২৯ মে, ২০১৩

Education: জ্ঞান ও শিক্ষার বিকাশে ধর্মের প্রভাব।

It is a precept of God to learn. For thus says God: Ask of your elders, and they shall teach you. And of the Law says God: See that my precept be before your eyes, and when you sit down, and when you walk, and at all times meditate thereon. Whether, then, it is good not to learn, you may now know. Oh, unhappy he who despises wisdom, for he is sure to lose eternal life.

But some may argue that Job learned not from a master, nor Abraham; nevertheless they became holy ones and prophets. They say so because they forgot that he who is of the bridegroom's house does not need to be invited to the marriage, because he dwells in the house where the marriage is held; but they that are far from the house. Now know you not that the prophets of God are in the house of God's grace and mercy, and so have the Law of God manifest in them: as David says on this matter: "The Law of his God is in his heart; therefore his path shall not be digged up"

Now It is a Question that how shall the prophets teach us if they are dead; and how shall he be taught who has not knowledge of the prophets?"

The doctrine of the Prophet is written down, for you to study. He who despises the prophecy, despises not only the prophet, but also God who has sent the prophet. But concerning such as know not the prophet, as are the nations, Say, if there shall live in those regions any man who lives as his heart shall show him, not doing to others that which he would not receive from others, and giving to his neighbour that which he would receive from others, such a man shall not be forsaken of the mercy of God.'-[Barnabas, CH-78-79]

ইসলামে জ্ঞান অর্জনের জন্য শিক্ষার উপর অধিক জোর দেয়া হয়েছে। কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে ’পড়’ শব্দের মাধ্যমে। ‘পড়, তোমার সেই প্রভুর নামে-যিনি সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন- যিনি এক বিন্দু রক্ত হতে মানুষ সৃষ্টি করেছেন, পড়-তোমার সেই মহিমাময় প্রভু -যিনি (সাধারণতঃ) কলমের দ্বারা জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন -যিনি মানুষকে অনুগ্রহ করে অজ্ঞাতপূর্ব জ্ঞান দান করেছেন।’-(৯৬:১-৫)

কোরআনের বহু আয়াতে জ্ঞান অর্জনের কথা বলা হয়েছে। যেমন- বল, হে আমার প্রতিপালক, আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দাও। -(২০:১১৪) যারা জানে এবং যারা জানেনা, তারা কি উভয়ে সমান? -(৩৯:৯) আল্লাহ তাদের অন্তর কলুষিত করে দেন যারা বিচার বুদ্ধি ব্যবহার করে না। -(১০:১০০)  এসব আয়াত থেকে জ্ঞান অর্জণের গুরুত্ব সুস্পষ্ট।

আমাদের নবী মুহম্মদও শিক্ষা ও জ্ঞান অর্জনের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। জ্ঞানের গুরুত্ব অনুধাবণের জন্যে আমরা প্রায়শ: নীচের এই উক্তি গুলির উদাহরণ দেই মুহম্মদের বাণী তথা হাদিস হিসেবে-
  • ’প্রত্যেক মুসলমানের জন্যে জ্ঞান অর্জন করা ফরজ।’; 
  • ’জ্ঞান অর্জনের জন্যে সূদূর চীনে যাও।’; 
  • ’এক ঘন্টার জ্ঞান অর্জন সহস্র বৎসরের এবাদতের থেকে শ্রেয়।’; 
  • 'জ্ঞানীর কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়ে পবিত্র।'; 
  • 'জ্ঞানহীন মানুষ পশুর চেয়েও অধম।'; 
  • 'প্রজ্ঞা যেখানে পাও কুড়িয়ে লও।' 
  • 'অজ্ঞানের সারারাত ইবাদতের চেয়ে জ্ঞানীর নিদ্রাই উত্তম।' -ইত্যাদি।
তোমাদের মধ্যে .....যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে সম্মানিত করবেন।-(৫৮:১১) এর সত্যতা কতটা না সুনিশ্চিত! সৃষ্টিগত ভাবে আদম ফেরেস্তা ও জ্বিণের তুলনায় নিকৃষ্ট। ফেরেস্তাগণ নূরের, জ্বিণ আগুণের ও মানুষ কাদামাটির সৃষ্ট। আর এই নিকৃষ্ট আদম ফেরেস্তা ও জ্বিণের উপর নিজের শ্রেষ্ঠ্যত্ব প্রতিষ্ঠিত করল কেবল জ্ঞানের জোরে। আর তাই আদমকে নয় বরং জ্ঞানী আদমকে সম্মানিত করতে খোদা ফেরেস্তাদেরকে আদেশ দেন তাকে সিজদা করার। সুতরাং বলা যায় ইসলামে জ্ঞান অর্জন করা একটি ধর্মীয় দায়িত্বও বটে।

এদিকে খোদার আদেশ মত সকল ফেরেস্তা সমীহের সাথে সিজদা করে আদমকে। কিন্তু জ্বিণ ইবলিসের গঠনগত শ্রেষ্ঠ্যত্বের কৌলিণ্য তাকে খোদার আদেশ অমান্য করতে প্ররোচিত করে। তার এই অহংকারের কারণে সে স্বর্গে নিষিদ্ধ হলে, প্রতিশোধ নিতে সেও আদম হাওয়াকে খোদায়ী আদেশ অমান্য করতে প্ররোচিত করে এবং স্বর্গচ্যূত করে দেয়। ফলে আমাদের দুনিয়াতে আগমন।  

কিন্তু যে জ্ঞান ও শিক্ষা আদম পান খোদার তত্বাবধানে, তা কি তিনি সঙ্গে করে দুনিয়াতে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন? এর উত্তর আমাদের জানা নেই বটে, তবে আমরা কেউ যে অদৃশ্যলোকের কোন স্মৃতি বা ঘটনা যে সঙ্গে করে আনিনি এটা নিশ্চিত বলা যায়। কেননা, কোরআন জানিয়েছে এই স্বীকারোক্তির কথা- যখন তোমার প্রতিপালক আদম বংশের জন্যে তাদের পৃষ্ঠ হতে তাদের সন্তানদের বের করলেন এবং তাদেরকে তাদের নিজেদের সম্বন্ধে স্বীকারোক্তি গ্রহণ করলেন, ‘আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?’
তারা বলেছিল, ‘হ্যাঁ, আমরাই স্বাক্ষী রইলাম।’-(৭:১৭২)

-বুঝতেই পারছেন এই স্বীকৃতির কথা কেন উল্লেখ করলাম। এই স্বীকৃতি শেষবিচারে আপনার জন্যে স্বাক্ষী হবে। কিন্তু আমরা কি কেউ ঐ গুরুত্বপূর্ণ স্বীকারোক্তির কথা স্মরণ করতে পারি? না, আর তাই আমাদের সেদিনের উত্তর হবে- ‘আমরা এ বিষয়ে অজ্ঞাত ছিলাম।’ কিংবা ‘আমাদের পূর্বপুরুষরাই তো পূর্ব হতে অংশীবাদিতা করেছিল এবং আমরা তাদের পরবর্তী বংশধর ছিলাম, অতএব তুমি কি পথভ্রষ্টদের কৃতকর্মের জন্যে আমাদেরকে ধ্বংস করবে?’-(৭:১৭৩) পালাবার পথ নেই, তখন স্মরণ করিয়ে দেয়া হবে কোরঅানে বর্ণিত এ আয়াতটি।

আমাদের অস্তিত্ব আমাদের জন্মের পূর্বে থাকলেও তা কেন আমরা স্মরণ করতে পারি না? প্লেটোর রিপাবলিকে, এর (Er) অদৃশ্যলোক ভ্রমণ শেষে ফিরে এসে অবশ্য এ বিষয়ের একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার বর্ণনা ছিল এমন- অপরাহ্নে সকলে এসে শিবির স্থাপন করল ‘বিস্মৃতির নদী’র তটে। বিস্মৃতির এই নদীর পানিকে কোন পাত্রেই ধারণ করা চলে না। নিয়তির নির্দেশে সকল আত্মাকেই পান করতে হল এই পানি। যারা বিজ্ঞতার সাথে নিজেকে রক্ষা করতে পারল না, তারা এই পানি প্রয়োজনের তুলনায় অধিক পান করে ফেলল। এবার সকল আত্মা নিদ্রামগ্ন হল এবং পরলোকের সকল অভিজ্ঞতা বিস্মৃত হয়ে গেল। তারপর যখন মধ্যরাত্রি আগত, তখন ভূমির কম্পন শুরু হল এবং বজ্র্ নিঘোষিত হল। আর বিচ্ছুরিত তারকার মত এক বিপুল উৎক্ষেপনে সকল আত্মা পরলোক থেকে উৎক্ষিপ্ত হল ইহলোকে। মর্ত্যলোকে তাদের ঘটল নূতন অস্তিত্বের জন্ম।

বিস্মৃতির নদীর পানি পান করা এরের জন্যে নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু সেও বলতে পারেনি, কেমন করে, কোন উপায়ে সে প্রত্যাবর্তন করতে সক্ষম হল তার মৃত দেহের মধ্যে। তার এইমাত্র স্মরণ আছে হঠাৎ সে জীবন ফিরে পেল। তার চক্ষু উন্মীলিত হল, আর দেখতে পেল প্রত্যুষ হয়ে আসছে এবং সে শায়িত রয়েছে তার সমাধি শয্যায়। -অর্থাৎ আমরা জানলাম দুনিয়াতে আগমনে আত্মাগণ অদৃশ্যলোকের সকল কথা বিস্মৃত হয়ে যায়।

যাইহোক, মূলকথা হল অদৃশ্যলোকের সব জ্ঞান আদম (নবী বলে কথা) সঙ্গে করে নিয়ে এলেও আমরা এনেছি এমনটা দাবী করতে পারি না। তবে একথাও ঠিক যে, আদমের স্মরণ শক্তিও প্রখর ছিল না। কেননা সে খোদার আদেশ ভুলে গিয়ে গন্ধম খেয়ে ফেলেছিল, যাতে করে খোদা তার সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন- আমি ইতিপূর্বে আদমকে নির্দেশ দিয়েছিলাম। অতঃপর সে ভুলে গিয়েছিল এবং আমি তার মধ্যে দৃঢ়তা পাইনি।-(২০:১১৫) তবে আদম জ্ঞান সঙ্গে করে আনুক বা না আনুক, দুনিয়াতে তাকে জ্ঞান দানের পরোক্ষ ওয়াদা খোদার ছিল- ”তিনি বললেন, ‘তোমরা সকলে একে অন্যের শত্রু হিসেবে স্বর্গ থেকে নেমে যাও। পরে আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে সৎপথের নির্দেশ এলে যে আমার পথ অনুসরণ করবে সে বিপথগামী হবে না ও দুঃখ-কষ্ট পাবে না।..,”.-(২০:১২২-১২৪)

প্রাথমিক শিক্ষা।
সুতরাং বলা যায়, খোদা তার ওয়াদা মত যুগে যুগে তার প্রতিনিধি পাঠিয়ে মানুষকে জ্ঞান ও শিক্ষা দিয়েছেন। আর বাকীটা তারা পেয়েছে প্রকৃতির কাছ থেকে। 

প্রথম দিকে জ্ঞান আদম থেকে মৌখিক উপস্থাপনায় তার সন্তানদের কাছে পৌছায়। এভাবে ধর্মীয়, সামাজিক এবং প্রকৃতিকে বশ করে টিকে থাকার জ্ঞান বংশ পরস্পরায় এগিয়ে যায়। আর যখনই তারা ইবলিসের প্ররোচনায় সত্য পথ বিচ্যূত হয়েছে তখনই খোদার তরফ থেকে প্রতিনিধি তাদের কাছে এসেছে। তবে এধারা কেবল উম্মূল বিলাদেই ছিল, সর্বত্র ছিল এটা ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয় না। 

এরিস্টোটলের স্কূল।
যখন মানব ছড়িয়ে পড়ল পৃথিবীময়, তখন বিচ্ছিন্ন ঐ সকল গোষ্ঠি এক সময় বর্বর থেকে বর্বরতর স্তরে নেমে গিয়েছিল।অত:পর তারা প্রকৃতি থেকে ধীরে ধীরে শিক্ষা গ্রহণ করে। প্রস্তর যুগ লৌহযুগ পার করে তারা একসময় নূতন নূতন সভ্যতার সূচনা করে। রাহুল সংস্কৃতায়ন তার "ভলগা থেকে গঙ্গা" বইটিতে এই সভ্যতার একটি ধারা বিকাশকে সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে আমি একথা বললাম আমার ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে- বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণে নয়। কেননা প্রচলিত ধর্মীয় কাহিনী বলে প্রথম মানব আদম ক্ষেতে গম চাষ করে উৎপন্ন গম পিষে আটা তৈরী শেষে রুটি বানিয়ে আগুনে সেঁকে খেয়েছেন, যা বিজ্ঞান অস্বীকার করে। কারণ বিজ্ঞান মনস্ক একদল মানুষ বিশ্বাস করে তাদের আদিপিতা বানর, তাদের সৃষ্টি বিবর্তণের মাধ্যমে, আর বিজ্ঞান তাদেরকে এখন পর্যন্ত সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ইসলাম ফেরেস্তা, জ্বিণ ও মানব বিবর্তণের আওতা বহির্ভূত বলে সুস্পষ্ট তথ্য উপস্থাপন করেছে।

প্যাপিরাস।
যা হোক, যা বলছিলাম- আমরা এ যুগে জ্ঞানের যা কিছু অর্জন করছি তা মূলত: মৌখিক উপস্থাপনা, প্রকৃতি এবং লিখিত পুস্তক থেকে। এখন আমরা দেখব দুনিয়াতে জ্ঞান ও শিক্ষা বিস্তারের পর্যায়ক্রম বা ধারাবাহিকতা কি।

ইতিমধ্যে আমরা বলেছি প্রথমদিকে পুরুষ পরম্পরায় মানুষ জ্ঞানের বিস্তার ঘটিয়েছিল মৌখিকভাবে। এভাবে এক পুরুষ থেকে পরবর্তী পুরুষে সংস্কৃতির ধারা বহমান প্রক্রিয়াকে বলে এনকালচারেশন। আর এভাবে সামাজিক মূল্যবোধ ও ব্যবহার শিক্ষাই হচ্ছে সামাজিকায়ন বা socializationThe history of the curricula of such education reflects history itself, the history of knowledge, beliefs, skills and cultures of humanity.

তবে এই পর্যায়ে লেখনির উদ্ভব না ঘটায় জ্ঞান ও দক্ষতার বিকাশ ঘটে কেবল নির্দিষ্ট বিষয়ে জ্ঞানী ও দক্ষ লোকের মাধ্যমে (skills were passed down from a person skilled at the job)। আর ঐ সব দক্ষ লোকেরা তা শিখেছিল তাদের বয়োজোষ্ঠ্যদের কাছ থেকে, শিখেছিল নিজেদের প্রয়োজনে, প্রকৃতিকে বশ করে টিকে থাকতে। আর এভাবে শিক্ষার যে সব সেক্টর দ্রুত গড়ে ওঠে তা হল মূলত: ধর্মশিক্ষা, পশুপালন, কৃষিখামার, মৎস শিকার, খাদ্য প্রস্তুত প্রনালী, নির্মাণ ও রণ কৌশল। 

প্যাপিরাসে লেখা।
In pre-literate societies, education was achieved through demonstration and copying as the young learned from their elders. No resources, no products for expanding education. At later stages student received instruction of a more structured and formal nature, imparted by people not necessarily related, in the context of initiation, religion or ritual. 

Some forms of traditional knowledge were expressed through stories, legends, folklore, rituals, and songs, without the need for a writing system. Tools to aid this process include poetic devices such as rhyme and alliteration. These methods are illustrative of orality. The stories thus preserved are also referred to as part of an oral tradition. By means of memorization, they were passed down through many generations.

মিসরীয় হায়ারোগ্লিফিক।
The development of writing Starting in about 3500 BC, various writing systems developed in ancient civilizations around the world. In Egypt fully developed hieroglyphs were in use at Abydos as early as 3400 BC. Later, the world's oldest known alphabet was developed in central Egypt around 2000 BC from a hieroglyphic prototype. One hieroglyphic script was used on stone monuments, other cursive scripts were used for writing in ink on papyrus, a flexible, paper-like material, made from the stems of reeds that grow in marshes and beside rivers such as the River Nile.

The Phoenician writing system was adapted from the Proto-Canaanite script in around the 11th century BC, which in turn borrowed ideas from Egyptian hieroglyphics. This script was adapted by the Greeks. The Phoenician system was also adapted into the Aramaic script, from which the Hebrew script and also that of Arabic are descended. -Wikipedia.

গিলগামিশ।
মূলত: লেখনির উদ্ভব ঘটেছিল নগরসমূহ গড়ে উঠলে। আর লেখা হত হায়ারোগ্লাফিতে। পরবর্তীতে বর্ণের উদ্ভব হয়। তবে জ্ঞান ও শিক্ষার প্রসারে স্কূল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠে অনেক পরে।

প্রথমদিকে লেখনীর ব্যবহার ছিল মূলত: ধর্মীয় কিতাব সংরক্ষণ ও শিক্ষায় এবং নগর ও রাজ্য পরিচালনায় আইন-কানুনের প্রয়োজনে। অবশ্য গিলগামিশের কাব্য (Epic of Gilgamesh- এ কাব্যের কাহিনী মহাপ্লাবন তথা নূহের বন্যার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ) লেখা হয়েছে খ্রী:পূ: ২৫০০ অব্দে। 

গিলগামিশের কাব্য।
প্রথম লিখিত আইন প্রনয়ণ করেন সম্ভবত: ব্যাবিলন সাম্রাজ্যের সম্রাট হাম্বুরাবি খ্রী:পূ: অষ্টাদশ শতকে। মানুষের উচ্চতার চেয়ে বেশী উচ্চতার একটি কাল পাথরের স্তম্ভে এই অনুশাসন খোঁদিত হয়েছিল এবং অনুশাসনের উপরিভাগে অঙ্কিত হয়েছিল সম্রাটের মূর্ত্তি।

হাম্বুরাবি তার ঐ অনুশাসনের শুরুতে বলেছিলেন: “আমি, হাম্বুরাবি, দেবগণ কর্তৃক নির্ধারিত নেতা, সম্রাটদের মধ্যে সর্বপ্রথম সমগ্র ইউফ্রেটিস অঞ্চলের বিজয়ী, আমি আমার দেশের কানে সত্য ও ন্যায়নীতির মন্ত্র দান করলাম এবং জনগণকে দান করলাম সমৃদ্ধি।’  অার সত্য ও ন্যায়নীতির মন্ত্র দান শেষে তিনি জানান- আমি, হাম্বুরাবি, ন্যায়নিষ্ঠ সম্রাট, সূর্যদেবের নিকট হতে এই আইনাবলী পেয়েছি। আমার বচন অপূর্ব সুন্দর, আমার কর্ম তুলনারহিত...”

মহাগ্রন্থ বেদ রচিত হয়েছে খ্রী:পূ: ১৫০০ অব্দের দিকে। এটি বৈদিক ধর্মগ্রন্থ। জ্ঞান ও শিক্ষার বিকাশে এ ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থের প্রভাব সম্পর্কে আলোচনার শুরুতে আমরা এ ধর্মের উৎপত্তির ইতিহাসের দিকে নজর বুলিয়ে নে। 

নূহের বংশধরগণ নৌকো থেকে নেমে উম্মুল বিলাদে কাছাকাছি বসবাস করে যাচ্ছিল অনেকদির ধরে। আর তারা দিনগুজরান করছিল বেশ আরাম আয়েশে। পশু চরাচ্ছে, ফরমালিনবিহীন ফলফলারী ও খাঁটি দুধ-মধু খাচ্ছে-দাচ্ছে-ঘুমুচ্ছে আর সন্তান উৎপাদন করে যাচ্ছে; কিন্তু খোদার কোন নাম-গান নেই। কেউ একজন ভাবছে না, সে কে, কেন তার দুনিয়াতে আগমন, কেন এ জীবন স্বল্পকালের, আর গন্তব্যই বা কোথায়? সুতরাং খোদা চিন্তান্বিত হলেন, -তবে কি তাদেরকে ”আশ্রাফুল মকলুকাত” উপাধিটা দেয়া কি ভুল হল? তাদের মধ্যে চিন্তাভাবনার এত অভাব কেন? 
কেন তাদের কর্মকান্ডগুলো নাদান পশুর সাথে কোন পার্থক্য সূচিত করছে না ?

হাম্বুরাবির অনুশাসন।
সুতরাং তিনি মনে মনে বললেন, ওহে বনি নূহ! ফল-মূল, দুধ-মধু যথেষ্ট খাওয়া হয়েছে, এগুলো তো কেবল প্রকৃতিতে আমার রহমত, এক বন্যা ছাড়া প্রকৃতির কঠোর রূপ তোমরা দেখনি, এখন তা দেখার সময় হয়েছে।আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্থ না হতে চাইলে নিজেকে জান ও স্রষ্টাকে চেন। গাছ দেখে ফল চেনার মত কেবল সৃষ্টি দেখেই স্রষ্টাকে জানতে ও চিনতে হবে তোমাদেরকে। 

সুতরাং জরথুষ্টের আবির্ভাব ঘটল। আর দীর্ঘ নির্জনবাস ও সাধনার পর সে তার প্রাপ্ত জ্ঞান "Golden Rule" বিতরণ শুরু করে দিল। এতে বাঁধল ধর্মীয় বিরোধ। যারা এতকাল একজায়গায় এতকাল ধরে বসবাস করে আসছিল, ধর্ম এখন তাদেরকে পৃথক করে দিল- একদল আরেক দলকে বহিস্কার করল মাতৃভূমি থেকে। প্রথম যারা বেরিয়ে গেল, তারা হেমিটিক, নূহের পুত্র হামের বংশ ও জাফেটিকদের একটি শাখা, নুহের পুত্র যেফতের বংশ। প্রকৃতির অনুকূল ও বিরূপ পরিবেশ তাদেরকে বাধ্য করল ছড়িয়ে পড়তে পৃথিবীর নানা কোনে। একসময় তারা বর্বর থেকে বর্বরস্তরে পৌঁছে গেল অথবা সংস্পর্শে চলে গেল ঐ সব আদম সন্তানদের যারা কেন বা কাবিলের সাথে ইতিপূর্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সূদূর অতীতে। আর প্রস্তর যুগ, ব্রোঞ্জযুগ পার করে তারা এগিয়ে এসেছে সভ্যতার দ্বারপ্রান্তে। মিসরে শুরু হয়েছে বিজ্ঞানের চর্চা। ফেরাউন কাফু ২৭০০ অব্দে পিরামিড নির্মাণের কাজ শুরু করেন। অবশ্য এর ও পূর্বে বাবিলে নমরূদ টাওয়ার অফ বাবিল নির্মাণ করে বসেছিলেন।

যা হোক, উম্মুল বিলাদ থেকে পরবর্তীতে বেরিয়ে পড়ল সেমিটিক ও জাফেটিকগণ, হয় প্রাকৃতিক দূর্য়োগ, নতুবা চারণ ভূমির অপর্যাপ্ততার কারণে, এবং সবশেষে বের হয়ে এল আর্যগণ। আর তারা মিডিয়া ও শূশানিয়াতে পৌঁছে দেখতে পেল সেখানে তুরানীয়রা সুপ্রতিষ্ঠিত। সংখ্যায় ও শক্তিতে বলিয়ান আর্যরা তাদেরকে কয়েক’ শ বৎসরের জন্য দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ করল অথবা নিজেরাই আবদ্ধ হয়ে গেল। আর তাদের বাকীরা যারা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে অগ্লগামী ছিল, তারা তাদের যাত্রাপথে বসতির চিহ্ন রেখে যেতে যেতে একসময় আফগানিস্তান পার হয়ে ভারতবর্ষে চলে গেল এবং তারা সেখানে দেখা পেল একদল কৃষ্ণবর্ণের আদি মানবের যারা বর্বর থেকে বর্বরস্তর পার হয়ে একসময় সেখানে থিত হয়েছিল এবং সভ্যতার সূচনা ঘাটিয়েছিল। আর্যগণ সেখানে গিয়েছিল কেবল বসতির উদ্দেশ্যে। কিন্তু অত:পর তারা তাদের শক্তি দিয়ে বিতাড়িত করল অধিবাসীদের আর তাদের বসতবাটিগুলো নিজেদের করে নিল।তারা স্থায়ী আবাস গড়ে তুলল 
সপ্তসিন্ধুতে। এদিকে আদিম অধিবাসীদের যারা আর্যদের এই আক্রমণ প্রতিহত করে প্রাণে বেঁচেছিল তারা তাদের বাসস্থান পরিত্যাগ করে দক্ষিণ ভারতে আশ্রয় নিল। আর যারা বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছিল তারা আর্য সমাজে নিম্নস্তরের জীবন-যাপনের সুযোগ পেল। 

আর্যগণ যখন উপমহাদেশে আগমন করে তখন তাদের মধ্যে কোন জাতিভেদ ছিল না। পরবর্তীতে তারা গুণ ও কর্মভেদে তাদের মধ্যে চারটি বর্ণের উদ্ভব ঘটায়। 


ক) ব্রাহ্মণ: পূজা-পার্বন, যাগ-যজ্ঞ, ধর্মশাস্ত্র পাঠ ও রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার যারা সংরক্ষিত করেছিল।

খ) ক্ষত্রিয়: অস্ত্র-শস্ত্রের ব্যাবহার, দেশরক্ষা ও দেশ শাসনে যারা নিয়োজিত হত।
গ) বৈশ্য: ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিকাজ ও পশুপালনের দ্বারা যারা জীবিকা নির্বাহ করত।
ঘ) শূদ্র: উপরোক্ত তিন শ্রেণীর সেবাকাজে যারা ব্যপ্ত হয়েছিল।

তা কেন শূদ্ররা অপর তিন শ্রেণীর চাকর-বাকর হবে? বা কেন কেবলমাত্র ব্রাহ্মণগণ পূজা-পার্বন, যাগ-যজ্ঞ, ধর্মশাস্ত্র পাঠ ও রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার পাবেন? এর উত্তরে ব্রাহ্মণরা জানিয়ে দিল যে, পৃথিরীর সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা তার শরীরের বিভিন্ন প্রত্যঙ্গ থেকে মানুষ সৃষ্টি করেছেন। তার মুখ থেকে সৃজিত হয়েছে ব্রাহ্মণ এবং এই কারণে তারা দেবতার পক্ষ থেকে কথা বলতে পারে, হাত থেকে ক্ষত্রিয়, উরু থেকে বৈশ্য, আর পদযুগলের ময়লা থেকে শূদ্র অর্থাৎ ভৃত্য শ্রেণী। কিন্তু ব্রক্ষ্মা তার শরীরকে খন্ড খন্ড করে কিভাবে এতসব সৃষ্টি করল? বা যে ব্রক্ষ্মা তার ডিম (অান্ডা) থেকে ব্রক্ষ্মান্ড সৃষ্টি করল, সে কেন আরেকটা ডিম পাড়ল না এসব সৃষ্টিতে? -এসব প্রশ্ন কেউ করল না।

যা হোক, শূদ্রদের জীবন ছিল অতি কষ্টের, কিন্তু তার চেয়েও কষ্টের ও লাঞ্ছনার জীবন ছিল তাদের যারা ছিল অচ্ছুৎ। অচ্ছুৎ গণ্য করা হত তাদের যারা এই চতুর্বর্ণের কোনটার মধ্যেই পড়ে না। অচ্ছুৎরা সবচেয়ে নোংরা কাজ করতে বাধ্য থাকত। এরা হল মুচি, ম্যাথর, কাওরা বা শুকর পালক ইত্যাদি। মনে করা হত এদের গাত্র স্পর্শ করা মাত্রই কোন যে কেউ অপবিত্র হয়ে যায়। ভূমিষ্ঠ হওয়ার মূহূর্ত থেকেই অচ্ছুতের সন্তানকে অশুচি ভাবত লোকে।

ব্রাহ্মণরা তাদের মেধা ও জ্ঞান কাজে লাগাল মানবাধিকার বিরুদ্ধ আইন প্রনয়নে যেমনটা করেছিলেন হাম্বুরাবি।তারা বিভিন্ন বর্ণভূক্ত লোকদের জন্যে নির্দিষ্ট ধরণের কাজ ও আচার ব্যবহারের কঠোর নিয়ম বেঁধে দিয়েছিল যেমন-
  • শরীরের সর্বোত্তম প্রত্যঙ্গ থেকে উৎপত্তি লাভের ফলেই একজন হয় ব্রাহ্মণ-সারা পৃথিবীর প্রভু। ব্রাহ্মণদের যদি কিছু ভাল লাগে, বিনা খেদে তাকে তা প্রদান করা উচিৎ।
  • ঈশ্বর শুধুমাত্র একটি কর্তব্য সমাধার জন্যেই শূদ্রদের নির্দেশ দিয়েছেন: বিনয়াবনত চিত্তে তোমা অপেক্ষা উচ্চবর্ণের লোকদের সেবা কর। 
  • উচ্চ বর্ণদের সম্পর্কে যদি কোন শূদ্র অপমানজনক কোন কথা বলে, তবে তার মুখ উত্তপ্ত লৌহপিন্ড দ্বারা বন্ধ করে দাও। ব্রাহ্মণদের সঙ্গে তর্করত শূদ্রদের মুখ ও কানে ফুটন্ত তেল ঢেলে দিতে রাজাই আদেশ দেবেন।
  • শূদ্র ব্রাহ্মণকে হাত বা ষষ্ঠি দ্বারা প্রহার করার চেষ্টা করলে শূদ্রের হাত কেটে ফেলার জন্যে যোগ্য হয়, আর রাগান্বিত হয়ে পা দ্বারা আঘাত করলে তার পা কেটে ফেলা উচিৎ। 
  • ব্রাহ্মণের ক্ষেত্রে মৃত্যুদন্ডের স্থলে মস্তক মুন্ডনই চরম শাস্তি।
  • ব্রাহ্মণকে বাদ দিয়ে ক্ষত্রিয় কখনও সাফল্য লাভ করে না এবং ক্ষত্রিয় ব্যাতিরেকে ব্রাহ্মণেরও কোন সাফল্য নেই।
  • ঈশ্বরই রাজা ও ক্ষত্রিয়দের সৃষ্টি করেছেন, যাদের কাজ হল এইসব নিয়ম ঠিকমত পালিত হচ্ছে কিনা তা দেখা।
আর্যরা স্বর্গ ও মর্ত্যকে দেবতা জ্ঞানে অর্চণা করত। আর এসব দেবতাদেরকে মহান ও শক্তিশালী মনে করা হত। তারা বিশ্বাস করত দেবতারা উপাসনাকারীদের মঙ্গল সাধনে ইচ্ছুক এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে নিয়ত সংগ্রামে লিপ্ত।

এই উপমহাদেশে আগমন কালে আর্যগণ কোনরূপ পূজার সাথে জড়িত ছিল না। তারা স্তুতি ও উৎসর্গের দ্বারা দেবতাদের অর্চণা করত মাত্র। তাদের ধর্ম একেশ্বরবাদী না হলেও তাদের মধ্যে একেশ্বরবাদের ধারণা প্রচলিত ছিল। কালক্রমে তাদের এইসব রীতিনীতি এবং চিন্তাধারা যা তারা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল, অনার্য রীতি-নীতি তাদের সমাজে প্রবেশ করাতে তার ক্রমাগত গ্রহণ ও বর্জন চলতে লাগল এবং একসময় তারা কর্মফল ও জন্মান্তরবাদে বিশ্বাসী হয়ে পড়ল
 যা বৈদিক (হিন্দু) ধর্মের জন্ম দেয়।

তবে উপমহাদেশের সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে আর্যদের অবদান অপরিসীম। তাদের রচিত প্রথম গ্রন্থের নাম বেদ। বেদ অর্থ জ্ঞান।এই বেদ চারটি ভাগে বিভক্ত ছিল-যথা- ঋগ্বেদ, সামবেদ, যজুর্বেদ এবং অথর্ববেদ। ইতিহাস রচনায় আর্যদের অবদান না থাকলেও তাদের ধর্মগ্রন্থ, সাহিত্য ও ইতিহাস রচনায় এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।পরবর্তীতে বেদ আবারও চারিভাগে বিভক্ত হয়েছে। যেমন- সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ। উপনিষদ বেদের একেবারে শেষভাগে রচিত বলে একে বেদান্ত বলা হয়ে থাকে। তবে বেদ তত্বজ্ঞানের আধার হলেও এই জ্ঞানের প্রসার ও তার সুফল খুব একটা মানুষ ভোগ করতে পারেনি, কেবল এক শ্রেণীর কাছে সেগুলোর পাঠ-পঠন সীমাবদ্ধ থাকায়।

১৩০০ বিসিইর শেষ দিকে তোয়া উপত্যাকা থেকে  মূসা তাওরাত কিতাব লিখিত আকারে নিয়ে এসেছিলেন ৪০ দিন সেখানে অবস্থান করে। সেটিও জ্ঞানের আধার। সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনের নানান দিক তাতে বর্ণিত হয়েছে। সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সেটি ছিল মাইল ফলক। এছাড়াও পথভ্রষ্ট মানুষের জন্যে কিতাবটি ছিল আলোক বর্তিকা বা মশাল স্বরূপ। 

জন্মান্ধ গ্রীক কবি হোমার ইলিয়াদ রচনা করে ফেলেন খৃষ্টপূর্ব ৮ম শতকে অর্থাৎ রোম নগরী পত্তনের সমসাময়িক কালে। তবে শিক্ষা প্রাতিষ্ঠানিক রূপলাভ করে মূলত: নবী ওযাইয়েরের সময়কালে।তিনি সিনাগগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। (অবশ্য্ মূসার সময়ে ইস্রায়েলীরা মিসরে অবস্থানকালে নিজেদের জন্য উপাসনালয় তৈরী করে নিয়েছিল। কিন্তু মূসার কাছে ফেরাউনের যাদুকরেরা পরাজিত ও মুসলমান হয়ে গেলে ফেরাউন ইস্রোয়েলীদের উপর কঠোর বোঝা চাপিয়ে দেয় আর তারা যেন একত্রিত হতে না পারে সেজন্যে তাদের উপাসনালয়গুলো গুড়িযে দেয়া হয়। এতে খোদা তাদের নিজেদের আবাসবাটিতে উপাসনার নির্দেশ দেন।) আর ঐ সব সিনাগগের অধীনে ছিল মিদরাস, যা ছিল মূলত: ধর্মশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তবে সিনাগগ ও মিদরাস সাধারণতঃ উপাসনা ও ধর্মীয় শিক্ষার জন্যে সৃষ্ট হলেও সেটি ইস্রোয়েলীদের সামাজিক ও নাগরিক জীবনে দিক নির্দেশনা দেবার জন্যেও ব্যবহার করা হত।

কিন্তু ওযাইয়ের কেন হঠাৎ করে সিনাগগ ও মিদরাস প্রতিষ্ঠা করলেন? 
এক কথায় এর উত্তর হবে- ধর্মীয়জ্ঞান ও মূল্যবোধকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে, যাতে তা বংশ পরস্পরায় এগিয়ে যায়। 

ইহুদিরা ছিল খোদার বেঁছে নেয়া জাতি, যারা খোদার একত্ববাদীরতার সাক্ষ্য বহন করবে অন্য জাতিদের মাঝে। বিনিময়ে তারা প্রতিজ্ঞাত দেশে বসবাস করবে এবং সেখানকার দুধ-মধু খেতে থাকবে। কিন্তু তারা নিজেদের স্বকীয়তা আর ধরে রাখতে পারেনি। তারা কনানীয়দের প্রলুব্ধকারী ধর্মীয় রীতিনীতির ফাঁদে পড়ে। তারা তাদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে শংকর জাতির সৃষ্টি করে। কিতাবকে পেছনে ফেলে রাখে এবং খোদার স্মরণ থেকে দূরে সরে আসে। ফলে খোদা তাঁর সাথে কৃতচুক্তি ভঙ্গ করার জন্য তাদের উপর প্রতিশোধ নেন। নেঁবু চাঁদ নেজ্জ্বার এসে তাদেরকে কচুকাটা করে শহরটাকে গুড়িয়ে দিয়ে পুড়িয়ে দেন। আর বাকীদেরকে নাঙ্গা করে শিকলে বেঁধে নিয়ে গিয়ে তার রাজ্যের নানান প্রান্তে নির্বাসিত করেন। ফলে তারা তাদের কিতাব চিরতরে হারিয়ে ফেলে। আর ৭০ বৎসর নির্বাসন দন্ড ভোগ করার পর সাইরাস তাদেরকে নিজভূমিতে ফিরে যাবার অনুমতি দেন। কিন্তু তারা তাদের মাতৃভূমিতে, ফিরে এল বটে কিন্তু খোদার গৃহ প্রাঙ্গনে দাঁড়াবার সাহস তাদের ছিল না, কেননা, তাদের কাছে না অাছে কোন কিতাব না অাছে ধর্মের কোন জ্ঞান। সুতরাং নবী ওযাযের নিজের স্মরণ থেকে মূসার কিতাবটি পুন:রায় লেখেন এবং সিনাগগ ও মিদরাস (মাদ্রাসা) প্রতিষ্ঠা করেন তাদেরকে উপাসনা পদ্ধতি ও ধর্মীয় জ্ঞান শিক্ষা দেবার জন্যে, যাতে তারা আর কখনও তা বিস্মৃত না হয় এবং বংশ পরস্পরায় তাদের ঐ জ্ঞান বহমান থাকে।

৬০০ বিসি ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মীয় চিন্তার জগতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হল। ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যের বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে গড়ে উঠা উষ্মা ও ক্ষোভ এই নূতন ধর্মীয় মতবাদের উদ্ভবের কারণ। এই ধর্মীয় বিপ্লব সাধিত হল ক্ষত্রিয়দের দ্বারা। বৈদিক ধর্মের জটিলতা, বাহ্যিক আড়ম্বর সর্বস্ব ধর্মীয় বিধি, যাগ-যজ্ঞাদি, নরবলি, সর্বোপরি পুরোহিত শ্রেণীর প্রাধান্য তাদেরকে ধর্মীয় মুক্তির পথ সন্ধানে উদ্বুদ্ধ করেছিল। প্রথম তীর্থাঙ্কর বা মুক্তির পথপ্রদর্শক ছিলেন ঋষভদেব। পরবর্তীতে একে একে আরও ২৩ জন তীর্থাঙ্করের আগমন ঘটে ধরণীতে। সর্বশেষ তীর্থাঙ্কর মহাবীরের পূর্ববর্তী তীর্থাঙ্কর ছিলেন পার্শ্বনাথ। তার জন্ম ক্ষত্রিয় রাজবংশে। তিরিশ বৎসর বয়সে তিনি রাজপরিবারের বিলাসী জীবন-যাপন পরিত্যাগ করে সত্য সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে একসময় তিনি বর্তমান কাশীর নিকটবর্তী পরেশনাথ পর্বতে কঠোর সাধনায় লিপ্ত হন এবং সিদ্ধি লাভ করেন। অহিংসা, সত্য, অন্তেয় (অচৌর্য) ও অপরিগ্রহ (সন্ন্যাস) এই চারটি তার প্রচারিত ধর্মের মূল মন্ত্র যা চতুর্যাম নামে পরিচিত।

সর্বশেষ তীর্থাঙ্কর ছিলেন মহাবীর। পার্শ্বনাথের মৃত্যুর আড়াই‘শ বৎসর পর তার আবির্ভাব ঘটে। তার বাল্যনাম ছিল বর্ধমান। তিনি বর্তমান উত্তর বিহারের বৈশালীর নিকটবর্তী কুন্দপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা সিদ্ধার্থ ছিলেন একজন ক্ষত্রিয় দলপতি। আর তার মাতা ত্রিশলা ছিলেন বৈশালী রাজের ভগ্নি।

মহাবীর যশোদা নাম্নী এক রাজকন্যার পাণি গ্রহণ করেছিলেন। কয়েক বৎসর সংসার যাপনের পর তাদের এক কন্যা সন্তান জন্মগ্রহন করে। এই সন্তান জন্মের পরপরই ৩০ বৎসর বয়সে তিনি সংসারত্যাগী হন।

দীর্ঘ বার বৎসর কঠোর সাধনার পরও তিনি দিব্যজ্ঞান লাভ করতে না পেরে গোসাল নামের এক সন্যাসীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে ছয়মাস তার সাথে অতিবাহিত করেন। ইতিমধ্যে তার সন্যাস জীবনের তের বৎসর পূর্ণ হল। এসময় তিনি পূর্ব ভারতের ঋজুপালিকা নদীর তীরে বর্তমান পরেশনাথ পাহাড়ের নিকটবর্তীতে পুন:রায় কঠোর সাধনায় নিমগ্ন হলে, এবার তিনি দিব্যজ্ঞান লাভে সমর্থ হন। মহাবীর সকল রিপু জয় করেছিলেন বলে লোকেরা তাকে জিন বা জয়ী বলত।

মহাবীর দীর্ঘ ৩০ বৎসর ধর্ম প্রচার করেছিলেন। মগধরাজ বিম্বিসার ও অজাতশত্রু তাকে প্রচারকার্যে সহায়তা করেন। ধর্ম প্রচারকালে বর্তমান পাটনার পাব্য নামক স্থানে ৪৬৭ খ্রী:পূ: ৭২ বৎসর বয়সে এই মহান ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করেন।
মহাবীরের প্রচারিত ধর্মমত ’নিগ্রন্থ’ বা সম্পর্কমুক্ত নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু কালক্রমে তার জিন উপাধির অনুসরণে এই ধর্ম জৈনধর্ম নামে পরিচিতি লাভ করে। মহাবীরের নামের সাথে জৈনধর্ম পরিচিতি লাভ করলেও প্রকৃতপক্ষে পার্শ্বনাথ এই ধর্মের মূল ভিত্তি স্থাপন করে গিয়েছিলেন। তার প্রবর্তিত চতুর্যামের সাথে মহাবীর কেবল ব্রহ্মচর্য সংযুক্তি করেন।
মহাবীর পার্থিব ভোগ-বিলাসের সাথে সাথে পরিধানের বস্ত্র পর্যন্ত ত্যাগ করেছিলেন। এ কারণে তার অনুসারীরা দ্বিগম্বর নামে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তীতে জৈনদের মধ্যে শ্বেতাম্বর নামে অপর এক শাখার উদ্ভব হয়।

বৈদিক ধর্মাবলম্বীদের সাথে জৈনদের মূল পার্থক্য হল-এরা বেদের কর্তৃত্ব স্বীকার করে না এবং দেবতার সন্তুষ্টি কামনায় পূজা ও পশু বলি করে না। তাদের চরম উদ্দেশ্য সিদ্ধি বা নির্বাণ লাভ করা। আর এই সিদ্ধি লাভের উপায় হল তিনটি-সৎকর্ম, কৃচ্ছসাধন ও কঠোর সংযম। সংসারে বসবাস করে সিদ্ধিলাভ সম্ভব নয়। তাই সংসারত্যাগী জৈনরা মঠ, আশ্রম বা সঙ্ঘে বাস করে।

জৈনরা সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না। তাদের মতে বিশুদ্ধ বা পূর্ণ বিকশিত মানবাত্মাই দেবতা। তারা বৈদিক ধর্মাবলম্বীদের মত পুনর্জন্ম ও কর্মবাদে বিশ্বাসী। মূল, সূত্র, রঙ্গ ও উপাঙ্গ -এই চারটি জৈনদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ।

খ্রী:পূ: ৫ম শতকে জন্ম হল গৌতম বুদ্ধের। তিনি ২৯ বৎসর বয়সে রাজপরিবারের বিলাসী জীবন-যাপন ও সংসারের মায়া ত্যাগ করে জীবনের মুক্তির পথ খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছিলেন। অত:পর সত্যের সন্ধানে তিনি একাধিক সন্যাসীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে বহুস্থানে পরিভ্রমণ করেন। কিন্তু নানাভাবে আত্মপীড়ন, ধ্যান ও কৃচ্ছসাধনের পরও তিনি দিব্যজ্ঞান লাভে ব্যর্থ হন। অবশেষে বর্তমান বুদ্ধগয়ার সন্নিকটস্থ উরুবিল্ব নামক স্থানে নিরঞ্জনা নদীতে অবগাহন করে পাশের এক বটমূলে কঠিন তপস্যায় লিপ্ত হলেন। এবার অভীষ্ট অর্জিত হল, পরম সত্য তার মনে উদ্ভাসিত হয়- তিনি বোধিলাভ করেন।  

বুদ্ধ বোধি বা দিব্যজ্ঞান লাভ করেন ৪৮৩ খ্রী:পূ: ৩৫ বৎসর বয়সে। অত:পর তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেন ধ্যানলব্ধ জ্ঞান তথা মহাসত্য প্রচারে। তার বাণী ছিল-

ক) হিংসা কোরও না।
খ) চুরি কোরও না।
গ) মিথ্যে বলিও না।
ঘ) পরনিন্দা কোরও না।
ঙ) জীব হত্যা মহাপাপ।
চ) ধনসম্পদ পরিত্যাগ কর। এবং
ছ) ব্রহ্মচর্য পালন কর।

সূদীর্ঘ ৪৫ বৎসর ধর্ম প্রচারের পর কূশী নগরে ৪৪৮ খ্রীঃপূঃ ৮০ বৎসর বয়সে গৌতম বুদ্ধ ইহধাম পরিত্যাগ করেন। তার এই তিরোধান বৌদ্ধদের নিকট 'মহাপরিনির্বাণ' নামে অভিহিত।

বৌদ্ধধর্মমত সহজ সরল ও উদারপন্থী। এই ধর্মনীতিতে মানুষ মানুষে কোন ভেদাভেদ নেই। ধর্মের মূল লক্ষ্য হল-
ক) অন্যায় কার্য থেকে নিজেকে বিরত রাখা।
খ) মনকে পবিত্র রাখা। এবং
গ) যা কিছু ভাল তা অন্তরে সঞ্চয় করা।

বুদ্ধ ছিলেন বাস্তবধর্মী সংস্কারক। মানুষের সংসার জীবনের দুঃখ কষ্ট থেকে মুক্তির লক্ষ্যে তিনি চারটি মহা সত্যের প্রচার ও ব্যাখ্যা করেন। এগুলি হল-
ক) সংসারে দুঃখ নিত্য বর্তমান।
খ) দুঃখের নিশ্চয়ই কারণ আছে;
গ) দুঃখের নিবৃত্তিই মানুষের একান্ত কাম্য। এবং
ঘ) দুঃখ নিবৃত্তির যথার্থ উপায় কি তা জানা আবশ্যক।

বুদ্ধের মতে মানুষের দুঃখ কষ্টের মূল কারণ হল তার অজ্ঞতা এবং কোন কিছুর প্রতি আসক্তি। তনহা বা আকাঙ্খার ফলে দুঃখের সূচনা। সুতরাং আকাঙ্খার নিবৃত্তিতে দুঃখেরও নিবৃত্তি। আর এই আকাঙ্খার কবল হতে মুক্তিলাভ করা যায় ৮টি উপায় অবলম্বনের দ্বারা-যা 'অষ্টাঙ্গিক মার্গ' নামে পরিচিত। এগুলি হল-

ক) সৎ সংকল্প।
খ) সৎ চিন্তা।
গ) সৎ বাক্য।
ঘ) সদ্ব্যবহার।
ঙ) সৎ জীবন-যাপন।
চ) সৎ প্রচেষ্টা।
ছ) সৎ দর্শণ।
জ) সম্যক সমাধি।

গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর পর তার শিষ্যগণ রাজগৃহ নামক স্থানে এক মহাসভার আয়োজন করে। এই সভা 'বৌদ্ধ সংগীতি' নামে পরিচিত। এই সভায় সকলে বুদ্ধের মূল্যবান উপদেশবাণী গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। সুতরাং এক মহাগ্রন্থ রচিত হল- যা 'ত্রিপিটক' নামে পরিচিত।

যা হোক, বুদ্ধের মৃত্যুর পর বিভিন্ন সময়ে তার বাণী নিয়ে মতভেদ দেখা দিলে একাধিকবার বৌদ্ধ সংগীতি আহুত হয়। বৈশালীতে ২য় সংগীতি, সম্রাট অশোকের সময় পাটালীপুত্র নগরীতে ৩য় সংগীতি এবং কাশ্মীরে কৃষাণরাজ কনিস্কের সময় ৪র্থ সংগীতি আহুত হয়েছিল। ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে এসব সংগীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কনিস্কের রাজত্বকালে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীগণ দু‘ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল যথা-
ক) হীনযানঃ এতকাল বুদ্ধের মূর্ত্তি বা প্রতিকৃতি নির্মাণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। বুদ্ধের নিরাকার উপাসনাকে হীনযান বা সুক্ষ্ম ধর্মপথ নামে অভিহিত হত। এ পথে আত্মার পরমশুদ্ধির মাধ্যমে নির্বাণ লাভের চেষ্টা করা হত।
খ) মহাযানঃ মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর বিদেশীদের সংমিশ্রণে বৌদ্ধধর্মের উপাসনা পদ্ধতির উপর যে বিরূপ প্রভাব পরিলক্ষিত হয় তাই মহাযান। এ পদ্ধতিতে বুদ্ধের প্রতিকৃতি নির্মাণের মাধ্যমে উপাসনা করা হত।

এই হীনযান ও মহাযান সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মীয় মতভেদ দেখা দিলে কনিষ্ক পার্থ নামের জনৈক বৌদ্ধধর্মাবলম্বীর পরামর্শক্রমে কাশ্মীরে এক বৌদ্ধ সংগীতি আহবান করেন এবং এটাই ৪র্থ ও শেষ সংগীতি। এই সংগীতিতে বসুমিত্র সভাপতি এবং অশ্বঘোষ সহসভাপতি নিযুক্ত হয়েছিলেন।

যে সময়ে বুদ্ধ তার বোধি প্রচারে ব্যস্ত ছিলেন, সে
ই সময়কালে হঠাৎ করে একের পর এক সূর্য্য উদিত হতে থাকে গ্রীসে। আর ঐ সব সূর্য্য থেকে ছড়িয়ে পড়া জ্ঞানের আলো ছাপিয়ে গেল মিসর ও পারস্য সভ্যতার সকল জ্ঞান বিজ্ঞানকে।হোমারের পর থেকে একে একে নানান মনীষীর আগমন ঘটতে থাকল সেখানে। এসব গূণীজন যেমন জ্ঞান পূজারী ছিলেন, তেমনি জ্ঞান শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাও বুঝতেন। সক্রেটিস, এরিস্টোটলের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদানের জন্যে নিজস্ব স্কুল ছিল।

তবে অজ্ঞানতার মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেয়া সহজ ছিল না। কেননা, তাদের শিক্ষা পৌত্তলিক অসার ধর্মমত বিরূদ্ধ হওয়ায় নগর ও রাষ্ট্রের রোষানলে পড়ে মৃত্যুকে বরণ করতে হয় তাদের অনেককে। সক্রেটিসকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয় ইম্পিটির অভিযোগ এনে, যুবসমাজকে বিপথগামী করার দায়ে। 

তা এই ম্পিটি আবার কি? Impiety is a perceived lack of proper respect for something considered sacred. It is often closely associated with sacrilege, though it is not necessarily a physical action. It was believed that impious actions such as disrespect towards sacred objects or priests could bring down the wrath of the gods. Impiety was often used to prosecute atheists, who were widely discriminated against.

সামন্তপ্রথা।
Anaxagoras, an Athenian scholar, proposed that the sun and the stars were fiery stones whose heat we did not feel because of their distance. Athena used this to justify a charge of impiety and forced Anaxagoras into exile. Diagoras of Melos was accused of atheism, and had to flee Athens after being charged with impiety for revealing the Eleusinian mysteries and allegedly chopping up a statue of Heracles for firewood. Aristotle, mentor to Alexander the Great, was almost charged with impiety for refusal to recognize the divinity of his pupil and not holding the gods in honor. Aristotle fled the city before a trial could take place, saying, "I will not allow the Athenians to sin twice against philosophy".[-Jones, W.T. (1980). The Classical Mind: A History of Western Philosophy]  

পঞ্চম শতাব্দীতে সামন্তবাদের (Feodalism- লাতিন শব্দ ফিউডাম অর্থ ভূ-সম্পত্তি।) উত্থান ঘটে। এই সামন্তবাদ একটা আর্থ সামাজিক ব্যবস্থা বা প্রথা। এই প্রথার সূচণা ঘটে সর্বপ্রথম ইউরোপে।

সামন্তপ্রথা অনুযায়ী রাষ্ট্র বা রাজাই সকল সম্পত্তির মালিক। রাজা কতিপয় শর্তের বিনিময়ে তার অধীনস্ত একটি গোষ্ঠির মাধ্যমে জমি চাষাবাদের জন্যে বিতরণ করতেন। রাজার অনুগত ঐ গোষ্ঠিই সামন্ত প্রভূ।

সামন্ত ব্যবস্থায় রাজা ছিলেন লর্ড তার অধীনস্ত ছিল টেনান্ট ইন চিফ, তার ভ্যাসাল ছিল কাউন্ট, ডিউক, আর্ল বা মারগ্রেভ। আর তাদের ভ্যাসাল ছিল ব্যারণ বা নাইটসগণ যাদের অধীনে ছিল জমির মালিকানাবিহীন কৃষক।

আর্যভট্ট।
সামন্ত ব্যবস্থায় বিপুল পরিমান অনাবাদী জমি চাষাবাদের আওতায় আসে। ফলে কৃষি উৎপাদনে বিপ্লব আনে। অতিরিক্ত করের বোঝার কথা মাথায় রেখে কৃষককূল নিজেদের জীবন ধারণ ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এসব জমিতে নানা ধরণের ফসল উৎপাদন করত। ফলে অতিরিক্ত উৎপাদন ঘটে যা ক্রমশ: বাজার সৃষ্টি করে।

রাজতন্ত্র উত্থানের পর থেকেই রাজ্য পরিচালনা তথা নূতন আইন প্রনয়ন ও বিচার প্রভৃতি কার্য সম্পাদন করতে দক্ষ ও বুদ্ধিমান লোকের প্রয়োজন হয়। অত:পর সামন্ততন্ত্রের যুগে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটায়, হিসাব-নিকাশ ও ব্যবসা পরিচালনার জন্যে এই ধরণের লোকের চাহিদা বেড়ে যায়। ফলে দক্ষ জনগোষ্ঠি তৈরী করতে অধিক হারে স্কুল গড়ে উঠতে লাগল। এইসব স্কুলে শিক্ষার্থীরা মূলত: লিখতে শেখা, সাধারণ হিসেব নিকেশ জন্যে যোগ-বিয়োগ, গুন, ভাগ করতে শেখা (ভারতীয় গণিতজ্ঞ আর্যভট্টের ৫০০ সির দিকে শুন্য আবিস্কারের ফলে গণিতের এইসব হিসেব-নিকেশ সহজ হয়েছিল।) এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের কিছু প্রাথমিক ধারণা লাভ করত মাত্র।

মধ্যযুগে শহরের উৎপত্তি ও বিকাশের ফলে উচ্চতর শিক্ষিত মানুষের চাহিদা বেড়ে যায়। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে প্রাপ্ত আয়-ব্যয় হিসাব নিকাশ করার জন্যে এবং নগর পরিষদের কাজকর্ম পরিচালনার জন্যে যে মানের শিক্ষা-দীক্ষা ও দক্ষতা অর্জণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় তা স্কুলগুলো পূরণ করতে সক্ষম ছিল না। সুতরাং যুগের চাহিদা পূরণে উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে শুরু করে।

পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়
সিই ৫ম শতাব্দীতে গুপ্ত সম্রাট কর্তৃক বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ভারতের গুপ্ত সাম্রাজ্যের রাজধানী পাটালীপুত্রের নিকটবর্তী নালন্দাতে। মূলত:বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শণের প্রচার ও প্রসারের জন্যে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হলেও জ্ঞানের অন্যান্য শাখারও পাঠ দানের সক্ষমতা এটির ছিল।

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে বৌদ্ধদর্শন, বৈদিক দর্শন, আইন, তর্কশাস্ত্র, অর্থশাস্ত্র (অর্থনীতি ও রাজনীতি), গণিত, চিত্র ও শিল্পকলা, সাহিত্য, ব্যাকরণ, জ্যোতির্বিদ্যা এবং ভেষজবিদ্যা সম্পর্কে শিক্ষা দেয়া হত। পরপরই আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- তক্ষশীলা, উজ্জ্বয়িন ও বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয়।

ইউরোপে দশম শতাব্দীর পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ গড়ে উঠতে থাকে। ১২০০ সি প্যারি বিশ্ববিদ্যালয়টি রাজার নিকট থেকে বৈধতার সনদলাভ করে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪টি অনুষদ বা ফ্যাকাল্টি ছিল। ল্যাটিন শব্দ facultas অর্থ দক্ষতা। সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি হচ্ছে সেটি, যেখানে নির্দিষ্ট কোন বিষয় নিয়ে পাঠ দানের দক্ষতা রয়েছে।

প্যারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি অনুষদ ছিল -একটি জুনিয়র অনুষদ ও অপর তিনটি সিনিয়র অনুষদ। জুনিয়র অনুষদে শিক্ষার্থীরা ৭টি মুক্ত কলার বিষয়ে এবং সিনিয়র অনুষদ তিনটিতে ধর্মতত্ব, মানবিক আইনের বিজ্ঞান, দর্শন ও চিকিৎসা বিজ্ঞান সংক্রান্ত বিষয়ে পড়তে পারত। তবে জুনিয়র অনুষদের কোর্স সমাপ্ত না করে কেউ সিনিয়র অনুষদে ভর্তি হতে পারত না।

এরিস্টটল।
পঞ্চদশ শতাব্দীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ইউরোপে ৬৫টির মত হয়েছিল-যার ২০টি ছিল ফ্রান্সে। ইতালী, ইংল্যান্ড, স্পেন, জার্মানী, চেক, পোল্যান্ড ও ভিলবিউস ইত্যাদি অঞ্চলে বাকীগুলো অবস্থিত ছিল।

ক্যাথলিক গির্জা শুরু থেকেই নিরন্তর ভাবে চেষ্টা করছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করতে যেমনটা তারা করতে সক্ষম হয়েছিল স্কূলগুলোর উপর। ইউরোপের সকল স্কুলই ছিল গির্জার অধীনে। যাইহোক, গির্জার এই চেষ্টা শেষপর্যন্ত চরম আদর্শগত দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। এই প্রবনতার কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছিল প্যারি বিশ্ববিদ্যালয়। এরিস্টটল (Aristotle)-কে নিয়েই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ত্রয়োদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে দু’টি পৃথক স্কুল অব থটস তৈরী হয়। যার একটির নেতৃত্ব দেয় গোঁড়াপন্থী ক্যাথলিক গ্রেট আলবের্ত (১১৯৩-১২৮০) এবং তার ছাত্র থমাস একুইনিস (১২১৫-১২৭৪)। তারা দু’জনই এরিস্টটলের রচনাবলীকে গির্জার শিক্ষার আদর্শের ধারক ও বাহক বলে প্রমান করতে চেষ্টা করেন। অথচ এরিস্টটলের জীবনাকালে (৩৮৪-৩২২বিসি) ক্যাথলিক ধর্মের উৎপত্তিই ঘটেনি কিম্বা গ্রীক দর্শন চিন্তায় ধর্মের কোন প্রভাব পরিলক্ষিত হয়নি।

ইবনে রূশদ।
দ্বিতীয় ধারাটি মূলত: কলা অনুষদের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছিল। এরিস্টটলকে ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে এরা ইবনে রূশদ (Abū l-Walīd Muḥammad bin ʾAḥmad bin Rušd, ১১২৬-১১৯৮) এর চেতনাকে গ্রহণ করে। সিগের ব্রাবনেট নামক একজন শিক্ষক এই ধারার নেতৃত্ব প্রদান করেন। তিনি দাবী করেন যে, খোদা প্রকৃতির নিয়মেই চলেন। গির্জা ১২৭০ ও ১২৭৭ সি দু’ দু'বার ইবনে রূশদের রচনাবলী নিষিদ্ধ করে। সিগের নিজেও পোপের ষড়যন্ত্রে নিহত হন।

বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে গির্জার অন্ধতত্ত্ববাদ (Dogmatism) দ্বারা বিজ্ঞান চিন্তাকে রূদ্ধ করার চেষ্টা চললে স্কলাস্টিক পদ্ধতিতে পড়ানোর প্রচলন শুরু হয়। এই পদ্ধতিতে পাঠ শিক্ষা শিক্ষার্থীদের মধ্যে তর্কশাস্ত্রীয় চিন্তা চেতনার প্রসার ঘটাতে থাকে।

স্কলাস্টিকবাদের ইতিবাচক দিক হচ্ছে যে, তা একদিকে যেমন শিক্ষাথীদেরকে প্রাচীন দর্শণের সাথে পরিচিত হতে সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়, অন্যদিকে জীবনের কিছু সত্য সম্পর্কে নুতন ভাবে ভাবনা-চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করে।

মূল:কথা, গির্জা ও ধর্ম যাজকদের বাড়াবাড়ির ফলে জ্ঞান জগতের বিকাশ বার বার রূদ্ধ হয়ে পড়েছিল। বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে বিরোধের কারণে অনেক বিজ্ঞানীকে নাজেহাল ও মৃত্যুবরণ করতে হয়। কেননা তারা ধর্মের অপব্যাখ্যা করে প্রনয়ণ করে নিয়েছিল পৈচাশিক শারিরিক অত্যাচারের মাধ্যমে মানুষ খুণের লাইসেন্স তথা ’জুডিকাম ডেই’ (Judicium Dei,-The trial of guilt by direct appeal to God, under the notion that He would defend the right even by miracle. There were numerous methods of appeal, as by single combat, ordeal by water or fire, eating a crust of bread, standing with arms extended, consulting the Bible, etc., etc.) ফলত: প্রাচীন গ্রীক, রোমান সাহিত্য, দর্শন ও শিল্পকলায় উজ্জীবিত মনীষীগণ তাদের লেখনী ও শিল্পকর্মে মনুষ্যত্বের অবমাননার বিরুদ্ধে, মানুষের স্বাধীন জ্ঞান বিকাশের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন। আর তাই আজ আমরা জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখার নানা সুফল উপভোগ করতে পারছি।

সমাপ্ত।
ছবি: Wikipedia, introduceofenglishculture.blogspot,


২৩ মে, ২০১৩

Islam: মুহম্মদের ইসলাম প্রচার ও পৌত্তলিকদের প্রতিক্রিয়া।

হেরা পর্বতের গুহায় নবূয়্যত লাভের পর মুহম্মদ (Muhammad) আধ্যাত্মিক বেদনাবোধ, মানসিক অন্তর্দ্বন্দ্ব, সংশয়, আশা এবং আশঙ্কা দ্বারা পর্যায়ক্রমে আন্দোলিত হয়েছিলেন। এসময় স্ত্রী খাদিজা তাকে সান্তনা ও আশার বাণী শুনয়েছিলেন। অতঃপর ফেরেস্তা তাকে মানবজাতির প্রতি তার দায়িত্ব পালনের জন্যে আহবান করল-

উষার শপথ, এবং অন্ধকার রজনীর শপথ........নিশ্চয়ই তোমার পরকাল ইহকালের চেয়ে উত্তম। তোমার প্রভু তোমাকে এমন কিছু দান করবেন যাতে তুমি সন্তুষ্ট হবে। তিনি কি তোমাকে এতিম অবস্থায় পাননি, আর তোমাকে আশ্রয় দেননি? তিনি কি তোমায় পথহারা অবস্থায় পেয়ে, পথের হদিস দেননি? তিনি কি তোমাকে অভাবগ্রস্থ দেখে অভাবমুক্ত করেননি? সুতরাং যে এতিম, তাকে তুমি উৎপীড়ন কোরও না, যে ভিক্ষুক, তাকে তুমি তিরস্কার কোরও না, আর তুমি তোমার প্রভুর অনুগ্রহের কথা প্রচার কর।’(৯৩:১-১১)

স্বর্গীয় এই কন্ঠস্বর মুহম্মদের সংশয় ও ভীতি আলোড়িত ব্যথিত হৃদয়ে আশা ও বিশ্বাস এবং সোনালী ভবিষ্যতের স্বপ্ন সঞ্চার করল। তিনি নিশ্চিত হলেন যে, স্বর্গীয়বাণী দ্বারা তিনি আহুত হয়েছেন, যে বাণী তার পূর্বে যারা বিগত হয়েছেন তাদেরকেও আহবান জানিয়েছিল সত্য প্রচার করতে।

শুরুতে মুহম্মদ একমাত্র অনুরক্তজনদের কাছে সত্য ধর্মের দাওয়াত দিয়েছিলেন এবং তাদের পূর্ব পুরুষদের স্থূল রীতিনীতি থেকে মুক্ত করার প্রয়াস চালিয়েছিলেন। স্ত্রী খাদিজা তার প্রথম শিষ্য এবং তরুণ আলী দ্বিতীয়।

তারপর একদিন ধ্যানমগ্ন অবস্থায় তিনি আবারও এই বাণী দ্বারা আহুত হলেন- ‘ওহে বস্ত্রাবৃত, ওঠ, সতর্ক কর, আর নিজ পালনকর্তার মহিমা ঘোষণা কর।’(৭৪:১-৩)

এখন মুহম্মদের কাছে তার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত কর্ম পরিকল্পণা পরিস্কার হল। তিনি উঠলেন এবং যে কাজের জন্যে তিনি মনোনীত হয়েছেন তা সম্পন্ন করার জন্যে প্রস্তুতি নিলেন। তারপর থেকেই তার জীবন মানবতার সেবায় উৎসর্গীত।

একদিন মুহম্মদ জনসম্মুখে পৌত্তলিকতা বর্জন করার আহবান জানাতে এক প্রত্যুষে ঘন্টি বাজালেন। অতি প্রত্যুষে এ ঘন্টি বাজান হত তখনি, যখন সম্মুখে ভয়ংকর বিপদের হাতছানি দেখা দিত বা অন্যকোন গোত্র কর্তৃক আক্রমণ ধেঁয়ে আসত। সুতরাং ধ্বনি শুনে লোকেরা জিজ্ঞেস করল- ’কে এ ঘন্টি বাজাচ্ছে?’
তারা বলল, ’মুহম্মদ।’
সুতরাং সকলে সাফা পর্বতের পাদ দেশে সমবেত হল।

শুনুন, আমি সকলকে এক 
ভীষণ বিপদের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি।
অত:পর মুহম্মদ পর্বতে আরোহণ করে বললেন-"O my people, if I were to tell you that behind this hill there is an enemy about to attack you, would you believe me?" 

এমনিতে মুহম্মদের কোমল স্বভাব, চরিত্রের তপশ্চার্য্য, জীবনের কঠোর বিশুদ্ধি, বিবেক সম্পন্ন শিষ্টাচার, দীন ও দুর্বলের প্রতি সদা প্রস্তুত সাহায্য, সম্মানবোধের মহৎ ধারণা, অবিচলিত বিশ্বস্ততা, কঠোর কর্তব্য পরায়ণতা তাকে তার স্বগোত্রীয় কাছে মহান ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বাসী উপাধিতে ভূষিত করেছিল। সুতরাং তারা সমস্বরে বলল, ’হ্যাঁ।’

তখন মুহম্মদ বললেন, ’তবে শুনুন, আমি সকলকে এক ভীষণ বিপদের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি।’
কেউ কিছু বলার আগেই পিতৃব্য আবু লাহাব তার দিকে এক টুকরো পাথর ছুঁড়ে মারলেন এবং বললেন, "Woe be on you the rest of the day! Is that what you summoned us for?"

মুহম্মদ আল্লাহর দৃষ্টিতে কুরাইশদের অপরাধের ব্যপকতা, মূর্ত্তিপূজার অসারতা সম্পর্কে এবং অতীতকালে পয়গম্বরদের আহবানে সাড়া না দেয়ায় বিভিন্ন গোত্রের যে ভয়াবহ পরিনতি হয়েছিল সে সম্পর্কেও সতর্ক করলেন। সকলকে সম্বোধন করে তিনি বলেছিলেন, ‘হে আমার দেশবাসী! শ্রবণ করুন! এক বেহেস্তী সওগাত আমি আপনাদের জন্যে নিয়ে এসেছি। আল্লাহর পবিত্র কালাম আমি লাভ করেছি। আপনারা মূর্ত্তিপূজা করবেন না। একমাত্র আল্লাহর উপাসনা করুন। বলুন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহম্মদুর রসূলুল্লাহ। এ ধর্ম গ্রহণ ও আমাকে অনুসরণ করুন, ইহকাল ও পরকালে আপনাদের কল্যাণ হবে। অন্যথায় শিরক ও কুফরের কারণে ভীষণ আযাব সকলকে গ্রাস করবে।- কে এই সত্য প্রচারে আমাকে সাহায্য করবেন? কে আমার পাশে এসে দাঁড়াবেন? -আসুন।’

আবু লাহাব ক্রুদ্ধ হয়ে বলে উঠলেন, ‘মুহম্মদ! ধৃষ্টতা পরিহার কর। তোমার পূজনীয় পিতৃব্য ও খুল্লাতাত ভ্রাতৃগণ এখানে উপস্থিত আছেন, তাদের সম্মুখে বাতুলতা কোরও না। তুমি কুলাঙ্গার। তোমার আত্মীয়দের উচিৎ তোমাকে কয়েদ করে রাখা।’

তিনি সোরগোল পাকিয়ে তুললেন। পিতৃব্যের তার এহেন ব্যবহারে মুহম্মদ মর্মাহত হলেন। এসময় আলী সম্মুখে এগিয়ে এসে উচ্চকন্ঠে ঘোষণা করলেন, ‘হে রসূলুল্লাহ! আমি আপনার পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত আছি। আল্লাহর কসম, আজ হতে আমি আমার জীবন আপনার সেবায় নিয়োজিত করলাম।’

কিন্তু কুরাইশগণ তার আহবানের প্রতি ব্যঙ্গোক্তি করল, তরুন আলীর উদ্দীপনাকে হেসে উড়িয়ে দিল। উপহাস ও তামাসার মহড়া করতে করতে তারা সকলে স্থানত্যাগ করল।

এরপর মুহম্মদ তার পিতৃব্য আবু তালিবকে ইসলাম গ্রহণের জন্যে আমন্ত্রণ জানালেন। তিনি তাকে বলেছিলেন, ‘হে আমার পিতৃব্য, এই ধর্ম আল্লাহর, তার ফেরেস্তাদের, তার নবীদের এবং আমাদের পূর্বপুরুষ ইব্রাহিমের ধর্ম। আল্লাহ আমাকে তার বান্দাদের কাছে পাঠিয়েছেন তাদেরকে সত্যের দিকে পরিচালিত করতে, হে পিতৃব্য! আপনি সকলের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত ব্যক্তি। এটা একটা সম্মেলন, আমি আপনাকে অনুরোধ করি যে, আপনি ইসলাম গ্রহণ করে এর প্রচারে সহায়ক হোন।’

আবু তালিব একজন দৃঢ়চিত্ত সেমিটিকের যথার্থ ভঙ্গীতে বললেন, ‘হে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র! আমি আমার পিতা-পিতামহের পালিত ধর্ম জলাঞ্জলি দিতে পারিনে, তবে পরম শক্তিমান আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি যে, যতদিন আমি জীবিত আছি কেউ তোমার কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারবে না।’
কিন্তু তিনি তার পুত্র আলী বললেন- ‘হে আমার পুত্র! সে তোমাকে যা ভাল নয় এমন কিছুর দিকে আহবান করবে না, কাজেই তুমি স্বাধীনভাবেই তার প্রতি অনুগত হতে পার।’

সাফা পর্বতের পাদদেশে দেয়া বক্তৃতার দ্বারা বাহ্যতঃ তৎক্ষণাৎ বিশেষ কোন সুফল ফলল না বটে, কিন্তু এর ফলে মুহম্মদ ও তার উপদেশ সম্বন্ধে মক্কার গৃহে গৃহে নানারূপ আলোচনা ও আন্দোলন আরম্ভ হল। কয়েকজন ইসলাম গ্রহণ করল আর অন্যরা নানরূপ মন্তব্য করল। এসময় ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন মুক্তদাস জায়েদ, আবু বকর প্রমুখ।

আর মন্তব্যকারীগণ এমনই মন্তব্য করতে থাকল, -‘ঐ কোরআন মিথ্যে বৈ নয়, মুহম্মদই তা উদ্ভাবণ করেছেন এবং অন্য লোকেরা তাকে সাহায্য করেছে।’
অনেকে বলল, ‘এগুলো তো পুরাকালের রূপকথা, যা তিনি লিখে রেখেছেন। এগুলো সকালে সন্ধ্যায় তাকে শেখান হয়।’

কেউ কেউ বলল, ‘এ কেমন রসূল যে, খাদ্য আহার করে এবং হাটে বাজারে চলাফেরা করে? তার কাছে কেন কোন ফেরেস্তা নাযিল করা হল না, যে তার সাথে সতর্ককারী হয়ে থাকত? অথবা তিনি ধন-ভান্ডার প্রাপ্ত হলেন না কেন, অথবা তার একটি বাগান হল না কেন, যা থেকে তিনি আহার করতেন?’
অনেকে বলল, ‘আমাদের কাছে ফেরেস্তা অবতীর্ণ করা হল না কেন? অথবা আমরা আমাদের পালনকর্তাকে দেখি না কেন?’ আবার কেউ কেউ বলল, ‘আমাদের জন্যে তাই যথেষ্ট, যার উপর আমরা আমাদের বাপ-দাদাদেরকে পেয়েছি।’

অতঃপর তারা কোন মুসলমানকে দেখলেই বলতে লাগল, ‘তোমরা তো একজন জাদুগ্রস্থ ব্যক্তিরই অনুসরণ করছ?’
এরই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতসমূহ নাযিল হল- অবিশ্বাসীরা বলে, এটা মিথ্যে বৈ নয়, যা তিনি উদ্ভাবণ করেছেন এবং অন্যলোকেরা তাকে সাহায্য করেছে।’ অবশ্যই তারা অবিচার ও মিথ্যের আশ্রয় নিয়েছে।
তারা বলে, ‘এগুলো তো পুরাকালের রূপকথা, যা তিনি লিখে রেখেছেন। এগুলো সকালে ও সন্ধ্যায় তার কাছে শেখান হয়।’ বল, একে তিনিই অবতীর্ণ করেছেন, যিনি নভঃমন্ডল ও ভূ-মন্ডলের গোপন রহস্য অবগত আছেন। তিনি ক্ষমাশীল মেহেরবান।

তারা বলে, ‘এ কেমন রসূল যে, খাদ্য আহার করে এবং হাটে বাজারে চলাফেরা করে? তার কাছে কেন কোন ফেরেস্তা নাযিল করা হল না, যে তার সাথে সতর্ককারী হয়ে থাকত? অথবা তিনি ধন-ভান্ডার প্রাপ্ত হলেন না কেন, অথবা তার একটি বাগান হল না কেন, যা থেকে তিনি আহার করতেন?’(২৫:৪-৮)

তারা আরও বলে যে, তার কাছে কোন ফেরেস্তা কেন প্রেরণ করা হল না? যদি আমি কোন ফেরেস্তা প্রেরণ করতাম, তবে গোটা ব্যাপারটাই শেষ হয়ে যেত। অতঃপর তাদেরকে সামান্য অবকাশ দেয়া হত না। যদি আমি কোন ফেরেস্তাকে রসূল করে পাঠাতাম, তবে সে মানুষের আকারেই হত। এতেও ঐ সন্দেহ করত, যা এখন করছে। নিশ্চয়ই তোমার পূর্ববর্তী পয়গম্বরগণের সাথেও উপহাস করা হয়েছে।(৬:৮-১০)

যখন তাদেরকে বলা হয় যে, আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান এবং রসূলের দিকে এস; তখন তারা বলে, আমাদের জন্যে তাই যথেষ্ট, যার উপরে আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে পেয়েছি। যদি তাদের বাপ-দাদারা কোন জ্ঞান না রাখে এবং হেদায়েত প্রাপ্ত না হয় তবুও কি তারা তাই করবে?(৫:১০৪)

জালেমরা বলে, ‘তোমরা তো একজন জাদুগ্রস্থ ব্যক্তিরই অনুসরণ করছ?’ দেখ, তারা তোমার কেমন দৃষ্টান্ত বর্ণনা করে। অতএব তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে, এখন তারা পথ পেতে পারে না। কল্যাণময় তিনি, যিনি ইচ্ছে করলে তোমাকে তদাপেক্ষা উত্তম বস্তু দিতে পারেন-বাগ-বাগিচা, যার তলদেশে নহর প্রবাহিত হয় এবং দিতে পারেন তোমাকে প্রাসাদসমূহ।(২৫:৮-১০)

যারা আমার সাক্ষাৎ আশা করে না, তারা বলে, ‘আমাদের কাছে ফেরেস্তা অবতীর্ণ করা হল না কেন? অথবা আমরা আমাদের পালনকর্তাকে দেখি না কেন? তারা নিজেদের অন্তরে অহঙ্কার পোষণ করে এবং গুরুতর অবাধ্যতায় মেতে উঠেছে। যেদিন তারা ফেরেস্তাদেরকে দেখবে, সেদিন অপরাধীদের জন্যে কোন সুসংবাদ থাকবে না এবং তারা বলবে, কোন বাঁধা যদি তা আটকে রাখত!(২৫:২১-২২)

মুহম্মদ স্বজাতীর বিদ্যমান ধর্মীয় বিশ্বাসের বিপরীতে দাবী করেছিলেন যে, আরাধনার যোগ্য একমাত্র আল্লাহ, অন্য কেউ নয়। তিনি পৌত্তলিকরা যেসব স্বহস্তে নির্মিত প্রতিমাকে প্রতিপালকের আসনে অধিষ্ঠিত করেছিল, সেগুলো যে জ্ঞান ও চেতনা থেকে মুক্ত এবং কারও উপকার বা ক্ষতি করতে অক্ষম, একথা প্রকাশ্যে বর্ণনা করেছিলেন। কুরাইশদের কাছে এসব প্রচার সম্পূর্ণ নুতন ধর্মমত প্রতীয়মান হওয়ায় প্রথমদিকে সকলে তার বিরোধিতায় নামে, আর মুহম্মদ আত্মরক্ষার বাহ্যিক কোন সাজসরঞ্জাম ব্যতিরেকেই পৌত্তলিকদের মোকাবেলায় দাঁড়িয়ে যান। এতে কুরাইশগণ তাকে পাগল ভেবেছিল।

মুহম্মদকে সত্যবাদী জানার পরও কুরাইশগণের তার বিরোধিতা ও ধর্ম গ্রহণ না করার মূল কারণগুলির প্রতি যদি আমরা দৃষ্টি দেই, তবে দেখতে পাব সেগুলি ছিল গোত্রগত কৌলিন্যের জন্যে বিরোধিতা, বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করা অথবা নিজেদের নিরাপত্তা বিঘ্নিতের খোঁড়া অজুহাত।

গোত্রগত কৌলিন্যের জন্যে বিরোধিতা করা: কুরাইশ সর্দার আখনাস ইবনে শরীকের সাথে পথে আবু জেহেলের দেখা হল। আখনাস তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মুহম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ সম্পর্কে তোমার ধারণা কি আমাকে সত্য করে বল? তাকে সত্যবাদী মনে কর না মিথ্যেবাদী?’

তিনি বললেন, ‘নিঃসন্দেহে মুহম্মদ সত্যবাদী। সে সারা জীবন একটিও মিথ্যে বলেনি। কিন্তু ব্যাপার এই যে, কুরাইশ গোত্রের একটি শাখা বনি কোসাইয়ে এসব গৌরব ও মহত্ত্বের সমাবেশ ঘটবে, অবশিষ্ট কুরাইশগণ রিক্তহস্ত থেকে যাবে-আমরা তা কিরূপে সহ্য করতে পারি? পতাকা তাদের হাতে, হাজীদের পানি পান করানোর গৌরবময় কাজটি তাদের দখলে, কা’বার প্রহরা ও চাবি তাদের করায়ত্ত। এখন নব্যুয়তও তাদের হাতে ছেড়ে দিলে আমাদের আর কি রইল? --সুতরাং আমরা কোনদিনই তাদের অনুসরণ করব না, যে পর্যন্ত না আমাদের কাছেও তাদের অনুরূপ ওহী আসে।’

এরই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াত নাযিল হয়েছিল- যখন তাদের কাছে কোন আয়াত পৌঁছে, তখন বলে, ‘আমরা কখনই মানব না যে পর্যন্ত না আমরাও তা প্রদত্ত হই, যা আল্লাহর রসূলগণ প্রদত্ত হয়েছেন। আল্লাহ এ বিষয়ে সুপরিজ্ঞাত যে, কোথায় স্বীয় পয়গাম প্রেরণ করতে হবে।(৬:১২৪)

অতঃপর আবু জেহেল মুহম্মদকেও একদিন বলেছিলেন, ‘তুমি মিথ্যাবাদী এরূপ কোন ধারণা আমরা পোষণ করি না। তবে আমরা ঐ গ্রন্থকে অসত্য মনে করি যা তুমি প্রাপ্ত হয়েছ।’

এরই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতসমূহ নাযিল হয়েছিল- আমার জানা আছে যে, তাদের উক্তি তোমাকে দুঃখিত করে। অতএব তারা তোমাকে মিথ্যে প্রতিপন্ন করে না, বরং জালেমরা আল্লাহর নিদর্শণাবলীকে অস্বীকার করে। তোমার পূর্ববর্তী অনেক পয়গম্বরকে মিথ্যা বলা হয়েছে। তারা এতে সবর করেছে। তাদের কাছে আমার সাহায্য পৌঁছা পর্যন্ত তারা নির্যাতিত হয়েছে। আল্লাহর বাণী কেউ পরিবর্তণ করতে পারে না। তোমার কাছে পয়গম্বরদের কিছু কাহিনী পৌঁছেছে।(৬:৩৩-৩৪)

বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করা: কিছু কিছু কুরাইশ নেতা মুহম্মদ সম্পর্কে সম্যক জানা সত্ত্বেও শুধুমাত্র বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করছিলেন। এদেরই একজন ওলীদ ইবনে মুগীরা। ‘রায়হানা কুরাইশ’ নামে খ্যাত এই ব্যক্তি ছিলেন অগাধ বিত্তশালী। তার ফসলের ক্ষেত ও বাগ-বাগিচা মক্কা থেকে তায়েফ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। একদিন মুহম্মদ যখন কোরআন পাঠ করছিলেন তখন তিনি আড়াল থেকে সেই পাঠ শুনলেন। কোরআনের একদিকে রয়েছে পঠনে অপূর্ব মাধুর্য এবং বাক্যবিন্যাসে বিশেষ এক ধরণের বর্ণাঢ্যতা। অন্যদিকে এর বাহ্যিক আবরণও হৃদয়গ্রাহী। পাঠ শুনে তিনি মনে মনে স্বীকার করলেন, ‘এই বাণী কোন মানুষের বা জ্বীনের হতে পারে না।’

কিন্তু এসব কথা মনে মনে স্বীকার করার পরও শুধুমাত্র অহঙ্কার ও বিদ্বেষ বশতঃই তিনি মুহম্মদের নব্যুয়তের স্বীকৃতি না দিয়ে তার বিরুদ্ধাচারণের পথ বেঁছে নিলেন। তিনি কোরআন সম্পর্কে বলে বেড়াতে লাগলেন, ‘এ তো লোক পরস্পরায় প্রাপ্ত জাদু বৈ নয়, এ তো মানুষের উক্তি বৈ নয়।’

তার সম্পর্কে কোরআনের এই আয়াত নাযিল হল- তোমার পালনকর্তা সম্যক জানেন কে তাঁর পথ থেকে বিচ্যূত হয়েছে এবং তিনি জানেন যারা সৎ পথপ্রাপ্ত। অতএব, তুমি মিথ্যারোপকারীদের আনুগত্য করবে না। তারা চায় যদি তুমি নমনীয় হও, তবে তারাও নমনীয় হবে। যে অধিক শপথ করে, যে লাঞ্ছিত, তুমি তার আনুগত্য করবে না। যে পশ্চাতে নিন্দা করে একের কথা অপরের কাছে লাগিয়ে ফেরে, যে ভাল কাজে বাঁধা দেয়- সে সীমালংঘন করে, সে পাপিষ্ঠ, কঠোর স্বভাব, তদুপরি কূখ্যাত; এ কারণে যে সে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতির অধিকারী। তার কাছে আমার আয়াত পাঠ করা হলে সে বলে, ‘সেকালের উপকথা।’ আমি তার নাসিকা দাগিয়ে দেব।(৬৮:৭-১৬)

যাকে আমি অনন্য করে সৃষ্টি করেছি, তাকে আমার হাতে ছেড়ে দাও। আমি তাকে বিপুল ধন-সম্পদ দিয়েছি এবং সদা সঙ্গী পুত্রবর্গ দিয়েছি এবং তাকে খুব সচ্ছলতা দিয়েছি। এরপরও সে আশা করে যে, আমি তাকে আরও বেশী দেই। কখনই নয়। সে আমার নিদর্শণসমূহের বিরুদ্ধাচারণকারী। আমি সত্ত্বরই তাকে শাস্তির পাহাড়ে আরোহণ করাব। সে চিন্তা করেছে এবং মনস্থির করেছে। ধ্বংস হোক সে, কিরূপে সে মনস্থির করেছে। আবার ধ্বংস হোক সে, কিরূপে সে মনস্থির করেছে! সে আবার দৃষ্টিপাত করেছে। অতঃপর সে ভ্রুকুঞ্চিত করেছে ও মুখ বিকৃত করেছে, অতঃপর পৃষ্ঠ প্রদর্শণ করেছে ও অহঙ্কার করেছে। এরপর বলেছে, এ তো লোক পরস্পরায় প্রাপ্ত জাদু বৈ নয়, এ তো মানুষের উক্তি বৈ নয়।’

আমি তাকে দাখিল করব অগ্নিতে। তুমি কি জান অগ্নি কি? এটা অক্ষত রাখবে না এবং ছাড়বেও না, মানুষকে দগ্ধ করবে। এর উপর নিয়োজিত রয়েছে উনিশ জন ফেরেস্তা।(৭৪:১১-৩০)

ইসলাম না গ্রহণের খোঁড়া অজুহাত দেয়া: হারেস ইবনে ওসমান ঈমান কবুল না করার এক কারণ বর্ণনা করলেন। তিনি বললেন, ‘আপনার শিক্ষাকে সত্য মনেকরি, কিন্তু আমাদের আশঙ্কা এই যে, আপনার পথনির্দেশ মেনে আমরা আপনার সাথে একাত্ম হয়ে গেলে সমগ্র আরব আমাদের শত্রু হয়ে যাবে এবং আমাদেরকে আমাদের দেশ থেকে উৎখাত করে দেয়া হবে।’

এ সংক্রান্ত আয়াতসমূহ- তারা বলে, ‘যদি আমরা আপনার সাথে সুপথে আসি, তবে আমরা আমাদের দেশ থেকে উৎখাত হব।’ আমি কি তাদের জন্যে একটি নিরাপদ হরম প্রতিষ্ঠিত করিনি? এখানে সর্বপ্রকার ফলমূল আমদানি হয় আমার দেয়া রিযিকস্বরূপ। কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না।(২৮:৫৮)

তারা কি দেখে না যে, আমি একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থান করেছি। অথচ এর চতুর্পার্শ্বে যারা আছে তাদের উপর আক্রমণ করা হয়। তবে কি তারা মিথ্যায়ই বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং আল্লাহর নেয়ামত অস্বীকার করবে?(২৯:৬৭)

এতসব সত্ত্বেও বেশ কিছু লোক ইসলাম গ্রহণ করলেন। এরা হলেন- ওসমান বিন আফফান, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ, সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস এবং খাদিজার জ্ঞাতি ভাই জুবায়ের ইবনে আওয়াম। এরা সকলেই মুহম্মদের হাতে হাত রেখে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীতে আরও ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন- আবু ওবায়দা, আবু সালমা, ওসমান ইবনে মায়উন, সাইদ, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ প্রমুখ। আর যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল তারা তাতে অবিচলভাবে লেগে ছিল। এতে এসময় নব ধর্মান্তরিতদের ফেরানোর জন্যে কুরাইশগণ প্রথমে ভিন্ন ভিন্ন পন্থায় বিচ্ছিন্নভাবে এবং পরবর্তীতে সম্মিলিতভাবে নানারকম প্রচেষ্টা চালাল।

বিছিন্নভাবে নানা তরিকায় নবধর্মান্তরিতদেরকে ফেরানোর চেষ্টা: সা'দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস ইসলাম গ্রহণ করাতে তার মাতা হোমনা বিনতে আবু সুফিয়ান খুবই মর্মাহত হলেন। তিনি শপথ গ্রহণ করলেন, ‘আমি ততক্ষণ পর্যন্ত আহার ও পানীয় গ্রহণ করব না, যে পর্যন্ত না সা'দ পৈতৃক ধর্মে ফিরে আসে। এমনিভাবে আমি ক্ষুৎ-পিপাসায় মৃত্যুবরণ করব, যাতে সে মাতৃহন্তা রূপে সকলের দৃষ্টিতে হেয় প্রতিপন্ন হয়।’

সা'দ অত্যধিক পরিমাণে মাতৃভক্ত ছিলেন। তিনি এই ঘটনায় বিচলিত হয়ে পড়লেন। এসময় এই আয়াত নাযিল হল- আমি মানুষকে পিতামাতার সাথে সদ্ব্যাবহার করার জোর নির্দেশ দিয়েছি। যদি তারা তোমাকে আমার সাথে এমন কিছু শরীক করার জোর প্রচেষ্টা চালায়, যার সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তবে তাদের আনুগত্য কোরও না।’(২৯:৮)

সা'দের মাতা শপথ অনুযায়ী তিন দিন তিন রাত অনশন অব্যহত রাখলেন। তখন সা'দ তার মাতার কাছে গিয়ে বললেন, ‘মা, যদি তোমার দেহে এক‘শ আত্মা থাকত এবং আমার সম্মুখে সেগুলি একটি একটি করে তোমার দেহ পরিত্যাগ করত, তবুও আমি এই সত্যধর্ম ত্যাগ করতাম না।’ তখন তার মাতা নিরাশ হয়ে অনশন ভঙ্গ করলেন।

আবার ওকবা ইবনে আবী মুয়ীত একজন অন্যতম কুরাইশ নেতা ছিলেন। তিনি কোন সফর থেকে ফিরে এলে শহরের গণ্যমান্য লোকদের দাওয়াত করতেন এবং মুহম্মদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করতেন। এ ধরণের এক নিমন্ত্রণে মুহম্মদ তার বাসগৃহে গেলেন। যখন ওকবা তার সামনে খানা উপস্থিত করলেন, তখন তিনি বললেন, ‘আমি তোমার খানা গ্রহণ করতে পারি না যে পর্যন্ত না তুমি সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ এক, এবাদতে তাঁর কোন অংশীদার নেই এবং আমি তার রসূল।’ তখন ওকবা সাক্ষ্য দিলেন এবং মুহম্মদ খাদ্য গ্রহণ করলেন।

উবাই ইবনে খলফ ছিলেন ওকবার ঘনিষ্ট বন্ধু। তিনি যখন ওকবার ইসলাম গ্রহণের কথা জানতে পারলেন, তখন খুবই রাগান্বিত হলেন। ওকবা ওজর পেশ করলেন, ‘কুরাইশ বংশের সম্মানিত অতিথি মুহম্মদ আমার গৃহে আগমন করেছিলেন। তিনি খাদ্য গ্রহণ না করে ফিরে গেলে তা আমার জন্যে অবমাননাকর হত। তাই অমি তার মনোরঞ্জনের জন্যে ইসলাম গ্রহণ করেছি।’
উবাই বললেন, ‘আমি তোমার এই ওজর কবুল করব না, যে পর্যন্ত না তুমি গিয়ে তার মুখে থুথু নিক্ষেপ করবে।’
হতভাগ্য ওকবা বন্ধুর কথায় সম্মত হলেন।

এরপর তাদের সম্পর্কে এই আয়াত নাযিল হয়েছিল- জালেম সেদিন আপন হস্তদ্বয় দংশন করতে করতে বলবে, ‘হায় আফসোস, আমি যদি রসূলের সাথে পথ অবলম্বণ করতাম! হায় আমার দুর্ভাগ্য, আমি যদি ওমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম। আমার কাছে উপদেশ আসার পর সে আমাকে বিভ্রান্ত করেছিল।(২৫:২৭-২৯) এই ওকবা ও উবাই দু‘জনই কুরাইশদের পক্ষে যুদ্ধ করতে এসে বদর যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন।

আবার মক্কার জনৈক ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করল। এতে তার বন্ধু তাকে তিরস্কার করে বলল, ‘তুমি পৈত্রিক ধর্ম কেন ছেড়ে দিলে?’
সে বলল, ‘আমি আল্লাহর শাস্তিকে ভয় করি।’
বন্ধু বলল, ‘তুমি আমাকে কিছু অর্থকড়ি দিলে আমি তোমার সেই শাস্তি নিজের কাঁধে নিয়ে নেব। ফলে তুমি শাস্তি থেকে অব্যহতি লাভ করবে।’
এই আহম্মক তার বন্ধুর কথায় বিশ্বাস স্থাপন করল এবং ইসলাম ত্যাগ করল। আর চুক্তিমত ঐ বন্ধুকে কিছু অর্থকড়ি দিল। বন্ধু আরও চাইলে সে সামান্য ইতস্ততঃ করার পর আরও কিছু অর্থ দিল।

অথচ ইব্রাহিমের ও মূসার কিতাবে পরিস্কার উল্লেখ আছে যে, কোন ব্যক্তি কারও গোনাহ নিজে বহন করবে না। অন্যদিকে নির্বোধ এই ব্যক্তির কাছে কোন অদৃশ্যের জ্ঞান নেই, যা দ্বারা  সে দেখতে পাচ্ছে যে, এই বন্ধু তার শাস্তি মাথা পেতে নিচ্ছে এবং সে বেঁচে যাচ্ছে।

এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াত নাযিল হয়েছিল- তুমি কি তাকে দেখেছ, যে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং দেয় সামান্যই ও পাষাণ হয়ে যায়? তার কাছে কি অদৃশ্যের জ্ঞান আছে, যে সে দেখে? তাকে কি জানান হয়নি যা আছে মূসার কিতাবে এবং ইব্রাহিমের কিতাবে, যে তার দায়িত্ব পালন করেছিল? কিতাবে এ আছে যে, কোন ব্যক্তি কারও গোনাহ নিজে বহন করবে না এবং মানুষ তাই পায়, যা সে করে। তার কর্ম শীঘ্রই দেখা হবে।(৫৩:৩৩-৪০)

আবার খাব্বার ইবনে আরত নামক এক মুসলমান আস ইবনে ওয়ায়েল নামক কুরাইশের কাছে কিছু অর্থ পাওনা ছিলেন। একদিন পাওনার তাগাদায় তিনি আসের কাছে গেলেন। আস তাকে বলল, ‘তুমি মুহম্মদের প্রতি ঈমান প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত আমি তোমার পাওনা পরিশোধ করব না।’

তিনি বললেন, ‘এরূপ করা আমার পক্ষে কোনক্রমেই সম্ভবপর নয়, চাই কি তুমি মরে  পুনঃরায় জীবিত হও।’
আস বলল, ‘ভাল কথা, আমি কি মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত হব?’
তিনি বললেন, ‘অবশ্যই এবং তাতে কোনই সন্দেহ নেই।’
আস বলল, ‘তাহলে তোমার ঋণ আমি তখনই শোধ করব। কারণ, তখনও আমার হাতে ধন-দৌলত ও অর্থ-কড়ি থাকবে।’

কোরআন এই আহম্মকের প্রশ্নের জবাব দিয়েছে এভাবে- তুমি কি তাকে লক্ষ্য করেছ, যে আমার নিদর্শণাবলীতে বিশ্বাস স্থাপন করে না এবং বলে, ‘আমাকে অর্থ-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি অবশ্যই দেয়া হবে।’
সে কি অদৃশ্য বিষয় জেনে ফেলেছে, অথবা দয়াময় আল্লাহর কাছ থেকে কোন প্রতিশ্রুতি প্রাপ্ত হয়েছে? না, এটা ঠিক নয়। সে যা বলে আমি তা লিখে রাখব এবং তার শাস্তি দীর্ঘায়িত করতে থাকব। সে যা বলে, মৃত্যুর পর আমি তা নিয়ে নেব এবং সে আমার কাছে আসবে একাকী।(১৯:৭৭-৮০)

আর নাজার ইবনে হারেছ মুহম্মদ সম্পর্কে এমন মন্তব্য করলেন যা কুরাইশদের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করল। তিনি জনতাকে সমবেত করে বললেন, ‘হে কুরাইশগণ! আল্লাহ তোমাদের উপর এমন এক বিষয় অবতীর্ণ করেছেন যার উপর আর কোন ছল-চাতুরী চলবে না, মুহম্মদ তোমাদেরই মাঝে লালিত-পালিত, তোমাদের মাঝেই তিনি বয়োঃপ্রাপ্ত হয়েছেন। তোমরাই তাকে আল-আমিন উপাধি দিয়েছ। তোমরা সবাই তাকে ভালবাসতে, আর তার আচার-আচরণের জন্যে ভূয়সী প্রশংসা করতে। সকলে তাকে সত্যবাদী বলে জানতে।

--কিন্তু পৌঢ় বয়সে যখন তিনি ঐশী বাণী প্রচার করতে লাগলেন, তখন তোমরা তাকে যাদুকর, গণক, পাগল ইত্যাদি বলা শুরু করলে। অথচ এই সকল লোকের প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের যথেষ্ট অভিজ্ঞতা আছে। তাই অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায় যে, তিনি এদের কিছুই নন, তবে আমি বলছি যে, তার বাণীর চেয়ে আমার বাণী আরও সুন্দর। অতএব, তোমরা সবাই আমার বাণীর অনুসরণ কর।’

নাজার ছিলেন দারুণ নাদওয়ার সদস্য এবং একজন ব্যবসায়ী। তিনি ব্যবসায়িক কারণে বিভিন্ন দেশ ভ্রমন করতেন, ফলে রাজা-বাদশাদের কিচ্ছা-কাহিনীর অনেক কিছুই তিনি জানতেন। তাছাড়া তিনি রুস্তম, ইছফেনদিয়ার ও পারস্য সম্রাটদের কিচ্ছা-কাহিনীর বই পারস্য থেকে ক্রয় করে এনেছিলেন। তিনি পৌত্তলিকদের বললেন, ‘মুহম্মদ তোমাদেরকে আ‘দ, সামুদ প্রভৃতি সম্প্রদায়ের কিচ্ছা-কাহিনী শোনায়, কিন্তু আমি তোমাদেরকে পারস্য সম্রাটদের সেরা কাহিনী শোনাব।’

নাজার সুললিত ভাষায় সম্রাটদের কাহিনী পৌত্তলিকদের শুনাতে লাগলেন। এগুলি ছিল চটকদার গল্পগুচ্ছ, ফলে পৌত্তলিকদের যারা আগে কোরআনের আলৌকিকতা ও অদ্বিতীয়তার কারণে তা শোনার আগ্রহ পোষণ করত ও গোপনে শুনতও, তারা এখন কোরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবার ছুতা পেয়ে গেল। আর নাজার পৌত্তলিকদের গল্প শুনান শেষে বলতে লাগলেন, ‘বল, মুহম্মদের বাণী অপেক্ষা আমার বাণী কোন অংশে শ্রেষ্ঠ ও শ্রুতিমধুর নয়?’

মুহম্মদের জনৈক শিষ্য তার কথা শুনে বললেন, ‘কোরআন সমগ্র বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে-‘এর বিরোধীরা যদি সত্য হয়ে থাকে, তবে কোরআনের ছোট একটি সূরার অনুরূপ একটি সূরা উপস্থাপন করে দেখিয়ে দিক।’
নাজার বললেন, ‘আমরা যদি ইচ্ছে করি তবে আমরাও এমন কালাম বলতে পারি।’

নাজার আল্লাহর বাণী অবতীর্ণ করার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন। কিন্তু অনুরূপ কোন বাণী অবতীর্ণ করতে ব্যর্থ হলেন তিনি। তখন ঐ শিষ্য বললেন, ‘তাহলে একথা বলা যায় যে, আমরা যদি ইচ্ছেকরি তবে আমরাও এমন কালাম বলতে পারি’- এমন কথা লাজ-লজ্জার অধিকারী কোন ব্যক্তিই বলতে পারে না।’
নাজার বললেন, ‘হে আল্লাহ, এই কোরআনই যদি সত্য হয়ে থাকে, তবে আমাদের উপর আকাশ থেকে প্রস্তর বর্ষণ কর, কিম্বা কোন কঠিন আযাব নাযিল কর।’

নাজার পারস্য থেকে এক সুন্দরী বাঁদী ক্রয় করে এনে তাকে কোরআন শ্রবণ থেকে মানুষকে ফেরানোর কাজে নিয়োগ করলেন। আর তিনি লোকদেরকে ডেকে বলতে লাগলেন, ‘মুহম্মদ তোমাদেরকে কোরআন শুনিয়ে নামাজ কায়েম করতে, রোজা রাখতে এবং ধর্মের জন্যে প্রাণ বিসর্জনের কথা বলেন। এতে কষ্টই কষ্ট। এস এই সুন্দরী নারীর কন্ঠে গান শুন ও উল্লাস কর।’

তার কথা ও জবাব কোরআন এভাবে দিয়েছে- ঐ ব্যক্তির চাইতে বড় জালেম কে হবে যে, আল্লাহর প্রতি মিথ্যে আরোপ করে অথবা বলে, ‘আমার প্রতি ওহী অবতীর্ণ হয়েছে। অথচ তার প্রতি কোন ওহী আসেনি এবং যে দাবী করে যে, আমিও নাযিল করে দেখাচ্ছি, যেমন আল্লাহ নাযিল করেছেন।(৬:৯৩)

অবিশ্বাসীরা বলে, ‘এটা মিথ্যা বৈ নয়, যা তিনি উদ্ভাবন করেছেন এবং অন্য লোকেরা তাকে সাহায্য করেছে।’ অবশ্যই তারা অবিচার ও মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে। তারা বলে, ‘এগুলো তো পুরাকালের রূপকথা, যা তিনি লিখে রেখেছেন। এগুলো সকাল ও সন্ধ্যায় তার কাছে পাঠ করা হয়।’(২৫:৪-৫)

আর কেউ যখন তাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করে তবে বলে, ‘আমরা শুনেছি, ইচ্ছে করলে আমরাও এমন বলতে পারি, এ তো পূর্ববর্তীদের ইতিকথা বৈ তো কিছুই নয়।’ তাছাড়া তারা যখন বলতে আরম্ভ করে যে, ‘ইয়া আল্লাহ, এ যদি তোমার পক্ষ থেকে আগত সত্য দ্বীন হয়ে থাকে, তবে আমাদের উপর আকাশ থেকে প্রস্তর বর্ষণ কর কিম্বা আমাদের উপর বেদনাদায়ক আযাব নাযিল কর।’ কিন্তু আল্লাহ কখনও তাদের উপর আযাব নাযিল করবেন না, যতক্ষণ তুমি তাদের মাঝে অবস্থান করবে। তাছাড়া যতক্ষণ তারা ক্ষমা প্রার্থণা করতে থাকবে আল্লাহ কখনও তাদের উপর আযাব দেবেন না।(৮:৩১-৩৩)

এক শ্রেণীর লোক আছে যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে গোমরাহ করার উদ্দেশ্যে অবান্তর কথাবার্তা সংগ্রহ করে অন্ধভাবে এবং তাকে নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রুপ করে। এদের জন্যে রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি। যখন ওদের সামনে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করা হয়, তখন ওরা দম্ভের সাথে এমনভাবে মুখ ফিরিয়ে নেয়, যেন ওরা তা শুনতেই পায়নি অথবা যেন ওদের দু‘কান বধির।(৩১:৬-৭)

মুহম্মদকে নিন্দনীয় উপাধি দেয়া: খাদিজার গর্ভে মুহম্মদের তিন পুত্র- কাসেম, তাহের ও তৈয়ব এবং এক কন্যা ফাতিমা জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু সব পুত্রসন্তান শৈশবেই মারা যান। পুত্রদের অকাল মৃত্যুতে পিতৃহৃদয় যেভাবে উদ্বেলিত করেছিল তাতে বিরোধী কুরাইশগণ তার প্রতি নিন্দনীয় উপাধি আরোপ করেছিল। তারা মুহম্মদকে আবতার উপাধি দিয়েছিল, যার অর্থ লেজ বা লাঙ্গুল বিহীন-নির্বংশ। তিনি মনে মনে কষ্ট অনুভব করতেন। আল্লাহ তখন তাকে সাত্ত্বনা দিতে এই আয়াত নাযিল করেছিলেন -

‘আমি তো তোমাকে কাওছার দান করেছি। সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ পড় ও কোরবাণী দাও। যে তোমার দুশমন সে-ই তো নির্বংশ।’(১০৮:১-৩)

ইসলাম ও নবধর্মান্তরিতদেরকে বিদ্রুপ করা: কোরআন অবতরণের প্রথম দিকে এই আয়াত দ্বারা তাহাজ্জুতের নামাজ ফরজ করা হয়েছিল- হে বস্ত্রাবৃত, রাত্রিতে দন্ডায়মান হও কিছু অংশ বাদ দিয়ে; অর্ধরাত্রি অথবা তদপেক্ষা কিছূ কম অথবা তদপেক্ষা বেশী এবং কোরআন আবৃত্তি কর সুবিন্যস্তভাবে ও স্পষ্টভাবে। আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি গুরুত্বপূর্ণ বাণী। নিশ্চয় এবাদতের জন্যে রাত্রিতে উঠা প্রবৃত্তি দলনে সহায়ক এবং স্পষ্ট উচ্চারণের অনুকূল। নিশ্চয় দিবাভাগে রয়েছে তোমার দীর্ঘ কর্ম ব্যস্ততা। তুমি তোমার পালনকর্তার নাম স্মরণ কর এবং একাগ্রচিত্তে তাতে মগ্ন হও।(৭৫:১-৮)

উপরের আয়াতসমূহে দেখা যাচ্ছে তাহাজ্জুতের নামাজ রাত্রির অধিকাংশ সময় ধরে পড়ার নির্দেশ রয়েছে। মুহম্মদের শিষ্যদের সকলেই তা পালন করতে লাগলেন। ফলে অতি অল্পসয়য়েই তাদের পদযুগল ফুলে গেল। তাছাড়া তখনকার যুগে ঘড়ির প্রচলন না থাকায় কতটা সময় ধরে নামাজ আদায় করা হয়েছে এ সম্পর্কে তাদের সম্যক ধারণা থাকত না। ফলে প্রায় সারা রাত্রিই তারা নামাজে অতিবাহিত করে ফেলতেন। রাতের এই পরিশ্রম দেখে পৌত্তলিকরা মুসলমানদেরকে বিদ্রুপ করতে লাগল। তারা বলল- ‘তোমাদের প্রতি কোরআন তো নয়, সাক্ষাৎ বিপদ নাযিল হয়েছে। দিনেও শান্তি নেই, রাতেও আরাম নেই।’

আবার মুহম্মদকে বিব্রত করতে কুরাইশগণ সবসময় তার পিছে লেগে থাকত এবং নানারকম অবান্তর প্রশ্নের অবতারণা করত। একবার তারা এই প্রশ্ন নিয়ে হাজির হল- ‘হে মুহম্মদ, তোমার আল্লাহর বংশ-পরিচয় কি? তিনি কিসের তৈরী, স্বর্ণরৌপ্য অথবা অন্যকিছুর?’

এর জবাবে সূরা এখলাস অবতীর্ণ হয়- বল, ‘তিনি আল্লাহ, এক, আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি এবং তার সমতুল্য কেউ নেই।’(১১২:১-৪)

আবার মুহম্মদ একদিন নামাজ শেষে দোয়ায় ইয়া আল্লাহ, ইয়া রহমান বলে আহবান করলে কুরাইশ পৌত্তলিকরা মনে করতে থাকে যে, তিনি দু‘উপাস্যকে আহবান করেন। অতঃপর তারা বলাবলি করতে লাগল- ‘তিনি আমাদেরকে তো একজন ব্যতিত অন্য কাউকে ডাকতে নিষেধ করেন অথচ দেখ তিনি নিজেই দু‘উপাস্যকে ডাকেন।’
অতঃপর মুহম্মদ যখনি নামাজে কোরআন পাঠ করতেন, তখনি কুরাইশদের একদল ঠাট্টা-বিদ্রুপ এবং কোরআন, আল্লাহ ও জিব্রাইলকে উদ্দেশ্য করে ধৃষ্টতাপূর্ণ কথাবার্তা বলতে লাগল।

আবার আদ বিন কাব পরিবারের সদস্য ওমর বিন খাত্তাব এর এক বাঁদী ইসলাম গ্রহণ করল। এই বাঁদীর নাম ছিল রানীন। ইসলাম গ্রহণের অপরাধে ওমর সকাল-বিকাল তাকে প্রহার করতেন। এ দেখে কুরাইশগণ মন্তব্য করত, ‘ইসলাম ভাল হলে রানীনের মত নীচ বাঁদী আমাদেরকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে পারত না।’

এরই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়-আর কাফেররা মুমিনদেরকে বলতে লাগল যে, যদি এ দ্বীন ভাল হত; তবে এরা আমাদেরকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে পারত না।(৪৬:১১)

কোরআন খোদার বাণী সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করা: কোরআন যে মহান আল্লাহর বাণী এ সম্পর্কে কিছু কিছু কুরাইশ সন্দেহ পোষণ করল। তাদের এই সন্দেহের কারণ হল, কোরআনে মশা-মাছির ন্যায় তুচ্ছ বস্তুর আলোচনাও স্থানলাভ করেছে, বস্তুতঃ এটা মহান আল্লাহ ও তাঁর পবিত্র কালামের মর্যাদার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। এই গ্রন্থ প্রকৃতই যদি আল্লাহর বাণী হত, তবে এতে এরূপ নিকৃষ্ট ও তুচ্ছ বস্তুর আলোচনা স্থান পেত না। কারণ, কোন মহান সত্ত্বা এ ধরণের নগণ্য বস্তুর আলোচনা করতে লজ্জা ও অপমান বোধ করেন।

এরই প্রত্যুত্তরে এই আয়াত নাযিল হয়েছিল- আল্লাহ নিঃসন্দেহে মশা বা তদুর্ধ বস্তু দ্বারা উপমা পেশ করতে লজ্জাবোধ করেন না। বস্তুতঃ যারা মুমিন তারা নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করে যে, তাদের পালনকর্তা কর্তৃক উপস্থাপিত এ উপমা সম্পূর্ণ নির্ভুল ও সঠিক। আর যারা কাফের তারা বলে, এরূপ উপমা উপস্থাপনে আল্লাহর মতলবই বা কি ছিল! এ দ্বারা আল্লাহ অনেককে বিপথগামী করেন, আবার অনেককে সঠিক পথও প্রদর্শণ করেন। তিনি অনুরূপ উপমা দ্বারা অসৎ ব্যক্তিবর্গ ভিন্ন কাউকেও বিপথগামী করেন না।(২:২৬)

উত্যক্ত, অপদস্থ ও শারিরিক নির্যাতনের হুমকি: এখন মিথ্যে অপবাদ ও দুর্ণাম, গালিগালাজ ও অবমাননার বিনিময়ে প্রাকাশ্যে প্রচন্ড নিষ্পেষণ শুরু হল। তারা মুহম্মদকে কা’বাগৃহে নামাজ পড়া বন্ধ করে দিল। তিনি যেখানেই যান না কেন সেখানেই তারা তাকে অনুসরণ করতে লাগল। তিনি বা তার শিষ্যরা কোথাও নামাজে দাঁড়ালে তারা তাদের উপর ময়লা ও নোংরা জিনিষ নিক্ষেপ করতে লাগল।

কুরাইশগণ মুহম্মদকে অপমান করার জন্যে নগরের শিশু ও দষ্টু লোকদের লেলিয়ে দিল। তিনি যে সব রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করতেন সেই সব রাস্তায় কাঁটা ছড়িয়ে রাখতে লাগল। এসব কাজে তার পিতৃব্য আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মুল জামিল নেতৃত্ব দিতেন। এই ক্রুদ্ধ আচরণের জন্যে তিনি ‘কাষ্ঠ বহনকারিণী’ খেতাব পেয়েছিলেন। আবু লাহাব ও তার স্ত্রী সম্পর্কে কোরআনের এই সূরাটি (সূরা লাহাব) নাযিল হয়েছিল-

ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দু’হাত! আর সে নিজে। তার ধন-সম্পদ ও সে যা অর্জন করেছে তা তার কোনই কাজে আসবে না। অচিরেই সে লেলিহান আগুনে প্রবেশ করবে আর তার স্ত্রীও, যে ইন্ধণ (কাঠ) বহন করে; তার গলদেশে খর্জ্জুর বৃক্ষের আঁশের পাকান রজ্জু নিয়ে।’(১১১:১-৫)

বদর যুদ্ধের সাতদিন পর আবু লাহাবের গলায় প্লেগের ফোঁড়া দেখা দিয়েছিল। সংক্রমণের ভয়ে তার পরিবারের লোকেরা তাকে বিজন জায়গায় ছেড়ে চলে আসে। শেষপর্যন্ত ঐ অসহায় অবস্থায়ই তার মৃত্যু হয়েছিল। তিনদিন পর্যন্ত মৃতদেহ কেউ স্পর্শ করেনি। পঁচতে শুরু করলে চাকরেরা তাকে মাটিতে পুঁতে ফেলেছিল।

নামাজের আদেশ লাভ করার পর মুহম্মদ যখন নামাজ পড়া শুরু করেন, তখন তার পিতৃব্য আবু জেহেল তাকে নিষেধ করলেন এবং হুমকি দিলেন- ‘ভবিষ্যতে নামাজ পড়লে ও সিজদা করলে আমি তোমার ঘাড় পদতলে পিষ্ট করে দেব।’

এর জবাবে এই আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হয়- সত্যি সত্যি মানুষ সীমালঙ্ঘন করে এ কারণে যে, সে নিজেকে অভাবমুক্ত মনে করে। নিশ্চয় তোমার পালনকর্তার দিকে প্রত্যাবর্তণ হবে। তুমি কি তাকে দেখেছ যে নিষেধ করে এক বান্দাকে যখন সে নামাজ পড়ে? তুমি কি দেখেছ যদি সে সৎপথে থাকে অথবা আল্লাহভীতি শিক্ষা দেয়? তুমি কি দেখেছ, যদি সে মিথ্যারোপ করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়? সে কি জানে না যে, আল্লাহ দেখেন? কখনই নয় যদি সে বিরত না হয়, তবে আমি মস্তকের সামনের কেশগুচ্ছ ধরে হেঁচড়াবই- মিথ্যাচারী, পাপীর কেশগুচ্ছ। অতএব সে তার সভাষদদের আহবান করুক। আমিও আহবান করব জাহান্নামের প্রহরীদেরকে কখনই নয়, তুমি তার আনুগত্য করবে না। তুমি সিজদা কর ও আমার নৈকট্য অর্জণ কর।(৯৬:৬-১৯)

একদিন মুহম্মদ সাফা পর্বতের গুহায় ধ্যানমগ্ন ছিলেন এসময় আবু জেহেল সেখানে উপস্থিত হলেন। প্রথমে তিনি তাকে নানারূপ গালি দিতে লাগলেন, কিন্তু মুহম্মদ বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না। তখন তিনি কোরআন ও ইসলাম সম্বন্ধে কুৎসিৎ আলোচনা আরম্ভ করলেন, তাতেও তার বিন্দুমাত্র ধৈর্য্যচ্যূতি না ঘটায় তিনি একখানা প্রস্তর তাকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারলেন। প্রস্তরখন্ডটি মুহম্মদের মাথায় লাগল। এই আঘাতে ক্ষতস্থান থেকে দরদর করে রক্ত ঝরতে লাগল। তিনি রক্তসিক্ত অবস্থায় কাউকে কিছু না জানিয়ে নিরবে গৃহে ফিরে এলেন। এই ঘটনা মুহম্মদের পিতৃব্য হামজাকে ইসলাম গ্রহনে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

এরপর একদিন মুহম্মদ কতিপয় ভক্ত সমবিহারে কা’বা গৃহে গমন করে, সেখানে একেশ্বরবাদ প্রচার করতে চাইলেন। চারিদিকে হুলস্থূল পড়ে গেল, সকলে মার-মার করে ছুটে এল এবং তার সাথে চরম দুর্ব্যাবহার করতে শুরু করল। এসময় বিবি খদিজার পুত্র হারেছ ইবনে আবি হালাঃ এসে তাদের দুর্ব্যাবহারের প্রতিবাদ করলেন। ফলে উত্তেজিত কুরাইশগণ তাকে আক্রমণ করল এবং তাতে এই নিরপরাধ যুবকের শোণিতে কা’বার প্রাঙ্গণ রঞ্জিত হয়ে গেল।

আবিষ্ট ভাবা ও জ্বিন ছাড়ানোর প্রচেষ্টা: দীর্ঘ ক্লান্তিকর তিন বৎসর ধরে মুহম্মদ কুরাইশদেরকে মূর্ত্তিপূজা থেকে বিরত করার জন্যে নীরবে কঠোর পরিশ্রম করছিলেন। পৌত্তলিকতা তাদের মধ্যে গভীর শিকড় গেড়ে বসেছিল। প্রাচীন ধর্ম উপাসনায় তাদের কায়েমী স্বার্থ ছিল এবং তার রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে তাদের মান-সম্মান জড়িত ছিল। তদুপরি তারা কুসংস্কারে আবদ্ধ ছিল। এসব শক্তির সঙ্গে লড়াই করে তিনি তিন বৎসরে কেবল ত্রিশজন অনুসারী করতে সমর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি মোটেই দমে যাননি। যে সর্বশক্তিমান আল্লাহর আদেশ তিনি বাস্তবে রূপ দিচ্ছিলেন, তাঁর প্রতি অবিচল বিশ্বাস রেখে তিনি অগ্রসর হচ্ছিলেন। মক্কাবাসীরা তার দিকে বক্রদৃষ্টিতে তাকাতে শুরু করেছিল, তার আল আমিন উপাধির স্বাভাবিকতা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছিল, তারা তাকে ‘অবিষ্ট’ বলে ভেবেছিল।

ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় মুহম্মদের সারা অঙ্গে তার প্রতিক্রিয়া ফুটে উঠত। অতঃপর তিনি প্রাপ্ত ওহী পাঠ করে শুনাতেন। এই গোটা ব্যাপারটি পৌত্তলিকদের জ্ঞান ও অনুভূতির উর্দ্ধে ছিল। তাই তারা তাকে ওহী পাঠরত দেখতে পেলে ক্রুদ্ধ ও তীর্যক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাত।

যেমাদ বিন সালাবা বিখ্যাত আযত গোত্রের একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি। তিনি মন্ত্রতন্ত্রে পারদর্শী ছিলেন। কুরাইশগণ তাকে সংবাদ পাঠাল- ‘মুহম্মদের স্কন্ধে একটা ভয়ঙ্কর ভূত চেপেছে। আপনি এসে আমাদেরকে সাহায্য করুন।’

যেমাদ মক্কায় আগমন করে মুহম্মদের সাক্ষাতে এলেন। অতঃপর তাকে বললেন, ‘হে মুহম্মদ! শুনতে পাচ্ছি আপনাকে ভয়ঙ্কর ভূতে পেয়েছে। আপনি সোজা হয়ে বসুন। আমি এখুনি মন্ত্র পাঠ করে আপনার ভূত ছাড়িয়ে দিচ্ছি।’ তার কথা শুনে মুহম্মদ হেসে ফেললেন এবং অতঃপর উচ্চেঃস্বরে কোরআনের একটি আয়াত পাঠ করলেন। আয়াতটি শ্রবণমাত্র যেমাদের মন পরিবর্তিত হল। তিনি ইসলাম গ্রহণ করে স্ব-গোত্রে ফিরে গেলেন।

মক্কায় জনৈক ব্যক্তি নযর লাগানোর কাজে খুবই প্রসিদ্ধ ছিল। সে উট বা অন্য কোন গৃহপালিত পশুকে নযর লাগালে সেটি ক্লিষ্ট হয়ে পড়ত এবং একসময় মৃত্যুর দ্বারে পৌঁছে যেত। অতঃপর মক্কার পৌত্তলিকরা মুহম্মদের উপর নযর লাগানোর জন্যে ঐ ব্যক্তিকে নিয়োগ করল। ঐ ব্যক্তি এই কাজে তার সর্বশক্তি নিয়োগ করল। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছে ব্যতিত তাঁর রসূলের ক্ষতি করার সাধ্য কার?

এ সকল ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াত নাযিল হল- অবিশ্বাসীরা যখন কোরআন শুনে, তখন তারা তাদের দৃষ্টি দ্বারা যেন তোমাকে আছাড় দিয়ে ফেলে দেবে এবং তারা বলেঃ সে তো একজন পাগল।(৬৮:৫১)

নিদর্শণ দাবী করা: জিলকদ মাসের ১২/১৩ তারিখে মুহম্মদ মিনায় অবস্থান করছিলেন কুরাইশ নেতাদের একত্রে পাবার আশায়। আবু জেহেলসহ কতিপয় কুরাইশ নেতা সেই সময় তার কাছে এলেন। তারা বললেন, ‘হে মুহম্মদ! যদি তুমি চাঁদকে দ্বিখন্ডিত করে দেখাতে পার তবে আমরা তোমার নব্যুয়ত প্রাপ্তির সত্যতার প্রমান পাব আর নিশ্চয় আমরাও ইসলাম গ্রহণ করব।’

পূর্ণ চাঁদ দ্বিখন্ডিত হয়ে পড়ল।
মুহম্মদ সর্বদা পৌত্তলিকদের মু‘জেযার দাবী প্রত্যাখ্যান করতেন এই যুক্তিতে যে, প্রতিনিয়ত তার উপর প্রকাশ্যভাবে দিনের পর দিন কোরআন অবতরণের মত প্রমান্য ব্যাপার প্রত্যক্ষ করেও যারা সত্য গ্রহণ করতে পারেন না, কয়েক মূহুর্তের অদৃশ্যমান মু‘জেযা তাদের সেই সত্য দেখতে কোন সাহায্য করবে না। তবুও মুহম্মদ এই চ্যলেঞ্জ গ্রহণ করলেন। তিনি হাত উঠিয়ে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করলেন এবং আঙ্গুল উঁচিয়ে চাঁদকে নির্দেশ দিলেন। পূর্ণ চাঁদ দ্বিখন্ডিত হয়ে পড়ল। এমনকি একখন্ড অপরখন্ড থেকে এতদূরে চলে গেল যে, মাঝখান দিয়ে হেরাপর্বত দেখা যাচ্ছিল। কয়েক মূহুর্ত পরে তা পুনঃরায় একত্রে মিলিত হল।

প্রত্যক্ষদর্শী সাহাবা ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, হুজায়ফা, জোবায়ের ইবনে মুতাইম। কুরাইশ নেতাদের অন্তর ছিল মোহর বিশিষ্ট, স্বচক্ষে দেখেও তারা একে যাদু বলে উড়িয়ে দিলেন। তারা সিদ্ধান্ত নিলেন দূর দেশের কেউ এ অবলোকন করেছে কিনা? কিন্তু দূরবর্তী অঞ্চলের কেউ কেউ এ ব্যাপারে সাক্ষ্য দিলেও তাদের মন্তব্য ছিল- ‘এ বস্তুতঃ এক শক্তিশালী যাদু।’

এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ-কেয়ামত আসন্ন, চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে, ওরা কোন নিদর্শণ দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে, ‘এ তো চিরাচরিত যাদু।’ তারা সত্য প্রত্যাখ্যান করে এবং নিজ খেয়ালখুশীর অনুসরণ করে। প্রত্যেক ব্যাপারের গতি তার নির্ধারিত পরিমানের দিকে।’(৫৪:১-৩)

কুরাইশগণ এবারও মুহম্মদকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করল এবং কপটতাপূর্ণ প্রশ্নের দ্বারা তাকে বিব্রত করতে চাইল। আব্দুল্লাহ ইবনে আবু উমাইয়া একটি হটকারিতাপূর্ণ দাবী পেশ করে বসল। সে বলল, ‘আমি তার প্রতি ততক্ষণ বিশ্বাস স্থাপন করতে পারি না, যে পর্যন্ত না তাকে আকাশে আরোহণ করে সেখান থেকে একটি গ্রন্থ নিয়ে আসতে দেখব। আর সেই গ্রন্থে আমার নাম উল্লেখ করে এই নির্দেশ থাকতে হবে- ‘হে আব্দুল্লাহ, এই রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর।’

আর তারপর এই আব্দুল্লাহ ইবনে উমাইয়া, নাজার ইবনে হারেছ এবং নওফেল ইবনে খালেদ একত্রে মুহম্মদের কাছে উপস্থিত হয়ে এই আব্দারগুলি করে বসল, ‘আমরা আপনার উপর বিশ্বাস স্থাপন করব, যদি-

--আপনি আকাশ থেকে একটি গ্রন্থ নিয়ে আসেন। গ্রন্থের সাথে চারজন ফেরেস্তা এসে সাক্ষ্য দেবেন যে, এই গ্রন্থ আল্লাহর পক্ষ থেকেই এসেছে এবং আপনি আল্লাহর রসূল।
--মক্কা শহরটি খুবই সংকীর্ণ। চতুর্দিক থেকে পর্বত বেষ্টিত উচ্চভূমি- যাতে না আছে চাষাবাদের সুযোগ, না আছে অন্যান্য প্রয়োজন পূরণের অবকাশ। সুতরাং আপনি পাহাড় গুলোকে দূরে সরিয়ে দিন-যাতে মক্কার জমিন প্রশস্ত হয়ে যায়। দাউদের সাথে পাহাড়ও তসবিহ পাঠ করত, আর আপনার কথা অনুযায়ী আপনি তো আল্লাহর কাছে দাউদের চেয়ে খাটো নন।’

--শলোমনের জন্যে যেরূপ বায়ূকে আজ্ঞাবহ করে পথের বিরাট দূরত্বকে সংক্ষিপ্ত করে দেয়া হয়েছিল, আপনিও আমাদের জন্যে তদ্রুপ করে দিন- যাতে সিরিয়া বা ইয়েমেনে সফর আমাদের জন্যে সহজ হয়ে যায়।
--আমাদের পূর্বপুরুষ কোসাইকে জিন্দা করে দেখান। যাতে আমরা তাকে জিজ্ঞেস করতে পারি আপনি সত্যিই পয়গম্বর কি-না? যদি পারেন তবে বুঝব আপনি প্রকৃতই একজন পয়গম্বর এবং আমরাও আনন্দের সাথে ইসলাম গ্রহণ করব।’

তাদের এসব দাবীর লক্ষ্য এটাই ছিল যে, দাবী পূরণ না করা হলে তারা বলবেন- আল্লাহই এসব কাজ করার শক্তি রাখেন না অথবা এই রসূলের কথা তাঁর কাছে শ্রবণযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য নয়।

উপরের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতসমূহ নাযিল হয়েছিল- যদি আমি কাগজে লিখিত কোন বিষয় তাদের প্রতি নাযিল করতাম, অতঃপর তারা তা স্বহস্তে স্পর্শ করত, তবুও অবিশ্বাসীরা একথাই বলত যে, এটা প্রকাশ্য জাদু বৈ কিছু নয়।(৫:৭)

তোমার কাছে আহলে কিতাবীরা আবেদন জানায় যে, তুমি তাদের উপর আসমান থেকে লিখিত কিতাব অবতীর্ণ করিয়ে নিয়ে এস। বস্তুতঃ এরা মূসার কাছে এর চেয়েও বড় জিনিস চেয়েছে, বলেছে,- একেবারে সামনা-সামনিভাবে আমাদেরকে আল্লাহকে দেখাও। অতএব তাদের উপর বজ্রপাত পতিত হয়েছে তাদের পাপের দরুণ।(৪:১৫৩)

তারা আরও বলে যে, তার কাছে কোন ফেরেস্তা কেন প্রেরণ করা হল না? যদি আমি  ফেরেস্তা প্রেরণ করতাম, তবে গোটা ব্যাপারটাই শেষ হয়ে যেত। অতঃপর তাদেরকে সামান্যও অবকাশ দেয়া হত না। যদি আমি ফেরেস্তাকে রসূল করে পাঠাতাম, তবে সে মানুষের আকারেই হত। এতেও ঐ সন্দেহ করত, যা এখন করছে।(৫:৮-৯)

অবিশ্বাসীরা বলে, তার প্রতি তার পালনকর্তার পক্ষ থেকে কোন নিদর্শণ কেন অবতীর্ণ হল না?’ বলে দাও, আল্লাহ যাকে ইচ্ছে পথভ্রষ্ট করেন এবং যে মনোনিবেশ করে তাকে নিজের দিকে পথপ্রদর্শণ করেন।(১৩:২৭)

যদি কোন কোরআন এমন হত, যার সাহায্যে পাহাড় চলমান হয় অথবা জমিন খন্ডিত হয় অথবা মৃতেরা কথা বলে, তবে কি হত? বরং সব কাজ তো আল্লাহর হাতে। ঈমানদাররা কি এ ব্যাপারে নিশ্চিত নয় যে, যদি আল্লাহ চাইতেন তবে সব মানুষকে সৎপথে পরিচালিত করতেন? অবিশ্বাসীরা তাদের কৃতকর্মের কারণে সবসময় আঘাত পেতে থাকবে অথবা তাদের গৃহের নিকটবর্তী স্থানে আঘাত নেমে আসবে, যে পর্যন্ত আল্লাহর ওয়াদা না আসে। নিশ্চয় আল্লাহ ওয়াদা খেলাফ করেন না।(১৩:৩১) পরবর্তীতে অবশ্য এই আব্দুল্লাহ ইবনে উমাইয়া ইসলাম গ্রহণ করে এবং ওহুদ যুদ্ধে শহীদ হয়।

আবারও একই ধরণের আব্দার নিয়ে একদল কুরাইশ এসেছিল। তাদের কেউ নহর প্রবাহিত করে পানির ফোয়ারা আনতে, কেউবা তার নিজের জন্যে স্বর্ণনির্মিত গৃহ নির্মাণ করে নিতে, কেউবা স্বর্গের টুকরো আনতে এবং মই দিয়ে আকাশে উঠতে বলল এবং সকলে বলেছিল, ‘আমরা কসম খেয়ে বলছি এরূপ মু‘জেযা প্রকাশ পেলে আমরা আপনার নব্যুয়ত মেনে নেব এবং মুসলমান হয়ে যাব।’

এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ- ওরা বলে, ‘আমরা তোমাকে বিশ্বাস করব না যতক্ষণ না তুমি মাটি ফাঁটিয়ে একটি ঝর্ণা ফোঁটাবে, বা তোমার খেজুরের বা আঙ্গুরের বাগান হবে, যার ফাঁকে ফাঁকে অজস্র নদী-নালা বইবে, বা তুমি যেমন বল, আকাশকে ও ফেরেস্তাদেরকে নিয়ে আসবে আমাদের সামনে, বা তোমার জন্যে একটি সোনার বাড়ী হবে, বা তুমি আকাশে আরোহণ করবে; কিন্তু তোমার আকাশে আরোহণ আমরা কখনও বিশ্বাস করব না যতক্ষণ না আমাদের পড়ার জন্যে তুমি আমাদের উপর এক কিতাব অবতীর্ণ করবে।’(১৭:৯০-৯৩)

মুহম্মদের নব্যূয়ত সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা: মুহম্মদের নব্যুয়ত চর্চায় কুরাইশ নেতৃবর্গ খুবই বিব্রতবোধ করতে লাগলেন, কারণ তিনি তাদের সম্মানিত দেবদেবীদেরকে অগ্রাহ্য ও অসার প্রতিপন্ন করছিলেন। কিন্ত তারা মুহম্মদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে পারছিলেন না কারণ মুহম্মদ ছিলেন সত্যবাদী, তিনি জীবনে একটিও মিথ্যে কথা বলেননি। এ কারণে তারা তাকে ‘আল-আমিন’ বলে ডাকত। তখন তারা তখন তারা নাজার ইবনে হারিছ ও ওকাবা ইবনে আবী মুয়ীতকে মদিনায় ইহুদি পন্ডিতদের কাছে প্রেরণ করলেন মুহম্মদ সম্পর্কে তাদের মন্তব্য কি তা জানার জন্যে যাতে করে তারা একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারেন। মদিনার ইহুদি এক পন্ডিত মুহম্মদ সত্য নবী কিনা তা পরীক্ষার জন্যে কয়েকটি প্রশ্ন তার নিকট রাখতে বলে। তাদের প্রশ্নগুলো ছিল-

ক) ঐ সকল যুবকের ঘটনা কি, যারা প্রাচীন কালে শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিল?
খ) সেই ব্যক্তির ঘটনা কি, যিনি পৃথিবীর পূর্ব, পশ্চিম ও সারা বিশ্ব সফর করেছিলেন?
গ) রূহ কি?’
তারা বলল, “বাস্তবিকই মুহম্মদ এসবের কোন উত্তর দিতে পারেন না।”

প্রতিনিধি দল ফিরে এসে কুরাইশ নেতৃবৃন্দদেরকে জনাল, ‘আমরা একটি চুড়ান্ত ফয়সালার ব্যবস্থা করতে পেরেছি।’
কুরাইশগণ সদলবলে প্রশ্নগুলো নিয়ে মুহম্মদের কাছে হাযির হলেন। সবকিছু শুনে তিনি বললেন, ‘তোমরা আগামীকাল এস।’ কিন্তু তিনি ‘আল্লাহ চাইলে’ অর্থাৎ ‘ইনশাল্লাহ’ বলতে ভুলে গেলেন।

মুহম্মদ ওহী আগমনের অপেক্ষায় থাকলেন। কিন্তু পরদিন ওহী এল না। এভাবে দিনের পর দিন অতিক্রান্ত হতে লাগল। আর কুরাইশগণও তাকে ঠাট্টা করতে লাগল। অনেকে বলতে লাগল, ‘মুহম্মদের আল্লাহ তাকে পরিত্যাগ করেছেন।’

পনের দিন পর ফেরেস্তা জিব্রাইল কুরাইশদের প্রশ্নের উত্তর সম্বলিত সূরা কাহফ নিয়ে এল। এই সূরায় ওহী বিলম্বের কারণ হিসেবে বলা হল-ভবিষ্যতে কোন কাজ করার ওয়াদা করলে ‘ইনশাল্লাহ’ বলা উচিৎ। “তুমি কোন কাজের বিষয়ে বলবে না যে, সেটি ‘আমি আগামীকাল করব’ ‘আল্লাহ ইচ্ছে করলে (ইনশাল্লাহ)’ বলা ব্যতিরেকে। যখন ভুলে যাও, তখন তোমার পালনকর্তাকে অধিক ভাবে স্মরণ কর এবং বল, ‘আশাকরি আমার পালনকর্তা আমাকে এর চাইতেও নিকটতম সত্যের পথনির্দেশ করবেন।” -(১৮:২৩-২৪)

সঠিক জবাব পেয়ে কুরাইশ নেতৃবর্গ হতভম্ব হল, কিন্তু মুহম্মদকে রসূল হিসেবে স্বীকার করতে তাদের অন্তর সায় দিল না। ফলে তারা মুহম্মদের বিরোধিতা করা পরিত্যাগ করতে পারল না।

সুন্দরী নারী, সম্মান ও ঐশ্বর্যের প্রলোভন: ফরীশীরা যেভাবে ঈসাকে প্রলোভিত করেছিলেন কুরাইশগণও তেমনি মুহম্মদকে পার্থিব সম্মান ও প্রতিপত্তির প্রলোভন দেখিয়ে তার কর্তব্যপথ থেকে বিচ্যুত করতে চেষ্টা করল।

একদিন মুহম্মদ বিরোধী নেতাদের মজলিসের কাছাকাছি বসেছিলেন। তখন ওতবা বিন রাবিয়া, ওয়ালিদের পিতা এসে বললেন, ‘হে ভ্রাতুস্পপুত্র! তুমি তোমার ব্যক্তিগত গুণাবলী ও বংশ গৌরবের অধিকারী। কিন্তু এখন তুমি আমাদের মধ্যে দলাদলি ও বিরোধ বাঁধিয়ে দিয়েছ; তুমি আমদের দেবদেবীকে প্রত্যাখ্যান করেছ; আমাদের পূর্বপুরুষদের বিরুদ্ধে নাস্তিকতা আরোপ করেছ। আমরা তোমাকে একটি প্রস্তাব দিতে চাই; ভালকরে ভেবে দেখ তুমি গ্রহণ করতে পার কি-না।’

মুহম্মদ বললেন, ‘হে ওয়ালিদের পিতা। বলুন আমি শুনছি।’
ওতবা বললেন, ‘হে আমার ভ্রাতুস্পপুত্র! যদি তুমি এই কাজ দিয়ে সম্পদশালী হতে চাও তবে আমরা তোমার জন্যে আমাদের প্রত্যেকের চেয়ে অধিক সম্পদ জোগাড় করে দেব।
--যদি তুমি সুন্দরী স্ত্রী চাও তবে আমরা মক্কার সর্বাপেক্ষা সুন্দরী কন্যার সঙ্গে তোমার বিবাহের ব্যবস্থা করব।
--যদি তুমি সম্মান ও প্রতিপত্তি চাও তবে আমরা তোমাকে আমাদের নেতা বানাব এবং তোমার নির্দেশ ছাড়া কোন কাজ করব না।
--যদি তুমি রাজ্য চাও, তবে তোমাকে আমাদের নৃপতি বানাব এবং যে দুষ্টাত্মা তোমার উপর ভর করেছে সে যদি তোমাকে ছেড়ে যেতে না চায় তবে আমরা বড় বড় চিকিৎসক আনাব এবং যত অর্থ লাগুক তোমাকে সুস্থ্য করে তুলব।’

মুহম্মদ বললেন, ‘হে ওয়ালিদের পিতা! আপনার কি বলা শেষ হয়েছে?’
তিনি সম্মতি জানালে মুহম্মদ বললেন, ‘আমি ঐশ্বর্যলাভে ইচ্ছুক নই, প্রতিপত্তি ও রাজ্যলাভেও আমার বিন্দুমাত্র লোভ নেই। আমি আল্লাহ কর্তৃক আপনাদের কাছে সুসংবাদদাতা হিসেবে প্রেরিত হয়েছি। আমি আপনাদেরকে তাঁর বাণী শুনিয়েছি, আপনাদেরকে উপদেশ দিয়েছি। আমি যে বাণী প্রাপ্ত হয়েছি তা যদি আপনারা গ্রহণ করেন তবে তিনি আপনাদের প্রতি ইহজগতে ও পরজগতে খুশী থাকবেন। আর আপনারা যদি আমার উপদেশ প্রত্যাখ্যান করেন তবে আমি ধৈর্য্য ধারণ করব এবং আমার ও আপনাদের বিচারের ভার তাঁর হাতে ন্যস্ত করব।’

মুহম্মদ পাঠ করলেন- ‘পরম করুণাময় ও দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। পরম করুণাময় আল্লাহর তরফ থেকেই এ কালাম নাযিল করা হয়েছে; এ এমন কিতাব-যার আয়াতসমূহ সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে; আরবী ভাষায় কোরআন জ্ঞানীদের জন্যে তো সুসংবাদদাতা, সতর্ককারী। কিন্তু বেশীরভাগ লোকই তা এড়িয়ে যাচ্ছে-যেন তারা শুনতেই পায়নি। তারা বলছে, ‘তুমি আমাদেরকে যেদিকে ডাকছ, তা থেকে আমাদের মন যে পর্দার আড়ালেই রয়েছে। আর আমাদের কানে মোহর করা রয়েছে। আর আমাদের ও তোমার মাঝখানে যেন একটা পর্দা রয়েছে। সুতরাং তুমি তোমার কাজ করতে থাক। আর আমরাও নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকব।’(৪১:২-৮)

আল্লাহর নির্দেশ তুমি ঘোষণা করে দাও, ‘আমি তো তোমাদের মতই একজন মানুষ। আমার কাছে এই ওহী এসেছে; তোমাদের মাবুদ মাত্র একজনই। সুতরাং সোজা তাঁর দিকেই নিবিষ্ট হও। আর তোমরা তার কাছে ক্ষমা চাও, আর মুশরিকরা ধ্বংস হোক। যারা যাকাত আদায় করে না, আর আখিরাতকেও যারা অস্বীকার করছে। যারা ঈমান এনেছে আর নেক কাজও করেছে-তাদের জন্যে পারিশ্রমিক রয়েছে-যা মওকুফ করা হবে না। এ কথা সত্য সুনিশ্চিত।’

কোরআনের আয়াতগুলি আবৃত্তি করে মুহম্মদ ওতবার দিকে ফিরে বললেন, ‘আপনি আল্লাহর নির্দেশ শুনলেন, এখন আপনার কাছে যে পন্থা উত্তম মনে হয় সেটাই আপনি গ্রহণ করতে পারেন।’

শারিরিক অত্যচারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়া: আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের উপাসনা কর, সেগুলি দোযখের ইন্ধন-(২১:৯৮) এই আয়াত নাযিল হবার পর পৌত্তলিকদের বিতৃষ্ণার অবধি রইল না। তারা বলতে লাগল, ‘এতে আমাদের উপাস্যদের চরম অবমাননা করা হয়েছে।’

তারা ইবনে যবআরীর কাছে এই বিষয়ে নালিশ করল। সবশুনে তিনি বললেন, ‘তোমরা তাকে গিয়ে বল- খ্রীষ্টানরা ঈসার, ইহুদিরা ওযাইরের এবাদত করে। তাদের সম্পর্কে হে মুহম্মদ, আপনি কি বলেন? তারাও কি দোযখে যাবেন?’
কুরাইশগণ ভীষণ খুশী হল। তারা বলল, ‘বাস্তবিকই তিনি এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারবেন না।’

তাদের প্রশ্নের জবাবে এই আয়াত নাযিল হল-যাদের জন্যে প্রথম থেকেই আমার কল্যাণ নির্ধারিত হয়েছে তারা জাহান্নাম থেকে দূরে থাকবে।(২১:১০১)

সকল অত্যাচার ও জুলুমের মধ্যেও মুহম্মদ তার জাতির প্রতি আহবান কখনও বন্ধ করলেন না। তিনি ইসলাম প্রচারের মধ্যে তার মনপ্রাণ ঢেলে দিলেন, উদ্দীপনাময় ভাষায় তাদেরকে সত্যধর্মের পথে আহবান জানাতে লাগলেন।

অন্যদিকে কিভাবে মুহম্মদের ধর্ম অধিকতর শক্তিলাভের পূর্বেই তার গতিরোধ করা যায় সেই চিন্তায় কুরাইশগণ তখন বিভোর। অবশেষে তারা অত্যাচারের এক সুসংহত পদ্ধতি বের করল। বংশগত বিরোধনীতি লংঘন না করে প্রত্যেক পরিবার নিজ নিজ গন্ডীর মধ্যে ইসলামের শ্বাসরোধ করার দায়িত্ব গ্রহণ করল। মুহম্মদ, আবু তালিব ও তার জ্ঞাতি-কুটম্ব আবু বকর ও আরও কয়েকজন তাদের পদমর্যাদার জন্যে কিছুকালের জন্যে অবশ্য অত্যাচারের হাত থেকে রেহাই পেলেন।

রামফার পাহাড় ও বাসা নির্মম অত্যাচারের লীলাভূমিতে পরিণত হল। গ্রেফতারকৃতদেরকে মরুভূমির উত্তপ্ত বালুতে প্রচন্ড রোদে রাখা হল এবং প্রচন্ড পিপাসায় যখন তারা মূমুর্ষ, তখন তাদের দু’টি প্রস্তাবের যে কোনটি বেঁছে নিতে বলা হল-‘স্বগোত্রীয ধর্মে ফের নতুবা মৃত্যুবরণ কর।’ কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ দল মুহম্মদের শরীয়তে অবিচলভাবে লেগে থাকলেন।

বেলাল, যিনি ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জ্বিন হয়েছিলেন, তাকে তার মনিব উমাইয়া বিন খলফ গ্রীস্মের দুপুরে সূর্য যখন মাথার উপরে থাকত, তখন তাকে খোলা মাঠে সূর্যের দিকে মুখ করে খালি পিঠে বুকে একখানা বড় পাথর চাপা দিয়ে শুইয়ে বলতেন, ‘যতদিন না তুমি মরবে বা ইসলাম পরিত্যাগ করবে ততদিন পর্যন্ত তোমাকে এই শাস্তি ভোগ করতে হবে।’
দিনের পর দিন এই অত্যাচার চলতে থাকায় তিনি মূমুর্ষ হয়ে পড়লেন। এসময় আবু বকর অতিরিক্ত বন্দীপণ দিয়ে তাকে মুক্ত করলেন।

খোবাই বিন আদিকে বিশ্বাসঘাতকতার মধ্যে দিয়ে কুরাইশদের কাছে বিক্রয় করা হয়েছিল। ইসলাম গ্রহণ করার কারণে কুরাইশগণ তার শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে মাংস কেটে নিয়ে তাকে প্রতিবার জিজ্ঞেস করত, মুহম্মদের অবস্থা তার মত হোক সে কি তা চায়? তিনি প্রত্যেকবার উত্তরে বলতেন, ‘মুহম্মদের গায়ে একটি কাঁটা বিদ্ধ না হোক এই শর্তে আমি আমার পরিবার, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে চাইনে।’ নির্মম অত্যাচারে তিনি মারা গেলেন।

ওসমান যখন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তখন কুরাইশগণ তার পিতৃব্যের সাথে যোগ দিয়ে প্রত্যহ তাকে হাত পা বেঁধে নির্মমভাবে প্রহার করত। ওসমান আল্লাহর নামে সমস্তই সহ্য করতেন। খাব্বারকে কুরাইশগণ জলন্ত অগ্নির উপর শায়িত করে বুকে পা চাপা দিয়ে রাখত। আর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে শোয়েব দেশত্যাগ করলেন।

মুহম্মদ প্রায়শঃ এসব অত্যাচার, জুলুম, দুঃখ-দুর্দশার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন এবং অতি আশ্চর্য ছিল এই যে, নব-দীক্ষিতরা ইসলাম গ্রহণের পর, সম্পদ এবং পার্থিব জীবনের মোহের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে পড়েছিলেন।

যারা গ্রেফতার হয়েছিলেন তাদের মধ্যে আরও ছিলেন আম্বার, তার পিতা ইয়াসির, মাতা সামিয়া, সুহায়েব প্রমুখ। এসব গ্রেফতারকৃত নবদীক্ষিতদেরকে কুফরী অবলম্বণ করতে বলা হল। কিন্তু তাদের অস্বীকৃতির কারণে তাদের উপর কুরাইশগণ অত্যাচারের চুড়ান্ত করে ছাড়ল। তারা ইয়াসিরের দু’পা দু’টি উটের সাথে বেঁধে উট দু’টিকে বিপরীত দিকে চালনা করে তার দেহ দু’টুকরো করে ফেলল। পুত্র আম্বারকে প্রহার করে মূমুর্ষ করল।

চোখের সামনে স্বামীর মৃত্যু ও পুত্রের মুমুর্ষ অবস্থা দেখে সামিয়া একমনে পাঠ করছিলেন- ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লা’, এসময় আবু জেহেল তাকে বর্শা বিদ্ধ করে হত্যা করলেন। আম্বার এসময় প্রাণের ভয়ে কুফরীর স্বীকারোক্তি করে ফেললেন।

শত্রুর কবল থেকে মুক্তি পেয়ে আম্বার মুহম্মদের কাছে উপস্থিত হয়ে অত্যন্ত দুঃখের সাথে ঘটনাটি বর্ণনা করেছিলেন। মুহম্মদ তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন এই বলে, ‘সেইসময় তোমার অন্তর ঈমানে দৃঢ় থাকলে এই স্বীকারোক্তির জন্যে তোমাকে কোন শাস্তি পেতে হবে না।’

মুহম্মদের এই সিদ্ধান্তের সত্যায়নে এই আয়াত নাযিল হয়েছিল-যার উপর জবরদস্তি করা হয় এবং তার  অন্তর বিশ্বাসে অটল থাকে সে ব্যতিত যে কেউ বিশ্বাসী হওয়ার পর আল্লাহতে অবিশ্বাসী হয় এবং কুফরীর জন্যে মন উন্মুক্ত করে দেয় তাদের উপর আপতিত হবে আল্লাহর গজব এবং তাদের জন্যে রয়েছে শাস্তি।(১৬:১০৬)

কোরআন পরিবর্তনের দাবী: পৌত্তলিক কুরাইশদের একদল মুহম্মদের কাছে আবারও এসেছিল এই দাবী নিয়ে- ‘এই কোরআনে আমাদের দেবদেবীকে অত্যন্ত নিন্দা করা হয়েছে। তাই আমরা এর প্রতি ঈমান আনতে পারছি না। সুতরাং আপনি অন্য কোরআন নিয়ে আসুন অথবা এরমধ্যে পরিবর্তণ ও সংশোধন করুন।’
মুহম্মদ বললেন, ‘এটি আমার কালাম নয়। সুতরাং নিজের ইচ্ছেমত আমি এতে কোন পরিবর্তণ, পরিবর্ধণ করতে পারি না। আমি শুধু সে নির্দেশরই আনুগত্য করি, যা আমার কাছে প্রেরিত হয়।’

এরই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতসমূহ নাযিল হয়েছিল- আর যখন তাদের কাছে আমার প্রকৃষ্ট আয়াতসমূহ পাঠ করা হয়, তখন সে সমস্ত লোক বলে, যাদের আশা নেই আমার সাক্ষাতের, ‘নিয়ে এস কোন কোরআন এটি ছাড়া, অথবা একে পরিবর্তিত করে দাও।’ তাহলে বলে দাও, ‘একে নিজের পক্ষ থেকে পরিবর্তিত করা আমার কাজ না। আমি সে নির্দেশেরই অনুসরণ করি, যা আমার কাছে আসে। আমি যদি স্বীয় পরওয়ারদেগারের নাফরমানি করি, তবে কঠিন দিবসের আযাবের ভয় করি।’ বলে দাও, ‘যদি আল্লাহ চাইতেন, তবে আমি এটি তোমাদের সামনে পড়তাম না; আর নাইবা তিনি তোমাদেরকে অবহিত করতেন এ সম্পর্কে। কারণ, আমি তোমাদের কাছে ইতিপূর্বেও একটা বয়ন অতিবাহিত করেছি। তারপরও কি তোমরা চিন্তা করবে না?’(১০:১৫-১৬)

আর সম্ভবতঃ ঐসব আহকাম যা ওহীর মাধ্যমে তোমার কাছে পাঠান হয়, তার কিছু অংশ বর্জন করবে? এবং এতে মন ছোট করে বসবে? তাদের এ কথায় যে, তার উপর কেন কোন ধন-ভান্ডার অবতীর্ণ হয়নি? অথবা তার সাথে কোন ফেরেস্তা আসেনি কেন? তুমি তো শুধু সতর্ককারী মাত্র, আর সবকিছুরই দায়িত্বভার তো আল্লাহই নিয়েছেন।(১১:১২)

সমঝোতার চেষ্টা: এ সময় কুরাইশদের পক্ষ থেকে পারস্পারিক শান্তির লক্ষ্যে মুহম্মদের কাছে এই প্রস্তাব রাখা হল-‘আসুন, এক বৎসর আমরা আপনার সাথে আপনার উপাস্যের এবাদত করি এবং পরের বৎসর আপনি আমাদের সাথে আমাদের উপাস্যের এবাদত করবেন।’

এরই পরিপ্রেক্ষিতে সূরা কাফিরূন অবতীর্ণ হল- বল, হে কাফেরকূল, আমি এবাদত করিনা তোমরা যার এবাদত কর এবং তোমরাও এবাদতকারী নও যার এবাদত আমি করি এবং আমি এবাদতকারী নই যার এবাদত তোমরা কর। তোমরাও এবাদতকারী নও যার এবাদত আমি করি। তোমাদের কর্ম ও কর্মফল তোমাদের জন্যে এবং আমার কর্ম ও কর্মফল আমার জন্যে।(১০৯:১-৬)

এভাবে কুরাইশদের আল্লাহর হুশিয়ারী শোনাতে ব্যর্থ হয়ে মুহম্মদ বাণিজ্য বা তীর্থ উপলক্ষ্যে মক্কায় আগতদের প্রতি দৃষ্টি দিলেন। কিন্তু এখানেও কুরাইশরা তার প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিল। তীর্থযাত্রীরা নগরীর সীমানার মধ্যে প্রবেশ করতে শুরু করলে তারা বিভিন্ন প্রবেশ পথে দাঁড়িয়ে তাদেরকে ভয়ভীতি প্রদর্শণ করল এবং মুহম্মদকে একজন যাদুকর হিসেবে প্রচার করে তার সঙ্গে কোনরূপ যোগাযোগ করতে নিষেধ করল।

বৃদ্ধ আবু তালিব হঠাৎ অসুস্থ্য হয়ে পড়লেন। এসময় কুরাইশগণ মহাফাঁপরে পড়ল। তারা পরস্পর বলাবলি করতে লাগল, ‘আবু তালিবের মারা গেলে আমাদের জন্যে কঠিন সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। তার মৃত্যুরপর যদি আমরা মুহম্মদকে হত্যা করি, তবে এটা আমাদের আত্মসম্মান ও গৌরবের পরিপন্থি হবে। লোকে বলবে, ‘আবু তালিব জীবিত অবস্থায় তারা তাকে কিছু করতে পারেনি। এখন একা পেয়ে তাকে হত্যা করেছে।’ -কাজেই এখনও সময় আছে, চল আমরা সকলে মিলে স্বয়ং আবু তালিবের সাথে চুড়ান্ত কথাবার্তা বলে নেই।’

অতঃপর কুরাইশ নেতাদের সর্বসম্মতিক্রমে আবু তালিবের কাছে যাওয়ার জন্যে একটি প্রতিনিধিদল গঠন করা হল। আবু সুফিয়ান, আবু জেহেল, আমর ইবনে আস এই দলের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন। তারা আবু তালিবের কাছে গমন পূর্বক তাকে বললেন, ‘আমরা আপনার বয়স ও পদমর্যাদাকে সম্মান করি। কিন্তু আপনার প্রতি আমাদের সম্মানেরও একটা সীমা আছে। আর নিশ্চয়ই আপনার ভ্রাতুষ্পুত্র আমাদের দেবদেবীর প্রতি যে নিন্দা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং আমাদের পূর্বপুরুষদের বিরুদ্ধে যে অশ্লীল বাক্য আরোপ করছেন, তাতে হয় আপনি তাকে তা থেকে বিরত করুন নতুবা তার সঙ্গে অংশগ্রহণ করুন, যেন আমরা যুদ্ধের মাধ্যমে এর একটা নিষ্পত্তিতে পৌঁছিতে পারি যতক্ষণ পর্যন্ত না দু’দলের একদল নিশ্চিহ্ন হই।’

আবু তালিব তার লোকদের থেকে বিচ্ছিন্ন হতে অনিচ্ছুক ছিলেন, আর মুহম্মদকে কুরাইশদের কাছে ছেড়ে দিতেও তিনি রাজী ছিলেন না। তিনি মুহম্মদকে ডেকে পাঠালেন। মুহম্মদ এলেন।
আবু তালিব বললেন, ‘এরা তোমার কাছে এসেছেন।’
মুহম্মদ আগতদেরকে বললেন, ‘আপনাদের কথা বলুন।’
তারা বললেন, ‘তুমি আমাদেরকে এবং আমাদের উপাস্যকে মন্দ বলা থেকে বিরত থাক। তাতে আমরাও তোমাকে এবং তোমার উপাস্যকে মন্দ বলব না।’
আবু তালিব বললেন, ‘হে ভ্রাতুষ্পুত্র, তাদের কথা যুক্তিসঙ্গত। তুমি তোমার প্রচার কাজ বন্ধ কর।’

মুহম্মদ ভাবলেন যে তার চাচা তার প্রতি আশ্রয়ের হাত সরিয়ে নিতে চান; কিন্তু এই অসহায় মূহুর্তেও তিনি তার মনোবল হারালেন না। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে উত্তর দিলেন, ‘হে আমার পিতৃব্য, যদি তারা আমার ডান হাতে সূর্য্য ও বাম হাতে চন্দ্র এনে উপস্থিত করে তাহলেও আমি আমার প্রচার কাজ থেকে বিরত হব না; যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহ কোন নতুন কারণ উদ্ভব করেন অথবা আমি আমার কাজ সম্পাদন করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করি।’

কুরাইশগণ আর একবার আবু তালিবকে তার ভ্রাতুষ্পুত্রকে তাদের হাতে সমর্পণের জন্যে অনুরোধ জানিয়েছিল। তারা তার পরিবর্তে মাখজুম পরিবারের একটি ধনী যুবককে তাকে প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছিল। যুবকটিকে তারা সঙ্গে করেই নিয়ে এসেছিল। তারা বলেছিল, ‘এই ধনবান খুবসুরৎ যুবকটিকে আপনি গ্রহণ করুন, আর এর বদলে মুহম্মদকে আমাদের হস্তে সমর্পণ করুন; আমরা তাকে খুন করব।’
কিন্তু এই প্রস্তাবে কোন ফল ফলল না। আবু তালিব উত্তর করেছিলেন, ‘হুশিয়ার হয়ে কথা বল। আবু তালিব এত নীচ নয় যে, তুচ্ছ ধন-সম্পদের লোভে তাকে তোমাদের হস্তে সমর্পণ করবে।’

মুহম্মদের প্রতি মিথ্যা আরোপ করা: এসময়ই মেরাজের ঘটনা ঘটে। মুহম্মদ তার ফুফু উম্মে হানীকে মেরাজের কথা বললেন। সবশুনে তিনি বললেন, ‘তুমি কারও কাছে এ কথা প্রকাশ কোরও না, তা করলে কুরাইশগণ তোমার প্রতি আরও বেশী মিথ্যারোপ করবে।’

মেরাজ থেকে মুহম্মদ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বিধান নিয়ে এসেছিলেন। আর ঐ সময় প্রত:কালীন ফজরের নামাজের সময় হয়ে গেছে। সুতরাং মুহম্মদ কা‘বাতে এলেন। অতঃপর নামাজ শেষে তিনি তার মেরাজের কথা উপস্থিত শিষ্যদেরকে বললেন। এ সময় সেখানে আবু জেহেল, জুবায়ের ইবনে মুতাইম, ওলীদ ইবনে মুগীরা প্রমুখ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। মেরাজের পূর্ণ ঘটনা বিবৃত হওয়ার পর আবু জেহেল তাকে নানারূপ বিদ্রুপাত্মক প্রশ্ন করতে লাগলেন। মুহম্মদ তার সকল প্রশ্নের জবাব দিতে লাগলেন। একপর্যায়ে আবু জেহেল মেরাজে পূর্ববর্তী নবী-রসূলদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ ও কথোপকথন হয়েছে জানতে পেরে তাদের আকৃতি-প্রকৃতি সম্পর্কে জানতে চাইলেন। মুহম্মদ যখন এই প্রশ্নের উত্তর দিতে শুরু করলেন, তখন কুরাইশগণ হৈঁ-চৈঁ শুরু করে দিলেন। এমনকি কিছু নও মুসলিম তার কথাবার্তা শুনে ইসলাম ত্যাগ করল।

জুবায়ের ইবনে মুতাইম বললেন, ‘হে মুহম্মদ! তোমার জান্নাত জাহান্নামের কথা বাদই দিলাম, বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত যেতে দু‘মাস সময় লাগে। সুতরাং এতদিন পর্যন্ত তোমাকে যতটুকু বিশ্বাস করা গিয়েছিল তাও আর সম্ভব হল না। তুমি যে অসম্ভব ঘটনা বর্ণনা করছ, তাতে আর তোমার নব্যুয়তের বিষয়টা আর কোনক্রমেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। এখন তুমি সত্যবাদী হলে বায়তুল মুকাদ্দাসের পরিপূর্ণ বর্ণনা আমাদেরকে জানাও।’

মুহম্মদ তো রাতের বেলায় বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করেছিলেন। তাছাড়া তার বর্ণনা করার প্রয়োজন পড়তে পারে এমনটা তো তিনি কষ্মিনকালেও চিন্তা করেননি। সুতরাং তিনি চিন্তায় পড়ে যান। তৎক্ষণাৎ জ্রিব্রাইল উপস্থিত হয়ে বায়তুল মুকাদ্দাসকে তার দৃষ্টির সম্মুখে তুলে ধরলেন। তিনি তা দেখে দেখেই কুরাইশদের সকল প্রশ্নের জবাব দিতে লাগলেন। যারা পূর্বে বায়তুল মুকাদ্দাস দেখেছিলেন তারা মুহম্মদের জবাবের সত্যতা স্বীকার করলেন। আর উপস্থিত কুরাইশ নেতৃবর্গরা মনে মনে স্বীকার করলেন- মুহম্মদ সত্যিই এক মহা যাদুকর।

এসবের পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াত নাযিল হয়েছিল- এবং স্মরণ কর, আমি তোমাকে বলে দিয়েছিলাম যে, তোমার পালনকর্তা মানুষকে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন এবং যে দৃশ্য আমি তোমাকে দেখিয়েছি তাও কোরআনে উল্লেখিত অভিশপ্ত বৃক্ষ কেবল মানুষের পরীক্ষার জন্যে। আমি তাদেরকে ভয প্রদর্শণ করি। কিন্তু এতে তাদের অবাধ্যতাই আরও বৃদ্ধি পায়।(১৭:৬০)

এদিকে ইহুদিরা এই মেরাজের কথা জানতে পেরে সেই প্রভাতেই আবু বকরের গৃহে গমন করল এবং তাকে বলল, ‘হে আবু বকর, এখন কি বলতে চান? মুহম্মদ নাকি গতরাতে জেরুজালেমের বায়তূল মুকাদ্দাসে গিয়ে গতরাতেই ফিরে এসেছেন!’
আবু বকর বললেন, ‘তিনি এ কথা বলেছেন?’
তারা বলল, ‘হ্যা, তিনিই বলেছেন। বিশ্বাস না হলে আমাদের সঙ্গে চলেন, তিনি মসজিদে আছেন।’
আবু বকর বললেন, ‘তিনি যদি এ কথা বলে থাকেন তবে তা সত্য, আর আমি তা বিশ্বাস করি।’ পরবর্তীতে তার এ কথা জানতে পেরে মুহম্মদ তাকে ‘সিদ্দিক’ (বিশ্বাসী) উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।

সমাজচ্যূত করা: অবশেষে কুরাইশগণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল যে, তারা এক আঘাতেই সমগ্র হাশিম ও  মুত্তালিব গোত্রের মুলোৎপাটন করবে। এই লক্ষ্য সামনে রেখে তারা নব্যুয়তের সপ্তম বর্ষে ৬১৬ খ্রীষ্টাব্দের শেষ দিকে হাশিম ও মুত্তালিবের বংশধরদের বিরুদ্ধে একটি সংঘ গঠন করল। তারা একটি দলিল (প্রতিজ্ঞা পত্র) দ্বারা অঙ্গীকারাবদ্ধ হল যে, তাদের সঙ্গে তারা বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হবে না; তাদের সঙ্গে কোনরূপ পণ্য-দ্রব্যের বেচাকেনা করবে না। যে পর্যন্ত না তারা হত্যা করার জন্যে মুহম্মদকে তাদের হাতে সমর্পন করবেন এই প্রতিজ্ঞা পত্রটি ততদিন বলবৎ থাকবে। এটি মুনসুর ইবনে ইকরামা লিখেছিলেন এবং তা সাধারণ্যে প্রচারের জন্যে দেব-দেবীকে স্বাক্ষী করে কা’বার দেয়ালে লটকিয়ে দেয়া হয়েছিল।

এ সময় নিজেদের নিরাপত্তার খাতিরে জ্ঞাতিবর্গসহ মুহম্মদ শেব গিরিসংকটে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আর তখন ইসলামের কোন প্রগতি সাধিত হয়নি। পবিত্র মাসগুলিতে যখন বিবাদ ও রক্তপাত নিষিদ্ধ ছিল তখনই কেবল মুহম্মদ অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতেন এবং তীর্থযাত্রীদের মধ্যে ঐশীবাণী শোনাবার জন্যে লোকের সন্ধান করতেন, তখন বক্রদৃষ্টিতে আবু লাহাব তার গতিবিধির উপর নজর রাখতেন এবং তিনি কাউকে কিছু বললেই তিনি বলে উঠতেন, ‘সে একজন মিথ্যেবাদী ও একজন সেবীয়। তোমরা জেনে শুনে কেন তার কবলে পড়?’ -এভাবে তিনি মুহম্মদের কথার গুরুত্বকে ধুলিসাৎ করে দিতেন।

এতকিছু সত্বেও ইসলামের প্রচারের কাজ চলছে এবং আরবের বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে ‘মুহম্মদের প্রচারিত বিষ’ ছড়িয়ে পড়ছে দেখে কুরাইশগণ বিচলিত হয়ে পড়ল এবং কিভাবে এই প্রচার ব্যর্থ ও ব্যাহত করা যেতে পারে তারা সেই সম্বন্ধে যুক্তি পরামর্শে বসল। অনেক আলোচনার পর মক্কার সর্বসাধারণের মধ্য থেকে ২৫ জনের এক কার্যনির্বাহী পরিষদ গঠন করা হল।

হজ্জ্বের মৌসুম নিকটবর্তী হচ্ছে, এসময় বিভিন্নস্থান হতে কত লোকের মক্কায় আগমন হবে-মুহম্মদ তাদের মধ্যে নাস্তিকতা প্রচার করবেন, এতে অনেক লোক ‘গোমরাহ’ হয়ে যেতে পারে। তাই কুরাইশগণ তড়িঘড়ি সভা আহবান করল।

আগত বিদেশী লোকদিগকে মুহম্মদের মোহমন্ত্র হতে কি প্রকারে রক্ষা করা যেতে পারে-সভায় তার আলোচনা শুরু হল। বর্ষীয়ান অলিদ সকলকে সম্বোধণ করে বললেন, ‘মৌসুম নিকটবর্তী হয়েছে। সুতরাং আমাদের তখনকার কর্তব্য সম্বন্ধে সকলের সমবেতভাবে একটা মত স্থির করে নেয়া উচিত। যাত্রীদল সমবেত হলে সকলে তার সম্বন্ধে যেন এক কথাই বলে তা নাহলে কূ-ফল ফলিবার আশঙ্কাই অধিক। আর তাতে বিজ্ঞ লোকদের কাছে আমরা মিথ্যেবাদী বলে প্রতিপন্ন হব।’

তার কথা শেষ হলে কয়েকজন বলে উঠল, ‘আমরা তাকে জ্যোতিষী ও গণৎকার বলে পরিচিত করব।’
অলিদ বললেন, ‘একটা যা তা বললেই তো হবে না। লোকে বিশ্বাস করবে কেন? গণৎকারের কি লক্ষণ তার আছে?’
একজন বলল, ‘আমরা বলব সে পাগল, তার মস্তিস্ক বিকৃতি দেখা দিয়েছে।’
অলিদ বললেন, ‘তাকে পাগল বললে লোকে তোমাকেই পাগল বলবে! তার কথা শুনলে কে তাকে পাগল বলে বিশ্বাস করবে?’
আর একজন বলল, ‘তাকে কবি বলে প্রচার করা হোক, তাতে আমাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে।’

বহুদর্শী অলিদ এই প্রস্তাবেরও সমর্থন করলেন না। তিনি বললেন, ‘কাব্য ও কবিত্ব যে কি আরবের সকলেই তা জানে। সে যা বলে থাকে তাকে কবিতা বললে সকল গোত্রের বিজ্ঞ লোকেরা আমাদেরকে একেবারে অজ্ঞ ও অপদার্থ বলে বিবেচনা করবে।
এরূপ নানা প্রস্তাব ও আলোচনার পর স্থির হল যে, মুহম্মদকে মায়াবী ও যাদুকর বলে ঘোষণা প্রচার করা হবে। ‘মুহম্মদ ভয়ানক যাদুকর’ তার সংস্পর্শে আসামাত্র সে মানুষকে তার অজ্ঞাতসারে এমনভাবে মায়াবিষ্ট করে ফেলে যে, তার আর হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। সাবধান! কেউ তার কথা শুন না, তার সংশ্রবে যেও না, তাকে নিজেদের কাছে আসতে দিও না।’
সভা ভঙ্গ হল।

নির্ধারিত সময়ে মক্কানগরীতে জনসমাগম আরম্ভ হল। আর কুরাইশগণ পূর্ব নির্ধারিত বক্তব্য প্রচার করতে লাগল। মুহম্মদের স্বজনরা তার সম্বন্ধে এইসব প্রচার করাতে, বাহ্যদর্শী লোকেরা সহজেই সেই কথায় বিশ্বাস স্থাপন করল। কাজেই মুহম্মদের জন্যে প্রচার কাজ অধিকতর দুঃসাধ্য হয়ে উঠল। কিন্তু তিনি নিরুৎসাহ হলেন না। তিনি প্রচার চালিয়ে যেতে থাকলেন। এসময় আবু লাহাব সবসময় তার পিছু লেগে থাকতেন। তিনি তার সম্পর্কে নানাবিধ জঘণ্য কথা প্রচার করে বেড়াতেন এবং তা শুনে লোকের মনে তার সম্বন্ধে অসত্য ও অসঙ্গত ধারণা বদ্ধমূল হয়ে যেত।

একদিন মুহম্মদ মেলায় উপস্থিত হয়ে সকলকে স্বতন্ত্রভাবে সম্বোধণ করে বললেন, ‘সকলে শ্রবণ কর, আল্লাহ আমাকে তোমাদের কাছে প্রেরণ করেছেন। আল্লাহর আদেশ-সকলে একমাত্র তাঁর উপাসনা করবে। তাঁর উপাসনায় অন্য কাউকে শরিক করবে না। এইসব দেবদেবতার পূজা পরিত্যাগ কর।’

আবু লাহাব এসময় তার পশ্চাৎ থেকে চিৎকার করে বলতে লাগলেন, ‘সাবধান! কেউ এর কথা শুন না। এ অত্যন্ত ভয়ঙ্কর দূরভিসন্ধি নিয়ে তোমাদের কাছে উপস্থিত হয়েছে। এ তোমাদেরকে লাত এবং উজ্জাদেবীর আশ্রয় হতে বঞ্চিত করে কতকগুলি অভিনব পাপাচারে লিপ্ত করতে চায়। এই মিথ্যেবাদী নাস্তিকের কথা তোমরা শুন না।’
তিনি প্রস্তর নিক্ষেপ করতে করতে মুহম্মদের পশ্চাৎধাবন করলেন।

দিনে প্রচার দূরহ হওয়ায় মুহম্মদ রাতে প্রচার কাজ চালাতে শুরু করলেন। এসময়ই এক রাতে তিনি মক্কায় আগত ইয়াসরিবের ৬ জনের একটি দল পেলেন এবং তাদেরকে ইসলামের বাণী শোনালেন। তারা মুহম্মদের কথায় বিশ্বাস স্থাপন করলেন এবং মুহম্মদের হাতে হাত রেখে বায়াত নিলেন। যখন শপথপর্ব প্রায় শেষ এসময় দূর থেকে এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করা এক আরবের কন্ঠ রাতের বাতাসে ভেসে এল- ‘মক্কাবাসীরা! তোমরা নিদ্রা যাচ্ছ, আর এদিকে হতভাগাটা তার নাস্তিক দলটাকে নিয়ে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ষড়যন্ত্র করছে।’

মক্কার ঐ গুপ্তচর এই সম্মেলনের খবর সারা শহরে ছড়িয়ে দিয়েছিল। মুহম্মদ ও তার অনুসারীদের দুঃসাহস দেখে হতবাক হয়ে কুরাইশগণ সদলবলে কাফেলার গমনপথ রূদ্ধ করে শপথ গ্রহণকারী ব্যক্তিদেরকে দাবী করল। কিন্তু ইয়াসরিববাসীদের কেউই তাদের প্রশ্নের না কোন উত্তর দিলেন বা তাদেরকে অন্য কোনভাবে সহযোগিতা করতে রাজী হলেন। ফলে কোন কোন ব্যক্তি শপথ নিয়েছেন তা জানতে ব্যর্থ হয়ে কুরাইশগণ কাফেলাকে উৎপীড়ন না করেই যেতে দিতে বাধ্য হল। কিন্তু, তাদের এই ব্যাবহার মুহম্মদ ও তার অনুসারীদের উপর প্রচন্ড উৎপীড়নেরই পূর্বাভাস হিসেবে দেখা দিয়েছিল।

এ সময়ই (৬২০ খ্রীঃ) অল্পদিনের ব্যবধানে (একমাস পাঁচ দিনের) মুহম্মদ আবু তালিব ও খাদিজাকে হারিয়েছিলেন। গিরি সংকটের অনাহার বৃদ্ধ আবু তালিবের শরীর সহ্য করতে পারেনি।

মক্কা থেকে ইসলামের মুলোৎপাটনের জন্যে কুরাইশগণ বর্তমান অবস্থাকে অনুকূল সুযোগ বলে মনে করল। আর আবু তালিব, যার ব্যক্তিগত প্রভাব ও চরিত্র তাদের ক্রোধকে একটা সীমার মধ্যে রেখেছিল, তার মৃত্যুতে তারা তাদের নির্যাতনের মাত্রা কয়েকগুন বৃদ্ধিতে উৎসাহিত হল।

একদিন মুহম্মদ ইসলাম প্রচার করতে বনি কেন্দা গোত্রের নিকট গমন করলেন, কিন্তু তারা তার আহবানের প্রতি ভ্রক্ষেপ করল না। এরপর বনি হানিফা গোত্রের কাছে গেলে তারা অতিশয় কঠোর ভাষায়, নিতান্ত অভদ্রভাবে তাকে প্রত্যাখ্যান করল। তাদের দ্বারা প্রত্যাখ্যাতের পর তিনি বনি আমের গোত্রের কাছে উপস্থিত হলেন। এসময় বায়হারা নামক এক ধূর্ত যুবক মুহম্মদের ভাষার তেজ ও উপদেশের দর্শণে মুগ্ধ হল। সে ভাবল এই ব্যক্তিকে হাত করতে পারলে সমস্ত আরবের উপর প্রভাব বিস্তার সম্ভব হতে পারে। সুতরাং সে মুহম্মদের কাছে প্রস্তাব রাখল, ‘আমরা সকলে আপনাকে অনুসরণ করতে প্রস্তুত আছি। তবে আমাদের কথা এই যে, আপনি জয়যুক্ত হলে আরবের রাজত্বটা কিন্তু আমাদের হবে। আপনি এই শর্তে সম্মত আছেন কি?’

তার কথা শুনে মুহম্মদ গম্ভীরভাবে উত্তর করলেন, ‘রাজ্য রাজত্বাদি প্রদান বা তার পরিবর্তন আল্লাহর কাজ। আমি তৎসম্বন্ধে কি বলতে পারি?
তারপর একদিন আবু বকরকে সঙ্গে নিয়ে মুহম্মদ বনি জহল গোত্রের মাঝে উপস্থিত হলেন। এরপর আবু বকর গোত্র প্রধানের কাছে মুহম্মদের পরিচয় প্রদান করলে, গোত্রপতি মাফরূক মুহম্মদকে জিজ্ঞেস করলেন- ‘আপনি সকলকে কি শিক্ষা দিয়ে থাকেন?’
তিনি উত্তর করলেন, ‘আমি এ আহবান জানাই যে, আল্লাহ ব্যতিত অন্য কোন উপাস্য নেই, তিনি একক, অদ্বিতীয় ও অংশীবিহীন। আমি সেই আল্লাহ কর্তৃক প্রেরণাপ্রাপ্ত তাঁর রসূল।’
তিনি বললেন, ‘আর কি কথা আপনি প্রচার করে থাকেন?’

মুহম্মদ কোরআনের এই আয়াতসমূহ পাঠ করলেন- তোমাদের প্রভু তোমাদের প্রতি যা নিষিদ্ধ করেছেন আমি তোমাদেরকে তা পড়ে শুনাচ্ছি। (তা এই) তোমরা কোন বস্তু বা ব্যক্তিকে কোন প্রকারেই প্রভুর কোন গুণ বা কোন শক্তির অংশভাগী কোরও না, পিতামাতার প্রতি সততই সদ্ব্যাবহার করতে থেক এবং অভাব হেতু নিজেদের সন্তান-সন্তুতিকে হত্যা কোরও না, তোমাদেরকে এবং তাদেরকে আমিই রুজি দিয়ে থাকি। তোমরা প্রকাশ্য বা গুপ্ত কোন প্রকার অশ্লীলতার কাছেও যেও না এবং যে প্রাণহানী করতে আল্লাহ নিষেধ করেছেন-কদাচ তাতে লিপ্ত হয়ো না, তবে বিচারের দ্বারা যে প্রাণহানী করা হয় তার কথা স্বতন্ত্র। তোমরা এগুলি গ্রহণ কর, তোমাদের প্রভু তোমাদেরকে এই উপদেশ দিয়েছেন-যেন তোমরা জ্ঞানবান হতে পার।’(৬:১৫১)
মাফরূক মুগ্ধ হলেও তৃপ্ত হলেন না। তিনি মুহম্মদকে মধুর সম্ভাষণ করে বললেন, ‘আপনি আর কি উপদেশ দিয়ে থাকেন?’

মুহম্মদ পুনঃরায় কোরআন পাঠ করলেন-আল্লাহ ন্যায়নিষ্ঠ হতে, সকলের উপকার করতে এবং স্বজনদেরকে দান করতে আদেশ দিচ্ছেন এবং সকল প্রকার অশ্লীলতা, সকল প্রকার ঘৃণিত কাজ এবং সকল প্রকার বিপ্লব হতে নিষেধ করছেন, তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।

মাফরূক ও উপস্থিত অন্যান্যরা মুহম্মদকে যা বললেন তার সারকথা হল- ‘আপনি যে সকল কথা বললেন সমস্তই সত্যি। তবে পুরুষ-পুরুষানুক্রমিক ধর্ম হঠাৎ ত্যাগ করা সঙ্গত নয়। এছাড়া পারস্য সম্রাটের সঙ্গে আমাদের যে সন্ধি আছে, তাতে তাকে না জানিয়ে হঠাৎ এই প্রকার একটা ব্যাপারে লিপ্ত হয়ে পড়া আমাদের পক্ষে সম্ভবপরও নয়। অবশ্য আপনার স্বজাতীরা যে আপনাকে অকারণে ও অন্যায়ভাবে উৎপীড়ন করছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। যাহোক আপনি নিজের কাজ করে যেতে থাকুন, আমরাও ভেবে-চিন্তে দেখি, তারপর যা ভাল হয় করা যাবে।’

এভাবে মুহম্মদ গোত্রের পর গোত্রের কাছে গমন করে লোকদিগকে আল্লাহর বাণী এবং তাঁর মহিমা শুনাতে লাগলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, ‘জোর নেই, জবরদস্তি নেই। আমার কথাগুলি যদি কারও ভাল লাগে, তবে সে তা গ্রহণ করুক, আর তা যদি কারও অপছন্দ হয়, তবে তাকে আমি জবরদস্তি করে আমার মত মান্য করতে বলিনে। আমি কেবল এই চাই যে, আমার প্রভুর বাণীগুলি পৌঁছিয়ে না দেয়া পর্যন্ত কেউ যেন আমাকে হত্যা করতে না পারে। তাহলে আমার কর্তব্য অসম্পন্ন রয়ে যাবে।’

অবশেষে মুহম্মদকে হত্যার সিদ্ধান্ত: এই সময়ে যখন ঝড়ের তান্ডব ছিল সবচেয়ে উঁচুতে এবং যে কোন মুহুর্তে তা মুহম্মদের উপর আঘাত হানতে পারত। কিন্তু তিনি মোটেই সন্ত্রন্ত হননি। তার শিষ্যদের প্রায় সকলে ইয়াসরিবের উদ্দেশ্যে দেশত্যাগ করেছে, তিনি একাই অনুগত আলী ও আবু বকরসহ সাহসিকতার সঙ্গে নিজ অবস্থান আগলে ছিলেন। অবশ্য যে সকল মুসলমান নরনারী কুরাইশদের দ্বারা বাঁধাপ্রাপ্ত ও বন্দী হয়ে মক্কায় অবস্থান করতে বাধ্য হয়েছিল তাদের কথা আলাদা।

ইতিমধ্যে বিপদের মেঘ দ্রুত ঘনিয়ে আসছিল। মুহম্মদ যে কোন সময়ে পলায়ন করতে পারেন এই আশঙ্কায় দার-উন-নাদওয়ায় (কোসাই ইবনে কেলাবের বাড়ী- বর্তমান বাবুজ জিয়াদাতই সেইস্থান যেখানে এই বাড়ীটি ছিল।) কুরাইশদের একটি জরুরী অধিবেশন বসল-অন্যত্র থেকে কিছুসংখ্যক প্রধানকে এই অধিবেশনে ডাকা হল।
মুহম্মদের বংশকে এই সভায় আহবান করা হয়নি।

উপস্থিত সমস্যা ও তার সমাধানকল্পে আহবায়িত এই সভা খুবই বাক-বিতন্ডাপূর্ণ হল। কারণ, কুরাইশদের মনে ভয় প্রবেশ করেছিল। এই ভয় ছিল এই যে, এতদিন মুহম্মদের ইসলাম প্রচার ও লোকদের নূতন ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার বিষয়টি মক্কাতেই সীমাবদ্ধ ছিল অর্থাৎ কুরাইশদের আয়ত্ত্বের মধ্যেই ছিল, কিন্তু এখন তা মদিনাতেও বিস্তার লাভ করেছে এবং তার অনুসারীদেরও অধিকাংশ মদিনাতে হিযরত করেছে। এখন মুহম্মদ সেখানে পালিয়ে গিয়ে শক্তি সঞ্চয় করতে পারেন। তাতে কুরাইশদের সমূহ বিপদের সম্ভাবণা। এ কারণে সভায় তাকে যাবৎজীবন কারাদন্ড প্রদান বা নগর থেকে বহিস্কার করা নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হল।

একজন বলল, ‘আমার মতে হাতে হাতকড়ি, পায়ে বেড়ী দিয়ে এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ করে তাকে জেলখানায় রাখা হোক। তারপর কারাকক্ষের দরজা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়া হোক। সেখানে সে নিজের পাপের দন্ডভোগ করতে করতে মরে যাবে।’
আর একজন এ কথার প্রতিবাদ করে বলল, ‘এই প্রস্তাব অনুসারে কাজ করলে মুহম্মদের লোকজন ও আত্মীয়-স্বজনদের এ সংবাদ জানতে বাকী থাকবে না। তারা যে কোন প্রকারে, তাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করবে। এতে একটা ভয়ঙ্কর যুদ্ধ-বিগ্রহ বেঁধে একটা হিতে বিপরীত কান্ড ঘটতে পারে-এই প্রস্তাব একেবারেই অসমীচীন।’

আর একজন বলল, ‘তাকে দূর করে তাড়িয়ে দেয়া হোক। দেশান্তরিত হয়ে যাবার পর, সে যেখানে যাক বা যা করুক, তা আমাদের দেখার কোন আবশ্যকতা নেই। আমরা নিরাপদে নিজেদের কাজ-কর্মে মনোযোগ দিতে পারব।’
এই প্রস্তাবেরও প্রতিবাদ হল। প্রতিবাদকারীরা বলল, ‘তার কথা যেরূপ মিষ্টি এবং সে মানুষের মনকে যেমন সুন্দর করে বশীভূত করে নিতে পারে-তাতে সে যে দেশে গমন করবে, সেখানেই তার বহু ভক্ত জুটে যাবে। তাহলে আমাদের কন্টক যেমনকার তেমনি রয়ে গেল। পক্ষান্তরে অন্যত্র যেতে পারলেই সে লোকবলে পুষ্ট হবে। তখন আমাদের উপর আপতিত হয়ে প্রতিশোধ গ্রহণ করা তার পক্ষে সহজ হয়ে পড়বে।’
অতঃপর তাকে হত্যা করার প্রস্তাব উঠল; কিন্তু কেউ একজন তাকে হত্যা করলে তিনি ও তার পরিবার রক্তের প্রতিশোধ-প্রতিহিংসায় কবলিত হয়ে পড়বেন। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কি?

অবশেষে আবু জেহেল (তার প্রকৃত নাম আমর এবং বিচক্ষণতার জন্যে সে আবুল হিশাম (জ্ঞানের পিতা) উপাধি পেয়েছিলেন। কিন্তু ধর্মান্ধতার জন্যে নতুন ধর্মের মধ্যে তিনি কোন কল্যাণ দেখতে পাননি, এ কারণে মুহম্মদ তাকে আবু জেহেল (অজ্ঞানতার পিতা) উপাধি দেন) পরামর্শ দিলেন- ‘সকল গোত্রের বাঁছাইকৃত লোকেরা তাকে হত্যা করবে।’
প্রস্তাবটি সর্বসম্মতক্রমে গৃহীত হল।

কুরাইশদের এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে কোরআন জানায়-‘এবং (হে মুহম্মদ! সেই ঘোর বিপদের কথা স্মরণ কর) যখন অবিশ্বাসীরা তোমার সম্বন্ধে- তোমাকে বন্দী করে রাখবে কি তোমাকে হত্যা করে ফেলবে, কিম্বা তোমাকে দেশ হতে বহিস্কার করে দেবে- এ নিয়ে ষড়যন্ত্র করছিল।(৮:৩০)

এদিকে ৬ষ্ঠ ইন্দ্রিয় মুহম্মদকে বিপদ সম্পর্কে সাবধান করল। অতঃপর জিব্রাইল মারফত তিনি কুরাইশদের ষড়যন্ত্রের কথা অবগত হলেন ও হিযরতের আদেশ পেলেন। ইতিপূর্বেই মুহম্মদ মানসিকভাবে হিযরতের প্রস্তুতিতে ছিলেন, সুতরাং তিনি দ্রুতই সিদ্ধান্ত নিলেন। আর  আবু বকর তার সঙ্গী হবেন এটাও তিনি নিশ্চিত ছিলেন।

মক্কার জনসাধারণ কুরাইশ দলপতিদের প্ররোচনায় ও নিজেদের অজ্ঞতাবশতঃ মুহম্মদের বিরুদ্ধাচারণ করতে কুন্ঠিত হয়নি। কিন্তু সেই পরম শত্রুকে তারা তখনও এতদূর বিশ্বাস্য ও মহাত্মা বলে মনে করত যে মক্কার যার যে কোন মূল্যবান অলঙ্কার ও নগত অর্থ আমানত বা গচ্ছিত রাখার আবশ্যক হত, সে তা নিঃসংশয়ে তার কাছে রেখে যেত। এমনকি তিনি যখন আবু বকরকে নিয়ে মদিনায় যাত্রা করার জন্যে প্রস্তুত হলেন, তখনও তার কাছে কুরাইশদের বহু মূল্যবান জিনিষপত্র গচ্ছিত ছিল, তখনও তিনি আমিন ও সাদেক নামে খ্যাত। তাকে সেইরাত্রে চলে যেতে হবে অথচ আমানতের জিনিষপত্রগুলি ফিরিয়ে দিতে গেলে লোকের মনে সন্দেহের উদ্রেক হবে। এই কারণে তিনি আলীকে মক্কায় রেখে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

এদিকে কুরাইশগণ রাতেই মুহম্মদের গৃহ অবরোধ করল এবং সকালে তিনি ঘর থেকে বেরুলেই হত্যার প্রস্তুতিতে রইল।

ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। আলী গাত্রত্থান করলেন। অতঃপর আড়মোড়া ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে দ্বার খুলে বেরিয়ে এলেন তিনি। তৎক্ষণাৎ অবরোধকারীরা খোলা তরবারী হাতে ঘিরে ধরল তাকে। ভোরের আলো ততটা না ফুটলেও তারা মুহম্মদের সবুজ পোষাক পরিহিত আলীকে চিনতে পারল। কাজেই তাকে হত্যা করতে উদ্যোগী হল না তারা। বরং সারারাত নিজেদের বোকামীর কথা চিন্তা করে তারা বিশেষ লজ্জিত হয়ে পড়ল।

মুহম্মদ পলায়ন করেছেন- এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে। এতে কুরাইশদের উম্মত্ততা সীমাহীন আক্রোশে ফেঁটে পড়ল। হত্যাকারীরা ব্যর্থ হয়েছে- আর এই ব্যর্থতা তাদের সমগ্র শক্তিকে জাগিয়ে তুলল।
উন্মত্ত কুরাইশদল আলীকে বন্দী করে নিয়ে এল। অতঃপর আক্রোশ নিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘বল, মুহম্মদ কোথায়?’
আলী দুঃসাহসিক ছিলেন। তিনি অত্যন্ত স্বাভাবিক কন্ঠে উত্তর করলেন, ‘তোমরা কি তার গতিবিধির উপর নজর রাখার জন্যে আমাকে নিয়োজিত করেছিলে?’

সুষ্ঠ জবাব না পেয়ে তারা আলীকে উৎপীড়নের চরম করল। তারপর সদলবলে মুহম্মদের খোঁজে আবু বকরের গৃহদ্বারে এসে উপস্থিত হল। কেননা মুহম্মদ যে মদিনায় গমন করবেন এবং আবু বকর ছাড়া যে তিনি কিছুই করবেন না এ কথা তাদের অবিদিত ছিল না।

দলপতি ক্রোধান্বিত হয়ে আবু বকরের গৃহদ্বারে ভীষণভাবে করাঘাত করতে শুরু করলেন। বাড়ীতে তখন যুবতী আসমা ও বালিকা আয়েশা ছিলেন। ব্যাপার কি তা তাদের বুঝতে এতটুকু অসুবিধে হল না। পিতা তাদেরকে বিপদের মধ্যে রেখে গেছেন এবং নিজেও মৃত্যুর মুখে ঝাপিয়ে পড়েছেন কিন্তু তাতে তারা এতটুকু বিচলিত ছিলেন না। আসমা দরজা খুলে দিলেন এবং সম্মুখে মূর্ত্তিমান শয়তান আবু জেহেলকে দেখতে পেলেন। আবু জেহেল তীব্রস্বরে হুংকার দিলেন, ‘বল, তোর পিতা কোথায়?’
নিরুদ্বিগ্ন ঠান্ডা স্বরে আসমা উত্তর করলেন, ‘আমি বলতে পারিনে।’
সাথে সাথে আবু জেহেল তাকে প্রচন্ড এক চড় লাগালেন। এই চড়ে আসমার কর্ণবালি ছিন্ন হয়ে গেল এবং তিনি ছিঁটকে পড়লেন। ক্রোধান্বিত দলপতি ভূ-লুন্ঠিত আসমার প্রতি ক্ষণকাল তীব্র দৃষ্টি হেনে দলবলসহ প্রস্থান করলেন।

অশ্বারোহীরা দেশময় তন্নতন্ন করে মুহম্মদকে খুঁজতে লাগল। তার মস্তিস্কের উপর কুরাইশ প্রধানরা মূল্য নির্ধারণ করলেন। এক’শ উট মুহম্মদের শিরের মূল্য নির্ধারিত হয়েছিল।

মুহম্মদের বিশ্বাস ছিল যে, তিনি এক মহা-সত্যের সেবায় ও সাধনায় প্রবৃত্ত হয়েছেন, মিথ্যে ও কপটতার লেশমাত্র তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। তার আরও বিশ্বাস ছিল যে, সর্বশক্তিমান আল্লাহ সর্বদাই তার সঙ্গে আছেন। সেই সত্যময় আল্লাহ সময় হলেই নিজে সত্য ধর্মের নিশ্চয়ই সহায়তা করবেন এবং তার সাধনা একদিন সেই সর্বশক্তিমানের আশীর্বাদ লাভে নিশ্চয়ই সফল ও সার্থক হবে। আল্লাহর প্রতি তার এই অপূর্ব আত্মনির্ভর এবং আত্মসত্যে তার এই অবিচল প্রত্যয়, পরীক্ষার এ ধরণের ভীষণ ঝঞ্ঝাবাতের মধ্যেও পর্বতের ন্যায় অটল অবস্থায় সর্বদাই আত্মপ্রতিষ্ঠা করেছিল।

আলৌকিকতার ক্ষমতাকে অস্বীকার করে মুহম্মদ নব্যুয়তের কর্মভারকে সম্পূর্ণরূপে তার প্রচারের উপর ন্যস্ত করেছিলেন। তিনি কখনও অলৌকিকতার আশ্রয় নিয়ে তার প্রভাব কিংবা নব্যুয়তের বিষয়বস্তু চাপানোর চেষ্টা করেননি। আল্লাহর অস্তিত্বের নিদর্শণ হিসেবে প্রকৃতির পরিচিত ঘটনাবলীর দিকে তিনি সবসময় সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

তোমরা চারিদিকে দৃষ্টিপাত কর-এই যে বিস্ময়কর জগৎ, সূর্য্য, চন্দ্র ও তাঁরকারাজী নীল আকাশে তাদের নিয়মিত নীরবপথ পরিক্রমা করছে; নিয়ম ও রীতি-পদ্ধতি সমগ্র বিশ্বজগতে সক্রিয় রয়েছে; বৃষ্টির পতন শুস্ক ধরণীকে প্রাণবন্ত করে তুলছে; বাণিজ্য জাহাজ লাভজনক পন্য বহন করে সমুদ্রে ভেসে চলেছে; আর ঐ সুন্দর খেজুর গাছে কাঁদি কাঁদি সোনালী খেজুর ঝুলছে-সে-কি তোমাদের কাঠ বা পাথরের তৈরী দেবতাদের সৃষ্টি?

হায় নির্বোধ! তুমি একটি মাত্র নিদর্শণ চাও, যখন সমগ্র সৃষ্টি আল্লাহর অগনিত নিদর্শণে পরিপূর্ণ? তোমার শরীরের গঠন কতই না জটিল, অথচ কতই না সুন্দরভাবে নিয়ন্ত্রিত তোমার নিদ্রা ও জাগরণ; আল্লাহর প্রাচুর্য থেকে তুমি সংগ্রহ করে থাক; জলভরা মেঘ বাতাস তাড়িত হয়ে ধেয়ে চলে দেশ থেকে দেশান্তরে-বয়ে নিয়ে যায় স্রষ্টার করুণার সংকেত; বৈচিত্র্যের মধ্যে সামঞ্জস্যের অবস্থিতি; মনুষ্যজাতির বৈচিত্র্য অথচ তাদের মধ্যে ঘনিষ্ট যোগসূত্র; ফল, ফুল, প্রাণী, মানুষ এসব কি মহাজ্ঞানী আল্লাহর অস্তিত্বের যথেষ্ট নিদর্শণ নয়?

হে অবিশ্বাসীর দল, তোমরা কি এর চেয়ে অধিকতর অলৌকিক ঘটনা চাও যে তোমাদের অমার্জিত ভাষাকে সেই তূলনাবিহীন গ্রন্থের ভাষা হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। যার সামান্য অংশ তোমাদের সোনালী কবিত্ব ও মোয়ালাকার (কা’বাগৃহে ঝুলন্ত কবিতাগুচ্ছ) দীপ্তিকে চিরতরে নি:ষ্প্রভ করে দিয়েছে-সার্বজনীন করুণার সুসংবাদ এবং অহঙ্কার ও জুলুমের প্রতি হুশিয়ারী বহন করে এনেছে।

কিন্তু মুহম্মদের উপদেশের প্রতি কুরাইশগণ ভ্রুক্ষেপ করল না। তারা আল্লাহর নিদর্শণ সমূহের প্রতি অন্ধ ছিল, ধর্ম নিষ্ঠায় পুনঃরায় ফেরার জন্যে, প্রাচীন যুগের অপরাধ ও অশ্লীলতা ত্যাগে মুহম্মদের আহবানের প্রতি তারা ছিল সম্পূর্ণ অমনোযোগী। তারা বলেছিল, ‘ওহে মুহম্মদ, জেনে রাখ যতদিন পর্যন্ত তুমি বা আমরা নিশ্চিহ্ন না হচ্ছি ততদিন পর্যন্ত আমরা তোমাকে প্রচার কার্যে বাঁধা দেয়া থেকে বিরত হবে না।’

এতদসত্ত্বেও ঐশী সাহায্যের অবিচল বিশ্বাস নিয়ে মুহম্মদ তার প্রচারকার্য অব্যাহত রেখেছিলেন, কুরাইশদের বাঁধা-বিপত্তির সাময়িক বিরতি কিংবা তাদের প্রচন্ড দুশমনির মধ্যে দিয়ে সত্যের যে বীজ ছড়িয়ে পড়েছিল তা পুষ্পিত হতে ব্যর্থ হয়নি।

সমাপ্ত।
ছবি: facebook,Wikimedia Commons  

Moses: কোরাণিক ক্যানভাসে নবী মূসা।

Abu Hena Mostafa Kamal  01 May, 2017 মি সরের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ফেরাউন। হঠাৎ করে তিনি মৃত্যুবরণ করলেন। কিন্তু তিনি কোন উত্তরাধিকারী ন...