pytheya.blogspot.com Webutation

১ মে, ২০১৫

Sacrifice: কে উৎসর্গিত- ইসমাঈল না ইসহাক?

ইহুদি, খৃষ্টান এবং মুসলিমদের সকলেই এ বিষয়ে একমত যে, ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ খোদার প্রতি নির্ভেজাল বিশ্বাস ও নি:শর্ত ধার্মিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। অনেক আকাংখার পর বৃদ্ধ বয়সে পাওয়া একমাত্র প্রাণপ্রিয় সন্তানকে কোরবানী করার সদিচ্ছাতেই খোদার প্রতি তার অসীম ভালবাসার সুস্পষ্ট বহি:প্রকাশ ঘটেছে। অবশ্য তিনটি ধর্মের কোনটিতেই এ নিয়ে বিতর্ক নেই, বিতর্ক কেবল উৎসর্গিত শিশুটির পরিচয় বা সনাক্ততা নিয়ে। কারণ, কোরআন বিষয়টি সুনির্দিষ্ট করেনি। অন্যদিকে বাইবেল বলেছে ঐ সন্তানটি ছিল ইসহাক। আর এ কারণেই এই বিতর্ক। অবশ্য অনেকেই এ বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চান একথা বলে যে, it should not be a point of contention for the believers. 

যা হোক, তথ্য অনুসন্ধানে প্রথমে আমরা দেখি কিতাবসমূহে কি আছে। বাইবেলে রয়েছে- “এ সবের পর খোদা ইব্রাহিমকে পরীক্ষা করলেন। তিনি তাকে বললেন, “ইব্রাহিম!”

সে বলল, “এই তো আমি।”
তিনি বললেন, “তোমার একমাত্র প্রিয়পুত্র ইসহাককে সঙ্গে নিয়ে মোরিয়াতে যাও এব্ং অামার নির্দেশিতব্য সেখানকার এক পর্বতের উপর তাকে পোড়ান উৎসর্গরূপে উৎসর্গ কর।” -জেনেসিস ২১:১-২।

“বিশ্বাসে্ ইব্রাহিম পরীক্ষিত হয়ে ইসহাককে উৎসর্গ করেছিলেন। যিনি একদা প্রতিজ্ঞাসমূহ সানন্দে গ্রহণ করেছিলেন তিনি এখন তার একমাত্র পুত্রকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হলেন..” -ইব্রীয় ১১:১৭।

“অামাদের পিতা ইব্রাহিম কর্মহেতু অর্থাৎ বেদীর উপর নিজ পুত্র ইসহাককে উৎসর্গ করার কারণে কি ধার্মিক গণিত হলেন না?” -জেমস ২:২১।

অন্যদিকে কোরআনে রয়েছে: “সে (ইব্রাহিম) বলল, “অামি আমার প্রতিপালকের কাছে যাব! তিনি নিশ্চয়ই আমাকে গাইড করবেন! হে আমার প্রতিপালক আমাকে এক সৎকর্মপরায়ন পুত্র দাও।”


সুতরাং আমি তাকে এক ধীর-স্থির পুত্রের খবর দিলাম। তারপর যখন তার পিতার সঙ্গে কাজ করার মত বয়স হল তখন ইব্রাহিম তাকে বলল, “বাছা! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে কোরবানী করছি, এখন তোমার কি বলার আছে?”

সে বলল, “পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে তাই করুন! আল্লাহর ইচ্ছায়, আপনি দেখবেন আমি ধৈর্য্য ধরতে পারি।” 
তারা দু’জনে যখন আনুগত্য প্রকাশ করল ও ইব্রাহিম তার পুত্রকে (কোরবানী করার জন্যে) কাত করে শুইয়ে দিল; তখন আমি তাকে ডেকে বললাম, “হে ইব্রাহিম! তুমি তো স্বপ্নের আদেশ সত্যিই পালন করলে।”

নিশ্চয়ই এ ছিল এক স্পষ্ট পরীক্ষা! আমি (তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে) কোরবানী করার জন্যে দিলাম এক মহান জন্ত্তু এবং তাকে রেখে দিলাম পরবর্তীদের মাঝে (স্মরণীয় করে), ইব্রাহিমের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। এভাবে আমি সৎকর্মপরায়নদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি।-(৩৭:৯৯-১১০) সে ছিল আমার এক বিশ্বাসী দাস। আমি তাকে ইসহাকের সুখবর দিয়েছিলাম, সে ছিল এক নবী, সৎকর্মপরায়নদের একজন।” -(৩৭:১১১-১১২)


কোরআনের এ্ই আয়াতসমূহ থেকে কি বোঝা গেল? কোরবানীর ঘটনা বর্ণনা করার পর ইসহাকের জন্মের সুসংবাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, এতে কি বোঝা যায় না যে, কোরবানী ইসমাঈলকে করা হয়েছিল? যারা ইসহাকের পক্ষ নেন, তারা কোরআনের সূরা ৩৭ এর ৯৯ থেকে ১০৭ পর্যন্ত আয়াতের উদাহরণ টানেন, পরবর্তী আয়াতগুলো বিবেচনায় আনেন না, ফলে বিতর্ক থেকে যায়। যা হোক, আরো তথ্য অনুসন্ধানে প্রথমে আমরা জেনে নেই হাজেরাকে শিশুপুত্রসহ কেন নির্বাসন দেয়া হয়েছিল। 

বিবি সারার কোন সন্তানাদি ছিল না। একটি সন্তানের জন্যে তার আকুতিও কম ছিল না। খোদা ইব্রাহিমের মাধ্যমে একটি জাতি গড়ে তুলবেন জানিয়েছিলেন। কিন্তু নিজের যখন বৃদ্ধ বয়সেও সন্তান হল না, তখন সারা ভাবলেন খোদা হয়ত: ইব্রাহিমের অন্য কোন স্ত্রীর মাধ্যমে তাঁর প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করবেন। সুতরাং তিনি ইব্রাহিমকে প্রলুব্ধ করেন তার দাসী হাজেরাকে বিবাহ করতে। 

অত:পর যখন হাজেরা গর্ভধারণ করল, তখন সে নিজের মাতৃত্বের গর্বে মনিবপত্নী সারাকে অবজ্ঞা করতে লাগল।এতে ক্ষুব্ধ সারা ইব্রাহিমের নিকট অভিযোগ করলে ইব্রাহিম বলেছিলেন, 'সে তোমার দাসী। সুতরাং তোমার যা ভাল মনে হয় তার প্রতি তুমি তা-ই কর।’


ইব্রাহিমের ৮৬ বৎসর বয়সের সময় হাজেরা একটি পুত্র সন্তান প্রসব করল। তার নাম রাখা হল ইসমাঈল। ইতিমধ্যে সারা ও হাজেরার মধ্যে অসন্তোষ আরও বৃদ্ধি পেল। ক্ষুব্ধ সারা আর সহ্য করতে রাজী ছিলেন না। তাছাড়া তিনি ইতিমধ্যে জানতে পেরেছেন তার নিজেরও একটি সন্তান হবে।-(১১:৭১) সুতরাং তিনি ইব্রাহিমকে বললেন, ‘সন্তানসহ তাকে মরুভূমিতে নির্বাসন দাও।’

কিন্তু হাজেরাকে নির্বাসন দিতে ইব্রাহিম গড়িমসি করতে লাগলেন। এইসময় ফেরেস্তা জিব্রাইল তাকে সারার কথা মতই কাজ করতে বলল। সে বলল, 'তাদেরকে নির্বাসন দাও। আল্লাহ তোমার এই সন্তানের মধ্যে দিয়েই একটা জাতি গড়ে তুলবেন।’

এ বিষয়ে বাইবেলে রয়েছে- ইসহাক তার মায়ের বুকের দুধ ছাড়লে সারা দেখতে পেলেন ইসমাঈল তাকে বিদ্রুপ করছে। এতে তিনি চাননি ইসমাঈল তার পুত্র ইসহাকের সাথে উত্তরাধিকারীত্বের অংশীদার হোক-

“পরে শিশুটি বড় হল এবং স্তন্যপান ত্যাগ করল। আর ইসহাকের ঐ স্তন্যপান ত্যাগ উপলক্ষ্যে সেদিন ইব্রাহিম বড় এক ভোজের উৎসব করলেন। আর মিশরীয় হাজেরা ইব্রাহিমের জন্যে যে পুত্র প্রসব করেছিল, সারা তাকে পরিহাস করতে দেখলেন। তাতে তিনি ইব্রাহিমকে বললেন, “তুমি ঐ দাসী ও তার সন্তানকে দূর করে দাও; কেননা আমার পুত্র ইসহাকের সাথে ঐ দাসীপুত্র উত্তরাধিকারীত্ব লাভ করতে পারবে না।” -জেনেসিস ৮-১০।

প্রায় দু’বৎসর বয়সের সময় ইসহাক তার মায়ের দুধ ছাড়ে। ঐ সময় ইসমাঈলের বয়স ছিল ১৬ বৎসর। এই ১৬ বৎসর কি কোন শিশুর প্রোফাইল? এটা কি টিন এজারের নয়? সুতরাং নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ইসমাঈল ও তার মাতা হাজেরা বিবি সারাকে ছেড়ে যায় ইসহাকের জন্মের বহু পূর্বে। 

ঐশ্বরিক নির্দেশে ইব্রাহিম শিশুপুত্র ইসমাঈল সহ হাজেরাকে নির্বাসন দেন মক্কায় যাকে বাইবেলে পারণ (Paran) বলা হয়েছে (জেনেসিস ২১:২১), যা ছিল খোদার পরিকল্পনার অংশ। 

শিশুপুত্র সহ হাজেরাকে নির্বাসন দিতে নিয়ে চলেছেন ইব্রাহিম। চারিদিকে ধূ-ধূ মরুভূমি। একস্থানে কিছু গাছপালা দেখতে পেয়ে তিনি তাদেরকে সেখানে নির্বাসনের বাসনা করলেন। কিন্তু ফেরেস্তা জিব্রাইল জানাল- “এটা ঐ স্থান নয় যা তাদের জন্য নির্ধারিত হয়েছে।”

সুতরাং কাফেলা চলতে লাগল। চলতে চলতে যখন শুস্ক পাহাড় ও উত্তপ্ত বালুকাময় প্রান্তর এসে পড়ল, তখন জিব্রাইল তাদেরকে সেখানেই থামিয়ে দিল। ইব্রাহিম তার পরিবারকে বললেন, “আল্লাহর নির্দেশমত আমি চলে যাচ্ছি।”
তার স্ত্রী তাকে বলল- “এই নির্জন মরুভূমিতে আমাদেরকে কার কাছে রেখে যাচ্ছেন?”
তিনি উত্তরে বললেন- “আল্লাহর তত্ত্বাবধানে।”
তখন সে বলেছিল, “তবে, আমাদের জন্যে চিন্তা করবেন না। আল্লাহ নিশ্চয়ই আমাদের ধ্বংস হতে দেবেন না।”

এদিকে হাজেরা দুগ্ধপোষ্য শিশুকে নিয়ে জনমানবহীন প্রান্তরে দিনাতিপাত করতে লাগল। তাদের খাদ্য ও পানীয় একসময় শেষ হয়ে গেল। পিপাসায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে। সন্তানকে উন্মুক্ত প্রান্তরে দৃষ্টির সম্মুখে শায়িত রেখে পানির খোঁজে হাজেরা এদিকে ওদিকে ছোটাছুটি করল। অত:পর আশে পাশে পানি নেই বুঝতে পেরে সে কোন পথিক বা নিকটস্থ জনপদের সন্ধানে সাফা (al-Safa) ও মারওয়া (al-Marwa) পর্বতদ্বয়ে সাতবার ওঠানামা করে। আর এ কারণেই হজ্বের সময় এই পর্বতদ্বয়ের মাঝে সাতবার দৌঁড়ান একটা বিধিতে পরিণত হয়েছে। 

“নিঃসন্দেহে ‘সাফা’ ও ‘মারওয়া’ আল্লাহর নিদর্শণগুলোর অন্যতম। সুতরাং যারা কা‘বা গৃহে হজ্জ্ব বা ওমরাহ পালন করে, তাদের পক্ষে এ দু‘টিতে প্রদক্ষিণ করাতে দোষ নেই। বরং কেউ যদি স্বেচ্ছায় কিছু নেকীর কাজ করে, তবে আল্লাহ তা অবশ্যই অবগত হবেন এবং তার সে আমলের সঠিক মূল্য দেবেন।”-(২:১৫৮)

সন্ধ্যা হয়ে এল। এখন তার সন্তানের কাছে ফিরে যাওয়া দরকার। এই চরম অসহায় অবস্থায় হাজেরা দু‘হাত আকাশের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে খোদার কাছে আর্জি জানাল, “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা তো মৃত্যূর দ্বার প্রান্তে পৌঁছে গেছি। তুমি কি দেখছ না!  আমাদেরকে সাহায্য কর একান্তই যদি কোন সাহায্য করতে চাও।” 

আল্লাহ তার এই প্রার্থনায় সাড়া দিলেন। জিব্রাইল এসে শায়িত ইসমালের পদদেশে তার গোঁড়ালী দিয়ে আঘাত করল। তাতে মরুর বালু ফুঁড়ে পানির ফল্গুধারা বেরিয়ে এল, তৈরী হল এক কূপ। 

পরিশ্রান্ত, অসহায় মা তার সন্তানের কাছে ফিরে এল। তার জন্য এক মহাবিষ্ময় অপেক্ষা করছিল। সে দেখল শিশু ইসমালের পদদেশে একটি ফোয়ারার সৃষ্টি হয়েছে এবং পানির ক্ষীণধারা বয়ে চলেছে। মাতা বুঝতে পারল আল্লাহ তাকে একটি পূণ্যবান সন্তান দান করেছেন। সে সন্তানকে কোলে তুলে নিয়ে তখনি খোদাকে অশেষ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করল। তারপর তারা উভয়ে পানি পান করল। 

একটু সুস্থ্য হলে মাতা হাজেরা এদিক সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নুড়ি কুড়িয়ে এনে ফোয়ারার চতুর্দিকে স্থাপন করে ঐ পানি আবদ্ধ করতে চেষ্টা করল। একসময় ঐ আবদ্ধ পানি উপচে পড়তে লাগল। এ দেখে সে আরও বালু ও নুড়ি দ্বারা ঐ পানি আবদ্ধ করতে করতে বলতে লাগল, ‘জম, জম।’ অর্থাৎ থাম, থাম, তাতে আল্লাহর ইচ্ছায় ঐ পানির প্রবাহ থেমে পড়ল। পানির এই কূপটি বাইবেলে নির্দেশিত হয়েছে এভাবে-

“তখন খোদা তার চোখ খুলে দিলেন এবং সে একটি পানির কূপ দেখতে পেল। তখন সে উঠে সেখানে গেল এবং মশক পূর্ণ করে শিশুটিকে তা থেকে পানি পান করাল।” -জেনেসিস ২১:১৯।

কূপটি এখনও বর্তমান এবং তা জমজম কূপ (Zamzam Well) নামে পরিচিত। পরবর্তীতে হাজেরার অনুমতিক্রমে যূরহুম গোত্রের একদল বণিক অচিরেই সেখানে বসতি গড়ে তোলে। আর তাই যবুরে রয়েছে-

“তিান প্রান্তরকে জলাশয়ে, মরুভূমিতে জলের ঝর্ণা তৈরী করেন,
আর সেখানে তিনি ক্ষুৎ পিপাসিতকে বাস করান,
যেন তারা বসতি নগর তৈরী করে, এবং
ক্ষেতে বীজ বপন ও দ্রাক্ষালতা রোপন করে, এবং উৎপন্ন ফল সঞ্চয় করে।
তিনি তাদেরকে আশীর্বাদ করেন, তাই তারা অতিশয় বৃদ্ধি পায়, এবং
তিনি তাদের পশুগণকে হ্রাস পেতে দেন না।” -(১০৭:৩৫-৩৮)

ইব্রাহিম ও পৃত্র ইসমাঈল উভয়ে মিলে পরবর্তীতে মক্কায় কা’বাগৃহটি নির্মাণ করেন। আর যে প্রস্তর খন্ডের উপর দাঁড়িয়ে ইব্রাহিম কা’বাগৃহের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেছিলেন তা ‘মকামে ইব্রাহিম’ (“Maqam Ibrahim”, i.e., the Station of Abraham) নামে খ্যাত। প্রস্তরখন্ডটি ইব্রাহিমের পদচিহ্ন গ্রহণ করেছিল এবং তাতে এই গভীর পদচিহ্ন অদ্যাবধি বিদ্যমান। প্রথমদিকে এটি কা’বাগৃহের দ্বার সংলগ্ন স্থানে রক্ষিত ছিল। বর্তমানে তা ঐস্থান থেকে সরিয়ে একটি কাঁচপাত্রে সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। 

নি:সন্দেহে সর্বপ্রথম গৃহ (যে স্থানে ইব্রাহিম ও ইসমাঈল কা’বা নির্মাণ করেন সেখানেই আদমের অনুরোধে ফেরেস্তাগণ প্রথম উপাসনালয় কা’বা নির্মাণ করেছিলেন যার ভিত্তি তখনও বালুর নীচে বিদ্যমান ছিল।) যা মানুষের জন্যে নির্ধারিত হয়েছে, সেটাই হচ্ছে এ গৃহ, যা বাক্কায় অবস্থিত এবং সারা জাহানের মানুষের জন্যে হেদায়েত ও বরকতময়। এতে রয়েছে ‘মকামে ইব্রাহিমের’ মত প্রকৃষ্ট নিদর্শণ। আর যে লোক এর ভিতরে প্রবেশ করেছে, সে নিরাপত্তা লাভ করেছে। আর এ গৃহের হজ্জ্ব করা হল মানুষের উপর আল্লাহর প্রাপ্য; যে লোকের সামর্থ রয়েছে এ পর্যন্ত পৌঁছার।-(৩ঃ৯৬-৯৭)

যখন আমি ইব্রাহিমকে বায়তুল্লাহর স্থান ঠিক করে দিয়ে বলেছিলাম, “আমার সাথে কাউকে শরীক কোরও না এবং আমার গৃহকে পবিত্র রাখ তাওয়াফকারীদের জন্য, নামাজে দন্ডায়মানকারীদের জন্য এবং রুকু ও সিজদাকারীদের জন্য এবং মানুষের মধ্যে হজ্জ্বের জন্য ঘোষণা প্রচার কর। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে। যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থান পর্যন্ত পৌঁছে এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোতে (যিলকদ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ) আল্লাহর নাম স্মরণ করে তাঁর দেয়া চতুষ্পদ জন্তু জবেহ করার সময়। অত:পর তোমরা তা থেকে আহার কর এবং দুস্থ্য ও অভাবগ্রস্থকে আহার করাও। তারপর তারা যেন দৈহিক ময়লা দূর করে দেয়, তাদের মানত পূর্ণ করে এবং এ সুসংরক্ষিত গৃহের তাওয়াফ করে। এটা শ্রবণযোগ্য। আর কেউ আল্লাহর সম্মানযোগ্য বিধানাবলীর প্রতি সম্মান প্রদর্শণ করলে পালনকর্তার কাছে তা তার জন্যে উত্তম। উল্লেখিত ব্যতিক্রমগুলো ছাড়া তোমাদের জন্যে চতুষ্পদ জন্তু হালাল করা হয়েছে। সুতরাং তোমরা মূর্ত্তিদের অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাক এবং মিথ্যে কথন থেকে দূরে সরে থাক।- (২২:২৬-৩০)

 
আর যখন ইব্রাহিম ও ইসমাইল (কা’বা) গৃহের ভিত্তি স্থাপন করছিল, তখন তারা বলেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাদের এ কাজ গ্রহণ কর। তুমি তো সব শোন আর সব জান। 

--হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাদের দু‘জনকে তোমার একান্ত অনুগত কর ও আমাদের বংশধর হতে তোমার অনুগত এক উম্মত (সমাজ) তৈরী কর। আমাদেরকে উপাসনার নিয়ম পদ্ধতি দেখিয়ে দাও, আর আমাদের প্রতি ক্ষমাপরবশ হও! তুমি তো অত্যন্ত ক্ষমাপরবশ পরম দয়ালু। 


--হে আমার প্রতিপালক! তাদের মধ্যে থেকে তাদের কাছে এক রসূল প্রেরণ কোরও যে তোমার আয়াত তাদের কাছে আবৃত্তি করবে, তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেবে এবং তাদেরকে পবিত্র করবে। তুমি তো পরাক্রমশালী, তত্ত্বজ্ঞানী।-(২ঃ১২৫-১২৭)


তাদের এই প্রার্থনা কবুল হয়, আমরা দেখতে পাচ্ছি তাদের বংশধরদের মধ্য থেকেই তৈরী হয়েছে খোদার অনুগত এক উম্মত বা সমাজ যারা নিজেদেরকে মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেয় এবং তাদের (ইব্রাহিম ও ইসমাঈল) বংশধরদের মধ্য থেকেই এক মহান রসূল মুহম্মদের আগমন হয়েছে, যিনি মানুষকে কোরআন ও হিকমত শিক্ষা দিয়েছেন এবং তাদেরকে পবিত্র করেছেন। আর হজ্জ্ব মৌসূমে, মক্কার হাজীগণ এবং সারা পৃথিবীর মুসলিমগণ পশু কোরবানী দিয়ে ইব্রাহিম ও ইসমাঈলের এই উৎসর্গ স্মরণার্থে উৎসব করে। 

খোদা, ইব্রাহিম ও তার “একমাত্র” পুত্র ইসমাঈলের মধ্যে চুক্তি made and sealed when Ishmael was supposed to be sacrificed. ঐ একই দিনে ইব্রাহিম, ইসমাঈল এবং ইব্রাহিমের গৃহের সকল পুরুষের ত্বকচ্ছেদ হল। ঐ সময় এমনকি ইসহাকের জন্মও হয়নি:

“ইব্রাহিমের ত্বকচ্ছেদকালে তার বয়স ৯৯ বৎসর ছিল। আর তার পুত্র ইসমাঈলের ত্বকচ্ছেদকালে বয়স ছিল তের বৎসর। সেদিনই ইব্রাহিম ও তার পুত্র ইসমাঈল, উভয়ের ত্বকচ্ছেদ হল। আর তার গৃহজাত এবং পরজাতীয়দের নিকট থেকে মূল্য দ্বারা ক্রীত তার গৃহের সকল পুরুষদেরও ত্বকচ্ছেদ সেই সময়ে হল।”- জেনেসিস ১৭:২৪-২৭। 

এক বৎসর পর ইসহাক জন্মগ্রহণ করে এবং জন্মের অাট দিনের দিন তার খৎনা করা হয়: “এবং ইব্রাহিম খোদার আদেশ অনুসারে তার পুত্র ইসহাকের আট দিন বয়সের সময় তার ত্বকচ্ছেদ করলেন। ইব্রাহিমের একশত বৎসর বয়সের সময় তার পুত্র ইসহাকের জন্ম হয়।” -জেনেসিস ২১:৪-৫। 

সুতরাং, যখন চুক্তি made and sealed (ত্বকচ্ছেদ ও উৎসর্গ) হয় তখন ইব্রাহিমের বয়স ছিল ৯৯ এবং ইসমাঈলের ১৩। এক বৎসর পর ইসহাকের জন্ম হয় যখন ইব্রাহিমের বয়স ছিল এক শত বৎসর।

যেহেতু আমরা জানি কেদর (Kedar) ইসমাঈলের সন্তানদের একজন (জেনেসিস ২৫:১৫) এবং ইসমাঈল হচ্ছে কেদরের মধ্য দিযে নবী মুহম্মদের Family Tree-র মূল। ইসমাঈলের অনুসারী, নবী মুহম্মদ এবং সকল মুসলিম আজও বিশ্বস্ত রয়েছে ত্বকচ্ছেদের এই চুক্তির উপর। প্রত্যাহিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে মুসলিমগণ মুহম্মদ ও তার অনুসারীদের প্রশংসার সঙ্গে ইব্রাহিম ও তার অনুসারীদের প্রশংসা অন্তর্ভূক্ত করেছে। 

কিন্তু জেনেসিসের ২২ অধ্যায়ে বলা হয়েছে ইসহাকের উৎসর্গের কথা যা বিরোধপূর্ণ নয় কি? বলা হয়েছে “shine only son Isaac.” এটা কি হওয়া উচিৎ নয়  “shine only son Ishmael,” যখন ইসমাঈলের বয়স তের বৎসর এবং ইসহাকের এমনকি জন্মও হয়নি? তাছাড়া যখন ইসহাক জন্মগ্রহণ করল, ইব্রাহিমের সন্তান হল দু’টি। সুতরাং “shine only son Isaac.” সত্য হলে নিশ্চিতভাবে ইব্রাহিম প্রতিবাদ করতেন, বলতেন “হায় খোদা! আপনে কন কি! আমার পুত্র তো একটি নয়, দু’টি!” কিন্তু তিনি তা করেননি, কারণ, তখন তো ইসহাকের জন্মই হয়নি। তাই বলা যায় chauvinism-এর কারণে ইসমাঈল নামটি ইসহাকে পরিবর্তিত হয়েছে সমগ্র জেনেসিসের ২২ অধ্যায়ে। কিন্তু খোদা সংরক্ষণ করেছেন “একমাত্র” শব্দটিকে আমাদেরকে দেখিয়ে দিতে, এটা প্রকৃতই কি হওয়া উচিৎ ছিল।

“আমি তোমার বংশকে বহুগুণে বৃদ্ধি করব।” জেনেসিস ২২:১৭ এর এই কথাগুলো ইতিপূর্বে প্রযোজ্য হয়েছিল ইসমাঈলের ক্ষেত্রে জেনেসিস ১৬:১০-এ. তাহলে সমগ্র জেনেসিস ২২ ইসমাঈলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় কি? “আমি তাকে এক মহাজাতি করব।” বাইবেলে অনেকবারই এর পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে ইসমাঈলের ক্ষেত্রে-

“আর খোদার দূত তাকে (হাজেরা) আরও বললেন, “অামি তোমার বংশের এমন বৃদ্ধি করব যে, তারা বাহুল্য প্রযুক্ত অগণ্য হবে।” -জেনেসিস ১৬:১০। 

“আর ইসমাঈলের বিষয়েও তোমার প্রার্থনা শুনলাম: দেখ, আমি তাকে আশীর্বাদ করলাম, এব্ং তাকে ফলবান করে তার অতিশয় বংশবৃদ্ধি করব। তাদের থেকে বারজন নৃপতি উৎপন্ন হবে, ও আমি তাদেরকে বৃহৎ এক জাতিতে পরিণত করব।” -জেনেসিস ১৭:২০। 

“আর ঐ দাসীপুত্র থেকেও আমি এক জাতি উৎপন্ন করব, কারণ সে তোমার বংশীয়।” -জেনেসিস ২১:১৩। 
“ওঠ, আর শিশুটিকে (ইসমাঈল) তুলে তোমার হাতে নাও, কারণ আমি তাকে এক মহাজাতি করব।” -জেনেসিস ২১:১৭। 

“যদি কোন পুরুষের প্রেমাস্পদ ও অপ্রেমাস্পদ দুই স্ত্রী থাকে এবং তারা উভয়ে তার জন্যে সন্তান জন্ম দেয় এবং যদি প্রথমজাত পুত্রটি অপ্রেমাস্পদের হয়; তবে নিজ পুত্রদেরকে সর্বস্বের অধিকার দেবার সময় অপ্রেমাস্পদজাত জৈষ্ঠ্যপুত্র থাকতে সে প্রেমাস্পদজাত পুত্রকে জৈষ্ঠ্যাধিকার দিতে পারবে না। কিন্তু সে অপ্রেমাস্পদের পুত্রকে জৈষ্ঠ্যরূপে স্বীকার করে নিজ সর্বস্বের দুই অংশ তাকে দেবে, কারণ সে তার শক্তির প্রথম ফল, জৈষ্ঠ্যাধিকার তারই।”- দ্বিতীয় বিবরণ ২১:১৫-১৭।

সর্বোপরি, ইসমাঈল নামটি ইসহাকে পরিবর্তিত হওয়ার কারণেই বাইবেলে বর্ণিত আয়াতগুলোর অসামঞ্জস্যতা প্রকট হয়ে পড়েছে। উদাহরণ স্বরূপ- বাইবেল অনুযায়ী নির্বাসনের সময়ে্ ইসমাঈলের বয়স ১৬ বা তার উর্দ্ধে। অথচ মাতা হাজেরাকে মাবুদের ফেরেস্তা এই ১৬ বৎসরের শিশুকে কোলে তুলে নিয়ে শান্ত করতে বলছে-


“থলির পানি যখন শেষ হয়ে গেল, তখন তিনি পুত্রকে একটি ঝোপের নীচে শুইয়ে রাখলেন্। তারপর তিনি একটি তীর ছুড়িলে যতদুর যায় আনুমানিক ততটা দূরে গিয়ে বসে রইলেন। “পুত্রের মৃত্যু যেন আমাকে দেখতে না হয়।”, মনে মনে একথা বলে তিনি সেখানে বসেই জোরে জোরে কাঁদতে লাগলেন। পুত্রটির কান্না কিন্তু খোদার কানে গিয়ে পৌঁছিল। তখন খোদার ফেরেস্তা বেহেস্ত হতে হাজেরাকে ডেকে বললেন, “হাজেরা তোমার কি হয়েছে? ভয় কোরও না, কারণ ছেলেটি যেখানে আছে সেই জায়গা হতেই তার কান্না খোদার কানে গিয়ে পৌঁছেছে। তুমি উঠে পুত্রকে কোলে তুলে শান্ত কর, কারণ আমি তার মধ্য দিয়ে একটি মহাজাতি গড়ে তুলব।” -(জেনেসিস ২১:১৫-১৭)


ইসলাম কখনই ইসহাক ও তার বংশধরদের উপর খোদার অনুগ্রহ অস্বীকার করে না। বরং মুসলিমগণ মনে করে প্রতিজ্ঞাত সন্তানটি ছিলেন ইসমাঈল, from whom arose Muhammad as the seal of the prophets.

তবে কি ইহুদিগণ ইসমাঈল নামটিকে ইসহাকে পরিবর্তিত করেছে কেবলমাত্র ধর্মান্ধতার কারণে, নাকি আরব ও মুহম্মদের প্রতি হিংসা বশত:! (এটি উল্লেখ করা হল কেবল যুক্তির খাতিরে)

Encyclopaedia Judaica: বর্ণিত আছে যে, ইহুদি বনু কুরাইজা গোত্রের একজন স্বনামখ্যাত traditionalist এবং একজন ইহুদি আলেম যিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, খলিফা ওমর ইবনে আব্দুল আজিজকে (৭১৭-২০) বলেন, ইহুদিরা ভালকরেই জানত যে, ইসমাইলই ছিল সেই যে বন্ডধারী। কিন্তু তারা এ গোপন করেছিল কেবল হিংসার কারণে। মুসলিম আখ্যান্ ইসমাঈলের মাতা হাজেরার বিস্তারিতও যুক্ত করেছে। ইব্রাহিম তাকে তার পুত্র সহ নির্বাসনে দেবার পর পানির খোঁজে সে মক্কার নিকটবর্তী সাফা ও মারওয়া পর্বতদ্বয়ের মাঝে ছুটাছুটি করেছিল। আর সেই সময় পানির ফোয়ারা জমজমের প্রবাহ শুরু হয়। তার কাজই হজ্জ্বের সময় মুসলিমদের পবিত্র প্রথার ভিত্তি হয়েছে। -Encyclopaedia Judaica, Volume 9, Jerusalem, pp. 82 (Under 'Ishmael').

উপরে উল্লেখিত সাবেক ইহুদির স্বীকারোক্তি হাদিস সাহিত্যে যেভাবে উল্লেখ করা হয়েছে তা Encyclopaedia Judaica উদ্ধৃত করেছে এমন:

“মুহম্মদ ইবনে ক্বাব বর্ণিত: ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ একজন লোককে ডেকে পাঠান যে ছিল ইহুদি অত:পর ইসলাম গ্রহণ করে এবং ইসলামের গুণাবলী তার মধ্যে প্রকাশ পায়। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে সে ছিল ইহুদিদের একজন আলেম। সুতরাং ওমর তাকে জিজ্ঞেস করেন: “ইব্রাহিম তার কোন পুত্রটিকে উৎসর্গ করেছিলেন?”
সে উত্তর দিয়েছিল: “এ ছিল ইসমাঈল। খোদা স্বাক্ষী, ও আমীরুল মুমেনীন, ইহুদিরা তা জানত কিন্তু তারা আপনাদেরকে-আরবদেরকে হিংসা করত।” -ইবনে ইসহাক।

অবশ্য ক্রিশ্চিয়ানগণের অনেকে দাবী করতে পারেন যে, ইসমাঈল ইব্রাহিমের বৈধ সন্তান নয়। তবে তারা এমনটি দাবী করলেও বাইবেল কি তা সমর্থন করে? ইব্রাহিমের মত এতবড় একজন মহান নবীর কিভাবে একজন অবৈধ স্ত্রী ও বিবাহ বহির্ভূত একজন সন্তান থাকতে পারে! দেখি বাইবেল কি বলে-

“...,ইব্রাহিমের স্ত্রী সারা নিজ দাসী মিসরীয় হাজেরাকে নিয়ে তার স্বামী ইব্রাহিমের সাথে বিবাহ দিলেন।” -জেনেসিস ১৬:৩।

অর্থাৎ হাজেরা ইব্রাহিমের বৈধ স্ত্রী। আর যদি বিবাহ বৈধ হয়, তবে ঐ বৈধ বিবাহজাত সন্তান অবৈধ হয় কিভাবে? দু’জন বিদেশী যাদের একজন চ্যালডিয় ও অপরজন মিশরীয়. তাদের মধ্যে বিবাহ কি অধিক বৈধ নয় নিজ পিতার এক কন্যার সাথে বিবাহ হবার চাইতে? এটা ইব্রাহিমের মিথ্যে বলা হোক বা না হোক, বাইবেলে তো এমনটাই বলা হয়েছে- 


“আর সে আমার ভগিনী, এও সত্য বটে; কেননা সে আমার পিতৃকন্যা, কিন্তু মাতৃকন্যা নহে, পরে আমার ভার্য্যা হল।” -জেনেসিস ২০:১২।

আর ইসমাঈল নামটিও খোদা প্রদত্ত: “স্বর্গদূত তাকে (হাজেরা) আরও বলল, “দেখ, তোমার গর্ভ হয়েছে; তুমি এক পুত্র সন্তান প্রসব করবে এবং তার নাম ইসমাঈল রাখবে, কেননা, খোদা তোমার দু:খ শ্রবণ করলেন।” -জেনেসিস ১৬:১১। 

বাইবেলের কোথায় এটা লেখা আছে যে, ইসমাঈল ইব্রাহিমের এক অবৈধ পুত্র ছিলেন? বরং বাইবেল হাজেরাকে বৈধ স্ত্রী (জেনেসিস ১৬:৩) এবং ই্সমঈলকে সন্তান হিসেবেই স্বীকৃতি দিযেছে (His sons Isaac and Ishmael buried him in the cave of Machpelah near Mamre -জেনেসিস ২৫:৯)। সর্বোপরি ইসমাঈল অবৈধ পুত্র হলে তো ইস্রায়েলী ১২ গোত্রের ৪টিকেই খারিজ করে দিতে হয়। ইয়াকুবের স্ত্রী লেয়া ও রাহেলার বাঁদী বিলহা ও শিল্পার গর্ভেই তো দান, নপ্তালী, গাঁদ ও আঁশের জন্মগ্রহণ করেছে।

সবশেষে বলা যায়, ইসমাঈল ও ইসহাকের জন্মের বহু পূর্বে খোদা ইব্রাহিমের সাথে এক চুক্তি করেন: “আমি মিসরের নদ হতে মহনদী ইউফ্রেটিস অবধি সমস্ত ভূমি তোমার বংশধরদেরকে দিলাম।" -জেনেসিস ১৫:১৮।

আরবের বৃহৎ অংশ কি নীল ও ইউফ্রেটিস নদীর মধ্যবর্তীতে অবস্থিত নয়, যেখানে ইসমাঈলের সকল বংশধরেরা পরবর্তীতে বসতি স্থাপন করেছে? আরো লক্ষণীয় নয় কি যে, ইব্রাহিমকে কনানে “একজন আগন্তুক” বলা হলেও নীল ও ইউফ্রেটিস নদীর মধ্যবর্তী ভূমিতে কখনও তা বলা হয় না? সত্যি বলতে কি, একজন চ্যালডিয়ান হিসেবে তিনি একজন ইহুদির চাইতে অনেক বেশী আরব।

সুতরাং, ঐ চুক্তি হয়েছিল ইব্রাহিম ও ইসমাঈলের সাথে: “তোমার ও তোমার ভাবী বংশের সাথে কৃত আমার যে চুক্তি তোমরা পালন করবে তা এই- তোমাদের প্রত্যেক পুত্র সন্তানের ত্বকচ্ছেদ করতে হবে।” -জেনেসিস ১৭:১০।

“যারা তোমাদের গৃহে জন্ম নেবে বা যাদেরকে তোমরা মূল্যের বিনিময়ে ক্রয় করবে, তাদের সকলেরই ত্বকচ্ছেদ করতে হবে। এটা তোমাদের জন্যে আমার এক চিরস্থায়ী নিয়ম।” -জেনেসিস ১৭:১৩।

তবে এখানেই কিন্তু বিতর্কের শেষ নয়, এমনও তথ্য আমাদের হাতে রয়েছে- ই্‌বনে আব্বাস এবং ইকরামা একে অন্যের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হল ইব্রাহিমের উৎসর্গিত পুত্রের সনাক্ততা নিয়ে:


ইকরামা জিজ্ঞেস করল: “কাকে কোরবানী করা হয়েছিল বলে মনে হয়?”

ইবনে আব্বাস: “ইসমাঈল!”
“কেন?” -ইকরামার জিজ্ঞাসা।
ইবনে আব্বাস: “কারণ, কেমনে খোদা ইসহাকের জন্মের সুসংবাদ ইব্রাহিমকে জানাবে, আর তারপর আদেশ করবে যে তাকে উৎসর্গ করতে হবে?”

“আমি তোমাকে কোরআন থেকেই প্রমাণ দেখাব যে, ইসহাককেই উৎসর্গের কথা বলা হয়েছিল।” -বলল ইকরামা- “আর এইভাবে তোমার প্রভু তোমাকে মনোনীত করবেন, আর তোমাকে শিক্ষা দেবেন ঘটনাবলীর ব্যাখ্যা সম্পর্কে, আর তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণাঙ্গ করবেন তোমার প্রতি ও ইয়াকূবের বংশধরদের প্রতি, যেমন তিনি তা পূর্ণাঙ্গ করেছিলেন এর আগে তোমার পূর্বপুরুষ ইব্রাহিম ও ইসহাকের প্রতি। নি:সন্দেহে তোমার প্রভু সর্বজ্ঞাতা, পরমজ্ঞানী।” -(১২:৬)


‘God's blessing to Abraham was by choosing him, and saving him’, আকরামা বলল, “আর ইসহাকের ক্ষেত্রে by redeeming him from slaying” -আল-মাসুদী, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা-৫২-৫৩। ইকরামার বক্তব্য কি যুক্তিযুক্ত? ইসহাকের ক্ষেত্রে কেন নয় “by choosing him.”

বা, মুহম্মদ বিন আল-মুনতাসির একজন লোকের কথা বলেন যে প্রতিজ্ঞা করেছিল নিজেকে উৎসর্গ করার যদি খোদা তাকে তার শত্রুর হাত থেকে নি:স্কৃতি দেন। সে ইবনে আব্বাসের সাথে এ ব্যাপারে কথা বললে তিনি মাসরুকের সাথে পরামর্শ করতে বলেন। অত:পর সে মাসরুকের সাথে কথা বললে তিনি বললেন, “নিজেকে উৎসর্গ কোরও না, কারণ তুমি বিশ্বাসী হলে তুমি একটা বিশ্বাসী আত্মাকে হত্যা করবে, আর অবিশ্বাসী হলে তুমি জাহান্নামে ঝুলে যাবে; বরং তুমি একটা ভেড়া কিনে তাকে দুস্থ্যদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ কর, কারণ ইসহাক তোমার চেয়ে বেটার ছিলেন and he was ransomed with a ram.” সে ফিরে ইবনে আব্বাসকে এ কথা জানালে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “এই সিদ্ধান্তই আমি তোমাকে দিতে চেয়েছিলাম।” রাজিন এটা সঞ্চালন করেছেন। -মিসকাত আল-মাসাবিহ, বুক ১৪, চ্যাপ্টার ৪, সেকশন ৩। এখানে সিম্পলি মাসরুকের ধারণার প্রতিফলণ ঘটেছে কেননা, ইসহাক নামটি তিনি কোন বৈধ যুক্তি ছাড়াই অবতারণা করেছেন। তাছাড়া উপরে মাসুদীর বর্ণনাতেই দেখা যাচ্ছে ইবনে আব্বাস সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারণা পোষণ করতেন।

বা, The messenger of God said that Gabriel took Abraham to Jamra al-Aqabah (the upper Jamrah, the pillar or place for stoning) and then Satan appeared to him. Then he stoned Satan with seven stones so he fainted him to faint. Then he came to the middle Jamrah, and Satan again appeared to him. He again stoned him with seven stones causing Satan to faint. He then came to the lower Jamrah, and Satan again appeared to him. Again he stoned Satan, causing him to faint once again. Now when Abraham wanted to slaughter his son Isaac, he said his father, "Father, tie me so I don’t get afraid and my blood splash all over you when you slaughter me." So he took him and he tied him up, and then he took the knife. And when he wanted to slay him a voice called from behind him, "O Abraham, the vision has been fulfilled." - মুসনাদ, আহমদ ইবনে হাম্বল, নাম্বার ২৬৫৮।

অার তাবারী এ সম্পর্কে বলেন,- “আমাদের নবীর উম্মতের প্রথমদিককার আলেমগণের মধ্যে ইব্রাহিমের দু’পুত্রের কোনটিকে উৎসর্গ করার জন্যে তিনি আদেশ প্রাপ্ত হয়েছিলেন সে সম্পর্কে মতবিরোধ ছিল। কেউ কেউ বলেন- এ ছিল ইসমাঈল, আবার  কেউ কেউ বলেন- এ ছিল ইসহাক। Both views are supported by statements related on the authority of the Messenger of God. If both groups of statements were equally sound, then - since they both came from the Prophet - only the Qur’an could serve as proof that the account naming Isaac is clearly the more truthful of the two." -al-Tabari (খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৮২). কিন্তু আমরা মনে করি, তাবারী ভুল করেছেন, কেননা, কোরআনের (৩৭:৯৯-১১২) অনুসারে, Ishmael is clearly the more truthful of the two. আমরা উপরে ইতিমধ্যে তা দেখিয়েছি। 

তিনি (তাবারী) অারও বলেন,- খোদা তাঁর বন্ধু ইব্রাহিমের প্রার্থনা সম্পর্কে আমাদের জানিয়েছেন, যখন তিনি সারাকে সঙ্গে নিয়ে তার লোকদের ছেড়ে সিরিয়া চলে আসেন, ইব্রাহিম প্রার্থনা করেন, “অামি আমার প্রতিপালকের কাছে যাব! তিনি নিশ্চয়ই আমাকে গাইড করবেন! হে আমার প্রতিপালক আমাকে এক সৎকর্মপরায়ন পুত্র দাও।” এছিল তার হাজেরার (যিনি ইসমাঈলের মাতা হন পরবর্তীতে) সাথে পরিচয়ের পূ্র্বে। আর ঐ প্রার্থনার কথা উল্লেখ করার পর খোদা বর্ণনা করতে থাকেন তার সেই প্রার্থনা এবং উল্লেখ করেন যে তিনি ইব্রাহিমকে ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন যে তার একটা ধীরস্থির পুত্র হবে। খোদা আরও উল্লেখ করেন ইব্রাহিমের নিজেই ঐ পুত্র উৎসর্গের দর্শনের কথা, যখন সে তার সাথে চলার মত যথেষ্ট বয়সী হবে। ইসহাককে বোঝানোর ঘটনা ব্যতিত, কিতাব ইব্রাহিমকে দেয়া পুত্র সন্তানের আর কোন সুসংবাদ উল্লেখ করেনি, আর তাতে খোদা বলেন:

 .. সে বলল, “তোমাদেরকে আমার ভয় হচ্ছে!” 
ওরা বলল, “ভয় কোরও না, আমরা তোমাকে এক জ্ঞানী পুত্রের সুসংবাদ দিচ্ছি।” 
সে বলল, “আমি বার্ধক্যগ্রস্থ হওয়া সত্ত্বেও কি তোমরা আমাকে এ সুখবর দিচ্ছ? তোমরা কি ব্যাপারে সুখবর দিচ্ছ?”
ওরা বলল, “আমরা সত্য খবর দিচ্ছি, তুমি হতাশ হইও না।”
সে বলল, “পথভ্রষ্ট ছাড়া আর কে প্রতিপালকের অনুগ্রহ থেকে হতাশ হয়?”- (১৫:৫২-৫৬)

তখন তার স্ত্রী দাঁড়িয়েছিল, সে হাসল। তারপর আমি তাকে ইসহাকের ও ইসহাক পরবর্তী ইয়াকুবের সুসংবাদ দিলাম। সে বলল, কি আশ্চর্য ! আমি সন্তানের জননী হব, যখন আমি বৃদ্ধা ও এ আমার স্বামী বৃদ্ধ! এ তো এক অদ্ভূত ব্যাপার!”
তারা বলল, “আল্লাহর কাজে অবাক হচ্ছ? হে নবীর পরিবার! তোমাদের উপর রয়েছে আল্লাহর অনুগ্রহ ও কল্যাণ। তিনি প্রশংসার্হ ও সম্মানার্হ।”- (১১:৭১-৭৩)

এভাবে কোরআন যখনই উল্লেখ করেছে খোদা ইব্রাহিমকে একটা পুত্র সন্তান হওয়ার সুখবর দিলেন, it refers to Sarah (আর এরূপে ইসহাক) and the same must be true of God's words- সুতরাং আমরা তাকে এক ধীর-স্থির পুত্রের খবর দিলাম।” as it is true of all such references in the Qur’an." (Ibid., p. 89) 

-এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য কি? আমরা তো মনে করি “হে আমার প্রতিপালক আমাকে এক সৎকর্মপরায়ন পুত্র দাও।” ইব্রাহিমের এই প্রার্থনা খোদা শোনেন, ফলে যখন তার সন্তান হয়, তার নাম রাখা হয় ইসমাঈল অর্থাৎ “খোদা শোনেন” অন্যদিকে হাজেরাকে নির্বাসন দেবার পর যখন ইব্রাহিমের মন:কষ্ট লাঘবে তাকে ও বিবি সারাকে সন্তান লাভের কথা জানান হয়, তখন বিবি সারা তার বৃদ্ধ বয়সে সন্তান হবার কথা শুনে অবাক-বিষ্ময়ে হেসে ফেলেন। -(১১:৭১) ফলত: তাদের ঐ সন্তান হবার পর তার নাম রাখা হয় ইসহাক অর্থাৎ “হাস্য”।


এখন আমরা দেখি খৃষ্টানদের এপোক্রাফা হিসেবে চিহ্নিত করা বার্ণাবাসের গসপেল এ বিষয়ে কি বলে-
If I work iniquity, reprove me, and God will love you, because you shall be doing his will, but if none can reprove me of sin it is a sign that you are not sons of Abraham as you call yourselves, nor are you incorporate with that head wherein Abraham was incorporate. As God lives, so greatly did Abraham love God, that he not only brake in pieces the false idols and forsook his father and mother, but was willing to slay his own son in obedience to God. 

The high priest answered: "This I ask of you, and I do not seek to slay you, wherefore tell us: Who was this son of Abraham?" 
Jesus answered: "The zeal of your honour, O God, inflames me, and I cannot hold my peace. Truly I say, the son of Abraham was Ishmael, from whom must be descended the Messiah promised to Abraham, that in him should all the tribes of the earth be blessed." Then was the high priest wroth, hearing this, and cried out: "Let us stone this impious fellow, for he is an Ishmaelite, and has spoken blasphemy against Moses and against the Law of God."-— Barnabas 208:1–2

Here, Jesus confirming that the sacrificed son of Abraham was Ishmael not Isaac, 

উপরের সমস্ত আলোচনা থেকে অাপাত: দৃষ্টিতে আমরা দেখতে পাই ইসমাঈলের সপক্ষে যথেষ্ট তথ্য ও যুক্তি রয়েছে অন্যদিকে ইসহাকের স্বপক্ষে তথ্য থাকলেও যৌক্তিকতার অনেকটাই ঘাটতি রয়েছে। অবশ্য সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার পাঠকদেরই এবং যার যেমন জ্ঞান সে তেমনই সিদ্ধান্ত নেবে, আর নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞানী।


বি:দ্র: প্রতিটি তথ্যচিত্রের একটি বিপরীত তথ্যচিত্র থাকে। আর সেই ব্যক্তিকেই আমি জ্ঞানী মনে করি যে ঐ উভয় তথ্যচিত্র সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখে। অর্থাৎ আমার দৃষ্টিতে যুক্তিবাদী সেই যে, যুক্তি দিয়ে সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্যে রূপান্তরিত করার জ্ঞান ধারণ করে।


প্রায় তিন দশক আগে বন্ধু বেনজিন খান সহ আমরা কয়েকজন যুক্তিবাদী সমাজ গঠনের লক্ষ্যে কাজ শুরু করি। অত:পর বেনজিন জেলে যাবার পর (প্রসঙ্গ কোরবানী: ইসমাঈল না ইসহাক উৎসর্গীত কে?- যশোরের একটি দৈনিকে এটি প্রকাশের পর তাকে জেলে যেতে হয়) সম্ভবত: তখন থেকেই এটির কা্র্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। অবশ্য এর অনেক আগেই আমি ঐ সংঘ থেকে ব্যক্তিগত নানান ঝামেলার কারণে বিছিন্ন হয়ে পড়েছিলাম।


বেনজিন যুক্তিবাদী লোক। তার আর্টিকেলটিও এখানে রাখলাম পাঠকদের সুবিধার্থে। অবশ্য এটি সেই বাজেয়াপ্ত আর্টিকেল নয় বরং সেটির বিপরীত তথ্যচিত্র।


প্রসঙ্গ কোরবানি: ইসমাঈল না ইসহাক-উৎসর্গীত কে?

                                                             --বেনজিন খান।

উৎসর্গ শব্দটির দু’টি দিক আছে-একটি সদর্থক, অপরটি নঞর্থক। সদর্থক দিকটি হল- মানুষ যখন মানবতা প্রতিষ্ঠার জন্য ত্যাগ স্বীকার করে- সর্বোপরি জীবন দান করে, তখন ঐ ত্যাগ তথা জীবন দানকে উৎসর্গ বলে। উৎসর্গের নানান ধরণ রয়েছে, যেমন, নবান্নের ফসল, নতুন গাছের ফল, প্রথম উপার্জনের অর্থ- মন্দিরে, মসজিদে বা মঠে দান করা অথবা সাধু-সন্যাসী বা গরীব-দু:খীর মাঝে বিলিয়ে দেয়া। আর এসবই উৎসর্গের সদর্থক দিক। অন্যদিকে উৎসর্গের নঞর্থক দিক হল- দেবতার উদ্দেশ্যে নরবলি বা পশুবলি দেয়া। সন্তানের মঙ্গল কামনায় পশু কোরবানি বা আকিকা (জানের ছদকা) দেয়া ইত্যাদি। 


কেউ কেউ মৃত ব্যক্তির আত্মার শান্তি কামনায় দরগাহে, মসজিদে বা মন্দিরে অর্থ ও অন্যান্য দ্রব্যাদি দান করে থাকে অথবা ঐ মৃতের জন্যে কলেমা, দোয়া-দৃুরূদ, মন্ত্র বা হরি নাম পাঠ করে গোরস্থান বা শ্মশানের খাদেম, মসজিদের ঈমাম বা মন্দিরের পুরোহিত বরাবর জানিয়ে দেয়- এসবও এক ধরণের উৎসর্গ। সত্যি বলতে কি, উৎসর্গের নানান ধরণ রয়েছে বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায়ের মধ্যে যা বলে শেষ করা যাবে না। তাওরাত ও যবুরেই তো রয়েছে অনেক ধরণের উৎসর্গের কথা, যেমন, ঢালন উৎসর্গ (লেবীয়, ২৩:১৩; যবুর, ১৬:৪), দোলন উৎসর্গ, দোষ উৎসর্গ, ধূপ উৎসর্গ, স্ব-ইচ্ছায় করা উৎসর্গ (যবুর, ৫৪:৬), পাপ উৎসর্গ (যবুর, ৪০:৬), পোড়ান উৎসর্গ (যবুর, ২০:৩), যোগাযোগ উৎসর্গ (যবুর, ৫৬:১২), প্রথম তোলা শস্যের উৎসর্গ, প্রাত:কালীন উৎসর্গ ও সান্ধ্যকালীন উৎসর্গ (যবুর, ১৪১:২) ইত্যাদি। 


এইসব উৎসর্গ ও তার তাৎপর্য বিষয়ে যবুরে বলা হয়েছে- “ঈমানদারগণ তাদের ঈমানের কেবলমাত্র বাইরের চিহ্ন হিসেবে কোন কিছু কোরবানি করত। আর পশু কোরবানির রক্ত তাদের মনে করিয়ে দিত যে, খোদার বিরুদ্ধে করা গুনাহ ভীষণ খারাপ এবং তার শাস্তি মৃত্যু। এইসমস্ত উৎসর্গের মধ্যদিয়ে লোকেরা সকলের সামনে তাদের গুণাহ স্বীকার করত এবং খোদার ক্ষমা পাবার সাক্ষ্য দিত। (যবুর, পৃষ্ঠা ২৬৯) আর পাপ উৎসর্গ কেবল লেবীয় ঈমামগণই করতে পারতেন। আর তারা তা করতেন একজনের পক্ষ হতে বা সমস্ত জাতির পক্ষ হতে। আর পশু বা খাদ্য বস্তুর যে কোনটি এই পাপার্থে উৎসর্গ করা যেত।


কোরআনে কোরবানি সম্পর্কে বলা হয়েছে- “আমি তোমাকে কাওছার (ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ) দান করেছি। সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ কায়েম কর ও কোরবানি দাও।”-(কাওছার, ১০৮:১-৩) এছাড়া সাফফাত: ১০২-১০৮; বাকারা: ১৯৬-১৯৭; হজ্জ:৩৩-৩৭; মায়িদা: ২, ৯৭ আয়াতেও কোরবানির কথা উল্লেখ রয়েছে।


সূরা হজ্জ্বে বলা হয়েছে- “আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্যে কোরবানি নির্ধারণ করেছি, যাতে তারা আল্লাহর দেয়া চতুস্পদ জন্ত্তু জবেহ করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। অতএব তোমাদের আল্লাহ তো একমাত্র আল্লাহ। সুতরাং তাঁরই আজ্ঞাধীনে থাক এবং বিনয়ীগণকে সুসংবাদ দাও।”-(হজ্জ:৩৪)


এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তফসীরকারীগণ বলেন- “এই আয়াতের প্রথমেই কোরবানির ঐতিহাসিক তত্ত্বের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। আল্লাহ জানাচ্ছেন যে, এই কোরবানির কাজটি মুসলিমদের জন্যে কোন অভিনব বিধান নহে। তিনি পূর্ববর্তী প্রত্যেক সম্প্রদায়ের (প্রত্যেক নবীর উম্মত) জন্যেই কোরবানির ব্যবস্থা করেছিলেন। ইব্রাহিম, ইয়াকুব, মূসা প্রভৃতি নবীর উম্মতের মধ্যে কোরবানির ব্যবস্থা ছিল। তাছাড়া অগ্নি উপাসক ও মূর্ত্তিপূজক সম্প্রদায়ের মাঝেও বলিপ্রথা ছিল। সুতরাং এ কোন নতুন বিধি নহে। কোরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর নামে পালিত পশু উৎসর্গ করে তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করা। আর এর মাধ্যমে বিনয়ী বিশ্বাসীগণকে আল্লাহ জানাচ্ছেন যে, এই কাজের বিনিময়ে তাদের জন্যে প্রচুর কল্যাণ রয়েছে।


অন্যদিকে এর অন্তর্নিহীত তৎপর্য হল- আল্লাহর একত্ব উপলব্ধি করা এবং তা ঘোষণা করা। ইসলামে কোরবানির ধারণা, ক্রুদ্ধ দেবদেবীকে সন্তুষ্ট করা নহে, অথবা কারও পাপের প্রায়শ্চিত্ত করাও নহে বরং আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহর পথে ব্যক্তির সমস্তকিছু (ব্যক্তির যাবতীয় কূ-প্রবৃত্তির (কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ) বিনাশ ঘটিয়ে সম্পদ ও শক্তি) উৎসর্গ করা।”


মুসলিমদের “ঈদুল আহযা” বা কোরবানির এই উৎসব চালু হয়েছে ইব্রাহিম স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে পুত্র ইসমাঈলকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোরবানি করার মধ্য দিয়ে। ইব্রাহিম মুসলিম, খৃষ্টান ও ইহুদি- সকলেরই আদিপিতা, তথাপি কেবল মুসলিমগণই ইব্রাহিমের ঐ কোরবানির স্মৃতি স্মরণ করে উৎসব পালন করে থাকে এবং পশু কোরবানি দেয়।


কালের পরিক্রমায় টিকে থাকা প্রাচীন তিনটি ঐশীগ্রন্থের (তাওরাত, যবুর ও ইঞ্জিল) সবকটি ইব্রাহিমের উৎসর্গীত সন্তানটি ইসহাক বলে উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে সর্বশেষ ঐশীগ্রন্থ কোরআন সন্তানটির পরিচয় সুনির্দিষ্ট না করলেও অধিকাংশ মুসলিম সেটি ইসমাঈল বলে বিশ্বাস করে।


কেন এই দ্বি-মত? এটি জানতে এবং সত্য উৎঘাটনে আমাদেরকে সবগুলো কিতাবের বাণীই পুংখানুপুংখ রূপে বিচার ও বিশ্লেষণ করতে হবে। দেখা যাক কিতাব সমূহে কি রয়েছে-


ইঞ্জিল বা বাইবেল (নতুন নিয়ম):

“যদিও সারার সন্তান হবার বয়স পার হয়ে গিয়েছিল তবুও বিশ্বাসের জন্যেই তিনি গর্ভ ধারণ করার শক্তি পেয়েছিলেন, ... এইজন্য বয়সের দরুণ জরা দেহ নিয়েও ইব্রাহিম আসমানের তারার মত এবং সাগর পারের বালুকণার মত অসংখ্য সন্তানের পিতা হয়েছিলেন।” -(ইব্রাণী ১১:১১-১২)

“ইব্রাহিমকে পরীক্ষা করার সময়ে তিনি খোদার উপর বিশ্বাসের জন্যই ইসহাককে কোরবানি দিয়েছিলেন। যার নিকটে খোদা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তিনিই তার একমাত্র পুত্রকে কোরবানি দিতে যাচ্ছিলেন। এই সেই পুত্র যার বিষয়ে খোদা বলেছিলেন- “ইসহাকের বংশকেই তোমার বংশ বলে ধরা হবে।” ইব্রাহিম তাকে কোরবানি দিতে রাজি হলেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, খোদা মৃতকে জীবিত করতে পারেন। আর সত্যি বলতে কি ইব্রাহিম তো মৃত্যুর দুয়ার হতেই ইসহাককে ফিরিয়ে নিয়েছিলেন।” -(ইব্রাণী ১১:১৭-১৯)


তাওরাত বা বাইবেল (পুরাতন নিয়ম):

“ইব্রাহিমের স্ত্রী সারীর তখনও কোন সন্তানাদি হয়নি। হাজেরা নামে তার একজন মিশরীয় বাঁদী ছিল। একদিন সারী ইব্রাহিমকে বললেন, “দেখ, খোদা আমাকে বন্ধ্যা করেছেন। সুতরাং তুমি আমার বাঁদীর কাছে যাও। হয়ত: তার মধ্য দিয়ে আমি সন্তান লাভ করব।”

ইব্রাহিম সারীর কথায় রাজী হলেন। তাই কনান দেশে ইব্রাহিমের দশ বৎসর কেটে যাবার পর সারী তার মিশরীয় বাঁদী হাজেরার সঙ্গে তার বিবাহ দিলেন। ইব্রাহিম হাজেরার কাছে গেলে পর সে গর্ভবতী হল। যখন সে বুঝতে পারল যে সে গর্ভবতী হয়েছে, তখন সে তার মনিবপত্নীকে তুচ্ছ করতে লাগল। এতে সারী ইব্রাহিমকে বললেন, “আমার প্রতি তার এই আচরণের জন্য অাসলে তুমিই দায়ী। আমার বাঁদীকে আমি তোমার বিছানায় তুলে দিয়েছিলাম। কিন্তু সে এখন গর্ভবতী হয়েছে জেনে আমাকে তাচ্ছিল্য করতে শুরু করেছে।... ”

জবাবে ইব্রাহিম সারীকে বললেন, “দেখ, তোমার বাঁদী তো তোমার হাতেই আছে। তোমার যা ভাল মনে হয় তার প্রতি তুমি তাই কর।”

তখন সারী হাজেরার প্রতি এমন নিষ্ঠুর ব্যবহার করতে লাগলেন যে, হাজেরা তার নিকট হতে পালিয়ে গেল। পথে মরুভূমির মধ্যে একটি পানির ফোয়ারার নিকট মাবুদের ফেরেস্তা হাজেরাকে দেখতে পেলেন। ফোয়ারাটি ছিল শূর নামে একটি জায়গায় যাবার পথে। ফেরেস্তা বললেন, “সারীর বাঁদী হাজেরা, তুমি কোথা থেকে আসছ আর কোথায় বা যাচ্ছ?”

জবাবে হাজেরা বললেন, “আমি আমার মনিবপত্নী সারীর নিকট হতে পালিয়ে যাচ্ছি।”
তখন মাবুদের ফেরেস্তা বললেন, “তোমার মনিবপত্নীর নিকট ফিরে গিয়ে আবার তার অধীনতা স্বীকার করে নাও।” তিনি তাকে আরও বললেন, “আমি তোমার বংশের লোকদের সংখ্যা এমন বাড়িয়ে তুলব যে, তাদের সংখ্যা গণনা করে শেষ করা যাবে না।”

মাবুদের ফেরেস্তা হাজেরাকে আরও বললেন, “দেখ, তুমি গর্ভবতী, তোমার একটা পুত্র সন্তান হবে। আর সে্ই পুত্রের নাম তুমি ইসমাঈল রাখবে। কারণ তোমার দু:খের কান্নায় মাবুদ কান দিয়েছেন।...”

এই কথা শুনে হাজেরা মনে মনে বললেন, “আমি কি তা হলে সত্যই তাঁকে দেখলাম যাঁর দৃষ্টির সম্মুখে আমি আছি।”
....পরে হাজেরার একটি পুত্র সন্তান হল, আর ইব্রাহিম তার নাম দিলেন ইসমাঈল। ইব্রাহিমের ৮৬ বৎসর বয়সে ইসমাঈলের জন্ম হয়েছিল।” -(জেনেসিস ১৬:১৬)

“খোদা ইব্রাহিমকে আরও বললেন, “তোমার স্ত্রী সারীকে আর সারী বলে ডাকবে না। তার নাম হবে সারা। আমি তাকে রহমত করে তার মধ্য দিয়ে একটি পুত্র সন্তান দেব। আমি তাকে আরও রহমত দান করব যাতে সে অনেক জাতির এবং তাদের নৃপতিদের আদি মাতা হয়।”


এ কথা শুনে ইব্রাহিম উবু হয়ে পড়লেন এবং হেসে মনে মনে বললেন, “তাহলে সত্যই ১০০ বৎসরের বৃদ্ধ লোকের সন্তান হবে আর তা হবে ৯০ বৎসরের স্ত্রীর গর্ভে!” পরে ইব্রাহিম খোদাকে বললেন, “আহা, ইসমাঈলই যেন তোমার দয়ায় বেঁচে থাকে!”


তখন খোদা বললেন, “তোমার স্ত্রীর সারার সত্যই পুত্র সন্তান হবে। আর তুমি তার নাম রাখবে ইসহাক।.... তবে ইসমাঈল সম্বন্ধে তুমি যা বললে তা আমি শুনলাম। শোন, আমি তাকেও রহমত দান করব এবং অনেক সন্তান দিয়ে তার বংশের লোকদের সংখ্যা অনেক বাড়িয়ে দেব। সেও ১২ গোষ্ঠির নেতার আদি পিতা হবে এবং তার মধ্য দিয়েও আমি একটি মহাজাতি গড়ে তুলব।  কিন্তু ইসহাকের মধ্য দিয়েই আমি আমার ব্যবস্থা চালু রাখব। আগামী বৎসর এই সময়ে সে সারার কোলে আসবে।”- (জেনেসিস ১৬:১৫-২১)


“মাবুদ তাঁর কথা মতই সারার দিকে মনোযোগ দিলেন এবং তিনি তার জন্য যা করবেন বলে  ওয়াদা করেছিলেন তা করলেন। এতে সারা গর্ভবতী হলেন।...

ইব্রাহিম সারার গর্ভের এই সন্তানের নাম রাখলেন ইসহাক।... ইব্রাহিমের বয়স যখন ১০০ বৎসর তখন তার পুত্র ইসহাকের জন্ম হয়েছিল। সারা বলেছিলেন, “খোদা আমার মুখে হাসি ফোটালেন, আর সেকথা শুনে অন্যের মুথেও হাসি ফুটবে।” তিনি আরও বলেছিলেন, “সারা যে সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াবে এই কথা এর আগে কে ইব্রাহিমকে বলতে পারত? অথচ তার এই বৃদ্ধ বয়সেই তার সন্তান আমার কোলে এল।” -(জেনেসিস ২১:৭)

“ইসহাক বড় হলে পর যে দিন তাকে মায়ের দুধ ছাড়ান হল সেদিন ইব্রাহিম একটি ভোজ দিলেন। সারা দেখলেন, মিশরীয় হাজেরার গর্ভে ইব্রাহিমের যে সন্তানটি জন্ম নিয়েছে সে ইসহাককে নিয়ে তামাশা করছে। এই অবস্থা দেখে তিনি ইব্রাহিমকে বললেন, “পুত্রসহ ঐ বাঁদীকে বের করে দাও কারণ ঐ পুত্র আমার ইসহাকের সঙ্গে বিষয়-সম্পত্তির ওয়ারিশ হতে পারবে না।”


পুত্র ইসমাঈলের এই ব্যাপার নিয়ে ইব্রাহিমের মনের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু খোদা তাকে বললেন, “তোমার বাঁদী ও তার পুত্রের কথা ভেবে মন খারাপ কোরও না। সারা তোমাকে যা বলেছে তুমি তাই কর, কারণ ইসহাকের বংশকেই তোমার বংশ বলে ধরা হবে। তবে সেই বাঁদীর পুত্রের মধ্য দিয়েও আমি একটি বংশ গড়ে তুলব, কারণ সেও তো তোমার সন্তান।” -(জেনেসিস ২১:৮-১৩)


“তখন ইব্রাহিম প্রত্যুষে উঠে কিছু খাবার আর পানি ভরা একটি চামড়ার থলি হাজেরার কাঁধে তুলে দিলেন। তারপর পুত্রটিকে তার হাতে তুলে দিয়ে তাকে বিদায় করে দিলেন। সেই জায়গা হতে বের হয়ে হাজেরা শেবার মরুভূমিতে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। থলির পানি যখন শেষ হয়ে গেল, তখন তিনি পুত্রকে একটি ঝোপের নীচে শুইয়ে রাখলেন্। তারপর তিনি একটি তীর ছুড়িলে যতদুর যায় আনুমানিক ততটা দূরে গিয়ে বসে রইলেন। “পুত্রের মৃত্যু যেন আমাকে দেখতে না হয়।”, মনে মনে একথা বলে তিনি সেখানে বসেই জোরে জোরে কাঁদতে লাগলেন। পুত্রটির কান্না কিন্তু খোদার কানে গিয়ে পৌঁছিল। তখন খোদার ফেরেস্তা বেহেস্ত হতে হাজেরাকে ডেকে বললেন, “হাজেরা তোমার কি হয়েছে? ভয় কোরও না, কারণ ছেলেটি যেখানে আছে সেই জায়গা হতেই তার কান্না খোদার কানে গিয়ে পৌঁছেছে। তুমি উঠে পুত্রকে কোলে তুলে শান্ত কর, কারণ আমি তার মধ্য দিয়ে একটি মহাজাতি গড়ে তুলব।”


তারপর খোদা হাজেরার চোখ খুলে দিলেন; তাতে তিনি একটি পানিপূর্ণ একটি কূয়ো দেখতে পেলেন। সেই কূয়োর নিকটে গিয়ে তিনি তার চামড়ার থলিটা ভরে নিয়ে পুত্রকে পানি পান করালেন। খোদা সেই পুত্রটির হেফাজত করতে থাকলেন। আর সে বড় হয়ে উঠতে লাগল।...” -(জেনেসিস ২১:১৪-২০)


“এই সমস্ত ঘটনার পরে খোদা ইব্রাহিমকে এক পরীক্ষায় ফেললেন। খোদা তাকে ডাকলেন, “ইব্রাহিম!” 

ইব্রাহিম জবাব দিলেন, “এই যে আমি।”
খোদা বললেন, “তোমার এই যে অদ্বিতীয় পুত্র ইসহাক, যাকে তুমি এত মহব্বত কর, তাকে নিয়ে তুমি মোরিয়া এলাকায় যাও। সেখানে যে পাহাড়টির কথা আমি তোমাকে বলব তার উপর তুমি তাকে পোড়ান উৎসর্গ রূপে উৎসর্গ কর।”

সেইজন্য ইব্রাহিম প্রত্যুষে উঠে একটি গাধার পিঠে গদি চাপালেন। তারপর তার পুত্র ও দু’জন গোলামকে সঙ্গে নিলেন, আর পোড়ান উৎসর্গ করার জন্য কাঠ কেটে নিয়ে যে জায়গার কথা খোদা তাকে বলেছিলেন সেদিকে রওনা হলেন। তিন দিনের দিন ইব্রাহিম চোখ তুলে চাইতেই দূর হতে সেই জায়গাটি দেখতে পেলেন, তখন তিনি তার গোলামদের বললেন, “তোমরা গাধাটি নিয়ে এখানেই থাক; আমার পুত্র আর আমি ঐখানে যাব। ঐখানে আমাদের এবাদত শেষ করে আবার আমরা তোমাদের নিকট ফিরে আসব।”

এইকথা বলে ইব্রাহিম পোড়ান উৎসর্গের জন্য কাঠের বোঝাটা তার পুত্র ইসহাকের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে নিজে আগুনের পাত্র ও ছুরি নিলেন। তারপর তারা দু’জনে এক সঙ্গে হাঁটতে লাগলেন। তখন ইসহাক তার পিতা ইব্রাহিমকে ডাকলেন, “বাবা।”
ইব্রাহিম বললেন, “বাছা, বল, কি বলবে?”
ইসহাক বললেন, “পোড়ান উৎসর্গের জন্য কাঠ ও আগুন রয়েছে দেখছি, কিন্তু ভেড়ার বাচ্চা কোথায়?”
ইব্রাহিম বললেন, “বাছা, পোড়ান উৎসর্গের জন্য ভেড়ার বাচ্চা খোদা নিজেই জুগিয়ে দেবেন।”
এই সমস্ত কথা বলতে বলতে তারা এগিয়ে গেলেন।

যে জায়গার কথা খোদা ইব্রাহিমকে বলে দিয়েছিলেন তারা সেখানে গিয়ে পৌঁছিলেন। সেখানে পৌঁছে ইব্রাহিম একটা বেদী তৈরী করে তার উপর কাঠ সাঁজালেন। পরে ইসহাকের হাত-পা বেঁধে তাকে সেই বেদীর কাঠের উপর রাখলেন। তারপর তিনি পুত্রকে জবেহ করার জন্য ছুরি হাতে নিলেন। এমন সময় মাবুদের ফেরেস্তা বেহেস্ত হতে তাকে ডাকলেন, “ইব্রাহিম, ইব্রাহিম।”

ইব্রাহিম জবাব দিলেন, “এই যে আমি।”
ফেরেস্তা বললেন, “পুত্রকে জবেহ করার জন্য হাত তুলো না বা তার প্রতি আর কিছুই কোরও না। তুমি যে খোদা ভক্ত তা এখন বোঝা গেল, কারণ আমার নিকট তুমি তোমার পুত্রকে, একমাত্র সন্তানকেও উৎসর্গ করতে পিছপা হওনি।”

ইব্রাহিম তখন চারিদিকে তাকালেন এবং দেখলেন তার পিছনে একটা ভেড়া রয়েছে আর তার শিং ঝোপে আঁটকে আছে। তখন ইব্রাহিম গিয়ে ভেড়াটি নিলেন এবং পুত্রের বদলে সেই ভেড়াটি তিনি পোড়ান উৎসর্গের জন্যে ব্যবহার করলেন।” -(জেনেসিস ২২:১৩)

কোরআন:
ইসমাঈল ও ইসহাকের জন্মের বিষয়ে বলা হয়েছে-
... সে (ইব্রাহিম) বলল, “তোমরা স্বহস্তে নির্মিত পাথরের পূঁজা কর কেন? অথচ আল্লাহ তোমাদেরকে এবং তোমরা যা নির্মাণ করছ সবই সৃষ্টি করেছেন। তারা বলল, “এর জন্যে এক অগ্নিকুন্ড তৈরী কর এবং অত:পর তাকে ঐ অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ কর।” তারপর তারা তার বিরুদ্ধে এক মহা ষড়যন্ত্র আাঁটতে চাইল কিন্তু আমি তাদেরকেই পরাভূত করে দিলাম। 

সে বলল, “আমি আমার পালনকর্তার দিকে চাইলাম। তিনি আমাকে পথ প্রদর্শণ করবেন। হে আমার পরওয়ারদেগার আমাকে এক সৎপুত্র দান কর।” সুতরাং আমি তাকে এক সহনশীল পুত্রের সুসংবাদ দিলাম।-(সূরা সাফফাত, ৯৫-১০১)

তার স্ত্রীও দাঁড়িয়েছিল নিকটেই। সে হেসে ফেলল। অত:পর আমি তাকে ইসহাকের জন্মের সু-খবর দিলাম এবং ইসহাকের পরে ইয়াকুবেরও। সে বলল, “হায় আমার কপাল! আমি সন্তান প্রসব করব? অথচ আমি বার্ধ্যকের শেষপ্রান্তে এসে উপনীত হয়েছি আর আমার স্বামীও বৃদ্ধ, এতো ভারী অদ্ভূত কথা!--(সূরা হুদ, ৭১-৭২)

অত:পর তাদের সম্পর্কে সে মনে মনে ভীত হল। তারা বলল, “ভয় পেও না।”
তারা তাকে এক জ্ঞানী পুত্রের সংবাদ দিল। অত:পর তার স্ত্রী চিৎকার করতে করতে সামনে এল এবং কপালে করাঘাত করে বলল, “আমি তো বন্ধ্যা!”
তারা বলল, “তোমাদের পালনকর্তা এরূপই বলেছেন। নিশ্চয় তিনি প্রাজ্ঞময়, সর্বজ্ঞ।” -(সূরা আয-যারিয়াত, ২৮-৩০)

“.....আমি তাকে দান করলাম ইসহাক ও ইয়াকুবকে এবং প্রত্যেককে নবী করলাম।” -(সূরা মরিয়ম, ৪৯) আমি তাকে দান করেছি ইসহাক ও ইয়াকুব। প্রত্যেককেই আমি পথপ্রদর্শক করেছি।...” -(সূরা আনআম, ৮৪) আমি তাকে সুসংবাদ দিয়েছি ইসহাকের, সে সৎকর্মীদের মধ্য থেকে একজন নবী। -(সূরা সাফফাত, ১১২) আমি তাকে দান করলাম ইসহাক ও পুরস্কার স্বরূপ দিলাম ইয়াকুব এবং প্রত্যেককেই সৎকর্মপরায়ণ করলাম। -(সূরা আম্বিয়া, ৭২) আমি তাকে দান করলাম ইসহাক ও ইয়াকুব, তার বংশধরদের মধ্যে নবূয়্যত ও ফিতার রাখলাম... -(সূরা আনকাবুত, ২৭)

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি আমাকে এই বার্ধক্যে ইসমাঈল ও ইসহাককে দান করেছেন। নিশ্চয়ই আমার পালনকর্তা প্রার্থনা শুনে থাকেন। -(সূরা ইব্রাহিম, ৩৯)  

উপরের আয়াতগুলো থেকে দেখা যাচ্ছে ইসমাঈল নয় বরং ইসহাকের নামটিই কোরআনে অধিক সংখ্যক বার উল্লেখিত হযেছে। যাহোক, এখন দেখা যাক সন্তান উৎসর্গের বিষয়ে কোরআনে কি বলা হয়েছে-

তারপর যখন সে তার পিতার সঙ্গে কাজ করার মত বয়সের হল তখন ইব্রাহিম তাকে বলল, “বাছা! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে কোরবানী করছি, এখন তোমার কি বলার আছে?”
সে বলল, “পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে তাই করুন! আল্লাহর ইচ্ছায়, আপনি দেখবেন আমি ধৈর্য্য ধরতে পারি।” 

তারা দু’জনে যখন আনুগত্য প্রকাশ করল ও ইব্রাহিম তার পুত্রকে (কোরবানী করার জন্যে) কাত করে শুইয়ে দিল; তখন আমি তাকে ডেকে বললাম, “হে ইব্রাহিম! তুমি তো স্বপ্নের আদেশ সত্যিই পালন করলে।”

নিশ্চয়ই এ ছিল এক স্পষ্ট পরীক্ষা! আমি (তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে) কোরবানী করার জন্যে দিলাম এক মহান জন্ত্তু এবং তাকে রেখে দিলাম পরবর্তীদের মাঝে (স্মরণীয় করে), ইব্রাহিমের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। এভাবে আমি সৎকর্মপরায়নদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি।-(সূরা সাফফাত, ৩৭:১০২-১১০)

এখানে এই “সে” কে- ইসমাঈল না ইসহাক? কোরআনে এর ভেদ ভাঙ্গা হয়নি, ফলে বিতর্ক রয়ে গেছে। 

সূরা সাফফাতের উপরের আয়াতগুলোতে ইব্রাহিমের জীবনালেখ্যর এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। আর তা হল ইব্রাহিমের ঐ কোরবানি প্রসঙ্গ: দেশবাসীর তরফ থেকে সম্পূের্ণ নিরাশ হয়েই তিনি বলেছিলেন, “আমি তো আমার পরওয়ারদেগারের দিকেই চললাম।... সেখানে আমি তাঁর এবাদত করতে পারব।” সেমত তিনি পত্নী সারা ও ভাগ্নে লুতকে সাথে নিয়ে ইরাকের বিভিন্ন অঞ্চল অতিক্রম করে অবশেষে সিরিয়ায় পৌঁছিলেন। তখন পর্যন্ত ইব্রাহিমের কোন সন্তানাদি ছিল না। তাই তিনি দোয়া করলেন, “পরওয়ারদেগার আমাকে এক সৎপুত্র দান কর।” তার এই দোয়া কবুল হয় এবং খোদা তাকে এক পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দেন- “অত:পর আমি তাকে এক সহনশীল পূত্রের সূসংবাদ দিলাম।” আর এই সন্তান জন্মলাভের ঘটনা এই-

সারা যখন দেখলেন যে, তার গর্ভে কোন সন্তান হচ্ছে না, তখন তিনি নিজেকে বন্ধ্যাই মনে করলেন। এদিকে ইব্রাহিম ও সারা বন্দী হয়ে ফেরাউনের দরবারে নীত হলে, ফেরাউন সারাকে রাজকীয় হেরেমে রাখেন এবং হাজেরা নাম্নী এক দাসীকে তার খেদমতে দান করেন। যাহোক, স্বপ্ন দর্শণে ভীত হয়ে ফেরাউন স্ব-সন্মানে দাসীসহ সারাকে ইব্রাহিমের হাতে তুলে দেন। আর অত:পর সারা নিজেকে বন্ধ্যা ভেবে ইব্রাহিমকে ঐ দাসী হাজেরাকে স্ত্রীরূপে দান করলেন। এই হাজেরার গর্ভেই এই পুত্র জন্মগ্রহণ করে। আর ইব্রাহিম তার নাম রাখেন ইসমাঈল। অত:পর যখন পুত্র পিতার সাথে চলাফেরা করার মত বয়সে উপনীত হল, তখন ইব্রাহিম তাকে বলেন, “বৎস আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে জবেহ করছি।” এই স্বপ্ন ইব্রাহিম উপর্যপরি তিন দিন দেখেন।

 ...অর্থাৎ অনেক কামনা বাসনা ও দোয়া প্রার্থনার পর পাওয়া এই প্রাণপ্রতিম পুত্রকে কোরবানি করার নির্দেশ এমন সময় দেয়া হয়েছিল, যখন পুত্র পিতার সাথে চলাফেরা করার যোগ্য হয়ে গিয়েছিল এবং লালন-পালনের দীর্ঘ কষ্ট সহ্য করার পর যখন সময় হয়েছিল আপদে-বিপদে তার পাশে দাঁড়ানোর। ... সে সময় ইসমাঈলের বয়স ছিল ১৩ বৎসর। 

... “অতএব তুমি ভেবে দেখ তোমার অভিমত কি?” 
পুত্র জবাব দিল, “পিতা, আপনাকে যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা পালন করুন।”... সে নিজের পক্ষ থেকে পিতাকে আশ্বাসও দিল যে, “ইনশাল্লাহ! আপনি আমাকে ধৈর্য্যশীলদের মধ্যে পাবেন।”
... “যখন তারা উভয়ই নত হয়ে গেল।” অর্থাৎ খোদার নির্দেশের সামনে নত হয়ে পিতা পুত্রকে জবাই করতে এবং পুত্র জবাই হতে সম্মত হল। 

...অবশেষে পিতা পুত্র উভয়ই যখন এই অভিনব এবাদত পালন করতে প্রস্তুতি নিল, তখন পুত্র পিতাকে বলল, “পিত: আমাকে শক্ত করে বেঁধে নিন যাতে আমি বেশী ছটফট করতে না পারি। আপনার পরিধেয় বস্ত্রও সামলে নিন, যাতে আমার রক্তের ছিটা তাতে না লাগে। এতে আমার সওয়াব হ্রাস পেতে পারে। এছাড়া রক্ত দেখলে আমার মা অধিক ব্যাকূল হবেন। আর আপনার ছুরিটাও ধার দিয়ে নিন এবং তা আমার গলায় দ্রুত চালাবেন যাতে আমার প্রাণ সহজে বের হয়ে যায়। কারণ মৃত্যু বড় কঠিন ব্যাপার। আপনি আমার মায়ের কাছে পৌঁছে আমার সালাম বলবেন। আর যদি আমার জামা তার কাছে নিয়ে যেতে চান তবে নিয়ে যাবেন। হয়ত: এতে তিনি কিছুটা সান্ত্বনা পাবেন।”

একমাত্র পুত্রের মুখে এসব কথা শুনে পিতার মানসিক অবস্থা যে কি হবার কথা তা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু ইব্রাহিম দৃঢ়তায় অটল পাহাড় হয়ে জবাব দিলেন: “বৎস! আল্লাহর নির্দেশ পালন করার জন্য তুমি আমার চমৎকার সহায়ক হয়েছ।” অত:পর তিনি পুত্রকে চুম্বন করলেন এবং অশ্রুপূর্ণ নয়নে তাকে বেঁধে নিলেন।

...ইব্রাহিম তাকে চিৎ করে শুইয়ে দিয়ে তার গলায় ছুরি চালালেন। কিন্তু বারবার ছুরি চালান সত্ত্বেও গলা কাটছিল না। কেননা, খোদা স্বীয় কুদরতে পিতলের একটা টুকরো মাঝখানে অন্তরায় করে দিয়েছিলেন। তখন পুত্র নিজেই বলল, “পিতা, আমাকে কাত করে শুইয়ে দিন। কারণ আমার মুখ দর্শণে আপনার মধ্যে পিতৃস্নেহ উথলে ওঠে, ফলে গলা সম্পূর্ণ কাটে না। এছাড়া ছুরি দেখে আমিও ঘাবড়ে যাই।”

...তারপর ইব্রাহিম যখন তাকে কাত করে শুইয়ে দিলেন, তখন খোদা তাকে ডেকে বলেন, “হে ইব্রাহিম! তুমি তো স্বপ্নের আদেশ সত্যিই বাস্তবে পরিণত করে দেখালে। .......এখন এই পরীক্ষা পূর্ণ হয়ে গেছে। তাই তাকে ছেড়ে দাও।” বিনিময়ে আমি জবাই করার জন্যে তাকে এক মহান জন্তু দিলাম।

... মোটকথা, ইব্রাহিম এসব গায়েবী আওয়াজ শুনে উপরে তাকালে জিব্রাইলকে একটা ভেড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। আর তিনি পরে ঐ ভেড়াটি কোরবানি করেন।

এই হল কোরবনির কাহিনী এবং এটাই সত্য। কেননা ইব্রাহিম যখন সপ্নাদিষ্ট হয়েছেন তখন তার বয়স ছিল ১০০ বৎসর। আর ইসমাঈলের বয়স ছিল ১৩ বৎসর। অন্যদিকে ইসহাক তখন নবজাতক শিশু মাত্র। আর এই ১৩ বৎসর যাবৎ ইসমাঈল ছিল ইব্রাহিমের এক মাত্র প্রিয়পুত্র। আর তাওরাত থেকে আমরা জানতে পারি- সারা সন্তান প্রসব করার পর নানা কারণে ক্ষিপ্ত হযেছেন হাজেরা ও তার পুত্রের প্রতি- “পুত্রসহ ঐ বাঁদীকে বের করে দাও কারণ ঐ পুত্র আমার ইসহাকের সঙ্গে বিষয়-সম্পত্তির ওয়ারিশ হতে পারবে না।”- (জেনেসিস ২১:১০) সুতরাং কোরবানি দিতে হবে ইসমাঈলকেই এছিল অনেকটা সেই সময়ের রায়। 

এখন প্রশ্ন হল, তাহলে অন্যান্য কিতাব, যথা তাওরাত, যবুর ও ইঞ্জিলে কেন কোরবানির পাত্র হিসেবে ইসহাককে নির্দিষ্ট করা হয়েছে? কারণ হল-

প্রথমত: অন্যান্য কিতাবগুলোর ধারক ও বাহক সকলেই ছিল ইসহাকের বংশধর তথা উত্তরসূরী এবং ইসহাকের মা বিবি সারাই ছিলেন ইব্রাহিমের প্রকৃত স্ত্রী। তাদের ভাষায়- “ইব্রাহিমের দু’টি পুত্র ছিল, তাদের একজনের মাতা ছিলেন বাঁদী ও অপরজনের মাতা ছিলেন ইব্রাহিমের প্রকৃত “স্বাধীন” স্ত্রী। স্বাভাবিকভাবে সেই বাঁদীর সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিল, কিন্তু যিনি “স্বাধীন” ছিলেন তার সন্তানটি খোদার প্রতিজ্ঞার ফলে জন্মগ্রহণ করেছিল।” -(গালাতীয়, ৪:২২-২৩) “তাহলে দেখা যাচ্ছে আমরা বাঁদীর সন্তান নই, বরং আমরা “স্বাধীন” স্ত্রীর সন্তান।” -(গালাতীয়, ৪:৩১)

অর্থাৎ তারা বিবি হাজেরাকে ইব্রাহিমের স্ত্রীর মর্যাদা দিতেও রাজী নয়, একই সাথে রাজী নয় বাঁদীর সন্তান ইসমাঈলকে পিতা ইব্রাহিমের সন্তান হিসেবেও স্বীকৃতি দিতে। ইঞ্জিলে তাই রয়েছে-

“বাঁদী ও তার পুত্রকে বের করে দাও
কারণ বাঁদীর পুত্র কোন মতেই
“স্বাধীন” স্ত্রীর পুত্রের সঙ্গে
পিতার সম্পত্তির ভাগ পাবে না।” --(গালাতীয়, ৪:৩০)

সুতরাং যেহেতু তারা ইব্রাহিমের পুত্র বলতে কেবলমাত্র ইসহাককেই স্বীকার করে, সেহেতু কোরবানির পাত্র বলতে তারা ইব্রাহিমের একমাত্র পুত্র ইসহাককেই ধরে নেয়।

দ্বিতীয়ত: তাদের রয়েছে খোদার মনোনীত উৎসর্গকৃতের উত্তরাধিকারী না হতে পারার মানষিক হীনমন্যতা। এ কারণেই ইব্রাহিমের স্বপ্নের অলঙ্কারে সাজাতে চেয়েছে ইসহাককে। আর এজন্যে তাদের যা করতে হয়েছে তা হল-বাইবেলে “মারওয়া” পর্বতকে “মোরিয়া” বলে উল্লেখ করা এবং ইসমাঈলের নামের স্থলে ইসহাক বসিয়ে দেয়া।

এ্ই “মারওয়া” হল মক্কার অদূরে অবস্থিত একটি পর্বত যেখানে ইব্রাহিম তদীয় স্ত্রী হাজেরাকে শিশুপুত্র সহ আল্লাহর ইচ্ছায় ছেড়ে গিয়েছিলেন। আর প্রকৃত পক্ষে মরুর বুকে তাদেরকে পরিত্যাগ করার মধ্য দিয়েই তো একপ্রকারে স্বপ্নাদিষ্ট কোরবানি পূর্ণই হয়ে গিয়েছিল।

ইসহাকের বংশে নবুয়্যতের ধারা কায়েম থাকলেও ইসমাঈলের বংশে পয়গম্বর এসেছেন কেবল একজন। আর তিনি হলেন মুহম্মদ, যার মাধ্যমে নবুয়্যতের ধারারই পরিসমাপ্তি ঘটেছে। আর তিনিই প্রথম পুরুষ যিনি মরুর উত্তপ্ত বালুরাশির স্তুপ সরিয়ে বের করে এনেছেন প্রকৃত ইতিহাস, প্রতিষ্ঠিত করেছেন হাজেরার স্ত্রীর অধিকার ও ইসমাঈলের পুত্রত্বের দাবী। আর জগৎ লাভ করেছে একটি সর্বজনীন ধর্মীয় বিশ্বাস।

সমাপ্ত।

এক মানবতাবাদী(!) পাঠক আমার কাছে ইব্রাহিমের নীতি ও নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন তার সন্তান উৎসর্গের বিষয় নিয়ে। আমি বললাম ইব্রাহিম ও তার পুত্রের এ কাহিনী খোদা ঐশী গ্রন্থের মাধ্যমে জানাচ্ছেন তাঁর প্রতি তাদের বিশ্বস্ততা ও ভালবাসার গভীরতা কতটা ছিল তা মানুষকে উপলব্ধির জন্যে, যেন তারা এ কাহিনী থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং তাঁর প্রতি তেমনি ভালবাসা দেখায় ও বিশ্বস্ত থাকে যেমনিভাবে ইব্রাহিম ও তদীয় পুত্র ইসমাঈল ছিল, যাতেকরে তারা দুনিয়াতে কল্যাণ প্রাপ্ত হয় এবং আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্থদের দলভূক্ত না হয়ে পড়ে। অন্যদিকে আপনারা কি করছেন? অাপনারা তা উপলব্ধি না করে বরং সন্তান উৎসর্গের জন্য ইব্রাহিমের বা মুহম্মদের ৬ বৎসরের বালিকা বিবাহ নিয়ে আজ নীতি-নৈতিকতার প্রশ্ন তুলছেন, যদিও আপনারা ভাল করেই জানেন, নীতি-নৈতিকতা সময়ের সাথে পরিবর্তণশীল, কেননা তৎকালীন সময়ে ওগুলো কোন অনৈতিক কাজ হিসেবে বিবেচিত ছিল না। -তা আপনারা কেন তাদের নৈতিকতার প্রশ্ন না তুলে সরাসরি হত্যার পরিকল্পণা ও তা বাস্তবায়নে অংশগ্রহণের জন্য ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে এবং ঐ পরিকল্পনায় একাত্মতা ও সহযোগিতার অপরাধে ইসমাঈলের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিচ্ছেন না?


উৎস:

Qur'an;
Bible:
Sirat Rasul Allah-Ibn Ishaq 
Musnad of Ahmad;
Jāmi` al-bayān `an ta'wīl āy al-Qur'ān, al-Ṭabarī;
Mishkat al-Masabih by Mohammed bin Abdullah al-Khatib at-Tabrizi;
Encyclopaedia Judaica;
Muruj al-Dhahab, al-Mas'udi, 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন