pytheya.blogspot.com Webutation

২০ জানুয়ারী, ২০১৩

সংক্ষিপ্ত জীবনী: মির্জা গোলাম আহমেদ কাদিয়ানী।

মির্জা গোলাম আহমেদ ১৮৩৫ সনের ১৩ই ফেব্রুয়ারী ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের গুরুদাসপুর জেলার কাদিয়ান নামক গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতা মির্জা গোলাম মুর্তজা ছিলেন একজন অভিজ্ঞ ও খ্যাতনামা চিকিৎসক। তার মাতা চিরাগ বিবি জমজ সন্তানের জন্ম দিলেও গোলাম আহমেদ ব্যতিত অপর সন্তানটি বাঁচেনি।

মির্জা গোলাম আহমেদ প্রথমিকভাবে আরবী ভাষা ও গ্রামার, কোরআন, দর্শন এবং ফারসী ভাষা শিক্ষা করেন গৃহশিক্ষক ফজলে এলাহির নিকট। অত:পর ১০ বৎসর বয়সের সময় তার শিক্ষক নিযুক্ত হন ফজল আহমেদ। আর ১৮-১৯ বৎসর বয়সের সময় তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেন গুল আলী শাহের নিকট।

মির্জা গোলাম আহমেদ।
বাল্যকাল থেকেই মির্জা গোলাম আহমেদ খুবই সাধারণ ছিলেন। জাগতিক কোন বস্তু তাকে আকর্ষণ করত না। তিনি খুব অন্যমনস্ক ও ভুলোমনা ছিলেন। প্রায়ই দেখা যেত তিনি ডান পায়ের জুতা বাম পায়ে দিয়ে দিব্যি চলাচল করছেন।

১৮৫৩-৫৪ সনের দিকে গোলাম আহমেদ পারিবারিকভাবে বিবাহ করেন হুরমত বিবিকে। এই স্ত্রী ছিলেন তার জ্ঞাতিগুষ্ঠিরই একজন। তার গর্ভে দু’টি সন্তান (মির্জা সুলতান আহমেদ ও মির্জা ফজল আহমেদ) জন্মলাভ করে। ১৮৯১ সনে গোলাম আহমেদ তার এই স্ত্রীকে ডিভোর্স দেন। অবশ্য ইতিপূর্বে তিনি ১৮৮৪ সনে দিল্লীর নবাব মীর নাসির উদ্দিনের কন্যা নূসরত জাহান বেগমকে বিবাহ করেছিলেন। এই স্ত্রীর গর্ভে গোলাম আহমেদ তিনটি পুত্রসন্তান লাভ করেন। এরা হলেন যথাক্রমে-মির্জা বশির উদ্দিন মাহমুদ, মির্জা বশির আহমেদ ও মির্জা শরীফ আহমেদ।

শিষ্য সমন্বিত মির্জা গোলাম আহমেদ।
১৮৬৪ সনে মির্জা গোলাম আহমেদ তার পিতার ইচ্ছানুসারে শিয়ালকোটে সরকারী চাকুরীতে যোগদান করেন। তার বড় ভাই মির্জা গোলাম কাদিরও একজন সরকারী কর্মচারী ছিলেন। কিন্তু ১৮৬৮ সনে তিনি তার পিতার ইচ্ছানুসারে চাকুরীতে ইস্তফা দিয়ে বাড়ী ফিরে আসেন এবং পৈত্রিক সম্পত্তি দেখাশুনোর ভার নেন।

পাঞ্জাবে গোলাম আহমেদের দাদা গুল মুহম্মদের বিশাল জমিদারী ছিল। কিন্তু তার মৃত্যুর পর তৎকালীন পাঞ্জাবের শিখ সরকার তাদের সমস্ত সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় মালিকাধীন করে নেয়। তাদের অধীনে ছিল কেবল কাদিয়ান গ্রামটি। পরবর্তীতে শিখ সরকার ঐ গ্রামটিও রাষ্ট্রীয় অধিকারভূক্ত করে নেয় এবং মির্জা পরিবারকে সেখান থেকে উৎখাত করে। কিন্তু শেষ পাঞ্জাব শিখ সরকার রণজিৎ সিং তার শাসনের শেষ বৎসরে মির্জা গোলাম মুর্তজা কাদিয়ানে ফিরে এলে রাজ্য সরকারের তরফ থেকে তাকে পাঁচটি গ্রাম ফিরিয়ে দেন। অত:পর এই ভূ-সম্পত্তি দেখাশুনোর জন্যে তিনি পুত্র গোলাম আহমেদকে চাকুরীতে ইস্তফা দিয়ে গ্রামে ফিরে আসতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন।

খাদিজা মসজিদ, জার্মানী।
যাইহোক, নিজ গ্রামে ফিরে এসে নিজের অখন্ড অবসরে গোলাম আহমেদ নিয়মিত প্রত্যাহিক এবাদতে, কোরআন পঠন ও তার তফসীর পর্যালোচনা ও অন্যান্য বিভিন্ন ধর্মীয় পুস্তকাদি পাঠে মনোযোগ এবং নানাবিধ সমাজিক কর্মকান্ডে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। তাছাড়া তিনি তার পিতার সংগৃহীত চিকিৎসা শাস্ত্রের বিভিন্ন গ্রন্থাদি পঠনেও এসময় মনোযোগী হয়েছিলেন। ঐ দিনগুলি সম্পর্কে গোলাম আহমেদ নিজেই বলেন-

During those days I was so thoroughly engrossed in books as if I was not present in the world. My father used to instruct me repeatedly to curtail my reading, for, out of sympathy for me he feared that this might affect my health."

বায়তুন নূর মসজিদ, কানাডা।
কিন্তু জমিদারী দেখাশুনোর এই কাজটি গোলাম আহমেদের আদৌ পছন্দনীয় ছিল না। কেননা, প্রায়শ:তাকে জমি সংক্রান্ত নানাবিধ ঝামেলায় কোর্ট-কাছারীতে দৌঁড়াদৌড়ি করতে হত। এ সম্পর্কে গোলাম আহমেদ বলেন- 

“I feel sorry that a lot of my valuable time was spent in these squabbles and at the same time my respected father made me supervise the affair of landlordship. I was not a man of this nature and temperament."

যৌবণে মির্জা গোলাম আহমেদ নানাবিধ শারীরিক ও মানসিক উৎকর্ষতার দিকে মনোযোগ দেন। তিনি প্রায়শ: রোজা রাখতেন। এমন কি একধারে তিনি ৬ মাস রোজাও করেছেন। ১৮৮৬ সনে তিনি সিদ্ধিলাভের জন্যে হোসিয়ারপুরে ধ্যানে (উচ্চ মার্গের প্রার্থনা ও এবাদত) বসেছিলেন, কিন্তু শারীরিক কারণে ৪০ দিবস ও রজনীর ঐ কঠোর ব্রত তিনি সম্পন্ন করতে পারেননি। তিনি বিভিন্ন ধর্মীয় পন্ডিতদের সাথে বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় বিতর্কে লিপ্ত হয়েছেন এবং নিজের জ্ঞান ও মেধার পরিচয় দিয়েছেন।

১৮৯১ সনে মির্জা গোলাম আহমেদ নিজেকে 'প্রতিজ্ঞাত মসিহ' হিসেবে ঘোষণা দেন এবং তার দাবীর পিছনে কোরআন ও হাদিসের আলোকে নানা যুক্তি ও তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেন। তার রচিত “জেসাস ইন ইন্ডিয়া” গ্রন্থটি তথ্য, তত্ত্ব, যুক্তি ও প্রমাণে ভরপুর। নি:সন্দেহে বইটি বিশ্বের সমগ্র খৃষ্টান সম্প্রদায়ের প্রতি একটা ছুঁড়ে দেয়া চ্যালেঞ্জ। বইটি পাঠে তথ্য ও যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপনায় গোলাম আহমেদের দক্ষতা এবং 'ধর্ম ও দর্শণ' সম্পর্কে তার জ্ঞানের গভীরতার প্রমাণ পাওয়া যায়। উল্লেখ্য মির্জা গোলাম আহমেদ প্রায় ১০০ টির মত গ্রন্থ রচনা করেছেন।

'প্রতিজ্ঞাত মসিহ' হিসেবে ঘোষণা দেবার পর গোলাম আহমেদ তার মতাদর্শ ছড়িয়ে দিতে সমগ্র ভারতবর্ষ চষে বেড়াতে লাগলেন। কবি আল্লামা ইকবাল তার সম্পর্কে বলেন-

In religion, he is fond of the latest
,
He stays not for long at a place; he keeps on moving;
In learning and research he does not participate,
But to the game of Mentors and Disciples, he readily succumbs;
If the trap of explanation anyone lays,
He walks into it quickly from the branch of his nest.”


মির্জা গোলাম আহমেদ নিজেকে 'প্রতিজ্ঞাত মসিহ' দাবী করলে সমগ্র মুসলিম সম্প্রদায়ের নিকট থেকে আপত্তি, নিন্দা ও তীব্র বাঁধার সম্মুখীন হলেন। এ সময় "আহলে হাদিস" পত্রিকার সম্পাদক মওলানা সানাউল্ল্যা অমৃতসরী তাকে সরাসরি মিথ্যেবাদী আখ্যায়িত করে তার পত্রিকার বিভিন্ন সংখ্যায় সেভাবেই তাকে উপস্থাপন করতে লাগলেন। এতে ৫ই এপ্রিল, ১৯০৭ সনে মির্জা গোলাম আহমেদ তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন-

বায়তুল হাদী, দিল্লী।
If I am such a big liar and impostor as you portray me in each issue of your magazine, then I will die in your life-time, for I know that the lifespan of a mischief maker and a liar is not very long and ultimately he dies an unsuccessful man, during the life of his greatest enemies and in a state of humiliation and grief.

And if I am not a liar and impostor and have been honoured by God's communication and address to me, and if I am the Promised Messiah, then I hope that, with the grace of God and in accordance with God's practice, you will not escape the punishment of the rejecters (of Truth). Thus, if that punishment which is not in man's but in God's hand, that is, fatal diseases like plague and cholera, do not afflict you during my life-time-then I am not from God."

মির্জা গোলাম আহমেদের সমাধি।

এটি প্রকাশের এক বৎসর পর, মে ২৫, ১৯০৮ সনে মির্জা গোলাম আহমেদ অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। এসময় তিনি লাহোরে ছিলেন। গোলাম আহমেদ ডায়োরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাকে অবশ্য তৎক্ষণাৎ চিকিৎসার অধীনে নেয়া হয়েছিল, কিন্তু বমি এবং ঘন ঘন পাতলা পায়খানার দরুণ দূর্বলতায় তার শারিরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। পরদিন ২৬ শে মে সকাল দশটার পর তিনি মারা যান। তার মৃত্যু সম্পর্কে তার শ্বশুর নবাব মীর নাসির উদ্দিন বলেন-


“যে রাতে হযরত মির্জা সাহেব অসুস্থ্য হয়ে পড়েন, আমি আমার জায়গায় ঘুমিয়ে ছিলাম। যখন তিনি খুবই অস্বস্তি বোধ করতে লাগলেন, আমি জেগে গেলাম। আমি উঠে হযরত সাহেবের কাছে গেলে তিনি আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “মীর সাহেব, আমি কলেরায় আক্রান্ত হয়েছি।” আমার মনে হয় এরপর পরদিন সকাল দশটার পর মারা যাবার পূর্ব পর্যন্ত তিনি আর একটি কথাও পরিস্কার করে বলতে পারেননি।”

যাহোক, মৃত্যুর পর মির্জা গোলাম আহমেদের মৃতদেহ লাহোর থেকে পাঞ্জাবের কাদিয়ানে নিয়ে আসা হয়েছিল এবং ২৭ শে মে, ১৯০৮ সনে তার দাফন কাজ সম্পন্ন হয়। এ সময় তার উত্তরসূরী হলেন তার একান্ত বিশ্বস্ত ও সার্বক্ষণিক সঙ্গী হাকিম নাসির উদ্দিন। গোলাম আহমেদের অনুসারীরা আহমেদিয়া বা কাদিয়ানী নামে পরিচিত। বর্তমানে তারা বিশ্বের অধিকাংশ দেশে তাদের কর্মকান্ড পরিচালনা করে যাচ্ছেন।

সমাপ্ত।
সংশোধিত নয়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন