pytheya.blogspot.com Webutation

২৬ মার্চ, ২০১২

Muhammad: প্রতিবেশী রাজন্যবর্গকে ইসলাম গ্রহণের আমন্ত্রণ।



মুহম্মদ (Muhammad), তার প্রচারিত ইসলাম সর্বমানবের কাছে পৌঁছিবে-যে উদার বাসনা দ্বারা তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন তার অনুসরণে তিনি প্রতিবেশী রাজন্যবর্গ ও তাদের প্রজাকূলকে সত্যধর্ম ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিয়ে কতিপয় দূত প্রেরণ করেছিলেন। এদের মধ্যে গ্রীকসম্রাট হেরাক্লিয়াস ও পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজও ছিলেন।
মক্কার একজন দেশত্যাগী সমতার ভিত্তিতে তাকে মহান খসরু বলে অভিহিত না করার স্পর্ধার জন্যে খসরু বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং তার পত্রের ঔদ্ধত্যের জন্যে ক্রোধান্বিত হন, পত্র ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলেন এবং ঘৃণার সঙ্গে দূতকে তাড়িয়ে দেন। যখন এই আচরণের খবর মুহম্মদকে জানান হল, তিনি শান্তভাবে মন্তব্য করেছিলেন-এরূপে খসরুর সাম্রাজ্যও ভেঙ্গেচুরে টুকরো টুকরো হয়ে পড়বে। 

হেরাক্লিয়াস ছিলেন অধিকতর নম্র ও শ্রদ্ধাবনত। তিনি দূতকে প্রভূত সম্মান প্রদর্শণ করেন এবং পত্রের একটি সদয় ও সযত্ন উত্তর প্রদান করলেন। মুহম্মদ কর্তৃক দূত দেহইয়া ইবনে খলফের মাধ্যমে হেরাক্লিয়াসের কাছে প্রেরিত পত্রটি ছিল এরূপঃ
 
বিসমিল্লাহির রাহমানুর রহিম -
আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রসূল মুহম্মদের পক্ষ হতে রোমের প্রধান পুরুষ হেরাক্লিয়াস সমীপে-

‘সত্যের অনুসরণকারীদের প্রতি সালাম। অতঃপর আমি আপনাকে ইসলামের দিকে আহবান করছি। ইসলাম কবুল করুন, আপনার কল্যাণ হবে। ইসলাম গ্রহণ করলে আল্লাহ আপনাকে দ্বিগুণ পুরস্কৃত করবেন। অন্যথায় প্রজা সাধারণের পাপের জন্যে আপনি দায়ী হবেন।’

‘বল, ‘হে গ্রন্থধারীরা! এস, আমরা ও তোমরা এক যোগে সেই সাধারণ সত্যকে অবলম্বন করি; আমরা কেউই আল্লাহ ব্যতিত অন্য কাউকে পূজা করব না এবং আল্লাহর সাথে কাউকে অংশীদার করব না বা নিজেদের মধ্যে হতে কাউকেও আল্লাহর আসনে বসাব না।’ কিন্তু যদি তারা এ কথা না মানে তবে বলে দাও যে, আমরা মুসলমান; তোমরা এ কথার স্বাক্ষী থেক।’(৩:৬৪)

(মোহর): মুহম্মদ-রসূল-আল্লাহ

সিরিয়া ত্যাগের পূর্বে হেরাক্লিয়াস পত্র প্রেরক ব্যক্তির সম্পর্কে জানার জন্যে সচেষ্ট হলেন। এই উদ্দেশ্য তিনি আরব থেকে আগত গাজাতে উপস্থিত কাফেলার কয়েকজন ব্যবসায়ীকে ডেকে পাঠালেন। তাদের মধ্যে ছিলেন আবু সুফিয়ান, যিনি তখনও ছিলেন ইসলামের চরমতম দুশমন।

হেরাক্লিয়াস আবু সুফিয়ানকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কেমন পরিবার থেকে তার আগমন?
আবু সুফিয়ান-একটা সম্ভ্রান্ত পারিবার থেকে।
হেরাক্লিয়াস-কারা তাকে অনুসরণ করছে?
আবু সুফিয়ান-সমাজের অবহেলিত এবং দরিদ্রগণ।
হেরাক্লিয়াস-কেউ কি তার ধর্ম গ্রহণ করার পর তা পরিত্যাগ করেছে?
আবু সুফিয়ান-না।

হেরাক্লিয়াস-নব্যুয়তের দাবী করার পূর্বে তোমরা কি কখনও তাকে মিথ্যা বলতে শুনেছ?
আবু সুফিয়ান-না।
হেরাক্লিয়াস-সে কি কখনও তার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেছে?
আবু সুফিয়ান-না।
হেরাক্লিয়াস-কি মতবাদ মুহম্মদ উপস্থাপিত করছে?’
তার উত্তর ছিল, ‘তিনি গবীর-দুঃখীকে সাহায্য করতে, সত্য ও শূচিতার অনুশীলন করতে, ব্যভিচার, পাপ ও মানুষকে ঘৃণা করা থেকে দূরে থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন।’ 
আর তার শিষ্য সংখ্যা বাড়ছে কিংবা কমছে জিজ্ঞেস করা হলে উত্তর এল, ‘তার শিষ্য সংখ্যা বেড়েই চলেছে এবং তার একজন শিষ্যও তাকে পরিত্যাগ করেনি।’
তৃতীয় পত্র প্রেরিত হয়েছিল, আবিসিনিয়ার সম্রাট নাজ্জাশীর কাছে। এই ন্যায়পরায়ণ হাবসী সম্রাট মুসলমানদের বিপদের সময় নিজ রাজ্যে আশ্রয় দিয়েছিলেন। এমনকি এই পত্র প্রেরণের সময়ও একদল মুসলমান সেখানে অবস্থান করছিলেন। নাজ্জাসী এই পত্রের প্রতি যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শণ করেন। তিনি মুহম্মদ সম্পর্কে ভীষণ কৌতুহল বোধও করলেন। তাই তিনি তার পরিষদবর্গের মধ্যে থেকে সত্তুরজনের একটি প্রতিনিধিদল (দলে ৬২ জন আবিসিনিয় ও ৮জন সিরিয় ইঞ্জিলে পন্ডিত ছিলেন) মদিনায় প্রেরণ করলেন-মুহম্মদকে এবং তার প্রচারিত ধর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত জানার উদ্দেশ্যে।

প্রতিনিধিদল যখন মদিনায় উপস্থিত হলেন, তখন মুহম্মদ খায়বর যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ব্যাপৃত ছিলেন। অতঃপর সংসারত্যাগী, নিরাহংকারী, দরবেশসুলভ পোষাক পরিহিত এইসব লোক যখন মুহম্মদ সমীপে উপনীত হলেন তখন তিনি তাদেরকে সূরা ইয়াসিন পাঠ করে শোনালেন। এই পাঠ শুনে তাদের চক্ষু দিয়ে অবিরাম অশ্রু ঝরতে লাগল। তারা আবেগজড়িত কন্ঠে বললেন, ‘এই কালাম ঈসার প্রতি অবতীর্ণ কালামের সাথে কতই না সামঞ্জস্যপূর্ণ! হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা মুসলমান হয়ে গেলাম। অতএব আমাদেরকেও মান্যকারীদের তালিকাভুক্ত করে নিন। আমাদের কি ওজর থাকতে পারে যে, আমরা আল্লাহর প্রতি এবং যে সত্য আমাদের কাছে এসেছে, তৎপ্রতি বিশ্বাস স্থাপন করব না এবং এ আশা করব না যে, আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে সৎলোকদের সাথে প্রবিষ্ট করাবেন?’
এদের সম্পর্কে কোরআনের এই আয়াতসমূহ নাযিল হয়েছিল- তুমি সবার চাইতে মুসলমানদের সাথে বন্ধুত্বে অধিক নিকটবর্তী তাদেরকে পাবে, যারা নিজেদেরকে খ্রীষ্টান বলে। এর কারণ এই যে, খ্রীষ্টানদের মধ্যে আলেম রয়েছে, দরবেশ রয়েছে এবং তারা অহংকার করে না। আর তারা রসূলের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, তা যখন শুনে, তখন তুমি তাদের চোখ অশ্রসজল দেখতে পাবে, এ কারণে যে, তারা সত্যকে চিনে নিয়েছে। 

তারা বলে, 'হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা মুসলমান হয়ে গেলাম। অতএব আমাদেরকেও মান্যকারীদের তালিকাভুক্ত করে নিন। আমাদের কি ওজর থাকতে পারে যে, আমরা আল্লাহর প্রতি এবং যে সত্য আমাদের কাছে এসেছে, তৎপ্রতি বিশ্বাস স্থাপন করব না এবং এ আশা করব না যে, আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে সৎলোকদের সাথে প্রবিষ্ট করাবেন?’

অতপর আল্লাহ তাদেরকে এ উক্তির প্রতিদানস্বরূপ এমন উদ্যান দেবেন যার তলদেশে নির্ঝরণিসমূহ প্রবাহিত হবে। তারা তন্মধ্যে চিরকাল অবস্থান করবে। এটাই সৎকর্মশীলদের প্রতিদান।(৫:৮২-৮৫)

এই প্রতিনিধিদলও খায়বর যুদ্ধে মুসলমানদের পক্ষে অংশগ্রহণ করলেন। যুদ্ধে তাদের অনেকে আহত হয়েছিলেন বটে, কিন্তু তাদের একজনও নিহত হননি। 

যুদ্ধে মুসলমানদের সাথে সহবস্থানের দরুণ আগত প্রতিনিধিরা মুসলমানদের আর্থিক দুর্দশা লক্ষ্য করেছিলেন। যুদ্ধ শেষে তাই তারা মুহম্মদকে বলেছিলেন, ‘আমরা ধনাঢ্য ও সম্পদশালী জাতি। আপনার অনুমতি পেলে আমরা মুসলমানদের জন্যে অর্থসম্পদ সরবরাহ করব।’

তখন এই আয়াত নাযিল হল- কোরআনের পূর্বে আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছি, তারা এতে বিশ্বাস করে। যখন তাদের কাছে এটা পাঠ করা হয়, তখন তারা বলে, ‘আমরা এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলাম। এটা আমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সত্য। আমরা এর পূর্বেও আজ্ঞাবহ ছিলাম। তারা দুইবার পুরস্কৃত হবে তাদের সবরের কারণে। তারা মন্দর জবাবে ভাল করে এবং আমি তাদেরকে যা দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে।(২৮:৫২-৫৪)


মূতার যুদ্ধ সংঘটনের স্থান।
মিসরের রোমান শাসনকর্তা মুকাউকিসের কাছেও মুহম্মদের আহ্বান পৌঁছেছিল। তিনি বিনয় নম্র ভাষায় এর উত্তর দিয়েছিলেন এবং ইসলাম গ্রহণ ও বশ্যতার নিদর্শণস্বরূপ তার কাছে মেরী ও শিরী নাম্নী-দু‘জন খ্রীষ্টান কন্যা ও একটি দুষ্প্রাপ্য শ্বেতবর্ণের অশ্ব উপঢৌকন হিসেবে পাঠিয়েছিলেন।

অতঃপর দামেস্কের নিকটবর্তী বসরায় অবস্থানকারী হেরাক্লিয়াসের জায়গীর ভোগী ঘাসানিয়া যুবরাজের কাছে অপর একজন দূত প্রেরিত হল। দূতের প্রাপ্ত সম্মান দেবার পরিবর্তে ঐ পরিবারেরই একজন তাকে হত্যা করল।


জায়েদ বিন হারিছের সমাধি।
গ্রীক সম্রাটের জায়গীর ভোগী কর্তৃক মুসলিম দূত নিধন এমন একটি প্রকাশ্য অবমাননা যা নীরব বা শাস্তিবিহীন অবস্থায় যেতে পারে না। ঘাসানিয়া যুবরাজ আমরের পুত্র সুহাবিলের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের লক্ষ্যে তিন সহস্র সৈন্যের একটি অভিযান প্রেরিত হল। বাইজান্টাইন সম্রাটের সেনাধ্যক্ষরা অপরাধ স্বীকার করার পরিবর্তে তা গ্রহণ করলেন এবং গোলমালটিকে রাজকীয় পর্যায়ে উন্নীত করলেন। ঐক্যবদ্ধভাবে তারা কায়সারের নেতৃত্বে লক্ষাধিক সৈন্যসহ সিরিয়ায়, বলখ থেকে দূরে নয় এমন একটি গ্রাম যেখানে হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছিল, তার নিকটবর্তী স্থানে মুসলমানদের মোকাবেলার জন্যে প্রস্তুত হলেন।


জাফর ইবনে আবু তালিবের সমাধি।
এই সেনাবাহিনী মোকাবেলায় মুসলমানরা ইতিকর্তব্য সম্বন্ধে পরামর্শে বসলেন। কেননা বিশাল সৈন্য পার্থক্যের কারণে এই যুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠায় জীবন উৎসর্গ করা ছাড়া জয়লাভের বিন্দুমাত্র আশা ছিল না। সুতরাং অনেকে মদিনায় সংবাদ পাঠান অথবা ফিরে যাওয়া সমীচীন মনে করলেন। কিন্তু আব্দুল্লাহ-বিন-রওয়াহা দ্বিমত পোষণ করলেন। তিনি বললেন, ‘আসবার সময় আমরা লাভ লোকসানের খতিয়ান করে আসিনি। আমরা এসেছি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করতে। আমাদের কাম্য জয়লাভ করা অথবা শহীদ হওয়া। সুতরাং ফলাফল যাই হোক না কেন তিন হাজার সৈন্য নিয়েই আমরা এক লক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব।’

বাইজান্টাইনদের মুসলিম বাহিনীর মনোভাব ও মনোবল প্রদর্শণের জন্যে সর্বসম্মতিক্রমে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হল।

উভয়পক্ষ পরস্পরের সম্মুখীন হল। এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি ছিলেন জায়েদ বিন হারিস, মুহম্মদের মুক্ত দাস। তিনি নিহত হলেন। অতঃপর সেনাপতি মনোনীত হলেন মুহম্মদের পিতৃব্যপুত্র ও আলীর ভ্রাতা জাফর। খায়বর বিজয়ের দিনে তিনি আবিসিনিয়া থেকে মদিনায় ফিরেছিলেন এবং অতঃপর এই অভিযানে এসেছিলেন। জাফর নিহত হবার পর সকলের মনোনয়নে খালিদ বিন ওয়ালিদ সেনাপতির পদ লাভ করলেন।

খালিদের কুশলী নেতৃত্বের কারণে বাইজান্টাইন ও তাদের মিত্রদের প্রতিহত করা গেল। কিন্তু দু‘দলের মধ্যে সৈন্য পার্থক্য ছিল বিশাল। তাই মুসলিম যোদ্ধারা শেষপর্যন্ত মদিনায় ফিরে এলেন।

সমাপ্ত।
ছবি:  islamiclandmarks, islamicchannels, iwtter.co. 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন