pytheya.blogspot.com Webutation

১ মার্চ, ২০১২

Insha'Allah: ইনশাল্লাহ-বলা ও না বলার মাহত্ম্য।


মুহম্মদের ইনশাল্লাহ না বলা : মুহম্মদের নব্যুয়ত চর্চায় কুরাইশ নেতৃবর্গ খুবই বিব্রতবোধ করতে লাগলেন, তখন তারা নাজার ইবনে হারেছ ও ওকাবা ইবনে আবী মুয়ীতকে মদিনার ইহুদি পন্ডিতদের কাছে প্রেরণ করলেন মুহম্মদ সম্পর্কে তাদের মন্তব্য কি তা জানার জন্যে। মদিনার ইহুদি পন্ডিতরা তাদেরকে বললেন, ‘তোমরা তাকে এই তিনটি প্রশ্ন করবে, যদি তিনি সঠিক উত্তর দিতে পারেন তবে বুঝবে তিনি প্রকৃতই আল্লাহর রসূল। প্রশ্ন তিনটি এই-

ক) ঐ সকল যুবকের ঘটনা কি, যারা প্রাচীন কালে শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিল?
খ) সেই ব্যক্তির ঘটনা কি, যিনি পৃথিবীর পূর্ব, পশ্চিম ও সারা বিশ্ব সফর করেছিলেন?
গ) রূহ কি?’

তারা ফিরে এসে সকলকে বললেন, ‘আমরা একটি চুড়ান্ত ফয়সালার ব্যবস্থা করতে পেরেছি।’

কুরাইশরা সদলবলে প্রশ্নগুলো নিয়ে মুহম্মদের কাছে হাযির হলেন। তিনি সবকিছু শুনে বললেন, ‘তোমরা আগামীকাল এস।’ কিন্তু তিনি ‘আল্লাহ চাইলে’ অর্থাৎ ইনশাল্লাহ (Insha'Allah)বলতে ভুলে গেলেন।
তারা চলে গেলেন।

মুহম্মদ ওহী আগমনের অপেক্ষায় থাকলেন। কিন্তু পরদিন ওহী এল না। এভাবে দিনের পর দিন অতিক্রান্ত হতে লাগল। আর কুরাইশরাও তাকে ঠাট্টা করতে লাগলেন। তাদের অনেকে বলতে লাগলেন, ‘মুহম্মদের আল্লাহ তাকে পরিত্যাগ করেছেন।’

পনের দিন পর জিব্রাইল কুরাইশদের প্রশ্নের উত্তর সম্বলিত সূরা কাহফ নিয়ে অবতরণ করলেন। এই সূরায় ওহী বিলম্বের কারণ হিসেবে বলা হল-ভবিষ্যতে কোন কাজ করার ওয়াদা করলে ইনশাল্লাহ বলা উচিৎ।

এ সংক্রান্ত আয়াতসমূহ এই-তুমি কোন কাজের বিষয়ে বলবে না যে, সেটি ‘আমি আগামীকাল করব’ ‘আল্লাহ ইচ্ছে করলে (ইনশাল্লাহ)’ বলা ব্যতিরেকে। যখন ভুলে যাও, তখন তোমার পালনকর্তাকে অধিক ভাবে স্মরণ কর এবং বল, ‘আশাকরি আমার পালনকর্তা আমাকে এর চাইতেও নিকটতম সত্যের পথনির্দেশ করবেন।’-(১৮:২৩-২৪)

শলোমনের ইনশাল্লাহ না বলা : একদিন শলোমন মনে মনে এই ইচ্ছে ব্যক্ত করলেন যে-‘অদ্যরাত থেকে আমি পালাক্রমে স্ত্রীদের সাথে সহবাস করব এবং তাদের গর্ভ থেকে যে সন্তানেরা জন্মগ্রহণ করবে তাদেরকে আল্লাহর পথে জেহাদে শামিল করব।’-কিন্তু এই মনোভাবের সময় তিনি ইনশাল্লাহ বলতে ভুলে গেলেন। তার এই ত্রুটি আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হল না। তাই তিনি তার এই প্রয়াস নিষ্ফল করে দিলেন। তার কোন বিবিই গর্ভবতী হল না একজন ব্যতিত।

নিয়মিত মহড়ায় কোন একদিন বিকেলে শলোমনের সামনে প্রশিক্ষিত দ্রুতগামী অশ্বগুলোকে উপস্থিত করল তার কর্মচারীরা। এগুলো তার ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ছিল। শলোমন অশ্বগুলোর সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। দীর্ঘক্ষণ অতিবাহিত হল। 

কিং শলোমন।
একসময় অশ্বগুলোকে শলোমনের সামনে থেকে নিয়ে যাওয়া হল। এসময় সম্বিত ফিরে পেলেন তিনি। লক্ষ্য করলেন সূর্য্য ডুবে গেছে, বৈকালিক প্রার্থনার সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। এই অমনোযোগিতার কারণ ছিল অশ্বগুলো। তাই তিনি কর্মচারীদের বললেন, ‘আমি তো আমার প্রতিপালকের স্মরণ থেকে বিমুখ হয়ে অশ্বের প্রেমে মগ্ন হয়ে আছি, এদিকে সূর্য্য ডুবে গেছে। ওগুলোকে আবার আমার সামনে আন।’ 

কর্মচারীরা তার আদেশ মত সেগুলোকে আবার তার সামনে আনল। তখন তিনি সবগুলিকে কোরবাণী করে দিলেন।
এসময় আল্লাহ তাকে পরীক্ষা করলেন।  

ঐ সময় তার বিবিগণের মধ্যে যে গর্ভধারণ করেছিল, সে অপূর্ণ সময়ে একটি মৃত ও পার্শ্ববিহীন সন্তান প্রসব করল। তার চাকরদের একজন সেটিকে এনে তার সিংহাসনের উপর রাখল। তিনি যখন তা দেখতে পেলেন তখনই বুঝতে পারলেন কেন এমন হয়েছে। তিনি তৎক্ষণাৎ আকাশের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা কর ও এমন এক রাজ্য আমাকে দান কর, আমি ছাড়া কেউ যার অধিকারী হতে পারবে না। তুমি তো মহাদাতা।’ 

শলোমন তার নিজস্ব সকল আরোহণের পশু কোরবাণী করে দিয়েছিলেন। তাই এসময় আল্লাহ বায়ূকে তার অধীন করে দিলেন। এসময় শলোমন তার নিজের জন্যে এক চতুর্দ্দোল নির্মাণ করেছিলেন। তিনি তাতে বসলে বায়ূ যেখানে ইচ্ছে সেখানে তাকে বয়ে নিয়ে যেত। আর পক্ষীকুল এই ভ্রমনের সময় তার উপর ছায়া বিস্তার করত। এই চতুর্দ্দোল নির্মিত হয়েছিল লেবাননের এরস কাঠ দিয়ে। আর তার স্তম্ভগুলো রৌপ্য নির্মিত এবং তলদেশ স্বর্ণ নির্মিত ছিল এবং আসন ছিল বেগুণে রঙের। জেরুজালেমের কিছু দক্ষ নারী ঐ আসনের মধ্যভাগকে কারুকার্য্যময় করে তৈরী করেছিল। 

চতুর্দ্দোল সম্পর্কে শলোমনের পরমগীতে আছে-
শলোমন রাজা আপনার জন্যে এক চতুর্দ্দোল নির্মাণ করলেন,
লেবাননের কাঠ দিয়ে করলেন।
তিনি রৌপ্য দিয়ে তার স্তম্ভ নির্মাণ করলেন,
সুবর্ণের তলদেশ ও বেগুনে রঙের আসন করলেন,
          এবং জেরুজালেমের কন্যাগণ কর্তৃক প্রেম দিয়ে তার মধ্যভাগ খঁচিত হল। -(পরমগীত ৩:৯-১০)

শলোমনের সকালের বেড়ান ছিল এক মাসের পথ, আর বিকালের বেড়ানও ছিল এক মাসের পথ। আল্লাহ আরও অধীন করে দিয়েছিলেন বেশ কিছু জ্বীনকে, যারা ছিল স্থপতি ও ডুবুরী এবং আরও অনেককে, জোড়া শেকল পরিয়ে। এরা শলোমনের ইচ্ছেনুযায়ী বিভিন্ন বস্তু নির্মাণ করত। আল্লাহ এসব জ্বীনদের সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘হে শলোমন, এ থেকে তুমি অন্যকে দিতে পার বা নিজে রাখতে পার। এর জন্যে তোমাকে হিসেব দিতে হবে না।’ 

এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ- সে ছিল উত্তম দাস ও সবসময় আমার উপর নির্ভর করত। বিকেলে যখন তার সামনে প্রশিক্ষিত দ্রুতগামী ঘোড়া গুলোকে উপস্থিত করা হল সে বলল, ‘আমি তো আমার প্রতিপালকের স্মরণ থেকে বিমুখ হয়ে ঘোড়ার প্রেমে মগ্ন হয়ে আছি, এদিকে সূর্য্য ডুবে গেছে। ওগুলোকে আবার আমার সামনে আন।’ 
তারপর সে ঘোড়াগুলোর পা ও গলা কাটতে লাগল।

আমি শলোমনকে পরীক্ষা করলাম ও তার আসনের উপর রাখলাম এক লাশ। শলোমন তখন আমার দিকে মুখ ফেরাল। সে বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা কর ও এমন এক রাজ্য আমাকে দান কর, আমি ছাড়া কেউ যার অধিকারী হতে পারবে না। তুমি তো মহাদাতা।’ 

তখন আমি বায়ূকে তার অধীন করে দিলাম। সে (বায়ূ) যেখানে ইচ্ছে সেখানে তাকে বয়ে নিয়ে যেত।-(৩৮:৩০-৩৭) তার সকালের বেড়ান  ছিল এক মাসের পথ, আর বিকালের বেড়ানও ছিল এক মাসের পথ।-(৩৪:১২) আরও অধীন করে দিলাম সকল জ্বীন, যারা ছিল স্থপতি ও ডুবুরী এবং আরও অনেককে, জোড়া শেকল পরিয়ে। এসব আমার অনুগ্রহ, আমি বললাম, ‘হে শলোমন, এ থেকে তুমি অন্যকে দিতে পার বা নিজে রাখতে পার। এরজন্যে তোমাকে হিসেব দিতে হবে না।’-(৩৮:৩৮-৩৯)

আহলে কিতাবীর ইনশাল্লাহ না বলা : একজন সৎকর্মপরায়ণ আহলে কিতাবী একটি উদ্যান তৈরী করেছিলেন। তাওরাত কিতাবের বিধান অনুযায়ী এই ব্যক্তি ফল আহরণের সময় কিছু ফল ফকির মিসকীনদের জন্যে গাছেই রেখে দিতেন এবং যেসব ফল তলায় পড়ত তাও কুড়িয়ে নিতেন না। এ কারণে ফল আহরণের সময় বিপুল সংখ্যক ফকির মিসকীন সেখানে সমবেত হত।

ঐ ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার তিন পুত্র ঐ উদ্যানের মালিক হলেন। তারপর যখন ফল আহরণের সময় হল, তখন তাদের একজন বললেন, ‘আমাদের পরিবার পরিজন বেড়ে গেছে। আর ফলের উৎপাদনও কম। তাই মিসকীনদের জন্যে এত ফল রেখে দেবার সাধ্য আমাদের নেই।’
আরেকজন বললেন, ‘আমাদের পিতা একজন বেওকুফ লোক ছিলেন, তাই বিপুল পরিমান ফল মিসকীনদের জন্যে রেখে দিতেন। এখন আমাদের কর্তব্য এ প্রথা বন্ধ করে দেয়া।’

অন্যজন ছিলেন সৎকর্মপরায়ণ, কিন্তু তিনিও হালকা আপত্তির পর অন্য দু‘জনের প্রস্তাবে সম্মত হলেন। এরপর তারা পরস্পর সিদ্ধান্ত নিলেন এবং শপথ করে বললেন, ‘আগামীকালই আমরা রাত থাকতেই চুপিচুপি গিয়ে ক্ষেতের ফল সংগ্রহ করে আনব, যাতে মিসকীনরা টের না পায় এবং আমাদের পিছনে পিছনে না চলে।’

এই পরিকল্পনায় তারা এতটুকু দৃঢ় আস্থা ছিলেন যে, ইনশাল্লাহ বলারও প্রয়োজন মনে করলেন না। এদিকে রাতেই আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিপদ এসে ক্ষেতে হানা দিল, তাতে ফসল কেটে নেবার পর ক্ষেতের অবস্থা যেমন হয়-বাগানটির অবস্থাও তেমন হয়ে গেল। অতঃপর ভোর রাতে তারা যখন বাগানে পৌঁছিলেন, তখন সেখানে কোন দাঁড়িয়ে থাকা গাছ দেখতে পেলেন না। তাতে তাদের একজন বললেন, ‘আমরা বোধহয় অন্ধকারে পথ ভুলে অন্যত্র চলে এসেছি।’
কিন্তু নিকটবর্তী স্থান ও আলামত দেখে সকলে বুঝতে পারলেন যে, তারা তাদের গন্তব্য স্থানেই এসে পৌঁছেছেন, কিন্তু ক্ষেত আগুনে পুড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তারা সমস্বরে বলে উঠলেন, ‘আমরা এই ফসল থেকে বঞ্চিত হয়ে গেছি।’

তিন ভাইয়ের মধ্যে যিনি সৎকর্মপরায়ণ ছিলেন, তিনিও দুষ্টুদের সঙ্গী হয়ে তাদেরই মতানুসারে কাজ করতে সম্মত হয়েছিলেন। ফলে তার দশা অপরাধীদের মতই হল। এ দেখে তিনি ক্ষোভে অপর দু‘জনকে বললেন, ‘আমি কি পূর্বেই তোমাদেরকে আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করতে বলিনি? তোমরা তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা কর।’

তারা অতঃপর একে অন্যেকে ভর্ৎসনা করতে লাগলেন। অবশেষে সকলে তাদের ভুল বুঝতে পেরে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। তারা বললেন, ‘আমরা আমাদের পালনকর্তার পবিত্রতা ঘোষণা করছি, নিশ্চয়ই আমরা সীমালঙ্ঘণকারী ছিলাম। সম্ভবতঃ আমাদের পালনকর্তা পরিবর্তে এর চাইতে উত্তম বাগান আমাদেরকে দেবেন।’

এ সংক্রান্ত আয়াতসমূহ-আমি তাদেরকে পরীক্ষা করেছি, যেমন পরীক্ষা করেছি উদ্যান ওয়ালাদের, যখন তারা শপথ করেছিল যে, সকালে বাগানের ফল আহরণ করবে, ইনশাল্লাহ না বলে। অতঃপর তোমার পালনকর্তার পক্ষ থেকে বাগানে এক বিপদ এসে পতিত হল, যখন তারা নিদ্রিত ছিল। ফলে সকাল পর্যন্ত হয়ে গেল ছিন্নভিন্ন তৃণসম। সকালে তারা একে অপরকে ডেকে বলল, ‘তোমরা যদি ফল আহরণ করতে চাও, তবে সকাল সকাল ক্ষেতে চল।’
অতঃপর তারা চলল ফিস ফিস করে কথা বলতে বলতে- ‘অদ্য যেন কোন মিসকীন ব্যক্তি তোমাদের কাছে বাগানে প্রবেশ করতে না পারে।’

তারা সকলে লাফিয়ে লাফিয়ে দ্রুত বেগে রওনা হল। অতঃপর যখন তারা বাগান দেখল, তখন বলল, ‘আমরা তো পথ ভুলে গেছি। বরং আমরা তো কপাল পোড়া।’
তাদের উত্তম ব্যক্তি বলল, ‘আমি কি তোমাদেরকে বলিনি? এখনও তোমরা আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করছ না কেন?’
তারা বলল, ‘আমরা আমাদের পালনকর্তার পবিত্রতা ঘোষণা করছি, নিশ্চিতই আমরা সীমালঙ্ঘনকারী ছিলাম।’
অতঃপর তারা একে অপরকে ভর্ৎসনা করতে লাগল। তারা বলল, ‘হায়! দুর্ভোগ আমাদের আমরা ছিলাম সীমা অতিক্রমকারী। সম্ভবতঃ আমাদের পালনকর্তা পরিবর্তে এর চাইতে উত্তম বাগান আমাদেরকে দেবেন। আমরা আমাদের পালনকর্তার কাছে আশাবাদী।’
শাস্তি এভাবেই আসে এবং পরকালের শাস্তি আরও গুরুতর; যদি তারা জানত!-(৬৮:১৭-৩৩)

সমাপ্ত।
ছবি: readersdigest.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন