pytheya.blogspot.com Webutation

৩০ জুন, ২০১২

Resurrection Day: পুনরুত্থানের পর মানুষের অনুভূতির স্বরূপ।


নশ্বর জগতে বাস করে অবিনশ্বর জগৎ তথা পরলোকে পুনরুত্থান দিবসে (Resurrection Day) মানুষের অনুভূতির স্বরূপ কেমন হবে তা ব্যাখ্যা করা বেশ জটিল। সুতরাং আমরা একটি রূপকের মাধ্যমে বিষয়টি বিচার করব। মনে করা যাক, সমগ্র মানব জাতি মাটির নীচে একটি গুহার মধ্যে বাস করছে। পৃথিবী পৃষ্ঠের আলোর দিকে গুহার একটি মুখ আছে। মুখটি ভূপৃষ্ঠ থেকে গুহা পর্যন্ত দীর্ঘ। এই গুহার মধ্যে সব মানুষ তাদের শৈশবকাল থেকেই রয়েছে। তাদের পা এবং গলা শেকল দিয়ে আবদ্ধ। ডানে, বাঁয়ে কিম্বা পিছনে মুখ ফেরাতে তারা অক্ষম। শেকল তাদের মাথার এরূপ সঞ্চালনকে আটকে রাখে। গুহার দেয়ালের দিকেই তাদের মুখ ঘোরানো। তাদের সম্মুখের দেয়ালকেই মাত্র তারা দেখতে পায়। এবার কল্পনা করি, তাদের পশ্চাতে মাটির উপরে গুহার বাইরে কিছুদূরে আগুন জ্বলছে। বন্দী মানুষ এবং বাইরের আগুন- এদু'য়ের মধ্যভাগে রয়েছে উঁচু একটি পথ। এই পথ ধরেই তৈরী হয়েছে নীচু একটা দেয়াল, একটি পর্দার মত,- যেমন ছায়া নৃত্যের নৃত্য শিল্পীর সামনে থাকে, যে পর্দার উপর শিল্পীরা তাদের পুতুলদের নাচ দেখায়।

গুহা ও বন্দী মানব।
এখন ধরি নীচু দেয়ালটির পথ ধরে একদল লোক চলে যাচ্ছে। তাদের হাতে বিভিন্ন রকমের বস্তু আছে; পাথর, কাঠ কিম্বা অন্য কিছুতে তৈরী নানা পাত্র, মূর্তি, পশুর প্রতিকৃতি। এরা কেউ কেউ কথা বলছে। কেউ নীরবে অগ্রসর হচ্ছে। আর এই শোভাযাত্রার ছবিটি আগুনের আলোতে গুহার মধ্যে তার দেয়ালে এসে প্রতিফলিত হচ্ছে।

আগেই বলা হয়েছে বন্দীরা আমাদেরই মত এবং তাদের মুখ দেয়াল গাত্রে ফেরানো। সুতরাং আলোর প্রতিভাসে তারা কেবল তাদের কিম্বা একে অপরের ছায়াই দেখতে পায়। এখন তাদের মাথা যদি তারা আদৌ সঞ্চালন করতে না পারে তাহলে ছায়া বৈ অপর কিছু তারা দেখতে পাবে না। আর এসময় বাইরে জনতার মিছিল যে সব দ্রব্যাদি হাতে করে নিচ্ছে তারও ছায়াই মাত্র তারা দেখতে পাচ্ছে।

এখন ধরি, বন্দীরা পরস্পরের সাথে আলাপ করছে। এই আলাপে তারা তাদের সম্মুখে দেয়ালের ছায়াকেই কি সত্য বস্তু বলে পরস্পরের নিকট উল্লেখ করবে না? তাছাড়া মনে করি, গুহার মধ্যে শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়। তাহলে বাইরের মিছিলের যে শব্দ গুহার মধ্যে প্রতিধ্বনিত হবে, সেই শব্দকে কি তারা তাদের সম্মুখের ছায়াদের উচ্চারিত শব্দ বলেই মনে করবে না? সুতরাং তাদের কাছে সত্য হচ্ছে প্রতিকৃতির ছায়া মাত্র। এখন দেখি, বন্দীরা যদি মুক্তি পায় এবং তাদের ভুল ভাঙ্গে তাহলে কি ঘটে।

 গুহা ও বন্দী মানব।
মনে করি, বন্দীদের মধ্যে কেউ একজন হঠাৎ মুক্তি পেয়ে উঠে দাঁড়াল এবং মুখ ঘুরিয়ে আলোর দিকে ছুটে গেল। এতে আলোর ঝলক তার চোখকে ধাঁধিয়ে দিল এবং সে চোখে তীব্র যন্ত্রণা বোধ করতে লাগল। সুতরাং যে প্রতিকৃতির ছায়া সে গুহার দেয়ালে দেখে এসেছে তার যথার্থ আকারকে প্রথমে সে দেখতেই পাবে না। এখন মনে করি কেউ তাকে বলল, সে পূর্বে যা দেখেছিল তা ছিল ভ্রান্ত এবং এখন চোখের ধাঁধা কেটে যাবার পর যা দেখছে তাই সত্য। এতে তার জবাব কি হবে?

আরও মনে করা যাক, তার প্রদর্শক তাকে তার সম্মুখের চলমান বস্তু সকলের নাম বলতে বলল। এতে নিশ্চয়ই সে বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে। তার মনে হবে, যে ছায়া সে পূর্বে দেখেছে সেই ছায়া বর্তমানের বস্তু থেকে অধিক সত্য।
এখন সে যদি সোজা আলোর দিকে তাকায় তাহলে তার চোখে আলোর আঘাতে যে যন্ত্রণা হবে তার ফলে মুখ ফিরিয়ে সে যে দৃশ্য অধিক স্পষ্ট বোধ হয় তাকে সে দেখবে এবং আলোর ঝলকে প্রদর্শিত বস্তুর চেয়ে এই বস্তুকে অধিক সত্য বলে মনে করবে।

এবার আরও কল্পনা করি, ধরি, তাকে গুহার মধ্য থেকে জোর করে সেই অমসৃণ পথ দিয়ে উপরে এনে সূর্য্যরে আলোতে ধরে রাখা হল। সূর্য্যরে তীব্র আলোয় চোখে নিশ্চয়ই তার তীব্র জ্বালা হবে। এত আলোতে বাইরের জগতের কোন বস্তুই সে দেখতে পাবে না। কারণ তার চোখকে বাইরের দৃশ্যে অভ্যস্ত হতে হবে। গোড়াতে ছায়াগুলিকেই সে ভাল দেখবে এবং শেষে বাইরের জগতের বস্তুকে দেখতে পাবে। সে এবার চাঁদের আলো, তাঁরার ঝিকিমিকি এবং নক্ষত্র খঁচিত আকাশের দিকে তাকাবে। দিনের সূর্য্যরে আলোয় চেয়ে রাত্রির আকাশ এবং তারার মালাকে সে ভাল দেখতে পাবে। সব শেষে সে সূর্য্যরে দিকেও তাকাতে পারবে। পানিতে তার প্রতিবিম্ব নয়, সূর্য্যরে বাস্তব অস্তিত্বকে সে দেখতে পাবে। তার বিষয় সে এবার চিন্তা করবে। এবং এই সিদ্ধান্ত করতে সক্ষম হবে যে, এই সূর্য্যরে কারণেই ঋতুর বৈচিত্র্য, বৎসরের পরিক্রমা। সূর্য্যই হচ্ছে দৃশ্য জগতের সবকিছুর শাসক। সে এবং তার সঙ্গীরা যা কিছু দেখতে অভ্যস্ত তার কারণ হচ্ছে সূর্য্য।

এবার আমরা কল্পনা করি, গুহার বন্দীশালা হচ্ছে আমাদের দৃশ্য জগৎ, মশাল মিছিলের আলো হচ্ছে সূর্য্য। আর গুহা থেকে উপরে ওঠাকে আমরা আত্মার মুক্তি অর্থাৎ বুদ্ধির জগতে আত্মার আরোহণ। এভাবে আমরা বিশ্বাস করতে পারি, জ্ঞানের জগতে উত্তমের ভাব আমরা সবার শেষেই মাত্র লাভ করতে পারি এবং উত্তমের সে জ্ঞান বিনা আয়েসে লাভ সম্ভব নয়। কিন্তু উত্তমের জ্ঞান যখন আমরা লাভ করি, তখন আমরা উপলব্ধি করি, উত্তমের ভাবই হচ্ছে সবকিছুর মূল। সুন্দর কিম্বা ন্যায়ের কারণই হচ্ছে উত্তম। উত্তমই হচ্ছে দৃশ্য জগতের আলোর মূল। উত্তমই হচ্ছে সত্য এবং বুদ্ধির মূল।

যারা উত্তমের এই রূপকে উপলব্ধি করতে পারে, তারা মানুষের বৈষয়িক জীবনে যে নিজেদের জড়িত করতে চাইবে না, এতে বিষ্ময়ের কিছু নেই। গুহার উপাখ্যানের ভিত্তিতে আমরা বলতে পারি, বন্দী মানুষের আত্মা নিয়ত সত্যের জগতে উর্দ্ধারোহণ করতে চায় এবং সেই উর্দ্ধজগতে আরোহণ করতে সক্ষম হলে আত্মা স্বাভাবিকভাবে সেই জগতেই বাস করতে চাইবে।

অন্যদিকে উত্তমের জ্ঞানলব্ধ মানুষ যখন আবার অজ্ঞানতার গুহার মধ্যে প্রত্যাবর্তণ করে তখন তার আচরণ যদি অদ্ভূত বলে বোধ হয় তাতেও বিষ্ময়ের কিছু নেই। কারণ, তার চোখ অন্ধকারে এখনও অভ্যস্ত হয়নি। তাই যে বন্দী মানুষ চরম ন্যায়ের জ্ঞান লাভ করেনি তার সঙ্গে জাগতিক আদালতে কিম্বা অন্যত্র, প্রতিরূপের ছায়ার সত্যতা অসত্যতা নিয়ে তাকে লড়াই করতে হয়। কিন্তু যখন তার চোখ অভ্যস্ত হবে তখন সে গুহার অধিবাসীদের চাইতে সকল বিষয়কে সহস্র গুণ স্পষ্ট দেখতে পাবে। তখন প্রতিকৃতির কোনটি কি এবং কোনটি কিসের প্রতিকৃতি তাও সে নির্ধারণ করতে সমর্থ হবে। কারণ সে সুন্দর, সত্য এবং উত্তমকে ইতিপূর্বে প্রত্যক্ষ করেছে।
যার সাধরণ জ্ঞান আছে সেই বুঝতে পারবে চোখের বিভ্রম দু‘রকমের। দু‘টি কারণে এর উদ্ভব। এর একটি কারণ হচ্ছে, অন্ধকার থেকে আলোতে বেরিয়ে আসা। অপরটি আলো থেকে অন্ধকারে যাওয়া। দেহের চোখের ক্ষেত্রে যেরূপ একথা সত্য, মনের চোখের ক্ষেত্রেও তেমনি একথা সত্য।

যারা বলে যে, অন্ধকে যেমন দৃষ্টি দান করা যায়, আত্মাকেও তেমনি জ্ঞান দান করা যায়। কথাটি এমন যেন আত্মার মধ্যে জ্ঞান না থাকলেও বাইরে থেকে জ্ঞান এতে আত্মার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া যায়। কিন্তু আমরা দেখেছি, জ্ঞানের ক্ষমতা অর্থাৎ শেখার শক্তি আত্মার মধ্যে থাকে এবং সমস্ত শরীরটাকে না ঘুরিয়ে আমরা যেমন আমাদের চোখটাকে ঘুরিয়ে পিছন দিকে দৃষ্টি দিতে পারিনে, তেমনি আত্মাকেও সমগ্রভাবে নশ্বর জগৎ থেকে অবিনশ্বর জগতের দিকে না ঘুরিয়ে, বিবর্তমান জগৎ থেকে অস্তিত্বের জগতে জ্ঞানের মাধ্যমে ঘুরিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। আত্মাকেও আলোতে অভ্যস্ত হতে হবে। অস্তিত্বের দৃশ্য সে ক্রমান্বয়ে দেখতে পাবে। পরিণামে সে উজ্জ্বলতম অস্তিত্ব অর্থাৎ পরম উত্তম তথা খোদাকেই দেখতে পাবে।

যখন কোন মানুষ কেবল মাত্র যুক্তির আলোতে, ইন্দ্রিয়ের কোনরূপ সাহায্য ব্যাতিরেকে পরম সত্ত্বাকে আবিস্কারের যাত্রা শুরু করে এবং বিরামহীনভাবে এই উদ্দেশ্য নিয়ে সে অভিযানে অগ্রসর হতে থাকে যে, বিশুদ্ধ যুক্তি দ্বারা পরম সত্যকে উপলব্ধি না করা পর্যন্ত তার যাত্রা সে থামাবে না, তাহলে দৃষ্টি যেমন দৃশ্যের শেষে সূর্য্যকে দেখেছে, তেমনি যুক্তি তার যাত্রা শেষে পরম সত্ত্বাকে অবলোকন করবে।

আমাদের গুহার বন্দীদের মুক্ত করে দিয়ে তাদের মুখকে ছায়া থেকে প্রতিকৃতির দিকে ঘুরিয়ে দেয়া হয়েছিল যে প্রতিকৃতি ছায়াগুলিকে নিক্ষেপ করেছিল এবং অগ্নির দিকেও তাদের দৃষ্টি পড়েছিল। গুহা থেকে তারপর বন্দীরা সূর্য্যরে আলোতে উঠে এসেছিল। এখানে তারা জন্ত্তু এবং উদ্ভিদ এবং সূর্য্যকে প্রথম দেখতে পাচ্ছিল না। তখন তারা পানির মধ্যে যথার্থ বস্তুর নিক্ষিপ্ত ছায়ার দিকে তাকাল। এ ছায়া যথার্থ বস্তুর ছায়া ছিল, আগুনের আলো দ্বারা নিক্ষিপ্ত প্রতিকৃতির ছায়া নয়। এই পরিক্রমেই আত্মার উত্তম চরিত্রকে ধাপে ধাপে পরম সত্য অবলোকনের দিকে অগ্রসর করে নিয়ে যাবে- যেমন করে আমাদের দেহের সব চাইতে অনুভবকারী ইন্দ্রিয় দৃশ্যজগতের সর্বাধিক উজ্জ্বল বস্তুকে ক্রমান্বয়ে এবং সর্বশেষে দেখতে সমর্থ হয়েছে।

সমাপ্ত।

উৎস: The Republic by Plato, Tr. by Benjamin Jowett.
ছবি: faculty.eashington.edu, iblog.stjschool.org.

Hereafter: একটি পরলৌকিক কাহিনী।


ইউমোলপাস, উপকথার চরিত্র ‘ম্যুসাস ও তার পুত্র’ কাহিনীতে পূণ্যবানদের জন্যে যে স্বর্গীয় সুখের প্রলোভন দেখান হযেছে তা বিলাসী ও আড়ম্বরপূর্ণ। সেখানে পূণ্যবানদের সরাসরি স্বর্গপুরী নিয়ে যাবার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, যারা পূণ্যবান তারা সেখানে সোফায় শায়িত এবং বিরামহীনভাবে শূরা পানে চিরমত্ত মনীষীদের সঙ্গলাভ করার সৌভাগ্য লাভ করবে। কিছু গ্রন্থে আবার দেখা যায় এই প্রতিশ্রুতি এর থেকেও বেশী। সেইসব গ্রন্থে বলা হয়েছে, যারা পূণ্যবান তারা তাদের স্ত্রী, পুত্র, পৌত্র তথা গোটা পরিবার নিয়ে পুরুষ পরম্পরায় বেঁচে থাকতে পারবে। 

পূণ্যবানদেরকে প্রশংসা করার ধারা গ্রন্থগুলিতে এরূপ হলেও, পাপীদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিপরীত। যে পাপী তাকে পাতালপুরীতে নিয়ে একটা জলাভূমির পঙ্কে ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে, নয়ত: তাদের ভাগ্যে জুটেছে চালুনি ভরে পানি বহন করার পরীক্ষা। মৃত্যুর পূর্বেও তারা অপমানে আর অত্যাচারে হয়েছিল জর্জরিত। অর্থাৎ গ্রন্থগুলিতে এটা পরিস্কার করে ব্যক্ত করা হয়েছে যে, যারা পাপীষ্ঠ বলে পরিচিত দুনিয়াতেও তাদের ভাগ্যে মানুষের ঘৃণা, অত্যাচার আর অপমান বৈ অপর কিছুই জুটতে পারে না। 


কিছু ধর্মগ্রন্থে অবশ্য আমরা পরকালের অনেক কথাই দেখতে পাই। যেমন সর্বশেষ আসমানী কিতাব কোরআনে এ বিষয়ে অনেক প্রতিশ্রুতি রয়েছে যা খুবই ইন্টারেস্টিং। আর তাই যা আমাদেরকে ভাবিয়ে তোলে তা হল সত্যিকার অর্থে কি ঘটবে পরকালে? যাহোক আমরা এ নিয়ে পরবর্তীতে কোন আর্টিকেলে বিস্তারিত আলোচনা করব। আর এখানে কেবল আমরা আলোচনায় আনব প্লেটোর দ্যা রিপাকলিক বইতে উল্লেখিত এরের বর্ণনাকৃত পরকালের কাহিনী। তবে সবকিছুর আগে এখন আমরা ন্যায় এবং উত্তমতা মানুষের জন্যে এইলোকে এবং পরলোকে যে আশীর্বাদ বা পুরস্কার বয়ে আনতে পারে, তা বুঝতে চেষ্টা করব। এখানে অবশ্যই আমরা ধরে নিচ্ছি একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন এবং মানুষ পরকালে তার কর্মফল ভোগ করবে।

খোদার নিকট পূণ্য এবং পাপের যথার্থ চরিত্র অপরিজ্ঞাত নয়। খোদা পূণ্য এবং পাপের যথার্থ চরিত্রকে জানেন এবং এরা উভয়ে যদি খোদার পরিচিত হন তবে এদের একজন তাঁর মিত্র এবং অপরজন তাঁর শত্রু বলে বিবেচিত হবে এবং খোদার নিকট থেকে তাঁর মিত্র যা কিছু উত্তম তাই লাভ করবে। এর একমাত্র ব্যতিক্রম হতে পারে অতীতে কৃত কোন অপরাধের দন্ডের ক্ষেত্রে।

সুতরাং পূণ্যবান যদি দরিদ্র হয়, যদি সে অসুস্থ্য হয় কিম্বা অনুরূপ অপর কোন দুর্ভাগ্য দ্বারা যদি সে আক্রান্ত হয়, তাহলে এরূপ দুর্ভাগ্য তার এই জীবন কিম্বা পরজীবনের মঙ্গলেরই উৎস। কারণ, যে মানুষ ধর্মকে বরণ করেছে এবং ধর্মের অনুসরণে যে মানুষ তার সাধ্যমত ফেরেস্তায় পরিণত হবার চেষ্টা করেছে, সে মানুষকে খোদা কোনক্রমেই অবজ্ঞা করতে পারে না। অপরদিকে যে পাপীষ্ঠ তার ক্ষেত্রে এর বিপরীতটাই সত্য।

এখন আমরা দেখি পূণ্যবান তার জীবনকালে খোদার কাছ থেকে কি পুরস্কার লাভ করে। মানুষের ক্ষেত্রে কি ঘটে? সত্য যদি প্রকাশিত হয় তাহলে কূট-কৌশলে দক্ষ অসৎ, দৌঁড়ের ক্ষেত্রে প্রথমদিকে কিছুটা অগ্রগামী থাকলেও পরিণামকে সে ঠেকাতে পারে না। দৌঁড়ের দ্বিতীয় ধাপে তাকে অবশ্যই পিছিয়ে পড়তে হয়। প্রতিযোগিতার সাঁরি থেকে শীঘ্রই তার পতন ঘটে এবং পরিণামে তার অসম্মান ঘটে। ধিকৃত পশুর ন্যায় তাকে পুরস্কারহীন ভাবে লেজ গুটিয়ে সরে পড়তে হয়। আর যে সত্যিকারের ধাবমান প্রতিযোগী, সে তার দৌঁড় সম্পন্ন করে এবং বিজয়ীর পুরস্কার নিয়েই সে প্রত্যাবর্তন করে। পূণ্যবানের ক্ষেত্রেও কি একথা সত্য নয়? কোন কর্ম সম্পাদনে কিম্বা অপরের সঙ্গে আচরণে কিম্বা জীবনের ক্ষেত্রে পূণ্যবান কি পরিণামে তার সহযাত্রীদের মধ্যে পুরস্কার এবং সুনাম উভয়েরই অধিকারী হয় না? নিশ্চয়ই।

সুতরাং এখন আমরা বলতে পারি, যে ন্যায়পরায়ণ, পূণ্যবান সে যখন বার্ধ্যক্যে উপনীত হবে, তখন সে ইচ্ছে করলে রাষ্ট্রের ক্ষমতায় আরোহণ করতে পারবে; তেমনি নিজে ইচ্ছেমত অপর কোন রমণীকে যেমন সে বিবাহ করতে পারবে, তেমনি নিজের ইচ্ছেমত সন্তানদের বিবাহ কার্য সম্পন্ন করতেও সে সক্ষম হবে। অপর দিকে, যে অন্যায়কারী, পাপীষ্ঠ সে যদিবা তার যুবা বয়সে পরিত্রাণ পেয়ে থাকে, পরিণামে সে অবশ্যই ধৃত হবে এবং অসম্মনিত হবে। অন্যায়কারীর বার্ধক্য হবে দুর্দশাগ্রস্থ। নগরের নাগরিক কিম্বা বৈদেশিক সকলেই তাকে করুণার চোখে দেখবে এবং সমস্ত বর্বর নিগ্রহ যেমন- বেত্রাঘাত, নির্যাতন, জেল-জরিমানা এবং ফাঁসি- সকল দন্ডেই সে দন্ডিত হবে আমরা ন্যায়সঙ্গত ভাবেই তা বলতে পারি।

সুতরাং যে পূণ্যবান সে নিজের ন্যায়পরায়ণতার উপকার ব্যতিত তার জীবনকালে খোদা এবং মানুষের নিকট থেকে এইসকল পুরস্কার লাভ করে এবং এরূপ পুরস্কার অবশ্যই অতি উত্তম পুরস্কার। তবু মৃত্যুর পরে পূণ্যবান এবং পাপীষ্ঠের জন্যে যে প্রাপ্য অপেক্ষা করে আছে, তার তুলনায় তাদের ইহজগতের এই প্রাপ্য সংখ্যা এবং গুণের ক্ষেত্রে আদৌ তুলনীয় নয়। সেই প্রাপ্যের কথাও আমাদের জানা আবশ্যক। তাহলেই মাত্র পূণ্যবান এবং পাপীষ্ঠের প্রাপ্যের বর্ণনা পূর্ণ হবে।

প্যামফিলিয়াতে জন্মগ্রহণকারী আর্মেনিয়াসের পুত্র এর (Er) ছিল একজন বীর যোদ্ধা। যুদ্ধ ক্ষেত্রে তার মৃত্যু ঘটল। অবশ্যই বীরের মৃত্যু। দশদিন অতিবাহিত হবার পর, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিহত মৃত দেহগুলি সংগ্রহ করে তাদের শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করা হল। সব দেহগুলিই তখন পচন ক্রিয়ায় বিকৃত। কিন্তু বিষ্ময়ের ব্যাপার, এরের দেহ অবিকৃত ছিল। তার দেহকে তার গৃহে এনে সমাধিস্থ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে লাগল। কিন্তু দ্বাদশ দিবসে এর যখন সমাধি শয্যায় শায়িত, তখন তার দেহে জীবন ফিরে এল।

জীবন ফিরে পেয়ে এর তার চারিদিকে সমবেত সকলকে তার পরলোকের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে লাগল। এর বলল, যখন তার আত্মা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হল, তখন সে আরো বহু বীরের আত্মাদের সঙ্গে পরলোকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল। আর সেই যাত্রায় অগ্রসর হতে হতে তারা একসময় একটি রহস্যময় স্থানে এসে উপস্থিত হল। তারা দেখতে পেল, মহাবিশ্বের ঐ স্থানটিতে দু’টি পরস্পর সংলগ্ন পথ রয়েছে। কিন্তু নীচের এ দু’টি পথের উপরে আরও দু’টি পথকে দেখা গেল। উপরের এবং নীচের ঐ পথের মাঝামাঝি স্থানে একদল দেবদূত উপবিষ্ট যাদের অধিকাংশই গভীর মনোযোগে বইয়ের পাতায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করে আছে। তাদের সম্মুখেও রয়েছে বড় বড় পুস্তক। আর তারা আত্মাদেরকে একে একে পিতার নামসহ ডেকে নিয়ে কাউকে ঐ পুস্তকের একটি হাতে দিয়ে তাদেরকে আকাশের পথ দু’টির ডান দিকের পথ ধরে আরোহণের নির্দেশ দিচ্ছে এবং কাউকে তার ভারী পুস্তকটি পৃষ্ঠদেশে আবদ্ধ করে দিয়ে অধ:দেশের নি:স্ক্রমণ পথের বাম দিকের পথ ধরে নেমে যেতে আদেশ করছে। এভাবে যখন এর দেবদূতদের সম্মুখে উপস্থিত হল, তখন তাকে কোন পুস্তক না দিয়ে বলা হল, সে পরলোকের সবকিছু দেখবে এবং শুনবে। অত:পর ফিরে গিয়ে পৃথিবীর মানুষের কাছে তার পারলৌকিক ঐ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করবে।

এই আদেশের পর এর সবকিছু দেখতে-শুনতে লাগল। সে দেখল, পৃথিবী থেকে আগত সকল আত্মাই দেবদূতদের কাছ থেকে পুস্তক নিয়ে উপরের বা নিম্নের ঐ নির্দিষ্ট দু’টি নি:স্ক্রমণ পথে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। এর আরও দেখতে পেল, অন্য যে দু’টি পথ রয়েছে, তার মধ্যে অধ:দেশের পথটি দিয়ে কেউ হয়ত: ধূলাবালি সমাচ্ছন্ন হয়ে যাত্রার ক্লান্তি নিয়ে পৃথিবীর গহ্বর থেকে উঠে আসছে, আবার উর্দ্ধ মুখের পথটি দিয়ে কেউ কেউ পরিচ্ছন্ন ও উজ্জ্বল বেশে নেমে আসছে। উর্দ্ধ মুখের পথটি দিয়ে যারা নেমে আসছে, তাদের দেখে মনে হচ্ছে তারা দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে এসেছে, কিন্তু তাদের অবয়বে যাত্রার ক্লান্তির কোন ছাপ নেই। তাদের দেখা গেল সানন্দ মনে তারা একটি প্রান্তরে পৌঁছে যেন কোন উৎসবের আয়োজন করছে। তারা পরস্পরকে আলিঙ্গন করছে এবং বাক্যালাপে মশগুল হচ্ছে। আর যখন সেখানে পৃথিবী থেকে কোন সদ্য আগত আত্মার দল পৌঁছে যাচ্ছে, তারা এগিয়ে এসে তাদের কুশলাদি জানছে এবং তাদের কাছে পৃথিবীর খবরাখবর বেশ আগ্রহের সঙ্গে শুনছে।

যারা পৃথিবী থেকে সরাসরি (এরা মূলত: শিশু, ধর্ম ও ন্যায়ের পথে মৃত্যুবরণকারী এবং মুমিন) বা পাতালপুরী থেকে (এক পশলা সাজা খেটে আসা) এসেছে তারা তাদের দু:খ, কষ্ট ও যন্ত্রণার করুণ বর্ণনা দিতে লাগল। তাদের চোখ দিয়ে দু:খের অশ্রু ঝরে পড়তে লাগল। স্বর্গ থেকে আগত আত্মা গুলো তখন তাদেরকে স্বর্গের অবর্ণনীয় সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য ও সৌন্দয্যের বর্ণনা দিয়ে তাদেরকে শান্ত করতে লাগল। এ কাহিনী দীর্ঘ।

এর বলল, দেবদূতগণ পাপীষ্ঠদের পাপের ধরণ অনুসারে প্রতিটি অন্যায়ের দশ গুণ শাস্তির ব্যবস্থা করছে এবং কাউকে তার দন্ড ভোগকে শত বৎসরে একবার বা সহস্র বৎসরে দশবারের ভিত্তিতে বিভক্ত করে দিচ্ছে। কিন্তু যারা খোদার প্রতি বা পিতা-মাতার প্রতি অসম্মানকারী এবং যারা মানুষ হত্যাকারী তাদের শাস্তি উল্লেখিত দন্ডের চেয়ে বহুগুণে অধিক এবং ভয়ানক। এর একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করল। সে বলল, সে শুনতে পেল একটি আত্মা অপর একটি আত্মাকে প্রশ্ন করছে- ‘ভাই, মহান আর্ডিউস কোথায়?’

এই আর্ডিউস এরের হাজার বৎসর পূর্বে পৃথিবীতে জীবন-ধারণ করেছিল। সে প্যামফিলিয়ার কোন নগরীর স্বৈরশাসক ছিল। সে তার বৃদ্ধ পিতা এবং জৈষ্ঠ্য ভ্রাতাকে হত্যা করেছিল। এ ছাড়াও তার ঘৃণ্য দুস্কর্মের সীমা ছিল না। সে যা হোক, এর শুনতে পেল অপর আত্মাটি বলছে- ‘আর্ডিউসের আত্মা কখনও উর্দ্ধে আরোহণে সক্ষম হবে না। কারণ, আমরা নিজেদের চোখেই এক ভয়ানক দৃশ্য দেখেছি। পাতালপুরীর সমস্ত অভিজ্ঞতা শেষ করে আমরা তখন সবে গুহা মুখে পৌঁছেছি, আমাদের কেউ কেউ পুন:রায় আরোহণের উদ্যোগ করছে, আবার কেউ কেউ বিশ্রামে, এমন সময় আমরা দেখলাম, আর্ডিউস এবং তার সঙ্গে আরও কিছু আত্মা সেখানে এসে হাজির হল। তারা সকলেই ছিল স্বৈরশাসক। তাছাড়া, তাদের সাথে এমন আত্মারাও রয়েছে, যারা ব্যক্তিগত ভাবে বৃহৎ দুস্কর্মের নায়ক ছিল। তারা এসে সকলকে সরিয়ে দিয়ে গহ্বরের মুখে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারা ভেবেছিল অন্যদের মত তারাও উর্দ্ধে আরোহণ করবে। কিন্তু আমরা দেখলাম গহ্বরের মুখ তাদের গ্রহণ না করে আচম্বিতে গর্জন করে উঠল।

বস্তুত: এই দূরারোগ্য পাপীর দল কিম্বা তাদের সঙ্গীদের মধ্যে যাদের দন্ড ভোগ সমাপ্ত হয়নি, তাদের কেউ যখন উর্দ্ধে আরোহণের চেষ্টা করছিল, তখনি গুহা গর্জন করে উঠছিল এবং যেসব ভীমাকার প্রহরী দন্ডায়মান ছিল, তারা সেই গর্জনধ্বণি শ্রবণ করে এগিয়ে এসে তাদেরকে ধরে বেঁধে নিয়ে যাচ্ছিল।

আর্ডিউস ও তার সঙ্গীদেরকে প্রহরীর দল হাত-পা বেঁধে ভূমিতে ফেলে তাদেরকে চাবুক মারছিল এবং তাদেরকে কেশগুচ্ছ ধরে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে যেতে উপস্থিত অন্যান্য আত্মাদের নিকট তাদের অপরাধের বর্ণনা দিচ্ছিল এবং বলছিল তাদেরকে তারা আরো কঠিন শাস্তিতে নিক্ষেপ করতে যাচ্ছে। অপরাধী ছাড়া অপর যারা সেই সময় গুহা মুখের আশে-পাশে দাঁড়িয়ে আরোহণের অপেক্ষায় ছিল, তাদের মনে তখন সবচেয়ে বড় আতঙ্ক ছিল এই যে, পাছে তারাও সেই গর্জন ধ্বনি শুনতে পায়। কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে গুহামুখ নীরব হয়ে রইল, তখন তারা একে একে অসীম আনন্দে গুহামুখ দিয়ে উর্দ্ধে আরোহণ করল।’

এর আরও বর্ণনা করেছিল, উর্দ্ধ থেকে আগত আত্মারা সাত দিন প্রান্তরে অতিবাহিত করে আবারও যাত্রা শুরু করল। ৪র্থ দিনে তারা এমন এক স্থানে এসে উপস্থিত হল, যেখান থেকে স্বর্গ এবং মর্ত্য ভেদকারী একটি আলোক দন্ডকে তারা দেখতে পেল। স্তম্ভের মত আলোর এই দন্ডটি বর্ণ সমারোহে রামধণু প্রায়। বরং বলাচলে রামধণুর চেয়েও সে উজ্জ্বল এবং স্পষ্ট। আরও একদিন অতিবাহিত হল। অভিযাত্রী আত্মার দল এবার সেই আলোক স্তম্ভে প্রবেশ করল। তাদের ঐ অবস্থান থেকে আলোক স্তম্ভের মেরুদন্ডের উপর দৃষ্টিপাত করে এবার তারা স্বর্গ থেকে প্রলম্বিত দন্ডের উভয় প্রান্তকে দেখতে পেল। কারণ, আলোর এই স্তম্ভটি হচ্ছে স্বর্গ বা জ্যোতির্মন্ডলের বন্ধন দন্ড। এই দন্ডই জাহাজের দাঁড়ের সাঁরির বন্ধন-সূত্রের ন্যায় জ্যোতির্মন্ডলের সমগ্র পরিধিকে ধারণ করে রাখে। এই দন্ডের প্রান্তদেশ দ্বয়ে আবদ্ধ হচ্ছে অনিবার্যতার চক্রটি। অনিবার্যতার এই চক্রটির কারণে সমগ্র নক্ষত্র পুঞ্জের আবর্তন।

অনিবার্যতার চক্রের দন্ড এবং বক্র প্রান্ত কঠিন প্রস্তর এবং অন্য কোন ধাতব বস্তুর মিশ্রণে গঠিত এবং এর গতির নিয়ামক অংশটির প্রস্তুত প্রণালীর যে বর্ণনা এর দিয়েছে, তাতে মনে হয় চক্রের একটি অংশকে খোঁদাই করে তা তৈরী করা হয়েছে। এই খোঁদিত অংশটিতে আবার একটি দ্বিতীয় নিয়ামক স্থাপিত হয়েছে। আবার দ্বিতীয়টিতে খোঁদাই করে বসান হয়েছে একটি তৃতীয় নিয়ামক এবং তৃতীয় নিয়ামকটিকে খোঁদাই করে স্থাপিত হয়েছে চতুর্থ নিয়ামক। এমনি করে তৈরী হতে হতে অষ্টম নিয়ামকে যেয়ে তা সম্পূর্ণ হয়েছে। এ যেন কতকগুলি কুম্ভের স্তর-স্তুপ। কারণ, সেখানে সর্বমোট আটটি নিয়ামক খোঁদিত ছিল এবং একটির মধ্যে ঘটেছিল অপরটির স্থাপন। উর্দ্ধদেশ থেকে দেখলে এ নিয়ামকের বাহুকে একটি বৃত্তের মতই মনে হবে। দন্ডকে ঘিরে তৈরী হয়েছে এই নিয়ামকের তল। অষ্টম নিয়ামকের কেন্দ্র বিন্দু দিয়ে প্রবিষ্ট হয়েছে এই দন্ড। সবচেয়ে বাইরের দিকের নিয়ামকের বাহু প্রশস্ততম। পরিধিতে হ্রস্বতর ছিল ষষ্ঠ এবং তারচেয়ে চতুর্থ। চতুর্থের পরে অষ্টম, অষ্টমের পরে সপ্তম, সপ্তমের পরে পঞ্চম, তারপরে তৃতীয় এবং সবশেষে দ্বিতীয়।

বহির্দিকস্থ বৃহত্তম বাহুটি বর্ণে ছিল বিচিত্র। কিন্তু সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিল সপ্তমটি। অষ্টমটির আলো আসছিল সপ্তম থেকে। কারণ সপ্তমের বর্ণেই অষ্টমের বর্ণ। দ্বিতীয় এবং পঞ্চম নিয়ামকের বৃত্তকে বলা চলে পরস্পর সদৃশ। এদের বর্ণ ছিল অপর বৃত্তের চেয়ে অধিকতর পীত। কিন্তু তৃতীয়টি ছিল শুভ্রতম। চতুর্থটির বর্ণ লোহিত এবং ষষ্ঠটি শুভ্রতার ক্ষেত্রে দ্বিতীয়। সমগ্র চক্র একটি বেগেই আবর্তিত হত। কিন্তু সমগ্র গতির অন্তরে অন্তর্ভূক্ত অপর সাতটি নিয়ামকের গতি ছিল ধীরতর এবং সমগ্রের বিপরীতমুখী। কিন্তু এদের মধ্যেও অষ্টমটির গতি ছিল সর্বাধিক। গতিতে অষ্টমের নিকটবর্তীতে ছিল যথাক্রমে সপ্তম, ষষ্ঠ এবং পঞ্চম। এদের সকলের গতি ছিল সমহারের। গতির ক্রমে তৃতীয় স্থান ছিল চতুর্থের এবং এর গতি ছিল বিপরীত আবর্তের। চতুর্থ অবস্থান ছিল তৃতীয়ের এবং পঞ্চম স্থান ছিল দ্বিতীয়ের। আবার, সমগ্র চক্রের আবর্তই সংঘটিত হচ্ছে অনিবার্যতার ক্রোড় দেশে এবং প্রত্যেক বৃত্তের উপরিভাগে একটি করে সংকেত শিঙ্গা স্থাপিত রয়েছে। আবর্তের সঙ্গে সঙ্গে এই শিঙ্গাটি যেমন আবর্তিত হতে থাকে, তেমনি এর শিঙ্গা থেকে একটি নির্দিষ্ট খাতের শব্দ সর্বদা ধ্বণিত হতে থাকে। আর প্রত্যেক বৃত্তের শিঙ্গা একই খাতের ধ্বণি সৃষ্টি করে, ফলে আটটি বৃত্তের শিঙ্গা ধ্বণিতে একটি শব্দ রাগের সৃষ্টি হয়।

ল্যাচেসিস, ক্লথো এবং এ্যাটরোপস।
বৃত্তের পরিক্রম পথে প্রায় সমদূরত্বে আসীন তিনটি মূর্ত্তিবৎ দেবদূত। প্রত্যেকেই তারা একটি করে সিংহাসনে উপবিষ্ট। এরের ভাষ্য অনুসারে এরা তিন জন-তিন ভাগ্যদেবী-ল্যাচেসিস, ক্লথো এবং এ্যাটরোপস। শুভ্র বসনে তারা ভূষিত। শিরে তাদের পুষ্পমাল্য। শিঙ্গার ধ্বণির সঙ্গে কন্ঠ মিলিয়ে তারা সঙ্গীত সৃষ্টি করে চলেছে। ল্যাচেসিসের সঙ্গীতের ধূয়া হচ্ছে অতীত, ক্লথোর বর্তমান এবং এ্যাটরোপসের ভবিষ্যৎ। অভিযাত্রী আত্মার দল দেখতে পেল, মাঝে মাঝে ক্লথো চক্রের সর্বাপেক্ষা বহি:স্থ বাহুটি আকর্ষণ করে তাতে গতির সঞ্চার করে দিচ্ছে। এ্যাটরোপসও তার বাম বাহু দিয়ে অন্তর্বাহুটি ঘুরিয়ে দিচ্ছে এবং ল্যাচেসিস পর্যায়ক্রমে তার বাম এবং ডান বাহু দ্বারা অন্ত এবং বহির্বাহু গুলিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে।

এই স্থানটিতে পৌঁছে আত্মার দল সোজা ল্যাচেসিসের সম্মুখে হাজির হল। এবার একজন দোভাষী তাদেরকে অর্ধাবৃত্তাকারে দাঁড় করিয়ে দিল এবং ল্যাচেসিসের ক্রোড় থেকে কতকগুলি জীবন সংখ্যা তুলে নিয়ে একটি উচ্চ মঞ্চে আরোহণ করে ঘোষণা করল-‘হে আত্মার দল! মর্ত্যের মরণশীল জীবন তোমরা এবার শুরু করতে যাচ্ছ। তোমাদের জন্যে কোন ভাগ্য নির্দিষ্ট করে দেয়া হবে না। তোমাদের ভাগ্য তোমাদেরই নির্ধারণ করতে হবে। জীবন সংখ্যা ছুঁড়ে দেয়া হবে এবং যে আত্মা সংখ্যার যে ক্রম তুলে নেবে, সেই ক্রম অনুসারে সে নিজ জীবন বাঁছাইয়ের সুযোগ পাবে। তোমাদের বাঁছাইকৃত এই জীবনে উত্তম বা ধর্মের জন্যে খবরদারির আবশ্যকতা রাখা হয়নি। তোমরা যে যা বাঁছাই করবে, সে তাকে তেমনি লাভ করবে। এজন্য বিধাতাকে দায়ী করা যাবে না। আপন ভাগ্য বাঁছাইয়ের দায়িত্ব আত্মার নিজের।’

এই ঘোষণা পাঠ করে ভাষ্যকার জীবন সংখ্যাগুলো ছুঁড়ে দিল এবং আত্মা দলের যার নিকটে যে সংখ্যা এসে পড়ল, সে তা তুলে নিল। একমাত্র ব্যতিক্রম হল এর। সে কোন জীবন সংখ্যা কুড়িয়ে নিল না। কারণ তার জন্যে জীবন সংখ্যা গ্রহণ নিষিদ্ধ ছিল। যা হোক, জীবন সংখ্যা কুড়ানো হলে আত্মারা বুঝতে পারল, কে কখন জীবন বাঁছাইয়ের সুযোগ পাবে। এবার ভাষ্যকার সমবেত আত্মাদের যা সংখ্যা তার চেয়ে অধিক জীবন প্রকার তাদের সম্মুখে রেখে দিল। কল্পনীয় সমস্ত প্রকার মানব জীবনই তাদের মধ্যে ছিল। প্রত্যেক প্রকারের প্রতিটি জীবনের সাথে আয়ূস্কাল ও ভাগ্য বর্ণিত ছিল। সমস্ত আয়ূস্কাল ব্যাপী যে জীবন স্বৈরাচারী, তাও যেমন এখানে ছিল, তেমনি ছিল স্বৈরাচারী সেই জীবনও যার মধ্য পথে পতন ঘটে এবং সমাপ্তি ঘটে দারিদ্রে, নির্বাসনে কিম্বা ভিক্ষাবৃত্তিতে। দৌহিক সৌন্দয্যে মনোহর, কিম্বা শারিরীক ক্রীড়ায় পারদর্শী কিম্বা সুজাত বা অভিজাত পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত জীবনের নমুনারও অভাব ছিল না এবং এমন কোন সুনামের অধিকারী নয় তেমন জীবনও সেখানে ছিল। আর দারিদ্র এবং সমৃদ্ধি, স্বাস্থ্য এবং রোগ প্রত্যেক জীবনের সাথেই মিশ্রিত ছিল। জীবনের এই বৈচিত্র্যের সমাবেশ থেকে যার বেলায় যতগুলি জীবনের ধরণ অবশিষ্ট থাকবে, সে কেবল তা থেকেই বেঁছে নিতে পারবে।

মূলত: আত্মারা এখানে যা বাঁছাই করবে তা হল, আয়ূস্কাল, স্বাস্থ্য-সৌন্দর্য্য, রিজিক, অর্থ-বিত্ত, খ্যাতি-যশ:, রোগ-শোক, বিবাহ-সন্তানাদি ইত্যাদি। অন্যদিকে প্রজ্ঞা কাজে লাগিয়ে ধর্ম ও ন্যায়ের পথ বাঁছাইয়ের সুযোগ সে পাবে দুনিয়াতে। আর তাই ভাষ্যকার এবার আত্মাদের উদ্দেশ্য করে বলল-‘যে আত্মা সকলের শেষে জীবন বাঁছাইয়ের সুযোগ পাবে, তারও চিন্তার কোন কারণ নেই। কেননা, তার জীবনের ধরণ যাই হোক না কেন, সফলকাম বা ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ সকলেরই সমান সমান। তারাই সফলকাম হয়ে আবার এই জগতে ফিরে আসতে পারবে, যারা দুনিয়াতে বিধাতার তরফ থেকে প্রদর্শিত সত্য ও সরল পথ গ্রহণে প্রজ্ঞা কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞতার পরিচয় দিতে পারবে। কাজেই, সবার প্রথমে যে জীবন নির্বাচন করছে, তার অধৈর্য্য হওয়ার কারণ নেই, সুচিন্তিত ভাবে নির্বাচন করুক সে তার জীবনকে এবং যে নির্বাচন করছে সবার শেষে, তারও হতাশ হবার কোন কারণ নেই।’

ভাষ্যকারের এ বক্তব্য সমাপ্ত হলে যে আত্মার বাজির সংখ্যা ১ম ছিল, সে এবার তার জীবন বাঁছাই করে নিল। কিন্তু কি আশ্চর্য্য! ত্বরিৎ সে বাঁছাই করে নিল সর্বাধিক স্বৈরতান্ত্রিক শাসকের এক জীবনকে। নিজের মূর্খতায় এবং ব্যগ্রতায় সে পরিপূর্ণরূপে বিচার করে দেখল না, কোন জীবনকে সে গ্রহণ করছে। তাই সে উপলব্ধি করতে পারল না, নিয়তির নির্দেশে এই জীবনে তাকে নিজের সন্তানকে হত্যা করতে হবে এবং অনুরূপ বহু অবর্ণনীয় আতঙ্ক তার ভোগ করতে হবে। কিন্তু সিদ্ধান্তের পর অবসর মুহূর্তে যখন সে চিন্তা করে দেখল, কি জীবনকে সে নির্বাচিত করেছে, তখন সে নিজের মূর্খতার জন্যে অনুতাপে বিদ্ধ হতে লাগল। অথচ তার এ দূর্ভাগ্যের জন্যে দায়ী অপর কেউ নয়। সে বিস্মৃত হয়েছিল ভাষ্যকারের সতর্কবাণী। ভাষ্যকার বলেছিল প্রত্যেক আত্মাই তার ভাগ্যের নিয়ামক। কাজেই নিজ ভাগ্যের জন্যে বিধাতা, ভাগ্যদেবী বা অপর কাউকে দায়ী করা অর্থহীন।

বস্তুত: স্বৈরাচারী জীবন নির্বাচনকারী এই আত্মাই নয়, অধিকাংশ আত্মাই জীবন নির্বাচনে বিজ্ঞতার পরিচয় দিতে পারল না কেবলমাত্র অজ্ঞতার কারণে, বলা চলে ইতিপূর্বে দু:খের পরীক্ষায় পরীক্ষিত না হওয়ার কারণে। কিন্তু কিছু কিছু আত্মা যারা ইতিপূর্বে ‍পৃথিবী থেকে আগত কোন আত্মাদলের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময় করেছিল, জেনেছিল তাদের দূর্ভোগ, তারা নূতন জীবন নির্বাচনে তুলনামূলক ভাবে বিজ্ঞতার পরিচয় দিল। তারা ব্যগ্রতায় নয় বরং ধীর-স্থির ভাবে যথেষ্ট সময় নিয়ে জীবন নির্বাচন করল এবং তাদের জীবন তাদের জন্যে মঙ্গলকর হল। যেমন, বাজির সংখ্যা যার বিংশদশ ছিল, সে খুঁজে ফিরল সাদামাটা আটপৌরে এক জীবন। অবশেষে সে তা খুঁজে পেল এক কোনে, সেখানে পড়ে ছিল সেটি সকলের অবহেলায়। আর তা খুঁজে পেয়ে পরিতৃপ্তির এক হাসি দিয়ে সে ঘোষণা করল, যদি তার বাজির সংখ্যা প্রথমও হত, তবুও সে এ জীবনকেই বেঁছে নিত। প্রকৃতপক্ষে, আত্মাদের জীবন নির্বাচনের পর্বটি যথার্থই দেখার মত ছিল। এ দৃশ্য যেমন করুণার উদ্রেক করেছে, তেমনি হাস্যরস ও বিষ্ময়ের সৃষ্টি করেছে।

যা হোক, সকল আত্মার জীবন নির্বাচনের পর্ব সমাপ্ত হলে আত্মার দল তাদের বাজির সংখ্যার ধারাক্রমে একের পর এক ল্যাচেসিসের সম্মুখে উপস্থিত হল। এখন ল্যাচেসিস প্রত্যেক আত্মার নির্বাচিত পথপ্রদর্শক দেবদূতকে আত্মাদের জীবনপথ প্রদর্শণের নির্দেশ দিল। এতে দেবদূতগণ আত্মাদেরকে প্রথম নিয়ে গেল ক্লথোর নিকট। এভাবে তারা আত্মাদেরকে ক্লথো পরিচালিত চক্রের আবর্তের মধ্যে এনে তাদের নির্বাচিত ভাগ্যকে সুনির্দিষ্ট করে দিল। এই কার্য্য সমাধা করে দেবদূতগণ ক্লথোকে অভিবাদন জানিয়ে আত্মাদেরকে নিয়ে চলল চক্রের নিরলস চালনাকারী এ্যাটরোপসের নিকট। এ্যাটরোপস এবার নিয়তির সূত্রে আবদ্ধ করে আত্মার নির্বাচিত জীবনকে অপরিবর্তনীয় করে দিল।

অত:পর আত্মার দল পশ্চাৎ দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ না করে অনিবার্যতার সিংহাসনের সম্মুখে এসে সমবেত হল। তারপর তারা সেখান থেকে যাত্রা করে অগ্রসর হতে হতে এক সময় পৌঁছে গেল বৃক্ষ-লতা-গুল্ম শুণ্য ‘লেথির সমতল ভূমি’তে। অবশ্য এখানে পৌঁছার পূর্বে তাদেরকে অতিক্রম করতে হয়েছিল এক দু:সহ শ্বাসরুদ্ধকর তাপের তেজকে।

অপরাহ্নে সকলে এসে শিবির স্থাপন করল ‘বিস্মৃতির নদী’র তটে। বিস্মৃতির এই নদীর পানিকে কোন পাত্রেই ধারণ করা চলে না। নিয়তির নির্দেশে সকল আত্মাকেই পান করতে হল এই পানি। যারা বিজ্ঞতার সাথে নিজেকে রক্ষা করতে পারল না, তারা এই পানি প্রয়োজনের তুলনায় অধিক পান করে ফেলল। এবার সকল আত্মা নিদ্রামগ্ন হল এবং পরলোকের সকল অভিজ্ঞতা বিস্মৃত হয়ে গেল। তারপর যখন মধ্যরাত্রি আগত, তখন ভূমির কম্পন শুরু হল এবং বজ্র্ নিঘোষিত হল। আর বিচ্ছুরিত তারকার মত এক বিপুল উৎক্ষেপনে সকল আত্মা পরলোক থেকে উৎক্ষিপ্ত হল ইহলোকে। মর্ত্যলোকে তাদের ঘটল নূতন অস্তিত্বের জন্ম।

বিস্মৃতির নদীর পানি পান করা এরের জন্যে নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু সেও বলতে পারেনি, কেমন করে, কোন উপায়ে সে প্রত্যাবর্তন করতে সক্ষম হল তার মৃত দেহের মধ্যে। তার এইমাত্র স্মরণ আছে হঠাৎ সে জীবন ফিরে পেল। তার চক্ষু উন্মীলিত হল, আর দেখতে পেল প্রত্যুষ হয়ে আসছে এবং সে শায়িত রয়েছে তার সমাধি শয্যায়।

সমাপ্ত।

উৎস: The Republic by Plato, Tr. by Benjamin Jowett.
বি:দ্র: প্লেটোর বর্ণনা এবং আমার বর্ণনার মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। এটা অনুবাদ ত্রুটি নয়, আসলে আমি আমার মত করেই বর্ণনা করেছি প্লেটোর বর্ণনাকে।

২১ জুন, ২০১২

Hereafter: পরলোকে বিশ্বাস না অবিশ্বাস?


মানুষ যখন মৃত্যুর নিকটবর্তী হয় তখন তার মনে এতদিন পর্যন্ত যে চিন্তা, ভাবনা ও ভীতির উদয় হয়নি, সেগুলোরই উদ্ভব ঘটতে থাকে। পরলোকে (Hereafter) যাত্রা যখন তার আসন্ন হয়ে উঠেছে তখন তার কৃতকর্মের ফলস্বরূপ যে শাস্তি তাকে সেই পরলোকে পেতে হবে তার কথা আতঙ্কজনকভাবে তার মনে উদয় হতে থাকে। মর্তলোকের কার্যাবলীর জন্যে পরলোকে দন্ড কিম্বা পুরস্কার লাভের কাহিনী সে পূর্বেও শুনেছে। কিন্তু পূর্বে যে কাহিনী ছিল তার নিকট পরিহাসের বস্তু, আজ তাই হয়ে উঠেছে তার কাছে আতঙ্কের বিষয়। আজ সে ভাবছে, এতকাল যাকে হেসে উড়িয়ে দিয়েছে, সে কাহিনী শেষ পর্যন্ত সত্যও হতে পারে। পরলোকের সান্নিধ্য অথবা বয়সের আধিক্য- যে কারণেই হোক না কেন আজ যেন পরলোক সম্পর্কে তার দৃষ্টিটি বেশ পরিস্কার হয়ে এসেছে; উদ্বেগ এবং আতঙ্কে তাই সে অস্থির হয়ে উঠেছে। আজ সে ভাবতে শুরু করেছে, মর্তলোকের জীবনে কার প্রতি কোন অন্যায় সে করেছে। এই হিসাব নিকাশে যখন সে দেখতে পায় যে, অন্যায়ের অংশ তার মোটেই কম নয়, তখন শিশুর মতই নিদ্রার মধ্যে দুঃসপ্নে সে আঁৎকে উঠে; মন তার নানা দুশ্চিন্তায় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠে। কিন্তু অন্যায় থেকে যে মুক্ত, পাপের দুশ্চিন্তার উদয় যার মনে ঘটে না, সুন্দর আশাই তার পরলোকের পথে প্রিয় সঙ্গী হিসেবে তাকে অভয় দিতে থাকে। এই কথাগুলো সংক্ষেপে পিন্ডর বলেছেন এভাবে- 

‘যে ধর্মের পথে রয়েছে এবং পবিত্র জীবন-যাপন করেছে আশা তার আত্মার সঙ্গী; তার বার্ধক্যে আর পরলোকের পথে আশা তাকে ভরসা যোগায়; কারণ, দুশ্চিন্তায় অস্থির আত্মাকে শান্ত করার ক্ষমতা একমাত্র আশারই আছে।’ 

এখানে ধনসম্পদ সম্পর্কে একটি কথা বলা প্রয়োজন যে, তার একটা বড় আশীর্বাদ রয়েছে, তা হল এই যে, উত্তম ও সৎকে এই অভয়দান যে, ইচ্ছায় কি অনিচ্ছায় কাউকে প্রতারণা কিম্বা বঞ্চিত করার কোন কারণ তার ঘটেনি। পরলোকে যাত্রার মুহূর্তে মানুষ কিম্বা খোদা কারও কাছে কোন ঋণের চিন্তাতেই আর সে নিজেকে চিন্তাগ্রস্থ বোধ করে না। এ কথা সত্য যে, এ আশীর্বাদ কেবলমাত্র উত্তমের ভাগ্যেই জুটতে পারে, সকলের ভাগ্যে নয়। দুশ্চিন্তা থেকে মানুষের মুক্তি বোধের এই যে শান্তি সে কেবল সম্পদ থেকেই মানুষ লাভ করতে পারে।

প্লেটোর উপরের আলোচনা থেকে আমরা দুটি সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারছি-

১. বৃদ্ধকালে মৃত্যুর সময় আস্তিক নিশ্চিন্ত থাকে। কিন্তু নাস্তিক তার অতীত অন্যায় ও পাপ কৃতকর্মের জন্যে নানা দু:চিন্তায় অস্থির থাকে, নানা দু:স্বপ্নে তার নিদ্রা টুটে।

২. পরকালে আস্তিক যদি দেখে স্বর্গ-নরকের অস্তিত্ব নেই, তবু তার হারানোর কিছু নেই। কিন্তু নাস্তিক? তার তো তখন আফসোসে বৃদ্ধা আঙ্গুল চুষতে হবে যদি স্বর্গ-নরক থেকেই থাকে।

সমাপ্ত।

উৎস: দি রিপাবলিক-বাই প্লেটো, অনুদিত- বেঞ্জামিন জোয়েট।

২০ জুন, ২০১২

Human Character: মানব চরিত্রের শ্রেণী বিন্যাস।


মানুষ যে ধর্মের বা বর্ণের হোক না কেন, চরিত্রগত দিক থেকে তারা পাঁচভাগে বিভক্ত। ক) উচ্চাভিলাসী চরিত্র, খ) কতিপয়তন্ত্রী চরিত্র, গ) গণতন্ত্রী চরিত্র, ঘ) স্বৈরতান্ত্রিক চরিত্র, ঙ) দার্শণিক চরিত্র। এই আলোচনা এখানে একারণে যে, আমরা যেন মানব চরিত্রের (Human Character) স্বরূপটা বুঝতে পারি এবং নিজেদের চরিত্রকে প্রয়োজন মত পরিমার্জিত ও সংশোধিত করতে পারি। 

উচ্চাভিলাষী চরিত্রঃ এই চরিত্রের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে, অশিক্ষিতের মত তার দাসের সঙ্গে রূঢ় ব্যবহারে সে বেশ দক্ষতা দেখায়। কোন শিক্ষিত লোক এরূপ করবে না। কারণ, এরূপ রূঢ় ব্যবহারকে সে তার শিক্ষার অনুপযুক্ত বলে বিবেচনা করে। কিন্তু সে স্বাধীন নাগরিকদের প্রতি বেশ সৌজন্য পরায়ণ এবং ক্ষমতাবানদের প্রতি বিশেষভাবে অনুগত; মোটকথা শক্তির সে ভক্ত এবং সম্মানের সে যাচনাকারী। শাসক হবার দাবী তার বাগ্মীতা কিম্বা  কোন গুণের কারণে নয়। শাসক হবার দাবী তার যোদ্ধা হিসেবে তার দক্ষতার জন্যে। আর তাই সে শরীরর্চ্চা এবং পশ্চাৎধাবনের কৌশলকে বিশেষ পছন্দ করে। 

এরূপ যে চরিত্র, সে সম্পদকে অপছন্দ করে কেবল তখন, যখন সে বয়সে তরুণ থাকে। কিন্তু তার বয়স যত বৃদ্ধি পেতে থাকে তত সে অর্থ এবং সম্পদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ তার চরিত্রের মধ্যে লোভের উপাদান রয়েছে। ধর্ম বা মহৎ গুণের প্রতি সে একনিষ্ঠ থাকতে পারে না, কারণ তার পরম হিতাকাঙ্খী যে অভিভাবক তাকে সে পরিত্যাগ করেছে। সেই অভিভাবক ছিল তার সঙ্গীত মিশ্রিত দর্শণ। 

এই চরিত্রের উদ্ভব: একটি সুশাসিত নগরীর সাহসী পিতার সে সন্তান। তার পিতার বৈশিষ্ট্য এই যে, পিতা নির্বিবাদী লোক। রাষ্ট্রীয় সম্মান বা দায়িত্বকে সে অবাঞ্ছিত বলে পরিহার করেছে। কোন উপদ্রবের মধ্যে জড়িত হওয়াকে সে পছন্দ করে না। তাই কোন বিষয়ে আইন আদালতের সে স্মরণাপন্ন হয়নি। নিজের প্রাপ্য অধিকারকেও সে উপদ্রব থেকে রেহাই পাবার আশায় পরিত্যাগ করেছে।

পুত্রের চরিত্রে এর প্রভাব তখন থেকেই পড়তে শুরু করে যখন ছেলে দেখে মা বাবার বিরূদ্ধে অভিযোগ করে বলছে: সরকারে তোমার কোন জায়গা নেই, তাই তো মেয়েদের মহলেও আমার কোন মান নেই।’ তাছাড়া স্ত্রী যখন দেখে তার স্বামীর অর্থের প্রতি আগ্রহ নেই, আইন আদালত কিম্বা জনসভায় তর্ক, লড়াই বাগ্মীতার কসরৎ না করে সামান্য যে অর্থ পায় তাই সে সন্তুষ্ট চিত্তে গ্রহণ করে, যখন দেখে যে তার স্বামীর চিন্তা তার নিজেতেই কেন্দ্রীভূত এবং সে তার কাছ থেকে নিস্পৃহতা বাদে কিছুই লাভ করে না, তখন সে ক্ষুব্ধ হয়ে তার পুত্রকে বলে:  ‘তোমার বাপ পুরো মানুষই নয়। সে জীবনটাকে নিয়েছে অতি সহজ ভাবে।’ এই বলে স্বামীর বিরুদ্ধে অপর সকল অভিযোগেরই পুনরাবৃত্তি করতে থাকে। কারণ, স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগের পুনরাবৃত্তি মেয়েদের বিশেষ প্রিয় বিষয়।

পুরোন গৃহভৃত্য যাদের আমরা প্রভুর গৃহের প্রতি অনুরক্ত বলে মনেকরি তারাও সময়ে সময়ে গোপনে পুত্রের কাছে একই সূরে প্রভুর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশ করে। এরূপ ভৃত্যরা যদি দেখে যে, তার প্রভুর কাছে অর্থের দায়ে যারা ঋণী তারা তাদের দেয় ঋণ পরিশোধ করছে না কিম্বা অন্য উপায়েও তাকে প্রতারিত করছে তবু তার প্রভু প্রতারকদের বিরুদ্ধে আদালতে নালিশ করে কোন প্রতিবিধানের ব্যবস্থা করছে না, তখন সে পুত্রকে বলেঃ আপনি আপনার পিতার মত না হয়ে শক্ত হবেন এবং এই ধরণের প্রতারকদের বিরুদ্ধে আপনি কঠিন প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন।’ কেবল গৃহভৃত্যের নিকট নয়, পুত্র যেখানে যায় সেখানেই সে অনুরূপ কথা শুনতে পায়। সে দেখে নগরীতে যারা নিজের কর্তব্য পালন করে তারা সম্মানের পাত্র নয়। তাদের মনে করা হয় নির্বোধ। আর যারা ব্যস্ত সমস্ত ফোপর-দালাল তারাই সবার বাহবা লাভ করে। তারাই সম্মানিত হয়।

তরুণ পুত্র একদিকে দেখে তার পিতার বিরুদ্ধে সাধারণের এমনি অভিযোগ; অপরদিকে পুত্র হিসেবে অধিকতর ঘনিষ্টভাবে সে তার পিতার অভিমতকে জানে। পুত্র এই উভয় অভিমতকে তুলনা করে এবং দেখতে পায়, তার পিতা যখন নিজের মনে যুক্তিকে প্রধান বলে গণ্য করছে এবং যুক্তির নীতিকে লালন করছে তখন অপর সকলের কাছে প্রধান হচ্ছে ব্যক্তিগত স্বার্থ। সেই ব্যক্তিগত স্বার্থ সাধনেরই তারা চেষ্টা করছে। এমন অবস্থায় দুই বিপরীত আকর্ষণ সে বোধ করে। পুত্রের নিজের চরিত্র গোড়াতে খারাপ ছিল না। কিন্তু সকল অসৎ সঙ্গের সম্মিলিত প্রভাব তাকে দূরে সরিয়ে এনে দুই বিপরীত আকর্ষণের মধ্যবিন্দুতে স্থাপিত করে। পুত্র এবার তার অন্তরের সৎ এর রাজ্য পরিত্যাগ করে বিরোধ এবং লোভের কেন্দ্রবিন্দুকে বরণ করে এবং পরিণামে অহঙ্কারী এবং উচ্চাভিলাষী এক চরিত্রে পরিণত হয়।

কতিপয়তন্ত্রী চরিত্র: উচ্চাভিলাষীর পুত্র প্রথমে তার পিতার পথ ধরেই চলতে আরম্ভ করে। কিন্তু এমন একটা সময় আসে যখন সে নিজেকে রাষ্ট্রের মুখোমুখী একটা নিমজ্জিত প্রবাল প্রাচীরের উপর স্থাপিত বলে বোধ করে। তার নিজেতে হৃতসর্বস্ব মনে হয়। তার পিতা হয়ত: কোন সমরাধিনায়ক বা উচ্চপদস্থ রাষ্ট্রীয় কর্মচারী ছিল। কিন্তু গুপ্তচরের ষড়যন্ত্রে আজ তাকে বিচারে সোপর্দ হতে হয়েছে এবং সে বিচারে হয় তার মৃত্যুদন্ড হয়েছে, নয়ত: সে নির্বাসিত হয়েছে কিম্বা সকল নাগরিক অধিকার হতে তাকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তার সকল সম্পদকে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
পিতার এরূপ ভাগ্য পুত্রের চোখের সম্মুখেই ঘটেছে। পুত্র সবকিছুই দেখতে পেয়েছে। পিতার এই দুর্ভাগ্য, বিশেষ করে সম্পদের ক্ষেত্রে তার হৃতসর্বস্ব অবস্থা পুত্রের মনে সাহস এবং উচ্চাকাঙ্খার যে ভাব ছিল তাকে বিনষ্ট করে ফেলে। সে তার সাহস হারিয়ে ফেলে। কিন্তু দারিদ্রে নিপতিত হয়ে এবং নিজের পরিশ্রমে জীবিকা অর্জনে বাধ্য হয়ে পুত্র কষ্টকর মিতব্যায়ে এবং কঠিন কাজের মাধ্যমে পুন:রায় যখন সম্পদ সঞ্চয়ে সক্ষম হয়, তখন সে কি তার অন্তরে সম্পদের কামনাকেই সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করবে না? অর্থের কামনাই কি এবার প্রাচ্যের একচ্ছত্র সম্রাটের মত তাকে মুকুট, শৃঙ্খল ও তরবারীতে সজ্জ্বিত হয়ে শাসন করতে শুরু করবে না?

অর্থের লিপ্সা তার অন্তরে সম্রাট। আর যুক্তি এবং উচ্চাকাঙ্খা সেই সম্রাটের পদপ্রান্তে দাস। যুক্তির জন্যে জিজ্ঞাসা কিম্বা হিসাব বা অনুমান এখন নিষিদ্ধ। কেমন করে অধিকতর অর্থ অর্জন করা যায়, এই হচ্ছে এখন সম্রাটের আদেশে যুক্তির বিবেচ্য। উচ্চাকাঙ্খাও আর সম্পদ এবং সম্পদবান ব্যতিত অপর কিছুকে মূল্যদানে অক্ষম। তার জন্যে তা নিষিদ্ধ। তার করণীয় এখন শুধুমাত্র অর্থ উপার্জন করা। অর্থ উপার্জনের প্রতিযোগীতায় যোগদান করা-অপর কিছুতে নয়।

গণতন্ত্রী চরিত্র: কতিপয়তন্ত্রের শাসকের কৃপণ এবং অধম চরিত্রকে আমরা দেখেছি। এই অধম চরিত্রের একটি হল পুত্র। পুত্রকে সে নিজের পথেই মানুষ করতে লাগল। পুত্রও পিতার মত অর্থের ব্যয়ের দিকটি জোর করে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করল- কিন্তু অর্থ উপার্জনের দিকটি নয়। যে ব্যয় তার নিকট অপ্রয়োজনীয়, সে ব্যয়েতে সে পিতার মতই কৃপণ।
তার প্রয়োজনীয় এবং অপ্রয়োজনীয় আনন্দ কোনগুলি এবং কিসের ভিত্তিতে সে এর মধ্যে পার্থক্য নির্দিষ্ট করে সেটা এখন আমরা দেখব।

আমরা নিজেরা কি করি? আমরা কি আমাদের সেই আনন্দকে প্রয়োজনীয় বলিনে যেগুলি আমাদের জন্যে অপরিহার্য এবং লাভজনক? প্রকৃতিগত ভাবেই আমরা তাকেই কামনা করি যা আমাদের প্রয়োজনীয় এবং যা আমাদের উপকার সাধন করে। এরূপ কামনা করতেই আমরা বাধ্য। কাজেই যা আমাদের উপকারী তাকে প্রয়োজনীয় বলা আমাদের পক্ষে অসঙ্গত নয়।
আবার যে ইচ্ছে মানুষ শৈশব থেকে চেষ্টা করলে নিজের চরিত্র থেকে বাদ দিতে পারে, যে ইচ্ছে অপকার বৈ কোন উপকার সাধন করে না, সে ইচ্ছেকে সঙ্গত ভাবেই আমরা অনাবশ্যক বলতে পারি। এই দু‘রকম ইচ্ছারই দৃষ্টান্ত এমন-

ধরি, আহারের ইচ্ছে অর্থাৎ সাধারণ খাদ্য এবং মসলাদি গ্রহণের ইচেছর কথা। স্বাস্থ্য এবং শক্তির জন্যে এদের যতখানি প্রয়োজন আমরা এদের ততখানি আবশ্যক ইচ্ছে বলে অভিহিত করতে পারি। আহারের যে আনন্দ তার প্রয়োজন দু‘ধরণের। সে আমাদের স্বাস্থ্যের জন্যে উপকারী এবং আমাদের জীবনের জন্যে অপরিহার্য। কিন্তু মসলাদির প্রয়োজন কেবল স্বাস্থ্যের কারণে। এরা স্বাস্থ্যের যতটুকু উপকার করে ততটুকু এদের প্রয়োজন। কিন্তু আহারের যে ইচ্ছে একে অতিক্রম করে যায় অর্থাৎ সুস্বাদ, অন্য আহার কিম্বা বিলাস উপকরণ- যেগুলি দেহের জন্যে ক্ষতিকর এবং আত্মার জ্ঞান এবং মহৎ গুণের চর্চায় যে গুলি প্রতিবন্ধক- সেগুলিকে আমরা সঠিকভাবেই আমরা অনাবশ্যক ইচ্ছে বলতে পারি এবং এগুলিকে শৈশব থেকে চেষ্টা করলে আমরা আমাদের চরিত্র থেকে বাদ দিতে পারি।

এই দু‘ধরণের ইচ্ছের একটিকে বলা চলে উপকারী, অপরটিকে অপকারীঃ একটি মিতব্যয়ী, অপরটি অমিতব্যয়ী এবং যৌন আনন্দ বা ইচ্ছে এবং অন্যান্য ইচ্ছে সম্পর্কেও একথা সত্য।
সুতরাং যে অনাবশ্যক আনন্দে নিমজ্জিত, অপ্রয়োজনীয় ইচ্ছার সে দাস। আর যে ব্যয়ে কৃপণ এবং স্বভাবে অধম সে অপরিহার্য ইচ্ছার অধীন। 

কার্পণ্য এবং স্থূল প্রবৃত্তির মধ্যে যে পুত্র লালিত হচ্ছিল, সে যখন অলস মৌমাছির মধু ভক্ষণের স্বাদ পেয়ে যায়, যখন তার এমন সব বন্ধু-বান্ধব জুটে যায় যারা তাকে সকল রকম উদ্দাম আনন্দ এবং বিলাসের অনুসন্ধান দানে সক্ষম, তখনি তার মধ্যে কতিপয়ের নীতির ভাঙ্গন এবং গণতন্ত্রী চরিত্রের উদ্ভব শুরু হয়।

কিন্তু এই তরুণের চরিত্রের মধ্যে কতিপয়ী নীতির সমর্থক উপাদান তার পিতা কিম্বা স্বজনের প্রভাব যদি এখনও বিদ্যমান থাকে এবং তারা যদি তার এই বিচ্যূতিকে ভর্ৎসনা করতে থাকে এবং তাকে নিবৃত্ত করার জন্যে উপদেশ দান করে তাহলে তার আত্মা পরস্পর বিরোধী উপসত্ত্বায় বিভক্ত হয়ে যাবে। এর একভাগ অপর ভাগের বিরুদ্ধে দ্বন্দ্বে রত হবে। অর্থাৎ তার নিজের সঙ্গেই তার লড়াই বেঁধে যাবে। এ লড়াইতে দু‘এক সময়ে এমন হয় যে, তার চরিত্রের কতিপয়ী নীতির কাছে গণতান্ত্রিক নীতিকে পরাজয়বরণ করতে হয় এবং তার কোন কোন ইচ্ছার নির্বাসন ঘটে। তরুণের মনে একটা শ্রদ্ধার ভাব সৃষ্টি হয় এভং তার চরিত্রে একটা শৃঙ্খলা স্থাপিত হয়। কিন্তু এ অবস্থা সাময়িক। পুরোন ইচ্ছের বহি:স্কারের পরে আবার অনুরূপ নূতন ইচ্ছের আবির্ভাব ঘটে। কিন্তু এই ইচ্ছের যে জনক সেই চরিত্র এর নিয়ন্ত্রণ এবং শিক্ষায় অক্ষম। ফলে এদের বিক্রম এবং সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই নূতন ইচ্ছে তাকে পুন:রায় তার সঙ্গীদের কাছে আকর্ষণ করে নিয়ে যায়। নূতন আর পুরোন ইচ্ছের মধ্যে গোপন আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। নুুতনতর ইচ্ছের জন্ম ঘটে। ফলত: এদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে চলে। পরিণামে এই ইচ্ছের দল আত্মার দূর্গকে দখল করে ফেলে। কারণ, তারা দেখতে পেয়েছে তরুণের আত্মা জ্ঞানশুন্য হয়ে পড়েছে। তার নীতি এবং সত্য বিসর্জিত হয়েছে। আর জ্ঞান, নীতি এবং সত্য- এই হচ্ছে আত্মার সবচেয়ে উত্তম রক্ষক। আর এই শুণ্য স্থানে এবার আসন গ্রহণ করে অহঙ্কার এবং অসার বাক্য।

এবার সেই তরুণ আবার তার পুরোন সঙ্গীদের মধ্যে প্রত্যাবর্তণ করে। সেখানেই সে তার স্থায়ী আবাসকে নির্দিষ্ট করে। এখনও তার চরিত্রে কতিপয়ী রীতির রেশ যদি কিছু থাকে এবং তারা যদি তাকে রসদাদি পাঠিয়ে সাহায্য করার চেষ্টা করে, তাহলে তার চরিত্রের অহঙ্কার এবং দম্ভ সেই সাহায্যকে প্রত্যাখ্যান করে আত্মার দূর্গের দ্বারকে সকল নীতির মুখের উপর একেবারে রুদ্ধ করে দেয়। পুরোন এবং বিশ্বস্ত মহৎ বন্ধুর সদুপোদেশকেও এরা দূর্গে প্রবেশ করতে দেয় না। এই সময়ে হয়ত: কোন যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং অধমরা জয়লাভ করে। এবার সৌজন্য এবং সঙ্কোচকে বিজয়ীরা বিকার বলে সম্পূর্ণরূপে বিতাড়িত করে দেয়। তাদের দ্বারা নির্বাসিত করে এবং সংযমকে কাপুরুষতা আখ্যা দিয়ে তাকে পঙ্কে পদদলিত করে বিসর্জন দেয়। জনসাধারণকে তারা বোঝাতে থাকে, সংযম এবং মিতব্যয় হচ্ছে স্থূলতা এবং দীনতা। এমনিভাবে অধম প্রবৃত্তিরা কোলাহল তুলে সংযম এবং মিতাচারকে তারা আত্মার সীমানার বাইরে দূর করে দেয়।

অধম প্রবৃত্তির দল তাদের হাতে বন্দী আত্মাকে তার সকল মহৎ গুণ থেকে শোধন করতে শুরু করে। এবার তারা দম্ভ, অনাচার, অমিতব্যয় এবং নির্লজ্জতাকে মশাল শোভাযাত্রা সহকারে পুষ্পমাল্যে ভূষিত করে এবং প্রশংসার মধুুর বাণী উচ্চারণ করে বরণ করে এনে আত্মাশুণ্য ঘরে তাদের প্রতিষ্ঠিত করে। এবার তারা ঔদ্ধত্যকে অভিহিত করে আভিজাত্য বলে, অরাজকতাকে বলে স্বাধীনতা এবং অপব্যয়কে মহানুভবতা আর মূর্খতাকে বলে বিক্রম। যে তরুণের কথা আমরা বলতে শুরু করেছিলাম তার মূল চরিত্র এবার পরিপূর্ণরূপেই পরিবর্তিত হয়ে গেছে। যে একদিন লালিত হয়েছিল অপরিহার্য প্রয়োজনের বোধে, সে এবার অধম এবং অনাবশ্যক ভোগ এবং সুখের অবাধ স্বাধীনতা এবং স্বেচ্ছাচারের পঙ্কে নিমজ্জিত।

এই গণতান্ত্রিক তরুণ বাকি জীবন প্রয়োজনীয় ইচ্ছের পিছনে যে পরিমাণ অর্থ, সময় এবং পরিশ্রম ব্যয় করে, ঠিক সে পরিমাণ অর্থ সময় এবং পরিশ্রম তার ব্যয়িত হয় অনাবশ্যক ইচ্ছের পিছনে। তবে তার ভাগ্য যদি সুপ্রসন্ন হয় এবং ধ্বংসের চরমে যদি সে না পৌঁছে থাকে তাহলে বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার এই উচ্ছৃঙ্খল উদ্দামতা হয়ত: হ্রাস পেতে থাকে এবং নির্বাসিত মহৎ গুণের কিছু হয়ত: আবার আত্মার দূর্গে প্রত্যাবর্তণ করে। ফলে পরিপক্ক বয়সে হয়ত: আক্রমণকারীর প্রথম প্রবৃত্তির একাধিপত্য আর তত বজায় থাকে না। এবার তার চরিত্রে কিছুটা ভারসাম্য সৃষ্টি হয়। আবশ্যক ও অনাবশ্যক আনন্দ এবং ভোগের মধ্যে একটা সমতা স্থাপিত হয়। পরিপূর্ণরূপে তৃপ্ত না হওয়া পর্যন্ত মুহুর্তের উল্লাসকে পরিপূর্ণ স্বাধীনতাই সে অর্পণ করে। কিন্তু পরিতৃপ্তির পরে অনুরূপ স্বাধীনতা অপর ইচ্ছাকেও সে প্রদান করে। কাজেই আবশ্যক এবং অনাবশ্যক কোন ইচ্ছাই আর অতৃপ্ত থাকার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে তুলতে পারে না।

এবার যদি কেউ তাকে বলে, যে আনন্দের উৎস উত্তম ইচ্ছে, তাকেই তার উৎসাহিত করা উচিৎ এবং যে আনন্দের উৎস হচ্ছে অধম প্রবৃত্তি, তার বল্গা টেনে ধরা উচিৎ, তাহলে এরূপ পরামর্শের প্রতি সে কর্ণপাত করবে না। সত্যের জন্যে অন্তরের দ্বার সে উন্মুক্ত করবে না। তার মাথা নেড়ে সে বলবেঃ সকলের আনন্দই আমার চোখে সমান এবং সকলেরই সমান অধিকার থাকা সঙ্গত।

আসলে সে মূহুর্তের ভোগের মধ্যে বাস করে। এই মূহর্তে হয়ত: সে শূরা, নারী এবং সঙ্গীতে লিপ্ত, পরমুহুর্তে সে ভোজ্য দ্রব্যে ভুক্ত। এই মুহুর্তে সে কঠিন শরীরর্চ্চায় রত, পরমূহুর্তে সে অলস আয়েষী জীবনে তৃপ্ত, আবার পরমূহুর্তে দর্শণের র্চ্চায় সে উদ্ব্যস্তু! এবং পরক্ষণেই সে রাজনীতিক হল্লায় উচ্চকন্ঠ। বলাচলে সে সর্বদাই ব্যস্ত। ব্যস্তবাগিশের মত দু‘পায়ে খাঁড়া অবস্থাতেই সে যখন যা মাথায় আসছে তাই ভাবছে, আবার যখন যা মুখে আসছে তাই বলছে। কোন সময় মনে হবে, তার সকল কামনা সমরবিদ হবার জন্যে, কখনও মনে হবে, তার উচ্চাকাঙ্খার লক্ষ্য ব্যবসায় অর্থাৎ অর্থোপার্জনে সাফল্য। তার জীবনে সংযম বা শৃঙ্খলা বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই। এমন মানুষ তার জীবনকে আনন্দময়, স্বাধীন এবং সুখী বলে বিবেচনা করে। আর তার চরিত্রের এই সব বিদ্যায় পারদর্শীতার ভাব এবং বহু বৈশিষ্ট্যের বর্ণাঢ্য বৈচিত্র্যের সঙ্গে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার যে বৈচিত্র্য, তার সাদৃশ্য তো স্পষ্ট। এমন জীবন অনেকের কাছে আকর্ষণীয় বলে বোধ হতে পারে। কারণ, এর সম্ভাবণা বিচিত্র। এই হচ্ছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যক্তির চরিত্র।

স্বৈরতন্ত্রী চরিত্র: আমাদের এমন কতকগুলি কামনা বাসনা আছে যেগুলি অবৈধ। হয়ত: এগুলি আমাদের সহজাত। এগুলি নিয়েই আমরা জন্মগ্রহণ করি। কিন্তু সামাজিক আইন কানুন যুক্তি এবং উত্তম ইচ্ছে এগুলিকে ক্রমান্বয়ে এরূপ বাধ্য করে তোলে যে অনেকের চরিত্র থেকে এরা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায় কিম্বা থাকলেও বেশ দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু অনেকের চরিত্রে এগুলির সংখ্যা এবং শক্তি অব্যাহত থাকে। এইসব ইচ্ছেগুলো আমাদের স্বপ্নে দেখা দেয়। নিদ্রামগ্ন অবস্থায় আমাদের যুক্তি যখন সুপ্ত এবং মনুষ্যযোচিত শক্তির নিয়ন্ত্রণ যখন দুর্বল হয়ে পড়ে তখন আমাদের ভিতরের পশুশক্তি খাদ্য এবং পানীয়ে পূর্ণ হয়ে আমাদের দেহের মধ্যে জেগে ওঠে এবং ইচ্ছে মত নিজেদের কামনাকে তৃপ্ত করার চেষ্টা করে। আমরা জানি, আমাদের এমন কামনার পক্ষে কোনকিছুই অসম্ভব নয়। এদের মধ্যে সঙ্কোচ কিম্বা লজ্জার কোন অস্তিত্ব নেই। আর তাই এমন অবস্থায় এই কামনা জননী কিম্বা অনুরূপ কারও সঙ্গে, পুরুষ কিম্বা পশু কিম্বা দেবতা কারও সঙ্গে দৈহিক মিলনে সঙ্কোচ বোধ করে না কিম্বা নরহত্যা বা অপবিত্র কোন কর্ম থেকে বিরত থাকার আবশ্যকতা বোধ করে না। 

কিন্তু যে লোক চরিত্রবান, যার বিবেচনা সুস্থ্য এবং সুনিয়ন্ত্রিত, সে নিদ্রা গমনের পূর্বে তার যুক্তিকে জাগরিত করে। যুক্তিকে সে বুদ্ধি এবং সংলাপের অস্ত্রে সজ্জিত করে। তার কামনাকে সে যেমন প্রশ্রয় দেয়নি, তেমনি সে তাকে বুভুক্ষও রাখেনি। কাজেই তার কামনা তার আত্মাকে অতৃপ্তি কিম্বা ভোগ- কোন কিছু নিয়েই আর উদ্ব্যস্ত করে তোলে না। তার কামনাও নিদ্রার সঙ্গে শান্ত এবং নিদ্রিত হয়ে পড়ে। আত্মা তখন নিরুদ্বেগে ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমানের জ্ঞানের অন্বেষণে বহির্গত হতে পারে। তার চরিত্রের তৃতীয় শক্তিওে সে শান্ত করতে সক্ষম হয়। আর তাই যে চরিত্রবান সে যখন তার ক্ষুধা এবং প্রবৃত্তিকে শান্ত করে নিদ্রায় গমন করে তখন তার অন্তর- বোধ কোন দুস্কর্মের দুস্বপ্নে বিব্রত না হয়ে সত্য অনুধাবনে ব্যাপৃত থাকতে সক্ষম হয়।

অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি আমরা যতই সম্মানীয় বলে বোধ হই না কেন, আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে ভয়ঙ্কর পাশব এবং অনৈতিক ইচ্ছার অস্তিত্ব রয়েছে এগুলির প্রকাশ ঘটে প্রধানত: স্বপ্নে।

গণতান্ত্রিক তরুণের জনক হচ্ছে সেই কতিপয়ী শাসক যার সমগ্র দৃষ্টি অর্থোপার্জনের ক্ষেত্রে নিবদ্ধ, যে হচ্ছে ব্যয়ের ক্ষেত্রে কৃপণ এবং উপভোগ কিম্বা বাহারের জন্যে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের ইচ্ছেকে সে প্রশ্রয় দিতে অনিচ্ছুক। কিন্তু পুত্র কালক্রমে যে সঙ্গী জোটাল তাদের রুচি এবং ইচ্ছায় কোন কার্পণ্য ছিল না। তারা যথেচ্ছাচারী। পিতার কার্পণ্য এবং নীচতা তাকে যথেচ্ছাচারের জগতে ঠেলে দেয়। কিন্তু এ কথা স্বীকার্য যে, গণতান্ত্রিক পুত্র তার সঙ্গীদের চেয়ে উত্তম চরিত্রের। আর এ জন্যেই সে উভয়দিককে রক্ষা করার চেষ্টা করে। কার্পণ্য কিম্বা অমিতব্যয়-উভয়কে পরিহার করে সে উভয়ের মধ্যে একটা আপোষ স্থাপনের চেষ্টা করে। মোটকথা কতিপয়ী থেকে গণতান্ত্রিক চরিত্রে তার রূপান্তর ঘটে।

এই পুত্রেরও কালক্রমে একটি পুত্র হল এবং তার পুত্রকে সে নিজের স্বভাবে পালন করে তুলল। মনে করি, এই পুত্রের ক্ষেত্রেও তেমন ব্যাপারটি ঘটল যা তার পিতার ক্ষেত্রে ঘটেছিল। তার সঙ্গীদল পুরো স্বাধীনতার নামে তাকে পুরো যথেচ্ছাচারের পথে নিয়ে গেল। তার পিতা এবং পরিবার যেখানে ছিল সংযম এবং মিতাচারের পক্ষে, তার সঙ্গীরা সেখানে তাকে নিয়ে গেল এর বিপরীত ক্ষেত্রে। কিন্তু তবু শেষ পর্যন্ত যখন তার সঙ্গী কু-মন্ত্রকের দল তাকে বশে রাখা অসম্ভব বলে আশঙ্কিত হয়ে ওঠে, তখন তারা তার অলস ইচ্ছার বশকারী এক প্রভুকে তার উপর স্থাপিত করে। এই প্রভু তাকে তার অলস ইচ্ছার জগতে আবদ্ধ রাখার চেষ্টা করে।

এই অলস ইচ্ছার দল মৌমাছির ন্যায় পালাক্রমে অষ্ট প্রহর পুত্রের কানের কাছে গ্ঞ্জুন তুলতে থাকে। ইচ্ছার সুবাস, পুষ্প এবং সূরার উপঢৌকনে তাকে পূর্ণ এবং মোহিত করে তোলে এভং পরিশেষে তার অন্তরে এই ইচ্ছার হুল সৃষ্টি করতে সক্ষশ হয়। এবার তার প্রবৃত্তির প্রভু আর কোন রাশ মানে না। সে উন্মত্ত হয়ে ওঠে। তরুণের মনে এখনও যদি কোন মহৎ ইচ্ছে, সঙ্কোচ বা উৎকৃষ্ট ধারণার অস্তিত্ব থেকে থাকে তবে তার সব কিছুকে এবার হত্যা করা হয় এবং তাদের স্থানে উন্মত্ততা অনধিকারীর আসন দখল করে নেয়। 

এক কথায় এই চরিত্রে জন্মগত কিম্বা অভ্যাসগত ভাবে কিম্বা উভয়ভাবে সূরার উন্মাদনা, লালসা এবং মত্ততার সংযোগ ঘটেছে।

কোন প্রবল প্রবৃত্তি যখন মানুষের মনকে সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করে তখন তার জীবন পূর্ণ হয়ে ওঠে অবসর বিনোদনে, ভোজন উৎসবে, বন্ধু এবং বান্ধবী মিলন- প্রভৃতি অনুষ্ঠানে। শুধু তাই নয়। এছাড়াও নূতনতর প্রবল ইচ্ছার দল তার চরিত্রে জন্মলাভ করতে থাকে এবং তাদের তৃপ্তির দাবীকে অদমনীয় করে তোলে। ফলে তার যা কিছু উপার্জন সবটাই ইচ্ছার তৃপ্তিতে ব্যয়িত হয়ে যাবে এবং তাকে ঋণ গ্রহণ এবং মূলধন ব্যয়ের পথ অবলম্বণ করতে হবে।

কিন্তু ঋণ ও মূলধনেরও শেষ আছে। অর্থের সব উৎস যখন শেষ হয়ে যাবে তখন তার ইচ্ছার দল অতৃপ্তির কোলাহলে ফেটে পড়বে। তাদের কোলাহল তাকে উন্মাদ করে তুলবে। কিন্তু এই ইচ্ছার যে উৎস, যে প্রভু, সে তাদের চেয়েও তাকে ক্ষিপ্ত করে তুলবে লুন্ঠন কিম্বা প্রতারণা, যে কোন উপায়ে হোক অর্থ সংগ্রহের জন্যে তাকে যত্রতত্র তাড়িত করতে থাকবে। তার ইচ্ছার প্রভুর হুকুমঃ যে কোন প্রকারে হোক, যেখান থেকে হোক তাকে অবশ্যই অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। অন্যথায় তার জীবন-যন্ত্রণা এবং বেদনায় বিদ্ধ হতে থাকবে।

তার জীবনের ধারাটি এরূপ। প্রত্যেক পরবর্তী ইচ্ছা তার পূর্ববর্তী ইচ্ছাকে অতিক্রম করে গেছে। পূর্ববর্তীর বিনিময়ে সে পরবর্তীকে গ্রহণ করেছে। আর তাই পিতামাতাকে এখন সে পূর্ববর্তী বলে পরিত্যাগ করেছে। পারিবারিক সম্পদে তার যে অংশ ছিল সে অংশ সে নি:শেষ করেছে এবং তাকে নি:শেষ করে বাকী অংশকে ব্যয় করতে শুরু করেছে। কিন্তু পরিবারের অন্যরা যদি তাকে বাঁধা দান করে তবে সে তা দখলের জন্যে নিশ্চয়ই প্রবঞ্চনা এবং প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করবে। কিন্তু তাতেও যদি সে ব্যর্থ হয়, তবে সে জোর প্রয়োগ করতে দ্বিধা করবে না। কিন্তু ধরি, বৃদ্ধ পিতামাতা পুত্রের আক্রমণকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করল। তারা তাকে বাঁধা দিল। তখন এই বর্বর পুত্র তার অসহায় মাতা এবং বৃদ্ধ পিতাকে, অর্থাৎ তার নিকটতম এবং প্রিয়তমজনকে আঘাত করতে দ্বিধা করবে না এবং যদি সে পিতামাতার সঙ্গে একই গৃহে বাস করতে থাকে, তাহলে তার পিতা-মাতাকে তার সর্বশেষ প্রণয়ীর দাস-দাসীতে পরিণত করবে। অথচ তার পিতা-মাতার উপর এসব লোকের কোন অধিকার থাকতে পারে না।

কিন্তু পিতামাতার সম্পদেরও শেষ আছে। পুত্র তাকেও শেষ করেছে। অপরদিকে তার ইচ্ছের সংখ্যার বৃদ্ধি বৈ কমতি ঘটেনি। আর তাই এবার সে হয় অপরের ঘরে সিঁদ কাটতে শুরু করবে, নয়ত: রাত্রে কোন পথচারীর উপর হামলা করবে এবং মন্দিরের সম্পদ হরণ করবে। অপরদিকে এতদিনকার প্রতিষ্ঠিত ন্যায় অন্যায়ের বিশ্বাস, যার ভিত্তিতে সে নিজে বর্ধিত হয়েছিল, সে সব বিশ্বাস শৃঙ্খলমুক্ত প্রবৃত্তির হাতে পরাভূত হয়ে স্থানচ্যূত হয়ে পড়বে। কারণ যে প্রবৃত্তি এতদিন কিছুটা নিয়ন্ত্রিণে ছিল তা এখন তার প্রবল প্রভুর আদেশে মুক্তি পেয়ে তার দেহরক্ষীতে পরিণত হয়েছে। যখন সে গণতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন এবং আইনের অনুগত এবং তার পিতার প্রভাবে ছিল, তখন এইসব কামনার পক্ষে কেবল স্বপ্নের মধ্যে জেগে ওঠাই সম্ভব ছিল। কিন্তু প্রবৃত্তির প্রভুত্বে তার স্বপ্নের সত্ত্বা পরিপূর্ণরূপে বাস্তবে প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। এবার আর তার জীবনে কোন নিয়ম নিষেধের বালাই নেই। হত্যা, তা যতই ভয়ঙ্কর হোক না কেন- তা থেকেও আর সে নিবৃত্ত হবে না। তার প্রবৃত্তির সকল রকম বিধি নিষেধহীন স্বৈরতান্ত্রিক প্রভু হয়ে তাকে শাসন করছে, যেমন করে স্বৈরতান্ত্রিক শাসক একটা রাষ্ট্রকে শাসন করে। নিষিদ্ধ খাদ্য-দ্রব্য, কিম্বা নিষিদ্ধ ভয়ঙ্কর কোন কর্ম- কোন কিছুতেই তার আর কোন দ্বিধা নেই। দূ:ষ্প্রবৃত্তির স্বার্থে যে কোন দুস্কর্মে সে এবার প্রবৃত্ত হয়। এই দূ:ষ্প্রবৃত্তির কতকগুলিকে আক্রমণ করা হয়েছে বাইরে থেকে। অপর যারা তার ভিতরে এতদিন বন্দী ছিল তারা এবার মুক্ত হয়েছে।

অসমাপ্ত।

উৎস: The Republic by Plato, Tr. by Benjamin Jowett.

God: বিধাতার স্বরূপ।

"He is Allah , [who is] One,
 Allah , the Eternal Refuge.
 He neither begets nor is born,
 Nor is there to Him any equivalent."Quran, al-Ikhlas, 112:1-4

বিধাতার স্বরূপ কি? এর উত্তর জানতে আদিকাল থেকেই মানুষ সচেষ্ট। Mansur al-Hallaj, the master of all secretes, define God with His essence as-

God
-Al Hallaj [Arberry, A.J., The Doctrine of the Sufis]

"Before" does not outstrip Him,
"after" does not interrupt Him
"of" does not vie with Him for precedence
"from" does not accord with Him
"to" does not join with Him
"in" does not inhabit Him
"when" does not stop Him
"if" does not consult with Him
"over" does not overshadow 

Him "under" does not support Him
"opposite" does not face Him
"with" does not press Him
"behind" does not limit Him
"previous" does not display Him
"after" does not cause Him to pass away
"all" does not unite Him
"is" does not bring Him into being
"is not" does not deprive Him from Being.

Concealment does not veil Him
His pre-existence preceded time,
His being preceded non-being,
His eternity preceded limit.
If thou sayest 'when', 
His existing has outstripped time;

If thou sayest 'before', before is after Him;
If thou sayest 'he', 'h' and 'e' are His creation;
If thou sayest 'how', His essence is veiled from description;
If thou sayest 'where', His being preceded space;
If thou sayest 'ipseity' (ma huwa),

His ipseity (huwiwah) is apart from things. 
Other than He cannot
be qualified by two (opposite) qualities at
one time; yet With Him they do not create opposition.
He is hidden in His manifestation, 
manifest in His concealing. 
He is outward and inward,
near and far; and in this respect He is
removed beyond the resemblance of creation.

He acts without contact,
instructs without meeting,
guides without pointing.
Desires do not conflict with Him,
thoughts do not mingle with Him:
His essence is without qualification (takyeef),
His action without effort (takleef).

On the other hand, Greek Philosopher Plato, define God and His Attribution logically as-

বিধাতার স্বরূপ সম্পর্কে প্রথমত: বলা যায়, তাঁর রূপ হচ্ছে উত্তম। আমরা একথা নিশ্চয় স্বীকার করব যা উত্তম তা কখনও ক্ষতিকর বলে পরিচিত হতে পারে না। আবার যা ক্ষতিকর নয় তা কোন ক্ষতির কারণও নয়। সুতরাং বিধাতা উত্তম বলে, তিনি কোন ক্ষতির কারণ হতে পারেন না, তিনি কোন অন্যায়ও সাধন করতে পারেন না। আর যিনি অন্যায় সাধন করতে পারেন না, তিনি কোন অন্যায়ের কারণও হতে পারেন না। সুতরাং বলা যায় বিধাতা উত্তম, মঙ্গলকর। আর এজন্যে তাঁকে মঙ্গলের কারণ বলে আখ্যায়িত করা যায়। 

সুতরাং বিধাতা (God) সবকিছুরই মূলে বা সবকিছুরই কারণ বলে যে কথা প্রচলিত, তা যথার্থ নয়। কারণ, বিধাতা যদি উত্তম হন, তাহলে তিনি সবকিছুর কারণ স্বরূপ হতে পারেন না। কেননা উত্তম কেবল উত্তমেরই কারণ। সুতরাং বিধাতা কেবল মনুষ্য জীবনের কোন কোন বিষয়েরই মাত্র কারণ স্বরূপ।

মানুষের জীবনে অন্যায়ের পরিমাণ অধিক; ন্যায়ের পরিমাণ কম। বিধাতা মনুষ্য জীবনের ন্যায়ের কারণ; অন্যায়ের নয়। সুতরাং কেউ যদি ইলিয়াডে হোমার যেমন বর্ণনা করেছেন, তেমনি করে বলে-

‘খোদার কাছে রক্ষিত আছে দু‘টি ভান্ডঃ
একটি ন্যায়ের অপরটি অন্যায়ের।
আর সেই ভান্ড থেকে ন্যায় ও অন্যায়ের মিশ্রণ ঘটিয়ে
যার ভাগ্য তৈরী করেছেন তিনি,
তার জীবনে খেলা চলে দু:সময় আর সুসময়ের।
কিন্তু যার ভাগ্য তৈরী হয়েছে কেবলমাত্র অন্যায়ের আরক দিয়ে
সুন্দর পৃথিবীর বুকে বুভুক্ষার তাড়নে সে তাড়িত হয় নিশিদিন
কারণ খোদা হচ্ছেন ন্যায় এবং অন্যায়ের বিধাতা।’
                             
-তা হবে সর্বৈব মিথ্যা। যা যথার্থ এবং ন্যায় বিধাতা কেবল তারই কারণ হিসেবে কাজ করেন। এতে যদি দুর্ভোগ কারও ভাগ্যে নিপতিত হয়, তবে বুঝতে হবে তা ন্যায্য বলেই নিপতিত হয়েছে। কিন্তু কেউ এ কথা বলতে পারে না যে, দুর্ভাগ্যের কারণ হচ্ছেন বিধাতা। সে কেবল বলতে পারে, দুরাচারের  দুর্ভোগ আসে, কারণ এ তার প্রাপ্য। আর বিধাতা সেই দুর্ভোগ তার মঙ্গলের জন্যেই দিয়েছেন। কিন্তু একদিকে বিধাতা উত্তম, অপরদিকে তিনি অন্যায়ের কারণ- এ কথা বোধ সম্পন্ন কেউ বলতে পারে না। 

দ্বিতীয়ত: বিধাতা জাদুকরের ন্যায় বিভিন্ন রূপের দ্বারা আমাদের বিভ্রান্ত করতে পারেন না। কারণ, বিধাতার রূপ এক এবং অপরিবর্তনীয়ভাবে তিনি আপন রূপে প্রতিষ্ঠিত।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যাক। প্রথমে আমরা পরিবর্তনের কথা ধরি। কোন কিছুতে যখন কোন পরিবর্তন সংঘটিত হয় তখন সে পরিবর্তনের কারণ হয় সেই বস্তু নিজে নয়ত: অপর কোন শক্তি। আর বস্তুর ব্যাপারে যে বস্তু যত উত্তম সে তত অপরিবর্তনীয়। দৃষ্টান্ত স্বরূপ, যে ব্যক্তি যত সুস্থ্য এবং শক্তিশালী সে মদ্য কিম্বা মাংস আহারে ততকম অসুস্থ্য হয়। এমন কি যে উদ্ভিদ যত সতেজ- বায়ূর আঘাত, সূর্যের তাপ বা অপর কোন কারণে তার ক্ষতিও তত কম। সুতরাং যে সবচেয়ে সাহসী এবং সবচেয়ে জ্ঞানী বাইরের কোন প্রভাবে সে বিভ্রান্ত বা পথভ্রষ্ট হবে খুবই সামান্য। কেবল মানুষের ক্ষেত্রে নয়, তৈজসপত্র, গৃহ বা বস্ত্রাদি অর্থাৎ যে কোন সুমিশ্রিত বস্তুর ক্ষেত্রেই একথা সত্য। এ সমস্ত বস্তু যখন সুগঠিত হয় তখন সময় কিম্বা অবস্থান্তরের আঘাতে তাদের পরিবর্তনও খুব সামান্য ঘটে। 

সুতরাং যা কিছু উত্তম তা মানুষের শিল্পকর্ম কিম্বা প্রকৃতির সৃষ্টিকর্ম যাই হোক না কেন, বাইরের আঘাতে তার পরিবর্তন খুব সামান্যই সংঘটিত হয়। কিন্তু বিধাতা বা বিধাতার সৃষ্টি সম্পর্কে আমরা কি বলব? বিধাতা নিজে এবং তাঁর সৃষ্টি অবশ্যই সর্বপ্রকার সুসম্পূর্ণ। সুতরাং বাইরের অভিঘাত তাকে বিভিন্ন রূপ গ্রহণে নিশ্চয়ই বাধ্য করতে পারে না। তিনি যদি আদৌ পরিবর্তিত হন তাহলে সে পরিবর্তন সুস্পষ্টত: নিজে থেকেই সাধিত হবেন। আর সেক্ষেত্রে নিজের পরিবর্তন তিনি কি অধিকতর উত্তমের উদ্দেশ্যে সাধন করবেন, না অধিকতর নিকৃষ্টের জন্যে তিনি নিজেকে পরিবর্তন করবেন?

বিধাতা যদি আদৌ পরিবর্তিত হন তাহলে তাকে নিকৃষ্টতর হতে হবে। কারণ, ধর্ম বা কান্তি কোন ক্ষেত্রেই বিধাতা অসম্পূর্ণ ছিলেন এমন কথা আমরা ভাবতে পারিনে। অন্যদিকে বিধাতাই হোন আর মানুষই হোক কেউ নিজেকে নিকৃষ্টতর করে পরিবর্তিত করতে চাইবে না। সুতরাং বলা যায় বিধাতা আদৌ নিজের কোন পরিবর্তন কামনা করতে পারেন না। কারণ, তিনি হচ্ছেন সর্বোত্তম এবং মনোহরতম। তাই তিনি তাঁর নিজের রূপে নিত্যকালের জন্যেই থাকবেন অপরিবর্তিত।  এ কারণেই যিশুখৃষ্ট যেমন ঈশ্বর হতে পারেন না, তেমনি মানুষের মাঝে নানারূপ নিয়ে খোদার উপস্থিতিও অসম্ভব আর এ কারণেই খোদার রূপ কল্পনা করে কোন বস্তু, মূর্তি-প্রতিমার নিকট অর্ঘ্য প্রদান খোদার নিকট ঘৃণ্য, অমার্জিত পাপ কারণ, তৈরীকৃত প্রতিমূর্তি তাঁর প্রকৃত স্বরূপকে নিকৃষ্ট করে; তাঁর স্বরূপের মিথ্যা প্রতিভাস তৈরী করে।সুতরাং কেউ যদি বলেঃ

খোদা বৈদেশিকের বস্ত্র ধারণ করে
বিচিত্ররূপে আমাদের মধ্যে বিচরণ করেন। 

তা আমরা বিশ্বাস করতে পারি না। কিন্তু কেউ যদি বলে খোদা অপরিবর্তনীয় হলেও যাদুমন্ত্রণাদির সাহায্যে তিনি আমাদের সামনে বিভিন্ন রূপের বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে হয়ত: উপস্থিত হতে পারেন। কিন্তু বিধাতা কথায় কিম্বা কর্মে নিজেকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবেন বা নিজের মিথ্যা প্রতিভাস তৈরী করবেন, এমন কথা আমরা ভাবতে পারি না। আর কেউই তার যথার্থ প্রকৃতিতে মিথ্যা প্রতিপন্ন হতে চায় না। যাকে সে নিজের সর্বোত্তম বা যথার্থতম প্রকৃতি বলে বিবেচনা করে সে প্রকৃত মিথ্যার করায়ত্ব হোক, এমন ইচ্ছা কারও পক্ষেই স্বাভাবিক নয়। অর্থাৎ আমরা বলতে চাচ্ছি মানুষ নিজের আত্মার সত্ত্বায়- অর্থাৎ তার চরিত্রের সর্বোত্তম ক্ষেত্রে প্রতারণা বা মিথ্যাকে প্রশ্রয় দিতে পারে না। এমন প্রবণতা মানুষের কাছে অবশ্যই ঘৃণ্য।

প্রতারিতের আত্মার এই অজ্ঞানতাকেই আমরা সত্য-মিথ্যা বা যথার্থ মিথ্যা বলে আখ্যায়িত করতে চেয়েছি। কারণ শব্দের মিথ্যা তো আত্মার জন্যে কেবল মিথ্যার আভাস মাত্র, বলা যায় মিথ্যার আঁচ। এ মিথ্যা অবিমিশ্র মিথ্যা নয়। আর এমন অবিমিশ্র মিথ্যা কেবল খোদার কাছেই ঘৃণ্য নয়, মানুষও একে ঘৃণা করে।

কিন্তু শব্দগত মিথ্যা সবসময় ঘৃণ্য নাও হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে শব্দগত মিথ্যার ব্যাবহারগত সুবিধার দিক আছে। শত্রুর সঙ্গে আচরণ, এর একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে। অথবা ধরি আমাদের কোন সুহৃদ উন্মাদনা বা বিভ্রান্তির মুহুর্তে কোন ক্ষতিকর কার্য্য সম্পাদন করতে যাচ্ছে। তেমন অবস্থায় আমাদের পক্ষে মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ তার জন্যে নিরাময় বা প্রতিরোধের মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে। পুরানের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটে। পুরানের প্রকৃত কথা আমরা জানিনে। তাই পুরাণ সম্পর্কে আমাদের মিথ্যাকে আমরা সত্যের আকার প্রদান করি। আর সেই সত্যের আকার দিয়ে আমরা নিজেদের উদ্দেশ্য সাধন করি। কিন্তু মিথ্যা ব্যবহারের এ সমস্ত কারণের কোনটিকেই আমরা বিধাতার উপর প্রয়োগ করতে পারিনে। কেননা বিধাতা তো পুরাণের বিষয়ে অজ্ঞ নয় যে পুরাণের কারণে তিনি মিথ্যার আশ্রয় নেবেন। আবার বিধাতা কোন শত্রুর ভয়ে বা জ্ঞানহীন কোন বন্ধুর কারণে মিথ্যার আশ্রয় নেবেন তাও আমরা ভাবতে পারিনে। অর্থাৎ আমরা এমন কোন কারণ বা উদ্দেশ্যের কথা চিন্তা করতে পারিনে যে জন্যে বিধাতা মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করতে পারেন। সুতরাং বিধাতা মিথ্যার আশ্রয় নিতে একেবারেই অক্ষম।

তাহলে আমরা বলতে পারি, বিধাতা কথায় এবং কর্মে সরল এবং সত্য; তার কোন পরিবর্তন নেই। শব্দে বা সংকেতে তিনি কাউকে প্রতারণা করতে পারেন না।

যে সত্ত্বা জ্ঞান এবং সত্যের মূল এবং যিনি সৌন্দর্যে জ্ঞান এবং সত্যেরও অধিক, তাঁর সৌন্দর্য যে কি বিষ্ময়কর তা কল্পণা করাও আমাদের পক্ষে অসম্ভব। সূর্য্যরে কথাই ধরি। সূর্য্য কেবল দৃশ্যের মূল নয়; সূর্য্য, বস্তুর সৃষ্টি, পুষ্টি এবং বৃদ্ধিরও কারণ। কিন্তু সূর্য্য নিজে স্রষ্টা নয়। তেমনিভাবে, পরম যে উত্তম তিনি কেবল সকল জ্ঞাত বস্তুর জ্ঞানের মূল নন, বস্তুর অস্তিত্বেরও তিনি মূল, বস্তুর সারেরও তিনি মূল-কিন্তু পরম উত্তম নিজে সার নন। মর্যাদা এবং শক্তির দিক থেকে তিনি সারকেও অতিক্রম করে যান। Thus Qur'an Says-

God is the Light of the heaven and earth;
The parable of His light is- a lamp in a niche of a wall,
The lamp enclosed in a glass appears as a shining star.
Lit through a blessed tree, an olive,
That is neither of the east nor of the west,
Whose oil is well-nigh luminous,
Although no fire touched it.
Light upon Light!

God doth guide- whom He wills to

God doth set forth His Light- parables for men:
And God doth knows all things.-[Qur’an, al-Noor, 24:35].


সমাপ্ত।

Source: 
Quran
Mansur al-Hallaj, Kitab al-Tawasin,
Plato (360 BCE), The Republic; Translated-Benjamin Jowett.

১৩ জুন, ২০১২

Torah: তাওরাত কিতাবের সংক্ষিপ্তসার।

"আমি তোমাদের প্রত্যেককে একটি আইন ও পথ দিয়েছি। যদি আল্লাহ চাইতেন, তবে তোমাদের সবাইকে এক উম্মত করে দিতেন, কিন্তু এরূপ করেননি- যাতে তোমাদের যে ধর্ম দিয়েছেন, তাতে তোমাদের পরীক্ষা নেন। অতএব দৌঁড়ে কল্যাণকর বিষয়াদি অর্জন কর। তোমাদের সবাইকে আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তণ করতে হবে। অতঃপর তিনি অবহিত করবেন সে বিষয়, যাতে তোমরা মতবিরোধ করতে।"-(৫:৪৮)

"..‘ঐ গ্রন্থ কে নাযিল করেছেন, যা মূসা নিয়ে এসেছিল? যা জ্যোতি বিশেষ এবং মানবমন্ডলীর জন্যে হেদায়েতস্বরূপ, যা তোমরা বিক্ষিপ্ত পত্রে রেখে লোকদের জন্যে প্রকাশ করছ এবং বহুলাংশকে গোপন করছ। তোমাদেরকে এমন অনেক বিষয় শিক্ষা দেয়া হয়েছে যা তোমরা এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরা জানত না।’
বলে দাও, ‘আল্লাহ নাযিল করেছেন।..’" -(৬:৯১)

"আমি তাওরাত অবতীর্ণ করেছি। এতে হেদায়েত ও আলো রয়েছে। আল্লাহর আজ্ঞাবহ পয়গম্বর, দরবেশ ও আলেমরা এর মাধ্যমে ইহুদিদের ফয়সালা দিতেন। কেননা তাদেরকে এই খোদায়ী গ্রন্থের দেখা শোনা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল এবং তারা এর রক্ষণাবেক্ষণে নিযুক্ত ছিল।.. আমি এই গ্রন্থে তাদের প্রতি লিখে দিয়েছি যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চক্ষুর বিনিময়ে চক্ষু, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান, দাঁতের বিনিময়ে দাঁত এবং যখমসমূহের বিনিময় সমান যখম। অতঃপর যে ক্ষমা করে, সে পাপ থেকে পবিত্র হয়ে যায়। যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদানুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই অত্যাচারী।" -(৫:৪৪-৪৫)

তাওরাত খোদায়ী গ্রন্থ। সর্বশেষ ঐশী গ্রন্থ কোরআনে এ গ্রন্থ সম্পর্কে অনেক বর্ণনা আছে এবং আমরা উপরের আয়াতসমূহ থেকে জানছি যে এই গ্রন্থ এখন আর অবিকৃত নেই। তদুপরি ঐ গ্রন্থে কি নির্দেশ ছিল তা আমাদের কৌতুহল। যদিও কোরআন থেকে আমরা জানি মূল আইনসমূহের কোন পরিবর্তন নেই- কোন কিতাবেই । "..তুমি আল্লাহর বিধানে পরিবর্তণ পাবে না এবং আল্লাহর রীতিনীতিতে কোনরকম বিচ্যুতিও পাবে না।" -(৩৫:৪৩) যাইহোক, এখন আমরা দেখি তাওরাতে কি ছিল।

খোদা মূসাকে যে ব্যবস্থা (Torah) দিয়েছিলেন তা ছিল পূর্ণ এক কিতাব। Actually,Torah consists of five books (Pentateuch). In the first, the beginning of the creation and history from Adam to Joseph are recorded. Tn the second the enslaving  of the Israelite's by the Egyptians, the coming of Moses, the destruction of Pharaoh, the establish of the Arc of the covenant, the event in the wilderness, the Imamship of Aaron, the promulgation of the Decalogue, and the hearing by the people of the words of Allah the Most High., are related. The third book contains a summary of the  commandments. The fourth  the number of the people, the distribution of the land to them, the circumstances of the envoys sent by Moses to Syria, the history of the Mannah-Salwah, and of the cloud for guiding, shedding and lighting them..The fifth contains the numbers of the commandments of the Torah to elucidate the summary account, it also records the decease of Aaron and of Moses, and the succession of Joshua.

তবে যে তৌরাত বর্তমান রয়েছে তা মূল অাসমানী কিতাব নয়, নেবু চাঁদ নেজ্জার জেরুজালেম আক্রমণের পর ইহুদিদেরকে নাঙ্গা করে শিকলে বেঁধে নিয়ে গিয়ে তার রাজ্যের নানান স্থানে বসিয়ে দেন। ফলে ইহুদিরা কিতাবহীন হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে নবী ওজায়ের (Ezra) নির্বাসনের সময় তার পিতা কর্তৃক মাটিতে প্রোথিত করে রেখে যাওয়া পাঠের অনুপোযুক্ত হয়ে পড়া তৌরাত থেকে যতটুকু সম্ভব উদ্ধার ও বাকীটা তার মেমরী থেকে নিয়ে কিতাবটিকে আবারো লিখিত আকার দেন। তার সংকলিত ঐ গ্রন্থে ৬১৩টি শরিয়া আইন বা ব্যবস্থা ছিল। বিস্তারিত ঐ ব্যবস্থার সংক্ষিপ্তসার আমরা বোঝার সুবিধার্থে তিনভাগে বিভক্ত করেছি, যথা- নীতিগত ব্যবস্থা তথা দশ আজ্ঞা, সামাজিক বিচার ব্যবস্থা এবং ধর্মীয় আচার-বিধি ও উৎসবাদি-

ক). নীতিগত ব্যবস্থা তথা দশ আজ্ঞা:
-খোদা ব্যতিত অপর কাউকে উপাস্য স্থির কোরও না। (আমি ব্যতিত অন্য কোন উপাস্য নেই।)
-প্রতিমার পূজা কোরও না। (এক্ষেত্রে পিতার অপরাধের প্রতিফল সন্তানদের উপর বর্তিবে, যারা আমাকে দ্বেষ করে, তাদের উপর তৃতীয় ও চতুর্থ পুরুষ পর্যন্ত তা বর্ত্তিবে; কিন্তু যারা আমাকে প্রেম করে ও আমার আজ্ঞাসমূহ পালন করে, তাদের সহস্র পুরুষ পর্যন্ত আমার আশীর্বাদে ধন্য হবে।)

-অনর্থক (অসৎ উদ্দেশ্যে) খোদার নাম নিও না। 
-বিশ্রামবারকে পবিত্ররূপে মান্য কোরও। (তোমরা সপ্তাহের ছয়দিন কাজ করবে এবং সপ্তমদিন বিশ্রামবার হিসেবে পালন করবে। এতে তোমাদের হালের ও ভারবাহী পশু, তোমাদের গৃহে জন্ম নেয়া দাস-দাসী আর অন্যান্য জাতির লোকেরাও পরিশ্রম থেকে রেহাই পাবে।)
-পিতা-মাতাকে সমাদর কোরও।
-নরহত্যা কোরও না।
-ব্যভিচার কোরও না।
-চুরি কোরও না।
-প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে মিথ্যে সাক্ষ্য দিও না।
-প্রতিবেশীর কোন বস্তুতে (প্রতিবেশীর স্ত্রী, তার দাস-দাসী, তার পশু কিম্বা অন্য যে কোন বস্তু) লোভ কোরও না। 

খ) সামাজিক বিচার ব্যবস্থা: 
০১. খোদার একত্ব ও পবিত্রতা: খোদা এক এবং অদ্বিতীয়। তোমার সমস্ত অন্তর, সমস্ত প্রাণ, সমস্ত মন এবং সমস্ত শক্তি দিয়ে, তাকে মহব্বত করবে। উপাসনায় কাউকে তাঁর অংশীদার সাব্যস্ত করবে না। স্বর্ণ বা রৌপ্য দ্বারা নিজেদের জন্যে কোন দেবদেবতাও তৈরী করে নেবে না।
খোদাকে অপমান কোরও না। তাঁকে যা দেবার তা দিতে দেরী কোরও না। তাঁর পবিত্র নামের পবিত্রতা নষ্ট কোরও না। তাকে ভক্তিপূর্ণ ভয় করবে।
খোদার নামে মিথ্যে কসম খেও না। এতে খোদার পবিত্র নামকে অপবিত্র করা হয়।
০২. সামাজিক আইন-কানুন বা বিধি-বিধান: ক্রয়কৃত কোন দাস ছয় বৎসর তার মালিকের অধীনে কাজ করবে, কিন্তু সপ্তম বৎসরে তাকে কোন বিনিময় ছাড়াই মুক্তি দিতে হবে। যদি সে একা এসে থাকে তবে একাই চলে যাবে, কিন্তু যদি সে তার স্ত্রীকেও সঙ্গে এনে থাকে তবে তাকেও তার সঙ্গে যেতে দিতে হবে। কিন্তু ঐ দাসের বিবাহ যদি তার মনিবই দিয়ে থাকে আর তার সন্তানাদি হয়ে থাকে, তবে সেই স্ত্রী ও সন্তানেরা মনিবেরই থেকে যাবে। কিন্তু যদি ঐ দাস স্পষ্ট করে জানায় যে, সে তার মনিব, তার স্ত্রী ও সন্তানদেরকে ভালবাসে এবং তাদের ছেড়ে চলে যাবার ইচ্ছে তার নেই, তবে তার মনিব তাকে স্বাক্ষ্য তাম্বুর সম্মুখে উপস্থিত করবে। তারপর তাম্বুর দ্বারদেশে তুরপুন দিয়ে তার কান ফুঁটো করে দেবে। এতে সে সারাজীবন ঐ মালিকের দাস হয়ে থাকবে।

যদি কেউ তার কন্যাকে দাসী হিসেবে বিক্রি করে, তবে তার মনিব তাকে দাসের মত মুক্ত করে দিতে পারবে না। কিন্তু যে মনিব তাকে নিজের জন্যে পছন্দ করে নিয়েছে অতঃপর সে যদি তার উপর খুশী হতে না পারে, তবে তাকে মুক্ত করে দেবে। কিন্তু তার সাথে প্রবঞ্চনা করতে বা অন্য কারও কাছে তাকে বিক্রি করতে পারবে না। আর যদি মনিব তার পুত্রের জন্যে তাকে পছন্দ করে নিয়ে থাকে তবে নিজকন্যার মত সব অধিকার তাকে দিতে হবে। আর যদি মনিব সেই দাসীকে বিবাহ করার পরেও অন্য কাউকে বিবাহ করে তবুও সে তার খোরাক পোষাক দিতে বাধ্য থাকবে এবং তার দৈহিক চাহিদাও তাকে পূরণ করতে হবে। কারণ স্ত্রী হিসেবে এটা তার প্রাপ্য। সে যদি এই কর্তব্য না করে তবে কোন অর্থের বিনিময় ছাড়াই তাকে মুক্তি দিতে হবে।’
কারও আঘাতের ফলে যদি কারও মৃত্যু হয়, তবে আঘাতকারীর প্রাণদন্ড হবে। কিন্তু খুনের উদ্দেশ্য যদি তার না থেকে থাকে- যদি এটা হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোন ঘটনা হয়, তবে তাকে হত্যা করা যাবে না। যদি কেউ সুপরিকল্পিতভাবে কাউকে হত্যা করে বেদীর কাছে গিয়েও আশ্রয় নেয়, তবে সেখান থেকেও তাকে ধরে এনে হত্যা করতে হবে। 
পিতা বা মাতার প্রহারকারীকে হত্যা করতে হবে। পিতামাতার শাপদাতাও মৃত্যূদন্ডে দন্ডিত হবে।

যদি কারও আঘাতের ফলে কারও অঙ্গহানী হয়, তবে সেই আঘাতকারীকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং তাকে সুস্থ্য করার সব ব্যবস্থা এবং যাবতীয় ব্যয় ভারও বহন করতে হবে। আর দাস বা দাসীর ক্ষেত্রে সে মুক্ত হয়ে যাবে। আর যদি কারও আঘাতের দ্বারা তার দাস বা দাসীর মৃত্যু হয়, তবে আঘাতকারীকে হত্যা করতে হবে। কিন্তু যদি সে দু-একদিন বেঁচে থাকে অতঃপর তার মৃত্যু হয়, তবে আঘাতকারী কোন শাস্তি পাবে না, কারণ সে তার নিজেরই সম্পত্তি।
যদি কারও আঘাতের দ্বারা কোন গর্ভবতী স্ত্রীলোকের গর্ভ নষ্ট হয়ে যায়, তবে সেই স্ত্রীলোকের স্বামীর দাবী অথবা বিচারকের রায় অনুসারে অবশ্যই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কিন্তু এছাড়া যদি অন্য কোন ক্ষতি হয় তবে আঘাতকারীকে শাস্তি পেতে হবে। যেমন- প্রাণের বদলে প্রাণ, দাঁতের বদলে দাঁত, হাতের বদলে হাত, পায়ের বদলে পা, জখমের বদলে সমান জখম ইত্যাদি। 

যদি কেউ তার জমির কোন গর্তের মুখ খুলে রাখে, কিম্বা কোন গর্ত খুঁড়ে ঠিকমত তার মুখ ঢাকা দিয়ে না রাখে আর সেই গর্তে পড়ে যদি কোন পশুর মৃত্যু হয়, তবে তাকেই তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তবে মৃত পশুটা তার হয়ে যাবে। 
যদি কোন গরুর শিং এর আঘাতে কারও মৃত্যু হয় তবে পাথর নিক্ষেপে সেই গরুকে অবশ্যই হত্যা করতে হবে। সেই গরুর মাংস কেউ খাবে না এবং গরুর মালিকও কোন শাস্তি পাবে না। তবে গরুটার যদি গুঁতানোর অভ্যাস থাকে আর তার মালিককে সাবধান করে দেবার পরেও সে যদি তাকে আঁটকে না রাখে আর সেই গরুটার দ্বারা কারও মৃত্যু হয়, তবে পাথর নিক্ষেপে গরু এবং তার মালিককেও হত্যা করতে হবে। কিন্তু নিহতের ওয়ারিশরা যদি মালিকের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবী করে, তবে তা পরিশোধ করে সে তার জীবন রক্ষা করতে পারবে। 

কোন গরু যদি কোন দাস বা দাসীকে হত্যা করে ফেলে তবে তার মনিবকে গরুর মালিক ক্ষতিপূরণ বাবদ তিন‘শ ষাট গ্রাম রূপা দেবে, আর সেই গরুটাকে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করবে। আবার যদি কারও গরু অন্য কারও গরুকে হত্যা করে, তবে ঐ গরুর বিক্রয় লব্ধ অর্থ এবং মৃত গরুটাকে তারা দু‘জনে ভাগ করে নেবে। কিন্তু যদি একথা জানা যায় যে, গরুটা হিংস্র স্বভাবের মালিক তা পূর্ব থেকেই জ্ঞাত কিন্তু সে তাকে বেঁধে রাখেনি তবে সেই মালিককে গরুর বদলে গরু দিতে হবে এবং মৃত গরুটা তার হয়ে যাবে।

যদি কারও পালিত পশু অন্যকারও ক্ষেতের ফসল নষ্ট করে, তবে তাকে নিজের ক্ষেতের সর্বোৎকৃষ্ট ফসল দিয়ে তার ক্ষতিপূরণ করতে হবে।
কারও কাছ থেকে ধার স্বরূপ আনা কোন পশু যদি মালিকের অনুপস্থিতিতে আহত হয় বা মৃত্যুবরণ করে, তবে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কিন্তু মালিকের সম্মুখেই যদি তা হয় তবে তাকে কোন ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না। কিন্তু পশুটা যদি অর্থের বিনিময়ে ভাড়া করে আনা হয়ে থাকে তবে সেই পরিমান অর্থই তার ক্ষতিপূরণ হবে।

যদি কারও জ্বালান আগুন দ্বারা অন্য কারও ফসল বা অন্য কোন সম্পদের ক্ষতি সাধিত হয়, তবে আগুনটা যে জ্বালিয়েছিল তাকেই তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
যদি কেউ গরু বা ভেড়া চুরি করে এনে জবেহ করে, কিম্বা বিক্রি করে দেয়, তবে একটা গরুর পরিবর্তে পাঁচটা এবং একটা ভেড়ার পরিবর্তে চারটা ভেড়া ফিরিয়ে দিতে হবে। 
চোরকে চুরি করা জিনিষের জন্যে অবশ্যই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, কিন্তু যদি সে সম্বলহীন হয় তবে তাকেই বিক্রি করে সেই অর্থ আদায় করে দিতে হবে। চুরি করা পশু যদি চোরের কাছে পাওয়া যায় তবে চোরকে সেগুলোর দ্বিগুণ ফিরিয়ে দিতে হবে। আবার যদি কোন চোর রাতে চুরি করার সময় ধরা পড়ে আহত হয়ে মারা যায়, তবে আঘাতকারী হত্যার দায়ে দায়ী হবে না। কিন্তু যদি সূর্য্য উঠবার পরে তা হয় তবে সে সেই খুনের জন্যে দায়ী হবে। 

যদি কেউ কাউকে চুরি করে নিয়ে এসে বিক্রি করে দেয় কিংবা যদি তাকে তার সঙ্গে পাওয়া যায়, তবে তাকে হত্যা করতে হবে। 
যদি কেউ কারও কাছে অর্থ সম্পদ রাখতে দেয় আর তার গৃহ থেকে তা চুরি হয়ে যায় এবং চোর ধরা পড়ে, তবে চোর তার দ্বিগুণ ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু যদি চোর ধরা না পড়ে তবে গৃহকর্তা নিজেই সেইসব নিয়েছে কিনা তা স্থির করার জন্যে তাকে বেদীর সম্মুখে উপস্থিত হতে হবে। 

অন্যের দখলে আছে এমন কোন পশু বা পরিধেয় বস্ত্র কিম্বা অন্য কোন হারান জিনিষ দেখে যদি কেউ নিজের বলে দাবী করে, তবে তা মীমাংসার জন্যে দু‘পক্ষকেই বেদীর সম্মুখে উপস্থিত হতে হবে। সেখানে খোদা যাকে দোষী বলে স্থির করবেন সে অন্যজনকে তার দ্বিগুণ ফিরিয়ে দেবে। 

যদি কেউ তার কোন পশু কারও কাছে পালনার্থে রাখতে দেয়, আর তা মরে যায় বা আঘাত পায়, কিম্বা ছিনতাই হয় অথচ কেউ এসব হতে দেখেনি, তবে তাকে বেদীর সম্মুখে উপস্থিত হতে হবে ব্যাপারটার মীমাংসার জন্যে। আর ঐ ব্যক্তি খোদাকে সাক্ষী করে বলবে-‘আমি প্রতিবেশীর দ্রব্যে হস্তার্পণ করিনি।’ আর সেই পশুর মালিককে তা মেনে নিতে হবে এবং কোন ক্ষতিপূরণ সে দাবি করতে পারবে না। কিন্তু সেই ব্যক্তির কাছ থেকে যদি সেটা চুরি হয়ে যায় তবে তাকেই ক্ষতিপূরণ দিতেই হবে। আর যদি কোন হিংস্র জন্তু সেই পশুটাকে ছিঁড়ে ফেলে তবে তা প্রমান করার জন্যে তাকে পড়ে থাকা অংশগুলো নিয়ে এসে দেখাতে হবে। এ অবস্থায় তাকে আর ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না। 
কোন কুমারীকে যদি কেউ ভুলিয়ে এনে তার সঙ্গে ব্যভিচার করে, তবে সেই ব্যক্তিকে তার বিয়ের পণ দিতে হবে এবং মেয়েটা তার স্ত্রী হবে। কিন্তু যদি মেয়েটির পিতা কিছুতেই তার কাছে কন্যাদানে সম্মত না হয় তাহলেও ঐ ব্যক্তিকে ঐ মেয়েটির বিয়ের পণ দিতে হবে। 
কোন ব্যক্তি যদি ব্যভিচারে লিপ্ত অবস্থায় ধরা পড়ে, তবে তাদের উভয়কেই দেহের অর্ধাংশ মাটিতে প্রোথিত করে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করতে হবে।
ইস্রায়েলী হোক বা তাদের মধ্যে বসবাসকারী কোন বিদেশী হোক, তাদের কেউ যদি তার সন্তানকে বা বংশের কাউকে মোলক দেবের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে, তবে তার প্রাণদন্ড হবে, লোকেরা তাকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করবে। আর যদি তারা তা না করে সেইসময় চক্ষু মুদিত রাখে, তবে তাদের সকলে অপরাধী সাব্যস্ত হবে এবং আমি তাদের সকলকে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন করব।

মায়াবিনী কিম্বা গণকের বিদ্যা ব্যবহার কোরও না। মায়াবিনী মৃত্যুদন্ডের সাজা পাবে। জ্যোতিষ বা গণকের কাছে ভাগ্য অন্বেষণে যাবে না। আর পুরুষ কিম্বা স্ত্রীলোকের মধ্যে যে কেউ ভূতাড়িয়া বা গুণী হয়, তার প্রাণদন্ড হবে। লোকে তাকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করবে এবং তার রক্ত তারই উপর বর্তিবে।
কোন পশুর সঙ্গে যৌন সঙ্গমকারীকে এবং ঐ পশুটিকে অবশ্যই হত্যা করতে হবে। 
কোন ঈমাম কন্যা যদি বেশ্যা হয়, তবে তাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করবে।
সন্তানদের পাপের জন্যে পিতাকে কিম্বা পিতার পাপের জন্যে সন্তানকে হত্যা করা যাবে না। প্রত্যেকে তার নিজের পাপের ভার বহন করবে। 
০৩. সম্পত্তি আইন: ভূমি চিরকালের নিমিত্ত বিক্রীত হবে না, কেননা ভূমি আমারই; তোমরা তো আমার সাথে বিদেশী ও প্রবাসী। আর তোমরা নিজেদের অধিকৃত দেশের সর্বত্র ভুমি মুক্ত করতে দেবে।

কেউ যদি দরিদ্র হয়ে আপন অধিকারের কিঞ্চিত বিক্রয় করে, তবে তার মুক্তিকর্তা নিকটস্থ জ্ঞাতি এসে নিজ ভ্রাতার বিক্রীত ভূমি মুক্ত করে নেবে। যার মুক্তিকর্তা নেই, সে যদি ধনবান হয়ে নিজে তা মুক্ত করতে সমর্থ হয়, তবে সে তার বিক্রয়ের বৎসর গণনা করে তদনুসারে অতিরিক্ত মূল্য ক্রেতাকে ফিরিয়ে দেবে; এরূপে সে নিজ অধিকারে ফিরে যাবে। কিন্তু যদি সে তা ফিরিয়ে নিতে অসমর্থ হয়, তবে সেই বিক্রীত অধিকার যোবেল বৎসর পর্যন্ত ক্রেতার হস্তে থাকবে; অত:পর যোবেল বৎসরে তা মুক্ত হবে এবং সে আপন অধিকারে ফিরে যাবে।

প্রাচীর বেষ্টিত কোন শহরের কোন বাড়ী যদি কেউ বিক্রি করে, তবে বিক্রি করার পর এক বৎসর পর্যন্ত তা ছাড়িয়ে নেবার অধিকার তার থাকবে। বাড়ীটা যদি এক বৎসরের মধ্যে ছাড়িয়ে নেয়া না হয় তবে যে তা কিনেছে, স্থায়ীভাবে সেটা তার ও তার বংশধরদের হয়ে যাবে। ফিরে পাওয়ার বৎসর তথা যোবেল বৎসরেও সেটা ফিরিয়ে দিতে হবে না। কিন্তু প্রাচীর বেষ্টিত নয় এমন গ্রামের বাড়ীগুলো খোলা জমি জায়গার মতই ধরে নিতে হবে। সেগুলো ছাড়িয়ে নেয়া যাবে এবং যোবেল বৎসরে সেগুলো ফেরতও দিতে হবে। তবে সম্পত্তি হিসেবে পাওয়া লেবীয়দের সব গ্রাম ও শহর এবং সেগুলোর মধ্যেকার বাড়ীগুলো তাদের সবসময়ই ছাড়িয়ে নেবার অধিকার থাকবে। যদি লেবীয়দের বিক্রি করা সম্পত্তি, কোন লেবীয় ছাড়িয়ে নেয়, তবে  সেই বিক্রীত গৃহ এবং তার অধিকারস্থ নগর যোবেল বৎসরে মুক্ত হবে, কারণ ইস্রায়েলীদের মধ্যে লেবীয়দের গ্রাম ও শহরের বাড়ী-ঘর তাদেরই সম্পত্তি। কিন্তু তাদের গ্রাম ও শহরের পশু চরাবার মাঠ বিক্রিত হবে না; কেননা তা তাদের চিরকালের সম্পত্তি।

আর যদি তোমার ভ্রাতা দরিদ্র ও শুন্যহস্ত হয়, তবে তাকে সাহায্য করবে; সে বিদেশী ও প্রবাসীর ন্যায় তোমার সাথে জীবন ধারণ করবে। আর তোমার ভ্রাতা যদি দরিদ্র হয়ে তোমার নিকট নিজেকে বিক্রয় করে, তবে তুমি তার উপর কঠিন কর্তৃত্ব কোরও না। সে বেতনজীবি ভৃত্যের ন্যায় কিম্বা প্রবাসীর ন্যায় তোমার সঙ্গে থাকবে এবং দাস্যকর্ম করবে। অত:পর সে যোবেল বৎসরে মুক্ত হবে।

আর যদি কোন ইস্রায়েলী নিজেকে তোমাদের মধ্যে বসবাসকারী কোন ধনবান বিদেশী কিম্বা প্রবাসীর কাছে নিজেকে বিক্রয় করে, তবে বৎসর বৈতনিক ভৃত্যের ন্যয় সে তার সাথে থাকবে। আর তার থাকবার সময় বেতনজীবির দিনের ন্যায় হবে। তবে সে নিজে অথবা তার জ্ঞাতিদের কেউ তাকে ছাড়িয়ে নিতে পারবে এবং সেক্ষেত্রে ছাড়িয়ে নেবার দিন থেকে যোবেল বৎসর পর্যন্ত সময় গণনা করে ক্রয়কারীকে তার মোচনের মূল্য ফিরিয়ে দেবে। 

০৪. বৈধ-অবৈধ তথা হারাম হালাল: ভূমির উপর বাসকরা জীব-জন্তুর যেগুলি জাবর কাটে এবং যেগুলোর খুর পুরোপুরি দু‘ভাগে চেরা কেবল সেগুলোর মাংস তোমাদের জন্যে হালাল। কিন্তু উষ্ট্র, শাফন, খরগোষ প্রভৃতি তোমাদের খাওয়া চলবে না, কেননা তারা জবর কাটলেও তাদের খুর পুরোপুরি দ্বিখন্ডিত নয়। তেমনি শূকর হারাম, কেননা তার খুর দ্বি-খন্ড বিশিষ্ট হলেও সে জাবর কাটে না।

পানিতে যেসব প্রাণী বাস করে তাদের মধ্যে যাদের ডানা এবং গায়ে আঁশ আছে সেগুলো তোমাদের জন্যে হালাল।
ঈগল, শকুন, চিল, বাজপাখি, কাক, উটপাখি, পেঁচা, গাংচিল, হাঁড়গিলা, সিন্দুবাজ, হুপ্পু আর বাঁদুড় তোমরা খেতে পারবে না।
ভূচর প্রাণীদের মধ্যে বেজি, ইঁদুর, গিরগিটি, তক্ষক, গোসাপ, টিকটিকি, রক্তচোষা, কাঁকলাস তোমাদের পক্ষে অশুচি।
ভূচর প্রত্যেক কীট এবং চতুষ্পদ উড্ডীয়মান পতঙ্গ তোমাদের পক্ষে ঘৃণার্হ।

অধিক পানি আছে এমন জলাধার বা ঝর্ণার পানি মৃত প্রাণীর দরুণ অশুচি হবে না। 
এমন কোন পশুর মাংস তোমরা খাবে না যা কোন হিংস্র জানোয়ারে ছিঁড়ে ফেলে রেখেছে।
মৃত পশুর মাংস হারাম। 
রক্ত খাওয়া হারাম। কারণ, সমস্ত প্রাণীর প্রাণ রয়েছে তার জীবন্ত দেহের রক্তে। রক্তসুদ্ধ কোন মাংস খাওয়া যাবে না।
মেদ বা চর্বি তোমাদের জন্যে নিষিদ্ধ। কেননা যে কোন পশু হতে খোদার উদ্দেশ্যে অগ্নিকৃত উপহার উৎসর্গ করা যায়, সেই পশুর মেদ ভোজনকারী আপন লোকদের মধ্য হতে উচ্ছিন্ন হবে।
কোন পশুর মা এবং বাচ্চা একই দিনে জবেহ করবে না। আর কোন পশুর বাচ্চার মাংস তার মায়ের দুধে রান্না করবে না।
নিকট সম্বন্ধ আছে এমন কোন আত্মীয়ের সাথে বিবাহ অবৈধ। যেমন-সৎমা, আপন ভগ্নি বা সৎবোন, নিজের কন্যা, পুত্র বা কন্যা পক্ষের নাতনি, পুত্রবধূ, ফুফু, খালা, চাচী, মামী। একই সঙ্গে কোন স্ত্রীলোক ও তার কন্যাকে বিবাহ করা হারাম। স্ত্রী বর্তমানে তার ভগ্নিকে বিবাহ করা অবৈধ। এই ধরণের অবৈধ সম্পর্ক স্থাপনকারীদের উভয়ে প্রাণদন্ডে দন্ডিত হবে। আর যদি কেউ স্ত্রীকে ও তার মাতাকে রাখে তবে তাদেরকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করতে হবে। 

০৫. সামাজিক আচার-আচরণ ও বিধি-বিধান: পুং মৈথুন চলবে না। এটা ঘৃণার্হ কর্ম। এই কর্ম সাধনকারী উভয়ই প্রাণদন্ডে দন্ডিত হবে।
মিথ্যে গুজব রটাবে না। 
অন্যায়ের পক্ষ নিয়ে দুষ্ট লোককে সাহায্য করবে না। দশজনে অন্যায় করছে বলে তুমিও তা করতে যেয়ো না। 
কোন মোকদ্দমায় সাক্ষ্য দিতে দিয়ে গিয়ে অধিকাংশের সাথে যোগ দিয়ে ন্যায়বিচারে বাঁধা দিয়ো না। কেউ গরীব বলেই বিচারের সময় তার পক্ষ নেবে না।
সাজান মামলা থেকে দূরে থাকবে।
কোন নির্দোষীকে মৃত্যুর শাস্তি দিয়ো না। এই অন্যায়কারী শেষ বিচারে আমার করুণা লাভে সমর্থ হবে না। 
ঘুষ খেয়ো না, কারণ ঘুষ মানুষকে অন্ধ করে দেয়-সৎলোকের কথায়ও প্যাঁচ লাগিয়ে দেয়।
কারও নিকট থেকে অন্যায় সুবিধা নেবে না, কিম্বা জুলুম করে তার জিনিস নেবে না। মুজুরের দিনের মুজুরী দিনে পরিশোধ করতে হবে- তা সকাল পর্যন্ত আটকে রাখবে না।

বধিরকে অভিশাপ দেবে না। অন্ধের পথে উঁচোট খাবার মত কিছু রাখবে না।
কারও নিন্দা করবে না। কোন মানুষের প্রাণের ক্ষতি হতে পারে এমনকিছু করবে না।
বিভিন্ন জাতের পশুর মধ্যে মিলন ঘটানো যাবে না। 
কাউকে ঠকাবে না। মাপে কিম্বা ওজনে কম করবে না।
নিজের কন্যাকে বেশ্যা বানানো যাবে না। এতে সে অপবিত্র হয়ে পড়বে এবং দেশ ব্যভিচারী হয়ে যাবে ও সকল কূ-কার্য্যে পূর্ণ হবে।

তোমার শত্রুর কোন পশুকে যদি অন্য কোথাও চলে যেতে দেখ তবে সেটা অবশ্যই তার কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। তোমাকে ঘৃণা করে এমন কোন ব্যক্তির গাধাকে যদি বোঝার ভারে পড়ে যেতে দেখ তবে সেই ব্যক্তিকে সেই অবস্থায় রেখে চলে চলে যাবে না, তাকে অবশ্যই সাহায্য করতে হবে।
বলদ আর গাধা একসঙ্গে জুড়ে চাষ করবে না। 
শস্য মাড়াই করার সময়ে বলদের মুখে জালতি বেঁধ না। 
মৃতলোকের জন্যে শোক প্রকাশ করতে গিয়ে দেহের কোন স্থান ক্ষত করবে না। 
দেহে উল্কি আঁকবে না।

অন্যের প্রতি ঘৃণা পোষণ করবে না। অন্যের দোষ অবশ্যই দেখিয়ে দেবে যাতে শেষ বিচারে  নিজে দোষী সাব্যস্ত না হও। তোমাদের মধ্যে বাস করা অন্য জাতির লোকদের সঙ্গে দূর্ব্যাবহার করবে না। কারও বিরুদ্ধে মনের মধ্যে হিংসার ভাব পুষে রাখবে না। প্রত্যেক মানুষকে নিজেরমত করে ভালবাসবে।
কোন বিদেশীর সঙ্গে দূর্ব্যাবহার বা তার উপর কোন অত্যাচার কোরও না, কারণ মিসরে তোমরাও একদিন বিদেশী ছিলে। 
প্রাচীনকে উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান করবে এবং বয়স্ককে সমাদর করবে। 
প্রতিবেশীকে মহব্বত করবে এবং শত্রুকে ঘৃণা।

কোন বিধবা বা অনাথকে কষ্ট দিও না। যদি তা কর এবং সে আমার কাছে কাঁদে তবে নিশ্চয়ই আমি তার কান্নায় কান দেব। 
ঈমামেরা মাথা কামাবে না। তারা বেশ্যা, বিধবা বা স্বামী পরিত্যাক্তা কোন স্ত্রীলোককে বিবাহ করবে না।
মাথার দু‘পাশের চুল কাটা বা দাঁড়ির আগা ছাঁটবে না।
কোন স্ত্রীলোক যেন পুরুষের, কিম্বা কোন পুরুষ যেন স্ত্রীলোকের সাঁজ-পোশাক পরিধান না করে। 
সদ্য বিবাহিত কাউকে যুদ্ধে পাঠান যাবে না, কিম্বা তার উপর অন্য কোন কাজের বোঝা চাপিয়ে দেয়া যাবে না। স্ত্রীর সন্তুষ্টির জন্যে এক বৎসর পর্যন্ত এসব কাজ থেকে তাকে রেহাই দিতে হবে। 
এক পরিবার হয়ে বাস করার সময়ে যদি কোন এক ভাই পুত্রসন্তান না রেখে মারা যায়, তবে তার বিধবা স্ত্রী পরিবারের বাইরের কাউকে বিবাহ করতে পারবে না।

কাউকে কিছু ঋণ দিয়ে বন্ধক হিসেবে কোন জিনিষ নেবার জন্যে তার গৃহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করবে না। আর ঋণের বন্ধক হিসেবে কারও যাঁতা কিম্বা তার উপরের পাথরটা নেবে না।
কাউকে ধার দিয়ে মহাজনের মত করে তার কাছ থেকে সুদ নিও না। 
কারও গায়ের চাদর বন্ধক রাখলে সূর্য্য ডুবে যাবার আগেই তা ফিরিয়ে দিতে হবে, কারণ ওটাই তার গায়ে দেবার জন্যে একমাত্র কাপড়। আর যদি তা ফিরিয়ে দেয়া না হয়, যদি সে এজন্যে আমার কাছে কাঁদে, তবে আমি তার কান্নায় কান দেব।
ঈমামের কোন বংশধর দেহে খুঁত নিয়ে খাবার উৎসর্গ করতে বেদীর কাছে যেতে পারবে না বা খোদার উদ্দেশ্যে পোড়ান উৎসর্গের অনুষ্ঠান করতে পারবে না।
ঈমামের পরিবারের লোক ছাড়া আর কেউ উৎসর্গ করা পবিত্র জিনিস খেতে পারবে না। তবে ঈমামের ক্রয়কৃত বা গৃহে জন্ম গ্রহণ করেছে এমন দাস তা খেতে পারবে। তবে তার কন্যা যদি ঈমাম ছাড়া অন্য কাউকে বিবাহ করে, তবে সে তা খেতে পারবে না। তবে তার বিধবা বা স্বামী পরিত্যাক্তা কন্যারা তা খেতে পারবে। অন্য কেউ ভুল করে তা খেয়ে ফেললে ঈমামকে তার মূল্য দিয়ে দেবে। এই মূল্য হবে প্রকৃত মূল্যের চেয়ে এক পঞ্চমাংশ বেশী।

প্রথম জন্মেছে এমন প্রতিটি পুরুষ সন্তান তা মানুষের হোক বা পশুর-প্রভুর বলে ধরা হবে। সাতদিন পর্যন্ত বাচ্চারা তার মায়ের কাছে থাকবে, তারপর আট দিনের দিন সেগুলো খোদাকে দিতে হবে। 
প্রথমজাত পশুকে কেউই খোদার উদ্দেশ্যে উৎসর্গের জন্যে দান করতে পারবে না, কেননা তা খোদারই। কিন্তু যদি এই পশু অশুচি হয়, তবে তার নিরুপিত মূল্যের এক পঞ্চমাংশ বেশী দিয়ে তাকে মুক্ত করা যাবে। আর মুক্ত না হলে, তা ঐ নিরুপিত মূল্যে বিক্রয় করা যাবে।
ত্বকচ্ছেদের নিয়ম পালন করতে হবে জন্মের অষ্টম দিবসে।

কেউ যদি বিশেষ মানত করে অর্থাৎ নিজেকে বা সন্তানকে খোদার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে, তবে সে নিরুপিত মূল্যের বিনিময়ে নিজেকে বা সন্তানকে মুক্ত করতে পারবে। এই নিরুপিত মূল্য হবে বিশ থেকে ষাট বৎসর বয়স পর্যন্ত পুরুষের ক্ষেত্রে ধর্মীয় শেকেলের পঞ্চাশ শেকেল, আর স্ত্রীর ক্ষেত্রে ত্রিশ শেকেল; আর পাঁচ বৎসর হতে বিশ বৎসর পর্যন্ত পুরুষের ক্ষেত্রে বিশ শেকেল ও স্ত্রীলোকের জন্যে দশ শেকেল; আর এক মাস থেকে পাঁচ বৎসর পর্যন্ত পুরুষের জন্যে পাঁচ শেকেল ও স্ত্রীর জন্যে তিন শেকেল রৌপ্য। কিন্তু কেউ যদি নিরুপিত মূল্য দিতে অক্ষম হয়, তবে সে ঈমামের নিকট আনীত হবে এবং ঈমাম তখন মানতকারী ব্যক্তির সংস্থান অনুসারে মূল্য নিরুপণ করবে।

কেউ যদি খোদার উদ্দেশ্যে নিজের গৃহ উৎসর্গ করে, তবে ঈমাম তার মূল্য নির্ধারণ করবে এবং ঐ ব্যক্তি যদি তার গৃহ মুক্ত করতে চায় তবে নিরুপিত মূল্যের চেয়ে এক পঞ্চমাংশ অধিক দিয়ে তা মুক্ত করতে পারবে। আর যদি কেউ তার অধিকৃত ক্ষেতের কোন অংশ খোদার উদ্দেশ্যে দান করে, তবে বপনীয় বীজানুসারে তার মূল্য নিরুপিত হবে; প্রতি এক ওমর যবের বীজের জন্যে পঞ্চাশ শেকেল করে রৌপ্য। আর যদি সে তা ছাড়িয়ে নিতে চায়, তবে নিরুপিত মূল্যের এক পঞ্চমাংশ বেশী দিয়েই তা মুক্ত করতে পারবে। কিন্তু যদি সে মুক্ত না করে ঐ ক্ষেত অন্য কারও কাছে বিক্রয় করে, তবে আর কখনও তা মুক্ত হবে না। যোবেল বৎসরে সেই ক্ষেত বর্জিত ভূমির ন্যায় খোদার উদ্দেশ্যে পবিত্র হবে, আর তাতে ঈমামেরই অধিকার হবে। 

মানত পূরণের জন্যে খোদার উদ্দেশ্যে উৎসর্গিত পশু হতে হবে নিখুঁত ও নির্দোষ। কেউ উৎসর্গের জন্যে দান করা বস্তুর পরিবর্তন বা অন্যথা করবে না, মন্দের পরিবর্তে ভাল কিম্বা ভালর পরিবর্তে মন্দ দেবে না; যদি কোন উৎসর্গের দান পরিবর্তন করতেই হয়, তবে তা এবং তার বিনিময় উভয়ই পবিত্র হতে হবে। আর যদি খোদার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা যায় না এমন পশু কেউ দান করে, তবে সে ঐ পশুকে ঈমামের সম্মুখে উপস্থিত করবে। ঐ পশু ভাল কিম্বা মন্দ হোক, ঈমাম তার মূল্য নির্ধারণ করবে। কিন্তু যদি মালিক কোন প্রকারে তা মুক্ত করতে চায়, তবে সে নিরুপিত মূল্যের এক পঞ্চমাংশ বেশী দেবে।

মানত পূরণ করতে দেরী কোরও না। বেশ্যার উপার্জিত অর্থ মানত পূরণের জন্যে খোদারগৃহে আনা চলবে না। কারণ এরকম পুরুষ ও স্ত্রীলোক উভয়ই ঘৃণ্য।
ফসল কাটবার সময় তোমরা ক্ষেতের কিনারার ফসল কাটবে না এবং ক্ষেতে যা পড়ে থাকবে তা-ও কুড়িয়ে নেবে না। গরীব ও ভিন্ন জাতির লোকদের জন্যে তা রেখে দেবে। 
কারও আঙ্গুর বা অন্য কোন ফলের বাগানে গিয়ে তোমরা খুশী মত খেতে পারবে, কিন্তু তা নিয়ে যাওয়ার জন্যে কোন কিছুতে তুলে রাখা চলবে না।
রোপিত কোন বৃক্ষে ফল ধরলে পরপর তিন বৎসর তা তোমাদের জন্যে নিষিদ্ধ। আর চতুর্থ বৎসরের ফল খোদার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করবে। এতে তোমাদের জন্যে প্রচুর ফল উৎপন্ন হবে।

উৎপন্ন শস্যের এক দশমাংশ খোদার- তা জমির ফসলই হোক কিম্বা গাছের ফলই হোক। তা খোদার উদ্দেশ্যে আলাদা করে রাখতে হবে। কেউ যদি এই অংশ ছাড়িয়ে নিতে চায় তবে তার প্রকৃত মূল্যের সঙ্গে তাকে আরও এক পঞ্চমাংশ বেশী দিতে হবে। পশুপালেরও এক দশমাংশ, অর্থাৎ রাখালের লাঠির নীচ দিয়ে চলে যাওয়া প্রতিটি দশম পশু হবে খোদার। এই পশুগুলো ভাল কি মন্দ তা দেখা চলবে না। কিন্তু যদি কেউ তার পরিবর্তন করে তবে, তা ও তার বিনিময় উভয়ই পবিত্র হতে হবে; কিন্তু তা মুক্ত করা যাবে না।

প্রত্যেক তৃতীয় বৎসরে সব ফসলের এক দশমাংশ আদায় শেষ হলে সেগুলো তোমরা লেবীয়, মুসাফির, অনাথ এবং বিধবাদের দেবে। তারপর তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে বলবে, ‘আমি আমার আয় থেকে তোমার উদ্দেশ্যে আলাদা করে রাখা অংশটা তোমার আদেশ অনুসারে লোকদের দিয়েছি। তোমার আদেশ আমি অমান্য করিনি কিম্বা সেগুলোর একটাও আমি ভুলে যাইনি, তার কোনকিছু আমি খাইনি, কিম্বা অশূচি অবস্থায় তা গৃহ থেকে বের করিনি, কিম্বা তা থেকে কোন অংশ মৃতলোকদের উদ্দেশ্যে দান করিনি।’

পরপর ছয় বৎসর তোমরা ক্ষেতে চাষ করবে এবং ফসল কাটবে, সপ্তম বৎসরে জমি চাষও করবে না বুনবেও না; এই বৎসর ভূমির বিশ্রামার্থক বিশ্রামকাল। ঐ সময় জমিতে এমনি যা জন্মাবে তোমাদের মধ্যেকার গরীব লোকেরা এবং বুনোপশুরা তা থেকে খাবার পাবে। বিশ্রাম বৎসরে তোমাদের খাদ্যের চিন্তা করতে হবে না। কেননা ষষ্ঠ বৎসরে আমার আশীর্বাদে তিন গুন শস্য উৎপন্ন হবে। যা তোমরা সংগ্রহ করে রাখবে সপ্তম বৎসর তথা অষ্টম বৎসরের ফসল উৎপন্নের পূর্ব পর্যন্ত ভক্ষণের নিমিত্ত।

আর তোমরা সপ্তম বিশ্রাম বৎসরের পরবর্তী বৎসর তথা ৫০তম বৎসরকে পবিত্র করবে, কেননা তা তোমাদের জন্যে যোবেল (তূরীধ্বনির মহোৎসব) বৎসর। তোমরা সমস্ত দেশ তথা সকল নিবাসীর কাছে মুক্তি ঘোষণা করবে এবং তোমরা প্রত্যেকে আপন অধিকারে, আপন গোষ্ঠীর কাছে ফিরে যাবে। এই বৎসর তোমরা ক্ষেতে বীজ বুনবে না, স্বত: উৎপন্ন শস্য ছেদনও করবে না, কোন ফলও সংগ্রহ করবে না; কেননা তা যোবেল। তবে তোমরা ক্ষেতে উৎপন্ন শস্যাদি ভক্ষণ করতে পারবে।

বিবাহের পর যদি কেউ স্ত্রীর মধ্যে কোন ঙ্খলন লক্ষ্য করে তবে তার হাতে তালাকনামা  দিয়ে বিদায় করে দেবে। অত:পর স্ত্রীলোকটি যদি অপর কাউকে বিবাহ করে এবং তার দ্বিতীয় স্বামীও যদি পরে তাকে তালাক দেয়, কিম্বা সেই স্বামী যদি মারা যায়, তবে তার প্রথম স্বামী তাকে আর বিবাহ করতে পারবে না, কারণ সে অশুচি হয়ে গেছে।

যদি কোন স্ত্রীলোক গর্ভবতী হয় এবং সে সন্তান প্রসব করে, তবে সে মাসিকের সময়ের মতই সাত দিন অশুচি থাকবে। পরে অষ্টম দিবসে সে নিজেকে শুচি করবে। এতদুদ্দেশ্যে সে এক জোড়া ঘুঘু কিম্বা এক জোড়া কপোত শাবক নিয়ে সমাগম তাম্বুর দ্বারে ঈমামের নিকটে আসবে; ঈমাম তার একটা পাপার্থক বলি ও অন্যটা হোমবলিরূপে উৎসর্গ করবে। তারপর সে ঐ স্ত্রীলোকের অশৌচ প্রযুক্ত খোদার সম্মুখে তার জন্যে প্রায়শ্চিত্ত করবে। অশৌচ হতে শুচি করণে সকলের জন্যে এই ব্যবস্থা।

মাসিকের অশুচি অবস্থার সময় কোন স্ত্রীলোকের সাথে দৈহিক মিলন করবে না। যদি কোন পুরুষ এ রকম স্ত্রীলোকের সঙ্গে মিলিত হয় এবং মাসিকের রক্ত তার গায়ে লাগে তবে সে সাতদিন পর্যন্ত অশুচি থাকবে। আর যে তাকে স্পর্শ করবে সে সন্ধ্যে পর্যন্ত অশুচি থাকবে।
খাবার বাঁধা নেই এমন কোন মৃত পশুর দেহ কেউ স্পর্শ করলে সে সন্ধ্যে পর্যন্ত অশুচি থাকবে।

চর্মরোগ দেখা দিলে তোমাদের সতর্ক হতে হবে এবং ঈমামেরা যে নির্দেশ দেবে তা যত্নের সঙ্গে পালন করতে হবে। কারও চর্মরোগ দেখা দিলে সে ছিন্নবস্ত্র পরিধান করবে ও তার মস্তক মুক্তকেশ থাকবে। আর সে নিজ ওষ্ঠ বস্ত্র দ্বারা আবৃত করে নিজেকে অশুচি বলে প্রচার করবে যতদিন তার গায়ে ঘা থাকবে এবং শিবিরের বাইরে সে একাকী বাস করবে।
খোদা পবিত্র বলে তোমাদেরও পবিত্র হতে হবে। 

যদি কারও স্ত্রী কূপথে যায় এবং স্বামীর প্রতি অবিশ্বস্ত হয়ে অন্য পুরুষের সঙ্গে ব্যভিচার করে অসতী হয়, আর তা যদি স্বামীর অজানা থাকে এবং তা গোপন থেকে যায়- কারণ তার বিরুদ্ধে কোন স্বাক্ষী নেই এবং সেই কাজে সে ধরাও পড়েনি- কিন্তু তবুও যদি কোন কারণে স্ত্রীর উপর সন্দেহ সৃষ্টি হয় তবে সে তাকে ঈমামের কাছে নিয়ে যাবে। সেই সঙ্গে তার স্ত্রীর হয়ে উৎসর্গ করার জন্যে তাকে এক ওমর যবের ময়দাও সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। সে এর উপর কোন তেল বা লোবান দেবে না। 
ঈমাম সেই স্ত্রীলোককে বেদীর সম্মুখে দাঁড় করাবে। তারপর সে একটি মাটির পাত্রে কিছু পবিত্র পানি নেবে এবং আবাস তাম্বুর মেঝে থেকে কিছু ধূলো নিয়ে সেই পানির মধ্যে দেবে। তারপর ঈমাম তার চুল খুলে দিয়ে সন্দেহের দরুণ আনা উৎসর্গের জিনিষ তার হাতে দেবে। ঈমাম তার নিজের কাছে রাখবে আভিশাপের তিতা পানি। তারপর সে স্ত্রীলোকটিকে বলবে-‘বিবাহের পর যদি তুমি ব্যভিচার করে না থাক, যদি তুমি কূ-পথে গিয়ে অসতী না হয়ে থাক তবে অভিশাপ আনা এই পানি যেন তোমার কোন ক্ষতি না করে। কিন্তু যদি তুমি কূ-পথে গিয়ে, ব্যভিচার করে অসতী হয়ে থাক’ -এ পর্যন্ত বলার পর ঈমাম স্ত্রীলোকটির উপর একটা অভিশাপ ডেকে আনবে। উত্তরে স্ত্রীলোকটি বলবে, ‘তাই হোক।’

মহাঈমাম হারুণের পোষাক
ঈমাম তখন ঐ অভিশাপ চামড়ার উপর লিখে, লেখাটা সেই তিতা পানিতে ফেলবে। তারপর সে স্ত্রীলোকটির হাত থেকে উৎসর্গের জিনিস নিয়ে তা বেদীর সামনে দুলিয়ে তা থেকে এক মুঠো বেদীর উপর পুড়িয়ে দেবে। তারপর সে সেই তিতা পানি তাকে খেতে দেবে। স্ত্রীলোকটি অসতী হলে এই পানি তার সন্তানধারণ ক্ষমতা নষ্ট করবে বা তার উপর ডেকে আনা অভিশাপ কার্যকরী করবে।
গ). ধর্মীয় আচার-বিধি ও উৎসবাদি: 
আমার নির্দেশনা মতই আবাস তাম্বু ও সব আসবাবপত্র তৈরী করাবে।
মাটি বা পাথর দিয়ে বেদী তৈরী করবে, আর তার উপর তোমাদের উৎসর্গের পশু কোরবাণী করবে। পাথর দিয়ে আমার উদ্দেশ্যে কোন বেদী তৈরী করতে গিয়ে সেই পাথরগুলো কাটবে না। কারণ, তার উপর যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে গিয়ে তোমরা তা অপবিত্র করে ফেলবে। বেদী এমনভাবে তৈরী করবে যাতে তার উপর সিঁড়ি দিয়ে উঠতে না হয়, কারণ সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গেলে তোমাদের উলঙ্গতা প্রকাশ পাবে।

হারুণ ও তার পুত্ররা ঈমাম হিসেবে আমার সেবা করবে। সম্মান ও সাঁজের উদ্দেশ্যে তাদের জন্যে পবিত্র পোশাক তৈরী করাবে। হারুণের পোশাকের মধ্যে থাকবে বুক ঢাকন, এফোদ, বাইরের জামা, ভিতরের জামা, পাগড়ী ও কোমর বাঁধনি। আর বুক ঢাকনের ভাঁজের মধ্যে রাখবে উরীম ও তুম্মীম।
মহাঈমাম হারুণের পোষাক
হারুণের পুত্রদের জন্যে জামা, কোমর বাঁধনি ও মাথার টুপি এবং কোমর থেকে উরু পর্যন্ত ঢাকার জন্যে মসীনার কাপড়ের জাঙ্গিয়া তৈরী করাবে। পরে তাদেরকে অভিষেক করে ঈমাম পদে বহাল করবে। আমার উদ্দেশ্যে তাদেরকে আলাদা করার জন্যে তুমি একটা ষাঁড় ও দু‘টো ভেড়া নেবে। পরে ষাঁড়টাকে তুমি মিলন তাম্বুর সম্মুখে আনবে, আর হারুণ ও তার পুত্ররা ওটার মাথায় তাদের হাত রাখবে এবং তুমি ষাঁড়টাকে জবেহ করবে। পরে কিছুটা রক্ত নিয়ে তুমি বেদীর শিংগুলোতে লাগিয়ে দেবে, আর বাকী রক্ত বেদীর পাদদেশে ঢেলে দেবে। তারপর নির্ধারিত অংশ বেদীর উপর, আর বাকী অংশ ছাউনি থেকে দূরে নিয়ে পুড়িয়ে ফেলবে। এই হল পাপ উৎসর্গ।

একই ভাবে ভেড়া দু‘টোর একটা নিয়ে জবেহ করবে এবং তার রক্ত নিয়ে বেদীর চার পাশের গায়ে ছিঁটিয়ে দেবে। পরে ভেড়াটা কেটে টুকরো টুকরো করে তার পা এবং পেটের ভিতরকার অংশগুলো ধূয়ে নিয়ে মাথা ও অন্যান্য টুকরোগুলোর সঙ্গে বেদীর উপর রাখবে পোড়ান উৎসর্গ হিসেবে।

পরে অন্য ভেড়াটাও একইভাবে জবেহ করবে এবং তার রক্ত নিয়ে হারুণ ও তার পুত্রদের ডান কানের লতিতে, ডান হাত ও ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলে লাগিয়ে দেবে। আর কিছু রক্ত নিয়ে বেদীর চারপাশে ছিঁটিয়ে দেবে। তারপর কিছু অভিষেক তেল ও বেদী থেকে কিছু রক্ত নিয়ে হারুণ ও তার পুত্রদের শরীরে এবং পোশাকে ছিটিয়ে দেবে এতে পোশাকসহ তাদেরকে আমার উদ্দেশ্যে পৃথক করে নেয়া হবে।

তারপর ঐ ভেড়ার চর্বি, লেজ, মেটের উর্দ্ধাংশ, বৃক্ক ও ডান দিকের উরু, দর্শণ রুটির টেবিলে রাখা খামিহীন রুটির টুকরী থেকে একটা রুটি, একটা তেলে ময়ান দেয়া পিঠা নিয়ে সেগুলি হারুণ ও তার পুত্রদের হাতে দেবে আর তারা তা দোলাবে। এটা হল দোলন উৎসর্গ। তারপর সেগুলি বেদীর উপরস্থিত পোড়ান উৎসর্গের সাথে পুড়িয়ে ফেলবে।

পাঁচ কেজি গন্ধরস, আড়াই কেজি সুগন্ধি দারুচিনি, আড়াই কেজি বচ, আর পাঁচ কেজি দারুচিনি ফুলের কুঁড়ি, সাড়ে তিন লিটার জলপাইয়ের তেল প্রভৃতি সুগন্ধি মসলা একসঙ্গে মিশিয়ে পবিত্র অভিষেক তেল তৈরী করবে। আর নির্ভেজাল গুগগুলু, মেথী, কুন্দুরু ও খাঁটি লোবান সমান পরিমানে মিশিয়ে সুগন্ধি ধূপ তৈরী করবে। এতে পরিমান মত লবনও দেবে।
দীপবৃক্ষের প্রদীপগুলো নিয়মিত সন্ধ্যা হতে সকাল পর্যন্ত জ্বালিয়ে রাখার জন্যে ছেঁচা জলপাইয়ের খাঁটি তেল ব্যাবহার করবে।’

দর্শণ রুটির টেবিল।
প্রতিটি দুই ওমর সুক্ষ্ম সূজি দ্বারা প্রস্তুত বারখানি রুটি দর্শণ রুটির টেবিলে দুই পংক্তিতে সাজিয়ে রাখবে। প্রত্যেক পংক্তির উপরে বিশুদ্ধ কুন্দুরু দেবে; তা সেই রুটির স্মরণার্থক অংশ বলে খোদার উদ্দেশ্যে অগ্নিকৃত উপহার হবে। ঈমাম নিয়ত: প্রতি বিশ্রামবারে খোদার সম্মুখে দর্শণ রুটির টেবিলে তা সাজিয়ে রাখবে। এই রুটি হারুণ ও তার সন্তানগণের হবে। আর তারা কোন পবিত্রস্থানে তা ভোজন করবে। 

রূপা দিয়ে দু‘টো তুরী তৈরী করবে। ইস্রায়েলীদেরকে সমবেত করার জন্যে এবং বিভিন্ন দলের যাত্রা শুরু করবার জন্যে তা বাজাবে। যখন দু‘টো তুরীই বাজান হবে তখন ইস্রায়েলীরা সকলে মিলন-তাম্বুর দ্বারদেশে এসে সমবেত হবে। যখন একটা তুরী বাজান হবে তখন ইস্রায়েলের বিভিন্ন বংশের নেতারা তোমার সামনে এসে একত্রিত হবে। এই তুরী বাজাবে হারুণের পুত্রেরা, অর্থাৎ ঈমামেরা। 

লোকগণনার সময় প্রত্যেককেই তার জীবন-মূল্য দিতে হবে। এই জীবন-মূল্য হবে দশ গ্রাম ওজনের ধর্মীয় শেখেলের আধা শেখেল রূপা যা ধনী, গরীব সকলের জন্যে সমান। কেউ এর বেশী বা কম দিতে পারবে না। এসব জীবন-মূল্যের রূপা মিলন-তাম্বুর কাজে ব্যাবহার করবে।

মিলন-তাম্বুকে বেষ্টন করে ইস্রায়েলীরা ছাউনি ফেলবে। 
লেবী-গোষ্ঠিকে গণনা করা যাবে না, কিম্বা লোকগণনার সময় অন্যান্য ইস্রায়েলীদের মধ্যে তাদের ধরাও চলবে না। লেবীরা কেবলমাত্র তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে। তাদের দায়িত্ব হবে আবাস তাম্বু এবং তার সমস্ত সাঁজ-সরঞ্জাম বয়ে নেয়া এবং তার রক্ষণাবেক্ষণ করা। 
মিলন-তাম্বুকে বেষ্টন করে কিছু দূরে ইস্রায়েলীরা তাদের ছাউনি ফেলবে। 
বৎসরে তিনবার তোমরা সমস্ত পুরুষ জাতি খোদার সাক্ষাতে উপস্থিত হবে।
আমার ধর্মধামের সমাদর করবে।
তোমরা বৎসরে আমার উদ্দেশ্যে এইসব উৎসব পালন করবে। 
ঈদুল ফেসাখ: নিস্তার পর্বের এই উৎসব হবে আমার আদেশ অনুযায়ী, নিরুপিত সময়ে, বৎসরের প্রথম মাস অর্থাৎ আবীর মাসের চতুর্দশ দিবসের সন্ধ্যাবেলায়। 
ঈদুল মাত‘ছ: ঈদুল ফেসাখের পরবর্তী সাতদিন হবে খামিহীন রুটির উৎসব। প্রথম দিবস এবং ৭ম দিবসে পবিত্র সভা অনুষ্ঠিত হবে এবং ঐ দিন তোমরা কোন শ্রমসাধ্য কোন কাজ করবে না।   
নবান্ন বা শস্যচ্ছেদনের উৎসব: ক্ষেতে বোনা আশুপক্ক শস্যের অগ্রিমাংশ তোমরা খোদার গৃহে আনবে। আর ঈমাম তা বিশ্রামবারের পরদিন দোলন উৎসর্গ করবে, যেন তা তোমাদের জন্যে গ্রাহ্য হয়।

আর যেদিন তোমরা শস্যের আঁটি দোলন উৎসর্গ করবে, সেদিন খোদার উদ্দেশ্যে হোমার্থে এক বর্ষীয় এক নির্দোষ মেষশাবক উৎসর্গ করবে। তার ভক্ষ্য নৈবদ্য হবে দুই ওমর (এক ঐফার দুই দশমাংশ) লোবান বা তৈল মিশ্রিত সূক্ষ্ম সূজি, যা খোদার উদ্দেশ্যে সৌরভার্থক অগ্নিকৃত উপহার হবে এবং তার পেয় নৈবদ্য হবে এক হিন দ্রাক্ষারসের এক চতুর্থাংশ। আর যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা খোদার উদ্দেশ্যে এই উপহার না আনবে, সেইদিন পর্যন্ত তোমরা তোমরা ঐ শস্যের কোনকিছু ভক্ষণ করবে না। 

ঈদুল খেমীশশীম: নবান্ন উৎসবের পর ৫০তম দিবসে তোমরা খোদার উদ্দেশ্যে নুতন ভক্ষ্যের উপহার নিবেদন করবে। এদিন তোমরা আপন আপন নিবাস হতে প্রতিটি এক ওমরের দু‘খানা রুটি আনবে। এই রুটি তৈরী হবে সুক্ষ্ম সূজি দিয়ে এবং খামী দ্বারা। তা খোদার উদ্দেশ্যে আশু পক্কাংশ হবে। আর তোমরা সেই রুটির সাথে হোমার্থে এক বর্ষীয় নির্দোষ সাত মেষ শাবক, এক যুব বৃষ ও দুই মেষ উৎসর্গ করবে এবং তৎসম্বন্ধীয় ভক্ষ্য ও পেয় নৈবদ্যের সাথে খোদার উদ্দেশ্যে সৌরাভার্থক অগ্নিকৃত উপহার হবে।

পরে তোমরা পাপার্থক উৎসর্গের জন্যে এক ছাগ বৎস ও মঙ্গলার্থক উৎসর্গের জন্যে এক বর্ষীয় দুই মেষশাবক উৎসর্গ করবে। আর ঈমাম ঐ আশু পক্কাংশের রুটি ও দুই মেষশাবকের সাথে খোদার সম্মুখে দোলনীয় নৈবদ্যরূপে তা দোলাবে; তা ঈমামের জন্যে খোদার উদ্দেশ্যে পবিত্র হবে। আর সেদিন তোমরা তোমাদের পবিত্র সভার ঘোষণা করবে এবং সেদিন তোমরা কোন শ্রমসাধ্য কাজ করবে না।
সপ্তম মাসের প্রথম দিনে তোমাদের বিশ্রাম পর্ব এবং তূরীধ্বনিসহ স্মরনার্থক পবিত্র সভা হবে। ঐ দিন তোমরা কোন শ্রমসাধ্য কাজ করবে না, কিন্তু খোদার উদ্দেশ্যে অগ্নিকৃত উপহার উৎসর্গ করবে।
ঈদুল ইয়োম কিপ্পুর: সপ্তম মাসের দশম দিন হবে তোমাদের প্রায়শ্চিত্ত দিন। ইস্রায়েল সন্তানগণ তাদের সমস্ত পাপ প্রযুক্ত বৎসরের এই দিন প্রায়শ্চিত্ত করে শুচি হবে। এদিন তোমরা রোজা রাখবে। আর যে রোজা রাখবে না সে আপন সামাজ হতে উচ্ছিন্ন হবে। এদিন তোমাদের পবিত্র সভা হবে এবং দিনটি হবে বিশ্রামবার অর্থাৎ তোমরা কোন শ্রমসাধ্য কাজ করবে না। নবম দিবস সন্ধ্যা হতে পরদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়টাই এই বিশ্রামবার বলে গণ্য হবে।

ঈদুল সুক্ক: সপ্তম মাসের পঞ্চদশ দিবসাবধি তোমরা কুটিরবাস পর্ব পালন করবে, যেন তামাদের অনাগত সন্তানেরা জানতে পারে যে আমি তোমাদেরকে মিসর থেকে বের করে এনে কুটিরে বাস করিয়েছিলাম। এই পর্বের প্রথম ও অষ্টম দিবসে পবিত্র সভা হবে এবং দিন দু‘টি বিশ্রামবার হবে। আর প্রতিদিনই তোমরা খোদার উদ্দেশ্যে অগ্নিকৃত উপহার উৎসর্গ করবে। 
আবার ঐ মাসের পঞ্চদশ দিবসে ভূমির ফল সংগ্রহ করলে তোমরা পরবর্তী সাতদিন ফল সঞ্চয়ের উৎসব পালন কোরও। এই পর্বেরও প্রথম ও অষ্টম দিবস বিশ্রামবার হিসেবে গণ্য হবে।

এই সকল তোমাদের জন্যে খোদার নির্দিষ্ট করা পর্ব। খোদার বিশ্রাম দিন হতে, খোদার উদ্দেশ্যে তোমাদের দান হতে, তোমাদের সমস্ত মানত হতে ও তোমাদের স্ব-ইচ্ছায় দত্ত সমস্ত নৈবদ্য হতে এই সকল ভিন্ন।

এভাবে আল্লাহ মূসাকে ব্যবস্থা দিলেন। যা ছিল মানুষের জন্যে জ্ঞানবর্তিকা, হেদায়েত ও রহমতস্বরূপ। 

সমাপ্ত।
ছবি: biblesearchers, mudpreacher, cogtoronto.