২৮ জানুয়ারি, ২০১৩

Baha-ul-lah: বাবীবাদ থেকে বাহাই ধর্মমতের বিকাশ।

বাহাউল্লাহ বর্তমান ইরানের তেহরানের মাজান্দারান নগরে ১২ই নভেম্বর, ১৮১৭ সনে এক উচ্চ সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রকৃত নাম মির্জা হুসেইন আলী নূরী। নিজেকে নবী হিসেবে ঘোষণা করার পর তিনি 'বাহাউল্লাহ' এই আরবী উপাধিটি ধারণ করেন, যার অর্থ 'গ্লোরী অফ গড' বা খোদার মহিমা। তার অনুসারীরা দাবী করেন তিনি ইব্রাহিমের শেষ বয়সে বিবাহ করা স্ত্রী কাটুরার বংশজাত। তার পিতা ছিলেন মির্জা বুজুর্গ (Mírzá Buzurg) এবং মাতা খাদিজা খানম (Khadíjih Khánum)। মির্জা বুজুর্গ প্রথমে ফতেহ আলী শাহ কাজর এর দ্বাদশ সন্তান ঈমাম-ভার্দি মির্জার প্রধানমন্ত্রী (Vizier) ছিলেন। অত:পর তিনি বুরুজার্ড (Burujird)ও লরেস্তান (Lorestan)এর গভর্নর নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে ১৮৩৪ সনে শাহ-এর মৃত্যুর পর তার পুত্র মুহম্মদ শাহ ক্ষমতায় এলে তিনি পদচ্যূত হন। 

শিরিন অব বাহা, আক্কা।
বাল্যকাল থেকেই বাহাউল্লাহ খুবই সেন্সিটিভ ও আধ্যাত্মিক ধরণের ছিলেন। শিক্ষা জীবনের শুরুতে তিনি তৎকালীন তেহরানে প্রচলিত বিভিন্ন জ্ঞান আহরণ করেন। বড় ভাইয়ের বিবাহের সময় তার 'Puppet Show' বা 'পুতুল নাচ' দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। তিনি লক্ষ্য করলেন শো শেষে পাপেটারগণ সকল পাপেট বা পুতুলগুলোকে বাক্সবন্দী করল। এই দৃশ্য যুবক বাহাউল্লাহকে জাগতিক মোহ থেকে মুক্ত করল। তিনি সুফীবাদে দীক্ষিত হলেন এবং অচিরেই সুফীদের মধ্যে বিশেষ খ্যাতি লাভ করলেন। 

পিতা মির্জা বুজুর্গ এর মৃত্যুর পর তৎকালীন মন্ত্রী হাজী মির্জা আকাসী বাহাউল্লাহকে একটি সরকারী পদ গ্রহণের জন্যে অনুরোধ করেন, বাহাউল্লাহর অস্বীকৃতিতে তা পরিত্যক্ত হয়। এসময় মন্ত্রী বাহাউল্লাহর নিজস্ব সম্পত্তি মাজান্দারান নগরের নূরী গ্রামের একটা অংশ হুকুম দখল করতে চাইলেন। কিন্তু বাহাউল্লাহ তা রাষ্ট্রের কাছে বিক্রী করতে অস্বীকৃত হলে মন্ত্রী মির্জা আকাসী ও তার মধ্যে এক বড় ধরণের তিক্ততার সূত্রপাত হল।

শিরিন অব বাব, হাইফা।
১৮৩৫ সনে, ১৮ বৎসর বয়সে বাহাউল্লাহ তেহরানের এক মহৎ ব্যক্তির কন্যা আছিয়া খানমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৮৪৯ সনে, ৩২ বৎসর বয়সের সময় তিনি আবারও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তার বিধবা চাচাত বোন ফাতিমা খানম এর সাথে। অবশ্য ১৮৬৩ সনের কিছু পূর্বে তিনি বাগদাদে অবস্থান কালীন সময়ে আরও একটা বিবাহ করেছিলেন। এইসব স্ত্রীর গর্ভে তার সর্বমোট ১৪টি সন্তান জন্মলাভ করে, এদের ১০টি ছিল পুত্রসন্তান। অন্যদিকে বাহাউল্লাহর পুরো পরিবারের মধ্যে কেবলমাত্র ১ম স্ত্রী আছিয়া খানম ও তার সন্তানগণ যথাক্রমে মির্জা মেহেদী, বাহাইয়া খানম ও আব্দুল বাহাই পবিত্র পরিবারভূক্ত বলে গণ্য।

এদিকে ১৮৪৪ সনে সিরাজ নগরের ২৫ বৎসর বয়স্ক সৈয়দ মির্জা আলী মুহম্মদ নামক এক ব্যক্তি বাব (Bab) বা গেট (Gate) উপাধি ধারণ করে নিজেকে প্রতিজ্ঞাত মেহেদী বলে দাবী করলেন। বাব ঘোষণা করলেন তিনিই শেষ নন, তারপরে আসবেন 'প্রতিজ্ঞাত জন' যার কথা পাক কিতাবসমূহে আছে, যিনি পৃথিবীতে খোদায়ী রাজ্য স্থাপন করবেন। বাব তার লেখাসমূহে জানিয়েছিলেন যে, প্রতিজ্ঞাত জনের আগমন শীঘ্রই হবে। এ কারণে তার কোন উত্তরাধিকারী থাকবে না, যতক্ষণ না তিনি আসেন। তবে তিনি তার পরে তার আন্দোলন চালিয়ে যাবার জন্যে সাধারণ নেতা হিসেবে মির্জা ইয়াহিয়া (Mírzá Yahyá) নামক এক ব্যক্তিকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। বাব তার অনুসারীদের এ নির্দেশও দিয়েছিলেন যে, যখন সেই প্রতিজ্ঞাত জন আসবেন তখন যেন তারা তাকে অনুসরণ করে। 

বাহাই টেম্পল সিডনি।
বাহাউল্লাহ সর্বপ্রথম বাবের কথা শুনেছিলেন ১৮৪৪ সনে, যখন তার বয়স ২৭ বৎসর। এসময় তার সাক্ষাৎপ্রার্থী হয়ে বাবের নিকট থেকে মোল্লা হুসেইন নামক এক ব্যক্তি এসেছিলেন। এই ব্যক্তি তাকে বাবের কথা এবং তার দাবীর বিষয়টি জানিয়েছিলেন। বাহাউল্লাহ বাবের দাবীর বিষয়টি মেনে নিয়েছিলেন এবং একজন বাবী হিসেবে তেহরান থেকে নিজ প্রদেশ নূরে ফিরে বাবী আন্দোলনকে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেবার কাজে মনোনিবেশ করেছিলেন। লোকালয়ে তার পরিচিতি তাকে খুব সহজে মানুষের কাছে পৌঁছুতে সাহায্য করেছিল।তিনি শুধু প্রচারেই নয়, অনুসারীদের সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিও নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। 

১৮৪৮ সনে বাহাউল্লাহ খোরাসানে বাবীদের এক সম্মেলনে যোগদান করেন। সেখানে ৮১জন বাবী নেতা ২২ দিনের জন্যে একত্রিত হয়েছিলেন। ঐ সম্মেলনে বাবীদের মধ্যে যারা ইসলামিক আইন মেনে চলতে চায় ও যারা মনে করে বাবের বাণী একটি নূতন খোদায়ী দিকনির্দেশনার নির্দেশ, এ দু’য়ের মাঝে বিষয়টির উপর দীর্ঘ আলোচনা চলেছিল। বাহাউল্লাহ বাবের দিকটি সমর্থন করেন এবং ভোটাভুটিতে জয়লাভ করেন। এই সম্মেলনেই তিনি 'বাহা' উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। 

১৮৪৮ সনের শেষদিকে বাবী সম্প্রদায় ও কাজার সরকারের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হলে বাহাউল্লাহ নির্যাতিত বাবীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্যে তেহরান থেকে মাজান্দারানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। কিন্তু তিনি সেখানে যাবার আগেই আটক ও কারাবন্দী হলেন।১৮৫০ সনে বাবী আন্দোলন পারস্যের বিভিন্ন প্রদেশে ছড়িয়ে পড়লে বাবী ও মুসলিমদের মধ্যে দাঙ্গার সূত্রপাত হল। এরই ফলশ্রুতিতে ঐ সনেই বাবকে বন্দী করে তিবরিজের উন্মুক্ত ময়দানে জনসম্মুখে গুলি করে হত্যা করা হল। তার লাশ তার অনুসারীরা প্রথমে তেহরানে ও পরে ইজ্রায়েলের হাইফাতে নিয়ে গিয়ে সমাহিত করে। এটি বর্তমানে শিরিন অব বাব নামে পরিচিত।

লোটাস টেম্পল দিল্লী।
এদিকে বাবের এই হত্যার প্রতিশোধ নিতে তেহরানের একদল বাবী, আজিমের নেতৃত্বে তৎকালীন ইরানের বাদশাহ, শাহ নাসের আল দীন শাহকে হত্যার এক ষড়যন্ত্র করে এবং ১৫ই অগাস্ট তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করলেও তারা সফল হতে পারেনি। এ সময় শাহকে হত্যার পরিকল্পনার দায়ে অনেক বাবীকে হত্যা ও আটক করা হয়। বাহাউল্লাহ সহ বেশ কিছু বাবী নেতাকে তেহরানে শিয়াচল (Síyáh-Chál) নামক এক ভূ-গর্ভস্থ অন্ধকুপে (Bláck Pit) আটক রাখা হয়। এই অন্ধকূপে বাহাউল্লাহ অমানুষিক নির্যাতন ভোগ করেছিলেন। এই কারাগারে বন্দীরা বেশীদিন বাঁচত না, আর যারা বেঁচে থাকত, তারা আসলে তাদের মৃত্যুকেই কামনা করত সর্বদা। মৃত্যুর আদেশ পাওয়া বা এমনিতেই সেখানে মারা যাওয়াটা তাদের কাছে ছিল সৌভাগ্যের বিষয়। এই অন্ধকূপের কারাকক্ষে বন্দীকে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে কোমর, দু’হাত ও দু’পা অতি ভারী লৌহ শিকলে আবদ্ধ করে স্যাঁতসেতে মেঝেতে নিজ মল-মূত্রের মাঝে শয়নে বাধ্য করা হত। ফলে অচিরেই বন্দীর কোমরে ও দু’হাত-পায়ে ঘাঁয়ের সৃষ্টি হত। চির অন্ধকারাচ্ছন্ন হওয়ায় এক বন্দীর দু’গজ সামনেই যে অপর বন্দী রয়েছে তার কাতরানীর শব্দ শোনা ছাড়া তাকে দেখার সৌভাগ্য কখনও একে অপরের হত না। অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত, প্রভাবশালী ও ধনী পরিবারের সদস্য হওয়ায় বাহাউল্লাহর পরিবার কারারক্ষীদেরকে উচ্চ অঙ্কের পারিতোষিকের দ্বারা তার জন্যে খাদ্য ও অন্যান্য বস্তু সরবরাহে সক্ষম হয়েছিল।

বাহাই মন্দির ইলিয়ন, USA
শিয়াচলের অন্ধকূপে চার মাস আটক থাকার পর বাহাউল্লাহকে রুশ দূতাবাসের চাপে সরকার মুক্তি দিতে বাধ্য হল। কেননা ইতিমধ্যে আজিম, শাহকে হত্যার পরিকল্পনার কথা স্বীকার করে সকল দায়দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল। এদিকে সরকার তাকে মুক্তি দিলেও তার মাতৃভূমি পারস্যে তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করল। ফলে শুরু হল বাহাউল্লাহর ৪০ বৎসরের নির্বাসন জীবন।

বাহাউল্লাহ বলেন তেহরানের শিয়াচল বা অন্ধকূপের ঐ বন্দী জীবনে তার বেশকিছু অতিপ্রাকৃতিক অভিজ্ঞতা হয়। দিব্য-দর্শনে তার নিকট এক স্বর্গীয় হুরীর আগমন হয়, যে তাকে অবহিত করে যে তিনিই সেই প্রতিজ্ঞাত জন যার সত্ত্বর আগমন সম্পর্কে বাব ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন। 

বাহাউল্লাহকে রুশ দূতাবাস তাদের দেশে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ না করে ৮ই এপ্রিল, ক্ষত-বিক্ষত, অসুস্থ্য শরীর নিয়ে ১৮৫৩ সনে চলে এলেন বর্তমান ইরাকের বাগদাদ নগরে। এই প্রাচীন নগরীটি তখন ছিল অটোম্যান সাম্রাজ্যের অধীন। এদিকে বাহাউল্লাহকে বাগদাদে নির্বাসিত করা হয়েছে জানতে পেরে মির্জা ইয়াহিয়া সেখানে যাবার মনস্থ করলেন। শাহকে হত্যার পরিকল্পণা ব্যর্থ হবার পর ব্যাপকভাবে বাবীদেরকে ধরপাকড়ের সময় তিনি আত্মগোপন করেছিলেন। যাহোক, এসময় অন্যান্য বাবীরাও যারা পারস্যে বিশেষভাবে নির্যাতিত হচ্ছিল, তারাও এখন একে একে বাগদাদে বাহাউল্লাহর চারিপাশে এসে ভীড় করল।

মির্জা ইয়াহিয়া বাগদাদে এসে বাবী সম্প্রদায়ের মাঝে বাহাউল্লাহর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালালেন এবং সম্প্রদায়কে দু’ভাগে বিভক্ত করে ফেললেন। নিজ সম্প্রদায়ের মাঝে নিজেকে বিরোধের উৎস হিসেবে দেখতে পেয়ে বাহাউল্লাহ একাকীত্বের জীবন বেঁছে নিলেন এবং পরিবারের ভার তার ভ্রাতা মির্জা মূসার হাতে অর্পণ করে, একজন মাত্র সাথীসহ কুর্দিস্থানে চলে গেলেন। বাহাউল্লাহ বাগদাদের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত সুলাইমানিয়া শহরের নিকট কুর্দিস্থানের পাহাড়ের দিকে গমন করেছিলেন।

বাহাই টেম্পল, ডয়েসল্যান্ড।
দু’বৎসর বাহাউল্লাহ কুর্দিস্থানের পাহাড়ে বসবাস করেছিলেন। তিনি আসলে সেখানে একজন সাধকের জীবন-যাপন করেছিলেন, তার পোষাক ছিল দরবেশ সুলভ; আর তিনি নাম ধারণ করেছিলেন দরবেশ মুহম্মদ-ই-ইরানী। কোন একসময় কেউ একজন তার একাকীত্বের জীবন-যাপন লক্ষ্য করে, যা স্থানীয় সূফী সমাজের মধ্যে ব্যাপক কৌতুহলের সৃষ্টি করেছিল। তারপর যখন তিনি আগতদের দর্শণ দিতে শুরু করলেন, তখন তিনি তার শিক্ষা ও জ্ঞানের জন্যে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করলেন। নকসীবান্ধা, কাদেরিয়া ও খালিদিয়ার নেতাগণ যথাক্রমে শায়খ উসমান, শায়খ আব্দুর রহমান ও শায়খ ইসমাইল প্রমুখ তার উপদেশ চাইতেন। এই সময়ে নির্জনে বাহাউল্লাহ বেশকিছু উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।

এদিকে বাগদাদে মির্জা ইয়াহিয়ার দূর্বল নেতৃত্বের কারণে বাবী সম্প্রদায় ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়তে লাগল। এসময় বাহাউল্লাহর পরিবারসহ কিছু বাবী দিকনির্দেশনার জন্যে বাহাউল্লাহকে খুঁজে ফিরতে থাকে। তারপর যখন দরবেশ মুহম্মদ নামধারী একজন লোকের পাহাড়ে বসবাসের সংবাদ আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ল, তখন বাহাউল্লাহর পরিবার তাকে বাগদাদে ফিরে আসার জন্যে বিনীত অনুরোধ করল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯শে মার্চ, ১৮৫৬ সনে দু’বৎসর কুর্দিস্থানে কাটানোর পর তিনি বাগদাদে ফিরে এলেন।

বাগদাদে ফিরে বাহাউল্লাহ বাবী সম্প্রদায়কে ভগ্নহৃদয় ও বিভক্ত দেখতে পেলেন। তার অনুপস্থিতে মির্জা ইয়াহিয়ার স্বৈরাচারী পলিসি ও কার্যকরী যোগ্য নেতৃত্ব দানের অক্ষমতাই এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। মির্জা ইয়াহিয়া বাবের পরিস্কার নির্দেশের বিরুদ্ধে তার দু’জন বিধবা স্ত্রীকে বিবাহ করেছিলেন; শাহকে দ্বিতীয়বার হত্যা প্রচেষ্টার পর নূর প্রদেশের বাবীদেরকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত রেখে তিনি আত্মগোপন করেছিলেন; এমনকি তার নেতৃত্বের বিরোধিতাকারীদের প্রতি তিনি ত্রাস সৃষ্টিও করেছিলেন যা সঙ্কটকে আরো ঘনীভূত করেছিল।

এ কারণে বাগদাদে ফিরে বাহাউল্লাহ বাবী সম্প্রদায়কে সংগঠিত করতে আত্মনিয়োগ করলেন। ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং লেখনীর দ্বারা বাবী ধর্ম সম্পর্কে তাদের মাঝে নূতন উপলব্ধি ও প্রেরণার সৃষ্টি করলেন। কিন্তু তিনি তার লক্ষ্য ও তিনি যে বাবের সেই প্রতিজ্ঞাত জন, এ বিষয়টি সম্পূর্ণ উহ্য রাখলেন। তথাপি শীঘ্রই তিনি বাবীদের মাঝে এবং সরকারী কর্তৃপক্ষের নিকট চিহ্নিত হয়ে গেলেন আগামীদিনের বাবী নেতা হিসেবে। এসময় তিনি সরকারী কর্মকর্তা ও সুন্নী আলেমদের নিকট থেকে সহানুভূতি লাভ করেছিলেন। 

বাহাই-রিদভ্যানের উদ্যান, বাগদাদ। 
নগরীতে বাহাউল্লাহর উঠতি প্রভাব এবং প্রতিদ্বন্দ্বী পারস্যিয়ান বাবী সম্প্রদায় শীঘ্রই মনোযোগ আকর্ষণ করল ইসলামিক আলেমগণ ও পারস্যিয়ান সরকারের, যারা বাহাউল্লাহ ও বাবীদের প্রতি চরম শত্রুভাবাপন্ন ছিলেন। পারস্যিয়ান সরকার বাহাউল্লাহকে বহিস্কার করার জন্যে অটোম্যান সরকারকে অনুরোধ করলেন। কিন্তু অটোম্যান সরকার তা প্রত্যাখ্যান করে বাহাউল্লাহকে স্পর্শকাতর সীমান্ত এলাকা থেকে অটোম্যান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনষ্টানটিনোপলে সরে আসাটা সমস্যার আশু সমাধান বলে বিবেচনা করলেন।

সরকারী নির্দেশের পর, ১৮৬৩ সনের ২১শে এপ্রিল বাহাউল্লাহ বাগদাদ ত্যাগ করলেন এবং বাগদাদের নিকটবর্তী নাজিবিয়া উদ্যানে প্রবেশ করলেন। বর্তমানে এটির নাম 'বাহাই-রিদভ্যানের উদ্যান'। বাহাউল্লাহ ও তার সঙ্গীরা কনস্টানটিনোপলে যাত্রার পূর্বে সেখানে ১২ দিন অবস্থান করেছিলেন। ঐ সময়ই বাহাউল্লাহ তার সঙ্গী, ক্ষুদ্র এক দলের নিকট একজন 'খোদার দূত' (Messenger of God) হিসেবে তার উদ্দেশ্য ও অবস্থান ঘোষণা করেন। এ কারণে বাহাই সম্প্রদায়ের নিকট এই সময়কালটা বড়ই তাৎপর্যপূর্ণ এবং তারা এর স্মরণে ১২ দিন ধরে ঐ উদ্যানে 'রিদভ্যানের উৎসব' (Festival of Ridván)পালন করে থাকে। 

বাহাউল্লাহ যখন দাবী করেছিলেন যে তিনি শিয়াচলে স্বর্গীয় অপ্সরীর দেখা পেয়েছিলেন এবং রিদভ্যানের উদ্যানে তার ঘোষনা Ayyam-i Butun বা "Days of Concealment" এর মধ্যবর্তী সময়কালকে দূতীয় গোপনীয়তার সময়কাল বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বর্ণনা করেন যে, এই সময়কালটা ছিল একটা "Set Time of Concealment"। রিদভ্যানের উদ্যানের ঘোষণা ছিল বাবী সম্প্রদায়ে একট নূতন ধাপের শুরু যা বাবীবাদ (Bábísm) থেকে পৃথক করেছে বাহাই ধর্মমত বা বিশ্বাসের (Bahá'í Faith) উত্থানকে একটি স্বতন্ত্র আন্দোলন হিসেবে।

৩রা মে, ১৮৬৩ সনে বাহাউল্লাহ পরিবার এবং অনুসারীদের এক বিরাট দল নিয়ে রিদভ্যানের উদ্যান থেকে যাত্রা শুরু করেন এবং ১৭ই অগাস্ট, ১৮৬৩ সনে কনস্টানটিনোপলে পৌঁছেন। এই যাত্রায় তিনি যে শহরেই পা রেখেছেন, সেখানেই সমাদর ও সম্মানের সাথে আপ্যায়িত হয়েছেন। এমনকি কনস্টানটিনোপলে পৌঁছিলে তিনি রাজকীয় অতিথীর মর্যাদা পেয়েছিলেন। তবে অটোম্যান কর্তৃপক্ষ কেন তাকে পারস্যে ফেরৎ না পাঠিয়ে কনস্টানটিনোপলে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তা পরিস্কার নয়। কারণটা হয়ত: রাজনৈতিক ছিল, কেননা বাহাউল্লাহ ইতিমধ্যে উদ্ভাসিত হয়েছিলেন অপরকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা সম্পন্ন একজন মানুষ রূপে।

বাহাউল্লাহর নির্বাসন পথের ম্যাপ।
যাহোক, বাহাউল্লাহ অটোম্যান কর্তৃপক্ষের সাথে কাজ করতে অস্বীকৃত হয়েছিলেন। সুতরাং সাড়ে তিন মাস কনস্টানটিনোপলে অবস্থানের পর তাকে আদ্রিয়ানোপলে যেতে আদেশ দেয়া হল। কেন সেখানে যেতে বলা হয়েছিল তাও পরিস্কার নয়। হয়ত: হতে পারে এটা পারস্য দূতাবাসের চাপ এবং বাহাউল্লাহর অটোম্যান কর্তৃপক্ষের সাথে কাজ করতে অস্বীকৃতির সমন্বিত ফলাফল।

যাইহোক, কর্তৃপক্ষের আদেশমত বাহাউল্লাহ তার পরিবার ও অনুসারীসহ ১লা ডিসেম্বর, ১৮৬৩ সনে আদ্রিয়ানোপলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন এবং ১২ই ডিসেম্বর সেখানে পৌঁছেন। এই যাত্রা ভ্রমনের ছিল না, ছিল নির্বাসনের। বাহাউল্লাহ এখানে সাড়ে চার বৎসর অবস্থান করেন। এখানে অবস্থান কালে মির্জা ইয়াহিয়া তাকে হত্যার কয়েকটি পরিকল্পনা করেন। কেননা বাবী সম্প্রদায়ে বাহাউল্লাহর উত্থান ক্রমাগত তার নেতৃত্বের অবস্থান নিম্নগামী করছিল। এই কাজে প্রথমে তিনি নিয়োগ দিয়েছিলেন স্থানীয় একজন নাপিতকে। এই নাপিত মুহম্মদ আলী ছিল ইস্পাহানের অধিবাসী। কিন্তু নাপিত মির্জা ইয়াহিয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং পরিকল্পনার কথা ফাঁস করে দেয়। পরবর্তীতে মির্জা ইয়াহিয়া ওস্তাদ মুহম্মদ আলী-ই সালমানীর সহযোগীতায় তাকে স্নানের সময় হত্যার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু এটাও ব্যর্থ হলে তিনি বিষ প্রয়োগে তাকে হত্যার প্রচেষ্টা চালান এবং আংশিক সফল হন। বিষের ক্রিয়ায় বাহাউল্লাহর স্নায়ূ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায় পরবর্তী জীবন তাকে হস্ত কস্পন (Shaking Hand) নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়। 

বাহাউল্লাহর আক্কার কারাগার।
এই ঘটনার পর ১৮৬৬ সনে বাহাউল্লাহ প্রকাশ্য নিজেকে বাবের ভাববাণীকৃত 'খোদার মনোনীত সেই ব্যক্তি' (Him Whom God Shall Make Manifest) হিসেবে ঘোষণা করলেন এবং একটি ঘোষণাপত্র লিখে মির্জা ইয়াহিয়ার নিকট পাঠালেন যাতে তার অনুসারীদেরকে প্রথমবারের মত 'বাহার সম্প্রদায়' (People of Bahá) বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। এই ঘোষণা একজন ধর্মীয় নেতা হিসেবে মির্জা ইয়াহিয়ার পদকে একেবারে নীচে নামিয়ে দিয়েছিল। স্বভাবতই মির্জা ইয়াহিয়া এর বিরোধিতায় নামলেন এবং বাবী মতাদর্শ রক্ষায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালালেন। ফলে তার অনুসারীরা অচিরেই মাইনরিটিতে পরিণত হল।

বাহাউল্লাহ তার কয়েকজন অনুসারীকে ইরাক ও ইরানের বাবীদের মাঝে তার দাবী সম্বলিত বাণী পৌঁছানোর জন্যে নির্দেশ দিলেন যারা তার বক্তব্য শুনতে পারেনি। তিনি তাদেরকে আরও বলে দিলেন তারা যেন সকল বাহাইকে একত্রিত ও পুরো বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হতে তার আদেশ জানিয়ে দেন। এই সময়কালে বাহাউল্লাহ স্বতন্ত্র্যভাবে বাহাই বিশ্বাস ও অনুশীলনী সম্পর্কে লেখার কাজে হাত দেন।

এরপর বাহাউল্লাহ তার দাবীকৃত বাহাই বিশ্বাস গ্রহণ করতে, দৃশ্যমান বিরোধগুলো নিস্পত্তিতে একত্রে কাজ কাজ করার আশ্বাস দিয়ে এবং মানুষের জন্যে এ পৃথিবীকে বেহেস্তী রাজ্য করে তোলার প্রচেষ্টায় তার সাথে শামিল হতে বিশ্বনেতৃবৃন্দ ও রাজ-রাজড়াদের প্রতি আহবান জানিয়ে দূত প্রেরণ করেন। তার প্রথম পত্র (Tablet of the Kings) প্রেরিত হয়েছিল অটোম্যান সাম্রাজ্যের সুলতান আব্দুল আজিজ ও তার সভাষদদের প্রতি।পরবর্তীতে আক্কাতে পৌঁছে তিনি যাদের নিকট পত্র প্রেরণ করেছিলেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন-

বাহাজি ম্যনসন।
১. পোপ পায়াস ৯বম।
২. ফ্রান্সের সম্রাট নেপোলিয়ান ৩য়।
৩. রূশ সম্রাট আলেকজান্ডার ২য়।
৪. প্রুশিয়ার রাজা উইলহেম ১ম।
৫. আয়ারল্যান্ড ও বৃটেনের রানী ভিক্টোরিয়া।
৬. অষ্ট্রিয়া-হাঙ্গেরীর সম্রাট ফ্রান্সিস জোসেফ।
৭. পার্স্যিয়ান সম্রাট নাসির উদ্দিন শাহ।
৮. আমেরিকার শাসক ও সেখানকার প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট।

বাবী সম্প্রদায়ে এখন বাহাউল্লাহ ও মির্জ ইয়াহিয়ার মধ্যে বিভেদ প্রকট হয়ে দেখা দিল। কোনভাবেই এই বিভক্তি দূর করার আর কোন পথ খোলা ছিল না। মির্জা ইয়াহিয়া ও তার অনুসারীরা বাহাউল্লাহকে হেয় করতে তার বিরুদ্ধে এক গুরুতর অভিযোগ এনে অটোম্যান কর্তৃপক্ষের নিকট অভিযোগ দায়ের করলেন। বাহাউল্লাহর বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্র ও স্থানীয়দের মাঝে উত্তেজনা ছড়িয়ে ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টের অভিযোগ আনা হয়েছিল। এসময় সরকার তাদের প্রতি মনোযোগ দিলেন এবং দেখতে পেলেন যে বাহাউল্লাহ এবং মির্জা ইয়াহিয়া উভয়ে এক নূতন ধর্মীয় দাবী ছড়িয়ে দিচ্ছেন যা মুসলিমদের নিকট গ্রহণযোগ্য নয়।এতে সরকার আশঙ্কা করলেন আগামীতে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও শৃঙ্খলার মারাত্মক অবনতি হতে পারে। সুতরাং কর্তৃপক্ষ তাদেরকে দোষী সাব্যস্ত করে পুনরায় তাদের উভয়কে অটোম্যান সাম্রাজ্যের দুই প্রান্তে কারাদন্ডসহ নির্বাসনে দেবার সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৮৬৮ সনের জুলাই মাসে এ সম্পর্কিত রাজকীয় ফরমান জারী হল। মির্জা ইয়াহিয়া ও তার অনুসারীদেরকে সাইপ্রাসের ফামাগুস্তা (Famagusta) এবং বাহাউল্লাহ ও তার অনুসারীদেরকে প্যালেস্টাইনের আক্কাতে (Akka) নির্বাসনের আদেশ হয়েছিল। 

বাহাই গার্ডেন আক্কা।
বাহাউল্লাহ তার পরিবার ও অনুসারীসহ আদ্রিয়ানোপল ত্যাগ করলেন ১২ই অগাস্ট ১৮৬৮ সনে সমুদ্র ও স্থলপথের এক দীর্ঘ যাত্রা শেষে ঐ বৎসরের ৩১শে অগাস্ট আক্কা এসে পৌঁছিলেন। তাদেরকে শহরের একটি দূর্গের মধ্যে একটি ব্যারাকে বন্দী রাখা হল। আর শহরের অধিবাসীদেরকে এই বলে সতর্ক করে দেয়া হল যে, এইসব বন্দীরা সাম্রাজ্যের শত্রু, খোদা ও তার ধর্মের শত্রু, সুতরাং তাদের সাথে কারও দেখা সাক্ষাৎ ও মেলামেশা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

১ম বৎসরের বন্দী জীবন বাহাইদের খুবই কষ্টে কাটল। কয়েকজন মারাও গেল, যাদের মধ্যে ছিল বাহাউল্লার ২২ বৎসরের পুত্র মির্জা মেহেদী। সে প্রার্থনা ও ধ্যানের সময় স্কাইলাইট দিয়ে নীচে পড়ে গিয়েছিল। ধীরে ধীরে কারাকর্মকর্তারা বাহাউল্লাহকে সম্মান ও বিশ্বাস করতে শুরু করলে অবস্থার উন্নতি হল। তারপর সুলতানের মৃত্যুর পর তিনি শহর ত্যাগ ও আশেপাশের এলাকায় যাবার অনুমতিও পেলেন।

১৮৭৭ থেকে ১৮৭৯ সন পর্যন্ত বাহাউল্লাহ মাজরাহির একটি বাড়ীতে ছিলেন। তারপর তার শেষ বৎসরগুলো (১৮৮৯ সন থেকে বাকী জীবন) কাটে বাহজি ম্যানসনে-আক্কার সীমান্তলগ্ন স্থানে।যদিও তিনি তখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে আটোম্যান শাসকের অধীনে কারাবন্দীই ছিলেন।

৯ই মে, ১৮৯২ সনে বাহাউল্লাহ সামান্য জ্বরে পড়েন।পরবর্তীতে তার শারিরীক অবস্থার আরও অবনতি হয় এবং ২৯শে মে, ১৮৯২ সনে তিনি পরলোকগমন করেন। তাকে বাহাজি ম্যানসনের পাশেই অন্তিম শয়নে শায়িত করা হয়।

বাহাউল্লাহ নিজেকে সকল ধর্মের বিশ্বাসীদের নিকট 'প্রতিজ্ঞাত জন' হিসেবে তুলে ধরেছেন (এখানে উল্লেখ্য যদিও তিনি কখনও বলেননি যে, তিনি হিন্দুদের 'কলি অবতার' বা বৌদ্ধদের 'মৈত্রীয়', কিন্তু তার লেখনীর মধ্যে তা প্রকাশ পেয়েছে)। তার শিক্ষা ছিল মূলত: খোদা একজনই; সকল ধর্মই তাঁর নিকট থেকে এসেছে; এখন সময় এসেছে মানবতার স্বার্থে সকলে এক হবার, যেন খোদার অভীষ্ট পূরণে সকলে মিলে এক বেহেস্তী রাজ্য গঠন করা যায়।

সমাপ্ত।

ছবি: Wikipedia.

২০ জানুয়ারি, ২০১৩

Biography: মির্জা গোলাম আহমেদ কাদিয়ানী।

মির্জা গোলাম আহমেদ ১৮৩৫ সনের ১৩ই ফেব্রুয়ারী ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের গুরুদাসপুর জেলার কাদিয়ান নামক গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতা মির্জা গোলাম মুর্তজা ছিলেন একজন অভিজ্ঞ ও খ্যাতনামা চিকিৎসক। তার মাতা চিরাগ বিবি জমজ সন্তানের জন্ম দিলেও গোলাম আহমেদ ব্যতিত অপর সন্তানটি বাঁচেনি।

মির্জা গোলাম আহমেদ প্রথমিকভাবে আরবী ভাষা ও গ্রামার, কোরআন, দর্শন এবং ফারসী ভাষা শিক্ষা করেন গৃহশিক্ষক ফজলে এলাহির নিকট। অত:পর ১০ বৎসর বয়সের সময় তার শিক্ষক নিযুক্ত হন ফজল আহমেদ। আর ১৮-১৯ বৎসর বয়সের সময় তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেন গুল আলী শাহের নিকট।

মির্জা গোলাম আহমেদ।
বাল্যকাল থেকেই মির্জা গোলাম আহমেদ খুবই সাধারণ ছিলেন। জাগতিক কোন বস্তু তাকে আকর্ষণ করত না। তিনি খুব অন্যমনস্ক ও ভুলোমনা ছিলেন। প্রায়ই দেখা যেত তিনি ডান পায়ের জুতা বাম পায়ে দিয়ে দিব্যি চলাচল করছেন।

১৮৫৩-৫৪ সনের দিকে গোলাম আহমেদ পারিবারিকভাবে বিবাহ করেন হুরমত বিবিকে। এই স্ত্রী ছিলেন তার জ্ঞাতিগুষ্ঠিরই একজন। তার গর্ভে দু’টি সন্তান (মির্জা সুলতান আহমেদ ও মির্জা ফজল আহমেদ) জন্মলাভ করে। ১৮৯১ সনে গোলাম আহমেদ তার এই স্ত্রীকে ডিভোর্স দেন। অবশ্য ইতিপূর্বে তিনি ১৮৮৪ সনে দিল্লীর নবাব মীর নাসির উদ্দিনের কন্যা নূসরত জাহান বেগমকে বিবাহ করেছিলেন। এই স্ত্রীর গর্ভে গোলাম আহমেদ তিনটি পুত্রসন্তান লাভ করেন। এরা হলেন যথাক্রমে-মির্জা বশির উদ্দিন মাহমুদ, মির্জা বশির আহমেদ ও মির্জা শরীফ আহমেদ।

শিষ্য সমন্বিত মির্জা গোলাম আহমেদ।
১৮৬৪ সনে মির্জা গোলাম আহমেদ তার পিতার ইচ্ছানুসারে শিয়ালকোটে সরকারী চাকুরীতে যোগদান করেন। তার বড় ভাই মির্জা গোলাম কাদিরও একজন সরকারী কর্মচারী ছিলেন। কিন্তু ১৮৬৮ সনে তিনি তার পিতার ইচ্ছানুসারে চাকুরীতে ইস্তফা দিয়ে বাড়ী ফিরে আসেন এবং পৈত্রিক সম্পত্তি দেখাশুনোর ভার নেন।

পাঞ্জাবে গোলাম আহমেদের দাদা গুল মুহম্মদের বিশাল জমিদারী ছিল। কিন্তু তার মৃত্যুর পর তৎকালীন পাঞ্জাবের শিখ সরকার তাদের সমস্ত সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় মালিকাধীন করে নেয়। তাদের অধীনে ছিল কেবল কাদিয়ান গ্রামটি। পরবর্তীতে শিখ সরকার ঐ গ্রামটিও রাষ্ট্রীয় অধিকারভূক্ত করে নেয় এবং মির্জা পরিবারকে সেখান থেকে উৎখাত করে। কিন্তু শেষ পাঞ্জাব শিখ সরকার রণজিৎ সিং তার শাসনের শেষ বৎসরে মির্জা গোলাম মুর্তজা কাদিয়ানে ফিরে এলে রাজ্য সরকারের তরফ থেকে তাকে পাঁচটি গ্রাম ফিরিয়ে দেন। অত:পর এই ভূ-সম্পত্তি দেখাশুনোর জন্যে তিনি পুত্র গোলাম আহমেদকে চাকুরীতে ইস্তফা দিয়ে গ্রামে ফিরে আসতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন।

খাদিজা মসজিদ, জার্মানী।
যাইহোক, নিজ গ্রামে ফিরে এসে নিজের অখন্ড অবসরে গোলাম আহমেদ নিয়মিত প্রত্যাহিক এবাদতে, কোরআন পঠন ও তার তফসীর পর্যালোচনা ও অন্যান্য বিভিন্ন ধর্মীয় পুস্তকাদি পাঠে মনোযোগ এবং নানাবিধ সমাজিক কর্মকান্ডে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। তাছাড়া তিনি তার পিতার সংগৃহীত চিকিৎসা শাস্ত্রের বিভিন্ন গ্রন্থাদি পঠনেও এসময় মনোযোগী হয়েছিলেন। ঐ দিনগুলি সম্পর্কে গোলাম আহমেদ নিজেই বলেন-

During those days I was so thoroughly engrossed in books as if I was not present in the world. My father used to instruct me repeatedly to curtail my reading, for, out of sympathy for me he feared that this might affect my health."

বায়তুন নূর মসজিদ, কানাডা।
কিন্তু জমিদারী দেখাশুনোর এই কাজটি গোলাম আহমেদের আদৌ পছন্দনীয় ছিল না। কেননা, প্রায়শ:তাকে জমি সংক্রান্ত নানাবিধ ঝামেলায় কোর্ট-কাছারীতে দৌঁড়াদৌড়ি করতে হত। এ সম্পর্কে গোলাম আহমেদ বলেন- 

“I feel sorry that a lot of my valuable time was spent in these squabbles and at the same time my respected father made me supervise the affair of landlordship. I was not a man of this nature and temperament."

যৌবণে মির্জা গোলাম আহমেদ নানাবিধ শারীরিক ও মানসিক উৎকর্ষতার দিকে মনোযোগ দেন। তিনি প্রায়শ: রোজা রাখতেন। এমন কি একধারে তিনি ৬ মাস রোজাও করেছেন। ১৮৮৬ সনে তিনি সিদ্ধিলাভের জন্যে হোসিয়ারপুরে ধ্যানে (উচ্চ মার্গের প্রার্থনা ও এবাদত) বসেছিলেন, কিন্তু শারীরিক কারণে ৪০ দিবস ও রজনীর ঐ কঠোর ব্রত তিনি সম্পন্ন করতে পারেননি। তিনি বিভিন্ন ধর্মীয় পন্ডিতদের সাথে বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় বিতর্কে লিপ্ত হয়েছেন এবং নিজের জ্ঞান ও মেধার পরিচয় দিয়েছেন।

১৮৯১ সনে মির্জা গোলাম আহমেদ নিজেকে 'প্রতিজ্ঞাত মসিহ' হিসেবে ঘোষণা দেন এবং তার দাবীর পিছনে কোরআন ও হাদিসের আলোকে নানা যুক্তি ও তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেন। তার রচিত “জেসাস ইন ইন্ডিয়া” গ্রন্থটি তথ্য, তত্ত্ব, যুক্তি ও প্রমাণে ভরপুর। নি:সন্দেহে বইটি বিশ্বের সমগ্র খৃষ্টান সম্প্রদায়ের প্রতি একটা ছুঁড়ে দেয়া চ্যালেঞ্জ। বইটি পাঠে তথ্য ও যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপনায় গোলাম আহমেদের দক্ষতা এবং 'ধর্ম ও দর্শণ' সম্পর্কে তার জ্ঞানের গভীরতার প্রমাণ পাওয়া যায়। উল্লেখ্য মির্জা গোলাম আহমেদ প্রায় ১০০ টির মত গ্রন্থ রচনা করেছেন।

'প্রতিজ্ঞাত মসিহ' হিসেবে ঘোষণা দেবার পর গোলাম আহমেদ তার মতাদর্শ ছড়িয়ে দিতে সমগ্র ভারতবর্ষ চষে বেড়াতে লাগলেন। কবি আল্লামা ইকবাল তার সম্পর্কে বলেন-

In religion, he is fond of the latest
,
He stays not for long at a place; he keeps on moving;
In learning and research he does not participate,
But to the game of Mentors and Disciples, he readily succumbs;
If the trap of explanation anyone lays,
He walks into it quickly from the branch of his nest.”



মির্জা গোলাম আহমেদ নিজেকে 'প্রতিজ্ঞাত মসিহ' দাবী করলে সমগ্র মুসলিম সম্প্রদায়ের নিকট থেকে আপত্তি, নিন্দা ও তীব্র বাঁধার সম্মুখীন হলেন। এ সময় "আহলে হাদিস" পত্রিকার সম্পাদক মওলানা সানাউল্ল্যা অমৃতসরী তাকে সরাসরি মিথ্যেবাদী আখ্যায়িত করে তার পত্রিকার বিভিন্ন সংখ্যায় সেভাবেই তাকে উপস্থাপন করতে লাগলেন। এতে ৫ই এপ্রিল, ১৯০৭ সনে মির্জা গোলাম আহমেদ তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন-

বায়তুল হাদী, দিল্লী।
If I am such a big liar and impostor as you portray me in each issue of your magazine, then I will die in your life-time, for I know that the lifespan of a mischief maker and a liar is not very long and ultimately he dies an unsuccessful man, during the life of his greatest enemies and in a state of humiliation and grief.

And if I am not a liar and impostor and have been honoured by God's communication and address to me, and if I am the Promised Messiah, then I hope that, with the grace of God and in accordance with God's practice, you will not escape the punishment of the rejecters (of Truth). Thus, if that punishment which is not in man's but in God's hand, that is, fatal diseases like plague and cholera, do not afflict you during my life-time-then I am not from God."

মির্জা গোলাম আহমেদের সমাধি।

এটি প্রকাশের এক বৎসর পর, মে ২৫, ১৯০৮ সনে মির্জা গোলাম আহমেদ অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। এসময় তিনি লাহোরে ছিলেন। গোলাম আহমেদ ডায়োরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাকে অবশ্য তৎক্ষণাৎ চিকিৎসার অধীনে নেয়া হয়েছিল, কিন্তু বমি এবং ঘন ঘন পাতলা পায়খানার দরুণ দূর্বলতায় তার শারিরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। পরদিন ২৬ শে মে সকাল দশটার পর তিনি মারা যান। তার মৃত্যু সম্পর্কে তার শ্বশুর নবাব মীর নাসির উদ্দিন বলেন-


“যে রাতে হযরত মির্জা সাহেব অসুস্থ্য হয়ে পড়েন, আমি আমার জায়গায় ঘুমিয়ে ছিলাম। যখন তিনি খুবই অস্বস্তি বোধ করতে লাগলেন, আমি জেগে গেলাম। আমি উঠে হযরত সাহেবের কাছে গেলে তিনি আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “মীর সাহেব, আমি কলেরায় আক্রান্ত হয়েছি।” আমার মনে হয় এরপর পরদিন সকাল দশটার পর মারা যাবার পূর্ব পর্যন্ত তিনি আর একটি কথাও পরিস্কার করে বলতে পারেননি।”


যাহোক, মৃত্যুর পর মির্জা গোলাম আহমেদের মৃতদেহ লাহোর থেকে পাঞ্জাবের কাদিয়ানে নিয়ে আসা হয়েছিল এবং ২৭ শে মে, ১৯০৮ সনে তার দাফন কাজ সম্পন্ন হয়। এ সময় তার উত্তরসূরী হলেন তার একান্ত বিশ্বস্ত ও সার্বক্ষণিক সঙ্গী হাকিম নাসির উদ্দিন। গোলাম আহমেদের অনুসারীরা আহমেদিয়া বা কাদিয়ানী নামে পরিচিত। বর্তমানে তারা বিশ্বের অধিকাংশ দেশে তাদের কর্মকান্ড পরিচালনা করে যাচ্ছেন।

সমাপ্ত।
সংশোধিত নয়।

১ জানুয়ারি, ২০১৩

Barnabas: বার্নাবাসের গসপেল -এর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।


বার্নাবাসের গসপেল (The Gospel of Barnabas) কাল পরিক্রমায় রক্ষাপ্রাপ্ত একমাত্র গসপেল। এর রচয়িতা বার্নাবাস। যীশুর তিন বছর ব্যাপী ধর্ম প্রচারকালে তিনি অধিকাংশ সময়ই তার বিশ্বস্ত সহচর হিসেবে ছিলেন। এর ফলে তিনি যীশুর ধর্মপ্রচার স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করে সরাসরি অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান লাভ করেন যা চারটি স্বীকৃত গসপেলের রচয়িতাদের কারও ছিল না।

মথি।
প্রথম গসপেলের রচয়িতা জন মার্ক (John Mark)। এটি লিখিত হয় ৬০-৭৫ সনে। তিনি ছিলেন সেন্ট বার্নাবাসের (St. Barnabas)- এর বোনের পুত্র। যীশুর সাথে তার কখনোই সাক্ষাৎ হয়নি। সুতরাং তিনি তার গসপেলে যীশুর জীবন ও শিক্ষা সম্পর্কে যা বর্ণনা করেছেন তা তিনি অবশ্যই অন্য কারো কাছ থেকে শুনেছেন বা জেনেছেন। নিউ টেষ্টামেন্টের গ্রন্থসমূহ থেকে জানা যায় যে পল ও বার্নাবাসের সাথে বহু ধর্মপ্রচার বিষয়ক সফরে তিনি সঙ্গী হয়েছিলেন। তদুপরি তথ্যের জন্যে তিনি পলের উপর নির্ভর করেছিলেন, এটা হতেই পারে না। এখানে একমাত্র যুক্তি সংগত সিদ্ধান্ত এটাই যে মামা বার্নাবাস যীশু সম্পর্কে তাকে যা বলেছিলেন, তিনি তার গসপেলে সেভাবেই পুনরাবৃত্তি করেছেন। কেউ কেউ বলেন যে মার্ক পিটার এর দোভাষী হিসেবে কাজ করেছিলেন এবং তিনি পিটারের কাছ থেকে যা শুনেছেন তাই লিখেছেন। এটাও সত্য হতে পারে।

২য় গসপেলের রচয়িতা মথি (Matthew) ছিলেন একজন ট্যাক্স কালেক্টর (কর আদায়কারী) তথা নিম্নপদস্থ কর্মকর্তা। তিনি যীশুর সাথে ভ্রমণ করেননি।

লুক।
৩য় গসপেলের রচয়িতা লূক (Luke) এবং তার গসপেলটি অনেক পরে লিখিত। তাছাড়া মথি ও মার্কের মত তার গসপেলের বর্ণনার উৎস একই। লুক ছিলেন পলের (পৌল-Paul) চিকিৎসক এবং পলের মত তিনিও কখনো যীশুকে দেখেননি।

অন্যদিকে ৪র্থ গসপেলের রচয়িতা জনের (ইউহোন্না) উৎস ভিন্ন এবং আরো পরে ১শ’ সনের দিকে রচিত। তাকে যীশুর শিষ্য জন (John) মনে করা ভুল হবে, কারণ তিনি ভিন্ন ব্যক্তি। এই গসপেলকে যীশুর জীবনের নির্ভরযোগ্য বিবরণ বলে গণ্য করা উচিত হবে কিনা এবং তা পবিত্র গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হবে কিনা তা নিয়ে দু’শ বছর ধরে উত্তপ্ত বিতর্ক চলেছিল।

সুতরাং মার্কের গসপেল অন্য ৩টি গসপেলের অভিন্ন উৎস হতে পারে কিনা তা বিতর্কের বিষয়। পক্ষান্তরে এই ৩টি গসপেলে যে সব ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, বার্নাবাসের গসপেলে সেগুলো রয়েছে। শুধু তাই নয়, বরং বলা যায় বার্নাবাসের গসপেলে অন্যান্য গসপেলগুলোর চেয়ে যীশুর জীবনের অনেক বেশি দিক বর্ণিত হয়েছে।

জন (ইউহোন্না)।
তবে বিতর্কিত প্রেক্ষাপট যাই থাকুক না কেন, বার্নাবাস সম্পর্কে এ ঐশী নির্দেশের কথা স্মরণ যোগ্য: 'যদি সে তোমাদের কাছে আসে, তাকে স্বাগত জানাও।' কলোসিয়ানদের কাছে পত্র (Epistle to the Colossians, ৪:১০)

এদিকে বার্নাবাস কখন এ গসপেল রচনা করেন তা জানা যায় না। তবে সম্ভবত জন মার্কের (John Mark) সাথে তিনি সাইপ্রাস প্রত্যাবর্তন করার পূর্বে কিছুই রচনা করেননি। যীশুর ঊর্ধ্বারোহণের কিছু দিন পর টারসসের পল (Paul of Tarsus) এর সাথে সম্পর্কচ্ছেদের পর দু’জন সাইপ্রাস যাত্রা করেছিলেন।পল বার্নাবাসের সাথে পুনরায় ভ্রমণে অস্বীকৃতি জানালেও মার্ক তাঁর সহযাত্রী হন। তবে এ গসপেল কখন লেখা হয়েছিল তা ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ এই যে, এটি যীশুর জীবন ও কর্ম বিষয়ে একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ।

জন মার্ক।
৩২৫ সন পর্যন্ত আলেকজান্দ্রিয়ার চার্চগুলোতে বার্নাবাসের গসপেল একটি গির্জা অনুমোদিত গসপেল (Canonical Gospel) হিসেবেই স্বীকৃত ছিল। এ গসপেলটি ইরানিয়াসের (Iraneus, ১৩০-২০০ সন) লেখালেখির কারণেই প্রথম ও ২য় শতাব্দীতে বেশ আলোচিত ছিল। ইরানিয়াস যীশুর শিক্ষার মধ্যে পৌত্তলিক, রোমান ধর্ম ও প্লাটোনিক দর্শনের মিশ্রণ ঘটানোর দায়ে পলকে অভিযুক্ত করেছিলেন। আর তিনি তার মতের সমর্থনে বার্নাবাসের বাইবেল থেকে ব্যাপক উদ্ধৃতি দিতেন।

৩২৫ সনে নিকাইয়ার (Nicea) বিখ্যাত কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে ত্রিত্ববাদকে পলীয় চার্চের আনুষ্ঠানিক ধর্মমত হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই সিদ্ধান্তের একটি ফল হয় এই যে, সে সময় যে ৩শ’র মত গসপেল বিদ্যমান ছিল, সেগুলোর মধ্য থেকে চারটিকে চার্চের অনুমোদিত গসপেল হিসেবে মনোনীত করা হয়। অন্যান্য গসপেলেগুলো যার মধ্যে বার্নাবাসের গসপেলও ছিল, সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। ফরমান জারি করা হয় যে কারো কাছে অননুমোদিত গসপেল পাওয়া গেলে তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। তবে বার্নাবাসের গসপলের ক্ষেত্রে এ চেষ্টা সম্পূর্ণ ফলপ্রসূ হয়নি। আজকের দিনেও এ গ্রন্থের অস্তিত্ব বজায় থাকা থেকেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। 

পল।
ডামাসাস (Damasus, ৩০৪-৩৮৪ সন) ৩৬৬ সনে পোপ হন। তিনি ফরমান জারি করেন যে বার্নাবাসের গসপেল পাঠ করা উচিত নয়। কায়সারিয়ার বিশপ গেলাসাস (Gelasus)-এ ফরমান সমর্থন করেন। গেলাসাস ৩৯৫ সনে পরলোক গমন করেন। তিনি ‘এপোক্রাইফাল’(Apocryphal) গ্রন্থগুলোর যে তালিকা তৈরি করেন তার মধ্যে এ গসপেলটিও ছিল। এপোক্রাইফা অর্থ 'জন-সাধারণের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা'। ফলে এ গসপেলটি তখন সহজলভ্য ছিল না। তবে চার্চ নেতারা তাদের কথায় এ গসপেলের প্রসঙ্গ উল্লেখ করতেন। বাস্তবে জানা যায় যে পোপ ৩৮৩ সনে বার্নাবাসের বাইবেলের একটি কপি সংগ্রহ করেছিলেন ও তা তার ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে রেখেছিলেন। 

এ গসপেল সংক্রান্ত বিষয়ে আরো বেশ কিছু ফরমান জারি করা হয়। ৩৮২ সনে পাশ্চাত্যের চার্চগুলো এবং ৪৫৬ সনে পোপ ইনোসেন্ট কর্তৃক (Innocent) এ গসপেল নিষিদ্ধ করে ফরমান জারি করা হয়। ৪৯৬ সনে গ্লাসিয়ান ফরমানে নিষিদ্ধ গ্রন্থের তালিকায় 'Evangelium Barnabe’ও অন্তর্ভুক্ত হয়। হরমিসডাস (Hormisdas) এর ফরমানেও (যিনি ৫১৪ সন থেকে ৫২৩ সন পর্যন্ত পোপ ছিলেন) এ নিষেধাজ্ঞা পুনর্ব্যক্ত করা হয়। বি দ্য মন্টফাকো (B.De. Montfaucon, ১৬৫৫-১৭৪১) কর্তৃক প্রণীত চ্যান্সেলর সেগুইয়ার (Chancellor Seguier, ১৫৫৮-১৬৭২)- এর গ্রন্থাগারের গ্রীক পাণ্ডুলিপির ক্যাটালগে এ সকল ফরমানের উল্লেখ করা হয়েছে। 

নাইসেফোরাসের (NicephorusStichometry তেও নিম্নরূপে বার্নাবাসের গসপেলের উল্লেখ করা হয়েছে:
ক্রমিক নং ৩, বার্নাবাসের পত্রাবলী (Epistle of Barnabas) ... ১,৩০০ পংক্তি।  
আবার Sixty Books- এর তালিকাতে বার্নাবাসের গসপেলের নিম্নরূপ উল্লেখ রয়েছে:
ক্রমিক নং ১৭। প্রেরিত দূতদের ভ্রমণ ও শিক্ষা।
ক্রমিক নং ১৮। বার্নাবাসের পত্রাবলি।
ক্রমিক নং ২৪। বার্নাবাসের গসপেল। 
এই বিখ্যাত তালিকা Index নামে পরিচিত।

ফ্রান্সের রাজার গ্রন্থাগারের পাণ্ডুলিপি সমূহের ক্যাটালগ প্রস্তুতকারী কোটেলেরিয়াস (Cotelerius) ১৭৮৯ সনে প্রণীত Index of Scriptures- এ বার্নাবাসের গসপেলকে তালিকাভূক্ত করেন। অক্সফোর্ড বোদলেইয়ান লাইব্রেরির বারো সিয়ান (Baroccian) সংগ্রহের ২০৬ তম পাণ্ডুলিপিতে এই গসপেলের বর্ণনা রয়েছে। এথেন্সের একটি যাদুঘরে বার্নাবাসের গসপেলের একটি খন্ডিত কপি রয়েছে। গ্রীক ভাষায় অনুদিত এ কপিটি পুড়িয়ে ফেলা একটি গসপেলের রক্ষাপ্রাপ্ত অংশ। 
বার্নাবাস।
সম্রাট জেনোর (Zeno) শাসনামলের চতুর্থ বছরে ৪৭৮ সনে বার্নাবাসের দেহাবশেষ আবিষ্কৃত হয় এবং তার নিজের হাতে লেখা গসপেলের একটি কপি তার বুকের উপর রাখা অবস্থায় পাওয়া যায়। ১৬৯৮ সনে অ্যান্টওয়ার্প (Antwarp) থেকে প্রকাশিত Acta Sanctorum (Boland Junii, Tome II)- এর ৪২২-৪৫০ পৃষ্ঠায় এর উল্লেখ রয়েছে। রোমান ক্যাথলিক চার্চ দাবি করেছিল যে বার্নাবাসের কবরে প্রাপ্ত গসপেলটি মথির রচিত। কিন্তু এ কপিটি প্রদর্শনের কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ভ্যাটিকানের '২৫ মাইল লম্বা লাইব্রেরি' অভ্যন্তরেই এর বিষয়বস্তু অজ্ঞাত রয়ে গেল। 

বার্নাবাসের গসপেলের যে পাণ্ডুলিপি থেকে ইংরেজি অনুবাদ করা হয়েছে সেটি আদতে ছিল পোপ সেক্সটাস (Sextus, ১৫৮৯-৯০) এর কাছে। ফ্রা মারিনো (Fra Marino) নামে তার এক যাজক বন্ধু ছিলেন। তিনি ইরানিয়াসের লেখা পাঠ করে বার্নাবাসের বাইবেলের ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ইরানিয়াস তার লেখায় বার্নাবাসের বাইবেল ব্যাপকভাবে উদ্ধৃত করতেন। 

একদিন মারিনো পোপের সাথে সাক্ষাৎ করতে যান। তারা একসাথে দুপুরের আহারের পর কথাবার্তা বলতে থাকেন। এ সময় পোপ ঘুমিয়ে পড়েন। ফাদার মারিনো তখন পোপের ব্যক্তিগত লাইব্রেরির বইগুলো ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকেন। এক পর্যায়ে তিনি বার্নাবাসের গসপেলের একটি ইতালীয় পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করেন। সেটি নিজের আলখেল্লার আস্তিনে লুকিয়ে মারিনো পোপের বাড়ি ত্যাগ করেন এবং ভ্যাটিক্যান থেকে চলে যান। বিভিন্ন লোকের হাত ঘুরে পাণ্ডুলিপিটি অবশেষে Amsterdam এ এমন এক ব্যক্তির হাতে পৌঁছে যিনি ছিলেন ‘স্বনাম খ্যাত ও ক্ষমতাশালী’। তিনি গসপেলটিকে অত্যন্ত মূল্যবান বলে মনে করতেন। তার মৃত্যুর পর গসপেলটি প্রুশিয়ার রাজার এক সভাসদ জে, ই, ক্রেমারের (JE Cremer) হাতে পড়ে। ১৭১৩ সনে ক্রেমার বিখ্যাত গ্রন্থপ্রেমী স্যাভয় এর যুবরাজ ইউজিনকে (Prince of Eugene of Savoy) পাণ্ডুলিপিটি উপহার দেন। ১৭৩৮ সনে প্রিন্সের সম্পূর্ণ গ্রন্থাগারের সাথে পাণ্ডুলিপিটি ভিয়েনার হফবিবলিওথেক (Hofbibliothek)- এ পৌঁছে এবং এখনও তা সেখানেই আছে।

বিশিষ্ট ঐতিহাসিক টোলান্ড (Toland) বার্নাবাসের গসপেলের এ পাণ্ডুলিপিটি পাঠ করেছিলেন এবং গসপেল সম্পর্কে তিনি তার Miscellaneous Works-এ এর উল্লেখ করেছেন-'এটি আগাগোড়া যথার্থই এক ধর্মগ্রন্থ' (This is in Scripture Style to a hair)। তিনি আরও বলেছিলেন: 'এ পর্যন্ত প্রাপ্ত গসপেল সমূহে যীশুর কাহিনি বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। বিশেষ করে এ গসপেলটিতে এই ভিন্নতা আরো বেশি লক্ষণীয়। মূল থেকে নিকটতর ছিল বিধায় কেউ কেউ এর প্রতি অধিকতর অনুকূল ধারণা পোষণ করবে। কারণ কোন একটি ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পরই শুধু সে সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করা যায়। তাই মূল ঘটনা থেকে যতই দূরে সরে যাওয়া হয় ততই তার আবেদন হ্রাস পায়।' 
উল্লেখ্য, স্প্যানিশ ভাষায় আরেকটি গসপেল এক সময় ছিল। গসপেলের ইতালীয় পাণ্ডুলিপিটি যে সময় হফবিবলিও থেকে দেওয়া হয় সেই একই সময়ে স্প্যানিশ গসপেলটিও ইংল্যান্ডের একটি কলেজ লাইব্রেরিকে উপহার দেওয়া হয়েছিল। রহস্যজনকভাবে সে পাণ্ডুলিপিটি অন্তর্হিত হওয়ার অনেক আগে থেকেই সেটিকে ইংল্যান্ডে খুঁজে পাওয়া যায়নি। 

ক্যানন (Canon) ও মিসেস র‌যাগ (Mrs Ragg) ইতালীয় পাণ্ডুলিপিটি ইংরেজীতে অনুবাদ করেন। ১৯০৭ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস কর্তৃক তা মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়। রহস্যজনক ভাবে এর প্রায় সকল কপিই বাজার থেকে উধাও হয়ে যায়। মাত্র ২টি কপি এখন টিকে আছে। একটি রয়েছে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে এবং অন্যটি ওয়াশিংটনের লাইব্রেরি অব কংগ্রেস-এ। লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের কপিটির একটি মাইক্রো ফিল্ম কপি সংগ্রহ করা হয় এবং তা পাকিস্তানে মুদ্রিত হয়। বার্নাবাসের গসপেলের সংশোধিত সংস্করণ পুনর্মুদ্রণের লক্ষ্যে এই সংস্করণেরই কপি ব্যবহার করা হয়।

সমাপ্ত।
ছবি: Wikipedia. 

বি:দ্র: অনেকে বার্ণাবাসের গসপেলকে ভূয়া বলে উড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেন। তবে পুস্তকটি যে নবী মুহম্মদের আগমনের বহু পূর্বে লেখা তার প্রমান এ আটিকেলে রয়েছে। তবে কেন এবং কিভাবে এতে নবী মুহম্মদের এত বিবরণ এল তা গবেষণার বিষয়। আর যদি এটা ফরজারি হয় তথাপি তা হবে কোন খৃষ্টান বা 
ইহুদির কাজ, কোন মুসলিমের নয়। কারণ কিছু তথ্য তে রয়েছে যা কোন মুসলিমের জানা সম্ভব ছিল না, সর্বোপরি, মুসলিমের লেখা হলে তা কেন তাদের কারো দ্বারা উৎঘাটিত হল না।

যা হোক, বার্ণাবাসের গসপেলটিকে যদি ভূয়াও হয় তথাপি ধর্মগ্রন্থ হিসেবে বিবেচনায় অন্য তিনটি গসপেলের চাইতে মর্য়াদায় অনেক উপরে থাকবে এটি এর পান্ডিত্যপূর্ণ তথ্য ও তার উপস্থাপনা, তত্ত্বের ব্যাখ্যা ও বিন্যাস পদ্ধতির জন্যে।সত্যি বলতে কি, সেক্ষেত্রে জ্ঞানে লেখককে জেসাসের সমকক্ষ বলে গণ্য করা আদৌ অযোক্তিক হবে না।

২৩ ডিসেম্বর, ২০১২

Council of Nicea: নিকাইয়ার সম্মেলন ও সম্রাট কনষ্টানটাইন।

রোমান সম্রাট কনষ্টানটাইন তার জ্যেষ্ঠ পুত্র ও সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ক্রিসপাসের (Crispus) প্রতি ঈর্ষান্বিত ছিলেন। তরুণ রাজকুমার তার সুন্দর ব্যবহার, চমৎকার আচরণ এবং যুদ্ধ ক্ষেত্রে সাহসিকতার জন্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। সম্রাট তার নিজের অবস্থান যাতে বিপন্ন না হয়, সে জন্যে ক্রিসপাসকে গুপ্তহত্যা করেন। ক্রিসপাসের মৃত্যুতে সমগ্র সাম্রাজ্যে বিষাদের ছায়া নেমে আসে। 

স্টাচু অব সম্রাট কনষ্টানটাইন।
এই হত্যাকান্ডের জন্যে অভিযুক্ত করা হয় ক্রিসপাসের সৎ মাতাকে। সম্রাটের ২য় স্ত্রী, ঐ রানী ফাউস্টা (Fausta) নিজের পুত্রের সিংহাসনে আরোহণের পথ নিষ্কণ্টক করার জন্যে উদগ্রীব ছিলেন। এ কারণে ক্রিসপাসকে সরিয়ে দেবার অভিপ্রায় তার ছিল। যাইহোক, সম্রাট কনষ্টানটাইন ক্রিসপাসের হত্যার অভিযোগে এই রানীকে বন্দী করলেন এবং ফুটন্ত পানি ভর্তি চৌবাচ্চার মধ্যে নিক্ষেপ করে তাকে হত্যার আদেশ দিলেন। 

কিন্তু এই হত্যাকান্ডের ফল সম্রাটের প্রত্যাশার বিপরীত হল। নিহত নিরাপরাধ রানীর সমর্থকরা, ক্রিসপাসের সমর্থকদের সাথে মিলিত হয়ে সম্রাটের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হল। অন্যদিকে কনষ্টানটাইন নিজেও আত্মগ্লানিতে ভুগছিলেন।আর তাই উপায়ন্তর না দেখে তিনি জুপিটারের মন্দিরের পুরোহিতদের শরণাপন্ন হলেন। কিন্তু ঐ পুরোহিতরা তাকে জানাল যে, এমন কোন উৎসর্গ বা প্রার্থনা নেই যা তাকে এ দু’টি হত্যার দায় থেকে মুক্ত করতে পারে। এমতাবস্থায় কনষ্টানটাইন রোমে অবস্থানে স্বস্তি বোধ না করায় বাইজানটিয়াম চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন।

বাইজানটিয়ামে এসে কনষ্টানটাইন তার নামে শহরটির নামকরণ করেন। তখন থেকেই শহরটি কনষ্টান্টিনোপল (Constantinople) হিসেবে পরিচিত হয়। এখানে তিনি পলীয় চার্চের কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত সমর্থন লাভ করেন। ঐ চার্চ তাকে জানায় যে, তিনি যদি তাদের চার্চে প্রায়শ্চিত্ত করেন তবে তার পাপমুক্তি ঘটবে। কনষ্টানটাইন এর পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করেন। শুধু দু’টি হত্যার রক্তে তার হাত যে রঞ্জিত ছিল তাই নয়, সাম্রাজ্য শাসনের বিভিন্ন সমস্যায়ও তিনি হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। এ ভাবে অপরাধ স্বীকারের মাধ্যমে বিবেকের দংশন থেকে মুক্তি লাভ এবং দুশ্চিন্তা থেকে রেহাই পেয়ে তিনি সাম্রাজ্যের দিকে মনোনিবেশ করলেন। 

কনষ্টান্টিনোপল (ইস্তাম্বুল) বর্তমানে।
এদিকে পাপমুক্ত হবার পর সম্রাট নিজ স্বার্থসিদ্ধির জন্যে চার্চকে ব্যবহারের এক অপার সম্ভাবনা দেখতে পেলেন। তিনি চার্চকে জানালেন যে, চার্চ যদি তাকে সমর্থন করে যায়, তবে তিনিও চার্চকে পূর্ণ সহযোগিতা ও সমর্থন দিয়ে যাবেন। সম্রাটের কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত এ সমর্থন লাভ করে পলীয় চার্চ রাতারাতি শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান হয়ে উঠল। অন্যদিকে কনষ্টানটাইনও চার্চকে তার কাজে পূর্ণ ব্যবহার করলেন। ভূ-মধ্যসাগরের চারপাশের দেশগুলোতে অসংখ্য খৃষ্টান চার্চ ছিল যেগুলিকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে সম্রাট তার পথের কাঁটাগুলিকে তুলে ফেলতে লাগলেন। বহু পুরোহিতই তার গোয়েন্দা বৃত্তির কাজে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যকে তার অধীনে একত্রিত করার প্রচেষ্টায় এ সাহায্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অংশত কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের জন্যে এবং অংশত জুপিটারের মন্দিরের যে রোমান পুরোহিতরা তাকে সমর্থন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল তাদের ক্ষমতা কিছুটা খর্ব করতে তিনি রোমে একটি পলীয় চার্চ প্রতিষ্ঠার জন্যে খৃষ্টানদেরকে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিলেন। 

যাইহোক, কনষ্টানটাইন যখন পলীয় চার্চের সাথে জোটবদ্ধ হলেন, তখন এক ভিন্ন পরিস্থিতির উদ্ভব হল। কেননা তিনি রোমান দেবতাদের পূজারি এবং পৌত্তলিক রাষ্ট্রের ধর্মীয় প্রধান হওয়া সত্ত্বেও সরাসরি পলীয় চার্চকে সমর্থন যুগিয়ে চলছিলেন। সম্রাটের ঐ আনুকূল্য খৃষ্টধর্মকে নতুন আলোয় উদ্ভাসিত করেছিল এবং কার্যত: তা রোমান সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রীয় ধর্ম বিশ্বাসে পরিণত হয়ে পড়েছিল। ফলে অনেকের জন্যেই খৃষ্টধর্ম আকস্মিকভাবে যুগপৎ নীতি ও সুবিধা লাভের বিষয় হয়ে উঠল। এতে পৌত্তলিক ধর্মবিশ্বাসে যারা দৃঢ় ছিল না, তারা এখন দ্রুত পলীয় চার্চের অনুগত অনুসারীতে পরিণত হল। তবে বহু লোকই অন্তর থেকে নয়, সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে খৃষ্টধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেছিল। যেভাবে যাই হোক না কেন, মোটকথা ঐসময় খৃষ্টধর্মে এক গণজোয়ার পরিলক্ষিত হয়েছিল।

পলীয় চার্চের এই আকষ্মিক উত্থানে আঁরিয়ানবাদী চার্চের সাথে তাদের বিভেদ প্রকট হয়ে দেখা দিল। এসময় সম্রাট কনষ্টানটাইন, একটি ঐক্যবদ্ধ চার্চের রাজনৈতিক সুবিধা উপলব্ধি করেন। সুতরাং তিনি জেরুজালেমকে বাদ দিয়ে খৃষ্টধর্মকে রোম কেন্দ্রিক করতে চাইলেন। কিন্তু আঁরিয়ানবাদী চার্চ তার ইচ্ছা পালনে অস্বীকৃতি জানিয়ে দিল। কারণ তারা এ ঘটনাকে একজন বিদেশি শাসকের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে খৃষ্টধর্ম বিরোধী একটি পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য করল। 

বিশপ ডোনাটাস।
প্রথম বিদ্রোহের ঘটনাটি ঘটে উত্তর আফ্রিকায় বারবার সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে। আর এ বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন ডোনাটাস (Donatus) নামক এক বিশপ, যিনি ৩১৩ খৃষ্টাব্দে বিশপ হিসেবে নির্বাচিত হয়ে চার্চের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। এতে রোমের পলীয় চার্চের বিশপ, ডোনাটাসের স্থলে কার্থেজে কেসিলিয়ান (Cacealian) নামক একজনকে বিশপ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করলেন। এই বিরোধ নিষ্পত্তির জন্যে উভয়পক্ষ সম্রাট কনস্টানটাইনের শরণাপন্ন হলেন। সম্রাটের পৃষ্ঠপোষকতা লাভের এ প্রয়াস খৃষ্টধর্মের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করে দিল। 

কনষ্টানটাইন কেসিলিয়ানের পক্ষ সমর্থন করলেন। এতে কার্থেজের অধিবাসীরা রোমান উপ-কন্সালের অফিসের সামনে জড় হল এবং কেসিলিয়ানের নিন্দা করল। কনষ্টানটাইন তাদের এ আচরণে বিরক্ত হলেন। তা সত্ত্বেও তিনি উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার জন্যে রোমের বিশপের নেতৃত্বে একটি ট্রাইবুনাল গঠন করলেন।ডোনাটাস সেখানে হাজির হননি এবং তার পক্ষে যুক্তি-তর্ক পেশ করারও কেউ সেখানে ছিল না। তার অনুপস্থিতিতেই তার বিরুদ্ধে রায় দেওয়া হল। 

আফ্রিকায় আঁরিয়ানবাদী চার্চ রোমান বিশপের প্রদত্ত একতরফা রায় প্রত্যাখ্যান করে। এ ঘটনায় কনষ্টানটাইনের বিরুদ্ধে এ বলে ক্ষোভ প্রকাশ করা হল যে, “ঈশ্বরের মন্ত্রীগণ ফালতু মামলাবাজদের মত নিজেদের মধ্যে বাক-বিতণ্ডায় লিপ্ত ছিলেন” হতাশ হওয়া সত্ত্বেও কনষ্টানটাইন আরলেসে নতুন করে একটি ট্রাইবুনাল স্থাপন করলেন। উভয় পক্ষের শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে সংঘর্ষ এড়ানোর লক্ষ্যে তাদেরকে পৃথক পৃথক পথে আরলেসে আসার জন্যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ডোনাটাসের সমর্থকরা পুনরায় পরাজিত হল। এ ট্রাইবুনালের রায়ে বলা হয়েছিল: “বিশপগণ নিজেদের বিপজ্জনক লোকদের সাথেই দেখতে পেয়েছেন, যাদের দেশের কর্তৃপক্ষ বা ঐতিহ্যের প্রতি কোন শ্রদ্ধা নেই। একমাত্র শাস্তিই তাদের প্রাপ্য।”

পূর্বের রায় পরের রায়ের থেকে কোনভাবেই পৃথক ছিল না। ফলে উত্তর আফ্রিকার খৃষ্টানদের কাছে তা গ্রহণযোগ্য হল না। তারা শুধুমাত্র রোমের পলীয় চার্চের বিশপের রায় বলবৎ করার জন্যে রোমান সাম্রাজ্যের রাজকর্মচারীদের রাতারাতি ঈশ্বরের সেবক বনে যাওয়ার বিষয়টিকে মেনে নিতে পারেনি। সুতরাং বিশপ ডোনাটাস তাদের জনপ্রিয় নেতায় পরিণত হলেন। 

সম্রাট কনষ্টানটাইন দুই চার্চের কাছে লেখা এক পত্রে তাদের মধ্যকার বিরোধ ভুলে যেতে এবং তার সমর্থিত চার্চের অধীনে উভয় পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি তার পত্রে লিখেছিলেন- ’আমার পক্ষে আরো যা করা যেতে পারে তা হল সকল ভ্রান্তি দূর করে এবং হঠকারী মতামত ধ্বংস করে দিয়ে সকল লোককে সত্য ধর্ম ও সরল জীবনের পথ অনুসরণ এবং সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের প্রাপ্য উপাসনা করার আহ্বান জানানো।’
কেউ এ পত্রের দ্বারা প্রভাবিত হয়নি।

৩১৫ খৃষ্টাব্দে ইতালির উত্তরে ফ্রাংকরা হামলা শুরু করলে তা দমনের জন্যে সম্রাট রোমে প্রত্যাবর্তন করেন। এ সময় তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে আফ্রিকায় প্রেরণের জন্যে একটি কমিশন গঠন করেছিলেন। কমিশন সেখানে পৌছলে তাকে বর্জন করা হয়। ফলে কোন সাফল্য অর্জন ছাড়াই কমিশনের সদস্যরা রোমে ফিরে আসতে বাধ্য হন। এই অপ্রীতিকর সংবাদ কনষ্টানটাইনের কাছে পৌঁছিলে, তিনি স্বয়ং উত্তর আফ্রিকা গমন এবং সঠিক কিভাবে সর্বোচ্চ ঈশ্বরের উপাসনা করতে হবে সে বিষয়ে সুস্পষ্ট ফরমান জারির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। 
কনষ্টানটাইন পরিকল্পনা গ্রহণ করলেও আফ্রিকা সফরে যাননি। কারণ, ডোনাটাসপন্থীরা এত শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল যে সম্রাটকে ডোনাটাস ও কেসেলিয়নের মধ্যকার বিরোধে ব্যক্তিগতভাবে হস্তক্ষেপ না করার পরামর্শ দেয়া হয়। কেননা, যদি তার ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ ব্যর্থ হয়, তবে তা হবে তার মর্যাদার প্রতি এক বিরাট আঘাত। সুতরাং সম্রাট এসময় কেবল ডোনাটাসের নিন্দা করে একটি ফরমান জারি করলেন। ঐ ফরমানে সর্বোচ্চ ঈশ্বরের যথোচিত পন্থায় প্রার্থনার সুযোগ সুবিধার বিষয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। যখন তা উপেক্ষিত হল, তখন অত্যন্ত কঠোর এক আইন জারি করে আফ্রিকায় প্রেরিত হল। এতে ডোনাটাসের অনুসারীদের সকল চার্চ বাজেয়াপ্ত এবং তাদের সকল নেতাকে নির্বাসনে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়। এসময় কেসেলিয়ান প্রথমে ডোনাটাসপন্থী চার্চদের নেতাদের উৎকোচ দিয়ে হাত করার চেষ্টা করেন, কিন্তু ব্যর্থ হন। ডোনাটাসপন্থীরা রাজকীয় ফরমান অগ্রাহ্য ও উৎকোচ উপেক্ষা করে। আর তারা অর্থ উৎকোচের প্রস্তাবের বিষয়টি প্রকাশ্যে ফাঁস করে দেয়। ফলে কেসেলিয়ান “কসাই এর চাইতেও নির্মম এবং একজন স্বৈরাচারীর চাইতেও নিষ্ঠুর” হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছিলেন। 

ইতিমধ্যে রোমের পলীয় চার্চ ‘ক্যাথলিক’ বিশেষণ গ্রহণ করেছিল। ঈশ্বরের উপাসনায় তাদের ধর্মমতকে সার্বজনীন করার লক্ষ্যেই তারা এ নামটি গ্রহণ করে। যাহোক, এখন এই ক্যাথলিক চার্চ ডোনাটাসপন্থীদের কাছে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আবেদন জানাল। এ আবেদনের কোন সাড়া মেলেনি এবং ডোনাটাস কেসেলিয়ানের কাছে তার চার্চগুলো হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানান। শেষ পর্যন্ত রোমান সেনাবাহিনী মাঠে নামে। পাইকারিভাবে লোকজনকে হত্যা করা হয়। আর বিশপদের হত্যা করা হয় চার্চের অভ্যন্তরে। কিন্তু ঐ হত্যাযজ্ঞ থেকে ডোনাটাস রক্ষা পান এবং অনমনীয় থাকেন। 

কনষ্টানটাইন, যিনি একজন দক্ষ প্রশাসক ছিলেন, বল প্রয়োগে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও ঐক্য পুনরুদ্ধারে তার ব্যর্থতা উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। বিচক্ষণতা বীরত্বের অঙ্গ এ বিবেচনায় তিনি উত্তর আফ্রিকার জনসাধারণকে তাদের নিজেদের উপর ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং আফ্রিকা থেকে তার মনোযোগ সরিয়ে এনে সাম্রাজ্যের অন্যান্য স্থানের দিকে নিবদ্ধ করেন। ফলে ডোনাটাসপন্থীদের উপর নিপীড়নের মাত্রা হ্রাস পায় এবং তাদের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। তারা এতটা শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে, সম্রাট যখন ৩৩০ খৃষ্টাব্দে উত্তর আফ্রিকায় ক্যাথলিকদের জন্যে একটি চার্চ নির্মাণ করেন, তখন ডোনাটাসপন্থীরা তা দখল করে নেয়। আর তারা এ অভিমত ব্যক্ত করে, “ক্যাথলিকদের যাজকগণ অসৎ ব্যক্তি। তারা ইহলোকের রাজন্যবর্গের সাথে কাজ করে। রাজ-অনুগ্রহের উপর নির্ভরশীল হয়ে তারা যীশুর অবমাননা করে যাচ্ছে।”

সম্রাট এ ঘটনায় অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন। কিন্তু আরেকটি চার্চ নির্মাণের জন্যে ক্যাথলিকদের পর্যাপ্ত অর্থ প্রদানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করা ছাড়া তার আর কিছু করার ছিল না। ডোনাটাসপন্থীদের আন্দোলন রোম পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে। রোমে তাদেরও একজন বিশপ ছিলেন, তবে পদমর্যাদার দিক থেকে তাকে কার্থেজ (Carthage) ও নিকোমেডিয়ার (Nicomedia) বিশপের চেয়ে একধাপ নীচে বলে গণ্য করা হত।

এদিকে ডোনাটাসের আন্দোলনের পাশাপাশি একই সময়ে অথচ সম্পূর্ণ স্বাধীন আর এক আন্দোলন দক্ষিণ মিসরে চলছিল। কনষ্টানটাইন যখন ৩২৪ খৃষ্টাব্দে উত্তর আফ্রিকার জট খোলার জন্যে আরেকবার উদ্যোগ গ্রহণ করছিলেন, তখনি তার দৃষ্টি মিশরের উপর পতিত হয়। মিশর তখন বিদ্রোহ, গোলযোগ ও অরাজকতায় আকীর্ণ ছিল। ডায়োক্লোশিয়ানের নেতৃত্বে খৃষ্টানদের প্রতি নিপীড়ন যখন তুঙ্গে উঠেছিল, তখন অনেকেই তা পরিহারের জন্যে তার সাথে সমঝোতা করেছিল। মেলেটিয়াস (Meletius) নামক একজন যাজক এ সময় বলেন যে, যেসব যাজকেরা প্রকাশ্যে খৃষ্টধর্মের নিন্দা করেছে তাদের যাজকবৃত্তির কাজ পুনরায় শুরু করার ক্ষেত্রে বাধা দেয়া উচিত। তিনি আরো বলেন যে, প্রায়শ্চিত্তের পর্যাপ্ত প্রমাণ না প্রদর্শন করা পর্যন্ত সকল বিশুদ্ধ প্রার্থনা সমাবেশে তাদের যোগদান বন্ধ করতে হবে। এ সময় আলেকজান্দ্রিয়ার প্রধান যাজক পিটার আরো নমনীয় পন্থার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে অধিকাংশ লোকই মেলেটিয়াসকে সমর্থন করে। অত:পর আলেকজান্ডার যখন যাজকদের প্রধান হলেন, তিনি মেলেটিয়াসকে মাইনেস-এ (Mines) নির্বাসিত করলেন। 

মেলেটিয়াসকে নির্বাসন থেকে ফিরে আসার অনুমতি দেয়া হল।তিনি ফিরে এলে বহু অনুসারী তার চারপাশে সমবেত হয়। তিনি বিশপ, যাজক ও উচ্চপদের যাজকদের নিয়োগ দান এবং বহু গির্জা নির্মাণ করেছিলেন। তার অনেক অনুসারীরা তাদের নিপীড়নকারীদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকার করে জীবন উৎসর্গ করেছিল। তাই মেলেটিয়াস তার চার্চকে “শহীদদের চার্চ” (Church of the Martyrs) নামে আখ্যায়িত করেছিলেন।বিশপ আলেকজান্ডারের অনুসারীরা এর বিরোধী ছিল। কারণ তারা নিজেদেরকে ক্যাথলিক নামে আখ্যায়িত ও পলের প্রচারিত খৃষ্টধর্মের অনুসরণ করত। 

মেলেটিয়াসের মৃত্যুর পর বিশপ আলেকজান্ডার তার অনুসারীদের প্রার্থনা সমাবেশ নিষিদ্ধ করেন। এ আদেশের বিরোধিতা করে তারা সম্রাট কনষ্টানটাইনের কাছে একটি প্রতিনিধি দল প্রেরণ করে। সেখানে নিকোমেডিয়ার ইউসেবিয়াসের সাহায্য লাভ করে তারা সম্রাটের সাথে সাক্ষাতের অনুমতি লাভ করে। সম্রাটের দরবারে তাদের উপস্থিতির ঘটনা নিকাইয়ার কাউন্সিল আহ্বানের অন্যতম কারণ ছিল। ইউসেবিয়াস আঁরিয়াসের বন্ধু ছিলেন। এই সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে আঁরিয়ান ও মেলেটিয়ান আন্দোলনের মধ্যে সংযোগ স্থাপিত হয়। 
 বিশপ আঁরিয়াস।
আলেকজান্দ্রিয়ার বিশপ পিটার আঁরিয়াসকে একজন উচ্চ পদমর্যাদার যাজক হিসেবে নিয়োগ করেন, কিন্তু পরে তাকে তিনি বহিষ্কার করেন। পিটারের উত্তরসূরি আকিলাস (Achillas) পুনরায় তাকে যাজক নিয়োগ করেন। আঁরিয়াস এত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন যে যখন আকিলাসের মৃত্যু ঘটে তখন তিনি তার স্থান দখলের সর্বপ্রকার সুযোগ থাকা সত্বেও তাতে আগ্রহী হননি। ফলে যাজকদের সর্বোচ্চ পদটিতে আলেকজান্ডার সহজেই অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। ৩২১ খৃষ্টাব্দ নাগাদ আঁরিয়াস হয়ে উঠেছিলেন একজন জনপ্রিয় বিদ্রোহী যাজক, বিপুল রকম আত্মবিশ্বাসী এবং নিজের বিশ্বাসের ব্যাপারে দ্বিধা-দ্বন্দ্বহীন। 

এ পর্যায় পর্যন্ত খৃষ্টানদের ধর্ম বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বিরাট স্বাধীনতা ছিল। যারা নিজেদের খৃষ্টান বলে আখ্যায়িত করত তাদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক লোক ত্রিত্ববাদকে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু এর প্রকৃত অর্থ কি, সে ব্যাপারে কেউই নিশ্চিত ছিল না। কিছু লোক অন্ধভাবে এর সমর্থন করত। অন্যদিকে ডোনাটাস ও মেলেটিয়াসের মত কিছু লোক তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। আর এ দুয়ের মধ্যে যারা অবস্থান করছিল, তারা নিজেরা যে ভাবে ভাল মনে করত, ত্রিত্ববাদের সেভাবে ব্যাখ্যা করার স্বাধীনতা তাদের ছিল। দু'শতাব্দী ধরে আলোচনার পরও কেউই এ ধর্মমতকে সন্দেহমুক্ত ভাবে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয়নি। আঁরিয়াস ত্রিত্ববাদের সংজ্ঞা প্রদানের জন্যে চ্যালেঞ্জ জানালেন। আলেকজান্ডার তখন সম্পূর্ণ পশ্চাদপসরন করলেন। তিনি যতই এর ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করলেন, ততই তিনি বিভ্রান্তির শিকার হলেন। আঁরিয়াস যুক্তি দিয়ে এবং পবিত্র গ্রন্থের প্রামাণিকতার উপর নির্ভর করে ত্রিত্ববাদকে মিথ্যা বলে প্রমাণ করলেন।

এরপর আঁরিয়াস যীশু সম্পর্কে বিশপ আলেকজান্ডারের দেয়া ব্যাখ্যা খণ্ডন করেন। তিনি যুক্তি দেখান যে, যীশু যদি প্রকৃতই ‘ঈশ্বরের পুত্র’ হয়ে থাকেন তাহলে তার অর্থ এই দাঁড়ায় যে পুত্রের পূর্বে পিতার অস্তিত্ব ছিল। অতএব এমন একটি সময় অবশ্যই ছিল যখন সন্তানের অস্তিত্ব ছিল না। সুতরাং এর অর্থ এটাই হয় যে পুত্র ছিল কোন সত্তা বা প্রাণ দ্বারা গঠিত সৃষ্টি যা সব সময়ই অস্তিত্বশীল ছিল না। যেহেতু ঈশ্বর অনাদি ও চিরস্থায়ী সত্তা, সে কারণে যীশু ঈশ্বরের মত একই সত্তা হতে পারেন না। 

বিতর্কে এই ব্যক্তিগত বিপর্যয় ঘটার পর আলেকজান্ডার আঁরিয়াসের ধর্মমতের ব্যাপারে রায় ঘোষণার জন্যে এক প্রাদেশিক সভা আহ্বান করেন। প্রায় ১শ’ মিশরীয় ও লিবীয় বিশপ এতে যোগদান করেন। আঁরিয়াস অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে তার অবস্থানের কথা ব্যাখ্যা করেন। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন: এমন এক সময় ছিল যখন যীশু অস্তিত্বশীল ছিলেন না, অথচ ঈশ্বর তখনও বিরাজিত ছিলেন। যেহেতু যীশু ঈশ্বর কর্তৃক সৃষ্ট সেকারণে তার সত্তা সীমাবদ্ধ, সুতরাং তিনি চিরন্তন হতে পারেন না। একমাত্র ঈশ্বরই চিরন্তন। যেহেতু যীশু সৃষ্ট প্রাণী, সে কারণে তিনিও অন্যান্য সকল যুক্তিবাদী প্রাণীর মতই পরিবর্তনশীল। একমাত্র ঈশ্বরই অপরিবর্তনীয়। এভাবে তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, যীশু ঈশ্বর ছিলেন না। অবিরাম যুক্তি সহকারে তার বক্তব্য পেশের পাশাপাশি তিনি বাইবেল থেকে অজস্র শ্লোক উদ্ধৃতি করতেন যেগুলোর কোথাও ত্রিত্ববাদের ব্যাপারে কোন উল্লেখই ছিল না। তিনি বলেন, যদি যীশু বলে থাকেন ‘আমার পিতা আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ’ তাহলে ঈশ্বর ও যীশু সমকক্ষ এ কথায় বিশ্বাস করার অর্থ বাইবেলের সত্যকে অস্বীকার করা। 

আঁরিয়াসের যুক্তিসমূহ অখণ্ডনীয় ছিল। তদুপরি তার বিরুদ্ধে ধর্মমতের বিরোধিতার অভিযোগ আনা হল। আর বিশপ আলেকজান্ডার তার অবস্থানের সুবাদে তাকে যাজক পদ থেকে বহিস্কার ও তাকে নির্বাসনে প্রেরণ করলেন। 

তবে আঁরিয়াসের অনুসারীর সংখ্যা এত বিপুল ছিল যে পলীয় চার্চ তাকে উপেক্ষা করতে পারেনি। বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলের অনেক বিশপই আলেকজান্ডারের জারি করা আদেশ মেনে নেয়নি। যে বিতর্ক ৩শ’ বছর ধরে টগবগ করে ফুটছিল তা এবার বিস্ফোরিত হল। পূর্বাঞ্চলের এত বেশি সংখ্যক বিশপ আঁরিয়াসকে সমর্থন করলেন যে আলেকজান্ডার রীতিমত সমস্যার সম্মুখীন হয়ে পড়েন। এ সব বিশপের প্রধান মিত্র ছিলেন নিকোমেডিয়ার ইউসেবিয়াস। তিনি ও আঁরিয়াস ছিলেন বন্ধু ও লুসিয়ানের ছাত্র যিনি তার পবিত্রতা ও জ্ঞানের জন্য সার্বজনীন মর্যাদার পাত্র ছিলেন। সম্ভবত: ৩১২ খৃষ্টাব্দে লুসিয়ানের হত্যার ঘটনা তাদের বন্ধুত্বকে আরো শক্তিশালী ও অভিন্ন ধর্ম বিশ্বাসে আরো দৃঢ় প্রত্যয়ী করেছিল। 

আলেকজান্ডার কর্তৃক নির্বাসিত হওয়ার পর আঁরিয়াস কনষ্টান্টিনোপলে ইউসেবিয়াসের কাছে একটি পত্র লেখেন। ইউসেবিয়াসের ব্যাপক প্রভাব ছিল। আর শুধু জনসাধারণের উপরই নয়, খোদ রাজ প্রসাদেও তার প্রভাব বিস্তৃত ছিল। যাইহোক, আঁরিয়াস তার পত্রে ইউসেবিয়াসকে বলেন: “আমরা নির্যাতিত হচ্ছি এ কারণে যেহেতু আমরা বলি যে, যীশু উদ্ভূত হয়েছিলেন; কিন্তু ঈশ্বর উদ্ভূত হননি, তিনি অনাদি।”

অন্যদিকে বিশপ আলেকজান্ডার আঁরিয়াস সম্পর্কে তার এক পত্রে লিখেছেন: তারা শয়তানের দ্বারা চালিত, শয়তান তাদের মধ্যে বাস করে এবং তাদেরকে উত্তেজিত করে; তারা ভেলকি জানে এবং প্রতারক, চতুর, জাদুকরের মত কথায় মোহাবিষ্ট করে, তারা হল দস্যু, নিজেদের আস্তানায় তারা দিনরাত খৃষ্টকে অভিশাপ দেয়... তারা শহরের চরিত্রহীন তরুণী রমণীদের মাধ্যমে লোকজনকে ধর্মান্তরিত করে।”
ইউসেবিয়াস বিশপ আলেকজাণ্ডারের মনোভাবে অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন। তিনি পূর্বাঞ্চলীয় বিশপদের এক সভা আহ্বানপূর্বক তাদের কাছে সম্পূর্ণ বিষয়টি উত্থাপন করেন। এ সমাবেশের ফল ছিল একটি পত্র যা পূর্ব ও পশ্চিমের সকল বিশপের কাছে প্রেরণ করা হয়। পত্রে তাদেরকে আঁরিয়াসকে চার্চে ফিরিয়ে নিতে আলেকজান্ডারকে রাজি করাতে অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু আলেকজান্ডার আঁরিয়াসের পূর্ণ আত্মসমর্পণ চাইলেন। এসময় আঁরিয়াস ফিলিস্তিনে ফিরে আসেন ও তার অনুসারীদের নিয়ে প্রার্থনা সমাবেশ করতে থাকেন। 

এসময় ইউসেবিয়াসের সমালোচনা করে আলেকজান্ডার “তার ক্যাথলিক চার্চের সহযোগী কর্মীদের” কাছে দীর্ঘ এক পত্র লেখেন যাতে তিনি অভিযোগ করেন এই বলে যে, “তিনি মনে করেন যে তার সম্মতির উপরই চার্চের কল্যাণ নির্ভর করে। "তিনি আরো বলেন, "ইউসেবিয়াস আঁরিয়াসকে সমর্থন করেন, আর তা শুধু তিনি যে আঁরিয়াসের মতবাদে বিশ্বাস করেন সে জন্যেই নয়, এর পিছনে রয়েছে তার নিজস্ব উচ্চাকাঙ্খা জনিত স্বার্থ।" এভাবে যাজকদের মধ্যকার বিরোধ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিশপদের মধ্যে ব্যক্তিগত বিরোধের রূপ গ্রহণ করে। 

এ বিষয়টি নিয়ে বিশপদের পর্যায় থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিভিন্ন প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়ে। নাইসিয়ার গ্রেগরী (Gregory of Nyssea) লিখেছেন: রাস্তা-ঘাট, বাজার, মুদ্রা ব্যবসায়ীদের দোকান, খাবার দোকানসহ কনষ্টান্টিনোপলের সর্বত্রই তাদের নিয়ে আলোচনা চলছিল। একজন দোকানিকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় যে অমুক জিনিসের মূল্য কত, সে তার জবাব দেয় উদ্ভূত সত্তা ও উদ্ভূত নয় এমন সত্তা সম্পর্কে জানতে চেয়ে। রুটিওয়ালার কাছে রুটির দাম জানতে চাইলে সে বলে, “পুত্র তার পিতার বান্দা”; চাকরকে যদি জিজ্ঞাসা করা যায় যে গোসলখানা তৈরি করা হয়েছে কিনা, সে জবাব দেয়: "পুত্র কোন কিছু থেকে উদ্ভূত হয়নি।" ক্যাথলিকরা ঘোষণা করেছে, “জন্মলাভকারীই শ্রেষ্ঠ” এবং আঁরিয়াসরা বলছে: “তিনিই শ্রেষ্ঠ যিনি জন্মদান করেছেন।”

লোকে রমণীদের কাছে জিজ্ঞাসা করত যে কোন পুত্র জন্মগ্রহণ করার আগে তার অস্তিত্ব থাকতে পারে কি? যাজক মহলের উচ্চ পর্যায়েও এ বিতর্ক ছিল সমানভাবে উত্তপ্ত ও তিক্ত। জানা যায় যে  "প্রতিটি শহরেই বিশপরা বিশপদের সাথে একগুঁয়ে বিরোধে লিপ্ত ছিল। জনসাধারণ ছিল জনসাধারণের বিপক্ষে... এবং তারা পরস্পরের সাথে সহিংস সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল।" 

সম্রাট কনষ্টানটাইন বিষয়টি অবহিত ছিলেন। ঘটনাবলী ক্রমশই অবনতির দিকে যাচ্ছিল। তিনি হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হলেন এবং আলেকজান্ডার ও আঁরিয়াস উভয়ের উদ্দেশ্যে একটি পত্র প্রেরণ করলেন। এতে তিনি বললেন যে, ধর্মীয় মতামতের ঐক্য তিনি একান্তভাবে কামনা করেন যেহেতু সাম্রাজ্যে শান্তির জন্যে সেটাই হল সর্বোত্তম গ্যারান্টি। উত্তর আফ্রিকার ঘটনাবলীতে গভীরভাবে হতাশ হয়ে তিনি "প্রাচ্যের হৃদয়ের" (Bosom of East) কাছ থেকে উত্তম কিছু আশা করলেন যেখানে "ঐশ্বরিক আলোর প্রভাতের" (Dawn of Divine Light) উদয় ঘটেছিল। 

তিনি লিখেছেন: কিন্তু হায় গৌরবময় ও পবিত্র ঈশ্বর! শুধু আমার কান নয়, আমার হৃদয়ও ক্ষত-বিক্ষত, যখন আমি শুনতে পেলাম যে আপনার মধ্যে যে বিরোধ ও দলাদলি বিদ্যমান তা এমন কি আফ্রিকার চাইতেও মারাত্মক; সুতরাং আপনারা, যাদের আমি অন্যদের বিরোধ নিরসনের দৃষ্টান্ত হিসেবে আশা করি, তাদের চেয়ে আরো খারাপ হওয়ার আগেই এর প্রতিকার হওয়া প্রয়োজন এবং এখনো, এই আলোচনার মূল কারণ সম্পর্কে সতর্ক অনুসন্ধান করার পর আমি দেখতে পেয়েছি যে, তা একেবারেই তাৎপর্যহীন এবং এ ধরনের বিবাদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ যুক্তিহীন।

আমার অনুমান যে, বর্তমান বিতর্কের উৎপত্তি ঘটেছে এভাবে: যখন আপনি, আলেকজান্ডার, প্রতিটি যাজককে জিজ্ঞাসা করলেন যে পবিত্র গ্রন্থের কতিপয় অংশ সম্পর্কে তিনি কি ভাবেন অথবা তিনি একটি অর্থহীন বোকামিপূর্ণ প্রশ্নের একটি বিশেষ দিক সম্পর্কে কি চিন্তা করেন; এবং আপনি, আরিয়াস, যথাযথ বিবেচনা ছাড়াই এমন সব কথা বললেন যা কখনো প্রকাশই পায়নি অথবা পেলেও নীরবেই তার বিলুপ্তি ঘটেছে, আপনাদের মধ্যে ভিন্নমত দেখা দিল। যোগাযোগ ছিন্ন হল এবং অধিকাংশ লোক দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল, তারা আর অভিন্ন হিসেবে ঐক্যবদ্ধ রইল না।

এরপর সম্রাট তাদের উভয়কেই অবান্তর প্রশ্ন ও হঠকারী জবাব বিস্মৃত হওয়ার সনির্বন্ধ অনুরোধ জানান: বিষয়টি আদতে কখনোই উত্থিত হওয়ার যোগ্য ছিল না, কিন্তু অলস লোকদের করার মত বহু অপকর্ম থাকে এবং অলস মস্তিষ্কগুলো এ চিন্তাই করে। আপনাদের মধ্যে যে মতপার্থক্য বা বিরোধ তা পবিত্রগ্রন্থ ভিত্তিক কোন যাজকের ধর্মমত নয়, কিংবা তা নয়া প্রবর্তিত কোন মতবাদের কারণে নয়। আপনারা উভয়েই একই প্রকার এবং অভিন্ন মত পোষণ করেন। সুতরাং আপনাদের মধ্যে পুনর্মিলন সহজেই সম্ভব। 

সম্রাট এ পত্রে পৌত্তলিক দার্শনিকদের উদাহরণ দেন যারা একই প্রকার বিশদ সাধারণ নীতিমালা ধারণের ক্ষেত্রে মতপার্থক্য পোষণে সম্মত হয়েছিলেন। সেক্ষেত্রে, তিনি প্রশ্ন করেন, নিছক তুচ্ছ ও মৌখিক মতপার্থক্যের কারণে খৃষ্টান ভাইদের একে অপরের সাথে শত্রুর মত আচরণ করা কি ঠিক? তাঁর মতে, এ ধরনের আচরণ: রুচিহীন, শিশুসূলভ ও বদমেজাজি ও দুর্ভাগা ঈশ্বরের যাজকগণ এবং বোধ সম্পন্ন ব্যক্তিগণ... এটা হল শয়তানের ছলনা ও প্রলোভন। এ ব্যাপারে আসুন আমরা কিছু করি। আমরা সবাই যদি সকল বিষয়ে এক রকম ভাবতে নাও পারি, অন্তত বড় বিষয়গুলোতে আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারি। পবিত্র ঐশ্বরিক সত্তা প্রসঙ্গে আসুন সবাই একই বিশ্বাস এক উপলব্ধি পোষণ এবং ঈশ্বর প্রসঙ্গে এক ও অভিন্ন মত অবলম্বন করি। 

পত্রে এ বলে উপসংহার টানা হয়: যদি তা না হয়, তাহলে আমার সেই শান্তিপূর্ণ ও সমস্যামুক্ত রাতগুলো ফিরিয়ে দিন যাতে আমি আমার আনন্দ এবং শান্তিপূর্ণ জীবনের উৎফুল্লতা লাভ করতে পারি। তা যদি না হয় তাহলে আমি অবশ্যই যন্ত্রণা কাতর ও অশ্রুসিক্ত হব এবং মৃত্যু পর্যন্ত আমি কোন শান্তি পাব না। যেখানে ঈশ্বর প্রেমীগণ, আমার সহকর্মী সেবকগণ এ ধরনের বেআইনি ও ক্ষতিকর বিতর্কে লিপ্ত সেখানে আমি কীভাবে মনে শান্তি পাব?

এ পত্র শুধু খৃষ্টধর্ম সম্পর্কেই নয়, অন্যান্য ধর্ম সম্পর্কেও সম্রাটের চরম অজ্ঞতার পরিচয় বহন করে যেহেতু তিনি মনে করতেন যে, একজন মানুষ যেভাবে খুশি ঈশ্বরের উপাসনা করুক অথবা ঈশ্বর নির্দেশিত পন্থায়ই উপাসনা করুক, তা একই ব্যাপার। কার্যত: তার কাছে আলেকজান্ডার ও আঁরিয়াসের মধ্যকার বিরোধ ছিল নেহায়েতই মৌখিক বিবাদ অথবা এক তাৎপর্যহীন এবং অপ্রয়োজনীয় তুচ্ছ বিষয়। একদিকে এক ঈশ্বরে বিশ্বাস অন্যদিকে ত্রিত্ববাদে বিশ্বাস এর মধ্যে তার দৃষ্টিতে মৌলিক কোন বিরোধ ছিল না। 

কর্দোবার হোসিয়াস এ পত্র আলেকজান্দ্রিয়ায় বয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। অল্প কয়েকদিন অবস্থানের পর তিনি তার মিশনের ব্যর্থতা সম্পর্কে সম্রাটকে জ্ঞাত করার জন্যে শূন্য হাতে ফিরে এলেন। 

একদিকে যখন এসব ঘটনা ঘটে চলেছিল, অন্যদিকে কনষ্টানটাইন তার ভগ্নিপতি লিসিনাসের (Licinus) সাথে যুদ্ধ ক্ষেত্রে লড়াই করছিলেন। যুদ্ধে লিসিনাস নিহত হন। এসময় কনষ্টানটাইন উপলব্ধি করলেন যে, একটি যুদ্ধে জয়লাভ করলেও শান্তি হারানো সম্ভব। 

হোসিয়াসের (Hosius) মিশনের ব্যর্থতার পর প্রাচ্যের পরিস্থিতি গোলযোগপূর্ণ হয়ে পড়েছিল। আঁরিয়াসের বাণী ও যুক্তির পরিণতি হল আলেকজান্দ্রিয়ায় রক্তপাত। সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চল বা প্রাচ্যের সর্বত্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। ইতিপূর্বেই উত্তর আফ্রিকায় বিশৃঙ্খলা ও গোলযোগ ছিল। এ পর্যায়ে সম্রাট উপলব্ধি করেন যে তার পলীয় চার্চের বন্ধুগণ তার কোন সমস্যাই মিটিয়ে দেওয়ার মত শক্তিশালী নয়। উত্তর আফ্রিকার বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি শিক্ষা লাভ করেছিলেন তা হল: প্রকাশ্যে কোন পক্ষ সমর্থন করা তার উচিত নয়। তাই তিনি আহ্বান করার সিদ্ধান্ত নেন। একজন পৌত্তলিক হিসেবে তার অবস্থান তাকে এক বিরাট সুযোগ এনে দিয়েছিল। যেহেতু তিনি বিবাদমান কোন সম্প্রদায়েরই অনুসারী নন, সে কারণে তিনি একজন নিরপেক্ষ বিচারক হতে পারবেন। তার ধারণা হল, এর ফলে তখন পর্যন্ত বিশপরা যে সমস্যার সম্মুখীন ছিলেন, তা নিরসন হবে। কারণ এ ধরনের একটি বিষয়ের নিষ্পত্তিকারী হিসেবে একজন খৃষ্টানের সভাপতিত্বের বিষয়টি মেনে নেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। কনষ্টানটাইনের নেতৃত্বে বিশপদের এ সভাটি আজ কাউন্সিল অব নিকাইয়া (Council of Nicea) হিসেবে পরিচিত। 

সভার জন্যে আমন্ত্রণ লিপি প্রেরণ করা হল। কনষ্টানটাইন রাজকীয় কোষাগার থেকে এর সকল ব্যয়ভার বহন করা হয়। দু’বিবদমান পক্ষে নেতৃবৃন্দ ছাড়া অন্য যাদের আমন্ত্রণ জানানো হল তারা সার্বিকভাবে তেমন জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন না। ডোনাটাসের প্রধান বিরোধী কেসেলিয়ানকে এ সভায় আমন্ত্রণ জানানো হলেও ডোনাটাসের চার্চের কাউকেই আমন্ত্রণ করা হয়নি। সভায় অংশগ্রহণকারী গুরুত্বপূর্ণ বিশপগণ হলেন: কায়সারিয়ার ইউসেবিয়াস, নিকোমেডিয়ার ইউসেবিয়াস, এথানাসিয়াস, হোসিয়াস। এ ছাড়াও কাউন্সিলে এমন সব ব্যক্তি ছিলেন যারা ধর্মনিষ্ঠার জন্যে খ্যাতিমান হলেও জ্ঞানের জন্যে খ্যাতিমান ছিলেন না। যেমন- স্পিরিডেম (Spyridon), পাটামন, ওসিয়াস, নিকোলাসের মাইজার ইত্যাদি।

এভাবে দেখা যায়, নিকাইয়ার পরিষদ বেশির ভাগ সেসব বিশপদের নিয়েই গঠিত হয়েছিল যারা একান্ত ধর্মনিষ্ঠ ছিলেন, কিন্তু মূল বিষয়ে পর্যাপ্ত বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান তাদের ছিল না। এ সকল লোককে হঠাৎ করে সেকালের গ্রীক দর্শনের চটপটে ও অত্যন্ত জ্ঞানী ব্যাখ্যা তাদের মুখোমুখি করা হয়েছিল। তাদের প্রকাশ ভঙ্গি ছিল এমন যে কী বলা হচ্ছে তার তাৎপর্য বুঝে ওঠা এসব বিশপের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তারা তাদের জ্ঞানের যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা দিতে অপরাগ হয়ে অথবা তাদের বিরোধীদের সাথে বিতর্কে অক্ষম হয়ে তাদের নিজেদের বিশ্বাসে স্থিত হয়ে চুপ করে থাকা অথবা সম্রাটের সিদ্ধান্তের সাথে একমত হওয়া ছাড়া তাদের আর কিছু করার ছিল না।

সভা শুরু হওয়ার কয়েকদিন আগেই সকল প্রতিনিধি নিকাইয়া পৌঁছেন। তারা ছোট ছোট দলে জড় হতেন এবং তাদের মধ্যে আসন্ন সভার বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে বিতর্ক হত। এসব সমাবেশে, যা সাধারণত জিমনেসিয়াম বা খোলা আকাশের নীচে অনুষ্ঠিত হত, গ্রীক দার্শনিকগণ তাদের যুক্তির বাণ ছুঁড়ে দিতেন এবং ব্যঙ্গ্য-বিদ্রুপ করতেন তবে তা আগত প্রতিনিধিদের বিভ্রান্ত করত না। 

অবশেষে নির্দিষ্ট দিনটি এল। প্রত্যেকেই সভায় উপস্থিত হলেন। সম্রাট সভা উদ্বোধন করবেন। প্রাসাদের একটি বিশাল কক্ষ সভার জন্যে নির্ধারণ করা হয়। কক্ষের মাঝখানে টেবিলে সেকালের সকল জ্ঞাত গসপেলের কপি সমূহ রাখা হয়ে ছিল। সেগুলোর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩শ’। প্রত্যেকের দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল চমৎকার সাজে সজ্জিত কাঠের তৈরি রাজসিংহাসনের দিকে। সিংহাসনটি স্থাপন করা হয়েছিল পরস্পরের দিকে মুখ করে সন্নিবিষ্ট দু’সারি আসনের মধ্যে, কক্ষের উঁচু হয়ে উঠে যাওয়া দিকের শেষ প্রান্তে। কক্ষের মধ্যে গভীর নীরবতা বিরাজ করছিল। এসময় রাজদরবারের কর্মকর্তারা একে একে আসতে শুরু করলেন। শেষ মুহূর্তে কোন ঘোষণা ছাড়াই সম্রাট এসে হাজির হলেন। সভায় আগত সমবেত প্রতিনিধিরা উঠে দাঁড়ালেন এবং প্রথমবারের মত তারা সম্রাট কনষ্টানটাইনের প্রতি সবিস্ময় দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে লাগলেন। 

তিনি ছিলেন সম্রাট কনষ্টানটাইন, বিজয়ী, মহান, শ্রেষ্ঠ। তার দীর্ঘ দেহ, সুগঠিত শরীর, প্রশস্ত কাঁধ এবং সুদর্শন মুখায়বর তার উচ্চ মর্যাদার সাথে সংগতিপূর্ণ ছিল। তার অভিব্যক্তি দেখে তাকে অবিকল রোমান সূর্যদেবতা অ্যাপোলোর মত মনে হচ্ছিল। বিশপদের অনেকেই তার ঝলমলে জমকাল রাজ পোশাক দেখে বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়েন। তার দীর্ঘ চুলে ঢাকা মাথায় ছিল মনিমুক্তা খচিত রাজমুকুট। তার উজ্জ্বল লাল রঙ্গের আলখেল্লা ছিল মূল্যবান পাথর ও সোনার কারুকাজ খচিত। তার পায়ে ছিল টকটকে লাল রঙের জুতা যা সেকালে শুধুমাত্র সম্রাটরাই পায়ে দিতেন এবং এ কালে শুধুমাত্র পোপই তা পরেন। 

নিকাইয়ার সম্মেলন।
সম্রাটের দু’পাশে আসীন ছিলেন হোসিয়াস ও ইউসেবিয়াস। ইউসেবিয়াস সম্রাটের উদ্দেশ্যে বক্তৃতার মাধ্যমে সভার কার্যক্রম শুরু করলেন। সম্রাট সংক্ষিপ্ত ভাষণের মধ্যে দিয়ে তার জবাব দিলেন। তার ভাষণ ল্যাটিন থেকে গ্রীক ভাষায় অনুবাদ করা হয় যা অল্প লোকেই বুঝতে সক্ষম হয়েছিল। এমনকি সম্রাট নিজেও তা তেমন বুঝতে পারেননি। কারণ গ্রীক ভাষায় তার জ্ঞান ছিল অতি সামান্য। সভার কাজ যতই অগ্রসর হতে থাকল, বিতর্কের তোরণদ্বার তত উন্মুক্ত হতে শুরু করল। কনষ্টানটাইন তার ভাঙ্গা ভাঙ্গা গ্রীক জ্ঞান নিয়ে একটা বিষয়েই তার সকল শক্তি নিয়োজিত করলেন। তাহল, একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছা। তিনি প্রত্যেককে জানিয়ে দিলেন যে বিভিন্ন দলের কাছ থেকে কয়েকদিন আগে তিনি যত অভিযোগ আবেদন পেয়েছিলেন তার সবই তিনি পুড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি আশ্বস্ত করলেন যে, যেহেতু তিনি সেগুলোর কোনটিই পড়েননি, সেহেতু তার মন খোলা রয়েছে এবং তিনি পক্ষপাতদুষ্ট নন। 

পলীয় চার্চের প্রতিনিধিগণ ঈশ্বরের ৩টি অংশ প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তারা বাইবেল থেকে মাত্র দু’জনের পক্ষে যুক্তি পেশ করতে সক্ষম হন। তা সত্ত্বেও ‘পবিত্র আত্মা’ কে ঈশ্বরের তৃতীয় অংশ তথা তৃতীয় ঈশ্বর হিসেবে ঘোষণা করা হয় যদিও এ কল্পিত বিষয়ের সমর্থনে কোন যুক্তি প্রদর্শন করা হয়নি। অন্যদিকে লুসিয়ানের শিষ্যরা তাদের ভিত্তি সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন এবং তারা ত্রিত্ববাদীদের একটি অসম্ভব অবস্থান থেকে অন্য অবস্থানে যেতে বাধ্য করেন। 

ত্রিত্ববাদীরা একজন খৃষ্টানের যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে চাইছিল, আঁরিয়াস ও অন্যান্য একত্ববাদী সমর্থকদের বাদ দিয়ে সে সংজ্ঞা নির্ধারণে সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষ করে ত্রিত্ববাদ যাকে তারা দু’পক্ষের মধ্যে প্রধান বিতর্কিত বিষয় বলে গুরুত্ব আরোপ করেছিল, প্রকৃতপক্ষে কোন গসপেলেই তার উল্লেখ ছিল না। তাদের বক্তব্য ছিল যে তারা যাকে 'পুত্র' হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি ঈশ্বরের পুত্র। আঁরিয়াস পন্থীরা তার জবাবে বলে যে তারা সকলেই ‘ঈশ্বরের পুত্র’, কারণ বাইবেলে লেখা আছে যে, “সকল কিছুই ঈশ্বর থেকে।” এ যুক্তি ব্যবহার করা হলে সকল সৃষ্টিরই ঈশ্বরত্ব প্রমাণিত হয়। পলীয় বিশপগণ তখন যুক্তি উত্থাপন করেন যে যীশু শুধু ‘ঈশ্বর হতে’ নন, ‘ঈশ্বরের সত্তা থেকেও।’ এ যুক্তি সকল সনাতনপন্থী খৃষ্টানের বিরোধিতার সম্মুখীন হয়। তারা বলেন, বাইবেলে এ ধরনের কোন কথাই নেই। এভাবে যীশুকে ঈশ্বর প্রতিপন্ন করার চেষ্টা খৃষ্টানদের ঐক্যবদ্ধ করার পরিবর্তে তাদের মধ্যে আরো বিভক্তি সৃষ্টি করে। বেপরোয়া হয়ে ত্রিত্ববাদীরা তখন যুক্তি প্রদর্শন করে যে বাইবেলে বলা হয়েছে যে “যীশু হলেন পিতা ও সত্য ঈশ্বরের চিরন্তন ভাবমূর্তি।” আঁরিয়াস পন্থীরা তার জবাবে বলেন, বাইবেলে একথাও বলা হয়েছে যে “আমরা মানবগণ ঈশ্বরের ভাবমূর্তি ও গৌরব।” যাহোক, এ যুক্তি যদি গৃহীত হয় তাহলে প্রমাণিত হয় শুধু যীশুই নয়, সকল মানুষই ঐশ্বরিক বলে দাবি করতে পারে। 

সভাকক্ষেই শুধু নয়, রাজপ্রাসাদের মধ্যেও আলোচনা চলতে থাকে। এভাবে সভায় যার শুরু হয়েছিল তা রাজ প্রাসাদ পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। সম্রাটের মাতা হেলেনা পলীয় চার্চকে সমর্থন করে বসেন। অন্যদিকে সম্রাটের বোন কনষ্টানটিনা আঁরিয়াসকে সমর্থন করলেন। কনষ্টানটিনা তার ভ্রাতা সম্রাট কনষ্টানটাইনের সাথে যুদ্ধে তার স্বামী প্রাণ হারালে রাজপরিবারে ফিরে এসেছিলেন। যাহোক, বিতর্ক রাজ দরবারেও ছড়িয়ে পড়ে এবং তাতে রাজপুরুষ এমনকি প্রাসাদের পাচকগণও এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এদিকে সুকৌশলে সম্রাট দু’পক্ষ থেকে দূরত্ব বজায় রাখেন এবং সবাইকে আঁচ-অনুমানের মধ্যে রাখেন। একজন পৌত্তলিক হিসেবে তিনি খৃষ্টানদের কোন সম্প্রদায়েরই পক্ষে ছিলেন না। এটি ছিল তার পক্ষে এক জোরালো যুক্তি। 

বিতর্ক চলতে থাকা অবস্থায় উভয় পক্ষের কাছেই স্পষ্ট হয়ে উঠে যে এ সভায় কোন সুস্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। তা সত্ত্বেও তারা সম্রাটের সমর্থনের প্রত্যাশা করলেন যেহেতু পলীয় চার্চের জন্যে সেটা ছিল শক্তি বৃদ্ধির ব্যাপার। অন্যদিকে উত্তর আফ্রিকাবাসীদের জন্যে সম্রাটের সমর্থন লাভের অর্থ ছিল তাদের নিপীড়নের অবসান। 

রাজকুমারী কনষ্টানটিনা ইউসেবিয়াসকে পরামর্শ দিলেন যে সম্রাট একটি ঐক্যবদ্ধ চার্চ চান। কারণ খৃষ্টান সম্প্রদায়ের বিভক্তি সাম্রাজ্যকে বিপদগ্রস্ত করবে। কিন্তু যদি কোন ঐকমত্য না হয় তা হলে তিনি ধৈর্য হারাবেন এবং খৃষ্টানদের প্রতি তার সমর্থন প্রত্যাহার করবেন। যদি তিনি সেপন্থাই গ্রহণ করেন তা হলে খৃষ্টানদের পরিস্থিতি আগের চেয়েও খারাপ হবে এবং খৃষ্টান ধর্মও অধিকতর বিপন্ন হবে। এদিকে কনষ্টানটাইনের আনুকূল্য লাভের জন্যে উপস্থিত সকল বিশপ ধর্মের কিছু পরিবর্তন সাধনে এমনিতে সম্মত ছিলেন। আর তাই ইউসেবিয়াসের পরামর্শক্রমে আরিয়াস ও তার অনুসারীরা নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করলেন। যেহেতু সেসময় সাম্রাজ্যের সর্বত্র রোমান সূর্যদেবতার উপাসনা অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল এবং সম্রাটকে পৃথিবীতে দেবতার রূপ হিসেবে গণ্য করা হত, এ প্রেক্ষিতে পলীয় চার্চ :
  • রোমান সূর্য-দিবস (Sunday)-কে খৃষ্টানদের সাপ্তাহিক ধর্মীয় দিবস ঘোষণা করল;
  • সূর্য-দেবতার প্রচলিত জন্মদিবস ২৫ডিসেম্বরকে যীশুর জন্মদিবস(Christmas Day)হিসেবে গ্রহণ করল;
  • সূর্য-দেবতার প্রতীক আলোর ক্রুশকে (Cross of Light)খৃষ্টবাদের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করল; এবং
  • সূর্য-দেবতার জন্মদিবসের সকল উৎসব অনুষ্ঠানকে নিজেদের উৎসব অনুষ্ঠান হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নিল। 
খৃষ্টধর্ম এবং তার সাম্রাজ্যের ধর্মের মধ্যকার বিপুল ব্যবধান অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস পাওয়ার এ ঘটনা সম্রাট কনষ্টানটাইনের জন্যে নিশ্চয়ই অত্যন্ত সন্তোষজনক মনে হয়েছিল। চার্চ তার ইচ্ছানুযায়ী কাজ করে। ফলে চার্চের প্রতি তার সমর্থন আগে দুর্বল থাকলেও এখন তা অত্যন্ত জোরালো হয়ে ওঠে।
চূড়ান্ত ভাবে ত্রিত্ববাদ খৃষ্টানধর্মের মৌলিক মতবাদ হিসেবে গৃহীত হয়। এ পর্যায়ে সম্ভবত এই মতবাদের কিছু অনুসারীর তখনও সরাসরি একত্ববাদের অভিজ্ঞতা ও তার প্রতি সমর্থন বিদ্যমান ছিল। তাদের জন্যে ত্রিত্ববাদ সেই পন্থার চেয়ে কম কিছু ছিল না যে পন্থায় তারা যা প্রত্যক্ষ করেছিল তা বর্ণনার চেষ্টা করত। যেহেতু যীশু যে এক ঈশ্বরের শিক্ষা দিয়েছিলেন তা তখন বিলুপ্ত হয়েছিল, তাই তারা শেষ পন্থা হিসেবে প্লাটোনিক দর্শনের পরিভাষা ব্যবহার করতে শুরু করেছিল যদিও তা তাদের উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে পর্যাপ্ত ছিল না। কার্যত এ-ই ছিল তাদের সব যা তারা জানত। যা হোক, এ বিষয়টি সামান্য কিছু লোকের কাছেই স্পষ্ট ছিল। এপুলিয়াস (Apuleius) লিখেছেন, “আমি নীরবে এই মহিমান্বিত ও প্লাটোনিক মতবাদ উপেক্ষা করেছিলাম। কারণ সামান্য কিছু ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিই এটা বুঝেছিলেন, অন্যদিকে প্রতিটি সাধারণ মানুষের কাছেই তা অজ্ঞাত ছিল।” 
প্লাটো বলেন, “স্রষ্টাকে খোঁজা কঠিন, কিন্তু নিম্নশ্রেণির লোকদের কাছে তা ব্যাখ্যা করা অসম্ভব।”  
পিথাগোরাস বলেন, “কু-সংস্কারাচ্ছন্ন মতের মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের কথা বলা নিরাপদ নয়। তাদের কাছে সত্য বা মিথ্যা বলা সমান বিপজ্জনক।”

যারা এক ঈশ্বরের বৈশিষ্ট্য প্রকাশের চেষ্টা করেছিলেন তাদের কারো কারো কাছে যদিও এ পরিভাষার ব্যবহার যৌক্তিক বলেই গণ্য ছিল, কিন্তু কার্যত: এ প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এমন কোন পন্থা ছিল না যাতে ‘দেবতাগণ’ এর গ্রীক ধারণা যীশুর কাছে প্রত্যাদেশকৃত ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বকে সফলভাবে খর্ব করতে পারে। এ ধরনের কোন ঘটনা শুধুমাত্র পল ও তার অনুসারীদের পক্ষেই কল্পনা করা সম্ভব ছিল। যারা গ্রীক দর্শনের আদর্শ হৃদয়ংগম করতে পারেনি তাদের মধ্যে শুধু বিভ্রান্তিরই সৃষ্টি হয়েছিল। আসলে ত্রিত্ববাদের সংস্পর্শে যারা এসেছিল, তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের অবস্থাই ছিল এ রকম। তারা যে বিভ্রান্তিতে পতিত হয়েছিল তা নানা জল্পনা কল্পনার সৃষ্টি করেছিল। সভা নিজে থেকেই তাদের সুস্পষ্টভাবে এ পথে ঠেলে দিয়েছিল। এ মতবাদ কীভাবে উদ্ভূত এবং কেন তা গৃহীত হল, কি করে অনানুষ্ঠানিক ভাবে অনুমোদিত হল, তা বোধগম্য। এটাও পরিষ্কার যে এ মতবাদের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তির প্রেক্ষিতে আরিয়াস কেন পথ নির্দেশনার জন্যে গ্রীক দার্শনিকদের চিন্তাধারার আশ্রয় নেয়ার বদলে খৃষ্টধর্মের উৎসের কাছে ফিরে যাবার উপর গুরুত্ব প্রদান করেছিলেন। কারণ গ্রীক দর্শন নবী যীশুর উপর প্রত্যাদেশ থেকে উদ্ভূত ছিল না। 

নিকাইন ধর্মমত।
আজ যা নিকাইন ধর্মমত (Nicene Creed) নামে পরিচিত তা সম্রাট কনষ্টানটাইনের সমর্থনে সভায় উপস্থিতদের দ্বারা প্রণীত ও সত্যায়িত। এতে ত্রিত্ববাদীদের মতই স্থান পেয়েছিল এবং আঁরিয়াসের শিক্ষার সরাসরি প্রত্যাখ্যান হিসেবে নিম্নোক্ত দৈব অভিশাপ সংযুক্ত করা হয়েছিল। 

যারা বলে, "এক সময় তিনি ছিলেন না এবং জন্মের পূর্বে তিনি অস্তিত্বশীল ছিলেন না এবং তিনি কোন কিছু থেকে অস্তিত্বশীল হননি" অথবা যারা বলে যে "ঈশ্বরের পুত্র ভিন্ন সত্তা বা উপাদান অথবা তিনি সৃষ্ট হয়েছেন অথবা পরিবর্তনের উপযোগী" তাদের জন্যে ক্যাথলিক চার্চের অভিশাপ। 

যারা এ ধর্মমতে স্বাক্ষর করেছিলেন, তাদের কেউ কেউ এতে বিশ্বাসী ছিলেন, কেউ কেউ জানতেন না যে কিসে তারা তাদের নাম স্বাক্ষর করেছেন, এবং কিছু ব্যক্তি, যারা সভার প্রতিনিধিদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন, তারা ত্রিত্ববাদের সাথে একমত হতে পারেননি, কিন্তু তারা অনিচ্ছা সত্ত্বেও সম্রাটকে খুশি করার জন্যে এতে স্বাক্ষর করেন। তাদের একজন বলেন, “একটু কালির বিনিময়ে প্রাণরক্ষা মোটেই খারাপ নয়।” 

এরাই ছিল সেসব লোক যারা একজন পৌত্তলিক সম্রাটের অধীনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল যে একজন গোঁড়া খৃষ্টানের পরীক্ষা কি হবে। এর ফল ত্রিত্ববাদীদের জন্য যেমন তেমনি আঁরিয়াসপন্থীদের জন্যও অত্যন্ত বিস্ময়কর হয়েছিল। ঘটনা কোন দিকে মোড় নেবে তা কারোরই জানা ছিল না। সার্বজনীন পরীক্ষা গ্রহণের ধারণাটি ছিল এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। কেউই তা পছন্দ করেনি। তদুপরি আঁরিয়াসবাদের সরাসরি নিন্দা ছিল এক মারাত্মক পদক্ষেপ। এমনকি যারা ধর্মমতের সত্যায়নে সম্মতি জ্ঞাপন করেছিল তারাও সন্দেহের সাথেই তা করেছিল। পবিত্র গ্রন্থে ছিল না এবং যীশু বা তার শিষ্যদের দ্বারা ব্যক্ত বা উল্লেখিত নয়, এমন একটি শব্দের সমর্থনে স্বাক্ষর করতে হয়েছে। বহু ঢাকঢোল পিটিয়ে তোড়জোড় করে যে সভার আয়োজন করা হয়েছিল বাস্তবে তা কিছু অর্জন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। 

একজন মাত্র ব্যক্তি জানতেন যে তিনি কি করছেন। তিনি হলেন সম্রাট কনষ্টানটাইন। তিনি জানতেন যে দৃঢ় বিশ্বাস নয়, ভোটের উপর ভিত্তি করে দাঁড় করানো একটি ধর্মমতকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করা হবে না। কোন ব্যক্তি ঈশ্বরে বিশ্বাস করতে পারে, কিন্তু তাকে গণতান্ত্রিক পন্থায় নির্বাচিত নাও করতে পারে। তিনি জানতেন কীভাবে ও কেন বিশপগণ ধর্মমতের ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছেন। তিনি বিশপদের তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্বাক্ষর দিতে বাধ্য করেছেন এমন ধারণা সৃষ্টি না করার ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্প ছিলেন। সুতরাং সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে সভার সিদ্ধান্তের প্রতি ঈশ্বরের সমর্থন ও অনুমোদন প্রমাণের জন্যে ঈশ্বরের অলৌকিক ক্ষমতার আশ্রয় নেয়া হবে। 

সভার শুরুতে এনে জড়ো করা যীশুর শিক্ষার লিখিত বিবরণ গসপেলের বিশাল স্তূপ তখনও সভাকক্ষের মধ্যখানে রাখা ছিল। একটি সূত্রমতে, সেখানে সেসময়ে ২৭০টি গসপেল রাখা ছিল। অন্য একটি সূত্রমতে বিভিন্ন ধরনের গসপেলের সংখ্যা ছিল ৪০০০ এর মত। গসপেলে খুঁজে পাওয়া যায় না এমন সব ধারণা সম্বলিত এবং কোন কোন ক্ষেত্রে গসপেলের সাথে সরাসরি বিরোধমূলক একটি ধর্মীয় মতবাদ প্রণয়ন ও প্রচলন কিছু লোককে যেমন বিভ্রান্ত করেছিল অন্যদিকে গসপেলসমূহের বিদ্যমানতা অন্যদের জন্য খুবই অসুবিধাজনক ছিল। 

এ প্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, সকল গসপেল সভাকক্ষে একটি টেবিলের নীচে রাখা হবে। তারপর সকলেই কক্ষ ত্যাগ করবে এবং তা তালাবদ্ধ করা হবে। এখন যে গসপেলটি সঠিক সেটা যাতে টেবিলের উপর চলে আসে তার জন্য সারারাত ধরে প্রার্থনা করার জন্যে বিশপদের নির্দেশ দেওয়া হল। 

সকাল বেলা দেখা গেল, আলেকজান্ডারের প্রতিনিধি এথানাসিয়াসের কাছে গ্রহণযোগ্য গসপেলটি টেবিলের উপর স্থাপিত রয়েছে। এ ঘটনায় টেবিলের নীচে থাকা অন্যান্য সকল গসপেল পুড়িয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে সেই রাতে সভাকক্ষের তালার চাবি কার কাছে ছিল, সে ব্যাপারে কিছু জানা যায় না। 

এরপর অননুমোদিত গসপেল কাছে রাখা গুরুতর অপরাধে পরিণত হয়। এর পরিণতিতে পরবর্তী বছরগুলোতে ১০ লাখেরও বেশি খৃষ্টান নিহত হয়। এথানাসিয়াস যে কীভাবে খৃষ্টানদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন, এ থেকেই তা বুঝা যায়।

নিকাইয়ার সভা থেকে প্রত্যাবর্তনের পর বিশপগণ তাদের পুরোনো বিরোধকে জাগিয়ে তুললেন যা তারা সম্রাট কর্তৃক আহূত হয়ে পরিত্যাগ করেছিলেন। লড়াই শুরু হয়, পুরোনো বিরোধ চলতেই থাকে। তারা যে নিকাইয়ার সভায় ধর্মমতে স্বাক্ষর করেছেন, সে কথা বিস্মিত হলেন। আঁরিয়াসের সমর্থকরা নিকাইয়ার ধর্মমতকে প্রকৃত খৃষ্টান ধর্মের সমর্থক বলে বিবেচনা করেন না, সে কথা গোপন করলেন না। একমাত্র এথানাসিয়াসই (Athanasius) সম্ভবত এ নয়া ধর্মমতের প্রতি অনুগত ছিলেন। কিন্তু তার সমর্থকদের মধ্যে এ নিয়ে সন্দেহ বিরাজ করছিল। অন্যদিকে পাশ্চাত্যে তা ছিল সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। 

এভাবে নিকাইয়ার সভা খৃষ্টান সম্প্রদায়গুলোর মধ্যকার বিরাট ব্যবধান কমিয়ে আনার পরিবর্তে তা আরো বাড়িয়ে তোলে। তাদের মধ্যে তিক্ততার অবসান তো ঘটলই না, বরং তা বৃদ্ধি পেল। চার্চের ক্রোধ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, সকল যুক্তি ও কারণ বাদ দিয়ে তা শক্তি প্রয়োগের পথ গ্রহণ করে। এর পরিণতিতে বড় ধরনের রক্তপাত শুরু হয়। এ পন্থায় পথ (Goths) ও লমবার্ডরা (Lombards) ‘ধর্মান্তরিত’ হয়। 

৩২৮ খৃষ্টাব্দ বিশপ আলেকজান্ডারের পরলোকগমন করেন। তার মৃত্যুতে আলেকজান্দ্রিয়ার বিশপ নির্বাচন নিয়ে গোলযোগ দেখা দিল। আঁরিয়াসপন্থী ও মেলেটিয়ানপন্থীরা প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও এথানাসিয়াস বিশপ পদে প্রার্থী হিসেবে ঘোষিত, নির্বাচিত ও অভিষিক্ত হলেন। 

এদিকে সম্রাট কনষ্টানটাইনের দরবারে তার বোন কনষ্টানটিনা খৃষ্টানদের হত্যাকাণ্ডের বিরোধিতা অব্যাহত রেখেছিলেন। তিনি আরিয়াসকেই সত্য খৃষ্টান ধর্মের প্রতিনিধি মনে করতেন। তিনি নিকোমেডিয়ার ইউসেবিয়াসের প্রতি সম্রাটের আচরণেরও বিরোধিতা করেন। কনষ্টানটাইন তাকে নির্বাসন দিয়েছিলেন। 

দীর্ঘদিন পর কনষ্টানটিনা সফল হন এবং ইউসেবিয়াসকে দেশে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়। এথানিয়াসের জন্যে এটি ছিল এক মারাত্মক আঘাত। এসময় সম্রাট ধীরে ধীরে আঁরিয়াসের প্রতি ঝুঁকে পড়তে শুরু করেন। যখন তিনি শুনলেন যে, আলেকজান্দ্রিয়ার বিশপ পদে এথানাসিয়াসের নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, তখনি তিনি নয়া বিশপকে রাজধানীতে তলব করেন। কিন্তু এথানাসিয়াস ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। তিনি রাজধানী কনষ্টান্টিনোপলে গেলেন না। ৩৩৫ খৃষ্টাব্দ কনষ্টানটাইনের রাজত্বের ত্রিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে টায়ার (Tyre) নগরীতে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এথানাসিয়াস তাতে যোগ দিতে বাধ্য হন। তার বিরুদ্ধে রাজকীয় স্বৈরাচারের অভিযোগ আনা হয়। পরিস্থিতি তার এমনই প্রতিকূল ছিল যে তিনি সভার সিদ্ধান্তের অপেক্ষা না করেই সভাস্থল ত্যাগ করেন। তার নিন্দা করা হয়। বিশপগণ জেরুজালেমে সমবেত হন এবং তার নিন্দার বিষয়ে নিশ্চিত হন। এসময় আঁরিয়াসকে চার্চে ফিরিয়ে আনা হয় এবং তিনি ধর্মীয় প্রার্থনা সভা অনুষ্ঠানের অনুমতি লাভ করেন। 

আঁরিয়াস ও তার বন্ধু ইউসেবিয়াসকে সম্রাট কনষ্টান্টিনোপলে আমন্ত্রণ জানান। আঁরিয়াস ও সম্রাটের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্পন্ন হল। এরপর বিশপগণ পুনরায় আনুষ্ঠানিকভাবে এথানাসিয়াসের নিন্দা করেন। বেপরোয়া এথানাসিয়াস এসময় কনষ্টান্টিনোপলে চলে আসেন। সম্রাটের দরবারে উপস্থিত হওয়ার জন্যে তাকে অনুমতি দেওয়া হল। এসময় নিকোমেডিয়ার ইউসেবিয়াস সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি ভালভাবেই জানতেন যে নিকাইয়ার সভার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক কারণে আঁরিয়াসের বিপক্ষে গেছে। তিনি আরও উপলব্ধি করলেন যে ধর্মীয় বিতর্ক সম্রাট কোনভাবেই বুঝতে পারবেন না। সুতরাং সে পথে না গিয়ে তিনি রাজধানীতে শস্য সরবরাহে বাঁধা সৃষ্টির জন্যে এথানাসিয়াসকে অভিযুক্ত করলেন। এই অভিনব অভিযোগে এথানাসিয়াস বিস্ময়বিমূঢ় হয়ে পড়েন। তিনি উপলব্ধি করলেন যে, তিনি যে খেলায় দক্ষ, সে খেলা দক্ষতার সাথে খেলতে পারার মত অন্য লোকও আছে। অভিযোগ সহজেই প্রমাণিত হয় এবং এথানাসিয়াসকে গল প্রদেশের ট্রায়ারে প্রেরণ করা হল। আঁরিয়াস কনষ্টান্টিনোপলের বিশপ নিযুক্ত হলেন। কিন্তু এর কিছুদিন পরই ৩৩৬ খৃষ্টাব্দ বিষ প্রয়োগের ফলে তিনি মারা যান। চার্চ একে অলৌকিক ঘটনা বলে আখ্যায়িত করলেও সম্রাট তা হত্যাকাণ্ড বলে সন্দেহ করলেন। তিনি এ মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে একটি কমিশন গঠন করেন। রহস্যজনক পন্থায় তদন্ত কাজ চলে। এথানাসিয়াস এ হত্যাকাণ্ডের জন্যে দায়ী বলে প্রমাণিত হয়। ফলে আঁরিয়াসকে হত্যার জন্যে এথানাসিয়াসকে দোষী সাব্যস্ত করা হল। 

আঁরিয়াসের মৃত্যুর ঘটনায় সম্রাট প্রচণ্ডভাবে আলোড়িত হয়েছিলেন। উপরন্তু বোনের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি খৃষ্টানধর্ম গ্রহণ করেন। নিকোমেডিয়ার ইউসেবিয়াস তাকে দীক্ষিত করেন। এর মাত্র এক বছর পর ৩৩৭ খৃষ্টাব্দ সম্রাট পরলোক গমন করেন। এভাবে যিনি তার রাজত্বের অধিকাংশ সময় একত্ববাদের সমর্থকদের উপর নিপীড়ন চালিয়েছিলেন, তিনি জীবনের শেষপ্রান্তে এসে তার হাতে যারা নিহত হয়েছিল তাদেরই ধর্ম গ্রহণ করে পরলোকে গমন করলেন। 

সম্রাট কনষ্টানটাইনের কফিন।
৩৩৭ খৃষ্টাব্দ সম্রাট কনষ্টানটাইনের মৃত্যুর পর পর পরবর্তী সম্রাট কনষ্টানটিয়াসও আঁরিয়াসের ধর্মমত গ্রহণ করেছিলেন এবং একত্ববাদে বিশ্বাসই গোঁড়া খৃষ্টান ধর্ম হিসেবে সরকারীভাবে গৃহীত হওয়া অব্যাহত ছিল। 

৩৪১ খৃষ্টাব্দ এন্টিওকে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে একত্ববাদই খৃষ্টান ধর্মের প্রকৃত ভিত্তি হিসেবে গৃহীত হয়। ৩৫১ খৃষ্টাব্দ সিরমিয়ামে অনুষ্ঠিত আরেকটি সম্মেলনে তৎকালীন সম্রাটের উপস্থিতিতে পুনরায় পূর্বের সিদ্ধান্তকেই স্বীকার করে নেয়া হয়। এভাবে আঁরিয়াস যে শিক্ষা ধারণ করেছিলেন তাই খৃষ্টান সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ গ্রহণ করে। সাধু জেরোম ৩৫৯ খৃষ্টাব্দ লিখেছিলেন যে, "সারা বিশ্বই নিজেকে আঁরিয়াসের ধর্মমতের অনুসারী হিসেবে দেখতে পেয়ে বেদনার্ত ও বিস্মিত হয়েছিল।"

৩৮১ খৃষ্টাব্দ কনষ্টানটিনোপলে সম্রাটের সরকারী ধর্ম হিসেবে আঁরিয়াসের ধর্মমতের কথা ঘোষণা করা হল। 

সমাপ্ত।

উৎস: Jesus- A Prophet of God by Muhammad Ata-Ur-Rahim.

ছবি: Wikipedia, orangemanor.wordpress, saints.sqpn, samuelatgilgal.wordpress, flickr.

Moses: কোরাণিক ক্যানভাসে নবী মূসা।

Abu Hena Mostafa Kamal  01 May, 2017 মি সরের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ফেরাউন। হঠাৎ করে তিনি মৃত্যুবরণ করলেন। কিন্তু তিনি কোন উত্তরাধিকারী ন...