মোহাজির লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মোহাজির লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

১৮ মার্চ, ২০১২

Hajj: হজ্জ্বের বিধি-বিধান।


ছয় বৎসর হল মক্কার মোহাজিররা তাদের দেশ ও ভিটেমাটি ত্যাগ করেছিলেন তাদের ধর্মের জন্যে ও তার জন্যে যিনি তাদের মধ্যে অভূতপূর্ব চেতনা জাগিয়ে দিয়েছিলেন যা তাদের মধ্যে কোনদিন অনুভূত হয়নি। তাদের মধ্যে জাগ্রত করেছিলেন ঐক্য, প্রেম ও ভ্রাতৃত্ব। আরবের প্রত্যেক অংশ থেকে মানুষ এই বিস্ময়কর ব্যক্তির কথা শ্রবণ করার জন্যে, প্রত্যাহিক জীবনের বিভিন্ন কাজে পরামর্শ গ্রহণের জন্যে তার কাছে আসতে লাগলেন, যেমন অতীতে বনি ইস্রায়েলীরা নবী ইসমাইলের সঙ্গে আলোচনা করতেন।

কা'বায় হজ্জ্ব দৃশ্য।
মোহাজিরদের হৃদয় জন্মভূমির জন্যে কাঁদত। গৃহ থেকে বহিঃস্কৃত হয়ে তারা একটি প্রতিদ্বন্দ্বী শহরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তারা পবিত্র কা’বাগৃহের সীমানা থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন যাছিল তাদের সকল সমষ্টিগত সম্পর্কের গৌরবময় কেন্দ্র। এই স্থানটিকে কেন্দ্র করেই তাদের জাতীয় জীবনের ইতিহাস সঞ্চিত হয়েছিল। মুহম্মদ নিজেও জন্মভূমি দর্শনের জন্যে প্রবল ইচ্ছে অনুভব করছিলেন। কা’বাগৃহ সমগ্র আরব জাতির অধিকারভূক্ত ছিল। কুরাইশরা এই পবিত্র গৃহের অভিভাবক ছিল মাত্র। তারা দেশীয় আইন অনুসারে এমনকি একজন শত্রুর আগমনও নিবারণ করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়নি, যদি সে ব্যক্তি কোনরূপ শত্রুতামূলক অভিসন্ধি প্রদর্শণ না করত এবং ধর্মীয় কর্তব্য পালনের প্রকাশ্য স্বীকৃতি ঘোষণা করত।
‘নিঃসন্দেহে সর্বপ্রথম গৃহ যা মানুষের জন্যে নির্ধারিত হয়েছে, সেটাই হচ্ছে এ গৃহ, যা বাক্কায় অবস্থিত এবং সারা জাহানের মানুষের জন্যে হেদায়েত ও বরকতময়। এতে রয়েছে ‘মকামে ইব্রাহিম’এর মত প্রকৃষ্ট নিদর্শণ। আর যে লোক এর ভিতরে প্রবেশ করেছে, সে নিরাপত্তা লাভ করেছে। আর এই গৃহের হজ্জ্ব করা হল মানুষের উপর আল্লাহর প্রাপ্য; যে লোকের সামর্থ রয়েছে এ পর্যন্ত পৌঁছার।(৩:৯৬-৯৭)  

কা'বার প্লান।
হিজরী ৩য় সনের দিকে উপরোক্ত কোরআনের আয়াত দ্বারা হজ্জ্বকে (Hajj) ফরজ করা হল। অবশ্য ইতিপূর্বেও হজ্জ্বের নির্দেশ ছিল। অত:পর তা সময়ের বিবর্তণে এক কূ-প্রথায় পরিণত হয়। বলা যায় জাহেলিয়াত যুগে শয়তান মানুষকে যেসব লজ্জাজনক ও অর্থহীন কূ-প্রথায় লিপ্ত করেছিল, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি ছিল হজ্জ্ব পদ্ধতি।

কুরাইশ ছাড়া (হরমের সেবক হওয়ার সুবাদে তারা এ আইনের ব্যতিক্রম ছিল) কোন ব্যক্তি নিজবস্ত্র পরিহিত অবস্থায় কা‘বাগৃহ তাওয়াফ করতে পারত না। তাকে কুরাইশ গোত্রের কোন না কোন ব্যক্তির কাছ থেকে বস্ত্র ধার করতে হত। কিন্তু হজ্জ্বে আগত সব মানুষকে কুরাইশদের পক্ষ থেকে বস্ত্র প্রদান করা সম্ভবপর ছিল না। তাই আগত পুরুষ ও মহিলাদের প্রায় সকলেই উলঙ্গ অবস্থায় তাওয়াফ করত। মহিলারা সাধারণতঃ রাতের বেলায় তাওয়াফের কাজটা সারত। আর তাদের এই তাওয়াফ ছিল, শিস বাজাতে বাজাতে এবং তালি দিতে দিতে কাবাগৃহ প্রদক্ষিণ করা। উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করার বৈধতার প্রশ্নে তারা বলত, ‘আল্লাহই আমাদের এই নির্দেশ দিয়েছেন। আর আমাদের বাপ-দাদাদের তরিকাও এটা।’

মূর্খ বাপ-দাদার অনুসরণ করার মধ্যে কোন যৌক্তিকতা নেই। কোন তরিকার বৈধতার পক্ষে এটা কোন প্রমান হতে পারে না যে, বাপ-দাদারা এরূপ করত। কেননা বাপ-দাদার তরিকা হওয়া যদি কোন তরিকার বিশুদ্ধতার জন্যে যথেষ্ট হয়, তবে দুনিয়াতে বিভিন্ন লোকের বাপ-দাদার বিভিন্ন ও পরস্পর বিরোধী তরিকা ছিল এবং এ যুক্তির ফলে জগতের সব ভ্রান্ত তরিকাও বৈধ ও বিশুদ্ধ প্রমাণিত হয়ে যায়।

আবার অনেকে বলত, ‘যে সব পোষাক পরিধান করে আমরা পাপ কাজ করি, সেগুলো পরিধান করে আল্লাহর গৃহ প্রদক্ষিণ করা বেয়াদবী।’
এই জ্ঞানপাপীরা এ বিষয়টি বুঝত না যে, উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করা আরও বেশী বেয়াদবীর কাজ।

এদের এই নির্লজ্জ প্রথা ও কথার জবাবে এই আয়াত নাযিল হয়েছিল- আর কা‘বার কাছে তাদের নামাজ বলতে শিস দেয়া ও তালি বাজান ছাড়া আর অন্যকোন কিছুই ছিল না।(৮:৩৫)
তারা যখন কোন মন্দকাজ করে, তখন বলে, আমরা বাপ-দাদাকে এমনি করতে দেখেছি এবং আল্লাহ আমদেরকে এই নির্দেশই দিয়েছেন।’
আল্লাহ মন্দ কাজের আদেশ দেন না। এমন কথা আল্লাহর প্রতি কেন আরোপ কর, যা তোমরা জান না।(৭:২৮)

তুমি বলে দাও, আমার পালনকর্তা কেবল অশ্লীল বিষয়সমূহ হারাম করেছেন-যা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য এবং হারাম করেছেন গোনাহ, অন্যায় অত্যাচার, আল্লাহর সাথে এমন বস্তুকে শরীক করা, তিনি যার কোন সনদ অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহর প্রতি এমন কথা আরোপ করা, যা তোমরা জান না।(৭:৩৩)

যাইহোক এখন হজ্জ্বকে ফরজ করা হলে আ‘কবা ইবনে হারেস প্রশ্ন করলেন, ‘ইয়া রসূলুল্লাহ! আমাদের জন্যে কি প্রতি বৎসরই হজ্জ্ব করা ফরজ?’
মুহম্মদ এই প্রশ্নের কোন উত্তর দিলেন না। এতে তিনি পুনর্বার ঐ একই প্রশ্ন রাখলেন। মুহম্মদ এবারও চুপ। প্রশ্নকারী ৩য়বার ঐ একই প্রশ্ন রাখলে তিনি বললেন, ‘আমি যদি তোমার প্রশ্নের উত্তরে হ্যাঁ বলতাম, তবে প্রতি বৎসরই হজ্জ্ব ফরয হয়ে যেত। কিন্তু তুমি নিজেও এই আদেশ পালন করতে পারতে না। সুতরাং যে সব বিষয়ে আমি নিরব থাকি সেগুলি নিয়ে বেশী ঘাঁটাঘাঁটি করবে না।’

এরই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াত নাযিল হয়েছিল- ইতিপূর্বে মূসা যেমন জিজ্ঞাসিত হয়েছিল, (মুসলমানগণ) তোমরাও কি তোমাদের রসূলকে তেমনি প্রশ্ন করতে চাও?(২:১০৮)
হে মুমিনগণ! এমন কথাবার্তা জিজ্ঞেস কোরও না, যা তোমাদের কাছে পরিব্যক্ত হলে তোমাদের খারাপ লাগবে। যদি কোরআন অবতরণকালে তোমরা এসব বিষয় জিজ্ঞেস কর, তবে তা তোমাদের জন্যে প্রকাশ করা হবে। অতীত বিষয় আল্লাহ ক্ষমা করেছেন আল্লাহ ক্ষমাশীল, সহনশীল। এরূপ কথাবার্তা তোমাদের পূর্বে এক সম্প্রদায় জিজ্ঞেস করেছিল। এরপর তারা এসব বিষয়ে অবিশ্বাসী হয়ে গেল।(৫:১০১-১০২)

মকামে ইব্রাহিম।
যাইহোক হজ্জ্ব ফরজ হবার পর হজ্জ্বের বিধিবিধান সম্বলিত এই ৮টি আয়াত নাযিল হল- আর তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্জ্ব ও ওমরাহ পরিপূর্ণভাবে পালন কর। যদি তোমরা বয়োপ্রাপ্ত হও, তাহলে কোরবাণীর জন্যে যা কিছু সহজলভ্য, তাই তোমাদের উপর ধার্য্য। আর তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত মাথা মুন্ডন করবে না, যতক্ষণ না কোরবানী যথাস্থানে পৌঁছে যাবে। যারা তোমাদের মধ্যে অসুস্থ্য হয়ে পড়বে, কিম্বা মাথায় যদি কোন কষ্ট থাকে, তাহলে তার পরিবর্তে রোজা করবে, কিম্বা খয়রাত দেবে অথবা কোরবাণী করবে। 

আর তোমাদের মধ্যে যারা হজ্জ্ব ও ওমরাহ একত্রে একই সাথে পালন করবে চাও, তবে যা কিছু সহজলভ্য, তা দিয়ে কোরবাণী করাই তার উপর কর্তব্য। বস্তুতঃ যারা কোরবাণীর পশু পাবে না, তারা হজ্জ্বে দিনগুলোর মধ্যে রোজা রাখবে তিনটি আর সাতটি রোজা রাখবে ফিরে যাবার পর। এভাবে দশটি রোজা পূর্ণ হয়ে যাবে। এ নির্দেশটি তাদের জন্যে, যাদের পরিবার পরিজন মসজিদুল হারামের আশেপাশে বসবাস করে না। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক। সন্দেহাতীতভাবে জেন যে, আল্লাহর আযাব বড়ই কঠিন।

হজ্জ্বের কয়েকটি মাস আছে সুবিদিত। এসব মাসে যে লোক হজ্জ্বের পরিপূর্ণ নিয়ত করবে, তার পক্ষে স্ত্রীও নিরাভরণ হওয়া জায়েজ নয়। না অশোভন কোন কাজ করা, না ঝগড়া বিবাদ করা হজ্জ্বের সেই সময় জায়েজ নয়। আর তোমরা যাকিছু সৎকাজ কর, আল্লাহ তা জানেন। আর তোমরা পাথেয় সাথে নিয়ে নাও। নিঃসন্দেহে সর্বেত্তম পাথেয় হচ্ছে আল্লাহর ভয়। আর আমাকে ভয় করতে থাক, হে বুদ্ধিমানরা! তোমাদের উপর তোমাদের পালনকর্তার অনুগ্রহ অন্বেষণ করায় কোন পাপ নেই। 

সাফা ও মারওয়া পর্বতদ্বয় বর্তমানে কাবা কমপ্লেক্সের 
অংশ বিশেষ, মধ্যবর্তী দূরত্ব ৪৫০ মি.।
অতঃপর যখন তাওয়াফের জন্যে ফিরে আসবে আরাফাত থেকে, তখন মাশ’ আরে হারামের কাছে আল্লাহকে স্মরণকর। আর তাঁকে স্মরণকর তেমনি করে, যেমন তোমাদিগকে হেদায়েত করা হয়েছে--আর নিশ্চয়ই ইতিপূর্বে তোমরা ছিলে অজ্ঞ। অতঃপর তাওয়াফের জন্যে দ্রুত গতিতে সেখান থেকে ফিরে আস, যেখান থেকে সবাই ফিরে। আর আল্লাহর কাছে মাগফেরাত কামনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাকারী, করুণাময়।

আর অতঃপর যখন হজ্জ্বে যাবতীয় অনুষ্ঠান ক্রিয়াদি সমাপ্ত করে সারবে, তখন স্মরণ করবে আল্লাহকে, যেমন করে তোমরা স্মরণ করতে নিজেদের বাপ-দাদাদেরকে, বরং তারচেয়েও বেশী স্মরণ করবে। তারপর অনেকে তো বলে যে, হে পরওয়ারদেগার! আমাদিগকে দুনিয়াতে দান কর। অথচ তার জন্যে পরকালে কোন অংশ নেই। আর তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলে, হে পরওয়ারদেগার! আমাদিগকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান কর এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান কর এবং আমাদিগকে দোযখের আযাব থেকে রক্ষা কর। এদেরই জন্যে অংশ রয়েছে নিজেদের উপার্জিত সম্পদের। আর আল্লাহ দ্রুত হিসেবগ্রহণকারী। আর স্মরণকর আল্লাহকে নির্দিষ্ট সংখ্যক কয়েকটি দিনে। অতঃপর যে লোক তাড়াহুড়ো করে চলে যাবে শুধু দু‘দিনের মধ্যে, তার জন্যে কোন পাপ নেই, অবশ্য যারা ভয় করে। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করতে থাক এবং নিশ্চিত জেনে রাখ, তোমরা সবাই তাঁর সামনে সমবেত হবে।(২:১৯৬-২০৩) 

এ ছাড়াও হজ্জ্ব সংক্রান্ত আরও কয়েকটি আয়াত রয়েছে-নিঃসন্দেহে সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শণগুলোর মধ্যে অন্যতম। সুতরাং যারা কা‘বা গৃহে হজ্জ্ব বা ওমরাহ পালন করে, তাদের পক্ষে এ দু‘টিতে প্রদক্ষিণ করাতে কোন দোষ নেই। বরং কেই যদি স্বেচ্ছায় কিছু নেকীর কাজ করে, তবে আল্লাহ অবশ্যই তা অবগত হবেন এবং তার সে আমলের সঠিক মূল্য দেবেন। (২:১৫৮)

জামরাতে শয়তানের প্রতীক।
এবং কা‘বার জন্যে উৎসর্গীতকৃত উটকে আমি তোমাদের জন্যে আল্লাহর অন্যতম নিদর্শণ করেছি। এতে তোমাদের জন্যে মঙ্গল রয়েছে। সুতরাং সাঁরিবদ্ধভাবে বাঁধা অবস্থায় তাদের জবেহ করার সময় তোমরা আল্লাহর নাম উচ্চারণ কর। অতঃপর যখন তারা কাত হয়ে পড়ে যায় তখন তা থেকে তোমরা আহার কর এবং আহার করাও যে কিছু যাঞ্ছা করে না তাকে এবং যে যাঞ্ছা করে তাকে। এমনিভাবে আমি এগুলিকে তোমাদের বশীভূত করে দিয়েছি, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। এগুলোর মাংস ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, কিন্তু পৌঁছে তাঁর কাছে তোমাদের মনের তাকওয়া। এমনিভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের বশ করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আল্লাহর মহত্ত্ব ঘোষণা কর এ কারণে যে, তিনি তোমাদের পথ প্রদর্শণ করেছেন। সুতরাং সৎকর্মশীলদের সুসংবাদ শুনিয়ে দাও।(২২:৩৬-৩৭)

প্রতি বৎসর লক্ষ লক্ষ লোক হজ্জ্ব করতে আসেন। প্রত্যেক হাজী জামরাত নামক স্থানে একটি প্রতীক (শয়তানের) লক্ষ্য করে দৈনিক সাতটি করে কঙ্কর তিনদিন পর্যন্ত নিক্ষেপ করেন। সরকারের পক্ষ থেকে এসব কঙ্কর সরিয়ে নেবার কোন ব্যবস্থা নেই। যদি এসব কঙ্কর সেখানেই জমা থাকত, তবে এক বৎসরেই কঙ্করের স্তুপের নীচে জামরাত অদৃশ্য হয়ে যেত। অথচ হজ্জ্বের তিনদিন অতিবাহিত হবার পরেও সেখানে কঙ্কর খুব একটা দেখা যায় না। এর কারণ সম্বন্ধে মুহম্মদ বলেছেন, ‘ফেরেস্তারা এসব কঙ্কর তুলে নেয় এবং যাদের হজ্জ্ব কবুল হয় না, শুধু তাদের কঙ্করই এখানে থেকে যায়।’

এই কারণেই জামরাত থেকে কঙ্কর তুলে নিক্ষেপ করতে নিষেধ করা হয়েছে। কেননা এগুলো কবুল করা হয়নি।

সমাপ্ত।
ছবি: Wikipedia, go-makkah, thekeytoislam.

১২ মার্চ, ২০১২

Battle of Badr: যুদ্ধে ধৃত বন্দীদিগের ভাগ্য মীমাংসা।


মক্কাবাসীরা প্রভূত ক্ষতি সহ্যকরে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গেল। তাদের অনেক নেতা নিহত হল। আবু জেহেল তার দুর্নিবার অহংকারের শিকার হয়েছিলেন। মা‘আজ ও তার ভাই আবু জেহেলকে হত্যার উদ্দেশ্যে ধাবিত হলে, আবু জেহেল পুত্র ইকরামা তাদেরকে বাঁধা দিল। সে তরবারির এক আঘতে মা‘আজের বাম বাহু বিছিন্ন করে ফেলে। কিন্তু অদম্য মা‘আজ তা উপেক্ষা করে আবু জেহেলের শির তার দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিলেন। 

এই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুসলমানদের পক্ষে ৬ জন মোহাজির ও ৮ জন আনসার নিহত হয়। আর কুরাইশদের পক্ষে ওৎবা, শায়বা, আবু জেহেল ও তার ভ্রাতা আছী, আবু সুফিয়ানের পুত্র হানজালাসহ প্রায় শতাধিক নিহত হয়েছিলেন।
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কুরাইশদের পলায়নের সংবাদ শুনে মুহম্মদ মুসলমানদের অস্ত্র ব্যাবহারে নিষেধাজ্ঞা জারী করলেন। তিনি যুদ্ধের পূর্বেও মুসলমানদের এই বলে সতর্ক করেছিলেন-‘কুরাইশদের মধ্যে কতকগুলি লোক অনিচ্ছাসত্ত্বেও যুদ্ধে যোগদান করতে বাধ্য হয়েছে। সাবধান, তাদেরকে কেউ আঘাত কোরও না।’

মুসলমানরা মুহম্মদের আদেশ মেনে নিয়ে অস্ত্র ব্যাবহার বন্ধ করে পলায়নপর শত্রুদেরকে বন্দী করতে আরম্ভ করল। বহু সংখ্যক কুরাইশ (৭০জন) মুসলমানদের হাতে বন্দী হল। অতঃপর এসব বন্দী ও আবু জেহেলের ছিন্ন শির মুহম্মদের নিকট আনীত হল।

যুদ্ধবন্দীদের প্রতি আরবদের মধ্যে প্রচলিত প্রথা ও ঐতিহ্যের বিপরীতে উচ্চতম মানবতার সঙ্গে আচরণ করা হল। মুহম্মদ কড়া নির্দেশ ছিল যে বন্দীদের দুর্ভাগ্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শণ করতে হবে এবং তাদের প্রতি সদয় আচরণ করতে হবে। যে সব মুসলমানদের তদারকীতে এসব বন্দীরা ছিল, তারা বিশ্বস্ততার সঙ্গে মুহম্মদের নির্দেশ পালন করেছিলেন। তারা তাদের আহার্য রুটি বন্দীদের খেতে দিতেন এবং নিজেরা শুধু শুকনো খেজুর আহার করে ক্ষুধা নিবৃত্ত করতেন। পরবর্তীকালে একজন বন্দী (আবু আজিজ) তাদের প্রতি আচরণ সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘মদিনার লোকদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। তারা আমাদের অশ্বপৃষ্ঠে যেতে দিতেন এবং নিজেরা হেঁটে যেতেন। তারা আমাদেরকে রুটি খেতে দিতেন, নিজেদের জন্যে রুটি অবশিষ্ট থাকত না, ফলে তারা খেজুর ভক্ষণ করে ক্ষুধা মেটাতেন এবং তাতেই তৃপ্ত থাকতেন।’
বদরযুদ্ধে (Battle of Badr) ধৃত বন্দীদিগের ভাগ্য সম্বন্ধে মীমাংসার ভার ও অধিকার আল্লাহ কর্তৃক মুসলমানদের প্রতি ন্যস্ত হয়েছিল এবং মুহম্মদ প্রকাশ্যভাবে এর ঘোষণাও করে দিয়েছিলেন। এ কারণে বন্দীদের মদিনায় আনয়নের পর পরামর্শ সভা বসল। মুহম্মদ শিষ্যদের মতামত জানতে চাইলেন। আবু বকর নিবেদন করলেন, ‘হযরত এরা সকলে আমাদের স্বজন ও আত্মীয়। আমার মতে যদি কিছু কিছু অর্থ নিয়ে এদেরকে মুক্তি দেয়া হয়, তাতে আমাদের সাধারণ তহবিলে যথেষ্ট অর্থ সঞ্চিত হবে, পক্ষান্তরে অল্পদিনের মধ্যে এদের সকলের পক্ষে ইসলাম গ্রহণ করাও সম্ভব।’

মুহম্মদ আবু বকরের মতামত শোনার পর ওমরের প্রতি লক্ষ্য করে বললেন, ‘খাত্তাবের পুত্র, আপনার কি মত?’
ওমর স্ব-সম্ভ্রমে নিবেদন করলেন, ‘এরা ইসলামের চিরশত্রু। মুসলমানদেরকে নির্যাতিত করতে, আল্লাহর রসূলকে হত্যার ষড়যন্ত্র করতে এবং আল্লাহর সত্য ধর্মকে পৃথিবীর পৃষ্ঠ হতে মুছে ফেলতে এরা সাধ্যমতে চেষ্টার ত্রুটি করেনি। এগুলি অন্যায়, অধর্ম ও অত্যাচারের সাক্ষাৎ প্রতিমূর্ত্তি। এদেরকে অবিলম্বে হত্যা করে ফেলা উচিৎ। প্রত্যেক মুসলমান উলঙ্গ তরবারী হস্তে দন্ডায়মান হবে এবং নিজহস্তে নিজের আত্মীয়বর্গের মুন্ডুপাত করবে- এটাই ন্যায়তঃ বলে আমি মনে করি।’
মুহম্মদ দু‘টি ফয়সালাই সাহাবীদের কাছে ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে পেশ করলেন। অধিকাংশ সাহাবীর মতের প্রতিধ্বনি ছিল মুক্তিপণের মাধ্যমে বন্দীদেরকে মুক্তিদান। সুতরাং রহমাতুল্লিল আলামীন সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত গ্রহণ করলেন। অতঃপর মুক্তিপণ নির্ধারিত হল। এর পরিমান ছিল চারশত দিরহাম। এসময় জিব্রাইল এসে মুহম্মদকে অবহিত করলেন যে, বন্দীদেরকে অর্থের বিনিময়ে মুক্তি দেবার সিদ্ধান্তের কারণে আল্লাহর নির্দেশক্রমে একথা অবধারিত যে, এর বদলা হিসেবে আগামী বৎসর সমসংখ্যক মুসলমান যুদ্ধে শহীদ হবে।’

অতঃপর কোরআনের এ আয়াত নাযিল হল- নবীর পক্ষে উচিৎ নয় বন্দীদেরকে নিজের কাছে রাখা, যতক্ষণ না দেশময় প্রচুর রক্তপাত ঘটাবে। তোমরা পর্থিব সম্পদ কামনা কর, অথচ আল্লাহ চান আখেরাত। আর আল্লাহ হচ্ছেন পরক্রমশালী হেকমতওয়ালা। (৮:৬৭)

বদর যুদ্ধের সময় পর্যন্ত যুদ্ধবন্দীদের প্রতি কৃপা করা বা মুক্তিপণ নেয়া নিষিদ্ধ ছিল। তাই অধিকাংশ সাহাবী কর্তৃক মুক্তিপণ বাবদ পার্থিব সম্পদ কামনা করা আল্লাহর কাছে পছন্দনীয় ছিল না। কিন্তু মুসলমানরা যে এমন সিদ্ধান্ত নেবে তা পূর্ব থেকেই লওহে মাহফুজে তিনি লিখে রেখেছেন। একারণে কোন আযাব তাদেরকে পাকড়াও করবে না। সাহাবীদেরকে সতর্ক করা ঐ আয়াতটি এই-যদি একটি বিষয় না হত যা পূর্ব থেকেই আল্লাহ লিখে রেখেছেন, তাহলে তোমরা যা গ্রহণ করছ, সেজন্যে বিরাট আযাব এসে পৌঁছাত।(৮:৬৮)

এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর মুহম্মদ সাহাবীদেরকে বলেছিলেন, ‘আমাদের সিদ্ধান্তের কারণে আল্লাহর আযাব নিকটবর্তী হয়ে গিয়েছিল। আর যদি আযাব এসেই পড়ত, তবে ওমর ইবনে খাত্তাব ও সা‘দ ইবনে মু‘আজ ব্যতিত কেউই রেহাই পেত না।’

অতঃপর এই আয়াত নাযিল হল- হে নবী, তাদেরকে বলে দাও, যারা তোমার হাতে বন্দী হয়ে আছে যে, আল্লাহ যদি তোমাদের অন্তরে কোনরকম মঙ্গল চিন্তা রয়েছে বলে জানেন, তবে তার চেয়ে বহুগুণ বেশী দান করবেন যা তোমাদের কাছ থেকে বিনিময়ে নেয়া হয়েছে। তাছাড়া তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। বস্তুতঃ আল্লাহ ক্ষমাশীল করুণাময়।(৮:৭০)

অনেকে আশঙ্কা করছিল কুরাইশরা মক্কায় ফিরে গিয়ে আবারও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে। তখন তাদের আশঙ্কামুক্ত করতে এই আয়াত নাযিল হল-আর যদি তারা তোমার সঙ্গে প্রতারণা করতে চায়-বস্তুতঃ তারা আল্লাহর সাথেও ইতিপূর্বে প্রতারণা করেছে, অতঃপর তিনি তাদেরকে ধরিয়ে দিয়েছেন। আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে পরিজ্ঞাত, সুকৌশলী।(৮:৭১)
যে সকল বন্দী লেখাপড়া জানত কিন্তু মুক্তিপণ দিতে অক্ষম ছিল তাদেরকে মুক্তির বিনিময়ে দশটি বালককে লেখাপড়া শেখাতে বলা হয়েছিল। আর যাদের শিক্ষা ও অর্থ কোনটাই ছিল না তাদেরকে কোন প্রকার পণ না নিয়েই মুক্তি দেয়া হয়েছিল। এভাবে মুহম্মদের দয়া ও মুসলমানদের অনুগ্রহের ফলে অল্পদিনের মধ্যে কুরাইশ সমস্ত বন্দী স্বাধীনভাবে স্বদেশে ফিরে গেল।
মুহম্মদের পিতৃব্য আব্বাস বদর যুদ্ধে ধৃতবন্দীদের একজন ছিলেন। তাকে বন্দী অবস্থায় মদিনায় আনা হলে তার মুসলিম আত্মীয়বর্গ যারা মদিনাতে হিযরত করে চলে এসেছিল তারা তাকে বাতিল ধর্মের উপর বহাল থাকার জন্যে বিদ্রুপ করতে লাগল। তখন আব্বাস বললেন, ‘তোমরা নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ মনে করে আছ, অথচ আমরা কা’বার রক্ষণাবেক্ষণ ও হাজীদের পানি সরবরাহ করে থাকি? তাই আমাদের সমান আমল কারও হতে পারে না।’

তার এই কথা ও তার জবাব কোরআন দিয়েছে এভাবে-তোমরা কি হাজীদের পানি সরবরাহ ও মসজিদুল হারাম আবাদকরণকে সেই লোকের সমান মনেকর, যে ঈমান রাখে আল্লাহ ও শেষবিচারের দিনের প্রতি এবং যুদ্ধ করেছে আল্লাহর রাহে, এরা আল্লাহর দৃষ্টিতে সমান নয়, আর আল্লাহ জালেম লোকদের হেদায়েত করেন না।(৯:১৯)

যাহোক মুক্তিপণের সময় আব্বাস যখন মুহম্মদের সম্মুখে আনীত হলেন, তিনি দেখলেন যে তার গায়ে কোন কোর্তা নেই। তখন তিনি উপস্থিত সাহাবীদের বললেন, ‘তাকে একটি কোর্তা পরিয়ে দেয়া হোক।’
আব্বাস ছিলেন দীর্ঘাদেহী লোক। উপস্থিত আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইও ছিলেন দীর্ঘাদেহী। তিনি আগ্রহ করে তার কোর্তা খুলে দিলে মুহম্মদ তা তার পিতৃব্য আব্বাসকে পরিয়ে দিলেন।

অতঃপর তিনি পিতৃব্যকে বললেন, ‘আপনার জন্যে মুক্তিপণ ধার্য্য হয়েছে।’
আব্বাস নিবেদন করলেন, ‘আমার কাছে যে স্বর্ণমুদ্রা ছিল তা মুক্তিপণ হিসেবে গণ্য করা হোক।’ তিনি ৭০০স্বর্ণমুদ্রা কুরাইশ সৈন্যদের জন্যে ব্যয় করার উদ্দেশ্যে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। 
তিনি বললেন, ‘তা মুসলমানদের গনিমতের মালে পরিণত হয়েছে। মুক্তিপণ হতে হবে সেগুলো বাদে। তাছাড়া আপনার দুই ভাতিজা আকিল ইবনে আবু তালিব ও নওফেল ইবনে হারেসের মুক্তিপণও আপনাকে পরিশোধ করতে হবে।’
আব্বাস বললেন, ‘আমার উপর এত অধিক অর্থনৈতিক চাপ পড়লে আমাকে কুরাইশদের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করতে হবে।’
তিনি বললেন, ‘আপনি সেই অর্থ মুক্তিপণ বাবদ দেবেন যা আপনি যুদ্ধে আসার আগে আপনার স্ত্রী উম্মুল ফজলের কাছে রেখে এসেছেন।’
একথা শুনে আব্বাস অতি অবাক হয়ে তার মুখপানে চেয়ে রইলেন। 

বদর যুদ্ধে কুরাইশদের পক্ষে যুদ্ধ করতে এসে মুহম্মদের জামাতা আ‘স বন্দী হয়েছিলেন। পিতার নব্যুয়ত প্রাপ্তির পর কন্যা জয়নব ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তার স্বামী আ‘স পৌত্তলিক রয়ে গিয়েছিলেন। আ‘স ছিলেন খাদিজার ভাগিনেয় এবং তিনি ছিলেন সম্ভ্রান্ত ও ধনী। আ‘সকে কখনই মুহম্মদ বা খাদিজা কেউই ইসলাম গ্রহণের জন্যে পীড়াপীড়ি করেননি বা জয়নবকে তার কাছ থেকে ছাড়িয়ে আনার চেষ্টাও করেননি। মুহম্মদ যখন তার পরিবারকে মক্কা থেকে মদিনায় স্থানান্তরিত করেন, তখন জয়নব তার স্বামীর গৃহেই রয়ে গিয়েছিলেন। 
        
বন্দীরা মদিনায় আনীত হলে অন্যান্য বন্দীর মত আ‘সেরও মুক্তিপণ নির্ধারিত হয়। তখন জয়নব তার স্বামীর মুক্তিপণ বাবদ কিছু অর্থ ও একটি মুল্যবান স্বর্ণহার পাঠিয়ে দেন। এই হার বিবি খাদিজা জয়নবকে বিবাহে উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন। হারটি দেখে মুহম্মদ বিচলিত হয়ে পড়লেন এবং আ’সের কাছ থেকে মুক্তিপণ বাবদ প্রদেয় হারটি গ্রহণ না করার জন্যে শিষ্যদের অনুমতি প্রার্থনা করলেন। তারা সম্মত হল। আ‘সকে হারটি ফিরিয়ে দেয়া হল একটি মাত্র শর্ত দিয়ে যে, তিনি জয়নবকে মদিনায় পাঠিয়ে দেবেন। 
আ‘স তার কথা রক্ষা করেছিলেন।

সমাপ্ত।

বিদ্র: জয়নব খাদিজার কন্যা হোক বা তার বোন হালার, বিবি খাদিজা  ও মুহম্মদ তাকে লালন-পালন করেছেন এতে কোন বিতর্কের অবকাশ নেই।

১ মার্চ, ২০১২

Medina Charter: মদিনা ও তার পার্শ্ববর্তী গোত্রসমূহকে সন্ধিবদ্ধ করেছিল।


নবীজীর আগমনের পর মদিনায় তিনটি স্বতন্ত্রদলের অস্তিত্ব প্রকাশ লাভ করল। মোহাজির, আনসার ও ইহুদি। প্রথম দলটির নবীজীর> প্রতি আনুগত্য ছিল সীমাহীন। তারা আরব ঐতিহ্যের বিপরীত দিকের ধর্মের জন্যে তাদের আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল। আল্লাহর কাজে তারা সাহসিকতার সঙ্গে সর্বপ্রকার দুঃখ-দুর্দশার মোকাবিলা করেছিল, যাবতীয় প্রলোভনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। তাদের অনেকেই নিঃসম্বল অবস্থায় মদিনায় এসেছিল।

প্রাচীন মদিনা নগরী।
দ্বিতীয়, আনসাররা তাদের মোহাজির ভাইদেরকে আন্তরিকতার সঙ্গেই গ্রহণ করেছিল। তারা তাদের মধ্যে সম্পত্তি বন্টন করে দিয়েছিল। নবীজী অত্যন্ত জ্ঞানবতার সঙ্গে ধর্মীয় ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠিত করেছিল। যা ঈর্ষা বিদ্বেষের বিকাশকে বন্ধ করেছিল এবং তাদের মধ্যে উদার দানশীলতার প্রতিযোগীতার জন্ম দিয়েছিল, কে আল্লাহ ও তার রসূলের জন্যে সর্বাধিক ত্যাগ স্বীকার করতে পারে।

আনসারদের একাংশ পৌত্তলিকতার জন্যে গোপন পূর্বানুরাগ বজায় রেখেছিল। এই দলের নেতা ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই। তিনি প্রতিপত্তিশালী ছিলেন এবং তার একটি শক্তিশালী সমর্থক দল ছিল। তিনি মদিনায় রাজত্বলাভের উচ্চাভিলাষ পোষণ করতেন। কিন্তু, নবীজীর আগমন তার পরিকল্পণাকে নস্যাৎ করেছিল। কেবলমাত্র লৌকিক উদ্দীপনা তাকে ও তার সমর্থকদের নামমাত্র ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য করেছিল।

এই দল সামান্যতম সুযোগ পেলেই মুসলমানদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে প্রস্তুত ছিল। কাজেই নবীজীকে তাদের উপর তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হয়েছিল। তিনি তাদের প্রতি সর্বোত্তম ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করতেন এবং আশা পোষণ করতেন যে, শেষপর্যন্ত তারা ইসলামের পতাকাতলে সমবেত হবে। অতঃপর এই আশা অবশ্য পরিণতি দ্বারা পরিপূর্ণভাবে সমর্থিত হয়েছিল।

৬২২ সিই, মদিনার আশেপাশের গোত্রসমূহ।
তৃতীয় দল ইহুদিরা ছিল সবচেয়ে মারাত্মক বিপদের কারণ। কুরাইশদের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল এবং তাদের দল উপদলসমূহ বিভিন্ন স্থানে বিস্তৃত হয়েছিল ও তারা ইসলামের ঘোর বিরোধী ছিল। তারা তাদের পুরাতন শত্রু আওস ও খাজরাজ গোত্র তাদের পৃষ্ঠপোষক তাদের প্রতিশোধ গ্রহণকারী হতে পারে; আরবদের জয় করতে ও ইহুদি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় তাদের সাহায্য করতে পারে এই উদ্দেশ্য নিয়ে নবীজীর অভ্যর্থনায় উদাসীনতার সঙ্গে মদিনাবাসীদের সাথে যোগ দিয়েছিল এবং কিছুকালের জন্যে শান্ত মনোভাব গ্রহণ করেছিল।

মদিনায় আগমনের পর মুহম্মদ মদিনা ও তার পার্শ¦বর্তী এলাকা যে বিভিন্ন জাতি ও বিরোধী উপাদান নিয়ে গঠিত তাকে একটি সুশৃঙ্খল সন্ধিবদ্ধ জাতিতে ঐক্যবদ্ধ করাকে অন্যতম প্রথম কর্তব্য বলে মনে করলেন। এই লক্ষ্য সামনে রেখে তিনি মদিনার বিভিন্ন জাতির লোকদের মধ্যে সনদ প্রদান করলেন। যার মাধ্যমে মুসলমানদের অধিকার ও কর্তব্যসমূহ, মুসলমান ও ইহুদিদের পারস্পরিক অধিকার ও কর্তব্যসমূহ সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ হল। ইহুদিরা সাময়িকভাবে সনদের দুর্দমনীয় বৈশিষ্ট্যের জন্যে নিরূৎসাহিত হলেও আনন্দের সঙ্গে চুক্তি গ্রহণ করেছিল। বিবেকের স্বাধীনতা সম্বলিত এই মদিনা সনদের (Medina Charter) বর্ণনা ছিল এরূপ-
পরম করুণাময়, দাতা ও দয়ালু আল্লাহর নামে- 
আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ মুহম্মদ কর্তৃক এই সনদ প্রদান করা হচ্ছে যে-

ক) মদিনায় বসবাসরত বিভিন্ন ধর্মাবলস্বী, বিভিন্ন গোত্রের বিক্ষিপ্ত জনমন্ডলী এক উম্মত বা জাতি বলে বিবেচিত হবে।

খ) সনদের অন্তর্ভূক্ত কোন সম্প্রদায় শত্রু কর্তৃক আক্রান্ত হলে সম্মিলিতভাবে তা প্রতিহত করা হবে।
গ) সনদের অন্তর্ভূক্ত সম্প্রদায়ের কেউ কুরাইশদের সাথে গোপনে সন্ধিচুক্তিতে আবদ্ধ হবে না, কেউ তাদের কোন লোককে আশ্রয় দেবে না, তাদের কোন পরিকল্পনায় সহায়তা করবে না।

ঘ) বহিঃশত্রু কর্তৃক মদিনা আক্রান্ত হলে স্বাধীনতা রক্ষায় সকলে সম্মিলিতভাবে যুদ্ধ করবে এবং প্রত্যেক সম্প্রদায় নিজেদের যুদ্ধব্যয় বহন করবে।
ঙ) সকল সম্প্রদায় স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে। কেউ কারও ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে না।

চ) কোন অমুসলমানের অপরাধ তার ব্যক্তিগত অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। ব্যক্তির অপরাধের জন্যে তার জাতি বা সম্প্রদায়ের অধিকার খর্ব করা যাবে না।

ছ) মুসলমানরা সাধারণতন্ত্রের অন্যান্য সম্প্রদায়ের প্রতি সর্বদা সদাচারণ, স্নেহপূর্ণ আচরণ করবে, তাদের মঙ্গলের চেষ্টা করবে। কোন প্রকারে তাদের অনিষ্টের সংকল্প পোষণ করবে না।
জ) উৎপীড়িতকে রক্ষা করা হবে। যদি ঘনিষ্ট আত্মীয় নিন্দনীয় হয় তাহলেও তাকে কেউ সমর্থন করবে না।

ঝ) প্রত্যেক সম্প্রদায়ই নিজেদের স্বত্ত্বাধিকারের মর্যাদা রক্ষা করবে।
ঞ) নরহত্যা বা রক্তপাত মদিনাতে হারাম বলে গণ্য হবে।
ট)  রক্তপণ পূর্ববৎ বহাল থাকবে।

ঠ) হযরত মুহম্মদ নবপ্রতিষ্ঠিত সাধারণতন্ত্রের প্রধান বলে বিবেচিত হবেন। সাধারণভাবে যেসব বিবাদ-বিসম্বাদের সমাধান সম্ভব নয়, তা তার উপর ন্যস্ত হবে। আল্লাহর বিধানমতে তিনি সেসবের সমাধান করবেন।

-আল্লাহর নামে এ এক চিরস্থায়ী প্রতিজ্ঞা, যে বা যারা এ ভঙ্গ করবে তাদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাৎ।

আরবদের যে নৈরাজ্যমূলক প্রথার ক্ষেত্রে ব্যথিত ও ক্ষতিগ্রস্থ লোকদের নিজেদের বা তাদের জ্ঞাতিদের শক্তির উপর নির্ভর করতে হত প্রতিশোধ গ্রহণ বা বিচারের প্রয়োজন মেটানোর জন্যে সেই প্রথার প্রতি এভাবে মরণাঘাত হানা হল। এই সনদ মুহম্মদকে জাতির প্রধান প্রশাসকে পরিণত করল, এ যেমন তার প্রেরিত পুরুষ সূলভ ভূমিকার দ্বারা তেমনি তিনি ও তার জনগণের মধ্যেকার চুক্তির দ্বারা সাধিত হয়েছিল।

মদিনার উপকন্ঠে বসতি স্থাপনকারী বনি নাজির, বনি কুরাইজা ও বনি কাইনুকা প্রমুখ ইহুদি বংশ সমূহকে প্রথমে এই সনদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি, কিন্তু অল্পকাল পরেই তারাও সকৃজ্ঞ চিত্তে এ সনদের শর্তাদি গ্রহণ করেছিল। 

সমাপ্ত।
ছবি: in.groups.yahoo. Muhamad and the people of the book.

Moses: কোরাণিক ক্যানভাসে নবী মূসা।

Abu Hena Mostafa Kamal  01 May, 2017 মি সরের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ফেরাউন। হঠাৎ করে তিনি মৃত্যুবরণ করলেন। কিন্তু তিনি কোন উত্তরাধিকারী ন...