False Prophet লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
False Prophet লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

৩ মার্চ, ২০১৩

False Prophet: হারিস বিন সাঈদের নব্যূয়ত ও অলৌকিক কর্মকান্ডসমূহ!

আল হারিস বিন সাঈদ (al-Harith bin Said) ভিশন বা স্বপ্ন দর্শণের দ্বারা অনুপ্রাণিত হন এবং দাবী করেন খোদা তাকে তাঁর নবী হতে আহবান জানিয়েছেন। এই বিশ্বাসের উপর কাজ করতে গিয়ে হারিস পরবর্তীতে তার নব্যূয়তের বিষয়টি গোপনে জনসাধারনের নিকট প্রচার করতে থাকেন এবং ধীরে ধীরে দামেস্কের মসজিদে তার একদল অনুসারী তৈরী করে ফেলেন। যখন দামেস্কান কর্তৃপক্ষ আবিস্কার করলেন যে, তিনি দামেস্কের মসজিদে আগত মুসল্লিদের এক সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে বিপথে নিচ্ছেন, তখন তারা বিষয়টি খলিফা আবদ আল মালিককে জ্ঞাত করলে তিনি তাকে গ্রেফতার করতে নির্দেশ দেন।

এসময় হারিস উমাইয়া সাম্রাজ্যের রাজধানী দামেস্ক থেকে পালিয়ে জেরুজালেম চলে যান। সেখানে তিনি অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে তার কার্য্যাবলী চালিয়ে যেতে থাকেন। তার অনুসারীগণ তার চারিদিকে এক অভেদ্য বুহ্য রচনা করল। কিন্তু তার এই নিরাপত্তা বলয় যে নিচ্ছিদ্র ছিল না তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কেননা, তার এই কার্য্যকলাপ আবারও আবিস্কৃত হল তার একান্ত বিশ্বস্ত এক অনুসারীর প্রতারণার দ্বারা। এই অনুসারী তার গোপন আস্তানার খবর খলিফাকে জ্ঞাত করেছিল। এতে আল হারিস ধৃত ও বন্দী হন এবং পরবর্তীতে খলিফার নির্দেশে তাকে হিজরী ৭৯ সনে ক্রুসবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়।

উমাইয়া খেলাফতের ঐতিহাসিকগণ আল হারিসকে ভন্ড নবী হিসেবে চিহ্নিত করে এমন দায়সারা ভাবে চিত্রিত করেছেন তার কাহিনী। তারা উপেক্ষা করেছেন তার জীবনাচার ও অলৌকিক কার্য্যাবলী যা অবশ্যই বিশ্লেষণের দাবী রাখে বলে আমার বিশ্বাস। 

আল হারিস দামেস্কের অধিবাসী। ধারণা করা হয় তিনি আবু গুলাসের শিষ্য ছিলেন। তার পিতা বসবাস করতেন আল হুলা (al-Hūla)-তে। ঐ সময় সিরিয়ার দু’টি শহরের নাম আল হুলা ছিল। হারিসের পিতা এই দু’টির কোনটিতে বাস করতেন তা নিশ্চিত নয়। যাইহোক, আল হারিস খোদাভীরু, পরহেজগার ও বিনয়ী ব্যক্তি ছিলেন। এমন কি যদি তাকে মূল্যবান স্বর্ণখঁচিত পোষাকও পরিধান করিয়ে দেয়া হত, তবুও তার বিনয় প্রকাশ পেত। যখন তিনি খোদার প্রশংসা বা কোরআন পাঠ করতেন, আর যারা তা শুনতে পেত তারা স্বীকার করতে বাধ্য হত যে, জীবনে তারা এমন সুমধুর বচন বা কন্ঠ দ্বিতীয় একটা শুনেনি।

এই আল হারিস একদা তার পিতাকে লিখলেন, "হে পিত: আমি এমন সব দর্শণ পাচ্ছি যাতে আমার মনে হচ্ছে শয়তান আমাকে বিভ্রান্ত করছে। তুমি আমাকে তাড়াতাড়ি জানাও এখন আমি কি করব।”

সব শুনে তার পিতা উত্তরে তাকে জানান, "ও আমার পুত্র, তুমি সেই কাজই করে যাও যা তোমাকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ বলেছেন- "Shall I declare to you upon whom demons (al-šayātīn) descend? They descend upon all liars and sinners.-(২৬:২২১-২২২)। -আর তুমি মিথ্যেবাদী নও, নও পাপিষ্ঠ। সুতরাং যেমন আদেশ পাও তেমনি কার্য্য করাই তোমার কর্তব্য।”

আল হারিস মসজিদে আগতদের নিকট, জনে জনে প্রত্যেকের শপথ ও কসম নিয়ে তাদের সাথে তার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতেন। এই শপথ ছিল এমন যে, সে যদি দেখে হারিসের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য, তবে সে তা গ্রহণ করবে, আর যদি তার নিকট হারিসের বক্তব্য গ্রহণীয় না হয়, তবে সে বিষয়টি ভুলে যাবে বা গোপন করবে। হারিস মাঝে মাঝে শিষ্যদেরকে বিষ্ময়কর সব কার্য্য করে দেখাতেন। যেমন, তিনি মসজিদের একটা বড় মার্বেল পাথরের স্লাবের নিকট দাঁড়িয়ে সেটাকে হাত দিয়ে দ্বিখন্ডিত করে ফেলতেন ও তারপর খোদার মহিমা কীর্তন করতেন বা তিনি তাদেরকে এমনসব ফল খেতে দিতেন যা ঐ মৌসূমে পাওয়া যায় না। অর্থাৎ শীতকালের ফল গ্রীষ্মকালে বা গ্রীষ্মের ফল শীতে খেতে দিতেন। কখনও কখনও তিনি তাদেরকে বলতেন, "আমার সাথে চল, যাতে আমি তোমাদেরকে ফেরেস্তাদেরকে দেখাতে পারি।”

তিনি তাদেরকে নিয়ে যেতেন দামেস্কের নিকটবর্তী জাবাল কাসিয়ূনের ধর মুরান (Dayr Murrān)-এ এবং সেখানে ফেরেস্তাগণকে দেখাতেন। আর তারা তাদেরকে দেখতে পেত ঘোড়ার পিঠে সওয়ার মানুষ রূপে।

দামেস্কের উমাইয়া মসজিদ প্রাঙ্গন।
অনেক লোক আল হারিসের অনুসারী হয়ে গেল। দামেস্কের মসজিদে তার বিষয়টি আর কারও জানার বাকী ছিল না। তার অনুসারী দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। আর এভাবেই চলছিল যতক্ষণ না বিষয়টি আল কাসিম বিন মুহাইমারা (al-Qāsim b. Muhaymara)-র কাছে পৌঁছিল। 

আল কাসিম বিন মুহাইমারা ছিল একজন সিরীয় মুহাদ্দিস। সে দামেস্কের মসজিদে মুসল্লিদের ওজু ও গোসলের পানি সরবরাহ করে জীবিকা নির্বাহ করত। একদিন আল হারিস তার নিকটে এসে তার কিছু কথা শোনার জন্যে তাকে অনুরোধ করলেন। তবে তিনি তাকে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিলেন যে, যদি সে তার কথা গ্রহণ করে তো করল, আর যদি তা গ্রহণ না করে তবে তার খাতিরে সে বিষয়টি গোপন করে যাবে। তারপর হারিস যখন কাসিমকে তার নব্যূয়তের বিষয়টি নিয়ে শপথবাক্য পাঠ করতে বললেন, তখন কাসিম তাকে বলল, "তুমি একটা মিথ্যেবাদী, তুমি খোদা ও তাঁর ধর্মের শত্রু! তুমি কোন নবী নও এবং তুমি কখনই আমার কোন বচন বা শপথ পাবে না!

আল কাসিম বিষয়টি আবু ইদ্রিস আল হাওলানিকে জ্ঞাত করল। এই আবু ইদ্রিস ছিলেন উমাইয়া দরবারের একজন কাজী বা বিচারক। সবশুনে তিনি কাসিমকে বললেন, "তুমি তো বোকামী করেছ, তুমি কি তাকে বন্দী করতে পারতে না? সে তো এখন পালিয়ে যাবে!”

দামেস্কের উমাইয়া মসজিদ।
আবু ইদ্রিস তার মজলিস থেকে উঠলেন এবং খলিফা আবদ আল মালিকের সাথে দেখা করতে গেলেন। তারপর খলিফাকে বিষয়টি জ্ঞাত করলে তিনি হারিসকে গ্রেফতার করতে নির্দেশ দিলেন। কিন্তু আল হারিসকে গ্রেফতার করা যায়নি। গ্রেফতার পর্বের কাহিনী শুনে খলিফার সন্দেহ করার যথেষ্ট অবকাশ ছিল যে, তার সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য হারিসকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। আর তাই তিনি তার সেনাবাহিনীর এক বিরাট অংশকে হারিসের সমর্থক ও তার মতাদর্শে বিশ্বাসী হিসেবে অভিযুক্ত করেন। এই সময়টা ছিল শীতের আগমনের শুরু। তাই খলিফা দামেস্ক ত্যাগ করে আল সিনাইবারা (al-Sinnabra)-তে চলে গেলেন। এই সিনাইবারাতে ছিল খলিফার শীতকালীন অবকাশ যাপনের প্রাসাদ।

আল হারিস পালিয়ে জেরুজালেম চলে আসেন এবং সেখানে নিজেকে লুকিয়ে ফেলেন। তার বিশ্বস্ত শিষ্যরা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে বেঁছে বেঁছে লোকদেরকে ধরে আনত এবং তিনি তাদেরকে তার মতাদর্শে দীক্ষিত করতেন। এমনিই চলছিল।

একদিন ইরাকের বসরা নগরী থেকে এক ব্যক্তি জেরুজালেমে এল। হারিসের এক শিষ্যের সাথে এই বসরীয়র দেখা হল। আলাপচারিতার এক পর্যায়ে শিষ্য বসরীয়কে বলল, 'এখানে একজন ধর্মতাত্ত্বিক লোক অছেন, তুমি কি তার ধর্মতত্ত্বের আলোচনা শুনতে আগ্রহী?’
বসরীয়রা ধর্মতত্ত্ব তথা থিয়োলজিতে ব্যাপক আগ্রহী ছিল। সুতরাং সে বলল, 'অবশ্যই’।

তারপর সে ঐ শিষ্যের সাথে চলতে লাগল যতক্ষণ না তারা আল হারিসের আস্তানায় পৌঁছিল। অত:পর সে হারিসের মজলিসে বসল ও তার আলোচনা শুনল। সত্যি বলতে কি ঐ বসরীয় সুন্দর একটি আলোচনা শুনল। আর তারপর হারিস তাকে তার বিষয়টি বললেন। তিনি বললেন যে, তিনি খোদা কর্তৃক আহুত ও প্রেরিত নবী। এতে ঐ বসরীয় বলল, 'আপনার বাণী সুন্দর বটে, তদুপরি আরও কিছু বিষয় অনুসন্ধানের রয়েছে।’
তিনি বললেন, 'তবে অনুসন্ধান কর।’
বসরীয় চলে গেল।

পরে বসরীয় পুনরায় হারিসের নিকট এল এবং বলল, 'আপনার বাণী সুন্দর এবং তা আমার হৃদয়ে গেঁথে গেছে। আমি আপনার উপর ঈমান আনলাম। এটাই সত্য ধর্ম।’

বসরীয় হারিসকে নিয়মিত দর্শণ দিতে লাগল, যতক্ষণ না সে তার অন্যতম বিশ্বস্ত শিষ্যদের একজন না হল। এভাবে সে জেনে গেল কোথায় হারিস যান, কোথায় থাকেন, কিভাবে লুকান, তার বিশ্বস্ত শিষ্যগণ কারা ও তার নিরাপত্তা বেষ্টনীর স্তরসমূহ কিভাবে কাজ করে ইত্যাদি যাবতীয় তথ্য।

তারপর একসময় ঐ বসরীয় হারিসকে বলল, 'এবার আমাকে যাবার অনুমতি দিন।’
'কোথায়?’- হারিস জিজ্ঞেস করলেন।
'বসরায়’- সে বলল, 'আমি আপনার ধর্মপ্রচারকারীর প্রথমজন হতে যাচ্ছি।’
তখন তিনি অনুমতি দিলেন।

খলিফার আল সিনাইবারার প্রাসাদ।
ঐ বসরীয় হারিসের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সরাসরি খলিফা আবদ আল মালিকের নিকট গেল। খলিফা তখন সিনবারাতে ছিলেন। খলিফার তাঁবুতে পৌঁছে সে চিৎকার করে বলল, 'জরুরী সংবাদ আছে।’
প্রহরী তাকে জিজ্ঞেস করল, 'কি সেই সংবাদ?’
সে বলল, 'সংবাদটি বিশ্বাসীদের নেতার জন্যে।’

খলিফা তার প্রহরীদেরকে তাকে ভিতরে প্রবেশ করতে দিতে নির্দেশ দিলেন। বসরীয় খলিফার তাঁবুর মধ্যে প্রবেশ করে দেখতে পেল খলিফা তার সভাষদবর্গ পরিবেষ্টিত রয়েছেন। বসরীয় খলিফাকে বলল, 'আপনার জন্যে একটা সংবাদ আছে।’
খলিফা বললেন, 'কি তোমার সংবাদ।’
বসরীয় জানত ইতিপূর্বে খলিফা তার সেনাদলের এক বৃহৎ অংশের বিরুদ্ধে হারিসের উপর সমব্যাথী হবার অভিযোগ এনেছিলেন। সুতরাং সে বলল, 'আমাকে অনুমতি দিন যেন আমি একান্তে আপনার সাথে কথা বলতে পারি।’
খলিফা আবদ আল মালিক তার সিংহাসনে বসেছিলেন। তিনি বসরীয়কে কাছে ডাকলেন। সে তার নিকটবর্তী হলে তিনি বললেন, 'এখন বল, কি সংবাদ এনেছ?’
'আল হারিস’- সে নীচু স্বরে বলল।
খলিফা তার সিংহাসনে নড়ে-চড়ে বসলেন, বললেন, 'কোথায় সে?’

'হে বিশ্বাসীদের নেতা’-সে বলল, 'সে এখন জেরুজালেমে। আমি জানি কোথায় সে থাকে আর কোথায় সে যায়।’ 
বসরীয় তার আদ্যোপান্ত কাহিনী খলিফাকে খুলে বলল। সবশুনে খলিফা বললেন, 'তুমি তার সঙ্গী ছিলে। সুতরাং বল কিভাবে তাকে ধরা যাবে।’
বসরীয় বলল, 'আমার সঙ্গে কিছু লোক দেন যারা খোদার কালাম জানে না।’

সুতরাং খলিফা বসরীয়কে ৪০ জন ফারঘানা (Fargāna)-র লোক দিলেন এবং তাদেরকে তার আদেশ মত কাজ করতে নির্দেশ দিলেন। এই ফারঘানারা ছিল খলিফার 'আল বারিদ’ দলের সদস্য। উমাইয়া খলিফা আল বারিদকে দ্রুত সংবাদ আদান-প্রদান বা কোন সম্মানিয় ব্যক্তি বা ভয়ানক কয়েদীকে প্রহরা দিয়ে আনায়নের কাজে ব্যবহার করতেন। যাইহোক, খলিফা জেরুজালেমের কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্যে একটা চিঠি লিখেও বসরীয়র হাতে দিলেন। এই চিঠিতে তিনি বসরীয় জেরুজালেম ত্যাগ না করা পর্যন্ত তার সকল চাহিদা পূরণ করতে কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছিলেন।

বসরীয় জেরুজালেমে এসে নগর কর্মকর্তার সাথে দেখা করে খলিফার পত্রটি হস্তান্তর করল। তখন ঐ কর্মকর্তা বললেন, 'তুমি কি চাও?’
বসরীয় নগরের সকল শক্ত সামর্থ্য ব্যক্তিকে জেরুজালেমের আনাচে কানাচে,প্রতিটি কোনায় কোনায়, রাস্তায় সর্বত্র মোমবাতি হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে এবং সংকেত পাবার পর যে-ই তাদের পাশ দিয়ে যাক না কেন তাকে আটক করার নির্দেশ দিলেন। তারপর যখন সবকিছু ছক অনুযায়ী করা হল, তখন সে একাকী হারিসের আস্তানায় গেল। সে দ্বারদেশে পৌঁছে দারোয়ানকে বলল, 'আমাকে ভিতরে যেতে অনুমতি দাও, যাতে আমি আল্লার নবীর সাথে দেখা করতে পারি।’

দ্বাররক্ষী তাকে নিস্পৃহ গলায় বলল, 'সকাল না হওয়া পর্যন্ত রাতের এই প্রহরে প্রবেশের কোন অনুমতি নেই।’
'তাকে জানাও’-বসরীয় বলল, 'যে আমি সবে পৌঁছেছি এবং পৌঁছানোর আগে থেকেই তার সাথে দেখা করার জন্যে উদগ্রীব হয়ে আছি।’
দ্বাররক্ষী ভিতরে গেল এবং একটু পরে এসে তার জন্যে দ্বার খুলে দিল।

বসরীয় গৃহমধ্যে প্রবেশ করার সংকেত পাওয়া মাত্র সকল মোমবাতি জ্বালান হল। এতে পুরো জেরুজালেম আলোকে আলোকিত হয়ে গেল। বসরীয় আল হারিসের মূল আস্তানায় প্রবেশ করল। কিন্তু তাকে সেখানে দেখল না। সে তখন তাকে খুঁজতে শুরু করল, তথাপি কক্ষের কোথাও তাকে পেল না। এসময় তার অনুসারীগণ যারা সেখানে ছিল তাকে বলল, 'হায়! তুমি আল্লার নবীকে হত্যা করতে চাও, কিন্তু তাকে স্বর্গে তুলে নেয়া হয়েছে!’

বসরীয় তাদের কথায় কান না দিয়ে তাকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে ফিরল এবং একসময় দেয়াল গাত্রে তার লুকিয়ে থাকার নিরাপদ স্বর্গ আবিস্কার করে ফেলল। সে সেখানে হাত ঢুকিয়ে তাকে ধরে টেনে বের করে নিয়ে এল। তারপর তাকে জোরপূর্বক গৃহের বাইরে বের করে দিয়ে ফারগিন্সদের বলল, 'একে ধরে এমনভাবে বাঁধ, যেন পালাতে না পারে।'

আল হারিসকে যখন শৃংঙ্খলিত করা হচ্ছিল, তখন তিনি কোরআনের (৪০:২৮) আয়াতটি পাঠ করলেন। রক্ষী ঐ ফারগিন্সরা আরবী ভাল জানত না। তারা তখন তাকে বলল, “This is our Koran. Give us your own Koran.”

খলিফার 'আল বারিদ’ রক্ষীদল আল হারিসকে তার গলার সাথে হস্তদ্বয় একত্রে শৃংঙ্খলিত করল। তারপর তারা তাকে নিয়ে দামেস্কের পথে রওনা দিল। এই দল যখন একটি পার্বত্য পথের নিকট পৌঁছিল তখন জেরুজালেমের দিকে তাকিয়ে হারিস কোরআনের (৩৪:৫০) আয়াতটি পাঠ করলেন-“If I go astray, that is my loss, and if I am rightly guided it is through what my Lord has revealed to me.”

আয়াতটি পাঠ শেষ হওয়া মাত্র আল হারিসের গলা ও হাত থেকে শৃংঙ্খল খুলে মাটিতে পড়ে গেল। তৎক্ষণাৎ রক্ষীরা তাকে আবার শৃংঙ্খলিত করল। কিন্তু হারিস এই একই ঘটনা পুনরায় ঘটাল যখন তারা অন্য একটি পার্বত্যময় পথের উপর পৌঁছিল। 

অবশেষে আল বারিদ রক্ষীদল হারিসকে নিয়ে দামেস্কের আল সিনাবারাতে পৌঁছিল। আর তারপর খলিফা আবদ আল মালিককে হারিসের আগমন সংবাদ জ্ঞাত করলে তিনি তাকে কারাবন্দী করতে আদেশ দিলেন। পরবর্তীতে অবশ্য খলিফা একজন অজ্ঞাত ফিকহবিদকে হারিসের কাছে পাঠিয়েছিলেন যেন তার মারফতে তিনি সত্য জানতে ও বুঝতে পারেন যে তিনি শয়তান দ্বারা বিভ্রান্ত হয়েছেন এবং অত:পর তিনি অনুতাপ ও অনুশোচনা করতে পারেন। কিন্তু হারিস ঐ ফিকহবিদ দ্বারা পরিশুদ্ধ হতে অস্বীকার করেন। তখন খলিফা তাকে জীবন্ত ক্রুসবিদ্ধ করে হত্যার আদেশ দিলেন। এই আদেশ শুনে আল হারিস বলে উঠলেন- “Will you (pl.) kill a man who says, ‘My Lord is God?'”-(৪০:২৮)। 

তখন শীতকাল। আল হারিসের জন্যে একটা ক্রুস তৈরী করা হল। তারপর কোন এক সকালে তাকে ঐ ক্রুসে বিদ্ধ করে ঝুলিয়ে দেযা হল। তবে বিষ্ময়ের ব্যাপার এই যে, হারিস ক্রুসবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর মুহুর্তেও একটি অলৌকিক কার্য্য দেখিয়ে যান। তিনি যখন ক্রুসে ঝুলছিলেন তখন একজন রক্ষী বর্শা দিয়ে তার বুকের বামদিকে বিদ্ধ করতে চাইল। কিন্তু তার সেই বর্শার আঘাত তাকে বিদ্ধ করতে পারেনি। বর্শার লৌহ ফলক পশ্চাৎদিকে বেঁকে গেল এবং বর্শাধারীকে দ্বিগুণ বেগে দূরে ঠেলে দিল। এতে সাধারণ দর্শণার্থীরা ঘোষণা করল- 'তিনি অভেদ্য।’

কেউ কেউ বলল, 'অস্ত্র কোন নবীর উপর কাজ করবে না (Weapons do not avail against prophets!).’
হারিসের অনুসারীগণ এসময় মাটিতে উঁপুড় হয়ে ভয়ে ও বিষ্ময়ে তাকে সম্মান করল। আর তারা কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল- “it’s not possible for someone like him to be killed!”

ঐ রক্ষী দ্রুত গিয়ে খলিফাকে বিষয়টি জ্ঞাত করলে তিনি রাগান্বিত হয়ে বললেন, “Muhammad was not the father of any of your men, but was God’s Messenger and the Seal of the Prophets.”-(৩৩:৪০)। তিনি ঐ রক্ষীকে খোদার নাম নিয়ে হারিসকে বিদ্ধ করার চেষ্টার জন্যে তিরস্কার করেন।

তারপর খলিফা তার প্রধান কারারক্ষী আবু জুরা রওয়াহ বিন জিন্বা (Abū Zura Rawh b. Zinbā)-কে ডেকে এ নির্দেশ দেন- “Pierce his right side, then the šaytān will be forced out his left.” এতে সে পাতলা সূচালো এক বল্লম নিয়ে এসে হারিসের পাঁজড়ের বিভিন্ন স্থানে খোঁচাতে থাকল যতক্ষণ না তা বিদ্ধ হয়। অবশেষে দুই পাঁজড়ের মধ্যস্থানে বল্লম বিদ্ধ হলে সে তা এমনভাবে বিদ্ধ করতে থাকল যতক্ষণ না বল্লমের অগ্রভাগ তার পৃষ্ঠদেশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। এভাবেই হারিসের অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি হল।

আল হারিস তার বুদ্ধিদীপ্ত আচরণ, সুমিষ্ট কন্ঠ ও বাণী দিয়ে মানুষকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন। তিনি স্বল্প সময়ে এক বিরাট অনুগত অনুসারী তৈরী করেন। তার মানুষকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা ও দক্ষতার প্রমান পাওয়া যায় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে খলিফার অভিযোগ থেকে। সম্ভবত: খলিফার উচ্চপদস্থ কর্মচারীর মধ্যেও তার অনুসারী ছিল। কিছু কিছু সূত্র জানায় জিলান, যিনি রাজদরবারের খতিব ছিলেন ও উম্মে আল দার্দার বিরুদ্ধে কানাঘুষা হয়েছিল যে তারা হারিসের সমর্থক ও তার প্রতি সহানুভূতিশীল।

জিলান আল দামেস্কী, রাজদরবারের সেক্রেটারী বা খতিবই শুধু ছিলেন না, তিনি রাষ্ট্রের আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের সাথেও জড়িত ছিলেন। হিশাম বিন আবদ আল মালিক তাকে ক্রুসবিদ্ধ করে দামেস্কের নগর দ্বারে ঝুলিয়ে দেন। কিন্তু এই শাস্তি দেশদ্রোহীর বেলায় প্রযোজ্য ছিল ধর্মদ্রোহীর বেলায় নয়। সম্ভবত: হিশাম হারিসের প্রতি জিলানের সহানুভূতির কথা জানতে পেরেই এই কঠোর শাস্তি দেন। প্রথমে আমরা জিলানের বিরুদ্ধে অভিযোগের সুত্রগুলোতে নজর বুলিয়ে যাই-

সূত্র-১: আল ওয়ালিদ বিন মুসলিম বর্ণনা করেন- আল মুন্দির বিন নাফি বলেন তিনি জিলানকে তিরস্কার করে হালিদ বিন লাগলাগকে বলতে শুনেছেন, ’ড্যাম য়্যূ জিলান, তুমি কি নাচনেওয়ালা ছিলে না? ড্যাম য়্যূ, তুমি কি কিবতী ছিলে না যে পরে মুসলমান হয়েছে? আমি কি তোমাকে রমজান মাসে মহিলাদের দিকে আপেল ছুঁড়ে দেবার সময় হাতেনাতে ধরিনি? একসময় তুমি হারিস আল কাদ্দাবের স্ত্রীর প্রহরার দায়িত্ব নিয়েছিলে আর দাবী করেছিলে তিনি বিশ্বাসীদের মাতা। আর তারপর তুমি তোমার মতাদর্শের পরিবর্তন ঘটালে, বনে গেলে কাদেরী- একজন জিন্দিক (zindīq-a Persian word resembling the heretic notion of hulul al-Ruh, incarnation of the spirit, often related to Manichaeism. The term zindīq here likely does not connote dualist beliefs, despite the frequent associa-tions of qadar with Magians, but rather Gaylān’s practice of kalām;)! -(Ibn Asākir, Ta'rih madinat Damasq, XLVIII, p. ১৯২)

সূত্র-২: ইয়াহিয়া বিন মুসলিম নাম্নী এক সিরীয় জেরুজালেমে গিয়েছিল খোদার পবিত্র নগরীতে আল আকসা মসজিদে নামাজ আদায়ের জন্যে। এই সময় সে যখন শহরে প্রবেশ করল, তখন এক লোকের সাথে তার দেখা হল। লোকটি তার কাছে জানতে চাইল যে এই শহুরে ভ্রাতার জন্যে কিছুটা সময় ব্যয় করার মত অবকাশ তার আছে কিনা। যখন সে সম্মতি দিল, তখন সে তার এই কাহিনী বর্ণনা করল-

'শহরে রাতটা কাটাও’ লোকটি বলল, 'সকালে তুমি ঘুম থেকে উঠলে আমি তোমার সাথে দেখা করব।’
পরদিন সকালে আমি যখন ঘুম থেকে উঠলাম, সে আমার সাথে দেখা করল এবং বলল, ’তুমি রাতে স্বপ্নের মধ্যে কি কিছু দেখেছ?’
আমি বললাম, 'না, ভাল স্বপ্নই তো দেখলাম।’
সে এই বিষয়ে আমাকে তিনবার প্রশ্ন করল তারপর সে বলল, 'চল।’

আমি তার সাথে গেলাম এবং আমরা একটা ডেরায় প্রবেশ করলাম। সেখানে আমি দেখলাম জিলান, আল হারিস আল কাদ্দাব ও তার অনেকগুলো সঙ্গী রয়েছেন। এ সময় এক ব্যক্তি জিলানকে বলল, 'আবু মারওয়ান! আপনি ঐ সহিফাটি কি করলেন যেটা আমরা গতকাল পাঠ করছিলাম?’

জিলান বললেন, 'সেটার সঠিকত্ব নিরীক্ষণে স্বর্গে ফেরৎ নেয়া হয়েছে আর তারপর সেটা আমাদের কাছে পুনরায় অবতরণিত হবে।’
তখন আমি বললাম, 'আমি কখনও ভাবিনি যে, জীবিত অবস্থায় কখনও মুহম্মদের কমিউনিটির মধ্যে আমি এমনকিছু শুনতে পাব।’-(Ibn Asākir, Ta'rih madinat Damasq, XLVIII, p. ১৯১).

অন্যদিকে উম্মে আল দার্দা রাজ দরবাবের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি ছিলেন। তিনি এই পদ অর্জন করেছিলেন একজন ফিকহবিদ হিসেবে। বাল্যকালে তাকে এতিম অবস্থায় লালন-পালন করেন রসুলুল্লাহর সাহাবী আবু দার্দা। উম্মে দার্দা প্রচন্ড মেধাবী ছিলেন। বাল্যকাল থেকেই কোরআন এবং অন্যান্য ধর্মতত্ত্বের উপর তার দখল আসে আবু দার্দার প্রত্যক্ষ তত্ত্ববধানে। পরে তিনি যৌবণ প্রাপ্ত হলে আবু দার্দা তাকে বিবাহ করে নেন। আবু দার্দার মৃত্যুর পর মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান তাকে বিবাহ করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন এই বলে যে, তিনি মৃত্যুর পরবর্তী জীবনেও আবু দার্দার স্ত্রী হয়ে থাকতে চান।

উম্মে দার্দা জেরুজালেমে এক স্কুলে ছেলেমেয়েদের ধর্মশিক্ষা দিতেন। তার সুনামের কারণে খলিফা আবদ আল মালিক তার প্রতি আগ্রহী হন এবং তাকে জেরুজালেম ছেড়ে দামেস্কে এসে বসবাসের জন্যে অনুরোধ করেন। আর খলিফার সেই অনুরোধ উম্মে দার্দা রক্ষা করেন।

-এমন একজন মহিলা হারিসের অনুসারী হিসেবে অসামঞ্জস্য। তবু তার বিরুদ্ধে এমন অপবাদ রটেছিল। অপবাদ বললাম এ কারণে যে, দামেস্কানরা দেখেছিল তিনি বহিরাগত আবার আল হারিসও ছিল রিফুজি। আর সম্ভবত: তারা এটাকেই মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে বেঁছে নিয়েছিল। যাইহোক, আমরা এখন উম্মে দার্দার বিরুদ্ধে এই অপবাদের সূত্রটি দেখব।

"ইসমাইল বিন ওবায়েদ আল্লা- উম্মে দার্দার একজন প্রথিত যশা ছাত্র বর্ণনা করেন- "উম্মে আল দার্দা আমাকে বললেন, 'লোকেরা আল হারিস আল কাদ্দাব সম্পর্কে কি বলছে?’
আমি বললাম, 'ও মা, তারা দাবী করছে আপনি তাকে আপনার আনুগত্যের শপথ দিয়েছেন!’ কিন্তু তিনি জিজ্ঞাসা করেননি কে সেই ব্যক্তি যে এমন দাবী করছে, এটা হয়ত: একারণে যে, পাছে সেখানে কথা ওঠা ব্যক্তির প্রতি তার ঘৃণা জন্মে।” -(Ibn Asākir, Ta'rih madinat Damasq, LXX, p. 126)

-এমন হাই প্রোফাইলের ব্যক্তিদের সাথে হারিসের সম্পর্কের সূত্রটিই বা কি? এ এই যে, একসময় আল হারিস খলিফা আবদ আল মালিক এর পিতা ও খলিফার পূর্বসূরী মারওয়ান বিন আল হাকাম এর শিক্ষক ছিলেন-(Ibn Asākir, Ta'rih madinat Damasq, XI, p. 427.)। 

সমাপ্ত।
ছবি: Wikipedia, amonamon2.wordpress.
উৎস:

  • Sean W. Anthony,The Prophecy and Passion of al-Harith ibn Sa'id al-Kadhdhab,
  • Ibn Asākir, Ta'rih madinat Damasq,
  • D.M. Dunlop, al-Hārith b. Saīd al-Kadhdhāb,
  • F. Donner, Narratives of Islamic Origins.
  • A. Elad, The Rise and Development of Early Muslim Historiography,
  • Yāqūt al-Hamawī (d. 626/1229), Muğam al-buldān,
  • Šams al-Dīn al-Dahabī (d. 748/1348), Tarīh ̮al-Islām wa-wafayāt al-mašāhīr wa-l-alām
  • Ibn Katīr (d. 774/1373),al-Bidāya wa-l-nihāya,
  • Ibn al-Ğawzī (d. 597/1200), al-Muntaz am fī Tarīh ̮al-mulūk wa-l-umam,
  • Ibn Hağar al- Asqalānī (d. 852/1449),Lisān al-mīzān,
  • Šihāb al-Dīn Mahmūd b. Tamīm al-Maqdisī (d.765/1363), Mutīr al-garām ilā ziyārat al-Quds wa-l-Šām,
  • Ahmad b. Yahyā l-Balādurī (d. 279/982), Ansāb al-ašrāf,
  • Abū Bakr Ahmad b. Abī Haytama, al-Tarīh ̮al-kabīr,
  • Ğamāl al-Dīn al-Mizzī, Tahdīb al-Kamāl fī asmā al-riğāl,
  • Mohammad Akram Nadwi, al-Muhaddithāt: The Women Scholars in Islam,
  • Steven C. Judd, Ghaylān al-Dimashqī,
  • Josef van Ess, Anfänge muslimischer Teologie,
  • J.L. Kraemer, “Apostates, Rebels and Brigands”,
  • Šams al-Dīn al-Dahabī, Siyar alām al-nubalā,
  • Wikipedia.

৭ মার্চ, ২০১২

False Prophet: ভন্ডনবীর উত্থান, প্রতিক্রিয়া ও ফলাফল।

বী মুহম্মদের আসন্ন মৃত্যু সংবাদ সীমান্তবর্তী কয়েকটি প্রদেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করল। কয়েক ব্যক্তি ঐশী পরোয়ানা প্রাপ্তির দাবী করলেন। তারা নিজেদেরকে পয়গম্বর হিসেবে প্রচার ও তাদের গোত্রের লোকদের অনুমোদন ও সমর্থনের প্রচেষ্টা চালালেন। এদের মধ্যে বিপজ্জনক ছিলেন আয়হালা ইবনে ক্বাব বা আল আসওয়াদ আল আনসী, যিনি ছিলেন ইয়েমেনের একজন বিশিষ্ট নাগরিক এবং বিপুল সম্পদ ও প্রভূত বুদ্ধিজ্ঞানের অধিকারী। তিনি সর্বদা পাগড়ী পরতেন এবং মুখ ঢেকে রাখতেন।

আরবের গোত্রসমূহ।
আল-আসওয়াদ আল আনসী লোকদেরকে দৈববাণী দিতেন। তাছাড়া তিনি জাদুও জানতেন। এইসব দৈববাণী ও জাদু দিয়ে তিনি সহজে যে কোন মানুষকে তার প্রভাব বলয়ে নিয়ে আসতেন। তার একটা গাধা ছিল। ঐ গাধাকে তিনি যদি জনসম্মুখে বলতেন, 'তোমার প্রভুর সামনে নত হও।' তখন ঐ গাধা তার সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসত। আবার যদি তিনি বলতেন, 'তোমার প্রভুকে সিজদা কর বা ছালাম দাও।' তবে সে তাই করত। এভাবে তিনি তার গোত্র 'বনি মুদহিজ'- এর সরল বিশ্বাসী লোকদের কাছে যে ভেল্কীবাজী দেখাতেন তা ঐশী বিশিষ্ট্যতা পেত। 

শীঘ্রই আল-আসওয়াদ আল আনসী তার গোত্রের লোকদেরকে নিজ দলভূক্ত করলেন এবং তাদের সাহায্যে শক্তির দ্বারা প্রতিবেশী অনেক গোত্রের বশ্যতা আদায় করলেন। খুবই অল্প সময়ের মধ্যে তিনি হাদ্রামউত থেকে তায়েফ ও আল আহসা থেকে এডেন পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল দখলে নিলেন। তিনি বাজান পুত্র শাহরকে হত্যা করলেন এবং তার স্ত্রী মারজাবানাকে নিজের স্ত্রী করে নিলেন। 

এই শাহরকে নবী মুহম্মদ বাজানের মৃত্যুর পর সানার প্রশাসক নিযুক্ত করেছিলেন। শাহর ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী। তার ইসলাম গ্রহণের পর তার পথ অনুসরণ করে ইয়েমেনের পারস্যিকরা ইসলাম গ্রহণ করেছিল। ইসলামের প্রচার ও প্রসারে তার ভূমিকা ছিল অনন্য। তার নির্দেশেই আরবের বাইরে, পার্স্যিয়ান বন্দর নগরী সিলোনে প্রথম কোন মসজিদ মসজিদ নির্মিত হয়। 

যা হোক, পরবর্তীতে আল আসওয়াদ আল আনসী অবশ্য নিহত হয়েছিলেন। কেননা, তার বিরুদ্ধে নবীজী মৃত্যুদন্ডের আদেশ জারি করেছিলেন। আর ঐ আদেশের পর স্থানীয় মুসলিমগণ সফল ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাকে হত্যা করে ক্ষমতাচ্যুত করে। এক নৈশ পানোৎসব শেষে আল আসওয়াদ যখন মাতাল অবস্থায় ছিলেন, তখন মারজাবানার সাহায্যে এক 'আবনা' (শাহরের গোত্রের নাম), ফিরোজ আদ দায়লামি তাকে তার শয়ন কক্ষে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করেছিল। এই ফিরোজ ছিল সম্পর্কে মারজাবানার ভ্রাতা।

অনেকের মতে- একমাত্র রাতে শয়নের সময় ব্যতিত আসওয়াদ সর্বদা একদল দেহরক্ষী পরিবেষ্টিত থাকায় তাকে রাতে হত্যার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। আর এই হত্যাকান্ডে মারজাবানা সহযোগিতা করেছিলেন। তিনি গভীর রাতে হত্যাকারীদের সংকেত পেয়ে শয়ন কক্ষের দ্বার খুলে দিয়ে পাশের কক্ষে অবস্থান নেন। 

এদিকে ফিরোজ কক্ষে প্রবেশের পর যখন আসওয়াদের শয্যার দিকে এগিয়ে গেল, তখন তিনি বলে উঠলেন,-'ফিরোজ, তুমি কি করতে যাচ্ছ তা আমি জানি।'-এতে ভীত হয়ে সে তৎক্ষণাৎ তার উপর ঝাপিয়ে পড়ে। 

এতে আসওয়াদ শয্যা থেকে পতিত হয় এবং তার ঘাঁড় ভেঙ্গে যায়। ফিরোজ তাকে ঐ অবস্থায় ফেলে রেখে দ্রুত দ্বারের দিকে এগিয়ে গেলে তার সঙ্গী তাকে বাঁধা দেয় এবং আসওয়াদের দিকে নিজে এগিয়ে যায়। আসওয়াদ তখনও জীবিত ছিলেন। ফিরোজের সঙ্গী তাকে ঐ অবস্থায় ছুরি দিয়ে তার শির বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। তারপর তারা ঐ কর্তিত শির নিয়ে দ্রুত প্রাসাদের ছাদে গিয়ে চিৎকার করে বলে-'আল্লাহ মহান'।

এসময় কিছু লোক প্রাসাদের নীচে সমবেত হয়। ফিরোজ তাদের উদ্দেশ্যে বলে-'এই ব্যক্তি আসওয়াদ একজন ভন্ড নবী এবং খোদার শত্রু।' তারপর সে ঐ খন্ডিত শির নীচে সমবেত লোকের মাঝে ছুঁড়ে ফেলে।

যাইহোক, পত্র মারফত যখন আল আসওয়াদের এই মৃত্যুর খবর মদিনায় পৌঁছিল, তখন জানা যায় যে, রসূলূল্লাহ রাতে মারা গেছেন।

অপর দু‘জন প্রতারক হলেন খোওয়ালিদের পুত্র তুলাইহা ও হাবিবের পুত্র আবু সুমামা হারান (মুসাইলিমা)। তুলাইহা 'বনি আসাদ' গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। আর তিনি তার গোত্রের সাহসী বীরদের অন্যতম ছিলেন। হিজরী নবম সনে তিনি বনি আসাদ গোত্রের প্রতিনিধি দলের সাথে মদিনায় আগমন করেন এবং তার গোত্রের অন্যদের সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন।

বনি আসাদ গোত্রের এই সব লোকেরা এক নিদারুণ দুর্ভিক্ষের সময় মদিনাতে এসেছিল। তারা অন্তরগত ভাবে মুমিন ছিল না। শুধু দান খয়রাত লাভের জন্যে ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেছিল। ইসলামী বিধি-বিধান ও রীতি-নীতি সম্পর্কে তারা অজ্ঞ ও বেখবর ছিল। তারা মদিনার পথে-ঘাটে মলমূত্র ও আবর্জনা ছড়িয়ে দিল এবং বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির মূল্য বাড়িয়ে দিল।

আসাদ গোত্রের এসকল লোকেরা নবী মুহম্মদের কাছে এসে যা বলেছিল তা হল- ‘অন্যান্য লোকেরা দীর্ঘকাল ধরে আপনার সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত রয়েছে, অনেকে অনেক যুদ্ধ করেছে এরপর মুসলমান হয়েছে। কিন্তু আমরা কোনরূপ যুদ্ধ ছাড়াই আপনার কাছে উপস্থিত হয়ে মুসলমান হয়েছি। কাজেই আমাদের সদিচ্ছাকে মূল্য দেয়া দরকার।’ তখন তাদের মিথ্যে দাবী ও অনুগ্রহ প্রকাশের মুখোস উন্মোচন করে এই আয়াতসমূহ নাযিল হল- 

মরুবাসীরা বলে, ‘আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি।’
বল, তোমরা বিশ্বাস স্থাপন করনি। বরং বল, আমরা বশ্যতা স্বীকার করেছি। এখনও তোমাদের অন্তরে বিশ্বাস জন্মেনি। যদি তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য কর, তবে তোমাদের কর্ম বিন্দুমাত্রও নিষ্ফল করা হবে না। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম মেহেরবান। তারাই মুমিন যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি ঈমান আনার পর সন্দেহ পোষণ করে না এবং আল্লাহর পথে প্রাণ ও ধন-সম্পদ দ্বারা জেহাদ করে। তারাই সত্যনিষ্ঠ।

বল, তোমরা কি তোমাদের ধর্মপরায়ণতা সম্পর্কে আল্লাহকে অবহিত করছ? অথচ আল্লাহ জানেন যা কিছু আছে ভূ-মন্ডলে এবং যা কিছু আছে নভঃমন্ডলে। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক জ্ঞাত। তারা মুসলমান হয়ে তোমাকে ধন্য করেছে মনে করে। বল, তোমরা মুসলমান হয়ে আমাকে ধন্য করেছ মনে কোরও না। বরং আল্লাহ ঈমানের পথে পরিচালিত করে তোমাদেরকে ধন্য করেছেন, যদি তোমরা সত্যনিষ্ঠ হয়ে থাক। আল্লাহ নভঃমন্ডল ও ভূ-মন্ডলের অদৃশ্য বিষয় জানেন, তোমরা যা কর আল্লাহ তা দেখেন।-(৪৯:১৪-১৮)

যা হোক, তুলাইহা তার দেশে ফিরে গিয়ে নবুয়্যতের দাবী করে বসেন। নবীজী কর্তৃক নিযুক্ত প্রতিনিধি দ্বারার ইবনুল-আযওয়ার তাকে হত্যা করতে আক্রমণ করেন, কিন্তু তরবারীর আঘাত তার শরীরে কাজ করেনি। এই অস্বাভাবিক ঘটনার দ্বারা মানুষের মাঝে তার প্রভূত গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। শীঘ্রই আরবের বনি আসাদ, বনি গাতাফান এবং বনি তাঈ গোত্রের অনেকেই তার ভক্ত ও অনুসারী হয়ে যায়।

অন্যদিকে মুসাইলিমা নজদের ইয়ামামাহ অঞ্চলের আল-আইনিয়্যাহ এলাকায় 'বনি হানিফা' গোত্রে জন্ম গ্রহণ করেন। লোকেরা তাকে রাহমানুল ইয়ামামাহ বলত। হিজরী নবম সনে তার গোত্র বনি হানিফার সাথে তিনি মদিনায় হাজির হন। ঐসময় তিনি বলেছিলেন যে, মুহাম্মদ যদি আমাকে তার সাথে নবুয়্যতে অংশীদার মেনে নেন তবে আমি তার অনুসরণ করব। যাহোক, তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ইয়ামামায় ফিরে গিয়ে নবুয়্যতের দাবী করে বসেন।

Musaylimah, who is reported as having been a skilled magician, dazzled the crowd with miracles. He could put an egg in a bottle; he could cut off the feathers of a bird and then stick them on so the bird would fly again; and he used this skill to persuade the people that he was divinely gifted.

প্রায় একই সময় নবুয়্যত দাবী করে বসেন সাজ্জাহ বিনতে হারিস (Sajjah bint Harith) নামের এক মহিলা। এই সাজ্জাহ খৃষ্টান গোত্র 'বনি তাগলিব'-এ জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নবুয়্যতের দাবী করে বসলে তার গোত্রের লোকরা তাকে সমর্থন করেন। এভাবে গোত্রীয় লোকদের সমর্থনের উপর ভর করে তিনি পাশ্ববর্তী অন্যান্য গোত্রের উপর প্রাধান্য বিস্তার করতে সক্ষম হন। মুসাইলিমা তাকে দক্ষ ও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী দেখে তার সাথে সন্ধির প্রস্তাব করেন। আর ঐ সন্ধির মজলিসে তিনি তাকে বিবাহের প্রস্তাব পেশ করেও সম্মতি আদায়ে সমর্থ হন। সেখানে তিনি সাজ্জাহের সাথে তিনদিন সহাবস্থান শেষে একাকী ফিরে আসেন, কেননা সাজ্জাহ তার গোত্রের লোকদের ছেড়ে অন্যত্র অবস্থান করতে অসম্মতি জ্ঞাপন করেছিলেন।

অত:পর হিজরী ১০ সনে মুসাইলিমা তার পক্ষ থেকে মদীনায় দূত প্রেরণ করেন এই পত্র দিয়ে- 

“আল্লাহর রসূল মুসাইলিমা হতে আল্লাহর রসূল মুহম্মদের প্রতি- 

আসসালামু আলায়কুম! 
আমি আপনার অংশীদার; ক্ষমতা আমাদের মধ্যে অবশ্যই ভাগ করতে হবে। পৃথিবীর অর্ধেক আমার, বাকী অর্ধেক আপনার কুরাইশদের। কিন্তু কুরাইশরা লোভী জাতি-তাদের মধ্যে ন্যায়বিচার নেই।’

--------------------------”
দূত মারফত নবীজী তার এ পত্রের  যে উত্তর দিয়েছিলেন তাতে তার চরিত্রের প্রকৃত স্বরূপ প্রকাশ পেয়েছে-

“পরমদাতা ও দয়ালু আল্লাহর নামে- 
আল্লাহর রসূল মুহম্মদ থেকে প্রতারক মুসাইলিমার প্রতি- 
‘যারা সত্যপথের অনুসারী তাদের প্রতি সালাম। পৃথিবী আল্লাহর, তিনি যার প্রতি সদয় হন তাকেই দুনিয়ার কর্তৃত্ব দান করেন। কেবল পরহিজগারদের জন্যেই পরকাল (শুধু তারাই সুফল লাভ করবে, যারা আল্লাহকে ভয় করবে)।’

(মোহর):
রসূল আল্লাহ।”

মুসাইলিমা নবীজীর প্রেরিত দূতদেরকে চরম অপমান করেন। তাদেরকে ঘৃণাভরে তাড়িয়ে দেয়া হয় এই বলে যে- ‘যদি দূতদের হত্যা করা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি না হত, তবে আমি তোমাদেরকে হত্যা করতাম।’

বিভিন্ন রণাঙ্গনে সেনাবাহিনী প্রেরণ।
এইসব নব্যূয়ত দাবীকারী প্রতারক ও ভন্ডদেরকে দমন ও কঠোর শাস্তির আওতায় আনা অপরিহার্য্য ছিল। কেননা ইসলাম সম্পর্কে পূর্ণ অবগতির পর স্ব-ইচ্ছায় তারা মুসলমান হয়েছিল, অত:পর তারা তাদের মিথ্যে নব্যূয়তের দাবী (যেহেতু কোরআন নব্যূয়তের ধারা সমাপ্তি ঘোষণা করেছিল।) দ্বারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের উপর মিথ্যে আরোপ করল এবং নব্য মুসলমান ও অন্য ধর্মাবলম্বী ব্যক্তিবর্গের সম্মুখে খোদায়ী ধর্মের মর্যাদা ও মাহত্ম্যকে ভূ-লুন্ঠিত করার পাশাপাশি মানুষকে ঐ ধর্ম গ্রহণের পথে বাঁধা সৃষ্টি করে তাদের অপূরণীয় ক্ষতি করে যাচ্ছিল।   

কিন্তু আবু বকরের খেলাফত লাভের পূর্বে এসব ভন্ড নবীদেরকে (False Prophet) দমন করা যায়নি। খেলাফত লাভের পর তিনি যখন সাহাবাদের সাথে এই বিষয়ে পরামর্শ করলেন, তখন কেউই প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণে সম্মতি দিলেন না। এতে আবু বকর তাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘যারা মুসলমান হবার পর রসূল প্রদত্ত নির্দেশ ও ইসলামকে অস্বীকার করে, তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করা আমার কর্তব্য। যদি আমার বিপক্ষে সব জ্বিণ, মানব ও বিশ্বের যাবতীয় বৃক্ষ-প্রস্তর একত্রিত করে আনা হয় এবং আমার সাথে কেউই না থাকে, তবুও আমি একাই ধর্মের জন্যে এই যুদ্ধ চালিয়ে যাব।’

Ridda wars.
তার এই বক্তব্যের পর সাহাবারা এগিয়ে এসেছিলেন এবং তাকে এক জায়গায় বসিয়ে রেখে বিভিন্ন রণাঙ্গনে সেনাবাহিনী প্রেরণের জন্যে মানচিত্র তৈরী করে ফেলেছিলেন। ভন্ড নবীদের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ “Ridda wars” - the Wars of Apostasy হিসেবে পরিচিত।

খলিফা আবু বকর, তুলাইহার বিরুদ্ধে খালিদ ইবনে ওয়ালিদকে প্রেরণ করেন। যুদ্ধে তুলাইহা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে স্ত্রী সহ সিরিয়ায় পলায়ন করেন। সেখানে থাকা অবস্থায় তিনি পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে তার জীবন ইসলামের ছায়াতলেই কেটেছিল।

অন্যদিকে মুসাইলিমার বিরুদ্ধে খলিফা আবু বকর হিজরী ১১ সনে খালিদ ইবনে ওয়ালিদের নেতৃত্বে এক বিরাট বাহিনী প্রেরণ করেছিলেন। ওহুদ যুদ্ধে নবীজীর চাচা হামজার হত্যাকারী- 'ওয়াহশি ইবনে কামিয়া' এ যুদ্ধে মুসাইলিমাকে হত্যা করেছিল। 

এই যুদ্ধে সাজ্জাহর গোত্র বা তার অনুসারীগণ মুসলমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেনি। আর নবুয়্যতের দাবী করলেও খলিফা আবু বকর তার বিরুদ্ধে কোন সেনা অভিযান করেননি, কেননা সাজ্জাহ ছিলেন খৃষ্টান। 
অবশ্য পরবর্তীতে মু'আবিয়া তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করেন। তখন তিনি ইরাকের বসরায় গিয়ে বসবাস করতে থাকেন। যতদূর জানা যায়, একসময় তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং একজন মুসলিমা হিসেবেই বসরাতে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। যাহোক, এখন আমরা দেখি, এ সকল লোকদের এই মিথ্যা নব্যুয়তের দাবীর কারণ কি?

তৎকালীন আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায় -গোত্রীয় ও জাতিগত গোঁড়ামী, ইহুদি ও খৃষ্টানদের মুসলিম জাতির প্রতি প্রতিহিংসা, চিন্তার বিকৃতি, ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞতা ও মুসলিম জাতির বেহাল দশাই মূলত: নব্যুয়তের দাবীর কারণ।

তৎকালীন আরব সমাজ ব্যাবস্থা ছিল গোত্র নির্ভর। মুহম্মদের আগমন কুরাইশ গোত্রের বনি কোসাইয়ে হলে ঐ গোত্রের অপর একটি শাখা বনি মাখজুম গোত্র তা মেনে নিতে রাজী ছিল না, কেবলমাত্র গোত্রীয় গোঁড়ামীর কারণে। আবু জেহেলের উক্তি থেকেই এর সত্যতা পাওয়া যায়- "কুরাইশ গোত্রের একটি শাখা 'বনি কোসাই'য়ে এসব গৌরব ও মহত্ত্বের সমাবেশ ঘটবে, অবশিষ্ট কুরাইশরা রিক্তহস্ত থেকে যাবে-আমরা তা কিরূপে সহ্য করতে পারি? পতাকা তাদের হাতে, হাজীদের পানি পান করানোর গৌরবময় কাজটি তাদের দখলে, কা’বার প্রহরা ও চাবি তাদের করায়ত্ত। এখন নব্যুয়তও তাদের হাতে ছেড়ে দিলে আমাদের আর কি রইল? সুতরাং আমরা কোনদিনই তাদের অনুসরণ করব না, যে পর্যন্ত না আমাদের কাছেও তাদের অনুরূপ ওহী আসে।”

এরই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতও নাযিল হয়েছিল- “যখন তাদের কাছে কোন আয়াত পৌঁছে, তখন বলে, ‘আমরা কখনই মানব না যে পর্যন্ত না আমরাও তা প্রদত্ত হই, যা আল্লাহর রসূলগণ প্রদত্ত হয়েছেন। আল্লাহ এ বিষয়ে সুপরিজ্ঞাত যে, কোথায় স্বীয় পয়গাম প্রেরণ করতে হবে।”-(৬:১২৪)

যা হোক, আরবে বহু গোত্র ছিল। এসব গোত্রের কেউ কেউ (যেমন হানিফা ও আসাদ গোত্র।) মনে করত যে, তারাও কুরাইশদের সমকক্ষ। তারপর যখন কুরাইশ গোত্রের একজন নব্যুয়ত পেলেন, তখন এইসব গোত্রও নব্যুয়তের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। তারা মনে করতে থাকে তাদের মধ্যে থেকেও নবী হওয়া জরুরী। কেননা এটাকে তারা গোত্রীয় সম্মান বলে বিবেচনা করে বসে। আর এতেই পরবর্তীতে এই দু’ই গোত্র থেকেই নব্যূয়তের দাবীদার উত্থিত হয়েছিল।

এভাবে হানিফা গোত্র থেকে যখন মুসাইলিমা নব্যূয়তের দাবী করে বসেন, তখন তার গোত্রের লোকেরা নব্যূয়তের সত্য-মিথ্যা বিচার না করে এটাকে তাদের গোত্রীয় সম্মান বিবেচনা করে তাকে অনুসরণ করতে থাকে। উদাহরণ স্বরূপ-হানিফা গোত্রের এক লোক মুসাইলিমার নব্যূয়ত প্রাপ্তির সংবাদে তার কাছে আগমণ পূর্বক জিজ্ঞেস করল, 'তোমার কাছে এমন কিছু কি অবতীর্ণ করা হয়েছে যে, আমরা তোমার অনুসরণ করব?’

তখন মুসাইলিমা তাকে তার কাছে অবতীর্ণ বাণী শুনিয়ে দিল। লোকটি তখন বলেছিল, ’আমি জানি তুমি মিথ্যেবাদী। কিন্তু আমার কাছে হানিফা গোত্রের একজন মিথ্যেবাদী, কুরাইশ গোত্রের একজন সত্যবাদীর চাইতে অনেক বেশী প্রিয়। সুতরাং আমি তোমাকে অনুসরণ করলাম।’

অবশ্য পরবর্তীতে ঈমানের দৃঢ়তা আসার পর গোত্রীয় কৌলিন্যের জন্যে নব্যুয়তের দাবী তেমন একটা কেউ করেনি। কারণ, মানুষ স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিল যে, নব্যূয়ত কোন দাবীর বিষয় নয়। আল্লাহ জানেন কে উপযুক্ত এবং কোথায় তাঁর পয়গাম প্রেরণ করতে হবে।

আরবদের মধ্যে যেমন গোত্রীয় গোঁড়ামী ছিল, তেমনি অনারবদের মধ্যে ছিল জাতিভেদ। ইসলামের বিজয়ের ফলে প্রচুর অনারব ইসলাম গ্রহণ করে। যেমন,- পারস্যিক জাতি। কিন্তু ইসলাম গ্রহণ করলেও তাদের অনেকের মধ্যেই এ ধারণা প্রবল ছিল যে, একসময় তারা শাসক ছিল অথচ এখন মুসলিম আরবদের দ্বারা তারা শাসিত হচ্ছে। সুতরাং তারাও নিজেদের মধ্যে নবীর প্রত্যাশা করল। তারা ধারণা করল, আল্লাহ যেমন আরবদের মাঝে নবী প্রেরণ করেছেন তেমনি তাদের মাঝেও তিনি প্রেরণ করবেন। আর তারা তাদের ঐ ভাবাদর্শ ও চিন্তাধারাকে তাদের অনুসারীদের মধ্যেও বপন করতে সক্ষম হয়। এতে পরবর্তীতে তাদের মধ্যে নব্যূয়তের দাবীদার উত্থিত হয়। উমাইয়া ও আব্বাসী যুগের নব্যূয়তের দাবীদারদের অধিকাংশই ছিল অনারব।

পরবর্তীতে যারা নব্যূয়তের দাবী করেছেন, তাদের অধিকংশই ছিলেন শিয়া সম্প্রদায় ভূক্ত। তারা প্রথমে ঈমাম হওয়ার দাবী করেছিলেন, যা শেষপর্যন্ত নব্যূয়তের দাবী পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছিল। যেমন,- মুগীরা ইবনে সাঈদ আল-ইজলী, আবু মনসূর আল-ইজলী, আবুল খাতাব আল-আসাদী এবং বয়ান ইবনে সামুআন। আর আলী ইবনে ফাদল আল হিমাইরী আল ইয়েমেনী, যিনি ছিলেন শিয়াদের বার ঈমামী বাইশনা আশারী উপদলের এক ব্যক্তি। তিনি ইসমাঈলী শিয়াদের প্ররোচনায় পড়ে নিজেকে ঈমাম মেহেদী বলে দাবী করে বসেন, তারপর দাবী করেছিলেন তার নব্যূয়ত প্রাপ্তির।

নব্যূয়তের দাবীদারদের মধ্যে সূফী প্রভাবও বেশ লক্ষ্যণীয়। যেমন,- আল হারিস বিন সাঈদ। সবাই তাকে সবচেয়ে বড় পরহেজগার বলে মনে করত, কিন্তু শয়তানের ধোঁকায় পড়ে তিনি পদস্খলিত হন এবং নিজের নব্যূয়ত দাবী করে বসেন।

মূলত: নব্যূয়তের দাবীদারদের যে কাজটি সবচেয়ে বেশী সহযোগীতা করেছিল তা হল তাদের সম্প্রদায়ের মাঝে ইসলাম ও কোরআন সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাব। ফলে এইসব দাবীদাররা সহজে তাদের মতামত ঐ সম্প্রদায়ের উপর খাটাতে সক্ষম হয়েছিল। আবার একথাও উড়িয়ে দেয়া যাবে না যে, নব্যূয়তের এইসব দাবীদাররা মুসলিম উম্মাহর খারাপ অবস্থার সুযোগ নিয়েছিল সবচেয়ে বেশী।

সমাপ্ত।
সংশোধিত নয়।

উ’স:
al-Nadīm, The Fihrist.
Sahih Bukhari, 
The History of al-Tabari  
Maulana Wahiduddin Khan, Muhammad: A Prophet for All Humanity.
Taha Jabir Alalwani, Apostasy in Islam: A Historical and Scriptural Analysis.
M. Mukarram Ahmed, Muzaffar Husain Syed, Encyclopaedia of Islam, ,

Moses: কোরাণিক ক্যানভাসে নবী মূসা।

Abu Hena Mostafa Kamal  01 May, 2017 মি সরের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ফেরাউন। হঠাৎ করে তিনি মৃত্যুবরণ করলেন। কিন্তু তিনি কোন উত্তরাধিকারী ন...