pytheya.blogspot.com Webutation

৮ জুলাই, ২০১৫

Jesus Christ: একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ।

যিশুখৃষ্ট (Jesus Christ) বা ঈসার শিক্ষা কর্মকাণ্ডের লিখিত বিবরণ থাকলেও তিনি আসলে কিভাবে জীবন অতিবাহিত করতেন এবং অন্য লোকদের সাথে তিনি প্রতিদিন কিভাবে কাজকর্ম করতেন, সে ব্যাপারে খুব কমই জানা যায়। যতটুকু জানা যায়, তা  কেবল বার্নাবাসের গসপেল থেকে। এই গসপেলে অন্যান্য স্বীকৃত গসপেলগুলোর চেয়ে যিশুর জীবনের অনেক বেশি দিক বর্ণিত হয়েছে। ৪টি গসপেলের মধ্যে মার্ক ও জন (যোহন-ইউহোন্না) যিশুর জন্ম সম্পর্কে নীরব এবং মথি দায়সারা ভাবে তা উল্লেখ করেছেন। এরপর লূক যিশুর বংশ-বৃত্তান্ত উল্লেখ করে আবার স্ববিরোধিতার পরিচয় দিয়েছেন, পক্ষান্তরে মার্ক ও জন কোন বংশ-বৃত্তান্ত দেননি। 

বিভিন্ন সময়ে লিখিত ৪টি গৃহীত বা স্বীকৃত গসপেল (বাইবেলের নতুন নিয়ম) কেবল পরিবর্তিত ও সেন্সরকৃতই শুধু হয়নি, সেগুলো প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণও নয়। 

১. প্রথম গসপেলের রচয়িতা মার্ক। এটি লিখিত হয় ৬০-৭৫ সনে। তিনি ছিলেন সেইন্ট বার্নাবাসের বোনের পুত্র। 
২. মথি ছিলেন একজন ট্যাক্স কালেক্টর (কর আদায়কারী) তথা নিম্নপদস্থ কর্মকর্তা। তিনি যিশুর সাথে ভ্রমণ করেননি। 
৩. লূকের গসপেল অনেক পরে লিখিত। তাছাড়া মথি ও মার্কের মত তার গসপেলের বর্ণনার উৎস একই। লুক ছিলেন পলের চিকিৎসক এবং পলের মত তিনিও কখনো যিশুকে দেখেননি। 
৪. জনের গসপেলের উৎস ভিন্ন এবং আরো পরে, ১শ’ সনের দিকে রচিত। তাকে যিশুর শিষ্য জন মনে করা ভুল হবে, কারণ তিনি ভিন্ন ব্যক্তি। এই গসপেলকে যিশুর জীবনের নির্ভরযোগ্য বিবরণ বলে গণ্য করা উচিত হবে কিনা এবং তা পবিত্র গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হবে কিনা তা নিয়ে দু’শ বৎসর ধরে উত্তপ্ত বিতর্ক চলেছিল।

ইহুদীরা তাদের ইতিহাসে বার বার আগ্রাসনের শিকার হয়ে হানাদারের পদতলে নিষ্পিষ্ট হয়েছে। যা হোক, বারংবার পরাজয় ইহুদীদের অসহায় করে তোলে, ফলে তাদের মনে ধিকি ধিকি জ্বলতে থাকে ঘৃণার আগুন। তা সত্ত্বেও, গভীর হতাশা ভরা দিনগুলোতেও ইহুদীদের একটি বড় অংশই তাদের মানসিক ভারসাম্য বহাল রাখে এ আশায় যে এক নয়া মুসা আসবেন এবং তার সহযোগীদের নিয়ে আগ্রাসনকারীদের বিতাড়িত করতে সক্ষম হবেন, আবার প্রতিষ্ঠিত হবে যিহোভার শাসন। তিনি হবেন মেসিয়াহ্ (Messiah) অর্থাৎ অভিষিক্ত যিশু। 

ইহুদী জাতির মধ্যে একটি অংশ ছিল যারা সবসময় ক্ষমতাসীনদের পূজা করত। প্রতিকূল অবস্থায়ও নিজেদের সুবিধা লাভের জন্যে তারা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে পাল উড়িয়ে দিত। তারা ধন-সম্পদ ও ধর্মীয় অবস্থানের দিক দিয়ে উচ্চস্থানে অধিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও ইহুদী জাতির অবশিষ্ট অংশ তাদেরকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবেই গণ্য করত। 

এ দু’টি অংশ ছাড়াও ইহুদীদের মধ্যে ৩য় আরেকটি দল ছিল, যাদের সাথে পূর্বোক্ত দু’টি দলের ব্যাপক পার্থক্য ছিল। তারা আশ্রয় নিয়েছিল জঙ্গলে এবং তাওরাত অনুযায়ী তারা ধর্ম পালন করত। যখনই সুযোগ আসত তখনি তারা হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করত। এ সময় রোমানরা তাদের গুপ্ত ঘাঁটিগুলো খুঁজে বের করার জন্যে বহুবার চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়। এই দেশপ্রেমিক ইহুদীদের সংখ্যা ক্রমশই বাড়তে থাকে। যোসেফাসের কাছ থেকে তাদের কথা প্রথম জানা যায়। তিনি ইহুদীদের এ ৩টি দলকে যথাক্রমে ফরীশী (Pharisees), সদ্দুকী (Sadducces) ও এসেনি (Essenes) বলে আখ্যায়িত করেন। 

এসেনিদের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবহিত হওয়া গেলেও বিশদ কিছু জানা যায় না। ৪টি গসপেলের কোনটিতেই তাদের নাম একবারও উল্লেখিত হয়নি।  

মোটামুটি হিসেবে জর্দান নদীর তীরবর্তী পাহাড়ে প্রায় ৬শ গুহা রয়েছে। এ সব গুহাতেই বাস করত এসেনিরা। এ ইহুদী সম্প্রদায়টি মানুষের সংশ্রব ত্যাগ করেছিল। কারণ তারা বিশ্বাস করত যে একজন প্রকৃত ইহুদী শুধুমাত্র যিহোভার সার্বভৌমত্বের অধীনেই বাস করতে পারে, অন্য কারো কর্তৃত্বের অধীনে নয়। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী রোমান সম্রাটের অধীনে যে ইহুদী, বসবাস এবং তাকে প্রভু হিসেবে স্বীকার করে, সে পাপ কাজ করে। 

পৃথিবীর ভোগ-বিলাস, আড়ম্বরপূর্ণ জীবন এবং অদম্য- সেই শক্তি যা অনিবার্যভাবে মানুষকে ঠেলে দেয় বিরোধ ও আত্ম-ধ্বংসের পথে, প্রভৃতি কারণে বীতশ্রদ্ধ এ ইহুদী সম্প্রদায় মরু সাগরের তীরবর্তী পাহাড়ে নির্জন স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। পাহাড়ের গুহায় বসবাসের এ জীবন তারা বেঁছে নিয়েছিল এ কারণে যে, নীরব-নিভৃত পরিবেশে তারা পবিত্র জীবন যাপনে মনোনিবেশ করতে পারবে এবং মুক্তিলাভ করতে সক্ষম হবে। মন্দিরের বহু ইহুদীর মত তারা ওল্ড টেষ্টামেন্টকে অর্থোপার্জনের কাজে ব্যবহার করেনি, বরং পবিত্র গ্রন্থের শিক্ষানুযায়ী জীবন-যাপনের চেষ্টা করে। এ জীবন-যাপনের মাধ্যমে শুদ্ধতা ও পবিত্রতা লাভ করতে পারবে বলে তারা আশা করেছিল। ঈশ্বরের নির্দেশ ইহুদীরা অনুসরণ না করায় প্রকৃতপক্ষে ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলেছিল। সেই পথ তারা কীভাবে পরিহার করেছে, অবশিষ্ট ইহুদীদের সামনে তার দৃষ্টান্ত স্থাপনই ছিল তাদের লক্ষ্য। 

মরুসাগর পূঁথি আবিষ্কারের পূর্বে এসেনিদের বিষয়ে অতি অল্পই জানা যেত। প্লিনি (Pliny) ও যোসেফাস তাদের কথা উল্লেখ করলেও পরবর্তী কালের ঐতিহাসিকদের দ্বারা কার্যত তারা উপেক্ষিত হয়েছে। প্লিনি বর্ণনা করেছেন- “তাদের স্ত্রী নেই, তারা যৌন সংসর্গ পরিত্যাগ করে, তাদের কোন অর্থ সম্পদ নেই....তাদের জীবনাচারণ দেখে বিপুল সংখ্যক লোক তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং এভাবে তাদের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল....এভাবে এ গোষ্ঠীটি হাজার হাজার বৎসর টিকে ছিল যদিও তারা কোন সন্তান উৎপাদন করত না।”

যোসেফাস (Josephus), যার জীবন শুরু হয়েছিল একজন এসেনি হিসেবে, তিনি লিখেছেন যে- “এসেনিরা বিশ্বাস করত যে, আত্মা অমর। এটা ঈশ্বরের প্রদত্ত এক উপহার। ঈশ্বর কিছু কিছু আত্মাকে সকল পাপ থেকে মুক্ত করে নিজের জন্যে পবিত্র করে নেন। এভাবে বিশুদ্ধ করণকৃত ব্যক্তি সকল অপবিত্রতা থেকে মুক্ত হয়ে পবিত্রতা অর্জন করে।” 

যুগে যুগে বিজয়ী বহিঃশক্তি মন্দির ধ্বংস ও ইহুদীদের বহুবার পরাজিত করা সত্ত্বেও এ গুহাবাসীদের জীবন-যাত্রায় তার কোন প্রভাব পড়েনি। তাদের এই স্বেচ্ছা নির্বাসনের জীবন ধর্মের পবিত্রতা এবং বিদেশি আগ্রাসন থেকে ইহুদাকে মুক্ত করার জন্যে প্রতিটি ইহুদীর সংগ্রামের দায়িত্ব থেকে পলায়ন ছিল না। প্রত্যহিক প্রার্থনা ও পবিত্র গ্রন্থ পাঠের পাশাপাশি তাদের কেউ কেউ একটি সুদক্ষ বাহিনী গড়ে তুলেছিল যারা শুধু মুসার ধর্মই প্রচার করত না, উপরন্তু নির্দেশিত পথে স্বাধীনতার জন্যে লড়াই করতেও প্রস্তুত ছিল। তাদের যুদ্ধ ছিল শুধুমাত্র ঈশ্বরের সেবার জন্যে, ক্ষমতা লাভ বা ব্যক্তিগত স্বার্থ-সিদ্ধির জন্যে নয়। 

এই যোদ্ধা বাহিনীর সদস্যদেরকে শত্রুরা ‘ধর্মান্ধ ইহুদি’ বলে আখ্যায়িত করত। তারা এক পতাকার অধীনে সংগৃহিত ছিল এবং প্রতিটি গোত্রের নিজস্ব পরিচিতি পতাকা ছিল। তারা ছিল ৪টি ডিভিশনে বিভক্ত এবং প্রতিটি ডিভিশনের শীর্ষে ছিল একজন প্রধান। প্রতিটি ডিভিশনই গঠিত ছিল ইস্রাইলের ৩টি গোত্রের লোক নিয়ে। এভাবে ইহুদীদের ১২টি গোত্রের সকলেই এক পতাকার নীচে সংগৃহিত হয়েছিল। বাহিনীর প্রধানকে একজন লেবীয় ঈমাম হতে হত। তিনি শুধু একজন সামরিক অধিনায়কই ছিলেন না, আইনের একজন শিক্ষকও ছিলেন। প্রতিটি ডিভিশনের তার নিজস্ব মাদ্রাসা (‘মিদরাস’ বা স্কুল) ছিল এবং ঈমামদের একজন সামরিক কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন ছাড়াও বিদ্যালয়ে নিয়মিত “দরশ” বা শিক্ষা প্রদান করতে হত। 

এভাবে এসব গুহায় আদিম পরিবেশে বাস করে এসেনিরা আনন্দ-বিলাস পরিত্যাগ করেছিল, তারা বিবাহকে ঘৃণা করত এবং ধন সম্পদের প্রতি বিতৃষ্ণ ছিল। তারা একটি গুপ্ত সমাজ প্রতিষ্ষ্ঠা করেছিল এবং তাদের গুপ্ত বিষয়সমূহ সদস্য নয় এমন কারো কাছে কখনোই প্রকাশ করত না। রোমকরা তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানলেও তাদের চারপাশের গোপনীয়তার মুখোশ ভেদ করতে পারেনি। প্রতিটি অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় ইহুদীরই স্বপ্ন ছিল এই সমাজের সদস্য হওয়া, কারণ বিদেশি হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করার এটাই ছিল একমাত্র সহজলভ্য পন্থা।

প্লিনির বর্ণনা থেকে আমরা জানতে পারি, কার্যত এসেনিরা বিবাহকে ঘৃণা করত। তবে তারা অন্যদের নম্র ও বাধ্য শিশুদের তাদের নিকটজন হিসেবে গ্রহণ করত এবং নিজেদের জীবন ধারায় তাদের গড়ে তুলত। এভাবেই শত শত বছর ধরে এসেনিরা তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পেরেছিল যদিও তাদের সমাজে কেন শিশুর জন্ম হত না। এভাবেই, টেম্পল অব শলোমন বা শলোমন মন্দিরের প্রধান ঈমাম জাকারিয়া বৃদ্ধ বয়সে যখন একটি পুত্র সন্তান লাভ করেন তিনি তাকে এসেনিদের আদিম পরিবেশে পাঠিয়ে দেন এবং সেখানেই সে বেড়ে ওঠে। ইতিহাসে সেই জন দি ব্যাপটিষ্ট (John the Baptist) নামে পরিচিত।

ইহুদীরা মনে করত যে, মেসিয়াহ নামে একজন নয়া নেতার আবির্ভাব ঘটবে। তিনি খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত হবেন এবং তাদের রাজাকে হত্যা করবেন।

যিশুর বাল্যকালে একটি গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে যে, জন এসেনি সম্প্রদায়ের কাছ থেকে চলে এসেছেন এবং নির্জনে বাস করছেন। তার পরনে রয়েছে শুধু মাত্র উটের লোমের তৈরি একটি বস্ত্র এবং কোমরে রয়েছে চামড়ার বন্ধনী। তিনি শুধু ফল-মূল এবং বন্য মধু আহার করেন:-(মথি ৩ঃ৪)। তিনি সরাসরি লোকজনের মধ্যে ধর্মপ্রচার করেন। 

তিনি জনগণের মধ্যে আলোড়ন তুলেছেন। তিনি যিহোভার দিকে ফিরে আসার জন্য সকলের প্রতি ডাক দিয়েছেন এবং সকলকে আশ্বাস দিয়েছেন যে, শিগগিরই ঈশ্বরের রাজত্ব প্রতিষ্ষ্ঠিত হবে। 

জনের উদাত্ত আহ্বান বিপুল সংখ্যক লোককে আকৃষ্ট করতে শুরু করল। তিনি এসেনিদের জীবনাচরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিলুপ্ত করলেন। সেটি ছিল- ”সম্প্রদায়ের কোন গুপ্ত বিষয়ই কারো কাছে প্রকাশ করা যাবে না- এমনকি নির্যাতনে মৃত্যু হলেও নয়” আগের মত কঠোর নিয়ম পালিত না হওয়ায় আন্দোলনের মধ্যে রোমানদের জন্যে গুপ্তচরের অনুপ্রবেশ ঘটানো সহজ হয়ে ওঠে। কিন্তু জন তার নবী সুলভ ক্ষমতাবলে এসব ছদ্মবেশী লোকদের পরিচয় জেনে ফেলতে সক্ষম হন। তিনি তাদের ‘বিষাক্ত সাপ’ বলে আখ্যায়িত করেন -(মথি ৩ঃ৭)। তার কনিষ্ঠ জ্ঞাতি যিশু এ আন্দোলনে যোগ দেন এবং সম্ভবত তিনি ছিলেন প্রথমদিকের অভিষিক্তদের অন্যতম। তার সর্বক্ষণের সঙ্গী বার্ণাবাসও সম্ভবত তার সাথেই দীক্ষা গ্রহণ করেন। যিশুর অন্য সঙ্গী ম্যাথিয়াসও তার সাথেই দীক্ষিত হন।

জন জানতেন যে, তিনি লড়াই শুরু করার আগেই ‘বিষাক্ত সাপেরা’ (Vipers) সফল হতে যাচ্ছে। কিন্তু যিশুর দীক্ষা গ্রহণের ফলে তিনি এতই সন্তুষ্ট হয়েছিলেন যে, তার মৃত্যুর সাথেই যে তার আন্দোলন শেষ হয়ে যাবে না, এ ব্যাপারে তিনি নিশ্চিন্ত ছিলেন। জন যেমনটি ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন, তেমনটিই হল। রাজা হেরোদ তার শিরচ্ছেদ করলেন। ফলে তার আন্দোলনের সকল ভার যিশুর কাঁধে এসে পড়ল। যিশু এসময় ছিলেন ৩০ বৎসরের যুবক। তার কাজের মেয়াদ ৩ বৎসরের বেশি স্থায়ী হয়নি। তিনি উপলব্ধি করেন যে, তার প্রস্তুতির কাল শেষ ও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। 

ঘটনা যা ইহুদীদের ইতিহাসে বারবার সংঘটিত হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই শাসকরা যখন তাদেরকে ঈশ্বরের সাথে নিজেদের সহযোগী ও অংশীদার করার চেষ্টা করেছে চূড়ান্তভাবে, তখনই ইহুদীরা বিদেশি হানাদারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। এক ঈশ্বরের বিশ্বাস এবং তিনি ছাড়া আর কেউ উপাস্য নন, তাদের এ ব্যাপারটি ছিল নিঃশর্ত ও সুস্পষ্ট। 

যিশুর জন্মের সময় রোমকরা পূর্ববর্তী শাসকদের ভুলেরই পুনরাবৃত্তি করেছিল। তারা মন্দিরে প্রধান ফটকের উপর একটি স্বর্ণ ঈগল স্থাপন করেছিল। এ বিষয়টি ইহুদীদের ক্রুদ্ধ করে তুলেছিল এবং এর ফলে রোমকদের বিরুদ্ধে উপর্যুপরি বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। ম্যাকাবিসের দু’জন অনুসারী প্রথম বিদ্রোহের পতাকা উত্তোলন করে। স্বর্ণ ঈগল ধ্বংস করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। রোমকদের কাছে এটা শুধু রাষ্ট্রদ্রোহিতাই ছিল না, তাদের ধর্মের জন্যেও এটা ছিল অবমাননার শামিল। বহু রক্তপাতের পর বিদ্রোহ দমন করা হয়। বিদ্রোহের দু’নেতাকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। এর অল্পকাল পরই রোমানদের আরেকটি বিদ্রোহের সম্মুখীন হতে হয়। এ যুদ্ধে ইহুদীদের পরাজয় ঘটে এবং ২ হাজার বিদ্রোহীকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়। 

ইহুদীরা পরাজিত হলেও তাদের মনের মধ্যে ক্রোধ ধিকিধিকি জ্বলছিল। ৬ সনে কর ধার্যের সুবিধার জন্যে সম্রাট অগাষ্টাস যখন ইহুদীদের জনসংখ্যা গণনার নির্দেশ দেন তখনও সে ক্রোধ অত্যন্ত উঁচুমাত্রায় বিরাজিত ছিল। দেবত্ব আরোপিত সম্রাটকে কর প্রদান করা ছিল তাওরাতের শিক্ষার বিপরীত। ইহুদীরা শুধু যিহোভাকেই রাজা বা সম্রাট বলে গণ্য করত। ফলে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। 

ইহুদীদের মধ্যে উদার মনোভাবাপন্ন অংশটি উপলব্ধি করল যে, এই লড়াই ইহুদীদের জন্যে পুরোপুরি গণহত্যায় পরিণত হবে। তারা সমঝোতার আবেদন করে কর প্রদান করতে সম্মত হওয়ার মাধ্যমে অর্থহীন আত্মহত্যা থেকে তাদের জনগণকে বাঁচাতে চাইল। যে নেতারা এই মূল্য দিয়ে শান্তি কিনলেন তারা জনপ্রিয় হননি, বরং তাদেরকে ইহুদী জাতির প্রতি বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। 

যিশুর জন্মকালীন সময় এবং জনের মৃত্যু পর্যন্ত সংঘটিত ঘটনার সাথে ঐ সময়ের বাস্তব ও সামাজিক পরিস্থিতির কথা ইতিমধ্যেই উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছি যেখানে সমগ্র প্রতিরোধ আন্দোলনই ঐশী অনুপ্রেরণায় উদ্দীপ্ত যিশুকে ঘিরে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল।

কোন কিছু করার আগে যিশুর ৪০ দিন নির্জনে বাস ও প্রার্থনা করা প্রয়োজন ছিল। তার বয়স তখন ছিল ৩০ বছর। ইহুদী আইন অনুযায়ী এটা ছিল সেই বয়স, যে বয়সে কোন মানুষ তার পিতার নিয়ন্ত্রণ মুক্ত হয়। কিন্তু যিশু এর আগে প্রকাশ্যে ধর্ম প্রচার করেননি। সুতরাং সতর্কতার সাথে তার প্রস্তুতি নেয়া প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। দূরদৃষ্টি ও বিচক্ষণতার সাথে তিনি ইহুদীদের সংগঠিত করার কাজ শুরু করলেন। তিনি কাউকে দীক্ষা দিলেন না। এটা অকারণে রোমানদের ব্যাপক দৃষ্টি আকর্ষণ করত এবং তা বিপজ্জনক অবস্থার সৃষ্টি করতে পারত। 

তিনি ইসরাইলের ১২টি গোত্রের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে প্রচলিত প্রথায় ১২ জন শিষ্য বা অনুসারী নিয়োগ করলেন। তারা আবার তাদের নেতৃত্বে কাজ করার জন্যে ৭০ জন দেশপ্রেমিককে নিয়োগ করল। ইহুদীদের আচারনিষ্ঠ ধর্মীয় সম্প্রদায় ফরীসীরা গ্রামের শক্ত সমর্থ ইহুদীদের (আম আল আরেজ -Am-Al Arez) সাথে শীতল সম্পর্ক বজায় রাখতে যিশু তাদের নিজের অধীনে নিয়ে এলেন। এই কৃষকদের মধ্যে অনেকেই এসেনি সম্প্রদায়ভূক্ত ছিল। তারা যিশুর ঈর্ষণীয় সমর্থকে পরিণত হয়। তার জন্যে তারা জীবন দিতে প্রস্তুত ছিল। তারা পরিচিত ছিল ধর্মযোদ্ধা (Zealots) নামে। বাইবেলের মতে, ১২ জন শিষ্যের মধ্যে অন্তত ৬জন ছিল ধর্মযোদ্ধা। 

যিশু মুসার শিক্ষা প্রত্যাখ্যান নয়, পুনঃপ্রচারের জন্যে আগমন করেছিলেন। তিনি ওল্ড টেষ্টামেন্টের আবেদন তুলে ধরলেন: “যে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং চুক্তি মেনে চলে, আমার পরেই তার স্থান” -ম্যাকাবিস ২ঃ২৭-৩১। বহু লোক তার অনুসারী হতে শুরু করে। কিন্তু তাদের গোপন স্থানে রাখা হত এবং নির্জন এলাকায় তাদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়। তাদের বলা হত ‘বার ইওনিম’ (Bar Yonim) অর্থাৎ ‘নির্জন স্থানের সন্তান’। তাদের মধ্যে যারা ছুরকার ব্যবহার শিক্ষা করেছিল তারা ‘সাইকারি’ (Sicarii) বা ‘চুরিকাধারী ব্যক্তি’ নামে পরিচিত ছিল। 

এ ছাড়া মুষ্টিমেয় কিছু লোককে নিয়ে এক ধরনের দেহরক্ষী দল তৈরি করা হয়। তারা পরিচিত ছিল ‘বার জেসাস’ নামে পরিচিত লোকের কথা উল্লেখ করেছেন। তা সত্ত্বেও এসব লোকদের ঘিরে এক ধরনের রহস্য বিরাজ করত। ফলে তাদের সম্পর্কে বেশি কিছু জানা যায় না। এটা বোধগম্য। কারণ তারা ছিল যিশুর অনুসারী ঘনিষ্ঠ মহলটির অংশ। তাই রোমান গুপ্তচরদের চোখের আড়ালে রাখার জন্য তাদের পরিচয় গোপন রাখা হত। 
অনুসারীদের যিশু নির্দেশ দিলেন- “যার টাকার থলি আছে তাকে সেটা নিতে দাও, সে তাই নিয়ে থাক, এবং যার কোন তরবারি নেই তাকে তার পোশাক বিক্রি করতে দাও যাতে সে একটি কিনতে পারে।” -লূক ২২ঃ৩৬। যিশুর শিক্ষা অলৌকিক কর্মকাণ্ডে অনুপ্রাণিত হয়ে তার অনুসারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এসব প্রস্তুতির ফল দাঁড়াল এই যে, পিলেটের উত্তরসুরী সোসিয়ানাস হিয়েরোকলস খোলাখুলিই বললেন যে যিশু ৯’শ ডাকাতের একটি দলের নেতা (‘চার্চ ফাদার’ ল্যাক্টানিয়াস কর্তৃক উদ্ধৃত)। যোসেফাসের রচিত গ্রন্থের মধ্যযুগীয় হিব্রু অনুলিপি থেকে দেখা যায়, যিশুর সাথে ২ হাজার থেকে ৪ হাজার সশস্ত্র অনুসারী ছিল।

এসেনিদের অনুসৃত ধর্মাদর্শ থেকে যাতে বেশি দূরে সরে না যান, সেদিকে যিশুর সতর্ক দৃষ্টি ছিল। তিনি জানতেন যে, এসেনিদের ধর্মগ্রন্থের প্রতি পৃষ্ঠাতেই গসপেল ও ঈশ্বর প্রেরিত দূতদের আচার অনুষ্ঠান ও নীতিবাক্য রয়েছে। ধর্মপ্রচার কালে যিশু তার শিক্ষা ও আদর্শ সম্পূর্ণরূপে তার অনুসারীদের কাছে প্রকাশ করেননি। মূলত, পূর্ণ সত্যটি মাত্র অতি অল্প কয়েকজনের জানা ছিল। “তোমাদের কাছে আমার এখনও অনেক কিছু বলার বাকি আছে। কিন্তু তোমরা সেগুলো বহন করতে পারবে না। যা হোক, সেই তিনি অর্থাৎ সত্য আত্মা যখন আগমন করবেন, তখন তিনি তোমাদের পূর্ণ সত্যের পথে পরিচালিত করবেন, কিন্তু তিনি নিজে থেকে কিছু বলবেন না। তিনি যা শুনবেন, তাই তিনি বলবেন।” -যোহন, ১৬:১২-১৪.

তিনি কোন জাগতিক ক্ষমতা চাননি। তাই তিনি দেশের শাসক যেমন হতে চাননি, তেমনি চাননি ধর্মশাস্ত্রবিদ হতে বা প্রভাবশালী ইহুদী চক্রের নেতৃত্ব। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে তার বিপুল জনপ্রিয়তা দেখে ও তার অনুসারীদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে রোমকরা এবং তাদের সমর্থক ইহুদী আলেমরা শঙ্কিত হয়ে ওঠে যে তিনি বোধ হয় শাসন ক্ষমতা দখল করতে চাইছেন। নিজেদের ক্ষমতার প্রতি হুমকি সৃষ্টি হতে যাচ্ছে ভেবে তারা তাকে নিশ্চিহ্ন করার জন্যে দ্রুত সচেষ্ট হয়ে ওঠে।

যিশুর একমাত্র লক্ষ্য ছিল স্রষ্টা যেমনটি নির্দেশ করেছেন তদনুযায়ী উপাসনার পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা। ঐশী নির্দেশিত পন্থায় চলার পথে যে বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করবে তার সাথে লড়াই করার জন্যে যিশু ও তার অনুসারীরা প্রস্তুত ছিলেন। 

প্রথম লড়াইটি সংঘটিত হয় রোমকদের অনুগত ইহুদীদের সাথে। এ যুদ্ধে যিশুর পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ‘বার জেসাস’ (Bar Jesus) বারাব্বাস (Barabbas) এ যুদ্ধে ইহুদী দলের নেতা নিহত হলে তারা সম্পূর্ণরূপে মনোবল হারিয়ে ফেলে। কিন্তু বারাব্বাস গ্রেফতার হন। 

পরবর্তী লক্ষ ছিল শলোমনের মন্দির। এ মন্দিরের কাছেই রোমকদের একটি শক্তিশালী বাহিনী ছিল, কারণ সেটা ছিল বাৎসরিক উৎসবের সময় এবং পূর্ব উপলক্ষে ভোজোৎসব (Feast of the Passover) ছিল আসন্ন। এ রোমক সৈন্যরা বৎসরের এ সময় সাধারণভাবে ছোট-খাট গোলযোগের জন্যে প্রস্তুত হয়েই থাকত। তবে এবার তারা অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি সতর্ক ছিল। এরা ছাড়াও ছিল মন্দির পুলিশ যারা পবিত্র স্থানগুলো পাহারা দিত। যিশুর মন্দির অভিযানটি এমনই সুপরিকল্পিত ছিল যে রোমক সৈন্যরা ঘটনার সময় একেবারে হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। যিশু মন্দিরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। এই লড়াই ‘মন্দির শুদ্ধিকরণ’ (Cleansing of the Temple) নামে খ্যাত। যোহন এর গসপেলে এ ঘটনা নিম্নোক্ত ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে-

“যিশু মন্দিরে সেই সব ব্যক্তিদের দেখতে পেলেন যারা গরু, ভেড়া ও পায়রা বিক্রি করছিল। মুদ্রা বিনিময়কারীরা তাদের কাজে নিয়োজিত ছিল। যিশু চাবুকের আঘাত করে গরু ও ভেড়াসহ তাদের মন্দিরের বাইরে তাড়িয়ে দিলেন। তিনি মুদ্রা ব্যবসায়ীদের টাকাগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিলেন এবং তাদের টেবিলগুলোও উল্টিয়ে দিলেন।” -যোহন ২ঃ১৪

চাবুকের আঘাত সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে কারমাইকেল বলেন যে- “সেটা কার্যত ছিল এক বিরাট ঘটনা যে ক্ষেত্রে তারা মাত্র সহিংসতার আভাস দিয়েছিলেন এবং সন্দেহাতীতভাবে অতি সামান্যতম আঘাত মাত্র হেনেছিলেন। আমরা যদি শুধু সেই মন্দিরের আয়তন কল্পনা করি, যার ভিতর ও বাইরে সমবেত হয়েছিল বহু হাজার লোক, অসংখ্য সেবক, পুলিশ বাহিনী রোমক সৈন্যরা, পাশাপাশি মুদ্রা ব্যবসায়ীদের ব্যাপারে কিছু না বলে শুধু গরু বিক্রেতাদের প্রতিক্রিয়ার কথা ভাবি, আমরা দেখতে পাই যে, কাজটি ছিল বিস্ময়কর ব্যাপারের চাইতেও অনেক বেশি কিছু। চতুর্থ গসপেলে এ ঘটনার যে বর্ণনা রয়েছে, আসল ঘটনা ছিল একেবারেই ভিন্নতর। তারা বাস্তবতার বাইরে ঘটনাটিকে ‘ঐশ্বরিকীকরণে’র মাধ্যমে তাৎপর্যহীন করে ফেলেছেন।”

প্রতিটি যোদ্ধার এ বিষয়টি জানা ছিল যে, স্থানীয় পুলিশদের সহানুভূতি ছিল দেশ-প্রেমিকদের প্রতি, দখলদার সেনাবাহিনীর প্রতি নয়। এ বিষয়টি মন্দিরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার একটি কারণ হতে পারে। 

রোমকরা স্থানীয়ভাবে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হলেও তাদের শক্তি চূর্ণ হয়নি। তারা শক্তি বৃদ্ধির জন্যে সাহায্য চেয়ে পাঠালে নতুন সৈন্য দল জেরুজালেমের দিকে অগ্রসর হয়। জেরুজালেমের তোরণ রক্ষার লড়াই কয়েকদিন ধরে চলে। কিন্তু শেষপর্যন্ত দেশপ্রেমিক বাহিনীর তুলনায় রোমান বাহিনী অনেক বেশি শক্তিশালী প্রমাণিত হয়। তার সকল অনুসারী পিছু হটে যায়। এমনকি যিশুর ঘনিষ্ঠ শিষ্যরাও পলায়ন করে। তার সাথে মাত্র সামান্য কিছু মানুষ অবশিষ্ট ছিল। যিশু আত্মগোপন করলেন। রোমানরা তাকে খুঁজে বের করার জন্যে ব্যাপক তল্লাশি শুরু করে। 

যিশুর গ্রেফতার, ‘বিচার’ এবং ‘ক্রুশবিদ্ধ’ করা নিয়ে এত বেশি পরস্পর বিরোধী ও বিভ্রান্তিকর বিবরণ পাওয়া যায় যে তার মধ্য থেকে বাস্তবে কি ঘটেছিল তা জানা অত্যন্ত দুষ্কর। আমরা দেখতে পাই যে, রোমক সরকার স্বল্পসংখ্যক ইহুদীদের আনুগত্য ও সেবা লাভ করতে সক্ষম হয়েছিল। কারণ জেরুজালেমে রোমক শাসন অব্যাহত থাকলে এ বিশেষ মহলটির স্বার্থ রক্ষিত হত। 

যিশুর এক শিষ্য জুডাস ইস্কারিয়্যত (Judas Iscariot) যিশুকে গ্রেফতারের কাজে সাহায্য করার বিনিময়ে ৩০টি রৌপ্যখন্ড লাভের প্রতিশ্রুতি পেয়ে রোমকদের দলে ভিড়ে যায়। যে কোন ধরনের গোলযোগ এড়াতে রাতের বেলায় যিশুকে গ্রেফতার করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। যিশু যে স্থানে তার কয়েকজন সঙ্গীসহ অবস্থান করছিলেন, সেখানে পৌঁছে জুডাসকে যিশুকে চুম্বন করার নির্দেশ দেওয়া হয়, যাতে বিদেশি রোমক সৈন্যরা সহজেই তাকে শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু পরিকল্পনাটি ভন্ডুল হয়ে যায়। সৈন্যরা অন্ধকারের মধ্যে দিশা হারিয়ে ফেলে। দু’জনকেই অন্ধকারের মধ্যে এক রকম মনে হচ্ছিল। সৈন্যরা ভুল করে যিশুর পরিবর্তে জুডাসকে গ্রেফতার করে। এরপরে যিশু পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। 

এ ব্যাপারে কোরআনে বলা হয়েছে: ”তারা তাকে হত্যা বা ক্রুশবিদ্ধ করেনি, কিন্তু তাদের এরূপ বিভ্রম হয়েছিল।”

বন্দীকে যখন রোমক বিচারক পিলেট-এর সামনে হাজির করা হল, ঘটনার নাটকীয়তা সকলকেই সন্তুষ্ট করেছিল। অধিকাংশ ইহুদী উল্লসিত হয়ে উঠেছিল এ কারণে যে অলৌকিকভাবে বিশ্বাসঘাতক নিজেই কাঠগড়ায় দণ্ডায়মান ছিল, যিশু নন। অন্যদিকে রোমকদের অনুগত ইহুদীরা খুশি হয়েছিল এ কারণে যে, জুডাসের মৃত্যু হলে তাদের অপরাধের প্রমাণ বিলুপ্ত হবে। উপরন্তু যেহেতু আইনের দৃষ্টিতে যিশুর মৃত্যু ঘটবে, সে কারণে তিনি আর প্রকাশ্য আত্ম প্রকাশ করে তাদের জন্যে কোন সমস্যা সৃষ্টি করতে পারবেন না। 

রোমক বিচারক পিলেট বিচার কাজে কী ভূমিকা পালন করেছিলেন তা জানা যায় না। বাইবেলে বলা হয়েছে যে তিনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন। ইহুদী নেতাদের প্রতি তার পক্ষপাতিত্ব ছিল, অন্যদিকে যিশুর প্রতিও তার সহানুভূতি ছিল। ফলে এ ব্যাপারে এমন এক কাহিনি তৈরি হয় যা বিশ্বাস করা কঠিন। গসপেলের লেখকরা যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করে তার সকল দায়-দায়িত্ব সমগ্র ইহুদী জাতির উপর চাপিয়ে দিতে এবং যিশুর কথিত মৃত্যুর দায় থেকে রোমকদের মুক্ত করার যে চেষ্টা চালিয়েছিলেন, তার ফলশ্রুতিতেও প্রকৃত ঘটনা তালগোল পাকানো হতে পারে।- এ ক্ষেত্রে একমাত্র পথ হতে পারত এই ঘটনা সম্পর্কে এমন একটি সরকারী বিবরণ যা দেশি শাসকদের জন্যে ক্ষতিকর হত না এবং সেখানে কর্তৃপক্ষ যাতে অসন্তুষ্ট বা ক্রুদ্ধ না হয় সে জন্যে প্রকৃত ঘটনা প্রয়োজন বোধে কিছুটা ঘুরিয়ে লেখা। আর তৎকালীন পরিবেশে শুধু এ ধরনের বিবরণই টিকে থাকা সম্ভব ছিল।

অতএব একটি শক্তিশালী সূত্রে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে যে, পিলেট ৩০ হাজার পাউন্ডের সমপরিমাণ অর্থ ঘুষ গ্রহণ করেন। গসপেলে যা বর্ণিত হয়েছে, তা যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে এটা নিশ্চিত যে, সেদিন জেরুজালেমে যে নাটক অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে পিলেট একটি বিশেষ মহলের স্বার্থে কাজ করেছিলেন।

সর্বশেষ আর একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়। মিশর ও ইথিওপিয়ার কপ্টিক চার্চের সন্তদের ক্যালেন্ডারগুলো থেকে দেখা যায়, পিলেট ও তার স্ত্রী ‘সন্ত’ (Saint) হিসেবে গণ্য হয়েছেন। এটা শুধু তখনই হওয়া সম্ভব যদি মেনে নেয়া যায় যে পিলেট সৈন্যদের ভুল ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত ছিলেন এবং তিনি জেনে শুনেই জুডাসকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে যিশুকে পালিয়ে যাবার সুযোগ করে দেন। 

বার্ণাবাসের বিবরণে বলা হয়েছে যে, গ্রেফতারের সময় স্রষ্টার ইচ্ছায় জুডাস, যিশুর চেহারায় পরিবর্তিত হন এবং তা এতই নিখুঁত ছিল যে তার মাতা ও ঘনিষ্ষ্ঠ অনুসারীরাও তাকে যিশু বলেই বিশ্বাস করেছিলেন। জুডাসের মৃত্যুর পর যিশু তাদের কাছে হাজির না হওয়া পর্যন্ত তারা বুঝতেই পারেননি যে প্রকৃতপক্ষে কি ঘটে গেছে। এ থেকেই বোঝা যায়, তৎকালীন পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে কেন এই বিভ্রান্তি ঘটেছিল এবং কেন কোন কোন লেখক এ ঘটনার বর্ণনা করতে গিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থেকেও যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর ভ্রান্ত কথা সমর্থন করে গেছেন।

যিশুর সাথে বিশ্বাসঘাতকতাকারী বলে উল্লেখিত ব্যক্তি ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন কিনা সে ব্যাপারে সকলেই সম্পূর্ণ একমত নন। গোড়ার দিকের খৃষ্টানদের মধ্যে করিন্থিয়ানস ও পরে ব্যাসিলিডিয়ানস যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। তারা বিশ্বাস করতেন যে যিশুর বদলে সাইরিন এর সাইমন (Simon of Cyrene) ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন। পিটার, পল ও জন এর সমসাময়িক করিন্থিয়ানস যিশুর পুনরুত্থানের কথাও স্বীকার করেন। গোড়ার দিকের আরেকটি খৃষ্টান সম্প্রদায় কার্পোক্রেশিয়ানরা বিশ্বাস করত যে যিশু নয়, হুবহু তার মত দেখতে তার এক অনুসারীকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছে। চতুর্থ শতাব্দীর মানুষ প্লাটিনাস বলেছেন যে তিনি ‘দি জার্নি’স অব অ্যাপোসলস, (The Journies of the Apostles) নামক একটি গ্রন্থ পাঠ করেন যা পিটার, জন, অ্যান্ড্রু, টমাস ও পলের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে রচিত হয়েছিল। অন্যান্য বিষয়ের সাথে এখানেও বলা হয়েছে যে যিশু ক্রুশবিদ্ধ হননি, তার স্থলে অন্য ব্যক্তি ক্রুশবিদ্ধ হয় এবং যারা বিশ্বাস করেছিল যে তারা ক্রুশবিদ্ধ করে তাকে হত্যা করেছে, তাদের তিনি উপহাস করতেন।

এভাবে দেখা যায়, যিশু ক্রুশবিদ্ধ হননি বলে জানা গেলেও সে কালের লেখকগণ বা ঐতিহাসিকরা যিশুর স্থলে কে ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করলেন তার ব্যাপারে মতপার্থক্যের শিকার কিংবা সুনির্দিষ্ট কিছু বলতে অপারগ। কেউ কেউ কিছুই বিশ্বাস করতে চান না।

যখন কেউ রোমান সৈনিকদের দৌরাত্ম্যের কথা বর্ণনা করেন তিনি আক্ষরিক ভাবেই ওল্ড টেস্টামেন্টের নির্দিষ্ট কয়েকটি অনুচ্ছেদের পুনরাবৃত্তি করেন.....তখনই পুরো বিষয়টিই নিছক কল্পনাপ্রসূত আবিষ্কার বলে সন্দেহ জেগে ওঠে।

বার্নাবাসের গসপেল ও কোরআন ছাড়া যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার পর কি ঘটেছিল, সে সম্পর্কে কোন ঐতিহাসিক তথ্য নেই। উক্ত বার্নাবাসের গসপেল ও কোরআনে এ ঘটনার বর্ণনা রয়েছে, যাকে ৪টি স্বীকৃত গসপেলেই ‘ঊর্ধ্বারোহন’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে- যার অর্থ তাকে পৃথিবী থেকে তুলে নেয়া হয়েছিল। 

সমাপ্ত।
উৎস: Jesus- A Prophet of Islam- by Muhammad Ata ur-Rahim.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন