pytheya.blogspot.com Webutation

৬ অক্টোবর, ২০১৫

সারমেয়: প্রাচীন সাহিত্য, লোককাহিনী, ধর্ম ও নৃবিদ্যায়।

কুকুর বা সারমেয় গৃহপালিত প্রাণী। প্রাচীনকাল থেকেই পশুপালন, পাহারার কাজে, শিকার করতে, যুদ্ধে যোদ্ধারূপে ইত্যাদি নানা কাজে এই প্রাণীটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রখর বুদ্ধিমত্তা, দূর্দান্ত সাহস ও প্রভুভক্ততার কারণে সে সর্বজনপ্রিয়। তাছাড়া প্রাচীন সাহিত্য, লোককাহিনী, ধর্ম ও নৃবিদ্যায় এদের সরব উপস্থিতি রয়েছে। আর তাই কুকুর তত্ত্ব ও তথ্যের উপর আমাদের এ উপস্থাপনা।

কুকুরই সম্ভবত: পোষ মানানো প্রথম প্রাণী। ধারণা করা হয় নেকড়ে বাঘ থেকেই এদের উদ্ভব। আর ফসিল রেকর্ড এমনটাই ইঙ্গিত দেয়। উত্তর চীন ও অন্যান্য প্যালেন্টোলোজিক্যাল সা্ইটে ২ থেকে ৫ লক্ষ বৎসর আগের হোমিনিডস ও ছোট নেকড়ে বাঘ মধ্য প্লেইস্টোসিন লেভেলে একত্রে পাওয়া গেছে। এতে ধারণা করা হয় নেকড়ে বাঘ মনুষ্য বসতির প্রতি আকৃষ্ট হয় সম্ভবত: উচ্ছিষ্ট খাবারের গন্ধে। আর তাদের বিচরণ ক্ষেত্রে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের প্রতি বর্ষিত গর্জণধ্বনি ঐ বসতির জন্যে প্রাথমিক সতর্কবাণী হিসেবে কাজ করত।

কুকুর গৃহপালিত হল কিভাবে? অনুসন্ধানে দেখা যায়, ক্যানিড হাঁড়ের খোঁজ পাওয়া গেছে পরিত্যাক্ত ভাঁগাড়ের কাছাকাছি কিন্তু প্যালোলিথিক ক্যাম্পে নয়, অন্যদিকে গৃহপালিত কুকুরের হাঁড় প্রথম পাওয়া যায় নিওলিথিক ক্যাম্পের মধ্যে, যা প্রমাণ করে যে, পোষ মানানো প্রক্রিয়া নিশ্চিতভাবে ছিল ধীরগতির কিন্তু ক্রমাগতভাবে।অবশ্য এই হাইপোথিসিস এফ.ই জুনের প্রত্যাখ্যান করেছেন, তবে তিনি এ অভিমত দিয়েছেন যে, নেকড়ে বাঘের চরে খাওয়ার অভ্যাস ছিল যা তাকে মনুষ্য বসতির কাছে টেনে অানে আর হয়ত এভাবেই কিছু শাবক সেখানকার বাসিন্দাদের কারো দ্বারা পোষ্য হিসেবে গৃহীত হয় যা ঘটনাক্রমে পশুটিকে গৃহপালিত করেছে।

কাল কুকুর।
উপরের এসব কথা হচ্ছে আর্কিওলোজিস্টদের, কারণ তারা তো এখনও প্রথম মানব আদমের হাড্ডি খুঁজে পায়নি। আর তাই তাদের জানা নেই আদম-হাওয়া বা তার পুত্র হাবিলেরও পোষ্য কুকুর ছিল। ইহুদিদের স্যাক্রেড টেক্সট হাগাধা জানায়- কাবিল-হাবিলকে হত্যা করে লাশ ফেলে রাখলে আদম-হাওয়া বসে বসে কাঁদছিল। আর এমনিতেই তারা জানত না সৎকারের উপায়। তখন হাবিলের কুকুরটা লাশের পাশে বসে পশু-পাখীর হাত থেকে রক্ষা করে তার দফাদারিত্বের প্রমান দিয়েছিল।[১] যাহোক, আবার আর্কিওলোজিস্টদের কাছে ফিরি।

নিকট প্রাচ্যের প্রাচীনতম গৃহপালিত কুকুরের দেহাবশেষের সন্ধান পাওয়া গেছে উত্তর-পূর্ব ইরাকের পালগাওরা গুহায় যা ইউরোপে পাওয়া দেহাবশেষগুলোরও আগের; আজ থেকে বার হাজার বৎসর পূ্র্বেকার এবং অনুমিত হয় সেগুলো তথাকথিত "কুর্দি কুকুর"-এর গঠনের কাছাকাছি। দক্ষিণ পারস্যে পশুপালন ও চাষাবাদ শুরুর এক গবেষণায় ফ্রাঙ্ক হোল ও তার সহকর্মীরা প্রাপ্ত অস্টোলোজিক্যাল তথ্য-প্রমাণ থেকে এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হন-

ক: -কুকুর সম্ভবত: ৫,৫০০ বিসিই’র দিকে খুজিস্তানে পোষ মানানো হয়েছে। 
খ: -সেগুলো সম্ভবত: স্থানীয় বিভিন্ন জাতের বন্য নেকড়ের বংশোদ্ভূত ছিল; এবং 
গ: -কিছু ক্যানিড হাঁড়ের অবস্থা প্রমাণ করে যে, কুকুর কিছুকিছু এলাকায় খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হত। অবশিষ্ট গৃহপালিত কুকুরের সন্ধান পাওয়া গেছে আজারবাইজানের হাজী ফিরোজ সাইটে।

শাস্ত্রীয় লেখকগণ চার ধরণের পার্স্যিয়ান শিকারী হাউন্ডস এর কথা উল্লেখ করেছেন; ইলায়মিয়ান্স এসেছে পারস্য উপসাগরের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় উপকূলে থেকে; হিরকানিয়ান্স এবং কারমানিয়ান্স সুপরিচিত তাদের বর্বরতার জন্য; এবং মিডিয়ান্স পরিচিত মহান যোদ্ধা হিসেবে।[২] জরোস্ট্রিয়ান শেষকৃত্য রীতি ছাড়াও প্রাক-ইসলামী পার্স্যিয়ানগণ কুকুরকে কেবল শিকার ও পশুপালনেই নয় বরং যুদ্ধেও ব্যবহার করত।

পার্স্যিয়, গ্রিক, অশূরীয় এবং ব্যাবিলনীয়গণ বড় মাসটিফসকে শক সৈন্য হিসাবে ব্যবহার করত; এক অ্যাথেনীয় কুকুর পারস্যের বিরুদ্ধে ম্যারাথন যুদ্ধে (৪৯০ বিসিই) নিজেকে এমনই পৃথক করেছে যে, তার উপমা কল্পনানুসারে স্থাপন করা হয়েছে গ্রিক বিজয় সৌধে[৩] ভারতীয় কুকুর পার্স্যিয়ান অাভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যে অত্যন্ত প্রশংসিত ছিল; জনশ্রুতি রয়েছে ১ম অহশ্বেরশ (৪৮৬-৬৫ বিসিই) তার সৈন্যবাহিনীতে বৃহৎ সংখ্যক এ কুকুর অন্তর্ভূক্ত করেন তার গ্রীসের বিরুদ্ধে অভিযানে।


ব্যাবিলনের এক পার্স্যিয়ান প্রদেশিক গভর্ণর উল্লেখ করেছেন যে, তার প্রদেশের চারটি বৃহৎ গ্রাম থেকে প্রাপ্ত আয় তার ভারতীয় হাউন্ডগুলোর যত্ন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে নির্ধারিত ছিল[৪] কথিত আছে, ৩য় দারিয়ূস (৩৩৬-৩০ বিসিই) যুদ্ধে বেসসুসের আঘাতে নিহত হলে তার পোষা কুকুর তার মৃতদেহ ফেলে চলে যায়নি[৫] এছাড়াও উৎসব ও বিনোদনে কুকুরের লড়া্ই প্রাচীন পারস্যে বেশ প্রচলিত ছিল। কথিত আছে, মহাবীর আলেকজান্ডার ভারতীয়দের কাছ থেকে চারটি লড়াইয়ের কুকুর উপহার পেয়েছিলেন। পার্স্যিয়ান স্যাগ-ই-কারজারি বা যোদ্ধা কুকুর, হয় নির্দেশ করে কনাইন বীরযোদ্ধাকে, বা, নিদেন পক্ষে ঐসব কুকুরগুলোকে, যাদেরকে প্রশিক্ষণ দেয়া হত কুকুর লড়াইয়ের জন্য।[৬]

কুকুর সৃষ্টি ও গৃহপালিত হওয়ার নানান পুরাণ কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। এসবের কিছু সূপ্রাচীন, কিছু বাইবেলীয় এবং কিছু ইসলামি উপকথা।

কুকুর সৃষ্টির প্রাচীন উপকথা: 

বুন্দাহিসন অনুসারে, সকল প্রাণী আদিম ষাড়ের পরিশুদ্ধ বীর্য থেকে সৃষ্টি করা হয়েছিল। দশ প্রকার কুকুরের উল্লেখ রয়েছে, যার মধ্যে কেবল পাহারাদার কুকুর, ভেড়ার পাল চরানো কুকুর, এবং শিকারি কুকুরকে সঠিকভাবে কুকুর বিবেচনা করা যেতে পারে। কথিত আছে- কুকুর কেবল নেকড়ের বিরুদ্ধে মানুষের সহায়-সম্পদ রক্ষার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে; সে শয়তানের বিরোধিতায় মোরগকে সহযোগীতা করে আর তার তীক্ষ্ন দৃষ্টিশক্তি দ্বারা অপশক্তি বিতাড়িত করতেও সক্ষম হয়[৭]

কুকুর সৃষ্টির বাইবেলীয় কাহিনী
খোদা ফেরেস্তাদেরকে মানব সৃষ্টির পরিকল্পণার কথা জানালে তারা বলল, “আপনি কি এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যে রক্তারক্তি করবে? আমরাই তো রয়েছি আপনার পবিত্র মহিমা ঘোষণার কাজে।”
তিনি বললেন, “আমি যা জানি তোমরা তা জান না। সুতরাং আমি যখন সুঠাম করে তাতে আমার আত্মা ফুঁকে দেব, তখন তোমরা তাকে সিজদা কববে।”
স্বাধীন করে সৃষ্ট জ্বিণ ইবলিস মানুষকে তাদের উপরে মর্যাদা দিতে রাজী ছিল না। আর বার্ণাবাসের গসপেল থেকে জানা যায়- 

ইবলিসের পক্ষ নিয়ে তার কিছু ভক্ত ও অনুসারী ফেরেস্তা প্রকাশ্যে খোদার বিরোধিতায় নামল। তখন খোদা ইবলিস ও তার সাঙ্গ-পাঙ্গদেরকে বললেন, “তোমরা অনুতপ্ত হও আর সৃষ্টিকর্তা হিসেবে আমাকে মেনে নাও।”
তারা বলল: “আমাদের অনুতাপ তোমার জন্যে মর্যাদার হবে না, কারণ তুমি ন্যায়বিচারক নও, বরং শয়তানই ন্যায়বিচারক।’
তখন খোদা বললেন, “ও অভিশপ্তের দল! দূর হয়ে যাও আমার সামনে থেকে, কেননা, তোমাদের জন্যে আমার কোন করুণা আর নেই।”

আর তারা চলে যাচ্ছিল, তখন ইবলিস পড়ে থাকা ঐ মাটি, যা আদমকে সৃষ্টির জন্যে এনে রাখা হয়েছিল, তার উপর ঘৃণা ভরে থুথু ফেলল। আর ফেরেস্তা জিব্রাইল তা থেকে কিছু মাটি তুলে নিল, যাতে শয়তানের থুথু ফেলা মাটির কিছুটা রয়ে গেল। আর খোদা তা থেকে মানব সৃষ্টি করলেন, আর ঐ থুথু মিশ্রিত মাটিটুকু এখন নাভিরূপে মানুষের শরীরে বিরাজমান।” আর তাই আগুনে সৃষ্ট শয়তানের থুথুর কারণে মানুষের নাভি আগুনে পোড়ে না।


“খোদা শয়তানকে বহি:স্কার করার পর জিব্রাইল ঐ মাটি পরিশুদ্ধ করে যাতে শয়তান থুথু ফেলেছিল। আর খোদা তা থেকে জন্তু-জানোয়ারসহ জীবন্ত সবকিছু-যেগুলো আকাশে ওড়ে, মাটিতে চরে বেড়ায় বা পানিতে সাঁতার কাটে- সৃষ্টি করেন এবং পরে সেগুলো দিয়ে পৃথিবী সুশোভিত করেন।”


একদিন শয়তান দূর থেকে দেখল স্বর্গদ্বারের কাছে একপাল ঘোড়া ঘাস খাচ্ছে। তখন সে তাদেরকে পড়ে থাকা কাদামাটির তাল দেখিয়ে বলল যে, যদি ঐ কাদামাটি আত্মা প্রাপ্ত হয়, তবে তাদের জন্য তারা যাচ্ছেতাই পরিশ্রমের কারণ হবে। সুতরাং তাদের জন্যে এই ভাল, ঐ মাটিকে মাড়িয়ে এমন করে ফেলা, যেন তা দিয়ে কোন কিছু সৃষ্টি করার মত আর না থাকে। 


তখন ঘোড়ার পাল কোন কিছু চিন্তা-ভাবনা না করে উত্তেজিত হয়ে ছুটে এল এবং লিলি ও গোলাপ বাগানের মাঝে রাখা ঐ মাটির উপর দিয়ে নিজেদেরকে চালিত করল। তারপর জিব্রাইল ঐ মাটি থেকে কিছুটা তুলে নিল, যার পুরোটাই ছিল শয়তানের থুথু ফেলা অপবিত্র মাটি, আর খোদা ঐ মাটি দিয়ে কুকুর সৃষ্টি করলেন। আর যখন সেটা আত্মা পেল, চিৎকার করে ডাকতে ডাকতে ছুটে গেল ঘোড়ার পালের দিকে, আর সেগুলো ভয়ে পালিয়ে গেল।[৮] 


কুকুর সৃষ্টির ইসলামী উপকথা:
কুকুর সৃষ্টির তিনটি ভিন্ন উপকথা ইসলামী গ্রন্থসমূহ থেকে পুনর্গঠন করা যায়। একটি রেওয়াতে আলী ইবনে আবি তালেবের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে- আদম ও হাওয়াকে যখন জান্নাত থেকে বহিস্কার করা হয়, তখন শয়তান পৃথিবীর জন্তু-জানোয়ারদের কাছে আসে এবং তাদেরকে উৎসাহিত করে হুংকার ও সহিংস আক্রমণ দ্বারা আদম দম্পতিকে গ্রাস করতে। ঐসময় তার মুখ থেকে লালা বেরিয়ে ছিঁটকে আসে এবং খোদা তা থেকে একটি পুরুষ ও একটি স্ত্রী কুকুর সৃষ্টি করেন। তারপর তিনি পুরুষটিকে আদমের এবং স্ত্রীটিকে হাওয়ার প্রহরীরূপে পাঠিয়ে দেন। এভাবে কুকুর এবং বন্যপ্রাণীর মধ্যে শত্রুতার সূচনা হয়েছিল[৯]

দ্বিতীয় একটি ভার্সন হচ্ছে, খোদা আদমকে সৃষ্টির পর অবশিষ্ঠ মাটি থেকে কুকুর সৃষ্টি করেন,[১০] যার ভিত্তিতে সম্ভবত: কিছু কিছু উৎসে এটা উল্লেখ করা হয়েছে যে, কুকুরের হাঁড় এবং টিস্যু মানবদেহে প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে। প্রাচীন ফার্সি লোক ব্যাকরণে রয়েছে যে, স্যাগ (কুকুর) শব্দটি উদ্ভূত সেহ-ইয়াক (এক তৃতীয়াংশ) থেকে, কারণ, তার এক তৃতীয়াংশ বৈশিষ্ট্য মানুষের।[১১]

তৃতীয় শ্রুতিটির খোঁজ পাওয়া যায় কুকুরের মাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ হওয়া সম্পর্কিত একটি রেওয়াত থেকে, যেখানে উল্লেখ রয়েছে প্রাণীটি “রূপান্তরিত”[১২]আর এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, কুকুরের মাংস ভক্ষণ নরমাংস ভক্ষণের সমতূল্য। কারণ, পাপিষ্ঠ মানব কুকুরে রূপান্তরিত হয়। পাপীষ্ঠদের রূপান্তরের এই ধারণা ব্যাপকভাবে মুসলিম সাহিত্য এবং পণ্ডিতগণের দ্বারা সত্যায়িত। উদাহরণস্বরূপ, ইবনে আবি দোনিয়া এক রেওয়াত উল্লেখ করেছেন- যারা অন্যদের বিরুদ্ধে নোংরা ও অশ্রাব্য ভাষা ব্যবহার করে, তাদেরকে কুকুরের আকৃতিতে পুনরুত্থিত করা হবে।[১৩]


রশিদ-আল-দীন মেবুদি, যিনি কোরআনের উপর একটি সূফী ব্যাখ্যা লিখেছেন, তার অভিমত যে, বিচার দিবসে সুদখোরদেরকে কুকুর ও শুকর রূপে উত্থিত করা হবে।[১৪] বল’আম বিন বাওরা এবং সীমার বিন দিল-জওসান- ঈমাম হোসেনের হত্যাকারী, সম্ভবত: কুকুরে রূপান্তরিত হয়ে শাস্তি ভোগ করবে।[১৫] ১৯৩৫ সনের দিকে মাসাদের এক স্ত্রীলোক, যে ঈমাম হোসেনের মৃত্যুর সাথে যুক্ত অলৌকিক ঘটনাকে উপহাস করেছিল, সে একটা কুকুরে রূপান্তরিত হয়েছে বলে অনুমান করা হয়[১৬]


কুকুর পোষ মানানো বা গৃহপালিতকরণ সম্পর্কে একটি রেওয়াতে ইবনে আব্বাসের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে: আদমকে যখন স্বর্গ থেকে বহিস্কার করা হয়, তখন তিনি শয়তান দ্বারা আক্রান্ত হন, ঐসময় আল্লাহ তাকে আশ্বাস দেন এবং প্রতিরক্ষার উপায় হিসেবে মূসার লাঠিটি পাঠান; লাঠি পেয়ে আদম তা দিয়ে এক কুকুরকে আঘাত করতে উদ্যত হলে, খোদা তাকে নিবৃত্ত করেন, আর লাঠিটি কেবল ঐ কুকুরের মাথার উপর ধরতে বলেন। এতে প্রাণীটি পোষ মানে এবং আদম ও তাঁর বংশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের হয়ে যায়[১৭]


ইসলামী শরীয়তে কুকুর:
কোর’আনে কেবল চারটি আয়াতে[১৮] কুকুরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং বেশকিছু হাদিসেও তাদের কথা আছে। যেমন- বুখারীতে রয়েছে-‘যে গৃহে কুকুর থাকে সেখানে ফেরেস্তা প্রবেশ করে না।’[১৯] তবে ইগনাস গোল্ডজিহের দাবী করেন যে, নবীজীর সময়ে কুকুরকে অপবিত্র বিবেচনা করা হত না।[২০] পরবর্তীতে ইসলামিক আইনগ্রন্থগুলিতে তাদেরকে অপবিত্র ঘোষণা করা হয়েছে।

বুখারীতে আরও আছে- “যে ব্যক্তি শিকারী কুকুর, শস্যক্ষেত অথবা জন্তুদের হেফাজতকারী কুকুর ব্যতিত অন্য কুকুর পালন করে, প্রত্যহ তার পূণ্য থেকে দু‘কীরাত (কীরাত একটি ছোট্ট ওজনের নাম) হ্রাস পায়।”[২১] অর্থাৎ অপবিত্র হলেও প্রহরী কুকুর, ভেড়া চরানো কুকুর এবং বিশেষত: শিকারী কুকুর অনুমোদিত।[২২] এটা এ কারণে যে প্রশিক্ষিত কুকুর পশুসম্পদ হিসেবে বিবেচিত। আর তা তাদের ক্রয়, বিক্রয় ও ভাড়া প্রদান অনুমোদিত।[২৩] শিকারী কুকুর কর্তৃক ধৃত প্রাণীর মাংস অপবিত্র হবে না, যদি কি-না প্রাণীটি নিজে হারামের অন্তর্ভূক্ত না হয়।[২৪]


সুন্নি আইনের কিতাবগুলিতে অমুসলিমদের দ্বারা প্রশিক্ষিত শিকারী কুকুর ব্যবহারে কিছু বিধি-নিষেধ রয়েছে। কোন এক রেওয়াতে এ দাবী করা হয়েছে যে, নবী মুহাম্মদ অগ্নিউপাস্য কারো দ্বারা প্রশিক্ষিত কোন শিকারী কুকুরের শিকার করা প্রাণীর মাংস নিষিদ্ধ করেছেন।[২৫] অবশ্য পন্ডিতগণের অনেকে এটি প্রত্যাখ্যান করেন। তবে কিছু শিয়া পন্ডিতগণ অভিমত দেন যে, যদি শিকারী নিজে মুসলিম হয়, তবে এটা কোন বিবেচ্য বিষয় নয় কে কুকুরটিকে প্রশিক্ষিত করেছে।[২৬] অন্যদিকে, কালো কুকুরের শিকার করা প্রাণীর মাংসের বৈধতার ব্যাপারে কিছুটা সন্দেহ রয়ে গেছে,[২৭] যা সম্ভবত: শয়তানের সাথে কালো কুকুরের সম্পৃক্ততার নিকটপ্রাচ্যীয় এক সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।


মালেক বিন আনাসকে মক্কায় হজ্বব্রত পালনের কাজে একটি কুকুর বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থ ব্যবহার করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। ইসলামে যুদ্ধলব্ধ “গণিমতের মাল” হিসেবে সংগৃহীত প্রশিক্ষিত ‍কোন কুকুর, যার তা প্রয়োজন তাকে দেবার অনুমতি একজন ঈমামের রয়েছে।[২৮] যদি কেউ কারো কুকুরকে হত্যা বা জখম করে, তবে তাকে কুকুরের মালিককে জরিমানা দিতে হবে।[২৯] বিপরীতভাবে, কুকুর মালিক আইনগতভাবে যেমন তার কুকুর দ্বারা কারো ব্যক্তিগত জখম বা সম্পত্তির ক্ষতির জন্য দায়ী হবে[৩০], তেমনি দায়ী হবে নিজ কুকুরকে উৎপাতে নিবৃত্ত করতে না পারার জন্য[৩১]


প্রাণীকূল জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে কি-না সে প্রশ্নে অনেক পন্ডিতই সম্ভবত: বিতর্কে জড়িয়েছেন এবং অবশেষে একটি আপোষ মিমাংসায় পৌঁছেছেন যে, কেবলমাত্র তিনটি (কিছু সূত্রমতে চার) প্রাণীকে জান্নাতে প্রবেশ করার অনুমতি দেয়া হবে, যার একটি হবে আসহাব আল-কাহফ-এ উল্লেখিত ঐ বিশ্বস্ত কুকুর।[৩২]


কাব্য ও পুরাণে কুকুর:
বনে পরিত্যাক্ত শিশুদের বিভিন্ন জানোয়ার দ্বারা লালন-পালনের অনেক কাহিনী ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে, যদিও প্রায়শ: সেগুলো কিংবদন্তি, কিন্তু এটার সত্যায়ন করা যায় যে, মানব শিশু কুকুর দ্বারা পালিত হতে পারে।[৩৩] বেশকিছু সুপারহিরো, দেবতা এবং প্রাচীন কিংবদন্তি চরিত্র কুকুর দ্বারা পালিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।হেরোডোটাস এক কিংবদন্তি উল্লেখ করেছেন, যাতে এক মাদী কুকুর সাইরাস দি গ্রেটকে স্তন্যপান করিয়েছে।[৩৪]

একইভাবে মোজমাল লেখক তার হিংস্র স্বভাব গুণ “দি ফাদার অব সকলাব” লাভ করেন একটি কুকুর দ্বারা পালিত হবার কারণে[৩৫] বাহমান-নামায় উল্লেখ করা হয়েছে-, যারা শিশু অবস্থায় কুকুর দ্বারা পালিত হয়েছিল, সহিংসতা বারবার তাদের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে[৩৬] শাহনামার কিছু কিছু মৌখিক সংস্করণে বলা হয়ে থাকে, আফ্রাসিয়াব তার উগ্র মেজাজ লাভ করেছিলেন কুকুরের দুধ পান করার কারণে[৩৭] কথিত আছে, দুষ্ট রাজা জাহক একটি মাদী নেকড়ে দ্বারা পালিত হয়েছিলেন[৩৮] আরেকটি নামহীন কাব্যিক চরিত্র, নেবু চাঁদ নেজ্জার, কথিত আছে, জন্মের পর তার পিতা-মাতা তাকে পরিত্যাগ করেছিলেন সম্ভবত: তার কুৎসিৎ চেহারার জন্যে ঐ সময় এক মাদী কুকুর তাকে দিনে তিনবার দুধ পান করিয়ে যেত[৩৯]


কিংবদন্তি রয়েছে-, আর্মেনিয়ান রাজা আরদাভাজদকে মাসিস পর্বতে শিকলে বেঁধে রাখা হয়েছিল; ঐসময় তার শিকারী কুকুর ঐ শিকল চিবিয়ে তাকে মুক্ত করার চেষ্টা করে। অত্যাচারী ঐ সম্রাটের স্মরণে আজও আর্মেনিয়ান কামারগণ সপ্তাহ শেষে কাজ বন্ধ করার সময় আনুষ্ঠানিকভাবে তার নেহাইয়ে হাতুড়ীর এক ঘা মারে দৈবিকভাবে সেই শিকলটি আবার জোড়া লাগানোর কামনায়[৪০] সমকালীন বোয়ের আহমাদীর এক কাহিনী অনুসারে, ম্যাসেনীয় শাসক কায়খসরু পারস্যের ফার্স প্রদেশের একটি গুহার মধ্যে তার ঘোড়া ও শিকারী কুকুরের সঙ্গে লুকিয়ে রয়েছেন[৪১] এছাড়াও কাব্য সাহিত্য থেকে পাওয়া শিকারী কুকুরের সাথে রাজা-বাদশাদের প্রত্যাশিত অনুসঙ্গের কারণে, কুকুর ফার্সি বীরত্বপূর্ণ গল্পগুলোতে অন্যান্য ভূমিকাও পালন করেছে।


শাহনামা ও অন্যান্য আরো কিছু উৎসে একটি বিখ্যাত কাহিনী আছে। বাহরাম বাদশা ৫ম, প্রত্যক্ষ করেন যে, তার বিশ্বাসঘাতক মেষপালক কুকুরটিকে এক রাখাল সেবা-শ্রুশুষা করছে, আর যখন সে নেকড়ের মত বড় হয়ে উঠল, তখন উদ্বুদ্ধ হল মনিবের ভেড়ার পাল ধ্বংস করার কাজে। অার এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে তিনি তার স্বৈরাচারী উজিরের অত্যাচারের বিষয়টি বুঝতে পারেন[৪২] ১ম আরদাসিরের কাব্যের এক কৌতুহল উদ্দীপক ভার্সন রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে- সাধারণভাবে উল্লেখিত রামছাগল ছাড়াও এক মহান কুকুর তার যাত্রাকালে তাকে অনুসরণ করেছিল[৪৩]


গুপ্ত ও সূফী সাহিত্যে কুকুর:
পার্স্যিয়ান জীবনধারায় কুকুরের বিনম্র অবস্থানের কারণে, গুপ্ত ও সূফী সাহিত্য পুস্তকগুলোতে সে নম্রতার এক প্রতীক হয়ে ওঠে। কিছু মুসলিম সূত্র মতে, এক মৃত কুকুরের দাঁতের শুভ্রতার প্রশংসা না করে তার শবদেহের দুর্গন্ধ সমালোচনা করায় যিশু তার শিষ্যদের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন[৪৪]

কথিত আছে- নূহ (নূহ-শোককারী; একটি জনপ্রিয় শব্দতত্ত্ব অনুসারে এটি আরবী রুট থেকে এসেছে) তার এ নাম লাভ করেন, কারণ, একটি কুকুরের প্রতি বিরক্তি প্রকাশের জন্যে খোদা তাকে তিরস্কার করেছিলেন, যা তাকে স্বীয় কৃতকর্মের জন্যে তীব্র অনুশোচনা ও বিলাপ করতে অনুপ্রাণিত করেছিল[৪৫]


সূফী মা’সূক তুসি একবার একটি ঢিল ছুঁড়ে একটি কুকুরকে আঘাত করেন। তৎক্ষণাৎ এক অশ্বারোহী দূত হাজির হয় এবং তাকে চাবুক মেরে তীব্রস্বরে বলে যে, খোদার দৃষ্টিতে তার সাধুত্ব মোটেও উত্তম নয় ঐ প্রাণীর তুলনায়, যার সাথে সে দূর্ব্যবহার করেছে। অনেক অধ্যাত্মিক সাধক এমনও প্রচার করেছেন যে, কুকুরই প্রথম তাদেরকে নম্রতা শিক্ষা দিয়েছে[৪৬]


এক রেওয়াত মতে- নবীজী বলেন-“নীতিহীন মানুষের চেয়ে কুকুর উত্তম।”[৪৭] অনুরূপভাবে- এক সূফী মুয়াজ্জ্বিনকে অভিশাপ দেন তার আযানের জন্যে, কারণ, তিনি এক কুকুরের প্রশংসায় মগ্ন ছিলেন যে সেই সময় উচ্চরবে খোদার গুণগান করছিল[৪৮]


প্রাচীন চিকিৎসায় কুকুর:

কুকুরের হাঁড় এবং টিস্যু সফলভাবে মানব দেহে প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে- এ বিশ্বাস অনুযায়ী পার্স্যিয়ান চিকিৎসক বাহা-আল-দৌলা তার খোলাসাত আল-তাজারেব পুস্তকে উল্লেখ করেন যে, সেখানে বসবাসরত একজন ভারতীয় ডাক্তার সফলভাবে একটুকরো কুকুরের চামড়া একজন রোগীর মাথার খুলিতে গ্রাফটিং করেন। ঐ রোগী ইমপিটিগোতে (এক ধরণের ব্যাক্টেরিয়া জনিত চর্মরোগ) আক্রান্ত ছিল। ডাক্তার প্রথমে রোগীকে অবশ করে তার মাথার চামড়া অপসারণ করেন। তারপর কুকুরের চামড়া তার খুলিতে গ্রাফটিং করে বিভিন্ন মলম দিয়ে ক্ষতের পরিচর্য়া করেন। এই ত্বক প্রতিস্থাপণের কাজ সম্পূর্ণ সফল হয় এবং রোগী আরোগ্য লাভ করে।

জলাতঙ্ক রোগ যা সবচেয়ে নাটকীয়ভাবে কুকুরকে প্রভাবিত করে, একসময় মানুষের অনেক উদ্বেগের কারণ হয়েছিল। এই রোগের অনেক প্রাক-পাস্তুরিয়ান নিরাময়ের কথা রিভিন্ন ভেজষ-ওষধিতে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমদিককার আরবীয় এক চিকিৎসা পুস্তকে জলাতঙ্ক প্রতিকারের এক ঔষধি, জলাতঙ্কে আক্রান্ত কুকুরের প্লীহা বা যকৃত থেকে তৈরীর কথা অন্তর্ভুক্ত করা হয়[৪৯]


প্রাচীনকালে, কুকুরের দুধ বিষের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতিষেধক হিসেবে বিবেচনা করা হত এবং আরো বিশ্বাস করা হত, এ দুধ পানে মৃত ভ্রূণ ও অমরাকে গর্ভ থেকে বের হওয়া ত্বরান্বিত করে। এছাড়া, স্তনের ব্যাথা উপশমে সদ্য জন্ম দেয়া কুকুরের দুধ পানে নারীদের অনুমতি ছিল[৫০] আবার, ফোঁড়া ও আবের চিকিৎসায় কুকুরের মূত্র ব্যবহার করা হত। এর আরও ব্যবহার ছিল সংক্রামক এবং বিষাক্ত প্রাণীর কাঁমড় চিকিৎসায়[৫১]


জাদুতে কুকুর:
শয়তানের সঙ্গে কুকুরের যোগসূত্রের ধারণা এই প্রাণীটিকে নির্মূল করার কয়েকটি প্রচেষ্টায় প্রেরণা হিসেবে কাজ করে থাকতে পারে। কথিত আছে- নবী মুহাম্মদ (এবং পরে ইউসূফ বিন হাজ্জাজ), সব কুকুর হত্যা করতে আদেশ দেন, কিন্তু পরে তা সংশোধন করে কেবল কালো কুকুরের ক্ষেত্রে, বিশেষত: যাদের চোখের উপর দু’টি স্পট আছে, সেটি বলবৎ করতে বলেন[৫২]

কালো কুকুর জাদুতে প্রসিদ্ধ হয়ে আছে। শয়তানের সাথে তার যোগসূত্রতার কারণে অনেকের এ ধারণা রয়েছে যে, তার কোন ক্ষতি করলে অপরাধীর জন্যে তা শারিরিক আঘাত বা কোন দূর্ভাগ্য বয়ে আনবে[৫৩] খোরাসানে এমনও বিশ্বাস প্রচলিত ছিল- যে একটি কুকুর হত্যা করে, সে একটি শিশুসন্তান হারাবে বা সাত বৎসর দূর্ভাগ্যের শিকার হবে[৫৪] কুকুরের ক্ষতির বিরুদ্ধে এধরণের বিশ্বাস, অন্তত: আংশিকভাবে হলেও তা প্রাকইসলামী কূসংস্কারের প্রতিফলন করছে। আর এ তুলে ধরা হল, এটা প্রমান করতে যে, ইসলামেও পশুর সাথে শয়তানের যোগসূত্র রয়েছে এমনটা বিশ্বাস করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ৯বম শতাব্দীর দিকে কুকুরের কল্যাণে জরাস্ট্রিয়ান সচেনতা ইতিমধ্যে সামনে নিয়ে এসেছে যে, তা ছিল কেবল কুকুরের কূ-নজর প্রতিহত করার একটা প্রচেষ্টা। আমর বিন বাহার জাহেয আরো উল্লেখ করেন যে, পাস্যিয়ানগণ কূ-নজর ভীতির কারণে জন্তু-জানোয়ারের সামনে খাওয়া-দাওয়া করত না, বিশেষ করে কুকুরের সামনে[৫৫] ডোনাল্ডসনও বলেছেন যে, কুকুরের কূ-নি:শ্বাসের ভয়ে পার্স্যিয়ানরা খাবার সময় তাকে তাদের কাছে আসতে অনুমতি দেয় না[৫৬] অন্তত একটি শিয়া উৎসে এই নিষেধাজ্ঞা আলী ইবনে আবি তালিবের নামেও আরোপিত হয়েছে[৫৭] অপর এক বর্ণনা মতে, ইমাম হাসানকে একটি কুকুরের সামনে আহার করতে দেখা যায়, ঐ সময় তিনি কুকুরকে একটি করে রুটির টুকরো দিচ্ছিলেন তার নিজের খাওয়া প্রতিটি টুকরোর বিনিময়ে[৫৮] লোককাহিনী মতে, একটি পাহারাদার কুকুরকে কেউ খাবার থেকে বঞ্চিত করলে সে বুলিমিয়াতে আক্রান্ত হয়[৫৯]


এছাড়াও সাগদিদের প্রাক-ইসলামী অনুষ্ঠানগুলো কিছু মুসলিম লেখক দ্বারা পুনঃসংস্কারকৃত এবং যৌক্তিকীকরণ করা হয়েছিল[৬০] উদাহরণস্বরূপ, অগ্নিপূজকগণ তাদের শবদেহ কুকুরের জন্য উন্মুক্ত করে রাখে, কারণ, প্রাণীটির গন্ধ নেবার তীক্ষ্ণ অনুভূতি তাদেরকে নিরুপণ করতে সাহায্য করে, ব্যক্তিটি প্রকৃতই মৃত না-কি নিছক অজ্ঞান হয়ে পড়েছে[৬১]


বিশ্বাস করা হয়, কুকুর ফেরেস্তা ও জ্বীণদেরকে দেখতে পায়[৬২] এবং এই বিশ্বাস নবীজীর কিছু রেওয়াতেও দেখতে পাওয়া যায়[৬৩] এটাই হয়ত: এসব গল্পের জন্ম দিয়েছে যে, প্রাণীরা মহান পুরুষদের উত্থান ও পতনের পূর্বাভাস দিয়ে থাকে[৬৪] অথবা, এমন বিশ্বাস যে, তারা ডাইনিদের জন্যে পর্বতস্বরূপ কাজ করে[৬৫]


যাদু সৃষ্টির বেশকিছু চর্চায়, বিশেষত: কোন একটি পরিবারের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি বা ধ্বংস করতে কুকুর বা কুকুরের সঙ্গে সম্পর্কিত কোন বস্তু ব্যবহার করা হত[৬৬] কুকুর অশুভ প্রকৃতির- এই বিশ্বাস প্রকাশ পেয়েছে নানান কুসংস্কারে- সকালে ঘুম থেকে উঠেই কোন কুকুর দর্শণ খারাপ লক্ষণ এবং দু’টি কুকুরের মধ্যে দিয়ে গমন দূর্ভাগ্য বয়ে আনে, ইত্যাদি[৬৭] কুকুরকে এড়িয়ে চলা হয় সাঁজগোজ করার সময় যেন তাদের দৃষ্টি বা নৈকট্য সৌন্দর্য়্য প্রভাবকে খর্বকরে না ফেলে[৬৮] খুজিস্তানের কোহনাক গ্রামে এমন একটি ব্যাপক বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে যে, কোন বিড়ালের গায়ে কেউ পানি ছিটিয়ে দিলে তার হাতে ফোঁড়া হবে বা তার হাত কুকুরের মত হয়ে যাবে[৬৯]


স্বাভাবিকভাবেই এমন একটি শক্তিশালী প্রাণী প্রায়শ:বিপদ আপদের বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হত। লোকেরা বিশ্বাস করত, হাতের কব্জিতে একটি পাগলা কুকুরের দাঁত পরলে বা সাথে একটি কালো কুকুরের জিহবা রাখলে পাগলা জন্তুর আক্রমণ থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। দাঁত উঠতে শুরু করেছে এমন একটি শিশুর গলায় একটি কুকুরের দাঁত ঝুলিয়ে দিলে তার দাঁত ওঠা ত্বরান্বিত করবে। কুকুরের শুকনো লিঙ্গ কারো উরুতে বেঁধে দিলে তার কামেচ্ছা বৃদ্ধি পাবে, ইত্যাদি[৭০]


জাদু বা মায়াজালে কুকুরছানার মস্তিষ্ক ব্যবহার করা হত[৭১]  কুকুরের পাতলা দুধ জাদুগ্রস্থের মাথায় ঢাললে এবং সন্দেহভাজন কোন ভৌতিক বাড়ির অভ্যান্তরে একটি সাদা কুকুরের বিষ্ঠা জ্বালিয়ে ধোঁয়া ছড়িয়ে দিলে মোহিনীশক্তি বিনষ্ট হয়। আর মজার ব্যাপার হচ্ছে, এটি এই শতাব্দীতেও শক্তিশালী অপশক্তি দূরকারী হিসেবে বিবেচিত হয়েছে[৭২] এছাড়াও বিশ্বাস করা হয়, কুকুর দুস্প্রাপ্য মান্ডারেকের (মান্ডারেক/মেহেরগিয়াহ; ফার্সি-সাগকান অর্থ “কুকুর দ্বারা উত্তেলিত”; এক ধরণের ভূ-মধ্য সাগরীয় উদ্ভিদ) মূল অনুসন্ধান করতে সক্ষম[৭৩] মান্ডারেক বন্ধ্যাকে সন্তান জন্মদানে সক্ষম করে বলে বিশ্বাস করা হয়। আর এসব বিশ্বাসকারীদের বক্তব্য হল ইয়াকুব পত্নী রাহেলা এই মান্ডারেকের গুণেই ইউসূফকে সন্তান হিসেবে লাভ করেছিল[৭৪]

স্বপ্ন বিদ্যায় কুকুর সাধারণত: দুর্বল শত্রুর প্রতিনিধিত্ব করে। স্বপ্নে একটা শিকারি কুকুর দর্শন একজন বিজ্ঞ ব্যক্তির শত্রু রূপে; এবং কুর্দি ও তুর্কি কুকুর বহিরাগত শত্রু হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়। তবে স্বপ্নে কোন কুকুরকে মাংস বা পরিচ্ছদ ছিঁড়তে দেখার অর্থ করা হত আসন্ন কোন সহিংস মারামারি বা প্রতিদ্বন্দ্বী শত্রুর (স্বপ্নদর্শীর জন্য পরাক্রমী) আক্রমণের সতর্কবাণী। একইভাবে কুত্তী [মাদী কুকুর] বিবেচিত হত দুশ্চরিত্রা ও বদমেজাজী স্ত্রীর প্রতীকীরূপে[৭৫] কথিত আছে, নবীজী স্বপ্নে দেখেন ছোপযুক্ত তার রক্ত চেটে খাচ্ছে; জেগে গিয়ে তিনি ঐ স্বপ্নের অর্থ করেন যে, তার প্রপৌত্র হোসেন শ্বেত রোগে আক্রান্ত এক ব্যক্তির হাতে শহীদ হবেন - আর এ তার আগাম পূর্বাভাস[৭৬]

পার্স্যিয়ান লোককাহিনীতে প্রায় সর্বসম্মত মতামত রয়েছে আর্তনাদকারী কুকুরের অশুভতা সম্পর্কে[৭৭] কেবলমাত্র মৃত্যুই নয় বরং ভূমিকম্প ও মহামারীর আগমণও ধারণা করা হত ঐশ্বরিকভাবে আর্তনাদকারী কুকুর থেকে আসে[৭৮] এছাড়া আবহাওয়ারও পূর্বাভাস কুকুরের আচরণ থেকে দেয়া হত: ধূলায় গড়াগড়ি খাওয়া কুকুর ঝড়ের পূর্বাভাস। আবার শীতের দিনে ছাউনির মধ্যে শুয়ে থাকা গ্রীষ্মকাল আগমনের পূর্বাভাস[৭৯]

জিলানে বিশ্বাস করা হত, শিয়ালের আর্তনাদের প্রতিউত্তরে কুকুর আর্তনাদ করলে পরদিন আবহাওয়া ভাল হবে[৮০] পারস্যের শিরাজীরা, প্রথম তুষারপাতকে বলত “তুষার কুকুর” (বরফ-ই-স্যাগ), এবং এ বিশ্বাস করা হত যে, কারো এটা খাওয়া উচিত নয়[৮১] আবহাওয়ার সঙ্গে কুকুরের সংযোগে বিশ্বাস আবহাওয়ার উন্নতির লক্ষ্যে অনেকগুলো ঐন্দ্রজালিক চর্চার সূচনা করেছে। উদাহরণ স্বরূপ, আজারবাইজানের কোর্রাম দার্রায় স্যাগ দাবানি (কুকুর তাড়ানো)  নামে একটা ধর্মীয় পর্ব অনুষ্ঠিত হয়, শৈত্য প্রবাহ ও তুষার ঝড় বন্ধ করার উদ্দেশ্যে। অধিবাসীরা আশেপাশে কোন কুকুর দেখলে তাকে প্রহার করতে করতে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় যতক্ষণ না সে অবসন্ন হয়ে পুরোপুরি হারমানে। আর তাকে এভাবে তাড়িয়ে দূর করে দেওয়াতে তারা বিশ্বাস করে শৈত্য প্রবাহকেও তারা দূর করে দিতে পেরেছে[৮২]

দৈনিন্দন কাজে কুকুরের ব্যবহার:
শিকারী কুকুর অভিজাত ও সাধারণ উভয় শ্রেণীর দ্বারা অত্যন্ত প্রশংসিত হত[৮৩] তাদের ছিল দীর্ঘ বাহুর, ছোট মাথার, ও উত্থিত চক্ষুগোলক[৮৪] রাজকীয় শিকারী কুকুরগুলোকে সচরাচর স্বর্ণ ও সূক্ষ্ম কাপড় পরিয়ে রাখা হত[৮৫] এছাড়াও অভিজাত সরকারী কর্মচারীরাও খাদ্য পরীক্ষক হিসেবে কুকুর ব্যবহার করত। কথিত আছে, খলিফা হারুনুর রশীদের মাতা মৃত্যু প্রতিহত করেছিলেন বিষ সন্দেহভাজন একটি খাবার ডিশ একটি কুকুরকে দেবার মাধ্যমে[৮৬] বেশকিছু কাহিনী অনুসারে, অনেক রাজা কুকুর পুষতেন এবং তাদের সম্মুখে তার বিরোধিতাকারীদেরকে ছুঁড়ে দিতেন ছিঁড়ে খেয়ে ফেলার জন্যে[৮৭]

যদিও নবীজী প্রাণীদের লড়া্ই নিষিদ্ধ করেছেন[৮৮], তথাপি ইসলামী শাসনামলেও এর চর্চা পার্স্যিয়ান সাংস্কৃতিক মন্ডলে ভালভাবেই প্রচলিত ছিল[৮৯] কখনও কখনও কুকুরদেরকে অন্য প্রাণীদের সাথে লড়াই করতে দেয়া হত। জাহেয একটি মোরগ ও একটি কুকুরের মধ্যে লড়াইয়ের এক ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন[৯০] স্পষ্টতই হলুদ বা লালচে রং এর গুলোই পছন্দনীয় ছিল[৯১]

স্যাগবান বা স্যাগ-বান্দা নামে একদল লোক ছিল, যাদের কাজই ছিল কুকুর পরিচর্চা করা[৯২] কুকুর প্রশিক্ষিত করা হত এবং নির্দিষ্ট কোন দক্ষতার কুকুর উচ্চ প্রশংসিত হত। জাহেয উল্লেখ করেছেন-কুকুরকে মাথার উপর ভর দিয়ে দাড়ানো শেখানো হত এবং ফর্দ ও অর্থ দিয়ে মুদি পণ্য-দ্রব্য ক্রয়ে পাঠানো হত, আর বিক্রেতা নির্দিষ্ট দ্রব্য তার থলিতে দিলে, সে তা তার মালিকের নিকট বয়ে আনত[৯৩] অবশ্য কুকুরকে জড়িয়ে নানা পাশবিকতার তথ্যও আছে[৯৪]

গল্প ও লোকগাঁথায় কুকুর:
এসোপিয়ান কর্পাসের কুকুর সম্পর্কিত নৈতিক উপদেশমূলক গল্পগুলো পার্স্যিয়ান সাহিত্য ও লোককাহিনীতেও পাওয়া যায়। সবচেয়ে বিখ্যাত গল্পটি হল ঐ কুকুর সম্বন্ধে যে পানিতে নিজের ছায়া দেখে অপর আরেকটি কুকুর মনে করে স্বভাববশত: ডেকে উঠে নিজ মুখে ধরে রাখা মাংসের টুকরো পানিতে ফেলে দিয়েছিল[৯৫] অন্যগুলো শ্রেণীবদ্ধ হয়েছে উলরিখ মারজলফ কর্তৃক, যিনিও কুকুর সম্পর্কিত পার্স্যিয় উপকথার গল্পগুলোর ধরণ অনুসারে একটা সুবিধাজনক তালিকা দিয়েছেন। বিশেষকরে কুকুরের বিশ্বস্ততার গল্পগুলো মৌখিক এবং লিখিত উৎসসমূহে সুন্দরভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। এক সংকলনে এক পোষ্য কুকুর (বা বেজি) সাপের কাঁমড় থেকে মনিবের শিশু সন্তানকে রক্ষায় সেটিকে কাঁমড়ে হত্যা করে। এদিকে পিতা কুকুরের রক্তাক্ত মুখ দেখে ভাবে যে তার সন্তানকে সে খেয়ে ফেলেছে। রাগান্বিত হয়ে ঐ মনিব তার কুকুরকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। অত:পর সে সত্য জানতে পারে[৯৬] এ ধরণের কাহিনী বেশ প্রচলিত।

এক ব্যক্তি তার বিশ্বস্ত কুকুরকে তার এক ঋণের জামানত হিসাবে রাখে। কুকুরটি পাওনাদারকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে। এতে খুশী হয়ে পাওনাদার কুকুর মালিকের ঋণ ক্ষমা করে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে একটি চিরকূট কুকুরের গলায় বেঁধে দিয়ে তাকে মালিকের বাড়ীতে ফেরৎ পাঠায়। এদিকে বাড়ীর দিকে তার কুকুরকে আসতে দেখে মালিক বুঝতে পারে সে পালিয়ে চলে এসেছে। অার পালিয়ে এসে পাওনাদারের কাছে তার কুকুর তাকে অসম্মনিত করেছে এ্ই রাগে সে পিটিয়ে কুকুরটিকে সেখানেই হত্যা করে এবং তারপর চিঠি খুঁজে পায়[৯৭] অন্যান্য কাহিনীতে দেখা যায়, নিহত ব্যাক্তির কুকুর তার মনিবের হত্যাকারীকে আক্রমণ করে হত্যা করেছে বা তার নিজ বুদ্ধিমত্তায় হত্যাকারী সনাক্তে কর্তৃপক্ষকে সাহায্য করেছে[৯৮] 

অনেক কাহিনীতে আমৃত্যু কুকুরের প্রভুভক্ততা উদাহরণ হয়ে রয়েছে। এক কাহিনীতে দেখা যায়, মনিবের মৃত্যুর পর তার বিশ্বস্ত কুকুর তার মৃতদেহ ফেলে চলে যায়নি বরং অনাহারে আমৃত্যু ভগ্নহৃদয়ে মনিবের মৃতদেহের পাশে বসে সযত্নে সেটি আগলে রাখে যাতে কোন বন্যপশু ও পাখি তার কোন ক্ষতি করতে না পারে[৯৯] এমনও কিছু কুকুরের কাহিনী রয়েছে যারা তাদের মনিবকে বিপদ ও মৃত্যুর হাত থেকে উদ্ধার করেছে[১০০] 

কথা ও লেখ্য সাহিত্যে জাদু বা ইন্দ্রজালের সাহায্যে মানুষকে কুকুরে রূপান্তরিত করা সাধারণভাবে স্বীকৃত[১০১] বিকল্পভাবে একজন নিহত ব্যক্তির আত্মা কুকুরের শরীরে প্রবেশ করতে পারে এবং একটা কুকুরের জীবন-যাপন করে ঝুঁকি উৎঘাটন না করে[১০২] 

জরথুস্ট্রবাদে কুকুর:
স্পষ্টত:ই মৃত্যুর এক অতিপ্রাকৃত কুকুরে ইন্দো-ইউরোপীয়ান বিশ্বাস ছিল এবং একে ঋগ্বেদে দেখান হয়েছে যমের চার চক্ষু বিশিষ্ট হাউন্ডস রূপে, যে পাহারায় নিয়োজিত আত্মাগণের ভবিষ্যৎ বাসস্থানের দিকে গমণের পথটি[১০৩] পার্সি ধর্মে বলা হয়েছে -দু’টো কুকুর সিনভাট সেতুর (“ব্রিজ অব জাজমেন্ট”) উপর দাঁড়িয়ে থাকবে নারীরূপে (ডায়না) যে, আত্মাদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করবে। অার তাদেরকে বলা হয়েছে “দুই সেতু-রক্ষা কুকুর"-[১০৪] 

মরণশীল কুকুরগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে আভেস্তার ‘বৈধ’ [দাদিগ] কিতাবগুলোতে বিশেষকরে ভিদেভদাদ এবং প্রায় অপষ্মৃত দুজদ্ড-সার-নিজাদে। দু‘ধরণের কুকুরের উল্লেখ রয়েছে: পশু রক্ষা ও গৃহ পাহারা। অন্যান্য কুকুররা প্রভুহীন হিসেবে স্বীকৃত। 

পশু ও গৃহ পাহারার কুকুরের প্রতি মানুষের কৃতজ্ঞ থাকা উচিৎ, কেননা আহুরা মাজদা ঘোষণা করেছেন: “No house would stand *firmly founded* for me on the Ahura-created earth were there not my herd dog or house dog”।-[১০৫]  কুকুরের প্রতি দায়িত্ববোধকে বারবার মানুষের প্রতি দায়িত্বরোধের সাথে সম্পর্কিত করা হয়েছে। হুস্পারাম নসকে মানুষ, শিশু ও তিন প্রকার কুকুরের প্রয়োজনীয় পরিমান খাবারের তালিকা দেয়া হয়েছে। অসুস্থ্য কুকুরকে অসুস্থ্য মানুষের মতই দেখভাল করার কথা বলা হয়েছে-[১০৬]গর্ভবতী কুকুরের স্বাস্থ্যের প্রতি গর্ভবতী নারীর মতই যত্ন নিতে বলা হয়েছে-[১০৭] কুকুর ছানাগুলোকে ৬মাস এবং মানব শিশুকে ৭ বৎসর যত্ন নিতে বলা হয়েছে-[১০৮]

নৃবিদ্যায় কুকুর:
প্রাক ইসলামী পারস্যে কুকুরের প্রতি থাকা মনোভাবের সাথে তুলনায়, বর্তমান পার্স্যিয়ান ও আফগান মুসলিমদেরও, সারা দুনিয়ার অধিকাংশ মুসলমানদের মত সাধারণত: বিপরীত। তারা মনে করে প্রাণীটি অপবিত্র এবং যতটা সম্ভব তার সংস্পর্শ তারা এড়িয়ে চলে। তাদের জন্যে কুকুরের মাংস খাওয়া সম্পূর্ণরূপে হারাম। ইমাম জাফর আল-সাদিকের মতে, এমনকি বাড়িতে কুকুর রাখাও (মাকরূহ)। -(ডোনাল্ডসন, পৃ.১৫৯) এভাবে তেহরানের উত্তর আবাসিক এলাকার সর্বাধিক পশ্চিমাপন্থী সংখ্যালঘুদের মধ্যে ছাড়া পারস্যে কুকুর পোষা একপ্রকার অপরিচিত হয়ে গেছে। আফগানিস্থানে পাপ্পী নামের শহুরে পোষ্য এক প্রাণী আছে "[যে] অন্তত দেখতে দক্ষিণ সাইবেরিয়া ও আরো উত্তরের স্পিটজ এর অনুরূপ", কিন্তু তা একটা প্রান্তিক উদাহরণ মাত্র; ইরানী বিশ্বে সাধারণ প্রবণতা হচ্ছে কুকুর এড়িয়ে চলা, এমনকি তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করা এ যুক্তিতে যে, আফগানিস্তানে “কোন আফগানের কুকুরকে প্রহারের ঘটনার বিষয় নিয়ে জড়িয়ে উরোপিয়ানদেরকে প্রায়শ: স্থানীয় জেলে বাস করতে হয়।

কুকুরের সাথে এমন আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে তারা বেওয়ারিশ হয়ে পড়ে বিশেষত: শহরে, যেখানে তারা নানা প্রকারের পরিত্যক্ত খাবার পায় ডাস্টবিনের আশেপাশে, তবে তারা যে গুরুত্ব বহন করে না এমন নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যে তারা হুমকিস্বরূপ [বিশেষ করে জলাতঙ্ক], ফলে পর্যায়ক্রমে প্রশাসনকে এ বিষয়টি তদারকি করতে হয়। আফগানিস্তানের বড় বড় শহরগুলোর রাস্তাঘাটকে  [বিশেষ করে কাবুল] প্রায়শ: কুকুরের দলকে হাঁক ডাক দিয়ে সরগরম করে তুলতে দেখা যায়। আর পুলিশ সেগুলোকে ধ্বংস করতে মাঝে মাঝে তাদের দিকে বিষাক্ত মাংস নিক্ষেপ করে, বা তাদেরকে ট্রাংকুলাইজড করে হত্যার উদ্দেশ্যে। তবে যারা বেঁচে থাকে তারা বেশ ভালোই থাকে। এশিয়ার অন্যান্য স্থানের তুলনায় তারা যথেষ্ট নাদুস-নুদুস।

বিদ্যমান এই বৈরিতা সত্ত্বেও, ফার্সি সংস্কৃতিতে কুকুরের জন্য অনুকূল মতামত ও আচরণের উদাহরণের কোন ঘাটতি নেই। ইতিমধ্যে ভিদেভদাদের গুরুত্বপূর্ণ ভার্সেসগুলো সনাক্ত হয়েছে এবং একটা প্যাসেজে এমনও প্রেসক্রাইব করা হয়েছে যে, ৬মাস বয়সী কুকুরছানাকে অল্পবয়সী মেয়েরা স্তন্যপান করবে, এতে তারা একই মেধা অর্জন করবে যেমন তাদের রয়েছে পবিত্র অগ্নির অভিভাবক রূপে।-(ভাউটসি, ১৯৮৯, পৃ. ৩৬৯; হোভেলাকি, পাছিম) অনুরূপ বার্তা সাদীর এক কবিতায়ও দেখতে পাওয়া যায়। এক ব্যক্তি মরুভূমিতে একটি তৃষ্ণার্ত কুকুর দেখতে পেয়ে সে তার টুপি এবং পাগড়ি ব্যবহার করে একটি কূপ থেকে পানি তুলে এনে কুকুরটিকে পান করায়। এই মহৎ কাজের জন্য খোদা তার সমস্ত গোনাহ মাফ করে দেন।-( সাদি পৃ.৮৫) কিছু সুফী সাধক কুকুরকে অতি উচ্চতায় স্থান দেন তার সাহস, ভক্তি, আনুগত্য এবং আরো অনেক গুণাবলীর জন্যে। 

তবে এটা পরিস্কার যে, পর্স্যিয়ানরা কুকুরের প্রতি শ্রেণীভিত্তিক আচরণ করে থাকে। প্রাচীনকাল থেকেই শিকারী কুকুর এবং পশু পালনের কাজে ব্যবহৃত কুকুর সাধারন শহুরে ও গ্রাম্য কুকুর থেকে পৃথকীকৃত। সেগুলেকে যত্নসহকারে প্রশিক্ষিত করা হয়। তারা শিকারকে হত্যা করার অনুমতি প্রাপ্ত নয়। এসব কারণে তাদের মূল্যায়ন ভিন্ন। তবে সেগুলো অমুসলিমদের হাতে প্রশিক্ষিত হলে হবে না। ধনীদের গৃহেই এসব কুকুর শোভা পেত আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে, যদিও তাদের অধিকাংশ এখন পারস্য থেকে বিলুপ্তির পথে, তবে ৭০ দশকে আফগানিস্তানে তাদেরকে ঘরে ঘরেই দেখা যেত।

অসমাপ্ত
সংশোধিত নয়।

উৎস:
--হাগাধা অব পেসাক, (অধ্যায়-৩)[১]
--ডি বি হুল, হাউন্ডস এন্ড হান্টিং ইন এনসিয়েন্ট গ্রীস, শিকাগো, ১৯৬৪।[২]
--এলিয়েন, ক্যারেক্টারেস্টিকস অব এনিমেল, (৭.৩৮)[৩](৬.২৫, ৭.১০)[৫]
--হেরোডেটাস, (৭.১৮৭)[৪] (১.১২২)[৩৪] 
--আজনবী শিরাজী, মর্দম ও কাহরা মানান-ই-শাহনামা, তেহরান।(খন্ড-৩, মস্কো, পৃ. ১৬৬)[৬](১৯৭৫, পৃ.৯৪-৯৫)[৪১](১৯৭৫, পৃ.৯৬-৯৭)[৩৭] (১৯৭৮, পৃ.২৩)[৩৮] (পৃ.২৭)[৩৯] (পৃ. ৩১৬-১৭)[৪০] -(পৃ.৮০-৮৩)[১০২] (খন্ড-২, পৃ. ৯)[৮২]
--বুন্দাহিসন, অনু. বাহার, তেহরান, ১৯৯০। (১৩.১০, ১৩.১৮, ২৪.৩৮, ২৪.৪৮)[৭]
--বার্ণাবাসের গসপেল, (অধ্যায়-৩৫-৩৬)[৮]
--মুহম্মদ বিন মূসা দামিরী, হায়াত আল-হায়াওন আল-কুবরা, কায়রো, ১৯৭০।(খন্ড ২, পৃ. ২৯৮)[৯](খন্ড-২, পৃ. ২৯১)[২৮] (খন্ড-২, পৃ. ২৫৩)[৪৭] (খন্ড-২, পৃ.২৫৭, ২৮৮-৯০)[৬৩] (খন্ড-২, পৃ. ২৫৯)[৬৫]  (খন্ড-২, পৃ. ২৯৬-৯৭)[৭০] (খন্ড-২, পৃ.২৯৭)[৭৫] (খন্ড-২, পৃ.২৫৫)[৭৬]  
--ফোজুনি আস্টারবাদী, বহেরা, তেহরান, ১৯১০। (পৃ. ৪৯০)[১০] (পৃ. ৪১৮)[৪৩] -(পৃ. ৫৩১)[৮৭] -(পৃ. ৫৩১)[৯৭] -(পৃ. ৫৩১-৩২)[৯৮] -(পৃ. ৫৩২-৩৪)[১০০] 
--এ, বালাজি, কিতাব-ই-তারিখ-ই নাইন, তেহরান, ১৯৪৯।(পৃ. ২০৪)[১১]
--আবু জাফর মুহম্মদ কল্যানী, কিতাব আল-কাফি, তেহরান, ১৯৮৮।(খন্ড ৬, পৃ. ২৪৫)[১২](খন্ড-৬, পৃ. ২০৬)[২৭] 
--আবদ-আল্লাহ ইবনে দোনিয়া, কিতাব আল-সামৎ ওয়া আদাব আল-লিসান, বৈরুত- ১৯৮৬[৩](পৃ. ৪০৪)[১৩]
--রশিদ আল-দীন মেবুদি, কাসফ আল-আছর ওয়া-ওদাত আল-আবর, তেহরান, ১৯৭৮।[৪] (খন্ড-১, পৃ. ৭৪৭)[১৪] (খন্ড-৩, পৃ. ২৭১)[১৫] (খন্ড-৪, পৃ. ৩৮১-৮২)[৪৫] (খন্ড-৩, পৃ. ১৭২)[৪৮] (খন্ড-৩, পৃ. ৩১)[৫২] -(খন্ড-১, পৃ. ৬১৫)[৯২] -(খন্ড-৩, পৃ. ৭৯০)[১০১] 
--এ ডোনাল্ডসন, দি ওয়াল্ড রু- এ স্টাডি অব মুহাম্মাদান ম্যাজিক এন্ড ফকলোর ইন ইরান, লন্ডন, ১৯৩৮[১৬] (পৃ. ১৫৯)[৫৬] (পৃ. ১৬০-৬১)[৭২] (পৃ. ১৫৯)[৭৮]  
--মুহম্মদ হাকিম তিরমিযি, আল-আমতাল  মিন আল-কিতাব ওয়া আল-সুন্নাহ, কায়রো, ১৯৭৫(পৃ. ১৬)[১৭]
--কোর’আনে, (৫:৪; ৭:১৭৬; ১৮:১৮, ২২)[১৮] 
--সহিহ বুখারী, (খন্ড-২, পৃ. ৮৮০)[১৯] [নম্বর-৫০৮৫; ৫০৮৬][১৯]  
--গোল্ডজিহের, ইসলামিজমত পার্স্যিজিজমে, ১৯০১(পৃ. ১-২৯)[২০] 
--মুহম্মদ বিন হোসেন তুসি, আল-মাবসূত ফিল ফিকাহ আল-ঈমানী, তেহরান, ১৯৭২।(খন্ড-১, পৃ. ৯২,৯৪)[২২] (খন্ড-২, পৃ. ১৬৫-৬৬)[২৩] (খন্ড-৬, পৃ. ২৫৬-৬২)[২৫] (খন্ড-৬, পৃ. ২৬২)[২৬]
(খন্ড-৮, পৃ. ৭৯)[৩০] (পৃ. ১৪৮)[৬৮]
--এম এন আলবানি, জাইফ সুনান আল-তিরমিযি, বৈরুত, ১৯৯১(পৃ. ১৭০)[২৪] 
--আব্বাস বিন মুহম্মদ রেজা কওমি, সাফিনাৎ আল-বিহার ওয়া মদিনাৎ আল-হিকাম ওয়াল আসর, বৈরুত, ১৯৩৬।(খন্ড-২, পৃ. ৪৮৮)[২৯] (খন্ড-২, পৃ. ৪৮৮)[৩২] (খন্ড-২, পৃ. ৪৮৮)[৫৮] (খন্ড-২, পৃ. ৪৮৭)[৬১]
--মুহম্মদ গাজ্জালী, কিমিয়া-ই-সা’দত, তেহরান, ১৯৮২।(খন্ড-১, পৃ. ৫২৩)[৩১] 
--আমর বিন বহর জাহেয, আল-হায়াওন, কায়রো, ১৯৬৮।(খন্ড-২, পৃ. ১৫৫-৫৬)[৩৩] (খন্ড-২, পৃ. ১৬৩)[৪৪] (খন্ড-২, পৃ. ১৩১)[৫৫] (খন্ড-১, পৃ. ৩৭৫, খন্ড-২, পৃ. ২৮৯)[৬০] -(খন্ড-২, পৃ. ১৬৩-৬৪, খন্ড-৫, পৃ. ২৪৬)[৮৯] -(খন্ড-১, পৃ.৩৭৬)[৯০] - (খন্ড-২, পৃ. ১৭৯)[৯৩] - (খন্ড-১, পৃ. ৩৬৯-৭১, ৩৭৩, খন্ড-৩, পৃ. ২০৩;)[৯৪] 
--মোজমাল আল-তারিখ আল-কিসাস, অনু. মুহম্মদ তাকি বাহার, তেহরান, ১৯৩৯। (পৃ. ১০৪)[৩৫] (পৃ.৭০, ৩৬৪)[৮৩] -(পৃ. ৩৪০)[৮৬]  
--ইরানশাহ বিন আবুল খায়ের, বহমান নামা, তেহরান, ১৯৯১।(পৃ. ২৬৮)[৩৬]
--আবু আলী হাসান ইবনে আল-তুসি, নিজাম-আল-মূলক। -(পৃ. ২৫-২৬)[৪২] (তুসি, পৃ. ৪৯৭)[৬৪]
--ফরিদ আল-দীন আত্তার, এলাহিনামা,  তেহরান, ১৯৭২।(পৃ. ৪৬-৪৭)[৪৬]
--মুহম্মদ বিন আয়ূব হাসেব তাবারী, তোফাত আল-গারেব,তেহরান, ১৯৯২।(পৃ. ৪২৬)[৪৯]
--মুহম্মদ মোমেন তনোকবনী, তোফা-ই- হাকিম মোমেন, তেহরান, ১৯৫৯।(পৃ. ২২২)[৫০] (পৃ. ২২২)[৬৬] 
--শাকুরজাদা, আকায়েদ ও রসুম-ই-মারদুম-ই-খোরাসান, তেহরান, ১৯৮৩।(পৃ. ২৪৯,৬২৮)[৫১](পৃ. ৩২১)[৫৪] (পৃ. ৩২১)[৬৭] (পৃ. ৩৩৮)[৭৯] 
--এস হেদায়েত, নেরঙ্গেস্তান, তেহরান, ১৯৬৩। (পৃ. ১৩৮)[৫৩] (পৃ. ১৩৮-৩৯)[৫৯] (পৃ. ১১৬)[৭১] 
--হা’য়েরী, কিতাব মোক্তাবিস আল-আত্তার, ৩০ খন্ড, তেহরান, ১৯৭১। (অধ্যায়-২৫, পৃ. ১০০)[৫৭]  
-থম্পসন, মোটিফ-ইন্ডেক্স অফ ফোক লিটারেচার, খন্ড ৬, ব্লুমিংটন, ইন্ডিয়া, ১৯৫৫।-(ই ৪২১.১.৩)[৬২] -(বি ৩৩১.২)[৯৬]  
--আর্ণি ও থম্পসন, দি টাইপ অব ফকটেল, হেলসিঙ্কি, ১৯৭৩।-(টি.৩৪এ)[৯৫] 
--এ করিমী, কোহনাক- অনর ও মরদম, তেহরান, ১৯৬৯।(পৃ. ৪৪)[৬৯] (পৃ.৪৪)[৭৭] 
--ফ্রেজার, ফকলোর ইন দ্যা ওল্ড টেস্টামেন্ট, খন্ড ৩, লন্ডন, ১৯১৯।(খন্ড-২, পৃ. ৩৮১)[৭৩] 
--জেনেসিস।(৩০:১৪-১৬)[৭৪] 
--এইচ এল রবিনো, লেস ট্রাইবুস ডু লরিস্তান, প্যারিস, ১৯১৬। (অনু, পৃ.৩৪)[৮০]
--ফকিরী, মোতাকাদাত-ই-মারদম-ই- শিরাজ, অনার -ও মারদম, তেহরান, ১৯৭২। (পৃ.৭১)[৮১]
--হামদ আল্লা মুস্তাফি, নুজহাত অাল-কোলাব, তেহরান, ১৯৮৪।-(পৃ.৪৯)[৮৪] -(পৃ. ২৮২)[৯৯]
--মুহম্মদ বিন মাহমুদ তুসি, আজিব আল-মখলুকাত, তেহরান, ১৯৬৬। -(পৃ. ৪১৬)[৮৫] - (তুসি, পৃ. ৫৮৪)[৯১]
--আবু দাউদ সুলায়মান বিন আস-সিজাস্তিনি, সুনান আবু দাউদ, বৈরুত, ১৯৭০।-(জিহাদ ৫১)[৮৮] 
--কি কেইথ, দি রিলিজিয়ন এন্ড ফিলোসফি অব দা বেদ এন্ড উপনিষদ, খন্ড-২, কেম্ব্রিজ, ১৯২৫।-(খন্ড-২, পৃ. ৪০৬-৭)[১০৩]
--ভিদেভদাদ, -(১৯.৩০; ১৩.৯)[১০৪] -(১৩.৪৯)[১০৫] -(১৩.৩৫)[১০৬] -(১৫.১৯)[১০৭] -(১৫.৪৫)[১০৮] 

২টি মন্তব্য:

  1. উন্নতমানের একটি ওয়েব টেম্পল ও ডোমেইন দিয়ে এই ব্লগটিকে আরো উন্নত করা যায়। চাইলে হেল্প করব

    উত্তরমুছুন
  2. ফেসবুকে আসুন, আলাপ করব।

    উত্তরমুছুন