২৯ মার্চ, ২০১২

Rome: রোমক সভ্যতার উৎপত্তি ও বিকাশ।

রোম (Rome) নগরী, কিম্বদন্তী অনুযায়ী এটি ৭৫৩ খ্রীঃপূঃ ইটালীর তিবর (টাইবার) নদীর তীরস্থ বাম পার্শ্ববর্তী টিলাগুলোর উপরে, মোহনা থেকে ২৫ কিমি দূরে সৃষ্টি হয়েছিল এবং পরবর্তীতে এটির সাম্রাজ্য ভূ-মধ্য সাগরীয় অঞ্চলে ব্যাপকভাবে প্রসারিত হয়ে উত্তর দিকে ইউরোপ পর্যন্ত দূর-প্রাচ্যে বিস্তারলাভ করেছিল। আর শতাব্দীর পর শতাব্দী এটি সভ্য জগতের উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। 

নেকড়ে মাতার দুধপানরত রোমলুস ও রেমুস।
কিম্বদন্তী রয়েছে, ল্যাটিন ভাষাভাষী রাজ্যের কোন একটির রাজা নিজের এক আত্মীয়ার দু‘ই শিশু পুত্র সন্তান রোমলুস ও রেমুসকে তিবর নদী গর্ভে বিসর্জন দেবার হুকুম জারী করেন। কেননা, তার ভয় ছিল এরা বড় হয়ে তার সিংহাসন কেড়ে নেবে। বিসর্জন দেবার পরে তিবর নদীতে বন্যা আসায় যে ঝুড়িতে করে শিশু দু‘টিকে পানিতে ভাসিয়ে দেয়া হয়, তা বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে এক গাছের ডালে আঁটকে যায়। এভাবে শিশু দু‘টির প্রাণ বাঁচে। তারপর তারা একটি নেকড়ে বাঘের হাতে পড়ে এবং নেকড়ে মায়ের দুধ খেয়েই তারা বড় হচ্ছিল। পরে এক রাখাল তাদের দেখতে পেয়ে স্বগৃহে নিয়ে এসে দু‘ভাইকে মানুষ করতে থাকে। ভ্রাতৃদ্বয় যথারীতি (গল্প কাহিনীতে যেমন হয়) অমিত বিক্রম যোদ্ধারূপে বড় হয়ে ওঠে। তারপর ঐ রাজার বিরুদ্ধে তারা বিদ্রোহ পরিচালনা করে রাজাকে হত্যা করে। অত:পর তারা উভয়ে নগর পত্তন করতে চায়, কিন্তু কোথায় নগর গড়া হবে এবং কে তার পরিচালনার ভার নেবে তাই নিয়ে দু‘ভাইয়ের মধ্যে বিবাদ শুরু হয়। এই বিবাদে রোমলুস রেমুসকে হত্যা করে।

প্রাচীন রোম নগরী।
যে স্থানে রাখাল দু‘শিশু পুত্রকে খুঁজে পেয়েছিল তার নিকটে পত্তন হয় রোম নগরী, ল্যাটিন ভাষায় যাকে বলা হয় রোমা। যতদূর জানা যায়, খ্রী:পূ: ৭৫৩ অব্দে রোম নগরীর পত্তন হয়েছিল এবং এদিন থেকেই রোমকগণ বৎসর গণনা শুরু করেছিল। রোমের ক্যাপিটালিজম টিলার উপরে নেকড়ে জননীর মূর্ত্তি তৈরী করে রাখা হয়েছিল, এখন সেটি জাদুঘরে সংরক্ষিত হচ্ছে।

যা হোক, রোম নগরী মোট সাতটি টিলার উপরে ছড়িয়ে সৃষ্টি হয়েছিল। এ নগরীর অবস্থান নানান দিক থেকে সুবিধাজনক ছিল। নগরের চতুষ্পার্শ্বে ছিল উর্বর শস্যক্ষেত; তিবর নদীর মোহনায় ছিল বন্দর; সেখান থেকে রোমের ভিতর দিয়ে রাস্তা চলে গিয়েছিল ইতালীর গভীরে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সওদাগর ও কারিগরেরা এসে ধীরে ধীরে বসত করতে শুরু করল রোমে। 

খ্রী:পূ: ৬ষ্ঠ শতকের শেষভাগে এক নিষ্ঠুর রাজা শাসন করত রোম। একসময় রোমবাসী তাকে দেশ থেকে বিতাড়িত করে। এরপরে প্রতি বৎসর অনুষ্ঠিত একটি জনসভায় পাত্রিৎসিউ তথা পিতৃবংশীয়দের মধ্য থেকে দু‘জন শাসক- এদের বলা হত কন্সুল- নির্বাচন করা হত। এক বৎসরের জন্যে এই কন্সুলদ্বয় রোমের শাসনভার পরিচালনা করতেন। বিচার কার্য চালানোর ভারও ছিল তাদের উপরে এবং যুদ্ধবিগ্রহের সময় তারা সেনাপতি হতেন। অন্যান্য পদস্থ ব্যাক্তিরা অবশ্য এসব কাজে তাদেরকে সাহায্য করত, এই লোকজনও আবার প্রতি বৎসর অনুরূপ এক জনসভায় পাত্রিৎসিউদের মধ্য থেকেই নির্বাচিত হত এক বৎসর মেয়াদী কাজ করার জন্যে। এই এক বৎসর সর্বাপেক্ষা উচ্চ পদস্থ ব্যক্তি রূপে গণ্য হতেন সিনেটের সভ্যগণ যাদের তারা ডাকত সিনেটর বলে।

রোমের ৭টি টিলা।

সিনেটের ক্ষমতা ছিল অসীম। যুদ্ধবিগ্রহ যখন নেই অর্থাৎ শান্তির সময়ে সমস্ত প্রকার কাজকর্ম কন্সুলেরা সিনেটের পরামর্শ নিতে বাধ্য থাকত। কোষাগার, যুদ্ধ ও দেশের শান্তি রক্ষা ইত্যাদি সমস্ত দায়িত্ব সিনেটই বহন করত। কোন সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে জনসভা আহবান করে তা জনগণকে জানিয়ে দেয়া হত এবং জনগণ তা মান্য করত।

উত্তর ইতালীতে বসবাসকারী গল উপজাতি খ্রী:পূ: ৪র্থ শতাব্দীর প্রারম্ভে রোম আক্রমণ করল। লম্বা, ঝাঁকড়া চুলো এবং প্রকান্ড তরবারী এবং বিরাটাকার ঢাল দ্বারা সুসজ্জ্বিত বিশাল দেহের অধিকারী গলরা দেখতে ছিল ভয়াল দর্শণ। তাদের প্রচন্ড আক্রমণে রোমক সেনাবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। রোম দখল করে তারা নগর লুন্ঠন করে এবং আগুন দিয়ে পুড়িয়ে নগর ধ্বংস করে দেয়।

রোমবাসীদের কিছূ দূর্গে আশ্রয় নিয়েছিল। তখন গলরা দূর্গ অবরোধ করল। এই অবরোধের একপর্যায়ে তারা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে দূর্গে প্রবেশ করতে চাইল। কিন্তু যখন প্রবেশে ব্যর্থ হল, তখন তারা শর্ত দিল, যদি ৩০০ কিলোগ্রামের বেশী স্বর্ণ মুক্তিপণ হিসেবে দেয়া হয়, তবে তারা নগর ছেড়ে চলে যাবে। যখন সোনা ওজন করা হচ্ছে, সে সময় গলদের নেতা পশুরি সমেত পাল্লার উপরে নিজের ভারী তরবারীটি চাপিয়ে দেয়। রোমবাসীরা এর প্রতিবাদ করে উঠলে সে উত্তর দিয়েছিল: ‘পরাজিতদের কপালে দুঃখই থাকে।’

গলদের রোম আক্রমণ।

খ্রী:পূ: ৩য় শতকে রোম প্রজাতন্ত্র অত্যন্ত শক্তিশালী, সুসংগঠিত ও যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী সেনাবাহিনী গঠন করল। এই সেনাবাহিনী মূলত: কৃষকদের নিয়েই গঠিত হয়েছিল, কেননা সামরিক বাহিনীতে কেবল সেইসব লোকজনদেরই নেয়া হত, যাদের নিজেদের চাষের জমি আছে।

রোমক সেনাবাহিনীতে নিয়মানুবর্তিতা ছিল অত্যন্ত কড়া। অস্ত্র হারিয়ে ফেললে, কিম্বা প্রহরারত অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়লে তার শাস্তি ছিল মৃত্যূদন্ড। তাছাড়া উচ্চপদস্থ ব্যক্তির হুকুম তার অধীনস্থ সৈনিককে বিনা প্রশ্নে পালন করতে হত।

যুদ্ধের সময় সৈন্যদলের প্রথম সারিতে থাকত হালকা অস্ত্রে সজ্জ্বিত যোদ্ধারা। সম্মুখবর্ত্তী শত্রুবাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করার জন্যে তারা ধনুর্বাণ, পাথর এবং ছোট ছোট আকারের বল্লম ছুঁড়ে মারত। তারপরেই তারা পিছনে হটে গিয়ে সামনে যাবার জন্যে জায়গা করে দিত ভারী অস্ত্রে সজ্জ্বিত পদাতিকদের। বিপক্ষীয়দের উপর বল্লম নিক্ষেপ করে এই পদাতিকেরা উন্মুক্ত তরবারী হাতে শত্রুর উপর ঝাপিয়ে পড়ত। অশ্বারোহী দল পদাতিকদের রক্ষা করত উভয় পার্শ্বে- ডান ও বাম দিকে। যুদ্ধে জয়ী হলে এরা পরাজিত শত্রুদের পিছন পিছন তাড়া করে ছুটে যেত।

পিরুসের ইটালী অভিযানের রুট ম্যাপ।
খ্রী:পূ: ৩য় শতকের প্রথমার্ধে ইটালীর দক্ষিণে অবস্থিত গ্রীক শহরগুলো রোম দখল করে নেয়। তারপর ধীরে ধীরে সমগ্র অ্যাপেনাইন উপদ্বীপ দখল করে। অ্যাপেনাইন উপদ্বীপে কমপক্ষে ১২টি জাতি বাস করত এবং তাদের নিজেদের মধ্যে প্রায়ই শত্রুতা লেগে ছিল। তাদের সাথে রোমের সংগ্রাম চলেছিল ২০০ বৎসরেরও বেশী সময় ধরে। রোমের সেনাবাহিনী অস্ত্রশস্ত্র, যুদ্ধবিদ্যার জ্ঞান ও নিয়ম শৃঙ্খলার দিক থেকে শত্রু অপেক্ষা উন্নততর ছিল; প্রতিবেশী উপজাতিগুলোর বাহিনী সুশৃঙ্খলাবদ্ধ না হওয়ায় রোমের যুদ্ধাভিযান তারা প্রতিহত করতে পারেনি।

বিজিত অঞ্চলে রোম উপনিবেশ গড়ে তোলে। পরবর্তীতে এই উপনিবেশগুলো তাদের আধিপত্যের খুঁটি হিসেবে কাজ করতে থাকে। তাছাড়া সিনেট ‘Divide and Rule’ -এই নীতিতে বিশ্বাসী হয়ে বিজিত জাতিগুলোর মধ্যে ঝগড়া বিবাদ জিইয়ে রাখত, যাতে করে তারা সম্মিলিতভাবে রোমের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে না পারে।  

পিরুস তার সেনাবাহিনী নিয়ে ইটালীতে।
রোম যখন ইটালীর দক্ষিণে গ্রীক শহরগুলোর সাথে সংগ্রামে লিপ্ত ছিল, তখন বলকান উপদ্বীপের ছোট একটি রাজ্যের রাজা পিরুস গ্রীকদের সাহায্য করার জন্যে সেখানে উপস্থিত হন। পিরুসের সৈন্যবাহিনীতে ২২ হাজার পদাতিক, ৩ হাজার অশ্বারোহী এবং ২০টি হাতি ছিল। যুদ্ধে হস্তীযুথ রোম সেনাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং পায়ের তলায় পিষে তাদের বহু সৈন্য হত্যা করে ফেলে। আর হাতির পিঠে চড়ে তাদের সৈন্যরা রোমকদের উপর শর ও বল্লম নিক্ষেপ করে মহাত্রাস সৃষ্টি করে। রোমক বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায়।

পিরুসের বাহিনী পরপর কয়েকটি যুদ্ধে জয়ী হয় ঠিকই, কিন্তু যুদ্ধে যে বিপুল পরিমাণে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তাতে পিরুস আর্ত্তনাদ করে উঠেছিল: ‘আর একটি মাত্র যুদ্ধের পরই দেখছি আমার আর কোন বাহিনীই থাকবে না!’ -তার এই আক্ষেপ থেকেই ‘Pyrrhic Victory’ -এই প্রবচনটি এসেছে, যার অন্তর্নিহিত অর্থ হল: বিপুল ক্ষতির বিনিময়ে অর্জিত জয়, যখন জয়ের আনন্দ বা অর্থ থাকে না।

পরপর কয়েকটি যুদ্ধে পরাজয়ের পরও রোমকরা দুর্বল হয়নি, তারা  নতুন করে আরও সৈন্য সমাবেশ করেছিল। এই কারণে লোকে রোমের সাথে তুলনা করত হিদ্রার- যার একটি মাথা কেটে নিলে সেইস্থানে দু‘টো করে মাথা গজিয়ে উঠত। সর্বশেষ যুদ্ধে রোমকরা হাতির পায়ের নীচে বড় বড় পেরেক পোতা তক্তা ফেলে এবং জলন্ত ফেঁসো বাঁধা তীর দিয়ে হাতিগুলোকে এমন তাড়া করেছিল যে, ভয় পেয়ে ঐ দৈত্যাকার জন্তুগুলো নিজের সৈন্যদের পদতলে পিষ্ট করে দৌঁড়ে পালায়। এভাবে পিরুসের বাহিনী তছনছ হয়ে গেল। এই যুদ্ধের পর কিছু গ্রীক শহর বিনা যুদ্ধে রোমক বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। অন্যগুলো রোমানরা প্রচন্ড আক্রমণে দখল করে নেয়।

কার্থেজ নগরী।
আফ্রিকা মহাদেশের উত্তরাংশে সমুদ্রোপকূলে ফিনিসীয়রা কার্থেজ (Carthage) নগরীর পত্তন করেছিল। সমুদ্রের মধ্যে অনেকদূর পর্যন্ত প্রসারিত প্রস্তরময় অন্তরীপে এই নগরী অবস্থিত ছিল। উঁচু উঁচু মিনার সমেত পাথরের তৈরী দুর্ভেদ্য দূর্গপ্রাকার শহরটিকে বহি:শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করত।

সমুদ্রপথে বাণিজ্যের জন্যে কার্থেজের খ্যাতি ছিল। গভীর সমুদ্রের উপর নির্মিত তার বন্দরে সর্বদা জাহাজের ভীড় লেগে থাকত, আর সমুদ্রতীরের দোকান পসারীতে জিনিসপত্রের প্রাচুর্য ছিল দেখবার মত। জাহাজের মাঝিমাল্লা এবং বন্দরের খালাসীরা ছিল দাস। অত্যন্ত শক্তিশালী নৌবাহিনী ও বিশাল সৈন্যদল ছিল কার্থেজের। সৈন্যরা প্রধানত: ছিল ভাড়াটে যোদ্ধা। কার্থেজবাসীরা সমুদ্রোপকূলবর্তী বহু এলাকা ও দ্বীপ নিজেদের অধিকারে এনেছিল। সমগ্র পশ্চিম ভূ-মধ্যসাগরীয় অঞ্চলে প্রভূত্ব স্থাপনের চেষ্টা করেছিল তারা।

খ্রী:পূ: ২৬৮ অব্দে রোম সিসিলি দ্বীপ দখলের চেষ্টা করলে কার্থেজ ও রোমের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যায়। এই যুদ্ধকে বলা হয় পুনিক যুদ্ধ। যুদ্ধ চলেছিল বিশ বৎসরেরও অধিক এবং পরিশেষে রোম জয়লাভ করে। সিসিলি, সার্দিনিয়া ও কোর্সিকো দ্বীপগুলো রোমের অধীনে চলে আসে। পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করল কার্থেজ। স্পেনকে কব্জা করে নিল তারা। সেখানে এই অভিযান পরিচালনা করলেন তরুণ সেনাপতি হানিবল। হানিবলের সৈন্য পরিচালনার কৌশল এবং অসাধারণ শৈর্য্যবীর্যের কাহিনী ছড়িয়ে পড়ল সর্বত্র। 

হানিবলের সেনাবাহিনী আল্পস পবর্তমালা পার হচ্ছে।
স্পেনে অভিযানের কারণে খ্রী:পূ: ২১৮ অব্দে, রোম কার্থেজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে ২য় পুনিক যুদ্ধ শুরু হয়। তখন হানিবল তার বাহিনী নিয়ে তুষারাবৃত পার্বত্যপথ দিয়ে আল্পস পর্বত অতিক্রম করে ইটালীতে গিয়ে পৌঁছুলেন; রোমকদের জন্যে এ ছিল একেবারে কল্পনার বাইরে। কার্থেজ বাহিনীর অর্ধেকই পর্বত অতিক্রম করার পথেই প্রচন্ড ঠান্ডায় মৃত্যূমুখে পতিত হয়েছিল। যারা বেঁচে ছিল তাদের নিয়ে হানিবল ইটালীর পো নদীর অববাহিকায় উপস্থিত হলেন। সেখানে উত্তর ইটালীর অধিবাসী দুর্ধর্ষ গল উপজাতী হানিবলের সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগ দিল। হারান শক্তি ফিরে পাবার পর হানিবল ধীরে ধীরে উত্তর থেকে দক্ষিণ ইটালী অভিমুখে অভিযান শুরু করলেন। পথিমধ্যে তিনি ছোট খাট বাঁধা অতিক্রম করে কানে এসে পৌঁছুলেন, সেখানে সম্মিলিত রোমান বাহিনী অপেক্ষা করছিল। 

কানে অপেক্ষারত রোমান বাহিনীতে ছিল ৮০ হাজার পদাতিক ও ছয় হাজার অশ্বারোহী সেনা। অন্যদিকে হানিবলের সাথে ছিল চল্লিশ হাজার পদাতিক ও দশ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য। রোমানরা তাদের পদাতিক বাহিনীকে চতুর্ভুজ আকারে সারিবদ্ধভাবে বিন্যস্ত করেছিল। আর অশ্বারোহী সেনা পদাতিক বাহিনীর দু‘পাশে পার্শ্ববাহিনী হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিল। হানিবল যখন দেখলেন যে, রোমান পদাতিকের সংখ্যা তার দ্বিগুন, তখন তিনি এক দু:সাহসিক পরিকল্পণা গ্রহণ করলেন। নিজের বাহিনীকে তিনি এমনভাবে অর্ধাচন্দ্রাকারে বিন্যাস করলেন যে, পিঠের দিকটা রইল রোমানদের মুখোমুখি, আর দু‘পাশে রাখলেন শ্রেষ্ঠ কিছু পদাতিক ও অশ্বারোহী বাহিনী।

হানিবলের সমরাভিযানের রুট ম্যাপ।
রোমান পদাতিক বাহিনী সামনে এসে আঘাত করল। কার্থেজ বাহিনীর মধ্যভাগে আঘাত করে রোম বাহিনী অগ্রসর হয়ে ঢুকে পড়ার ফলে তাদের উভয় পার্শ্ব অরক্ষিত হয়ে গেল। আর ঠিক সেই সময় হানিবলের পার্শ্ববাহিনীর সবচেয়ে শক্তিশালী সেনারা দু‘পাশ থেকে শত্রুর উপর ঝাপিয়ে পড়ল। কার্থেজের অশ্বারোহী বাহিনী রোমের অশ্বারোহী বাহিনীকে পিছন দিক থেকে আক্রমণ করল। রোমের পদাতিক বাহিনীর বিন্যাস এতে ভেঙ্গে গিয়ে সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। ওদিকে হানিবলের সেনারা সেসময় রোমান বাহিনীকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। রোমানরা পরাজিত হল। হানিবল ৭০ হাজারের মত রোমান সৈন্য বন্দী করল।

রোম পরাজিত হওয়ায় ইটালীর বহু শহর হানিবলের পক্ষে চলে আসে। রোমের অবস্থা তখন সঙ্কটজনক হয়ে দাঁড়ায়। এতদসত্ত্বেও রোমান সিনেট হানিবলের কাছে কোন সন্ধির প্রস্তাব পেশ করেনি। সুতরাং কার্থেজ বাহিনী নিয়ে হানিবল রোমের একদম কাছে চলে এলেন। হানিবল দেখলেন, কান যুদ্ধ শেষে তার বাহিনীর যে শক্তি অবশিষ্ট আছে, তা দিয়ে বিশাল দুর্ভেদ্য এই নগরীকে দখল করা একেবারেই অসম্ভব। সুতরাং তিনি ইটালীর দক্ষিণ দিকে সরে গেলেন।

কানের যুদ্ধ শেষ হবার ১২ বৎসর পর রোমানরা সিসিলি থেকে আফ্রিকার দিকে অভিযান শুরু করল। এই অভিযানে রোমান সেনাপতি ছিলেন সসিপিও। এই সময় হানিবল ছিলেন ইটালীতে। তিনি দেখলেন কার্থেজকে রক্ষা করতে হলে তার এখন ইটালী ছেড়ে যাওয়া অপরিহার্য। 

খ্রী:পূ: ২০২ অব্দে কার্থেজের অনতিদূরে জাম্মা শহরের কাছে রোমান ও কার্থেজ বাহিনী একে অপরের মুখোমুখি হল। এবারের যুদ্ধে রোমানদের অশ্বারোহী বাহিনী কার্থেজের চেয়ে অনেক বেশী ছিল। রোমান ও কার্থেজীয় পদাতিক বাহিনীর মধ্যে যখন সূদীর্ঘ ও প্রচন্ড যুদ্ধ চলছিল, সেইসময় (খ্রী:পূ: ২০১ অব্দে) হানিবলের বাহিনীকে পিছন থেকে আক্রমণ করল রোমান অশ্বারোহী বাহিনী এবং তাদেরকে ছিন্নভিন্ন করে দিল। 

এই পরাজয়ের ফলে রোমের কাছে কার্থেজ তার যুদ্ধ জাহাজ সমর্পণ ছাড়াও বিশাল অঙ্কের যুদ্ধপণ দিতে বাধ্য হল; কার্থেজের আধিপত্য প্রায় আর কোথাও রইল না। অন্যদিকে এই বিজয়ের ফলে রোমানদের সামনে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে আরও নতুন নতুন অঞ্চল দখলের পথ উন্মুক্ত হয়ে গেল। যুদ্ধ শেষে রোমান সিনেট হানিবলকে আত্মসমর্পণ করতে নির্দেশ দেয়। হানিবল রোমানদের হাতে ধরা দিতে চাননি; তিনি মধ্যপ্রাচ্যের কোথাও আশ্রয় নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি, নিজ গৃহের চতুর্দিক রোমান সেনা পরিবেষ্টিত দেখে তিনি বিষপানে আত্মহত্যা করেন।

নৌবাহিনী ও পদাতিক বাহিনী হারানোর পর কার্থেজ আর রোমের কাছে বিপদজনক ছিল না। কিন্তু কার্থেজরা তাদের নৌবাণিজ্য আগের মতই চালু রেখেছিল এবং পুন:রায় সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠছিল, যা রোমান অভিজাত ও বণিক সম্প্রদায়ের হিংসার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তারা কার্থেজকে ধ্বংস করে তাদের নৌবাণিজ্য দখলে নিতে চাইল। সুতরাং কার্থেজকে ধ্বংসের উদ্দেশ্যে রোমক বাহিনী খ্রী:পূ: ২য় শতকের মধ্যভাগে পুন:রায় আফ্রিকার মাটিতে পা রাখল এবং অবরোধ করল কার্থেজ। শুরু হল ৩য় পুনিক যুদ্ধ।

ধ্বংসের পর কার্থেজ নগরী।
এ ছিল একটা অসম শক্তির যুদ্ধ। তবুও কার্থেজীয়রা নিজেদের মাতৃভূমি রক্ষার জন্যে ৩ বৎসর যাবৎ দূর্গ মধ্যে অবরুদ্ধ থেকে বীরত্বের সাথে লড়াই করে গেল। যখন তাদের রসদ ফুরিয়ে গেল এবং আর দূর্গ মধ্য থেকে নিক্ষেপের কোন অস্ত্রপাতি রইল না, তখন সমস্ত কার্থেজীয় মেয়েরা তাদের লম্বা চুল কেটে ফেলে সেই চুল দিয়ে পাথর নিক্ষেপের জন্যে দড়ি তৈরী করে দিয়েছিল যোদ্ধাদের।

দীর্ঘ ৩ বৎসর অবরোধের কারণে অনাহারে দুর্বল হয়ে গেল কার্থেজীয়রা। এই সময় সুযোগ বুঝে রোমানরা অভিযান চালাল। রোমান বাহিনী নগরীতে ঢুকে পড়ে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট শুরু করে দিল। একসপ্তাহ ধরে তারা এই লুটপাট ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল; এমনকি রাত্রেও তারা সংযোগকৃত অগ্নির ঐ অশুভ আলোয়ও তা করেছিল।

রোমের সিনেটের আদেশে কার্থেজকে পৃথিবীর বুক থেকে নিচিহ্ন করে দেয়ার পর, বন্দী ৫০ হাজার কার্থেজবাসীকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হল।

এদিকে ভূমধ্য সাগরের পশ্চিম উপকূলবর্তী অঞ্চলে নিজেদের অধিকার বিস্তার করে ক্ষান্ত হল না রোমানরা। তারা বলকান উপদ্বীপ ও এশিয়া মাইনরেও অভিযান চালায়। প্রাচ্য অভিমুখে রোমের অগ্রসরণের ফলে পূর্ব ভূমধ্য সাগরীয় অঞ্চলের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ও বিশাল সাম্রাজ্যের সাথে তাদের যুদ্ধ বাঁধে। সিরিয়া সম্রাটের ছিল বিরাটায়তনের সেনাদল, হস্তী বাহিনী, তীক্ষ্ণ অস্ত্রযুক্ত রথচক্র এবং উষ্ট্র বাহিনী। বহুজাতির লোক নিয়ে এই বাহিনী গঠিত হয়েছিল। এশিয়া মাইনরে রোমক বাহিনীর সাথে যুদ্ধে সিরীয় সম্রাট পরাজিত হন ফলে তার সাম্রাজ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বহু রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

দীর্ঘ বল্লম সজ্জিত ফালাঙ্গোস।
বলকান উপদ্বীপে রোম তার ‘Divide and Rule’ পলিসি সঠিকভাবে কাজে লাগিয়েছিল। মেসিডোনিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের সময় রোম, গ্রীকদেরকে স্বপক্ষে টেনে এনেছিল এই আশ্বাস দিয়ে যে, তারা তাদেরকে স্বাধীনতা দিয়ে দেবে।

শক্তি পরীক্ষায় মেসিডোনিয় ফালাঙ্গোস ও রোমান লেগিও মুখোমুখি হল। দীর্ঘ বল্লম সজ্জিত ফালাঙ্গোস ছিল অজেয়। রোমক বাহিনীর প্রথম আক্রমণ প্রতিহত করে তারা পাল্টা আক্রমণ চালায় এবং রোমীয়দের পিছু হটিয়ে দিতে শুরু করে। কিন্তু এর ফলে তারা নিজেরা কিছুটা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়, আর সেই সুযোগে রোমের ক্ষিপ্রগতির সৈন্যরা মেসিডোনিয় বাহিনীর বুহ্য ভেদ করে ভিতরে ঢুকে পড়ে। সুদীর্ঘ বল্লম তখন আর কোন কাজে দেয়নি এবং মেসিডোনিয়রা পরাজয় বরণ করে।

মেসিডোনিয় সাম্রাজ্যের পতনের পর গ্রীকেরা নিজের স্বাধীনতা ফিরে পাবার চেষ্টা করল। তখন রোম তাদের বাঁধা অগ্রাহ্য করে খ্রীঃপূঃ ১৪৬ অব্দে গ্রীসের উপর নিজের প্রভূত্ব স্থাপন করল। রোমকদের ইচ্ছের বিরুদ্ধতা করার শাস্তিস্বরূপ রোম, গ্রীক সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র কোরিন্থ নগরী একেবারে ধ্বংস করে দেয়।

 ত্রিউম্ফুস।
রোমের বিজয়ী সেনাপতিরা সংবর্ধিত হত ত্রিউম্ফুসের মাধ্যমে। মেসিডোনিয়া বিজয়ী রোমান সেনাপতির জন্যেও ত্রিউম্ফুসের আয়োজন হল। এই ত্রিউম্ফুস দেখার জন্যে সব রাস্তাতেই যেখান থেকে শোভাযাত্রা দেখা সম্ভব, সেখানেই জনতা সমবেত হয়েছিল।


প্রথমদিন ভোরবেলা অন্ধকার থাকতেই লুন্ঠিত প্রস্তরমূর্ত্তি ও ছবিভর্ত্তি ২৫০টি গাড়ি আসতে শুরু করল।পরের দিন নগরের পথে পথে সবচেয়ে সুন্দর ও মূল্যবান মেসিডোনিয় অস্ত্র-শস্ত্র বোঝাই করা গাড়ি দেখা গেল। তামা ও লোহার তৈরী অস্ত্রগুলো ঝকঝক করছিল। সেগুলোর মাঝখানে তরবারী ও বল্লমের খোঁচা খোঁচা মাথা দেখা যাচ্ছিল। এর পিছু পিছূ সাড়ে সাতশ' ঘট ভর্তি রৌপ্য মুদ্রা নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। চারজন করে লোক একেকটা ঘড়া বইছিল। তারও পিছনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছির রৌপ্যনির্মিত বিশালাকার ভারি ভারি পেয়ালা ও পাত্র।

৩য় দিন নিয়ে আসা হল বলিদানের জন্য ১২০টি মোটাসোটা বৃহদাকার ষাঁড়, তাদের শিং সোনালী রঙে রঞ্জিত। দূরে দেখা গেল, নিয়ে আসছে স্বর্ণমুদ্রা ভর্ত্তি ৭৭টি ঘড়া, আগেরগুলো যেমন ছিল সেরকমই আকারে বৃহৎ। এসবের পিছনে পিছনে আসছিল লোকজন, তাদের মাথার উপরে মূল্যবান প্রস্তর খঁচিত খাঁটি সোনার তৈরী বিরাটাকার পাত্র আর থালাগুলো তারা উর্দ্ধে তুলে ধরেছিল। এসবেরও পিছনে আসছিল মেসিডোনিয় সম্রাটের রাজশকট, তাতে রাজার অস্ত্রশস্ত্র ভর্তি, আর তার উপরে শোভা পাচ্ছিল তার রাজমুকুট।

এই রথের পিছনে নিয়ে আসা হচ্ছিল রাজার সন্তানদের -দুই রাজকুমার ও এক রাজকুমারীকে। তাদের বয়স এত কম যে, কি দু:খের দিন শুরু হয়েছে তাদের জন্যে সেকথা বূঝতে পারার কথা নয়। তাদের পিছুপিছু আসছিলেন কাল পোষাক পরিহিত সম্রাট। এই সর্বনাশে তিনি যেন বোধশক্তি রহিত হয়ে গেছেন।

অত্যন্ত অলংকৃত জাঁকজমকপূর্ণ শকটে চড়ে চলেছিলেন স্বর্ণখঁচিত লাল পোষাক পরিহিত রোমান সেনাপতি। আর তাঁর পশ্চাতে চলেছিল তার সৈন্যদল, হাতে তাদের তেজপাতা গাছের ডাল, মুখে গান।

সমাপ্ত।


ছবি: Wikipedia, livius, mclaughlinbibleministries, daviddarling.
উৎস: হিস্ট্রি অব দা এন্সিয়েন্ট ওয়ার্ল্ড -ফিওদর করোভকিন। হিস্ট্রি অব গ্রীস -গ্রোট। এন্সিয়েন্ট মনার্কী -শিলথন।

Alexander: আলেকজান্ডার দি গ্রেট।

৩৩৫-৩৩৪ বিসিই গ্রীসের সিংহাসনে বসলেন আলেকজান্ডার। তার পিতা ছিলেন ২য় ফিলিপ, যিনি ৩৩৪ বিসিই তার মৃত্যুর পূর্বপর্যন্ত মেসিডোনিয়ার রাজা ছিলেন। এই মেসিডোনিয়া গ্রীসের অন্যতম প্রধান রাজ্য ছিল। আর এসময় এখানে সকল প্রকার শিল্পকলার বিকাশ ঘটেছিল এবং উৎকর্ষতা শিখরে পৌঁছেছিল। দর্শন, সাহিত্য, ভাস্কর্য, স্থাপত্য-শিল্প এবং অন্যান্য কলায় তারা সমসাময়িক অন্যান্য জাতিসমূহের তুলনায় শ্রেষ্টত্ব অর্জন করেছিল। এখানেই থুসিডাইডেস, অ্যারিষ্টফেনিস, জেনোফোন, সক্রেটিস, প্লেটো, এরিষ্টোটল, ডায়োজিনিস, ডিমোস্থিনিস এবং আরও অনেক মহৎ মহৎ লোকের জন্ম হয়েছিল। বিশ্ব বিজয়ী আলেকজান্ডার এরিষ্টোটলের ছাত্র ছিলেন। 

আলেকজান্ডারকে পাঠদানরত এরিস্টোটল
গ্রীসের সভ্যতা ছিল মূলতঃ নগর কেন্দ্রিক। এটি নগরসমূহে বিকাশ লাভ করেছিল এবং নগরবাসীদের দ্বারা বিস্তার লাভ করেছিল। প্রাচ্যের নগরগুলি কিছু সংখ্যক দালান-কোঠা নিয়ে গড়ে উঠেছিল। জনগণের মধ্যে কোন সুষ্ঠ পরিকল্পণা ছিল না। একজন স্বৈরাচারী শাসকের দ্বারা সেগুলি শাসিত হত। তাই জনগণের অবস্থা ছিল প্রায় ক্রীতদাস পর্যায়ের। অপরদিকে গ্রীসের নগরগুলি ছিল সুপরিকল্পিত এবং শিল্পমন্ডিতভাবে নির্মিত। জনগণ কর্মাধ্যক্ষগণকে নির্বাচিত করত, জনগণের বিষয়সমূহ নিয়ে আলাপ-আলোচনা করত এবং তাদের সরকারী ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করত। গ্রীকেরা মনে করত যে জীবন উত্তম এবং তা উপভোগ করা উচিৎ। স্বাস্থ্য ছিল সুখের ভিত্তি। ব্যায়ামাগার ছিল একটি জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান। এখানে খেলাধূলা, ক্রীড়া প্রতিযোগীতা, নৃত্য, গান-বাজনা, কাব্যচর্চা ইত্যাদি গুরুত্বসহকারে অনুশীলন করা হত। তাদের ক্রীড়া প্রতিযোগীতার জন্যে ছিল স্টেডিয়াম, রথ চালানোর জন্যে ছিল বড় মাঠ, নাট্যানুষ্ঠানের জন্যে ছিল থিয়েটার।

সাহিত্য ও শিল্পকলা গ্রীকদের জীবনে একটি বিরাট স্থান দখল করেছিল। বুদ্ধিগত বিকাশ সম্পর্কে সতর্ক ছিল বিধায়, তারা বিভিন্ন শিক্ষালয় স্থাপন করেছিল। তারা দর্শণশাস্ত্র নিয়ে আলাপ আলোচনা করত। শিল্পকলা এবং ভাস্কর্য শিক্ষার্থীদের জন্যে তাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছিল। তাদের প্রত্যেকটি দালান কোঠায় আবশ্যিকভাবে কারুকার্য করা হত। এই কারুকার্য বা ভাস্কর্য প্রধানতঃ ছিল তাদের বিভিন্ন দেবদেবীদের নিয়ে। তাদের কাছে শিল্পকলাবিহীন একটি নগরী ছিল অচিন্ত্যনীয়। তারা তাদের ভাষাকে ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষায় পরিণত করেছিল।

প্রাচ্যের অন্যান্য জাতিসমূহ থেকে গ্রীকদের জীবন-যাপনের পদ্ধতি ও রীতিনীতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের। তাদের পোশাক ছিল জমকাল, ঢিলে-ঢালা এবং তারা চওড়া কান বিশিষ্ট টুপি মাথায় দিত। তাদের জীবন দর্শন ছিল এই ধরণের যে, জীবনকে আজই উপভোগ করতে হবে, আগামীকাল আমরা নাও থাকতে পারি। এই কারণে গ্রীকেরা ভোগ-বিলাসকে তাদের অন্যতম প্রধান বিষয় মনে করত। তদের কাছে ধর্ম ছিল ভবিষ্যৎ জীবনের বিষয় তাই তাদের চিন্তা-ভাবনায় এর স্থান ছিল সামান্য মাত্র।

আলেকজান্ডারের মূর্ত্তি, 
ইস্তাম্বুল।
গ্রীসের উত্তর-পূর্ব দিকে বলকান উপদ্বীপে অবস্থিত ছিল মেসিডোনিয়া। এখানকার অধিকাংশ জনগণ ছিল কৃষিজীবি। বিসিই ৪র্থ শতকের মধ্যভাগে রাজা ২য় ফিলিপমেসিডোনিয় রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং এক শক্তিশালী সেনাদল গঠন করলেন। কৃষকদের মধ্যে থেকে বেঁছে বেঁছে তিনি তার পদাতিক বাহিনী গঠন করেছিলেন। যুদ্ধে পদাতিকদের নিয়েই ফালাঙ্গোস তৈরী করা হত। অভিজাত মেসিডোনিয়রা হত অশ্বারোহী যোদ্ধা।

রাজা ২য় ফিলিপ তার শক্তিশালী সেনাবাহিনী দ্বারা একের পর এক গ্রীক শহর দখল করতে শুরু করলেন। গ্রীক দাস মালিকদের একাংশ স্বেচ্ছায় তার বশ্যতা স্বীকার করে নেয়। জন্মভূমির স্বাধীনতার চেয়ে তারা বেশী মূল্য দিত নিজেদের ধন-সম্পত্তিকে। এমনও ঘটেছে যে, রাজা ফিলিপ কাউকে কিছু উৎকোচ দিয়েছেন, আর তারা পরে দূর্গের প্রবেশদ্বার তার জন্যে খুলে দিচ্ছে। এ করণে ফিলিপ ব্যঙ্গ করে বলতেন যে-‘সোনাভরা গর্দভ যে কোন শহর নিয়ে নিতে পারে।’

মেসিডোনিয় সম্রাটের বিরুদ্ধে এথেনিয় দেমোস উঠে দাঁড়িয়েছিল। আত্তিকা প্রদেশের শাসক অভিজাতবর্গ ব্যতিরেকে সমস্ত স্বাধীন এথেন্সবাসীদের বলা হয় দেমোস। এদের বেশিরভাগই ছিল কৃষক, কারিগর, মাঝিমাল্লা ও দিনমুজুর। যাহোক বিখ্যাত বাগ্মী ডিমোস্থিনিস তার জ্বালাময়ী বক্তৃতায় ২য় ফিলিপকে পরস্বাপহারী রূপে সকলের সম্মুখে প্রকাশ করেন এবং গ্রীকদের স্বাধীনতা রক্ষার জন্যে আহবান জানান। এরফলে মধ্যগ্রীসের নগর রাষ্ট্রসমূহের একাংশ মেসিডোনিয়ার সাথে সংগ্রামের জন্যে ঐক্যবদ্ধ হয়। 

মেসিডোনিয়া।
৩৩৮ বিসিই খেরোনিয়া শহরের নিকটে এথেনিয় ও মেসিডোনিয়দের চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু হয়। এথেনিয়দের সাথে এক সাঁরিতে দাঁড়িয়ে সাধারণ যোদ্ধার ন্যায় যুদ্ধ করেছিলেন ডিমোস্থিনিস। 

এথেনিয় সেনাবাহিনী কঠোর নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে গড়ে উঠেছিল। সেনাবাহিনীতে ভর্ত্তির সময় তরুণেরা শপথ নিত। তাদের শপথ ছিল এমন- ‘আমি এই পবিত্র অস্ত্রের অসম্মান করব না এবং যুদ্ধ ক্ষেত্রে যেখানেই থাকি, কখনই আমার সঙ্গীকে পরিত্যাগ করব না। আমি আমার পর্ণ কুঠির রক্ষার জন্যে যুদ্ধ করব এবং তারপরে পিতৃভূমিকে দূর্বল তো করবই না, বরং আরও পরাক্রান্ত ও শক্তিশালী করে তুলব। আমি নিজে অন্যদের সাথে বর্তমানে প্রচলিত আইন-কানুন এবং ভবিষ্যতে যেসব আইন-কানুন প্রবর্তিত হবে, সেসবও মেনে চলব। স্বদেশের সমুদয় পবিত্র বস্তুকে আমি ভক্তি করব। দেবতারা আমার সাক্ষী-সাক্ষী স্বদেশের সীমানা, গম ও যবের শস্য ক্ষেত, জলপাইয়ের বাগান ও দ্রাক্ষাক্ষেত।’

এথেনীয়দের দৃঢ় মনোবল ও নেতৃত্বের কারণে দীর্ঘদিন ধরে এই ভয়াবহ যুদ্ধ চলে। প্রথম দিকে ২য় ফিলিপের বাহিনীকে এথেনিয়রা পিছু হটিয়ে দেয়। অবশ্য উন্নততর অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জ্বিত এবং অধিক নিয়ম শৃঙ্খলায় অভ্যস্ত মেসিডোনিয় সেনাবাহিনী জয়লাভ করেছিল। এই জয়লাভের ফলে প্রায় সমস্ত গ্রীস মেসিডোনিয়ার পদানত হয়। 

আলেকজান্ডার বাল্যকাল থেকেই ইচ্ছে পোষণ করতেন যে, তিনি সিংহাসনে আরোহণের পর বিশ্ব জয়ের মত বিশাল এবং গৌরবময় কোন কার্য্য করবেন। গোর্দিউস নগরে একটি রথের উপরে ‘গোর্দিউস গিঁট’ অত্যন্ত জটিলভাবে জঁটপাকানো একটি গিঁট রাখা ছিল। কথিত ছিল যে, যিনি ঐ গিঁট খুলতে পারবেন তিনি সমগ্র এশিয়ার অধিপতি হবেন। অনেকেই গিঁট খুলতে চেষ্টা করেছিল বটে, কিন্তু কেউই তা খুলতে পারেনি। আলেকজান্ডারও চেষ্টা করেন। অত:পর যখন ব্যর্থ হলেন, তখন তিনি তরবারী দ্বারা গিঁটটা কেটে ফেললেন। এ থেকেই এ বাগিধির উৎপত্তি: To cut the Gordian knot. অর্থাৎ জটিল ও গোলমেলে কোন সমস্যার দ্রুত চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করা। 

সুতরাং পিতা ২য় ফিলিপের এই বিজয়াভিযানের সাফল্য শুনে যুবক আলেকজান্ডার তাই বলেছিলেন, ‘আমার পিতাই সব অধিকার করে নেবেন দেখছি, বিরাট ও গৌরবময় কোন কিছু করার সুযোগ আর আমার কপালে বোধহয় নেই।’ 
Plutarch stated, Philip overjoyed at his courage and ambition, kissed his son and declared: "My boy, you must find a kingdom big enough for your ambitions. Macedon is too small for you",

সমস্ত গ্রীস নিজের অধিকারে নিয়ে আসার পর রাজা ২য় ফিলিপ পারস্য অভিযানের জন্যে তৈরী হতে লাগলেন। এই অভিযান প্রস্তুতি কালে চক্রান্তকারীদের হাতে নিহত হলেন তিনি। তখন তার ২০ বৎসর বয়স্ক পুত্র আলেকজান্ডার সিংহাসনে উপবেশন করলেন।

আলেকজান্ডার সিংহাসনে আরোহণের অল্পদিনের মধ্যে ৩০ হাজার পদাতিক ও পাঁচ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে বের হন দিগিজয়ে এবং অল্পদিনেই লক্ষ লক্ষ মানুষের এবং বহু জাতির ভাগ্যনিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। তিনি তার সংক্ষিপ্ত বার বৎসরের রাজত্বকালে যে বিশাল বিজয় অর্জন করেন তার পূর্বে অন্য কেউ সেরূপ করতে সক্ষম হননি।

ইসসুজের যুদ্ধ।
বিশ্বজয়ের প্রথমদিকে পারস্য সাম্রাজ্যের এশিয়া মাইনরে প্রবেশ করে আলেকজান্ডার ৩য় দরিয়াবসের পারস্যিক সেনাবাহিনীর মোকাবেলা করেন এবং ইসসুজের যুদ্ধে তাদের পরাজিত করেন। তারপর তার বাহিনী ভূ-মধ্য সাগরের তীর ধরে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে যায়। আলেকজান্ডারের পদানত হয় উত্তর সিরিয়াসহ ফ্রিজিয়া, কেপডাসিয়া এবং সেলেওসিয়া। তারপর তিনি সিরিয়া এবং প্যালেস্টাইনের মধ্যে দিয়ে মিসরের দিকে অগ্রসর হয়ে সোর নগরী অবরোধ করেন। পতনের পূর্বে সোর কয়েক মাস গ্রীক সেনাবাহিনীকে ঠেকিয়ে রেখেছিল।

যুদ্ধে সোরীয়রা পরাজিত হল। আলেকজান্ডার ছিলেন বদরাগী ও নিষ্ঠুর। তার বিরুদ্ধে যারা রূখে দাঁড়িয়েছে সেইসব জনগোষ্ঠীকে তিনি নির্মমভাবে হত্যা করেছেন নয়ত: তাদের দাসে পরিণত করেছেন। সোর নগরী আত্মসমর্পণে অস্বীকৃত হওয়ায় আলেকজান্ডার পুরো নগরী পুড়িয়ে ছারখার করে দেন। অত:পর নগরী দখল করার পর তার ৮ হাজার অধিবাসীকে হত্যা ও ৩০ হাজার অধিবাসীকে বন্দী করে বাজারে দাসরূপে বিক্রি করে দেন।

আলেকজান্দ্রিয়া নগরীর পত্তন।
পুনঃরায় মিসরের পথে আলেকজান্ডার জেরুজালেমে প্রবেশ করেন এবং বিনা বাঁধায় তা দখল করে নেন। জেরুজালেমের বাইরে সেইসময় একদল ধর্মীয়নেতা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। এদের মধ্যে এমন একজন ছিলেন, যিনি পূর্বেই তার সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন যে, তিনি বিশ্বজয় করবেন। আলেকজান্ডার তাদের দ্বারা প্রভাবিত হন এবং পবিত্র নগরী সম্পর্কীত যুক্তিসঙ্গত শর্তাবলী মঞ্জুর করেন। 

জেরুজালেম থেকে আলেকজান্ডার তার সেনাবাহিনী নিয়ে মিসর অভিমুখী হন এবং শীঘ্রই তা তার করতলগত হয়। এই প্রাচীন দেশের উত্তর সমুদ্রতীরে তিনি এক মহানগরী স্থাপন করেন এবং তার নাম দেন আলেকজান্দ্রিয়া। এতেও তিনি সন্তুষ্ট হলেন না। তিনি তার সেনাবাহিনী নিয়ে অশুর দেশের মরুভূমি, অরবিলায় দরিয়াবসের সেনাবাহিনীর মোকাবেলা করার জন্যে প্যালেস্টাইন এবং সিরিয়ার মধ্যে দিয়ে আবার ফিরে আসেন। 

 ফালাঙ্গোস।
আলেকজান্ডার তার সেনাবাহিনী নিয়ে মেসোপটেমিয়ায় এসে পৌঁছেন। পারস্য সম্রাট ৩য় দরিয়াবস বিশাল সৈন্য সমাবেশ করেছিলেন। তার বাহিনীতে রণহস্তী ও রথ ছিল। রথের সাথে কাস্তে জাতীয় ধারাল অস্ত্র বাঁধবার ব্যবস্থা ছিল, যাতে করে যুদ্ধের সময় বিপক্ষেরা তার আঘাতে ধরাশায়ী হয়। ৩৩১ বিসিই টাইগ্রিস নদীর ধারে গিউগামেলা নামক এক বসতির নিকটবর্তী বিস্তীর্ণ প্রান্তর, অরবিলায় আলেকজান্ডার দরিয়াবসের সেনাবাহিনীর মুখোমুখী হন। শুরু হল বিখ্যাত গ্রানিকাসের যুদ্ধ। 

যুদ্ধের শুরুতে দারিয়াবস আক্রমণের জন্যে রথীদের পাঠালে গ্রীক বাহিনী শর নিক্ষেপ করে তাদের অধিকাংশকে নিহত করে ফেলে এবং নিজেরা দু‘পাশে সরে যাওয়া মাত্র পারস্যিকদের ক্ষিপ্তপ্রায় ধাবমান যুদ্ধাশ্বগুলো তীরবেগে ভিতরে অগ্রসর হয়। এদিকে তাদের পাশ কাটিয়ে অশ্বারোহী বাহিনীসহ আলেকজান্ডার পারস্যিক সৈন্যদলের কেন্দ্রস্থলে যেখানে সম্রাট দরিয়াবস দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেখানে গিয়ে উপস্থিত হন। সঙ্গে সঙ্গে তার ফালাঙ্গোসও পারস্যিকদের আক্রমণ করে হটিয়ে দেয়। পরিস্থিতির আকষ্মিকতায় ভীতচকিত দরিয়াবস সর্বাগ্রে পালাতে শুরু করেন। তার পিছনে পিছনে তার সমগ্র বাহিনীও পালাতে শুরু করে। এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পারস্য সাম্রাজ্যের পতন হল। এরফলে ২০০ বৎসরের (৫৩১-৩৩১ বিসিই) পারস্যিক শাসনেরও অবসান ঘটল।

পার্সিপলিস
সম্রাট ৩য় দরিয়াবস পালিয়ে যান এশিয়ার দিকে। পরে নিহত হন মধ্য এশিয়ার ব্যাকটেরিয়ায়।আলেকজান্ডার ব্যাবিলন হয়ে পৌঁছে যান পার্সিপলিস।

পারস্য সাম্রাজ্যের রাজধানী, পার্সিপলিস লুন্ঠিত ও ভষ্মিভূত হল গ্রীক সেনাদের হাতে। সমগ্র পারস্য অঞ্চল আলেকজান্ডারের দখলে চলে এল। কিন্তু এতেও তার বিজয়ের আকাঙ্খা পরিতৃপ্ত হয়নি। দূরপ্রাচ্যের দেশগুলির ধন-সম্পদ তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। তিনি একবাটানা থেকে পূর্বদিকে অগ্রসর হতে শুরু করেন এবং মধ্য এশিয়া দখল শেষে ভারতীয় উপমহাদেশের দিকে এগিয়ে যান। 

আলেকজান্ডার ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করেন ৩২৭ বিসি। হিন্দুকূশ পর্বত অতিক্রমের পর কাবুলের সন্নিকটে নিকাইয়া নামক স্থানে গ্রীক শিবির স্থাপিত হয়। তারপর  সেখান থেকে তক্ষশীলা ও সিন্ধু উপত্যকার রাজন্যবর্গকে তার আনুগত্য স্বীকারের আমন্ত্রণ জানিয়ে দূত প্রেরিত হল। 

আলেকজান্ডারের ভারতীয় উপমহাদেশে অভিযানের প্রাক্কালে সমগ্র ভারত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনপদ ও মহাজনপদে বিভক্ত ছিল। কেবলমাত্র ঝিলিম ও বিপাশা নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলেই সাতটি ভিন্ন জাতির বসবাস ছিল এবং অঞ্চলটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত ছিল। যেমন- অশ্বক রাজ্য (বুনার অঞ্চল), পুস্করাবতী (পেশোয়ার), তক্ষশীলা (রাওয়ালপিন্ডি), অভিসার, ঝিলিম ও চেনার নদীর মধ্যবর্তী পুরুর রাজ্য, গান্ধার, মালব ইত্যাদি অন্যতম। এইসব রাজ্যগুলো পরস্পর আত্মকলহ, যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত থাকায় তাদের মধ্যে কোন ঐক্য ছিল না। প্রতিটি রাজ্য একারণে রাজনৈতিক ভাবে অস্থিতিশীল ছিল।

সর্বপ্রথম তক্ষশীলার রাজা অম্ভি আলেকজান্ডারের বশ্যতা স্বীকার করে নেন। তিনি গ্রীক দূত তার নিকট পৌঁছানোর পূর্বেই বশ্যতা স্বীকারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচুর উপঢৌকনসহ আলেকজান্ডারের নিকট দূত প্রেরণ করেন। একে একে আলেকজান্ডার শশীগুপ্ত সঞ্জয়, কোফিউস আরও কতিপয় রাজন্যবর্গের বশ্যতা স্বীকারের প্রতিশ্রুতি পান।

কাবুলের মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হলে আলেকজান্ডার (Alexander) সর্বপ্রথম পুস্করাবতীর রাজা অস্টক কর্তৃক বাঁধাপ্রাপ্ত হন। সম্মুখ সমরে পরাজিত হয়ে অস্টক দূর্গে আশ্রয় নেন। অতঃপর দীর্ঘ ৩০ দিন অবরুদ্ধের পর দূর্গের পতন হলে তিনি গ্রীক বাহিনীর হাতে নিহত হন।

পুস্করাবতীকে পদানত করে আলেকজান্ডার সম্মুখে অগ্রসর হন এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজন্যবর্গের প্রতিরোধ প্রতিহত করে সিন্ধুনদ অতিক্রম শেষে তক্ষশীলায় ছাউনি ফেলেন। এ সময় তক্ষশীলার রাজা অম্ভি স্থানীয় দলপতিদের সঙ্গে আলেকজান্ডারের পরিচয় করিয়ে দেন। এখানে অবস্থান কালেই অভিসার জাতির বশ্যতা স্বীকারপত্র দূতেরা আলেকজান্ডারের নিকট হস্তান্তর করেছিল।

তক্ষশীলা হতে পূর্বদিকে ঝিলাম নদী বরাবর অগ্রসর হন আলেকজান্ডার। ঝিলাম ও চন্দ্রভাগার মধ্যবর্তী অঞ্চলের রাজা ছিলেন পুরু। আলেকজান্ডার পুরুকে বশ্যতা স্বীকারের আমন্ত্রণ জানিয়ে দূত প্রেরণ করেন। আত্মমর্যাদা সম্পন্ন পুরু তার এই প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। বিনাযুদ্ধে এই রাজ্য দখল সম্ভব হবে না দেখে আলেকজান্ডার পুরুকে মিত্র সংগ্রহের কিম্বা যুদ্ধ প্রস্তুতির কোনরূপ অবকাশ না দিয়ে ৩২৬ বিসিইর মে মাসে ঝিলাম নদীর তীরে শিবির স্থাপন করেন। নিজ রাজ্যের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে নদীর অপর তীরে পুরু ছাউনি ফেলেন।

স্বল্প সময়ের মধ্যে পুরু গ্রীক বাহিনীর তুলনায় অধিক সেনাসমাবেশ করেছিলেন। সুতরাং আলেকজান্ডার কৌশলের আশ্রয় নেন, আর এমনিতেও তিনি সমর কুশলী ছিলেন। তিনি রাতের অন্ধকারে ঝিলাম নদীর গতিপথ ধরে ১৭ মাইল অগ্রসর হয়ে পিন্ডি খোয়াতে পৌঁছেন এবং নদী অতিক্রম করে প্রত্যুষে অতর্কিত পুরুর রাজ্যে প্রবেশ করেন।এতদ্রুত গ্রীক বাহিনী তার রাজ্যে প্রবেশ করতে পারে পুরু তার জন্যে আদৌ প্রস্তুত ছিলেন না। গ্রীক বাহিনীর ক্ষিপ্রতায় বিষ্মিত পুরু তার দুই পুত্রকে আলেকজান্ডারের গতিরোধ করতে প্রেরণ করেন। পুরুর পুত্রদ্বয়ের উভয়ই আলেকজান্ডারের সাথে যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হয়।

পুত্রদের মৃত্যুতেও পুরু আত্মবিশ্বাস হারান না। তিনি ৫০ হাজার পদাতিক, চার হাজার অশ্বারোহী, তিন’শ রথ এবং দু‘শ হস্তি নিয়ে গ্রীক বাহিনীর মোকাবেলায় এগিয়ে যান এবং সুখচৈনপুর অতিক্রম করে প্রত্যুষে ঝিলাম নদীর তীরে আলেকজান্ডারের বার হাজার অশ্বারোহী ও তীরন্দাজ বাহিনীর মুখোমুখী হন। 

পূর্বরাত্রির বৃষ্টিপাতে ঝিলাম নদী তীরের যুদ্ধক্ষেত্র পিচ্ছিল ও কর্দমাক্ত ছিল। যুদ্ধ শুরু হলে পুরু বাহিনীর অধিকাংশ রথের চাকাগুলো কাদায় আটকে গিয়ে সেগুলি একে একে অচল হয়ে পড়তে লাগল। আলেকজান্ডারের অশ্বারোহী বাহিনী এই সুযোগে দ্রুত বেগে পুরুর সেনাবাহিনীর উপর ঝাপিয়ে পড়ে ছত্রভঙ্গ করে দিল। অসীম বীরত্বে যুদ্ধ করে পুরু আহত অবস্থায় বন্দী হন। এসময় তার শরীর নয়টি আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত ছিল। 

পুরুকে খাঁচায় বন্দী করে আলেকজান্ডারের সম্মুখে উপস্থিত করা হলে পুরু তার প্রতি গ্রীক সম্রাটের এহেন ব্যবহারে তীব্র ক্ষোভ ও উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন। এতে বিষ্মিত আলেকজান্ডার পুরুকে তার নিকট থেকে কিরূপ ব্যাবহার প্রত্যাশা করেন তা জিজ্ঞেস করেন। পুরু তার কাছে রাজকীয় সম্মান দাবী করে বসেন।

আলেকজান্ডার পুরুর অসাধারণ সাহস, বীরত্ব ও স্বদেশ প্রেমে মুগ্ধ হয়ে তার সাথে মিত্রতা স্থাপন করেন এবং এই মিত্রতার নিদর্শণ স্বরূপ তার রাজ্য তাকে ফিরিয়ে দেন। আর পুরু আলেকজান্ডারের এই বিজয়ের নিদর্শণ স্বরূপ ঝিলাম নদীর তীরে বুকেফালা ও নিকাইয়া নামে দু‘টি নগরীর গোড়াপত্তন করেন।

আলেকজান্ডারের বিজয়াভিযানের রুট ম্যাপ।
অপরাজিত গ্রীক বাহিনীর হাতে পুরুর পরাজয়ের পর রাভী নদীর পার্শ্ববর্তী অঞ্চল সমূহের প্রজাতান্ত্রিক রাজ্যগুলো আলেকজান্ডারের আনুগত্য স্বীকার করে নিল। সুতরাং ছোট খাট আর কোন বাঁধা বিপত্তি না থাকায় আলেকজান্ডার সরাসরি মগধ আক্রমণের মানসে সসৈন্যে বিপাশা নদীর তীরে এসে ছাউনি ফেলেন। এসময় নদীর ওপারে মগধের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন ধননন্দ। এখানেই আলেকজান্ডারের সেনাবাহিনীর মধ্যে মতানৈক্য দেখা দিল। সেনাবাহিনী দীর্ঘসময় যুদ্ধে লিপ্ত থাকায় অত্যাধিক রণক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। তাই তারা আর অধিক দূর অগ্রসর হতে অনীহা প্রকাশ করে দেশে ফেরার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সুতরাং আলেকজান্ডার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করা স্থির করেন।

৩২৬ বিসিইর নভেম্বর মাসে আলেকজান্ডার ঝিলাম নদীর তীর ধরে অগ্রসর হলেন এবং ৩২৫ বিসিইর সেপ্টেম্বর মাসে বেলুচিস্থানের মধ্যে দিয়ে ব্যবিলনের পথে রওনা হন।

আলেকজান্ডার তার বিজিত অঞ্চল সমূহকে ৭টি প্রদেশে বিভক্ত করেছিলেন। এদের পাঁচটি ভারতীয় এবং অপর দু‘টি উপমহাদেশের বাইরে। ভারতীয় ৫টি প্রদেশের দু‘টিতে পাঞ্জাব ও সিন্ধুতে তিনি গ্রীক গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন এবং অপর তিনটিতে ভারতীয় গভর্নর নিযুক্ত হযেছিল।

আলেকজান্ডার যখন পাঞ্জাবে অবস্থান করছিলেন, সেইসময় চন্দ্রগুপ্ত তার সাক্ষাৎপ্রার্থী হন। যে উদ্দেশ্যে চন্দ্রগুপ্তের এই মিশন তা হল মগধরাজ ধননন্দকে সিংহাসনচ্যূত করতে আলেকজান্ডারের সহায়তা লাভ। সুতরাং চন্দ্রগুপ্ত ধননন্দের প্রতি প্রজাসাধারণের ঘৃণা ও বীতশ্রদ্ধার কথা আলেকজান্ডারের কাছে তুলে ধরেন এবং সাথে সাথে প্রজাসাধারণের পক্ষ থেকে ধননন্দকে উৎখাতে সাহায্য সহযোগীতার প্রতিশ্রুতিও দেন।

চন্দ্রগুপ্তের এই মিশন সম্পূর্ণ ব্যর্থ হল। গ্রীক সহায়তা লাভের বদলে নিজের মৃত্যুদন্ডাদেশ কাঁধে নিয়ে তিনি পলায়ন করে কোনরকমে নিজ প্রাণ রক্ষা করেন। চন্দ্রগুপ্ত তার নির্ভিক ও তেজোদীপ্ত আচরণের জন্যে আলেকজান্ডার কর্তৃক মৃত্যুদন্ডাদেশ প্রাপ্ত হয়েছিলেন।

চন্দ্রগুপ্ত ক্ষত্রিয় বংশোদ্ভূত ছিলেন। কোন এক যুদ্ধে তার পিতা মারা গেলে তার মাতা মূরা দেবী বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন এবং অন্ত:সত্ত্বা অবস্থায় মগধের রাজধানী পাটালীপুত্রে আশ্রয় গ্রহণ করেন। চন্দ্রগুপ্ত সেখানেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। মূরাদেবীর আর্থিক স্বচ্ছলতা না থাকায় এক রাখাল চন্দ্রগুপ্তকে পোষ্যপুত্র হিসেবে গ্রহণ করে। চন্দ্রগুপ্ত এই রাখালের গৃহে কিছুদিন লালিত-পালিত হন। অত:পর বালক চন্দ্রগুপ্তের রাজসদৃশ চেহারা ও বুদ্ধিমত্তা লক্ষ্য করে তাকে তক্ষশীলার এক ব্রাহ্মণ চানক্য যিনি বিষ্ণুগুপ্ত ও কৌটিল্য নামেও পরিচিত, সঙ্গে করে নিয়ে যান এবং তাকে রাজনীতি ও সামরিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে থাকেন। এর কারণ ছিল এই যে, এই কৌটিল্য প্রকাশ্য রাজদরবারে একবার নন্দরাজ কর্তৃক অপমানিত হয়েছিলেন।

ধননন্দের পিতৃশ্রাদ্ধে পৌরহিত্য করার জন্যে একজন ব্রাহ্মণের প্রয়োজন হয়। তখন মন্ত্রী শকটার কৌটিল্য বা চাণক্যকে ঐ শ্রাদ্ধে পৌরহিত্য করার জন্যে আমন্ত্রণ জানান। তারপর যখন কৌটিল্য রাজপ্রসাদে উপস্থিত হয়ে প্রধান পুরোহিতের আসন গ্রহন করেন, তখন কুৎসিৎ কদাকার চেহারার কৌটিল্যকে দেখে ধনানন্দ ভীষণ ক্রুদ্ধ হন। তিনি তাকে টিকি ধরে তার আসন থেকে টেনে তুলে ঘেটি ধরে রাজপ্রাসাদ থেকে বের করে দেন। আর কৌটিল্য এই অপমানের প্রতিশোধ নেবার প্রতিজ্ঞা করেন এবং ব্রত পালন করতে থাকেন।

চন্দ্রগুপ্ত আলেকজান্ডারের সাহায্য লাভে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসে সেনাবাহিনী সংগঠনে আত্মনিয়োগ করেন এবং কূটবুদ্ধি সম্পন্ন ব্রাহ্মণ চানক্যের সহযোগীতায় পার্শ্ববর্তী প্রজাতান্ত্রিক রাজ্যগুলো থেকে সেনা সংগ্রহ করে অতি অল্প সময়ের মধ্যে বিন্ধ্যা পর্বতে একদক্ষ সেনাদল গড়ে তোলেন। এই সেনাবাহিনী শক, যবন, কিরাত, কম্বোজ প্রভৃতি জাতির যোদ্ধা দ্বারা গঠিত হয়েছিল।

৩২৪ বিসিই চন্দ্রগুপ্ত তার সেনাবাহিনী নিয়ে মগধ আক্রমণ করেন। এই সংঘর্ষে নন্দরাজ পরাজিত ও নিহত হলে চন্দ্রগুপ্ত মগধের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন এবং কৌটিল্য হন তার উপদেষ্টা।

আলেকজান্ডার তার বাহ্যিক সাফল্যগুলির দ্বারা বিমোহিত হয়ে, তার আদর্শ সমূহকে বিসর্জন দিয়েছিলেন। এরূপে পূর্বাঞ্চলে তার শেষ বৎসরগুলিতে তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি সম্পূর্ণরূপে পাল্টে গিয়েছিল। তিনি তার চারপাশের বিভিন্ন প্রলোভন দ্বারা দারুনভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তিনি মাত্রাতিরিক্ত মদ্যপানে আসক্ত এবং এক ধরণের জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। এই জ্বরই তার মৃত্যুর কারণ হল। 

বাবিলে ৩২৩ বিসিই বিশ্ববিজয়ী আলেকজান্ডার মৃত্যুবরণ করেন। এসময় তার বয়স ছিল মাত্র ৩৩ বৎসর। এত অল্প বয়সী হলেও ইতিমধ্যেই তিনি এক যুগান্তকারী ইতিহাস সৃষ্টি করে ফেলেছিলেন।

আলেকজান্ডারের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার শোভাযাত্রা।
আলেকজান্ডার যখন মৃত্যুবরণ করেছিলেন তখন তার উত্তরাধিকারী হওয়ার মত এমন কোন শক্তিশালী লোক ছিলেন না যিনি তার বিজিত বিশাল সাম্রাজ্য একত্রে ধরে রাখতে পারেন। তার মৃত্যুরপর তাকে সমাধিস্থ করার পূর্বেই তার সেনাপতিদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়ে যায়। তার এই সাম্রাজ্য অত:পর তার চারজন সেনাপতির মধ্যে ভাগ হয়ে গেল। এই সেনাপতিরা হলেন টলেমি, লাইসিয়াস, কাসেন্ডার এবং সেলুকাস। আর এই বিভাগগুলি ছিল পশ্চিমাঞ্চল অথবা গ্রীস, উত্তরাঞ্চল অথবা আর্মেনিয়া, পূর্বাঞ্চল অথবা সিরিয়া এবং দক্ষিণাঞ্চল বা মিসর। সেলুকাসের শাসনাধীনে সিরিয়া বা পূর্বাঞ্চলের অংশে পড়েছিল পাঞ্জাব, সিন্ধু, পারস্য ও প্যালেষ্টাইনের উত্তরাঞ্চল। টলেমীর শাসনাধীন দক্ষিণাঞ্চল বা মিসরীয় ভাগের অন্তর্ভূক্ত ছিল প্যালেস্টাইনের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চল। বস্তুতঃ প্যালেস্টাইন সেলুকাস এবং টলেমি এই দু’শক্তির মাঝে পড়েছিল।
 
সেলুকাস তার রাজ্যে গ্রীসের অনুরূপ নগর রাষ্ট্র গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়েছিলেন যার অন্যতম ছিল দজলা বা টাইগ্রিসে অবস্থিত সেলেওসিয়া। এখানে তিনি পশ্চিমা দেবদেবীদের মূর্ত্তি স্থাপন করেছিলেন এবং পশ্চিমা শিল্পকলা ও চিন্তাধারার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন।

আলেকজান্ডারের মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই চন্দ্রগুপ্ত গ্রীক শাসকদের বিতাড়নের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। প্রথমে নন্দ বংশের উচ্ছেদ সাধন করে তিনি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে তার রাজ্য বিস্তার অব্যহত রাখেন। একই সঙ্গে একের পর এক গ্রীক অধিকৃত অঞ্চলসমূহ জয় করে পাঞ্জাবের নিকটবর্তী হন। আলেকজান্ডারের নিয়োজিত গ্রীক শাসনকর্তা সেলিওকাস তাকে দমন ও বিজিত রাজ্যসমূহ পুন:রুদ্ধার করতে ৩০৫ বিসিই সিন্ধুতে এসে পৌছিলে চন্দ্রগুপ্ত কর্তৃক প্রচন্ড বাঁধার সম্মুখীন হন। এতে সেলিওকাস চন্দ্রগুপ্তের সাথে সন্ধি করতে বাধ্য হন। সন্ধির আশু শর্তানুসারে সেলিওকাস চন্দ্রগুপ্তকে কাবুল, কান্দাহার, হিরাট ও মাকরান প্রদেশ ছেড়ে তো দিলেনই উপরন্তু নিজকন্যা হেলেনের সঙ্গে চন্দ্রগুপ্তের বিবাহ দিয়েছিলেন। অন্যদিকে বন্ধুত্বের নিদর্শণ স্বরূপ চন্দ্রগুপ্ত সেলিওকাসকে পাঁচশত হাতি উপহার দেন। দীর্ঘ ২৪ বৎসর রাজত্বের পর ৩০০ বিসিই এই চন্দ্রগুপ্ত অবশেষে মহীশুরের শ্রাবণ বেলগোলা নামক স্থানে অনশনে মৃত্যুবরণ করেন।

সমাপ্ত।

ছবি: Wikipedia, historyforkids.
বি:দ্র: যারা ২০০৪ সনে মুক্তিপ্রাপ্ত Alexander ছবিটি দেখেননি, এখন সেটি দেখে ফেলেন।

২৮ মার্চ, ২০১২

Hindustan: প্রাচীন ধর্ম ও সংস্কৃতি।

প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশ (Hindustan)। এই অঞ্চলের আদিম অধিবাসীরা ছিল দ্রাবিড়। বর্তমান তামিলের আদি নাম দ্রাভিদা। সম্ভবত: এই অঞ্চলে বসবাসের কারণেই তারা কালক্রমে দ্রাবিড় নামে পরিচিতি লাভ করে। দ্রাবিড়গণ ভূ-মধ্যসাগরীয় অঞ্চল, ক্রীট দ্বীপ ও অপরাপর সন্নিহিত অঞ্চল হতে ক্রমান্বয়ে উপমহাদেশের উত্তর পশ্চিম সীমান্ত পথে প্রথমে বেলুচিস্থানে বসতি স্থাপন করে। অত:পর তাদের একটি শাখা সিন্ধু নদীর উপত্যকা বরাবর বসতি স্থাপন করতে করতে অগ্রসর হয়। প্রাচীনকালে ভূ-পৃষ্ঠের স্থলভাগ ঘন-জঙ্গলে পরিপূর্ণ থাকায় সুবিধাজনক ও নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল নদীপথ। এ কারণে বসতি ও ব্যবসা কেন্দ্র নদ-নদীর তীরবর্তী অঞ্চলসমূহে গড়ে উঠেছিল। এভাবে খ্রী:পূ: ৪,৫০০ বৎসর পূর্বে দ্রাবিড়গণ কর্তৃক মহেঞ্জদারো (Mohenjodaro) ও হরপ্পাতে (Horoppa) দু‘টি নগর কেন্দ্রিক প্রাকবৈদিক সভ্যতার সূচনা ঘটে- যা সিন্ধু সভ্যতা নামে পরিচিত। একই ভাবে পৃথিবীর বড় বড় নদীর উপত্যকায় বিভিন্ন সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। যেমন-নীল নদের উপত্যকায় মিসরীয় সভ্যতা, টাইগ্রীস উপত্যকায় অ্যাসিরীয় সভ্যতা এবং ফোরাত উপত্যকায় ব্যাবিলীয় সভ্যতা প্রভৃতি। 

মহেঞ্জদারো সভ্যতা।
দ্রাবিড়রা সমাজবদ্ধভাবে ছোট ছোট নগরে বাস করত। কৃষিই ছিল তাদের প্রধান উপজীবিকা। তবে ব্যবসা-বাণিজ্যও তাদের জানা ছিল। সোনা, রূপা, তামা ও লোহার ব্যাবহারও তারা জানত। আত্মরক্ষার জন্যে তীর-ধনুক, বল্লম, তরবারী প্রভৃতির ব্যাবহার তারা শিখে ফেলেছিল। তারা কৃষির প্রয়োজনে বাঁধ নির্মাণ করতে পারত। এমন কি পাকা দালান কোঠা নির্মাণ করতেও তারা শিখেছিল। পোশাক-পরিচ্ছদ ও অলঙ্কারাদি ব্যাবহারের পাশাপাশি তারা নৌকা ও ছোট ছোট জাহাজ নির্মাণ করত যা যোগাযোগ ও বাণিজ্যের কাজে ব্যবহৃত হত। 

 হরপ্পা সভ্যতা।
দ্রাবিড় সমাজে বিবাহ প্রথা প্রচলিত ছিল, তবে এটি ছিল মাতৃপ্রধান সমাজ। মাতা সন্তানদের নিয়ে বসবাস করত। তবে পিতা পরিবারের সাথে থাকতে পারত না।

দ্রাবিড়রা মাতৃদেবীর পূজা করত এবং দেবতার সন্তুষ্টি অর্জণে নরবলি দিত। তবে তাদের মধ্যে পাপ-পূণ্যের কোন ধারণা ছিল না। বর্তমানে দক্ষিণ ভারত ও সিংহলের অধিবাসী যারা তামিল, তেলেগু, মালয়ালম, কানাড়ী ভাষাভাষী তারাই সূ-প্রাচীন দ্রাবিড়দের বংশধর।

খাদ্যাভাব, স্থানাভাব ও গৃহবিবাদের কারণে আর্যরা তাদের আদি বাসস্থান মধ্য এশিয়ার ব্যাকটেরিয়া হতে দলে দলে বেরিয়ে পড়ল। তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল পশু পালনের জন্যে চারণ ভূমি দখল করা। এইসব আর্যদের এক অংশ খ্রী:পূ: ২য় সহস্রাব্দে উত্তর-পশ্চিম খায়বর গিরিপথ দিয়ে ভারত উপমহাদেশে প্রবেশ করল এবং তাদের একটি শাখা পারস্য বা ইরানে চলে গেল। আর্য জাতির যে অংশ ইউরোপে চলে যায় বর্তমানে তারাই বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন জাতি নামে পরিচিত। যেমন- এ্যাংলো স্যকশনের নামানুসারে বর্তমান ইংল্যন্ড, ফ্রাঙ্ক এর নামানুসারে বর্তমান ফ্রান্স ইত্যাদি।

প্রাচীন ভারতবর্ষ,১৮৩১।
আর্যরা শান্তিপূর্ণ ভাবে নিজেদের গৃহস্থলি, পশু, আসবাবপত্র এবং দেবদেবী নিয়ে অধিবাসী হিসেবে এই উপমহাদেশে আগমন করেছিল। অত:পর দৈহিক শক্তি, নিষ্ঠুরতা, দু:সাহস ও দক্ষতা প্রভৃতি কারণে তারা উত্তর ভারতের আদি অধিবাসীদের উপর প্রভুত্ব অর্জনে সমর্থ হয়েছিল। তারা সর্বপ্রথমে পাঞ্জাবে বসতি স্থাপন করেছিল। অত:পর পূর্বাঞ্চলে বসতি বিস্তার করে কোশল ও কাশী রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তীতে তারা ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের উপর আধিপত্য অর্জন করতে চাইলে যুদ্ধের সূচণা ঘটে। দীর্ঘ সংগ্রামের পর তারা সিন্ধু বিধৌত অঞ্চল- সপ্তসিন্ধুর দখল কায়েমে আনে। সিন্ধু, বিতস্তা, চন্দ্রভাগা, ইরাবতী, বিপাশা, শতদ্রু ও স্বরস্বতী এই সাতটি নদী বিধৌত অঞ্চলটি সপ্তসিন্ধু নামে পরিচিত।

আর্যদের আক্রমণের ফলে সমগ্র সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। অনার্য সিন্ধুর অধিবাসী যারা এই আক্রমণ প্রতিহত করে প্রাণে বেঁচেছিল তারা তাদের বাসস্থান পরিত্যাগ করে দক্ষিণ ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। আর যারা বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছিল তারা আর্য সমাজে নিম্নস্তরের জীবন-যাপনের সুযোগ পেয়েছিল। ক্রমে ক্রমে আর্যরা সমগ্র উত্তর ভারতে তাদের আধিপত্য বিস্তার করে এবং বিহার, বারাণসী, বঙ্গদেশ প্রভৃতি স্থান দখল করে নেয়। এভাবে হিমালয় হতে বিন্ধ্যা পর্বত এবং বঙ্গোপসাগর হতে আরব সাগর পর্যন্ত সমগ্র ভারতে তাদের প্রভাব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।

সপ্তসিন্ধু।
যে সময় গঙ্গা উপত্যকার পূর্বাঞ্চালে আর্য সভ্যতার বিস্তার ঘটছিল, সেই সময় হস্তিনাপুর, অহিচ্ছত্র এবং কৌশম্বীতে আর্য সভ্যতা পরিপূর্ণ বিকাশ লাভ করেছিল। কিন্তু প্রাকৃতিক দূর্যোগে হস্তিনাপুর ও কৌশম্বী নগরীদ্বয় ধ্বংস প্রাপ্ত হলে সুযোগ মত লিছবী উপজাতীরা বিদেহ রাজ্যটি দখল করে নেয়। এসময় এই বিদেহ রাজ্যের দক্ষিণে মগধ নামে আর একটি রাজ্যের উৎপত্তি ঘটে। 

উপমহাদেশে আগমনকারী আর্যরা ৫টি গোত্র ছিল। এ কারণে তারা নিজেদেরকে পঞ্চজাতি বলত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপে সমাজ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এল। কয়েকটি পরিবার নিয়ে গোত্র, কয়েকটি গোত্র নিয়ে গ্রাম, কয়েকটি গ্রাম নিয়ে বিশ, কয়েকটি বিশ নিয়ে জনপদ অথবা কয়েকটি জনপদ নিয়ে একটি মহাজনপদ গঠিত হয়েছিল। 

গ্রীষ্মে ঝিলম নদী।
আর্য সমাজে পিতা হত পরিবারের প্রধান। আর গোত্র প্রধান হত গোত্রের সবচেয়ে বয়সী গণ্যমান্য ব্যক্তি। অন্যদিকে গ্রাম, বিশ, জনপদ বা মহাজনপদের প্রধানগণ নির্বাচিত হত। জনপদ বা রাজ্য প্রধান (রাজা) নির্বাচিত হত ক্ষত্রিয়দের মধ্যে থেকে সেই ব্যক্তি যে বিজয়ী সমরনায়ক অথবা সম্মুখ সমরে সুযোগ্য নেতৃত্বদানে সক্ষম সাহসী যোদ্ধা।

আর্যগণ যখন উপমহাদেশে আগমন করে তখন তাদের মধ্যে কোন জাতিভেদ ছিল না। তারা ছিল গৌর বর্ণ, দীর্ঘকায় এবং অনার্য আদিবাসীরা ছিল কৃষ্ণ বর্ণ। পরবর্তীতে বৈদিক যুগে সমাজ ব্যবস্থা জটিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গুণ ও কর্মভেদে তাদের মধ্যে চারটি বর্ণের উদ্ভব হয়। এগুলি হল-

ক) ব্রাহ্মণ: পূজা-পার্বন, যাগ-যজ্ঞ, ধর্মশাস্ত্র পাঠ ও রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার যারা সংরক্ষিত করেছিল।
খ) ক্ষত্রিয়: অস্ত্র-শস্ত্রের ব্যাবহার, দেশরক্ষা ও দেশ শাসনে যারা নিয়োজিত হত।
গ) বৈশ্য: ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিকাজ ও পশুপালনের দ্বারা যারা জীবিকা নির্বাহ করত।
ঘ) শূদ্র: উপরোক্ত তিন শ্রেণীর সেবাকাজে যারা ব্যপ্ত হয়েছিল।

এই শ্রেণী বিভাগের ব্যাখ্যায় ব্রাহ্মণরা প্রচার করেছিল যে পৃথিরীর সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা তার শরীরের বিভিন্ন প্রত্যঙ্গ থেকে মানুষ সৃষ্টি করেছেন। ব্রহ্মার মুখ থেকে সৃজিত হয়েছে ব্রাহ্মণ এবং এই কারণে তারা দেবতার পক্ষ থেকে কথা বলতে পারে, হাত থেকে সৃষ্টি হয়েছে ক্ষত্রিয় অর্থাৎ যোদ্ধা শ্রেণী, উরু থেকে বৈশ্য অর্থাৎ বণিক শ্রেণী, আর পদযুগলের ময়লা থেকে শূদ্র অর্থাৎ ভৃত্য শ্রেণী। শূদ্রদের জীবন ছিল অতি কষ্টের, কিন্তু তার চেয়েও কষ্টের ও লাঞ্ছনার জীবন ছিল তাদের যারা ছিল অচ্ছুৎ। অচ্ছুৎ গণ্য করা হত তাদের যারা এই চতুর্বর্ণের কোনটার মধ্যেই পড়ে না। অচ্ছুৎরা সবচেয়ে নোংরা কাজ করতে বাধ্য থাকত। এরা হল মুচি, ম্যাথর বা ডোম, কাওরা বা শুকর পালক ইত্যাদি। মনে করা হত এদের গাত্র স্পর্শ করা মাত্রই কোন লোক অপবিত্র হয়ে যায়। ভূমিষ্ঠ হওয়ার মূহূর্ত থেকেই অচ্ছুতের সন্তানকে অশুচি ভাবত লোকে।

ব্রাহ্মণরা বিভিন্ন বর্ণভূক্ত লোকজনের জন্যে নির্দিষ্ট ধরণের কাজ ও আচার ব্যাবহারের এমন কঠোর নিয়ম বেঁধে দিয়েছিল-
  • শরীরের সর্বোত্তম প্রত্যঙ্গ থেকে উৎপত্তি লাভের ফলেই একজন হয় ব্রাহ্মণ-সারা পৃথিবীর প্রভু। ব্রাহ্মণদের যদি কিছু ভাল লাগে, বিনা খেদে তাকে তা প্রদান করা উচিৎ।
  • ঈশ্বর শুধুমাত্র একটি কর্তব্য সমাধার জন্যেই শূদ্রদের নির্দেশ দিয়েছেন: বিনয়াবনত চিত্তে তোমা অপেক্ষা উচ্চবর্ণের লোকদের সেবা কর। 
  • উচ্চ বর্ণদের সম্পর্কে যদি কোন শূদ্র অপমানজনক কোন কথা বলে, তবে তার মুখ উত্তপ্ত লৌহপিন্ড দ্বারা বন্ধ করে দাও। ব্রাহ্মণদের সঙ্গে তর্করত শূদ্রদের মুখ ও কানে ফুটন্ত তেল ঢেলে দিতে রাজাই আদেশ দেবেন।
  • শূদ্র ব্রাহ্মণকে হাত বা ষষ্ঠি দ্বারা প্রহার করার চেষ্টা করলে শূদ্রের হাত কেটে ফেলার জন্যে যোগ্য হয়, আর রাগান্বিত হয়ে পা দ্বারা আঘাত করলে তার পা কেটে ফেলা উচিৎ। 
  • ব্রাহ্মণের ক্ষেত্রে মৃত্যুদন্ডের স্থলে মস্তক মুন্ডনই চরম শাস্তি।
  • ব্রাহ্মণকে বাদ দিয়ে ক্ষত্রিয় কখনও সাফল্য লাভ করে না এবং ক্ষত্রিয় ব্যাতিরেকে ব্রাহ্মণেরও কোন সাফল্য নেই।
  • ঈশ্বরই রাজা ও ক্ষত্রিয়দের সৃষ্টি করেছেন, যাদের কাজ হল এইসব নিয়ম ঠিকমত পালিত হচ্ছে কিনা তা দেখা।
আর্যরা স্বর্গ ও মর্ত্যকে দেবতা জ্ঞানে অর্চণা করত। এভাবে ইন্দ্র বজ্রের দেবতা ছিল। অগ্নিকেও তারা দেবতার আসনে বসিয়েছিল। দেবতাদেরকে মহান ও শক্তিশালী মনে করা হত। আর্যদের মতে দেবতারা উপাসনাকারীদের মঙ্গল সাধনে ইচ্ছুক এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে নিয়ত সংগ্রামে লিপ্ত।

এই উপমহাদেশে আগমন কালে আর্যগণ কোনরূপ পূজার সাথে জড়িত ছিল না। তারা স্তুতি ও উৎসর্গের দ্বারা দেবতাদের অর্চণা করত মাত্র। তাদের ধর্ম একেশ্বরবাদী না হলেও তাদের মধ্যে একেশ্বরবাদের ধারণা প্রচলিত ছিল। কালক্রমে তাদের এইসব রীতিনীতি এবং চিন্তাধারা যা তারা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল, অনার্য রীতি-নীতি তাদের সমাজে প্রবেশ করাতে তার ক্রমাগত গ্রহণ ও বর্জন চলতে লাগল এবং একসময় তারা কর্মফল ও জন্মান্তরবাদে বিশ্বাসী হয়ে পড়েছিল। এই মতবাদই বর্তমান হিন্দু ধর্মের জন্ম দেয়।

উপমহাদেশের সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে আর্যদের অবদান অপরিসীম। তাদের রচিত প্রথম সাহিত্যের নাম বেদ। বেদ অর্থ জ্ঞান। এই বেদ চারটি ভাগে বিভক্ত ছিল। যথা- ঋগ্বেদ, সামবেদ, যজুর্বেদ এবং অথর্ববেদ। ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে আর্যদের অবদান না থাকলেও তাদের এইসব সাহিত্য ইতিহাস রচনায় এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।

সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে বেদ আবারও চারভাগে বিভক্ত হয়েছে। যেমন- সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ। উপনিষদ বেদের একেবারে শেষভাগে রচিত বলে একে বেদান্ত বলা হয়ে থাকে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আর্যদের রচিত এই বেদ-পূরাণে এক কলি অবতারের (মহাপুরুষ) আগমন বার্তা ঘোষণা করে তার জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটনা সমূহের বিস্তারিত ভবিষ্যৎ বাণী বর্ণনা করা হয়েছে। ঐসব গ্রন্থে বলা হয়েছে একমাত্র তিনিই হবেন মানব মুক্তির দূত। সকল মানুষকেই তার মুখ নিঃসৃত বাণী গ্রহণ করে তার আদর্শে আদর্শবান হতে হবে। এছাড়া মানব মুক্তির কোন পথ খোলা নেই। সেই কলি অবতার হচ্ছেন শেষ নবী মুহম্মদ। বলা হয়ে থাকে বেদ বাক্য অপরিবর্তনীয় ও অলঙ্ঘনীয়। সুতরাং আমরা কৌতুহলবশত: মুহম্মদ সম্পর্কে বেদ-পূরাণের শ্লোকগুলিতে নজর বুলিয়ে যাব--

উত্তরায়নবেদ:   
লা-ইলাহা হরত্তি পাপম
ইলাহ ইলাহা পরম পাদম
জন্ম বৈকুন্ঠ অপঃ ইন্যুতি
ও জপি নামো মুহামদম।
অর্থ: লা-ইলাহার (এক আল্লাহর) আশ্রয় ব্যতিত পাপমুক্তির কোন উপায় নেই। ইলাহ (আল্লাহ) এর আশ্রয়ই প্রকৃত আশ্রয়। বৈকুন্ঠে জন্মলাভের আশা করলে ইলাহর (আল্লাহর) আশ্রয় নেয়া ছাড়া কোন উপায় নেই। আর এজন্যে মুহম্মদের প্রদর্শিত পথ অনুসরণ অপরিহার্য।

অথর্বেদীয় উপনিষদ: 
অস্য ইল্ললে মিত্রাবরূণো রাজা
তম্মাৎ তানি দিব্যানি পুনস্তং দুধ্যু
হবয়ামি মিলং কবর ইল্লালাং
অল্লোরসূল মহম্মদ কং
বরস্য অল্লো অল্লাম ইল্লল্লোতি ইল্লাল্লা \ ৯ \
অর্থ: যথাসময়ে জনৈক মহাপুরুষ আবির্ভূত হবেন। একমাত্র তিনিই হবেন মানব মুক্তির দূত। সকল মানুষকেই তার মুখনিঃসৃত বাণী গ্রহণ করে তার আদর্শে আদর্শবান হতে হবে। এছাড়া মানব মুক্তির কোন পথ খোলা নেই। সেই আল্লাহর রসূল মুহম্মদকে প্রণতি জানাই।
ভবিষ্যৎ পূরাণ:   
এত স্লিন্নস্তরে ম্লেচ্ছআচার্যেন সবন্বিতঃ।
মহামদ ইতি খ্যাতঃ শিষ্য শাখা সমন্বিতঃ \৫\
নৃপশ্চৈব মহাদেবং মরুস্থ'ল নিবাসিনম
গঙ্গা জলৈশ্চ সংস্পপ্য পঞ্চগব্য সমন্বিতৈঃ
চন্দনাদি ভিরভ্যর্চ তুষ্টাব মনসা হরম \৬\
নমস্তে গিরিজানাথ মরুস্থল নিবাসিনে 
ত্রিপুরা সুরনাশায় বহুমায়া প্রবর্তিনে \৭\
অর্থঃ যথাসময়ে মুহম্মদ নামে জনৈক মহাপুরুষ আবির্ভূত হবেন। যার নিবাস হবে মরুস্থলে আরব দেশে। সাথে স্বীয় সহচরবৃন্দও থাকবেন।
হে মরুর প্রভূ, হে জগত গুরু, আপনার প্রতি আমাদের স্তুতিবাদ, আপনি জগতের সমুদয় কুলুষাদি ধ্বংসের উপায় অবগত আছেন। আপনাকে প্রণতি জানাই। 

ভোজরাজ উবাচ:   
ম্লেচ্ছৈ গুপ্তায় শুদ্ধায় সচ্চিদানন্দ রূপিণে।
ত্বংমাং হি কিঙ্করং বিদ্ধি শরনার্থ মুপাগতম \৮\
অর্থ: হে মহাত্মা, আমরা আপনার দাসানুদাস। আমাদেরকে আপনার পদমূলে আশ্রয় প্রদান করুন।

অলোপনিষদ:
হোতার মিন্দ্রো হোতার মিন্দ্রো মহাসুরিন্দ্রাঃ।
অল্লো জ্যেষ্ঠং শ্রেষ্ঠং পরমং পূর্ণং ব্রহ্মাণ অল্লাম
অল্লো রসূল মহমদ কং বরস্য অল্লো অল্লাম 
আদল্লাহ্ বুকমে ককম অল্লাবুক নিখাতকম \৩\
অর্থ: ‘আল্লাহ সকল গুণের অধিকারী। তিনি পূর্ণ ও সর্বজ্ঞানী। মুহম্মদ আল্লাহর রসূল।  আল্লাহ আলোকময়, অয়, এক, চির পরিপূর্ণ এবং স্বয়ম্ভূ।’

অথর্ববেদ:    
ইদং জনা উপশ্রুত নরাশংসস্ত বিষ্যতে।
ষষ্টিং সহস্র নবতিংচ কৌরম আরুশ মেষু দবহে \১\
অর্থ: ‘হে মানবজাতি, মনোযোগ দিয়ে শোন, ‘প্রসংশিত জন’ লোকদের মধ্যে থেকে উত্থিত হবেন। আমরা তাকে ষাট হাজার শত্রুর মাঝে পেলাম। (মুহম্মদ নামের অর্থ প্রশংসিত জন আর তৎকালীন আরববাসীর সংখ্যা ছিল প্রায় ষাট হাজার।)’- ইত্যাদি।

যা হোক, আর্যদের দ্বারা উপমহাদেশের সাহিত্য ভান্ডার পরবর্তিতে আরও সমৃদ্ধ হয়। মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যসদেব মহাভারত এবং মহর্ষি বাল্মীকি রামায়ণ মহাকাব্য রচনা করলেন। সংস্কৃত ভাষায় এই মহাকাব্য দু‘টি রচিত হয়েছিল। ধারণা করা হয় আর্যদের যাগ-যজ্ঞাদিতে যে সমস্ত বীরগাঁথা পঠিত হত তা থেকেই এই মহাকাব্য দু‘টির উৎপত্তি।

মহাভারত পৃথিবীর দীর্ঘতম মহাকাব্য। প্রায় এক লক্ষেরও বেশী শ্লোক সন্নিবেশিত রয়েছে এতে। অন্যদিকে রামায়ণ মহাভারত অপেক্ষা অনেক ছোট কাব্যগ্রন্থ- মহাভারতের প্রায় এক চতুর্থাংশ। মহাভারত মহাকাব্য দুই রাজ পরিবারের মধ্যে ক্ষমতালাভের দ্বন্দ্ব নিয়ে রচিত হয়েছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যসদেব অসম্ভব কল্পণার অপরূপ অলংকরণে সজ্জ্বিত করেছেন এই মহাকাব্যের পংক্তিগুলো। তবে আমরা কাব্যিক অলঙ্কার বিশ্লেষণে না গিয়ে বরং মহাভারতের কাহিনীটাতে একবার নজর বুলিয়ে যাই-

"পান্ডবদের পাঁচ ভাই অকালে পিতৃহীন হয়ে পড়ে। তাদের পিতৃব্য এবং তার সন্তানেরা তাদের স্বদেশ থেকে বিতাড়িত করে। বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে পঞ্চপান্ডব অমিত বিক্রমশালী যোদ্ধা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। সে সময়ে পার্শ্ববর্তী একটি দেশের রাজা ঘোষণা করেন যে, যে ব্যক্তি সোনালী মাছের চোখ তীরবিদ্ধ করার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারবে, সে তার কন্যার পাণি গ্রহণ করতে পারবে। মাছটিকে একটি গাছে ঝুলিয়ে দিয়ে তার সামনে পাখা বিশিষ্ট একটি চক্র সর্বদা ঘূর্ণায়মান রাখা হয়েছিল। সমগ্র ভারতবর্ষ থেকে তরুণের দল এসে জমায়েত হয়েছিল রাজদরবারে। এই পরীক্ষায় শুধুমাত্র পান্ডবদের একভাই উত্তীর্ণ হয়েছিল এবং সেই রাজকন্যাকে বিবাহ করেছিল।

পান্ডবদের মধ্যে যে জৈষ্ঠ্য সে নিজে সহ চার ভাই ও রাজকন্যাকে বাজী রেখে দ্যূতক্রীড়া খেলতে বসে এবং পরাজিত হয়। পরাজয়ের ফলে সকলকে দাস জীবন যাপন করতে হয়। অনেক পরে দাসত্ব থেকে তারা মুক্তি পায় বটে, কিন্তু নির্বিঘ্নে সহজ পন্থায় নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। তখন শুরু হয় পঞ্চ পান্ডবভ্রাতা ও তাদের পিতৃব্যপুত্রদের মধ্যে মরণপণ সংগ্রাম। পন্ডবদের সবচেয়ে প্রধান শত্রুর কথা ছিল: "হয় আমি ওদের ধ্বংস করে পৃথিবী শাসন করব, নয়ত: আমার মৃত্যুর পর পারলে ওরা শাসন করুক।"

জনগোষ্ঠির কিছু দল গেল পন্ডবদের পক্ষে, আর অন্যরা গেল শত্রুদের দিকে। তাদের মধ্যে যুদ্ধ চলেছিল আঠার দিন। শত্রু নিধনের সাধনায় উভয় পক্ষই সবকিছু ভুলে প্রাণপণে যুদ্ধ করেছিল। সমস্ত যুদ্ধক্ষেত্র জুড়ে বোঁ বোঁ শব্দে তীরের আনাগোনা, রথে রথে সংঘর্ষ, আকাশে মেঘের ন্যায় বিশাল হস্তীযুথ একে অন্যের উপর প্রচন্ড হিংসায় ঝাঁপিয়ে পড়ে পরস্পর পরস্পরকে ছিন্ন ভিন্ন করতে লাগল। যুদ্ধরত অশ্বারোহী সেনা ছুটে বেড়াচ্ছে পাখির মত দ্রুত গতিতে, হিস হিস শব্দে বায়ূ ভেদ করে ছুটে যাচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে তীর। সমগ্র যুদ্ধক্ষেত্র মৃত ও আহত মানুষের দেহে ঢেকে গেল, এই মহাযুদ্ধের যারা হোতা তাদের প্রতি উৎক্ষিপ্ত অভিশাপে পূর্ণ হয়ে গেল সমরভূমি।

না এ-পক্ষে, না ও-পক্ষে, কোনদিকেই জয়ের লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত অবশ্য পান্ডবরাই জয়ী হল। তারাই অবশেষে সিংহাসনে আরোহণ করে সমুদ্র পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করল।"

অন্যদিকে রামায়ণ মহাকাব্যে বর্ণিত হয়েছে রাজকুমার রামের কাহিনী। "রামকে নির্বাসনে পাঠান হয়, তার পত্নী রাবণের হাতে বন্দী হয়। রাবণ ছিল শ্রীলঙ্কার রাজা। রাম হনুমান নিয়ে একটি সেনাবাহিনী ও ভল্লুক বাহিনী গঠন করে। তারপর তার বাহিনী নিয়ে রাবণের রাজ্য লঙ্কা দ্বীপে গিয়ে হাজির হয়। রামের হনুমান বাহিনী লঙ্কাতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে এক 'লঙ্কাকান্ড' ঘটিয়ে ফেলে। অন্যদিকে দ্বন্দ্ব যুদ্ধে রাম রাবণকে হত্যা করে পত্নীকে মুক্ত করে এবং তাকে নিয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে।"

খ্রী:পূ: ষষ্ঠশতকে ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মীয় চিন্তার জগতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হল। ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যের বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে গড়ে উঠা উষ্মা ও ক্ষোভ এই নূতন ধর্মীয় মতবাদের উদ্ভবের কারণ। এই ধর্মীয় বিপ্লব সাধিত হল ক্ষত্রিয়দের দ্বারা। বৈদিক ধর্মের জটিলতা, বাহ্যিক আড়ম্বর সর্বস্ব ধর্মীয় বিধি, যাগ-যজ্ঞাদি, নরবলি, সর্বোপরি পুরোহিত শ্রেণীর প্রাধান্য তাদেরকে ধর্মীয় মুক্তির পথ সন্ধানে উদ্বুদ্ধ করেছিল। প্রথম তীর্থাঙ্কর বা মুক্তির পথপ্রদর্শক ছিলেন ঋষভদেব। পরবর্তীতে একে একে আরও ২৩ জন তীর্থাঙ্করের আগমন ঘটে ধরণীতে। সর্বশেষ তীর্থাঙ্কর মহাবীরের পূর্ববর্তী তীর্থাঙ্কর ছিলেন পার্শ্বনাথ। তার জন্ম ক্ষত্রিয় রাজবংশে। তিরিশ বৎসর বয়সে তিনি রাজপরিবারের বিলাসী জীবন-যাপন পরিত্যাগ করে সত্য সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে একসময় তিনি বর্তমান কাশীর নিকটবর্তী পরেশনাথ পর্বতে কঠোর সাধনায় লিপ্ত হন এবং সিদ্ধি লাভ করেন। অহিংসা, সত্য, অন্তেয় (অচৌর্য) ও অপরিগ্রহ (সন্ন্যাস) এই চারটি তার প্রচারিত ধর্মের মূল মন্ত্র যা চতুর্যাম নামে পরিচিত।

সর্বশেষ তীর্থাঙ্কর ছিলেন মহাবীর। পার্শ্বনাথের মৃত্যুর আড়াই‘শ বৎসর পর তার আবির্ভাব ঘটে। তার বাল্যনাম ছিল বর্ধমান। তিনি বর্তমান উত্তর বিহারের বৈশালীর নিকটবর্তী কুন্দপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা সিদ্ধার্থ ছিলেন একজন ক্ষত্রিয় দলপতি। আর তার মাতা ত্রিশলা ছিলেন বৈশালী রাজের ভগ্নি।

মহাবীর যশোদা নাম্নী এক রাজকন্যার পাণি গ্রহণ করেছিলেন। কয়েক বৎসর সংসার যাপনের পর তাদের এক কন্যা সন্তান জন্মগ্রহন করে। এই সন্তান জন্মের পরপরই ৩০ বৎসর বয়সে তিনি সংসারত্যাগী হন।

দীর্ঘ বার বৎসর কঠোর সাধনার পরও তিনি দিব্যজ্ঞান লাভ করতে না পেরে গোসাল নামের এক সন্যাসীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে ছয়মাস তার সাথে অতিবাহিত করেন।

ইতিমধ্যে তার সন্যাস জীবনের তের বৎসর পূর্ণ হল। এসময় তিনি পূর্ব ভারতের ঋজুপালিকা নদীর তীরে বর্তমান পরেশনাথ পাহাড়ের নিকটবর্তীতে পুন:রায় কঠোর সাধনায় নিমগ্ন হলে, এবার তিনি দিব্যজ্ঞান লাভে সমর্থ হন।
মহাবীর সকল রিপু জয় করেছিলেন বলে লোকেরা তাকে জিন বা জয়ী বলত।

বুদ্ধের জন্মস্থান, লুম্বিনী।
মহাবীর দীর্ঘ ৩০ বৎসর ধর্ম প্রচার করেছিলেন। মগধরাজ বিম্বিসার ও অজাতশত্রু তাকে প্রচারকার্যে সহায়তা করেন। ধর্ম প্রচারকালে বর্তমান পাটনার পাব্য নামক স্থানে ৪৬৭ খ্রী:পূ: ৭২ বৎসর বয়সে এই মহান ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করেন।
মহাবীরের প্রচারিত ধর্মমত নিগ্রন্থ বা সম্পর্কমুক্ত নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু কালক্রমে তার জিন উপাধির অনুকরণে এই ধর্ম জৈনধর্ম নামে পরিচিতি লাভ করে। মহাবীরের নামের সাথে জৈনধর্ম পরিচিতি লাভ করলেও প্রকৃতপক্ষে পার্শ্বনাথ এই ধর্মের মূল ভিত্তি স্থাপন করে গিয়েছিলেন। তার প্রবর্তিত চতুর্যামের সাথে মহাবীর ব্রহ্মচর্য সংযুক্তি করেন।
মহাবীর পার্থিব ভোগ-বিলাসের সাথে সাথে পরিধানের বস্ত্র পর্যন্ত ত্যাগ করেছিলেন। এ কারণে তার অনুসারীরা দ্বিগম্বর নামে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তীতে জৈনদের মধ্যে শ্বেতাম্বর নামে অপর এক শাখার উদ্ভব হয়।

বৈদিক ধর্মাবলম্বীদের সাথে জৈনদের মূল পার্থক্য হল-এরা বেদের কর্তৃত্ব স্বীকার করে না এবং দেবতার সন্তুষ্টি কামনায় পূজা ও পশু বলি করে না। তাদের চরম উদ্দেশ্য সিদ্ধি বা নির্বাণ লাভ করা। আর এই সিদ্ধি লাভের উপায় হল তিনটি-সৎকর্ম, কৃচ্ছসাধনও কঠোর সংযম। সংসারে বসবাস করে সিদ্ধিলাভ সম্ভব নয়। তাই সংসারত্যাগী জৈনরা মঠ, আশ্রম বা সঙ্ঘে বাস করে।

ধ্যানরত বুদ্ধ মূর্ত্তি, সারনাথ।
জৈনরা সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না। তাদের মতে বিশুদ্ধ বা পূর্ণ বিকশিত মানবাত্মাই দেবতা। তারা বৈদিক ধর্মাবলম্বীদের মত পুনর্জন্ম ও কর্মবাদে বিশ্বাসী। মূল, সূত্র, রঙ্গ ও উপাঙ্গ -এই চারটি জৈনদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ।

খ্রী:পূ: ৫ম শতকে হিমালয়ের পাদদেশে তরাই অঞ্চলে শাক্য জাতির বসবাস ছিল। শুদ্বোধন ছিলেন এই জাতির রাজা যিনি ক্ষত্রিয় বংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।শুদ্বোধনের স্ত্রী রানী মায়াদেবী গর্ভবতী হলে সন্তান জন্মের সময় পিতৃগৃহের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পথে প্রসব বেদনা শুরু হয়ে গেলে কপিলাবস্তুর নিকটবর্তী লুম্বিনী গ্রামে ৫১৮ খ্রী:পূ: এক পুত্রসন্তান প্রসব করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এই শিশুসন্তানই 'সিদ্ধার্থ'।

মায়াদেবীর মৃত্যুর কারনে বিমাতা গৌতমী সিদ্ধার্থকে লালন-পালনের ভার নেন। বিমাতা গৌতমীর কারণে তার অপর নাম হয় 'গৌতম'। আবার শাক্যকূলে জন্মগ্রহণ করেন বলে তার অপর এক নাম 'শাক্যসিংহ'।

বাল্যকাল থেকেই গৌতম চিন্তাশীল ও উদাসীন ছিলেন। এ কারণে পিতা শুদ্বোধন তাকে সংসারী করতে ৫০২ খ্রী:পূ: মাত্র ষোল বৎসর বয়সে বিবাহ দেন গোপা নাম্নী এক রাজকুমারীর সাথে। এই গোপা-যশোধরা, বিম্বা, শুভদ্রকা নামেও পরিচিত। তের বৎসর সংসার যাপনের পর ৪৮৯ খ্রী;পূ: রাহুল নামে তাদের এক পুত্রসন্তান জন্ম গ্রহণ করে। এই সন্তান জন্মগ্রহনের পরই ২৯ বৎসর বয়সে গৌতম বিলাসী জীবন-যাপন ও সংসারের মায়া ত্যাগ করে জীবনের মুক্তির পথ খুঁজতে বেরিয়ে পড়েন।

ধ্যানরত বুদ্ধ।
সত্যের সন্ধানে গৌতম একাধিক সন্যাসীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে বহুস্থানে পরিভ্রমণ করেন। কিন্তু নানাভাবে আত্মপীড়ন, ধ্যান ও কৃচ্ছসাধনের পরও তিনি দিব্যজ্ঞান লাভে ব্যর্থ হন। অবশেষে বর্তমান বুদ্ধগয়ার সন্নিকটস্থ উরুবিল্ব নামক স্থানে নিরঞ্জনা নদীতে অবগাহন করে পাশের এক বটমূলে কঠিন তপস্যায় লিপ্ত হলেন। এবার অভীষ্ট অর্জিত হল, পরম সত্য তার মনে উদ্ভাসিত হয়- তিনি বোধিলাভ করেন। 

যে বটমূলে বসে গৌতম দিব্যজ্ঞান লাভ করেন তা বোধিবৃক্ষ বা 'বোধিদ্রুম' নামে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তীকালে গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক এই বোধিবৃক্ষটি কর্তন করে ফেলেন।

গৌতম দিব্যজ্ঞান লাভ করেছিলেন ৪৮৩ খ্রী:পূ: ৩৫ বৎসর বয়সে। অত:পর তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেন ধ্যানলব্ধ মহাসত্য প্রচারে। তার প্রথম প্রচার স্থান ছিল কাশীর নিকটবর্তী সারনাথে।

ধামেক স্তুপা, সারনাথ।
গৌতম বুদ্ধ মানুষের উদ্দেশ্যে যে উপদেশাবলী প্রদান করেছিলেন তা হল-
ক) হিংসা কোরও না।
খ) চুরি কোরও না।
গ) মিথ্যে বলিও না।
ঘ) পরনিন্দা কোরও না।
ঙ) জীব হত্যা কোরও না। জীব হত্যা মহাপাপ।
চ) ধনসম্পদ পরিত্যাগ কর। এবং
ছ) ব্রহ্মচর্য পালন কর।

সূদীর্ঘ ৪৫ বৎসর ধর্ম প্রচারের পর কূশী নগরে ৪৪৮ খ্রীঃপূঃ ৮০ বৎসর বয়সে গৌতম বুদ্ধ ইহধাম পরিত্যাগ করেন। তার এই তিরোধান বৌদ্ধদের নিকট 'মহাপরিনির্বাণ' নামে অভিহিত।

বুদ্ধ রিলিক স্তুপা, বৈশালী।
বৌদ্ধধর্মমত সহজ সরল ও উদারপন্থী। এই ধর্মনীতিতে মানুষ মানুষে কোন ভেদাভেদ নেই। ধর্মের মূল লক্ষ্য হল-
ক) অন্যায় কার্য থেকে নিজেকে বিরত রাখা।
খ) মনকে পবিত্র রাখা। এবং
গ) যা কিছু ভাল তা অন্তরে সঞ্চয় করা।

গৌতমবুদ্ধ ছিলেন বাস্তবধর্মী সংস্কারক। মানুষের সংসার জীবনের দুঃখ কষ্ট থেকে মুক্তির লক্ষ্যে তিনি চারটি মহা সত্যের প্রচার ও ব্যাখ্যা করেন। এগুলি হল-
ক) সংসারে দুঃখ নিত্য বর্তমান।
খ) দুঃখের নিশ্চয়ই কারণ আছে;
গ) দুঃখের নিবৃত্তিই মানুষের একান্ত কাম্য। এবং
ঘ) দুঃখ নিবৃত্তির যথার্থ উপায় কি তা জানা আবশ্যক।

বুদ্ধের মতে মানুষের দুঃখ কষ্টের মূল কারণ হল তার অজ্ঞতা এবং কোন কিছুর প্রতি আসক্তি। তনহা বা আকাঙ্খার ফলে দুঃখের সূচনা। সুতরাং আকাঙ্খার নিবৃত্তিতে দুঃখেরও নিবৃত্তি। আর এই আকাঙ্খার কবল হতে মুক্তিলাভ করা যায় ৮টি উপায় অবলম্বনের দ্বারা-যা 'অষ্টাঙ্গিক মার্গ' নামে পরিচিত। এগুলি হল-

বুদ্ধ শান্তি স্তুপা, বৈশালী।
ক) সৎ সংকল্প।
খ) সৎ চিন্তা।
গ) সৎ বাক্য।
ঘ) সদ্ব্যবহার।
ঙ) সৎ জীবন-যাপন।
চ) সৎ প্রচেষ্টা।
ছ) সৎ দর্শণ।
জ) সম্যক সমাধি।

গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর পর তার শিষ্যগণ রাজগৃহ নামক স্থানে এক মহাসভার আয়োজন করে। এই সভা 'বৌদ্ধ সংগীতি' নামে পরিচিত। এই সভায় সকলে বুদ্ধের মূল্যবান উপদেশবাণী গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। সুতরাং এক মহাগ্রন্থ রচিত হল- যা 'ত্রিপিটক' নামে পরিচিত।

অবাক ব্যাপার এই য়ে, বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ এক মহাপুরুষের আগমন বার্তা ঘোষণা করেছে, আর তিনি হচ্ছেন শেষ নবী মুহম্মদ। 

দিঘা-নিকায়া:
মানুষ যখন গৌতম বুদ্ধের ধর্ম ভুলে যাবে, তখন আর একজন বুদ্ধ আসবেন, তার নাম ‘মৈত্তেয়’ অর্থাৎ শান্তি ও করুণার বুদ্ধ।

দ্যা গসপেল অব বুদ্ধা:
আনন্দ বুদ্ধকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার মৃত্যুর পর কে আমাদেরকে উপদেশ দেবে?’
বুদ্ধ বললেন, ‘আমিই একমাত্র বুদ্ধ বা শেষ বুদ্ধ নই। যথাসময়ে আর একজন বুদ্ধ আসবেন। আমার চেয়েও তিনি পবিত্র ও অধিকতর আলোকপ্রাপ্ত। তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্মমত প্রচার করবেন।’ 
আনন্দ জিজ্ঞেস করলেন, ‘তাকে আমরা চিনব কি করে?’ 
বুদ্ধ বললেন, ‘তার নাম হবে মৈত্রেয়।’ 

এই মৈত্রেয়ই মুহম্মদ। কোরআনে তার সম্পর্কে বলা হয়েছে তিনি ‘রহমাতুল্লিল আলামিন, ‘অর্থাৎ সমগ্র বিশ্বের জন্যে মূর্তকরুণা ও আশীর্বাদ।

যা হোক, বুদ্ধের মৃত্যুর পর বিভিন্ন সময়ে তার বাণী নিয়ে মতভেদ দেখা দিলে একাধিকবার বৌদ্ধ সংগীতি আহুত হয়। বৈশালীতে ২য় সংগীতি, সম্রাট অশোকের সময় পাটালীপুত্র নগরীতে ৩য় সংগীতি এবং কাশ্মীরে কৃষাণরাজ কনিস্কের সময় ৪র্থ সংগীতি আহুত হয়েছিল। ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে এই সংগীতিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

যে স্থানে বসে বুদ্ধ বোধিলাভ করেছিলেন।
কনিস্কের রাজত্বকালে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীগণ দু‘ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল যথা-

ক) হীনযানঃ এতকাল বুদ্ধের মূর্ত্তি বা প্রতিকৃতি নির্মাণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। বুদ্ধের নিরাকার উপাসনাকে হীনযান বা সুক্ষ্ম ধর্মপথ নামে অভিহিত হত। এ পথে আত্মার পরমশুদ্ধির মাধ্যমে নির্বাণ লাভের চেষ্টা করা হত।

খ) মহাযানঃ মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর বিদেশীদের সংমিশ্রণে বৌদ্ধধর্মের উপাসনা পদ্ধতির উপর যে বিরূপ প্রভাব পরিলক্ষিত হয় তাই মহাযান। এ পদ্ধতিতে বুদ্ধের প্রতিকৃতি নির্মাণের মাধ্যমে উপাসনা করা হত।

এই হীনযান ও মহাযান সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মীয় মতভেদ দেখা দিলে কনিষ্ক পার্থ নামের জনৈক বৌদ্ধধর্মাবলম্বীর পরামর্শক্রমে কাশ্মীরে এক বৌদ্ধ সংগীতি আহবান করেন এবং এটাই ৪র্থ ও শেষ সংগীতি। এই সংগীতিতে বসুমিত্র সভাপতি এবং অশ্বঘোষ সহসভাপতি নিযুক্ত হয়েছিলেন।

সমাপ্ত।

উৎস: হিস্ট্রি অব দা এন্সিয়েন্ট ওয়ার্ল্ড -ফিওদর করোভকিন। টেন গ্রেট রিলিজিয়ান্স  - ক্লার্ক।
ছবি: Wikipedia, myguru, maps.google, nationalgeographic, onushilon.

Moses: কোরাণিক ক্যানভাসে নবী মূসা।

Abu Hena Mostafa Kamal  01 May, 2017 মি সরের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ফেরাউন। হঠাৎ করে তিনি মৃত্যুবরণ করলেন। কিন্তু তিনি কোন উত্তরাধিকারী ন...