pytheya.blogspot.com Webutation

১১ এপ্রিল, ২০১৪

Begging Bowl: বুদ্ধের বোধিলাভ ও ভিক্ষাবাটি উপাখ্যান।

খ্রী:পূ: ৫ম শতকে হিমালয়ের পাদদেশে তরাই অঞ্চলে শাক্য জাতির বসবাস ছিল। ক্ষত্রিয় বংশে জন্মগ্রহণকারী শুদ্বোধন ছিলেন এই জাতির রাজা আর তার স্ত্রী ছিলেন রানী মায়াদেবী। রানী মায়াদেবী গর্ভবতী হলে সন্তান জন্মদানের সময় পিতৃগৃহের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পথে প্রসব বেদনা শুরু হয়ে গেলে কপিলাবস্তুর নিকটবর্তী লুম্বিনী গ্রামে ৫১৮ খ্রী:পূ: এক পুত্রসন্তান প্রসব করে মৃত্যুবরণ করেন। এই শিশুসন্তানই সিদ্ধার্থ বা গৌতমবুদ্ধ।

বুদ্ধের জন্মস্থান (মায়াদেবী টেম্পল), লুম্বিনী, নেপাল।
মাতা মায়াদেবীর মৃত্যুর কারনে বিমাতা গৌতমী সিদ্ধার্থকে লালন-পালনের ভার নেন। ফলে বিমাতার নামানুসারে তার অপর নাম হয় গৌতম। আবার শাক্যকূলে জন্মগ্রহণ করেন বলে কখনও কখনও তাকে শাক্যসিংহ নামেও অভিহিত করা হয়ে থাকে। যা হোক, সিদ্ধার্থের জন্মের কিছুকাল পরে কপিলাবস্তু নগরে এক সন্যাসী আগমন করেন। তিনি তাকে দেখে ভবিষ্যৎবাণী করেন যে, এই শিশু (সিদ্ধার্থ) ভবিষ্যতে দিগ্বীজয়ী রাজা হবেন নয়ত: হবেন সংসার ত্যাগী এক মহামানব।

সন্যাসীর ভবিষ্যৎবাণীতে শংকিত রাজা শুদ্বোধন সন্তানের নিরাপত্তা ও সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের নিমিত্তে, উঁচু দেয়াল ঘেরা চারটি প্রাসাদ তৈরী করে দেন। কিন্তু চার দেয়ালের অভ্যান্তরে আবদ্ধ জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে সিদ্ধার্থ সন্তুষ্ট ছিলেন না, বরং উঁচু দেয়ালের বাইরের জীবন কেমন তা জানতে তিনি প্রচন্ড আগ্রহী ছিলেন। কোন এক উৎসবের সময় তার আগ্রহের কথা জানতে পেরে রথে চড়ে নগরী ঘোরার এবং আনন্দ করার অনুমতি দেন তার পিতা। প্রথম দিন নগরী ঘুরতে গিয়ে একজন বৃদ্ধ ব্যক্তি, দ্বিতীয়দিন একজন অসুস্থ্য মানুষ, তৃতীয়দিন একজন মৃত ব্যক্তি এবং চতুর্থদিন একজন সন্যাসী দেখে তিনি সারথী ছন্দককে প্রশ্ন করে জানতে পারেন জগত দু:খময়। তিনি বুঝতে পারেন সংসারের মায়া, রাজ্য, ধন-সম্পদ কিছুই স্থায়ী নয়। তখন থেকে তিনি দু:খের কারণ ও তার প্রতিকার অনুসন্ধানে চিন্তিত ও উদাসীন হয়ে পড়েন। 

বুদ্ধের মূর্ত্তি, বোধগয়া।
সিদ্ধার্থর চিন্তাশীলতা ও উদাসীনতার কারণে পিতা শুদ্বোধন তাকে সংসারী করতে ৫০২ খ্রী:পূ: মাত্র ষোল বৎসর বয়সে বিবাহ দেন গোপা নাম্নী এক রাজকুমারীর সাথে। এই গোপা-যশোধরা, বিম্বা, শুভদ্রুকা নামেও পরিচিত। তের বৎসর সংসার যাপনের পর ৪৮৯ খ্রী;পূ: রাহুল নামে তাদের এক পুত্রসন্তান জন্ম গ্রহণ করে। এইসময় সিদ্ধার্থ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে,  যে ধারায় তিনি জীবন-যাপন করছেন তাতে কখনও তিনি সুখী হতে পারবেন না। তখন তিনি বিলাসী জীবন-যাপন ও সংসারের মায়া ত্যাগ করে মুক্তির পথ খুঁজতে রাতের অন্ধকারে প্রাসাদ ত্যাগ করেন। এই সময় তার বয়স ছিল ২৯ বৎসর। 

সত্যের সন্ধানে গৌতম একাধিক সন্যাসীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে বহুস্থানে পরিভ্রমণ করেন। কিন্তু নানাভাবে আত্মপীড়ন, ধ্যান ও কৃচ্ছতা সাধনের পরও তিনি দিব্যজ্ঞান লাভে ব্যর্থ হন। এমনকি অধিক কৃচ্ছতা সাধনের কারণে তিনি মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তেও পৌঁছেছিলেন। এতে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, চরম পন্থা নয় বরং মধ্যপন্থা অবলম্বণই শ্রেয়। কিন্তু তাতে দ্বিমত পোষণ করে তার সঙ্গী সন্যাসগণ তাকে ত্যাগ করে চলে যায়। এসময় গৌতম বর্তমান বুদ্ধগয়ার সন্নিকটস্থ উরুবিল্ব নামক স্থানে নিরঞ্জনা নদীতে অবগাহন করে পাশের এক বটমূলে (অশ্বথ বৃক্ষতলে) কঠোর তপস্যায় লিপ্ত হন। এবার অভীষ্ট অর্জিত হল, তিনি পরমসত্য তথা বোধিলাভ করলেন। তপস্যার ঐ দিনগুলোতে তিনি এক ধরণের ঘোরের মত (ecstatic trance) অনুভব করেছিলেন যা স্থায়ী হয়েছিল সাত সপ্তাহ। আর ঐ দিনগুলোতেই he enjoyed the experiences of deliverance.

কিম্বদন্তি রয়েছে- যে সময় বুদ্ধ উরুবিল্ব আগমন করেন, ঐ সময় সেনানী (Senani) নামক নিকটবর্তী এক গ্রামের এক ধণিক কৃষক পরিবারে সুজাতা নামের এক অপরূপা কুমারী কন্যা বসবাত করত। এই নারী তার উপযুক্ত একজন স্বামী এবং সন্তানের স্বপ্ন দেখছিল। কিন্তু তার আশা পূরণ হচ্ছিল না। লোকেরা তাকে উপদেশ দিল, সে যেন নিরঞ্জনা নদীর তীরস্থ এক নির্দিষ্ট বটবৃক্ষের তলে গিয়ে বৃক্ষদেবতার (tree-god) নিকট কাঙ্খিত স্বামী ও সন্তানের জন্যে প্রার্থনা করে। সে তাদের কথামতই করল, আর খুব শীঘ্রই তার বিবাহ হয়ে গেল। অত:পর যখন তার কোলে এক সন্তান এল, তখন সে ভীষণ খুশী হল এবং বৃক্ষদেবতাকে এই দানের প্রতিদান দিয়ে খুশী করতে চাইল।

সুজাতার এক বিশাল গো-পাল ছিল। সে তখন তার পাল থেকে এক হাজার গাভী বেঁছে নিয়ে সেগুলিকে কয়েকদিন মধু মিশ্রিত খড় খাওয়াল। তারপর তাদের দুধ সংগ্রহ করে ঐ এক হাজার গাভীর মধ্য থেকে উত্তম ৫০০টি বেঁছে নিয়ে তাদের পান করাল। তারপর সেগুলির সংগৃহীত দুধ পান করাল ঐ ৫০০ গাভীর মধ্য থেকে উত্তম ২৫০টিকে। এভাবেই চলল যতক্ষণ না গাভীর সংখ্য দাঁড়াল ৮টিতে। সে এমনটি করেছিল কেবলমাত্র উত্তম স্বাদের অতি পুষ্টিকর দুধ পাবার জন্যে।

যাহোক, আট গাভীর সংগৃহীত দুধ দিয়ে সুজাতা বৃক্ষদেবতার জন্যে পায়েস রান্না করতে বসল এবং তার কয়েকজন ভৃত্যকে পাঠিয়ে দিল ঐ বটগাছের চারিদিকের জঙ্গল ও ঘাস-পাতা পরিস্কার করার জন্যে। এদিকে সে যখন পায়েস রান্না শেষ, ঠিক তখনই তার এক ভৃত্য হন্তদন্ত হয়ে ছূটে এল এবং বলল, ’হে আমাদের কর্ত্রী, আমরা তো দেখে এলাম বৃক্ষদেবতা স্বয়ং বটতলে ধ্যানে বসেছেন। আর আপনি কতই না ভাগ্যবতী যে স্বয়ং দেবতা আপনার দান গ্রহণের জন্যে উপস্থিত আছেন।’ 

এ সংবাদে আগ্রহ ও উত্তেজনা নিয়ে সুজাতা দ্রুত ঐ পায়েস একটা স্বর্ণের বাটি পূর্ণ করে নিরঞ্জনা নদীর তীরস্থ নির্দিষ্ট ঐ বটপানে চলল। তারপর যখন সেখানে পৌঁছিল, সে দেখতে পেল সত্যিই এক সৌম্য-শান্ত, পবিত্র লোক ঐ বটতলে ধ্যানে রয়েছেন। সুজাতা তাকে বৃক্ষদেবতা জ্ঞান করল, কেননা তার জানা ছিল না যে এই তপস্বী দেবতা নন স্বয়ং মহারাজ গৌতম। 

এই স্থানে বুদ্ধ বোধিলাভ করেন।
সুজাতা পায়েসের বাটিটি ধ্যান-মগ্ন গৌতমের সামনে রেখে অতি সাবধানে উপুড় হয়ে (সাষ্টাঙ্গে) সম্মান জানিয়ে প্রার্থনা জানাল, ”প্রভু, আমার এই সামান্য দান গ্রহণ করুন। আমি যেমন সফলতা লাভ করেছি, তেমনি আপনার মনের ইচ্ছেও নিশ্চয় পূর্ণ হবে।” 

সিদ্ধার্থ গৌতম ঐ পায়েস ৪৯ ভাগে ভাগ করেছিলেন, প্রতিদিনের জন্যে একভাগ, যতদিন না তিনি বোধি লাভ করেন।

৪৯তম দিনে বুদ্ধের ধ্যান ভঙ্গ হল। এই দিনগুলিতে তিনি “enjoyed the experiences of deliverance.তিনি শেষবারের মত খাবার খেয়ে তার আসন থেকে উঠলেন এবং নিরঞ্জনা নদীর দিকে স্নানের উদ্দেশ্যে চললেন। তিনি নদীর তীরে গিয়ে পানিতে নামলেন তারপর মূল্যবান ঐ সোনার বাটিটি নদীতে ছুঁড়ে ফেলে বললেন, ”যদি আমি আজ বুদ্ধ হয়ে থাকি, তবে এই বাটি স্রোতের প্রতিকূলে ভেসে যাক, আর যদি না হয়ে থাকি তবে তা অনুকূলে যাক।” - এতে ঐ বাটি নদীর মাঝ বরাবর স্রোতের প্রতিকূলে ভেসে গিয়েছিল। 

এতো গেল বুদ্ধের বোধিলাভের ঘটনা। কিন্তু আমাদের আলোচ্য বিষয় এটি নয়  বরং বুদ্ধের ভিক্ষাবাটি প্রসঙ্গ। এই ভিক্ষাবাটি বৌদ্ধধর্মের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং বুদ্ধের বোধিলাভের সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে এর উপাখ্যান। আর এই উপাখ্যান ও অন্যান্য উপকথা এবং এই বাটির মহৎ সন্যাস ব্যবহারের সাথে সম্বন্বিত হয়ে সাধারণ এক ভিক্ষাবাটিকে বুদ্ধের পার্থিব সম্পদ ও মোহ থেকে বিযুক্তি শিক্ষার প্রতীক (symbol) করে তুলেছে। বুদ্ধের পাথরের ভিক্ষাবাটি তাৎপর্য্য বহন করে পার্থিব উপাদানের এবং তা প্রকাশিত হয়েছে এর ময়ূরপঙ্খীবর্ণে (purple color)। গান্ধারা ধর্মগ্রন্থে বুদ্ধের ভিক্ষাবাটির নিম্নোক্ত উপাখ্যান বর্ণিত হয়েছে- 

                                  পদ্মফুল
বোধিলাভের পর নিরঞ্জনা নদীতে স্নান শেষে বুদ্ধ পাশ্ববর্তী এক বনের মধ্যে এক ডুমুর তলে গিয়ে বসেছিলেন, তখন উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমের রক্ষক দেবতাগণ (Guardians of the Four Quarters, Indra, Yama, Varuna and Kubera) প্রত্যেকে একটা করে স্বর্ণের ভিক্ষাবাটি এনে তার সামনে উপস্থাপন করলেন এই ভেবে যে, জীবন ধারণের প্রয়োজন মেটাতে দান হিসেবে যে খাবার দেবতাগণ তাকে দেবেন, তা একটা ভিক্ষাবাটি ছাড়া আদৌ তিনি সেগুলো গ্রহণ করতে সক্ষম হবেন না। 

কিন্তু, বুদ্ধ ঐ স্বর্ণের ভিক্ষাবাটি গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন এই ভেবে যে, মূল্যবান ঐ পাত্র একজন তপস্বীর জন্যে সম্পূর্ণ বেমানান। তখন ঐ চার দেবতাগণ তুলনামূলক কম মূল্যমানের পাত্র একে একে হাজির করলেন। তবে সবই প্রত্যাখ্যাত হল, যতক্ষণ না তারা পাথরের তৈরী বাটি হাজির করলেন। আর যখন পাথরের ভিক্ষাবাটি গ্রহণে বুদ্ধ সম্মত হলেন, তখন দেবতারা প্রত্যেকেই চাইছিলেন তিনি যেন তার দেয়া বাটিটিই গ্রহণ করেন, যাতে এর দ্বারা ঐ দেবতা সম্মানিত হন। কিন্তু বুদ্ধ কাউকে এককভাবে নয়, বরং তিনি সকলকে সম্মানিত করতে একটি বাটির মধ্যে অপর তিনটিকে একে একে স্থাপন করে অলৌকিক ক্ষমতাবলে সবগুলিকে একটিতে রূপান্তরিত করেন।  

বুদ্ধের ভিক্ষাবাটি।
প্রতিদিন বুদ্ধ ভিক্ষার উদ্দেশ্যে তার এই ভিক্ষাবাটি হাতে নিয়ে দিনের এক নির্দিষ্ট সময়ে বেরিয়ে পড়তেন এবং তার শিষ্য সন্যাসগণ সাঁরিবদ্ধভাবে তার পশ্চাতে তাকে অনুসরণ করতেন। বুদ্ধের সন্যাস আদেশ বিধি মতে, কোন সন্যাসী (monk) হাত পেতে কোন দান গ্রহণ করতে পারেন না। তারা কেবল তাই গ্রহণ করবেন যা তাদের ভিক্ষাবাটিতে প্রদত্ত হবে। আর তাই begging bowl বা alms bowl খুবই সাধারণ একটি বাটি হলেও একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুর (Buddhist monk) প্রত্যাহিক জীবনে তা অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বস্তু। মূলত: এটি তাদের সামান্য কয়েকটি বাসন-কোসনের মধ্যে একটি যা তারা নিজের জন্যে ব্যবহারের অনুমতি প্রাপ্ত। প্রথমিকভাবে এটা একটা ব্যবহার্য বস্তু, পাত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় সাধারণ অনুসারীদের নিকট থেকে দান গ্রহনের নিমিত্তে। বিনয়া (The Vinaya) তে বর্ণনা করা হয়েছে, ভিক্ষুগণ পোড়ামাটি বা লৌহ নির্মিত ছোট, মাঝারী বা বৃহৎ আকৃতির বাটি ব্যবহার করতে পারবেন। পালি (Pali)-তে এই ভিক্ষাবাটিকে বলে পাট্টা (Patta) এবং সংস্কৃতে (Sanksrit) পাত্রা (Patra)।

ভিক্ষাবাটি হাতে বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ।
যা হোক, বুদ্ধের এই ভিক্ষাবাটিটি কিন্তু খুব একটা ছোট নয়, বলা চলে আমাদের মত সাধারণ মানুষের পক্ষে সেটা নিয়ে চলাচল অসম্ভবই বটে, কেননা এর ওজন প্রায় ৩৫০-৪০০ কেজি। আর এর এই বৃহৎ আকৃতি ও ওজনের কারণে আনেকেই এমনটা বিশ্বাস করেন যে, বুদ্ধ ছিলেন আঠারো ফুট উচ্চতার বিশালদেহী এক মানব। যা হোক যা বলছিলাম, বাটিটিকে বাইরে থেকে দেখলে একটিই মনে হয়, কিন্তু উপর থেকে দেখলে অপর তিনটির উপস্থিতি সুস্পষ্ট নজরে আসে। সবুজাভ ধূসর গ্রানাইট পাথরের তৈরী অর্ধাগোলাকার এই বাটির ব্যস ১.৭৫ মি. উচ্চতা প্রায় ০.৭৫ মি.। আর এর প্রান্তের দিকের পুরুত্ব প্রায় ১৮ সে.মি. যদিও এটির মাঝের অংশ এবং তলা তুলনামূলকভাবে বেশী পুরু। এতে কোন জোঁড়ের চিহ্ন নেই, তবে প্রান্তের দিকে হাতের তালুর মত খাঁজ দৃশ্যমান। সুক্ষ্ম পদ্ম পাঁপড়ির নকশা বাটালির সাহায্যে খোঁদাই করা হয়েছে এর তলদেশের চারিদিকে। দেখে মনে হবে যেন পুরো বাটিটি বসান হয়েছে একটা পদ্মফুলের উপর। বাটির তলদেশে পদ্মের পাপড়ির নকশা মূলত: বুদ্ধের অতীত সত্যায়ণ করছে। এই ভিক্ষাবাটিটিকে বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ (Mahaparinirvana) বা মৃত্যুর পর হাজার বৎসর ধরে বৌদ্ধধর্ম অবলম্বীগণ মহা শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে গণ্য করে এসেছে। 

কাবুল জাতীয় জাদুঘর, আফগানিস্থান।
বাটিতে পদ্ম পাঁপড়ির নকশা কিন্তু সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির জন্যে করা হয়নি বরং এটি ব্যবহৃত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ এক ধর্মীয় প্রতীক হিসেবে। বুদ্ধধর্মে ফুটন্ত পদ্ম প্রতীক নির্দেশ করে সম্পূর্ণ পবিত্রতায় শরীরের, বাক ও মনের এবং সর্বতোভাবে মুক্তির কার্য্যাবলীর পরিস্ফুটন। এই পদ্মফুল অবশ্য বৌদ্ধধর্মপথের আরও অনেক দিকই নির্দেশ করে, যেমন- এটা জন্ম নেয় পঙ্কিলে (samsara), উঠে আসে পরিস্কার পানির মধ্যে দিয়ে (purification), এবং এভাবে গভীর থেকে উঠে এসে একটা সুন্দর ফুল উৎপন্ন করে (enlightenment)। অন্যভাবে বলা যায়, the white blossom represents purity, the stem stands for the practice of Buddhist teachings which raise the mind above the (mud of) worldly existence, and gives rise to purity of mind. একটা ফোঁটা পদ্ম (open blossom) তাৎপর্য বহন করে পূর্ণ আলোকিত হওয়ার (full enlightenment)। অন্যদিকে কূঁড়িপদ্ম বোঝায় আলোকিত হওয়ার সম্ভাবনা (potential for enlightenment)।

Alexander Cunningham. 
ছড়ানো ছিটানো জটিল সূদীর্ঘ ইতিহাস থেকে এতটুকু জানা যায় যে, বৈশালী শহরের মধ্য দিয়ে কুশীনগরে (Kusinara) যাবার পথে বুদ্ধ তার ভিক্ষাবাটিটি স্থানীয় অধিবাসীকে দান করেছিলেন। এটি সেখানকার এক আশ্রমের প্রবেশদ্বারে রক্ষিত হয়েছিল। ভারতে ফল প্রদানকারী বৃক্ষের প্রথম উৎপাদিত ফল দান করার প্রথা প্রচলিত ছিল। বৈশালীবাসী আশ্রমে রক্ষিত ঐ ভিক্ষাবাটিতে এইসব ফল দান করত। 

প্রথম বা দ্বিতীয় শতাব্দীতে রাজা কনিস্ক বৈশালী আক্রমণ করে এই ভিক্ষাবাটিকে পুষ্পপুরায় (বর্তমানে পাকিস্তানের পেশোয়ারে) নিয়ে যান। চীনা তীর্থযাত্রী দল এটি সেখানে তৃতীয় ও নবম শতাব্দীর মাঝে দেখেছে বলে উল্লেখ আছে। গান্ধারা চিত্রের অসংখ্য শিল্পকর্ম বিশেষত: পদ্ম পাঁপড়ির উপর বুদ্ধের মূর্ত্তি এই বাটির গুরুত্ব সত্যায়ণ করে। ইসলামিক শাসনামলে মুসলিমগণ এই বাটির মর্যাদা ও পবিত্রতা অনুধাবণ করে। ফলে এটি এক স্থান (বা কোন মসজিদ) থেকে অন্যত্র স্থানান্তরের কাজ চলে যতক্ষণ না পর্যন্ত সেটি বর্তমান আফগানিস্থানের কান্দাহারের সীমান্ত অঞ্চলে অবস্থিত সুলতান ওয়েজ বাবার মাজার তথা সমাধি শিয়রে স্থাপিত না হয়। সম্ভবত: এই স্থানান্তর চলাকালীন কোন এক সময় এর অভ্যান্তর ও বহির্ভাগের পরিধি জুড়ে আনুভূমিকভাবে ছয় সাঁরি কোরআনের আয়াত খোঁদিত হয়। যা হোক, এটি ওয়েজ বাবার মাজারে কখন পৌঁছেছিল তা জানা যায় না, তবে উনিশ ’শ শতকে কিছু ব্রিটিশ অফিসার এটিকে সেখানে দেখেছে বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। এই অফিসারদের একজন বাটিতে খোঁদিত বাণী অনুবাদের চেষ্টা চালান এবং অপর একজন Alexander Cunningham, trying to trace its history.   

কাবুল জাতীয় জাদুঘরে বুদ্ধের ভিক্ষাবাটি।
আশির দশকের শেষ দিকে, আফগানিস্থানে গৃহযুদ্ধ চলাকালে প্রেসিডেন্ট নজিবুল্লাহ ভিক্ষাবাটিটিকে কাবুলের জাতীয় জাদুঘরে নিয়ে যান। যখন তালেবান ক্ষমতায় এল, তখন তালেবান মিলিশিয়া সর্বেচ্চ নেতা মোল্লা মোহাম্মদ ওমর এমন একটি ডিক্রি জারী করেন- "Based on the verdict of the clergymen and the decision of the supreme court of the Islamic Emirate (Taliban) all the statues around Afghanistan must be destroyed." এতে যদিও জাদুঘরে রক্ষিত সমস্ত বৌদ্ধ শিল্পকর্ম ধ্বংস করা হয়েছিল, তথাপি বুদ্ধের এই ভিক্ষাবাটিটি অক্ষত রয়ে যায়। নি:সন্দেহে এটি রক্ষা পেয়েছিল এতে খোঁদিত কোরআনের আয়াতের কারণে। বর্তমানে এই ভিক্ষাবাটি কাবুল জাতীয় জাদুঘরের প্রবেশ পথে প্রদর্শিত হচ্ছে as a reflection of its Islamic continuum and its status through the ages as an object of special religious interest.

সমাপ্ত।