pytheya.blogspot.com Webutation

৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫

Nimrod: এক স্বেচ্ছাচারী নরপতির কাহিনী।

বাইবেলের তথ্য অনুসারে নমরুদ ছিলেন কুশের পুত্র, হামের পৌত্র এবং নূহের প্রপৌত্র। শিকারী হিসেবে তিনি ছিলেন প্রবাদ পুরুষ তুল্য। শিনার ভূ-খন্ডের বাবিল (Babel), উরুক (Erech), আক্কাড (Accad) ও চালনা (Calneh) নিয়ে তার সাম্রাজ্য গঠিত ছিল।-(Gen. 10: 8-10; I Chron. i. 10; Micah 5:5 [A. V. 6]).

নমরুদ
তবে সত্যিকার অর্থে এই নমরুদ কে ছিলেন তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। প্রকৃতপক্ষে, তার ব্যাক্তি পরিচয় নিয়ে দু'টি সুপ্রতিষ্ঠিত মতামত রয়েছে। প্রথমটির অবতারণা করেছেন জি. স্মিথ ও জেরেমিয়া প্রমুখ। তাদের মতে নমরুদ ব্যাবিলনীয় বীর Izdubar বা Gishdubar (Gilgamesh) ব্যাতিত অপর কেউ নন। তাদের এই বক্তব্যের ভিত্তি হল এই যে, Izdubar-কে ব্যাবিলনীয় মহাকাব্যে উপস্থাপন করা হয়েছে একজন অতি সুদক্ষ শিকারী রূপে, যার সঙ্গে থাকত সবসময় চারটি কুকুর। আর তিনি এশিয়াতে প্রথম একটি বড় সাম্রাজ্যও প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাছাড়া "Izdubar" এই নামটির এখন পর্যন্ত কোন সঠিক উচ্চারণ নির্ণিত হয়নি। জেরেমিয়ার মতে এটি "Namra Udu" (Shining Light) হওয়ারই সম্ভাবনা ব্যাপক, আর তাতে নমরুদের সনাক্ততাও সুসম্পন্ন হয়।


২য় মতটির প্রতিষ্ঠাতা হলেন Sayce, Pinches, ও অন্যান্যরা। তারা ব্যাবিলনীয় মারকারী Marduk-কে নমরুদ হিসেবে সনাক্ত করেন। তাদের মতে Izdubar অবশ্যই পঠিত হবে 
Gilgamesh যাতে নামের মাহাত্ম্য সাধারণভাবে নিহীত। আর যে বৈশিষ্ট্য Marduk নামটিকে প্রতিষ্ঠিত করছে তা হল, তিনিও একজন সুদক্ষ শিকারী। তাছাড়া, এই নামটির ফোনোটিক্যালি উচ্চারণ Amar Ud, যা হয়ত: Namr Ud হিসেবেও উচ্চারিত হয়ে থাকতে পারে। অন্যদিকে বাইবেলীয় নমরুদকে কুশের পুত্র অর্থে না ধরে, কুশের বংশীয় ধরলে, Ea এর পুত্র Marduk ও বাইবেলীয় নমরুদ একাত্ম হয়ে যায়।

শিকারী নমরুদ-১
রাব্বানিক সাহিত্য অনুসারে নমরুদ খোদাদ্রোহীদের জনক। তার নাম এভাবেই উচ্চারিত হয়- যিনি মানুষকে খোদাদ্রোহীতে পরিণত করেছিলেন।” -(Pes. 94b; comp. Targ. of pseudo-Jonathan and Targ. Yer. to Gen. 10:9). তিনি কেবল প্রথম শিকারীই নন, বরং তিনি প্রথম মাংস ভোজীও বটে। আর তিনিই প্রথম যুদ্ধের সূচনা করেছিলেন মানব জাতির মধ্যে।-(Midr. Agadah to Gen. 10:9).

শিকারে নমরুদের মহাসাফল্যের-(comp. Gen.10:9) কারণ ছিল চামড়ার তৈরী অাদমের সেই কোট। শয়তানের প্ররোচনায় গন্ধম ফল ভক্ষণের ফলে আদম-হাওয়া যখন উলঙ্গ হয়ে পড়েন, তখন খোদা তাদের জন্যে এই কোট তৈরী করে দিয়েছিলেন।-(Gen.3:21) এই কোট বংশ পরস্পরায় নূহ এবং নূহ থেকে হাম-কুশ হয়ে নমরুদের হাতে পৌঁছে। নানা রঙে রঙিন এই কোটে কিছু চিহ্ন খোঁদিত ছিল। যখনই কোন পশু খোঁদিত ঐ চিহ্ন দেখতে পেত, তখনই সে গুড়ি মেরে নত হয়ে যেত। ফলে ঐ সব পশু শিকারে নমরুদকে কোন বেগ পেতে হত না। লোকেরা তার এই ক্ষমতাকে আলৌকিক বলে ভাবত। এ কারণে তারা তাকে তাদের নরপতি বানিয়ে নেয়। -(Pirḳe R. El. xxiv.; 
Sefer ha-Yashar, l.c.; comp. Gen. R. lxv. 12).

শিকাররত নমরুদ-২
অন্য কাহিনী মতে, নমরুদের বয়স যখন ১৮ বৎসর তখন তার গোত্র হেমিটিকদের সাথে জাফেটিকদের বিরোধ বাঁধে। অত:পর যুদ্ধের শুরু হলে প্রথমদিকে জাফেটিকদের বিজয়ের লক্ষণ দেখা দেয়, কিন্তু নমরুদ কুশাইটদের ক্ষুদ্র এক বাহিনী নিয়ে অতর্কিতভাবে আক্রমণ করে তাদের উভয়কে পরাজিত করেন। এই বিজয় তাকে খ্যাতির সমুচ্চ শিখরে উন্নীত করে এবং তিনি সকল মানুষের নৃপতি বনে যান।


প্রথমদিকে নমরুদ খোদার প্রতি একনিষ্ঠ ছিলেন। শিকারে পাওয়া পশুগলো তিনি খোদার তরে উৎসর্গ করতেন। কিন্তু খ্যাতির শিখরে পৌঁছে তার মনোভাবে পরিবর্তন আসে। তিনি ঘোর পৌত্তলিক বনে যান এবং দেবমূর্ত্তি নির্মাতা আজর (তেরাহ)-কে তার মন্ত্রী নিয়োগ করেন। অাজর এ সময় চ্যালডীয়র কুটা বা উরে বসবাস করতেন।-(B. B. 91a)


নমরুদের সাম্রাজ্য
অন্যদিকে, আরবগণ নমরুদকে চরম স্বেচ্ছাচারী (Tyrant- “al-Jabbar”) হিসেবে বিবেচনা করে। আরবীয় ঐতিহাসিকগণ নমরুদের বাইবেলীয় বংশ বৃত্তান্তের সাথে একমত নন। একটি সূত্রমতে তিনি ছিলেন মাশের পুত্র এবং অরামের পৌত্র; অর্থাৎ একজন সেমেটিক। তিনি ফোরাত নদীর উপর সেতু এবং টাওয়ার অব বাবেল নির্মাণ করেছিলেন। আর তার গোত্র নাবাতিয়ানদের উপর তিনি রাজত্ব করেন পাঁচশত বৎসর। কিন্তু সাধারণ মত এই যে, তিনি ছিলেন কনান পুত্র এবং কুশের পৌত্র অথবা কুশের পুত্র এবং কনানের পৌত্র (দু’টি মতামতই তাবারী দিয়েছেন তার History of the Prophets and Kings পুস্তকে)। তার জন্ম Reu (great-great-grandfather of Abraham) এর রাজত্বকালে ও তিনিই প্রথম অগ্নি উপাসনা প্রচলন করেন এবং তিনিই প্রথম নরপতি যিনি মুকুট পরিধান করেন।-(Kitab al-Magall).


অন্য উপাখ্যান মতে দু’জন নমরুদ ‍ছিলেন- প্রথম জন কুশের পুত্র এবং ২য় জন সুপরিচিত স্বেচ্ছাচারী ও ইব্রাহিমের সমসমিয়িক। যিনি ছিলেন কনান পুত্র এবং ১ম নমরুদের পৌপোত্র। মাসুদীর মতানুসারে (
“Muruj al-Dhahab,” ii. 96) নমরুদ ছিলেন প্রথম ব্যাবিলনীয় নৃপতি এবং তার রাজত্বের ষাট বৎসরে তিনি ইরাকে বহু খাল খনন করেন।

ইব্রাহিমের সময় চ্যালডি
Ta'rikh Muntaḥab এর রচয়িতা নূহের প্লাবণের পর প্রথম পার্স্যিয়ান নৃপতি Daḥḥak (Persian Zoḥak)-কে নমরুদ হিসেবে সনাক্ত করেন। কিন্তু আল-খারিজমি তার Mafatiḥ al-'Ulum-এ ২য় পারস্য রাজবংশের ২য় সম্রাট, Kai Kaos-কেই নমরুদ হিসেবে সনাক্ত করেছেন। বর্তমান ইরাকের বাগদাদই তার রাজধানী ছিল। প্রথম দিকে তিনি ন্যায় পরায়নতার সাথে রাজ্য শাসন করলেও পরবর্তীতে তিনি শয়তানের প্ররোচনায় একেশ্বরবাদীদের হত্যা করতে শুরু করেন। ইব্রাহিমের পিতা আজর (তেরাহ) তার প্রধান মন্দ্রী ছিলেন। যাহোক, আমরা এবার মূল কাহিনীতে ফিরি।

শিকাররত নমরুদ-৩
ইব্রাহিমের জন্মগ্রহণ উপলক্ষে তেরাহ বাড়ীতে তার কিছু বন্ধু-বান্ধব নিমন্ত্রণ করেন। নিমন্ত্রিত ঐ অতিথিদের মধ্যে ‍ছিলেন নমরুদের বেশকিছু উপদেষ্টা ও গণক। মধ্যরাতে ঐ সব অতিথি যখন ভোজন-পান শেষে গৃহত্যাগ করেন, তখন তারা উর্দ্ধদিকে তাকিয়ে দেখতে পান, পূর্বদিক থেকে একটা নক্ষত্র ছুটে এসে আকাশের চারদিকের চারটি বড় নক্ষত্রকে একে একে গিলে ফেলল। তারা অবিলম্বে নমরুদকে জানান, “Of a certainty a lad has been born who is destined to conquer this world and the next.”
নমরুদ বলেন, “এ শিশু কোথায় জন্মগ্রহণ করেছে?” 
তারা বলেন “তেরাহর গৃহে।” 
নমরুদ গর্জে উঠলেন, “My own trusted servant?”

উপদেষ্টাগণের পরামর্শ মত নমরুদ তেরাহকে ডেকে এনে বিপুল অঙ্কের সম্পদের বিনিময়ে শিশুটিকে তার হাতে সোপর্দের অনুরোধ জানান। সব শুনে তেরাহ এক গল্পের অবতারণা করেন। তিনি বলেন- 
এক ব্যক্তি এক গাধাকে প্রস্তাব দিয়েছিল, “আমি তোমাকে গোলাভর্ত্তি যব দেব, যদি তুমি আমাকে তোমার মাথাটি কেটে ফেলার অনুমতি দাও।”

শিকাররত নমরুদ-৪
ঐ গাধা উত্তরে পাল্টা প্রশ্ন করেছিল, “ঐ গোলাভর্ত্তি যব আমার কি কাজে লাগবে যদি তুমি আমার মাথা কেটেই ফেল?” -এভাবে প্রকারন্তে তেরাহ নমরুদকে বোঝাতে চাইলেন যে, ঘর ভর্ত্তি সম্পদ কি কাজে আসবে যদি তা ভোগ করার জন্যে উত্তরাধিকারীই না থাকে।

গল্প শুনে নমরুদের মুখ রাগে লাল হয়ে যায়। এ দেখে তেরাহ তাড়াতাড়ি বলেন, “আমি এবং আমার সব সন্তানই তো আপনার অধীন। সুতরাং কোন বিনিময়ের আবশ্যকতা নেই। তবে আমাকে তিনদিন সময় প্রদান করা হোক, যাতে করে আমি আমার পরিবারকে এ বিষয়ে সম্মত করাতে পারি।”


নমরুদ তার দাবী মেনে নেন এবং বলেন, “যথাসময়ে যদি তুমি তোমার সন্তান হস্তান্তরে ব্যর্থ হও, তবে মনেরেখ তোমার গৃহে এমনকি একটি কুকুরও জীবিত থাকবে না।”


গৃহে ফিরে তেরাহ এক দাসীসহ ইব্রাহিম ও তার মাতাকে এক গুহায় লুকিয়ে ফেলেন এবং সদ্য জন্ম নেয়া অপর এক দাসীর সন্তানকে নমরুদের হাতে তুলে দেন। নমরুদ ঐ শিশুকে তৎক্ষণাৎ হত্যা করে ফেলেন।-(Sefer ha-Yashar-8:1-36)


ইব্রাহিম দশ বৎসর লোক চক্ষুর অন্তরালে গুহায় বসবাস করে। অত:পর নমরুদ যখন তার বিষয়ে সম্পূর্ণ বিম্মৃত হন তখন পিতা আজর তকে বাড়ীতে নিয়ে আসেন। 


আজর দেবমূর্ত্তি তৈরী করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তাই ইব্রাহিম দেবতাদের বিষয়ে প্রথম থেকেই ভীষণ কৌতুহলী ছিল। একদিন সে তার পিতাকে জিজ্ঞেস করল, “বাবা, মানুষ কি তৈরী করে?”

পিতা বললেন, “মানুষ। যেমন, আমি তোমাকে তৈরী করেছি আর আমার বাবা তৈরী করেছিলেন আমাকে।”
ইব্রাহিম বলল, “বাবা, এ এমন নয়; কেননা আমি এক বৃদ্ধকে কাঁদতে কাঁদতে বলতে শুনেছি- “হে খোদা, কেন তুমি আমাকে সন্তান দিচ্ছ না?”

উত্তরে পিতা বললেন, “তা সত্যি, আসলে দেবতা মানুষকে মানুষ তৈরী করতে সাহায্য করে, কিন্তু তিনি নিজে ঐ কাজে হাত লাগান না। মানুষ কেবল তার কাছে প্রার্থনা করবে তাকে সন্তান, মেষশাবক এবং ভেড়া দেবার জন্যে আর দেবতা তাকে সেগুলো দিতে সাহায্য করবেন।”

ইব্রাহিম, “বাবা, কতগুলো দেবতা আছেন?”
পিতা, “সংখ্যায় অগণ্য।”

ইব্রাহিম, “আচ্ছা বাবা, আমি যদি এক দেবতার সেবা করি, আর তাতে যদি অন্য দেবতা রেগে যায় যেহেতু আমি তার সেবা করছিনে, তখন আমি কি করব? যে কোন কারণে যদি দেবতাদের মধ্যে বিরোধ বাঁধে এবং তাদের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধে বা ধর, যে দেবতা আমার প্রতি রূষ্ট সে যদি আমার নিজের দেবতাকে হত্যা করে, তাহলে আমি কি করব? এটা অবশ্য ঠিক যে ঐ দেবতা আমাকেও হত্যা করবে।”


একথা শুনে তার পিতা হেসে ফেললেন, বললেন, “বাবা, ভয়ের কোন কারণ নেই, কেননা কোন দেবতা অন্য দেবতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে না; কখনও না, দেখ, বড় মন্দিরগুলোতে হাজার খানেক দেবতা রয়েছেন, আর তাদের সাথে রয়েছেন সবচেয়ে বড় দেবতা বা’ল; আর আমার বয়স এখন প্রায় সত্তুর এবং আমি আজ পর্যন্ত এক দেবতাকে অন্য দেবতার উপর আক্রমণে লিপ্ত হতে দেখিনি। আর সত্যি বলতে কি, সব মানুষ এক দেবতাকে সেবা করে না, কেউ করে একজনকে, কেউ অন্যজনকে।”


ইব্রাহিম বলল, “তাহলে বলা যায়, তাদের নিজেদের মধ্যে শান্তি রয়েছে।”

পিতা বললেন, “তা আছে।”
তখন ইব্রাহিম বলল, “আচ্ছা বাবা, দেবতারা দেখতে কেমন হয়?”
পিতা বললেন, “ওরে বোকা, প্রতিদিন আমি দেবতা তৈরী করছি, যা আমি অন্যের নিকট বিক্রি করে চাল-আটা কিনছি, আর তুমি জান না দেবতারা দেখতে কেমন!”

আর ঐ সময় তিনি একটা মূর্ত্তি তৈরী করছিলেন। “এটা” -তিনি বললেন “তাল কাঠের, ওটা জলপাইয়ের, ঐ ছোটটা আইভরির; দেখ কত সুন্দর এটা! দেখে কি মনে হচ্ছে না, এটা জীবন্ত? সত্যি বলতে কি, এর কেবল শ্বাসটাই নেই ।”


ইব্রাহিম বলল, “বল কি বাবা! দেবতাদের শ্বাস নেই? তাহলে তারা শ্বাস দেবে কিভাবে? আর তাদের যেহেতু জীবন নেই, তাই তারা কখনও জীবন দিতে পারে না। এটা অবশ্যই বাবা, এগুলো দেবতা নয়।”

বৃদ্ধ পিতা রেগে গেলেন, বললেন, “তুমি যদি বালেগ হতে, আমি এই কুঠার দিয়ে তোমার মাথা ভেঙ্গে দিতাম: কিন্তু মনে শান্তি রাখ, কারণ তোমার বোঝার বয়স হয়নি।”

ইব্রাহিম বলল, “বাবা, দেবতারা যদি মানুষ সৃষ্টিতে সাহায্য করতে পারে, তাহলে এটা কেমন যে মানুষ দেবতাদের তৈরী করবে? আর যদি দেবতারা কাঠের তৈরী হয়, তাহলে তো কাঠ পোড়ান মহাপাপ। এখন আমাকে বল বাবা, এটা কেমন হয় যে, যখন তুমি এতগুলো দেবতা তৈরী করেছো, তখন দেবতারা কেন তোমাকে অনেকগুলো ছেলেমেয়ে তৈরী করতে সাহায্য করছে না যাতে তুমি পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশী শক্তিশালী হও?”


তার পিতা তার কথা শুনে তার পাশে এসে বসলেন; ইব্রাহিম বলে চলল, “আচ্ছা বাবা, এমন কি কোন সময় ছিল, যখন পৃথিবীতে কোন মানুষ ছিল না?”

“হ্যাঁ,” বৃদ্ধ বললেন  “কিন্তু কেন?”
“কারন,” ইব্রাহিম বলল- “আমি জানতে চাচ্ছি কে প্রথম দেবতাটা তৈরী করেছিলেন।”

“এবার আমার বাড়ী থেকে দূর হও!” বৃদ্ধ বললেন, “আর আমাকে এই দেবতাকে তৈরীর কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করতে দাও, এখন আমার সাথে একটা কথাও বলবে না; কেননা তুমি ক্ষুধার্থ হলে তোমার রুটি দরকার হবে, কথা দিয়ে পেট ভরবে না।”

ইব্রাহিম বলল, “একটা সুন্দর দেবতা সত্যি বলতে কি, তুমি তাকে ইচ্ছেমত কাটছ, কিন্তু সে নিজেকে রক্ষা করতে পারছে না!”

বৃদ্ধ রেগে গেলেন এবং বললেন, “সারা দুনিয়ার লোক বলছে এটা একটা দেবতা, আর তুমি পাগল বলছ, এটা তা নয়। দেবতা সাক্ষী, তোমার উপযুক্ত বয়স হলে আমি হয়ত: তোমাকে হত্যা করতাম।”- একথা বলে তিনি ইব্রাহিমকে একটা লাথি লাগালেন এবং তাড়িয়ে বাড়ীর বাইরে বের করে দিলেন। -(বার্ণাবাসের গসপেল, অধ্যায়-২৬)


ইহুদি রাব্বানিক সাহিত্যে রয়েছে- 
তেরাহ ছিলেন একজন ভাস্কর-দেবমূর্ত্তি নির্মাতা। কোন একদিন দূরে কোথাও যাবার প্রাক্কালে তিনি ইব্রাহিমকে মূর্ত্তি বিক্রয়ের কাজে রেখে গেলেন। তারপর এক ক্রেতা এলে ইব্রাহিম তার বয়স জানতে চাইল। ঐ ক্রেতা বলল যে তার বয়স পঞ্চাশ-ষাট তো হবেই। এ কথা শুনে ইব্রাহিম তাকে বলল, “Woe to the man of sixty who would worship the work of a day!” এতে ঐ ক্রেতা লজ্জিত হয়ে ফিরে গেল।-Vide Geiger, i., p. 124.

পিতার সাথে ইব্রাহিম অনেকবার দেব-মন্দিরে গিয়েছে। মন্দিরে হরেকরকম দেবতা ছিল। আকৃতি এবং প্রকতিতে একেকটি একেক রকম। লোকেরা মন্দিরে প্রবেশ করে দেবতার সামনে প্রাণিপাত করত। সে অবাক হয়ে ভাবত মানুষ নিজের হাতে মূর্ত্তি তৈরী করে সেই মূর্ত্তিকে দেবতা জ্ঞানে পূজা করে কিভাবে! দেবতাদের বিষয়ে তার মনে সবসময় ছিল সন্দেহ আর অবিশ্বাস। সে গভীরভাবে ভাবতে শুরু করল প্রকৃতি এবং তার স্রষ্টাকে নিয়ে। 

কোরআনে রয়েছে- নিশ্চয়ই ইব্রাহিম ছিল এক সম্প্রদায়ের প্রতীক। সে ছিল আল্লাহর অনুগত, একনিষ্ঠ আর সে অংশীবাদীদের অন্তর্ভূক্ত ছিল না।-(১৬:-১২৩) 
আমি তাকে পৃথিবীতে কল্যাণ দিয়েছিলাম ও পরকালেও সে তো সৎকর্মপরায়ণদের অন্যতম হবে।-(১৬:-১২২)

আমি তো এরপূর্বে ইব্রাহিমকে ভাল-মন্দ বিচারের জ্ঞান দিয়েছিলাম ও আমি তার সম্বন্ধে ভাল করেই জানতাম।-(২১:৫১-৭০) এভাবে ইব্রাহিমকে আকাশ ও পৃথিবীর পরিচালনা ব্যবস্থা দেখাই যেন সে দৃঢ়বিশ্বাসীদের একজন হয়। তারপর রাতের অন্ধকার যখন তাকে ছেয়ে ফেলল তখন নক্ষত্র দেখে বলল, ও-ই আমাদের প্রতিপালক! তারপর যখন তা অস্তমিত হল তখন সে বলল, যা অস্তমিত হয় তা আমি ভালবাসিনে।

তারপর যখন সে চাঁদকে উঠতে দেখল সে বলল, এ আমার প্রতিপালক! যখন তা অস্তমিত হল তখন সে বলল, আমাকে আমার প্রতিপালক সৎপথ না দেখালে আমি তো পথভ্রষ্টদের শামিল হব। তারপর যখন সে সূর্য্যকে উঠতে দেখল তখন বলল, এ-ই আমার প্রতিপালক! এ সবচেয়ে বড়। যখন তাও অস্তমিত হল তখন সে (মনে মনে তার বিভ্রান্ত) সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে বলল, হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা যাকে আল্লাহর শরিক কর, তার সাথে আমার সম্পর্ক নেই। নিশ্চয়ই আমি একনিষ্ঠভাবে তাঁর দিকে মুখ ফেরাচ্ছি যিনি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, আর আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভূক্ত নই।-(৬:৭৫-৭৯)

ইব্রাহিম তার পিতা আজরকে বলেছিল, তুমি কি মূর্ত্তিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ কর? আমি তো তোমাকে ও তোমার সম্প্রদায়কে স্পষ্ট ভুল করতে দেখছি।-(৬:৭৪) 
সে তার পিতা ও তার সম্প্রদায়কে বলল, এ যে মূর্ত্তিগুলো যাদের পূজায় তোমরা রত রয়েছ, এগুলো কি?-(২১:৫৩) তোমরা কিসের উপাসনা কর?-(২৬:৭০) 

ওরা বলল, আমরা প্রতিমার পূজা করি, সারাদিন এদেরকেই নিষ্ঠার সাথে আঁকড়ে থাকি।- (২৬:৭১) 
সে বলল, তোমরা যখন আহবান কর, তখন তারা শোনে কি? অথবা তারা কি তোমাদের উপকার কিম্বা ক্ষতি করতে পারে?
তারা বলল, না, তবে আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে এদের পূজা করতে দেখেছি।

সে বলল, তোমরা কি যার পূজা করছ তার সম্বন্ধে ভেবে দেখেছ? তোমরা আর তোমাদের পূর্বের পিতৃপুরুষগণ যার পূজা করত?-(২৬:৭২-৭৬) তোমরা নিজেরা তো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছ; তোমাদের পিতৃপুরুষগণও ছিল (বিভ্রান্তিতে)।-(২১:৭০) 
ওরা বলল, তুমি কি আমাদের কাছে সত্য এনেছ, না তুমি ঠাট্টা করছ?
সে বলল, না, তোমাদের প্রতিপালক আকাশ ও পৃথিবীর প্রতিপালক, তিনি তো ওদের সৃষ্টি করেছেন আর এ বিষয়ে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি।

লোকেরা তাকে ও তার সাক্ষ্যকে অগ্রহ্য করল। তখন সে মনে মনে বলল, “আল্লাহর শপথ! তোমরা চলে গেলে আমি তোমাদের মূর্ত্তিগুলোর ব্যাপারে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।-(২৬:৭৫) সে বাড়ি থেকে একটি কুঠার নিয়ে এল এবং সুযোগের অপেক্ষায় রইল।

এসময় এক মহিলা এক বাটি পায়েস নিয়ে সেখানে এল এবং ইব্রাহিমকে বলল, Set it before them;” তখন সে মন্দিরের ভিতরে গিয়ে দেবতাদের মুখের সামনে খাবার রাখল। তারা যখন সেই আহার্য গ্রহণ করল না, তখন সে বলল, তোমরা খাচ্ছ না কেন? তোমাদের কি হয়েছে যে তোমরা কথা বলছ না?” 

ইব্রাহিম তার হাতে কুঠার তুলে নিল, আর তা দিয়ে ওদের প্রধান দেবতার মূর্ত্তি ছাড়া অন্যান্য সব মূর্ত্তিকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিল। তারপর কুঠারটি প্রধান দেবতার গলায় ঝুলিয়ে দিয়ে সেখান থেকে চলে এল। লোকেরা যখন এই অবস্থা দেখল তখন তারা মর্মাহত হল এবং একে অন্যেকে বলল, আমাদের দেবতাদের সাথে এরূপ ব্যাবহার কে করল? নিশ্চয়ই সে সীমালংঘনকারী।

কেউ কেউ বলল, এক যুবককে ওদের সমালোচনা করতে শুনেছি; সবাই তাকে ইব্রাহিম বলে ডাকে। 
ওরা বলল, তাকে লোকজনের সামনে উপস্থিত কর, যেন ওরা সাক্ষ্য দিতে পারে।
ইব্রাহিমকে ডেকে আনা হল। তারপর ওরা তাকে জিজ্ঞেস করল, হে ইব্রাহিম! তুমিই কি আমাদের দেবতাদের এমন অবস্থা করেছ? 

ইব্রাহিমের দৃষ্টি নিবদ্ধ হল প্রধান দেবতার গলায় ঝুলান কুঠারের প্রতি। তারপর উপস্থিত লোকদেরকে বলল, আমার তো মনে হয় এদের এই প্রধানই একাজ করেছে। দেখছ না তার কাছেই রয়েছে কুঠার। আর সম্ভবত: তার এবাদতে এতগুলো অংশীদার দেখে রাগান্বিত হয়েই তা করেছে। এখন ওকেই জিজ্ঞেস করে দেখ না প্রকৃত ঘটনা কি!
ওরা মনেমনে চিন্তা করে দেখল ও একে অপরকে বলতে লাগল, (আমরাই তো সীমালংঘনকারী)! তারপর ওদের মাথা হেঁট হয়ে গেল ও ওরা বলল, তুমি তো ভাল করেই জান যে এরা কথা বলে না। 

ইব্রাহিম বলল, তবে কি তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুর উপাসনা কর যা তোমাদের কোন উপকার করতে পারে না; ক্ষতিও করতে পারে না? ধিক, তোমাদেরকে আর আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের উপাসনা কর তাদেরকে! এরপরও কি তোমাদের জ্ঞান হবে না?-(৩৭:৮৮-৯২)

আর এ সম্পর্কে ইহুদি রাব্বানিক সাহিত্যে আছে এমন- “যখন তার পিতা ফিরে এল, তিনি জানতে চাইলেন, 
Who has done this?
ইব্রাহিম বললকেন মিথ্যে বলব? এক মহিলা এসেছিল একবাটি পায়েস নিয়ে আর সে আমাকে তা তাদের সামনে রাখতে বলে। When I did so, every one of them would have eaten first; then arose the tallest, and demolished them with the staff.”

তেরাহ বললেন, “আমার কাছে কিচ্ছা ফাঁদছো! তাদের কি কোন বোধশক্তি আছে?”
ইব্রাহিম উত্তরে বলল, “কি বলছ বাবা! তুমি মুখে যা বল, তোমার কান কি তা শুনতে পায় না? তবে তাদের ক্ষেত্রে তা হবে না কেন? আর যদি তারা সত্যিই বোধশক্তিহীন হয়, তবে তারা অবশ্যই দেবতা নয়।” -Vide Geiger, i., p. 124.

তারপর তেরাহ যখন কুঠারটি দেখে চিনতে পারলেন, তখন তিনি চিৎকার করে বললেন, “আমি আর কি বলব! এ যে আমার নিজের ছেলেই, কারণ কুঠারটা তো আমার।”

এসময় ইব্রাহিমের সম্প্রদায় তার সঙ্গে তর্ক করতে শুরু করল। সে বলল, তোমরা কি আল্লাহ সম্বন্ধে আমার সঙ্গে তর্কে নামবে? তিনি তো আমাকে সৎপথে পরিচালিত করেছেন। আমার প্রতিপালক অন্য ইচ্ছে না করলে তোমরা যাকে তাঁর শরিক কর তাকে আমি ভয় করিনে। সবকিছুই আমার প্রতিপালকের জানা, তবুও কি তোমরা বুঝবে না? তোমরা যাকে আল্লাহর শরিক কর আমি তাকে কেমন করে ভয় করব? যার বিষয়ে তিনি কোন সনদ দেননি তাকে তোমরা আল্লাহর শরিক করতে ভয় কর না? সুতরাং যদি তোমরা জান তবে বল দু’দলের মধ্যে নিরাপত্তা কোন দলের প্রাপ্য-যারা বিশ্বাস করেছে ও তাদের বিশ্বাসকে সীমালংঘন করে কলুষিত করেনি, নিরাপত্তা তাদেরই জন্যে এবং তারাই সৎপথ প্রাপ্ত।”-(৬:৮০-৮২)

লোকেরা ইব্রাহিমের সঙ্গে যুক্তিতে টিকতে না পেরে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না তার বিরুদ্ধে কি পদক্ষেপ তারা নেবে। এসময় ওদের কেউ কেউ বলল, ওকে পুড়িয়ে ফেল; সাহায্য কর তোমাদের দেবতাদেরকে, যদি একান্তই কিছু করতে চাও।”-(১৯:৪২-৪৮)

বিষয়টি নমরুদের কানে গেল। তিনি আদেশ করলেন, “তাকে অগ্নিতে নিক্ষেপ কর।” তার এই আদেশের কারণে তার আরেক নাম হয়ে গেল অম্রাফল (Amraphelhe said, throw in)-Targ. pseudo-Jonathan to Gen. xiv. 1; Gen. R. xlii. 5; Cant. R. viii. 8. কোরআনে রয়েছে- তারা বলল, এরজন্যে এক অগ্নিকুন্ড তৈরী কর; আর একে জ্বলন্ত আগুনে ফেলে দাও।”- (৩৭:৯৬)

ইব্রাহিম বলল, পার্থিব জীবনে তোমাদের পারস্পরিক বন্ধুত্বের জন্যে তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে প্রতিমা গুলোকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছ, কিন্তু শেষবিচারের দিন তোমরা একে অপরকে অস্বীকার করবে ও অভিশাপ দেবে। তোমরা বাস করবে জাহান্নামে আর তোমাদের কোন সাহায্যকারী থাকবে না।”-(২৯:২৫) 

লোকেরা স্বেচ্ছাশ্রমে লাকড়ি যোগাড় করল এবং সেগুলি এক জায়গায় স্তুপীকৃত করে তৈল ও ঘি ঢেলে তাতে অগ্নিসংযোগ করা হল। সাত দিন আগুনে তা দিয়ে পূর্ণ অগ্নিকুন্ড তৈরী করার পর তারা সমস্যায় পড়ল ঐ অগ্নিকুন্ডে ইব্রাহিমকে নিক্ষেপ করা নিয়ে। কেননা তীব্র উত্তাপের জন্যে আগুনের ধারে কাছে পৌঁছান কারও পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। এসময় নমরুদের এক উপদেষ্টার পরামর্শে একটা চড়ক গাছ তৈরী করে তাতে ঝুলিয়ে ইব্রাহিমকে অগ্রিকুন্ডে নিক্ষেপ করা হল।

The flame had already consumed his robe, when the angel Gabriel stepped before him and asked, "Hast thou need of me?"
But he replied, "The help of Allah alone is what I need!"
"Pray, then, to him, that He may save thee!" rejoined Gabriel.
"He knows my condition," answered Abraham.
ঐসময় আল্লাহ বলেন, হে অগ্নি, তুমি ইব্রাহিমের জন্যে শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও।-(৩৭:৯৭) 

ইব্রাহিম চল্লিশ দিন ঐ অগ্নিকুন্ডে ছিলেন। এই দীর্ঘসময় ধরে লোকেরা পালাক্রমে ঐ অগ্নিকুন্ড পাহারা দিয়েছিল। অবশ্য ইতিমধ্যে লোকদের পাহারা যথেষ্ট শিথিল হয়েছিল। কেননা তারা ভেবেছিল সে আর বেঁচে নেই। অতঃপর যখন তারা দেখতে পেল সে সুস্থ্য অবস্থায় অগ্নিকুন্ড থেকে বেরিয়ে এসেছে এবং তাদের মাঝে ঘোরাফেরা করছে, তখন তারা দ্রুত নমরুদকে বিষয়টি অবহিত করল। নমরুদ ইব্রাহিমকে দরবারে তলব করলেন।

রাব্বানিক সাহিত্যে (Chapter 38:13) রয়েছে-ইব্রাহিমকে যখন অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করা হয় তখন তার ভ্রাতা হারুণ সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। সে মনে মনে ভাবছিল, যদি ইব্রাহিম জয়ী হয়, তবে আমি তাকে অনুসরণ করব। আর যদি নমরুদ জয়ী হয়, তবে নিশ্চয়ই আমি তার অনুসারী। সুতরাং যখন ইব্রাহিম সুস্থ্য অবস্থায় আগুন থেকে বেরিয়ে আসে তখন লোকেরা হারুণকে বলল, "Whose (follower) are you?" সে বলল, "I am Abraham's!"  তখন তারা তাকেও অগ্নিতে নিক্ষেপ করে এবং তাতে তার মৃত্যু হয়।

এদিকে ইব্রাহিম নমরুদের দরবারে উপস্থিত হন এবং কোন অভিবাদন না জানিয়ে নমরুদকে বলেন, হে নমরুদ! আমি আল্লাহ প্রেরিত রসূল, যিনি এক-যার কোন শরীক নেই, যিনি আরশের অধিপতি। ফেরাউন (Nimrod was not the first king of kings. He became labeled as king of kings by gathering all kings of 42 cities in Egypt to be an assembly house called Pharaoh in the year after Noah's death) নমরুদের উপদেষ্টাগণ এসময় তাকে অভিবাদনের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি বললেন- আমি সিজদা করি একমাত্র আল্লাহকে, যিনি আমার প্রতিপালক এবং প্রতিপালক আপনাদের সকলের।

নমরুদ স্বীকার করলেন ইব্রাহিমের খোদা একজন শক্তিশালী দেবতা কিন্তু তিনি তাঁর কর্তৃত্ব স্বীকারের পক্ষপাতি নন। সুতরাং তিনি এ বিষয়ে ইব্রাহিমের সাথে বাদানুবাদে লিপ্ত হলেন। তিনি বললেন, হে ইব্রাহিম, কে তোমার প্রতিপালক?
ইব্রাহিম বললেন, আমার প্রতিপালক তিনি, যিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান।
তিনি বললেন, আমিও তো জীবন দান করি এবং মৃত্যু ঘটিয়ে থাকি।-(২:২৫৮)

নমরুদ তৎক্ষণাৎ দু’জন বন্দীকে দরবারে হাজির করতে নির্দেশ দিলেন। এই বন্দীদ্বয় মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত ছিল। যখন তাদেরকে দরবারে হাজির করা হল, তখন তিনি তাদের একজনকে মুক্তি দিলেন এবং অপরজনকে হত্যা করতে আদেশ দিলেন। তার এই আদেশ পালনের মধ্য দিয়ে তিনি ইব্রাহিমকে বুঝিয়ে দিতে চাইলেন য়ে, তিনিও জীবন দান ও মৃত্যু ঘটাতে সক্ষম।

এতে ইব্রাহিম বললেন, নিশ্চয় তিনি সূর্য্যকে উদিত করেন পূর্বদিক থেকে, এবার আপনি তাকে পশ্চিম দিক থেকে উদিত করে দেখান। তখন নমরুদ হতভম্ব হয়ে গেল।-(২:২৫৮)

এসময়ে নমরুদ ইব্রাহিমের সাথে অার বিতর্কে না গিয়ে সরাসরি ফয়সালার পথ বেঁছে নিলেন। তিনি বললেন, হে ইব্রাহিম! দুনিয়ার রাজত্ব তো আমার। শীঘ্রই আকাশের রাজত্বও আমি তোমার খোদার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেব।

অতঃপর নমরুদ তার মন্ত্রণা পরিষদকে তার মনের ইচ্ছের কথা জানালেন। তিনি তাদেরকে বলেন যে, তিনি স্বর্গে আরোহণ করে ইব্রাহিমের খোদাকে ধরাশায়ী করতে চান। তারা বলল, “it would be difficult to accomplish such a journey, the heavens being very high. তখন পরিষদবর্গের একজন পরামর্শ দিল সূউচ্চ এক টাওয়ার নির্মাণের, যাতে করে তার চূঁড়া থেকে স্বর্গে লুকিয়ে থাকা ইব্রাহিমের খোদাকে সহজেই ধরাশায়ী করা যায়। নমরুদ প্রস্তাবটি গ্রহণ করলেন এবং এভাবে নূহের বন্যার ২০১ বৎসর পর টাওয়ারের নির্মাণ কাজ শুরু হল।

নমরুদ তার লোকদের বলেছিলেন-"God has no right to choose the upper world for Himself, and to leave the lower world to us; therefore we will build us a tower, with an idol on the top holding a sword, so that it may appear as if it intended to war with God" (Gen. R. xxxviii. 7; Tan., ed. Buber, Noah, xxvii. et seq.).

And they began to build, and in the fourth week they made brick with fire, and the bricks served them for stone, and the clay with which they cemented them together was asphalt which comes out of the sea, and out of the fountains of water in the land of Shinar. And they built it: forty and three years were they building it; its breadth was 203 bricks, and the height [of a brick] was the third of one; its height amounted to 5433 cubits and 2 palms (8,150 ft), and [the extent of one wall was] thirteen stades [and of the other thirty stades]. (Jubilees 10:20-21)

টাওয়ার অব বাবেল
দীর্ঘ্ দিনে (৪৩ বৎসরে) হাজার হাজার শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রমে টাওয়ার অব বাবেল (Tower of Babel) নির্মিত হল। এই টাওয়ার সম্পর্কে বাইবেলে আছে- ....and a tower, whose top may reach unto heaven..... -(Genesis 11:4) খোদা বললেন, I made Nimrod great; but he built a tower in order that he might rebel against Me- (Ḥul. 89b).

যাহোক, নমরূদ অত:পর টাওয়ারের চূঁড়ায় আরোহণ করলেন, কিন্তু তিনি খুবই বিষ্মিত হলেন এটা দেখে যে, the heavens were still as remote from him as when he was on the ground. He was still more mortified on the following day, when the tower collapsed with such a noise that the people fainted with terror, those that recovered losing their speech or power of hearing which was illustrated in the Bible as an allusion to the confusion of tongues.

এই ব্যার্থতার পর পরিষদবর্গের অপর একজন বিকল্প এক পরামর্শ দিল। তার পরামর্শে চারটি বৃহৎ শকুনকে লালন-পালন করা হল। অতঃপর একটি সিন্দুক তৈরী করে শকুন চারটিকে কয়েক দিন অভুক্ত রেখে ঐ সিন্দুকের চার কোনায় বেঁধে দেয়া হল। তারপর সিন্দুকের উপর দিকে শকুনের নাগালের বাইরে কিন্তু দৃষ্টির সীমানায় ঝুলিয়ে দেয়া হল মাংসের টুকরো।

নমরুদ ও তার সেনাপতি প্রস্তুত হয়ে সিন্দুকে আরোহণ করলেন। যাহোক, শকুনেরা মাংসের টুকরো খেতে চাইল, আর তাদেরকে নিয়ে সিন্দুকসহ উর্দ্ধপানে উড়ে চলল। সিন্ধুকের উপর এবং নীচের দিকে দু’টি গবাক্ষ ছিল। আর সেনাপতি মাঝে মাঝে ঐ গবাক্ষ দু’টি পালাক্রমে উন্মুক্ত করে উভয়দিকে দৃষ্টিপাত করে দেখে নিতে লাগল যে, তারা স্বর্গের দিকে অগ্রসর হচ্ছে কি-না। 


উর্দ্ধ আকাশে পৌঁছে অর্থাৎ যেখান থেকে অাকাশ বা পৃথিবীর, কিছুই আর দৃষ্টি গোচর হল না, নমরূদ প্রস্তুতি নিলেন তীর নিক্ষেপের। তারপর তারা একের পর এক তীর উপরের দিকে নিক্ষেপ করলেন। ঐ সময় আল্লাহ জিব্রাইলকে বলেন, "আমার এই বান্দা যেন নিরাশ না হয়।" জিব্রাইল তখন তীরের অগ্রভাগ রক্তরঞ্জিত করে ফেরৎ পাঠাল, যাতে নমরুদের নিকট প্রতীয়মান হয় যে, তিনি ইব্রাহিমের খোদাকে ধরাশায়ী করতে সমর্থ্য হয়েছেন। 

এখানে একথা বলে রাখা ভাল-যখন খোদা জিব্রাইলকে বলেন যে, আমার এই বান্দা যেন নিরাশ না হয়। তখন জিব্রাইল তীরের অগ্রভাগ রক্ত রঞ্জিত করতে পশু, পাখী ও জলজ জীবের কাছে রক্ত চেয়েছিল। কিন্তু কেউই নিজের রক্ত দিতে সম্মত হয়নি "বেলে মাছ ছাড়া। এ কারণেই বেলে মাছের শরীরে কোন রক্ত নেই। অার তাই Book of Chamis জানিয়েছে- Respecting the blood which was seen on Nimrod's arrow, the learned are not agreed as to whence it came: many contend it was the blood of a fish which the clouds had carried with them from the sea, and adduce this circumstance as the reason why fish need not be slaughtered.-(Book of Chamis). 

এদিকে সকল তীর নিক্ষেপ শেষে নমরুদ পৃথিবী পৃষ্ঠে ফিরে আসতে চাইল। সেজন্যে শকুন গুলিকে নিম্নগতি করার লক্ষ্যে সিন্দুকের উপরের দিকে ঝুলিয়ে দেয়া মাংস একই ভাবে নিচের দিকে ঝুলিয়ে দেয়া হল। অবতরণের সময় সিন্দুক প্রচন্ড শব্দে মাটিতে আছড়ে পড়ে গুড়িয়ে যায়। নমরুদ নিজে অবশ্য এই পতনে কোনরূপ আঘাত প্রাপ্ত হননি।

মাটিতে অবতরণের পর নমরুদের রক্ষীরা নিক্ষিপ্ত তীরগুলি কুড়িয়ে আনল। যেগুলো পাওয়া গেল তার সবগুলোই রক্তরঞ্জিত। নমরুদ রক্তমাখা তীরগুলি দেখে সফলতার আনন্দে আত্মহারা হয়ে বললেন, 
নিশ্চয়ই আমরা ইব্রাহিমের খোদাকে হত্যা করে ফেলেছি, তীরে লেগে থাকা রক্তই তার সাক্ষ্য বহন করে।

এ সম্পর্কে ইহুদি রাব্বানিক সাহিত্য জানায়- Nimrod goes on to try storming Heaven, throwing arrows in person, in a chariot driven by birds." আর বুক অব জাসের (Book of Jasher,-Hebrew, Sefer ha-YasharBook of the Righteous One") জানায়- ..they cast the arrows toward the heavens, and all the arrows fell upon them filled with blood, and when they saw them they said to each other, Surely we have slain all those that are in heaven. -(Book of Jasher, 9:29) "..They thought that they killed God. -(Book of Jasher, 9:30)

এক রাতে নমরুদ স্বপ্ন দেখলেন যে, অগ্নিকুন্ড থেকে খোলা তরবারী হাতে এক লোক বেরিয়ে এসে তার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এ দেখে তিনি দৌঁড় লাগালেন। তখন ঐ ব্যক্তি একটা ডিম ছুঁড়ে মারল তার দিকে। ঐ ডিম পরে রূপান্তরিত হয়ে গেল বিশাল এক নদীতে। আর সেই নদীতে তার সকল সৈন্য-সামন্ত ডুবে গেল, কেবল বেঁচে গেলেন তিনি ও তার তিনজন সঙ্গী। তারপর ঐ নদী পুন:রায় ডিমে পরিণত হল এবং পরে তা থেকে বেরিয়ে এল ছোট এক পেঁচা যা নমরুদের দিকে উড়ে এসে ঠুঁকরে তার দু’চোখ তুলে ফেলল।” 

গণকেরা এই স্বপ্নের ব্যাখ্যায় ভবিষ্যৎবাণী করেছিল যে, ইব্রাহিমের হাতে নমরুদের পরাজয় ঘটবে। এতে নমরুদ গোপনে ইব্রাহিমকে হত্যার জন্যে লোক পাঠান। কিন্তু ইতিমধ্যে ইব্রাহিম সঙ্গী-সাথীসহ উর ত্যাগ করেছিলেন।ইব্রাহিমের ঐ যাত্রায় ভ্রাতৃষ্পুত্র লুত্ তার সঙ্গী ছিল। অগ্নিকুন্ড থেকে সুস্থ্য শরীরে ফিরে আসার খোদায়ী কুদরত দেখামাত্র সে তার উপর ঈমান এনেছিল। 

The punishment visited on the builders of the tower did not cause Nimrod to change his conduct; বরং দিনে দিনে তার শক্তি, ক্ষমতা ও দম্ভের প্রকাশ আকাশ ছুঁয়ে গেল। এক পর্যায়ে আল্লাহ ইব্রাহিমকে বলেন, নমরুদকে সতর্ক কর তার উপর শাস্তি আসার আগেই।

সুতরাং ইব্রাহিম রাজদরবারে হাজির হলেন। তাকে দেখে নমরুদ উৎফুল্ল হয়ে বললেন, “হে ইব্রাহিম! দুনিয়া এবং স্বর্গের রাজত্ব এখন আমারই। আমরা তোমার উপাস্যকে হত্যা করেছি।”
ইব্রাহিম বললেন, আমার উপাস্য চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী।"

নমরুদ একথা শুনে আর বিতর্কে না গিয়ে বললেন, ঠিক আছে,তিনি যদি মারা গিয়ে নাই থাকেন, তবে তাঁর সৈন্যদলকে একত্রিত করতে বল। আমিও আমার সৈন্যদল ময়দানে সমবেত করছি।
ইব্রাহিম বললেন, আল্লাহকে ভয় করেন, তিনিই তো আপনাকে রাজ্য ও রাজত্ব দান করেছেন। আর তিনিই পরজগতের প্রতিফল দাতা। but Nimrod declared that he himself was sole ruler and challenged God to fight with him. He also asked for a delay of three days, during which he gathered a considerable army.

নির্দিষ্ট দিনে নমরুদ ষাট লক্ষ সেনা ময়দানে সমবেত করলেন। এদিকে প্রতিপক্ষের কোন দেখা নেই। ইব্রাহিমকে একাকী ময়দানে দেখে তিনি অবাক হয়ে তাকে ডেকে বললেন, তোমার প্রতিপালকের সেনাদল কোথায়? তিনি নিশ্চয় আমার শক্তিবল দেখে ভীত হয়ে পশ্চাৎপসারণ করেছেন।

ইব্রাহিম বললেন, আমার রব ক্ষমতায় মহান, কোনরূপ ভীতি তাকে আচ্ছন্ন করতে পারে না, বরং তিনিই তা প্রদর্শণ করে থাকেন। একথা নিশ্চিত যে তার সেনাদল ময়দানে এসে পৌঁছিবেই-আর তা অতি অল্প সময়ের মধ্যেই।
নমরুদ সেনাপতিদের বললেন, যুদ্ধ পতাকা উড়িয়ে দাও, সতর্ক হও, নাকাড়া বাজাও।

ষাট লক্ষ সেনার শোরগোলে ভূমি প্রকম্পিত হল। ফেরাউন পুনঃরায় ইব্রাহিমকে বললেন, কোথায় তোমার রবের সৈন্যদল?
ইব্রাহিম দূরে আকাশের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করলেন। দূরে কাল রঙের একটা মেঘ দেখা যাচ্ছে। যখন সেটা কাছে, মাথার উপর চলে এল, লক্ষ লক্ষ মশার গুণ গুণ কলতানে চারিদিক মুখরিত হল। 

মশা! ক্ষুদ্র এ প্রাণীটি সন্ত্রাসী, বেপরোয়া। রক্তের নেশায় জীবনের ঝুকি নিয়ে তারা আক্রমণ করে মানুষ, পশুকে। আর এ মশা তো আল্লাহ প্রেরিত, যুদ্ধের নিমিত্ত। কিন্তু নমরুদ এদের ব্যক্তিত্বকে খাটো করে দেখলেন। অবজ্ঞার সূরে বললেন, এ তো মশা! তুচ্ছ এক প্রাণী, তার উপর নিরস্ত্র। তোমার রবের কি অস্ত্র-ভান্ডার বা মালখানা নেই?

এখানে বলে রাখা ভাল- অনেকের মতে এগুলো মশা ছিল না, ছিল মশার আকৃতির, আকারে আরও ক্ষুদ্র প্রাণী, মাংসাশী (carnivorous), Gnat.

ইব্রাহিম বললেন, আমার রবের বাহিনী সম্পর্কে আপনার কোন ধারণাই নেই। আপনার এই সেনাবাহিনীর জন্যে তিনি এই তুচ্ছ, নিরস্ত্র মশাকেই যথেষ্ট মনে করেছেন। আর নিরস্ত্র হলেও এরা তাদের যুদ্ধ কৌশল জানে। এখন আপনি শুধু এই বাহিনীর মোকাবেলা করে আপনার শক্তি, সামর্থ্য ও মেধার পরিচয় দিন।

এদিকে এই মশা বাহিনীর সঙ্গে কিরূপে যুদ্ধ করতে হবে তা ভেবে পাচ্ছিল না নমরুদের সেনারা। এত ক্ষুদ্র প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তাদের পূর্ব কোন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বা ট্রেনিং- কোনটাই নেই। সুতরাং তারা হতভম্ভ হয়ে আদেশের অপেক্ষায় সাঁরিবদ্ধ ভাবে নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইল। 

এই অবসরে প্রতিটি সৈন্যের মাথার উপর একটি করে মশা অবস্থান নিল। অতঃপর কেউ কিছু বুঝে উঠার পূর্বেই তারা তাদের নাসিকা পথে মস্তিস্কে প্রবেশ করল। তারপর দংশন। সেনাবাহিনীর মধ্যে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হল। হিতাহিত জ্ঞান শুণ্য হয়ে তীরন্দাজগণ উর্ধ্বে তীর নিক্ষেপ করতে লাগল। আর পদাতিক সেনারা নিজেদের চতুষ্পার্শ্বে অন্ধের মত তরবারী চালনা শুরু করল। এভাবে একে অপরকে নিজেদের অজান্তেই তারা আহত বা নিহত করে ফেলল।

নমরুদ পালিয়ে প্রাসাদে ফিরে আসছিলেন। এসময় একটি দূর্বল মশা তাকে তাড়া করল। সে কিছুক্ষণ তার শিরোস্ত্রাণের চতুষ্পার্শ্বে কয়েকবার প্রদক্ষিণ শেষে সুড়ুৎ করে তার নাসিকা পথে মস্তিস্কে ঢুকে পড়ল। তারপর ধীরে সুস্থ্যে মগজে দংশন শুরু করল। যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে পড়লেন নমরুদ। উন্মাদের ন্যায় প্রাসাদে প্রবেশ করলেন। এক সময় দিশেহারা হয়ে পাদুকা খুলে নিজের মাথায় আঘাত করতে শুরু করলেন তিনি। এতে মশা দংশনে বিরত রইল। তিনি একটু আরাম বোধ করলেন। কিন্তু আঘাত বন্ধ করতেই মশা পুন:রায় দংশন শুরু করল। অবশেষে নমরুদ তার মাথায় মৃদু আঘাত করার জন্যে একজন সার্বক্ষণিক কর্মচারী নিযুক্ত করলেন। সূদীর্ঘ ৪০ বৎসর তিনি ঐ দু:সহ যন্ত্রণা ভোগ করেছিলেন।

এটা অদ্ভূত ছিল যে, পাদুকা ব্যতিত অন্য কিছুর আঘাতে মশা দংশনে বিরত থাকত না। এসময়ই ইব্রাহিম তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বললেন, হে নমরুদ! স্বীয় মস্তকে, স্বীয় পাদুকা দ্বারা আঘাতের জন্যে, স্বীয় অর্থেই গোলাম নিযুক্ত করে রাখা জঘণ্য। সুতরাং এখনও সময় আছে আল্লাহকে সর্বশক্তিমান ও অদ্বিতীয় বলে স্বীকার করে নিন। তাতে তিনি আপনার পাপসমূহ ক্ষমা করবেন এবং আপনি এই কঠিন বিপদ থেকে মুক্তি পাবেন।

নমরুদ মনে করতেন খোদাকে স্বীকার করে নিলে তার ক্ষমতা ও প্রভাব বিলুপ্ত হবে। তাই তিনি উত্তর দিলেন, হে ইব্রাহিম! আমিই দুনিয়ার অধিশ্বর। অন্য কাউকে আমি স্বীকার করি না।
ইব্রাহিম বুঝতে পারলেন যাকে আল্লাহ পথ প্রদর্শণ করেননি, সে কখনও পথ খুঁজে পাবে না। তিনি হতাশ হয়ে ফিরে এলেন।

এ কারণেই তার সম্পর্কে বলা হয়েছে- Whether or not conceived as having ultimately repented, Nimrod remained in Jewish and Islamic tradition an emblematic evil person, an archetype of an idolater and a tyrannical king. In rabbinical writings up to the present, he is almost invariably referred to as Nimrod the Evil.- (Hebrewנמרוד הרשע)

এদিকে নমরুদের সার্বক্ষণিক দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মচারী অতিষ্ট হয়ে পড়েছিল। এক মুহুর্ত অবসর নেই। সামান্য বিরতিতেই তিরস্কার। একসময় তার মনে এমন বিরক্তি ও ক্রোধের সৃষ্টি হল যে, সে তার হস্তস্থিত পাদুকা দ্বারা সজোরে এক আঘাত হানে। ঐ আঘাতেই নমরুদের মৃত্যু হয়।

নমরুদের এই যুদ্ধ ও পরিণতি সম্পর্কে ইহুদি রাব্বানিক সাহিত্য জানায়- “নমরুদ তখন ইব্রাহিমের খোদাকে যুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করলেন। তারপর যখন তিনি বিশাল এক সেনাবাহিনী নিয়ে ময়দানে উপস্থিত হলেন, তখন খোদা তার বিরুদ্ধে মশার এক বাহিনী পাঠিয়ে দিলেন, যেগুলো নমরুদের বাহিনীকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলে। কথিত আছে- এই প্রাণীর একটি নমরুদের নাসিকা পথে তার মস্তিস্কে ঢুকে পড়ে এবং মগজ চুষে খেতে শুরু করে। ব্যাথা প্রশমনে নমরুদ নেহাই (যে লৌহ খন্ডের উপর রেখে কামার কিছু পেটায়) এর উপর হাতুড়ির আঘাত করতে একজন কর্মচারী নিয়োগ করেন, যাতে করে ঐ শব্দ মশাকে কামড় থেকে বিরত রাখে। 

অন্যদিকে এ সম্পর্কে Book of Chamis জানায়- “বার বর্গমাইল জায়গায় নমরুদের সেনাবাহিনী ছাউনি ফেলল। তখন আল্লাহ জিব্রাইলকে ইব্রাহিমের কাছে একথা জিজ্ঞেস করতে পাঠালেন যে, তাকে উদ্ধারে কোন প্রাণী পাঠাবেন তিনি? ইব্রাহিম বেঁছে নিলেন মশা। অাল্লাহ বললেন, Verily, if he had not chosen the fly, an insect would have come to his aid, seventy of which are lighter than the wing of a fly.

মহান আল্লাহ তখন মাছিদের রাজাকে সমন পাঠালেন এবং তাকে আদেশ করলেন নমরুদের বিরুদ্ধে তার বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হতে। সে তখন দুনিয়ার সকল মশা-মাছি নিয়ে নমরুদের বাহিনীকে এমন হিংস্রভাবে আক্রমণ করল যে, অল্প সময়ের মধ্যে পুরো ময়দানে মানুষের মাথার খুলি, হাঁড়-গোঁড়, তরবারী, বল্লম ও তীরে-ধনুক ব্যতিত অপর কিছু আর পরিদৃষ্ট হল না। কেননা সেগুলো তাদের শরীরের চামড়া, মাংস এমনকি মাথার মগজ পর্যন্ত চুষে খেয়ে ফেলেছিল।

নমরুদ পালিয়ে গিয়ে নিজেকে প্রাসাদের একটা পুরু দেয়াল ঘেরা কক্ষে আঁটকে ফেলেন। কিন্তু তার সাথে সেখানেও একটা মশা পৌঁছে গিয়েছিল। সাত দিন ঐ মশা তার মুখের চারপাশে ঘোরাফেরা করে, তবে নমরুদ কোনভাবেই তাকে ধরতে পারেননি। তারপর সেটি তার নাসিকা পথে প্রবেশ করে। নমরুদ যতই তাকে বাইরে বের করতে চেষ্টা করেন, সেটি ততই গভীরে প্রবেশ করে এবং একসময় মস্তিস্কে পৌঁছায়। তারপর সেটি তার মস্তিস্ক চুষে খেতে শুরু করে।

এসময় ব্যাথা প্রশমনে দেয়ালে মাথা ঠুকা ছাড়া নমরুদের আর কোন উপায় রইল না। পরে তিনি একজন কর্মচারীকে নিয়োগ করেন কাঠের এক হাতুড়ি দিয়ে মাথায় মৃদু আঘাত করার জন্যে। এদিকে মশা অবিরাম খেতে খেতে আকারে বৃদ্ধি পেতে লাগল। আর ৪র্থ দিনে সেটি তার মস্তিস্ক ফুঁড়ে বেরিয়ে এল। ঐ মশা এসময় বৃদ্ধি পেতে পেতে একটা কবুতরের অাকারের হয়ে গিয়েছিল। তারপর সেটি উড়ে যেতে যেতে মরোন্মুখ নমরুদকে, যার তখন্ এমনকি তওবা করারও সমর্থ্য ছিল না, বলল, Thus does Allah, whenever He pleases, permit the feeblest of His creatures to destroy the man who will not believe in Him and in His messenger. -(Book of Chamis.)

সমাপ্ত।

Source: 
 Qur'an;
 Bible;
 Book of Chamis by Husein ibn Muhammed;
 Book of Jasher (Sefer ha-Yashar);
 Gospel of Barnabas;
• History of the Prophets and Kings by Tabari
;
 Cheyne and Black, Encyc. Bibl.;
 Joseph Grivel, in Transactions Soc. Bibl. Arch. iii. 136 et seq.;
Sayce, ib. ii. 243 et seq.;
Jeremias, Izdubar Nimrod, Introduction, Leipsic, 1891;
Pinches, The Old Testament, pp. 127-131;
Rubin, Birusi ha-Kasdi, pp. 71-72, Vienna, 1882.
D'Herbelot, Bibliothèque Orientale;
Hughes, Dictionary of Islam;
Mas'udi, Muruj al-Dhahab, ed. Barbier de Meynard, i. 78, 81-83; ii. 96; iii. 240;
Mirkhond, Raudat al-Safa, English transl. by Rehatsek, part i. vol. i., pp. 126-128, 134-144;
Ṭabari, Chroniques, transl. by Zotenberg, i. 120, 136 et seq., 148-150, Paris, 1867.

৪ ডিসেম্বর, ২০১৪

Josheph Priestly: বিজ্ঞানী যাজকের খৃষ্টের ঈশ্বরত্ব বিরোধিতা।

যোসেফ প্রিষ্টলি (Josheph Priestly) ১৭৩৩ সনে লিডস এর ৬ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে ক্ষুদ্র ফিল্ডহেড গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন স্থানীয় একজন বস্ত্র উৎপাদক। প্রিষ্টলি ছিলেন পিতার জ্যোষ্ঠপুত্র। তার ৬ বছর বয়সের সময় মা মারা যান। কঠোর ক্যালভিনীয় শিক্ষায় বাড়িতে তিনি বেড়ে ওঠেন। কিন্তু স্কুলে তিনি সেইসব ভিন্ন ধর্মীয় আদর্শের অনুসারী শিক্ষকদের কাছে শিক্ষা লাভ করেন যারা চার্চ অব ইংল্যাণ্ডের মতবাদের সাথে ভিন্নমত পোষণ করতেন। একজন যাজক হওয়ার লক্ষ্যে তিনি ল্যাটিন, গ্রীক ও হিব্রু ভাষা ভালভাবে আয়ত্ত করেন।

আদমের পাপ (Adam’s Sins) বিষয়ে প্রিষ্টলি পর্যাপ্ত অনুতাপ প্রদর্শন না করায় তাকে বন্ধু সভার (Elders of the Quakers) সদস্য ভুক্তি করতে অস্বীকৃতি জানান হয়। অর্থোডক্স চার্চের সকল মতবাদের অনুসারী নয়, এমন কাউকে গ্রহণ করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও অস্বীকৃতি জানায়। ফলে তাকে একটি সুপরিচিত একাডেমিতে পাঠানো হয় যেখানে শিক্ষক ও ছাত্ররা অর্থোডক্স চার্চের মতবাদ ও ‘ধর্মবিরোধী মতবাদ’ তথা একত্ববাদে বিশ্বাসের মধ্যে বিভক্ত ছিল। এখানে প্রিষ্টলি খৃষ্টান চার্চের মৌলিক মতবাদ সমূহের বিশেষ করে ত্রিত্ববাদের সত্যতার ব্যাপারে গভীরভাবে সন্দেহ পোষণ করতে শুরু করেন। তিনি যতই বাইবেল পাঠ করলেন ততই তার নিজের মতে আস্থাশীল হয়ে উঠলেন। আরিয়াস, সারভেটাস ও সোজিনির রচনা তার মনের উপর গভীর ছাপ ফেলে। তাদের মত তিনিও সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, ধর্মগ্রন্থগুলো ত্রিত্ববাদ ও প্রায়শ্চিত্ত সম্পর্কে জোরাল প্রমাণ দিতে পারেনি। এর ফল হল এই যে, তিনি যখন শিক্ষা শেষ করে একাডেমি ত্যাগ করলেন, তখন তিনি একজন কট্টর আরিয়াস অনুসারীতে পরিণত হয়েছেন।

যোসেফ প্রিষ্টলি।
প্রিষ্টলি বার্ষিক ৩০ পাউণ্ড বেতনে একজন যাজকের সহকারী নিযুক্ত হন। যখন আবিষ্কৃত হল যে তিনি একজন আরিয়াস অনুসারী তখন তাকে চাকুরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। ১৭৫৮ সনে তিনি চেশায়ারে নান্টউইচে (Nantwich) একজন যাজক হিসেবে নিয়োগ লাভ করতে সক্ষম হন। সেখানে তিনি তিন বছর চাকুরি করেন। তার আয় অতি সামান্য হওয়ায় প্রাইভেট টিউশনির মাধ্যমে তিনি আরও অর্থোপার্জন করতেন। খুব শিগগিরই একজন ভাল শিক্ষক হিসেবে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। আরিয়াসপন্থীরা ১৭৫৭ সনে ওয়ারিংটনে (Warrington) একটি একাডেমী প্রতিষ্ঠা করলে প্রিষ্টলি নান্টউইচ ত্যাগ করেন এবং সেখানে শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত হন। অবসরকালীন সময়ে তিনি প্রায়ই লন্ডন গমন করতেন। এভাবেই এক সফরের সময় লণ্ডনে বিজ্ঞানী বেনজামিন ফ্রাংকলিনের সাথে তার প্রথমবারের মত সাক্ষাৎ ঘটে। ১৭৬৭ সনে তিনি তার পুরোন বাসস্থানের কাছাকাছি লিডস (Lids)-এর মিলহিল (Mill Hill) -এর যাজক হয়ে আসেন। সেখানে তিনি ৬ বছর ছিলেন।

লিডস-এ প্রিষ্টলি বেশকিছু পুস্তিকা প্রকাশ করেন। শিগগিরই একত্ববাদের একজন অসাধারণ ও জ্ঞানী মুখপাত্র হিসেবে তিনি খ্যাতি লাভ করেন। অবসর সময়ে তিনি রসায়নবিদ্যা পাঠ করতে শুরু করেন। এ ক্ষেত্রে তার সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি রয়াল সোসাইটির স্বীকৃতি লাভ করেন। ১৭৭৪ সনে অক্সিজেন আবিষ্কার করার ফলে তিনি অত্যন্ত বিখ্যাত হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে তিনি আরও গবেষণায় নতুন কিছু গ্যাস আবিষ্কার করেন যা তার আগে আর কোন বিজ্ঞানী করতে পারেননি। তবে পদার্থ বিজ্ঞানের চেয়ে ধর্মের ব্যাপারেই তিনি বেশী উৎসাহী ছিলেন। তাই তিনি এসব আবিষ্কারকে একজন ধর্মতত্ত্ববিদের অবসর মুহূর্তের ফসল হিসেবেই বিবেচনা করতেন। আত্মজীবনীতে প্রিষ্টলি তার এসব যুগান্তকারী আবিষ্কার সম্পর্কে বলতে গিয়ে মাত্র একটি পৃষ্ঠা ব্যয় করেছেন। একসময় তিনি লিখেছিলেন: “রসায়নের কয়েকটি শাখায় আমি কিছু আবিষ্কার করেছি। আমি এ ব্যাপারে কখনই স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত মনোযোগ দেইনি এবং সাধারণ প্রক্রিয়াসমূহের ব্যাপারেও আমি সামান্যই জানতাম।

পরবর্তীতে যোসেফ প্রিষ্টলি আর্ল অব শেলবার্ণের (Earl of Shellburne) লাইব্রেরিয়ান ও সাহিত্য সঙ্গী হন। এ কাজের জন্যে তাকে আকর্ষণীয় বেতন এবং তার খুশিমত কাজ করার স্বাধীনতাসহ আজীবন ভাতা বরাদ্দ করা হয়। তিনি এ কাজে ৭ বছর নিয়োজিত ছিলেন। তার গ্রীষ্মের দিনগুলো কাটত আর্লের পল্লী-প্রসাদে এবং শীতকাল কাটত লণ্ডনে। প্যারিস, হল্যাণ্ড, বেলজিয়াম ও জার্মানী সফরের সময় তিনি আর্লের সঙ্গী ছিলেন। আর্ল বেনজামিন ফ্রাংকলিনের সাথে প্রিষ্টলির বন্ধুত্বের কারণে বিব্রত বোধ করতে থাকেন। কারণ এসময় ফ্রান্সে যে বিপ্লব চলছিল ফ্রাংকলিন তার সমর্থক ছিলেন। প্রিষ্টলি আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্রাংকলিনের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করেন এবং এর অত্যল্পকাল পরই বসবাসের জন্যে বার্মিংহাম চলে যান। এই শহরে তার বসবাস ১১ বছর স্থায়ী হয়। যদিও শেষদিকটি ছিল অত্যন্ত মর্মবিদারক, ট্রাজেডিপূর্ণ, তা সত্ত্বেও এটিই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে সুখকর অধ্যায়। যাজক হিসেবে তাকে সপ্তাহে মাত্র একদিন অর্থাৎ রবিবারে দায়িত্ব পালন করতে হত। সে কারণে সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে তিনি প্রাণ ভরে গবেষণাগারে কাজ করতে ও ইচ্ছা মত লিখতে পারতেন।

বার্মিংহামে থাকতে প্রিষ্টলি তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী গ্রন্থ “History of the Corruptions of Christianity” রচনা করেন। এ গ্রন্থটি চার্চকে প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ করে তোলে। এ গ্রন্থে প্রিষ্টলি শুধু ত্রিত্ববাদের বৈধতা প্রত্যাখ্যানই করেননি, উপরন্তু তিনি যীশুর মানবীয়তাকেও সমর্থন করেন। তিনি বলেন, যীশুর জন্ম সম্পর্কে যে সব বর্ণনা ও বিবরণ পাওয়া যায় তা পরস্পর অসংগতিপূর্ণ। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, যীশু ছিলেন একজন মানুষ। আর দশজন মানুষের মত তিনিও অসুস্থ্যতা, অজ্ঞতা, সংস্কার ও দুর্বলতার প্রবণতা সম্পন্ন ছিলেন। বিশ্বে নৈতিক বিধান চালুর জন্যেই ঈশ্বর তাকে নির্বাচিত করেছিলেন। তার কাজ ও দায়িত্ব সম্পর্কে তাকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল এবং তাকে প্রদান করা হয়েছিল অলৌকিক ক্ষমতা। যীশুকে মৃত্যু পরবর্তী পরলৌকিক জীবন সম্পর্কে বিপুল জ্ঞান দান করে মানুষের কাছে প্রেরণ করা হয়েছিল যে জীবনে মানুষকে তার ইহজীবনের সৎকাজের জন্যে পুরস্কৃত করা হবে, নিছক খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার জন্যে নয়। সরকার কিংবা চার্চ কেউই প্রিষ্টলির এই মত পছন্দ করতে পারেনি।

প্রিষ্টলি যীশুর মানবীয়তাকে শুধু সমর্থনই করেননি, যীশুর অলৌকিক জন্মগ্রহণের (Immaculate Conception) বিষয়টিও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। এভাবে তিনি এক নয়া চিন্তার ভিত্তি স্থাপন করেন। এর ফলশ্রুতিতে একত্ববাদীদের অবস্থা হয়ে দাঁড়ায় ঝঞ্ঝা-বিক্ষুদ্ধ সাগরে হাল-বিহীন এক জাহাজের মত। সার্বজনীন একত্ববাদ নামে পরিচিত যে আন্দোলনের সূচনা হয়, তাতে দিক নির্দেশনার একান্তই অভাব ছিল। তাই যীশুর অলৌকিক জন্মগ্রহণের ধারণা প্রত্যাখ্যান সম্পূর্ণ অনাবশ্যক ও তিক্ত এক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে যা একত্ববাদের সমর্থকদের মঙ্গলের চাইতে ক্ষতিসাধন করে বেশী। ফরাসি বিপ্লব ও সন্ত্রাসের রাজত্বের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ইংল্যাণ্ডেও অনুরূপ আরেকটি আন্দোলনের জন্ম ঘটে যা বহু ইংল্যাণ্ডবাসীকে ভীত করে তোলে। গোঁড়া চার্চ এই সুযোগে প্রচারণা চালাতে থাকে যে, প্রিষ্টলির শিক্ষা ইংল্যাণ্ডেও অনুরূপ ট্রাজেডির সৃষ্টি করবে। এর ফলে প্রিষ্টলিকে অপমান করে ও তাকে হুমকি দিয়ে লেখা অসংখ্য চিঠি তার বাড়িতে আসতে শুরু করে। দেশের বিভিন্ন স্থানে তার কুশপুত্তলিকা পোড়ান হয়।

যোসেফ প্রিষ্টলি জন্মস্থান।
১৭৯১ সনের ১৪ জুলাই একদল লোক বার্মিংহামের একটি হোটেলে বাস্তিল পতনের বার্ষিকী উদযাপন করছিল। এ সময় শহরের বিচারকদের নেতৃত্বে এক বিশাল জনতা হোটেলের বাইরে সমবেত হতে শুরু করে। প্রিষ্টলি এ আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন ধারণা করে তারা হোটেলে হামলা চালায় ও জানালার কাচ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে। তবে প্রিষ্টলি সেখানে ছিলেন না। জনতা তারপর প্রিষ্টলির বাড়িতে হামলা চালায়। প্রিষ্টলির ভাষায় “তারা নিষ্ঠুরভাবে লুন্ঠনপর্ব সমাপ্ত করে বাড়িটিতে আগুন জ্বালিয়ে দিল।” তার গবেষণাগার, লাইব্রেরি, এবং তার সকল পাণ্ডুলিপি ও দলিলপত্র পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে যায়। এক বন্ধু আগে থেকে সতর্ক করে দেয়ায় প্রিষ্টলি কোন রকমে প্রাণে রক্ষা পান। পরদিন সকল গুরুত্বপূর্ণ একত্ববাদে বিশ্বাসী মানুষের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়। এর দু’দিন পর জনতা, যারা ঘোষিত একত্ববাদী নয়, কিন্তু একত্ববাদীদের আশ্রয় ও নিরাপত্তা দিয়েছে এমন সব লোকদের বাড়িগুলোও পুড়িয়ে দেয়। এ সময়টি বার্মিংহামের লোকজনের কাটে আতঙ্কের মধ্যে দিয়ে। সকল দোকান পাট বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণ মানুষকে উন্মত্ত জনতার রোষ থেকে বাঁচার জন্যে “চার্চ ও রাজা” চিৎকার করে উচ্চারণ করতে ও দরজায় লিখে রাখতে দেখা যায়। পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখে সেনাবাহিনী তলব করা হয়। তখন দাঙ্গাকারীরা অদৃশ্য হয়।

এ পর্যায়ে বার্মিংহামে অবস্থান করা প্রিষ্টলির জন্যে বিপজ্জনক হয়ে পড়ে। তিনি ছদ্মবেশে লণ্ডনের উদ্দেশ্যে বার্মিংহাম ত্যাগ করেন। বার্মিংহামের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন: “আইন বিহীন সহিংসতা থেকে পালানোর পরিবর্তে আমি পালিয়েছিলাম গণবিচার থেকে। চূড়ান্ত প্রতিহিংসার উন্মত্ত আবেগ নিয়ে সেখানে আমাকে খোঁজা হচ্ছিল।” লণ্ডনে এসে লোকের চিনে ফেলার ভয়ে তিনি রাস্তায় প্রকাশ্যে চলাফেরা করতে সক্ষম ছিলেন না। ইতিমধ্যে তার আশ্রয়দাতার বাড়িতে হামলা চালিয়ে ধ্বংস করে দেয়া হয়। ফলে তাকে একটি ভাড়া বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়। তার গৃহস্বামী শুধু বাড়ি হারানোর ভয়েই শঙ্কিত ছিলেন না, ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি হারানোর ভয়েও ভীত হয়ে পড়েছিলেন।

১৭৯৪ সনে বেনজামিন ফ্রাংকলিনকে সাথে নিয়ে প্রিষ্টলি আমেরিকার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। ফিলাডেলফিয়া পৌঁছে তারা শহরে ও আশপাশে প্রথম কয়েকটি একত্ববাদীদের চার্চ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী বছরগুলোতে ইংল্যাণ্ডের পরিস্থিতি অনেকখানি স্বাভাবিক হয়ে আসে। ১৮০২ সনে প্রিষ্টলির পুরোন সংগঠন একটি ক্ষুদ্র গির্জা স্থাপন করে। একত্ববাদীদের এক শীর্ষস্থানীয় নেতা বিলশামকে (Bilsham) উক্ত গির্জার উদ্বোধনী ধর্মোপদেশ প্রদানের আমন্ত্রণ জানান হয়। তবে প্রিষ্টলি আমেরিকাতেই থেকে যান। ১৮০৪ সনে তিনি পরলোকগমন করেন।

২য় আর্ল অব শেলবার্ণ।
ইংল্যাণ্ডে একত্ববাদীদের জন্যে প্রিষ্টলির বড় অবদান হল ঈশ্বরের একত্বের সমর্থনে ব্যাপক ঐতিহাসিক ও দার্শনিক যুক্তিসমূহ। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ এবং প্রাচীন খৃষ্টান যাজক ও ধর্মপ্রচারকগণের রচনা থেকে এসব যুক্তি তিনি সংগ্রহ করেছিলেন। সেগুলো তিনি তার সময়কালের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সমস্যায় যুক্তিপূর্ণভাবে প্রয়োগ করতেন। তিনি লিখেছিলেন, “অসার বিষয়কে শক্তি দিয়ে যুক্তির বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে টিকিয়ে রাখা যায় না।”

তার সকল ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের মধ্যে দুই খণ্ডে লেখা “History of the corruptions of Christianity” গ্রন্থটি ছিল সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী। এ গ্রন্থে তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে, প্রকৃত খৃষ্টান ধর্ম, যা প্রথমদিকের চার্চের ধর্মবিশ্বাসের অঙ্গ ছিল, তা একত্ববাদী এবং এ বিশ্বাস থেকে সকল ধরনের বিচ্যুতি কার্যত ধর্মবিকৃতি ছাড়া কিছুই নয়। এ গ্রন্থটি ইংল্যাণ্ড ও আমেরিকার গোঁড়া খৃষ্টানদের ক্রুদ্ধ এবং উদার পন্থীদের আনন্দিত করেছিল। হল্যাণ্ডে গ্রন্থটি প্রকাশ্যে পোড়ানো হয়। এ গ্রন্থে প্রিষ্টলি লিখেছেন:

খৃষ্টান ধর্মের পদ্ধতিটি বিবেচনা করে দেখলে যে কেউ একে ধর্মের বিকৃতি ও অপব্যবহারের জন্যে দায়ী বলে ভাবতে পারে। খৃষ্টান ধর্মের বাহ্যিক রূপ থেকে যা মনে হয়, তা হল এই যে, মানব জাতির শাশ্বত পিতা (ঈশ্বর) যিশুখ্রিস্টকে মানুষকে সৎকাজ করার আহ্বান জানাতে, অনুশোচনাকারীদের জন্যে তার ক্ষমার আশ্বাস প্রদান করতে এবং সকল সৎকর্মকারীদের জন্যে পরকালে অমর জীবন ও সুখময় দিন যাপনের সংবাদ পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব প্রদান করেন। এর মধ্যে এমন কিছু নেই যা নিয়ে দুর্বোধ্য জল্পনা-কল্পনা সৃষ্টি বা আপত্তিকর মনে হতে পারে। এ মতবাদ এতই সরল যে, জ্ঞানী-অজ্ঞানী সকলের কাছেই তা শ্রদ্ধার বিষয় বলে মনে হবে। যে ব্যক্তি এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে জ্ঞাত নয়, সে এ ধর্মের প্রচারকালে এ ধর্ম ব্যবস্থার মধ্যে লুকিয়ে থাকা ভয়ংকর বিকৃতি ও অপব্যবহার সম্পর্কে কিছু খুঁজতে গেলে ব্যর্থ হবে। যীশু ও তার ধর্মপ্রচারকগণ পূর্ব থেকেই অবহিত হয়েছিলেন যে, একসময় সত্য থেকে ব্যাপক বিচ্যুতি ঘটবে এবং তারা যা শিক্ষা প্রদান করেছেন তার সাথে চার্চের মতবাদের বিরাট ফারাক ঘটবে, এমনকি তা সত্য ধর্মের জন্যে ধ্বংসকর হবে।

যা হোক, বাস্তবে ধর্মের বিকৃতির কারণসমূহ উত্তরোত্তর বহাল থাকে এবং তদনুযায়ী, ধর্মের স্বাভাবিক রীতি-নীতি আরও অনুসরণের বদলে অপব্যবহার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে। এক্ষেত্রে যা অত্যন্ত আশ্চর্যজনক তা হল, সত্যধর্মের স্বাভাবিক কারণে এসব অপব্যবহার ধীরে ধীরে সংশোধিত হচ্ছে এবং খৃষ্টধর্ম তার প্রকৃত সৌন্দর্য ও মহিমা ফিরে পাচ্ছে।

এ ধর্মীয় বিকৃতির কারণসমূহ প্রায় সর্বাংশেই অ-খৃষ্টান জগতের প্রচলিত মত থেকে উদ্ভূত, বিশেষ করে তাদের দর্শনের অংশ এগুলো। সে কারণেই এই অ-খৃষ্টানরা যখন খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করল তারা এর সাথে তাদের ধর্মীয় শিক্ষা ও সংস্কারগুলিও মিশিয়ে দিল। উপরন্তু ইহুদী ও অ-খৃষ্টানরা উভয়েই অভিন্ন অনিষ্টকারী হিসেবে ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন এমন এক ব্যক্তির অনুসারী হওয়ার ধারণায় এতবেশী মর্মপীড়ার শিকার হয়ে পড়েছিল যে, খৃষ্টানরা এ কলঙ্ক একেবারে মুছে ফেলতে যে কোন মতবাদ পুরোপুরি গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিল।

গ্যাস পরীক্ষার জন্যে প্রিষ্টলির তৈরী যন্ত্র।
বলা হয় যে মানুষের মানসিক ক্ষমতা শরীর কিংবা মস্তিষ্ক থেকে পৃথক বিষয় এবং এই অদৃশ্য আত্মিক অংশ, অথবা আত্মা, দেহের সাথে সম্মিলনের পূর্বে বা পরে নিজস্ব অস্তিত্ব বজায় রাখতে সক্ষম, সকল দর্শনের মধ্যেই তা গভীর শিকড় বিস্তার করেছে, এই উদ্দেশ্যের জবাব খোঁজার ক্ষেত্রে চমৎকারভাবে তার উপর নির্ভর করা হয়েছে। এ পন্থায় খৃষ্টানরা খৃষ্টের আত্মাকে তার জন্মের পূর্বেই তাদের পছন্দ মত একটি ঐশ্বরিক মর্যাদায় স্থাপিত করতে সক্ষম হয়। প্রাচ্য দর্শন থেকে উদ্ভূত মতবাদ গ্রহণকারী অধ্যাত্ম রহস্যবাদী খৃষ্টানগণ এ নীতি অবলম্বন করেছিল। পরবর্তীতে খৃষ্টান দার্শনিকগণ জ্ঞান অথবা ঈশ্বর পিতার সর্বনিয়ন্ত্রক শক্তিকে ব্যক্তিসম্ভুত করে ঈশ্বর পিতার সমকক্ষ করার অন্য নীতি গ্রহণ করে...।

খৃষ্টানধর্মের সদর্থক প্রতিষ্ঠানগুলোর অপব্যবহার ছিল অত্যন্ত মারাত্মক। এর উদ্ভব ঘটে ধর্মীয় রীতি ও অনুষ্ঠানের বিশুদ্ধকরণ ও পবিত্রকরণের মতবাদ থেকে, যা ছিল অ-খৃষ্টানদের উপাসনার সর্বপ্রধান ভিত্তি এবং সেগুলো ছিল ইহুদী ধর্মের অপব্যবহারের অনুরূপ। আমরা অ-খৃষ্টানদের মত ও আচার-কর্মের মধ্যে সন্ন্যাসীদের কৃচ্ছ্রতার সকল উপাদান দেখতে পাই যারা শরীরকে মাসকারা ভূষিত হওয়ার ও বাসনা দমন করার মাধ্যমে আত্মাকে পবিত্র ও মহিমান্বিত করার চিন্তা করত। চার্চের কর্তৃত্বের এই অপব্যবহারকে সহজেই বেসামরিক সরকারের অপব্যবহারের মতই ব্যাখ্যা করা যেত। জাগতিক স্বার্থসম্পন্ন লোকেরা তাদের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্যে যে কোন সুযোগকে কাজে লাগাতে সদাপ্রস্তুত ছিল এবং অন্ধকার যুগে এমন বহু ঘটনা সংঘটিত হয় যা তাদেরকে এ ধরনের বিচিত্র সুযোগ এনে দিয়েছিল।

সামগ্রিকভাবে আমি বলতে চাই যে, একজন মনোযোগী পাঠকের কাছে এটা সুস্পষ্ট হবে যে খৃষ্টান ধর্মের ধর্ম বিশ্বাস ও প্রতিটি কর্মকাণ্ডে বিকৃতি রয়েছে, আর তা হল, যে পরিস্থিতিতে তার প্রচার ঘটেছিল, তারই ফল। এ সাথে একথাও বলতে হয় যে, এ বিচ্যুতি থেকে মুক্তিও বিভিন্ন পরিস্থিতির স্বাভাবিক পরিণতি।

পুরো বিষয়টিকে (খৃষ্টানদের ভ্রান্ত অবস্থান) সংক্ষিপ্ত করলে দাঁড়ায়:
১) সাধারণ সভা পুত্রকে পিতার মত একই বৈশিষ্ট্যে ভূষিত করেছিল।
২) পবিত্র আত্মাকে ত্রিত্ববাদের অন্তর্ভুক্ত করেছিল।
৩) মানবিক আত্মার অধিকারী খৃষ্টকে বিশ্ব নিয়ন্ত্রক শক্তির সাথে সংযুক্ত করেছিল। 
৪) খৃষ্টের ঐশ্বরিক ও মানবিক বৈশিষ্ট্যের কল্পিত মিলন ঘটিয়েছিল, এবং 
৫) এই মিলনের পরিণতি হিসেবে দু’টি বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে একই ব্যক্তি গঠিত হওয়ার কথা সমর্থন করেছিল।
এসব বৈশিষ্ট্য মনে রাখার জন্যে যথেষ্ট ভাল স্মৃতিশক্তি প্রয়োজন। কারণ এগুলো শুধু কথার বেসাতি, এর সাথে ভাবনা-চিন্তার কোন সম্পর্ক নেই।

The History of Jesus Christ” নামে আরও একটি গ্রন্থে প্রিষ্টলি বলেছেন: আমরা যখন কোন বিষয়ে একটি বা বেশকিছু বইয়ের মতবাদ খুঁজে দেখি এবং যখন বিভিন্ন মতের সমর্থনে বক্তব্যসমূহ দেখতে পাই, তখন আমাদের প্রধানত বিবেচনা করতে হবে যে, পুরো গ্রন্থটির মূল সুর ও মর্ম কি অথবা এ ব্যাপারে প্রথম সযত্ন অনুসন্ধান একজন নিরপেক্ষ পাঠকের উপর কি ছাপ ফেলবে...।

আমরা যদি সৃষ্টি সম্পর্কে মুসার ধারণা আলোচনা করি, তবে দেখতে পাব যে, তিনি একজনের বেশী ঈশ্বরের উল্লেখ করেননি যিনি স্বর্গ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, যিনি পৃথিবীতে গাছপালা ও জীব-জন্তু সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি মানুষও সৃষ্টি করেছেন। ঈশ্বর সম্পর্কে বহুবচনাত্মক সংখ্যা তখনি ব্যবহৃত হতে পারে যখন তার বক্তব্য এভাবে উপস্থাপন করা হয়। “চল, আমরা মানুষ সৃষ্টি করি” (আদি পুস্তক ১:২৬); কিন্তু এটা যে শুধুমাত্র বাগশৈলী তার প্রমাণ মেলে কিছু পরেই একবচন সংখ্যা থেকে, “ঈশ্বর মানুষকে তাঁর নিজস্ব কল্পনায় সৃষ্টি করেছেন।”(আদি পুস্তক ৫:২৭), সুতরাং স্রষ্টা কিন্তু একজনই। উপরন্তু বাইবেলের তোরণ নির্মাণ বিবরণেও আমরা পাঠ করি যে “ঈশ্বর বললেন, চল, আমরা নীচে নামি এবং সেখানে তাদের ভাষা তালগোল পাকিয়ে গেছে।” (আদি পুস্তক ১১:৭); কিন্তু পরবর্তী বাক্যেই আমরা দেখতে পাই যে, প্রকৃতপক্ষে এ কাজটি যিনি করেছিলেন তিনি ছিলেন একক সত্তা মাত্র।

ঈশ্বরের সঙ্গে আদম, নূহ ও অন্যান্য নবীর কথোপকথনের ক্ষেত্রে কখনই এক সত্তা ছাড়া অন্য কিছুর উল্লেখ পাওয়া যায় না। তারা ঈশ্বরকে একজন হিসেবেই সম্বোধন করেছেন। কখনও তাকে “যিহোভা” কখনও “ইব্রাহিমের ঈশ্বর” নামে তাকে সম্বোধন করা হয়েছে, কিন্তু এখানে কোন সন্দেহই থাকতে পারে না যে, প্রথমেই যাকে ঈশ্বর নামে সাধারণ সম্বোধন করা হয়েছে এবং পৃথিবী ও স্বর্গের স্রষ্টা বলে যাকে আখ্যায়িত করা হয়েছে, তিনি একই সত্তা।

ধর্মগ্রন্থগুলোতে স্বর্গীয় দূতদের (Angels) বিষয়ে বারংবার উল্লেখ রয়েছে যারা কখনও কখনও ঈশ্বরের নামে কথা বলেছে, কিন্তু তারা সর্বদাই স্রষ্টা এবং ঈশ্বরের দাস হিসেবে উল্লেখিত... কোন অবস্থাতেই এসব স্বর্গীয় দূতকে “ঈশ্বর” বলা যেতে পারে না। তারা সর্বোচ্চ সত্তার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে কিংবা তাঁর সমমর্যাদা সম্পন্ন হতে পারে না।

ঈশ্বরের একত্ব সম্পর্কিত সবচেয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা এবং তাতে বিশ্বাস স্থাপনের বিষয়ে ওল্ড টেষ্টামেন্টে বার বার গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। প্রথম নির্দেশ হল, “আমার পূর্বে আর কোন ঈশ্বর ছিল না” (যাত্রা পুস্তক ২০:৩)। এ কথাটি আরও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, “হে ইস্রায়েলীরা, শোন, যিনি প্রভু তিনিই ঈশ্বর, তিনি একজনই” (দ্বিতীয় বিবরণ ৫:৪)। এবিষয়ে পরবর্তী নবীদের ক্ষেত্রে কি ঘটেছিল তা পুনরাবৃত্তি করার সুযোগ আমার নেই। দেখা যায়, ইহুদী ধর্মে এটি ছিল বিরাট বিষয় এবং এর ফলে ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠত্বপূর্ণ উপস্থিতি ও তত্ত্বাবধান, নিজেদের মধ্যে একেশ্বরের জ্ঞান সংরক্ষণ অন্যান্য জাতির সাথে তাদের পার্থক্য সূচিত করেছিল, অন্যদিকে বাকি বিশ্ব ছিল মূর্তিপূজার অনুসারী। এ জাতির মাধ্যমে এবং অনুসৃত শৃঙ্খলার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে এই মহান মতবাদ কার্যকরভাবে সংরক্ষিত হয়েছিল এবং আজও তা অব্যাহত আছে।

ত্রিত্ববাদ যেমনটি বলে তেমনটি পৃথক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন একাধিক ঈশ্বর থেকে থাকলে তা ন্যুনতম পক্ষে মৌলিক ইহুদী ধর্ম-মতবাদের লঙ্ঘন হত এবং তা নিশ্চিতরূপে ব্যাখ্যা দাবি করত, উপরন্তু এর বিপক্ষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়া হত। শাশ্বত পিতার যদি কোন পুত্র এবং আরও একটি আত্মা থেকে থাকে (পবিত্র আত্মা) যারা প্রত্যেকে তাঁর নিজের সমান ক্ষমতা ও মহিমা সম্পন্ন, যদিও এমন একটি অর্থ থাকা উচিত ছিল যে, তাদের প্রত্যেকেই প্রকৃত ঈশ্বর তবুও সঠিকভাবে বলতে গেলে মাত্র একজন ঈশ্বর রয়েছেন। ন্যূনতম পক্ষে এমন সিদ্ধান্ত হতে পারত যে, তিন জনের প্রত্যেকেই যদি প্রকৃত ঈশ্বর হতেন তারা সকলে মিলে তিন ঈশ্বর হতেন। তবে যেহেতু ওল্ড টেষ্টামেন্টে এ ধরনের কিছু বলা হয়নি, কোন আপত্তি উত্থাপন বা তার জবাবও দেয়া হয়নি, সুতরাং প্রতীয়মান হয় যে, এ ধারণাটি তখন ছিল না। সেকালের কোন বক্তব্য বা ঘটনা থেকেও এ ধরনের সমস্যার কথা জানা যায় না।

ইহুদীরা যে জ্ঞান ও উপলব্ধি দিয়ে তাদের নিজেদের পবিত্র গ্রন্থসমূহ অবধান করত, আমরা যদি তার দ্বারা পরিচালিত হই, তা হলে যা দেখতে পাব তা হল যে, খৃষ্টীয় ত্রিত্ববাদের মত কোন মতবাদ সে সব গ্রন্থে নেই। প্রাচীন বা আধুনিককালের কোন ইহুদী তাদের কাছ থেকে এ ধরনের কোন মতবাদ কখনই গ্রহণ করেনি। ইহুদীরা সবসময়ই তাদের ধর্মগ্রন্থগুলোতে ঈশ্বর এক, একাধিক ঈশ্বরের উল্লেখ না করা এবং সেই অদ্বিতীয় সত্তাই পৃথিবীর স্রষ্টা প্রভৃতি শিক্ষা প্রদানের জন্যেই ব্যবহার করেছে এবং তাদের এসব ধর্মগ্রন্থ যাজক ও নবীদের সঙ্গে কথা বলার ব্যাপারে ঈশ্বর, স্বর্গীয় দূত (ফেরেস্তা) ছাড়া তাদের পাশাপাশি অন্য কোন সত্তার কথা বলেনি।

খৃষ্টানরা কল্পনা করে যে, ত্রি-ঈশ্বরের মধ্যে মসীহের (Messiah) স্থান হল দ্বিতীয়। কিন্তু ইহুদীরা কখনই এ ধরনের কোন বিষয় কল্পনা করেনি। অন্যদিকে আমরা যদি এ মহান ব্যক্তির নবীত্ব সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণীর বিষয়টি বিবেচনা করি, আমরা দেখতে পাব যে, তারা তাকে মানুষের বাইরে অতিরিক্ত কিছু হিসেবে প্রত্যাশা করেনি। এটা নিঃসন্দেহে সন্তোষজনক। মসীহকে “স্ত্রীলোকের সন্তান” শিরোনামের অধ্যায়ে আমাদের পূর্ব পুরুষদের কাছে ঘোষণা করা হয়েছে বলে মনে হয়” (আদি পুস্তক ৩:১৩)। ঈশ্বর ইব্রাহিমকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, পৃথিবীতে তার বংশধরগণের প্রতি ঈশ্বরের আশীর্বাদ থাকবে (আদি পুস্তক ১২:৩)।

এ বিষয়টি (মোটেও যদি মসীহের সাথে জড়িত হয়ে থাকে) আমাদেরকে যে ধারণা দেয় তা হল এই যে, তার কোন সন্তান বা বংশধর মানব সমাজের জন্যে এক বিরাট আশীর্বাদ বয়ে আনার কারণ হবেন। এ প্রসঙ্গে মসীহ সম্পর্কে মুসার কথিত বর্ণনার কথাও উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি বলেছিলেন, আমি তাদের নবী হিসেবে সৃষ্টি করব তাদের মধ্য থেকে, তোমার মত এবং তার মুখে দেব আমার বাণী এবং আমি তাকে যা নির্দেশ প্রদান করব সে তা তাদের কাছে ব্যক্ত করবে: (দ্বিতীয় বিবরণ ১৮:১৮)। এখানে ত্রিত্ববাদ অনুযায়ী দ্বিতীয় ঈশ্বরের মত কিছু নেই বা পিতার সমকক্ষ কোন ব্যক্তির কথা বলা হয়নি- এখানে বলা হয়েছে একজন নবীর কথা যিনি ঈশ্বরের নামে কথা বলবেন এবং তাই করবেন যা করার জন্যে তিনি নির্দেশিত....।

নিউ টেষ্টামেন্টেও আমরা ঈশ্বর সম্পর্কে ওল্ড টেষ্টামেন্টের মত একই মতবাদ লক্ষ্য করি। প্রথম এবং শ্রেষ্ঠতম ঐশ্বরিক নির্দেশ কী, ধর্মগুরুর এ অনুসন্ধানের জবাবে আমাদের পবিত্র আত্মা বলেন, “হে ইস্রায়েলীগণ, ঈশ্বরের প্রথম নির্দেশ হল আমাদের প্রভু যিনি ঈশ্বর তিনি এক প্রভু” ইত্যাদি এবং ধর্মগুরু তার জবাবে বলেন “হ্যাঁ প্রভু! আপনি সত্য বলেছেন: কারণ ঈশ্বর একজনই আছেন এবং তিনি ছাড়া আর কোন ঈশ্বর নেই” ইত্যাদি।

বিদ্যুৎ স্টাডির জন্যে প্রিষ্টলির তৈরী বৈদ্যুতিক মেশিন।
যীশু সর্বদাই তার ঈশ্বর ও পিতা হিসেবে এই এক ঈশ্বরের উপাসনাই করেছেন। তিনি বলতেন তার ধর্মমত ও শক্তি তিনি ঈশ্বরের কাছ থেকেই প্রাপ্ত এবং তিনি বারংবার তার নিজের কোন শক্তি বা ক্ষমতা থাকার কথা অস্বীকার করেছেন (যোহন ৫:১৯), “তখন যীশু জবাব দিলেন এবং তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের বলছি, পুত্র নিজে কিছুই করতে পারে না।” “আমি তোমাদের কাছে যা ব্যক্ত করেছি, তা আমার নিজের কথা নয়, সেগুলো হল আমার পিতার যিনি আমার ভিতরে বাস করেন, তিনিই সবকিছু করেন” (গালাতী ১৪:১৯)। “আমার সহযোগীদের কাছে গমন কর এবং তাদের উদ্দেশ্যে বল, আমি আমার পিতার ও তোমাদের পিতার এবং আমার ঈশ্বর ও তোমাদের ঈশ্বরের অধীনস্থ” (গালাতীয় ২০:১৭)। কোন ঈশ্বর এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করবেন, কোনক্রমেই তা হতে পারে না।

শেষদিকের ধর্মপ্রচারকগণ তাদের লেখা, কথাবার্তায় একই বিশ্বাস ও ধারণা ব্যক্ত করেছেন। তারা পিতাকে একমাত্র প্রকৃত ঈশ্বর এবং খৃষ্টকে একজন মানুষ ও ঈশ্বরের বান্দা হিসেবেই উপস্থাপন করেছেন যিনি তাকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন এবং তাঁর প্রতি আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে খৃষ্ট যে সকল শক্তির অধিকারী ছিলেন তা তিনি তাকে দিয়েছিলেন। (প্রেরিতদের কার্য ২:২২)। পিটার বলেছেন “হে ইস্রায়েলীগণ, তোমরা শোন, নাজারেথের যীশু, তিনি তোমাদের মধ্যে ঈশ্বর কর্তৃক মনোনীত, তিনি অলৌকিক, আশ্চর্য ক্ষমতা ও নিদর্শনসমূহের অধিকারী যা ঈশ্বর তাকে দিয়েছেন, ইত্যাদি, ঈশ্বর তাকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন।” পলও বলেছেন, “ঈশ্বর একজনই বিরাজমান এবং ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে একজন মধ্যস্থ ছিলেন, সেই লোকটি হলেন যিশুখ্রিষ্ট” (তীমথীয় ২:৫)।

ইতিহাসের ধারায় দেখা যাবে যে, সে সব সাধারণ মানুষ, যাদের ব্যবহারের জন্যে নিউ টেষ্টামেন্ট রচিত হয়েছিল, তারা সেগুলোর মধ্যে খৃষ্টের কোন প্রাক-অস্তিত্ব বা ঈশ্বরত্ব দেখেনি। অথচ এখনকার বহু লোকই দৃঢ় বিশ্বাসী যে, তারা সেগুলোর মধ্যে তা দেখেছে। তা যদি সত্যই হয়ে থাকে তাহলে ওল্ড ও নিউ টেষ্টামেন্টে যেমন সুনির্দিষ্ট এক ঈশ্বরের মতবাদ সুষ্পষ্টভাবে শিক্ষা দেয়া হয়েছে ত্রিত্ববাদ সেখানে সুষ্পষ্টভাবে শিক্ষা দেয়া হয়নি কেন? ন্যূনতমভাবে নিউ টেষ্টামেন্টে তো তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা যেত। কেন একত্ববাদকে এত শর্তহীনভাবে, ত্রিত্ববাদের প্রতি কোন ছাড় ব্যতিরেকে, যাতে এ ব্যাপারে কোন বিভ্রান্তি না ঘটতে পারে এত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে? যেমনটি আজকাল গোঁড়া শিক্ষারীতি, ধর্মমত, উপদেশ সকল ক্ষেত্রেই ত্রিত্ববাদের বিভ্রান্তিকে লালন করা হচ্ছে। ধর্মতত্ত্ববিদ গণ খুবই মামুলি কথাবার্তার উপর অনুমান করে অদ্ভুত এবং অ-ব্যাখ্যাযোগ্য ত্রিত্ব মতবাদ সৃষ্টি করছেন যা সুস্পষ্ট, বলিষ্ঠ এবং দ্ব্যর্থহীনভাবে ধর্মগ্রন্থ সমর্থিত বলে কারও কাছেই প্রমাণ করা যায় না।

প্রিষ্টলির পরীক্ষাগার।  
বাইবেলে এমন বহু অংশ রয়েছে যেগুলোতে সুস্পষ্ট ও বলিষ্ঠভাবে একত্ববাদের মতবাদ ঘোষিত হয়েছে। ত্রিত্ববাদের সমর্থনে এরকম কোন একটি মাত্র অংশ উদ্ধৃত করা যাবে না। তাহলে সুস্পষ্ট ও বলিষ্ঠ সাক্ষ্য প্রমাণ ব্যতিরেকে রহস্যময় সব বিষয়ে আমরা কেন বিশ্বাস করব? যারা বিশ্বাস করে যে খৃষ্ট হয় ঈশ্বর অথবা ঈশ্বরের অধীনে পৃথিবীর স্রষ্টা তাদের বিবেচনার জন্যে আরেকটি বিষয় এখানে উত্থাপিত হতে পারে। এটি হল: আমাদের প্রভু (যীশু) নিজের সম্পর্কে যে ভাষায় ও ভঙ্গিতে কথা বলেন এবং তার যে শক্তি দিয়ে তিনি অলৌকিক কর্মকাণ্ড সাধন করেন, তা তার ভাষার সাথে অসংগতিপূর্ণ বলে মনে হবে যদি তা থেকে অন্য কোন ব্যক্তির চেয়ে তার নিজের কোন শক্তি অধিক রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

যদি খৃষ্ট পৃথিবীর স্রষ্টা হতেন তাহলে তিনি নিজের সম্পর্কে বলতেন না যে, তিনি নিজে কিছু করতে পারেন না, তিনি যা বলেন তা নিজের কথা নয় এবং তার মধ্যে যে পিতা আছে তিনিই সবকিছু করেন। কোন সাধারণ লোক, অন্য সাধারণ লোকের মত কাজ করে যদি এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করত এবং বলত যে সে কিছু বলে না বা করে না, তার মাধ্যমে ঈশ্বরই সবকিছু বলেন ও করেন এবং সে কোন কিছুই বলতে বা করতে সক্ষম নয়, আমরা বলতে দ্বিধা করতাম না যে, সে হয় মিথ্যাবাদী অথবা ধর্ম অবমাননাকারী...।

যদি মনে করা হয় যে, খৃষ্ট যখন বলেছেন যে তার পিতা তার চেয়েও শ্রেষ্ঠতর তখন তিনি তার মানব সত্তার কথা ব্যক্ত করেছেন, অথচ একই সাথে তার ঐশ্বরিক সত্তা সম্পূর্ণরূপে ঈশ্বরের সমকক্ষ ছিল, তাহলে তা হবে ভাষার অপব্যবহার। মথি, মার্ক বা লূকের গসপেলে ঐশ্বরিকত্ব, এমনকি অতি দৈবিক সত্তা বলে আখ্যায়িত করা যায়, এমন কিছু যীশুর প্রতি আরোপিত হয়নি। জনের গসপেলের ভূমিকায় এ ধরনের কিছু আভাস আছে বলে স্বীকার করে নিলেও একথা বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, সেখানে এমন বহু অংশ আছে যাতে চূড়ান্ত ভাবে যীশুকে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়েছে।

বামিংহামে প্রিষ্টলির বাড়ীতে আক্রমণ। 
এখন এ খৃষ্টানরা উপলব্ধি করতে পারে না যে, যাদের জন্যে গসপেলসমূহ রচিত হয়েছিল সেই ইহুদী অথবা অ-ইয়াহুদীদের এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে তথ্যের প্রয়োজন ছিল না যা এ উভয় শ্রেণীর লোকদের ধারণার বাইরে ছিল বরং যা একই সময়ে ক্রুশের সমালোচনাকে কার্যকরভাবে আবৃত করেছিল, যাছিল সে যুগের খৃষ্টানদের অব্যাহত দুর্দশার কারণ। খৃষ্টের ঈশ্বরত্ব অথবা তার পূর্ব অস্তিত্বের মতবাদ যদি সত্য হয় তাহলে তা যে অতি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ও আগ্রহোদ্দীপক বিষয় তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু যেহেতু এ খৃষ্টানরা সেগুলো  সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট  কোন বিবরণ দিতে পারে না এবং তাদের গুরুত্ব সম্পর্কেও কিছু বলে না, সুতরাং নিশ্চিতভাবে বলা যায় এগুলো তাদের অজ্ঞাত ছিল।

আরেকটি প্রশ্নও তাদেরকে অবশ্যই করা যেতে পারে। তা হল, ধর্মপ্রচারকারীরা যখন যীশুকে ঈশ্বর অথবা ঈশ্বরের অধীন পৃথিবীর স্রষ্টাকে এক অতি-দৈবিক শক্তি হিসেবে আবিষ্কার করলেন, তারপরও তারা কিভাবে তাদের প্রেরিতদের কার্যাবলী (Book of Acts) গ্রন্থে এবং পত্রাবলিতে সবসময়ই যীশুকে একজন মানুষ হিসেবে আখ্যায়িত করলেন? উক্ত ধারণার পর এটা ছিল অমর্যাদাকর, অস্বাভাবিক ও অযৌক্তিক, মানুষের রূপে তার উপস্থিতি একেবারেই বেমানান।...

আসুন, আমরা প্রেরিতদের ও যীশুর শিষ্যদের স্থানে নিজেদের স্থাপন করি। তারা নিশ্চিতভাবে যীশুকে তাদের মতই একজন মানুষ হিসেবে ভেবেছিলেন বলেই তার সাথে সাক্ষাৎ ও কথাবার্তা বলেছিলেন। এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ থাকতে পারে না। এরপর, তিনি মানুষ নন, বরং প্রকৃত পক্ষে ঈশ্বর, অথবা পৃথিবীর স্রষ্টা বলে জানতে পারলে তাদের বিস্ময় তেমনটিই হত যেমনটি আমাদের হবে যদি আমরা আবিষ্কার করি যে, আমাদের চেনাজানা কোন একজন মানুষ বাস্তবে ঈশ্বর অথবা পৃথিবীর স্রষ্টা। এখানে আমাদের বিবেচনা করতে হবে যে, আমাদের কেমন অনুভূতি হত এবং আমরা এ ধরনের একজন ব্যক্তির সাথে কেমন ব্যবহার করতাম এবং তার সাথে কিভাবে কথা বলতাম। আমি আস্থাশীল যে, কেউ যদি উপলব্ধি করতে পারে যে, এই লোকটি ঈশ্বর অথবা একজন স্বর্গীয় দূত, সে কখনোই ঐ ব্যক্তিকে আর মানুষ হিসেবে আখ্যায়িত করবে না। সে এরপর থেকে তার পদ ও মর্যাদার উপযোগী পন্থায় তার সাথে কথা বলবে।

প্রিষ্টলির স্ত্রী মেরী প্রিষ্টলি। 
ধরা যাক, আমাদের সাথে সংশ্লিষ্ট যে কোন দু’ব্যক্তি পরীক্ষা নিরীক্ষার পর স্বর্গীয় দূত মাইকেল ও গ্যাব্রিয়েল (ফেরেশতা মিকাইল ও জিব্রাইল) বলে প্রমাণিত হলেন। এরপরও কি আমরা তাদের মানুষ বলেই আখ্যায়িত করব? অবশ্যই না। আমরা তখন স্বাভাবিকভাবেই বন্ধুদের বলব, “ঐ দুই ব্যক্তি যাদের আমরা মানুষ বলে জানতাম, তারা মানুষ নন, ছদ্মবেশে স্বর্গীয় দূত।” এ কথাটি হবে স্বাভাবিক। যিশুখ্রিষ্ট যদি পৃথিবীতে আসার পূর্বে মানুষের চাইতে বেশি কিছু হতেন, বিশেষ করে তিনি যদি ঈশ্বর বা পৃথিবীর স্রষ্টা হয়ে থাকতেন, তিনি কখনই পৃথিবীতে থাকাকালে একজন মানুষ হিসেবে গণ্য হতেন না, কেননা তিনি তার শ্রেষ্ঠত্ব ও আসল বৈশিষ্ট্য ত্যাগ করতে পারতেন না। তিনি যদি ছদ্মবেশেও থাকতেন তাহলে প্রকৃতপক্ষে তিনি পূর্বে যা ছিলেন তাই থাকতেন এবং যারা তাকে প্রকৃতপক্ষে চিনত, তাদের কাছে সেভাবেই তিনি আখ্যায়িত হতেন। যীশুখৃষ্টকে তখন কোনক্রমেই ন্যায়নিষ্ঠ, যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে গণ্য করা হতো না, যদিও তার বাহ্যিক উপস্থিতি মানুষকে অভিভূক্ত করত এবং তারা তাকে এ নামে ডাকত না।

নিউ টেষ্টামেন্টের বাগ-বৈশিষ্ট্যের দিকে দৃষ্টি দিলে প্রতিটি লোকের মনে যে কথাটা নাড়া দেবে তা হল ‘খৃষ্ট’ ও ‘ঈশ্বর’ নামক দু’টি আখ্যা যা পরস্পর বিরোধী হিসেবে আগাগোড়াই ব্যবহার হয়েছে ‘ঈশ্বর’ ও ‘মানুষ’ শব্দ দ্বয়ের মত। আমরা যদি শব্দের সাধারণ ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করি, আমরা সন্তোষের সাথে দেখতে পাব যে, এমনটি কখনই ঘটত না যদি প্রথমটি পরেরটির গুণ নির্দেশক হত, অর্থাৎ যদি খৃষ্ট ঈশ্বর হতেন।

আমরা বলি, “রাজপুত্র এবং রাজা”, কারণ রাজপুত্র রাজা নন। যদি তিনি রাজা হতেন, তাহলে আমদেরকে অন্য কোন পার্থক্যসূচক শব্দ যেমন “বৃহৎ ও ক্ষুদ্র” ‘ঊর্ধ্বতন ও অধস্তন’ ‘পিতা ও পুত্র’ ইত্যাদি ব্যবহার করতে হত। যখন ধর্মপ্রচারক পল বলেন যে, করিন্থের চার্চ খৃষ্টের এবং খৃষ্ট ঈশ্বরের একজন, (নিউ টেষ্টামেন্টে বারংবার এরকম উল্লেখ আছে) তখন প্রতীয়মান হয় যে, অর্থপূর্ণভাবে খৃষ্টের ঈশ্বর হওয়া সম্পর্কে তার কোন ধারণা ছিল না। অনুরূপভাবে ক্লিমেন্স রোমানাস কর্তৃক খৃষ্টকে “ঐশ্বরিক মহিমার রাজদণ্ড” হিসেবে আখ্যায়িত করা থেকে পর্যাপ্ত প্রমাণ মেলে যে, তার মতে রাজদণ্ড হল এক জিনিস এবং ঈশ্বর অন্য জিনিস। আমার বক্তব্য এই যে, কথাটি যখন প্রথম বলা হয়েছিল তখন তার অর্থ এরকমই ছিল।

প্রিষ্টলির সমাধিফলক।
বাইবেলগুলোর সামগ্রিক মর্ম এবং কতিপয় বিবেচনা থেকে সিদ্ধান্ত করা যায় যে, সেগুলো ত্রিত্ববাদের অথবা খৃষ্টের ঈশ্বরত্ব অথবা প্রাক অস্তিত্বের পক্ষে মোটেই অনুকূল নয়। উপরন্তু আরেকটি বিবেচনার দিকে লক্ষ্য করা যায় যেদিকে কারোরই দৃষ্টি খুব একটা পড়েনি যা এসকল মতবাদের সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং তা তাদের ধর্মগ্রন্থের মতবাদেরও বিরুদ্ধে। সেটি হল, যীশু মসীহ হলেও সে বিষয়টি ধর্মপ্রচারক ও ইহুদীদের কাছে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রকাশ করা হয়েছিল। আমদের প্রভু দীর্ঘসময় যাবৎ এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কিছুই বলেননি, বরং ইহুদীদের মত তার শিষ্যদেরও তাকে দেখে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য তাদের উপর ছেড়ে দেন। তিনি শুধু তার কাছে ব্যাপ্টিষ্ট যোহন এর প্রেরিত দূতদেরকেই ব্যাপারটি জানিয়ে ছিলেন।

যীশু নিজেকে মসীহ বলে ঘোষণার পর যদি সর্বোচ্চ পুরোহিত তার পোশাক ছিঁড়ে ফেলার মাধ্যমে আতঙ্ক প্রকাশ করে থাকেন, তাহলে তিনি যদি অন্য কোন উচ্চতর রকম দাবি করতেন, তা শোনা বা সন্দেহ করার পর ঐ পুরোহিত কি করতেন? যদি তিনি সে রকম কিছু দাবি করতেন তবে নিশ্চয়ই তা প্রকাশ পেত। যখন সাধারণ মানুষ তার অলৌকিক কার্যাবলী প্রত্যক্ষ করল, তারা বিস্মিত হয়েছিল এ ভেবে যে ঈশ্বর একজন মানুষকে এ ধরনের ক্ষমতা দান করতে পারেন! জনগণ যখন তা দেখল তারা বিস্মিত ও চমৎকৃত হল এবং ঈশ্বরের মহিমা ঘোষণা করল যিনি মানুষকে এ ধরনের ক্ষমতা দিয়েছেন (মথি ৯:৮)। হেরোদ যে সময় তার কথা শুনলেন, কেউ কেউ ধারণা করল তিনি ইলিয়াস, কেউ কেউ বলল তিনি নবী এবং কেউ কেউ বলল তিনি পুনর্জীবন লাভকারী যোহন। কিন্তু কেউই তাকে সর্বোচ্চ ঈশ্বর অথবা ঈশ্বরের অধীন পৃথিবীর স্রষ্টা হিসেবে ভাবেনি।

একটি লোকও একথা বলে না যে, যীশু তার নিজের শক্তিতে এরকম অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শন করছেন। প্রেরিতগণ যদি প্রকৃতপক্ষে যীশুর ঈশ্বরত্বের মতবাদই প্রচার করতেন এবং ধর্মান্তরিত ইহুদীরা যদি সামগ্রিকভাবে তা গ্রহণ করত, তাহলে অবিশ্বাসী ইহুদীদের মধ্যে তা অবশ্যই সুবিদিত থাকত এবং সে সময় যারা পূর্বাপর একত্ববাদে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী ছিল তারা কি একাধিক ঈশ্বরের ধর্মমত প্রচারের জন্যে খৃষ্টানদের কাছে আপত্তি উত্থাপন করত না? এখন পর্যন্ত প্রেরিতদের কার্যাবলী গ্রন্থ কিংবা নিউ টেষ্টামেন্টের কোনখানেই এ ধরনের কোন কিছুর সাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি।

দুই অথবা তিনজন ঈশ্বর সম্পর্কিত অভিযোগের জবাব দান কতিপয় প্রাচীন খৃষ্টান পাদ্রীর রচনার উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল। তারপরও কেন আমরা প্রেরিতদের সময়ে এধরনের কিছু খুঁজে পাই না? এর জবাব একটাই, আর তাহল এই যে, তখন এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়নি এবং খৃষ্টের ঈশ্বরত্বের মতবাদও উত্থাপিতই হয়নি। মন্দির ও আইনের বিরুদ্ধে কথা বলা ছাড়া ষ্টিফেনের বিরুদ্ধে আর কি অভিযোগ ছিল (প্রেরিতদের কার্য ৬:১৩)? আমরা যদি পলের সকল সফরেই তার সঙ্গী হই এবং ইহুদীদের উপাসনালয়ে (Synagogue) ইহুদীদের সাথে তার আলোচনা সমূহে যোগ দেই, তাদের অবিরাম ও প্রচণ্ড নির্যাতনের বিষয় লক্ষ্য করি, তাহলে দেখতে পাব যে, তিনি যীশুর নয়া ঈশ্বরত্বের প্রচার করেছেন বলে ইহুদীরা কোন সন্দেহ প্রকাশ করছে না। যদি যীশুর ঈশ্বরত্ব প্রচার করা হত তাহলে ইহুদীরা তাদের চিরাচরিত নিয়মে এক নয়া ঈশ্বরের প্রচার হচ্ছে বলে অভিযোগ উত্থাপন করত।

প্রিষ্টলির পোর্ট্রেইট।
প্রেরিতগণ কখনোই যীশুর ঈশ্বরত্ব বা পূর্ব অস্তিত্বের মত কোন মতবাদের ব্যাপারে কি কখনও নির্দেশিত হয়েছিলেন? যদি তাই হত, তাহলে তার সাথে তাদের সংযোগ স্থাপনের সময়কালটি আমাদের কাছে ধরা পড়ত যেহেতু সেটি ছিল তখনও সম্পূর্ণ নতুন ও অস্বাভাবিক এক মতবাদ। যদি এ বিষয়ের সত্যতা সম্পর্কে তারা দৃঢ়ভাবে সন্দেহমুক্ত না থাকতেন, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তারা বিস্ময় প্রকাশ করতেন। তারা যদি অবিচল বিশ্বাসে তা অন্যদের শিক্ষা দিতেন তবে তারা তাদের তাৎক্ষণিক ভাবে গ্রহণ করত না। কিছু বিষয় সম্পর্কে সন্দেহ থাকলে তাদের তর্ক-বিতর্ক করা কিংবা কতকগুলো বিষয়ে আপত্তির জবাব দিতে হত। কিন্তু তাদের সমগ্র ইতিহাসে এবং তাদের বিশাল রচনা ভাণ্ডারে তাদের নিজেদের বিস্ময় বা সন্দেহ কিংবা অন্যদের সন্দেহ বা আপত্তির কোন প্রমাণ মেলে না।

একথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, উপাসনার যথাযথ লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন পিতা ঈশ্বর, ত্রিত্ববাদে যাকে ঈশ্বরদের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি বলা হয়। কার্যত: ধর্মগ্রন্থগুলোতে এরকম কোন অনুমোদিত বিধান পাওয়া যায় না যা আমাদের অন্য কোন ঈশ্বর বা তদানুরূপ কাউকে সম্বোধন করতে বলে। এ বিষয়ে স্বপ্নে যীশুকে দেখার পর তার উদ্দেশ্যে ষ্টিফেনের কথিত সংক্ষিপ্ত ভাষনের উল্লেখ গুরুত্বহীন। যীশু সব সময়ই তার পিতা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতেন, আর তা তিনি করতেন এত বিনীত ও আত্ম সমর্পিত ভাবে যা একজন অতি নির্ভরশীল ব্যক্তির পক্ষেই শুধু করা সম্ভব। তিনি ঈশ্বরকে সর্বদাই তার পিতা বলে অথবা তার জীবনের প্রভু বলে সম্বোধন করতেন এবং তিনি তার শিষ্যদেরও একই সত্তার প্রার্থনা করার জন্যে নির্দেশ দিতেন। তিনি বলতেন, আমাদের তাঁরই উপাসনা করা উচিত।

তদানুযায়ী শুধুমাত্র পিতার প্রার্থনা করা ছিল চার্চের সুদীর্ঘকালের নিয়ম ও ঐতিহ্য। লিটানিতে (Litany) যেমনটি রয়েছে, “প্রভু আমাদের করুণা কর”, “খৃষ্ট আমাদের করুণা কর” এ ধরনের সংক্ষিপ্ত প্রার্থনা তুলনামূলকভাবে অনেক পরে প্রবর্তন করা হয়। ক্লিমেন্টীয় প্রার্থনা যা সবচেয়ে প্রাচীন প্রার্থনা হিসেবে আজও বিদ্যমান এবং গীর্জা সংক্রান্ত সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত, এটি রচিত হয়েছিল চতুর্থ শতাব্দীতে এবং সেখানে এ ধরনের কোন বিষয় নেই। অরিজেন প্রার্থনা বিষয়ক এক বিশাল গ্রন্থে অত্যন্ত বলিষ্ঠতার সাথে শুধু পিতাকে উপাসনার আহ্বান জানিয়েছেন, খৃষ্টকে নয়; এবং যেহেতু জনসাধারণের এ ধরনের প্রার্থনার ক্ষেত্রে নিন্দার বা দোষের কিছু আছে এমন কথা তিনি বলেননি, স্বাভাবিকভাবেই আমরা ধরে নিতে পারি যে, খৃষ্টের কাছে পূর্বোক্ত ধরনের কাতর অনুনয় বিনয় করা খৃষ্টানদের গণ প্রার্থনা সভার কাছে অজ্ঞাত ছিল।

প্রিষ্টলির পোর্ট্রেইট।
এখানে প্রেরিতদের ইতিহাসের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও ঘটনার প্রতি দৃষ্টি দেয়া যাক। হেরোদ যখন জেমসকে হত্যা করলেন (যনি ছিলেন জনের ভাই) এবং পিটারকে বন্দী করলেন, আমরা পাঠ করি যে চার্চে অবিরাম “ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে” প্রার্থনা করা হয়েছিল; খৃষ্টের উদ্দেশ্যে নয়, “তাঁর জন্য” (প্রেরিতদের কার্য ১২:৫)। পল ও সাইলাস যখন ফিলিপির কারাগারে বন্দী ছিলেন, আমরা পাঠ করি যে, তখন তারা “ঈশ্বরের গুণগান ও প্রশংসা করেছিলেন” (প্রেরিতদের কার্য ১৬:২৫) যীশুর নয়; এবং যখন পলকে জেরুজালেম গমন করলে তার পরিণতি সম্পর্কে হুঁশিয়ার করে দেয়া হল, তখন তিনি বলেছিলেন “ঈশ্বর যা ইচ্ছা করেন তাই হবে (প্রেরিতদের কার্য ২১:১৪)। এ থেকে অবশ্যই মনে করা যায় যে, তারা পিতা ঈশ্বরকেই বুঝিয়েছেন, কারণ যীশু নিজেও এ ক্ষেত্রে একই ভাষা ব্যবহার করেছিলেন। যেমন ঈশ্বরের উপাসনাকালে তিনি বলতেন: আমার ইচ্ছায় নয়, তোমর ইচ্ছাই পূরণ  হোক...।

পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, ধর্মগ্রন্থসমূহে ত্রিত্ববাদের মত কোন মতবাদ নেই। এটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, কোন যুক্তিবাদী ন্যায়নিষ্ঠ মানুষের পক্ষে এ ত্রিত্ববাদ গ্রহণ বা ধারণ করা অসম্ভব, কেননা এর স্ববিরোধিতা এটাকে অর্থহীন করে দিয়েছে।

এথানাসিয়াসের ত্রি-ঈশ্বর বিষয়ক মতবাদে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, পিতা, পুত্র বা আত্মার কারোরই কোন কিছুর অভাব নেই, কেননা তাদের মধ্যে প্রত্যেকে প্রকৃত ও যথাযথ ঈশ্বর, প্রত্যেকেই অবিনশ্বরতার দিক দিয়ে সমান এবং প্রত্যেকেই ঐশ্বরিকতায় পূর্ণাঙ্গ। কিন্তু তা সত্ত্বেও এরা তিনজন তিন ঈশ্বর নন, শুধু এক ঈশ্বর। ফলে তারা প্রত্যেকে পূর্ণাঙ্গ ঈশ্বর হওয়া সত্ত্বেও এক এবং বহু উভয়ই। এটি নিঃসন্দেহে এক স্ববিরোধী বিষয়, যেমন একথা বলা যে পিটার, জেমস ও জন এদের প্রত্যেকেরই এক একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হওয়ার জন্যে প্রয়োজনীয় সবকিছুই আছে, তবে তারা সম্মিলিতভাবে তিন ব্যক্তি নয়, একজন মাত্র। “ঈশ্বর” অথবা “মানুষ” শব্দ দ্বয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট ধারণা সমূহ এ দু’টি প্রস্তাবের প্রকৃতিতে কোন পার্থক্য সূচিত করতে পারে না। নিসিয়ার কাউন্সিলের পর এই বিশেষ রীতিতেই ত্রিত্ববাদের মতবাদকে ব্যাখ্যা করার বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। সে যুগের যাজক ও পাদ্রীগণ বিশেষভাবে তিন “ব্যক্তির” পূর্ণাঙ্গ সমকক্ষতা রক্ষার ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। আর তা করতে গিয়ে তারা একত্বের বিষয়টি সম্পূর্ণ বিসর্জন দিয়েছিলেন।

প্রিষ্টলি মেডেল।
যা হোক, এ মতবাদ কীভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল, সেটি কোন ব্যাপার না হলেও এগুলোর একটিকে সর্বদাই অন্যটির জন্যে বলি দিতে হয়। যেহেতু “ব্যক্তি” (Person) ও “সত্তা” (being) শব্দের ব্যবহার নিয়ে মানুষ বিভ্রান্তির শিকার, সে কারণে তা সুনির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন। “সত্তা” আখ্যাটি প্রত্যেকটি বিষয়ের এবং তারপর ত্রি-ঈশ্বরের তিন ব্যক্তির প্রত্যেকের গুণবাচক আখ্যা হতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ যদি বলা হয় খৃষ্টই ঈশ্বর। কিন্তু এখানে কোন সত্তা নেই, বৈশিষ্ট্য নেই যা দিয়ে তার গুণ প্রকাশ পায়। তাহলে এটাকে এক অর্থহীন বিষয় ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। কিন্তু যখন বলা হয় যে, এসব ব্যক্তিদের প্রত্যেকেই স্বয়ং ঈশ্বর, এর অর্থ অবশ্যই এই হবে যে, পিতা পৃথকভাবে একটি সত্তা, পুত্র পৃথকভাবে একটি সত্তা এবং তদানুরূপ পবিত্র আত্মারও স্বতন্ত্রভাবে একটি সত্তা রয়েছে। এখানে তিনটি সত্তার তিনজনই ব্যক্তি। সে ক্ষেত্রে এই তিনজন ঈশ্বর ছাড়া আর কি হতে পারেন যদি না অনুমান করা যায় যে, তিনজন সমন্বিত ব্যক্তি অথবা তিনজন পিতা, তিনজন পুত্র অথবা তিনজন পবিত্র আত্মা আছেন?

প্রিষ্টলির স্টাচু।
পিতার যদি জন্মদানের রহস্যময় বিচিত্র ক্ষমতা থাকে, তবে এখনও তা সক্রিয় নয় কেন? তিনি যদি অপরিবর্তনীয় নাই হবেন তাহলে শুরুতে যা ছিল এখন তা নেই কেন? তাঁর পূর্ণাঙ্গতা কি একই আছে এবং তাঁর পরিকল্পনা করার ক্ষমতাও কি একরই রকম রয়েছে? তাই যদি হয় তা হলে আরও সন্তান তিনি উৎপাদন করেননি কেন? গোঁড়া যাজকরা যেমনটি জিজ্ঞাসা করে সেরকম তিনি কি সন্তান জন্মদানে অক্ষম হয়ে পড়েছেন? অথবা তিনি তাঁর জন্মদানের ক্ষমতা কাজে লাগাবেন কিনা সেই ইচ্ছা ও মর্জির উপরই কি তা নির্ভরশীল? তিনি তাঁর দ্বারা ভিন্নভাবে সৃষ্ট অন্য কোন রূপ বা আকৃতি সম্পন্ন অন্য কোন কিছুর মতই? এবং তিনি তাঁরই মত একই উপাদানে গঠিত হবেন কি না?

এ প্রশ্নও অবশ্যই করতে হবে যে ত্রি-ঈশ্বরের তৃতীয় ব্যক্তি কোন পন্থায় উৎপন্ন হয়েছেন। তাকে প্রথম দু’ব্যক্তির স্ব-স্ব পূর্ণাঙ্গতার অভিপ্রায় থেকে যৌথ ক্ষমতার মাধ্যমে হয়েছে? যদি তাই হয়, তাহলে একই কার্যক্রমে কেন চতুর্থ বা পরে আরও উৎপন্ন করা হল না?

যা হোক, ত্রিত্ববাদের এই অদ্ভুত জন্মদানের কথা স্বীকার করে নিলে পুত্রের ব্যক্তিক অস্তিত্ব তার পিতার মেধা থেকেই উৎসারিত বলে অবশ্যই স্বীকার করতে হয়, আর তা পুত্রের তুলনায় নিশ্চিতভাবে পিতার অগ্রাধিকার অথবা শ্রেষ্ঠত্বের কথাই তুলে ধরে। আর কোন সত্তাই যথাযথ ঈশ্বর হতে পারে না যদি তার চেয়ে ঊর্ধ্বতন বা শ্রেষ্ঠ কেউ থাকে, সংক্ষেপে এই পরিকল্পনা কার্যকরভাবে যথাযথ সমকক্ষতার এবং পাশাপাশি ত্রিত্ববাদে তিন ব্যক্তির একত্বের মতবাদকে প্রত্যাখ্যান করে।

ত্রিত্ববাদের ব্যাপারে প্রধান আপত্তি এই যে, এটি হল ঐশ্বরিক প্রত্যাদেশের প্রধান উদ্দেশ্য উপাসনার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে একত্ববাদ প্রতিষ্ঠার পরিপন্থী। এই একত্ববাদের সংস্কার করা অথবা অন্যরূপে তার অনুসরণ সন্দেহের বিষয় বলেই বিবেচিত বা গণ্য হবে। আর তা এ কারণে যে এ মতবাদ বহু ঈশ্বর তথা পৌত্তলিক উপাসনার প্রবর্তন করে।

ইংল্যাণ্ডের একত্ববাদী আন্দোলনের গভীর প্রভাব আমেরিকাতেও পড়েছিল। ক্যালভিনপন্থী একটি গোষ্ঠীর মাধ্যমে এর সূচনা হয়েছিল। কিন্তু সপ্তদশ শতাব্দী নাগাদ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে ধর্মীয় আশ্রমে পরিণত হয় এবং এ পর্যায়ে ধর্মমতের উপর তত বেশি গুরুত্ব দেয়া হত না। এভাবে ধীরে ধীরে ধর্মীয় পরিবর্তনের পথ উন্মুক্ত হয়। চার্লস চানসী (Charles Chauncy, ১৭০৫-১৭৫৭ সন) ছিলেন বোষ্টনের অধিবাসী। তিনি এক ঈশ্বরে বিশ্বাস স্থাপনের এক সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেন। জেমস ফ্রিম্যানের (১৭৫৯-১৮৩৫ সন) নেতৃত্বে কিংস চ্যাপালের ধর্মীয় সমাবেশ ত্রিত্ববাদ বিষয়ক তাদের অ্যাংগলিকান গির্জার সকল রীতি-নীতি বিলোপ করে। ১৭৮৫ সনে এ ঘটনা ঘটে। এভাবে আমেরিকায় প্রথম একত্ববাদী চার্চের অস্তিত্ব ঘোষিত হয়। প্রিষ্টলির মতবাদ প্রকাশ্যে মুদ্রিত ও বিতরিত হতে থাকে। অধিকাংশ লোকই তা গ্রহণ করে। এর ফল হিসেবে বোষ্টনে একজন ছাড়া সকল যাজক নেতৃবৃন্দ কর্তৃক একত্ববাদ গৃহীত হয়।

সমাপ্ত।
উৎস: Jesus- A Prophet of Islam- by Muhammad Ata ur-Rahim.
ছবি: Wikipedia.