pytheya.blogspot.com Webutation

২৮ জানুয়ারী, ২০১৩

Baha-ul-lah: বাবীবাদ থেকে বাহাই ধর্মমতের বিকাশ।

বাহাউল্লাহ বর্তমান ইরানের তেহরানের মাজান্দারান নগরে ১২ই নভেম্বর, ১৮১৭ সনে এক উচ্চ সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রকৃত নাম মির্জা হুসেইন আলী নূরী। নিজেকে নবী হিসেবে ঘোষণা করার পর তিনি 'বাহাউল্লাহ' এই আরবী উপাধিটি ধারণ করেন, যার অর্থ 'গ্লোরী অফ গড' বা খোদার মহিমা। তার অনুসারীরা দাবী করেন তিনি ইব্রাহিমের শেষ বয়সে বিবাহ করা স্ত্রী কাটুরার বংশজাত। তার পিতা ছিলেন মির্জা বুজুর্গ (Mírzá Buzurg) এবং মাতা খাদিজা খানম (Khadíjih Khánum)। মির্জা বুজুর্গ প্রথমে ফতেহ আলী শাহ কাজর এর দ্বাদশ সন্তান ঈমাম-ভার্দি মির্জার প্রধানমন্ত্রী (Vizier) ছিলেন। অত:পর তিনি বুরুজার্ড (Burujird)ও লরেস্তান (Lorestan)এর গভর্নর নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে ১৮৩৪ সনে শাহ-এর মৃত্যুর পর তার পুত্র মুহম্মদ শাহ ক্ষমতায় এলে তিনি পদচ্যূত হন। 

শিরিন অব বাহা, আক্কা।
বাল্যকাল থেকেই বাহাউল্লাহ খুবই সেন্সিটিভ ও আধ্যাত্মিক ধরণের ছিলেন। শিক্ষা জীবনের শুরুতে তিনি তৎকালীন তেহরানে প্রচলিত বিভিন্ন জ্ঞান আহরণ করেন। বড় ভাইয়ের বিবাহের সময় তার 'Puppet Show' বা 'পুতুল নাচ' দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। তিনি লক্ষ্য করলেন শো শেষে পাপেটারগণ সকল পাপেট বা পুতুলগুলোকে বাক্সবন্দী করল। এই দৃশ্য যুবক বাহাউল্লাহকে জাগতিক মোহ থেকে মুক্ত করল। তিনি সুফীবাদে দীক্ষিত হলেন এবং অচিরেই সুফীদের মধ্যে বিশেষ খ্যাতি লাভ করলেন। 

পিতা মির্জা বুজুর্গ এর মৃত্যুর পর তৎকালীন মন্ত্রী হাজী মির্জা আকাসী বাহাউল্লাহকে একটি সরকারী পদ গ্রহণের জন্যে অনুরোধ করেন, বাহাউল্লাহর অস্বীকৃতিতে তা পরিত্যক্ত হয়। এসময় মন্ত্রী বাহাউল্লাহর নিজস্ব সম্পত্তি মাজান্দারান নগরের নূরী গ্রামের একটা অংশ হুকুম দখল করতে চাইলেন। কিন্তু বাহাউল্লাহ তা রাষ্ট্রের কাছে বিক্রী করতে অস্বীকৃত হলে মন্ত্রী মির্জা আকাসী ও তার মধ্যে এক বড় ধরণের তিক্ততার সূত্রপাত হল।

শিরিন অব বাব, হাইফা।
১৮৩৫ সনে, ১৮ বৎসর বয়সে বাহাউল্লাহ তেহরানের এক মহৎ ব্যক্তির কন্যা আছিয়া খানমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৮৪৯ সনে, ৩২ বৎসর বয়সের সময় তিনি আবারও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তার বিধবা চাচাত বোন ফাতিমা খানম এর সাথে। অবশ্য ১৮৬৩ সনের কিছু পূর্বে তিনি বাগদাদে অবস্থান কালীন সময়ে আরও একটা বিবাহ করেছিলেন। এইসব স্ত্রীর গর্ভে তার সর্বমোট ১৪টি সন্তান জন্মলাভ করে, এদের ১০টি ছিল পুত্রসন্তান। অন্যদিকে বাহাউল্লাহর পুরো পরিবারের মধ্যে কেবলমাত্র ১ম স্ত্রী আছিয়া খানম ও তার সন্তানগণ যথাক্রমে মির্জা মেহেদী, বাহাইয়া খানম ও আব্দুল বাহাই পবিত্র পরিবারভূক্ত বলে গণ্য।

এদিকে ১৮৪৪ সনে সিরাজ নগরের ২৫ বৎসর বয়স্ক সৈয়দ মির্জা আলী মুহম্মদ নামক এক ব্যক্তি বাব (Bab) বা গেট (Gate) উপাধি ধারণ করে নিজেকে প্রতিজ্ঞাত মেহেদী বলে দাবী করলেন। বাব ঘোষণা করলেন তিনিই শেষ নন, তারপরে আসবেন 'প্রতিজ্ঞাত জন' যার কথা পাক কিতাবসমূহে আছে, যিনি পৃথিবীতে খোদায়ী রাজ্য স্থাপন করবেন। বাব তার লেখাসমূহে জানিয়েছিলেন যে, প্রতিজ্ঞাত জনের আগমন শীঘ্রই হবে। এ কারণে তার কোন উত্তরাধিকারী থাকবে না, যতক্ষণ না তিনি আসেন। তবে তিনি তার পরে তার আন্দোলন চালিয়ে যাবার জন্যে সাধারণ নেতা হিসেবে মির্জা ইয়াহিয়া (Mírzá Yahyá) নামক এক ব্যক্তিকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। বাব তার অনুসারীদের এ নির্দেশও দিয়েছিলেন যে, যখন সেই প্রতিজ্ঞাত জন আসবেন তখন যেন তারা তাকে অনুসরণ করে। 

বাহাই টেম্পল সিডনি।
বাহাউল্লাহ সর্বপ্রথম বাবের কথা শুনেছিলেন ১৮৪৪ সনে, যখন তার বয়স ২৭ বৎসর। এসময় তার সাক্ষাৎপ্রার্থী হয়ে বাবের নিকট থেকে মোল্লা হুসেইন নামক এক ব্যক্তি এসেছিলেন। এই ব্যক্তি তাকে বাবের কথা এবং তার দাবীর বিষয়টি জানিয়েছিলেন। বাহাউল্লাহ বাবের দাবীর বিষয়টি মেনে নিয়েছিলেন এবং একজন বাবী হিসেবে তেহরান থেকে নিজ প্রদেশ নূরে ফিরে বাবী আন্দোলনকে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেবার কাজে মনোনিবেশ করেছিলেন। লোকালয়ে তার পরিচিতি তাকে খুব সহজে মানুষের কাছে পৌঁছুতে সাহায্য করেছিল।তিনি শুধু প্রচারেই নয়, অনুসারীদের সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিও নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। 

১৮৪৮ সনে বাহাউল্লাহ খোরাসানে বাবীদের এক সম্মেলনে যোগদান করেন। সেখানে ৮১জন বাবী নেতা ২২ দিনের জন্যে একত্রিত হয়েছিলেন। ঐ সম্মেলনে বাবীদের মধ্যে যারা ইসলামিক আইন মেনে চলতে চায় ও যারা মনে করে বাবের বাণী একটি নূতন খোদায়ী দিকনির্দেশনার নির্দেশ, এ দু’য়ের মাঝে বিষয়টির উপর দীর্ঘ আলোচনা চলেছিল। বাহাউল্লাহ বাবের দিকটি সমর্থন করেন এবং ভোটাভুটিতে জয়লাভ করেন। এই সম্মেলনেই তিনি 'বাহা' উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। 

১৮৪৮ সনের শেষদিকে বাবী সম্প্রদায় ও কাজার সরকারের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হলে বাহাউল্লাহ নির্যাতিত বাবীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্যে তেহরান থেকে মাজান্দারানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। কিন্তু তিনি সেখানে যাবার আগেই আটক ও কারাবন্দী হলেন।১৮৫০ সনে বাবী আন্দোলন পারস্যের বিভিন্ন প্রদেশে ছড়িয়ে পড়লে বাবী ও মুসলিমদের মধ্যে দাঙ্গার সূত্রপাত হল। এরই ফলশ্রুতিতে ঐ সনেই বাবকে বন্দী করে তিবরিজের উন্মুক্ত ময়দানে জনসম্মুখে গুলি করে হত্যা করা হল। তার লাশ তার অনুসারীরা প্রথমে তেহরানে ও পরে ইজ্রায়েলের হাইফাতে নিয়ে গিয়ে সমাহিত করে। এটি বর্তমানে শিরিন অব বাব নামে পরিচিত।

লোটাস টেম্পল দিল্লী।
এদিকে বাবের এই হত্যার প্রতিশোধ নিতে তেহরানের একদল বাবী, আজিমের নেতৃত্বে তৎকালীন ইরানের বাদশাহ, শাহ নাসের আল দীন শাহকে হত্যার এক ষড়যন্ত্র করে এবং ১৫ই অগাস্ট তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করলেও তারা সফল হতে পারেনি। এ সময় শাহকে হত্যার পরিকল্পনার দায়ে অনেক বাবীকে হত্যা ও আটক করা হয়। বাহাউল্লাহ সহ বেশ কিছু বাবী নেতাকে তেহরানে শিয়াচল (Síyáh-Chál) নামক এক ভূ-গর্ভস্থ অন্ধকুপে (Bláck Pit) আটক রাখা হয়। এই অন্ধকূপে বাহাউল্লাহ অমানুষিক নির্যাতন ভোগ করেছিলেন। এই কারাগারে বন্দীরা বেশীদিন বাঁচত না, আর যারা বেঁচে থাকত, তারা আসলে তাদের মৃত্যুকেই কামনা করত সর্বদা। মৃত্যুর আদেশ পাওয়া বা এমনিতেই সেখানে মারা যাওয়াটা তাদের কাছে ছিল সৌভাগ্যের বিষয়। এই অন্ধকূপের কারাকক্ষে বন্দীকে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে কোমর, দু’হাত ও দু’পা অতি ভারী লৌহ শিকলে আবদ্ধ করে স্যাঁতসেতে মেঝেতে নিজ মল-মূত্রের মাঝে শয়নে বাধ্য করা হত। ফলে অচিরেই বন্দীর কোমরে ও দু’হাত-পায়ে ঘাঁয়ের সৃষ্টি হত। চির অন্ধকারাচ্ছন্ন হওয়ায় এক বন্দীর দু’গজ সামনেই যে অপর বন্দী রয়েছে তার কাতরানীর শব্দ শোনা ছাড়া তাকে দেখার সৌভাগ্য কখনও একে অপরের হত না। অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত, প্রভাবশালী ও ধনী পরিবারের সদস্য হওয়ায় বাহাউল্লাহর পরিবার কারারক্ষীদেরকে উচ্চ অঙ্কের পারিতোষিকের দ্বারা তার জন্যে খাদ্য ও অন্যান্য বস্তু সরবরাহে সক্ষম হয়েছিল।

বাহাই মন্দির ইলিয়ন, USA
শিয়াচলের অন্ধকূপে চার মাস আটক থাকার পর বাহাউল্লাহকে রুশ দূতাবাসের চাপে সরকার মুক্তি দিতে বাধ্য হল। কেননা ইতিমধ্যে আজিম, শাহকে হত্যার পরিকল্পনার কথা স্বীকার করে সকল দায়দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল। এদিকে সরকার তাকে মুক্তি দিলেও তার মাতৃভূমি পারস্যে তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করল। ফলে শুরু হল বাহাউল্লাহর ৪০ বৎসরের নির্বাসন জীবন।

বাহাউল্লাহ বলেন তেহরানের শিয়াচল বা অন্ধকূপের ঐ বন্দী জীবনে তার বেশকিছু অতিপ্রাকৃতিক অভিজ্ঞতা হয়। দিব্য-দর্শনে তার নিকট এক স্বর্গীয় হুরীর আগমন হয়, যে তাকে অবহিত করে যে তিনিই সেই প্রতিজ্ঞাত জন যার সত্ত্বর আগমন সম্পর্কে বাব ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন। 

বাহাউল্লাহকে রুশ দূতাবাস তাদের দেশে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ না করে ৮ই এপ্রিল, ক্ষত-বিক্ষত, অসুস্থ্য শরীর নিয়ে ১৮৫৩ সনে চলে এলেন বর্তমান ইরাকের বাগদাদ নগরে। এই প্রাচীন নগরীটি তখন ছিল অটোম্যান সাম্রাজ্যের অধীন। এদিকে বাহাউল্লাহকে বাগদাদে নির্বাসিত করা হয়েছে জানতে পেরে মির্জা ইয়াহিয়া সেখানে যাবার মনস্থ করলেন। শাহকে হত্যার পরিকল্পণা ব্যর্থ হবার পর ব্যাপকভাবে বাবীদেরকে ধরপাকড়ের সময় তিনি আত্মগোপন করেছিলেন। যাহোক, এসময় অন্যান্য বাবীরাও যারা পারস্যে বিশেষভাবে নির্যাতিত হচ্ছিল, তারাও এখন একে একে বাগদাদে বাহাউল্লাহর চারিপাশে এসে ভীড় করল।

মির্জা ইয়াহিয়া বাগদাদে এসে বাবী সম্প্রদায়ের মাঝে বাহাউল্লাহর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালালেন এবং সম্প্রদায়কে দু’ভাগে বিভক্ত করে ফেললেন। নিজ সম্প্রদায়ের মাঝে নিজেকে বিরোধের উৎস হিসেবে দেখতে পেয়ে বাহাউল্লাহ একাকীত্বের জীবন বেঁছে নিলেন এবং পরিবারের ভার তার ভ্রাতা মির্জা মূসার হাতে অর্পণ করে, একজন মাত্র সাথীসহ কুর্দিস্থানে চলে গেলেন। বাহাউল্লাহ বাগদাদের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত সুলাইমানিয়া শহরের নিকট কুর্দিস্থানের পাহাড়ের দিকে গমন করেছিলেন।

বাহাই টেম্পল, ডয়েসল্যান্ড।
দু’বৎসর বাহাউল্লাহ কুর্দিস্থানের পাহাড়ে বসবাস করেছিলেন। তিনি আসলে সেখানে একজন সাধকের জীবন-যাপন করেছিলেন, তার পোষাক ছিল দরবেশ সুলভ; আর তিনি নাম ধারণ করেছিলেন দরবেশ মুহম্মদ-ই-ইরানী। কোন একসময় কেউ একজন তার একাকীত্বের জীবন-যাপন লক্ষ্য করে, যা স্থানীয় সূফী সমাজের মধ্যে ব্যাপক কৌতুহলের সৃষ্টি করেছিল। তারপর যখন তিনি আগতদের দর্শণ দিতে শুরু করলেন, তখন তিনি তার শিক্ষা ও জ্ঞানের জন্যে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করলেন। নকসীবান্ধা, কাদেরিয়া ও খালিদিয়ার নেতাগণ যথাক্রমে শায়খ উসমান, শায়খ আব্দুর রহমান ও শায়খ ইসমাইল প্রমুখ তার উপদেশ চাইতেন। এই সময়ে নির্জনে বাহাউল্লাহ বেশকিছু উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।

এদিকে বাগদাদে মির্জা ইয়াহিয়ার দূর্বল নেতৃত্বের কারণে বাবী সম্প্রদায় ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়তে লাগল। এসময় বাহাউল্লাহর পরিবারসহ কিছু বাবী দিকনির্দেশনার জন্যে বাহাউল্লাহকে খুঁজে ফিরতে থাকে। তারপর যখন দরবেশ মুহম্মদ নামধারী একজন লোকের পাহাড়ে বসবাসের সংবাদ আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ল, তখন বাহাউল্লাহর পরিবার তাকে বাগদাদে ফিরে আসার জন্যে বিনীত অনুরোধ করল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯শে মার্চ, ১৮৫৬ সনে দু’বৎসর কুর্দিস্থানে কাটানোর পর তিনি বাগদাদে ফিরে এলেন।

বাগদাদে ফিরে বাহাউল্লাহ বাবী সম্প্রদায়কে ভগ্নহৃদয় ও বিভক্ত দেখতে পেলেন। তার অনুপস্থিতে মির্জা ইয়াহিয়ার স্বৈরাচারী পলিসি ও কার্যকরী যোগ্য নেতৃত্ব দানের অক্ষমতাই এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। মির্জা ইয়াহিয়া বাবের পরিস্কার নির্দেশের বিরুদ্ধে তার দু’জন বিধবা স্ত্রীকে বিবাহ করেছিলেন; শাহকে দ্বিতীয়বার হত্যা প্রচেষ্টার পর নূর প্রদেশের বাবীদেরকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত রেখে তিনি আত্মগোপন করেছিলেন; এমনকি তার নেতৃত্বের বিরোধিতাকারীদের প্রতি তিনি ত্রাস সৃষ্টিও করেছিলেন যা সঙ্কটকে আরো ঘনীভূত করেছিল।

এ কারণে বাগদাদে ফিরে বাহাউল্লাহ বাবী সম্প্রদায়কে সংগঠিত করতে আত্মনিয়োগ করলেন। ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং লেখনীর দ্বারা বাবী ধর্ম সম্পর্কে তাদের মাঝে নূতন উপলব্ধি ও প্রেরণার সৃষ্টি করলেন। কিন্তু তিনি তার লক্ষ্য ও তিনি যে বাবের সেই প্রতিজ্ঞাত জন, এ বিষয়টি সম্পূর্ণ উহ্য রাখলেন। তথাপি শীঘ্রই তিনি বাবীদের মাঝে এবং সরকারী কর্তৃপক্ষের নিকট চিহ্নিত হয়ে গেলেন আগামীদিনের বাবী নেতা হিসেবে। এসময় তিনি সরকারী কর্মকর্তা ও সুন্নী আলেমদের নিকট থেকে সহানুভূতি লাভ করেছিলেন। 

বাহাই-রিদভ্যানের উদ্যান, বাগদাদ। 
নগরীতে বাহাউল্লাহর উঠতি প্রভাব এবং প্রতিদ্বন্দ্বী পারস্যিয়ান বাবী সম্প্রদায় শীঘ্রই মনোযোগ আকর্ষণ করল ইসলামিক আলেমগণ ও পারস্যিয়ান সরকারের, যারা বাহাউল্লাহ ও বাবীদের প্রতি চরম শত্রুভাবাপন্ন ছিলেন। পারস্যিয়ান সরকার বাহাউল্লাহকে বহিস্কার করার জন্যে অটোম্যান সরকারকে অনুরোধ করলেন। কিন্তু অটোম্যান সরকার তা প্রত্যাখ্যান করে বাহাউল্লাহকে স্পর্শকাতর সীমান্ত এলাকা থেকে অটোম্যান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনষ্টানটিনোপলে সরে আসাটা সমস্যার আশু সমাধান বলে বিবেচনা করলেন।

সরকারী নির্দেশের পর, ১৮৬৩ সনের ২১শে এপ্রিল বাহাউল্লাহ বাগদাদ ত্যাগ করলেন এবং বাগদাদের নিকটবর্তী নাজিবিয়া উদ্যানে প্রবেশ করলেন। বর্তমানে এটির নাম 'বাহাই-রিদভ্যানের উদ্যান'। বাহাউল্লাহ ও তার সঙ্গীরা কনস্টানটিনোপলে যাত্রার পূর্বে সেখানে ১২ দিন অবস্থান করেছিলেন। ঐ সময়ই বাহাউল্লাহ তার সঙ্গী, ক্ষুদ্র এক দলের নিকট একজন 'খোদার দূত' (Messenger of God) হিসেবে তার উদ্দেশ্য ও অবস্থান ঘোষণা করেন। এ কারণে বাহাই সম্প্রদায়ের নিকট এই সময়কালটা বড়ই তাৎপর্যপূর্ণ এবং তারা এর স্মরণে ১২ দিন ধরে ঐ উদ্যানে 'রিদভ্যানের উৎসব' (Festival of Ridván)পালন করে থাকে। 

বাহাউল্লাহ যখন দাবী করেছিলেন যে তিনি শিয়াচলে স্বর্গীয় অপ্সরীর দেখা পেয়েছিলেন এবং রিদভ্যানের উদ্যানে তার ঘোষনা Ayyam-i Butun বা "Days of Concealment" এর মধ্যবর্তী সময়কালকে দূতীয় গোপনীয়তার সময়কাল বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বর্ণনা করেন যে, এই সময়কালটা ছিল একটা "Set Time of Concealment"। রিদভ্যানের উদ্যানের ঘোষণা ছিল বাবী সম্প্রদায়ে একট নূতন ধাপের শুরু যা বাবীবাদ (Bábísm) থেকে পৃথক করেছে বাহাই ধর্মমত বা বিশ্বাসের (Bahá'í Faith) উত্থানকে একটি স্বতন্ত্র আন্দোলন হিসেবে।

৩রা মে, ১৮৬৩ সনে বাহাউল্লাহ পরিবার এবং অনুসারীদের এক বিরাট দল নিয়ে রিদভ্যানের উদ্যান থেকে যাত্রা শুরু করেন এবং ১৭ই অগাস্ট, ১৮৬৩ সনে কনস্টানটিনোপলে পৌঁছেন। এই যাত্রায় তিনি যে শহরেই পা রেখেছেন, সেখানেই সমাদর ও সম্মানের সাথে আপ্যায়িত হয়েছেন। এমনকি কনস্টানটিনোপলে পৌঁছিলে তিনি রাজকীয় অতিথীর মর্যাদা পেয়েছিলেন। তবে অটোম্যান কর্তৃপক্ষ কেন তাকে পারস্যে ফেরৎ না পাঠিয়ে কনস্টানটিনোপলে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তা পরিস্কার নয়। কারণটা হয়ত: রাজনৈতিক ছিল, কেননা বাহাউল্লাহ ইতিমধ্যে উদ্ভাসিত হয়েছিলেন অপরকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা সম্পন্ন একজন মানুষ রূপে।

বাহাউল্লাহর নির্বাসন পথের ম্যাপ।
যাহোক, বাহাউল্লাহ অটোম্যান কর্তৃপক্ষের সাথে কাজ করতে অস্বীকৃত হয়েছিলেন। সুতরাং সাড়ে তিন মাস কনস্টানটিনোপলে অবস্থানের পর তাকে আদ্রিয়ানোপলে যেতে আদেশ দেয়া হল। কেন সেখানে যেতে বলা হয়েছিল তাও পরিস্কার নয়। হয়ত: হতে পারে এটা পারস্য দূতাবাসের চাপ এবং বাহাউল্লাহর অটোম্যান কর্তৃপক্ষের সাথে কাজ করতে অস্বীকৃতির সমন্বিত ফলাফল।

যাইহোক, কর্তৃপক্ষের আদেশমত বাহাউল্লাহ তার পরিবার ও অনুসারীসহ ১লা ডিসেম্বর, ১৮৬৩ সনে আদ্রিয়ানোপলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন এবং ১২ই ডিসেম্বর সেখানে পৌঁছেন। এই যাত্রা ভ্রমনের ছিল না, ছিল নির্বাসনের। বাহাউল্লাহ এখানে সাড়ে চার বৎসর অবস্থান করেন। এখানে অবস্থান কালে মির্জা ইয়াহিয়া তাকে হত্যার কয়েকটি পরিকল্পনা করেন। কেননা বাবী সম্প্রদায়ে বাহাউল্লাহর উত্থান ক্রমাগত তার নেতৃত্বের অবস্থান নিম্নগামী করছিল। এই কাজে প্রথমে তিনি নিয়োগ দিয়েছিলেন স্থানীয় একজন নাপিতকে। এই নাপিত মুহম্মদ আলী ছিল ইস্পাহানের অধিবাসী। কিন্তু নাপিত মির্জা ইয়াহিয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং পরিকল্পনার কথা ফাঁস করে দেয়। পরবর্তীতে মির্জা ইয়াহিয়া ওস্তাদ মুহম্মদ আলী-ই সালমানীর সহযোগীতায় তাকে স্নানের সময় হত্যার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু এটাও ব্যর্থ হলে তিনি বিষ প্রয়োগে তাকে হত্যার প্রচেষ্টা চালান এবং আংশিক সফল হন। বিষের ক্রিয়ায় বাহাউল্লাহর স্নায়ূ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায় পরবর্তী জীবন তাকে হস্ত কস্পন (Shaking Hand) নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়। 

বাহাউল্লাহর আক্কার কারাগার।
এই ঘটনার পর ১৮৬৬ সনে বাহাউল্লাহ প্রকাশ্য নিজেকে বাবের ভাববাণীকৃত 'খোদার মনোনীত সেই ব্যক্তি' (Him Whom God Shall Make Manifest) হিসেবে ঘোষণা করলেন এবং একটি ঘোষণাপত্র লিখে মির্জা ইয়াহিয়ার নিকট পাঠালেন যাতে তার অনুসারীদেরকে প্রথমবারের মত 'বাহার সম্প্রদায়' (People of Bahá) বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। এই ঘোষণা একজন ধর্মীয় নেতা হিসেবে মির্জা ইয়াহিয়ার পদকে একেবারে নীচে নামিয়ে দিয়েছিল। স্বভাবতই মির্জা ইয়াহিয়া এর বিরোধিতায় নামলেন এবং বাবী মতাদর্শ রক্ষায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালালেন। ফলে তার অনুসারীরা অচিরেই মাইনরিটিতে পরিণত হল।

বাহাউল্লাহ তার কয়েকজন অনুসারীকে ইরাক ও ইরানের বাবীদের মাঝে তার দাবী সম্বলিত বাণী পৌঁছানোর জন্যে নির্দেশ দিলেন যারা তার বক্তব্য শুনতে পারেনি। তিনি তাদেরকে আরও বলে দিলেন তারা যেন সকল বাহাইকে একত্রিত ও পুরো বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হতে তার আদেশ জানিয়ে দেন। এই সময়কালে বাহাউল্লাহ স্বতন্ত্র্যভাবে বাহাই বিশ্বাস ও অনুশীলনী সম্পর্কে লেখার কাজে হাত দেন।

এরপর বাহাউল্লাহ তার দাবীকৃত বাহাই বিশ্বাস গ্রহণ করতে, দৃশ্যমান বিরোধগুলো নিস্পত্তিতে একত্রে কাজ কাজ করার আশ্বাস দিয়ে এবং মানুষের জন্যে এ পৃথিবীকে বেহেস্তী রাজ্য করে তোলার প্রচেষ্টায় তার সাথে শামিল হতে বিশ্বনেতৃবৃন্দ ও রাজ-রাজড়াদের প্রতি আহবান জানিয়ে দূত প্রেরণ করেন। তার প্রথম পত্র (Tablet of the Kings) প্রেরিত হয়েছিল অটোম্যান সাম্রাজ্যের সুলতান আব্দুল আজিজ ও তার সভাষদদের প্রতি।পরবর্তীতে আক্কাতে পৌঁছে তিনি যাদের নিকট পত্র প্রেরণ করেছিলেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন-

বাহাজি ম্যনসন।
১. পোপ পায়াস ৯বম।
২. ফ্রান্সের সম্রাট নেপোলিয়ান ৩য়।
৩. রূশ সম্রাট আলেকজান্ডার ২য়।
৪. প্রুশিয়ার রাজা উইলহেম ১ম।
৫. আয়ারল্যান্ড ও বৃটেনের রানী ভিক্টোরিয়া।
৬. অষ্ট্রিয়া-হাঙ্গেরীর সম্রাট ফ্রান্সিস জোসেফ।
৭. পার্স্যিয়ান সম্রাট নাসির উদ্দিন শাহ।
৮. আমেরিকার শাসক ও সেখানকার প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট।

বাবী সম্প্রদায়ে এখন বাহাউল্লাহ ও মির্জ ইয়াহিয়ার মধ্যে বিভেদ প্রকট হয়ে দেখা দিল। কোনভাবেই এই বিভক্তি দূর করার আর কোন পথ খোলা ছিল না। মির্জা ইয়াহিয়া ও তার অনুসারীরা বাহাউল্লাহকে হেয় করতে তার বিরুদ্ধে এক গুরুতর অভিযোগ এনে অটোম্যান কর্তৃপক্ষের নিকট অভিযোগ দায়ের করলেন। বাহাউল্লাহর বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্র ও স্থানীয়দের মাঝে উত্তেজনা ছড়িয়ে ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টের অভিযোগ আনা হয়েছিল। এসময় সরকার তাদের প্রতি মনোযোগ দিলেন এবং দেখতে পেলেন যে বাহাউল্লাহ এবং মির্জা ইয়াহিয়া উভয়ে এক নূতন ধর্মীয় দাবী ছড়িয়ে দিচ্ছেন যা মুসলিমদের নিকট গ্রহণযোগ্য নয়।এতে সরকার আশঙ্কা করলেন আগামীতে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও শৃঙ্খলার মারাত্মক অবনতি হতে পারে। সুতরাং কর্তৃপক্ষ তাদেরকে দোষী সাব্যস্ত করে পুনরায় তাদের উভয়কে অটোম্যান সাম্রাজ্যের দুই প্রান্তে কারাদন্ডসহ নির্বাসনে দেবার সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৮৬৮ সনের জুলাই মাসে এ সম্পর্কিত রাজকীয় ফরমান জারী হল। মির্জা ইয়াহিয়া ও তার অনুসারীদেরকে সাইপ্রাসের ফামাগুস্তা (Famagusta) এবং বাহাউল্লাহ ও তার অনুসারীদেরকে প্যালেস্টাইনের আক্কাতে (Akka) নির্বাসনের আদেশ হয়েছিল। 

বাহাই গার্ডেন আক্কা।
বাহাউল্লাহ তার পরিবার ও অনুসারীসহ আদ্রিয়ানোপল ত্যাগ করলেন ১২ই অগাস্ট ১৮৬৮ সনে সমুদ্র ও স্থলপথের এক দীর্ঘ যাত্রা শেষে ঐ বৎসরের ৩১শে অগাস্ট আক্কা এসে পৌঁছিলেন। তাদেরকে শহরের একটি দূর্গের মধ্যে একটি ব্যারাকে বন্দী রাখা হল। আর শহরের অধিবাসীদেরকে এই বলে সতর্ক করে দেয়া হল যে, এইসব বন্দীরা সাম্রাজ্যের শত্রু, খোদা ও তার ধর্মের শত্রু, সুতরাং তাদের সাথে কারও দেখা সাক্ষাৎ ও মেলামেশা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

১ম বৎসরের বন্দী জীবন বাহাইদের খুবই কষ্টে কাটল। কয়েকজন মারাও গেল, যাদের মধ্যে ছিল বাহাউল্লার ২২ বৎসরের পুত্র মির্জা মেহেদী। সে প্রার্থনা ও ধ্যানের সময় স্কাইলাইট দিয়ে নীচে পড়ে গিয়েছিল। ধীরে ধীরে কারাকর্মকর্তারা বাহাউল্লাহকে সম্মান ও বিশ্বাস করতে শুরু করলে অবস্থার উন্নতি হল। তারপর সুলতানের মৃত্যুর পর তিনি শহর ত্যাগ ও আশেপাশের এলাকায় যাবার অনুমতিও পেলেন।

১৮৭৭ থেকে ১৮৭৯ সন পর্যন্ত বাহাউল্লাহ মাজরাহির একটি বাড়ীতে ছিলেন। তারপর তার শেষ বৎসরগুলো (১৮৮৯ সন থেকে বাকী জীবন) কাটে বাহজি ম্যানসনে-আক্কার সীমান্তলগ্ন স্থানে।যদিও তিনি তখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে আটোম্যান শাসকের অধীনে কারাবন্দীই ছিলেন।

৯ই মে, ১৮৯২ সনে বাহাউল্লাহ সামান্য জ্বরে পড়েন।পরবর্তীতে তার শারিরীক অবস্থার আরও অবনতি হয় এবং ২৯শে মে, ১৮৯২ সনে তিনি পরলোকগমন করেন। তাকে বাহাজি ম্যানসনের পাশেই অন্তিম শয়নে শায়িত করা হয়।

বাহাউল্লাহ নিজেকে সকল ধর্মের বিশ্বাসীদের নিকট 'প্রতিজ্ঞাত জন' হিসেবে তুলে ধরেছেন (এখানে উল্লেখ্য যদিও তিনি কখনও বলেননি যে, তিনি হিন্দুদের 'কলি অবতার' বা বৌদ্ধদের 'মৈত্রীয়', কিন্তু তার লেখনীর মধ্যে তা প্রকাশ পেয়েছে)। তার শিক্ষা ছিল মূলত: খোদা একজনই; সকল ধর্মই তাঁর নিকট থেকে এসেছে; এখন সময় এসেছে মানবতার স্বার্থে সকলে এক হবার, যেন খোদার অভীষ্ট পূরণে সকলে মিলে এক বেহেস্তী রাজ্য গঠন করা যায়।

সমাপ্ত।

ছবি: Wikipedia.

২০ জানুয়ারী, ২০১৩

সংক্ষিপ্ত জীবনী: মির্জা গোলাম আহমেদ কাদিয়ানী।

মির্জা গোলাম আহমেদ ১৮৩৫ সনের ১৩ই ফেব্রুয়ারী ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের গুরুদাসপুর জেলার কাদিয়ান নামক গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতা মির্জা গোলাম মুর্তজা ছিলেন একজন অভিজ্ঞ ও খ্যাতনামা চিকিৎসক। তার মাতা চিরাগ বিবি জমজ সন্তানের জন্ম দিলেও গোলাম আহমেদ ব্যতিত অপর সন্তানটি বাঁচেনি।

মির্জা গোলাম আহমেদ প্রথমিকভাবে আরবী ভাষা ও গ্রামার, কোরআন, দর্শন এবং ফারসী ভাষা শিক্ষা করেন গৃহশিক্ষক ফজলে এলাহির নিকট। অত:পর ১০ বৎসর বয়সের সময় তার শিক্ষক নিযুক্ত হন ফজল আহমেদ। আর ১৮-১৯ বৎসর বয়সের সময় তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেন গুল আলী শাহের নিকট।

মির্জা গোলাম আহমেদ।
বাল্যকাল থেকেই মির্জা গোলাম আহমেদ খুবই সাধারণ ছিলেন। জাগতিক কোন বস্তু তাকে আকর্ষণ করত না। তিনি খুব অন্যমনস্ক ও ভুলোমনা ছিলেন। প্রায়ই দেখা যেত তিনি ডান পায়ের জুতা বাম পায়ে দিয়ে দিব্যি চলাচল করছেন।

১৮৫৩-৫৪ সনের দিকে গোলাম আহমেদ পারিবারিকভাবে বিবাহ করেন হুরমত বিবিকে। এই স্ত্রী ছিলেন তার জ্ঞাতিগুষ্ঠিরই একজন। তার গর্ভে দু’টি সন্তান (মির্জা সুলতান আহমেদ ও মির্জা ফজল আহমেদ) জন্মলাভ করে। ১৮৯১ সনে গোলাম আহমেদ তার এই স্ত্রীকে ডিভোর্স দেন। অবশ্য ইতিপূর্বে তিনি ১৮৮৪ সনে দিল্লীর নবাব মীর নাসির উদ্দিনের কন্যা নূসরত জাহান বেগমকে বিবাহ করেছিলেন। এই স্ত্রীর গর্ভে গোলাম আহমেদ তিনটি পুত্রসন্তান লাভ করেন। এরা হলেন যথাক্রমে-মির্জা বশির উদ্দিন মাহমুদ, মির্জা বশির আহমেদ ও মির্জা শরীফ আহমেদ।

শিষ্য সমন্বিত মির্জা গোলাম আহমেদ।
১৮৬৪ সনে মির্জা গোলাম আহমেদ তার পিতার ইচ্ছানুসারে শিয়ালকোটে সরকারী চাকুরীতে যোগদান করেন। তার বড় ভাই মির্জা গোলাম কাদিরও একজন সরকারী কর্মচারী ছিলেন। কিন্তু ১৮৬৮ সনে তিনি তার পিতার ইচ্ছানুসারে চাকুরীতে ইস্তফা দিয়ে বাড়ী ফিরে আসেন এবং পৈত্রিক সম্পত্তি দেখাশুনোর ভার নেন।

পাঞ্জাবে গোলাম আহমেদের দাদা গুল মুহম্মদের বিশাল জমিদারী ছিল। কিন্তু তার মৃত্যুর পর তৎকালীন পাঞ্জাবের শিখ সরকার তাদের সমস্ত সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় মালিকাধীন করে নেয়। তাদের অধীনে ছিল কেবল কাদিয়ান গ্রামটি। পরবর্তীতে শিখ সরকার ঐ গ্রামটিও রাষ্ট্রীয় অধিকারভূক্ত করে নেয় এবং মির্জা পরিবারকে সেখান থেকে উৎখাত করে। কিন্তু শেষ পাঞ্জাব শিখ সরকার রণজিৎ সিং তার শাসনের শেষ বৎসরে মির্জা গোলাম মুর্তজা কাদিয়ানে ফিরে এলে রাজ্য সরকারের তরফ থেকে তাকে পাঁচটি গ্রাম ফিরিয়ে দেন। অত:পর এই ভূ-সম্পত্তি দেখাশুনোর জন্যে তিনি পুত্র গোলাম আহমেদকে চাকুরীতে ইস্তফা দিয়ে গ্রামে ফিরে আসতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন।

খাদিজা মসজিদ, জার্মানী।
যাইহোক, নিজ গ্রামে ফিরে এসে নিজের অখন্ড অবসরে গোলাম আহমেদ নিয়মিত প্রত্যাহিক এবাদতে, কোরআন পঠন ও তার তফসীর পর্যালোচনা ও অন্যান্য বিভিন্ন ধর্মীয় পুস্তকাদি পাঠে মনোযোগ এবং নানাবিধ সমাজিক কর্মকান্ডে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। তাছাড়া তিনি তার পিতার সংগৃহীত চিকিৎসা শাস্ত্রের বিভিন্ন গ্রন্থাদি পঠনেও এসময় মনোযোগী হয়েছিলেন। ঐ দিনগুলি সম্পর্কে গোলাম আহমেদ নিজেই বলেন-

During those days I was so thoroughly engrossed in books as if I was not present in the world. My father used to instruct me repeatedly to curtail my reading, for, out of sympathy for me he feared that this might affect my health."

বায়তুন নূর মসজিদ, কানাডা।
কিন্তু জমিদারী দেখাশুনোর এই কাজটি গোলাম আহমেদের আদৌ পছন্দনীয় ছিল না। কেননা, প্রায়শ:তাকে জমি সংক্রান্ত নানাবিধ ঝামেলায় কোর্ট-কাছারীতে দৌঁড়াদৌড়ি করতে হত। এ সম্পর্কে গোলাম আহমেদ বলেন- 

“I feel sorry that a lot of my valuable time was spent in these squabbles and at the same time my respected father made me supervise the affair of landlordship. I was not a man of this nature and temperament."

যৌবণে মির্জা গোলাম আহমেদ নানাবিধ শারীরিক ও মানসিক উৎকর্ষতার দিকে মনোযোগ দেন। তিনি প্রায়শ: রোজা রাখতেন। এমন কি একধারে তিনি ৬ মাস রোজাও করেছেন। ১৮৮৬ সনে তিনি সিদ্ধিলাভের জন্যে হোসিয়ারপুরে ধ্যানে (উচ্চ মার্গের প্রার্থনা ও এবাদত) বসেছিলেন, কিন্তু শারীরিক কারণে ৪০ দিবস ও রজনীর ঐ কঠোর ব্রত তিনি সম্পন্ন করতে পারেননি। তিনি বিভিন্ন ধর্মীয় পন্ডিতদের সাথে বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় বিতর্কে লিপ্ত হয়েছেন এবং নিজের জ্ঞান ও মেধার পরিচয় দিয়েছেন।

১৮৯১ সনে মির্জা গোলাম আহমেদ নিজেকে 'প্রতিজ্ঞাত মসিহ' হিসেবে ঘোষণা দেন এবং তার দাবীর পিছনে কোরআন ও হাদিসের আলোকে নানা যুক্তি ও তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেন। তার রচিত “জেসাস ইন ইন্ডিয়া” গ্রন্থটি তথ্য, তত্ত্ব, যুক্তি ও প্রমাণে ভরপুর। নি:সন্দেহে বইটি বিশ্বের সমগ্র খৃষ্টান সম্প্রদায়ের প্রতি একটা ছুঁড়ে দেয়া চ্যালেঞ্জ। বইটি পাঠে তথ্য ও যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপনায় গোলাম আহমেদের দক্ষতা এবং 'ধর্ম ও দর্শণ' সম্পর্কে তার জ্ঞানের গভীরতার প্রমাণ পাওয়া যায়। উল্লেখ্য মির্জা গোলাম আহমেদ প্রায় ১০০ টির মত গ্রন্থ রচনা করেছেন।

'প্রতিজ্ঞাত মসিহ' হিসেবে ঘোষণা দেবার পর গোলাম আহমেদ তার মতাদর্শ ছড়িয়ে দিতে সমগ্র ভারতবর্ষ চষে বেড়াতে লাগলেন। কবি আল্লামা ইকবাল তার সম্পর্কে বলেন-

In religion, he is fond of the latest
,
He stays not for long at a place; he keeps on moving;
In learning and research he does not participate,
But to the game of Mentors and Disciples, he readily succumbs;
If the trap of explanation anyone lays,
He walks into it quickly from the branch of his nest.”


মির্জা গোলাম আহমেদ নিজেকে 'প্রতিজ্ঞাত মসিহ' দাবী করলে সমগ্র মুসলিম সম্প্রদায়ের নিকট থেকে আপত্তি, নিন্দা ও তীব্র বাঁধার সম্মুখীন হলেন। এ সময় "আহলে হাদিস" পত্রিকার সম্পাদক মওলানা সানাউল্ল্যা অমৃতসরী তাকে সরাসরি মিথ্যেবাদী আখ্যায়িত করে তার পত্রিকার বিভিন্ন সংখ্যায় সেভাবেই তাকে উপস্থাপন করতে লাগলেন। এতে ৫ই এপ্রিল, ১৯০৭ সনে মির্জা গোলাম আহমেদ তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন-

বায়তুল হাদী, দিল্লী।
If I am such a big liar and impostor as you portray me in each issue of your magazine, then I will die in your life-time, for I know that the lifespan of a mischief maker and a liar is not very long and ultimately he dies an unsuccessful man, during the life of his greatest enemies and in a state of humiliation and grief.

And if I am not a liar and impostor and have been honoured by God's communication and address to me, and if I am the Promised Messiah, then I hope that, with the grace of God and in accordance with God's practice, you will not escape the punishment of the rejecters (of Truth). Thus, if that punishment which is not in man's but in God's hand, that is, fatal diseases like plague and cholera, do not afflict you during my life-time-then I am not from God."

মির্জা গোলাম আহমেদের সমাধি।

এটি প্রকাশের এক বৎসর পর, মে ২৫, ১৯০৮ সনে মির্জা গোলাম আহমেদ অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। এসময় তিনি লাহোরে ছিলেন। গোলাম আহমেদ ডায়োরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাকে অবশ্য তৎক্ষণাৎ চিকিৎসার অধীনে নেয়া হয়েছিল, কিন্তু বমি এবং ঘন ঘন পাতলা পায়খানার দরুণ দূর্বলতায় তার শারিরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। পরদিন ২৬ শে মে সকাল দশটার পর তিনি মারা যান। তার মৃত্যু সম্পর্কে তার শ্বশুর নবাব মীর নাসির উদ্দিন বলেন-


“যে রাতে হযরত মির্জা সাহেব অসুস্থ্য হয়ে পড়েন, আমি আমার জায়গায় ঘুমিয়ে ছিলাম। যখন তিনি খুবই অস্বস্তি বোধ করতে লাগলেন, আমি জেগে গেলাম। আমি উঠে হযরত সাহেবের কাছে গেলে তিনি আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “মীর সাহেব, আমি কলেরায় আক্রান্ত হয়েছি।” আমার মনে হয় এরপর পরদিন সকাল দশটার পর মারা যাবার পূর্ব পর্যন্ত তিনি আর একটি কথাও পরিস্কার করে বলতে পারেননি।”

যাহোক, মৃত্যুর পর মির্জা গোলাম আহমেদের মৃতদেহ লাহোর থেকে পাঞ্জাবের কাদিয়ানে নিয়ে আসা হয়েছিল এবং ২৭ শে মে, ১৯০৮ সনে তার দাফন কাজ সম্পন্ন হয়। এ সময় তার উত্তরসূরী হলেন তার একান্ত বিশ্বস্ত ও সার্বক্ষণিক সঙ্গী হাকিম নাসির উদ্দিন। গোলাম আহমেদের অনুসারীরা আহমেদিয়া বা কাদিয়ানী নামে পরিচিত। বর্তমানে তারা বিশ্বের অধিকাংশ দেশে তাদের কর্মকান্ড পরিচালনা করে যাচ্ছেন।

সমাপ্ত।
সংশোধিত নয়।

১ জানুয়ারী, ২০১৩

Barnabas: বার্নাবাসের গসপেল -এর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।


বার্নাবাসের গসপেল (The Gospel of Barnabas) কাল পরিক্রমায় রক্ষাপ্রাপ্ত একমাত্র গসপেল। এর রচয়িতা বার্নাবাস। যীশুর তিন বছর ব্যাপী ধর্ম প্রচারকালে তিনি অধিকাংশ সময়ই তার বিশ্বস্ত সহচর হিসেবে ছিলেন। এর ফলে তিনি যীশুর ধর্মপ্রচার স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করে সরাসরি অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান লাভ করেন যা চারটি স্বীকৃত গসপেলের রচয়িতাদের কারও ছিল না।

মথি।
প্রথম গসপেলের রচয়িতা জন মার্ক (John Mark)। এটি লিখিত হয় ৬০-৭৫ সনে। তিনি ছিলেন সেন্ট বার্নাবাসের (St. Barnabas)- এর বোনের পুত্র। যীশুর সাথে তার কখনোই সাক্ষাৎ হয়নি। সুতরাং তিনি তার গসপেলে যীশুর জীবন ও শিক্ষা সম্পর্কে যা বর্ণনা করেছেন তা তিনি অবশ্যই অন্য কারো কাছ থেকে শুনেছেন বা জেনেছেন। নিউ টেষ্টামেন্টের গ্রন্থসমূহ থেকে জানা যায় যে পল ও বার্নাবাসের সাথে বহু ধর্মপ্রচার বিষয়ক সফরে তিনি সঙ্গী হয়েছিলেন। তদুপরি তথ্যের জন্যে তিনি পলের উপর নির্ভর করেছিলেন, এটা হতেই পারে না। এখানে একমাত্র যুক্তি সংগত সিদ্ধান্ত এটাই যে মামা বার্নাবাস যীশু সম্পর্কে তাকে যা বলেছিলেন, তিনি তার গসপেলে সেভাবেই পুনরাবৃত্তি করেছেন। কেউ কেউ বলেন যে মার্ক পিটার এর দোভাষী হিসেবে কাজ করেছিলেন এবং তিনি পিটারের কাছ থেকে যা শুনেছেন তাই লিখেছেন। এটাও সত্য হতে পারে।

২য় গসপেলের রচয়িতা মথি (Matthew) ছিলেন একজন ট্যাক্স কালেক্টর (কর আদায়কারী) তথা নিম্নপদস্থ কর্মকর্তা। তিনি যীশুর সাথে ভ্রমণ করেননি।

লুক।
৩য় গসপেলের রচয়িতা লূক (Luke) এবং তার গসপেলটি অনেক পরে লিখিত। তাছাড়া মথি ও মার্কের মত তার গসপেলের বর্ণনার উৎস একই। লুক ছিলেন পলের (পৌল-Paul) চিকিৎসক এবং পলের মত তিনিও কখনো যীশুকে দেখেননি।

অন্যদিকে ৪র্থ গসপেলের রচয়িতা জনের (ইউহোন্না) উৎস ভিন্ন এবং আরো পরে ১শ’ সনের দিকে রচিত। তাকে যীশুর শিষ্য জন (John) মনে করা ভুল হবে, কারণ তিনি ভিন্ন ব্যক্তি। এই গসপেলকে যীশুর জীবনের নির্ভরযোগ্য বিবরণ বলে গণ্য করা উচিত হবে কিনা এবং তা পবিত্র গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হবে কিনা তা নিয়ে দু’শ বছর ধরে উত্তপ্ত বিতর্ক চলেছিল।

সুতরাং মার্কের গসপেল অন্য ৩টি গসপেলের অভিন্ন উৎস হতে পারে কিনা তা বিতর্কের বিষয়। পক্ষান্তরে এই ৩টি গসপেলে যে সব ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, বার্নাবাসের গসপেলে সেগুলো রয়েছে। শুধু তাই নয়, বরং বলা যায় বার্নাবাসের গসপেলে অন্যান্য গসপেলগুলোর চেয়ে যীশুর জীবনের অনেক বেশি দিক বর্ণিত হয়েছে।

জন (ইউহোন্না)।
তবে বিতর্কিত প্রেক্ষাপট যাই থাকুক না কেন, বার্নাবাস সম্পর্কে এ ঐশী নির্দেশের কথা স্মরণ যোগ্য: 'যদি সে তোমাদের কাছে আসে, তাকে স্বাগত জানাও।' কলোসিয়ানদের কাছে পত্র (Epistle to the Colossians, ৪:১০)

এদিকে বার্নাবাস কখন এ গসপেল রচনা করেন তা জানা যায় না। তবে সম্ভবত জন মার্কের (John Mark) সাথে তিনি সাইপ্রাস প্রত্যাবর্তন করার পূর্বে কিছুই রচনা করেননি। যীশুর ঊর্ধ্বারোহণের কিছু দিন পর টারসসের পল (Paul of Tarsus) এর সাথে সম্পর্কচ্ছেদের পর দু’জন সাইপ্রাস যাত্রা করেছিলেন।পল বার্নাবাসের সাথে পুনরায় ভ্রমণে অস্বীকৃতি জানালেও মার্ক তাঁর সহযাত্রী হন। তবে এ গসপেল কখন লেখা হয়েছিল তা ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ এই যে, এটি যীশুর জীবন ও কর্ম বিষয়ে একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ।

জন মার্ক।
৩২৫ সন পর্যন্ত আলেকজান্দ্রিয়ার চার্চগুলোতে বার্নাবাসের গসপেল একটি গির্জা অনুমোদিত গসপেল (Canonical Gospel) হিসেবেই স্বীকৃত ছিল। এ গসপেলটি ইরানিয়াসের (Iraneus, ১৩০-২০০ সন) লেখালেখির কারণেই প্রথম ও ২য় শতাব্দীতে বেশ আলোচিত ছিল। ইরানিয়াস যীশুর শিক্ষার মধ্যে পৌত্তলিক, রোমান ধর্ম ও প্লাটোনিক দর্শনের মিশ্রণ ঘটানোর দায়ে পলকে অভিযুক্ত করেছিলেন। আর তিনি তার মতের সমর্থনে বার্নাবাসের বাইবেল থেকে ব্যাপক উদ্ধৃতি দিতেন।

৩২৫ সনে নিকাইয়ার (Nicea) বিখ্যাত কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে ত্রিত্ববাদকে পলীয় চার্চের আনুষ্ঠানিক ধর্মমত হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই সিদ্ধান্তের একটি ফল হয় এই যে, সে সময় যে ৩শ’র মত গসপেল বিদ্যমান ছিল, সেগুলোর মধ্য থেকে চারটিকে চার্চের অনুমোদিত গসপেল হিসেবে মনোনীত করা হয়। অন্যান্য গসপেলেগুলো যার মধ্যে বার্নাবাসের গসপেলও ছিল, সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। ফরমান জারি করা হয় যে কারো কাছে অননুমোদিত গসপেল পাওয়া গেলে তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। তবে বার্নাবাসের গসপলের ক্ষেত্রে এ চেষ্টা সম্পূর্ণ ফলপ্রসূ হয়নি। আজকের দিনেও এ গ্রন্থের অস্তিত্ব বজায় থাকা থেকেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। 

পল।
ডামাসাস (Damasus, ৩০৪-৩৮৪ সন) ৩৬৬ সনে পোপ হন। তিনি ফরমান জারি করেন যে বার্নাবাসের গসপেল পাঠ করা উচিত নয়। কায়সারিয়ার বিশপ গেলাসাস (Gelasus)-এ ফরমান সমর্থন করেন। গেলাসাস ৩৯৫ সনে পরলোক গমন করেন। তিনি ‘এপোক্রাইফাল’(Apocryphal) গ্রন্থগুলোর যে তালিকা তৈরি করেন তার মধ্যে এ গসপেলটিও ছিল। এপোক্রাইফা অর্থ 'জন-সাধারণের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা'। ফলে এ গসপেলটি তখন সহজলভ্য ছিল না। তবে চার্চ নেতারা তাদের কথায় এ গসপেলের প্রসঙ্গ উল্লেখ করতেন। বাস্তবে জানা যায় যে পোপ ৩৮৩ সনে বার্নাবাসের বাইবেলের একটি কপি সংগ্রহ করেছিলেন ও তা তার ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে রেখেছিলেন। 

এ গসপেল সংক্রান্ত বিষয়ে আরো বেশ কিছু ফরমান জারি করা হয়। ৩৮২ সনে পাশ্চাত্যের চার্চগুলো এবং ৪৫৬ সনে পোপ ইনোসেন্ট কর্তৃক (Innocent) এ গসপেল নিষিদ্ধ করে ফরমান জারি করা হয়। ৪৯৬ সনে গ্লাসিয়ান ফরমানে নিষিদ্ধ গ্রন্থের তালিকায় 'Evangelium Barnabe’ও অন্তর্ভুক্ত হয়। হরমিসডাস (Hormisdas) এর ফরমানেও (যিনি ৫১৪ সন থেকে ৫২৩ সন পর্যন্ত পোপ ছিলেন) এ নিষেধাজ্ঞা পুনর্ব্যক্ত করা হয়। বি দ্য মন্টফাকো (B.De. Montfaucon, ১৬৫৫-১৭৪১) কর্তৃক প্রণীত চ্যান্সেলর সেগুইয়ার (Chancellor Seguier, ১৫৫৮-১৬৭২)- এর গ্রন্থাগারের গ্রীক পাণ্ডুলিপির ক্যাটালগে এ সকল ফরমানের উল্লেখ করা হয়েছে। 

নাইসেফোরাসের (NicephorusStichometry তেও নিম্নরূপে বার্নাবাসের গসপেলের উল্লেখ করা হয়েছে:
ক্রমিক নং ৩, বার্নাবাসের পত্রাবলী (Epistle of Barnabas) ... ১,৩০০ পংক্তি।  
আবার Sixty Books- এর তালিকাতে বার্নাবাসের গসপেলের নিম্নরূপ উল্লেখ রয়েছে:
ক্রমিক নং ১৭। প্রেরিত দূতদের ভ্রমণ ও শিক্ষা।
ক্রমিক নং ১৮। বার্নাবাসের পত্রাবলি।
ক্রমিক নং ২৪। বার্নাবাসের গসপেল। 
এই বিখ্যাত তালিকা Index নামে পরিচিত।

ফ্রান্সের রাজার গ্রন্থাগারের পাণ্ডুলিপি সমূহের ক্যাটালগ প্রস্তুতকারী কোটেলেরিয়াস (Cotelerius) ১৭৮৯ সনে প্রণীত Index of Scriptures- এ বার্নাবাসের গসপেলকে তালিকাভূক্ত করেন। অক্সফোর্ড বোদলেইয়ান লাইব্রেরির বারো সিয়ান (Baroccian) সংগ্রহের ২০৬ তম পাণ্ডুলিপিতে এই গসপেলের বর্ণনা রয়েছে। এথেন্সের একটি যাদুঘরে বার্নাবাসের গসপেলের একটি খন্ডিত কপি রয়েছে। গ্রীক ভাষায় অনুদিত এ কপিটি পুড়িয়ে ফেলা একটি গসপেলের রক্ষাপ্রাপ্ত অংশ। 
বার্নাবাস।
সম্রাট জেনোর (Zeno) শাসনামলের চতুর্থ বছরে ৪৭৮ সনে বার্নাবাসের দেহাবশেষ আবিষ্কৃত হয় এবং তার নিজের হাতে লেখা গসপেলের একটি কপি তার বুকের উপর রাখা অবস্থায় পাওয়া যায়। ১৬৯৮ সনে অ্যান্টওয়ার্প (Antwarp) থেকে প্রকাশিত Acta Sanctorum (Boland Junii, Tome II)- এর ৪২২-৪৫০ পৃষ্ঠায় এর উল্লেখ রয়েছে। রোমান ক্যাথলিক চার্চ দাবি করেছিল যে বার্নাবাসের কবরে প্রাপ্ত গসপেলটি মথির রচিত। কিন্তু এ কপিটি প্রদর্শনের কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ভ্যাটিকানের '২৫ মাইল লম্বা লাইব্রেরি' অভ্যন্তরেই এর বিষয়বস্তু অজ্ঞাত রয়ে গেল। 

বার্নাবাসের গসপেলের যে পাণ্ডুলিপি থেকে ইংরেজি অনুবাদ করা হয়েছে সেটি আদতে ছিল পোপ সেক্সটাস (Sextus, ১৫৮৯-৯০) এর কাছে। ফ্রা মারিনো (Fra Marino) নামে তার এক যাজক বন্ধু ছিলেন। তিনি ইরানিয়াসের লেখা পাঠ করে বার্নাবাসের বাইবেলের ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ইরানিয়াস তার লেখায় বার্নাবাসের বাইবেল ব্যাপকভাবে উদ্ধৃত করতেন। 

একদিন মারিনো পোপের সাথে সাক্ষাৎ করতে যান। তারা একসাথে দুপুরের আহারের পর কথাবার্তা বলতে থাকেন। এ সময় পোপ ঘুমিয়ে পড়েন। ফাদার মারিনো তখন পোপের ব্যক্তিগত লাইব্রেরির বইগুলো ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকেন। এক পর্যায়ে তিনি বার্নাবাসের গসপেলের একটি ইতালীয় পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করেন। সেটি নিজের আলখেল্লার আস্তিনে লুকিয়ে মারিনো পোপের বাড়ি ত্যাগ করেন এবং ভ্যাটিক্যান থেকে চলে যান। বিভিন্ন লোকের হাত ঘুরে পাণ্ডুলিপিটি অবশেষে Amsterdam এ এমন এক ব্যক্তির হাতে পৌঁছে যিনি ছিলেন ‘স্বনাম খ্যাত ও ক্ষমতাশালী’। তিনি গসপেলটিকে অত্যন্ত মূল্যবান বলে মনে করতেন। তার মৃত্যুর পর গসপেলটি প্রুশিয়ার রাজার এক সভাসদ জে, ই, ক্রেমারের (JE Cremer) হাতে পড়ে। ১৭১৩ সনে ক্রেমার বিখ্যাত গ্রন্থপ্রেমী স্যাভয় এর যুবরাজ ইউজিনকে (Prince of Eugene of Savoy) পাণ্ডুলিপিটি উপহার দেন। ১৭৩৮ সনে প্রিন্সের সম্পূর্ণ গ্রন্থাগারের সাথে পাণ্ডুলিপিটি ভিয়েনার হফবিবলিওথেক (Hofbibliothek)- এ পৌঁছে এবং এখনও তা সেখানেই আছে।

বিশিষ্ট ঐতিহাসিক টোলান্ড (Toland) বার্নাবাসের গসপেলের এ পাণ্ডুলিপিটি পাঠ করেছিলেন এবং গসপেল সম্পর্কে তিনি তার Miscellaneous Works-এ এর উল্লেখ করেছেন-'এটি আগাগোড়া যথার্থই এক ধর্মগ্রন্থ' (This is in Scripture Style to a hair)। তিনি আরও বলেছিলেন: 'এ পর্যন্ত প্রাপ্ত গসপেল সমূহে যীশুর কাহিনি বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। বিশেষ করে এ গসপেলটিতে এই ভিন্নতা আরো বেশি লক্ষণীয়। মূল থেকে নিকটতর ছিল বিধায় কেউ কেউ এর প্রতি অধিকতর অনুকূল ধারণা পোষণ করবে। কারণ কোন একটি ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পরই শুধু সে সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করা যায়। তাই মূল ঘটনা থেকে যতই দূরে সরে যাওয়া হয় ততই তার আবেদন হ্রাস পায়।' 
উল্লেখ্য, স্প্যানিশ ভাষায় আরেকটি গসপেল এক সময় ছিল। গসপেলের ইতালীয় পাণ্ডুলিপিটি যে সময় হফবিবলিও থেকে দেওয়া হয় সেই একই সময়ে স্প্যানিশ গসপেলটিও ইংল্যান্ডের একটি কলেজ লাইব্রেরিকে উপহার দেওয়া হয়েছিল। রহস্যজনকভাবে সে পাণ্ডুলিপিটি অন্তর্হিত হওয়ার অনেক আগে থেকেই সেটিকে ইংল্যান্ডে খুঁজে পাওয়া যায়নি। 

ক্যানন (Canon) ও মিসেস র‌যাগ (Mrs Ragg) ইতালীয় পাণ্ডুলিপিটি ইংরেজীতে অনুবাদ করেন। ১৯০৭ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস কর্তৃক তা মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়। রহস্যজনক ভাবে এর প্রায় সকল কপিই বাজার থেকে উধাও হয়ে যায়। মাত্র ২টি কপি এখন টিকে আছে। একটি রয়েছে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে এবং অন্যটি ওয়াশিংটনের লাইব্রেরি অব কংগ্রেস-এ। লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের কপিটির একটি মাইক্রো ফিল্ম কপি সংগ্রহ করা হয় এবং তা পাকিস্তানে মুদ্রিত হয়। বার্নাবাসের গসপেলের সংশোধিত সংস্করণ পুনর্মুদ্রণের লক্ষ্যে এই সংস্করণেরই কপি ব্যবহার করা হয়।

সমাপ্ত।
ছবি: Wikipedia. 

বি:দ্র: অনেকে বার্ণাবাসের গসপেলকে ভূয়া বলে উড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেন। তবে পুস্তকটি যে নবী মুহম্মদের আগমনের বহু পূর্বে লেখা তার প্রমান এ আটিকেলে রয়েছে। তবে কেন এবং কিভাবে এতে নবী মুহম্মদের এত বিবরণ এল তা গবেষণার বিষয়। আর যদি এটা ফরজারি হয় তথাপি তা হবে কোন খৃষ্টান বা 
ইহুদির কাজ, কোন মুসলিমের নয়। কারণ কিছু তথ্য তে রয়েছে যা কোন মুসলিমের জানা সম্ভব ছিল না, সর্বোপরি, মুসলিমের লেখা হলে তা কেন তাদের কারো দ্বারা উৎঘাটিত হল না।

যা হোক, বার্ণাবাসের গসপেলটিকে যদি ভূয়াও হয় তথাপি ধর্মগ্রন্থ হিসেবে বিবেচনায় অন্য তিনটি গসপেলের চাইতে মর্য়াদায় অনেক উপরে থাকবে এটি এর পান্ডিত্যপূর্ণ তথ্য ও তার উপস্থাপনা, তত্ত্বের ব্যাখ্যা ও বিন্যাস পদ্ধতির জন্যে।সত্যি বলতে কি, সেক্ষেত্রে জ্ঞানে লেখককে জেসাসের সমকক্ষ বলে গণ্য করা আদৌ অযোক্তিক হবে না।