pytheya.blogspot.com Webutation

১৪ জুলাই, ২০১৫

Jesus: কবি রবির চিত্রিত যিশুচরিত।

যিশু যখন জন্মগ্রহণ করেছিলেন তখন রোম-সাম্রাজ্যের প্রতাপ অভ্রভেদী হয়ে উঠেছিল। যে কেউ যে দিকে চোখ মেলত এই সাম্রাজ্যেরই গৌরব চূড়া সবদিক থেকেই চোখে পড়ত; এরই আয়োজন উপকরণ সকলের চিত্তকে অভিভূত করে দিচ্ছিল। রোমের বিদ্যা-বুদ্ধি, বাহুবল ও রাষ্ট্রীয় শক্তির মহাজালে যখন বিপুল সাম্রাজ্য চারিদিকে আবদ্ধ, সেই সময়ে সাম্রাজ্যের এক প্রান্তে দরিদ্র ইহুদি মাতার গর্ভে এই শিশু জন্মগ্রহণ করলেন।

তখন রোম-সাম্রাজ্যে ঐশ্বর্যের যেমন প্রবল মূর্তি, ইহুদি সমাজে লোকাচার ও শাস্ত্র শাসনেরও তেমনি প্রবল প্রভাব।ইহুদিদের ধর্ম স্বজাতির মধ্যে গণ্ডিবদ্ধ। তাদের ঈশ্বর জিহোভা বিশেষভাবে তাদেরকে বরণ করে নিয়েছেন এমনই তাদের বিশ্বাস। তাঁর নিকট তারা কতকগুলো সত্যে বদ্ধ, এই সত্যগুলো বিধিরূপে তাদের সংহিতায় লিখিত। এই বিধি পালন করাই ঈশ্বরের আদেশ-পালন।

বিধির অচল গণ্ডির মধ্যে নিয়ত বাস করতে গেলে মানুষের ধর্মবুদ্ধি কঠিন ও সংকীর্ণ না হয়ে থাকতে পারে না। কিন্তু ইহুদিদের সনাতন-আচার-নিষ্পেষিত চিত্তে নূতন প্রাণ সঞ্চার করার উপায় ঘটেছিল। মাঝে মাঝে তাদের পাথরের প্রাচীর ভেদ করে তাদের মধ্যে এক-একজন মহাপুরুষ এসে দেখা দিতেন। ধর্মের প্রত্যক্ষ উপলব্ধি বহন করে নিয়ে যেতেই তাদের অভ্যুদয়। তারা স্মৃতি শাস্ত্রের মৃতপত্র-মর্মরকে আচ্ছন্ন করে দিয়ে অমৃতবাণী প্রচার করতেন। ই’শায়া জেরেমিয়া প্রভৃতি ইহুদি নবীগণ পরম দুর্গতির দিনে আলোক জ্বেলেছেন, তাদের তীব্র জ্বালাময়ী বাক্যের বজ্রবর্ষণে স্বজাতির বদ্ধ জীবনের বহুদিন সঞ্চিত কলুষরাশি দগ্ধ করেছেন।

শাস্ত্র ও আচার ধর্মের দ্বারাই ইহুদিদের সমস্ত জীবন নিয়মিত। যদিও তারা সাহসী যোদ্ধা ছিল, তবু রাষ্ট্ররক্ষা-ব্যাপারে তাদের পটুত্ব প্রকাশ পায়নি। এজন্য রাষ্ট্র সম্বন্ধে বিদেশী প্রতিবেশীদের হাতে তারা বারে বারে দুর্গতিলাভ করেছিল।

যিশুর জন্মের কিছুকাল পূর্ব হতে ইহুদিদের সমাজে নবী-অভ্যুদয় বন্ধ ছিল। কালের গতি প্রতিহত করে, প্রাণের প্রবাহ অবরুদ্ধ করে, পুরাতনকে চিরস্থায়ী করার চেষ্টায় তখন সকলে নিযুক্ত ছিল। বাহিরকে একেবারে বাইরে ঠেকিয়ে, সমস্ত দ্বার, গবাক্ষ বন্ধ করে, দেয়াল গেঁথে তোলার দলই তখন প্রবল হয়ে উঠেছিল। নবসংকলিত তাল্‌মুদ্‌ শাস্ত্রের বাহ্য আচার বন্ধনের আয়োজন পাকা হল, এবং ধর্মপালনের মূলে যে-একটি মুক্ত বুদ্ধি ও স্বাধীনতা-তত্ত্ব আছে তাকে স্থান দেয়া হল না।

জড়ত্বের চাপ যতই কঠোর হোক মনুষ্যত্বের বীজ একেবারে মরতে চায় না। অন্তরাত্মা যখন পীড়িত হয়ে ওঠে, বাইরে যখন সে কোন আশার মূর্তি দেখতে পায় না, তখন তার অন্তর হতেই আশ্বাসের বাণী উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে— সেই বাণীকে সে হয়ত সম্পূর্ণ বোঝে না, অথচ তাকে প্রচার করতে থাকে। এই সময়টাতে ইহুদিরা আপনা-আপনি বলাবলি করছিল, মর্তে পুনরায় স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠার কাল আসছে। তারা মনে করছিল, তাদেরই নেতা তাদের জাতিকেই এই স্বর্গ রাজ্যের অধিকার দান করবেন— ঈশ্বরের বরপুত্র ইহুদি জাতির সত্যযুগ পুনরায় আসন্ন হয়েছে।

এই আসন্ন শুভ মুহূর্তের জন্য প্রস্তুত হতে হবে এই ভাবটিও জাতির মধ্যে কাজ করছিল। এই জন্য মরুস্থলীতে বসে অভিষেক দাতা যোহন্‌ যখন ইহুদিদেরকে অনুতাপের দ্বারা পাপের প্রায়শ্চিত্ত ও জর্ডনের তীর্থজলে দীক্ষা গ্রহণ করবার জন্য আহ্বান করলেন তখন দলে দলে পুণ্যকামীগণ তার কাছে সমবেত হতে লাগল। ইহুদিরা খোদাকে প্রসন্ন করে পৃথিবীতে নিজেদের অপমান ঘুচাতে চাইল, ধরাতলের রাজত্ব এবং সকলের শ্রেষ্ঠস্থান অধিকার করার আশ্বাসে তারা উৎসাহিত হয়ে উঠল।

এমন সময়ে যিশুও মর্তলোকে ঈশ্বরের রাজ্যকে আসন্ন বলে ঘোষণা করলেন। কিন্তু ঈশ্বরের রাজ্য যিনি স্থাপন করতে আসবেন তিনি কে? তিনি তো রাজা, তাকে তো রাজপদ গ্রহণ করতে হবে। রাজপ্রভাব না থাকলে সর্বত্র ধর্মবিধি প্রবর্তন করবে কি করে। একবার কি মরুস্থলীতে মানবের মঙ্গল ধ্যান করবার সময় যিশুর মনে এই দ্বিধা উপস্থিত হয়নি। ক্ষণকালের জন্য কি তার মনে হয়নি রাজপীঠের উপরে ধর্মসিংহাসন প্রতিষ্ঠা করলে তবেই তার ক্ষমতা অপ্রতিহত হতে পারে? কথিত আছে, শয়তান তার সম্মুখে রাজ্যের প্রলোভন বিস্তার করে তাকে মুগ্ধ করতে উদ্যত হয়েছিল। সেই প্রলোভনকে নিরস্ত করে তিনি জয়ী হয়েছিলেন। এই প্রলোভনের কাহিনীকে কাল্পনিক বলে উড়িয়ে দেবার কারণ নেই। রোমের জয়পতাকা তখন রাজ-গৌরবে আকাশে আন্দোলিত হচ্ছিল এবং সমস্ত ইহুদি জাতি রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার সুখ-স্বপ্নে নিবিষ্ট হয়েছিল। এমন অবস্থায় সমস্ত জনসাধারণের সেই অন্তরের আন্দোলন যে তারও ধ্যানকে গভীরভাবে আঘাত করতে থাকবে এতে আশ্চর্য হবার কোন কারণই নেই।

কিন্তু আশ্চর্যের কথা এই যে, এই সর্বব্যাপী মায়াজালকে ছেদন করে তিনি ঈশ্বরের সত্য রাজ্যকে সুস্পষ্ট প্রত্যক্ষ করলেন। ধনমানের মধ্যে তাকে দেখলেন না, মহা-সাম্রাজ্যের দৃপ্ত প্রতাপের মধ্যে তাকে দেখলেন না; বাহ্য উপকরণহীন দারিদ্র্যের মধ্যে তাকে দেখলেন এবং সমস্ত বিষয়ী লোকের সম্মুখে একটা অদ্ভুত কথা অসংকোচে প্রচার করলেন- “যে নম্র পৃথিবীর অধিকার তারই।” তিনি চরিত্রের দিক দিয়ে এই যেমন একথাটা বললেন, উপনিষদের ঋষিরা মানুষের মনের দিক দিয়ে ঠিক এরকমই অদ্ভুত একটা কথা বলেছেন; যারা ধীর তারাই সকলের মধ্যে প্রবেশের অধিকার লাভ করে। “ধীরাঃ সর্বমেবাবিশন্তি।”

যা অত্যন্ত প্রত্যক্ষ এবং যা সর্বজনের চিত্তকে অভিভূত করে বর্তমান, তাকে সম্পূর্ণ ভেদ করে, সাধারণ মানবের সংস্কারকে অতিক্রম করে, ঈশ্বরের রাজ্যকে এমন-একটি সত্যের মধ্যে তিনি দেখলেন যেখানে সে আপনার আন্তরিক শক্তিতে আপনি প্রতিষ্ঠিত— বাইরের কোন উপাদানের উপর তার আশ্রয় নয়। সেখানে অপমানিতেরও সম্মান কেউ কেড়ে নিতে পারে না, দরিদ্রেরও সম্পদ কেউ নষ্ট করতে পারে না। সেখানে যে নত সেই উন্নত হয়, যে পশ্চাদ্‌বর্তী সেই অগ্রগণ্য হয়ে ওঠে। এ কথা তিনি কেবল কথায় রেখে যাননি। যে দৌর্দণ্ডপ্রতাপ সম্রাটের রাজদণ্ড অনায়াসে তার প্রাণবিনাশ করেছে তার নাম ইতিহাসের পাতার এক প্রান্তে লেখা আছে মাত্র। আর যিনি সামান্য চোরের সঙ্গে একত্রে ক্রুসে বিদ্ধ হয়ে প্রাণত্যাগ করলেন, মৃত্যুকালে সামান্য কয়েকজন ভীত অখ্যাত শিষ্য যার অনুবর্তী, অন্যায় বিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাধ্যমাত্র যার ছিল না, তিনি আজ মৃত্যুহীন গৌরবে সমস্ত পৃথিবীর হৃদয়ের মধ্যে বিরাজ করছেন এবং আজও বলছেন, ‘যারা দীন তারা ধন্য; কারণ, স্বর্গরাজ্য তাদের। যারা নম্র তারা ধন্য; কারণ, পৃথিবীর অধিকার তারাই লাভ করিবে।’

এইভাবে স্বর্গরাজ্যকে যিশু মানুষের অন্তরের মধ্যে নির্দেশ করে মানুষকেই বড় করে দেখিয়েছেন। তাকে বাইরের উপকরণের মধ্যে স্থাপণ করে দেখালে মানুষের বিশুদ্ধ গৌরব খর্ব হত। তিনি নিজেকে বলেছেন মনু্ষ্য পুত্র। মনু্ষ্য পুত্র যে কে তাই তিনি প্রকাশ করতে এসেছেন।

তাই তিনি দেখিয়েছেন, মানুষের মনুষ্যত্ব সাম্রাজ্যের ঐশ্বর্যেও নয়, আচারের অনুষ্ঠানেও নয়; কিন্তু মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের প্রকাশ আছে এই সত্যেই সে সত্য। মানব সমাজে দাঁড়িয়ে ঈশ্বরকে তিনি পিতা বলেছেন। পিতার সঙ্গে পুত্রের যে সম্বন্ধ তা আত্মীয়তার নিকটতম সম্বন্ধ— আত্মা বৈ জায়তে পুত্রঃ। তা আদেশ-পালনের ও অঙ্গীকার-রক্ষার বাহ্য সম্পর্ক নয়। ঈশ্বর পিতা এই চিরন্তন সম্বন্ধের দ্বারাই মানুষ মহীয়ান, আর কিছুর দ্বারা নহে। তাই ঈশ্বরের পুত্ররূপে মানুষ সকলের চেয়ে বড়, সাম্রাজ্যের রাজারূপে নয়। তাই শয়তান এসে যখন তাকে বলল ‘তুমি রাজা’ তিনি বললেন, ‘না, আমি মনুষ্যপুত্র।’ এই বলে তিনি সমস্ত মানুষকে সম্মানিত করেছেন।

তিনি এক জায়গায় ধনকে নিন্দা করেছেন, বলেছেন, “ধন মানুষের পরিত্রাণের পথে প্রধান বাধা।” এ একটা নিরর্থক বৈরাগ্যের কথা নয়। এর ভিতরকার অর্থ এই যে, ধনী ধনকেই আপনার প্রধান অবলম্বন বলে জানে— অভ্যাসের মোহ-বশত ধনের সঙ্গে সে নিজের মনুষ্যত্বকে মিলিয়ে ফেলে। এমন অবস্থায় তার প্রকৃত আত্মশক্তি আবৃত হয়ে যায়। যে আত্মশক্তিকে বাধামুক্ত করে দেখে সে ঈশ্বরের শক্তিকেই দেখতে পায় এবং সেই দেখার মধ্যেই তার যথার্থ পরিত্রাণের আশা। মানুষ যখন যথার্থভাবে নিজেকে দেখে তখনই নিজের মধ্যে ঈশ্বরকে দেখে; আর নিজেকে দেখতে গিয়ে যখন সে কেবল ধনকে দেখে, মানকে দেখে, তখনই নিজেকে অবনমিত করে এবং সমস্ত জীবন-যাত্রার দ্বারা ঈশ্বরকে অস্বীকার করতে থাকে।

মানুষকে এই মনুষ্য পুত্র বড় দেখেছেন বল্লেই মানুষকে যন্ত্ররূপে দেখতে চাননি। বাহ্য ধন যেমন মানুষকে বড় করে না তেমনি বাহ্য আকারে মানুষকে পবিত্র করে না। বাইরের স্পর্শ বাইরের খাদ্য মানুষকে দূষিত করতে পারে না; কারণ, মানুষের মনুষ্যত্ব যেখানে, সেখানে তার প্রবেশ নেই। যারা বলে বাইরের সংস্রবে মানুষ পতিত হয় তারা মানুষকে ছোট করে দেয়। এভাবে মানুষ যখন ছোট হয়ে যায় তখন তার সংকল্প, তার ক্রিয়াকর্ম, সমস্তই ক্ষুদ্র হয়ে আসে; তার শক্তি হ্রাস হয় এবং সে কেবলই ব্যর্থতার মধ্যে ঘুরে মরে। এই জন্যই মনু্ষ্যপুত্র আচার ও শাস্ত্রকে মানুষের চেয়ে বড় হতে দেননি এবং বলেছেন, বলি-নৈবদ্যের দ্বারা ঈশ্বরের পূজা নহে, অন্তরের ভক্তির দ্বারাই তাঁর ভজনা। এই বলেই তিনি অস্পৃশ্যকে স্পর্শ করলেন, অনাচারীর সাথে একত্রে আহার করলেন, এবং পাপীকে পরিত্যাগ না করে তাকে পরিত্রাণের পথে আহ্বান করলেন।

শুধু তাই নয়, সমস্ত মানুষের মধ্যে তিনি নিজেকে এবং সেই যোগে খোদাকে উপলব্ধি করলেন। তিনি শিষ্যদেরকে আহ্বান করে বললেন, ‘দরিদ্রকে যে খাওয়ায় সে আমাকেই খাওয়ায়, বস্ত্রহীনকে যে বস্ত্র দেয় সে আমাকেই বসন পরায়।’ ভক্তিবৃত্তিকে বাহ্য অনুষ্ঠানের দ্বারা সংকীর্ণরূপে চরিতার্থ করার উপদেশ ও দৃষ্টান্ত তিনি দেখাননি। ঈশ্বরের ভজনা ভক্তির সম্ভোগ করার উপায়মাত্র নহে। তাঁকে ফুল দিয়ে, নৈবদ্য দিয়ে, বস্ত্র দিয়ে, স্বর্ণ দিয়ে, ফাঁকি দিলে যথার্থ নিজেকেই ফাঁকি দেয়া হয়; ভক্তি নিয়ে খেলা করা হয় মাত্র এবং এমন খেলায় যতই সুখ হোক তা মনুষ্যত্বের অবমাননা। যিশুর উপদেশ যারা সত্যভাবে গ্রহণ করেছেন তারা কেবল মাত্র পূজা-অর্চনা-দ্বারা দিনরাত কাটায়ে দিতে পারেন না; মানুষের সেবা তাদের পূজা, অতি কঠিন তাদের ব্রত। তারা আরামের শয্যা ত্যাগ করে, প্রাণের মমতা বিসর্জন দিয়ে, দূর দেশ-দেশান্তরে নরখাদকদের মধ্যে, কুষ্ঠরোগীদের মধ্যে, জীবন উৎসর্গ করেছেন— কেননা, যার নিকট থেকে তারা দীক্ষা গ্রহণ করেছেন তিনি মনুষ্যপুত্র, তার আবির্ভাবে মানবের প্রতি ঈশ্বরের দয়া সুস্পষ্ট প্রকাশমান হয়েছে। কারণ, এই মহাপুরুষ সর্বপ্রকারে মানবের মাহাত্ম্য যেমন করে প্রচার করেছেন এমন আর কে করেছেন?

তাকে তার শিষ্যেরা দুঃখের মানুষ বলেন। দুঃখ স্বীকারকে তিনি মহৎ করে দেখিয়েছেন। এতেও তিনি মানুষকে বড় করেছেন। দুঃখের উপরেও মানুষ যখন নিজেকে প্রকাশ করে তখনই মানুষ নিজের সেই বিশুদ্ধ মনুষ্যত্বকে প্রচার করে যা আগুনে পোড়ে না যা অস্ত্রাঘাতে ছিন্ন হয় না।

সমস্ত মানুষের প্রতি প্রেমের দ্বারা যিনি ঈশ্বরের প্রেম প্রচার করেছেন, সমস্ত মানুষের দুঃখভার স্বেচ্ছাপূর্বক গ্রহণ করার উপদেশ তার জীবন থেকে আপনিই নিঃশেষ হয়ে উঠবে এতে আর আশ্চর্য কি আছে। কারণ, স্বেচ্ছায় দুঃখবহন করতে অগ্রসর হওয়াই প্রেমের ধর্ম। দুর্বলের নির্জীব প্রেমই ঘরের কোণে ভাবাবেশের অশ্রুজল ফেলে নিজেকে নিজে আর্দ্র করতে থাকে। যে প্রেমের মধ্যে যথার্থ জীবন আছে সে আত্মত্যাগের দ্বারা, দুঃখ স্বীকারের দ্বারা গৌরব লাভ করে। সে গৌরব অহংকারের গৌরব নয়; কারণ, অহংকারের মদিরায় নিজেকে মত্ত করা প্রেমের পক্ষে অনাবশ্যক— তার নিজের মধ্যেই স্বত:-উৎসারিত অমৃতের উৎস আছে।

মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের প্রকাশ— যিশুর এই বাণী কেবলমাত্র তত্ত্ব কথারূপে কোন-একটি শাস্ত্রের শ্লোকের মধ্যে বন্দী হয়ে বাস করছে না। তার জীবনের মধ্যে তা একান্ত সত্য হয়ে দেখা দিয়েছিল বলেই আজ পর্যন্ত তা সজীব বনস্পতির মত নব নব শাখা প্রশাখা বিস্তার করছে। মানব চিত্তের শত সহস্র সংস্কারের বাধা প্রতিদিনই সে ক্ষয় করার কাজে নিযুক্ত আছে। ক্ষমতার মদে মাতাল প্রতিদিন তাকে অপমান করছে, জ্ঞানের গর্বে উদ্ধত প্রতিদিন তাকে উপহাস করছে, শক্তি-উপাসক তাকে অক্ষমের দুর্বলতা বলে অবজ্ঞা করছে, কঠোর বিষয়ী তাকে কাপুরুষের ভাবুকতা বলে উড়িয়ে দিচ্ছে— তবু সে নম্র হয়ে নীরবে মানুষের গভীরতম চিত্তে ব্যাপ্ত হচ্ছে, দুঃখকেই নিজের সহায় এবং সেবাকে নিজের সঙ্গিনী করে নিয়েছে— যে পর তাকে আপন করছে, যে পতিত তাকে তুলে নিচ্ছে, যার কাছ থেকে কিছুই পাবার নেই, তার কাছে নিজেকে নিঃশেষে উৎসর্গ করে দিচ্ছে। এমনি করে মনুষ্যপুত্র পৃথিবীকে, সকল মানুষকেই বড় করে তুলেছেন— তাদের অনাদর দূর করেছেন, তাদের অধিকার প্রশস্ত করেছেন, তারা যে তাদের পিতার ঘরে বাস করছে এই সংবাদের দ্বারা অপমানের সংকোচ মানব সমাজ হতে অপসারণ করেছেন— এটাই মুক্তিদান।

সমাপ্ত।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন