মধ্যে কে যেন বলে দিচ্ছে, তুমি আর কারও চাকরি করো না; যে রাজা সবার বড়, সংসারে যার ভয় নেই, তারই তুমি খোঁজ কর।" এই বলে অফেরো কোথায় জানি বেরিয়ে গেল।

পৃথিবীতে কত রাজা, তাদের কত জনের কত ভয়। প্রজার ভয়, শত্রুর ভয়, যুদ্ধের ভয়, বিদ্রোহের ভয়— ভয়ে কেউ আর নিশ্চিন্ত নেই। এরকম হাজার দেশ ছেড়ে ছেড়ে অফেরো এক রাজ্যে এল, সেখানে রাজার ভয়ে সবাই খাড়া! চোরে চুরি করতে সাহস পায় না, কেউ অন্যায় করলে ভয়ে কাঁপে। অস্ত্রেশস্ত্রে সৈন্যসামন্তে রাজার প্রতাপ দশদিক দাপিয়ে আছে। সবাই বলে, "রাজার মত রাজা।" তাই শুনে অফেরো তাঁর চাকর হয়ে রইল।

তারপর কতদিন গেল— এখন অফেরো না হ'লে রাজার আর চলে না— উঠতে বসতে তার ডাক পড়ে। রাজা যখন সভায় বসেন অফেরো তার পাশে খাড়া। রাজার মুখের প্রত্যেকটি কথা সে আগ্রহ করে শোনে! রাজার চালচলন ধরনধারণ ভাবভঙ্গি— সব তার আশ্চর্য লাগে। আর রাজা যখন শাসন করেন, চড়া গলায় হুকুম দেন, অফেরো তখন আবাক হয়ে ভাবে, "যদি রাজার মত রাজা কেউ থাকে, তবে সে এই!"

তারপর একদিন রাজার সভায় কথায় কথায় কে যেন শয়তানের নাম করেছে। শুনে রাজা গম্ভীর হয়ে গেলেন। অফেরো চেয়ে দেখলে রাজার চোখে হাসি নেই, মুখখানি তার ভাবনা ভরা। অফেরো তখন জোড় হাতে দাঁড়িয়ে বলল, "মহারাজের ভাবনা কিসের? কি আছে তার ভয়ের কথা?" রাজা হেসে বললেন, "এক আছে শয়তান আর আছে মৃত্যু— এ ছাড়া আর কাকে ডরাই?" অফেরো বলল, "হায় হায়, আমি এ কার চাকরি করতে এলাম? এ যে শয়তানের কাছে খাটো হয়ে গেল। তবে যাই শয়তানের রাজ্যে; দেখি সে কেমন রাজা!" এই বলে সে শয়তানের খোঁজে বেরুল।

পথে কত লোক আসে যায়— শয়তানের খবর জিজ্ঞাসা করলে তারা বুকে হাত দেয় আর দেবতার নাম করে, আর সবাই বলে, "তার কথা ভাই বলো না, সে যে কোথায় আছে, কোথায় নেই কেউ কি তা বলতে পারে?" এমনি করে খুঁজে খুঁজে কতগুলো নিষ্কর্মা কুঁড়ের দলে শয়তানকে পাওয়া গেল। অফেরোকে পেয়ে শয়তানের ফূর্তি দেখে কে! এমন চেলা সে আর কখনও পায়নি। শয়তান বলল, "এস এস, আমি তোমায় তামাসা দেখাই। দেখবে আমার শক্তি কত?" শয়তান তাকে ধনীর প্রাসাদে নিয়ে গেল, সেখানে টাকার নেশায় মত্ত হয়ে, লোকে শয়তানের কথায় ওঠে বসে; গরীবের ভাঙা কুঁড়ের ভিতরে গেল, সেখানে এক মুঠো খাবার লোভে পেটের দায়ে বেচারীরা পশুর মত শয়তানের দাসত্ব করে। লোকেরা সব চলছে ফিরছে, কে যে কখন ধরা পড়ছে, কেউ হয়ত জানতে পারে না; সবাই মিলে মারছে, কাটছে, কোলাহল করছে "শয়তানের জয়।"

সব দেখে শুনে অফেরোর মনটা যেন দমে গেল। সে ভাবল, "রাজার সেরা রাজা বটে, কিন্তু আমার ত কৈ এর কাজেতে মন লাগছে না।" শয়তান তখন মুচকি মুচকি হেসে বললে, "চল ত ভাই, একবারটি এই শহর ছেড়ে পাহাড়ে যাই। সেখানে এক ফকির আছেন, তিনি নাকি বেজায় সাধু। আমার তেজের সামনে তাঁর সাধুতার দৌড় কতখানি, তা' একবার দেখতে চাই।"

পাহাড়ের নীচে রাস্তার চৌমাথায় যখন তারা এসেছে, শয়তান তখন হঠাৎ কেমন ব্যস্ত হয়ে থমকিয়ে গেল— তারপর বাঁকা রাস্তা ঘুরে তড়্‌বড়্‌ করে চলতে লাগল। অফেরো বললে, "আরে মশাই, ব্যস্ত হল কেন?" শয়তান বললে, "দেখছ না ওটা কি?!" অফেরো দেখল, একটা ক্রুশের মত কাঠের গায়ে মানুষের মূর্তি আঁকা! মাথায় তার কাঁটার মুকুট— শরীরে তার রক্তধারা! সে কিছু বুঝতে পারল না। শয়তান আবার বললে, "দেখছ না ঐ মানুষকে— ও যে আমায় মানে না, মরতে ডরায় না,— বাবারে! ওর কাছে কি ঘেঁষতে আছে? ওকে দেখলেই তফাৎ হটি।" বলতে বলতে শয়তানের মুখখানা চামড়ার মত শুকিয়ে এল।

তখন অফেরো হাঁফ ছেড়ে বললে, "বাঁচালে ভাই! তোমার চাকরি আর আমায় করতে হল না। তোমায় মানে না, মরতেও ডরায় না, সেইজনকে যদি পাই তবে তারই গোলাম হয়ে থাকি।" এই বলে আবার সে খোঁজে বেরুল।

তারপর যার সঙ্গে দেখা হয়, তাকেই সে জিজ্ঞাসা করে, "সেই ক্রুশের মানুষকে কোথায় পাব?"— সবাই বলে, খুঁজতে থাক, একদিন তারে পাবেই পাবে। তারপর একদিন চলতে চলতে সে এক যাত্রীদলের দেখা পেল। গায়ে তাদের পথের ধূলা, হাঁটতে হাঁটতে সবাই শ্রান্ত, কিন্তু তবু তাদের দুঃখ নাই— হাসতে হাসতে গান গেয়ে সবাই মিলে পথ চলছে। তাদের দেখে অফেরোর বড় ভাল লাগল— সে বললে, "তোমরা কে ভাই? কোথায় যাচ্ছ?" তারা বললে, "ক্রুশের মানুষ যীশু খৃষ্ট— আমরা সবাই তাঁরই দাস। যে পথে তিনি গেছেন, সেই পথের খোঁজ নিয়েছি।" শুনে অফেরো তাদের সঙ্গ নিল। 

সে পথ গেছে অনেক দূর। কত রাত গেল দিন গেল, পথ তবু ফুরায় না— চলতে চলতে সবাই ভাবছে, বুঝি পথের শেষ নাই। এমন সময় সন্ধ্যার ঝাপসা আলোয় পথের শেষ দেখা দিল। ওপারে স্বর্গ, এপারে পথ, মাঝে অন্ধকার নদী। নৌকা নাই, কূল নাই, মাঝে মাঝে ডাক আসে, "পার হয়ে এস।" অফেরো ভাবল, 'কি করে এরা সব পার হবে? কত অন্ধ, খঞ্জ, কত অক্ষম বৃদ্ধ, কত অসহায় শিশু— এরা সব পার হবে কি ক'রে?' যাঁরা বৃদ্ধ, তাঁরা বললেন, "দূত আসবে। ডাক পড়বার সময় হলে, তখন তাঁর দূত আসবে।"

বলতে বলতে দূত এসে ডাক দিল। একটি ছোট মেয়ে ভুগে ভুগে রোগা হয়ে গেছে, সে নড়তে পারে না, বাইতে পারে না, দূত তাকে বলে গেল,— "তুমি এস, তোমার ডাক পড়েছে।" শুনে তার মুখ ফুটে হাসি বেরুল, সে উৎসাহে চোখ মেলে উঠে বসল। কিন্তু হায়! অন্ধকার নদী, অকূল তার কালো জল, স্রোতের টানে ফেনিয়ে উঠছে— সে নদী পার হবে কেমন করে? জলের দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভিতরে দুর্‌ দুর্‌ করে উঠল। ভয়ে দু চোখ ঢেকে নদীর তীরে একলা দাঁড়িয়ে মেয়েটি তখন কাঁদতে লাগল। তাই দেখে সকলের চোখে জল এল, কিন্তু যেতেই যখন হবে তখন আর উপায় কি? মেয়েটির দুঃখে অফেরোর মন একেবারে গলে গেল। সে হঠাৎ চিৎকার করে বলে উঠল। "ভয় নাই— আমি আছি।" কোথা হতে তার মনে ভরসা এল, শরীরে তার দশগুণ শক্তি এল— সে মেয়েটিকে মাথায় করে, স্রোত ঠেলে, আঁধার ঠেলে, বরফের মত ঠাণ্ডা নদী মনের আনন্দে পার হয়ে গেল। মেয়েটিকে ওপারে নামিয়ে সে বলল, "যদি সেই ক্রুশের মানুষের দেখা পাও, তাঁকে বলো, এ কাজ আমার বড় ভাল লেগেছে— যতদিন আমার ডাক না পড়ে, আমি তাঁর গোলাম হয়ে এই কাজেই লেগে থাকব।"

সেই থেকে তার কাজ হল নদী পারাপার করা। সে বড় কঠিন কাজ! কত ঝড়ের দিনে কত আঁধার রাতে যাত্রীরা সব পার হয়— সে অবিশ্রাম কেবলই তাদের পৌঁছে দেয় আর ফিরে আসে। তার নিজের ডাক যে কবে আসবে, তা ভাববার আর সময় নেই।

ক্রিস্টোফার-২
একদিন গভীর রাত্রে তুফান উঠল। আকাশ ভেঙে পৃথিবী ধুয়ে বৃষ্টির ধারা নেমে এল। ঝড়ের মুখে স্রোতের বেগে পথ ঘাট সব ভাসিয়ে দিল— হাওয়ার পাকে পাগল হয়ে নদীর জল ক্ষেপে উঠল। অফেরো সেদিন শ্রান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে— সে ভেবেছে, এমন রাতে কেউ কি আর পার হতে চায়! এমন সময় ডাক শোনা গেল। অতি মিষ্টি কচি গলায় কে যেন বলছে, "আমি এখন পার হব।" অফেরো তাড়াতাড়ি উঠে দেখল, ছোট্ট একটি শিশু ঝড়ের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে, আর বলছে, "আমার ডাক এসেছে, আমি এখন পার হব।" অফেরো বললে, "আচ্ছা! এমন দিনে তোমায় পার হতে হবে! ভাগ্যিস আমি শুনতে পেয়েছিলাম।" তারপর ছেলেটিকে কাঁধে নিয়ে "ভয় নাই", "ভয় নাই" বলতে বলতে সে দুরন্ত নদী পার হয়ে গেল।

কিন্তু এবারেই শেষ পার। ওপারে যেমনি যাওয়া অমনি তার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে পড়ল, চোখ যেন ঝাপসা হয়ে গেল, গলার স্বর জড়িয়ে গেল। তারপর যখন সে তাকাল তখন দেখল, ঝড় নেই আঁধার নেই, সেই ছোট্ট শিশুটিও নেই— আছেন শুধু এক মহাপুরুষ, মাথায় তাঁর আলোর মুকুট। তিনি বললেন, "আমিই ক্রুশের মানুষ— আমিই আজ তোমায় ডাক দিয়েছি। এতদিন এত লোক পার করেছ, আজ আমায় পার করতে গিয়ে নিজেও পার হলে, আর তারি সঙ্গে শয়তানের পাপের বোঝা কত যে পার করেছ তা তুমিও জান না। আজ হতে তোমার অফেরো নাম ঘুচল; এখন তুমি Saint Christopher— সাধু খৃষ্টবাহন! যাও, যাঁরা শ্রেষ্ঠ সাধু, তাঁদের মধ্যে তুমি আনন্দে বাস কর।" -এই হল সুকুমার রায় রচিত কিংবদন্তিটি।  

ক্রিস্টোফার অত:পর লিসিয়া (Lycia) শহরে যান এবং সেখানকার খৃষ্টানদের যারা নির্যাতিত ও শহীদ হচ্ছিল, তাদের মাঝে সান্তনার বাণী প্রচার করতে থাকেন। একসময় তাকে বন্দী করে স্থানীয় রাজদরবারে হাজির করা হয়। রাজা তাকে পৌত্তলিক দেবতার উদ্দেশ্যে নৈবদ্য হিসেবে পশু উৎসর্গের আদেশ দেন। ক্রিস্টোফার তা করতে অস্বীকার করেন। তখন রাজা তাকে ধন-সম্পদের প্রলোভনের মধ্যে ফেলতে চেষ্টা করেন। কিন্তু তাতে ব্যর্থ হয়ে তিনি দু’জন সুন্দরী রমনীকে নিয়োজিত করেন তাকে ফাঁদে ফেলতে। কিন্তু ফল হয় উল্টো। ক্রিস্টোফার অতি অল্প সময়ের মধ্যে কেবল ঐ নারীদেরকেই নয় বরং তিনি আরও কয়েক হাজার নারী-পুরুষকেও খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত করে ফেলেন। এতে রাজা ক্ষিপ্ত হন এবং তার বিরুদ্ধে হত্যার আদেশ জারী করেন। এসময় ক্রিস্টোফার প্রকাশ্যে চলাফেরা বন্ধ করে দেন। অত:পর বেশ কয়েকটি পরিকল্পণা ব্যর্থ হবার পর অবশেষে তিনি ধৃত হন এবং তাকে শিরোচ্ছেদ করা হয়।  

সমাপ্ত।
ছবি: Wikipedia.

 উৎস:
  • Mershman, F. St. Christopher. In The Catholic Encyclopedia.
  • Weniger, Francis X., "St. Christopher, Martyr", 
  • "St. Christopher", Lives of Saints, John J. Crawley & Co., Inc. 
  • David Woods, "St. Christopher, Bishop Peter of Attalia, and the Cohors Marmaritarum: A Fresh Examination" 
  • D.H. Farmer, The Oxford Dictionary of Saints.
  • Collier, Mrs. "Saint Christopher and Some Representations of him in English Churches" .
  • White, Helen,  Tudor Books of Saints and Martyrs. 
  • Wilson, Stephen,  Saints and their cults: studies in religious sociology, folklore, and history. 
  • "The Life of Saint Christopher", Compiled by Jacobus de Voragine, Tr. by William Caxton
  • St. Christopher in the Golden Legend: English translation (Caxton)
  • Wikipedia,.ও
  • সুকুমার রায়, খৃষ্টবাহন।

১৪ জুলাই, ২০১৫

Jesus: কবি রবির চিত্রিত যিশুচরিত।

যিশু যখন জন্মগ্রহণ করেছিলেন তখন রোম-সাম্রাজ্যের প্রতাপ অভ্রভেদী হয়ে উঠেছিল। যে কেউ যে দিকে চোখ মেলত এই সাম্রাজ্যেরই গৌরব চূড়া সবদিক থেকেই চোখে পড়ত; এরই আয়োজন উপকরণ সকলের চিত্তকে অভিভূত করে দিচ্ছিল। রোমের বিদ্যা-বুদ্ধি, বাহুবল ও রাষ্ট্রীয় শক্তির মহাজালে যখন বিপুল সাম্রাজ্য চারিদিকে আবদ্ধ, সেই সময়ে সাম্রাজ্যের এক প্রান্তে দরিদ্র ইহুদি মাতার গর্ভে এই শিশু জন্মগ্রহণ করলেন।

তখন রোম-সাম্রাজ্যে ঐশ্বর্যের যেমন প্রবল মূর্তি, ইহুদি সমাজে লোকাচার ও শাস্ত্র শাসনেরও তেমনি প্রবল প্রভাব।ইহুদিদের ধর্ম স্বজাতির মধ্যে গণ্ডিবদ্ধ। তাদের ঈশ্বর জিহোভা বিশেষভাবে তাদেরকে বরণ করে নিয়েছেন এমনই তাদের বিশ্বাস। তাঁর নিকট তারা কতকগুলো সত্যে বদ্ধ, এই সত্যগুলো বিধিরূপে তাদের সংহিতায় লিখিত। এই বিধি পালন করাই ঈশ্বরের আদেশ-পালন।

বিধির অচল গণ্ডির মধ্যে নিয়ত বাস করতে গেলে মানুষের ধর্মবুদ্ধি কঠিন ও সংকীর্ণ না হয়ে থাকতে পারে না। কিন্তু ইহুদিদের সনাতন-আচার-নিষ্পেষিত চিত্তে নূতন প্রাণ সঞ্চার করার উপায় ঘটেছিল। মাঝে মাঝে তাদের পাথরের প্রাচীর ভেদ করে তাদের মধ্যে এক-একজন মহাপুরুষ এসে দেখা দিতেন। ধর্মের প্রত্যক্ষ উপলব্ধি বহন করে নিয়ে যেতেই তাদের অভ্যুদয়। তারা স্মৃতি শাস্ত্রের মৃতপত্র-মর্মরকে আচ্ছন্ন করে দিয়ে অমৃতবাণী প্রচার করতেন। ই’শায়া জেরেমিয়া প্রভৃতি ইহুদি নবীগণ পরম দুর্গতির দিনে আলোক জ্বেলেছেন, তাদের তীব্র জ্বালাময়ী বাক্যের বজ্রবর্ষণে স্বজাতির বদ্ধ জীবনের বহুদিন সঞ্চিত কলুষরাশি দগ্ধ করেছেন।

শাস্ত্র ও আচার ধর্মের দ্বারাই ইহুদিদের সমস্ত জীবন নিয়মিত। যদিও তারা সাহসী যোদ্ধা ছিল, তবু রাষ্ট্ররক্ষা-ব্যাপারে তাদের পটুত্ব প্রকাশ পায়নি। এজন্য রাষ্ট্র সম্বন্ধে বিদেশী প্রতিবেশীদের হাতে তারা বারে বারে দুর্গতিলাভ করেছিল।

যিশুর জন্মের কিছুকাল পূর্ব হতে ইহুদিদের সমাজে নবী-অভ্যুদয় বন্ধ ছিল। কালের গতি প্রতিহত করে, প্রাণের প্রবাহ অবরুদ্ধ করে, পুরাতনকে চিরস্থায়ী করার চেষ্টায় তখন সকলে নিযুক্ত ছিল। বাহিরকে একেবারে বাইরে ঠেকিয়ে, সমস্ত দ্বার, গবাক্ষ বন্ধ করে, দেয়াল গেঁথে তোলার দলই তখন প্রবল হয়ে উঠেছিল। নবসংকলিত তাল্‌মুদ্‌ শাস্ত্রের বাহ্য আচার বন্ধনের আয়োজন পাকা হল, এবং ধর্মপালনের মূলে যে-একটি মুক্ত বুদ্ধি ও স্বাধীনতা-তত্ত্ব আছে তাকে স্থান দেয়া হল না।

জড়ত্বের চাপ যতই কঠোর হোক মনুষ্যত্বের বীজ একেবারে মরতে চায় না। অন্তরাত্মা যখন পীড়িত হয়ে ওঠে, বাইরে যখন সে কোন আশার মূর্তি দেখতে পায় না, তখন তার অন্তর হতেই আশ্বাসের বাণী উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে— সেই বাণীকে সে হয়ত সম্পূর্ণ বোঝে না, অথচ তাকে প্রচার করতে থাকে। এই সময়টাতে ইহুদিরা আপনা-আপনি বলাবলি করছিল, মর্তে পুনরায় স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠার কাল আসছে। তারা মনে করছিল, তাদেরই নেতা তাদের জাতিকেই এই স্বর্গ রাজ্যের অধিকার দান করবেন— ঈশ্বরের বরপুত্র ইহুদি জাতির সত্যযুগ পুনরায় আসন্ন হয়েছে।

এই আসন্ন শুভ মুহূর্তের জন্য প্রস্তুত হতে হবে এই ভাবটিও জাতির মধ্যে কাজ করছিল। এই জন্য মরুস্থলীতে বসে অভিষেক দাতা যোহন্‌ যখন ইহুদিদেরকে অনুতাপের দ্বারা পাপের প্রায়শ্চিত্ত ও জর্ডনের তীর্থজলে দীক্ষা গ্রহণ করবার জন্য আহ্বান করলেন তখন দলে দলে পুণ্যকামীগণ তার কাছে সমবেত হতে লাগল। ইহুদিরা খোদাকে প্রসন্ন করে পৃথিবীতে নিজেদের অপমান ঘুচাতে চাইল, ধরাতলের রাজত্ব এবং সকলের শ্রেষ্ঠস্থান অধিকার করার আশ্বাসে তারা উৎসাহিত হয়ে উঠল।

এমন সময়ে যিশুও মর্তলোকে ঈশ্বরের রাজ্যকে আসন্ন বলে ঘোষণা করলেন। কিন্তু ঈশ্বরের রাজ্য যিনি স্থাপন করতে আসবেন তিনি কে? তিনি তো রাজা, তাকে তো রাজপদ গ্রহণ করতে হবে। রাজপ্রভাব না থাকলে সর্বত্র ধর্মবিধি প্রবর্তন করবে কি করে। একবার কি মরুস্থলীতে মানবের মঙ্গল ধ্যান করবার সময় যিশুর মনে এই দ্বিধা উপস্থিত হয়নি। ক্ষণকালের জন্য কি তার মনে হয়নি রাজপীঠের উপরে ধর্মসিংহাসন প্রতিষ্ঠা করলে তবেই তার ক্ষমতা অপ্রতিহত হতে পারে? কথিত আছে, শয়তান তার সম্মুখে রাজ্যের প্রলোভন বিস্তার করে তাকে মুগ্ধ করতে উদ্যত হয়েছিল। সেই প্রলোভনকে নিরস্ত করে তিনি জয়ী হয়েছিলেন। এই প্রলোভনের কাহিনীকে কাল্পনিক বলে উড়িয়ে দেবার কারণ নেই। রোমের জয়পতাকা তখন রাজ-গৌরবে আকাশে আন্দোলিত হচ্ছিল এবং সমস্ত ইহুদি জাতি রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার সুখ-স্বপ্নে নিবিষ্ট হয়েছিল। এমন অবস্থায় সমস্ত জনসাধারণের সেই অন্তরের আন্দোলন যে তারও ধ্যানকে গভীরভাবে আঘাত করতে থাকবে এতে আশ্চর্য হবার কোন কারণই নেই।

কিন্তু আশ্চর্যের কথা এই যে, এই সর্বব্যাপী মায়াজালকে ছেদন করে তিনি ঈশ্বরের সত্য রাজ্যকে সুস্পষ্ট প্রত্যক্ষ করলেন। ধনমানের মধ্যে তাকে দেখলেন না, মহা-সাম্রাজ্যের দৃপ্ত প্রতাপের মধ্যে তাকে দেখলেন না; বাহ্য উপকরণহীন দারিদ্র্যের মধ্যে তাকে দেখলেন এবং সমস্ত বিষয়ী লোকের সম্মুখে একটা অদ্ভুত কথা অসংকোচে প্রচার করলেন- “যে নম্র পৃথিবীর অধিকার তারই।” তিনি চরিত্রের দিক দিয়ে এই যেমন একথাটা বললেন, উপনিষদের ঋষিরা মানুষের মনের দিক দিয়ে ঠিক এরকমই অদ্ভুত একটা কথা বলেছেন; যারা ধীর তারাই সকলের মধ্যে প্রবেশের অধিকার লাভ করে। “ধীরাঃ সর্বমেবাবিশন্তি।”

যা অত্যন্ত প্রত্যক্ষ এবং যা সর্বজনের চিত্তকে অভিভূত করে বর্তমান, তাকে সম্পূর্ণ ভেদ করে, সাধারণ মানবের সংস্কারকে অতিক্রম করে, ঈশ্বরের রাজ্যকে এমন-একটি সত্যের মধ্যে তিনি দেখলেন যেখানে সে আপনার আন্তরিক শক্তিতে আপনি প্রতিষ্ঠিত— বাইরের কোন উপাদানের উপর তার আশ্রয় নয়। সেখানে অপমানিতেরও সম্মান কেউ কেড়ে নিতে পারে না, দরিদ্রেরও সম্পদ কেউ নষ্ট করতে পারে না। সেখানে যে নত সেই উন্নত হয়, যে পশ্চাদ্‌বর্তী সেই অগ্রগণ্য হয়ে ওঠে। এ কথা তিনি কেবল কথায় রেখে যাননি। যে দৌর্দণ্ডপ্রতাপ সম্রাটের রাজদণ্ড অনায়াসে তার প্রাণবিনাশ করেছে তার নাম ইতিহাসের পাতার এক প্রান্তে লেখা আছে মাত্র। আর যিনি সামান্য চোরের সঙ্গে একত্রে ক্রুসে বিদ্ধ হয়ে প্রাণত্যাগ করলেন, মৃত্যুকালে সামান্য কয়েকজন ভীত অখ্যাত শিষ্য যার অনুবর্তী, অন্যায় বিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাধ্যমাত্র যার ছিল না, তিনি আজ মৃত্যুহীন গৌরবে সমস্ত পৃথিবীর হৃদয়ের মধ্যে বিরাজ করছেন এবং আজও বলছেন, ‘যারা দীন তারা ধন্য; কারণ, স্বর্গরাজ্য তাদের। যারা নম্র তারা ধন্য; কারণ, পৃথিবীর অধিকার তারাই লাভ করিবে।’

এইভাবে স্বর্গরাজ্যকে যিশু মানুষের অন্তরের মধ্যে নির্দেশ করে মানুষকেই বড় করে দেখিয়েছেন। তাকে বাইরের উপকরণের মধ্যে স্থাপণ করে দেখালে মানুষের বিশুদ্ধ গৌরব খর্ব হত। তিনি নিজেকে বলেছেন মনু্ষ্য পুত্র। মনু্ষ্য পুত্র যে কে তাই তিনি প্রকাশ করতে এসেছেন।

তাই তিনি দেখিয়েছেন, মানুষের মনুষ্যত্ব সাম্রাজ্যের ঐশ্বর্যেও নয়, আচারের অনুষ্ঠানেও নয়; কিন্তু মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের প্রকাশ আছে এই সত্যেই সে সত্য। মানব সমাজে দাঁড়িয়ে ঈশ্বরকে তিনি পিতা বলেছেন। পিতার সঙ্গে পুত্রের যে সম্বন্ধ তা আত্মীয়তার নিকটতম সম্বন্ধ— আত্মা বৈ জায়তে পুত্রঃ। তা আদেশ-পালনের ও অঙ্গীকার-রক্ষার বাহ্য সম্পর্ক নয়। ঈশ্বর পিতা এই চিরন্তন সম্বন্ধের দ্বারাই মানুষ মহীয়ান, আর কিছুর দ্বারা নহে। তাই ঈশ্বরের পুত্ররূপে মানুষ সকলের চেয়ে বড়, সাম্রাজ্যের রাজারূপে নয়। তাই শয়তান এসে যখন তাকে বলল ‘তুমি রাজা’ তিনি বললেন, ‘না, আমি মনুষ্যপুত্র।’ এই বলে তিনি সমস্ত মানুষকে সম্মানিত করেছেন।

তিনি এক জায়গায় ধনকে নিন্দা করেছেন, বলেছেন, “ধন মানুষের পরিত্রাণের পথে প্রধান বাধা।” এ একটা নিরর্থক বৈরাগ্যের কথা নয়। এর ভিতরকার অর্থ এই যে, ধনী ধনকেই আপনার প্রধান অবলম্বন বলে জানে— অভ্যাসের মোহ-বশত ধনের সঙ্গে সে নিজের মনুষ্যত্বকে মিলিয়ে ফেলে। এমন অবস্থায় তার প্রকৃত আত্মশক্তি আবৃত হয়ে যায়। যে আত্মশক্তিকে বাধামুক্ত করে দেখে সে ঈশ্বরের শক্তিকেই দেখতে পায় এবং সেই দেখার মধ্যেই তার যথার্থ পরিত্রাণের আশা। মানুষ যখন যথার্থভাবে নিজেকে দেখে তখনই নিজের মধ্যে ঈশ্বরকে দেখে; আর নিজেকে দেখতে গিয়ে যখন সে কেবল ধনকে দেখে, মানকে দেখে, তখনই নিজেকে অবনমিত করে এবং সমস্ত জীবন-যাত্রার দ্বারা ঈশ্বরকে অস্বীকার করতে থাকে।

মানুষকে এই মনুষ্য পুত্র বড় দেখেছেন বল্লেই মানুষকে যন্ত্ররূপে দেখতে চাননি। বাহ্য ধন যেমন মানুষকে বড় করে না তেমনি বাহ্য আকারে মানুষকে পবিত্র করে না। বাইরের স্পর্শ বাইরের খাদ্য মানুষকে দূষিত করতে পারে না; কারণ, মানুষের মনুষ্যত্ব যেখানে, সেখানে তার প্রবেশ নেই। যারা বলে বাইরের সংস্রবে মানুষ পতিত হয় তারা মানুষকে ছোট করে দেয়। এভাবে মানুষ যখন ছোট হয়ে যায় তখন তার সংকল্প, তার ক্রিয়াকর্ম, সমস্তই ক্ষুদ্র হয়ে আসে; তার শক্তি হ্রাস হয় এবং সে কেবলই ব্যর্থতার মধ্যে ঘুরে মরে। এই জন্যই মনু্ষ্যপুত্র আচার ও শাস্ত্রকে মানুষের চেয়ে বড় হতে দেননি এবং বলেছেন, বলি-নৈবদ্যের দ্বারা ঈশ্বরের পূজা নহে, অন্তরের ভক্তির দ্বারাই তাঁর ভজনা। এই বলেই তিনি অস্পৃশ্যকে স্পর্শ করলেন, অনাচারীর সাথে একত্রে আহার করলেন, এবং পাপীকে পরিত্যাগ না করে তাকে পরিত্রাণের পথে আহ্বান করলেন।

শুধু তাই নয়, সমস্ত মানুষের মধ্যে তিনি নিজেকে এবং সেই যোগে খোদাকে উপলব্ধি করলেন। তিনি শিষ্যদেরকে আহ্বান করে বললেন, ‘দরিদ্রকে যে খাওয়ায় সে আমাকেই খাওয়ায়, বস্ত্রহীনকে যে বস্ত্র দেয় সে আমাকেই বসন পরায়।’ ভক্তিবৃত্তিকে বাহ্য অনুষ্ঠানের দ্বারা সংকীর্ণরূপে চরিতার্থ করার উপদেশ ও দৃষ্টান্ত তিনি দেখাননি। ঈশ্বরের ভজনা ভক্তির সম্ভোগ করার উপায়মাত্র নহে। তাঁকে ফুল দিয়ে, নৈবদ্য দিয়ে, বস্ত্র দিয়ে, স্বর্ণ দিয়ে, ফাঁকি দিলে যথার্থ নিজেকেই ফাঁকি দেয়া হয়; ভক্তি নিয়ে খেলা করা হয় মাত্র এবং এমন খেলায় যতই সুখ হোক তা মনুষ্যত্বের অবমাননা। যিশুর উপদেশ যারা সত্যভাবে গ্রহণ করেছেন তারা কেবল মাত্র পূজা-অর্চনা-দ্বারা দিনরাত কাটায়ে দিতে পারেন না; মানুষের সেবা তাদের পূজা, অতি কঠিন তাদের ব্রত। তারা আরামের শয্যা ত্যাগ করে, প্রাণের মমতা বিসর্জন দিয়ে, দূর দেশ-দেশান্তরে নরখাদকদের মধ্যে, কুষ্ঠরোগীদের মধ্যে, জীবন উৎসর্গ করেছেন— কেননা, যার নিকট থেকে তারা দীক্ষা গ্রহণ করেছেন তিনি মনুষ্যপুত্র, তার আবির্ভাবে মানবের প্রতি ঈশ্বরের দয়া সুস্পষ্ট প্রকাশমান হয়েছে। কারণ, এই মহাপুরুষ সর্বপ্রকারে মানবের মাহাত্ম্য যেমন করে প্রচার করেছেন এমন আর কে করেছেন?

তাকে তার শিষ্যেরা দুঃখের মানুষ বলেন। দুঃখ স্বীকারকে তিনি মহৎ করে দেখিয়েছেন। এতেও তিনি মানুষকে বড় করেছেন। দুঃখের উপরেও মানুষ যখন নিজেকে প্রকাশ করে তখনই মানুষ নিজের সেই বিশুদ্ধ মনুষ্যত্বকে প্রচার করে যা আগুনে পোড়ে না যা অস্ত্রাঘাতে ছিন্ন হয় না।

সমস্ত মানুষের প্রতি প্রেমের দ্বারা যিনি ঈশ্বরের প্রেম প্রচার করেছেন, সমস্ত মানুষের দুঃখভার স্বেচ্ছাপূর্বক গ্রহণ করার উপদেশ তার জীবন থেকে আপনিই নিঃশেষ হয়ে উঠবে এতে আর আশ্চর্য কি আছে। কারণ, স্বেচ্ছায় দুঃখবহন করতে অগ্রসর হওয়াই প্রেমের ধর্ম। দুর্বলের নির্জীব প্রেমই ঘরের কোণে ভাবাবেশের অশ্রুজল ফেলে নিজেকে নিজে আর্দ্র করতে থাকে। যে প্রেমের মধ্যে যথার্থ জীবন আছে সে আত্মত্যাগের দ্বারা, দুঃখ স্বীকারের দ্বারা গৌরব লাভ করে। সে গৌরব অহংকারের গৌরব নয়; কারণ, অহংকারের মদিরায় নিজেকে মত্ত করা প্রেমের পক্ষে অনাবশ্যক— তার নিজের মধ্যেই স্বত:-উৎসারিত অমৃতের উৎস আছে।

মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের প্রকাশ— যিশুর এই বাণী কেবলমাত্র তত্ত্ব কথারূপে কোন-একটি শাস্ত্রের শ্লোকের মধ্যে বন্দী হয়ে বাস করছে না। তার জীবনের মধ্যে তা একান্ত সত্য হয়ে দেখা দিয়েছিল বলেই আজ পর্যন্ত তা সজীব বনস্পতির মত নব নব শাখা প্রশাখা বিস্তার করছে। মানব চিত্তের শত সহস্র সংস্কারের বাধা প্রতিদিনই সে ক্ষয় করার কাজে নিযুক্ত আছে। ক্ষমতার মদে মাতাল প্রতিদিন তাকে অপমান করছে, জ্ঞানের গর্বে উদ্ধত প্রতিদিন তাকে উপহাস করছে, শক্তি-উপাসক তাকে অক্ষমের দুর্বলতা বলে অবজ্ঞা করছে, কঠোর বিষয়ী তাকে কাপুরুষের ভাবুকতা বলে উড়িয়ে দিচ্ছে— তবু সে নম্র হয়ে নীরবে মানুষের গভীরতম চিত্তে ব্যাপ্ত হচ্ছে, দুঃখকেই নিজের সহায় এবং সেবাকে নিজের সঙ্গিনী করে নিয়েছে— যে পর তাকে আপন করছে, যে পতিত তাকে তুলে নিচ্ছে, যার কাছ থেকে কিছুই পাবার নেই, তার কাছে নিজেকে নিঃশেষে উৎসর্গ করে দিচ্ছে। এমনি করে মনুষ্যপুত্র পৃথিবীকে, সকল মানুষকেই বড় করে তুলেছেন— তাদের অনাদর দূর করেছেন, তাদের অধিকার প্রশস্ত করেছেন, তারা যে তাদের পিতার ঘরে বাস করছে এই সংবাদের দ্বারা অপমানের সংকোচ মানব সমাজ হতে অপসারণ করেছেন— এটাই মুক্তিদান।

সমাপ্ত।

Newton: নিউটন ও তার বিতর্কিত গ্রন্থ।

স্যার আইজ্যাক নিউটন (Sir Isac Newton) ১৬৪২ সনের ২৫শে ডিসেম্বর উল্সথর্প মনর, লিঙ্কনশায়ার (Lincolnshire), ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মের তিন মাস পূর্বে তার পিতা আইজ্যাক নিউটন মারা যান। অত:পর তার তিন বৎসর বয়সের সময়, তার মাতা হান্না আয়সকফ (Hannah Ayscough)) তাকে তার মাতার হেফাজতে রেখে রেভারেন্ড বার্ণাবাস নামক এক ব্যক্তির সাথে পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। নিউটন তার এই সৎপিতাকে পছন্দ করতেন না। 

ট্রিনিটি কলেজ, কেম্ব্রিজ।
দি কিংস স্কূল, গ্রান্থাম (The King's School, Grantham)-এ নিউটন ৫ বৎসর পড়াশুনো করেন। এ সময় তার সৎপিতা মারা যান। ফলে ১৬৫৯ সনে তাকে স্কূল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে তার বিধবা মাতা তাকে কৃষি কাজে নিয়োজিত করেন, যদিও নিউটন কৃষি কাজকে একদম পছন্দ করতেন না। এসময় কিংস স্কূলের এক শিক্ষক হেনরী স্টোকস দূর্দান্ত মেধাবী ছাত্র নিউটনের স্কূল শিক্ষা সমাপনীর জন্যে তার মাতাকে প্ররোচিত করেন। সুতরাং নিউটন পূনরায় স্কূলে ভর্তি হলেন এবং স্কূলের সেরা  মেধাবী ছাত্র নির্বাচিত হলেন।

স্কূল শিক্ষা সমাপনীর পর ১৬৬১ সনের জুন মাসে নিউটন কেম্ব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে (Trinity College, Cambridge) ভর্তি হন। এ সময় এ কলেজটিতে এরিষ্টটলীয় পদ্ধতিতে শিক্ষা প্রদান করা হত। যাহোক, নিউটন এই কলেজ থেকে ১৬৬৫ সনের আগস্ট মাসে ডিগ্রী অর্জন করেন। তার এই ডিগ্রী অর্জনের পরপরই এক প্লেগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে সতর্কতামূলক ভাবে কলেজটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। দু’বৎসর কলেজটি বন্ধ থাকে। 

স্যার আইজ্যাক নিউটন।
ইতিমধ্যে নিউটন জেনারেলাইজড বায়োনোমিয়াল থিয়োরী (Generalized Binomial Theorem) আবিস্কার এবং গণিতের অপর একটি শাখা ইনফিনাইটসিমাল ক্যালকুলাস (Infinitesimal Calculus) ডেভেলোপ করেন। তিনি আলোক ও মাধ্যাকর্ষণ সূত্র (Law of Gravitation)ও আবিস্কার করে ফেলেন। ১৬৬৭ সনে তিনি পুনরায় কেম্ব্রিজে ট্রিনিটি কলেজের ফেলো হিসেবে যোগদান করেন এবং অচিরেই মর্যাদাপূর্ণ ”লুকাসিয়ান চেয়ার” (Lucasian Chair) নির্বাচিত হন।

এরপর নিউটন থেমে থাকেননি। ১৭২৪ সনের ২০শে মার্চ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বিচরণ করেছেন এবং যুগান্তকারী সব আবিস্কার করেছেন। তিনি ছিলেন একাধারে পদার্থবিদ, গণিতজ্ঞ, এস্ট্রনোমার, দর্শণবিদ, আলকেমিস্ট এবং থিয়োলজিয়ান। তাকে ধরা হয় মানব সভ্যতার ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা বড় উদ্দিপক বিজ্ঞানী (Greatest Influential Scientist)। তার রচিত ফিলোসফি ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা (Philosophiæ Naturalis Principia Mathematica) গ্রন্থটি এ কালের অধিকাংশ ক্লাসিক্যাল ম্যাথমেটিক্স এর ভিত্তি রচনা করেছে।

নিউটনের সমাধি।
ইংরেজ কবি আলেকজান্ডার পোপ (Alexander pope) নিউটনের এপিটাফ (Epitaph) লিখেছিলেন এভাবে:

Nature and nature's laws lay hid in night;
God said "Let Newton be"
and all was light.

অর্থ:
“প্রকৃতি ও প্রকৃতির বিধান ঢাকা পড়ে ছিল রাতে; 
ঈশ্বর বললেন “নিউটন সৃষ্টি হও” 
এবং সব আলোকিত হল।”

নিউটন ক্যাথলিক ধর্মের ত্রিত্ববাদী তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন না। প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন একত্ববাদী। কিন্তু তিনি তার জীবদ্দশায় ধর্মীয় বিশ্বাসকে প্রকাশ্যে ব্যক্ত করা কখনও বিচক্ষণতার পরিচায়ক বলে মনে করেননি। কেননা তার সময়কালে রাষ্ট্র ও গির্জা ধর্ম বিরোধীদের প্রতি প্রচন্ড কঠোরতা অবলম্বণ করেছিল। ধর্ম বিরোধীদের প্রতি আরোপিত ছিল মৃত্যুদন্ড, যা “জুডিকাম ডেই” বা “ঈশ্বরের বিচার” নামে খ্যাত। এই আইনে অপরাধীকে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে বা ঠান্ডা পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করা হত।

কিন্তু বিজ্ঞানের ছাত্র নিউটন ধর্মের প্রতি আগ্রহী হলেন কেন? এর কারণ এই যে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল গির্জার অধীনে এবং ধর্মগ্রন্থ পঠন ছিল আবশ্যিক। এতে নিউটন ধর্মগ্রন্থ পাঠে যথেষ্ট সময় ব্যয় করেন এবং অচিরেই বাইবেলের নানা অসঙ্গতি তার মনোযোগ আকর্ষণ করে। হিব্রু গবেষকগণ হিসেব করে দেখেছেন যে, নিউটনের বাইবেল পঠন সম্পর্কিত লেখা রয়েছে এক মিলিয়ন শব্দেরও অধিক। তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে এই যে, এই মহাজ্ঞানী ব্যক্তিটি বুক অফ ডানিয়েল পড়ার পর ১৭০৪ সনে একটি নোট লেখেন যাতে তিনি পূর্বাভাস দেন যে ২০৬০ সনে এই পৃথিবী ধ্বংস হবে। 

নিউটন এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন বুক অফ ডানিয়েল, অধ্যায় ১২, আয়াত ৭ থেকে, যেখানে বলা হয়েছে- And I heard the man clothed in linen, which was upon the waters of the river, when he held up his right hand and his left hand unto heaven, and sware by him that liveth for ever that it shall be for a time, times, and a half; and when he shall have accomplished to scatter the power of the holy people, all these things shall be finished. – KJB.

The phrase “time, times, and a half” caught the attention of Isaac Newton. He interpreted it as three and a half years or 1260 days (also referenced in Daniel 7:25, Revelation 11: 3, 12: 6 and 13: 5). Isaac Newton made a slight adjustment, interpreting days like years, 1260 years that marked the countdown to the end of the world and the return of Christ.

নিউটনের পত্র যাতে তিনি পূর্বাভাস দিয়েছিলেন যে,
পৃথিবী ২০৬০ সনে ধ্বংস হবে।
But Newton required a starting date in order to predict the “return of Christ”. Newton used the establishment of the Holy Roman Empire in 800 CE by Charlemagne. This marked the fusion of religious primacy of the pope with the political supremacy of Charlemagne. Consequently, the 2060 date was simply the result of adding 1260 years to 800 CE.

The Prophecy of the End Times was very popular in the Protestant movement during the days of Newton.

Newton believed that 800 CE marked the earliest start date for the countdown, but added that it could be later.

It “did not commence before the year 800 in which the pope’s supremacy commenced,” Newton said. He later added, “It may end later, but I see no reason for it ending sooner.”

“This I mention,” Newton added, “not to assert when the time of the end shall be, but to put a stop to the rash conjectures of fanciful men who are frequently predicting the time of the end, and by doing so bring the sacred prophesies into discredit as often as their predictions fail.”

যা হোক, মূল উপস্থাপনায় ফিরি, নিউটনের মনোযোগ যখন ধর্মগ্রন্থের অসংগতিগুলোর প্রতি আকৃষ্ট হল, তখন তিনি ঐ সব অসংগতি ও পরস্পর বিরোধী তথ্য ও তত্ত্বগুলো নিয়ে এক যুগান্তকারী পুস্তক “An Historical Accounts of Two Notable Corruptions of Scripture.” রচনা করলেন।

১৬৯০ সনে পুস্তকটি রচনার পর নিউটন ঐ পান্ডুলিপির প্যাকেটটি ফ্রান্সে জন লকের কাছে প্রেরণ করেন। কেননা এটি ইংল্যান্ডে প্রকাশ করা তার জন্যে চরম বিপজ্জনক ছিল। আর তাই তিনি আশা করেছিলেন লক তার পুস্তিকাটি ফরাসী ভাষায় অনুবাদ ও ফ্রান্সে প্রকাশের কাজে সহায়তা করবেন। 

লক, ১৬৯২ সনে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির রচনা হিসেবে পুস্তকটির ল্যাটিন অনুবাদ প্রকাশের চেষ্টা করেন। নিউটন ব্যাপারটা জানতে পেরে এ প্রকাশনা বন্ধের ব্যবস্থা নিতে লককে অনুরোধ করেন। কারণ, তার ধারণা হয়েছিল, ঐ সময়টিও ঐ পুস্তিকা প্রকাশের জন্যে অনুকূল নয়। 

কি ছিল ঐ গ্রন্থটিতে? 
পুস্তকটিতে নিউটন বর্তমান বাইবেলের (নিউ টেষ্টামেন্ট) জন (৫:৭) প্রসঙ্গে বলেছেন: “ত্রিত্ববাদ সম্পর্কে জেরোমের সময় এবং তার আগে ও পরে বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত শক্তিশালী দীর্ঘকালীন ও স্থায়ী কোন বিতর্কেই তিন ঈশ্বরের বিষয়টি কখনোই ছিল না। এটা এখন প্রত্যেকের মুখে এবং কাজের প্রধান ভিত্তি হিসেবে পরিগণিত এবং নিশ্চিতভাবে তাদের জন্যেই তা করা হয়েছে যেভাবে তাদের গ্রন্থগুলোতে রয়েছে।”

“যারা যোগ্য, এ ব্যাপারে তাদের বোধোদয় হওয়া উচিত। আমার পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়। যদি এটা বলা হয় যে আমার ধর্মগ্রন্থ কী তা নির্ধারণ এবং ব্যক্তিগত বিচারের কেউ নেই সেক্ষেত্রে যে সব স্থানে বিরোধ নেই সেখানে আমি এটা স্বীকার করি, কিন্তু যেখানে বিরোধ আছে সেখানে আমি সবচেয়ে যা ভাল বুঝি, তাই করি। মানব সমাজের উত্তপ্ত মেজাজ ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন অংশ ধর্মীয় ব্যাপারে চিরকালই রহস্যময়তার ভক্ত, আর এ কারণেই তারা যা কম বোঝে সেটাই বেশি পছন্দ করে। এ ধরনের লোকেরাই প্রেরিত দূত যোহনকে যেভাবে খুশী ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু তার প্রতি আমার এমন শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে যাতে আমি বিশ্বাস করি তিনি যে উদ্দেশ্যে লিখেছেন যা থেকে ভালটুকু গ্রহণ করা যায়।”

“এই অংশটি এরাসমাসের নিউ টেষ্টামেন্টের তৃতীয় সংস্করণে প্রথম দেখা যায়। এই সংস্করণ প্রকাশের আগে এই মিথ্যা অংশটি নিউ টেষ্টামেন্টে ছিল না। তারা যখন এই সংস্করণে ত্রিত্ববাদ পেল তখন তারা নিজেরাই নিজেদের ধর্মগ্রন্থ থেকে তা ছুঁড়ে ফেলল যেমন লোকজন পুরোনো আলমানাককে ছুঁড়ে ফেলে। এ ধরনের পরিবর্তনের ঘটনা কি কোন বিবেচক ব্যক্তিকে সন্তুষ্ট করতে পারে?”---- “ভাঙ্গা বাদ্যযন্ত্রে সুর তোলার মতই এটা ধর্মের জন্য উপকারী হওয়ার পরিবর্তে বিপজ্জনক।” 

১ তীমথীয় (৩:১৬) প্রসঙ্গে নিউটন বলেন: “উত্তপ্ত ও দীর্ঘস্থায়ী আরিয়ান বিতর্কের কোন সময়েই এটা শোনা যায়নি.... যারা বলে যে “ঈশ্বর রক্তমাংসের মানুষের মধ্যে প্রকাশিত” তারা তাদের উদ্দেশ্যের চূড়ান্ত লক্ষ্য হাসিলের জন্যেই তা বলে থাকে।”

নিউটন সবশেষে বলেন: “দেবতা (Deity) শব্দটি অধীনস্থ প্রাণীকুলের উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশক এবং ঈশ্বর (God) শব্দটি স্বতস্ফূর্তভাবে প্রভুত্ব প্রকাশক। প্রত্যেক প্রভুই ঈশ্বর নয়। এক আধ্যাত্মিক সত্তার মধ্যে প্রাধান্য বিস্তারের মাধ্যমে ঈশ্বরের প্রকাশ ঘটে। যদি এ প্রাধান্য সত্য হয় তা হলে সে সত্তাই প্রকৃত ঈশ্বর। এটা যদি সন্দেহপূর্ণ হয় তবে তা হবে মিথ্যা ঈশ্বর, আর যদি তা সন্দেহাতীত হয়, তবে তিনি হবেন সর্বশক্তিমান ঈশ্বর।” 

ক্ষণজন্মা এই বিজ্ঞানী নিউটন, ওল্ড টেষ্টামেন্টের প্রতীকী বা দ্বৈত ব্যাখ্যারও বিরোধী ছিলেন। তিনি সব ধর্মগ্রন্থকে সমান শ্রদ্ধা করতেন না। হুইষ্টন বলেন, তিনি অন্য দু’টি প্রধান ধর্মগ্রন্থের উপরও গবেষণা গ্রন্থ রচনা করেছিলেন যেগুলোকে যাজক এথানাসিয়াস বিকৃত করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে আজ আর তার সেসব গ্রন্থের কোন হদিস পাওয়া যায় না। 

সমাপ্ত।

উঃস: 
  • Muhammad Ata ur-Rahim, Jesus- A Prophet of Islam.
  • Jeffery Pritchett, Isaac Newton Predicted The World Would End in 2060.
  • Dobbs, Betty Jo Tetter. The Janus Faces of Genius: The Role of Alchemy in Newton's Thought. (1991), 
  • Force, James E., and Richard H. Popkin, eds. Newton and Religion: Context, Nature, and Influence. (1999),
  • Pfizenmaier, Thomas C. (1997). "Was Isaac Newton an Arian?".
  • Ramati, Ayval. "The Hidden Truth of Creation: Newton's Method of Fluxions" 
  • Snobelen, Stephen "'God of Gods, and Lord of Lords': The Theology of Isaac Newton's General Scholium to the Principia," 
  • Snobelen, Stephen D. (1999). "Isaac Newton, Heretic: The Strategies of a Nicodemite". 
  • Stephen D. Snobelen, "A Time and Times and the Dividing of Time": Isaac Newton, the Apocalypse and 2060 AD.
  • Wiles, Maurice. Archetypal Heresy. Arianism through the Centuries. (1996)
  • Westfall, Richard S.[1983]. Never at Rest: A Biography of Isaac Newton.
  • Stokes, Mitch (2010). Isaac Newton . Thomas Nelson. p. 97.
  • Keynes, Milo ( 2008). "Balancing Newton's Mind: His Singular Behaviour and His Madness of 1692-93" .
  • Newton, Isaac. "Waste Book" . 
  • Błaszczyk, Piotr; Katz, Mikhail; Sherry, David (2012), "Ten misconceptions from the history of analysis and their debunking", 
  • Olivier Darrigol ( 2012). A History of Optics from Greek Antiquity to the Nineteenth Century . 
  • Newton, Isaac. "Hydrostatics, Optics, Sound and Heat" .
  • William R. Newman, "Newton's Early Optical Theory and its Debt to Chymistry,"
  • Hall, Alfred Rupert (1996). Isaac Newton: adventurer in thought . p. 67.
  • Newton, Issac. "Of Colours" . The Newton Project. 
  • Iliffe, Robert (2007) Newton. A very short introduction.
  • Keynes, John Maynard (1972). "Newton, The Man". 
  • Dobbs, J.T. (December 1982). "Newton's Alchemy and His Theory of Matter".
  • Curtis Wilson, "The Newtonian achievement in astronomy", pages 233–274
  • Edelglass et al., Matter and Mind, 
  • On the meaning and origins of this expression, see Kirsten Walsh, Does Newton feign an hypothesis? ,
  • "John Locke Manuscripts -- Chronological Listing: 1690" . psu.edu.
  • John C. Attig, John Locke Bibliography — Chapter 5, Religion, 1751–1900 
  • David Brewster. "Memoirs of the Life, Writings, and Discoveries of Sir Isaac Newton:" p.268.
  • Levenson, Thomas (2009). Newton and the counterfeiter: the unknown detective career of the world's greatest scientist. 
  • "Sir Isaac Newton's Unpublished Manuscripts Explain Connections He Made Between Alchemy and Economics" . 
  • Michon, Gerard. "Coat of arms of Isaac Newton" . 
  • "Duillier, Nicholas Fatio de (1664–1753) mathematician and natural philosopher" . 
  • "Silly relic-worship" . The New York Times. 16 January 1881. p. 10. 
  • Snobelen, Stephen D. (1999). "Isaac Newton, heretic: the strategies of a Nicodemite" 
  • Tyson, Neil Degrasse (2005). "The Perimeter of Ignorance". Natural History Magazine.
  • "Papers Show Isaac Newton's Religious Side, Predict Date of Apocalypse" 
  • Berkun, Scott ( 2010). The Myths of Innovation. 
  • "Newton's apple: The real story" .
  • Christianson, Gale (1984). In the Presence of the Creator: Isaac Newton & His Times. 
  • Craig, John (1958). "Isaac Newton – Crime Investigator". 
  • Craig, John (1963). "Isaac Newton and the Counterfeiters".
  • White, Michael (1997). Isaac Newton: The Last Sorcerer.
  • Wikipedia.

৮ জুলাই, ২০১৫

Jesus Christ: একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ।

যিশুখৃষ্ট (Jesus Christ) বা ঈসার শিক্ষা কর্মকাণ্ডের লিখিত বিবরণ থাকলেও তিনি আসলে কিভাবে জীবন অতিবাহিত করতেন এবং অন্য লোকদের সাথে তিনি প্রতিদিন কিভাবে কাজকর্ম করতেন, সে ব্যাপারে খুব কমই জানা যায়। যতটুকু জানা যায়, তা  কেবল বার্নাবাসের গসপেল থেকে। এই গসপেলে অন্যান্য স্বীকৃত গসপেলগুলোর চেয়ে যিশুর জীবনের অনেক বেশি দিক বর্ণিত হয়েছে। ৪টি গসপেলের মধ্যে মার্ক ও জন (যোহন-ইউহোন্না) যিশুর জন্ম সম্পর্কে নীরব এবং মথি দায়সারা ভাবে তা উল্লেখ করেছেন। এরপর লূক যিশুর বংশ-বৃত্তান্ত উল্লেখ করে আবার স্ববিরোধিতার পরিচয় দিয়েছেন, পক্ষান্তরে মার্ক ও জন কোন বংশ-বৃত্তান্ত দেননি। 

বিভিন্ন সময়ে লিখিত ৪টি গৃহীত বা স্বীকৃত গসপেল (বাইবেলের নতুন নিয়ম) কেবল পরিবর্তিত ও সেন্সরকৃতই শুধু হয়নি, সেগুলো প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণও নয়। 

১. প্রথম গসপেলের রচয়িতা মার্ক। এটি লিখিত হয় ৬০-৭৫ সনে। তিনি ছিলেন সেইন্ট বার্নাবাসের বোনের পুত্র। 
২. মথি ছিলেন একজন ট্যাক্স কালেক্টর (কর আদায়কারী) তথা নিম্নপদস্থ কর্মকর্তা। তিনি যিশুর সাথে ভ্রমণ করেননি। 
৩. লূকের গসপেল অনেক পরে লিখিত। তাছাড়া মথি ও মার্কের মত তার গসপেলের বর্ণনার উৎস একই। লুক ছিলেন পলের চিকিৎসক এবং পলের মত তিনিও কখনো যিশুকে দেখেননি। 
৪. জনের গসপেলের উৎস ভিন্ন এবং আরো পরে, ১শ’ সনের দিকে রচিত। তাকে যিশুর শিষ্য জন মনে করা ভুল হবে, কারণ তিনি ভিন্ন ব্যক্তি। এই গসপেলকে যিশুর জীবনের নির্ভরযোগ্য বিবরণ বলে গণ্য করা উচিত হবে কিনা এবং তা পবিত্র গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হবে কিনা তা নিয়ে দু’শ বৎসর ধরে উত্তপ্ত বিতর্ক চলেছিল।

ইহুদীরা তাদের ইতিহাসে বার বার আগ্রাসনের শিকার হয়ে হানাদারের পদতলে নিষ্পিষ্ট হয়েছে। যা হোক, বারংবার পরাজয় ইহুদীদের অসহায় করে তোলে, ফলে তাদের মনে ধিকি ধিকি জ্বলতে থাকে ঘৃণার আগুন। তা সত্ত্বেও, গভীর হতাশা ভরা দিনগুলোতেও ইহুদীদের একটি বড় অংশই তাদের মানসিক ভারসাম্য বহাল রাখে এ আশায় যে এক নয়া মুসা আসবেন এবং তার সহযোগীদের নিয়ে আগ্রাসনকারীদের বিতাড়িত করতে সক্ষম হবেন, আবার প্রতিষ্ঠিত হবে যিহোভার শাসন। তিনি হবেন মেসিয়াহ্ (Messiah) অর্থাৎ অভিষিক্ত যিশু। 

ইহুদী জাতির মধ্যে একটি অংশ ছিল যারা সবসময় ক্ষমতাসীনদের পূজা করত। প্রতিকূল অবস্থায়ও নিজেদের সুবিধা লাভের জন্যে তারা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে পাল উড়িয়ে দিত। তারা ধন-সম্পদ ও ধর্মীয় অবস্থানের দিক দিয়ে উচ্চস্থানে অধিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও ইহুদী জাতির অবশিষ্ট অংশ তাদেরকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবেই গণ্য করত। 

এ দু’টি অংশ ছাড়াও ইহুদীদের মধ্যে ৩য় আরেকটি দল ছিল, যাদের সাথে পূর্বোক্ত দু’টি দলের ব্যাপক পার্থক্য ছিল। তারা আশ্রয় নিয়েছিল জঙ্গলে এবং তাওরাত অনুযায়ী তারা ধর্ম পালন করত। যখনই সুযোগ আসত তখনি তারা হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করত। এ সময় রোমানরা তাদের গুপ্ত ঘাঁটিগুলো খুঁজে বের করার জন্যে বহুবার চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়। এই দেশপ্রেমিক ইহুদীদের সংখ্যা ক্রমশই বাড়তে থাকে। যোসেফাসের কাছ থেকে তাদের কথা প্রথম জানা যায়। তিনি ইহুদীদের এ ৩টি দলকে যথাক্রমে ফরীশী (Pharisees), সদ্দুকী (Sadducces) ও এসেনি (Essenes) বলে আখ্যায়িত করেন। 

এসেনিদের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবহিত হওয়া গেলেও বিশদ কিছু জানা যায় না। ৪টি গসপেলের কোনটিতেই তাদের নাম একবারও উল্লেখিত হয়নি।  

মোটামুটি হিসেবে জর্দান নদীর তীরবর্তী পাহাড়ে প্রায় ৬শ গুহা রয়েছে। এ সব গুহাতেই বাস করত এসেনিরা। এ ইহুদী সম্প্রদায়টি মানুষের সংশ্রব ত্যাগ করেছিল। কারণ তারা বিশ্বাস করত যে একজন প্রকৃত ইহুদী শুধুমাত্র যিহোভার সার্বভৌমত্বের অধীনেই বাস করতে পারে, অন্য কারো কর্তৃত্বের অধীনে নয়। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী রোমান সম্রাটের অধীনে যে ইহুদী, বসবাস এবং তাকে প্রভু হিসেবে স্বীকার করে, সে পাপ কাজ করে। 

পৃথিবীর ভোগ-বিলাস, আড়ম্বরপূর্ণ জীবন এবং অদম্য- সেই শক্তি যা অনিবার্যভাবে মানুষকে ঠেলে দেয় বিরোধ ও আত্ম-ধ্বংসের পথে, প্রভৃতি কারণে বীতশ্রদ্ধ এ ইহুদী সম্প্রদায় মরু সাগরের তীরবর্তী পাহাড়ে নির্জন স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। পাহাড়ের গুহায় বসবাসের এ জীবন তারা বেঁছে নিয়েছিল এ কারণে যে, নীরব-নিভৃত পরিবেশে তারা পবিত্র জীবন যাপনে মনোনিবেশ করতে পারবে এবং মুক্তিলাভ করতে সক্ষম হবে। মন্দিরের বহু ইহুদীর মত তারা ওল্ড টেষ্টামেন্টকে অর্থোপার্জনের কাজে ব্যবহার করেনি, বরং পবিত্র গ্রন্থের শিক্ষানুযায়ী জীবন-যাপনের চেষ্টা করে। এ জীবন-যাপনের মাধ্যমে শুদ্ধতা ও পবিত্রতা লাভ করতে পারবে বলে তারা আশা করেছিল। ঈশ্বরের নির্দেশ ইহুদীরা অনুসরণ না করায় প্রকৃতপক্ষে ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলেছিল। সেই পথ তারা কীভাবে পরিহার করেছে, অবশিষ্ট ইহুদীদের সামনে তার দৃষ্টান্ত স্থাপনই ছিল তাদের লক্ষ্য। 

মরুসাগর পূঁথি আবিষ্কারের পূর্বে এসেনিদের বিষয়ে অতি অল্পই জানা যেত। প্লিনি (Pliny) ও যোসেফাস তাদের কথা উল্লেখ করলেও পরবর্তী কালের ঐতিহাসিকদের দ্বারা কার্যত তারা উপেক্ষিত হয়েছে। প্লিনি বর্ণনা করেছেন- “তাদের স্ত্রী নেই, তারা যৌন সংসর্গ পরিত্যাগ করে, তাদের কোন অর্থ সম্পদ নেই....তাদের জীবনাচারণ দেখে বিপুল সংখ্যক লোক তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং এভাবে তাদের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল....এভাবে এ গোষ্ঠীটি হাজার হাজার বৎসর টিকে ছিল যদিও তারা কোন সন্তান উৎপাদন করত না।”

যোসেফাস (Josephus), যার জীবন শুরু হয়েছিল একজন এসেনি হিসেবে, তিনি লিখেছেন যে- “এসেনিরা বিশ্বাস করত যে, আত্মা অমর। এটা ঈশ্বরের প্রদত্ত এক উপহার। ঈশ্বর কিছু কিছু আত্মাকে সকল পাপ থেকে মুক্ত করে নিজের জন্যে পবিত্র করে নেন। এভাবে বিশুদ্ধ করণকৃত ব্যক্তি সকল অপবিত্রতা থেকে মুক্ত হয়ে পবিত্রতা অর্জন করে।” 

যুগে যুগে বিজয়ী বহিঃশক্তি মন্দির ধ্বংস ও ইহুদীদের বহুবার পরাজিত করা সত্ত্বেও এ গুহাবাসীদের জীবন-যাত্রায় তার কোন প্রভাব পড়েনি। তাদের এই স্বেচ্ছা নির্বাসনের জীবন ধর্মের পবিত্রতা এবং বিদেশি আগ্রাসন থেকে ইহুদাকে মুক্ত করার জন্যে প্রতিটি ইহুদীর সংগ্রামের দায়িত্ব থেকে পলায়ন ছিল না। প্রত্যহিক প্রার্থনা ও পবিত্র গ্রন্থ পাঠের পাশাপাশি তাদের কেউ কেউ একটি সুদক্ষ বাহিনী গড়ে তুলেছিল যারা শুধু মুসার ধর্মই প্রচার করত না, উপরন্তু নির্দেশিত পথে স্বাধীনতার জন্যে লড়াই করতেও প্রস্তুত ছিল। তাদের যুদ্ধ ছিল শুধুমাত্র ঈশ্বরের সেবার জন্যে, ক্ষমতা লাভ বা ব্যক্তিগত স্বার্থ-সিদ্ধির জন্যে নয়। 

এই যোদ্ধা বাহিনীর সদস্যদেরকে শত্রুরা ‘ধর্মান্ধ ইহুদি’ বলে আখ্যায়িত করত। তারা এক পতাকার অধীনে সংগৃহিত ছিল এবং প্রতিটি গোত্রের নিজস্ব পরিচিতি পতাকা ছিল। তারা ছিল ৪টি ডিভিশনে বিভক্ত এবং প্রতিটি ডিভিশনের শীর্ষে ছিল একজন প্রধান। প্রতিটি ডিভিশনই গঠিত ছিল ইস্রাইলের ৩টি গোত্রের লোক নিয়ে। এভাবে ইহুদীদের ১২টি গোত্রের সকলেই এক পতাকার নীচে সংগৃহিত হয়েছিল। বাহিনীর প্রধানকে একজন লেবীয় ঈমাম হতে হত। তিনি শুধু একজন সামরিক অধিনায়কই ছিলেন না, আইনের একজন শিক্ষকও ছিলেন। প্রতিটি ডিভিশনের তার নিজস্ব মাদ্রাসা (‘মিদরাস’ বা স্কুল) ছিল এবং ঈমামদের একজন সামরিক কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন ছাড়াও বিদ্যালয়ে নিয়মিত “দরশ” বা শিক্ষা প্রদান করতে হত। 

এভাবে এসব গুহায় আদিম পরিবেশে বাস করে এসেনিরা আনন্দ-বিলাস পরিত্যাগ করেছিল, তারা বিবাহকে ঘৃণা করত এবং ধন সম্পদের প্রতি বিতৃষ্ণ ছিল। তারা একটি গুপ্ত সমাজ প্রতিষ্ষ্ঠা করেছিল এবং তাদের গুপ্ত বিষয়সমূহ সদস্য নয় এমন কারো কাছে কখনোই প্রকাশ করত না। রোমকরা তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানলেও তাদের চারপাশের গোপনীয়তার মুখোশ ভেদ করতে পারেনি। প্রতিটি অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় ইহুদীরই স্বপ্ন ছিল এই সমাজের সদস্য হওয়া, কারণ বিদেশি হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করার এটাই ছিল একমাত্র সহজলভ্য পন্থা।

প্লিনির বর্ণনা থেকে আমরা জানতে পারি, কার্যত এসেনিরা বিবাহকে ঘৃণা করত। তবে তারা অন্যদের নম্র ও বাধ্য শিশুদের তাদের নিকটজন হিসেবে গ্রহণ করত এবং নিজেদের জীবন ধারায় তাদের গড়ে তুলত। এভাবেই শত শত বছর ধরে এসেনিরা তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পেরেছিল যদিও তাদের সমাজে কেন শিশুর জন্ম হত না। এভাবেই, টেম্পল অব শলোমন বা শলোমন মন্দিরের প্রধান ঈমাম জাকারিয়া বৃদ্ধ বয়সে যখন একটি পুত্র সন্তান লাভ করেন তিনি তাকে এসেনিদের আদিম পরিবেশে পাঠিয়ে দেন এবং সেখানেই সে বেড়ে ওঠে। ইতিহাসে সেই জন দি ব্যাপটিষ্ট (John the Baptist) নামে পরিচিত।

ইহুদীরা মনে করত যে, মেসিয়াহ নামে একজন নয়া নেতার আবির্ভাব ঘটবে। তিনি খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত হবেন এবং তাদের রাজাকে হত্যা করবেন।

যিশুর বাল্যকালে একটি গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে যে, জন এসেনি সম্প্রদায়ের কাছ থেকে চলে এসেছেন এবং নির্জনে বাস করছেন। তার পরনে রয়েছে শুধু মাত্র উটের লোমের তৈরি একটি বস্ত্র এবং কোমরে রয়েছে চামড়ার বন্ধনী। তিনি শুধু ফল-মূল এবং বন্য মধু আহার করেন:-(মথি ৩ঃ৪)। তিনি সরাসরি লোকজনের মধ্যে ধর্মপ্রচার করেন। 

তিনি জনগণের মধ্যে আলোড়ন তুলেছেন। তিনি যিহোভার দিকে ফিরে আসার জন্য সকলের প্রতি ডাক দিয়েছেন এবং সকলকে আশ্বাস দিয়েছেন যে, শিগগিরই ঈশ্বরের রাজত্ব প্রতিষ্ষ্ঠিত হবে। 

জনের উদাত্ত আহ্বান বিপুল সংখ্যক লোককে আকৃষ্ট করতে শুরু করল। তিনি এসেনিদের জীবনাচরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিলুপ্ত করলেন। সেটি ছিল- ”সম্প্রদায়ের কোন গুপ্ত বিষয়ই কারো কাছে প্রকাশ করা যাবে না- এমনকি নির্যাতনে মৃত্যু হলেও নয়” আগের মত কঠোর নিয়ম পালিত না হওয়ায় আন্দোলনের মধ্যে রোমানদের জন্যে গুপ্তচরের অনুপ্রবেশ ঘটানো সহজ হয়ে ওঠে। কিন্তু জন তার নবী সুলভ ক্ষমতাবলে এসব ছদ্মবেশী লোকদের পরিচয় জেনে ফেলতে সক্ষম হন। তিনি তাদের ‘বিষাক্ত সাপ’ বলে আখ্যায়িত করেন -(মথি ৩ঃ৭)। তার কনিষ্ঠ জ্ঞাতি যিশু এ আন্দোলনে যোগ দেন এবং সম্ভবত তিনি ছিলেন প্রথমদিকের অভিষিক্তদের অন্যতম। তার সর্বক্ষণের সঙ্গী বার্ণাবাসও সম্ভবত তার সাথেই দীক্ষা গ্রহণ করেন। যিশুর অন্য সঙ্গী ম্যাথিয়াসও তার সাথেই দীক্ষিত হন।

জন জানতেন যে, তিনি লড়াই শুরু করার আগেই ‘বিষাক্ত সাপেরা’ (Vipers) সফল হতে যাচ্ছে। কিন্তু যিশুর দীক্ষা গ্রহণের ফলে তিনি এতই সন্তুষ্ট হয়েছিলেন যে, তার মৃত্যুর সাথেই যে তার আন্দোলন শেষ হয়ে যাবে না, এ ব্যাপারে তিনি নিশ্চিন্ত ছিলেন। জন যেমনটি ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন, তেমনটিই হল। রাজা হেরোদ তার শিরচ্ছেদ করলেন। ফলে তার আন্দোলনের সকল ভার যিশুর কাঁধে এসে পড়ল। যিশু এসময় ছিলেন ৩০ বৎসরের যুবক। তার কাজের মেয়াদ ৩ বৎসরের বেশি স্থায়ী হয়নি। তিনি উপলব্ধি করেন যে, তার প্রস্তুতির কাল শেষ ও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। 

ঘটনা যা ইহুদীদের ইতিহাসে বারবার সংঘটিত হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই শাসকরা যখন তাদেরকে ঈশ্বরের সাথে নিজেদের সহযোগী ও অংশীদার করার চেষ্টা করেছে চূড়ান্তভাবে, তখনই ইহুদীরা বিদেশি হানাদারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। এক ঈশ্বরের বিশ্বাস এবং তিনি ছাড়া আর কেউ উপাস্য নন, তাদের এ ব্যাপারটি ছিল নিঃশর্ত ও সুস্পষ্ট। 

যিশুর জন্মের সময় রোমকরা পূর্ববর্তী শাসকদের ভুলেরই পুনরাবৃত্তি করেছিল। তারা মন্দিরে প্রধান ফটকের উপর একটি স্বর্ণ ঈগল স্থাপন করেছিল। এ বিষয়টি ইহুদীদের ক্রুদ্ধ করে তুলেছিল এবং এর ফলে রোমকদের বিরুদ্ধে উপর্যুপরি বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। ম্যাকাবিসের দু’জন অনুসারী প্রথম বিদ্রোহের পতাকা উত্তোলন করে। স্বর্ণ ঈগল ধ্বংস করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। রোমকদের কাছে এটা শুধু রাষ্ট্রদ্রোহিতাই ছিল না, তাদের ধর্মের জন্যেও এটা ছিল অবমাননার শামিল। বহু রক্তপাতের পর বিদ্রোহ দমন করা হয়। বিদ্রোহের দু’নেতাকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। এর অল্পকাল পরই রোমানদের আরেকটি বিদ্রোহের সম্মুখীন হতে হয়। এ যুদ্ধে ইহুদীদের পরাজয় ঘটে এবং ২ হাজার বিদ্রোহীকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়। 

ইহুদীরা পরাজিত হলেও তাদের মনের মধ্যে ক্রোধ ধিকিধিকি জ্বলছিল। ৬ সনে কর ধার্যের সুবিধার জন্যে সম্রাট অগাষ্টাস যখন ইহুদীদের জনসংখ্যা গণনার নির্দেশ দেন তখনও সে ক্রোধ অত্যন্ত উঁচুমাত্রায় বিরাজিত ছিল। দেবত্ব আরোপিত সম্রাটকে কর প্রদান করা ছিল তাওরাতের শিক্ষার বিপরীত। ইহুদীরা শুধু যিহোভাকেই রাজা বা সম্রাট বলে গণ্য করত। ফলে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। 

ইহুদীদের মধ্যে উদার মনোভাবাপন্ন অংশটি উপলব্ধি করল যে, এই লড়াই ইহুদীদের জন্যে পুরোপুরি গণহত্যায় পরিণত হবে। তারা সমঝোতার আবেদন করে কর প্রদান করতে সম্মত হওয়ার মাধ্যমে অর্থহীন আত্মহত্যা থেকে তাদের জনগণকে বাঁচাতে চাইল। যে নেতারা এই মূল্য দিয়ে শান্তি কিনলেন তারা জনপ্রিয় হননি, বরং তাদেরকে ইহুদী জাতির প্রতি বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। 

যিশুর জন্মকালীন সময় এবং জনের মৃত্যু পর্যন্ত সংঘটিত ঘটনার সাথে ঐ সময়ের বাস্তব ও সামাজিক পরিস্থিতির কথা ইতিমধ্যেই উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছি যেখানে সমগ্র প্রতিরোধ আন্দোলনই ঐশী অনুপ্রেরণায় উদ্দীপ্ত যিশুকে ঘিরে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল।

কোন কিছু করার আগে যিশুর ৪০ দিন নির্জনে বাস ও প্রার্থনা করা প্রয়োজন ছিল। তার বয়স তখন ছিল ৩০ বছর। ইহুদী আইন অনুযায়ী এটা ছিল সেই বয়স, যে বয়সে কোন মানুষ তার পিতার নিয়ন্ত্রণ মুক্ত হয়। কিন্তু যিশু এর আগে প্রকাশ্যে ধর্ম প্রচার করেননি। সুতরাং সতর্কতার সাথে তার প্রস্তুতি নেয়া প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। দূরদৃষ্টি ও বিচক্ষণতার সাথে তিনি ইহুদীদের সংগঠিত করার কাজ শুরু করলেন। তিনি কাউকে দীক্ষা দিলেন না। এটা অকারণে রোমানদের ব্যাপক দৃষ্টি আকর্ষণ করত এবং তা বিপজ্জনক অবস্থার সৃষ্টি করতে পারত। 

তিনি ইসরাইলের ১২টি গোত্রের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে প্রচলিত প্রথায় ১২ জন শিষ্য বা অনুসারী নিয়োগ করলেন। তারা আবার তাদের নেতৃত্বে কাজ করার জন্যে ৭০ জন দেশপ্রেমিককে নিয়োগ করল। ইহুদীদের আচারনিষ্ঠ ধর্মীয় সম্প্রদায় ফরীসীরা গ্রামের শক্ত সমর্থ ইহুদীদের (আম আল আরেজ -Am-Al Arez) সাথে শীতল সম্পর্ক বজায় রাখতে যিশু তাদের নিজের অধীনে নিয়ে এলেন। এই কৃষকদের মধ্যে অনেকেই এসেনি সম্প্রদায়ভূক্ত ছিল। তারা যিশুর ঈর্ষণীয় সমর্থকে পরিণত হয়। তার জন্যে তারা জীবন দিতে প্রস্তুত ছিল। তারা পরিচিত ছিল ধর্মযোদ্ধা (Zealots) নামে। বাইবেলের মতে, ১২ জন শিষ্যের মধ্যে অন্তত ৬জন ছিল ধর্মযোদ্ধা। 

যিশু মুসার শিক্ষা প্রত্যাখ্যান নয়, পুনঃপ্রচারের জন্যে আগমন করেছিলেন। তিনি ওল্ড টেষ্টামেন্টের আবেদন তুলে ধরলেন: “যে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং চুক্তি মেনে চলে, আমার পরেই তার স্থান” -ম্যাকাবিস ২ঃ২৭-৩১। বহু লোক তার অনুসারী হতে শুরু করে। কিন্তু তাদের গোপন স্থানে রাখা হত এবং নির্জন এলাকায় তাদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়। তাদের বলা হত ‘বার ইওনিম’ (Bar Yonim) অর্থাৎ ‘নির্জন স্থানের সন্তান’। তাদের মধ্যে যারা ছুরকার ব্যবহার শিক্ষা করেছিল তারা ‘সাইকারি’ (Sicarii) বা ‘চুরিকাধারী ব্যক্তি’ নামে পরিচিত ছিল। 

এ ছাড়া মুষ্টিমেয় কিছু লোককে নিয়ে এক ধরনের দেহরক্ষী দল তৈরি করা হয়। তারা পরিচিত ছিল ‘বার জেসাস’ নামে পরিচিত লোকের কথা উল্লেখ করেছেন। তা সত্ত্বেও এসব লোকদের ঘিরে এক ধরনের রহস্য বিরাজ করত। ফলে তাদের সম্পর্কে বেশি কিছু জানা যায় না। এটা বোধগম্য। কারণ তারা ছিল যিশুর অনুসারী ঘনিষ্ঠ মহলটির অংশ। তাই রোমান গুপ্তচরদের চোখের আড়ালে রাখার জন্য তাদের পরিচয় গোপন রাখা হত। 
অনুসারীদের যিশু নির্দেশ দিলেন- “যার টাকার থলি আছে তাকে সেটা নিতে দাও, সে তাই নিয়ে থাক, এবং যার কোন তরবারি নেই তাকে তার পোশাক বিক্রি করতে দাও যাতে সে একটি কিনতে পারে।” -লূক ২২ঃ৩৬। যিশুর শিক্ষা অলৌকিক কর্মকাণ্ডে অনুপ্রাণিত হয়ে তার অনুসারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এসব প্রস্তুতির ফল দাঁড়াল এই যে, পিলেটের উত্তরসুরী সোসিয়ানাস হিয়েরোকলস খোলাখুলিই বললেন যে যিশু ৯’শ ডাকাতের একটি দলের নেতা (‘চার্চ ফাদার’ ল্যাক্টানিয়াস কর্তৃক উদ্ধৃত)। যোসেফাসের রচিত গ্রন্থের মধ্যযুগীয় হিব্রু অনুলিপি থেকে দেখা যায়, যিশুর সাথে ২ হাজার থেকে ৪ হাজার সশস্ত্র অনুসারী ছিল।

এসেনিদের অনুসৃত ধর্মাদর্শ থেকে যাতে বেশি দূরে সরে না যান, সেদিকে যিশুর সতর্ক দৃষ্টি ছিল। তিনি জানতেন যে, এসেনিদের ধর্মগ্রন্থের প্রতি পৃষ্ঠাতেই গসপেল ও ঈশ্বর প্রেরিত দূতদের আচার অনুষ্ঠান ও নীতিবাক্য রয়েছে। ধর্মপ্রচার কালে যিশু তার শিক্ষা ও আদর্শ সম্পূর্ণরূপে তার অনুসারীদের কাছে প্রকাশ করেননি। মূলত, পূর্ণ সত্যটি মাত্র অতি অল্প কয়েকজনের জানা ছিল। “তোমাদের কাছে আমার এখনও অনেক কিছু বলার বাকি আছে। কিন্তু তোমরা সেগুলো বহন করতে পারবে না। যা হোক, সেই তিনি অর্থাৎ সত্য আত্মা যখন আগমন করবেন, তখন তিনি তোমাদের পূর্ণ সত্যের পথে পরিচালিত করবেন, কিন্তু তিনি নিজে থেকে কিছু বলবেন না। তিনি যা শুনবেন, তাই তিনি বলবেন।” -যোহন, ১৬:১২-১৪.

তিনি কোন জাগতিক ক্ষমতা চাননি। তাই তিনি দেশের শাসক যেমন হতে চাননি, তেমনি চাননি ধর্মশাস্ত্রবিদ হতে বা প্রভাবশালী ইহুদী চক্রের নেতৃত্ব। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে তার বিপুল জনপ্রিয়তা দেখে ও তার অনুসারীদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে রোমকরা এবং তাদের সমর্থক ইহুদী আলেমরা শঙ্কিত হয়ে ওঠে যে তিনি বোধ হয় শাসন ক্ষমতা দখল করতে চাইছেন। নিজেদের ক্ষমতার প্রতি হুমকি সৃষ্টি হতে যাচ্ছে ভেবে তারা তাকে নিশ্চিহ্ন করার জন্যে দ্রুত সচেষ্ট হয়ে ওঠে।

যিশুর একমাত্র লক্ষ্য ছিল স্রষ্টা যেমনটি নির্দেশ করেছেন তদনুযায়ী উপাসনার পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা। ঐশী নির্দেশিত পন্থায় চলার পথে যে বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করবে তার সাথে লড়াই করার জন্যে যিশু ও তার অনুসারীরা প্রস্তুত ছিলেন। 

প্রথম লড়াইটি সংঘটিত হয় রোমকদের অনুগত ইহুদীদের সাথে। এ যুদ্ধে যিশুর পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ‘বার জেসাস’ (Bar Jesus) বারাব্বাস (Barabbas) এ যুদ্ধে ইহুদী দলের নেতা নিহত হলে তারা সম্পূর্ণরূপে মনোবল হারিয়ে ফেলে। কিন্তু বারাব্বাস গ্রেফতার হন। 

পরবর্তী লক্ষ ছিল শলোমনের মন্দির। এ মন্দিরের কাছেই রোমকদের একটি শক্তিশালী বাহিনী ছিল, কারণ সেটা ছিল বাৎসরিক উৎসবের সময় এবং পূর্ব উপলক্ষে ভোজোৎসব (Feast of the Passover) ছিল আসন্ন। এ রোমক সৈন্যরা বৎসরের এ সময় সাধারণভাবে ছোট-খাট গোলযোগের জন্যে প্রস্তুত হয়েই থাকত। তবে এবার তারা অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি সতর্ক ছিল। এরা ছাড়াও ছিল মন্দির পুলিশ যারা পবিত্র স্থানগুলো পাহারা দিত। যিশুর মন্দির অভিযানটি এমনই সুপরিকল্পিত ছিল যে রোমক সৈন্যরা ঘটনার সময় একেবারে হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। যিশু মন্দিরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। এই লড়াই ‘মন্দির শুদ্ধিকরণ’ (Cleansing of the Temple) নামে খ্যাত। যোহন এর গসপেলে এ ঘটনা নিম্নোক্ত ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে-

“যিশু মন্দিরে সেই সব ব্যক্তিদের দেখতে পেলেন যারা গরু, ভেড়া ও পায়রা বিক্রি করছিল। মুদ্রা বিনিময়কারীরা তাদের কাজে নিয়োজিত ছিল। যিশু চাবুকের আঘাত করে গরু ও ভেড়াসহ তাদের মন্দিরের বাইরে তাড়িয়ে দিলেন। তিনি মুদ্রা ব্যবসায়ীদের টাকাগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিলেন এবং তাদের টেবিলগুলোও উল্টিয়ে দিলেন।” -যোহন ২ঃ১৪

চাবুকের আঘাত সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে কারমাইকেল বলেন যে- “সেটা কার্যত ছিল এক বিরাট ঘটনা যে ক্ষেত্রে তারা মাত্র সহিংসতার আভাস দিয়েছিলেন এবং সন্দেহাতীতভাবে অতি সামান্যতম আঘাত মাত্র হেনেছিলেন। আমরা যদি শুধু সেই মন্দিরের আয়তন কল্পনা করি, যার ভিতর ও বাইরে সমবেত হয়েছিল বহু হাজার লোক, অসংখ্য সেবক, পুলিশ বাহিনী রোমক সৈন্যরা, পাশাপাশি মুদ্রা ব্যবসায়ীদের ব্যাপারে কিছু না বলে শুধু গরু বিক্রেতাদের প্রতিক্রিয়ার কথা ভাবি, আমরা দেখতে পাই যে, কাজটি ছিল বিস্ময়কর ব্যাপারের চাইতেও অনেক বেশি কিছু। চতুর্থ গসপেলে এ ঘটনার যে বর্ণনা রয়েছে, আসল ঘটনা ছিল একেবারেই ভিন্নতর। তারা বাস্তবতার বাইরে ঘটনাটিকে ‘ঐশ্বরিকীকরণে’র মাধ্যমে তাৎপর্যহীন করে ফেলেছেন।”

প্রতিটি যোদ্ধার এ বিষয়টি জানা ছিল যে, স্থানীয় পুলিশদের সহানুভূতি ছিল দেশ-প্রেমিকদের প্রতি, দখলদার সেনাবাহিনীর প্রতি নয়। এ বিষয়টি মন্দিরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার একটি কারণ হতে পারে। 

রোমকরা স্থানীয়ভাবে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হলেও তাদের শক্তি চূর্ণ হয়নি। তারা শক্তি বৃদ্ধির জন্যে সাহায্য চেয়ে পাঠালে নতুন সৈন্য দল জেরুজালেমের দিকে অগ্রসর হয়। জেরুজালেমের তোরণ রক্ষার লড়াই কয়েকদিন ধরে চলে। কিন্তু শেষপর্যন্ত দেশপ্রেমিক বাহিনীর তুলনায় রোমান বাহিনী অনেক বেশি শক্তিশালী প্রমাণিত হয়। তার সকল অনুসারী পিছু হটে যায়। এমনকি যিশুর ঘনিষ্ঠ শিষ্যরাও পলায়ন করে। তার সাথে মাত্র সামান্য কিছু মানুষ অবশিষ্ট ছিল। যিশু আত্মগোপন করলেন। রোমানরা তাকে খুঁজে বের করার জন্যে ব্যাপক তল্লাশি শুরু করে। 

যিশুর গ্রেফতার, ‘বিচার’ এবং ‘ক্রুশবিদ্ধ’ করা নিয়ে এত বেশি পরস্পর বিরোধী ও বিভ্রান্তিকর বিবরণ পাওয়া যায় যে তার মধ্য থেকে বাস্তবে কি ঘটেছিল তা জানা অত্যন্ত দুষ্কর। আমরা দেখতে পাই যে, রোমক সরকার স্বল্পসংখ্যক ইহুদীদের আনুগত্য ও সেবা লাভ করতে সক্ষম হয়েছিল। কারণ জেরুজালেমে রোমক শাসন অব্যাহত থাকলে এ বিশেষ মহলটির স্বার্থ রক্ষিত হত। 

যিশুর এক শিষ্য জুডাস ইস্কারিয়্যত (Judas Iscariot) যিশুকে গ্রেফতারের কাজে সাহায্য করার বিনিময়ে ৩০টি রৌপ্যখন্ড লাভের প্রতিশ্রুতি পেয়ে রোমকদের দলে ভিড়ে যায়। যে কোন ধরনের গোলযোগ এড়াতে রাতের বেলায় যিশুকে গ্রেফতার করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। যিশু যে স্থানে তার কয়েকজন সঙ্গীসহ অবস্থান করছিলেন, সেখানে পৌঁছে জুডাসকে যিশুকে চুম্বন করার নির্দেশ দেওয়া হয়, যাতে বিদেশি রোমক সৈন্যরা সহজেই তাকে শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু পরিকল্পনাটি ভন্ডুল হয়ে যায়। সৈন্যরা অন্ধকারের মধ্যে দিশা হারিয়ে ফেলে। দু’জনকেই অন্ধকারের মধ্যে এক রকম মনে হচ্ছিল। সৈন্যরা ভুল করে যিশুর পরিবর্তে জুডাসকে গ্রেফতার করে। এরপরে যিশু পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। 

এ ব্যাপারে কোরআনে বলা হয়েছে: ”তারা তাকে হত্যা বা ক্রুশবিদ্ধ করেনি, কিন্তু তাদের এরূপ বিভ্রম হয়েছিল।”

বন্দীকে যখন রোমক বিচারক পিলেট-এর সামনে হাজির করা হল, ঘটনার নাটকীয়তা সকলকেই সন্তুষ্ট করেছিল। অধিকাংশ ইহুদী উল্লসিত হয়ে উঠেছিল এ কারণে যে অলৌকিকভাবে বিশ্বাসঘাতক নিজেই কাঠগড়ায় দণ্ডায়মান ছিল, যিশু নন। অন্যদিকে রোমকদের অনুগত ইহুদীরা খুশি হয়েছিল এ কারণে যে, জুডাসের মৃত্যু হলে তাদের অপরাধের প্রমাণ বিলুপ্ত হবে। উপরন্তু যেহেতু আইনের দৃষ্টিতে যিশুর মৃত্যু ঘটবে, সে কারণে তিনি আর প্রকাশ্য আত্ম প্রকাশ করে তাদের জন্যে কোন সমস্যা সৃষ্টি করতে পারবেন না। 

রোমক বিচারক পিলেট বিচার কাজে কী ভূমিকা পালন করেছিলেন তা জানা যায় না। বাইবেলে বলা হয়েছে যে তিনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন। ইহুদী নেতাদের প্রতি তার পক্ষপাতিত্ব ছিল, অন্যদিকে যিশুর প্রতিও তার সহানুভূতি ছিল। ফলে এ ব্যাপারে এমন এক কাহিনি তৈরি হয় যা বিশ্বাস করা কঠিন। গসপেলের লেখকরা যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করে তার সকল দায়-দায়িত্ব সমগ্র ইহুদী জাতির উপর চাপিয়ে দিতে এবং যিশুর কথিত মৃত্যুর দায় থেকে রোমকদের মুক্ত করার যে চেষ্টা চালিয়েছিলেন, তার ফলশ্রুতিতেও প্রকৃত ঘটনা তালগোল পাকানো হতে পারে।- এ ক্ষেত্রে একমাত্র পথ হতে পারত এই ঘটনা সম্পর্কে এমন একটি সরকারী বিবরণ যা দেশি শাসকদের জন্যে ক্ষতিকর হত না এবং সেখানে কর্তৃপক্ষ যাতে অসন্তুষ্ট বা ক্রুদ্ধ না হয় সে জন্যে প্রকৃত ঘটনা প্রয়োজন বোধে কিছুটা ঘুরিয়ে লেখা। আর তৎকালীন পরিবেশে শুধু এ ধরনের বিবরণই টিকে থাকা সম্ভব ছিল।

অতএব একটি শক্তিশালী সূত্রে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে যে, পিলেট ৩০ হাজার পাউন্ডের সমপরিমাণ অর্থ ঘুষ গ্রহণ করেন। গসপেলে যা বর্ণিত হয়েছে, তা যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে এটা নিশ্চিত যে, সেদিন জেরুজালেমে যে নাটক অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে পিলেট একটি বিশেষ মহলের স্বার্থে কাজ করেছিলেন।

সর্বশেষ আর একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়। মিশর ও ইথিওপিয়ার কপ্টিক চার্চের সন্তদের ক্যালেন্ডারগুলো থেকে দেখা যায়, পিলেট ও তার স্ত্রী ‘সন্ত’ (Saint) হিসেবে গণ্য হয়েছেন। এটা শুধু তখনই হওয়া সম্ভব যদি মেনে নেয়া যায় যে পিলেট সৈন্যদের ভুল ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত ছিলেন এবং তিনি জেনে শুনেই জুডাসকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে যিশুকে পালিয়ে যাবার সুযোগ করে দেন। 

বার্ণাবাসের বিবরণে বলা হয়েছে যে, গ্রেফতারের সময় স্রষ্টার ইচ্ছায় জুডাস, যিশুর চেহারায় পরিবর্তিত হন এবং তা এতই নিখুঁত ছিল যে তার মাতা ও ঘনিষ্ষ্ঠ অনুসারীরাও তাকে যিশু বলেই বিশ্বাস করেছিলেন। জুডাসের মৃত্যুর পর যিশু তাদের কাছে হাজির না হওয়া পর্যন্ত তারা বুঝতেই পারেননি যে প্রকৃতপক্ষে কি ঘটে গেছে। এ থেকেই বোঝা যায়, তৎকালীন পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে কেন এই বিভ্রান্তি ঘটেছিল এবং কেন কোন কোন লেখক এ ঘটনার বর্ণনা করতে গিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থেকেও যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর ভ্রান্ত কথা সমর্থন করে গেছেন।

যিশুর সাথে বিশ্বাসঘাতকতাকারী বলে উল্লেখিত ব্যক্তি ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন কিনা সে ব্যাপারে সকলেই সম্পূর্ণ একমত নন। গোড়ার দিকের খৃষ্টানদের মধ্যে করিন্থিয়ানস ও পরে ব্যাসিলিডিয়ানস যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। তারা বিশ্বাস করতেন যে যিশুর বদলে সাইরিন এর সাইমন (Simon of Cyrene) ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন। পিটার, পল ও জন এর সমসাময়িক করিন্থিয়ানস যিশুর পুনরুত্থানের কথাও স্বীকার করেন। গোড়ার দিকের আরেকটি খৃষ্টান সম্প্রদায় কার্পোক্রেশিয়ানরা বিশ্বাস করত যে যিশু নয়, হুবহু তার মত দেখতে তার এক অনুসারীকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছে। চতুর্থ শতাব্দীর মানুষ প্লাটিনাস বলেছেন যে তিনি ‘দি জার্নি’স অব অ্যাপোসলস, (The Journies of the Apostles) নামক একটি গ্রন্থ পাঠ করেন যা পিটার, জন, অ্যান্ড্রু, টমাস ও পলের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে রচিত হয়েছিল। অন্যান্য বিষয়ের সাথে এখানেও বলা হয়েছে যে যিশু ক্রুশবিদ্ধ হননি, তার স্থলে অন্য ব্যক্তি ক্রুশবিদ্ধ হয় এবং যারা বিশ্বাস করেছিল যে তারা ক্রুশবিদ্ধ করে তাকে হত্যা করেছে, তাদের তিনি উপহাস করতেন।

এভাবে দেখা যায়, যিশু ক্রুশবিদ্ধ হননি বলে জানা গেলেও সে কালের লেখকগণ বা ঐতিহাসিকরা যিশুর স্থলে কে ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করলেন তার ব্যাপারে মতপার্থক্যের শিকার কিংবা সুনির্দিষ্ট কিছু বলতে অপারগ। কেউ কেউ কিছুই বিশ্বাস করতে চান না।

যখন কেউ রোমান সৈনিকদের দৌরাত্ম্যের কথা বর্ণনা করেন তিনি আক্ষরিক ভাবেই ওল্ড টেস্টামেন্টের নির্দিষ্ট কয়েকটি অনুচ্ছেদের পুনরাবৃত্তি করেন.....তখনই পুরো বিষয়টিই নিছক কল্পনাপ্রসূত আবিষ্কার বলে সন্দেহ জেগে ওঠে।

বার্নাবাসের গসপেল ও কোরআন ছাড়া যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার পর কি ঘটেছিল, সে সম্পর্কে কোন ঐতিহাসিক তথ্য নেই। উক্ত বার্নাবাসের গসপেল ও কোরআনে এ ঘটনার বর্ণনা রয়েছে, যাকে ৪টি স্বীকৃত গসপেলেই ‘ঊর্ধ্বারোহন’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে- যার অর্থ তাকে পৃথিবী থেকে তুলে নেয়া হয়েছিল। 

সমাপ্ত।
উৎস: Jesus- A Prophet of Islam- by Muhammad Ata ur-Rahim.