pytheya.blogspot.com Webutation

১৭ জানুয়ারী, ২০১৬

Satan: ইসলামিক থিয়োলজিতে ভূমিকা।

বিশ্বজগৎ সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহ ফেরেস্তাদেরকে এবং মানব সৃষ্টির পূর্বে জ্বিণ জাতিকে সৃষ্টি করেন। মূলত:স্রষ্টা খোদা সর্বপ্রথম বিশেষ কিছু ফেরেস্তা সৃষ্টি করেন যারা অতি পুতপবিত্র, অতি মহৎ। তাদের একদল খোদার নির্দেশে লওহে মাহফুজে এক কিতাব লিপিবদ্ধের কাজ শুরু করে এবং অপরদল তার রক্ষণাবেক্ষণে নিয়েজিত হয়। আর লিখিত ঐ কিতাব অনুসারে লিপিকার ফেরেস্তাগণ পরপর মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে অস্তিত্বহীনতা থেকে অস্তিত্বে নিয়ে আসে মহাবিশ্বগুলোকে। এভাবে সৃষ্টি হয় সাতটি মহাবিশ্বের (সাত আসমান) একটার পর একটা।

তারপর যখন কিতাবে লিখিত খোদার নির্দেশমত মহাবিশ্বগুলো একের পর এক নিয়মিত হয়, [তবে, ডাইমেনশনালিটিজ, স্থান-কালের টপোলজি, পদার্থ ও শক্তির ধরণ বা physical laws ও physical constants, ইত্যাদি নিম্নতম মহাবিশ্ব তথা আমাদেরটি থেকে ভিন্ন হওয়াই স্বাভাবিক, কারণ বাকীগুলোতে কেবল Celestial Being এর বসবাস।] তখন সেগুলোতে খোদা তাঁর নির্দেশ কার্যকরী করতে আপরাপর ফেরেস্তাকূল সৃষ্টি করেন। তারপর সর্বনিম্ন বা আমাদের মহাবিশ্বের সৌরজগৎগুলোর, প্রাণসৃষ্টির উপযোগী গ্রহগুলোতে খোদার নির্দেশ বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে সংশ্লিষ্ট ফেরেস্তাগণ। 


আর যখন আমাদের সৌরজগতের পৃথিবী নামক গ্রহে পানি সৃষ্টি হল, তখন সেই পানি থেকে বের করে আনা হল প্রাণ। অত:পর সেখানে বিবর্তণের মাধ্যমে সৃষ্টি করা হল প্রয়োজনীয় (প্রয়োজনীয় বললাম একারণে যে, যতধরণের সৃষ্টি করা যেত, তার সব করা হয় নি। যেমন- সবকিছু মজুদ আছে আমাদের কাছে, প্রয়োজন ছাড়া আমরা তা নীচে প্রেরণ করিনে।-(১৫:২১) উদ্ভিদ ও প্রাণীকূল। 


অত:পর খোদা লু এর আগুণ থেকে জ্বিণ সৃষ্টি করে তাদেরকে আমাদের মহাবিশ্বে বসবাস করতে দেন। অার যখন জ্বিণ জাতি অনাচারে এ ভূবন ভরিয়ে তুলল, তখন খোদার নির্দেশে দুষ্টুদেরকে ধ্বংস করতে শুরু করেন ফেরেস্তাগণ এবং ঐসময় জ্বিণজাতি ছড়িয়ে পড়ে এ মহাবিশ্বের সর্বত্র।


যা হোক, ঐ ধ্বংসযজ্ঞ থেকে কিছু জ্বিণ রক্ষা পেয়েছিল। এদেরই একজন আযাযিল (Azazyl)। তার পিতার নাম ছিল খবীশ এবং মাতা নিবলীস। ছোটবেলা থেকেই সে অতিশয় মেধাবী এবং স্মৃতিশক্তি সম্পন্ন ছিল। যা সে একবার দেখত বা শুনত, তা চিরদিনের জন্যে মনে রাখতে পারত। এই আযাযিলই পরবর্তীতে হয়ে যায় ইবলিস (Iblis)। The word Iblis means "to despair" and Azazel despaired of the Mercy of God, thus earning him that title.


মুনসূর আল হাল্লাজের মতে- The name of Iblis was derived from his first name, Azazyl in which were changed: the ‘ayn representing the amplitude of his endeavor, the zay, representing the growing frequency of his visits, the alif - his way in His rank, the second zay - his asceticism in His rank, and the ya- his wandering walk to his agony, and lam -his obstinacy in his pain -(Kitab at-Tawasin by Mansur al-Hallaj).


আযাযিল দুনিয়াতে এক হাজার বৎসর আল্লাহর এবাদত করল। এবাদতে তার একাগ্রতা ও নিষ্ঠা দেখে ফেরেস্তাগণ অবাক হল। আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়ে তাকে জ্বিণ জাতির সর্দার করে দিলেন। এভাবে আযাযিল তার ৭০ হাজার বৎসর এবাদতের দ্বারা অনেকগুলি গুণবোধক নাম অর্জন করেছিল। যেমন- ‘খাশে’,‘আবেদ’, ‘অলী’,‘সালেহ’ ইত্যাদি এবং এর সবগুণিই ফেরেস্তাদের দেয়া। এভাবে সে উর্দ্ধ আকাশে অবাধ বিচরণের সৌভাগ্য অর্জন করেছিল। তার এতসব অর্জনের মূলে ছিল তার নিরলস শ্রম ও নিষ্ঠা। দিনের একাংশ সে দুনিয়ার জ্বিণদের সৎপথ প্রদর্শণে ব্যয় করে অবশিষ্ট সময়টা আল্লাহর এবাদতেই অতিবাহিত করত।


যা হোক, দুনিয়া জ্বিণজাতি মুক্ত হলে খোদা মানব সৃষ্টির পরিকল্পণা করলেন। সুতরাং তিনি ফেরেস্তাদেরকে সমবেত হতে নির্দেশ দিলেন। তারা তৎক্ষণাৎ সমবেত হল। কিন্তু তারা বুঝতে পারছিল না কেন এই সমাবেশ, তাই পরস্পর ফিসফিস কথাবার্তা (-৩৮:৬১) ও আলোচনা করতে লাগল। অতঃপর আল্লাহ সমবেত ফেরেস্তাদেরকে তাঁর পরিকল্পণার কথা জানালেন। তিনি বললেন, ‘আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি সৃষ্টি করতে যাচ্ছি।’-(১৫:২৮)


ইতিপূর্বে ফেরেস্তাগণ জ্বিণ জাতির অভিজ্ঞতা লাভ করেছিল। সুতরাং তারা বলল, ‘আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যে অশান্তি ঘটাবে ও রক্তপাত করবে? আমরাই তো রয়েছি আপনার পবিত্র মহিমা ঘোষণা করার জন্যে।’ 

তিনি বললেন, ‘আমি যা জানি তোমরা তো তা জান না। সুতরাং অমি ছাঁচে ঢালা শুকনো মাটি হতে মানুষ সৃষ্টি করছি, যখন আমি তাকে সুঠাম করব এবং তার মধ্যে আমার রূহ সঞ্চার করব, তখন তোমরা তাকে সিজদা করবে।’-(১৫:২৮-২৯).

অত:পর আল্লাহ ফেরেস্তাদেরকে মাটি সংগ্রহের জন্যে নির্দেশ দিলেন। প্রধান ফেরেস্তাদের মধ্যে জিব্রাইল, মিকাইল ও ইস্রাফিল ব্যর্থ হল, কেননা জমিন তাদেরকে খোদার কসম দিয়ে মাটি নিতে নিষেধ করেছিল। কিন্তু অাজ্রাইল গিয়ে মটি সংগ্রহ করে নিয়ে এল।সে জমিনকে বলেছিল, ‘তুমি যার কসম দিচ্ছ আমি তাঁর আদেশে
ই এসেছি। সুতরাং মাটি না নিয়ে আমি ফিরে যাচ্ছিনে।’ অত:পর আল্লাহ প্রথম মানব আদমকে ঐ মাটি থেকে সৃষ্টি করলেন। বুক অব চামিস জানায়- 


The four most exalted angels, Gabriel, Michael, Israfil, and Azrail, were commanded to bring from the four corners of the earth the dust out of which Allah formed the body of Adam, all save the head and heart. For these He employed exclusively the sacred earth of Mecca and Medina, from the very spots on which, in later times, the holy Kaaba and the sepulchre of Mohammed were erected.--(Book of Chamis)


আদমের শরীর যখন সুঠাম হল, তখন আল্লাহ ফেরেস্তাদেরকে নির্দেশ দিলেন, ‘তার রূহ আন।’-ইতিপূর্বে তিনি আদমের রূহ সৃষ্টি করে তা ফেরেস্তাদের তত্ত্বাবধানে রেখেছিলেন।

ফেরেস্তাগণ একটি নূরের আধারে ঐ রূহ এনে আদমের শির পার্শ্বে রাখল। আল্লাহ রূহকে আদেশ করলেন, ‘এই দেহে প্রবেশ কর।’

এই আদেশের পর রূহ কয়েকবার আদমের দেহের চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ শেষে নাসিকা পথে দেহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করল। তৎক্ষণাৎ আদম চোখ মেলে চাইল এবং হাঁচি দিয়ে উঠে বসতে চেষ্টা করল। ফেরেস্তাগণ তা দেখে বলল, ‘নিশ্চয় এই বান্দা ত্বরাপ্রবণ হবে।’

প্রকৃতপক্ষে ফেরেস্তাদের ধারণাই ছিল সঠিক। আল্লাহ মানুষকে ত্বরাপ্রবণ করেই সৃষ্টি করেছেন। কোরআনেও এর প্রমান পাওয়া যায়- সৃষ্টিগত ভাবে মানুষ ত্বরা প্রবণ। -(২১:৩৭).

আদম উঠে বসল। উপস্থিত ফেরেস্তাগণ আদমকে সম্মান প্রদর্শণ করল।আর আদম তার চারিদিকে সমবেত ফেরেস্তাদেরকে এক নজর দেখে নিয়ে বলল, ‘সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর।’

আল্লাহ বলেন, ‘তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক।’

অন্যদিকে এ বিষয়ে  Book of Chamis জানায়- আমাদের কাছে যে তথ্য এসেছে তা থেকে এতটুকু জানা যায় যে, আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছিল শুক্রবার বিকেলে, আছরের ওয়াক্তে।


..Adam's beautiful form excited the admiration of the angels who were passing by the gates of Paradise, where Allah had laid it down. iblis said, to his fellows, "How can this hollow piece of earth be well pleasing in your sight? Nothing but weakness and frailty may be expected of this creature." When all the inhabitants of heaven, save Iblis, had gazed on Adam in long and silent wonder, they burst out in praises to Allah, the creator of the first man...


Allah then directed the angels to bathe the Soul of Adam, which he had created a thousand years before his body, in the sea of glory which proceedeth from himself, and commanded her to animate his yet lifeless form. The Soul hesitated, for she was unwilling to exchange the boundless heavens for this narrow home; but Allah said, "Thou must animate Adam even against thy will; and as the punishment of thy disobedience, thou shalt one day be separated from him also against thy will."


Allah then breathed upon her with such violence that she rushed through the nostrils of Adam into his head. On reaching his eyes, they were opened, and he saw the throne of Allah, with the inscription, "There is out one GOD, and Mohammed is his Messenger."


The Soul then penetrated to his ears, and he heard the angels praising Allah; thereupon his own tongue was loosed, and he cried, "Blessed be thou, my Creator, the only One and Eternal!" and Allah answered, "For this end wast thou created; thou and thy descendants shall worship me; so shall ye ever obtain grace and mercy." -(Book of Chamis)


আদমকে সৃষ্টির পর আল্লাহ তাকে আসমানের এক উদ্যানে বাস করতে দিয়েছিলেন। আদম ঘুরত ফিরত খুশীমত খাওয়া-দাওয়া করত। এসময় আল্লাহ তাকে তাঁর তত্ত্বাবধানে যাবতীয় কিছুর নাম শিক্ষা দিতে লাগলেন। আর এ বিষয়ে Book of Chamis জানায়- All created things were then assembled before Adam, and Allah taught him the names of all beasts, of birds, and of fish; the manner in which they are sustained and propagated, and explained their peculiarities, and the ends of their existence.-(Book of Chamis.) Finally, God
 showed to Adam every future generation, with their heads, sages, and scribes. He saw that David was destined to live only thirty years, and said, "Lord and Creator of the world, is this unalterably fixed?" 

The Lord answered, "It was my original design!"
"How many years shall I live?"
"One thousand,"
"Are grants known in Heaven?"
"Certainly!"
"I grant, then, seventy years of my life to David!"

What did Adam therefore do? He gave a written grant, set his seal to it, and the same was done by the angel Gabriel & Michael.—(Midrash Jalkut, p. 12). Thus, nine hundred and thirty years was the lifetime of Adam, -(Gen., 5: 3).


তার এবাদতের জন্যে আসমানে একটি গৃহ (বায়তুল মামুর) নির্মাণ করে দিয়েছিল ফেরেস্তারা। ফেরেস্তাদের সাথে সে সেখানে এবাদত করত এবং অবসরে তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলত। কিন্তু ফেরেস্তাগণ তো সর্বদা আল্লাহর নির্দেশ পালনে ব্যতিব্যস্ত এবং তাঁর এবাদতে মশগুল থাকত, তাই প্রায়ই আদম নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ত। আল্লাহ তো মহাজ্ঞানী, তিনি তার নিঃসঙ্গতা দূর করতে হাওয়াকে তার বাম পাঁজরের হাঁড় থেকে সৃষ্টি করলেন, যেন তিনি একজন সঙ্গী পান, যে সঙ্গী সর্বদা তার মনোরঞ্জন করবে, তাকে উৎফুল্ল ও আনন্দে ভরে রাখবে। যেমন- তিনি আদমকে সৃষ্টি করলেন ও তার থেকে তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেন যেন সে তার কাছে শান্তি পায়।’ -(৭:১৮৯).

হাওয়াকে আল্লাহ যখন সৃষ্টি করলেন, তখন আদম নিদ্রামগ্ন ছিল। সে ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখতে পেল তার মাথার পাশে বসে রয়েছে এক রমনী যে তার মুখের দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে। ঐ রমনীর সুন্দর মুখশ্রী এবং টানা টানা চোখের মাদকতা ভরা চাহনিতে আদম আকৃষ্ট হল। সে উঠে বসল এবং অবাক হয়ে ঐ নারীর সৌন্দর্য অবলোকন করতে লাগল। কারণ এমন সৃষ্টি সে তো পূর্বে দেখেনি। 


হাওয়ার সৃষ্টি সম্পর্কে Book of Chamis জানায়-Allah presented him, through Gabriel, with a bunch of grapes from Paradise, and when he had eaten them he fell into a deep sleep. The Lord then took a rib from Adam's side, and formed a woman of it, whom he called Hava [Eve], for he said, I have taken her from (hai) the living.She bore a perfect resemblance to Adam; but her features were more delicate than his, and her eyes shone with a sweeter luster, her hair was longer, and divided into seven hundred braids; her form was lighter, and her voice more soft and pure.


While Allah was endowing Eve with every female charm, Adam was dreaming of a second human being resembling himself. Nor was this strange, for had he not seen all the creatures which had been presented to him in pairs? -(Book of Chamis.)


যে আদম ইতিপূর্বে আগ্রহ নিয়ে ফেরেস্তাদের সঙ্গে কথাবার্তায় সময় কাটাত, সে এখন এই নারীকে নিয়ে বিভোর হয়ে পড়ল। এই সময় এক ফেরেস্তা ঐ নারীকে দেখে এবং আদমের এই পরিবর্তণে অবাক হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘হে আদম, এ কে?’

আদম উত্তর দিল, ‘এর নাম হাওয়া (Living Things)।’
ফেরেস্তা - ‘তার নাম এমন কেন?’
আদম - ‘তাকে আমার থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং আমি তো জীবন্ত (Living Being)।’

এ পর্যায়ে আমরা ফেরেস্তা, জ্বিণ ও ইনসানের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো জেনে নেই পুরো বিষয়টি ভালভাবে বোঝার সুবিধার্থে। আর এ কথাও ঠিক যে, খোদার যাবতীয় সৃষ্টির মধ্যে ফেরেস্তা, জ্বিণ ও মানব বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কেননা কিতাব অনুসারে অনুমিত হয় এ তিনটি জাতিকেই কেবল তিনি নিজে (প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে) সৃষ্টি করেছেন, বাকী সবকিছু হয়েছে বা হচ্ছে লিখিত কিতাবে দেয়া তাঁর আদেশ অনুসারে অর্থাৎ সেসব সৃষ্ট তাঁর পরোক্ষ অংশগ্রহণে। এ কারণে কোরআনে বলা হয়েছে- খোদা আসমান ও জমিনের স্রষ্টা। আর যখন তিনি কোন কিছু সৃষ্টি করতে চান, তখন শুধু বলেন “হও” আর তা হয়ে যায়। -(২:১১৭) 


জ্বিণ ও ইনসানকে স্বাধীন করে সৃষ্টি করা হয়েছে অর্থাৎ তারা খোদার আদেশ নিষেধের বিপরীতে কাজ করতে পারে এবং এই কারণে তারা বিচারের অধীন বলা হয়েছে। অন্যদিকে ফেরেস্তাগণ খোদার আদেশ নিষেধের বাইরে কাজ করতে পারে না, ফলে তারা বিচারের অধীনও নয়। তাছাড়া ফেরেস্তাগণ যেমন লিঙ্গভিত্তিক নয়, তেমনি নয় জন্ম-মৃত্যুর অধীন- যেমনটা জ্বিণ ও মনুষ্যজাতি। 


ফেরেস্তাগণের যারা দৃশ্যলোকে কাজ করে তাদের অদৃশ্যলোকে যাবার ক্ষমতা নেই। তাদের যাতায়াতের শেষ সীমানা হল ৪র্থ আসমান বা ৪র্থ মহাবিশ্বের প্রান্তে অবস্থিত সিদরাতুল মুনতাহা।সিদরা অর্থ বরইকুল আর মুনতাহা অর্থ শেষ সীমানা। এ কারণে নবীজীর মেরাজে গমন কালে জিব্রাইল এ পর্য়ন্ত এসে তার অপরাগতা প্রকাশ করেছিল। এ প্রান্তবর্তী সিদরা বৃক্ষের পত্রে দুনিয়ার কাজে নিয়োজিত ফেরেস্তাগণ স্বর্ণবর্ণের ফড়িং এর মত করে জড়িয়ে থাকে। 


যা হোক, সৃষ্ট মহাবিশ্বগুলোতে খোদার বিভিন্ন নির্দেশ বাস্তবায়নে লক্ষ কোটি ফেরেস্তা নিয়োজিত থাকলেও প্রধান ফেরেস্তা মাত্র চারজন-


জিব্রাইল: বার্তা বাহকের কাজে নিয়োজিত।

মিকাইল: মেঘ, বৃষ্টি, চন্দ্র, সূর্য্য তথা এ মহাবিশ্ব পরিচালনার কাজে নিয়োজিত।
আজ্রাইল: প্রাণ সংহরণের কাজ নিয়োজিত, এবং
ইস্রাফিল: শিঙ্গা মুখে সমস্ত সৃষ্টি ধ্বংসের জন্য খোদার আদেশের অপেক্ষায় রত।

দৃশ্যমান বা বস্তুজগতে সকল পদার্থের ক্ষুদ্রকণা হল পরমাণু। একটা নির্দিষ্ট ফিকোয়েন্সিতে এসকল পরমাণু একত্রিত হয়ে বস্তুর অস্তিত্ব প্রকাশ করেছে। আর দৃশ্যমান জগতের সকল বস্তু বা প্রাণীর দৃশ্যমান উপস্থিতি কেবলমাত্র ৩৯০-৭০০nm ফ্রিকোয়েন্সি সীমায় অবস্থিত। মাটির তৈরী মানুষও এর বাইরে নয়। অন্যদিকে আগুণে সৃষ্ট জ্বিণজাতি [‘এবং জ্বিণকে ’লু এর আগুনের দ্বারা সৃষ্টি করেছি।-(১৫:২৭)] ও নূরের সৃষ্ট ফেরেস্তাগণ এই ফিকোয়েন্সি সীমার বাইরের কোন নির্দিষ্ট ফিকোয়েন্সি দিয়ে সৃষ্ট, ফলে তারা দৃশ্যমান নয়। তবে তারা উভয় ফিকোয়েন্সি সীমায় যাতায়াত করতে পারে। 


গঠনগত দিক ছাড়াও জ্বিণ ও ফেরেস্তার মধ্যে কিছু বিশেষ পার্থক্য রয়েছে। জ্বিণ একজোড়া ডানা বা পাখাবিশিষ্ট কিন্তু ফেরেস্তাদের পাখার সংখ্যা সুনির্দিষ্ট নয়। কোলআনে বলা হয়েছে-(ফেরেস্তা) ‘দুই, তিন কিংবা চার জোড়া পক্ষ বিশিষ্ট।’-(৩৫:১)। তাছাড়া ফেরেস্তাগণ দৃশ্যমান জগতের যে কোন বস্তু বা প্রাণীর রূপধারণ বা নিজেকে তাতে রূপান্তরিত করতে পারে। অন্যদিকে জ্বিণ ফেরেস্তা ব্যতিত সকল কিছুর রূপ ধারণ করতে পারলেও কোন প্রানী বা বস্তুতে নিজেকে রূপান্তরিত করতে পারে না। এ কারণে তারা প্রয়োজনে অন্যের শরীরে ভর করে।


আর দৃশ্যমান প্রতিটি বস্তুর ফ্রিকোয়েন্সি তাদের জানা থাকায়, তারা ইচ্ছে করলে ম্যাটার ট্রান্সমিশনের মত করে আইফেল টাওয়ারটি মুহূর্তেই ঢাকার গাবতলীতে এনে বসিয়ে দিতে পারে। সেবার রানী বিলকিসের সেই বিশাল সিংহাসনটা নবী শলোমনের উপদেষ্টা জ্বিণ এভারেই এনে হাজির করেছিল তার সম্মুখে। যেমন-


শলোমন আরও বলল, ‘হে আমার পরিষদবর্গ! তারা আমার কাছে আত্মসমর্পন করতে আসার পূর্বে তোমাদের মধ্যে কে তার সিংহাসন আমাকে এনে দেবে?’

এক শক্তিশালী জ্বিণ বলল, ‘আপনি আপনার স্থান থেকে ওঠার আগেই আমি তা এনে দেব। এ ব্যাপারে আমি এমনই শক্তি রাখি। আর আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন।’
কিতাবের জ্ঞান যার ছিল সে বলল, ‘আপনি চোখের পলক ফেলার আগেই আমি তা এনে দেব।’ -(২৭:৩৮-৪০)

আবার যেহেতু জ্বিণজাতি দৃশ্যমান জগতের সকল বস্তুর ফিকোয়েন্সি জানে, তাই তারা বস্তু বা প্রাণীর ফিকোয়েন্সিতে অতি নগণ্য পরিমাণে পরিবর্তণ এনে বা তাকে বেষ্টন করে এক ফিকোয়েন্সি জাল (মায়াজাল) সৃষ্টির মাধ্যমে, তাকে সাময়িক পরিবর্তিত রূপদান, পরিবর্তিত আকারে উপস্থাপন বা তাকে সাময়িক অদৃশ্যমান করে দিতে পারে। নবী শলোমনের উপদেষ্টা জ্বিণ এভাবেই বিলকিসের সিংহাসনে সামান্য পরিবর্তণও এনেছিল। যেমন-


যখন তা সামনে রাখা দেখল, তখন (শলোমন) বলল, ........‘তার সিংহাসনের আকৃতিতে সামান্য পরিবর্তণ আনো; দেখি সে চিনতে পারে- নাকি ভুল করে।’ -(২৭:৪১)


আর এ সামান্য পরিবর্তনের কারনে বুদ্ধিমতী বিলকিস দাবী করেননি ঐটি তার সিংহাসন, কিন্তু তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সেটি তারই। আর তাই শলোমনের প্রশ্নের প্রদত্ত উত্তরে তার ঐ মনোভাবের প্রতিফলন ঘটেছিল-তার উত্তর হ্যাঁ- না দু’টোই মিন করেছিল। যেমন- 


(বিলকিস) যখন পৌঁছিল তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হল, ‘তোমার সিংহাসন কি এ রকম?’

সে বলল, ‘এ তো এ রকমই। ...।’-(২৭: ৪২)

তাছাড়া শলোমন সাময়িকভাবে সিংহাসনচ্যূত হন জ্বিণ চখরের কারসাঁজিতে। সে তার শরীরকে বেষ্টন করে এক মায়াজাল (ফিকোয়েন্সি জাল) সৃষ্টি করেছিল, ফলে এমনকি তার স্ত্রী আমিনাও তাকে চিনতে না পেরে অস্খীকার করে। 


কি আছে লওহে মাহফুজের কিতাবে? কোরআনে বলা হয়েছে- নিশ্চয় এটা সম্মানিত কোরআন, যা আছে এক গোপন কিতাবে।-(৫৬:৭৭-৭৮) এটা লিখিত আছে সম্মানিত, উচ্চ পবিত্র পত্রসমূহে, লিপিকারের হস্তে, যারা মহৎ পূত চরিত্র।-(৮০:১৩-১৬) নিশ্চয় এ কোরআন আমার কাছে সমুন্নত অটল রয়েছে লওহে মাহফুজে।-(৪৩:৪) আকাশ ও পৃথিবীতে এমন কোন গোপন ভেদ নেই যা না আছে ঐ কিতাবে।-(২৭:৭৫)   


কিতাবে সবকিছুই লিপিবদ্ধ রয়েছে, কেবল নে
ই স্বাধীন করে সৃষ্ট মানব ও জ্বিণের আমলনামা, তবে তাদের আয়ূস্কাল অর্থাৎ জন্ম ও মৃত্যুর ক্ষণ এবং জন্মপথ তাতে লিপিবদ্ধ আছে।জন্মপথ হচ্ছে জন্মক্ষণ ও মৃত্যুক্ষণের মধ্যবর্তী সময়কালের মধ্যে প্রকৃতির সাথে সংযুক্ত মাকড়সার জালের মত ছড়িয়ে থাকা একমুখী পথ। [যারা ‘হাউস অব ডেড’ গেমটি খেলেছেন তারা বিষয়টি ভালভাবে বুঝতে পারবেন] সময়ের সাথে কমতে থাকা এই পথে ব্যক্তি বিশেষের অবস্থান পুরোপুরি ব্যক্তির কথা ও কর্ম নির্ভর। আর ব্যক্তি তার কথা ও কর্মের সিদ্ধান্তগুলো নেয় তার নিজের বিবেক বা প্রবৃত্তির প্ররোচনায়। আর ব্যক্তির প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি জ্বিণজাতির হাতে। এ ক্ষমতা তাদেরকে দেয়া হয়নি বরং তারা এটা পেয়েছে তাদের সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্যের কারণে।


ব্যক্তির কথা ও কর্মের সিদ্ধান্ত ব্যক্তির নিজের তাই সেসবের কিছুই লওহে মাহফুজের কিতাবে লেখা নেই (ব্যতিক্রম কেবল খোদার নির্বাচিত দাস )। তাই এসব (আমল) লিপিবদ্ধ করে দু’জন ফেরেস্তা। আর যে খাতায় তারা তা লিপিবব্ধ করে তা লওহে মাহফুজেরই এক খুঁদে সংস্করণ যাতে রয়েছে ব্যক্তির জীবনপথের ছাপ। 


আবার যেহেতু ব্যক্তির প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণ ইবলিসের আয়ত্বধীন, তাই যখন ব্যক্তির প্রজ্ঞা কম, তখন ইবলিস তার বিবেককে সাময়িক আড়াল করে ঐ ব্যক্তির কথা ও কর্ম নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে ব্যক্তির প্রজ্ঞা যখন বেশী হয় তখন তা বিবেককে জাগিয়ে তোলে, ফলে প্রবৃত্তিকে দাবিয়ে রেখে সহজেই সে ব্যক্তির কথা ও কর্মকে নিয়ন্ত্রণ করে। [আর এ থেকে সহজ অনুমেয় কেন মুসলমানের জন্য জ্ঞান অর্জন করা ফরজ। কারণ কেবলমাত্র জ্ঞান শিক্ষার দ্বারাই তারা ঐশ্বরিক কিতাবের সঠিক অর্থ এবং সর্বিক গাইডলাইন বুঝতে পারবে এবং মানুষের উপর ক্ষমতাবান ও ধূর্ত ইবলিসকে এড়িয়ে চলতে পারবে।] 


অন্যদিকে ব্যক্তির কর্ম প্রভাব সরাসরি প্রকৃতির সাথে যুক্ত এবং সমগ্র মানবমন্ডলির কর্মপ্রভাব পুরো প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। কোন নির্দিষ্ট এলাকার মানবগোষ্ঠেীর কর্মপ্রভাব যখন প্রকৃতিকে মূলকিতাবের নির্ধারিত সীমাকে অতিক্রম করায়, তখন নতুন নতুন আত্মার জীবনপথ সংযুক্ত হতে থাকে কিতাবে অথবা মহাবিশ্ব পরিচালনাকারী ফেরেস্তাগণ সুনির্দিষ্ট নির্দেশ পায় প্রয়োজনীয় কর্ম সম্পাদনের যা প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে নির্ধারিত সীমায় রাখবে। সার সংক্ষেপে বলা যায়- Man possesses four unique qualities over angels: knowledge, Trust, Having multiple goals and free will and accountability. আর সবচেয়ে বড় বিষয় হল মানুষ দুনিয়াতে খোদার প্রতিনিধি, সবকিছুর 
নচার্জ। তাদের কথা ও কাজকর্মের প্রভাব সম্পূর্ণরূপে প্রকৃতির সাথে জড়িত।ফলে কেবল তারা পরিবর্তণ আনতে পারে প্রকৃতিতে। 


ফ্রি উ
ইল সম্পন্ন মানব ও জ্বিণের আমলনামা ছাড়াও কিতাবে আর যা নেই তা হল কেয়ামত সংঘটনের সময়কাল। এটি একমাত্র আল্লাহই জানেন [যেমন-"Verily the knowledge of the Hour is with Allah (alone)-(৩১:৩৪) বা, To your Lord is its finality.-(৭৯:৪৪) গসপেলে ঈসা বলেছেন-”প্রকৃতপক্ষে সেইদিন সেই সময়ের কথা কেউ জানে না, স্বর্গের ফেরেস্তারাও না, আমিও না, কেবল খোদা জানেন।”] আর এ থেকে বোঝা যায়, কাগজে কলমে সূর্য়্যের জ্বালানী কখন শেষ হবে তা আমরা অঙ্ক কষে বের করতে পারলেও কেয়ামতের সময়কাল কখনই মানুষ বিজ্ঞানের সাহায্যে জানতে পারবে না, পরিণতি আসবে হঠাৎ করেই, হয়ত: আচমকা কোন ব্লাক হোলে পতিত হবে আমাদের সৌরজগৎ। আর তাতে আন্তগ্রহীয় বন্ধন ছুটে গিয়ে লন্ডভন্ড হয়ে যাবে আমাদের সৌরজগৎ। হঠাৎ শব্দ ও কম্পনের সৃষ্টি হবে আর গ্রহগুলো ছুটে যাবে ব্লাক হোলের দিকে।আর ছোটার গতি বৃদ্ধির সাথে সাথে নিম্নগ্রামে শুরু হওয়া শব্দ ও কম্পন্ বৃদ্ধি পেতে থাকবে। একসময় সবকিছু টুকরো টুকরো হয়ে পড়বে। অত:পর পরিণত হবে ধূণিত রঙ্গিন পশমের মত। 


যা হোক, মূল কাহিনীতে ফিরি,প্রথম মানব আদমকে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ তাকে জ্ঞান শিক্ষা দিলেন। আর সে যখন সবকিছু শিখে ফেলল, তখন তিনি ফেরেস্তাদের সম্মুখে সকল বস্তু উপস্থাপন করে বলেন, ‘এসবের নাম আমাকে বল।’ 

তারা বলল, ‘আপনি মহান। আপনি আমাদের যা শিক্ষা দিয়েছেন তাছাড়া আমাদের কোন জ্ঞান নেই। নিশ্চয় আপনি প্রাজ্ঞ, তত্ত্বজ্ঞানী।’ 
তখন তিনি আদমকে বলেন, ‘হে আদম! তুমি ওদের এসবের নাম বলে দাও।’ -(২:৩১) তখন আদম সে সবের নাম বলে দিল।  

কেউ হয়ত: বলতে পারেন- তা আল্লাহ কেন ফেরেস্তাদের সামনে আদমের জ্ঞান জাহির করার প্রয়োজন বোধ করলেন? কারণ আদমকে সৃষ্টির পরিকল্পণা যখন তিনি ফেরেস্তাদেরকে জানিয়েছিলেন, তখন তারা সন্দিহান হয়েছিল। (উপরে দেখুন) তখন তিনি বললেন, ‘আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, আকাশ ও পৃথিবীর অদৃশ্য বস্তু সম্বন্ধে আমি জানি, আর আমি জানি যা তোমরা প্রকাশ কর বা গোপন রাখ।’-(২:৩৩)


জ্ঞানীর সম্মান খোদার কাছে অতি উচ্চ। সুতরাং তিনি বলেন, ‘আদমকে সিজদা কর।’-(২:৩৪) তখন ফেরেস্তাগণ সকলেই সিজদা করল ইবলিস ছাড়া, সে সিজদা করতে অস্বীকার করল।-(১৫:৩০-৩১)


ইবলিস ফেরেস্তা ছিল না, ছিল জ্বিণ-(And when We said to the angels, "Prostrate to Adam," and they prostrated, except for Iblis. He was of the jinn and departed from the command of his Lord.-১৮:৫০), তথাপি সেও এই নির্দেশের অন্তর্ভূক্ত ছিল। কেননা, তখন পর্যন্ত সে ফেরেস্তাদের সঙ্গে একত্রে বসবাস করত এবং আল্লাহর ঐ নির্দেশ দানের সময়ও সে তাদের সঙ্গে সেখানে স্ব-শরীরে উপস্থিত ছিল। [এভাবে খোদার নির্দেশ না থাকলেও কোন নবী যাদি কিছু আদেশ করেন তবে তা উম্মতের জন্যে অবশ্য পালনীয় হয়ে যায়। যেমন, নবী ইয়াকুব তার প্রিয় উটের দুধ হারাম করেছিলেন [অার তারা রাণের উপরের অংশের মাংসও খায় না। অবশ্য তা মানতের জন্যে নয়। স্বপ্নের মধ্যে ফেরেস্তা জিব্রা
ইলের সঙ্গে তার মল্লযুদ্ধ হয় এবং তাকে পরাজিত করেন। আর এভাবে তিনি ‘আল্লার বীর’ বা ‘ইস্রায়েল’ উপাধি লাভ করেছিলেন। তবে ঐ মল্লযুদ্ধে তিনি কোমরে আঘাত পান, ফলে ইস্রায়েলীরা কোমরের উপরের মাংস হারাম করেছিল।], তার রোগমুক্তির নিরাময়ে, মানত হিসেবে, ফলে সকল ইস্রায়েলীর জন্যে তা হারাম হয়েছিল।] 


কেন ফেরেস্তারা সিজদা করল আর 
ইবলিস করল না? ফেরেস্তারা সিজদা করল কারণ ইতিপূর্বে আল্লাহ তাদেরকে সিজদা করার বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছিলেন।- ‘অমি ছাঁচে ঢালা শুকনো মাটি হতে মানুষ সৃষ্টি করছি, যখন আমি তাকে সুঠাম করব এবং তার মধ্যে আমার রূহ সঞ্চার করব, তখন তোমরা তাকে সিজদা করবে।’- তাই এই নির্দেশ তাদের কাছে নতুন ছিল না। তাছাড়া তারা সর্বদা আল্লাহর নির্দেশ মান্যকারী। অন্যদিকে ইবলিস মানুষের মত ফ্রি উইলের অধিকারী। সে সৃষ্টির দিকে থেকে আদমের সিনিয়র এবং অাগুণ দ্বারা সৃষ্ট। ফলে তার কাছে মাটির সৃষ্টি আদম শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হয়নি- যদিও বিশেষ জ্ঞানের ক্ষেত্রে আদম তার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমান দিয়েছিল। আর তাই সে আল্লাহর নির্দেশ উপেক্ষা করে অনড় দাঁড়িয়ে রইল।


এদিকে সিজদাকারী ফেরেস্তারা মাথা তুলেই বুঝতে পারল, আযাযিল সিজদা অস্বীকারকারী। কারণ, তার চেহারায় পরিবর্তণ এসেছিল।
এতে ফেরেস্তারা ভয়ে পুনঃরায় সিজদায় পতিত হল। আর আল্লাহর প্রত্যক্ষ নির্দেশ অমান্য করায় আযাযিল হয়ে গেল ইবলিস।


আল্লাহ বললেন, ‘হে ইবলিস! তোমার কি হল যে তুমি সিজদাকারীদের সাথে যোগ দিলে না? কে তোমাকে বাঁধা দিল?’-(১৫: ৩২).

সে বলল, ‘আমি তো তার চেয়ে বড়, তুমি আমাকে আগুন দিয়ে সৃষ্টি করেছ, আর তাকে কাদা দিয়ে।’-(৭:১২).
তিনি বললেন, ‘হে ইবলিস! আমি যাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছি তাকে সিজদা করতে তোমার বাঁধা কোথায়? তুমি যে অহংকার করলে, তুমি কি এতই বড়?’ -(৩৮:৭৫).
সে বলল, ‘তুমি মাটি থেকে যে মানুষ সৃষ্টি করেছ আমি তাকে সিজদা করব না।’‘-(৩৮:৭৫).

এতক্ষণ আদম দাঁড়িয়ে তাকে ফেরেস্তাদের সিজদা করা দেখল। অতঃপর আল্লাহর সাথে ইবলিসের তর্ক-বিতর্ক করতে দেখল এবং সকল কথোপকথন নিজ কানে শুনল। মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিকে কতই না স্বাধীনতা দিয়েছেন এবং তিনি তাঁর সৃষ্টির প্রতি কতই না উদার ও সহানুভূতিশীল যে তিনি তাঁর সৃষ্টির এই প্রকার ঔদ্ধ্যত্য সহ্য করছেন- আদম বিষ্মিত ও হতবাক হয়ে পড়ল। 

এদিকে আল্লাহ দেখলেন এই ইবলিস আদমের প্রকাশ্য বিরোধীতায় লিপ্ত। সুতরাং আদমকে সতর্ক করে দিতে তিনি তাকে বললেন, ‘হে আদম! এই ইবলিস তোমার ও তোমার স্ত্রীর শত্রু। সুতরাং সে যেন কিছুতেই তোমাদেরকে জান্নাত হতে বের করে না দেয়, দিলে তোমরা দুঃখ-কষ্ট পাবে। তোমরা জান্নাতে বাস করতে থাক। সেখানে তোমরা ক্ষুধার্ত বা উলঙ্গ বোধ করবে না এবং সেখানে পিপাসা বা রোদের তাপ তোমাদেরকে কষ্ট দেবে না।’-(২০:১১৭-১১৯)


অতঃপর আল্লাহ তাদের চলাফেরায় সীমারেখা টেনে দিলেন। বাগানের মাঝখানে অবস্থিত এক বৃক্ষের নিকট গমন ও তার ফল ভক্ষণ নিষিদ্ধ করলেন। এই বৃক্ষটিই সেই জ্ঞানবৃক্ষ। আর ঐ বৃক্ষটি নির্দেশ করে তিনি বললেন, ‘হে আদম! তুমি ও তোমার সঙ্গিনী জান্নাতের যেখানে ইচ্ছে যাও বা যা ইচ্ছে খাও, কিন্তু এই বৃক্ষের নিকটবর্তী হইও না, হলে তোমরা সীমালংঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভূক্ত হবে।’-(৭:১৯). আর তিনি (ইবলিসকে) বললেন, ‘তুমি এখানে থেকে অহংকার করবে এ হতে পারে না। সুতরাং বের হয়ে যাও, তুমি তো অধমদের একজন।’ -(৭:১৩).


ইবলিস খোদার আদেশ অমান্য করে বেহেস্ত থেকে বিতাড়িত হল। সুতরাং যার জন্যে তার এই দূর্ভাগ্য, সে বেহেস্তের অপার সুখ ভোগের মধ্যে শান্তিতে থাকবে এটা সে সহ্য করতে পারল না। তাই আদমকেও পথভ্রষ্ট করে কিভাবে সেখান থেকে বের করে দেয়া যায় সেই চিন্তায় সে মশগুল হল। কিন্তু যে পরিকল্পণাই সে করুক তা বাস্তবায়ন করতে হলে তাকে প্রথমে বেহেস্তে প্রবেশ করতে হবে। কিন্তু কিভাবে? 


ইবলিস বেহেস্তের দ্বারদেশে পৌঁছে ইতস্ততঃ ঘোরাঘুরি করতে লাগল। দ্বারের একপাশে প্রাচীরের উপর বসে ছিল এক ময়ূর। সে তাকে ঘোরাঘুরি করতে দেখে তার পরিচয় জানতে চাইল।

ইবলিস বলল, ‘আমি আযাযিল, আল্লার এক বান্দা।’

ইবলিস দ্রুত ঐ ময়ূরের সাথে বন্ধুত্ব করে ফেলল এবং এক পর্যায়ে সে বেহেস্ত ঘুরে ফিরে দেখতে চাইল। ময়ূর বলল, তার সেরকম কোন ক্ষমতা খোদা দেননি। তবে সে জানায় যে তার এক বন্ধু আছে যার সে ক্ষমতা আছে। তখন ইবলিস তাকে তার সেই বন্ধুকে ডেকে আনতে অনুরোধ করে।


ময়ূর চলে গেল এবং অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে তার বন্ধুকে নিয়ে ফিরে এল। ময়ূরের ঐ বন্ধু ছিল একটা সাপ যে জ্ঞান বৃক্ষের ফল পাহারা দিত। ঐ সাপ বলল, ‘আল্লাহর অনুমতি ব্যতিত কারও ভিতরে প্রবেশের অধিকার নেই।’

ইবলিস বলল, ‘আমি বেহেস্তের কোথাও পা রাখব না, তোমার মুখের মধ্যেই অবস্থান করব।’

সাপ রাজী হল না। তখন ইবলিস তাকে বলল, ‘আমি ‘ইসমে আযম’ জানি। এই সামান্য কাজের বিনিময়ে তুমি তা শিখতে পারতে আমার কাছ থেকে। তবে যেহেতু তুমি তা শিখতে চাও না,’ইবলিস ফিরে যাবার ভঙ্গিতে বলল, “কি আর করা।’ তখনি সাপ তার মাথা প্রসারিত করে দিল। 

ইবলিস বলল, ‘আমাকে গন্ধম বৃক্ষের কাছে নিয়ে চল।’ সাপ উড়ে গিয়ে জ্ঞান বৃক্ষের এক শাখায় গিয়ে বসলে ইবলিস তাকে নানা কথায় ভুলিয়ে রাখল আর অপেক্ষায় থাকল অাদম হাওয়ার।

বেহেস্তের সুখ। নয়নাভিরাম নানা বর্ণের নানারকম ফলমূল, আরাম আয়েশ -আহা। বেহেস্তের মাঝামাঝি একস্থানে বসে ফল খেতে খেতে আদম ও হাওয়া নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগলেন, ‘কতই না ভাল হত যদি আমরা অমর হতাম, আর আমাদের এই জান্নাত বাস চিরকালীন হত!’ 


ইবলিস তাদের এই কথা শুনল। সে ঐ সময় গন্ধম বৃক্ষের শাখায় জড়িয়ে থাকা পাহারাদার সাপের মুখ গহ্বরে বসে ছিল। বৃক্ষ থেকে অবতরণ করে দ্রুত তাদের সন্নিকটে এসে গেল। 


তারপর শয়তান তাকে ফুসমন্তর দিল। সে বলল, ‘হে আদম! আমি কি তোমাকে অমরতা ও অক্ষয় রাজ্যের গাছের কথা বলে দেব? -(২০:১২০).

তারা দৃষ্টি ফেলে সাপকে দেখে বলল, ‘তুমি কে?’
সে বলল, ‘আমি সেই বৃক্ষ রক্ষণাবেক্ষণকারী।’  

আদম-হাওয়াকে নিয়ে সাপ ঐ বৃক্ষের একেবারে সন্নিকটে চলে এল। বৃক্ষের শাখায় শোভা পাচ্ছে নয়নমনোহর ফল একেবারে হাতের নাগালে। সুগন্ধে চারিদিক মৌ মৌ করছে। অভূতপূর্ব সৌন্দর্য। তারা অবাক নয়নে ফলের ভারে নূয়ে পড়া বৃক্ষটির শোভা উপভোগ করতে লাগলেন। ইবলিস বলল, ‘এটাই সেই বৃক্ষ, যার ফল ভক্ষণ করলেই তোমরা হবে অমর আর তোমাদের বাস বেহেস্তে চিরস্থায়ী হবে।’


আদম দেখল গাছটি বাগানের মাঝখানে। তখনি তার মনে পড়ল নিষেধবানী। সুতরাং সে বলল, ’না এর ফল আমরা ভক্ষণ করব না, নিষেধ অাছে।’

ইবলিস বলল, ‘কে নিষেধ করেছে?
হাওয়া বলল, ‘আল্লাহ আমাদেরকে বাগানের মাঝখানে থাকা গাছের কাছে যেতে নিষেধ করেছেন।’ 

তখন তাদের লজ্জাস্থান যা গোপন রাখা হয়েছিল তা প্রকাশ করার জন্যে শয়তান তাদেরকে কুমন্ত্রণা দিল ও বলল, ‘যাতে তোমরা দু’জনে ফেরেস্তা বা অমর না হতে পার তার জন্যেই তোমাদেরকে এ গাছের সম্বন্ধে নিষেধ করেছেন।তারা বলল, ‘কিভাবে আমরা তোমার কথা বিশ্বাস করব?’ 

সে কসম খেয়ে বলল, ‘আমি তো তোমাদের একজন হিতৈষী।’ এভাবে সে তাদেরকে ধোঁকা দিল।-(৭:২০) আর আদমের তো মিথ্যা ও প্রতারণার বিষয়ে কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই।
  
আদম দৃঢ় মনোবলের অধিকারী ছিল না। সে ভুলে গেল এটাই সেই বৃক্ষ যেটি বাগানের মাঝখানে অবস্থিত এবং যার সম্পর্কে আল্লাহ তাদেরকে সতর্ক করেছিলেন তার নিকটবর্তী না হতে, হলে তারা সীমালঙ্ঘণকারীদের অন্তর্ভূক্ত হবে।  

আল্লাহ বলেন, ‘আমি ইতিপূর্বে আদমকে নির্দেশ দিয়েছিলাম। অতঃপর সে ভুলে গিয়েছিল, এবং আমি তার মধ্যে দৃঢ়তা পাইনি। -(২০:১১৫).’ [এই আয়াতে কেবল আদমের নাম উল্লেখ করা হয়েছে- হাওয়ার নয়। একারণে হয়তঃ আল্লাহ নারী জাতির প্রতি বিশেষ রেয়াত প্রদর্শণ করেছেন। অথবা এটা হতে পারে- স্ত্রী যেহেতু পুরুষের অধীন সুতরাং স্বতন্ত্র্যভাবে হাওয়ার নাম উল্লেখের প্রয়োজন মনে করেননি।] 


তারা গাছ থেকে ফল ছিঁড়ল ও তা ভক্ষণ করল। ফল পাহারাদার সাপের মুখের গহব্বরে ইবলিস বসে থাকায় সে তাদেরকে কোনরূপ সতর্ক করতে পারল না।


তারপর যখন তারা সেইগাছের ফলের স্বাদ গ্রহণ করল তখন তাদের লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ল। আর তারা বাগানের গাছের পাতা দিয়ে নিজেদেরকে ঢাকার চেষ্টা করল। তখন তাদের প্রতিপালক তাদেরকে ডেকে বললেন, ‘আমি কি তোমাদের এ গাছের ব্যাপারে সাবধান করে দেইনি?’ 

তারা বলল, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের উপর জুলম করেছি, যদি তুমি আমাদেরকে ক্ষমা না কর, তবে নিশ্চয় আমরা ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভূক্ত হব।’-(৭:২১-২৩).

অনন্তর শয়তান তাদের উভয়কে ওখান থেকে পদঙ্খলিত করেছিল। পরে তারা যে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে ছিল তা থেকে তাদেরকে বের করে দিল। -(২:৩৬). পুরো ঘটনায় একদিকে আদম নিজেকে অপরাধী ভেবে হৃতদ্যম ও হতবাকের মত হয়ে পড়েছিল, অন্যদিকে ভীষণ লজ্জিতও ছিল, কেননা আল্লাহ তাকে ফেরেস্তাদের ও জ্বিনদের উপর মর্যাদা দিয়েছেন, অথচ সে কি করে ফেলল! তাই তিনি তার কোন অতিরিক্ত কথা অধিক শাস্তি ও কোপানলের কারণরূপে পরিগণিত হতে পারে এই আশঙ্কায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে মনে মনে কেবল আল্লাহর করূণা ভিক্ষা করছিল। আর আল্লাহ তো সব জান্তা।


সুতরাং আদম তার প্রতিপালকের কাছ থেকে কিছু বাণী পেল। আল্লাহ তার প্রতি ক্ষমা পরবশ হলেন। তিনি তো ক্ষমাপরবশ, পরম দয়ালু।’-(২:৩৭). এরপর তার প্রতিপালক তাকে মনোনীত করল-আর তাকে পথের নির্দেশ দিল, ‘পরে আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে সৎপথের নির্দেশ এলে যে আমার পথ অনুসরণ করবে সে বিপথগামী হবে না ও দুঃখ-কষ্ট পাবে না। আর যে আমার স্মরণে বিমুখ হবে তার জীবনের ভোগ-সম্ভার সঙ্কুচিত হবে, -(২০:১২২-১২৩) 


আর তিনি বললেন, ‘তোমরা একে অন্যের শত্রু হিসেবে কিছুকালের জন্যে পৃথিবীতে নেমে যাও। আর (সেখানে) তোমাদের জন্যে আবাস ও জীবিকা রইল। সেখানেই তোমরা জীবন-যাপন করবে, সেখানেই তোমাদের মৃত্যু হবে আর সেখান থেকেই তোমাদেরকে বের করে আনা হবে।’-(৭:২৪-২৫). মূলত: তোমাদেরকে সেখানে কিছুকাল অবস্থান করতে হবে ও লাভ সংগ্রহ করতে হবে।-(২:৩৬).


আদম-হাওয়াকে যখন আল্লাহ বচন দিচ্ছিলেন, তখন ইবলিস চুপচাপ একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু এবার সে মুখ খুলল। আদমকে দেখিয়ে সে বলল, ‘তুমি একে কি দেখেছ যাকে আমার উপরে তুমি মর্যাদা দিলে? কেয়ামতের দিন পর্যন্ত যদি আমাকে অবকাশ দাও, তাহলে আমি অল্প কয়েকজন ছাড়া তার বংশধরদের সমূলে নষ্ট করে ফেলব।’ 


আল্লাহ বললেন, ‘যাও, জাহান্নামই তোমার প্রতিদান আর প্রতিদান তাদের, যারা তোমাকে অনুসরণ করবে। তোমার কন্ঠস্বর দিয়ে ওদের মধ্যে যাকে পার সত্য থেকে সরিয়ে নাও, ......আর ওদের ধন-সস্পদে ও সন্তান-সন্তুতিতে শরিক হও আর প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাও।’-(১৭:৬২-৬৪).


ইবলিস আদম সন্তানদের সমূলে ধ্বংস করার দম্ভোক্তি করেছিল তার সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্যের কারণে। কিন্তু আল্লাহ ইতিপূর্বে আদমকে মনোনীত করেছেন এবং তাকে পথের নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাকে নিশ্চিত করেছেন যে, তার সন্তানদের মধ্যেও তাঁর মনোনীত বান্দা থাকবে যারা পথভ্রষ্টদেরকে পথ প্রদর্শণ করবেন। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, তিনি জানেন সুচতুর ইবলিস তাঁর ঐসব মনোনীত বান্দাদেরকে প্রধান টার্গেট করবে, যাতে আদম সন্তানগণ সরল পথ কখনও দেখতে না পায়। তাই তিনি আদমকে মনোনীত ও প্রতিশ্রুতি দেবার সময়ই তাঁর মনোনীত সকল দাসদের আয়ূস্কালীন প্রতিটি মূহুর্তের হিসেব (মুখের প্রতিটি কথা, কাজ এমনকি ইবলিসের ভূমিকারও যাবতীয় কিছু) ইতিমধ্যে লওহে মাহফুজের কিতাবে লিপিবদ্ধ হয়ে গেছে যা পরিবর্তণ হবে না। তাই তিনি ইবলিসের কাছে প্রতিশ্রুতি চাওয়ার পাশাপাশি এ বিষয়টিও সুস্পষ্টভাবে তাকে জানিয়ে দিলেন- ’আমার দাসদের উপর তোমার কোন ক্ষমতা থাকবে না। কর্মবিধায়ক হিসেবে তোমার প্রতিপালকই যথেষ্ট। -(১৭:৬৫).


তখন ইবলিস বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত অবকাশ দাও। -৭৮:৭৯-৮০,’ আল্লাহ তো ন্যায়পরায়ণ, তিনি ইবলিসের এতদিনের কর্মফল বিফল করে দিলেন না। তিনি তার প্রার্থনা মঞ্জুর করলেন, বললেন, ‘তোমাকে অবকাশ দেয়া হল সেইদিন পর্যন্ত-যা অবধারিত।-(৭৮:৮০) 


[ইবলিস তার সকল কাজকর্ম খোদার নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত থাকার খোদায়ী ওয়াদা পাওয়ামাত্র সে দুনিয়াতে সবচেয়ে ক্ষমতাধর হয়ে গেল। নায়ক খেকে সে হয়ে গেল খলনায়ক। এ কারণে ইব্রাহিমের সহিফায় রয়েছে- God's heritage (the created world) is largely under the dominion of evil (Iblis) – i.e., it is "shared with Azazel" -(আব্রাহাম, ২০:৫) 
একই সাথে তার উপর থেকে খোর রহমত উঠে যাওয়ায় তার চেহারাও কুৎসিৎ হয়ে যায়। যা অভিশপ্তের লক্ষণ। মূসার সঙ্গে তূর পর্বতের পাদদেশে ইবলিসের দেখা হলে তিনি তার এই ভয়ংকর চেহারার বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করেছিলেন। উত্তরে ইবলিস বলেছিল- ‘Oh Musa, that is but the ambiguity of appearances, while the spiritual state does not rely on it and does not change. Gnosis remains true even as it was at the beginning and does not change even if the individual changes.’ -Kitab at-tawasin by Mansur al-Hallaj] 


যাইহোক, কাহিনীতে ফিরি-. আর ইবলিসকে এটাও পরিস্কার করে দেয়া হল যে, অবকাশ সে পেয়েছে, তবে ঐ অবকালীন সময়কালে সে অভিশপ্ত্ও বটে। ’তোমার উপর আমার এ অভিশাপ কেয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী হবে।’-(৭৮:৭৮)


ইবলিস দেখল ইতিমধ্যে তার সর্বনাশ হয়ে গেছে, আল্লাহ তাকে কেয়ামত পর্যন্ত অভিশপ্ত করেছেন। সুতরাং যাদের কারণে তার এই সর্বনাশ, তাদেরকেও সর্বনাশ করার- পথভ্রষ্ট করার প্রতিশ্রুতি ও ওয়াদা দিল সে, বলল, ‘যাদেরকে উপলক্ষ্য করে তুমি আমার সর্বনাশ করলে, এ কারণে আমিও তোমার সরল পথে তাদের জন্যে নিশ্চয় ওৎ পেতে থাকব। তারপর আমি তাদের সামনে, পিছনে, ডান ও বাম থেকে তাদের কাছে আসবই, আর তুমি তাদের অনেককেই কৃতজ্ঞ পাবে না।-(৭:১৬-১৭). 

আমি তোমার দাসদের এক নির্দিষ্ট অংশকে আমার দলে নিয়ে ফেলব, আর আমি তাদেরকে পথভ্রষ্ট করবই, তাদের হৃদয়ে মিথ্যে বাসনার সৃষ্টি করব। আমি তাদেরকে নিশ্চয় নির্দেশ দেব এবং তারা পশুর কান ফুটো করবে দেবদেবীকে উৎসর্গ করার জন্যে। আর আমি তাদেরকে নিশ্চয় নির্দেশ দেব এবং তারা তোমার সৃষ্টিকে বিকৃত করবে।’

-‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমার যে সর্বনাশ করলে তার কসম! আমি পৃথিবীতে মানুষের কাছে পাপকে আকর্ষণীয় করব, আর আমি সকলের সর্বনাশ করব; তোমার নির্বাচিত দাস ছাড়া। -(৪:১১৮-১১৯) -আল্লাহর নির্বাচিত দাসদেরকে ইবলিস তার এই কসমের আওয়ার বাইরে রাখল। কেননা আল্লাহ ইতিপূর্বে তাকে পরিস্কার ভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাদের উপর তার কোন প্রভাব খাটবে না।


আল্লাহ বললেন, ‘এ-ই আমার কাছে পৌঁছানোর সরল পথ। বিভ্রান্ত হয়ে যারা তোমাকে অনুসরণ করবে তারা ছাড়া আমার দাসদের ওপর তোমার কোন প্রভাব খাটবে না।’-(১৫:৩৯-৪২). [এই কথা থেকেই মানুষ আল্লাহর কাছে পৌঁছানোর সরল পথের দিশা পেল। অর্থাৎ‘ইবলিস কতৃক আকর্ষণীয় করে উপস্থাপিত পাপকে পরিহার করে চলতে পারলেই মানুষ সর্বদা সেই সরল পথেই থাকবে, যে পথ তাকে আল্লাহর সান্নিধ্যে নিয়ে যাবে। আর কোন সন্দেহ নেই চতুর ও মানুষের উপর ক্ষমতাবান ইবলিসকে এড়িয়ে মানুষ চলতে পারবে কেবল তার জ্ঞান ও শিক্ষার দ্বারা।]


একই সাথে আল্লাহ ইবলিস ও তার অনুসারীদের শেষ পরিণতিও সুস্পষ্ট করে দিলেন যেন এ ব্যাপারে কারও নিকট সন্দেহের কোন অবকাশ না থাকে-‘আর আমি সত্যিই বলছি যে, তোমাকে দিয়ে ও ওদের মধ্যে যারা তোমার অনুসারী হবে তাদেরকে দিয়ে আমি জাহান্নাম ভরিয়ে তুলব। -(৩৮:৮৪-৮৫).তার সাতটি দরজা আছে, প্রত্যেক দরজার জন্যে পৃথক পৃথক দল থাকবে।’-(১৫:৪৪).


অত:পর দুনিয়াতে কি হচ্ছে? শয়তান তার কাজ ঠিকই করে যাচ্ছে। সে আদম-হাওয়ার কাছে শপথ করে বলেছিল- ‘আমি তো তোমাদের একজন হিতৈষী।’-অথচ তা ছিল ছলনা, কেবল তাদেরকে পথভ্রষ্ট করতে। তেমনি খোদার কাছে করা -‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমার যে সর্বনাশ করলে তার কসম! আমি পৃথিবীতে মানুষের কাছে পাপকে আকর্ষণীয় করব, আর আমি সকলের সর্বনাশ করব; তোমার নির্বাচিত দাস ছাড়া। -(৪:১১৮-১১৯) -প্রতিজ্ঞাও ছিল তার ছলনা। কেননা, কোরআনে রয়েছে- আমি তোমার পূর্বে যে সমস্ত রসূল ও নবী প্রেরণ করেছি, তারা যখনই কিছু কল্পণা করার চেষ্টা করেছে, তখনই শয়তান তাদের কল্পনায় কিছু মিশ্রণ করে দিয়েছে।-(২২:৫২)অর্থাৎ পারবে না জেনেও শয়তান কিন্তু ক্ষান্ত হয়নি। সে তার প্রতিজ্ঞার বিপরীতে নবীদেরকেও চেষ্টা করেছে পথভ্রষ্ট করে দিতে। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে আয়াতটি প্রমাণ করছে জ্বিণ মানুষের মনের কথা পড়তে পারে এমনকি, তা এডিট (সংযোজন বা বিয়োজন) করার ক্ষমতাও তার রয়েছে। আর এ কারণেই সে দম্ভোক্তি করতে পেরেছিল- খোদাকে চ্যালেঞ্জ করতে পেরেছিল বনি আদমকে সমুলে বিনষ্ট করার। সুতরাং বি কেয়ারফুল, কোন প্রলোভনে পড়া যাবে না। কেননা, প্রলোভন দেয় কেবল শয়তান। -আর শয়তান যে প্রতিশ্রুতি দেবে তা তো ছলনা মাত্র।-(১৭:-৬৪).


সমাপ্ত।


উৎস: 

Quran, 
Torah,
Midrash
Mansur al-Hallaj, Kitab at-tawasin
Husayn ibn Mahmud, Book of Chamis.
Abbas Ali, Islamic Perspectives on Management and Organization

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন