pytheya.blogspot.com Webutation

২৬ মার্চ, ২০১৬

ওয়াইশি ইবনে হার্ব: অবিস্মৃত এক ঘাতকের নাম।


য়াইশি ইবনে হার্ব (আক্ষরিক অর্থে যুদ্ধের সন্তান) ছিল জুবায়ের ইবনে মুতিমের ইথিওপিও দাস। সে মূলত: নবীজীর চাচা, হামজা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব এবং ভন্ডনবী মুসাইলিমা ইবনে সুমামা বিন কবির বিন হাবিবের হত্যাকারী হিসেবে সুপরিচিত।

নবীজী যখন ইসলাম প্রচার শুরু করেন, তখন সমাজের অবহেলিত ও নির্য়াতিতরাই কেবল তা গ্রহণ করছিল। এভাবে ওমরের বাঁদী রানীন যখন তা গ্রহণ করল, তখন কুরাইশগণ বলতে লাগল, “ইসলাম যদি ভাল কোন ধর্ম হত, তবে রানীনের মত বাঁদী আমাদেরকে ফেলে এগিয়ে যেতে পারত না।"

যা হোক, ইসলামে মানুষের মধ্যে কোন ভেদাভেদ নেই। সুতরাং সকলের সাথে জুবায়েরের দাস ওয়াইশির কাছেও ইসলামের দাওয়াত পৌঁছিল। এতে ওয়াইশি জানিয়েছিল: “ও মুহম্মদ! কি করে আপনি আমাকে ইসলামের দিকে আহবান করেন, যখন আপনি বলেন যে, হত্যাকারী, পৌত্তলিক ও ব্যাভিচারী শেষবিচারের দিনে দোযখী সাব্যস্ত হবে, তারা দোযখে যাবে এবং সেখানে চিরস্থায়ীভাবে বসবাস করবে? আমি সবগুলো পাপই করেছি। এতদসত্ত্বেও আমার পরিত্রাণের অন্যকোন উপায় আছে কি?”

উত্তরে নবীজী তাকে জানান: কিন্তু যারা তওবা করে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের গোনাহকে পুন্য দ্বারা পরিবর্তত করে এবং দেবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।-(২৫:৭০)

এতে ওয়াইশি বলেছিল, “ও, মুহম্মদ! “যদি সে তওবা করে, বিশ্বাসী হয় ও সৎকর্ম করে...” এ শর্তগুলো আমার জন্যে খুবই কঠিন।”

নবীজী জানিয়েছিলেন: “নিশ্চয় আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে তাঁর সাথে কাউকে শরীক করে। এছাড়া যাকে ইচ্ছা, ক্ষমা করেন। যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে সুদূর ভ্রান্তিতে পতিত হয়।” -(৪: ১১৬)

এরপর  ওয়াইশি বলেছিল, “ও, মুহম্মদ! এ তো সম্পূর্ণ আল্লার ইচ্ছেধীন। আমি নিশ্চিত নই আমি ক্ষমা পাব কি পাব না। অন্যকোন পথ আছে কি-না বলেন?”

তখন নবীজী উত্তরে বলেছিলেন: “বল, হে আমার বান্দাগণ যারা নিজেদের উপর যুলুম করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গোনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” -(৩৯:৫৩)

এ সময় সাহাবীরা বলেছিল, “ওয়া্ইশি যা জানতে চেয়েছে আমাদের মনেও এ প্রশ্ন উদয় হয়েছিল।”
এতে নবীজী বলেন, “এ তো সকল মুসলমানের জন্যেই সুখবর।” -দি ইসলামিক বুলেটিন, খন্ড-২২, নম্বর ২৭, পৃষ্ঠা-২৯।

আর ওয়াইশি এ শুনে বলেছিল, “নিশ্চয় এ কল্যাণের।” কিন্তু সে ঐ সময় ইসলাম গ্রহণ করেনি। সম্ভবত: তার মনিবের ভয়ে, কেননা, কুরাইশগণ মনিবের অনুমতি ছাড়া কোন দাসের ইসলাম গ্রহণ নিষিদ্ধ করেছিল। আবার এমনও হতে পারে, সে ভীত হয়েছিল নব্য মুসলিমদের উপর কুরাইশদের নৈমিত্তিক অত্যাচার প্রত্যক্ষ করে।

বদর যুদ্ধে অনেক কুরাইশ নেতা নিহত হয়েছিল, যাদের মধ্যে ছিল তুয়াইমা ইবনে আদি আল-খায়ের এবং ওৎবা ইবনে আবি রাবিয়া। তারপর ওহুদ যুদ্ধের সময়, আবু সূফিয়ানের স্ত্রী, ওৎবার কন্যা হিন্দ ওয়াইশিকে এমন এক প্রস্তাব দিল যে, যদি সে মুহম্মদ ইবনে আবদ আল্লা, আলি ইবনে আবু তালিব বা হামজা ইবনে আবদ আল-মুত্তালিব- এই তিনজনের কাউকে হত্যা করতে পারে, যাতে সে বদর যুদ্ধে নিহত তার পিতার হত্যার প্রতিশোধ নিতে সমর্থ হয়, তবে তার ঐ কাজে সফলতার পুরস্কার স্বরূপ সে তার মুক্তির ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে তার কাছে প্রতিজ্ঞাত হয়।

বদর যুদ্ধে হামজা, জুবায়ের ইবনে মুতিমের পিতৃব্য তাইমিয়া ইবনে আদি বিন আল খায়েরকে হত্যা করেছিলেন। সুতরাং কুরাইশগণ যখন মুসলমানদের উপর পরাজয়ের প্রতিশোধ এবং তাদেরকে পরাভূত করতে আবারো যুদ্ধের জন্যে নিজেদেরকে প্রস্তুত করছিল, সেময় তার মুনিব জুবায়ের তাকে বললেন, ‘আমার চাচার হত্যার প্রতিশোধে যদি তুমি মুহম্মদের পিতৃব্য হামজাকে হত্যা করতে পার, তবে তুমি মুক্ত হয়ে যাবে।’ সুতরাং দাসত্বের বন্ধন যা তার গলদেশে দীর্ঘকাল আগে ফাঁসের মত আঁটকে গিয়েছিল, তা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে, এ ছিল ওয়াইশির জন্যে এক দ্বি-মুখী সুযোগ।

তারপর আইনাইন [আইনাইন ওহুদ পর্বতের নিকটবর্তী একটি পর্বত এবং এ দুটি পর্বতের মধ্যবর্তী উপত্যকা যেখানে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল] বৎসরে কুরাইশগণ যখন যুদ্ধের জন্যে বেরিয়ে পড়ল তখন ওয়াইশি যুদ্ধে অংশ নিতে তাদের সঙ্গে গেল।

ওহুদ যুদ্ধের দিনে [সিই ৬২৫] যখন কুরাইশ যোদ্ধারা যুদ্ধের জন্যে সাঁরিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াল, তখন ওয়াইশি তার শিকার খুঁজে ফিরছিল। নবী মুহম্মদের দিকে অগ্রসর হওয়া তার জন্যে সম্ভব ছিল না, কারণ একদল সাহাবী সর্বদাই তাকে ঘিরে থাকত, পাহারায়। সে ভেবে দেখল আলী যুদ্ধের ময়দানে খুবই সতর্ক অন্যদিকে হামজা যুদ্ধে এাস সৃষ্টিকারী, সে অন্যদিকে নজর দেয় না, সুতরাং তাকে ফাঁদে ফেলে বা তার অসতর্কতার কোন সুযোগ নিয়ে তাকে ঘায়েল করা যেতে পারে।

সে যখন এসব ভাবছিল ঠিক তখন কুরাইশদের মধ্য থেকে শায়বা বেরিয়ে এল এবং হেঁকে বলল, ‘মুসলমানদের মধ্যে এমন কেউ কি আছ যে আমার সঙ্গে দ্বৈত লড়ার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করবে?’
আর হামজা তার হাঁক শুনে এগিয়ে এলেন এবং তাচ্ছিল্যের সূরে বললেন, “কে শায়বা নাকি! যার মা লেডিসদের ধরে ধরে খৎনা করে! তা তু কি আল্লা ও তাঁর রসূলকে চ্যালেঞ্জ দিচ্ছিস? তবে আয়! ও ভগাংকুর কাটনেওয়ালীর পুত! সামনে আয়!”

শায়বা ইবনে আল-উজ্জা তার দিকে এগিয়ে গেলেন আর হামজাও তার তরবারী চালালেন। এত দ্রুত ঘটনাটা ঘটল যে, দেখতে মনে হল হামজা মিস করেছেন, কিন্তু না, ঐ আঘাত তার মাথা বিচ্ছিন্ন করে দিল।

ওয়াইশি হামজার উপর চোখ রেখে একটা পাথরের আড়ালে লুকিয়েছিল। তারপর তিনি যখন তার কাছাকাছি হলেন, তখন সে বেরিয়ে এল এবং নির্দিষ্ট এক দূরত্ব থেকে তার বর্শাটাকে ভারসাম্যে নিয়ে সেটিকে ছুঁড়ে দিল। অন্যান্য আফ্রিকানদের মত ওয়াইশিও ছিল বর্শা নিক্ষেপে দক্ষ, তা কখনও লক্ষ্যভেদে ব্যর্থ হয় না।

ওয়াইশি তার বর্শার দিকে তাকাল, সেটি তখনও লক্ষ্যবস্তুর দিকে উড়ে যাচ্ছে। তারপর হঠাৎ হামজাকে আঘাত করল তার নাভিতে এবং বেরিয়ে গেল তার পায়ূদেশ দিয়ে। তিনি ওয়াইশিকে আক্রমণ করতে তার দিকে এগিয়ে যেতে চেষ্টা করলেন কিন্তু প্রচন্ড যন্ত্রণা তা তাকে করতে দিল না। তিনি ঐ অবস্থায় সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন, যতক্ষণ না তার আত্মা তার দেহ ছেড়ে বেরিয়ে না গেল।অত:পর ওয়াইশি তার কাছে গিয়ে বর্শাটা টেনে বের করে নিয়ে ফিরে গেল সেখানে যেখানে কুরাইশরা ছাউনি ফেলেছিল আর তার মুক্তির অপেক্ষায় থাকল। কোথাও না গিয়ে সে সেখানেই রইল কেননা তার দাসত্বের শৃংখল থেকে মুক্ত হতে সে কেবল হামজাকেই বেঁছে নিয়েছিল হত্যার জন্যে, নিজেকে যুদ্ধের সঙ্গে জড়ায়নি।

যখন যুদ্ধের ময়দান কুরাইশদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেল, তখন আবু সুফিয়ানের স্ত্রী, হিন্দ বিনতে ওৎবা হামজার লাশটি খুঁজে পায়। বদর যুদ্ধে হামজা তার পিতা ওৎবা ইবনে রাবিয়াকে হত্যা করেছিলেন। সে এইসময় পিতৃহত্যার প্রতিশোধে উন্মত্ত হয়ে উঠল। ছুরি দিয়ে সে লাশের বুক চিরে ফেলল এবং কলিজা বের করে নিয়ে, তার বুকের উপর বসেই তা চিবিয়ে খেয়ে ফেলল।

কোন এক শিষ্যের মাধ্যমে নবীজী তার পিতৃব্যের মৃত্যুর কথা জানতে পারেন। কিন্তু তার উপর এমন কিছু ঘটতে পারে তা তার কল্পনাতেও ছিল না। এই পিতৃব্যর প্রতি তার ভালবাসা ছিল প্রগাঢ়। তিনি জানতে চান, কেউ তাকে ঐ স্থানটি দেখিয়ে দিতে পারবে কি-না যেখানে তার পিতৃব্য নিহত হয়েছেন। তখন এক শিষ্য উঠে দাঁড়ালে, তিনি তার সঙ্গে সেখানে গেলেন।

লাশের অবস্থা দেখে নবীজী ব্যাথিত হন। বুক-পেট চিরে ফেলে ভিতরের সবকিছু টেনে বের করে ফেলা হয়েছে। যে শিষ্য তাকে সেখানে নিয়ে যায়, সে জানায় যে, মৃতদেহের অবস্থা অমনটা ছিল না যখন সে তাকে নিহত হতে দেখেছে, এসব ঘটেছে পরবর্তীতে।

যুদ্ধ শেষে কুরাইশগণ যখন মক্কাতে ফিরে গিয়েছিল, তখন ওয়াইশিও তাদের সাথে ছিল। তারপর সে সেখানে একজন মুক্তমানুষ হয়ে, উদ্দীপনার সাথে নতুনভাবে জীবন-যাপন শুরু করে। অত:পর মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে হামজাকে হত্যার অপরাধে ওয়াইশিকে “যুদ্ধঅপরাধী” ঘোষণা করা হয়। এতে সে মক্কা থেকে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে ওয়াইশি এ বিষয়ে বলেছিল, “ওহুদ যুদ্ধের পর আমি মক্কাতেই বসবাস করতে থাকি যতক্ষণ না তা মুসলমানদের দ্বারা বিজিত হয়। তারপর আমি পালিয়ে যাই তায়েফে।”

ওয়াইশি তায়েফে সাকিফদের সান্নিধ্যে বেশ কয়েক বৎসর বাস করে। তারপর নবম হিজরীতে, যখন তায়েফবাসী ইসলাম গ্রহণের অভিপ্রায়ে নবীজীর কাছে এক প্রতিনিধিদল প্রেরণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঐ ক্রান্তি লগ্নে সে বুঝতে পারছিল না তার কি করা উচিৎ। যদি তায়েফ ইসলাম গ্রহণ করে, তবে সে কোথায় যাবে? অবশেষে সে সিরিয়া, ইয়েমেন বা অন্য কোন দেশে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিল। ঐ সময়টা ছিল তার জন্য উদ্বেগ ও সিদ্ধান্তহীনতার কাল। আর সে সময় কেউ একজন তাকে বলেছিল, “কসম আল্লা, তিনি এমন কাউকে হত্যা করেন না, যে ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং তার সত্যতা স্বীকার করে নিয়েছে। সুতরাং তুমি আমাদের সঙ্গে চল।” সে এমনটা বলেছিল কারণ নবীজীর সংযম ও সহনশীলতার কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ায় তা তায়েফবাসীর কাছেও পৌঁছেছিল, আর তার ক্ষমাশীলতা ও দয়ার কথা তো সর্বজন বিদিত ছিল।

ওয়াইশি আরও জানতে পারে নবীজী দূতদের কোন ক্ষতি করেন না; আর তাই সে মদিনাতে যাবার সিদ্ধান্ত নেয় প্রতিনিধিদলের একজন হয়ে। তারপর যখন সাকিফ গোত্র নবীজীর কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করল, ওয়াইশিও তাদের সাথে ছিল এবং ব্যক্তিগতভাবে নবীজীর কাছে গিয়ে আনুগত্যের শপথ নিয়েছিল।

ওয়াইশি তার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে পরবর্তীতে বলেছিল, “অামি শুনেছি, যত বড় অপরাধই হোক না কেন, ক্ষমা চাইলে খোদা ক্ষমা করেন [কারণ তিনি অসীম ক্ষমাশীল]। আর তাই আমি নবীজীর কাছে গেলাম মুখে কলেমা শাহাদৎ নিয়ে।”

নবীজী তাকে দেখলেন। বহু বৎসরের অদর্শণে, এ সেই ওয়াইশি কি-না তা তিনি নিশ্চিত ছিলেন না। "তুমি কি সেই ইথিওপিয় ওয়াইশি?" -নবীজী জিজ্ঞেস করেন।
এতে ওয়াইশি হ্যাঁ সূচক জবাব দিল। তখন তিনি তাকে বসতে বলেন, তারপর তাকে জিজ্ঞেস করেন, “হামজা ইবনে অাবদ আল-মুত্তালিবকে কিভাবে তুমি হত্যা করেছিলে?”

ওয়াইশি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো কাহিনী স্মরণ করল। কিন্তু সে কেবল উত্তরে বলল, “তাই ঘটেছিল, যা আপনাকে জানানো হয়েছিল,” সে আরও বলেছিল, “ও রসূলুল্লাহ! আর যা আপনাকে জানানো হয়নি তা হল, আমি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিনি, কেবল তাকে হত্যা করি নিজের দাসত্ব মুক্তির জন্যে।”

পিন পতন নিস্তবতা। বিষাদের ছায়া নেমে এল নবীজীর সারামুখে, তিনি বললেন, “আমার পিতৃব্যের উপর তোমার হাত দিয়ে যে কহিনীর শুরু, তার সমাপ্তি হৃদয় বিদারক ঘটনার মধ্য দিয়ে।” তিনি নিরব হয়ে বসে রইলেন কিছুসময়, তারপর উঠে দাড়াতে দাড়াতে বললেন, “ও ওয়াইশি! পুনরুত্থিত হবার আগে তুমি আর আমার সামনে এস না।” -তিনি চলে গেলেন।

নবীজী ওয়াইশিকে ভবিষ্যতে তার সামনে আসতে নিষেধ করেছিলেন কেন?
বস্তুত: এ কেবল তার মঙ্গল কামনায়, কেননা তাকে দেখলে তার চাচার কথা স্মরণে আসবে, আর তাতে তার মন ব্যাথায় ভরে উঠবে, এতে তার অজান্তে যাতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি ওয়াইশির উপর নেমে না আসে।

পরবর্তী দু’বছর ওয়াইশি, দর্শণার্থী এড়িয়ে একটু নিরিবিলি থাকতে, তায়েফের বিভিন্ন স্থানে বাস করল। সে বিবেকের দংশনে ভুগছিল এবং জীবন সংশয়ে ছিল। এ ছিল এক দূর্বিসহ জীবন। তবে সে তার নবদীক্ষিত ধর্মে বিশ্বস্ত রইল। এরপর সে সত্য প্রতিষ্ঠায় অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ডাক পেল। তখন সে রিদ্দার যুদ্ধে অংশ নিল।

নবীজীর জীবনাবসান কালে মুসাইলিমা নবূয়্যত দাবী করে বসে। কিন্তু নবীজীর মধ্য দিয়ে নবূয়্যতের সমাপ্তির সুস্পষ্ট ঘোষণা ইতিপূর্বেই কোরআন জানিয়ে দিয়েছে। সুতরাং মুসাইলিমা মুসলমানদের নিকট সন্দেহাতীতভাবে একজন ভন্ড হিসেবে স্বীকৃত হয়। ইসলাম গ্রহণের পর মিথ্যের আশ্রয় নিয়ে মানুষের সাথে প্রতারণা, আল্লা ও তাঁর রসূলের উপর মিথ্যারোপের কারণে খলিফা আবুবকর তাকে দমনের সিদ্ধান্ত নেন। অার যখন তার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী প্রেরণ করা হল, তখন ওয়াইশিও তাতে অংশগ্রহণ করে মুসাইলিমাকে নিজ হাতে হত্যার অভিলাশ নিয়ে, যাতে করে তার উপর চেপে বসা গ্লানির ভার কিছুটা হলেও কমে।

রিদ্দার যুদ্ধে মুসলিম সেনাপতি ছিলেন খালিদ বিন আল-ওয়ালিদ। তার আগমণের খবরে মুসাইলিমা আকরাবাতে তার অনুগত বাহিনীকে বিন্যস্ত করে। মুসলিমদের ১ম ও ২য় আক্রমণের ধাক্কা সে প্রতিহত করে। কিন্তু প্রচুর হতাহতের পরও মুসলিমদের দৃঢ়তা দেখে সে তার সুরক্ষিত বাগিচা অঙ্গনে প্রবেশ করে।

তারপর মুসলিম সেনারা যখন ৩য় ধাপের আক্রমণের মধ্যদিয়ে ঐ সুরক্ষিত বাগানে প্রবেশ করে, তখন ওয়াইশি চারিদিকে মুসাইলিমাকে খুঁজে ফেরে। একসময় তার শিকারী বাজের দৃষ্টি তাকে খুঁজে পায় দূরে একজায়গায় তার অনুসারী বেষ্টিত অবস্থায়। দূরত্বটা তার জন্যে খুব একটা বেশী নয়। দ্রুত সে প্রস্তুত হয়ে পজিশন নেয় তারপর লক্ষ্যস্থির করে সে তার বর্শা ছুড়ে দেয়। এ সেই বর্শা যা দিয়ে ইতিপূর্বে সে হামজাকে বিদ্ধ করেছিল।

মুসাইলিমা তরবারী হাতে দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়েছিল। উসকো খুশকো চুলে তাকে দেখাচ্ছিল ছাই রংয়ের এক উটের মত। ওয়াইশি যখন তার বর্শা ছুঁড়েছিল, ঐ সময় বিপরীত দিক থেকে আবু দোজনা নামের এক আনসারীও মুসাইলিমার কাছে পৌঁছুতে চেষ্টা করছিল, কিন্তু সে তার কাছে যাবার আগেই ওয়াইশির ছুঁড়ে দেয়া বর্শা মুসাইলিমাকে অসহায়ভাবে গেঁথে ফেলল মাটির সাথে। আর ঠিক সেই মূহূর্তে দোজনার তরবারীও তাকে আঘাত হানে এবং তার শির দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। কিন্তু দূর্ভাগ্য দোজনার, উল্লাস প্রকাশ করার আগেই পেছন থেকে হানা এক আঘাত তার শিরও ফেলে দিয়েছিল ভূমিতে। এক গৃহের ছাদের উপর দাঁড়িয়ে মুসাইলিমার পরিণতি দেখে এক দাসী আফসোস নিয়ে বলেছিল: “হায়! বিশ্বাসীদের নেতা নিহত হলেন এক কাফ্রি দাসের হাতে।”

ওয়াইশি পরবর্তীতে খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে সিরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। অত:পর যখন সেটি বিজিত হয়ে মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায়, তখন সে এমেসার হিমসে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকে। আর সেখানে বসবাস কালে সে মাত্রাতিরিক্ত মদ্যপানে আসক্ত হয়ে পড়ে। ফলে শরিয়তী আইনের শাস্তি তাকে পেতে হয়। খলিফা ওমর তাকে ৮০টি দোররা মারার নির্দেশ দেন। সে ছিল প্রথম মুসলিম যে সিরিয়ায় এ ধরণের অপরাধের জন্য শাস্তির আওতায় আসে। তবে শাস্তি পাবার পরেও ওয়াইশি মদ্যপান পরিত্যাগ করতে পারেনি। এতে ওমর হতাশ হয়ে মন্তব্য করেছিলেন, “হয়ত: হামজার রক্তের কারণে আল্লার অভিশাপ ঐ বুনোটার উপর ভর করেছে।”

ওয়াইশির শেষ জীবনটা ঐ এমেসাতেই কাটে। তবে শেষের দিকে সে বেশ বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিল। অনেকে তাকে এক নজর দেখার জন্যে তার বাড়ীতে ভীড় করত। তবে পাঁড় মাতাল হলেও সে আগতদের অনুরোধে তাদেরকে হামজা ও মুসাইলিমাকে হত্যার বিস্তারিত ঘটনা শোনাত। আর তার আসনের পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা সেই ঐতিহাসিক বর্শাটা দেখিয়ে উপসংহার টানত- “যখন আমি অবিশ্বাসী ছিলাম, এই বর্শা দিয়ে আমি হামজাকে হত্যা করেছি- যে ছিল মানুষের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট; আর যখন বিশ্বাসী হলাম, এটা দিয়েই আমি হত্যা করলাম মুসাইলিমাকে- যে ছিল মানুষের মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট!” আর সে বর্শাটা হাতে তুলে নিয়ে কোলের উপর রাখত, তারপর সেটির গায়ে গভীর মমতায় হাত বুলাতে বুলাতে আনমনা হয়ে যেত।

একই কাহিনীর পুনরাবৃত্তি.......

জাফর বিন আমর বিন ওবায়দুল্লা ও আমর বিন উমাইয়া একসাথে ঘুরতে বের হয়েছিল। তারপর যখন তারা হিমে [সিরিয়ার এক শহর] পৌঁছিল, ওবায়দুল্লা আমরকে বলল, “ওয়াইশিকে দেখতে যাবা, যাতে করে আমরা তার কাছ থেকে হামজা হত্যার কাহিনীটা শুনতে পারি?”
সে বলল, “তা বেশ, চল।”

ওয়াইশি অধিকাংশ সময় হিমেই বসবাস করত। সুতরাং তারা তার সম্পর্কে খোঁজ নিল, এতে কেউ একজন তাদেরকে বলে, “He is that in the shade of his palace, as if he were a full water skin.” সুতরাং তারা এগিয়ে গেল এবং যখন কাছাকাছি পৌঁছিল, তারা তাকে দেখতে পেল। তারা হাত নেড়ে তাকে অভিবাদন জানাল এতে ওয়াইশিও তার প্রতিউত্তর দিল। ওবায়দুল্লা নিজেকে পাগড়ীর আড়ালে লুকিয়ে ছিল, যাতেকরে ওয়াইশি তার দু’চোখ ও পা ছাড়া আর কিছুই দেখতে না পারে। এরপর সে বলল, ‘ও ওয়াইশি! আপনি কি আমাকে চিনতে পেরেছেন?’

ওয়াইশি তার দিকে তাকাল এবং তারপর বলল, “না, খোদা স্বাক্ষী! কিন্তু আমার এটা জানা আছে যে, আদি বিন আল খায়ের, আবু আল-আসের কন্যা উম্মে কিতালকে বিবাহ করেন এবং সে তার জন্যে মক্কাতে এক পুত্র সন্তান প্রসব করেন। আর আমি ঐ শিশুর জন্যে একটা ধাত্রীর খোঁজ করেছিলাম। আমি মাতাসহ ঐ শিশুকে সঙ্গে নিয়ে ঐ ধাত্রীর কাছে যাই এবং তার হাতে ঐ শিশুকে সমর্পণ করি। আর তোমার পা ঠিক ঐ শিশুর পায়ের মত।”

তখন ওবায়দুল্লা তার মুখ অনাবৃত্ত করে বলল, “তুমি কি তোমার ঐ হামজা হত্যা কাহিনীটা আমাদেরকে একটু শোনাবে?”
ওয়াইশি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তারপর ক্ষণকাল নীরবতার পর সে বলল, “কেন শোনাব না।” সে কাহিনী বর্ণনা করে চলে।.....
এমনিভাবেই দিন গুজরান করে চলে ওয়াইশি। আর অপেক্ষায় থাকে ডাক আসার..............।

সমাপ্ত।
সংশোধিত নয়।

উৎস:
কোরআন,
সহিহ বুখারী,
মোবারকপুরী, দি সিল্ড নেকটার, পৃষ্ঠা ২৬১।

২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬

মুসাইলিমা আল-কাজ্জাব: এক ভন্ডনবীর উপাখ্যান।


মুসাইলিমার পুরো নাম মুহম্মদ হাসান মুসাইলিমা বিন সুমামা বিন কবির বিন হাবিব। তার জন্ম বনু হানিফা গোত্রে। এই গোত্র বনু বকরের (পরবর্তীতে রাবিয়া) একটি খৃষ্টান শাখা এবং নজদে বসবাসকারী আরব গোত্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় গোত্র। এরা মূলত: উত্তর আরব থেকে গিয়ে সেখানে বসতি স্থাপন করে। ৫০৩ সিইতে তারা মধ্য আরবের কিন্দা সাম্রাজ্যে নেতৃত্বদানকারী শক্তি হিসেবে অবির্ভূত হয়। বনু বকরেরা বাস করত অাল-ইয়ামামায় এবং তারা আল হিজরকে (বর্তমান আর-রিয়াদ) তাদের রাজধানী করেছিল।-[যোসেফ চিলোদ, পৃ.১৪]


৬২৮ সিইর জুনে, কুরাইশদের সাথে হুদা্ইবিয়ার সন্ধির কিছু পূর্বে, নবী মুহম্মদ ইয়ামামার শাসক ও বনু হানিফা গোত্রের প্রাক্তন প্রধান হাওদা বিন আলীকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিয়ে এক পত্র দিয়েছিলেন। তখন হাওদা তার ইসলাম গ্রহণের শর্ত হিসেবে নবীজীর কাছে তার নব্যূয়তের অংশীদারিত্ব অথবা উত্তরাধিকারীত্বের স্বীকৃতির প্রস্তাব রাখে, যা নবীজী কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়।৬৩০ সিইতে হাওদার মৃত্যুর পর মুসাইলিমা সাফল্যজনকভাবে নিজেকে তার জায়গায় সুপ্রতিষ্ঠিত করে এবং ইয়ামামার পূর্বাঞ্চলের এক বৃহৎ এলাকা নিজ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে যা ছিল মূলত: আবাদি জমি এবং সেখানে প্রচুর ফসল উৎপন্ন হত।


নবীজীর মৃত্যুর পূর্ববর্তী বৎসরে সে ইয়ামামায় আগত ও সেখানে বসতি স্থাপনকারী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোত্রগুলো ও ইয়ামামাবাসীর মধ্যে অানুগত্যের ভিত্তিতে সামাজিক শৃংখলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়।পরে সে সেখানে একটি নিরাপদ এলাকা (হারাম) গড়ে তোলে, যার কিছু জায়গায় তার সাথে আনুগত্যের বন্ধনে আবদ্ধ কিছু পরিবারকে বসবাস করতে দেয়। সূত্রমতে, হারাম পরিচালনায় দূর্ণীতি ছিল এবং বনু উসায়েদ, যারা এটির পরিচালনা করত, তারা অন্যদের সাথে দূর্ব্যহার করত।


যে বছর প্রচুর ফসল ফলত, যাযাবর বনু আসাদ ইয়ামামার গ্রামগুলোতে হানা দিত এবং লুটপাট করে এনে তা রাখত মুসাইলিমার প্রতিষ্ঠিত পবিত্র হারামের অভ্যান্তরে। সতর্ক করা সত্ত্বেও একের পর এক তা হতে থাকলে ইয়ামামাবাসী বনু আসাদকে হারাম এলাকা থেকে বের করে দেবার প্রস্তুতি নিল। কিন্তু মুসাইলিমা তাদেরকে নিবৃত্ত করে একথা বলে: "Wait for he who comes to me from heaven," and then revealed: '(I swear) by the darkness of the night and by the black wolf, the Usayyid did not violate [the sanctity] of the Haram'.

তখন ইয়ামামীরা বলেছিল- “হারামের অর্থ কি তাহলে নিষিদ্ধকে অনুমোদিত আর আমাদের সম্পত্তি ধ্বংস করা?”

পরবর্তীতে, বনু আসাদ আবারো ইয়ামামায় হানা দেয় এবং আবারো মুসাইলিমা তার অনুসারীদেরকে পবিত্র এলাকায় প্রবেশে বাঁধা দেয়, with "the one who comes to him" revealing through- '[I swear] by the dark night and by the softly treading lion, the Usayyid cut neither fresh nor dry.'-( Tabarï, pp. 1932; cf. Tabari, Chronique, p. 294.)



সাবার রানী বিলকিস
ইয়ামামার দক্ষিণে রয়েছে সেই ঐতিহাসিক নগরী সাবা, যার রানী বিলকিস জেরুজালেমে নবী শলোমনের কাছে গিয়েছিলেন। এ নগরী নবী মূসার আমল থেকেই যাদু ও মায়া বিদ্যা চর্চার কেন্দ্রভূমি ছিল। সেখানে বসবাসকারীগণ ছিল ম্যাজিবাদী- অগ্নি উপাসক, যারা অালোক এবং অন্ধকারকে তাদের ধর্মনীতির অন্তর্ভূক্ত করেছিল। এতে কালক্রমে অন্ধকারের শক্তি তথা জ্বিণ তাদের ধর্মে উপাসনার অংশ হয়ে যায়। ফলে আরাধনাকারীরা আবির্ভূত হয় ভাববাদী তথা গণক ও সূতসায়ার রূপে। অজ্ঞ মানুষ তাদের নানান ইচ্ছে পূরণে এদের স্মরণাপন্ন হত। যেমন-

‘আর শলোমনের রাজত্বে শয়তানেরা যা আওড়াত তারা (সাবাবাসীরা) তা মেনে চলত। শলোমন কূফর করেনি, বরং শয়তানই কূফর করেছিল। তারা মানুষকে শিক্ষা দিত (সেই) জাদু যা বাবিল শহরের দুই ফেরেস্তা হারুত ও মারুতের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল।- [২:১০১]


অর্থাৎ সাবাতে জাদুকর ও সূতসায়ারদেরকে জাদু শিক্ষা দিত শয়তান জ্বিণেরা। আর তারা তাদেরকে ‍সেই জাদু শিক্ষা দিত, যা অবতীর্ণ হয়েছিল বাবিলে বসবাসকারী ফেরেস্তা হারুত ও মারুতের উপর। অর্থাৎ ঐ ফেরেস্তাদ্বয়ের কারণে সাবা নগরীতে যাদু, মায়া ও ডাকিনী বিদ্যার প্রচলন ও ব্যবহার বহূলরূপে বৃদ্ধি পায়।


আর সূতসায়ারদের ভাববানীও ছিল তেমনি এক বাণী যা তারা পেত জ্বিণদের কাছ থেকে। ঐসব বাণী রচিত হত বিশেষ ধাঁচে, বিশেষ ছন্দে, যার কিছু ফলত, কিছু কখনও ফলত না। আর বাণী না ফললে তারা প্রার্থীর রীতিপালনের ত্রুটির উপর দোষ চাপাত। তথাপি, সমাজে তাদের সম্মান ও কদরে কখনও কোন ঘাটতি ছিল না।


জনসংখ্যার চাপ, যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ, ধর্মীয় বিরোধ, পশুপালন প্রভৃতি কারনে মানুষ এক স্থান থেকে অন্যত্র বসতি স্থাপন করত। এভাবে হিজাজে আগতরা যখন অভিবাসীরূপে সেখানে বসবাস গড়ে তোলে, তখন তারা সাবার ঐসব গণক, জাদুকর, ওঝা ও সূতসায়ারদের সংস্পর্শে আসে। অত:পর তারা তাদের সামাজিক অবস্থান ও প্রতিপত্তিতে আকৃষ্ট হয়ে ঐসব বিদ্যার চর্চা ও আরাধনা শুরু করে। হিজাজে এ ধারাই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ করে বনি কুরাইশ গোত্রে নবী আবির্ভূত হলে তারা সেদিকে দৃষ্টি দিল। আর নবীর প্রতি অনুসারীদের ভক্তি ও শ্রদ্ধা অবলোকন করে নিজেরাও নবী হয়ে গৌরাবান্বিত হতে চাইল। তাছাড়া এমনিতেই হিজাজের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠী, তাদের গোত্রগত কৌলিণ্য ও সম্মানকে বিশেষ মর্যাদায় দেখত। আর সূচতুর ঐসব জাদুকর ও সূতসায়ারগণ একেই মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে কাজে লাগায় এবং নবী মুহম্মদের মৃত্যুর কাছাকাছি সময়কালটাকে উপযুক্ত বিবেচনা করে তারা নব্যূয়ত প্রাপ্তির দাবী করে বসে। ফলে প্রায় প্রতিটি গোত্র থেকেই একের পর এক তথাকথিত নবীর আগমন ঘটতে থাকে।


৯বম হিজরীর শেষ দিকে নবীজী শাসনকর্তাগণ ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গকে ইসলাম গ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়ে চারিদিকে দূত প্রেরণ করেছিলেন। এমনিভাবে মুসাইলিমার কাছেও দূত পৌঁছেছিল। এতে বনু হানাফি গোত্রের একপ্রতিনিধি দলের সাথে সে মদিনায় আগমন করে এবং অবস্থান করে কাইস্যা কাননে, যা ছিল আল-হারিছের অবকাশকালীন গৃহ। এই আল-হারিছ ছিল মদিনার সম্ভান্ত ইহুদি গোত্র বনু নাজ্জারের বংশোদ্ভূত একজন আনসার। তার কন্যা কাইস্যা বিনতে আল-হারিছের সাথে মুসাইলিমার বিবাহ হয়েছিল। আর সে ছিল কাইস্যার ২য় স্বামী।


পরদিন সকালে প্রতিনিধিদল নবীজীর সঙ্গে সাক্ষাত করে এবং তার সঙ্গে কথাবার্তা বলার পর তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনার করে ইসলাম গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারপর যখন তারা ইসলাম গ্রহণ করে,নবীজী তার রীতি অনুসারে তাদের প্রত্যেকে উপহার প্রদান করেন। ঐসময় তাদের একজন জানায় যে, তাদের এক সাথী ক্যাম্পে রয়ে গেছে তাদের বাহন উটগুলো দেখাশোনার কাজে। তখন নবীজী বলেছিলেন, “সে তার সঙ্গীদের মাল-সামানা দেখাশোনার কাজে পেছনে থেকে যাওয়া কর্তব্য জ্ঞান করেছে বলে তার মর্যাদা তোমাদের কারো থেকে কোন অংশে কম নয়।” তিনি তার জন্যেও উপহার দিলেন।


ক্যাম্পে ফিরে তারা মুসাইলিমাকে তার উপাহার দিয়ে বলে যে, সে তাদের সাথে থেকে ইসলাম গ্রহণ করতে না পারলেও তাদেরই একজন হিসেবে তাকে গণ্য করা হয়েছে। এ কথা শুনে সে তখনই নিজেকে মুসলমান হিসেবে ঘোষণা দেয়। তারপর তারা ইয়ামামায় ফিরে গিয়ে নিজেদের গোত্রকে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসে এবং সেখানে একটা মসজিদ নির্মাণ করে প্রত্যাহিক নামাজ কায়েম করে।


মদিনাতে গিয়ে মুসাইলিমা নবীজীর প্রতি তার শিষ্যদের সমীহ এবং তার উচ্চ মর্যাদা ও সম্মান লক্ষ্য করে নিজেও নবী হবার জন্যে অনুপ্রাণিত হয়। আল-জাহেয বলেন, নব্যূয়ত দাবী করার পূর্বে, জ্যেতিষশাস্ত্র, মায়াবিদ্যা ও জাদু শেখার জন্যে সে আরব ভূমি [ধর আল-আরব] ও পারস্যের [অাল-অাযিম] মধ্যবর্তী সকল বাণিজ্যিক শহরগুলো ভ্রমন করে এবং তারপর নিজ গোত্রে ফিরে এসে নব্যূয়ত দাবী করে বসে। 


ইবনে কাছিরও তার সিরাত গ্রন্থে মুসাইলিমার জাদু প্রদর্শনীতে পারদর্শীতার কথা উল্লেখ করেছেন। তার কথায়- মুসাইলিমা তার জাদু দিয়ে সমবেত জনতাকে বিষ্ময়াভূত করতে পারত। অার সে তার এই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়েই মানুষকে নিজ বলয়ে ধরে রাখত। তাছাড়া তার পোষাক পরিচ্ছদও ছিল পূণ্যবাণ ব্যক্তি ও নবীগণের অনুরূপ। ফলে মানুষ সহজেই তার ক্ষমতাকে ঐশ্বরিক দান বলে বিশ্বাস করতে প্ররোচিত হত।


মুসাইলিমার বেশকিছু জাদুকার্য সিরা লেখকরা লিপিবদ্ধ করেছে, যেমন,- সে খুর সহজেই একটা আস্ত ডিম বোতলে ভরে ফেলতে পারত; একটা পাখির সব পালক ছাড়িয়ে ফেলে তা আবার লাগিয়ে দিতে পারত যাতে সে আবার উড়তে পারে,ইত্যাদি। ফলে তার জাদুকে অলৌকিক ভেবে কিছু অজ্ঞলোক তার চারপাশে জড় হয়। আর সে তার তাদেরকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয় যে, দয়াময় খোদার কাছ থেকে, ফেরেস্তা জিব্রাইলের মাধ্যমে তার কাছে ওহী নাযিল হয়। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, সে নবী মুহম্মদের নব্যূয়ত অস্বীকার করেনি, বরং দাবী করে যে, তাকে তার সাথে নব্যূয়ত শেয়ার [ভাগাভাগি] করে, তার সহযোগী হিসেবে পাঠানো হয়েছে।


ইবনে কাছির বলেন, মুসাইলিমা তার কাছে আগত কথিত ওহীগুলো এমনভাবে উপস্থাপন করত যেন তা ঐশীবাণী। আর লোকদেরকে বলত যে, মুহম্মদ তার সাথে ক্ষমতা ভাগ করে নিয়েছেন। এমনকি সে নিজেকে রহমান হিসেবে পরিচয় দিত অর্থাৎ ঐশ্বরিক কিছু গুণের সঙ্গে সে নিজেকে যুক্ত করে নিয়েছিল। এতে তার গোত্রের অনেকে যারা ইতিপূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছিল, নবী মুহম্মদের পাশাপাশি তাকেও তারা নবী হিসেবে স্বীকার করে নিল।


ধীরে ধীরে মুসাইলিমার প্রভাব এবং ক্ষমতা তার গোত্র মাঝে বৃদ্ধি পেল। লোকেরা তাকে “রহমান আল-ইয়ামামা” বলতে শুরু করল। আরো কিছুকাল পরে, পুরো গোত্র তার সাথে একাত্ম হল। তারপর সে তার গোত্রের একদল বীর যোদ্ধার সাথে মদিনায় এল এবং কাইস্যা কাননে অবস্থান করল।


আগত হানাফিগণ অত:পর নবীজীর সাথে সাক্ষাৎ করে তার কাছে প্রস্তাব রাখেন মুসাইলিমাকে নবী হিসেবে স্বীকৃতি দেবার ও আরবের উপর তার সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে নেবার। এমন অযৌক্তিক দাবীর কথা শুনে নবীজী তার হতে ধরা শুকনো একটা খেজুর শাখার প্রতি ইঙ্গিত করে এমন কি তার একটি আঁশ পর্য়ন্ত তাকে দিতে অস্বীকার করেন। 


পরদিন সকালে প্রতিনিধিগণ আবারো নবীজীর সাথে সাক্ষাৎ করার প্রস্তুতি নিল। ঐ সময় মুসাইলিমা ও তার স্ত্রী তাদের উটের পরিচর্যা করছিল। সে তাদেরকে বলল, “তাকে বোলও, যদি সে আমাকে তারপরে নব্যূয়তের উত্তরাধিকারীত্বে সম্মত হয়, তবে আমি তাকে অনুসরণ করব।”


তারপর ঐ প্রতিনিধিদল যখন মসজিদ উন নব্বীতে পৌঁছিল, তখন নবীজী সাবেত বিন কায়েসকে সঙ্গে নিয়ে তাদের সাথে দেখা করতে এলেন। তার হাতে গতদিনের সেই মরা খেজুর ডালটাও ছিল। প্রতিনিধিরা তখন তার কাছে সংশোধিত প্রস্তাবটি রাখে। তখন নবীজী তাদেরকে বিগত রাতে দেখা একটা স্বপ্নের কথা বলেন। তিনি স্বপ্নে দেখেন, তিনি দু’টি স্বর্ণের ব্রেসলেট পরে অাছেন যা তাকে অস্বস্তি দিচ্ছিল। তখন তাকে বলা হল সেগুলোকে গুড়িয়ে দূর করে দিতে এবং তিনি যখন তা করলেন, তখন তা অদৃশ্য হয়ে গেল। তিনি ঐ ব্রেসলেট দু’টোর অর্থ করেন দু’জন মিথ্যেবাদী-মুসাইলিমা ও আসওয়াদের প্রতিরূপ হিসেবে। 


“সুতরাং,” তিনি বললেন, “সে ফিরে যাবার পর ধ্বংস হবে। আমি তোমাদেরকে কেবল তাই বলেছি যা আমাকে তার সম্পর্কে দেখান হয়েছে। এ ছাড়া এখানে সাবেত বিন কায়েস রয়েছে, সে তোমাদের প্রশ্নের উত্তর দেবে।” তিনি চলে গেলেন।


১১ হিজরীর মুহররম মাসে ইয়ামামা থেকে আগত দু’জন লোককে মদিনায় দেখা গেল, যারা নবীজীর জন্য একটি পত্র নিয়ে এসেছে মুসাইলিমার কাছ থেকে। নবীজীর সেক্রেটারীদের একজন পত্রটি খুলে নবীজীর সামনে তা পাঠ করলেন। তাতে লেখা ছিল-


“আল্লাহর রসূল মুসাইলিমা হতে আল্লাহর রসূল মুহম্মদের প্রতি-

আসসালামু আলায়কুম!
আমি আপনার অংশীদার; ক্ষমতা আমাদের মধ্যে অবশ্যই ভাগ করতে হবে। পৃথিবীর অর্ধেক আমার, বাকী অর্ধেক আপনার কুরাইশদের। কিন্তু কুরাইশরা লোভী জাতি-তাদের মধ্যে ন্যায়বিচার নেই।’

নবীজী এই চিঠির বিষয়বস্তু জানতে পেরে দূতদ্বয়ের দিকে ফিরে মুসাইলিমার সম্পর্কে তাদের কি বক্তব্য তা জানতে চাইলে, তারা উত্তরে বলল যে, তাদেরও ঐ একই বক্তব্য যা মুসাইলিমার। তখন নবীজী বলেন, “যদি তোমরা দূত ও বার্তাবাহক না হতে তবে আমি তোমাদেরকে মৃত্যুদন্ডের আদেশ দিতাম।” তিনি আরও বলেছিলেন, “যখন তোমরা ইসলাম গ্রহণ করেছ এবং আমার নব্যূয়ত সম্পর্কেও অবহিত, তখন কেন তোমরা এমন একজন মাথামোটাকে অনুসরণ করতে গেলে পবিত্র ধর্ম ইসলাম পরিত্যাগ করে?”


নবীজী মূলত: মুসাইলিমার নব্যূয়তে অংশীদারিত্ব অথবা তারপরে উত্তরাধিকারিত্বের দাবী প্রত্যাখ্যান করেন। তবে তিনি তার সেক্রেটারীকে ডেকে পত্রের একটি সযত্ন প্রতিউত্তরের নির্দেশনা দেন। 


“পরমদাতা ও দয়ালু আল্লাহর নামে-

আল্লাহর রসূল মুহম্মদ থেকে মিথ্যবাদী মুসাইলিমার প্রতি-
‘যারা সত্যপথের অনুসারী তাদের প্রতি সালাম। পৃথিবী আল্লাহর, তিনি যার প্রতি সদয় হন তাকেই দুনিয়ার কর্তৃত্ব দান করেন। কেবল পরহিজগারদের জন্যেই পরকাল (শুধু তারাই সুফল লাভ করবে, যারা আল্লাহকে ভয় করবে)।’

(মোহর):

রসূল আল্লাহ।” -(অাল-তাবারী)

এই চিঠিতে নবীজী মুসাইলিমাকে মিথ্যাবাদী হিসেবে সম্বোধন করেছেন। আর তখন থেকে মুসলমানগণ তাকে মুসাইলিমা আল-কাজ্জাব বা মিথ্যবাদী মুসাইলিমা বলে সম্বোধন করে আসছে।


এদিকে পত্র নিয়ে নবীজীর দূতদ্বয় ইয়ামামায় পৌঁছিলে মুসাইলিমার লোকেরা তাদেরকে বন্দী করে তার সামনে হাজির করে। ‍অার সে প্রচলিত রীতির বিপরীতে তাদের সাথে কুকুরের মত ব্যবহার করে এবং তাদেরকে তরবারীর নীচে রাখে। তারপর সে তাদের কাছে- সেও মুহম্মদের মত একজন নবী, তার স্বীকারোক্তি দাবী করে। তখন তাদের একজন ঐ স্বীকারোক্তি দিয়ে দিল যখন তার গর্দানে চেপে থাকা তরবারী চামড়া ভেদ করে মাংসের গভীরে প্রবেশ করছিল। আর তাতে সে তার জীবন রক্ষা করতে পারে বটে, তবে অপরজন স্বীকারোক্তি দিতে অস্বীকার করে বসে। এতে মুসাইলিমা তার হাত ও পা প্রতিটি গিঁট থেকে কেটে একে একে বিছিন্ন করে। প্রতিবার অঙ্গ কাটার সে তার কাছে স্বীকারোক্তি দাবী করে, আর সেও তা অস্বীকার করে যায়, যতক্ষণ না তার মৃত্যু হয়। তবে দূত হত্যার অপরাধেও নবীজী মুসাইলিমার বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি সম্ভবত: ঐ সপ্নের কারণে যা আমরা ইতিমধ্যে উপরে উল্লেখ করেছি।


মুসাইলিমার শিক্ষার প্রায় সবই হারিয়ে গেছে। ইবনে কাছির বলেন: সে ঐশীবাণী প্রাপ্তির দাবী করেছিল আলৌকক কাজ ও রোগ নিরাময় করার কাজে। সে নামাজ বিলুপ্ত করেছিল এবং অবাধ যৌণাচার ও মদ্যপানের অনুমোদন দিয়েছিল। অন্যদিকে তাবারী উল্লেখ করেছেন: খৎনা করা,পুত্র সন্তান জীবিত অবস্থায় কোন নারীর সঙ্গে সহবাস করা সে নিষিদ্ধ করেছিল। আর অনুমোদন দিয়েছিল যে কোন দিক ফিরে দিনে তিনবার নামাজ আদায়ের এবং রাতের বেলা উপোসে রমজানের রোজা করার। তবে শুকরের মাংস ও মদ সে নিষিদ্ধ করেছিল।


It was interesting that Musaylimah also took to addressing gatherings as a messenger of Allah just like Muhammad, and would compose verses and offer them, as Qur'anic revelations. Musaylimah learned of Quranic verses and techniques through ar-Rajjàl bin 'Unfuwah, the renown warrior of the Banu Hanifah delegation to Muhammad who later apostasized,-(Baladhuri, p.132; Watt, Medina, p.134; Tabari, p.1932.) or a Qur'ànic teacher sent by Muhammad to the Banu Hanifah who did the same.-(Tabari, pp.1932, 1941; ad-Diyarbakri, p.175; Baladhuri, p.133. Cf. Tabarr, Chronique, pp. 294-297). However, most of his verses extolled the superiority of his tribe, the Banu Hanifa, over the Quraish.


The death of the prophet Muhammad raised the hopes of the community of Musaylimah. In one of the speeches said to have been delivered in that period and which was directed to the Banu Hanifa, Musaylimah stressed the qualities of his people and his land in comparison with Quraish and Mecca:


'What made Quraish more deserving of prophethood than yourselves? They are not greater in number than you; your land is wider than their land. Gabriel descends from heaven like he used to descend to Muhammad.'


Musaylimah claimed that the revelation transmitted to Muhammad had ceased with his death and henceforth it would be transmitted to him alone. The feeling that he was now the sole prophet is expressed in a verse attributed to Musaylimah:


O you, woman, take the tambourine and play, and disseminate the virtues of this prophet! Passed away the prophet of Bani Hashim, and rose up the prophet of Bani Ya'rub. -(Ibn Kathir, Bidhya, vi, 341).


মুসাইলিমার সম্মান ও মর্যাদা এবং তার অনুসারীর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেল। আর এতে ইয়ামামাবাসীরাও অনুপ্রাণিত হল, তারা মানষিকভাবে নিরাপত্তা ও শান্তি অনুভব করল। কিন্তু এই অনুভূতিতে আঘাত এল পূর্ববর্তী একজন সূতসায়ারের আগমনে, যে দাবী করল তাকেও নব্যূয়ত দান করা হয়েছে। তার নাম সাজাহ বিনতে আল-হারিছ। সে ছিল তামিম গোত্রের একজন খৃষ্টান, কিন্তু বাস করত বনু তাগলিবের খৃষ্টান আরবদের মধ্যে।


ইসলাম গ্রহণ করা বা না করা ব্যক্তির নিজস্ব ব্যাপার। কিন্তু একবার স্বইচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করে কেউ তা পরিবর্তণ করতে পারে না। কারণ, এ ধর্ম সত্যের। সুতরাং ইসলাম পরিত্যাগ অর্থ সত্যের উপর অপবাদ আরোপ এবং সত্যকে অস্বীকার করার শামিল, যা মানবতার বিরূদ্ধে অপরাধ হিসেবে গণ্য। কারণ তা একদিকে যেমন আল্লাহ ও তাঁর রসূলের উপর মিথ্যে আরোপ করে, তেমনি অন্যদিকে নব্য মুসলমান ও অন্য ধর্মাবলম্বী ব্যক্তিবর্গের সম্মুখে খোদায়ী ধর্মের মর্যাদা ও মাহত্ম্যকে ভূ-লুন্ঠিত করে, এতে সত্য ধর্মের প্রতি আগ্রহী একদল মানুষ নিরুৎসাহিত হয়, যা তাদের পরকালীন জীবনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হবে।


মুসাইলিমা ও তার গোত্রীয় লোকেরা ইসলাম সম্পর্কে পূর্ণ অবগতির পর স্ব-ইচ্ছায় তারা মুসলমান হয়েছিল, অত:পর তারা তার মিথ্যে নব্যূয়তের দাবী (যেহেতু কোরআন নব্যূয়তের ধারা সমাপ্তি ঘোষণা করেছিল।) দ্বারা প্রতারিত হয়ে পরকালীন জীবনে এক অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে গেল। প্রকৃত মুসলমান কাউকে সত্য গ্রহণ করার পর তাকে সত্যের খেলাপ ও সত্যের অপলাপ করতে দিতে পারে না। এদেরকে দমন ও কঠোর শাস্তির আওতায় আনা অপরিহার্য্য ছিল।


খেলাফত লাভের পর আবু বকর যখন সাহাবাদের সাথে এই বিষয়ে পরামর্শ করলেন, তখন কেউই প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণে সম্মতি দেয়নি। তখন আবু বকর তাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘যারা মুসলমান হবার পর, রসূল প্রদত্ত নির্দেশ ও ইসলামকে অস্বীকার করে, তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করা আমার কর্তব্য। যদি আমার বিপক্ষে সব জ্বিণ, মানব ও বিশ্বের যাবতীয় বৃক্ষ-প্রস্তর একত্রিত করে আনা হয় এবং আমার সাথে কেউই না থাকে, তবুও আমি একাই ধর্মের জন্যে এই যুদ্ধ চালিয়ে যাব।’- এই বক্তব্যের পর সাহাবারা এগিয়ে আসে এবং তাকে এক জায়গায় বসিয়ে রেখে বিভিন্ন রণাঙ্গনে সেনাবাহিনী প্রেরণের জন্যে মানচিত্র তৈরী করে ফেলে।


ইবনে কাছির বলেন, মুসাইলিমা ও তুলাইহা নব্যূয়ত প্রাপ্তির দাবী করেছে জানতে পেরে সাজাহ বিনতে আল-হারিছ নাম্নী এক খৃষ্টান নারীও নব্যূয়ত প্রাপ্তির দাবী করে বসে। এ ছিল সেই সময়, যখন খলিফা আবু বকর ধর্মত্যাগীদের দমনে হিজাজের উদ্দেশ্যে মুসলিম বাহিনীকে কয়েকটি গ্রুপে ভাগ করে প্রেরণ করেছেন। সাজাহ এই সংবাদ অবহিত হয়ে মদিনার বিরুদ্ধে অভিযানের সিদ্ধান্ত নেয় এবং ঐ উদ্দেশ্যে সে তার গোত্রের চার হাজার যোদ্ধাকে একত্রিত করে। তবে মদিনার বিরুদ্ধে অারো অনেকেই তার সাথে যাবার জন্যে ইচ্ছুক ছিল। কিন্তু সে তার ঐ পরিকল্পণা বাতিল করে, যখন জানতে পারে, খালিদ তুলাইহা আল-আসাদীকে পরাজিত করেছে। তখন সে খালিদের থ্রেট মোকাবেলায় মুসাইলিমার সহযোগিতা লাভে ইয়ামামার দিকে অগ্রসর হয়।


তাবারী বলেন, সাজাহর আগমনে মুসাইলিমা একটা শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্যে তাকে আমন্ত্রণ জানায়। সে তাকে তার নব্যূয়তের অংশীদার হিসেবে চিনতে পারে এবং ঘোষণা দেয় যে খোদা কর্তৃক কুরাইশকদেরকে বন্দোবস্ত দেয়া ভূমি সাজাহ ও তার লোকদের জন্যে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং অপর অর্ধাংশ মুসাইলিমার। এছাড়াও সে সাজাহকে ঐ বছর ইয়ামামায় উৎপন্ন শস্য নেবার অনুমতি এবং পরের বছর উৎপাদিত ফসল দেবারও প্রতিশ্রুতি দেয়।


প্রাথমিকভাবে মুসাইলিমার সাথে একটা সমঝোতায় উপনীত হয় সাজাহ। তারপর এক আনন্দঘন মুহুর্তে সে তার সম্পর্কে জানতে চায় এবং তার নিকট অবতীর্ণ আয়াতের কিছুটা শোনাতে অনুরোধ করে। তখন সে নরম সূরে ও হৃদয়স্পর্শী কন্ঠে আবৃত্তি করে এ শ্লোক-


"God has been gracious to the pregnant woman; 

He has brought forth from her a living being
that can move from her very midst." -(Ibn Ishaq: P 636-37; Tabari: pp. 1737-38).

মুসাইলিমার এ আয়াত শোনার পর সাজাহ বলে, "All speech-act that had its origin in the unseen powers, all speech-act- that was not a daily mundane use of words, but had something to do with the unseen powers, such as cursing, blessing, divination, incantation, inspiration, and revelation, had to be couched in this form".


মুসাইলিমা তাকে বলে, খোদা তার কাছে প্রকাশ করেছেন যে, জীবনে একজন স্ত্রীলোকের স্থান কেবল শয্যায়। সে আবৃত্তি করে-


"God created women with a wide-open cleft,

And made men as partners for her;
Then we penetrate the clitoris,
And she bears children for us." -(Tabari, pp. 1917-1918).

সাজাহ মুসাইলিমাকে নবী হিসেবে স্বীকার করে, তখন সে বলে: “আমাকে বিবাহ করবে? তাহলে তোমার ও আমার লোকদের নিয়ে আমি সারা আরব জয় করে নেব।” 
পরে তারা দু’জনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়।


অাল-ইয়ামামা
কয়েকদিনপর সাজাহ জাজিরাতে ফিরে যায় [কারো কারো মতে তিনদিন]। কেননা সে তার গোত্রের লোকদের ছেড়ে থাকতে ইচ্ছুক ছিল না।

মুসাইলিমার উত্থানশক্তি সম্পর্কে আবুবকর ওয়াকিবহাল ছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে যুদ্ধে মুসলিম সেনাপতি মনোনীত করেন খালিদ বিন ওয়ালিদকে। তুলাইহাকে পরাজিত করার পর খালিদ খলিফার ঐ আদেশ পান। তখন তিনি তার বাহিনী নিয়ে ইয়ামাম্রার দিকে অগ্রসর হন। যাত্রাপথে তিনি খলিফার অপর এক পত্র মারফত বনু হানাফির যুদ্ধশক্তি, তাদের দক্ষতা ও দু:সাহসের বিষয়ে সম্যক অবহিত হন।

মুসাইলিমার চরেরা খালিদের অগ্রযাত্রার কথা তাকে অবহিত করে। বোথা থেকে ইয়ামামার যাত্রাপথ ওয়াদি হানিফার মধ্যদিয়ে এসেছে এবং জুবাইলার পিছনে এই ওয়াদির উত্তর তীর, আকরাবার বিস্তীর্ণ সমতলভূমি যা আকরাবা থেকে ইয়ামামা এবং আরো দক্ষিণ-পূর্বের বিস্তৃত উর্বর এলাকার বহি:স্থ সীমানা চিহ্নিত করেছে। মুসাইলিমার ইচ্ছে ছিল না তার লোকদের গ্রাম ও শহরগুলো মুসলিম বাহিনী তছনছ করে দিক। এ কারণে সে তার বাহিনী নিয়ে ইয়মামার ২৫ মাইল উত্তর-পশ্চিমে জুবাইলার দিকে অগ্রসর হল এবং জুবাইলার নিকটবর্তীতে, যেখান থেকে আকরাবার সমতলভূমির শুরু সেই স্থানে ছাউনি ফেলল। এই স্থানে ছা্‌উনি ফেলে সে কেবল তার উর্বর আবাদি ফসলী ক্ষেতই রক্ষা করল না বরং অগ্রগামী খালিদের যাত্রাপথও বিপদসংকূল করে দেয়, যাতে খালিদ বাধ্য হন ওয়াদির মধ্যদিয়ে আগমনে, আর তাতে তার বাম উইং থাকবে বনু হানাফির আক্রমণভাগে।


ইয়ামামা থেকে যথেষ্ট দূরে থাকতেই খালিদের চরেরা সংবাদ নিয়ে এল যে, মুসাইলিমা আকরাবার সমতলভূমিতে, ওয়াদি হানিফার উত্তর তীরে ছাউনি ফেলেছে, যার মধ্যদিয়ে ইয়ামামার দিকে যাত্রাপথটি চলে গেছে। খালিদ তখন তার বাহিনী নিয়ে উপত্যাকার মধ্যদিয়ে শত্রুবাহিনীর দিকে অগ্রসর হলেন না। আকরাবার কয়েক মাইল পশ্চিমে তিনি রাস্তা পরিত্যাগ করলেন এবং দক্ষিণ দিক থেকে ঘুরে ওয়াদির মাইল খানেক দক্ষিণে এবং জুবাইলার শহরের বিপরীতে, এক উচ্চভূমিতে উপস্থিত হলেন। ঐ উচ্চভুমি থেকে আকরাবার পুরো সমতলভূমি এবং সামনের সীমানা যা বনু হানিফার বসতি বিস্তৃত করেছে, তার সবকিছুই খালিদের দৃষ্টিতে চলে এল। খালিদ ঐ উচ্চভূমিতে ছাউনি ফেললেন।

ওয়াদি হানিফার উপত্যাকা সীমানা নির্ধারণ করেছিল সম্মুখ যুদ্ধের ক্ষেত্র। উত্তর দিকের তীরটি প্রায় ১০০ ফুট উঁচু হয়েছে, কোথাও ঢালু, কোথাও খাড়ির মত। দক্ষিণ দিকটি প্রায় ২০০ ফুট উচু থেকে ধীরে ধীরে ঢালু হয়ে নেমেছে। মুসলিম যোদ্ধারা ছাউনি ফেলেছে উপত্যাকার প্রায় মাইল খানেক দূরে। দক্ষিণ তীরে বূহ্য রচনা করে দাঁড়িয়েছে মুসাইলিমা তার বাহিনী নিয়ে, তাদের পিছনে রয়েছে আকরাবার বিস্তৃত সমতলভূমি। আর ঐ সমতলভুমিতে, ওয়াদি থেকে মাইল দুয়েক দূরে রয়েছে সুউচ্চ প্রচীর ঘেরা বাগান, যা আবাজ নামে পরিচিত মুসাইলিমার পবিত্র হারাম। আকরাবার যুদ্ধের পর এটা পরিচিত হয় মউত উদ্যান নামে।

বনু হানিফার অবস্থান

শীতকালে, ৬৩২ সনের ডিসেম্বরের ৩য় সপ্তাহ, ১১ হিজরী শাওয়ালের শুরুর দিকের এক প্রভাতে ইয়ামামার যুদ্ধ শুরু হয়। ফজরের নামাজ শেষে যুদ্ধের জন্য দু’দল মুখোমুখি হল। মুসাইলিমার যোদ্ধা ছিল ৪০ হাজার। সে তার বাহিনীকে বিন্যাস করল- মধ্যভাগ এবং বাম ও ডানে দু’টো উইং। বাম উইং এর কমান্ডে ছিল রাজ্জাল, ডান উইংএ মুহাকিম বিন তোফায়েল এবং মধ্যভাগ সে তার নিজের কমান্ডে রেখেছিল। অন্যদিকে খালিদের নেতৃত্বে মুসলিম মুজাহিদ ছিল ১৩ হাজার। খালিদ তাদেরকে ওয়াদি হানিফার দক্ষিণ তীরে মুসাইলিমার অনুরূপ- একটা মধ্যভাগ ও দু’টো উইং-এ বিন্যাস্ত করেন। বাম উইং এর নেতৃত্বে ছিলেন আবু হুদাফা এবং ডান উইং এ জায়েদ, ওমরের জৈষ্ঠ্য ভ্রাতা। আর মধ্যবর্তী অংশ ছিল সরাসরি খালিদের অধীন।

মুসাইলিমার সেনাবাহিনী তিনগুণ বেশী হলেও খালিদ যুদ্ধ জয়ের ব্যাপারে পুরো আশাবাদী ছিলেন, কারণ তিনি নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তাদের, যারা ছিল “সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় জীবন দানকারীর স্বর্গপ্রাপ্তি সুনিশ্চিত” -খোদায়ী এই প্রতিজ্ঞায় পূর্ণ বিশ্বাসী। তবে বনু হানিফাদের দক্ষতা ও দু:সাহস এ যুদ্ধকে রক্তক্ষয়ী ও কষ্টার্জিত করবে তাতেও তিনি সন্দিহান ছিলেন না। কারণ ইতিমধ্যে আবু বকর তাকে এ ব্যাপারে সতর্ক করেছেন পত্র মারফত। যাহোক, খালিদের নির্দেশ পেয়ে মুসলিম মুজাহিদগণ ওয়াদির উত্তর তীরের দিকে ছুটে গেল, যেখানে মুসাইলিমা তার যোদ্ধাদের নিয়ে বূহ্য রচনা করে অপেক্ষায় ছিল খালিদের আক্রমণ প্রতিহত করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে।

পাথুরে দেয়ালের মত করে মুসাইলিমার যোদ্ধারা দাঁড়িয়েছিল। তাদের অনেকে মুসলিমদের আক্রমনে নিহত হল বটে, তবে তাদের সম্মুখভাগ তারা ভেদ করতে পারল না। The apostates fought fanatically, preferring death to giving up an inch of ground; and the Muslims realised with some surprise that they were making no headway. After the Muslims hard slogging to penetrate his wings, Musaylimah, realising that if he remained on the defensive much longer the chances of a Muslim break-through would increase, ordered a general counter-attack all along the front. The apostates moved forward like a vast tidal wave, and the Muslims now found to their horror that they were being pressed back. 

The Muslims proceeded to fall back steadily. Then the pace of withdrawal became faster. The apostate assaults became bolder. And the Muslim withdrawal turned into a confused retreat. Some regiments turned and fled, others soon followed their example. The officers were unable to stop the retreat and were swept back with the tide of their men. The Muslim army passed through its camp and stopped at a distance.

রিদ্দা-আকরাবার যুদ্ধ।
মুসলিম যোদ্ধারা আকরাবার সমতলভূমি পরিত্যাগ করতে শুরু করলে ধর্মত্যাগীরা তাদেরকে ধাওয়া করল উন্মত্তের মত। এ তাদের কোন পরিকল্পণার মধ্যে ছিল না, বরং তা ছিল সহজাত প্রতিক্রিয়া। তারা মুসলিমদের ক্যাম্পে থামল এবং তা তছনছ করে ফেলল। যদ্ধ জয়-পরাজয়ের মাঝে স্থির হয়েছিল এবং বিজয়ের কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। বরং দৃশ্যত: মুসলিমদের পশ্চাৎপসারণ পরাজয়ের নামান্তর ছিল।

খালিদ এখন পরিস্কার বুঝতে পারলেন ধর্মত্যাগীরা তাদের ভন্ড নবীর উপর বিশ্বাস একটুও হারায়নি।সুতরাং হতাহতের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার একমাত্র উপায় হল মুসাইলিমার মৃত্যু, যা তাদের মনোবলকে দমিয়ে দেবে। কিন্তু সে তার বিশ্বস্ত অনুসারীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত অবস্থায় নিরাপদে রয়েছে। তাকে হত্যা করতে হলে তাকে তার নিরাপদ অবস্থান থেকে বের করে আনা দরকার।

তখন খালিদ মুসাইলিমাকে আলোচনার প্রস্তাব দিলেন এবং তাতে সে রাজী হল। তারপর খালিদ যখন তার কাছাকাছি চলে এলেন, সে সতর্কতার সাথে সম্মুখে পা বাড়াল এবং খালিদের থেকে দ্বৈত লড়ার দূরত্বের ঠিক বাইরে গিয়ে থামল। তখন খালিদ তার কাছে জানতে চাইল- “যদি আমরা শর্তে আসতে চাই, কি শর্ত তুমি গ্রহণ করবে?”

Musaylimah cocked his head to one side as if listening to some invisible person who stood beside him and would talk to him. It was in this manner that he 'received revelations'! Seeing him thus reminded Khalid of the words of the Holy Prophet, who had said that Musaylimah was never alone, that he always had Satan beside him, that he never disobeyed Satan, and that when worked up he foamed at the mouth. Satan forbade Musaylimah to agree to terms, and then he turned his face to Khalid and shook his head.

Khalid already determined to kill Musaylimah. The talks were only bait to draw him close enough.He would have to work fast before Musaylimah withdrew to the safety of his guards. Khalid asked another question. Again Musaylimah turned his head to one side, intently listening to 'the voice.' At that instant Khalid sprang at him. Khalid was fast. but Musaylimah was faster. In a flash he had turned on his heels and was gone!

Musaylima was safe once again in the arms of his guards. But in that moment of flight something meaningful happened to the spirit of the two armies, depressing one and exalting the other. The flight of their 'prophet' and commander from Khalid was a disgraceful sight in the eyes of the apostates,To exploit the psychological opportunity which now presented itself, Khalid ordered an immediate renewal of the offensive. The spirits of the Muslims rose as they redoubled their efforts. Then the infidel front broke into pieces the commander of his right wing, Muhakim, who came to the rescue of the apostates."Banu Hanifa!" he shouted. "The garden! The garden! Enter the garden and I shall protect your rear."

মুসাইলিমার যোদ্ধাদের এক বড় অংশ ভেঙ্গে পড়ল এবং তারা বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে চারিদিক দিয়ে পালিয়ে গেল। কেবল তার এক চতুর্থাংশ যোদ্ধা রয়ে গেল যুদ্ধক্ষেত্রে এবং তারা নিজেদেরকে নিরাপদ করতে দেয়াল ঘেরা বাগানের দিকে সরে যেতে লাগল। আর ঐ সময় ছোট একটা দল নিয়ে মুহাকিম পেছন থেকে তাদেরকে নিরাপত্তা দিচ্ছিল। কিন্তু দূর্ভাগ্য তার, খলিফা পুত্র আব্দুর রহমানের নিক্ষিপ্ত তীর তাকে মৃত্যুর দূয়ারে পৌঁছে দিল।

সাত হাজারের কিছু বেশী অনুসারীসহ মুসাইলিমা তার পবিত্র হারামের অভ্যান্তরে আশ্রয় নিল। আর তারা প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দিয়ে সুউচ্চ প্রাচীরের দিকে তাকিয়ে নিজেদেরকে বিপদমুক্ত ও নিরাপদ ভাবল।

পড়ন্ত বিকাল। মুসলিম যোদ্ধাদের বড় অংশ এখন দেয়াল ঘেরা ঐ বাগানের কাছাকাছি সমবেত। তারা উদ্বিগ্ন দিনের অবশিষ্ট সময়টুকুর মধ্যে সুরক্ষিত ঐ বাগানের অভ্যান্তরে প্রবেশ করে বিজয়ের মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি টানা নিয়ে। কেননা বাগানের মধ্যে প্রবেশের কোন পথ এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। দেয়াল অপ্রবেশ্য বাঁধা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে আর তার প্রবেশ দ্বার ভেতর থেকে বন্ধ। অবরোধ ভাঙ্গার কোন সরঞ্জাম নেই, আবার সময়ও নেই তা তৈরী করে নেবার।

While Khalid searched his brain for ideas, an old warrior by the name of Baraa bin Malik, who stood in the group that confronted the gate, said to his comrades "Throw me over the wall into the garden." His comrades refused, for Baraa was a distinguished and much-respected Companion, and they hesitated to do something which would certainly result in his death. But Baraa insisted. At last his comrades agreed to his request and lifted him on their shoulders near the gate. He got his hands onto the edge of the wall, swung himself up and jumped into the garden. In a minute or so he had killed two or three infidels who stood between him and the gate, and before others could intercept him, he had loosened the heavy bolt. The gate was flung open and a flood of Muslims roared through it like water thundering through a breach in a dam. The last and most gory place of the Battle of Yamama had begun.

In the clashes with the Banu Hanifa, a division of the army that came from those Medinans who had assisted Muhammad in his emigration from Mecca (the Ansar) attacked Yamama and fought bravely together with the Meccans who had fled with Muhammad (the Muh'jirin). They were summoned to help out in dangerous situations in the bloody battle of 'Aqrab'.

At the outset, the Banu Hanifa succeeded in repulsing the Bedouin attacks. The solution of Khalid was to put the Bedouin fighters of the army behind the lines of the well motivated and steadfast warriors of the Emigrants (Muhajirin) and Helpers (Ansar).

When Khalid's siege was tightened and the eventual defeat of this pretender became evident some of Musaylimah's simple-minded follower asked him: "What has happened to the occult help and support which you had promised us?"

Musaylimah replied: "There is no news about occult law and help. It was a false promise which I gave you. However, it is incumbent upon you to defend your honour and greatness".However, defense of honour and greatness was of little avail!

This above sayings of Musaylimah shows that he was an eloquent speaker and it also shows that he is not at all the speaker of those insipid sentences, which history has attributed to him, as specimens of his contention with the Holy Qur'an.

মুসাইলিমা নিহত হয় দূর থেকে উড়ে আসা জ্যাভলিনে, যা তাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়ে মাটিতে তাকে গেঁথে ফেলেছিল। আর যখন সে প্রচন্ড যন্ত্রণায় দু’হাতে সেটি তুলে ফেলতে চেষ্টা করছিল, তখন আবু দো’জনা তার তরবারীর আঘাতে তার শির বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। কিন্তু সে মুসাইলিমার নিহত হবার খবর প্রচার করতে পারেনি। শির উঁচু করতেই তার গর্দান থেকে তা লাফিয়ে পড়ে মুসাইলিমার পাশে গিয়ে স্থান নেয়। কারো কারো মতে, ১১ হিজরী বা ৬৩২ সনে মুসাইলিমা যখন নিহত হন, ঐসময় তার বয়স ছিল ১৪০ বা ১৫০ বৎসর।

মুসাইলিমা নিহত হবার খবর ছড়িয়ে পড়লে যুদ্ধ আর প্রলম্বিত হয়নি। ঐসময় অনেকে হতাশা নিয়ে আত্মহত্যার মত সহিংসতায় লিপ্ত হয়। কিন্তু তারা কেবল তাদের যন্ত্রণা ও কষ্টই দীর্ঘায়িত করতে পারল, জীবন রক্ষা করতে পারল না। একসময় তাদের অধিকাংশ আক্রমণ বা আত্মরক্ষার প্রচেষ্টা থামিয়ে দিল এবং হতাশা নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল কোন মুসলিম যোদ্ধার তরবারীর আঘাত যা তাদেরকে হতাশার ঐ কষ্ট থেকে নিস্কৃতি দেবে। আর ঐ সময় সূৃর্য্য অস্ত গেল, শান্ত ও নিস্তব্ধতা নেমে এল ঐ মউত উদ্যানে।

মুসাইলিমার অনুসারীদের প্রগাঢ় বিশ্বস্ততার নানান গল্প কালের প্রবাহেও টিকে আছে। এক মহিলা তার মৃত্যুর কথা শুনে আর্তচিৎকার দিয়ে বলেছিল, “হায়, বিশ্বাসীদের নেতা!” এক আহত বনু হানাফি যোদ্ধা পাশে থাকা এক মুসলিম যোদ্ধাকে অনুরোধ করে তাকে হত্যা করতে যাতে সে তার কষ্ট থেকে মুক্তি পায়। তারপর যখন তাকে মুসাইলিমার নিহতের খবর জানান হল, সে মন্তব্য করল-“একজন নবীকে ধ্বংস করে দিল তার নিজের লোকেরা।” একথা শুনে ঐ মুসলিম যোদ্ধা তাকে এক “মরণ ঘা” দিয়ে পরপারে পাঠিয়ে দিল।

মুসাইলিমার অনুসারীর এক বহৎ অংশ নিহত হয় দেয়াল ঘেরা তার স্যাক্রেড হারামের অভ্যান্তরে ও তার বহি:স্থ প্রাঙ্গনে। স্থানটি পরবর্তিতে মউত উদ্যান “গার্ডেন অব ডেথ” হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এই যুদ্ধে মুসলিম যোদ্ধাদের অসীম সাহসিকতার অনেক নমুনা বিভিন্ন উৎসে দেখতে পাওয়া যায়। তবে মুসাইলিমার অনুসারীগণও যুদ্ধ করেছিল নির্ভিক চিত্তে। ফলে বিজয়ী হলেও মুসলমানদেরকে যথেষ্ট মূল্য দিতে হয়েছিল। যুদ্ধে আবু দো’জনা (যিনি ওহুদ যুদ্ধে মানববর্ম হয়ে নবীজীকে তীরের আঘাত থেকে রক্ষা করেছিলেন), আবু হুদাইফা (বাম উইং কমান্ডার), ওমরের ভ্রাতা জায়েদ (ডান উইং কমান্ডার) এবং চার’শ কোরআনে হাফেজসহ প্রায় ১,২০০ মুসলিম নিহত হয়। অন্যদিকে মুসাইলিমাসহ তার অনুসারীরা নিহত হয় ২১ হাজারের মত, যার ৭ হাজার নিহত হয়েছিল ওয়াদির উন্মুক্ত ময়দানে খালিদের ১ম ও ২য় আক্রমণে, ৭ হাজার মুসাইলিমার স্যাক্রেড হারামের অভ্যান্তরে এবং অবশিষ্টরা ছিল তারাই যারা মুসাইলিমা নিহত হবার পরও তার নবূয়্যত অস্বীকার করতে সম্মত হয়নি।

মুসাইলিমা নিহত হবার পর খালিদ নজদের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাসকারী বনু হানিফাদের বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর কাছে মুসলিম যোদ্ধাদের ছোট ছোট দল প্রেরণ করেন তাদের বশ্যতা আদায়ে, ইসলামের ছায়াতলে ফিরে আসার আহ্ববান জানিয়ে। আর প্রেরিত ঐ যোদ্ধা দল তাদের কাছে গিয়ে তাদের বিশ্বাস সম্পর্কে জানতে চায়। মূলত: তারা গোত্রের প্রতিটি সদস্যকে প্রশ্ন করেছিল- সে কার উপর বিশ্বাস করে? মুহম্মদের না মুসাইলিমার?

মুসাইলিমা নিহত এবং বনু হানাফিও তাদের গণ্যমান্য সকল নেতৃবর্গকে যুদ্ধে হারিয়েছিল, তথাপি তারা ছিল দূর্বিনীত কোন ব্যাতিক্রম ছাড়াই। তাদের কেউ অনুশোচনা করেনি, করতে রাজীও হয়নি।[কেবল কয়েকজন এমন অভিমত দিয়েছিল- “তোমাদের মধ্যেও একজন নবী থাকুক এবং আমাদের মধ্যেও একজনকে থাকতে দাও!”] ফলে তরবারীর নীচে দ্বি-খন্ডিত হল অবশিষ্ট প্রায় সাত হাজার হানাফি। তাদের কারো প্রতি কোন রকম দয়া প্রদর্শণ করা হয়নি। কেননা, অনুশোচনায় অস্বীকারকারী প্রত্যেক পূর্ণবয়স্ক পুরুষকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন খলিফা আবু বকর। -(বার্থহোল্ড, ৫০২-৫১১)

মুসাইলিমার নব্যূয়তে বিশ্বাস, তার বেঁচে থাকা শিষ্যদের মধ্যে ইসলামের প্রথম দশক পর্যন্ত টিকে ছিল। তারপর মুয়াবিয়া সাজাহকে জোরপূর্বক আরবভূমি থেকে উৎখাত করলে সে বসরার কূফাতে চলে গেল, ঐসময় মুসাইলিমার বেশকিছু অনুসারীও তাকে অনুসরণ করে এবং তাকে ঘিরে সেখানে বসতি করে। পরে তারা সেখানে একটা মসজিদও নির্মাণ করে নেয়। কূফায় বসবাস গড়ে তোলা মুসাইলিমার সকল অনুসারীরা বনু হানাফির ঐ মসজিদে সমবেত হত এবং প্রায়শ: ঐ মসজিদের মিনার থেকে- “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়া মুসাইলিমা রসূলুল্লাহ”- ধ্বনি শোনা যেত।

ইবনে মা’সুদ কূফার আমির থাকাকালে জানতে পারলেন যে, নবীজীর নিকট মুসাইলিমার পত্র নিয়ে দূত হিসেবে গমনকারী দু’জনের একজনকে কূফা নগরীতে পুন:রায় দেখা গেছে যে কি-না তখনও মুসাইলিমার নব্যূয়তের উপর বিশ্বাস রাখে। তখন আমির তাকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন। তারপর যখন তাকে তার সম্মুখে হাজির করা হল, তিনি তাকে শিরোচ্ছেদ করেন একথা বলে যে, মুসাইলিমার দূতের পরিচয় এখন আর তার নেই। তারপর তিনি মুসাইলিমার সকল অনুসারীকে হাজতে ভরার নির্দেশ দেন। কিছু পালিয়ে যায়, অার কিছু ধরা পড়ে জেলে যায়। পরবর্তীতে, যারা অনুশোচনা করে, তারা জেল থেকে মুক্তি পায়, আর যারা তাদের বিশ্বাস আঁকড়ে থাকে, তাদেরকে শিরোচ্ছেদ করা হয়। ঐ সময় সাজাহ ইসলাম গ্রহণ করে এবং আমৃত্যু তাতে বিশ্বাসী ছিল। 

সমাপ্ত।
সংশোধিত নয়।

উৎস:
এম জে, কিস্টার, মুসাইলিমা,
দালে এফ আইকেলমান, মুসাইলিমা,
ভি, বার্থহোল্ড, মুসাইলিমা,
এম, ওয়াট, মুসাইলিমা,
ভাক্কা, সাজদাহ,
সহিহ অাল বুখারী,
ইবনে কাছির, সিরাত রসূল আল্লাহ,
ইবনে ইসহাক, সিরাত রসূল আল্লাহ,
ইবনে কাছির, অাল-মিসবাহ আল-মুনির তাহজিব ওয়া তাহকিক তফসির,
ইবনে আবদ আল-বার আল-নামারী, আল-দুরার ফি ইখতিয়ূর আল মাঘজি ওয়াল সিয়ার,
আল-কালাই, অাল-ইকতিফা ফি মাঘাজি রসূল আল্লাহ ওয়াল সালাছা আল-খুলাফা,
আদ-দিয়ারবকরী, তারিখ আল-খামিস ফি আওয়াল আনফুস আন-নাফিস,
আল-নুয়াইরি, নিহোয়াত আল-আরব ফি ফুনিন আল-অাদাব,
ইয়াকুত বিন আব্দুল্লাহ অাল-হামায়ি, মুজাম অাল-বুলদান,
আল-তাবারী, তারিখ অাল-রসূল ওয়া অাল-মুলুক,
ইবনে সা’দ, কিতাব আল-তাবাকাত অাল কুবরা,
অাল-বায়হাকী, অাল-মাহাসিন ওয়াল মাসায়ি,
অাল-বায়হাকী, দালাইল অাল-নবু’ওয়া,
আল-বালাজুরি, কিতাব ফুতুহ অাল-বুলদান,
আল-কালবি, জামোরাত আল-নাসাব,
আল-মাকিরিজি, ইমতা আল-আসমা,
আল-সুহাইলি, রাউদ আল-উনুফ,
অাল-ওয়াকিদি, কিতাব আল-রিদ্দা,
ইসলামিক এনসাইক্লোপিডিয়া,
আল-ইসলাম ডট ওআরজি
উইকিপিডিয়া,
কোরআন।

১৭ জানুয়ারী, ২০১৬

Satan: ইসলামিক থিয়োলজিতে ভূমিকা।

বিশ্বজগৎ সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহ ফেরেস্তাদেরকে এবং মানব সৃষ্টির পূর্বে জ্বিণ জাতিকে সৃষ্টি করেন। মূলত:স্রষ্টা খোদা সর্বপ্রথম বিশেষ কিছু ফেরেস্তা সৃষ্টি করেন যারা অতি পুতপবিত্র, অতি মহৎ। তাদের একদল খোদার নির্দেশে লওহে মাহফুজে এক কিতাব লিপিবদ্ধের কাজ শুরু করে এবং অপরদল তার রক্ষণাবেক্ষণে নিয়েজিত হয়। আর লিখিত ঐ কিতাব অনুসারে লিপিকার ফেরেস্তাগণ পরপর মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে অস্তিত্বহীনতা থেকে অস্তিত্বে নিয়ে আসে মহাবিশ্বগুলোকে। এভাবে সৃষ্টি হয় সাতটি মহাবিশ্বের (সাত আসমান) একটার পর একটা।

তারপর যখন কিতাবে লিখিত খোদার নির্দেশমত মহাবিশ্বগুলো একের পর এক নিয়মিত হয়, [তবে, ডাইমেনশনালিটিজ, স্থান-কালের টপোলজি, পদার্থ ও শক্তির ধরণ বা physical laws ও physical constants, ইত্যাদি নিম্নতম মহাবিশ্ব তথা আমাদেরটি থেকে ভিন্ন হওয়াই স্বাভাবিক, কারণ বাকীগুলোতে কেবল Celestial Being এর বসবাস।] তখন সেগুলোতে খোদা তাঁর নির্দেশ কার্যকরী করতে আপরাপর ফেরেস্তাকূল সৃষ্টি করেন। তারপর সর্বনিম্ন বা আমাদের মহাবিশ্বের সৌরজগৎগুলোর, প্রাণসৃষ্টির উপযোগী গ্রহগুলোতে খোদার নির্দেশ বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে সংশ্লিষ্ট ফেরেস্তাগণ। 


আর যখন আমাদের সৌরজগতের পৃথিবী নামক গ্রহে পানি সৃষ্টি হল, তখন সেই পানি থেকে বের করে আনা হল প্রাণ। অত:পর সেখানে বিবর্তণের মাধ্যমে সৃষ্টি করা হল প্রয়োজনীয় (প্রয়োজনীয় বললাম একারণে যে, যতধরণের সৃষ্টি করা যেত, তার সব করা হয় নি। যেমন- সবকিছু মজুদ আছে আমাদের কাছে, প্রয়োজন ছাড়া আমরা তা নীচে প্রেরণ করিনে।-(১৫:২১) উদ্ভিদ ও প্রাণীকূল। 


অত:পর খোদা লু এর আগুণ থেকে জ্বিণ সৃষ্টি করে তাদেরকে আমাদের মহাবিশ্বে বসবাস করতে দেন। অার যখন জ্বিণ জাতি অনাচারে এ ভূবন ভরিয়ে তুলল, তখন খোদার নির্দেশে দুষ্টুদেরকে ধ্বংস করতে শুরু করেন ফেরেস্তাগণ এবং ঐসময় জ্বিণজাতি ছড়িয়ে পড়ে এ মহাবিশ্বের সর্বত্র।


যা হোক, ঐ ধ্বংসযজ্ঞ থেকে কিছু জ্বিণ রক্ষা পেয়েছিল। এদেরই একজন আযাযিল (Azazyl)। তার পিতার নাম ছিল খবীশ এবং মাতা নিবলীস। ছোটবেলা থেকেই সে অতিশয় মেধাবী এবং স্মৃতিশক্তি সম্পন্ন ছিল। যা সে একবার দেখত বা শুনত, তা চিরদিনের জন্যে মনে রাখতে পারত। এই আযাযিলই পরবর্তীতে হয়ে যায় ইবলিস (Iblis)। The word Iblis means "to despair" and Azazel despaired of the Mercy of God, thus earning him that title.


মুনসূর আল হাল্লাজের মতে- The name of Iblis was derived from his first name, Azazyl in which were changed: the ‘ayn representing the amplitude of his endeavor, the zay, representing the growing frequency of his visits, the alif - his way in His rank, the second zay - his asceticism in His rank, and the ya- his wandering walk to his agony, and lam -his obstinacy in his pain -(Kitab at-Tawasin by Mansur al-Hallaj).


আযাযিল দুনিয়াতে এক হাজার বৎসর আল্লাহর এবাদত করল। এবাদতে তার একাগ্রতা ও নিষ্ঠা দেখে ফেরেস্তাগণ অবাক হল। আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়ে তাকে জ্বিণ জাতির সর্দার করে দিলেন। এভাবে আযাযিল তার ৭০ হাজার বৎসর এবাদতের দ্বারা অনেকগুলি গুণবোধক নাম অর্জন করেছিল। যেমন- ‘খাশে’,‘আবেদ’, ‘অলী’,‘সালেহ’ ইত্যাদি এবং এর সবগুণিই ফেরেস্তাদের দেয়া। এভাবে সে উর্দ্ধ আকাশে অবাধ বিচরণের সৌভাগ্য অর্জন করেছিল। তার এতসব অর্জনের মূলে ছিল তার নিরলস শ্রম ও নিষ্ঠা। দিনের একাংশ সে দুনিয়ার জ্বিণদের সৎপথ প্রদর্শণে ব্যয় করে অবশিষ্ট সময়টা আল্লাহর এবাদতেই অতিবাহিত করত।


যা হোক, দুনিয়া জ্বিণজাতি মুক্ত হলে খোদা মানব সৃষ্টির পরিকল্পণা করলেন। সুতরাং তিনি ফেরেস্তাদেরকে সমবেত হতে নির্দেশ দিলেন। তারা তৎক্ষণাৎ সমবেত হল। কিন্তু তারা বুঝতে পারছিল না কেন এই সমাবেশ, তাই পরস্পর ফিসফিস কথাবার্তা (-৩৮:৬১) ও আলোচনা করতে লাগল। অতঃপর আল্লাহ সমবেত ফেরেস্তাদেরকে তাঁর পরিকল্পণার কথা জানালেন। তিনি বললেন, ‘আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি সৃষ্টি করতে যাচ্ছি।’-(১৫:২৮)


ইতিপূর্বে ফেরেস্তাগণ জ্বিণ জাতির অভিজ্ঞতা লাভ করেছিল। সুতরাং তারা বলল, ‘আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যে অশান্তি ঘটাবে ও রক্তপাত করবে? আমরাই তো রয়েছি আপনার পবিত্র মহিমা ঘোষণা করার জন্যে।’ 

তিনি বললেন, ‘আমি যা জানি তোমরা তো তা জান না। সুতরাং অমি ছাঁচে ঢালা শুকনো মাটি হতে মানুষ সৃষ্টি করছি, যখন আমি তাকে সুঠাম করব এবং তার মধ্যে আমার রূহ সঞ্চার করব, তখন তোমরা তাকে সিজদা করবে।’-(১৫:২৮-২৯).

অত:পর আল্লাহ ফেরেস্তাদেরকে মাটি সংগ্রহের জন্যে নির্দেশ দিলেন। প্রধান ফেরেস্তাদের মধ্যে জিব্রাইল, মিকাইল ও ইস্রাফিল ব্যর্থ হল, কেননা জমিন তাদেরকে খোদার কসম দিয়ে মাটি নিতে নিষেধ করেছিল। কিন্তু অাজ্রাইল গিয়ে মটি সংগ্রহ করে নিয়ে এল।সে জমিনকে বলেছিল, ‘তুমি যার কসম দিচ্ছ আমি তাঁর আদেশে
ই এসেছি। সুতরাং মাটি না নিয়ে আমি ফিরে যাচ্ছিনে।’ অত:পর আল্লাহ প্রথম মানব আদমকে ঐ মাটি থেকে সৃষ্টি করলেন। বুক অব চামিস জানায়- 


The four most exalted angels, Gabriel, Michael, Israfil, and Azrail, were commanded to bring from the four corners of the earth the dust out of which Allah formed the body of Adam, all save the head and heart. For these He employed exclusively the sacred earth of Mecca and Medina, from the very spots on which, in later times, the holy Kaaba and the sepulchre of Mohammed were erected.--(Book of Chamis)


আদমের শরীর যখন সুঠাম হল, তখন আল্লাহ ফেরেস্তাদেরকে নির্দেশ দিলেন, ‘তার রূহ আন।’-ইতিপূর্বে তিনি আদমের রূহ সৃষ্টি করে তা ফেরেস্তাদের তত্ত্বাবধানে রেখেছিলেন।

ফেরেস্তাগণ একটি নূরের আধারে ঐ রূহ এনে আদমের শির পার্শ্বে রাখল। আল্লাহ রূহকে আদেশ করলেন, ‘এই দেহে প্রবেশ কর।’

এই আদেশের পর রূহ কয়েকবার আদমের দেহের চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ শেষে নাসিকা পথে দেহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করল। তৎক্ষণাৎ আদম চোখ মেলে চাইল এবং হাঁচি দিয়ে উঠে বসতে চেষ্টা করল। ফেরেস্তাগণ তা দেখে বলল, ‘নিশ্চয় এই বান্দা ত্বরাপ্রবণ হবে।’

প্রকৃতপক্ষে ফেরেস্তাদের ধারণাই ছিল সঠিক। আল্লাহ মানুষকে ত্বরাপ্রবণ করেই সৃষ্টি করেছেন। কোরআনেও এর প্রমান পাওয়া যায়- সৃষ্টিগত ভাবে মানুষ ত্বরা প্রবণ। -(২১:৩৭).

আদম উঠে বসল। উপস্থিত ফেরেস্তাগণ আদমকে সম্মান প্রদর্শণ করল।আর আদম তার চারিদিকে সমবেত ফেরেস্তাদেরকে এক নজর দেখে নিয়ে বলল, ‘সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর।’

আল্লাহ বলেন, ‘তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক।’

অন্যদিকে এ বিষয়ে  Book of Chamis জানায়- আমাদের কাছে যে তথ্য এসেছে তা থেকে এতটুকু জানা যায় যে, আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছিল শুক্রবার বিকেলে, আছরের ওয়াক্তে।


..Adam's beautiful form excited the admiration of the angels who were passing by the gates of Paradise, where Allah had laid it down. iblis said, to his fellows, "How can this hollow piece of earth be well pleasing in your sight? Nothing but weakness and frailty may be expected of this creature." When all the inhabitants of heaven, save Iblis, had gazed on Adam in long and silent wonder, they burst out in praises to Allah, the creator of the first man...


Allah then directed the angels to bathe the Soul of Adam, which he had created a thousand years before his body, in the sea of glory which proceedeth from himself, and commanded her to animate his yet lifeless form. The Soul hesitated, for she was unwilling to exchange the boundless heavens for this narrow home; but Allah said, "Thou must animate Adam even against thy will; and as the punishment of thy disobedience, thou shalt one day be separated from him also against thy will."


Allah then breathed upon her with such violence that she rushed through the nostrils of Adam into his head. On reaching his eyes, they were opened, and he saw the throne of Allah, with the inscription, "There is out one GOD, and Mohammed is his Messenger."


The Soul then penetrated to his ears, and he heard the angels praising Allah; thereupon his own tongue was loosed, and he cried, "Blessed be thou, my Creator, the only One and Eternal!" and Allah answered, "For this end wast thou created; thou and thy descendants shall worship me; so shall ye ever obtain grace and mercy." -(Book of Chamis)


আদমকে সৃষ্টির পর আল্লাহ তাকে আসমানের এক উদ্যানে বাস করতে দিয়েছিলেন। আদম ঘুরত ফিরত খুশীমত খাওয়া-দাওয়া করত। এসময় আল্লাহ তাকে তাঁর তত্ত্বাবধানে যাবতীয় কিছুর নাম শিক্ষা দিতে লাগলেন। আর এ বিষয়ে Book of Chamis জানায়- All created things were then assembled before Adam, and Allah taught him the names of all beasts, of birds, and of fish; the manner in which they are sustained and propagated, and explained their peculiarities, and the ends of their existence.-(Book of Chamis.) Finally, God
 showed to Adam every future generation, with their heads, sages, and scribes. He saw that David was destined to live only thirty years, and said, "Lord and Creator of the world, is this unalterably fixed?" 

The Lord answered, "It was my original design!"
"How many years shall I live?"
"One thousand,"
"Are grants known in Heaven?"
"Certainly!"
"I grant, then, seventy years of my life to David!"

What did Adam therefore do? He gave a written grant, set his seal to it, and the same was done by the angel Gabriel & Michael.—(Midrash Jalkut, p. 12). Thus, nine hundred and thirty years was the lifetime of Adam, -(Gen., 5: 3).


তার এবাদতের জন্যে আসমানে একটি গৃহ (বায়তুল মামুর) নির্মাণ করে দিয়েছিল ফেরেস্তারা। ফেরেস্তাদের সাথে সে সেখানে এবাদত করত এবং অবসরে তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলত। কিন্তু ফেরেস্তাগণ তো সর্বদা আল্লাহর নির্দেশ পালনে ব্যতিব্যস্ত এবং তাঁর এবাদতে মশগুল থাকত, তাই প্রায়ই আদম নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ত। আল্লাহ তো মহাজ্ঞানী, তিনি তার নিঃসঙ্গতা দূর করতে হাওয়াকে তার বাম পাঁজরের হাঁড় থেকে সৃষ্টি করলেন, যেন তিনি একজন সঙ্গী পান, যে সঙ্গী সর্বদা তার মনোরঞ্জন করবে, তাকে উৎফুল্ল ও আনন্দে ভরে রাখবে। যেমন- তিনি আদমকে সৃষ্টি করলেন ও তার থেকে তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেন যেন সে তার কাছে শান্তি পায়।’ -(৭:১৮৯).

হাওয়াকে আল্লাহ যখন সৃষ্টি করলেন, তখন আদম নিদ্রামগ্ন ছিল। সে ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখতে পেল তার মাথার পাশে বসে রয়েছে এক রমনী যে তার মুখের দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে। ঐ রমনীর সুন্দর মুখশ্রী এবং টানা টানা চোখের মাদকতা ভরা চাহনিতে আদম আকৃষ্ট হল। সে উঠে বসল এবং অবাক হয়ে ঐ নারীর সৌন্দর্য অবলোকন করতে লাগল। কারণ এমন সৃষ্টি সে তো পূর্বে দেখেনি। 


হাওয়ার সৃষ্টি সম্পর্কে Book of Chamis জানায়-Allah presented him, through Gabriel, with a bunch of grapes from Paradise, and when he had eaten them he fell into a deep sleep. The Lord then took a rib from Adam's side, and formed a woman of it, whom he called Hava [Eve], for he said, I have taken her from (hai) the living.She bore a perfect resemblance to Adam; but her features were more delicate than his, and her eyes shone with a sweeter luster, her hair was longer, and divided into seven hundred braids; her form was lighter, and her voice more soft and pure.


While Allah was endowing Eve with every female charm, Adam was dreaming of a second human being resembling himself. Nor was this strange, for had he not seen all the creatures which had been presented to him in pairs? -(Book of Chamis.)


যে আদম ইতিপূর্বে আগ্রহ নিয়ে ফেরেস্তাদের সঙ্গে কথাবার্তায় সময় কাটাত, সে এখন এই নারীকে নিয়ে বিভোর হয়ে পড়ল। এই সময় এক ফেরেস্তা ঐ নারীকে দেখে এবং আদমের এই পরিবর্তণে অবাক হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘হে আদম, এ কে?’

আদম উত্তর দিল, ‘এর নাম হাওয়া (Living Things)।’
ফেরেস্তা - ‘তার নাম এমন কেন?’
আদম - ‘তাকে আমার থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং আমি তো জীবন্ত (Living Being)।’

এ পর্যায়ে আমরা ফেরেস্তা, জ্বিণ ও ইনসানের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো জেনে নেই পুরো বিষয়টি ভালভাবে বোঝার সুবিধার্থে। আর এ কথাও ঠিক যে, খোদার যাবতীয় সৃষ্টির মধ্যে ফেরেস্তা, জ্বিণ ও মানব বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কেননা কিতাব অনুসারে অনুমিত হয় এ তিনটি জাতিকেই কেবল তিনি নিজে (প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে) সৃষ্টি করেছেন, বাকী সবকিছু হয়েছে বা হচ্ছে লিখিত কিতাবে দেয়া তাঁর আদেশ অনুসারে অর্থাৎ সেসব সৃষ্ট তাঁর পরোক্ষ অংশগ্রহণে। এ কারণে কোরআনে বলা হয়েছে- খোদা আসমান ও জমিনের স্রষ্টা। আর যখন তিনি কোন কিছু সৃষ্টি করতে চান, তখন শুধু বলেন “হও” আর তা হয়ে যায়। -(২:১১৭) 


জ্বিণ ও ইনসানকে স্বাধীন করে সৃষ্টি করা হয়েছে অর্থাৎ তারা খোদার আদেশ নিষেধের বিপরীতে কাজ করতে পারে এবং এই কারণে তারা বিচারের অধীন বলা হয়েছে। অন্যদিকে ফেরেস্তাগণ খোদার আদেশ নিষেধের বাইরে কাজ করতে পারে না, ফলে তারা বিচারের অধীনও নয়। তাছাড়া ফেরেস্তাগণ যেমন লিঙ্গভিত্তিক নয়, তেমনি নয় জন্ম-মৃত্যুর অধীন- যেমনটা জ্বিণ ও মনুষ্যজাতি। 


ফেরেস্তাগণের যারা দৃশ্যলোকে কাজ করে তাদের অদৃশ্যলোকে যাবার ক্ষমতা নেই। তাদের যাতায়াতের শেষ সীমানা হল ৪র্থ আসমান বা ৪র্থ মহাবিশ্বের প্রান্তে অবস্থিত সিদরাতুল মুনতাহা।সিদরা অর্থ বরইকুল আর মুনতাহা অর্থ শেষ সীমানা। এ কারণে নবীজীর মেরাজে গমন কালে জিব্রাইল এ পর্য়ন্ত এসে তার অপরাগতা প্রকাশ করেছিল। এ প্রান্তবর্তী সিদরা বৃক্ষের পত্রে দুনিয়ার কাজে নিয়োজিত ফেরেস্তাগণ স্বর্ণবর্ণের ফড়িং এর মত করে জড়িয়ে থাকে। 


যা হোক, সৃষ্ট মহাবিশ্বগুলোতে খোদার বিভিন্ন নির্দেশ বাস্তবায়নে লক্ষ কোটি ফেরেস্তা নিয়োজিত থাকলেও প্রধান ফেরেস্তা মাত্র চারজন-


জিব্রাইল: বার্তা বাহকের কাজে নিয়োজিত।

মিকাইল: মেঘ, বৃষ্টি, চন্দ্র, সূর্য্য তথা এ মহাবিশ্ব পরিচালনার কাজে নিয়োজিত।
আজ্রাইল: প্রাণ সংহরণের কাজ নিয়োজিত, এবং
ইস্রাফিল: শিঙ্গা মুখে সমস্ত সৃষ্টি ধ্বংসের জন্য খোদার আদেশের অপেক্ষায় রত।

দৃশ্যমান বা বস্তুজগতে সকল পদার্থের ক্ষুদ্রকণা হল পরমাণু। একটা নির্দিষ্ট ফিকোয়েন্সিতে এসকল পরমাণু একত্রিত হয়ে বস্তুর অস্তিত্ব প্রকাশ করেছে। আর দৃশ্যমান জগতের সকল বস্তু বা প্রাণীর দৃশ্যমান উপস্থিতি কেবলমাত্র ৩৯০-৭০০nm ফ্রিকোয়েন্সি সীমায় অবস্থিত। মাটির তৈরী মানুষও এর বাইরে নয়। অন্যদিকে আগুণে সৃষ্ট জ্বিণজাতি [‘এবং জ্বিণকে ’লু এর আগুনের দ্বারা সৃষ্টি করেছি।-(১৫:২৭)] ও নূরের সৃষ্ট ফেরেস্তাগণ এই ফিকোয়েন্সি সীমার বাইরের কোন নির্দিষ্ট ফিকোয়েন্সি দিয়ে সৃষ্ট, ফলে তারা দৃশ্যমান নয়। তবে তারা উভয় ফিকোয়েন্সি সীমায় যাতায়াত করতে পারে। 


গঠনগত দিক ছাড়াও জ্বিণ ও ফেরেস্তার মধ্যে কিছু বিশেষ পার্থক্য রয়েছে। জ্বিণ একজোড়া ডানা বা পাখাবিশিষ্ট কিন্তু ফেরেস্তাদের পাখার সংখ্যা সুনির্দিষ্ট নয়। কোলআনে বলা হয়েছে-(ফেরেস্তা) ‘দুই, তিন কিংবা চার জোড়া পক্ষ বিশিষ্ট।’-(৩৫:১)। তাছাড়া ফেরেস্তাগণ দৃশ্যমান জগতের যে কোন বস্তু বা প্রাণীর রূপধারণ বা নিজেকে তাতে রূপান্তরিত করতে পারে। অন্যদিকে জ্বিণ ফেরেস্তা ব্যতিত সকল কিছুর রূপ ধারণ করতে পারলেও কোন প্রানী বা বস্তুতে নিজেকে রূপান্তরিত করতে পারে না। এ কারণে তারা প্রয়োজনে অন্যের শরীরে ভর করে।


আর দৃশ্যমান প্রতিটি বস্তুর ফ্রিকোয়েন্সি তাদের জানা থাকায়, তারা ইচ্ছে করলে ম্যাটার ট্রান্সমিশনের মত করে আইফেল টাওয়ারটি মুহূর্তেই ঢাকার গাবতলীতে এনে বসিয়ে দিতে পারে। সেবার রানী বিলকিসের সেই বিশাল সিংহাসনটা নবী শলোমনের উপদেষ্টা জ্বিণ এভারেই এনে হাজির করেছিল তার সম্মুখে। যেমন-


শলোমন আরও বলল, ‘হে আমার পরিষদবর্গ! তারা আমার কাছে আত্মসমর্পন করতে আসার পূর্বে তোমাদের মধ্যে কে তার সিংহাসন আমাকে এনে দেবে?’

এক শক্তিশালী জ্বিণ বলল, ‘আপনি আপনার স্থান থেকে ওঠার আগেই আমি তা এনে দেব। এ ব্যাপারে আমি এমনই শক্তি রাখি। আর আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন।’
কিতাবের জ্ঞান যার ছিল সে বলল, ‘আপনি চোখের পলক ফেলার আগেই আমি তা এনে দেব।’ -(২৭:৩৮-৪০)

আবার যেহেতু জ্বিণজাতি দৃশ্যমান জগতের সকল বস্তুর ফিকোয়েন্সি জানে, তাই তারা বস্তু বা প্রাণীর ফিকোয়েন্সিতে অতি নগণ্য পরিমাণে পরিবর্তণ এনে বা তাকে বেষ্টন করে এক ফিকোয়েন্সি জাল (মায়াজাল) সৃষ্টির মাধ্যমে, তাকে সাময়িক পরিবর্তিত রূপদান, পরিবর্তিত আকারে উপস্থাপন বা তাকে সাময়িক অদৃশ্যমান করে দিতে পারে। নবী শলোমনের উপদেষ্টা জ্বিণ এভাবেই বিলকিসের সিংহাসনে সামান্য পরিবর্তণও এনেছিল। যেমন-


যখন তা সামনে রাখা দেখল, তখন (শলোমন) বলল, ........‘তার সিংহাসনের আকৃতিতে সামান্য পরিবর্তণ আনো; দেখি সে চিনতে পারে- নাকি ভুল করে।’ -(২৭:৪১)


আর এ সামান্য পরিবর্তনের কারনে বুদ্ধিমতী বিলকিস দাবী করেননি ঐটি তার সিংহাসন, কিন্তু তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সেটি তারই। আর তাই শলোমনের প্রশ্নের প্রদত্ত উত্তরে তার ঐ মনোভাবের প্রতিফলন ঘটেছিল-তার উত্তর হ্যাঁ- না দু’টোই মিন করেছিল। যেমন- 


(বিলকিস) যখন পৌঁছিল তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হল, ‘তোমার সিংহাসন কি এ রকম?’

সে বলল, ‘এ তো এ রকমই। ...।’-(২৭: ৪২)

তাছাড়া শলোমন সাময়িকভাবে সিংহাসনচ্যূত হন জ্বিণ চখরের কারসাঁজিতে। সে তার শরীরকে বেষ্টন করে এক মায়াজাল (ফিকোয়েন্সি জাল) সৃষ্টি করেছিল, ফলে এমনকি তার স্ত্রী আমিনাও তাকে চিনতে না পেরে অস্খীকার করে। 


কি আছে লওহে মাহফুজের কিতাবে? কোরআনে বলা হয়েছে- নিশ্চয় এটা সম্মানিত কোরআন, যা আছে এক গোপন কিতাবে।-(৫৬:৭৭-৭৮) এটা লিখিত আছে সম্মানিত, উচ্চ পবিত্র পত্রসমূহে, লিপিকারের হস্তে, যারা মহৎ পূত চরিত্র।-(৮০:১৩-১৬) নিশ্চয় এ কোরআন আমার কাছে সমুন্নত অটল রয়েছে লওহে মাহফুজে।-(৪৩:৪) আকাশ ও পৃথিবীতে এমন কোন গোপন ভেদ নেই যা না আছে ঐ কিতাবে।-(২৭:৭৫)   


কিতাবে সবকিছুই লিপিবদ্ধ রয়েছে, কেবল নে
ই স্বাধীন করে সৃষ্ট মানব ও জ্বিণের আমলনামা, তবে তাদের আয়ূস্কাল অর্থাৎ জন্ম ও মৃত্যুর ক্ষণ এবং জন্মপথ তাতে লিপিবদ্ধ আছে।জন্মপথ হচ্ছে জন্মক্ষণ ও মৃত্যুক্ষণের মধ্যবর্তী সময়কালের মধ্যে প্রকৃতির সাথে সংযুক্ত মাকড়সার জালের মত ছড়িয়ে থাকা একমুখী পথ। [যারা ‘হাউস অব ডেড’ গেমটি খেলেছেন তারা বিষয়টি ভালভাবে বুঝতে পারবেন] সময়ের সাথে কমতে থাকা এই পথে ব্যক্তি বিশেষের অবস্থান পুরোপুরি ব্যক্তির কথা ও কর্ম নির্ভর। আর ব্যক্তি তার কথা ও কর্মের সিদ্ধান্তগুলো নেয় তার নিজের বিবেক বা প্রবৃত্তির প্ররোচনায়। আর ব্যক্তির প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি জ্বিণজাতির হাতে। এ ক্ষমতা তাদেরকে দেয়া হয়নি বরং তারা এটা পেয়েছে তাদের সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্যের কারণে।


ব্যক্তির কথা ও কর্মের সিদ্ধান্ত ব্যক্তির নিজের তাই সেসবের কিছুই লওহে মাহফুজের কিতাবে লেখা নেই (ব্যতিক্রম কেবল খোদার নির্বাচিত দাস )। তাই এসব (আমল) লিপিবদ্ধ করে দু’জন ফেরেস্তা। আর যে খাতায় তারা তা লিপিবব্ধ করে তা লওহে মাহফুজেরই এক খুঁদে সংস্করণ যাতে রয়েছে ব্যক্তির জীবনপথের ছাপ। 


আবার যেহেতু ব্যক্তির প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণ ইবলিসের আয়ত্বধীন, তাই যখন ব্যক্তির প্রজ্ঞা কম, তখন ইবলিস তার বিবেককে সাময়িক আড়াল করে ঐ ব্যক্তির কথা ও কর্ম নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে ব্যক্তির প্রজ্ঞা যখন বেশী হয় তখন তা বিবেককে জাগিয়ে তোলে, ফলে প্রবৃত্তিকে দাবিয়ে রেখে সহজেই সে ব্যক্তির কথা ও কর্মকে নিয়ন্ত্রণ করে। [আর এ থেকে সহজ অনুমেয় কেন মুসলমানের জন্য জ্ঞান অর্জন করা ফরজ। কারণ কেবলমাত্র জ্ঞান শিক্ষার দ্বারাই তারা ঐশ্বরিক কিতাবের সঠিক অর্থ এবং সর্বিক গাইডলাইন বুঝতে পারবে এবং মানুষের উপর ক্ষমতাবান ও ধূর্ত ইবলিসকে এড়িয়ে চলতে পারবে।] 


অন্যদিকে ব্যক্তির কর্ম প্রভাব সরাসরি প্রকৃতির সাথে যুক্ত এবং সমগ্র মানবমন্ডলির কর্মপ্রভাব পুরো প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। কোন নির্দিষ্ট এলাকার মানবগোষ্ঠেীর কর্মপ্রভাব যখন প্রকৃতিকে মূলকিতাবের নির্ধারিত সীমাকে অতিক্রম করায়, তখন নতুন নতুন আত্মার জীবনপথ সংযুক্ত হতে থাকে কিতাবে অথবা মহাবিশ্ব পরিচালনাকারী ফেরেস্তাগণ সুনির্দিষ্ট নির্দেশ পায় প্রয়োজনীয় কর্ম সম্পাদনের যা প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে নির্ধারিত সীমায় রাখবে। সার সংক্ষেপে বলা যায়- Man possesses four unique qualities over angels: knowledge, Trust, Having multiple goals and free will and accountability. আর সবচেয়ে বড় বিষয় হল মানুষ দুনিয়াতে খোদার প্রতিনিধি, সবকিছুর 
নচার্জ। তাদের কথা ও কাজকর্মের প্রভাব সম্পূর্ণরূপে প্রকৃতির সাথে জড়িত।ফলে কেবল তারা পরিবর্তণ আনতে পারে প্রকৃতিতে। 


ফ্রি উ
ইল সম্পন্ন মানব ও জ্বিণের আমলনামা ছাড়াও কিতাবে আর যা নেই তা হল কেয়ামত সংঘটনের সময়কাল। এটি একমাত্র আল্লাহই জানেন [যেমন-"Verily the knowledge of the Hour is with Allah (alone)-(৩১:৩৪) বা, To your Lord is its finality.-(৭৯:৪৪) গসপেলে ঈসা বলেছেন-”প্রকৃতপক্ষে সেইদিন সেই সময়ের কথা কেউ জানে না, স্বর্গের ফেরেস্তারাও না, আমিও না, কেবল খোদা জানেন।”] আর এ থেকে বোঝা যায়, কাগজে কলমে সূর্য়্যের জ্বালানী কখন শেষ হবে তা আমরা অঙ্ক কষে বের করতে পারলেও কেয়ামতের সময়কাল কখনই মানুষ বিজ্ঞানের সাহায্যে জানতে পারবে না, পরিণতি আসবে হঠাৎ করেই, হয়ত: আচমকা কোন ব্লাক হোলে পতিত হবে আমাদের সৌরজগৎ। আর তাতে আন্তগ্রহীয় বন্ধন ছুটে গিয়ে লন্ডভন্ড হয়ে যাবে আমাদের সৌরজগৎ। হঠাৎ শব্দ ও কম্পনের সৃষ্টি হবে আর গ্রহগুলো ছুটে যাবে ব্লাক হোলের দিকে।আর ছোটার গতি বৃদ্ধির সাথে সাথে নিম্নগ্রামে শুরু হওয়া শব্দ ও কম্পন্ বৃদ্ধি পেতে থাকবে। একসময় সবকিছু টুকরো টুকরো হয়ে পড়বে। অত:পর পরিণত হবে ধূণিত রঙ্গিন পশমের মত। 


যা হোক, মূল কাহিনীতে ফিরি,প্রথম মানব আদমকে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ তাকে জ্ঞান শিক্ষা দিলেন। আর সে যখন সবকিছু শিখে ফেলল, তখন তিনি ফেরেস্তাদের সম্মুখে সকল বস্তু উপস্থাপন করে বলেন, ‘এসবের নাম আমাকে বল।’ 

তারা বলল, ‘আপনি মহান। আপনি আমাদের যা শিক্ষা দিয়েছেন তাছাড়া আমাদের কোন জ্ঞান নেই। নিশ্চয় আপনি প্রাজ্ঞ, তত্ত্বজ্ঞানী।’ 
তখন তিনি আদমকে বলেন, ‘হে আদম! তুমি ওদের এসবের নাম বলে দাও।’ -(২:৩১) তখন আদম সে সবের নাম বলে দিল।  

কেউ হয়ত: বলতে পারেন- তা আল্লাহ কেন ফেরেস্তাদের সামনে আদমের জ্ঞান জাহির করার প্রয়োজন বোধ করলেন? কারণ আদমকে সৃষ্টির পরিকল্পণা যখন তিনি ফেরেস্তাদেরকে জানিয়েছিলেন, তখন তারা সন্দিহান হয়েছিল। (উপরে দেখুন) তখন তিনি বললেন, ‘আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, আকাশ ও পৃথিবীর অদৃশ্য বস্তু সম্বন্ধে আমি জানি, আর আমি জানি যা তোমরা প্রকাশ কর বা গোপন রাখ।’-(২:৩৩)


জ্ঞানীর সম্মান খোদার কাছে অতি উচ্চ। সুতরাং তিনি বলেন, ‘আদমকে সিজদা কর।’-(২:৩৪) তখন ফেরেস্তাগণ সকলেই সিজদা করল ইবলিস ছাড়া, সে সিজদা করতে অস্বীকার করল।-(১৫:৩০-৩১)


ইবলিস ফেরেস্তা ছিল না, ছিল জ্বিণ-(And when We said to the angels, "Prostrate to Adam," and they prostrated, except for Iblis. He was of the jinn and departed from the command of his Lord.-১৮:৫০), তথাপি সেও এই নির্দেশের অন্তর্ভূক্ত ছিল। কেননা, তখন পর্যন্ত সে ফেরেস্তাদের সঙ্গে একত্রে বসবাস করত এবং আল্লাহর ঐ নির্দেশ দানের সময়ও সে তাদের সঙ্গে সেখানে স্ব-শরীরে উপস্থিত ছিল। [এভাবে খোদার নির্দেশ না থাকলেও কোন নবী যাদি কিছু আদেশ করেন তবে তা উম্মতের জন্যে অবশ্য পালনীয় হয়ে যায়। যেমন, নবী ইয়াকুব তার প্রিয় উটের দুধ হারাম করেছিলেন [অার তারা রাণের উপরের অংশের মাংসও খায় না। অবশ্য তা মানতের জন্যে নয়। স্বপ্নের মধ্যে ফেরেস্তা জিব্রা
ইলের সঙ্গে তার মল্লযুদ্ধ হয় এবং তাকে পরাজিত করেন। আর এভাবে তিনি ‘আল্লার বীর’ বা ‘ইস্রায়েল’ উপাধি লাভ করেছিলেন। তবে ঐ মল্লযুদ্ধে তিনি কোমরে আঘাত পান, ফলে ইস্রায়েলীরা কোমরের উপরের মাংস হারাম করেছিল।], তার রোগমুক্তির নিরাময়ে, মানত হিসেবে, ফলে সকল ইস্রায়েলীর জন্যে তা হারাম হয়েছিল।] 


কেন ফেরেস্তারা সিজদা করল আর 
ইবলিস করল না? ফেরেস্তারা সিজদা করল কারণ ইতিপূর্বে আল্লাহ তাদেরকে সিজদা করার বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছিলেন।- ‘অমি ছাঁচে ঢালা শুকনো মাটি হতে মানুষ সৃষ্টি করছি, যখন আমি তাকে সুঠাম করব এবং তার মধ্যে আমার রূহ সঞ্চার করব, তখন তোমরা তাকে সিজদা করবে।’- তাই এই নির্দেশ তাদের কাছে নতুন ছিল না। তাছাড়া তারা সর্বদা আল্লাহর নির্দেশ মান্যকারী। অন্যদিকে ইবলিস মানুষের মত ফ্রি উইলের অধিকারী। সে সৃষ্টির দিকে থেকে আদমের সিনিয়র এবং অাগুণ দ্বারা সৃষ্ট। ফলে তার কাছে মাটির সৃষ্টি আদম শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হয়নি- যদিও বিশেষ জ্ঞানের ক্ষেত্রে আদম তার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমান দিয়েছিল। আর তাই সে আল্লাহর নির্দেশ উপেক্ষা করে অনড় দাঁড়িয়ে রইল।


এদিকে সিজদাকারী ফেরেস্তারা মাথা তুলেই বুঝতে পারল, আযাযিল সিজদা অস্বীকারকারী। কারণ, তার চেহারায় পরিবর্তণ এসেছিল।
এতে ফেরেস্তারা ভয়ে পুনঃরায় সিজদায় পতিত হল। আর আল্লাহর প্রত্যক্ষ নির্দেশ অমান্য করায় আযাযিল হয়ে গেল ইবলিস।


আল্লাহ বললেন, ‘হে ইবলিস! তোমার কি হল যে তুমি সিজদাকারীদের সাথে যোগ দিলে না? কে তোমাকে বাঁধা দিল?’-(১৫: ৩২).

সে বলল, ‘আমি তো তার চেয়ে বড়, তুমি আমাকে আগুন দিয়ে সৃষ্টি করেছ, আর তাকে কাদা দিয়ে।’-(৭:১২).
তিনি বললেন, ‘হে ইবলিস! আমি যাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছি তাকে সিজদা করতে তোমার বাঁধা কোথায়? তুমি যে অহংকার করলে, তুমি কি এতই বড়?’ -(৩৮:৭৫).
সে বলল, ‘তুমি মাটি থেকে যে মানুষ সৃষ্টি করেছ আমি তাকে সিজদা করব না।’‘-(৩৮:৭৫).

এতক্ষণ আদম দাঁড়িয়ে তাকে ফেরেস্তাদের সিজদা করা দেখল। অতঃপর আল্লাহর সাথে ইবলিসের তর্ক-বিতর্ক করতে দেখল এবং সকল কথোপকথন নিজ কানে শুনল। মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিকে কতই না স্বাধীনতা দিয়েছেন এবং তিনি তাঁর সৃষ্টির প্রতি কতই না উদার ও সহানুভূতিশীল যে তিনি তাঁর সৃষ্টির এই প্রকার ঔদ্ধ্যত্য সহ্য করছেন- আদম বিষ্মিত ও হতবাক হয়ে পড়ল। 

এদিকে আল্লাহ দেখলেন এই ইবলিস আদমের প্রকাশ্য বিরোধীতায় লিপ্ত। সুতরাং আদমকে সতর্ক করে দিতে তিনি তাকে বললেন, ‘হে আদম! এই ইবলিস তোমার ও তোমার স্ত্রীর শত্রু। সুতরাং সে যেন কিছুতেই তোমাদেরকে জান্নাত হতে বের করে না দেয়, দিলে তোমরা দুঃখ-কষ্ট পাবে। তোমরা জান্নাতে বাস করতে থাক। সেখানে তোমরা ক্ষুধার্ত বা উলঙ্গ বোধ করবে না এবং সেখানে পিপাসা বা রোদের তাপ তোমাদেরকে কষ্ট দেবে না।’-(২০:১১৭-১১৯)


অতঃপর আল্লাহ তাদের চলাফেরায় সীমারেখা টেনে দিলেন। বাগানের মাঝখানে অবস্থিত এক বৃক্ষের নিকট গমন ও তার ফল ভক্ষণ নিষিদ্ধ করলেন। এই বৃক্ষটিই সেই জ্ঞানবৃক্ষ। আর ঐ বৃক্ষটি নির্দেশ করে তিনি বললেন, ‘হে আদম! তুমি ও তোমার সঙ্গিনী জান্নাতের যেখানে ইচ্ছে যাও বা যা ইচ্ছে খাও, কিন্তু এই বৃক্ষের নিকটবর্তী হইও না, হলে তোমরা সীমালংঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভূক্ত হবে।’-(৭:১৯). আর তিনি (ইবলিসকে) বললেন, ‘তুমি এখানে থেকে অহংকার করবে এ হতে পারে না। সুতরাং বের হয়ে যাও, তুমি তো অধমদের একজন।’ -(৭:১৩).


ইবলিস খোদার আদেশ অমান্য করে বেহেস্ত থেকে বিতাড়িত হল। সুতরাং যার জন্যে তার এই দূর্ভাগ্য, সে বেহেস্তের অপার সুখ ভোগের মধ্যে শান্তিতে থাকবে এটা সে সহ্য করতে পারল না। তাই আদমকেও পথভ্রষ্ট করে কিভাবে সেখান থেকে বের করে দেয়া যায় সেই চিন্তায় সে মশগুল হল। কিন্তু যে পরিকল্পণাই সে করুক তা বাস্তবায়ন করতে হলে তাকে প্রথমে বেহেস্তে প্রবেশ করতে হবে। কিন্তু কিভাবে? 


ইবলিস বেহেস্তের দ্বারদেশে পৌঁছে ইতস্ততঃ ঘোরাঘুরি করতে লাগল। দ্বারের একপাশে প্রাচীরের উপর বসে ছিল এক ময়ূর। সে তাকে ঘোরাঘুরি করতে দেখে তার পরিচয় জানতে চাইল।

ইবলিস বলল, ‘আমি আযাযিল, আল্লার এক বান্দা।’

ইবলিস দ্রুত ঐ ময়ূরের সাথে বন্ধুত্ব করে ফেলল এবং এক পর্যায়ে সে বেহেস্ত ঘুরে ফিরে দেখতে চাইল। ময়ূর বলল, তার সেরকম কোন ক্ষমতা খোদা দেননি। তবে সে জানায় যে তার এক বন্ধু আছে যার সে ক্ষমতা আছে। তখন ইবলিস তাকে তার সেই বন্ধুকে ডেকে আনতে অনুরোধ করে।


ময়ূর চলে গেল এবং অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে তার বন্ধুকে নিয়ে ফিরে এল। ময়ূরের ঐ বন্ধু ছিল একটা সাপ যে জ্ঞান বৃক্ষের ফল পাহারা দিত। ঐ সাপ বলল, ‘আল্লাহর অনুমতি ব্যতিত কারও ভিতরে প্রবেশের অধিকার নেই।’

ইবলিস বলল, ‘আমি বেহেস্তের কোথাও পা রাখব না, তোমার মুখের মধ্যেই অবস্থান করব।’

সাপ রাজী হল না। তখন ইবলিস তাকে বলল, ‘আমি ‘ইসমে আযম’ জানি। এই সামান্য কাজের বিনিময়ে তুমি তা শিখতে পারতে আমার কাছ থেকে। তবে যেহেতু তুমি তা শিখতে চাও না,’ইবলিস ফিরে যাবার ভঙ্গিতে বলল, “কি আর করা।’ তখনি সাপ তার মাথা প্রসারিত করে দিল। 

ইবলিস বলল, ‘আমাকে গন্ধম বৃক্ষের কাছে নিয়ে চল।’ সাপ উড়ে গিয়ে জ্ঞান বৃক্ষের এক শাখায় গিয়ে বসলে ইবলিস তাকে নানা কথায় ভুলিয়ে রাখল আর অপেক্ষায় থাকল অাদম হাওয়ার।

বেহেস্তের সুখ। নয়নাভিরাম নানা বর্ণের নানারকম ফলমূল, আরাম আয়েশ -আহা। বেহেস্তের মাঝামাঝি একস্থানে বসে ফল খেতে খেতে আদম ও হাওয়া নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগলেন, ‘কতই না ভাল হত যদি আমরা অমর হতাম, আর আমাদের এই জান্নাত বাস চিরকালীন হত!’ 


ইবলিস তাদের এই কথা শুনল। সে ঐ সময় গন্ধম বৃক্ষের শাখায় জড়িয়ে থাকা পাহারাদার সাপের মুখ গহ্বরে বসে ছিল। বৃক্ষ থেকে অবতরণ করে দ্রুত তাদের সন্নিকটে এসে গেল। 


তারপর শয়তান তাকে ফুসমন্তর দিল। সে বলল, ‘হে আদম! আমি কি তোমাকে অমরতা ও অক্ষয় রাজ্যের গাছের কথা বলে দেব? -(২০:১২০).

তারা দৃষ্টি ফেলে সাপকে দেখে বলল, ‘তুমি কে?’
সে বলল, ‘আমি সেই বৃক্ষ রক্ষণাবেক্ষণকারী।’  

আদম-হাওয়াকে নিয়ে সাপ ঐ বৃক্ষের একেবারে সন্নিকটে চলে এল। বৃক্ষের শাখায় শোভা পাচ্ছে নয়নমনোহর ফল একেবারে হাতের নাগালে। সুগন্ধে চারিদিক মৌ মৌ করছে। অভূতপূর্ব সৌন্দর্য। তারা অবাক নয়নে ফলের ভারে নূয়ে পড়া বৃক্ষটির শোভা উপভোগ করতে লাগলেন। ইবলিস বলল, ‘এটাই সেই বৃক্ষ, যার ফল ভক্ষণ করলেই তোমরা হবে অমর আর তোমাদের বাস বেহেস্তে চিরস্থায়ী হবে।’


আদম দেখল গাছটি বাগানের মাঝখানে। তখনি তার মনে পড়ল নিষেধবানী। সুতরাং সে বলল, ’না এর ফল আমরা ভক্ষণ করব না, নিষেধ অাছে।’

ইবলিস বলল, ‘কে নিষেধ করেছে?
হাওয়া বলল, ‘আল্লাহ আমাদেরকে বাগানের মাঝখানে থাকা গাছের কাছে যেতে নিষেধ করেছেন।’ 

তখন তাদের লজ্জাস্থান যা গোপন রাখা হয়েছিল তা প্রকাশ করার জন্যে শয়তান তাদেরকে কুমন্ত্রণা দিল ও বলল, ‘যাতে তোমরা দু’জনে ফেরেস্তা বা অমর না হতে পার তার জন্যেই তোমাদেরকে এ গাছের সম্বন্ধে নিষেধ করেছেন।তারা বলল, ‘কিভাবে আমরা তোমার কথা বিশ্বাস করব?’ 

সে কসম খেয়ে বলল, ‘আমি তো তোমাদের একজন হিতৈষী।’ এভাবে সে তাদেরকে ধোঁকা দিল।-(৭:২০) আর আদমের তো মিথ্যা ও প্রতারণার বিষয়ে কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই।
  
আদম দৃঢ় মনোবলের অধিকারী ছিল না। সে ভুলে গেল এটাই সেই বৃক্ষ যেটি বাগানের মাঝখানে অবস্থিত এবং যার সম্পর্কে আল্লাহ তাদেরকে সতর্ক করেছিলেন তার নিকটবর্তী না হতে, হলে তারা সীমালঙ্ঘণকারীদের অন্তর্ভূক্ত হবে।  

আল্লাহ বলেন, ‘আমি ইতিপূর্বে আদমকে নির্দেশ দিয়েছিলাম। অতঃপর সে ভুলে গিয়েছিল, এবং আমি তার মধ্যে দৃঢ়তা পাইনি। -(২০:১১৫).’ [এই আয়াতে কেবল আদমের নাম উল্লেখ করা হয়েছে- হাওয়ার নয়। একারণে হয়তঃ আল্লাহ নারী জাতির প্রতি বিশেষ রেয়াত প্রদর্শণ করেছেন। অথবা এটা হতে পারে- স্ত্রী যেহেতু পুরুষের অধীন সুতরাং স্বতন্ত্র্যভাবে হাওয়ার নাম উল্লেখের প্রয়োজন মনে করেননি।] 


তারা গাছ থেকে ফল ছিঁড়ল ও তা ভক্ষণ করল। ফল পাহারাদার সাপের মুখের গহব্বরে ইবলিস বসে থাকায় সে তাদেরকে কোনরূপ সতর্ক করতে পারল না।


তারপর যখন তারা সেইগাছের ফলের স্বাদ গ্রহণ করল তখন তাদের লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ল। আর তারা বাগানের গাছের পাতা দিয়ে নিজেদেরকে ঢাকার চেষ্টা করল। তখন তাদের প্রতিপালক তাদেরকে ডেকে বললেন, ‘আমি কি তোমাদের এ গাছের ব্যাপারে সাবধান করে দেইনি?’ 

তারা বলল, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের উপর জুলম করেছি, যদি তুমি আমাদেরকে ক্ষমা না কর, তবে নিশ্চয় আমরা ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভূক্ত হব।’-(৭:২১-২৩).

অনন্তর শয়তান তাদের উভয়কে ওখান থেকে পদঙ্খলিত করেছিল। পরে তারা যে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে ছিল তা থেকে তাদেরকে বের করে দিল। -(২:৩৬). পুরো ঘটনায় একদিকে আদম নিজেকে অপরাধী ভেবে হৃতদ্যম ও হতবাকের মত হয়ে পড়েছিল, অন্যদিকে ভীষণ লজ্জিতও ছিল, কেননা আল্লাহ তাকে ফেরেস্তাদের ও জ্বিনদের উপর মর্যাদা দিয়েছেন, অথচ সে কি করে ফেলল! তাই তিনি তার কোন অতিরিক্ত কথা অধিক শাস্তি ও কোপানলের কারণরূপে পরিগণিত হতে পারে এই আশঙ্কায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে মনে মনে কেবল আল্লাহর করূণা ভিক্ষা করছিল। আর আল্লাহ তো সব জান্তা।


সুতরাং আদম তার প্রতিপালকের কাছ থেকে কিছু বাণী পেল। আল্লাহ তার প্রতি ক্ষমা পরবশ হলেন। তিনি তো ক্ষমাপরবশ, পরম দয়ালু।’-(২:৩৭). এরপর তার প্রতিপালক তাকে মনোনীত করল-আর তাকে পথের নির্দেশ দিল, ‘পরে আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে সৎপথের নির্দেশ এলে যে আমার পথ অনুসরণ করবে সে বিপথগামী হবে না ও দুঃখ-কষ্ট পাবে না। আর যে আমার স্মরণে বিমুখ হবে তার জীবনের ভোগ-সম্ভার সঙ্কুচিত হবে, -(২০:১২২-১২৩) 


আর তিনি বললেন, ‘তোমরা একে অন্যের শত্রু হিসেবে কিছুকালের জন্যে পৃথিবীতে নেমে যাও। আর (সেখানে) তোমাদের জন্যে আবাস ও জীবিকা রইল। সেখানেই তোমরা জীবন-যাপন করবে, সেখানেই তোমাদের মৃত্যু হবে আর সেখান থেকেই তোমাদেরকে বের করে আনা হবে।’-(৭:২৪-২৫). মূলত: তোমাদেরকে সেখানে কিছুকাল অবস্থান করতে হবে ও লাভ সংগ্রহ করতে হবে।-(২:৩৬).


আদম-হাওয়াকে যখন আল্লাহ বচন দিচ্ছিলেন, তখন ইবলিস চুপচাপ একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু এবার সে মুখ খুলল। আদমকে দেখিয়ে সে বলল, ‘তুমি একে কি দেখেছ যাকে আমার উপরে তুমি মর্যাদা দিলে? কেয়ামতের দিন পর্যন্ত যদি আমাকে অবকাশ দাও, তাহলে আমি অল্প কয়েকজন ছাড়া তার বংশধরদের সমূলে নষ্ট করে ফেলব।’ 


আল্লাহ বললেন, ‘যাও, জাহান্নামই তোমার প্রতিদান আর প্রতিদান তাদের, যারা তোমাকে অনুসরণ করবে। তোমার কন্ঠস্বর দিয়ে ওদের মধ্যে যাকে পার সত্য থেকে সরিয়ে নাও, ......আর ওদের ধন-সস্পদে ও সন্তান-সন্তুতিতে শরিক হও আর প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাও।’-(১৭:৬২-৬৪).


ইবলিস আদম সন্তানদের সমূলে ধ্বংস করার দম্ভোক্তি করেছিল তার সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্যের কারণে। কিন্তু আল্লাহ ইতিপূর্বে আদমকে মনোনীত করেছেন এবং তাকে পথের নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাকে নিশ্চিত করেছেন যে, তার সন্তানদের মধ্যেও তাঁর মনোনীত বান্দা থাকবে যারা পথভ্রষ্টদেরকে পথ প্রদর্শণ করবেন। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, তিনি জানেন সুচতুর ইবলিস তাঁর ঐসব মনোনীত বান্দাদেরকে প্রধান টার্গেট করবে, যাতে আদম সন্তানগণ সরল পথ কখনও দেখতে না পায়। তাই তিনি আদমকে মনোনীত ও প্রতিশ্রুতি দেবার সময়ই তাঁর মনোনীত সকল দাসদের আয়ূস্কালীন প্রতিটি মূহুর্তের হিসেব (মুখের প্রতিটি কথা, কাজ এমনকি ইবলিসের ভূমিকারও যাবতীয় কিছু) ইতিমধ্যে লওহে মাহফুজের কিতাবে লিপিবদ্ধ হয়ে গেছে যা পরিবর্তণ হবে না। তাই তিনি ইবলিসের কাছে প্রতিশ্রুতি চাওয়ার পাশাপাশি এ বিষয়টিও সুস্পষ্টভাবে তাকে জানিয়ে দিলেন- ’আমার দাসদের উপর তোমার কোন ক্ষমতা থাকবে না। কর্মবিধায়ক হিসেবে তোমার প্রতিপালকই যথেষ্ট। -(১৭:৬৫).


তখন ইবলিস বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত অবকাশ দাও। -৭৮:৭৯-৮০,’ আল্লাহ তো ন্যায়পরায়ণ, তিনি ইবলিসের এতদিনের কর্মফল বিফল করে দিলেন না। তিনি তার প্রার্থনা মঞ্জুর করলেন, বললেন, ‘তোমাকে অবকাশ দেয়া হল সেইদিন পর্যন্ত-যা অবধারিত।-(৭৮:৮০) 


[ইবলিস তার সকল কাজকর্ম খোদার নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত থাকার খোদায়ী ওয়াদা পাওয়ামাত্র সে দুনিয়াতে সবচেয়ে ক্ষমতাধর হয়ে গেল। নায়ক খেকে সে হয়ে গেল খলনায়ক। এ কারণে ইব্রাহিমের সহিফায় রয়েছে- God's heritage (the created world) is largely under the dominion of evil (Iblis) – i.e., it is "shared with Azazel" -(আব্রাহাম, ২০:৫) 
একই সাথে তার উপর থেকে খোর রহমত উঠে যাওয়ায় তার চেহারাও কুৎসিৎ হয়ে যায়। যা অভিশপ্তের লক্ষণ। মূসার সঙ্গে তূর পর্বতের পাদদেশে ইবলিসের দেখা হলে তিনি তার এই ভয়ংকর চেহারার বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করেছিলেন। উত্তরে ইবলিস বলেছিল- ‘Oh Musa, that is but the ambiguity of appearances, while the spiritual state does not rely on it and does not change. Gnosis remains true even as it was at the beginning and does not change even if the individual changes.’ -Kitab at-tawasin by Mansur al-Hallaj] 


যাইহোক, কাহিনীতে ফিরি-. আর ইবলিসকে এটাও পরিস্কার করে দেয়া হল যে, অবকাশ সে পেয়েছে, তবে ঐ অবকালীন সময়কালে সে অভিশপ্ত্ও বটে। ’তোমার উপর আমার এ অভিশাপ কেয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী হবে।’-(৭৮:৭৮)


ইবলিস দেখল ইতিমধ্যে তার সর্বনাশ হয়ে গেছে, আল্লাহ তাকে কেয়ামত পর্যন্ত অভিশপ্ত করেছেন। সুতরাং যাদের কারণে তার এই সর্বনাশ, তাদেরকেও সর্বনাশ করার- পথভ্রষ্ট করার প্রতিশ্রুতি ও ওয়াদা দিল সে, বলল, ‘যাদেরকে উপলক্ষ্য করে তুমি আমার সর্বনাশ করলে, এ কারণে আমিও তোমার সরল পথে তাদের জন্যে নিশ্চয় ওৎ পেতে থাকব। তারপর আমি তাদের সামনে, পিছনে, ডান ও বাম থেকে তাদের কাছে আসবই, আর তুমি তাদের অনেককেই কৃতজ্ঞ পাবে না।-(৭:১৬-১৭). 

আমি তোমার দাসদের এক নির্দিষ্ট অংশকে আমার দলে নিয়ে ফেলব, আর আমি তাদেরকে পথভ্রষ্ট করবই, তাদের হৃদয়ে মিথ্যে বাসনার সৃষ্টি করব। আমি তাদেরকে নিশ্চয় নির্দেশ দেব এবং তারা পশুর কান ফুটো করবে দেবদেবীকে উৎসর্গ করার জন্যে। আর আমি তাদেরকে নিশ্চয় নির্দেশ দেব এবং তারা তোমার সৃষ্টিকে বিকৃত করবে।’

-‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমার যে সর্বনাশ করলে তার কসম! আমি পৃথিবীতে মানুষের কাছে পাপকে আকর্ষণীয় করব, আর আমি সকলের সর্বনাশ করব; তোমার নির্বাচিত দাস ছাড়া। -(৪:১১৮-১১৯) -আল্লাহর নির্বাচিত দাসদেরকে ইবলিস তার এই কসমের আওয়ার বাইরে রাখল। কেননা আল্লাহ ইতিপূর্বে তাকে পরিস্কার ভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাদের উপর তার কোন প্রভাব খাটবে না।


আল্লাহ বললেন, ‘এ-ই আমার কাছে পৌঁছানোর সরল পথ। বিভ্রান্ত হয়ে যারা তোমাকে অনুসরণ করবে তারা ছাড়া আমার দাসদের ওপর তোমার কোন প্রভাব খাটবে না।’-(১৫:৩৯-৪২). [এই কথা থেকেই মানুষ আল্লাহর কাছে পৌঁছানোর সরল পথের দিশা পেল। অর্থাৎ‘ইবলিস কতৃক আকর্ষণীয় করে উপস্থাপিত পাপকে পরিহার করে চলতে পারলেই মানুষ সর্বদা সেই সরল পথেই থাকবে, যে পথ তাকে আল্লাহর সান্নিধ্যে নিয়ে যাবে। আর কোন সন্দেহ নেই চতুর ও মানুষের উপর ক্ষমতাবান ইবলিসকে এড়িয়ে মানুষ চলতে পারবে কেবল তার জ্ঞান ও শিক্ষার দ্বারা।]


একই সাথে আল্লাহ ইবলিস ও তার অনুসারীদের শেষ পরিণতিও সুস্পষ্ট করে দিলেন যেন এ ব্যাপারে কারও নিকট সন্দেহের কোন অবকাশ না থাকে-‘আর আমি সত্যিই বলছি যে, তোমাকে দিয়ে ও ওদের মধ্যে যারা তোমার অনুসারী হবে তাদেরকে দিয়ে আমি জাহান্নাম ভরিয়ে তুলব। -(৩৮:৮৪-৮৫).তার সাতটি দরজা আছে, প্রত্যেক দরজার জন্যে পৃথক পৃথক দল থাকবে।’-(১৫:৪৪).


অত:পর দুনিয়াতে কি হচ্ছে? শয়তান তার কাজ ঠিকই করে যাচ্ছে। সে আদম-হাওয়ার কাছে শপথ করে বলেছিল- ‘আমি তো তোমাদের একজন হিতৈষী।’-অথচ তা ছিল ছলনা, কেবল তাদেরকে পথভ্রষ্ট করতে। তেমনি খোদার কাছে করা -‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমার যে সর্বনাশ করলে তার কসম! আমি পৃথিবীতে মানুষের কাছে পাপকে আকর্ষণীয় করব, আর আমি সকলের সর্বনাশ করব; তোমার নির্বাচিত দাস ছাড়া। -(৪:১১৮-১১৯) -প্রতিজ্ঞাও ছিল তার ছলনা। কেননা, কোরআনে রয়েছে- আমি তোমার পূর্বে যে সমস্ত রসূল ও নবী প্রেরণ করেছি, তারা যখনই কিছু কল্পণা করার চেষ্টা করেছে, তখনই শয়তান তাদের কল্পনায় কিছু মিশ্রণ করে দিয়েছে।-(২২:৫২)অর্থাৎ পারবে না জেনেও শয়তান কিন্তু ক্ষান্ত হয়নি। সে তার প্রতিজ্ঞার বিপরীতে নবীদেরকেও চেষ্টা করেছে পথভ্রষ্ট করে দিতে। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে আয়াতটি প্রমাণ করছে জ্বিণ মানুষের মনের কথা পড়তে পারে এমনকি, তা এডিট (সংযোজন বা বিয়োজন) করার ক্ষমতাও তার রয়েছে। আর এ কারণেই সে দম্ভোক্তি করতে পেরেছিল- খোদাকে চ্যালেঞ্জ করতে পেরেছিল বনি আদমকে সমুলে বিনষ্ট করার। সুতরাং বি কেয়ারফুল, কোন প্রলোভনে পড়া যাবে না। কেননা, প্রলোভন দেয় কেবল শয়তান। -আর শয়তান যে প্রতিশ্রুতি দেবে তা তো ছলনা মাত্র।-(১৭:-৬৪).


সমাপ্ত।


উৎস: 

Quran, 
Torah,
Midrash
Mansur al-Hallaj, Kitab at-tawasin
Husayn ibn Mahmud, Book of Chamis.
Abbas Ali, Islamic Perspectives on Management and Organization