pytheya.blogspot.com Webutation

৩ মার্চ, ২০১২

Al khidh-r: মূসা ও খিযিরের কাহিনী।


একদিন মূসা ইস্রায়েলীদের এক মজলিসে পূর্ববর্তী নবী-রসূলগণের জীবনী এবং তাদের উপর অর্পিত বিতাবসমূহ সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন। এসময় জনৈক ব্যক্তি উঠে দাঁড়িয়ে তাকে প্রশ্ন করল, ‘হে মূসা! এখন এই দুনিয়ায় মানব জাতির মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তি কে?’ 

মূসা।
ইস্রায়েলীরা ছিল অমনোযোগী, মতলববাজ ও নচ্ছার জাতি। আচমকা উদ্ভট ও অপ্রাসাঙ্গিক কথাবার্তা বলে রসূলদেরকে বিপদে ফেলা, তাদের সাথে ঠাট্টা-তামাসা করা ছিল তাদের নিত্য অভ্যাস। মূসা তা জানতেন। আর এটাও জানতেন যে তিনি কোন উত্তর না দিলে তারা প্রচার করবে- ‘ঐ মূসাটা আসলে কিছুই জানে না। তার কথা শুনে সময় নষ্ট করার কোন মানে নেই।’ আর তারপর তার মজলিসে লোকদেরকে আসতে বাঁধা সৃষ্টি করবে। আবার যদি তিনি বলেন, 'আমি'- তাহলেও তারা বলবে- 'দেখ, সে কত বড় বেওকুফ! সে নিজেকে সবার চেয়ে জ্ঞানী মনে করে।'

যাহোক, ঐ ব্যক্তির প্রশ্নের উত্তরে মূসা ক্ষণকাল চিন্তা করে দেখলেন। তারপর উত্তর দিলেন এই ভেবে যে তিনি এ যমানার নবী ও রসূল, সুতরাং তার চেয়ে জ্ঞানী আর কে হতে পারে? তাই বললেন, ‘আমি’। মূসা যা ভেবেছিলেন, তাই-ই হল। লোকেরা তার উত্তর শুনে হাসাহাসি করতে লাগল। অন্যদিকে তার এই উত্তর আল্লাহর কাছেও গ্রহণযোগ্য হল না। কেননা নবী হিসেবে তার বলা উচিৎ ছিল, ‘হয়ত: আমি, হয়ত: আমি নই। উত্তরটা কেবলমাত্র মহাজ্ঞানী আল্লাহই জানেন।’ 

ইস্রায়েলীদের হেদায়েতরত মূসা।
নবী রসূলগণও আমাদের মত সাধারণ মানুষ। সুতরাং তাদেরও ভুল হতে পারে। কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে ভুলগুলো আল্লাহ শুধরে দিতেন যেন পরবর্তীতে তাদের দ্বারা এধরনের ভুল আর না হয়, আর মানুষও তাদের কাছ থেকে শেখে। তাই অচিরেই ওহী নাযিল হল-‘হে মূসা! দু’সমুদ্রের মোহনায় অবস্থানকারী আমার এক বান্দা তোমার চেয়ে অধিক জ্ঞানী।’

মূসা লজ্জিত হলেন এবং বললেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! সে অধিক জ্ঞানী হলে, জ্ঞান লাভের জন্যে আমার তার কাছে যাওয়া উচিৎ। মেহেরবাণী করে তুমি তার সাক্ষাৎলাভের পূর্ণপথ আমায় বাৎলে দাও।’
আল্লাহ তাকে জানালেন, ‘একটি ভাজা মাছ সাথে নিয়ে সমুদ্রের তীর ধরে সফর করতে থাক। যেখানে মাছটি জীবন লাভ করে অদৃশ্য হয়ে যাবে, সেখানেই আমার ঐ বান্দার সাক্ষাৎ লাভ করবে।’ 

পরদিন মূসা যাত্রা করলেন। এই যাত্রায় ইউশায়া ইবনে নুন তার সঙ্গী ছিলেন। মূসার নির্দেশে ইউশায়া টুকরীতে করে একটা ভাজা মাছ ও কিছু ফলমূল সাথে নিয়েছিলেন।

চলতে চলতে একসময় মূসা তার সঙ্গীকে বললেন, ‘দুই সমুদ্রের সঙ্গমস্থলে না পৌঁছে আমি থামব না- আমি বৎসরের পর বৎসর চলতে থাকব।’ 

দীর্ঘসময় পথ চলাতে একসময় তারা ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। সুতরাং একস্থানে বিশ্রাম নিতে থামলেন তারা। এসময় মূসা ক্লান্তিতে একটি পাথরের উপর মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পড়লেন। ইউশায়া জেগে ছিলেন-তার ঘুম আসছিল না। একসময় তিনি হাত-মুখ ধৌত করতে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে গেলেন। 

দু‘সাগরের মিলনস্থান।
জায়গাটি ছিল দু‘সাগরের মিলনস্থান। ইউশায়া দেখলেন দু‘সাগরের দু‘দিক থেকে ঢেউ এসে দু‘দিকের পানি উপরে উঠে যাচ্ছে, আর মাঝে একটি তাকের ন্যায় সৃষ্টি হচ্ছে। কাছেই একটি ঝর্ণা সাগরের সাথে মিশেছিল। ঝর্ণাটি ছিল আইনূল হায়াত (ayn al-hayat) বা জীবন ঝর্ণা। ইউশায়া হাত-মুখ ধৌত করার মানসে ঝর্ণার দিকে এগিয়ে গেলেন। 

ইউশায়া যখন ঝর্ণার পানিতে হাত-মুখ ধুচ্ছিলেন, তখন তার সাথে রাখা টুকরীতে হাতের পানির ছিঁটা লাগল। এই পানি ভাজা মাছের গায়ে লাগতেই তাতে জীবনীশক্তির সৃষ্টি হল এবং টুকরীর মধ্যে নড়াচড়া করতে লাগল। তারপর তার চোখের সামনেই মাছটি টুকরী থেকে লাফিয়ে ঝর্ণার পানিতে পড়ল এবং ঐ পানির সাথে সুড়ঙ্গের মত পথ করে সমুদ্রের মধ্যে প্রবেশ করল।

যে পথ দিয়ে মাছটি সমুদ্রের মধ্যে প্রবেশ করল সেই পথে স্রোত বন্ধ হল এবং পানি বরফের ন্যায় জমে গেল। ফলে মাছটির চলাচলের পথ ছিদ্রের ন্যায় হয়ে রইল। দেখে মনে হচ্ছিল বরফের উপর কেউ যেন একটি গভীর দাগ কেটে দিয়েছে। ইউশায়া পুরো ঘটনাটি লক্ষ্য করলেন। তার তখনই ইচ্ছে হয়েছিল মূসাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে অদ্ভূত এই ব্যাপারটি দেখানোর। কিন্তু সদ্য ঘুমিয়ে পড়া ব্যক্তিকে জাগান ঠিক হবে না ভেবে আপততঃ তিনি কিছুই করলেন না। ফিরে এসে তিনিও একটি পাথরের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন। 

মূসা ও ইউশায়া।
মূসা ঘুম থেকে উঠলেন তারপর ইউশায়াকে জাগিয়ে তুললেন। সেসময় ইউশায়া কিন্তু ঘটনাটা মূসাকে জানাতে ভুলে গেলেন। অতঃপর রওনা হয়ে তারা যখন আরও দূরে গেলেন, তখন একসময় মূসা তার সঙ্গীকে বললেন, ‘আমাদের সকলের খাবার আন। আমাদের এই যাত্রায় আমরা তো কাহিল হয়ে পড়েছি।’

এসময় ইউশায়ার মাছের কথা মনে পড়ল। তিনি বললেন, ‘তুমি কি লক্ষ্য করেছিলে, আমি যখন এক পাথরের উপর বিশ্রাম করছিলাম তখন আমি মাছের কথা ভুলে গিয়েছিলাম? শয়তানই ওর কথা বলতে আমায় ভুলিয়ে দিয়েছিল। আমি দেখলাম মাছটা আশ্চর্যরকম ভাবে সমুদ্রে নিজের পথ করে নিল।’
মূসা বললেন, ‘আমরা তো এই জায়গারই খোঁজ করছিলাম!’ 

তারপর তারা নিজেদের পায়ের চিহ্ন ধরে ফিরে চললেন। প্রস্তর খন্ডের কাছে যখন তারা এসে পৌঁছিলেন, তখনও প্রভাত রশ্মির আলো জোরালোভাবে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েনি। দূর থেকেই তারা দেখতে পেলেন এক ব্যক্তি আপদ-মস্তক চাদরে আবৃত করে শুয়ে আছেন। মূসা আরও নিকটবর্তী হলেন। তারপর লোকটিকে ডাকাডাকি না করে তিনি তাকে সালাম জানালেন এই ভেবে যে, লোকটি যদি জাগ্রত বা অর্ধনিদ্রায় থাকেন তবে তিনি এই সালামের জবাবে উঠবেন, আর যদি গাঢ নিদ্রায় থাকেন তবে তার নিদ্রা না টুটা পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করবেন।

শায়িত এই ব্যক্তি হলেন হযরত আল খিযির (Al khidh-r)। খিযির অর্থ সবুজ-শ্যামল। তিনি যেখানেই বসতেন সেখানেই ঘাস উৎপন্ন হত। তিনি ছিলেন একজন নবী কিন্তু শরীয়তী নন- মারফতী। তাই তার কর্মধারা ছিল ভিন্নমুখী। যাহোক, সালাম পেয়ে তিনি বিষ্মিত হলেন। মনে তার প্রশ্ন জাগল, ‘এই জনমানবহীন প্রান্তরে সালাম এল কোথা থেকে?’
তিনি চাদরের ভিতর থেকে মুখ বের করে শব্দের উৎসের দিকে তাকালেন। অতঃপর সালামের উত্তর দিলেন। দেখলেন দু‘জন লোক তার খুব কাছেই দাঁড়িয়ে আছে।

তাকে জাগ্রত হতে দেখে মূসা তাড়াতাড়ি বললেন, ‘আমি মূসা।’
-‘কোন মূসা?’ -বলতে বলতে শায়িত অবস্থা থেকে উঠে বসলেন হযরত খিযির। 
‘বনি ইস্রায়েলীদের মূসা?’-মূসার সরল উত্তর। 

হযরত খিযিরের সাথে আলাপ পরিচয়ের পর মূসা ইউশায়াকে বিদায় করে দিলেন। এরপর তিনি খিযিরকে তার আকাংখা ব্যক্ত করলেন, বললেন, ‘সত্যপথের যে জ্ঞান তোমাকে দেয়া হয়েছে তার থেকে আমাকে শিক্ষা দেবে এ শর্তে কি আমি তোমাকে অনুসরণ করব?’
তিনি বললেন, ‘তুমি কিছুতেই আমার সঙ্গে ধৈর্য্য রাখতে পারবে না। যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই সেই বিষয়ে তুমি কেমন করে ধৈর্য্য রাখবে?’ 
মূসা বললেন, ‘আল্লাহ চাইলে তুমি আমাকে ধৈর্য্য ধরতে দেখবে আর তোমার কোন আদেশ আমি অমান্য করব না।’ 
তিনি বললেন, ‘আচ্ছা, তুমি যদি আমাকে অনুসরণ করই তবে আমাকে কোন বিষয়ে প্রশ্ন কোরও না, যতক্ষণ না আমি তোমাকে সেই বিষয়ে কিছু বলি।’

তারপর তারা চলতে লাগলেন। সামনে একটা নদী পড়ল। দূরে নদীর ঘাটে একটা পারাপারের নৌকা রয়েছে। তারা যখন ঘাটে এলেন, তখন মাঝিরা খিযিরকে চিনে ফেলল। সুতরাং তারা তৎক্ষণাৎ নৌকাটি তাদের দিকে এগিয়ে আনল এবং কোনরকম পারিশ্রমিক ছাড়াই তাদেরকে নৌকায় তুলে নিল।

নৌকাটিতে একটি কুড়াল ছিল। তারা যখন অপর তীরে পৌঁছিলেন তখন খিযির ঐ কুড়াল দ্বারা নৌকাটিতে একটা ফুঁটো করে দিয়ে তারপর নামলেন। এ দেখে মূসা রাগান্বিত হয়ে বললেন, ‘ওরা তোমাকে বিনা পয়সায় নদী পার করে দিল, আর তুমি তাদের নৌকাটা ফুঁটো করে দিলে? তুমি কি সওয়ারীদেরকে ডোবানোর জন্যে ওর মধ্যে ফুঁটো করলে? তুমি তো এক গুরুতর অন্যায় কাজ করলে।’
খিযির শান্ত স্বরে বললেন. ‘আমি কি বলিনি যে তুমি আমার সাথে কিছুতেই ধৈর্য্য রাখতে পারবে না?’
মূসা বললেন, ‘আমার ভুলের জন্যে তুমি আমার অপরাধ ধরবে না, আর আমার উপর বেশী কঠোর হবে না।’

তারপর তারা চলতে লাগলেন। চলতে চলতে তাদের সঙ্গে এক কিশোরের দেখা হল। খিযির তাকে কাছে ডাকলেন। তারপর তাকে মাথার উপর তুলে মুহুর্তেই আঁছড়ে ফেললেন দূরে। মূসা ছুটে গেলেন ছেলেটির কাছে। অল্পক্ষণেই সে মারা গেল। মূসা তীব্র অবিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে রইলেন খিযিরের দিকে। 

খিযিরের প্রথম কাজটি মূসার কাছে তেমন গুরুতর ছিল না। শুধু নৌকাওয়ালাদের আর্থিক ক্ষতি অথবা নৌকা পানিতে ডুবে যাওয়ার সম্ভবণা মাত্র-যা বাস্তবে পরিণত হয়নি। কিন্তু একটা নিঃস্পাপ শিশুকে হত্যা? এ ঘটনা কি একজন নবীর পক্ষে সহ্য করা সম্ভব? সুতরাং মূসা অত্যন্ত ব্যাথিত হয়ে তীব্র প্রতিবাদের সঙ্গে তাকে বললেন, ‘তুমি এক নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করলে যে কাউকে হত্যা করেনি। তুমি তো এক গুরুতর অন্যায় কাজ করলে।’ 
তিনি বললেন, ‘আমি কি বলিনি যে তুমি কিছুতেই আমার সঙ্গে ধৈর্য্য রাখতে পারবে না?’ 
মূসা বললেন, ‘এরপর যদি তোমাকে কোন বিষয়ে প্রশ্ন করি তবে তুমি আর আমাকে সাথে রাখবে না। আমার ওজর আপত্তি শেষ হয়েছে।’

একজন নবীর পক্ষে শরীয়তের বরখেলাফ করা সম্ভবপর নয়। সুতরাং মূসা এসময় খিযিরের কাছে কোন ওয়াদা করলেন না। পরবর্তীতে কোন কারণে যদি তার ধৈর্য্য ভঙ্গ হয়, তবে তাকে সঙ্গে রাখা না রাখা তার ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর ছেড়ে দিলেন। 

তারপর তারা চলতে লাগলেন। যখন তারা এক জনপদের বাসিন্দাদের কাছে পৌঁছিলেন তখন তারা ভীষণ ক্ষুধার্ত ছিলেন। তারা সেখানকার লোকদের কাছে কিছু খাবার চাইলেন। কিন্তু তারা কেউই আতিথেয়তা করতে রাজী হল না। তারপর তারা যখন সেখানকার একস্থানে বিশ্রামের জন্যে থামলেন, তখন একটা পড়ন্ত দেয়াল তাদের দৃষ্টিগোচর হল। খিযির এগিয়ে গিয়ে অত্যন্ত পরিশ্রম করে ঐ দেয়ালটিকে সোজা করে গেঁথে তুলতে লাগলেন। মুসা খিযিরকে কাজে কোনরূপ সহযোগীতা না করে বরং চুপচাপ তার কার্যকলাপ অবলোকন করতে লাগলেন। দেয়ালটি যখন দাঁড়িয়ে গেল, মূসা তাকে বললেন. ‘আমরা এদের কাছে খাবার চাইলে তারা তা দিতে অস্বীকার করল, অথচ তুমি তাদের জন্যে কত মেহনত করলে? ইচ্ছে করলে অবশ্যই এরজন্যে তুমি পারিশ্রমিক আদায় করতে পারতে।’ 
খিযির বললেন, ‘এখানেই তোমার ও আমার সম্পর্ক ছিন্ন হল। আর যে বিষয়ে তুমি ধৈর্য্য রাখতে পারনি আমি এখন তার অর্থ বলে দিচ্ছি। 

-নৌকার ব্যাপার- সেটা ছিল কয়েকজন গরীব লোকের। তারা ছিল দশ ভাই-যাদের পাঁচজন ছিল বিকলাঙ্গ। বাকী পাঁচ ভাই পালাক্রমে এই একটি নৌকা দিয়ে নদীতে তাদের জীবিকা অন্বেষণ করত। ওদের সামনে ছিল এক রাজ্য যে রাজ্যের রাজা জোরপূর্বক ঐপথে চলাচলকারী সব নৌকা ছিনিয়ে নিত। আমি ইচ্ছে করে নৌকাটায় ত্রুটি ঢুকিয়ে দিলাম, যাতে রাজকর্মচারীরা ফুঁটো দেখে নৌকাটি ছেড়ে দেয় এবং দরিদ্ররা বিপদের হাত থেকে রক্ষা পায়।

-আর ঐ ছেলেটি- তার বাবা-মা ছিল বিশ্বাসী। আমার আশঙ্কা হয়েছিল যে বড় হবার পর তার অবাধ্যতা ও অবিশ্বাস তাদেরকে বিব্রত করবে। তারপর আমি চাইলাম যেন তার পরিবর্তে ওদের প্রতিপালক ওদেরকে এক সন্তান দেন যে পবিত্রতায় হবে আরও বড় ও ভক্তি-ভালবাসায় হবে আরও অন্তরঙ্গ। সে তার পিতামাতার হকও পূর্ণ করবে।’ 

হযরত খিযির বলে চললেন, ‘আর এই দেয়ালটি শহরের দুই এতিমের। তার নীচে রয়েছে গুপ্তধন। আর ওদের পিতা ছিলেন একজন সৎকর্মপরায়ণ লোক। সেজন্যে তোমার প্রতিপালক দয়া পরবশ হয়ে ইচ্ছে করলেন যে, ওরা যেন সাবালক হয় ও তারপর ওরা ওদের ধন উদ্ধার করে।

--আমি নিজ থেকে কিছু করিনি, তুমি যে বিষয়ে ধৈর্য্য রাখতে পারনি এটাই তার ব্যাখ্যা।’

এ ঘটনা সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ-‘..যখন মূসা তার সঙ্গীকে বলেছিল,‘দুই সমুদ্রের সঙ্গমস্থলে না পৌঁছে আমি থামব না- আমি বৎসরের পর বৎসর চলতে থাকব।’ 

ওরা যখন দু’য়ের সঙ্গমস্থলে পৌঁছিল তখন ওরা ভুলে গেল (সেই) মাছের কথা যে সুড়ঙ্গের মত পথ করে সমুদ্রের মধ্যে নেমে গেল। ওরা যখন আরও দূরে গেল তখন মূসা তার সঙ্গীকে বলল, ‘আমাদের সকলের খাবার আন। আমাদের এ যাত্রায় আমরা তো কাহিল হয়ে পড়েছি।’
সে বলল, ‘তুমি কি লক্ষ্য করেছিলে, আমি যখন এক পাথরের উপর বিশ্রাম করছিলাম তখন আমি মাছের কথা ভুলে গিয়েছিলাম? শয়তানই ওর কথা বলতে আমায় ভুলিয়ে দিয়েছিল। মাছটা আশ্চর্যরকমভাবে সমুদ্রে নিজের পথ করে নিল।’
মূসা বলল, ‘আমরা তো এ জায়গারই খোঁজ করছিলাম।’ 

তারপর তারা নিজেদের পায়ের চিহ্ন ধরে ফিরে চলল। তারপর ওদের দেখা হল আমার অন্যতম দাসের সঙ্গে যাকে আমি আমার অনেক অনুগ্রহ দান করেছিলাম ও যাকে আমি নিজে থেকে জ্ঞান দান করেছিলাম। মূসা তাকে বলল, ‘সত্যপথের যে জ্ঞান তোমাকে দেয়া হয়েছে তার থেকে আমাকে শিক্ষা দেবে এ শর্তে কি আমি তোমাকে অনুসরণ করব?’
সে বলল, ‘তুমি কিছুতেই আমার সঙ্গে ধৈর্য্য রাখতে পারবে না। যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই সে বিষয়ে তুমি কেমন করে ধৈর্য্য ধরবে?’ 
মূসা বলল, ‘আল্লাহ চাইলে তুমি আমাকে ধৈর্য্য ধরতে দেখবে আর তোমার কোন আদেশ আমি অমান্য করব না।’ 
সে বলল, ‘আচ্ছা, তুমি যদি আমাকে অনুসরণ করই তবে আমাকে কোন বিষয়ে প্রশ্ন কোরও না, যতক্ষণ না আমি তোমাকে সেই বিষয়ে কিছু বলি।’

তারপর তারা চলতে লাগল, যখন ওরা নৌকায় উঠল তখন সে তাতে ফুঁটো করে দিল। মূসা বলল, ‘তুমি কি সওয়ারীদেরকে ডোবানোর জন্যে ওর মধ্যে ফুঁটো করলে? এ তো এক গুরুতর অন্যায় কাজ করলে।’
সে বলল. ‘আমি কি বলিনি যে তুমি আমার সঙ্গে কিছুতেই ধৈর্য্য রাখতে পারবে না?’
মূসা বলল, ‘আমার ভুলের জন্যে তুমি আমার অপরাধ ধরবে না, আর আমার উপর বেশী কঠোর হবে না।’

তারপর ওরা চলতে লাগল। চলতে চলতে ওদের সঙ্গে এক বালকের দেখা হল। সে ওকে খুন করল। তখন মূসা বলল, ‘তুমি এক নিষ্পাপ বালককে খুন করলে যে কাউকে খুন করেনি। তুমি তো এক গুরুতর অন্যায় কাজ করলে।’ 
সে বলল, ‘আমি কি বলিনি যে তুমি কিছুতেই আমার সঙ্গে ধৈর্য্য রাখতে পারবে না?’ 
মূসা বলল, ‘এরপর যদি তোমাকে কোন বিষয়ে প্রশ্ন করি তবে তুমি আর আমাকে সাথে রাখবে না। আমার ওজর আপত্তি শেষ হয়েছে।’

তারপর ওরা চলতে লাগল। যখন ওরা এক জনপদের বাসিন্দাদের কাছে পৌঁছিল তখন তারা তাদের কাছে কিছু খাবার চাইল। কিন্তু তারা ওদের আতিথেয়তা করতে রাজী হল না। তারপর ওরা সেখানে একটা পড়ন্ত দেয়াল দেখতে পেল, কিন্তু মূসার সঙ্গী ওটাকে শক্ত করে দিল। মূসা বলল. ‘তুমি ইচ্ছে করলে অবশ্যই এর জন্যে পারিশ্রমিক নিতে পারতে।’ 
মূসার সঙ্গী বলল, ‘এখানেই তোমার ও আমার সম্পর্ক ছিন্ন হল। যে বিষয়ে তুমি ধৈর্য্য রাখতে পারনি আমি তার অর্থ বলে দিচ্ছি। 

নৌকার ব্যাপার-সেটা ছিল কয়েকজন গরীব লোকের। ওরা সাগরে তাদের জীবিকা অন্বেষণ করত। আমি ইচ্ছে করে নৌকাটায় ত্রুটি ঢুকিয়ে দিলাম, কারণ ওদের সামনে ছিল এক রাজা যে জোর করে সব নৌকা ছিনিয়ে নিত। 

আর ঐ ছেলেটি-তার বাবা-মা ছিল বিশ্বাসী। আমার আশঙ্কা হয়েছিল যে তার অবাধ্যতা ও অবিশ্বাস তাদেরকে বিব্রত করবে। তারপর আমি চাইলাম যেন তার পরিবর্তে ওদের প্রতিপালক ওদেরকে এক সন্তান দেন যে পবিত্রতায় হবে আরও বড় ও ভক্তি-ভালবাসায় হবে আরও অন্তরঙ্গ। 

আর এ দেয়ালটি ছিল শহরের দুই এতিমের। তার নীচে ছিল গুপ্তধন। আর ওদের পিতা ছিল এক সৎকর্মপরায়ণ লোক। সেজন্যে তোমার প্রতিপালক দয়া পরবশ হয়ে ইচ্ছে করলেন যে, ওরা যেন সাবালক হয় ও তারপর ওরা ওদের ধন উদ্ধার করে। 
আমি নিজ থেকে কিছু করিনি, তুমি যে বিষয়ে ধৈর্য্য রাখতে পারনি এটাই তার ব্যাখ্যা।’ (২৮:৬০-৮২)

সমাপ্ত।
ছবি: Simple.wikipedia, christianimagesource.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন