pytheya.blogspot.com Webutation

১৭ জুন, ২০১৫

কোডেক্স গিগাস: কেন এটি শয়তানের বাইবেল হিসেবে খ্যাত?


কোডেক্স গিগাস (ল্যাটিন অর্থে বিশাল বই) বিশ্বের বৃহত্তম মধ্যযুগীয় পান্ডুলিপি। ধারণা করা হয়ে থাকে, ১৩’শ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বোহেমিয়ার (বর্তমান চেক প্রজাতন্ত্র) চরুদিম এর নিকটে পডলাজাইসের আশ্রমে এটি লিখিত হয়েছিল। এতে আছে- ভালগেট বাইবেল, ইসিদোরে অব সেভিল’স এনসাইক্লোপিডিয়া এটাইমোলজি, জোসেফাসের এন্টিকুইটিজ অব দা জিউজ, কসমাস অব প্রাগ এর ক্রোনিকেল অব বোহেমিয়া, চ্যাপ্টারস অব হিস্টিরি, এটাইমোলজি এন্ড ফিজিওলজি, এ ক্যালেন্ডার উইথ নেক্রোলোজিয়াম, এ লিস্ট অব ব্রাদারস ফ্রম দা পডলাজাইস মনস্টারী ও ডিটেইলস অব ম্যাজিক ফর্মূলা, স্পেলস, মেডিসিন ও অন্যান্য লোকাল রেকর্ডস। এটি “শয়তানের বাইবেল” হিসেবেও পরিচিত, কারণ এর ভিতর (২৯০ নম্বর পৃষ্ঠাজুড়ে) তার একটি প্রতিকৃতি রয়েছে এবং পৌরাণিক কাহিনী মতে এর লেখকও সে। বর্তমানে এটি সুইডেনের স্টকহোমে জাতীয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত রয়েছে।
কোডেক্স গিগাস
কোডেক্স গিগাস চামড়া এবং ধাতুর অলংকারে সজ্জ্বিত একটি কাষ্ঠ নির্মিত বাক্সে বিশেষভাবে রক্ষিত। এ্ই পুস্তকটি ৩৬.২ ইঞ্চি লম্বা, ১৯.৭ ইঞ্চি চওড়া এবং ৮.৬ ইঞ্চি পুরু এবং এর ওজন ৭৫ কেজি। এতে রয়েছে ৩১০টি পার্চমেন্ট কাগজ যা তৈরীতে সম্ভবত: ১৬০টি গাধা বা গোচর্ম লেগেছে। প্রথমদিকে এতে ৩২০টি পাতা ছিল, কিন্তু পরবর্তীকালে এর থেকে ৮টি পাতা হারিয়ে যায়। ৭ই মে, ১৬৯৭ সনে আগুন লাগে সুইডেনের রাজপ্রাসাদে যেখানকার এক লাইব্রেরীতে এটি সংরক্ষিত ছিল। আগুনে পুড়ে যাবার আগেই জানালা দিয়ে উদ্ধার কর্মীরা বইটি নীচে ফেলে দিতে সমর্থ হয়। কিন্তু ততক্ষণে যথেষ্ট ক্ষতি হয়ে গেছে। কিছু পাতা পুড়ে যায় এবং কিছু পাতা নীচে পড়ার সময় বাতাসে উড়ে যায় যা আর পাওয়া যায়নি। অবশ্য অনেকের ধারণা, এই আট পৃষ্ঠা অনেক আগেই কেউ সরিয়ে নিয়েছে যাতে ষষ্ঠ শতকে লেখা সাধু বেনিডিক্ট প্রণীত সন্যাস জীবন-যাপনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় নিয়ম কানুনগুলো ছিল। 

লেখা থেকে রশ্মি নির্গত হয়!
প্রকৃতপক্ষে মধ্যযুগের সেই সময়ে নানান রং ব্যবহার করে অদ্ভুত সব ছবি সম্বলিত এই পুস্তকটি কেন রচিত হয়েছিল এবং কে তা রচনা করেছিল তা এখনও রহস্যাবৃত। একটি পৌরাণিক কাহিনী মতে এটি লেখার পরিকল্পণা করে হারম্যান রিকুলাস নামের একজন বেনিডিক্টাইন পাদ্রী (ইতালির সাধু বেনিডিক্টের অনুসারীরাই হচ্ছে বেনিডিক্টাইন)। সে অন্য সাধুদের সাথে পরমপিতার নাম-গান গেয়ে জীবন কাটাচ্ছিল, কিন্তু এক দূর্বল মুহুর্তে সে মঠের নিয়ম ভঙ্গ করে বসে।এতে শাস্তি হিসেবে পরদিন তাকে জীবন্ত অবস্থায় মঠের দেয়ালে গেঁথে ফেলার আদেশ দেন মঠাধক্ষ্য। 

যাহোক, এই কঠোর শাস্তির ঘোষণা শুনে হারমান মঠাধক্ষ্যকে জানায় যে, সে তার জীবনের অবশিষ্ট রাতটি মানব কল্যাণে ব্যয় করতে চায়। সে তার অর্জিত জ্ঞান দিয়ে তার জীবনের ঐ শেষরাতে এমন এক কিতাব লিখে যাবে, যাতে মানুষের প্রয়োজনীয় সমস্ত জ্ঞান থাকবে, আর তা চিরকালের জন্য ঐ আশ্রমের নামের সুখ্যাতি বয়ে বেড়াবে। সে মঠাধক্ষ্যের কাছে প্রয়োজনীয় উপকরণের আবেদন করলে তাকে তার চাহিদা মত সমস্তকিছু সরবরাহ করা হয়।

এদিকে হারমান মধ্যরাত্রির কাছাকাছি নিশ্চিত হয় যে, সে স্বল্প ঐ সময়ে তার কাজ সম্পূর্ণ করতে পারবে না। এতে হতাশার চরমে পৌঁছে যায় সে। ঈশ্বরের সেবাকাজে জীবন-যৌবণ উৎসর্গ করার পর আজ তার এই পরিণতি। সে এক কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়। বিশেষ পদ্ধতিতে শয়তানকে হাজির করে সে (জ্বিণ ছাড়ানোর পূর্ণ পদ্ধতি গিগাসেও বর্ণনা করা হয়েছে) এবং তার কাছে নিজ আত্মা উৎসর্গের অঙ্গীকার করে বইটি সম্পূর্ণ করে দেবার প্রস্তাব রাখে। শয়তান তার প্রস্তাবে সাড়া দেয়,শুরু হয় কোডেক্স গিগাস লেখা।

উষার আলো ফুটে ওঠার অনেক আগেই পুরো কিতাব লেখা শেষ করে শয়তান চলে যায় এবং প্রমান স্বরূপ তার ছবি একে রেখে যায় ঐ কিতাবের ২৯০ নম্বর পৃষ্ঠা জুড়ে। তার ঐ প্রতিকৃতি ছিল পশুর মত খুর, ধারালো নখ ও সাপের মতো লকলকে জিহ্বা বিশিষ্ট অর্ধমানব অর্ধপশুর দানবীয় এক চিত্ররূপ। ঐ চিত্রে দেখা যায়, সে এক বদ্ধ ঘরের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যে পৃষ্ঠায় শয়তান তার ছবি এঁকেছে ঠিক তার উল্টো পৃষ্ঠায় এঁকেছে স্বর্গের ছবি। কেন এমনটা সে করেছে তা এক অজানা রহস্য। 

বইটিতে এমন কিছু লেখা আছে যা থেকে রশ্মি নির্গত হয়! আর এসব বিচ্ছুরিত রশ্মির বিভিন্ন বর্ণের মধ্যে রয়েছে লাল, নীল, সবুজ ও সোনালী। বইয়ের পুরো পাতা জুড়ে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা বড় হাতের অক্ষরগুলো এমনি রশ্মির বিচ্ছুরণ করছে। এর প্রতিটি পাতা দেখতে একই রকম কেননা লেখার ধরণ আগাগোড়া অপরিবর্তিত যা লেখার ব্যাপ্তিকাল, লেখকের মর্জি মেজাজের কিছুরই নির্দেশক নয়। আর এটাই বিশ্বাস এনে দেয় যে, পুরো বইটি খুব অল্পসময়ে একজনের দ্বারাই লেখা হয়েছে।

কোডেক্স গিগাস নিয়ে প্রচুর গবেষণা চলছে। তবে, আধুনিক হস্তলেখা বিশারদগণ নিশ্চিত করেছেন যে সেটি একক হাতে লেখা। আর লেখার ব্যপ্তিকাল সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, একজন দক্ষ মানুষের এটা লিখতে প্রতি লাইন ২০ সেকেন্ড হিসেবে লাগবে ২০ বৎসরেরও অধিক। পাণ্ডুলিপিতে ব্যবহার করা হয়েছে একই ধরনের কালি, যা তৈরি হয়েছে পোকামাকড়ের ঝুলকালি দিয়ে। আর রং হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বিভিন্ন কীটের শরীরের নানান রং এর তরল। এতে প্রমানিত হয় যে, লেখকের কীট-পতঙ্গ সম্পর্কে খুব ভালো ধারণা ছিল, আর তাই সে তাদের শরীর থেকে প্রয়োজনীয় রংগুলো সংগ্রহ করে নিতে পেরেছে।

এই পুস্তকটি ১২২৯ সনের শেষার্ধে লেখা সম্পন্ন হয়েছে। বোহেমিয়ার পডলাজাইসের ঐ মঠ, যেখানে এটি লিখিত হয়েছিল তা ১৫ শতকের হুসাইট বিদ্রোহের সময় ধ্বংস হয়ে যায়। অবশ্য পূর্বেই কোন একসময় অর্থ সংকটে পড়ে মঠাধক্ষ্য বইটি বিক্রি করে দিয়েছিলেন। এরপর এ বই ১৪৭৭-১৫৯৩ পর্যন্ত ব্রোমভ মনাষ্টারিতে ছিল। অত:পর ১৫৯৪ সনে প্যারাগুয়ের সম্রাট রুডলফ দ্বিতীয় এটি তার সংগ্রহশালায় নিয়ে যান। আর প্যারাগুয়ের সাথে ত্রিশ বৎসর ব্যাপী যুদ্ধ শেষে ১৬৪৮ সনে সুইডিশ সেনারা এটি লুন্ঠন করে নিয়ে গিয়ে ষ্টকহোমের সুইডিশ রয়্যাল লাইব্রেরীতে রেখে দেয়। ১৬৪৯ থেকে ২০০৭ সন পর্যন্ত বইটি সেখানেই সংরক্ষিত ছিল। অার ৩৫৯ বৎসর পর ২০০৭ সনে এটি এক বৎসরের চুক্তিতে প্রদর্শনীর জন্য আবার প্যারাগুয়েতে আনা হয় এবং ২০০৮ সনে সুইডেন কর্তৃপক্ষ পুন:রায় তাদের বই ফিরিয়ে নিয়ে যায়। বইটি বর্তমানে সুইডেন রয়াল মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।

এই পুস্তকটি নিয়ে নানা কুসংস্কার চালু রয়েছে। বলা হয়ে থাকে, যারা এটিকে নিজেদের অধিকারে এনেছে, তাদের উপর ভর করেছে অশুভ শক্তি। হয় তাদের মস্তিস্ক বিকার ঘটেছে অথবা তারা ধ্বংস হয়েছে যুদ্ধে, অপঘাতে অথবা মড়কে।সম্রাট রুডলফই তো জলজ্যান্ত প্রমান।

কি আছে কোডেক্স গিগাসে? 
এতে রয়েছে পূর্ণাঙ্গ বাইবেল ছাড়া্ও পাঁচটি বড় রচনা। পাণ্ডুলিপির শুরু হয়েছে বাইবেল (পুরাতন নিয়ম) দিয়ে এরপর রয়েছে প্রথম শতক এডির ঐতিহাসিক ফ্লভিয়াস যোসেফাসের লেখা-দা এন্টিকুইটিজ অব দা জিউজ ও দা জিউইশ ওয়ার।

যোসেফাসের পরে রয়েছে মধ্যযুগের সর্বাধিক জনপ্রিয় ইসিদোর এর বিশ্বকোষ। এই ইসিদোর ৬ষ্ঠ শতকে স্পেনের সেভিলে বসবাস করতেন। এরপর রয়েছে চিকিৎসা শাস্ত্রের উপর সংগৃহীত কিছু লেখা এবং তারপর বাইবেল নূতন নিয়ম। এরপর রয়েছে বড় রচনার সর্বশেষ কাজ- প্রাগ এর কসমাস [সিএ ১০৪৫-১১২৫] এর “ক্রোনিকেল অব বোহেমিয়া”। আর এটাই বোহেমিয়ার প্রথম ইতিহাস।

পান্ডুলিপি ছাড়াও কিছু ছোট রচনাও রয়েছে। প্রথমটি অনুশোচনা বা প্রায়শ্চিত্তের উপর লেখা আর এটা রয়েছে স্বর্গচিত্রের ঠিক আগে। দ্বিতীয়টি জ্বিন ছাড়ানোর উপর, আর এর অবস্থান শয়তানের প্রতিকৃতির ঠিক পরে। ছোট রচনার সবশেষ গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে একটা বর্ষপঞ্জিকা, যাতে রয়েছে সাধু ও স্থানীয় বোহেমিয়ান ব্যক্তির তালিকা যাদেরকে ঐ সময় স্মরণ (স্মরণার্থে উৎসব পালন) করা হত। কিছু হারিয়ে যাওয়া বা পান্ডুলিপি থেকে সরিয়ে ফেলা কাজও রয়েছে। সম্ভবত: সেগুলো ছিল ৬ষ্ঠ শতকে লেখা সাধু বেনেডিক্টের আইন, সন্যাস জীবন-যাপনের জন্যে অত্যাবশ্যকীয় পথ নির্দেশিকা।

দৃশ্যত: এসব ছাড়া একটা শব্দ “inclusion” ব্যতিত সমগ্র রচনা সম্পূর্ণ নিখূঁত ও ত্রুটিমুক্ত এবং কোন শব্দটি আপনি ব্যবহারে বেঁছে নেবেন, তার উপর ৩২০ পৃষ্ঠার সমগ্র রচনার পুরোপুরি ভিন্ন অর্থ দাঁড়াবে। Is this a conspiracy to dumb down, separate and segregate religious belief from reality by modern religion?, maybe just simply a blind, closed minded approach to the translation of the text?, or is it really the incorrect understanding of the original scribes meaning. বড়ই রহস্য নয় কি? একটা শব্দ বেঁছে নাও, আর নিজে পরীক্ষা কর! ওয়াও...

বিষয়টি কি সত্যিই ইন্টারেস্টিং না? -a universal scripture within the bindings of a single book approaching the subjects of historic fact, magic and religion all together and all in line? 


সমাপ্ত।
সংশোধিত নয়।

উৎস:
ইকিপিডিয়া,
“কোডেক্স গিগাস”-ন্যাশনাল জিওগ্রাফি।
এম গুল্লিক, দ্যা কোডেক্স গিগাস।
রাজেন্দ্রন, সেজিন;  স্যাটানিক ইন্সপাইরেশন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন