pytheya.blogspot.com Webutation

২৯ ডিসেম্বর, ২০১২

Francis David: ট্রানসিলভানিয়ায় একত্ববাদী চার্চের প্রতিষ্ঠাতা।


ফ্রান্সিস ডেভিড (Francis David) ১৫১০ সনে হাঙ্গেরীর কালোজার (Kolozsar)-এ জন্মগ্রহণ করেন। প্রথমে তিনি জার্মানির উটেনবার্গে ও পরে ফ্রাঙ্কফূর্টে পড়াশুনো করেন। তিনি মূলত: ক্যাথলিক ধর্মের উপর পড়াশুনো করেছিলেন। যাহোক, পড়াশুনোর পাঠ চুকিয়ে কালোজার-এ ফিরে আসার পর তিনি এক ক্যাথলিক স্কুলের রেকর্ডার নিযুক্ত হন। এরপর তিনি প্রোটেষ্টাণ্টবাদীদের সাথে সহমত পোষণ করে ঐ স্কুল ত্যাগ করেন। অত:পর ১৫৫৫ সনে একটি লুথারপন্থী স্কুলের রেকর্ডার হন। লুথার ও ক্যালভিনের মধ্যে সংস্কার আন্দোলন নিয়ে ভাঙন দেখা দিলে তিনি ক্যালভিনের পক্ষ নেন। 

ফ্রান্সিস ডেভিড
সংস্কার তখনও ব্যাপক রূপলাভ করেনি।এ পরিবেশে অনুসন্ধানী চিন্তাকে তখনও নিষিদ্ধ করা হয়নি। খৃষ্টানধর্মের সকল পর্যায়ে আলোচনা অনুমোদিত ছিল। সংস্কারপন্থী চার্চ তখন পর্যন্ত কোন নির্দিষ্ট মতবাদ গ্রহণ করেনি এবং সে কারণে মুক্ত চিন্তার অবকাশ ছিল। এ পরিবেশে প্রতিটি মানুষ শুধু ঈশ্বরের কাছে জবাবদিহি করবে, এ মত প্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা ছিল। 

ডেভিডের জন্মস্থান কলোজার বর্তমানে।
যে দু’টি মত বিশ্বাস সাধারণ মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছিল তা হল- যীশুর ঈশ্বরত্ব ও ত্রিত্ববাদ। যুক্তি বহির্ভূত এ মত বিশ্বাসের ব্যাপারে ডেভিডের মনে আলোড়ন তুলেছিল। তিনি ভেবে পাচ্ছিলেন না যে, এ ব্যাপারগুলো বুঝার চেষ্টা না করেই যারা এ রহস্যে বিশ্বাসী তারাই ভাল খৃষ্টান হিসেবে গণ্য হয় কি করে! তিনি কোন বিশ্বাসকেই অন্ধভাবে গ্রহণ করতে রাজি ছিলেন না। তিনি ধীরে ধীরে এ সিদ্ধান্ত পৌঁছেন যে, যীশু ঈশ্বর নন। অত:পর তিনি পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মার পাণ্ডিতিক ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন এবং এক ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী হয়ে উঠেন।

Gyualafeharvar, Hungary.
ডেভিড যখন ধর্ম বিশ্বাস সম্পর্কে তার একটি ধারণা সূত্রবদ্ধ করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন, এ সময় ট্রানসিলভানিয়ার রাজা জন অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং চিকিৎসার জন্যে বণ্ড্রাটাকে তলব করেন। ডেভিড সেখানে অবস্থানকালে বণ্ড্রাটার সাথে সাক্ষাৎ করেন। ১৫৬৬ সনে বন্ড্রাটার সুপারিশে রাজা জন ডেভিডকে রাজদরবারে ধর্ম প্রচারক নিয়োগ করেন। এভাবে ডেভিড তৎকালে ধর্মীয় সমস্যাদি ব্যাখ্যা করার জন্যে রাজা কর্তৃক আহুত জাতীয় বিতর্কে একত্ববাদী দলের মুখপাত্রে পরিণত হন। 

রাজা জনের আমলে প্রথম ধর্মীয় বিতর্কসভা হয়েছিল ১৫৬৬ সনে জিউয়ালফিহেরভার (Gyualafeharvar)-এ। বিতর্কটি অমীমাংসিত ছিল। তবে রাজা জন বণ্ড্রাটা ও ডেভিডের যুক্তি-প্রমাণ প্রদর্শনে মুগ্ধ হয়েছিলেন। সে কারণে ১৫৬৭ সনে পরমত সহিষ্ণুতা সংক্রান্ত এক রাজকীয় ফরমান জারি করা হয়। এতে ঘোষণা করা হয়-'প্রতিটি স্থানে ধর্ম প্রচারকরা ধর্মপ্রচার করতে এবং তাদের উপলব্ধি অনুযায়ী গসপেলের ব্যাখ্যা করতে পারবেন এবং সমবেত ব্যক্তিরা যদি তা ভাল মনে করে তাহলে কেউ তাদের বাধা দিতে পারবে না এবং যাদের মতবাদ তাদের ভাল মনে হয় তারা সেই ধর্ম প্রচারককে রাখবে। কেউ ধর্ম প্রচারককে ঘৃণা করতে বা তার সাথে দুর্ব্যবহার করতে পারবে না... বিশেষ করে তার ধর্মমত প্রচারের জন্যে, কারণ ধর্ম বিশ্বাস ঈশ্বরের উপহার।’

১৫৬৮ সনে ঐ একই স্থানে দ্বিতীয় বিতর্ক সভাটি ডাকা হয়েছিল এ মতবিশ্বাস প্রমাণের জন্যে যে, বাইবেলে ত্রিত্ববাদ ও যীশুর ঈশ্বরত্বের কথা বলা হয়েছে কিনা। এই বিতর্কে বক্তা ডেভিডের যুক্তিতর্ক অসার প্রমাণ করতে বিরোধীরা ব্যর্থ হয়। বিতর্ক সভায় আসন্ন পরাজয় উপলব্ধি করে বিরোধীরা গালাগালি শুরু করে। এ ঘটনা রাজা জনকে ডেভিডের যুক্তি প্রমাণকেই খাঁটি বলে গণ্য করতে সাহায্য করে। দশ দিন ধরে বিতর্ক সভা চলে এবং তা একত্ববাদকে প্রতিষ্ঠিত করে। এ সময়ই মাইকেল সারভেটাসের গ্রন্থগুলো গোপনে ট্রানসিলভানিয়াতে এনে তা স্থানীয় ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশ করা হয়। সেগুলো ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলে। 

Nagyvarad, Hungary.
১৫৬৯ সনে হাঙ্গেরীর নাগিভারাদ (Nagyvarad)-এ তৃতীয় বিতর্ক সভা অনুষ্ঠিত হয়। রাজা স্বয়ং এ সভায় সভাপতিত্ব করেন এবং এতে রাজ্যের সকল উচ্চ পদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। এ বিতর্কে ডেভিড বলেন- 'রোমে পোপের ত্রিত্ববাদে আসলে ৪ অথবা ৫ জন ঈশ্বরের বিশ্বাস করা হয়। একজন মূল ঈশ্বর, ৩ জন পৃথক ব্যক্তি যাদের প্রত্যেককে ঈশ্বর বলা হয়ে থাকে এবং আরো একজন ব্যক্তি যীশু, যাকেও কিনা ঈশ্বর বলা হয়ে থাকে। যদিও ঈশ্বর শুধু একজন তিনি হচ্ছেন পিতা, যার থেকে এবং যার দ্বারা সবকিছু সৃষ্টি হয়েছে এবং যিনি সবকিছুর ঊর্ধ্বে। আর তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন তাঁর প্রজ্ঞায় এবং বাণীর মাধ্যমে। এই ঈশ্বরের বাইরে আর কোন ঈশ্বর নেই, তিনও নয়, চারও নয়, না ভাবার্থে না ব্যক্তিরূপে, কারণ কোন ধর্মগ্রন্থে ত্রয়ী ঈশ্বর সম্পর্কে কিছুই বলা হয়নি। 

চার্চের কথিত ঈশ্বর পুত্র যিনি কিনা ঈশ্বরের সত্তা থেকে সৃষ্টির শুরুতেই জন্মগ্রহণ করেছেন, তার কথা বাইবেলের কোথাও উল্লেখ নেই, কিংবা নেই ত্রিত্ববাদের দ্বিতীয় ঈশ্বরের কথা, যিনি উদ্ভূত ঈশ্বর থেকে এবং রক্তমাংসের মানুষ। এটা একান্তই মানুষেরই আবিষ্কার ও কুসংস্কার। আর সে কারণে তা প্রত্যাখ্যানযোগ্য। 

-যীশু নিজেকে সৃষ্টি করেননি, পিতা তাকে জন্ম দিয়েছেন। পিতা তাকে ঐশ্বরিক পন্থার মাধ্যমে জন্মদান করেছিলেন।
-পিতা তাকে পবিত্র করে পৃথিবীতে প্রেরণ করেন।
রাজা জন
-যীশুর সাথে ঈশ্বরের সম্পর্ক শুধু তাই যা ঈশ্বর তাকে প্রদান করেছেন। ঈশ্বর ঐশী সত্তার সব কিছুর ঊর্ধ্বে বিরাজমান। 
-ঈশ্বরের কাছে সময়ের পার্থক্য বলে কিছু নেই-তাঁর কাছে সমস্ত কিছুই বর্তমানকাল। কিন্তু ধর্মগ্রন্থে কোথাও এ শিক্ষা দেওয়া হয়নি যে যীশু সৃষ্টির শুরুতেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। 

এ বিতর্ক চলেছিল পাঁচ দিন ধরে। আর এটিও হয় সমাপ্তি মূলক। রাজা জন তার চূড়ান্ত ভাষণে ঘোষণা করেন যে, একত্ববাদীদের মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করা হবে। বিরোধী পক্ষ অর্থাৎ লুথারপন্থী দলের নেতা মেলিয়াসকে (Mrlius) হুঁশিয়ার করে দেয়া হল যে, তিনি যেন পোপের নির্দেশে কাজ না করেন, বই-পত্র পুড়িয়ে না দেন এবং জনগণকে বলপ্রয়োগে ধর্মান্তরিত না করেন।

এ ধর্মীয় বিতর্কের ফল হয় এই যে, কলোজার শহরের প্রায় সকল অধিবাসীই এক ঈশ্বরে বিশ্বাসী হয়ে উঠে। 

১৫৭১ সনে রাজা জন মারা যান। নতুন রাজা ষ্টিফেন রোমান ক্যাথলিকদের পক্ষ অবলস্বণ করেন এবং রাজা জনের সহিষ্ণুতার নীতি পরিত্যাগ করেন। মত প্রকাশের স্বাধীনতার নীতিও তিনি বাতিল করেন। ফলে একত্ববাদের অনুসারীদের জীবনযাত্রা বিপদসংকুল হয়ে পড়ে। কিন্তু ডেভিড ছিলেন অবিচল। তিনি জনসাধারণের মাঝে প্রচার অব্যাহত রাখলেন এবং প্রচারপত্রের মাধ্যমে চারদিকে ছড়িয়ে দিতে শুরু করেন-

-ঈশ্বরের কঠোর নির্দেশ হল যে কেউই স্বর্গ ও পৃথিবীর স্রষ্টা, পিতা ঈশ্বর ছাড়া আর কারো কাছে প্রার্থনা করতে পারবে না। 
-সত্যের শিক্ষাদাতা যিশুখৃষ্ট শিক্ষা দিয়েছেন যে স্বর্গীয় পিতা ব্যতীত আর কারো সাহায্য প্রার্থনা করা যাবে না। 
-প্রকৃত প্রার্থনার সংজ্ঞা হল যা মনে প্রাণে পিতার উদ্দেশ্যে নিবেদিত হয়।
-সাধারণ প্রার্থনার লক্ষ্যবস্তু পিতা, খৃষ্ট নন। 

ডেভা, যে শহরে ডেভিড আমৃত্যু কারাবন্দী ছিলেন।
ডেভিডকে গৃহবন্দী করার নির্দেশ দেয়া হয়। পরবর্তীতে তাকে গ্রেফতার করে একটি ধর্মীয় বিচার সভায় হাজির করা হয়। এসময় তিনি বলেছিলেন, 'বিশ্ববাসী যাই করার চেষ্টা করুক না কেন, ঈশ্বর এক- একথা সারা বিশ্বের কাছেই সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে।' 

এই বিচারে বণ্ড্রাটা একই সাথে প্রধান কৌসুলী এবং প্রধান সাক্ষীর ভূমিকা পালন করেন। বিচারে ডেভিডকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয় এবং একটি উঁচু পাহাড়ের উপর নির্মিত ক্যাসলের বন্দীশালায় তাকে রাখা হয়। তার সাথে কারো দেখা সাক্ষাৎ করাও নিষিদ্ধ ছিল। বন্দীশালায় ডেভিড ৫ মাস জীবিত ছিলেন। ১৫৭৯ সনের ১৫ই নভেম্বরে কারাকক্ষেই তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর একজন অপরাধীর মত কোন এক অজ্ঞাত স্থানে তাকে সমাহিত করা হয়েছিল।

ডেভিডের মৃত্যুর পর তার কারা কক্ষের দেয়ালে একটি কবিতা লিখিত দেখতে পাওয়া যায়। ঐ কবিতার অংশ বিশেষ-

কবিতার শুরুটা হয়েছে এভাবে-
’দু’টি দশক আমি নিষ্ঠার সাথে 
আমার দেশ ও প্রিন্সের সেবা করেছি
আমার বিশ্বস্ততা ছিল প্রমাণিত।
আমার অপরাধ কি যে আমি পিতৃভূমির কাছে ঘৃণিত?
তা হল শুধৃ এই: ঈশ্বর একজনই, তিনজন নন;
আমি এ উপাসনাই করেছি।’ 

আর সমাপ্তি টানা হয়েছে এভাবে-
’বজ্র নয়, ক্রুশ নয়, নয় পোপের তরবারি, নয় মৃত্যুর মুখ ব্যাদান
সত্যের অগ্রযাত্রা রোধ করে- নেই এমন কোন শক্তি
WC Gannett.
আমি যা অনুভব করেছি তাই লিখেছি
এক বিশ্বাস পরিপূর্ণ হৃদয় নিয়ে আমি কথা বলেছি
আমার মৃত্যুর পর ঘটবে পতন অসত্য মতবাদের।’

ফ্রান্সিস ডেভিডের সাথে মুসলমানদের যোগাযোগ ছিল কিনা সে ব্যাপারে জল্পনা-কল্পনা রয়েছে। তবে একথা ঠিক তার যতই নিন্দা বা সমালোচনা করা হোক না কেন, তাকে কখনোই একজন মুসলমান বলা হয়নি।

ডেভিডের একটি প্রধান সমালোচনা হল যে, যদি তার মত গ্রহণ করা হত, তাহলে ইহুদী ও খৃষ্টধর্মের মধ্যকার পার্থক্য দূর হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল এবং খৃষ্টধর্ম হয়ত: ইহুদী ধর্মের মধ্যে পুনরায় মিশে যেত। এমনকি বণ্ড্রাটাও ডেভিডকে বিদ্রুপ করতেন এ বলে যে তিনি ইহুদী ধর্মে ফিরে যাচ্ছেন। তিনি কখনই ডেভিডের যুক্তি খন্ডন করেননি, কিন্তু ইহুদীদের বিরুদ্ধে জনমতকে উসকে দিয়ে তিনি ডেভিডের মর্যাদা হানির চেষ্টা করেছিলেন।

WC Gannett বলেন, 'ফ্রান্সিস ডেভিডের গুরুত্ব এখানেই যে এক ঈশ্বরের প্রতি আস্থা ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে তিনি প্রেরিত পুরুষদের ধারাবাহিকতায় যীশুর আগে ও পরের কোন নবীর ঐতিহ্যকে অস্বীকার না করে যীশুর অবস্থান সমর্থন করেছেন। উপরন্তু তিনি জনগণকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, সত্য বিশ্বাস, ঈশ্বরে বিশ্বাস এবং যীশুর আদর্শ ও শিক্ষার অনুসরণ ও জীবন-যাপনই ইহকাল ও পরকালের জন্যে যথেষ্ট।'

সমাপ্ত।

উৎস: Jesus- A Prophet of Islam- by Muhammad Ata ur-Rahim.
ছবি: Wikipediarubylane, erdelyiutakon, steinerag.

২৮ ডিসেম্বর, ২০১২

Socianism: সোজিনি ও সোকিয়ানবাদ।


সোকিয়ানাসের প্রকৃত নাম ফাউষ্টো পাওলো সোজিনি (Fausto Paolo Sozzini)। অবশ্য অনেকে তাকে চিনেন Faustus Socinus বা Faust Socyn নামে। জন্ম ১৫৩৯ সনের ৫ই ডিসেম্বর সিয়েনা (Siena), ইটালিতে। তিনি তার পিতা-মাতার একমাত্র পুত্র সন্তান। তার জন্মের স্বল্পকাল পরেই, ১৫৪১ সনে তার পিতা আলেসান্দ্রো সোজিনি মারা যান। তার বাল্যকালের কিছুটা সময় বাউন্ডুলে কাটে। ১৫৫৬ সনে তার দাদা মারা যাবার সময় তাকে তাদের পারিবারিক সম্পত্তির এক চতুর্থাংশ দিয়ে যান। এই অর্থ তাকে স্বাবলম্বী করে। তার অসম্ভব মেধা ও বাগ্মিতা তাকে মাত্র ২৩ বছর বয়সেই জনসাধারণের কাছে 'সোকিয়ানাস' নামে পরিচিত করেছিল।

সোকিয়ানাস।
১৫৬১ সনে তিনি লিয়ঁ ও জেনেভা গমন করেন। ১৫৬৫ সনে তিনি ইটালিতে ফিরে আসেন।পরে তিনি ফ্লোরেন্স যান এবং ইসাবেলা দ্য মেডেসির অধীনে চাকুরি গ্রহণ করেন। ইসাবেলার মৃত্যুর পর তিনি ইটালি ত্যাগ করেন ও বাসিলে বসবাস করতে শুরু করেন। এখানে তিনি নিবিড়ভাবে বাইবেল পঠনে মনোযোগী হন। তরুণ পণ্ডিত সেখানে শীঘ্রই ধর্মতত্ত্বে আগ্রহীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। ১৫৭৮ সনে তিনি বেনামে একটি গ্রন্থ (De Jesu Christo Servatore) প্রকাশ করে গোপনে বিতরণ করেন।

ফাউষ্টো সোজিনির গ্রন্থটি পোলাণ্ডের রাজ দরবারের চিকিৎসক জর্জিও বণ্ড্রাটার (Giorgio Biandrata) হাতে পৌঁছে। বণ্ড্রাটা সোকিয়ানাসকে পোলাণ্ডে আসার আমন্ত্রণ জানান। সোকিয়ানাস আনন্দের সাথে তা গ্রহণ করেন। সেখানে তিনি স্বনামে লেখার স্বাধীনতা লাভ করেন। সোকিয়ানাসের মেধা ও মননে এবং চার্চের উপর তার লেখা প্রকাশিত হবার পর শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া ঘটল। তার বিরুদ্ধে চার্চ হূলিয়া জারি করল এবং ইতালিতে তার সহায়-সম্পদ বাজেয়াপ্ত হল।

সোকিয়ানাস গ্রেফতার হলেন এবং আদালত তাকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করার নির্দেশ দিল। কিন্তু সোকিয়ানাসের প্রতি জনসমর্থন এত বিপুল ছিল যে আদালত পরে তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। তবে অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে তাকে ঠান্ডা পানিতে ডুবিয়ে হত্যার রায় দেয়। ধর্মের বিরুদ্ধাচরণকারীদের জন্যে ক্যাথলিক চার্চীয় আইনে এ দু’টি বিধান ছিল যা 'জুডিকাম ডেই' (Judicum Dei) বা 'ঈশ্বরের বিচার' নামে আখ্যায়িত হত। 

সিয়েনা, ইটালি।
পানিতে ডুবিয়ে হত্যার এ শাস্তিতে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিকে সাগরের গভীর পানিতে নিক্ষেপ করা হত।এভাবে রায় কার্যকরীতে ক্যাথলিক যাজকগণ তাকে সাগরে নিক্ষেপ করে ফিরে এল। সোকিয়ানাস সাঁতার জানতেন না, কিন্তু যেভাবেই হোক তিনি প্রাণে বেঁচে যান।

১৬০৪ সনের ৪ঠা মার্চ সোকিয়ানাস মারা গেলেন। মৃত্যুর পর, ১৬০৫ সনে তার সব রচনা একত্র করে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করা হয়। গ্রন্থটি রোকোউ (Rokow)-তে প্রকাশিত হওয়ার কারণে এটি 'রাকোভিয়ান ক্যাথেসিজম' (Racovian Cathechism) নামে পরিচিত। পোলিশ ভাষায় প্রকাশিত এ গ্রন্থটি ইউরোপের প্রায় সকল ভাষায় অনুদিত হয়। তার মতাদর্শ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এবং তার ধর্মীয় চিন্তাধারা 'সোকিয়ানবাদ' (Socianism) নামে পরিচিতি লাভ করে।

 হারনাক তার 'আউটলাইনস অব দি হিষ্টরি অব ডগমা’ গ্রন্থে সোকিয়ানবাদের নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো উল্লেখ করেছেন-

-এতে রয়েছে ধর্মের বাস্তবতা ও বিষয় সম্পর্কিত প্রশ্নসমূহ সহজ করে তোলার এবং চার্চ প্রবর্তিত ধর্মের বোঝা প্রত্যাখ্যানের সাহস। 
-এটা ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে এবং খৃষ্টধর্ম ও প্লাটোনিজমের মধ্যে চুক্তির বন্ধন ভেঙে দিয়েছে। 
-এটা এ ধারণা ছড়িয়ে দিয়েছে যে ধর্মকে শক্তিশালী করতে হলে ধর্মীয় সত্যের বিবরণ সুস্পষ্ট ও উপলব্ধি যোগ্য হতে হবে। 
-এটা বাইবেলে যা নেই সেই প্রাচীন ধর্মমতের বন্ধন থেকে পবিত্র বাইবেলের অধ্যয়নকে মুক্ত করার চেষ্টা করেছে। কেউ একজন বলেছেন যে, 'সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা হল যাজকদের রাজস্ব।’ সোকিয়ানবাদ এ দু’টিকেই হ্রাস করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভূমিকা পালন করে। 

সোকিয়ানবাদ ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়লে নরউইচের বিশপ হল (Bishop Hall) খৃষ্টধর্মের চূড়ান্ত ধ্বংসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন। ১৬৩৮ সনে সোকিয়ানাসদের উপর নির্মম ও সংগঠিত নিপীড়ন শুরু হয়। তাদের সকল নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা সহ বহু লোককে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। ফুলার বলেন, 'সোকিয়ানবাদীদের এভাবে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার বীভৎস ব্যাপারটি সাধারণ মানুষকে স্তম্ভিত করে... এবং তারা ভাল চিন্তাগুলো এমনকি ধর্ম বিরোধীদের মতও সাদরে গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিল যারা রক্ত আখরে খঁচিত করেছিল নিজেদের ধর্ম বিশ্বাসকে।'
ওয়ালেস বলেন, 'সেজন্যই প্রথম জেমস আগুনে পুড়িয়ে হত্যার বদলে তাদের বই পুড়িয়ে দেয়ার অধিকতর কম ক্ষতিকর নীতি গ্রহণ করেছিলেন।'

১৬৫৮ সনে কঠোর আইন জারি হল। জনসাধারণকে- 'রোমান ক্যাথলিক ধর্ম গ্রহণ কর অথবা নির্বাসনে যাও'-এ দু'টি অপসনের মধ্যে যে কোন একটিকে বেছে নিতে বলা হয়। ফলে সোকিয়ানাসরা ছত্রভঙ্গ হয়ে সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে।

রাকোভিয়ান ক্যাথেসিজমে বিধৃত লেখায় সোকিয়ানাস 'প্রায়শ্চিত্ত মতবাদ' প্রত্যাখ্যান করে গোঁড়া খৃষ্টধর্মের মর্মমূলে আঘাত হেনেছিলেন। যীশু ক্রুশবিদ্ধ হননি কিংবা পুনরুজ্জীবিতও হননি, সুতরাং এ মতবাদ সম্পূর্ণরূপে ভিত্তিহীন। সোকিয়ানাস যীশুর জীবনের শেষ পরিণতি সম্পর্কে জ্ঞাত না থাকলেও তিনি প্রাপ্ত অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে এ মতবাদের অসারতা প্রমাণ করেছিলেন। 

সংক্ষেপে বললে, প্রায়শ্চিত্ত মতবাদের অনুসারীরা প্রচার করতে থাকে যে- 'আদমের প্রথম ভুল কাজের জন্যে মানুষ পাপী হয়ে জন্মগ্রহণ করেছে। যীশু তার ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে এ পাপ এবং খৃষ্টধর্ম গ্রহণকারী তার অনুসারী সকলের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করেছেন। গোঁড়া খৃষ্টধর্ম অনুসারে চার্চ হল একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও পবিত্র সমাজ যা যিশুখৃষ্ট মানুষের কাজের জন্যে তার প্রায়শ্চিত্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। শুধুমাত্র এ সমাজের মধ্যে থেকে এবং তার সেবার মাধ্যমে পাপী মানুষ ঈশ্বর লাভের পথ খুঁজে পেতে পারে। এ কারণে চার্চে বিশ্বাসী ব্যক্তি অন্যদের চাইতে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রাধিকার প্রাপ্ত।' 

সোকিয়ানাস-এর সবকিছুই প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, 'একজন মানুষ কোন মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই সরাসরি ঈশ্বরকে লাভ করতে পারে। আত্মার মুক্তির জন্যে খৃষ্টধর্ম নয়, সঠিক বিশ্বাস প্রয়োজন, অন্ধভাবে চার্চকে অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই।’

'প্রায়শ্চিত্ত মতবাদ' প্রত্যাখ্যান করে সোকিয়ানাস সমগ্র চার্চের কর্তৃত্ব ও অস্তিত্ব সম্পর্কেই প্রশ্নের সৃষ্টি করেন। প্রধানত: এই কারণেই ক্যাথলিক ও প্রোটেষ্টাণ্টরা সোকিয়ানাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যে পরস্পরের সাথে হাত মিলিয়েছিল। সোকিয়ানাস তাদের প্রায়শ্চিত্ত মতবাদ খণ্ডন করেন এভাবে-

’যিশুখৃষ্ট আদি পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য জীবন উৎসর্গ করেননি। গসপেলের বর্ণনা অনুযায়ী যীশু অল্প সময়ের জন্যে যন্ত্রণাভোগ করেন। মানুষকে যে অনন্তকালীন যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে তার সাথে তুলনায় স্বল্প সময়ের খুব তীব্র যন্ত্রণা কিছুই নয়। যদি এ কথা বলা হয় যে, এ যন্ত্রণা ছিল অতি ভয়ানক কারণ যিনি তা ভোগ করেন তিনি ছিলেন অনিঃশেষ, তথাপিও অনিঃশেষ ব্যক্তির যন্ত্রণাও অনন্ত যন্ত্রণার কাছে কিছুই নয়।

যদি স্বীকার করে নেয়াও হয় যে, যিশুখৃষ্ট প্রায়শ্চিত্ত করেছিলেন তাহলেও সৃষ্টিকর্তার ক্ষমা অথবা তার ক্ষমার জন্যে তার প্রতি মানুষের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের কথা বলা অসম্ভব, যেহেতু যে ব্যক্তি যীশুখৃষ্টের নামে দীক্ষিত হবে সৃষ্টিকর্তা তার পাপ ক্ষমা করার আগেই সে স্বংয়ক্রিয়ভাবে ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে যায়। এ মতবাদ অনুসরণ করার অর্থ-সৃষ্টিকর্তার আইন তার বান্দাদের জন্যে আর বাধ্য-বাধকতামূলক থাকে না। যেহেতু তার সকল পাপের ইতিমধ্যে পূর্ণ প্রায়শ্চিত্ত হয়ে গেছে। সুতরাং কোন ব্যক্তি তার যা খুশি করার স্বাধীনতা পেয়ে যায়। যেহেতু যীশুখৃষ্টের প্রায়শ্চিত্ত পূর্ণাঙ্গ ও অনন্ত, সুতরাং সকলেই তার আওতাভূক্ত। তাই চিরকালীন মুক্তি অবধারিত হয়ে যায়। অন্য কথায়, মানুষকে নতুন কোন শর্ত দেয়ার অধিকার ঈশ্বরের নেই। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে, সে কারণে সকল ঋণ গ্রহীতাই এখন মুক্ত। ধরা যাক, একদল লোক একজন জাগতিক ঋণদাতার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছে এবং কোন একজন তা সম্পূর্ণরূপে পরিশোধ করল। এরপর ঐ ঋণদাতার কি ওইসব ঋণ গ্রহীতার কাছে আর কোন দাবি থাকবে যারা আর তার কাছে ঋণী নয়?’

যীশু ঈশ্বর নন, একজন মানুষ, একথা ব্যক্ত করে সোকিয়ানাস পরোক্ষভাবে প্রায়শ্চিত্ত মতবাদ সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কোন ব্যক্তিই সমগ্র মানবজাতির অসৎ বা ভুল কাজের জন্যে প্রায়শ্চিত্ত করতে পারে না। এ সত্যটি এই কাল্পনিক মতবাদ খণ্ডন করার জন্যে যথেষ্ট।

সোকিয়ানাস জোর দিয়ে বলেছেন যে, 'যীশু একজন মরণশীল মানুষ ছিলেন। তিনি এক কুমারী মায়ের গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। তার জীবনের পবিত্রতার জন্যে তিনি অন্য সকল মানুষ থেকে পৃথক ছিলেন। তিনি ঈশ্বর ছিলেন না, কিন্তু ঈশ্বরের কাছ থেকে প্রেরণা পেয়েছিলেন। তার অলৌকিক দৃষ্টি ও শক্তি ছিল, কিন্তু তিনি তার স্রষ্টা ছিলেন না। ঈশ্বর মানবজাতির কাছে এক মিশনে তাকে প্রেরণ করেছিলেন।’

বাইবেলের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ সমূহের উদ্ধৃতি ও ব্যাপক ব্যাখ্যার মাধ্যমে সোকিয়ানাস এসব বিশ্বাসকে সমর্থন করেন। তার সূক্ষ্ম ও বলিষ্ঠ যুক্তি যীশুখৃষ্ট সম্পর্কে একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা প্রদান করে। তিনি বলেন, ’যীশু তার জীবনে সকল অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছেন। বিশ্ব সৃষ্টির আগে তার সৃষ্টি হয়নি। প্রার্থনার সময় যীশুর সাহায্য কামনা করা যেতে পারে যদি না ঈশ্বর হিসেবে তার উপাসনা করা হয়।’

সোকিয়ানাস দৃঢ়তার সাথে ব্যক্ত করেন যে, 'ঈশ্বর সর্বোচ্চ প্রভু। সর্বশক্তিমান তাঁর একমাত্র গুন নয়, তিনি সকল গুণের অধিকারী। ঈশ্বরের বিরুদ্ধে কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যায় না। সীমা-অসীমের পরিমাপ হতে পারে না। সুতরাং ঈশ্বর সম্পর্কে মানুষের সকল ধারণাই অপর্যাপ্ত এবং শুধু এ ধারণার উপর ভিত্তি করে ঈশ্বরের বিচার করা যায় না। ঈশ্বর স্বাধীন, স্ব-ইচ্ছা সম্পন্ন এবং মানুষের মস্তিষ্ক প্রসূত কোন আইনের তিনি আওতাধীন নন। তাঁর উদ্দেশ্য এবং তার ইচ্ছা মানুষের অগোচর। তিনি মানুষের এবং অন্য সকল বিষয়ের উপর সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব সম্পন্ন এবং সব কিছুই তাঁর ইচ্ছাধীন। তিনি অন্তরের অন্তস্থলে লুকিয়ে রাখা গোপন কথাটিও জানেন। যিনি ইচ্ছামত বিধি-বিধান তৈরি করেন এবং সৎকাজ ও অসৎ কাজের জন্যে পুরস্কার ও শাস্তি প্রদান করেন। ব্যক্তি হিসেবে মানুষকে ইচ্ছার স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে, কিন্তু কার্যত: সে ক্ষমতাহীন।’

সোকিয়ানাস বলেন, 'সকল কিছুর উপর সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী সত্তা একজনের বেশি হতে পারেন না। সুতরাং তিনজন সর্বশক্তিমানের কথা বলা অযৌক্তিক। ঈশ্বর একজনই, সংখ্যায়ও তিনি এক। ঈশ্বরের সংখ্যা কোন ক্রমেই একাধিক নয়। প্রতিটি ব্যক্তির নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক সত্তা রয়েছে। ঈশ্বর যদি সংখ্যায় তিনজনই হবেন তাহলে তিনটি স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তা ও থাকার কথা। যদি এটাই বলা হয় যে একটি মাত্র সত্তাই বিরাজমান তাহলে এটাও সত্য যে সংখ্যার দিক দিয়েও ঈশ্বর একজনই।’

সোকিয়ানাস যে যুক্তি দিয়ে ত্রিত্ববাদের বিষয় খণ্ডন করেছেন তা হল যীশুর একই সাথে দু’টি বৈশিষ্ট্য থাকা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, 'একই ব্যক্তির মধ্যে দু’টি বিপরীত গুণ বা বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন সত্তার সমাবেশ ঘটতে পারে না। আর এ ধরনের বৈশিষ্ট্যগুলো হল মরণশীলতা ও অ-মরণশীলতা, আদি ও অনাদি, পরিবর্তন ও পরিবর্তনহীনতা। আবার দু’টি বৈশিষ্ট্য যার প্রতিটি একটি পৃথক ব্যক্তিসত্তা গঠনে সক্ষম, এক ব্যক্তির মধ্যে তাদের সমন্বয় করা যেতে পারে না। তাই একজনের পরিবর্তে প্রয়োজনের তাগিদেই এক্ষেত্রে দু’ব্যক্তির উদ্ভব ঘটে এবং পরিণতিতে দু’জনই যীশুখৃষ্টে পরিণত হন। একজন ঈশ্বর, অন্যজন মানুষ।'

চার্চ বলে থাকে- 'যিশুখৃষ্টের ঐশ্বরিক ও মানবিক সত্তা রয়েছে যেমনটি মানুষ দেহ ও আত্মার সমন্বয়ে গঠিত।' সোকিয়ানাস এর জবাব দেন- 'উভয়ের মধ্যে তুলনা চলে না। কেননা একজন মানুষের ক্ষেত্রে দেহ ও আত্মা এমনভাবে সংযুক্ত যে, একজন মানুষ শুধু না আত্মা- না শরীর। শুধু আত্মা বা শুধু দেহ দিয়ে কোন মানুষ সৃষ্টি হয় না।পক্ষান্তরে ঐশীশক্তি নিজেই প্রয়োজনে একটি মানুষ সৃষ্টি করে। একইভাবে মানুষ নিজেও এক পৃথক ব্যক্তিকে সৃষ্টি করে।’

সোকিয়ানাস আরও বলেন, ‘শুধু তাই নয়, এটা বাইবেলের কাছেও গ্রহণযোগ্য নয় যে যীশুখৃষ্টের ঐশ্বরিক বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে। প্রথমত, ঈশ্বর যীশুকে সৃষ্টি করেছেন। দ্বিতীয়ত, বাইবেলের মতে তার সবই ঈশ্বরের দান। তৃতীয়ত, বাইবেলে সুষ্পষ্টভাবে আভাস দেওয়া হয়েছে যে যীশু সকল অলৌকিক ঘটনার উৎস হিসেবে তার নিজের বা কোন ঐশ্বরিক গুনের কথা উল্লেখ করেননি, বরং ঈশ্বরকেই এসবের উৎস বলে ব্যক্ত করেছেন। যীশু নিজেও ঈশ্বরের ইচ্ছার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।’

রেলান্ড (Reland) তার ‘হিষ্টারিকাল অ্যান্ড ক্রিটিকাল রিফ্লেকশনস আপন মোহামেডানিজম এণ্ড সোকিয়ানিজম’-গ্রন্থে 'রাকোভিয়ান ক্যাথেসিজম' সম্পর্কে বলেন- 'যিশুখৃষ্টকে ঈশ্বর বলে বিশ্বাস করার কথা যারা বলেন তা শুধু সঠিক যুক্তির বিপরীতই নয়, এমনকি তা পবিত্র বাইবেলেরও পরিপন্থী এবং যারা বিশ্বাস করে যে শুধু পিতাই নন, তার পুত্র এবং পবিত্র আত্মাও একই ঈশ্বরের মধ্যে ত্রয়ী সত্তা, তারাও মারাত্মক ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে... ঈশ্বরের সত্তা অত্যন্ত সহজ এবং সম্পূর্ণ একক। সুতরাং তারা যদি তিন স্বতন্ত্র ব্যক্তি হয়ে থাকেন তাহলে আরেকজন ঈশ্বরের কথা বলা একেবারেই পরস্পর বিরোধী এবং পিতা তার নিজস্ব সত্তায় একটি সন্তানের জন্মদান করেছেন বলে আমাদের প্রতিপক্ষের দুর্বল ক্ষুদ্র যুক্তি উদ্ভট ও অপ্রাসঙ্গিক... নিকাইয়ার কাউন্সিলের সময় পর্যন্ত সকল সময় এবং কিছু সময় পরও সমসাময়িকদের লেখায় পিতা ঈশ্বরকেই প্রকৃত ঈশ্বর বলে স্বীকার করা হত বলে দেখা যায়। যারা বিপরীত মতের অধিকারী ছিলেন, যেমন সাবেলিয়ান (Sabellian) এবং তার সমমনাদের প্রচলিত ধর্মমত বিরোধী বলে গণ্য করা হতো... যিশুখৃষ্ট বিরোধী চেতনা খৃষ্টীয় চার্চের মধ্যে সবচাইতে বেশি মারাত্মক ভুলের প্রচলন করেছে এই মতবাদে যে, ঈশ্বরের অত্যন্ত সহজ সত্তায় রয়েছে তিন জন স্বতন্ত্র ব্যক্তি, যাদের প্রত্যেকেই এক একজন ঈশ্বর এবং পিতাই শুধু একমাত্র প্রকৃত ঈশ্বর নন, পুত এবং পবিত্র আত্মাও অবশ্যই একই রকম ঈশ্বর। সত্যের এর চেয়ে অধিক অবাস্তব, অধিক অসম্ভব এবং অপলাপ আর হতে পারে না... খৃষ্টানরাও বিশ্বাস করে যে যীশুখৃষ্ট আমদের পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্যেই মৃত্যুবরণ করেছেন এবং আমাদের পাপের স্খালন করেছেন। কিন্তু এই মত মিথ্যা, ভ্রান্তিপূর্ণ ও ক্ষতিকারক।’

টোল্যান্ড তার 'দি নাজারেনিস' (The Nazarenes) গ্রন্থে বলেন-’সোকিয়ানাসের মতানুসারী এবং অন্যান্য একত্ববাদীরা অত্যন্ত আস্থার সাথে বলেন যে, যারা ইহুদী সম্প্রদায় ভুক্ত ছিল না তারাই খৃষ্টধর্মে তাদের সাবেক একাধিক ঈশ্বরবাদ ও মৃত মানুষকে ঈশ্বরত্ব আরোপের মতবাদ প্রচলন করেছে: এগুলোতে খৃষ্টধর্মের নাম বহাল রয়েছে কিন্তু বিষয়ের আমূল পরিবর্তন হয়ে গেছে এবং সকল মত ও প্রথার সাথে সংগতি রেখে নিজেদের স্বার্থে ও প্রয়োজনে এরা তা কাজে লাগাচ্ছে।’ 

এটা সুস্পষ্ট যে সোকিয়ানাসের রচনা ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়েছিল। তিনি জনসাধারণের কাছে যীশু কে ছিলেন এবং কী জন্য তিনি এসেছিলেন সে ব্যাপারে সঠিক চিত্রই শুধু তুলে ধরেননি, উপরন্তু মানুষের উপর চার্চ যে বিপুল ক্ষমতা প্রয়োগ করত, তার অধিকাংশই ধ্বংস করেছিলেন। সোকিয়ানাসের শ্রেষ্ঠত্ব এখানে যে তিনি এমন এক ধর্মমতের ধারক ছিলেন যা ছিল যৌক্তিক এবং বাইবেল ভিত্তিক। তার বিরোধীদের পক্ষে তার মতামত বাতিল করা সম্ভব ছিল না। যেমন- ১৬৮০ সনে রেভারেণ্ড জর্জ অ্যাশওয়েল (Ashwell) যখন দেখলেন যে সোকিয়ানাসের গ্রন্থগুলো তার ছাত্রদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়, তখন তিনি সোকিয়ানবাদের উপর একটি গ্রন্থ রচনার সিদ্ধান্ত নেন। সোকিয়ানাস সম্পর্কে তার মূল্যায়ন অত্যন্ত কৌতুহলোদ্দীপক-

'এ সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষক এক অত্যন্ত মহৎ ব্যক্তি যার মধ্যে সকল গুণের সমাবেশ ঘটেছিল এবং তিনি মানুষের শ্রদ্ধা ও প্রশংসা অর্জন করেছিলেন। যাদের সাথে তিনি কথা বলতেন তাদের সকলকেই তিনি মুগ্ধ করতেন। তিনি সকলের মনে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ছাপ রেখেছিলেন। তিনি তার প্রতিভার শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন করেছিলেন। তার যুক্তি বিন্যাস ছিল অত্যন্ত জোরালো, তিনি ছিলেন বিরাট বাগ্মী। তার সদ্গুণ সকলের কাছেই ছিল অসাধারণ। তার মহৎ চরিত্র ও জীবন ছিল উদাহরণযোগ্য এবং সে কারণেই তিনি মানুষের শ্রদ্ধা লাভ করেছেন।’ আর সমাপ্তি টেনেছেন এভাবে-'সোকিয়ানাস ছিলেন শয়তানের বড় ফাঁস বা ফাঁদ।’

তবে আজকের দিনে অধিকাংশ খৃষ্টানই সোকিয়ানাস সম্পর্কে রেভারেণ্ড অ্যাশওয়েলের স্ববিরোধী মন্তব্যের সাথে একমত নন। বরং যে নির্মমভাবে এই মতবাদ দমন করা হয়েছিল তাতে অনেকেরই সহানুভূতি উদ্রেক করে। 

সমাপ্ত।

উৎস: Jesus- A Prophet of Islam by Muhammad Ata-Ur-Rahim.
ছবি: Wikipedia.

২৭ ডিসেম্বর, ২০১২

John Biddle: বিডলের টুয়েলভ আর্গুমেন্টস।


জন বিডল (John Biddle) উত্তর পশ্চিম ইংল্যান্ডের গ্লুচেস্টশায়ারের (Gloucestershire) ওয়াটন আন্ডার এজ (Wotton-under-Edge) নামের একটি মার্কেট শহরে ১৪ই জানুয়ারী, ১৬১৫ সনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি অসম্ভব মেধাবী ছিলেন। ১৬৩৪ খৃষ্টাব্দে তিনি অক্সফোর্ডে ভর্তি হন এবং ১৬৩৮ খৃষ্টাব্দে  বি.এস. ডিগ্রি লাভ করেন। 

সেণ্ট মেরি দ্য ক্রিপ্ট গ্রামার স্কুল, গ্লুচেস্টশায়ার।
১৬৪০ খৃষ্টাব্দের জুন মাসে ক্যান্টারবেরি ও ইয়র্কের সম্মেলনে সোকিয়ানাসের গ্রন্থসমূহের আমদানি, মুদ্রণ ও বিতরণ নিষিদ্ধ করা হয় এবং হুঁশিয়ার করে দেয়া হয় যে এ ধর্মমতে কেউ বিশ্বাস স্থাপন করলে তাকে গির্জা হতে বহিষ্কার করা হবে। এসময় একদল লেখক ও বুদ্ধিজীবী এ সিদ্ধান্তের নিন্দা করলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। 

জন বিডল এসময় 'সোকিয়ানবাদ' সম্পর্কে আগ্রহী হন। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কারণে পুস্তক সংগ্রহ সম্ভব হয়নি। যাইহোক ১৬৪১ খৃষ্টাব্দে এম.এস. ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি গ্লুচেষ্টারের সেণ্ট মেরি দ্য ক্রিপ্ট গ্রামার স্কুলে (The Crypt Grammar School, Gloucester) প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।স্কূলটি গ্লুচেস্টশায়ারের ক্যাথেড্রাল এর সাথে সংযুক্ত ছিল।আর যেহেতু তিনি তার ছাত্রদের চার্চ অব ইংল্যান্ডের ক্যাথেসিজম অনুসারে শিক্ষা দিতে বাধ্য ছিলেন, তাই তিনি গভীরভাবে বাইবেল পঠনে মনোযোগ দেন। এসময়ই একান্ত অবসরে তিনি তার ধর্মবিশ্বাস পুনর্বিবেচনা করতে শুরু করেন এবং এক পর্যায়ে ত্রিত্ববাদী ধর্মমতের বৈধতার ব্যাপারে তার মনে সন্দেহ জাগে। 

গ্লুচেস্টশায়ার ক্যাথেড্রাল।
পুনর্মূল্যায়ন ও নতুন পরীক্ষার পর ত্রিত্ববাদসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিডলের নিজের মতেও পরিবর্তন সাধিত হয়। তিনি তার উপলব্ধ বিশ্বাস সম্পর্কে খোলাখুলি কথাবার্তা বলতে শুরু করেন। এরফল হিসেবে ম্যাজিষ্ট্রেট কর্তৃক ১৬৪৪ খৃষ্টাব্দে তিনি লিখিতভাবে তার ধর্মীয় স্বীকারোক্তির নির্দেশ পান। খুব সহজ ভাষায় তিনি সেটা করেন। -’আমি বিশ্বাস করি ঈশ্বর নামে একজনই সর্বশক্তিমান সত্তা রয়েছেন। সুতরাং ঈশ্বর একজনই।’

বিডল এ সময় 'পবিত্র আত্মার ঈশ্বরত্ব খণ্ডন করে ১২ টি যুক্তি' (Twelve Arguments Refuting the Deity of the Holy Sprit) নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। ১৬৪৫ খৃষ্টাব্দে এটি বাজেয়াপ্ত করা হয়। ১৬৪৭ খৃষ্টাব্দে তিনি আবার ঐ পুস্তিকার পুনর্মুদ্রণ করেন। পার্লামেন্ট ঐ পুস্তিকার সকল কপি পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেয়। এরপর ১৬৪৮ খৃষ্টাব্দের ২ মে এক কঠোর অধ্যাদেশ জারি করা হয়। ঐ অধ্যাদেশে বলা হয়- যদি কেউ ত্রিত্ববাদে, অথবা যীশু অথবা পবিত্র আত্মাকে অস্বীকার করে, তাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হবে। 

যে পুস্তিকার কারণে এই কঠোর শাস্তির বিধান জারি করা হয়, সেই 'টুয়েলভ আর্গুমেন্টস' এর সারাংশ নিম্নরূপ-

১. যে ঈশ্বর থেকে পৃথক সে ঈশ্বর নয়
পবিত্র আত্মা ঈশ্বর থেকে পৃথক
অতএব, পবিত্র আত্মা ঈশ্বর নয়। 

যুক্তির ব্যাখ্যা: পবিত্র আত্মা ব্যক্তি হিসেবে ঈশ্বর থেকে ভিন্ন কিন্তু সত্তা হিসেবে নয়, এরূপ যুক্তিই যুক্তি বিরুদ্ধ। 
প্রথমত- কোন মানুষের পক্ষে ঈশ্বর সত্তা থেকে ব্যক্তিকে পৃথক করা এবং তার মনের মধ্যে দু’টি বা তিনটি সত্তাকে ঠাঁই দেয়া অসম্ভব। এর ফল হিসেবে সে দু’জন ঈশ্বর রয়েছে বলে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে। 

দ্বিতীয়ত- ব্যক্তিকে যদি ঈশ্বরের সত্তা থেকে পৃথক করা হয় তখন ব্যক্তি এক ধরনের স্বাধীন বস্তু হয়ে উঠবে এবং তা হয় সীমাবদ্ধ নয় অ-সীমাবদ্ধ হবে। যদি সীমাবদ্ধ হয় তাহলে ঈশ্বরও একজন সীমাবদ্ধ সত্তা যেহেতু চার্চ বলে ঈশ্বরের মধ্যকার সবকিছুই স্বয়ং ঈশ্বর। সুতরাং এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত হবে অবাস্তব। আবার যদি অ-সীমাবদ্ধ হয় তাহলে ঈশ্বরের মধ্যেও দু’জন অ-সীমাবদ্ধ ব্যক্তি থাকবেন অর্থাৎ দু’জন ঈশ্বর যা আগের যুক্তির চেয়ে আরো অবাস্তব। 

তৃতীয়ত, ঈশ্বর সম্পর্কে নৈর্ব্যক্তিক কিছু বলা হাস্যকর যেহেতু প্রত্যেক ব্যক্তি কর্তৃক একথা স্বীকৃত যে ঈশ্বর একজন ব্যক্তির নাম যিনি সর্বশক্তিমান শাসনকারী... একজন ব্যক্তি ছাড়া কেউ অন্যদের উপর শাসন বিস্তার করতে পারে না। সুতরাং তাকে ব্যক্তির বদলে অন্য কিছু হিসেবে গ্রহণ করার অর্থ তিনি যা নন তাকে সে হিসেবে গণ্য করা।

২. যিনি ইসরাইলদের পবিত্র আত্মা দিয়েছিলেন তিনি যিহোভা।
সুতরাং পবিত্র আত্মা যিহোভা বা ঈশ্বর নন। 

৩. যিনি নিজের কথা বলেন না তিনি ঈশ্বর নন।
পবিত্র আত্মা নিজের কথা বলেন না। 
সুতরাং পবিত্র আত্মা ঈশ্বর নন। 

৪. যিনি শিক্ষা লাভ করেন তিনি ঈশ্বর নন।
যিনি কি বলবেন তা অন্যের কাছ থেকে শোনেন সেটাই হল শিক্ষা।
যীশু খৃষ্ট তাই বলতেন যা তাকে বলা হত। 
সুতরাং যীশু ঈশ্বর নন। 
সূত্র: গসপেল (৮:২৬) 'আমি তাঁর (ঈশ্বর) কাছ থেকে যা শুনেছি সে সব কথাই বলি।'- যীশু 

৫. ঈশ্বর তিনি যিনি সকলকে সব কিছু দিয়েছেন।
যিনি অন্যের কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করেন তিনি ঈশ্বর নন।
সূত্র: জনের গসপেল(১৬:১৪) ঈশ্বর তিনি যিনি সকলকে সব কিছু দিয়েছেন।-যীশু 

৬. যিনি অন্য কর্তৃক প্রেরিত তিনি ঈশ্বর নন।
পবিত্র আত্মা ঈশ্বর প্রেরিত।
সুতরাং পবিত্র আত্মা ঈশ্বর নন। 

৭. যিনি সবকিছু দিতে পারেন না তিনি ঈশ্বর নন।
সূত্র: ঈশ্বর সকলকে দিয়েছেন প্রাণ, শ্বাস- প্রশ্বাস এবং সবকিছু। -প্রেরিত (১৭:২৫)
ব্যাখ্যা: যিনি ঈশ্বরের দান, তিনি সর্বদাতা নন যেহেতু তিনি নিজেই ঈশ্বরের প্রদত্ত দান। কিছু দান করা দাতার শক্তি ও নিজস্ব ইচ্ছাধীন। সুতরাং এটা কল্পনা করাই অবাস্তব যে, ঈশ্বর কারো শক্তি ও ইচ্ছাধীন। 

৮. যিনি স্থান পরিবর্তন করেন তিনি ঈশ্বর নন
পবিত্র আত্মা স্থান পরিবর্তন করেন,
সুতরাং পবিত্র আত্মা ঈশ্বর নন।
ব্যাখ্যা: “যদি ঈশ্বর স্থান পরিবর্তন করেন তাহলে যেখানে তিনি আগে ছিলেন সেখানে তিনি থাকবেন না এবং যেখানে তিনি আগে ছিলেন না সেখানে যাত্রা শুরু করবেন। এটা তার সর্বত্র বিরাজমান থাকা ও ঈশ্বরত্বের বিরোধী। সুতরাং যীশুর কাছে যিনি এসেছিলেন তিনি ঈশ্বর নন বরং তিনি একজন স্বর্গীয় দূত। 

৯. যিনি সিদ্ধান্তের জন্যে যীশুর কাছে প্রার্থনা করেন তিনি ঈশ্বর নন,
সুতরাং পবিত্র আত্মা ঈশ্বর নন।

১০. যার প্রতি বিশ্বাস স্থাপিত হয়নি তিনি ঈশ্বর নন।
মানুষ পবিত্র আত্মার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেনি তবুও তারা তার অনুসারী
সুতরাং পবিত্র আত্মা ঈশ্বর নন।
সূত্র: 'যার কথা তারা শোনেনি তাকে তারা কীভাবে বিশ্বাস করবে? মানুষ যার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেনি, তবুও ছিল তারা অনুসারী।'-রোমীয় (১০:১৪)

১১. যিনি ঈশ্বরের কাছ থেকে নির্দেশ গ্রহণ করেন ও বলেন তা ঈশ্বরের শিক্ষা
পবিত্র আত্মা সেটাই করেন,
অতএব পবিত্র আত্মা ঈশ্বর নন।
ব্যাখ্যা: যিনি অন্যের মারফত ঈশ্বরের কথা জানতে পারেন. যেমন যীশু, তিনি যা বলবেন তা ঈশ্বর থেকে স্বতন্ত্র। 

১২. ঈশ্বর থেকে যিনি স্বতন্ত্র ইচ্ছা রাখেন তিনি ঈশ্বর নন।
পবিত্র আত্মা ঈশ্বর থেকে স্বতন্ত্র ইচ্ছা রাখেন, 
সুতরাং পবিত্র আত্মা ঈশ্বর নন। 
সূত্র: 'অনুরূপভাবে পবিত্র আত্মা আমাদের প্রার্থনা করতে শিখিয়েছেন, কারণ আমরা তা জানতাম না। পবিত্র আত্মা আমাদের জন্য কাতরভাবে প্রার্থনা করেছেন... ঈশ্বরের ইচ্ছানুযায়ী সাধু- সন্তদের জন্যেও তিনি সুপারিশ করেছেন।'-রোমীয় (৮:২৬-২৭)

বিডল নিউ টেষ্টামেন্টের একটি পংক্তিও আলোচনা করেছেন যা প্রতিষ্ঠিত চার্চ ত্রিত্ববাদের ব্যাপারে তাদের সমর্থনে উদ্ধৃত করে থাকে। তা হল জনের গসপেলে (৫:৭) বলা হয়েছে- '৩টি বিষয় রয়েছে যা ঐশী। সেগুলো হল পিতা ঈশ্বর, বাণী ও পবিত্র আত্মা। আর এই তিনে মিলে এক।' 

বিডল বলেন, এ পংক্তি সাধারণ জ্ঞানে পরস্পর বিরোধী। উপরন্তু তা ধর্মগ্রন্থ গুলোর অন্যান্য পংক্তিরও বিরোধী। তাছাড়া এটা তাদের ঐক্যমতকেই তুলে ধরে, কখনোই সত্তার নয়। তদুপরি, এমনকি প্রাচীন গ্রীক গসপেলেও এ পংক্তিটি দেখা যায় না যেমন তা নেই সিরীয় অনুবাদে এবং অতি প্রাচীন ল্যাটিন সংস্করণে। তাই মনে হয় যে এ পংক্তিটি সংযোজন করা হয়েছে এবং সে কারণে প্রাচীন ও আধুনিক কালের ব্যাখ্যাকার গণ তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

১৬৪৮ সালের আইন সত্ত্বেও বিডল তার দু’টি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। একটি হল A Confession of Faith Touching the Holy Trinity According to the Scripture. অন্যটি The Tectimonies of Iraneus, Justin Martyr etc Concerning one God and the Persons of the Holy Trinity.

বিডলের ঐ ’কনফেশন অব ফেইথ’ গ্রন্থটি ৬টি প্রবন্ধ নিয়ে প্রণীত হয়েছিল। প্রতিটি প্রবন্ধই রচিত হয়েছিল বাইবেলের উদ্ধৃতি ও তার যুক্তি-তর্ক দিয়ে। ভূমিকায় তিনি ত্রিত্ববাদী ধর্মমতের কারণে সৃষ্ট ক্ষতির কথা বলিষ্ঠতার সাথে ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন যে, ত্রিত্ববাদীদের ব্যবহৃত যুক্তিসমূহ খৃষ্টানদের চেয়ে জাদুকরদের জন্যে বেশি উপযুক্ত। 

এই 'কনফেশন অব ফেইথ' গ্রন্থের কিছু অংশ- 'আমি বিশ্বাস করি যে একজন সর্বোচ্চ ঈশ্বর রয়েছেন যিনি স্বর্গ ও পৃথিবীর স্রষ্টা এবং সকল বস্তুর মূল উৎস এবং তিনিই আমদের চূড়ান্ত বিশ্বাস ও প্রার্থনার লক্ষ্য। আমি যীশুতে বিশ্বাস করি এ পর্যন্ত যে তিনি আমাদের ভাই এবং আমাদের দুর্বলতার প্রতি তার রয়েছে সহানুভূতি যে কারণে আমাদের সাহায্যের জন্যে তিনি অধিক প্রস্তুত। তিনি একজন মানুষ মাত্র। তিনি স্রষ্টার অধীন। তিনি অন্য একজন ঈশ্বর নন। ঈশ্বর দু’জন নয়। আর পবিত্র আত্মা একজন স্বর্গীয় দূত যিনি তার মহত্ত্ব ও ঈশ্বরের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে ঈশ্বরের বাণী বহনের জন্যে নির্বাচিত হয়েছেন।'

গ্রন্থ দু’টি প্রকাশ করার কারণে ১৬৪৮ সালের প্রণীত আইনে বিডল গ্রেফতার হলেন। প্রণীত ঐ আইনে হয়ত: ফাঁসিতে ঝুলতে হত যদি না পার্লামেন্টের কয়েকজন নিরপেক্ষ সদস্য তাকে সাহায্য করতেন। কারাগারে দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর একজন ম্যাজিষ্ট্রেট বিডলের জামিন মঞ্জুর করেন এবং তিনি কারামুক্ত হন। নিরাপত্তার কারণে উক্ত ম্যাজিষ্ট্রেটের নাম গোপন রাখা হয়। কিন্তু বিডল বেশিদিন মুক্ত জীবন কাটাতে পারেননি। তাকে আবার কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। এর পরপরই ঐ ম্যাজিষ্ট্রেট পরলোকগমন করেন। তিনি বিডলের জন্যে সামান্য সম্পদ রেখে যান। কারা জীবনের ব্যায় মেটাতে খুব শিগগিরই তা নিঃশেষ হয়ে যায়। কিছুকালের জন্যে বিডলের আহার সকাল ও সন্ধ্যায় সামান্য পরিমাণ দুধে মাত্র এসে ঠেকে। এ সময় কারাগারে থাকা অবস্থায় বাইবেলের গ্রীক অনুবাদের একটি নতুন সংস্করণের প্রুফ দেখে দেওয়ার জন্যে লণ্ডনের একজন প্রকাশক তাকে প্রুফরিডার নিযুক্ত করায় তার আর্থিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি ঘটে। ১৬৫২ খৃষ্টব্দে ক্ষমা প্রদর্শন আইন পাস হলে বিডল মুক্তি লাভ করেন।
১৬৫৪ খৃষ্টাব্দে বিডল আমষ্টার্ডামে একত্ববাদ নিয়ে পুনরায় একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। ইংল্যাণ্ডে এ গ্রন্থটিও ব্যাপকভাবে পঠিত হয়। স্বাধীন জীবনের এ সময়কালটিতে তিনি প্রতি রবিবার তাদের নিজস্ব রীতিতে ঈশ্বরের উপাসনার জন্যে অন্যান্য একত্ববাদীর সাথে মিলিত হতেন। এতে যারা যোগদান করতেন তারা আদি পাপের ধারণা ও প্রায়শ্চিত্ত মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন না। 

১৬৫৪ খৃষ্টাব্দের ১৩ ডিসেম্বর বিডলকে পুনরায় গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। তাকে কলম, কালি ও কাগজ প্রদান নিষিদ্ধ করা হয় এবং কোন দর্শনার্থীরও তার সাথে সাক্ষাৎ করার অনুমতি ছিল না। এমনকি তার সব গ্রন্থ পুড়িয়ে ফেলারও নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। বিডল আপিল করেন এবং ১৬৫৫ খৃষ্টাব্দের ২৮ মে মুক্তি পান। 
অল্পদিনের মধ্যেই বিডল পুনরায় কর্তৃপক্ষের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। একটি প্রকাশ্য বিতর্ক অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। বক্তা বিতর্কের শুরুতেই জিজ্ঞাসা করেন যে যীশুকে সর্বোচ্চ ঈশ্বর বলে অবিশ্বাস করেন এমন কোন ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত আছেন কিনা। বিডল সাথে সাথে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বললেন, ’আমি অবিশ্বাস করি।’ 

তার বক্তব্যের স্বপক্ষে যুক্তি দিতে বললে, তিনি তার যুক্তি দিতে শুরু করেন। তার প্রতিপক্ষ ঐসব যুক্তি খণ্ডন করতে পারলেন না। তখন বিতর্ক বন্ধ এবং অন্যদিন তা পুনরায় অনুষ্ঠিত হবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অতপর নির্ধারিত দিনের আগেরদিন আবার তাকে গ্রেফতার করা হয়। সম্ভবত: সেসময় এমন কোন আইন বলবৎ ছিল না যার দরুণ তাকে শাস্তি দেওয়া যেত। 

১৬৫৫ খৃষ্টাব্দের ৫ই অক্টোবর বিডলকে সিসিলিতে নির্বাসিত করা হয়। তাকে জানান হয় বাকি জীবন তাকে সেন্ট মেরি ক্যাসলে (Castle of St. Mary) বন্দী অবস্থায় কাটাতে হবে এবং তাকে বার্ষিক ১০০ ক্রাউন ভাতা দেয়া হবে। সেখানে কারাবন্দি থাকা কালে বিডল একটি কবিতা লিখেছিলেন। তার কিছু অংশ- 

'গুপ্ত সভার বৈঠক বসল, বিচারক নির্ধারিত হল, 
মানুষ আরোহণ করল ঈশ্বরের সিংহাসনে
এবং তারা একটি বিষয়ের বিচার করল
যা শুধু একা তারই (ঈশ্বরের) শোভা পায়;
একজন ভাইয়ের বিশ্বাসকে তারা বলল অপরাধ 
এবং তারা ধ্বংস করল চিন্তার মহৎ স্বাধীনতা।'

এসময় টমান ফারমিন অতীতের মত বিডলকে অর্থ সাহায্য করেছিলেন। ফলে তার কারাগারে জীবনযাত্রা কিছুটা আরামদায়ক হয়ে উঠেছিল। ইতিমধ্যে বিডলের প্রতি সহানুভূতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। কারাগারে যতই দিন অতিবাহিত হতে থাকল তার জনপ্রিয়তা তত বেশি বাড়তে থাকল। তার মুক্তির ব্যাপারে সরকারের উপর চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৬৫৮ খৃষ্টাব্দে তিনি মুক্তি লাভ করেন। 

কারাগার থেকে বাইরে আসার পর পরই বিডল জনসভা করতে শুরু করেন। এসব সভায় তিনি ঈশ্বরের একত্ব সম্পর্কে এবং ত্রিত্ববাদের অসারতা বিষয়ে বাইবেল থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে যুক্তি-ব্যাখ্যা দিতেন। এসব জনসভা এক পর্যায়ে প্রার্থনা সভায় পরিণত হয়। ১৬৬২ খৃষ্টাব্দে এক সভা চলার মাঝপথে বিডল ও তার কয়েকজন সঙ্গীকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের সবাইকে কারাগারে নিক্ষেপ এবং জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করা হয়। তাদের বিচার চলে। বিচারে বিডলকে একশত পাউন্ড জরিমানা করে উক্ত অর্থ পরিশোধ না করা পর্যন্ত কারাগারে রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। আর তার সহযোগী বন্ধুদের প্রত্যেককে ২০ পাউন্ড করে জরিমানা করা হয়। কারাগারে বিডলের সাথে দুর্ব্যবহার করা হয় এবং তাকে বন্দী রাখা হয় এক নির্জন প্রকোষ্ঠে। কারাগারের দূষিত বাতাস তাকে রোগগ্রস্ত করে তোলে। মাত্র পাঁচ সপ্তাহের মধ্যেই তার মৃত্যু ঘটে। ১৬৬২ খৃষ্টাব্দের ২২ সেপ্টেম্বর তাকে সমাহিত করা হয়। 

যে বছর বিডলের মৃত্যু হয়, সে বছরই কার্যকর হয় সমরূপ বিধান আইন (Acts of Uniformity)। এর অর্থ হল বিডল যে প্রকাশ্য উপাসনা সভার পদ্ধতি প্রচলন করেছিলেন তা বন্ধ করে দেয়া। এ আইনে ২,২৫৭ জন যাজককে তাদের জীবিকা চ্যুত করা হয়। তবে এটা জানা যায় যে ত্রিত্ববাদকে মেনে নিতে অস্বীকার করায় ইংল্যান্ডে এসময় ৮ হাজার মানুষ কারাগারের অন্তরালে প্রাণ হারায়। 

যাহোক, এতকিছুর পরও একত্ববাদ একটি ধর্মমত হিসেবে টিকে থাকে এবং অনুসারীদের সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। চার্চের ধর্মে মানুষকে ফিরিয়ে আনার জন্যে বল প্রয়োগ করা হয়। পরিণতিতে তা সোকিয়ানাস ও বিডলের প্রচারিত মতের অনুসারীদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। সে যুগের শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবী, চিন্তাবিদগণ যেমন মিলটন, স্যার আইজাক নিউটন ও লক এর মত ব্যক্তিরা এক ঈশ্বরে আস্থা ব্যক্ত করেন। 

সমাপ্ত।

উৎস: Jesus- A Prophet of Islam by Muhammad Ata-Ur-Rahim.
ছবি: Wikipedia, cryptschool.

২৬ ডিসেম্বর, ২০১২

Saint Paul: পলের প্রচারণা- একটি বিশ্লেষণ।


টারসাসের পল বা পৌল (Paul of Tarsus) কখনোই যীশুর সাথে সাক্ষাৎ করেননি, কিংবা যীশুর ঘনিষ্ঠ শিষ্যদের কারো সাথেই তিনি সংশ্লিষ্ট ছিলেন না। বরং যীশুর একজন বড় শত্রু হিসেবেই তিনি পরিচিত ছিলেন। তিনি ষ্টিফেন (Stephen)-কে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা সতর্ক দৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং তিনি সেই ক্রমবর্ধমান ভক্তদের একজন যিনি যীশুর অন্তর্ধানের পর তার অনুসারীদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন। 

টারসাসের পল।
পলের নিজের শিক্ষক জামালিয়েল ষ্টিফেনকে রক্ষা করার চেষ্টা করলে তাকেও পাথর ছুঁড়ে হত্যা করা হয়। জানা যায় যে পল, যাকে তখন সল (Saul) বলে ডাকা হত, সেসময় চার্চের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড অত্যাচার চালানোর জন্যে দায়ী ছিলেন। তিনি গির্জাগুলো ধ্বংস করেন এবং ঘরে ঘরে প্রবেশ করে নারী ও পুরুষদের টেনে হিঁচড়ে বের করে এনে কারাগারে হিসেবে নিক্ষেপ করেন।-(প্রেরিত ৮:১-৩) এ সম্পর্কে পল নিজেই বলেছেন- 'আপনারা শুনেছেন .....কি প্রচণ্ড অত্যাচার আমি চালিয়েছি ঈশ্বরের চার্চের উপর এবং সেগুলোকে ধ্বংস করেছি- আমি আমার স্বদেশীয় অনেকের চাইতে ইহুদী ধর্মের কাছ থেকে লাভবান হয়েছি, কারণ আমি আমার পূর্বপুরুষদের চাইতেও অনেক বেশি ধর্মান্ধ।' -(গালাতীয় ১:১৩-১৫)

পল যীশুর অনুসারীদের হুমকি প্রদান ও হত্যা চালিয়ে যেতে থাকলেন। তিনি প্রধান পুরোহিতের কাছে গেলেন এবং তার কাছে দামেশকের সিনাগগ গুলোর কাছে চিঠি লিখে দেওয়ার আবেদন জানালেন যাতে যীশুর অনুসারী কাউকে পাওয়া গেলে তা সে নারী বা পুরুষ যেই হোক না কেন, তাকে যেন জেরুজালেমে নিয়ে আসতে পারেন।-(প্রেরিত  ৯: ৪১) 
এই দামেশক যাত্রাপথে পল যীশুকে স্বপ্নে দেখেছিলেন এবং পরিণতিতে তার অনুসারীতে পরিণত হয়েছিলেন বলে কথিত আছে। 

এসব ঘটনাবলী সংঘটিত হওয়ার কিছুদিন আগে পল পোপিয়া (Popea) নাম্নি এক নারীকে বিয়ে করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এই মেয়েটি ছিলেন ইহুদীদের প্রধান ঈমামের আকর্ষণীয় ও উচ্চাকাঙ্খী কন্যা। তিনি পলকে পছন্দ করা সত্ত্বেও তার বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন ও রোমে গিয়ে অভিনেত্রী হন। 

মঞ্চ থেকে ধাপে ধাপে তার উন্নতি হতে থাকে এবং এক পর্যায়ে তিনি সম্রাট নীরোর শয্যা পর্যন্ত পৌঁছে যান। শেষপর্যন্ত তিনি তাকে বিয়ে করেন ও রোম সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞী হন। সুতরাং ইহুদী ও রোমান উভয়ের প্রতিই পলের বিতৃষ্ণ হয়ে ওঠার সংগত কারণ ছিল। মূলত: পোপিয়া কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর পল অত্যন্ত আবেগতাড়িত ও মানসিক বিপর্যয়কর অবস্থার মধ্যে ছিলেন। আর তাই ইহুদী ধর্মের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমর্থক হওয়ার পরিবর্তে তিনি তার বিরাট শত্রুতে পরিণত হন। এর পিছনে তার জীবনের এই সংকটেরই বড় ভূমিকা ছিল। 
দামেস্কের পথে পলের ধর্মান্তরিত হওয়া।
ধর্মান্তরিত হওয়ার পর পল দামেশকে যীশুর অনুসারীদের সাথে অবস্থান করেন এবং 'সরাসরি সিনাগগগুলোতে গমন করে যীশু ঈশ্বরের পুত্র' বলে প্রচার করতে থাকেন।-(প্রেরিত ৯:২০) এর ফলশ্রুতিতে তিনি সেই অত্যাচারের স্বাদ লাভ করতে শুরু করলেন যার সাথে নিকট অতীতে তিনি নিজেই জড়িত ছিলেন। তিনি যীশুকে ‘ঈশ্বরের পুত্র’ বলে আখ্যায়িত করায় তা ইহুদীদের ক্রুদ্ধ করে তুলে ছিল। যেহেতু তারা ছিল ঈশ্বরের একত্বে বিশ্বাসী। 

এরপর পল দামেশক ত্যাগ করেন। তিনি যীশুর অন্যান্য অনুসারীদের সাহচর্য সন্ধানের পরিবর্তে আরবের মরুভূমিতে গমন করেন। সেখানে তিনি ৩ বৎসর লুকিয়ে থাকেন। সম্ভবত এ নির্জনবাসেই তিনি যীশুর প্রচারিত শিক্ষার ভিত্তিতে নিজস্ব একটি রূপ তৈরির কাজ করেছিলেন। যেমন.-ইহুদী আইন প্রত্যাখ্যান। যীশু তার জীবন ব্যাপী একজন আচারনিষ্ঠ ইহুদীই ছিলেন এবং তিনি মুসার শিক্ষাকেই সর্বদা সমুন্নত রেখেছিলেন। কিন্তু পল এ সত্যকে অস্বীকার করেন। 

মরুভূমির নির্জনবাস শেষে পল জেরুজালেমে যীশুর শিষ্যদের কাছে আগমন করেন। তার আকস্মিক আগমনের ঘটনা বিস্ময় সৃষ্টির চাইতে সন্দেহ সৃষ্টি করে বেশি। পল যীশুর অনুসারীদের প্রতি যে নির্যাতন চালিয়েছিলেন, তার স্মৃতি তখনও তাদের মনে জাগরুক ছিল। একটি চিতাবাঘ কি তার শরীরের দাগ পরিবর্তন করতে পারে? যীশুর শিষ্যদের পক্ষে পলকে তাদের মধ্যে গ্রহণ করার কোন কারণ ছিল না। কেননা, তিনি যে তাদের উপর নির্যাতন চালিয়েছিলেন শুধু তাই নয়, তিনি আরো দাবি করেছিলেন যে, যীশুর শিক্ষা সম্পর্কে তিনি জ্ঞাত, অথচ তিনি তাকে কোনদিন দেখেননি ও তার সাথে কখনোই অবস্থান করেননি, এমনকি যীশুর ঘনিষ্ঠ শিষ্যদের সাথেও তার মেলামেশা ছিল না। যীশুর জীবিতকালে যারা তার ঘনিষ্ঠ সাহচর্য পেয়েছিলেন, তাদের কাছ থেকে কিছু জানা ও শেখার বদলে পল তাদের শিক্ষা প্রদান করতে চাইলেন। পল পরে গালাতীয়দের কাছে লেখা তার চিঠিপত্রে তার এ পদক্ষেপের যৌক্তিকতা বর্ণনা করে বলেন- 'ভাইসব, আমি এ মর্মে প্রত্যয়ন করছি যে, আমার দ্বারা প্রচারিত গসপেল কোন মনুষ্য রচিত নয়। আমি কোন মানুষের কাছ থেকে এটি লাভ করিনি কিংবা কেউ আমাকে এটা শিক্ষাও দেয়নি, এটি হল যীশুর প্রত্যাদেশ থেকে প্রাপ্ত।'-(গালাতীয় ১:১০-১২) 
এভাবেই পল যীশুর সাথে নিজের সম্পৃক্ততার দাবি করেন যা যীশুর সাহচর্য লাভকারী ঘনিষ্ঠ অনুসারীরা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। অবশ্য পল তাকে যে শিক্ষা দেয়া হয়েছে বলে দাবি করেন, তা স্বয়ং যীশুর মুখ থেকে তার শিষ্যদের শোনা শিক্ষার সাথে মিলিয়ে দেখা হয়নি। এটা বোঝা যায় যে তারা ধর্মান্তরের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেছিলেন এবং তার কথিত 'প্রত্যাদেশ' কে নির্ভরযোগ্য বলে গণ্য করেননি। অনেকে সম্ভবত: সন্দেহ করেছিলেন যে, তিনি যীশু অনুসারীর ছদ্মবেশে গুপ্তচর ছাড়া আর কিছু নন।

পলকে গ্রহণ করা হবে কিনা এ নিয়ে এক তিক্ত বিরোধের সৃষ্টি হয় এবং এর ফলাফল ছিল পূর্ব নির্ধারিত। এমতাবস্থায় জামালিয়েলের ছাত্র হিসেবে বার্নাবাস তার সহপাঠী পলের পক্ষে হস্তক্ষেপ ও প্রচারণা শুরু করেন। যীশুর অনুসারীদের সর্বসম্মত বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি পলকে তাদের দ্বারা গ্রহণ করান। পল অবশ্যই এ কথা উপলব্ধি করেছিলেন যে, শুধুমাত্র বার্নাবাসের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার বলেই তিনি গৃহীত হয়েছেন, নিজের প্রচেষ্টায় নয়। এর ফলে সম্ভবত: তিনি অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তাই, এ ঘটনার পরপরই তিনি টারসাসে, নিজের শহর ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অবশ্য এ কথাও জানা যায় যে তার জীবন বিপদাপন্ন হওয়ার কারণেই তিনি জেরুজালেম ত্যাগ করেছিলেন। 

এন্টিওক নগরী
নির্যাতনের কারণে যীশুর শিষ্যদের অনেকে এবং বহু অনুসারী দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েন। স্টিফেনকে হত্যার পর কিছু অনুসারী এন্টিওকের (Antioch) উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। তৎকালীন রোমান সাম্রাজ্যে রোম ও আলোকজান্দ্রিয়ার পর এটি ছিল তৃতীয় বৃহত্তম নগরী। 

এন্টিওক নগরীটি মূলত: গ্রীক সাম্রাজ্যের রাজধানী হবার পর থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসাবে বিকশিত হয়েছিল। এখানকার অধিবাসীগণ সম্পদের প্রাচুর্য্যে স্ফীত হয়ে বিলাসী জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। শীঘ্রই তাদের অধঃপতন ঘটে এবং এন্টিওক নৈতিকতাহীন জীবন-যাত্রার নগরী বলে কুখ্যাতি লাভ করে। 

এরকম একটি নগরে গায়ে শুধু কম্বল জড়ানো ক্ষুদ্র একদল আগন্তুক সহজ, সরল ও সততাপূর্ণ ঈশ্বর ভীতিপূর্ণ জীবন-যাপন শুরু করে। নৈতিকতাহীন জীবন যাপনে ক্লান্ত নগরবাসীরা তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ভিড় জমাতে শুরু করে। কিন্তু অধিকাংশ লোকের কাছেই তারা ছিল অবজ্ঞা ও উপহাসের পাত্র। তারা তাদেরকে ‘খৃষ্টান’ বলে ডাকত। সামান্য কিছু লোকের কাছে এ শব্দটি শ্রদ্ধা ব্যাঞ্জক ছিল বটে, কিন্তু অন্যদের কাছে এটি ছিল ঘৃণা ও অবজ্ঞার। এ সময় পর্যন্ত যীশুর অনুসারীরা নাজারিনি (Nazarene) নামেই পরিচিত ছিলেন। হিব্রু এ শব্দটির মূল অর্থ 'রক্ষা করা’ বা ‘প্রহরা দেওয়া।’ এ ভাবেই এ বিশেষণটি যীশুর শিক্ষার রক্ষক ও অভিভাবক হিসাবে তাদের ভূমিকার ইঙ্গিত বহন করছিল। 

এন্টিওক
এন্টিওকের ইহুদীরা দিনে তিনবার প্রার্থনা করত এবং প্রতিটি প্রার্থনায়, 'নাজারিনিদের উপর ঈশ্বরের অভিশাপ’প্রেরণ করত। ঐতিহাসিক প্রফেরী (Prophery), নাজারিনিদের জীবন-পদ্ধতিকে 'বর্বর, নতুন ও অদ্ভুত ধর্ম’ বলে বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে জেরোমের (Jerome) মতে খৃষ্টানগণ ’গ্রীক ভণ্ড ও প্রতারক’ বলে আখ্যায়িত হত। কেননা, গ্রীক মন্দিরের পুরোহিতরা যে আলখেল্লা পরিধান করতেন, তারাও সেই একই গ্রীক আলখেল্লা পরিধান করতেন। 
এ ধরনের বিরোধিতার সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও এ অদ্ভুত নবাগতদের কাছে লোকজনের আসা যাওয়া অব্যাহত ছিল এবং তাদের সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। লোকদের আগ্রহ দেখে উৎসাহিত হয়ে তখন তারা আশেপাশের পৌত্তলিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সত্যবাণী ও যীশুর শিক্ষা প্রচারের জন্যে একজন ধর্ম প্রচারককে সেখানে প্রেরণের জন্যে জেরুজালেমে খবর প্রেরণ করেন। যীশুর শিষ্যরা এ কাজের জন্যে বার্নাবাসকে মনোনীত করেন। বার্নাবাস এন্টিওক গমন করেন এবং অকল্পনীয় সাফল্য লাভ করেন। তার প্রচেষ্টায় 'বহু সংখ্যক লোক যীশুর প্রচারিত ধর্ম গ্রহণ করে'-(প্রেরিত, ১১:১৪)। 

এক বৎসর পর বার্নাবাস (Barnabas) অনুভব করলেন যে এন্টিওকের বাইরে তার কর্মকাণ্ড প্রসারিত করার সময় এসেছে। তার নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল যে এ কাজে পল তার ভাল সাহায্যকারী হবেন। তিনি টারসাস গমন করেন এবং পলকে নিয়ে ফিরে আসেন। এভাবে পল সেসব লোকের কাছেই ফিরে এলেন যারা তারই হাতে নির্যাতিত হয়েছিল। যাইহোক, পল পুনরায় বৈরিতা ও বিরোধিতার সম্মুখীন হলেন তার অতীত কর্মকান্ডের কারণে। এবারও বার্নাবাস হস্তক্ষেপ করলেন, ফলে এন্টিওকের যীশু অনুসারী সমাজে পল গৃহীত হলেন। বার্নাবাস তার সাবেক সহপাঠী পলের শুধু ভালটুকুই দেখতে পেয়েছিলেন এবং মনে করেছিলেন- যে ধর্মীয় আবেগ ও উদ্দীপনা তাকে একজন অত্যাচারীতে পরিণত করেছিল তা যদি যীশুর ধর্মীয় প্রচারের কাজে লাগান যায় তবে তিনি অসাধারণ ও অমূল্য অবদান রাখতে পারবেন।

কিন্তু যীশুর সকল অনুসারী এ দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একমত হতে পারেনি। পিটার সরাসরি পলের বিরোধিতায় অবতীর্ণ হন। পলের অতীত কার্যকলাপের কথা স্মরণ করে এ বৈরিতা আরো জোরাল হয়ে উঠার পাশাপাশি আরো দু’টি বিষয়ে মত পার্থক্য দেখা দেয়। যীশুর শিক্ষা কার কাছ থেকে গ্রহণ করা হবে এবং শিক্ষা দেয়া হবে সে ব্যাপারে তারা একমত হতে পারলেন না। পিটার মত প্রকাশ করেন যে, ইহুদীদের কাছে প্রচারিত ধর্ম পুনরুজ্জীবনের জন্যই যীশুর আগমন ঘটেছিল। সে কারণে তাঁর শিক্ষা শুধুমাত্র ইহুদীদের মধ্যেই প্রচার করা হবে। অন্যদিকে পল শুধু যে ইহুদী ও অন্যদেরসহ সকলের কাছেই ধর্ম প্রচারের পক্ষ মত প্রকাশ করেন তাই নয়, উপরন্তু বলেন যে যীশুর অন্তর্ধানের পর তিনি তার কাছ থেকে অতিরিক্ত নির্দেশনা লাভ করেছেন। তিনি আরো বলেন যে, সময় ও পরিস্থিতির দাবীর সাথে যীশুর শিক্ষার প্রয়োজনীয় সমন্বয় সাধন করতে হবে। 

বার্নাবাস উভয় পক্ষের মধ্যবর্তী অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি মত দিলেন যে তাদের শুধু সে শিক্ষাই দান করা উচিত যা যীশু শিক্ষা দিয়ে গেছেন। তবে তিনি বলেন, এ শিক্ষা তার কাছেই প্রচার করা উচিত যার এতে কল্যাণ হবে এবং যে সাড়া দেবে, সে ইহুদীই হোক আর অ-ইহুদীই হোক। বার্নাবাস ও পিটার যীশুর কাছ থেকে যে শিক্ষা লাভ করেছিলেন তাকে তারা ইহুদী ধর্মের (Judaism) অব্যাহত ও সম্প্রসারিত রূপ হিসাবেই গণ্য করতেন। তারা স্বয়ং যীশুর কাছ থেকে যা শুনেছিলেন তার সাথে পলের শিক্ষার যেখানে মিল ছিল না, সে অংশটি গ্রহণ করতে পারেননি। তারা বিশ্বাস করতেন যে পলের নয়া ধর্মমত সম্পূর্ণরূপেই তার একান্ত নিজস্ব সৃষ্টি। আলবার্ট শোয়েইটজার (Albert Shweitzer) তার 'Paul and his Interpreters' গ্রন্থে বলেছেন যে, পল কখনোই  তার গুরুর (যীশু) বাণী ও নির্দেশ প্রচার করেননি।

মনে হয়, বার্নাবাস আশা করেছিলেন যে, এ দুই চরমপন্থী নমনীয় হবেন এবং বিশেষ করে পল যীশুর অনুসারীদের সাহচর্য থেকে যীশুর শিক্ষার পূর্ণ উপলব্ধি ও রূপায়ণের মধ্য দিয়ে অর্জিত জ্ঞানের স্বার্থে নিজের ধারণা পরিত্যাগ করবেন। পলের প্রতি এ পর্যায়ে বার্নাবাসের সমর্থন যে কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা স্পষ্ট বোঝা যায়। কারণ বার্নাবাস ধর্ম প্রচারকারীদের সর্বসম্মত বিরোধিতার মুখে পলকে আশ্রয় প্রদান ও রক্ষা করেছিলেন। সম্ভবত এ কারণেই বার্নাবাসের জীবনের এ পর্যায়টি ধর্ম প্রচারকদের কর্মকাণ্ডে বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে। প্রেরিতদের কার্য্যাবলীতে বার্নাবাস ও পলের মধ্যে সম্পর্ক বিষয়ে বলা হয়েছে-
'এন্টিওকের চার্চে বার্নাবাস ও শিমোনের মত কতিপয় ধর্মগুরু ও শিক্ষক ছিলেন যাদেরকে সাইরিনের নাইজার (Niger of Cyrene) ও মানায়েনের লুসিয়াস (Lucius manaen) বলে আখ্যায়িত করা হত যাদেরকে হেরোদ দি টেট্রার্ক (Herod the Tetrarch) এবং সলের (Saul) সাথে প্রতিপালন করা হয়েছিল। যখন তারা ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা ও উপবাস করলেন তখন পবিত্র আত্মা বললেন: বার্নাবাস ও সলকে আমার সে কাজের জন্যে পৃথক কর যে কাজের জন্যে আমি তাদের আহবান করেছি।' (প্রেরিত, ১৩:১-২)
একত্রে কাজ করার জন্যে নির্বাচিত হওয়ার পর তারা বার্নাবাসের বোনের পুত্র জন মার্ককে নিয়ে যীশুর শিক্ষা প্রচারের জন্যে গ্রীস যাত্রা করেন। ইউসূফ বা যোসেফের ঔরসে জন্মলাভকারী মেরীর পুত্র জেমসকে এন্টিওকে যীশুর অনুসারীদের প্রধান নির্বাচিত করা হয়। পিটারও সেখানে থেকে যান। 
প্রচারে পল ও বার্নাবাস।
গ্রীসে আসার পর কয়েকটি স্থানে তাদের প্রতি পাথর নিক্ষেপ করা সত্ত্বেও এ দুই ধর্মপ্রচারক সামগ্রিক ভাবে সফল হন। সত্যানুসারী ব্যক্তি হিসেবে তাদের খ্যাতি দূর-দূরান্তরে ছড়িয়ে পড়ে। তারা যখন লুকাওনিয়া (Lucaonia) পৌঁছেন এবং একজন পঙ্গুকে রোগমুক্ত করেন তখন গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে,- "মানুষের ছদ্মবেশে ঈশ্বরগণ আমাদের কাছে নেমে এসেছেন। তারা বার্নাবাসকে জুপিটার (Jupiter) নামে এবং পলকে মার্কারিয়াস (Mercurius) নামে আখ্যায়িত করে। তখন জুপিটারের পুরোহিতরা..... গরু ও মালা নিয়ে তোরণ দ্বারে এল এবং সেগুলোকে জবাই করল। বার্নাবাস ও পল যখন এটা শুনতে পেলেন, তারা তাদের পোশাক ছিঁড়ে ফেলে কাঁদতে কাঁদতে লোকজনের কাছে দৌড়ে গেলেন। তারা বললেন . তোমরা এ সব কি করছ? আমরা তোমাদেরই মত সাধারণ মানুষ, আমরা তোমাদের কাছে ঈশ্বরের কথা প্রচার করতে এসেছি যিনি স্বর্গ, পৃথিবী ও সমুদ্র সহ বিশ্বমণ্ডলের সকল কিছু সৃষ্টি করেছেন।"-(প্রেরিত ১৪:১১-১৫) 
গ্রীসের অধিবাসীদের এই প্রতিক্রিয়া যদি স্বাভাবিক হয়ে থাকে তবে তা ছিল বাস্তব সমস্যার ইঙ্গিত বহনকারী যার সম্মুখীন হয়েছিলেন বার্নাবাস ও পল। একজন প্রকৃত ইহুদী যীশুর শিক্ষাকে মুসার প্রচারিত ধর্মেরই পুনর্ব্যক্ত রূপ বলে তাৎক্ষণিক ভাবে স্বীকার করবে। কিন্তু বহু মূর্তিপূজকের কাছেই সেটি নতুন ও অদ্ভুত এবং কিছুটা জটিল বলে মনে হবে। অধিকাংশ পৌত্তলিক তখন পর্যন্ত বহু ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিল। তারা মনে করত, ঈশ্বরগণ মানুষের সাথে অবাধ মেলামেশা করে, তাদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং মানব জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে ছিল তাদের একজন ঈশ্বরের অনুরূপ এবং এ অর্থে তারা যীশুকে গ্রহণ করতে সম্ভবত প্রস্তুত ছিল। যাহোক, যীশুর প্রকৃত শিক্ষা তাদের সকল ঈশ্বরকে নাকচ করে দেয় ও এক ঈশ্বরের কথা ব্যক্ত করে। বহু পুতুল পূজারির কাছেই এ কথা গ্রহণযোগ্য ছিল না। অধিকন্তু, যীশুর ধর্মশিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল আচরণ বিধি যা কেউ অনুসরণ করতে চাইলে তার জীবনধারাই পাল্টে যেত। এটা একজন ইহুদীর পক্ষেই সম্ভব ছিল, পৌত্তলিকের পক্ষে নয়। ইহুদীদের সুদখোর জাতি হিসেবে গণ্য করা হত, অ-ইহুদীদের সবাই তাদের অপছন্দ করত। 
'ইহুদী নয় এমন জনসমাজের মধ্যে ইহুদীদের প্রতি ঘৃণা এতই প্রবল ছিল যে তাদের যৌক্তিক বা প্রয়োজনীয় কিছু করতে দেখলেও যেহেতু ইহুদীরা সেটা করছে শুধু সে কারণেই জনসমাজ তা করতে অস্বীকৃতি প্রকাশ করত।'-(The Nazarene, John Toland, P-6)

এ পর্যায়ে পল গ্রীক জনসাধারণের রুচি অনুযায়ী যীশুর শিক্ষার সমন্বয় সাধন অত্যাবশ্যক বলে মনে করলেন। গ্রীস তখন ছিল রোমান সাম্রাজ্যের অংশ। রোমান দেবতা গ্রীকের দেবতাদের সঙ্গে সাদৃশ্যযুক্ত ছিলেন এবং তাদের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা ছিল গ্রীক দেবতাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের মতই একটি ধারণা। পল ইতিপূর্বে কিছুদিন রোমে কাটিয়েছিলেন এবং তিনি রোমান নাগরিক ছিলেন। সম্ভবত রোমান জীবনধারা তার নিজস্ব বিচারবোধকে প্রভাবিত করেছিল। রোমান সাম্রাজ্যের মধ্যে সাধারণ জনগণের উপর গ্রেকো-রোমান (Graeco-Roman) ধর্মের জোরাল প্রভাব সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন। এটা সুস্পষ্ট যে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে নিজেদের শিক্ষার পরিবর্তন ঘটান ছাড়া তাদের ধর্ম রীতি পরিবর্তন করা সহজ হবে না। 

অন্যদিকে বার্নাবাস জানতেন যে তার স্রষ্টার ইচ্ছা নয় যে তিনি তার আইনের এক বিন্দুমাত্র পরিবর্তন করেন। সে কারণে তিনি তার ধর্মমতের কোন পরিবর্তনের ব্যাপারে অনড় ছিলেন। খৃষ্টধর্ম প্রচারের এ পর্যায়ে বিতর্কের প্রধান উৎস অধ্যাত্ম দর্শন (Metaphysical) সম্পর্কিত ছিল না। বুদ্ধিজীবীদের সূক্ষ্ম যুক্তি, তর্ক ও চুলচেরা- বিশ্লেষণের বিকাশ আরো পরবর্তী কালের ঘটনা। বার্নাবাস ও পলের মধ্যে যে সব বিষয় নিয়ে মত পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছিল তা ছিল মানুষের প্রাত্যহিক জীবনধারা সম্পর্কিত। পল তাদের গ্রীসে আগমনের পূর্বে সেখানে প্রচলিত ও পালিত আচার প্রথার আকস্মিক পরিবর্তন ঘটাতে ইচ্ছুক ছিলেন না। তাই তিনি পশুর মাংস হালাল হওয়া সম্পর্কিত এবং পশু কুরবানি বিষয়ে মুসার বিধান পরিত্যাগের ইচ্ছা পোষণ করেন। এমনকি তিনি খতনা সংক্রান্ত ইব্রাহিমের প্রতিষ্ঠিত নিয়মও বাতিলের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। যীশুর শিক্ষার এসব দিক প্রবর্তন ও বাস্তবায়নে বাস্তব সমস্যার সম্মুখীন হওয়ার প্রেক্ষিতে পল ও বার্নাবাসের মধ্যকার ব্যবধান ব্যাপকতর হয়ে ওঠে। 
গ্রীসে কোন স্থানেই পল ও বার্নাবাস দীর্ঘদিন অবস্থান করেননি। ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যে যীশুর সামগ্রিক শিক্ষা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। এ কারণেই তারা প্রথমে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর শিক্ষা প্রদান করতেন। তাদের ইচ্ছা ছিল, পরবর্তীকালে ফিরে এসে পুনরায় তারা তাতে সংযোজন করবেন এবং আরো নির্দেশনা প্রদান করবেন। অবশ্য বার্নাবাস যীশুর সমগ্র শিক্ষা প্রচার করতে আগ্রহী ছিলেন, পল সেখানে প্রয়োজন মত প্রচারের পক্ষপাতী ছিলেন। কারণ তিনি তার নিজের যে নয়া ধর্মমত গড়ে তুলছিলেন, সেখানে সেগুলোর আর প্রয়োজন ছিল না। যাহোক, তারা যখন জেরুজালেম প্রত্যাবর্তনের করলেন, তখন উভয়ে পৃথক যুক্তিতে নিজ নিজ কর্মকাণ্ডের যৌক্তিকতা প্রদর্শন করেন। তারা যৌথভাবে যে সব অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়েছিলেন তারও বর্ণনা দেন। তা সত্ত্বেও তাদের মত পার্থক্য বহাল রইল এবং শেষপর্যন্ত তাদের পথ পৃথক হয়ে গেল।
’তাদের মধ্যে বিরোধ এত তীব্র হয়ে ওঠে যে তারা একে অপরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান এবং এর পর বার্নাবাস মার্ককে নিয়ে সাইপ্রাস সফরে যান যেটি ছিল বার্নাবাসের জন্মভূমি।’-(প্রেরিত, ১৫:৩৯-৪০)

অবশ্য এ ব্যাপারে অনেকে অনেক কথা বলেন, কারো কারো মতে- পল জন মার্ককে ভবিষ্যতে কোন সফরে সাথে নেয়ার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেন। অন্যদিকে বার্নাবাস তাকে সফর সঙ্গী করার ব্যাপারে চাপ সৃষ্টি করেন। আর এ কারণেই তাদের মধ্যে বিভেদ দেখা দেয়। যাইহোক না কেন, জন মার্কের বার্নাবাসের সফর সঙ্গী হওয়ার ঘটনা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে তার ও মামা বর্ণাবাসের ধর্ম বিশ্বাস একই ছিল। পল যে তাকে সঙ্গী রাখতে চাননি, সম্ভবত এটা তার অন্যতম কারণ। বাইবেলে এ বিষয়ের পর বার্নাবাসের কথা আর উল্লেখ করা হয়নি বললেই চলে। 
কৌতূহলের বিষয় যে প্রেরিতদের কার্য-এ উল্লেখিত আছে, 'পবিত্র আত্মা' (Holy Ghost) বার্নাবাসকে মনোনীত করলেও পল তাকে প্রত্যাখ্যান করেন। মনে হয়, পল উপলব্ধি করেছিলেন যে, তার আর বার্নাবাসের প্রয়োজন নেই। তার প্রথম দিনকার দিনগুলোতে যখন জানাজানি হয়ে যায় যে তিনি যীশুর সঙ্গী ছিলেন না তখন কেউ তার উপর আস্থাশীল ছিল না। কিন্তু যখন তিনি খৃষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করলেন, তখন বিষয়টি আগের মত থাকেনি। তার খ্যাতি এতটাই হয়েছিল যে তিনি কোন ভীতি বা প্রত্যাখ্যানের আশঙ্কা ছাড়াই নিজের ধর্মমত প্রচার করতে পারবেন বলে উপলব্ধি করেছিলেন। এমনকি যীশুর শিক্ষা বহির্ভূত কিছু প্রচার করলে বার্নাবাস তার বিরোধিতা করতে পারেন, এ ধরনের সম্ভাবনাকেও তিনি আমলে আনেননি।

উপরন্তু পল ছিলেন একজন রোমান নাগরিক। তিনি অবশ্যই রোমানদের ভাষা শিখেছিলেন। সম্ভবত তিনি গ্রীক ভাষাতেও কথা বলতেন। কারণ তিনি যে এলাকায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেখানকার সরকারী ভাষা ছিল গ্রীক। তিনি গ্রীসের খৃষ্টান সম্প্রদায়ের কাছে যেসব পত্র লিখেছিলেন তা অবশ্যই তাদের মাতৃভাষায় লেখা হয়েছিল। এর অর্থ তিনি গ্রীস ও সম্ভবত ইতালিতেও ভাষার কোন সমস্যা ছাড়াই সফর করেছিলেন। অন্যদিকে বার্নাবাস এ দু’ভাষার কোনটিই বলতে পারতেন না। জন মার্ক গ্রীক ভাষা জানতেন। তাই, গ্রীসে বার্নাবাসের প্রথম ধর্মপ্রচার সফরে তিনি তার দোভাষী হিসেবে কাজ করেছিলেন। বার্নাবাস যদি সেখানে একা যেতেন, তাহলে তার কথা কেউ বুঝতে বা তিনিও কারো কথা বুঝতে পারতেন না। সুতরাং মার্কের সাথে সফরে যেতে পলের অস্বীকৃতি ছিল বার্নাবাস যাতে তার সাথে ভ্রমণে না যান, সেটা নিশ্চিত করার প্রয়াস। দু’জনের পৃথক হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে ম্যাক গিফার্ট (Mc Giffert) তার  'A History of Christianity in the Apostolic Age' গ্রন্থে বলেছেন-
'বার্নাবাস, ইহুদী নয় এমন জনসমাজের মধ্যে যার ধর্ম প্রচারের কাজ জেরুজালেমে স্বীকৃতি লাভ করেছিল.... তার ফিরে আসা, নিজকে পৃথক করে নেয়া ছিল এক আশ্চর্য ঘটনা। সকল প্রকার আইন থেকে খৃষ্টানদের মুক্তিদানের পলের মতবাদের প্রতি বার্নাবাসের পূর্ণ সমর্থন ছিল না.....প্রেরিতদের কার্য-এর লেখক, পল ও বার্নাবাসের মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদের ঘটনাকে মার্ককে নিয়ে মত-পার্থক্যের পরিণতি বলে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু প্রকৃত কারণ নিহিত ছিল আরো গভীরে......খৃষ্টান হিসেবে পলের জীবন শুরুর পর গোড়ার দিকের বৎসরগুলোতে পলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও অন্তরঙ্গ যিনি ছিলেন, তিনি বার্নাবাস। বার্নাবাস জেরুজালেমের চার্চের সদস্য ছিলেন......তার বন্ধুত্ব পলের জন্যে ছিল অনেক বেশি কিছু এবং নিঃসন্দেহে তা খৃষ্টানদের মধ্যে পলের সুনাম ও প্রভাব বৃদ্ধিতে ব্যাপক অবদান রেখেছিল। খৃষ্টানদের মনে যখন পলের নির্যাতনের স্মৃতি জাগরূক ছিল সেই দিনগুলোতে বার্নাবাস পলের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন।' 
পলের প্রতি বার্নাবাসের মনোভাবের পরিবর্তন ঘটেছিল পলের সাথে সফরকালে অর্জিত অভিজ্ঞতার কারণে। পল তার মত পরিবর্তন করবেন এবং যীশুর একজন প্রকৃত অনুসারী হবেন বলে বার্নাবাস যে আশা পোষণ করেছিলেন, প্রথম সফরেই তা অপসৃত হয়েছিল। সম্ভবত, শুধুমাত্র ইহুদীদের উদ্দেশ্যে প্রচারিত ধর্ম প্রচারের চেষ্টার অসারতা এবং তা যে ফলপ্রসূ হচ্ছে না, তা উপলব্ধি করতে পেরে বার্নাবাস তা ত্যাগ করেন। তবে তার আগে পর্যন্ত জনসাধারণের মধ্যে যীশুর ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে সম্ভাবনা পরিলক্ষিত হয়েছিল। কিন্তু সে চেষ্টা চালানোর পর বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায় যে, তা সম্ভব ছিল না। সে তুলনায় এন্টিওকে তার সাফল্য ছিল অনেক বেশি। কেননা সেখানে জনসাধারণ যীশুর অনুসারীদের কাছে আগমন করে খৃষ্টধর্মে তাদের ধর্মান্তরিত করার অনুরোধ জানাচ্ছিল। পক্ষান্তরে তিনি ও পল গ্রীসে গিয়ে সেখানকার অধিবাসীদের খৃষ্টান হওয়ার আহবান জানাচ্ছিলেন। 
বার্নাবাস সাইপ্রাসের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার পর পল যা শুরু করেছিলেন, তা অব্যাহত রাখেন। তখন তার সাথে এমন অনেক খৃষ্টান ছিলেন যারা দীর্ঘদিন পলকে স্বীকার করে নেননি। পল তার দুর্বল অবস্থান সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। এ সময় তাকে যীশুর প্রেরিত ধর্ম প্রচারকারী বলে আখ্যায়িত করা হয়। অবশ্য তাতে যীশু জীবদ্দশায় তার সাথে তার সাক্ষাৎ না হওয়ার সত্যটির কোন পরিবর্তন হয়নি। যদিও তিনি যীশুর কাছ থেকে বাণী লাভ করেছেন বলে দাবি করেছিলেন, তা সত্ত্বেও জনসাধারণের মধ্যে ধর্ম প্রচারকালে যীশুর সঙ্গী ছিলেন, এমন একজন ব্যক্তিকে তার সাথে রাখা প্রয়োজন ছিল। কারণ একজন প্রত্যক্ষদর্শী সঙ্গী তার জন্যে এক অমূল্য সমর্থন এবং তার যুক্তির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিশ্বাসযোগ্যতা প্রদান করত। তিনি পিটারকে তার সাথে যোগ দিতে রাজি করান। 
এই দু’ব্যক্তি, যারা অতীতে ছিলেন পরস্পর ঘোর বিরোধী, তারা কি করে, একত্র হলেন তা এক বিস্ময়কর ব্যাপার। যাহোক, পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছিল। অনেকেই পলকে একজন খৃষ্টান হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন এবং তাকে আর সম্ভাব্য গুপ্তচর বা অত্যাচারী হিসেবে গণ্য করতেন না। গ্রীক দার্শনিক সেলসাস (Celsus) বলেন- 'এন্টিওকে উভয়ের মধ্যে মত পার্থক্যের মূল কারণ ছিল পিটারের জনপ্রিয়তায় পলের ঈর্ষা। কিন্তু পরে পলের নিজের খ্যাতি বৃদ্ধি পাওয়ায় পিটারের প্রতি তার ঈর্ষার অবসান ঘটে। তা ছাড়া খৃষ্টানদের প্রতি নিপীড়নও সম্ভবত তাদের দু’জনকে এক করার পিছনে কাজ করেছিল। সে সময় খৃষ্টানদের প্রতি রোমান ও তাদের সমর্থক ইহুদীদের নিপীড়নের মাত্রা ভয়াবহ রকম বৃদ্ধি পেয়েছিল। ইতিপূর্বে যীশুর কথিত বিচার ও ক্রুশবিদ্ধ করার সময় চাপের মুখে অথবা আশু বিপদের সম্মুখীন হওয়ার কারণে যীশুর সহচর থাকার কথা অস্বীকার করে পিটার তার দুর্বলতার পরিচয় দিয়েছিলেন। এখন তিনি যীশুর বাণীর কিছুটা রদবদলের ব্যাপারে পলের পদক্ষেপ আগ্রহভরে সমর্থন করলেন। আর তা সম্ভবত এ কারণে যে এ ধরনের পরিবর্তন নিপীড়নকে হ্রাস করবে।' 
সেই দিনগুলোতে পরিস্থিতি ছিল এমনই যে যীশুর বাণীর পরিবর্তন ও তাতে নতুন কিছু সংযোজন করা হল যাতে তা অ-ইহুদীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়, উপরন্তু তা যেন দেশের কর্তৃপক্ষের প্রতি আক্রমণাত্মক বা হুমকি জনক না হয়। বিশ্ব-জগতের স্রষ্টার বিধানের সাথে সংগতিপূর্ণ হোক বা না হোক, শাসকগণ ও তাদের আইনের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়ে প্রণীত এই নীতির কথা পিটারের প্রথম পত্রে (প্রেরিত ৩:১৩-১৮) বিধৃত হয়েছে-
'ঈশ্বরের দোহাই, তোমরা মানুষের আইন মান্য কর: সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালী হিসেবে রাজা বা গভর্নর যারই সে আইন হোক না কেন, তোমরা তা মান্য কর যা অন্যায়কারীদের শাস্তিদানের জন্যে এবং শাসকদের প্রশংসার জন্যে প্রণয়ন করা হয়েছে, তাতে রয়েছে কল্যাণ। এটাই ঈশ্বরের ইচ্ছা। এ ভাবেই তোমরা মূর্খ ব্যক্তিদের মূর্খতা থেকে মুক্ত হতে পারবে। তোমরা তোমাদের স্বাধীনতাকে বিদ্বেষ পরায়ণতার জন্যে ব্যবহার করনা। ঈশ্বরের ভৃত্য তোমরা সকল মানুষকে সম্মান কর। মানুষকে ভালোবাস। ঈশ্বরকে ভয় কর। রাজাকে সম্মান কর। ভৃত্যগণ! অন্তরে ভীতিসহ প্রভুর অনুগত হও, শুধু ভাল ও সৎ লোকদের প্রতিই নয়, অন্যায়কারীদের প্রতিও।'
পল পিটারের সাথে পশ্চিমে ভ্রমণ করেছিলেন। আন্তরিকতা ছাড়া ও বার্নাবাসের প্রভাব দমন করে তারা নয়া ধর্মমত এবং আপোসরফা হিসেবে সংযোজনকৃত আচরণ ও ব্যবহার বিধির ক্ষেত্রে তিনি অবশ্যই স্বল্প প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিলেন। রোমিয় (১৬:২০-২১)-এ তিনি বলেছেন- 'হ্যাঁ, এভাবেই আমি গসপেল প্রচারের জন্যে সংগ্রাম করেছি, যেখানে খৃষ্টের নাম নেই, যাতে আমাকে অন্য কারো ভিত্তির উপর নির্মাণ করতে না হয়। বরং যেমনটি লিপিবদ্ধ রয়েছে- যাদের কাছে তিনি বাণী প্রচার করেননি তারা দেখবে এবং তারা যা শোনেনি তা বুঝতে পারবে।'
পল যদি যীশুর প্রকৃত শিক্ষা প্রচার করতেন তা হলে অন্য ব্যক্তির ভিত্তি ঠিক তার মতই হত। তারা উভয়ে একই কাঠামো নির্মাণে নিয়োজিত ছিলেন। যে সব লোক প্রথমবারের মত পলের মুখ থেকে যীশু বা খৃষ্টের কথা জানতে বা শুনতে পারছিল, তাদের পক্ষে যেসব ধর্মপ্রচারকারী তখনও যীশুর শিক্ষা ধারণ করেছিলেন, তার সাথে তুলনা করে দেখা সম্ভব ছিল না। কার্যত: তারা যা জানছিল, তা ছিল শুধু পলের শিক্ষা। 
পল তার নিজের বাণী প্রচারের ক্ষেত্রে আপ্পোলোস নামক আলেকজান্দ্রিয়া থেকে আগত এক জ্ঞানী ইহুদীর ব্যাপক সাহায্য লাভ করেন। তিনি জনসাধারণের মধ্যে পলের মতবাদ প্রচারে বিপুল সাফল্য লাভ করেন। বলা হত, পল চারা রোপণ করেছিলেন এবং আপ্পোলোস (Appolos) তাতে পানি সিঞ্চন করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত এমনকি আপ্পোলোসও পলের সকল ধর্মীয় উদ্ভাবন মেনে নিতে পারেননি এবং বার্নাবাসের মত তিনিও তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। 
পল যীশুর শিক্ষা থেকে ক্রমশই বেশি করে দূরে সরে যেতে থাকেন এবং তিনি স্বপ্নে যার সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন বলে দাবি করেন সেই খৃষ্টের প্রতি অধিকতর হারে গুরুত্ব আরোপ করতে শুরু করেন। যীশুর ধর্মের পরিবর্তন সাধনের অভিযোগে যারা তাকে অভিযুক্ত করেন তাদের বিরুদ্ধে তার যুক্তি ছিল এই যে, তিনি যা প্রচার করছেন তার মূল হল যীশুর কাছ থেকে সরাসরি লাভ করা প্রত্যাদেশ। এটি পলকে ঐশী কর্তৃত্ব প্রদান করেছিল। এই কর্তৃত্বের সুবাদে তিনি দাবি করেন যে গসপেলের আশীর্বাদ শুধু ইহুদীদের জন্য নয়, বরং যারা এতে বিশ্বাস করবে তাদের সকলের জন্যেই। উপরন্তু তিনি একথাও বলেন যে, মুসার ধর্মের চাহিদাসমূহ শুধু অপ্রয়োজনীয়ই নয়, তা ঈশ্বরের কাছ থেকে তার কাছে সরাসরি যে প্রত্যাদেশ হয়েছে তার বিরোধীও বটে। তিনি বলেন, আসলে এগুলো অভিশাপ। এভাবে পল যীশুর অনুসারীদের সহ সকল ইহুদীকেই ক্রুদ্ধ করে তুললেন। কারণ তিনি তাদের উভয় ‘নবী’রই বিরুদ্ধাচরণ করছিলেন। এ থেকে বোঝা যায় যে কেন তিনি শুধু তাদের মধ্যেই তার শিক্ষা প্রচার করছিলেন যারা ইহুদীদের ঘৃণা করত এবং যীশুর সত্য সম্পর্কে অবগত ছিল না। 
পল এই বক্তব্য দিয়ে তার মতবাদের যৌক্তিকতা প্রমাণের চেষ্টা করেছেন- 'ভাইসব, তোমরা কি জান না (আমি বিধান সম্পর্কে জ্ঞাত লোকদের উদ্দেশ্যে বলছি) যে একজন মানুষ যতদিন জীবিত থাকে ততদিনই তার উপর আইনের নিয়ন্ত্রণ থাকে। স্ত্রীলোকের ক্ষেত্রে যার স্বামী আছে সে তার স্বামী জীবিত থাকা পর্যন্ত আইন দ্বারা তার সাথে বন্ধনে আবদ্ধ। কিন্তু যদি তার স্বামী মারা যায় তখন মৃত স্বামীর সাথে তার আইনের বন্ধন শিথিল হয়ে যায়। যদি তার স্বামী জীবিত থাকে এবং সে অন্য লোকের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় তখন তাকে ব্যভিচারিণী বলে আখ্যায়িত করা হবে। কিন্তু যদি তার স্বামী মারা যায় তা হলে উক্ত আইন থেকে সে মুক্ত। তখন সে অন্য কোন লোককে বিবাহ করলেও সে আর ব্যভিচারিণী হবে না। সুতরাং, হে আমার ভ্রাতৃগণ! খৃষ্টের মৃত্যুর সাথে সাথে তার আইনও তোমাদের ক্ষেত্রে মৃত। তার অর্থ তুমি অন্যকে বিবাহ করতে পার, এমনকি সে ব্যক্তিকেও যিনি মৃত্যু থেকে পুনরুজ্জীবিত হয়েছেন যাতে আমরা ঈশ্বরের জন্যে ফলপ্রসূ কাজ করতে পারি।'
তার এ বক্তব্য থেকে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, তিনি যীশু ও 'খৃষ্ট’ এর মধ্যে একটি পার্থক্য সৃষ্টি করেছেন। তার যুক্তি অনুযায়ী যে আইন যীশু ও তার অনুসারীদের মধ্যে বন্ধন সৃষ্টি করেছিল, তিনি মারা যাওয়ার পর তার প্রয়োজন ফুরিয়ে গিয়েছিল। তারা আর যীশুর সাথে নয়, খৃষ্ট এর সাথে 'বিবাহিত' যিনি অন্য এক আইন এনেছেন। সুতরাং এখন যীশু নয়, খৃষ্টের অনুসরণ প্রয়োজন। যদি কেউ যীশুর শিক্ষা মান্য করে তাহলে সে বিপথে চালিত হচ্ছে। এ যুক্তির সাথে তিনি প্রায়শ্চিত্ত ও প্রতিকারের নিজস্ব ধর্মমতের সংযোজন করে যে মতবাদ প্রণয়ন করেন তা যীশু কখনোই শিক্ষা দেননি। এটা এক বিরাট সাফল্য এনে দেয় যেহেতু অন্য কথায়-এতে প্রচার করা হচ্ছিল যে, একজন মানুষ তার যা খুশি তাই করতে পারে এবং সে তার কৃতকর্মের জন্যে অবশ্যম্ভাবী পরিণতির সম্মুখীন হবে না। যদি সে দিনের শেষে এ কথাটি বলে- 'আমি খৃষ্টে বিশ্বাস করি।' যাহোক, যে মূল ভিত্তির উপর পলের যুক্তি নির্ভরশীল ছিল তা ছিল মিথ্যা। কারণ যীশু ক্রুশবিদ্ধও হননি কিংবা পুনরুজ্জীবিতও হননি। পলের প্রায়শ্চিত্ত ও প্রতিকারের মতবাদ ছিল ভ্রান্তিপূর্ণ।
পলের যুক্তি প্রদর্শনের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি দেখা গিয়েছিল। এর ফলে শুধু যীশুর শিক্ষারই পরিবর্তন ঘটেনি, উপরন্তু তা যীশু কে ছিলেন সে বিষয়ে জনসাধারণের ধারণারও সম্পূর্ণ পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। তিনি লোকের মনে একজন 'মানুষ' থেকে একটি ধারণায় পর্যবসিত হন। কিছু লোক যীশুর পৃথিবীতে অবস্থান কালেই তার বাণী ও অলৌকিক কর্মকাণ্ডে বিস্ময় বিমুগ্ধ হয়ে তার উপর ঈশ্বরত্ব আরোপ করে। কেউ কেউ তাকে নবীদের চেয়ে বেশি কিছু বিবেচনা করত। তার কোন কোন শত্রু গুজব ছড়িয়ে দিয়েছিল যে তিনি ছিলেন 'ঈশ্বরের পুত্র।' এর উদ্দেশ্য ছিল ঈশ্বরের সাথে তাকে সংশ্লিষ্ট করার জন্যে গোঁড়া ইয়াহুদীদের তার বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলা। এ ভাবে তার অন্তর্ধানের আগেই তার প্রকৃত সত্তার একটি অলৌকিক রূপদান এবং তার উপর ঈশ্বরত্ব আরোপের একটি প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। খৃষ্টের এই কাল্পনিক রূপ যা যীশুর প্রচারিত শিক্ষাকে হয়তো বাতিল করে দেয়ার শক্তি রাখত, তা স্পষ্টতই কোন সাধারণ ব্যাপার ছিল না এবং অনিবার্যরূপে বহু মানুষই ঈশ্বর সম্পর্কে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। এ ভাবে এই কাল্পনিক রূপই উপাসনার বস্তু হয়ে দাঁড়ায় এবং ঈশ্বরের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে যায়। 
গ্রীসে পলের প্রচার।
একজন মানুষ থেকে যীশুর খৃষ্টরূপী ঈশ্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার এ ঘটনা গ্রীস ও রোমের বুদ্ধিজীবীদেরকে পল ও তার অনুসারীদের প্রচারিত ধর্মকে তাদের নিজস্ব দর্শনের সাথে অঙ্গীভূত করতে সক্ষম করে। তারা ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসী ছিলেন। এখন পলীয় চার্চের ধর্মমতের 'পিতা ঈশ্বর' ও 'ঈশ্বরের পুত্র' এর সাথে ত্রিত্ববাদের জন্য তাদের প্রয়োজন ছিল শুধু 'পবিত্র আত্মা' যোগ করার। কাল পরিক্রমায় এ দুটি চিত্র একটিতে অঙ্গীভূত হল এবং ত্রিত্ববাদের জন্ম ঘটল। এ সময় গ্রীসে বিরাজিত দার্শনিক ধারণা তাতে যেমন রং চড়াল, তেমনি গ্রীকভাষাও এ শিক্ষার প্রকাশকে প্রভাবিত করে এর অর্থকে সীমাবদ্ধ করে দিল। গ্রীক ভাষা গ্রিকদের দর্শনকে ধারণ করতে সক্ষম ছিল, কিন্তু যীশু যা বলেছিলেন তা ধারণের মত বিশালতা বা গভীরতা এ ভাষার ছিল না। তাই যীশুর একজন প্রকৃত অনুসারী যদি স্বচ্ছন্দে গ্রীক ভাষা বলতেও পারতেন, তবুও এ ভাষাতে যীশুর শিক্ষার সার্বিকতা প্রকাশ করতে পারতেন না। এ জন্য তাকে বার বার উপযুক্ত শব্দের সন্ধান করতে হত। যখন হিব্রু গসপেলগুলো গ্রীকে ভাষান্তরের সময় এল, এ সীমাবদ্ধতা তখন স্থায়ীরূপ গ্রহণ করল এবং শেষ পর্যন্ত হিব্রুতে লিখিত সকল গসপেল যখন ধ্বংস হয়ে যায়, তখন তা মোহরাঙ্কিত হয়ে গেল। 
যদিও পল প্রকৃত পক্ষে যীশুর ঈশ্বরত্ব বা ত্রিত্ববাদ প্রচার করেননি, তার প্রকাশ ভঙ্গি এবং তার কৃত পরিবর্তন এ উভয়ই ভ্রান্ত ধারণার জন্য দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছিল এবং ইউরোপে তার ধর্মমত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ প্রস্তুত করে দিয়েছিল। এটি সেই ধর্মমত যা মেরীকে 'ঈশ্বরের মাতা' হিসেবে গণ্য করার মত এক অসম্ভব স্থানে তাকে অধিষ্ঠিত করেছিল।
পল এ কথা বলে তার কর্মকাণ্ডকে যৌক্তিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন যে যীশু যে সময়ে বাস করতেন এবং তিনি নিজে যে সময়ের মানুষ-এ দু'য়ের মাঝে কোন সম্পর্ক নেই। সময়ের পরিবর্তন হয়েছে এবং এখন যে পরিস্থিতি বিরাজিত তাতে যীশুর শিক্ষা পুরোনো হয়ে গেছে, তা আর অনুসরণযোগ্য নয়। নৈতিকতার একটি নতুন ভিত্তি খুঁজে পাওয়ার জন্যে তখন এ যুক্তি প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। পল তখনকার বিরাজমান পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেছিলেন এবং তখন প্রয়োজন অনুযায়ীই তিনি তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের শিক্ষা প্রদান করেছিলেন- আমার সব কিছুই আইন সম্মত, কিন্তু আমি কারো ক্ষমতার অধীন নই। -(১ করিনথীয় ৭-১২)
পল শুধু মুসা ও যীশুকে প্রত্যাখ্যানই করেননি, তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন যে তার আইন তিনি নিজেই। স্বাভাবিক ভাবেই বহু লোকই সে কথা মেনে নেয়নি। পল তাদের জবাব দিয়েছেন এ বলে- যদি আমার মিথ্যার মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের সত্য ও গরিমা প্রকাশিত হয়ে থাকে তা হলে আমি কেন বিচারে পাপী হব?-(রোমীয় ৩:৭-৮)
পলের এই বক্তব্য থেকে দেখা যায়, যদিও তিনি জানতেন যে তিনি মিথ্যা বলছেন, পল মনে করতেন তর উদ্দেশ্যের জন্যে এটা যৌক্তিক। কিন্তু এটা বুঝা মুশকিল যে মিথ্যার মধ্য দিয়ে সত্য কিভাবে প্রকাশিত হয়। এ যুক্তি অনুযায়ী মানুষ যীশু যদি ঈশ্বরের সমকক্ষ হন তাতে যীশুর অনুসারীদের আপত্তির কি আছে?
পলের গ্রেফতার।
পল এমন এক ধর্মের জন্ম দিয়েছেন যা বিভিন্ন পরস্পর বিরোধী উপাদান দ্বারা পরিবেষ্টিত। তিনি ইহুদীদের একত্ববাদ গ্রহণ করেন এবং তার মধ্যে পৌত্তলিকদের দর্শন যুক্ত করেন। এই অদ্ভুত মিশ্রণের মধ্যে ছিল কিছু যীশুর শিক্ষা এবং কিছু ছিল যা পল খৃষ্টের কাছ থেকে লাভ করেছিলেন বলে দাবি করেছিলেন। পলের ধর্মতত্ত্বের ভিত্তি ছিল সমকালীন গ্রীক চিন্তাধারার আলোকে ব্যাখ্যাকৃত তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। যীশুর উপর ঈশ্বরত্ব আরোপ করা হয়েছিল এবং তার পবিত্র মুখে বসিয়ে দেয়া হয়েছি প্লেটোর (Plato) কথা। প্রায়শ্চিত্তের তত্ত্ব ছিল পলের মস্তিস্ক প্রসূত যা যীশু ও তার শিষ্যদের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল। এগুলোর ভিত্তি ছিল ‘আদি পাপ’, ‘ক্রুশবিদ্ধকরণ’ ও 'পুনরুজ্জীবন’-এ বিশ্বাস যার কোনটিরই কোন বৈধতা ছিল না। এ ভাবেই একটি কৃত্রিম ধর্মের সৃষ্টি হয়। তার নাম খৃষ্ট ধর্ম যা গাণিতিকভাবে উদ্ভট, ঐতিহাসিক ভাবে মিথ্যা, তবুও মনস্তাত্ত্বিক ভাবে আকর্ষণীয়। ধর্মীয় উন্মাদনা নিয়ে পল ধর্মের যে জমকালো মন্দির তৈরি করেছিলেন তার সবদিকেই তিনি দরজা নির্মাণ করেছিলেন। এর ফল হয়েছিল এই যে যারা প্রথমবারের মত তার খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করেছিল, তারা ইহুদী বা গ্রীক যাই হোক না কেন, তারা যখন সেই মন্দিরের মধ্যে প্রবেশ করল, তাদের এ ধারণাই দেয়া হল যে তারা সেই দেবতার প্রতিই শ্রদ্ধা নিবেদন করছে যাকে তারা সব সময় উপাসনা করে আসছে। পলের ভ্রান্ত ধারণার উদ্ভব ও প্রতিষ্ঠা লাভের পর যারা ভাবত যে তারা যীশুর অনুসরণ করছে, তারা তাদের অজান্তে যীশুর পরিবর্তে পলের ধর্মমতের অনুসারীতে পরিণত হল। 
হেইনজ জাহরনট (Heinz Zahrnt) পলকে 'যীশুর গসপেলের বিকৃতকারী' বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। ওয়ারডি (Werde) তাকে বর্ণনা করেছেন 'খৃষ্টান ধর্মের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা' হিসেবে। উভয় বক্তব্যেরই কিছু যৌক্তিকতা আছে। ওয়ারডি বলেন, পলের কারণে- ঐতিহাসিক যীশু ও চার্চের খৃষ্টের মধ্যে অসামঞ্জস্য এত বেশি প্রকট যে তাদের মধ্যে কোন ঐক্য খুঁজে পাওয়া একেবারেই কঠিন। শনফিল্ড (Schonfield) লিখেছেন-গোঁড়ামির (Orthodoxy) পলীয় ধর্মমত খৃষ্টান ধর্মের ভিত্তিরূপে গণ্য হয় এবং বৈধ চার্চ ধর্মবিরোধী বলে পরিত্যক্ত হয়।
এভাবে বার্নাবাস পরিগণিত হন প্রধান ধর্ম বিরোধীরূপে।

৫৭ সালর দিকে পল জেরুজালেম এসেছিলেন দরিদ্র খৃষ্টানদের জন্যে কিছু অর্থ সাহায্য নিয়ে। তারপর তিনি খৃষ্টানদের জন্যে প্রার্থনার জন্যে মন্দিরে যান। জেমস অবশ্য তাকে সতর্ক করেছিলেন যে তার জীবন সংশয় ঘটতে পারে, যেহেতু তিনি খৎনা করা সম্পর্কে ইহুদিদের শরীয়ত বিরুদ্ধ কথা বলেছেন। পল তার কথাকে অগ্রাহ্য করেন।

পলের শিরোচ্ছেদ।
শলোমনের মন্দিরে পৌঁছিলে জনতা তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছে আঁচ করে পল কৌশলে নিজেকে রোমান কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেন। তখন ইহুদিরা তাকে নিয়ে যাবার পথে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। রোমান কর্তৃপক্ষ তা জানতে পেরে রাতের আঁধারেই তাকে কায়সারিয়ার পথে রওনা করিয়ে দেয়। পল সেখানে দু'বৎসর জেলে রইলেন। তারপর ৫৯ সনে নুতন শাসক এলে তার কেসটি সচল হয়। গভর্নর তাকে জেরুজালেমে ফিরিয়ে নিয়ে তার কেসের সুরাহা করতে চাইলে পল তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং একজন রোমান হিসেবে তার অধিকার ও মর্যাদার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। সুতরাং তাকে রোমে পাঠান হয়।

পল রোমে পৌঁছেন ৬০ সনে এবং দু'বৎসর গৃহবন্দী থাকেন। এরপর কিভাবে রোমে পল মারা গিয়েছিলেন সেবিষয়ে যথেষ্ট তথ্য নেই। তবে ইগনেটিয়াসে লিখেছেন যে তিনি শহীদ হয়েছিলেন। ৬০ সনের মাঝামাঝিতে নীরোর শাসনামলে পল ও পিটারকে রোমে হত্যা করা হয়; পলকে শিরোচ্ছেদের মাধ্যমে এবং পিটারকে উল্টো ক্রুসবিদ্ধ করে। ইতিপূর্বে জেরুজালেমের চার্চকে গুড়িয়ে দিয়ে পিটারকে বন্দী করা হয়েছিল।
পলের খৃষ্টধর্ম গ্রীস হয়ে ইউরোপে প্রসারিত হয়েছিল। পলীয় চার্চ অত:পর রোমান ক্যাথলিক চার্চ নামে আখ্যায়িত হয়। 

সমাপ্ত।

উৎস: Jesus- A Prophet of Islam by Muhamed Ata-Ur-Rahim.
ছবি: Wikipedia, biblicalarchaeology, livius, numisology.