pytheya.blogspot.com Webutation

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৩

Hadith: হাদিস ও সুন্নাহর বাধ্যবাধকতা- একটি পর্যালোচনা।

কোরআন বিশ্বাসীদেরকে একাধিকবার এটা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, পূর্ববর্তী জাতিসমূহ ধ্বংস হয়েছিল সৎপথ বিচ্যূত হবার কারণে। আর তাদের এই বিচ্যূতি ঘটেছিল অন্ধভাবে আলেম ও ঈমামদের হাদিসসমূহ অনুসরণ এবং খোদায়ী গ্রন্থকে পিছনে ফেলে রাখার কারণে। আর আমাদের পূর্বপুরুষগণ ইহুদি ও খৃষ্টানদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে আবিস্কার করেছেন এক গাদা ধর্মীয় ধারণা, লিখেছেন বহু সংখ্যক কিতাব এবং সেগুলিকে নিজেদের ধর্মের ভিত্তি করে নিয়েছেন।-(কোরআন, ২৩:৫২-৫৬; ৪২:২১) তারা "খোদায়ী ধর্ম"-কে পরিবর্ধন করে তৈরী করেছেন একটা জয়েন্ট স্টক ধর্ম, যা মূলত: প্রতিষ্ঠিত হয়েছে খোদা, রসূলুল্লাহ, রসূূলুল্লাহর পরিবার, সাহাবী, সাহাবীগণের উত্তরসূরী, ঈমাম ও আলেমগণের দ্বারা। আর এসব তেমনি হয়েছে যেমনটা নবীজী বলেছেন- 

আবু সাঈদ খুদরী বর্ণিত: রসূলুল্লাহ বলেন, "তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তী জাতি ও সম্প্রদায়ের নীতি ও পন্থা "বিঘতে বিঘতে ও হাতে হাতে" (হুবহু) অনুসরণ করবে। এমনকি তারা যদি গুইসাপের গর্তেও প্রবেশ করে থাকে, তবুও তোমরা তাদের অনুকরণ করবে। -সহীহ মুসলিম, খন্ড ৮, পরিচ্ছেদ-৫০, অনুচ্ছেদ ১, হাদিস ৬৫৯১, ৬৫৯২, ৬৫৯৩|

খোদায়ী ধর্মের ভিত্তি হল কোরআন, যা কিনা সম্পূর্ণ, নিখূঁত এবং বিস্তারিত। অর্থাৎ এই ধর্মকে ব্যাখ্যা করার জন্যে অন্যকোন কিতাবের দরকার নেই, অন্যকিছু অনুসরণেরও দরকার নেই। কেননা, খোদায়ী কিতাবের আদেশ-নিষেধের বাইরে অন্যকিছু অনুসরণ মানবকে সত্যপথ বিচ্যূত করবে। যেমন-

“আর তোমার প্রভুর বাণী (which He sent down in parts in different periods considering the conditions of each period) সম্পূর্ণ হয়েছে (with the Qur’an) সত্যে (with respect to the essentials of belief, principles of worship and good conduct, the rules to govern human life, and all the tidings it gives considering the past and future including the Hereafter) ও ন্যায়ে (regarding all the commandments it contains)। তাঁর বাণী (the laws He has established for life, and the operation of the universe; attempting to interfere with them will bring about great disasters, so no one must ever attempt to change His commandments, which are contained in the Book) কেউ বদলাতে পারে না; আর তিনিই সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞাতা (Who knows every need of every creature, every requirement of every age, just as He knows how you respond to His commandments)।”-(৬:১১৫) 

“তাবে কি আমি আল্লাহ ছাড়া অন্যকে বিচারক খুঁজব যখন তিনিই সেইজন যিনি তোমাদের কাছে অবতারণ করেছেন এ কিতাব, বিশদভাবে ব্যাখ্যাকৃত (সবকিছু)?”-(৬:১১৪) এর পরে আর কোন হাদিসে তারা তবে বিশ্বাস করব্? -(৭:১৮৫)

“ওরা যা বলে আমরা তা ভাল জানি, আর তুমি তাদের উপরে জবরদস্তি করার লোক নও। সুতরাং তুমি কোরআন নিয়ে স্মরণ করিয়ে চলো তার প্রতি যে আমার প্রতিশ্রুতিকে ভয় করে।” -(৫০:৪৫)

“তাদের কাহিনীর মধ্যে অবশ্যই শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে বোধশক্তি সম্পন্নদের জন্যে। এ (the Qur’an, which contains them) এমন কাহিনী নয় যা জাল করা হয়েছে। বরং এ হচ্ছে (a Divine Book revealed as) এর আগে যা এসেছিল তার সমর্থণকারী (the Divine authorship of and the truths still contained by), এবং সব বিষয়ের বিস্তারিত বৃত্তান্ত, আর পথনির্দেশ ও করুণা যারা বিশ্বাস করে সেই সম্প্রদায়ের জন্যে।” -(১২:১১১)

“আল্লাহ অবতারণ করেছেন, সর্বাপেক্ষা উত্তম হাদিস; একখানা গ্রন্থ সুবিন্যস্ত, এবং উভয় পথ নির্দেশ করেছেন (স্বর্গ ও দোযখের দিকে)। এতে যারা তাদের প্রভুকে ভয় করে তাদের ত্বক শিউরে ওঠে, তারপর তাদের শরীর মন সাড়া দেয় খোদায়ী বাণীতে। এমনই খোদার পথনির্দেশণা তিনি এ (পথনির্দেশণা) যাকে ইচ্ছে তাকে দেন। আর যাদেরকে তিনি পথভ্রষ্ট হতে দেন, কোনকিছুই তাদেরকে গাইড দিতে পারে না।” -(৩৯:২৩)

“এইসব হচ্ছে আল্লাহর বাণী যা আমরা আবৃত্তি করছি তোমার কাছে যথাযতভাবে। সুতরাং আল্লাহ ও তাঁর বাণীর পরে আর কোন হাদিসে তারা বিশ্বাস করবে?”

“আর, “নি:সন্দেহে তোমাদের ধর্ম, একটাই ধর্ম এবং আমিই তোমাদের প্রভু, সুতরাং আমাকে ভয় করো।” কিন্তু মানুষ তাদের ধর্ম নিজেদের মধ্যে টুকরো টুকরো করে ফেলল। প্রত্যেক দলই তাদের কাছে যা রয়েছে তাতে সন্তুষ্ট। সুতরাং তাদের থাকতে দাও তাদের বিভ্রান্তিতে কিছুকালের জন্য। তারা কি ভাবে যে, যেহেতু আমরা তাদের ধনসম্পদ ও সন্তানসন্তুতি দিয়ে যাচ্ছি,- আমরা তাদের জন্য মঙ্গলময় বস্তু ত্বরান্বিত করছি? না, তারা বুঝতে পারছে না।” -(২৩:৫২-৫৬)

“অথবা, তাদের কারণে কি অংশীদাররা রয়েছে যারা তাদের এমন এক ধর্মের বিধান দেয় যার জন্যে আল্লাহ কোন অনুমতি দেননি? আর যদি একটি সিদ্ধান্তপূর্ণ একটি বাণী না থাকত তাহলে নিশ্চয় তাদের মধ্যে মিমাংসা হয়েই যেত। আর অবশ্য অনাচারীরা- তাদের জন্যে রয়েছে মর্মন্তদ শাস্তি।”-(৪২:২১)

“আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আছে যে অন্যের সামনে ভিত্তিহীন হাদিস উপস্থাপন করে যেন সে তাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যূত করতে পারে কোন জ্ঞান না রেখেই এবং যে তা ঠাট্টা-বিদ্রুপরূপে গ্রহণ করে। এদের জন্যে রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।”-(৩১:৬), ইত্যাদি

এখন এই যদি হয় বাস্তবতা, তাহলে ‘সহীহ সিত্তা’ বলে খ্যাত কিতাবগুলির বাধ্যবাধকতা কতটুকু? এ জানতে প্রথমেই আমরা নজর দেব নবীজীর আদেশ-নির্দেশের প্রতি। কেননা, এসবের প্রয়োজন থাকলে তিনি অবশ্যই তা লিপিবদ্ধের আদেশ দেবেন, যেমনটা তিনি করেছিলেন কোরআনের ক্ষেত্রে। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, ইতিহাস ও গ্রন্থিত এসব হাদিসের গ্রন্থগুলি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এটা সুনিশ্চিত হয় যে, নবীজী হাদিস লিখনীর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। অর্থাৎ প্রচলিত হাদিসের গ্রন্থগুলি গ্রন্থিত হয়েছে নবীজীর ইচ্ছে ও আদেশের বিপরীতে। যেমন-

ক). ইবনে সাঈদ আল-খুদরী বর্ণিত- আল্লাহর রসূল বলেন, “কোরআন ছাড়া অন্যকোন কিছু আমার কাছ থেকে লিখ না। কেউ যদি কোরআন ছাড়া অন্যকিছু লিখে থাক অবশ্যই তা মুছে ফেলবে।” -মুসনাদ অব আহম্মদ, ভলিয়্যূম ১, পৃষ্ঠা ১৭১, সহীহ মুসলিম, জুদ, বুক ৪২, নাম্বার ৭১৪৭; ইবনে হাম্বল ৩/১২, ২১, ৩৯। 

খ). ইবনে সাঈদ আল-খুদরী বর্ণিত- “আমি হাদিস লিখে রাখার জন্যে আল্লাহর রসূলের অনুমতি চেয়েছিলাম, কিন্তু তিনি আমাকে তা দিতে অস্বীকার করেন।”-তাকীদ আল-ইলম,-আল খতিব আল বাগদাদী।

গ). আবু হুরায়রা বর্ণিত: আল্লাহর নবী আমাদের কাছে এলেন যখন আমরা তার হাদিস লিখছিলাম, বললেন, “তোমরা কি লিখছ?”
আমরা বললাম, “ও আল্লাহর রসূল, হাদিস, যা আমরা আপনার কাছ থেকে শুনি।”
তিনি বললেন, “আল্লাহর কিতাব ছাড়া আরেকটা কিতাব?”
আমরা বললাম, “ আমরা কি আপনাকে নিয়ে কথাবার্তা বলতে পারি?”
তিনি বললেন, “আমাকে নিয়ে বল, তা অবশ্য ভাল, কিন্তু যারা মিথ্যে বলবে তারা দোযখী হবে।”
আবু হুরায়রা বলেন, “আমরা হাদিসের যা লিখেছিলাম তা সংগ্রহ করে আগুনে পুড়িয়ে ফেললাম।” -ইবনে আল সালাহ, উলুম আল-হাদিস।

ঘ). আবু হুরায়রা বর্ণিত- নবীজী জানতে পারলেন কিছু লোক তার হাদিস লিখছে। তিনি মসজিদের পুলপিটে দাঁড়ালেন এবং বললেন, “এই বইগুলো কি যা আমি শুনতে পেলাম তোমরা লিখছ? আমি কেবল একজন মানুষ। যার কাছে এমন কোন লেখা আছে তা এখানে নিয়ে এস।” আবু হরায়রা বলেন, “আমরা সেগুলো সব সংগ্রহ করলাম এবং তা আগুনে পুড়িয়ে ফেললাম।”- তাকীদ আল-ইলম, আল-খতীব আল বাগদাদী।

যদিও বিবি আয়েশা, হযরত ওমর ও হযরত আলী আবু হুরায়রাকে মিথ্যেবাদী ও হাদিস বিকৃতকারী হিসেবে মুসলমানদের সতর্ক করেছেন এবং তাদের এই সতর্কবাণীতে সাড়া দিয়ে শিয়াগণ তার বর্ণিত হাদিস বর্জন করে থাকেন, তদুপরি আমরা হুরায়রা বর্ণিত হাদিস এখানে উল্লেখ করেছি একারণে যে, তিনি যত বিতর্কিত ব্যক্তিই হন না কেন, তার বর্ণিত অসংখ্য হাদিস (৫,৩৭৪টি) হাদিসের সংকলনগুলিতে রয়েছে, (ইবনে হাম্বলের মুসনাদেই রয়েছে হুরায়রা বর্ণিত ৩,৮৪৮টি হাদিস, বুখারীতে ৪৪৬টি) ফলে, অন্যকোন মূল্য না থাকলেও দলিল হিসেবে এগুলোর যথেষ্ট মূল্য রয়েছে। আর তাই তার বর্ণিত হাদিসগুলিও আমাদের আলোচনা বহির্ভূত নয়।

যাইহোক, মূল প্রসঙ্গে ফিরি। নবীজী কোরআন ব্যাতিত অন্যকিছু লিখে না রাখার জন্যে প্রকৃত বিশ্বাসীদেরকে আদেশ করেছিলেন। তার এ আদেশ খোলাফায়ে রাশেদীন যথাযতভাবেই পালন করেছিলেন। আবু বকর ৫০০টি হাদিস লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলেন। নবীজী তা জানার পর তাকে বলেছিলেন, "ওগুলো পুড়িয়ে ফেল।" এই আদেশের পর আবু বকর ততক্ষণ ঘুমাতে পারেননি যতক্ষণ না তিনি সেগুলো পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। -শেখ আব্দুর রশীদ নোমানী, তারিখ তাজিন-ই-হাদিস। এঘটনা অবশ্য বিভিন্ন জনের বর্ণনায় বিভিন্নভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, যেমন-

আবু ধা’বী বর্ণিত: আবু বকর নবীজীর ৫০০ হাদিস সংগ্রহ করে সেটি তার কন্যা আয়েশার নিকট গচ্ছিত রাখেন। পরেরদিন সকালে তিনি সেটা তার নিকট থেকে ফিরিয়ে নেন এবং তা ধ্বংস করে ফেলেন। এসময় তিনি বলেছিলেন, “আমি যা বুঝেছিলাম তাই লিখেছিলাম। এমনও সম্ভাবণা রয়েছে এতে এমন কিছু আছে যা আক্ষরিক অর্থে নবীজী যা ব্যক্ত করতে চেয়েছেন তার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।” -ইন্ট্রোডাকশন টু ইসলাম, ড: মুহম্মদ হামিদুল্লাহ, পৃষ্ঠা ৩৪,৩৫।

একইভাবে হযরত ওমর যখন জানতে পারলেন তার পুত্র আব্দুল্লাহ লিখিতরূপে কিছু হাদিস সংগ্রহ করে রেখেছেন, তখন তিনি তাকে ডেকে সেগুলি পুড়িয়ে ফেলতে আদেশ করেন। তিনি আরও বলেছিলেন, “অামি সুনান লিখতে চেয়েছিলাম, অার আমার মনে পড়ল পূর্ববর্তী লোকদের কথা, খোদার কিতাবকে পরিত্যাগ করে তারা অনুসরণের জন্যে অন্যান্য কিতাব লিখে নিয়েছিল। আর কসম, আমি কখনও খোদায়ী কিতাব কোনকিছুর সাথে প্রতিস্থাপন করিনি।” -জামি অাল-বাইয়ান আন তা’উইল আই আল-কোরআন, মুহম্মদ ইবনে জরীর আল-তাবারী। এঘটনা অবশ্য অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে ভিন্নভাবে, যেমন- 

মা’মর ইবনে রশিদ বর্ণিত: হযরত ওমর তার খেলাফতকালে হাদিস সংগ্রহের ব্যাপারে সাহাবীদের সাথে আলোচনা করলে, সকলে তাতে সম্মতি দিল, তথাপি ওমর ইতস্তত: করতে লাগলেন। তিনি এ বিষয়ে নির্দেশনার জন্যে একমাস খোদার নিকট প্রার্থনা শেষে এ কাজ না করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি বলেছিলেন, “পূর্ববর্তী লোকেরা খোদায়ী গ্রন্থকে অবহেলা করে কেবল নবীর আচার ব্যবহারের প্রতি মনোযোগ দিয়েছিল; আমি খোদায়ী কোরআন ও নবীজীর হাদিসের মধ্যে কোনরূপ বিভ্রান্তি সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরী করতে চাই না।” -ইন্ট্রোডাকশন টু ইসলাম, ড: মুহম্মদ হামিদুল্লাহ, পৃষ্ঠা ৩৪,৩৫।

“তারা কি লক্ষ্য করে না আকাশ মন্ডল ও পৃথিবীর প্রতি, এবং আর যা কিছু আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন? তাদের কাছে এমন কি কখনও ঘটেছে যে তাদের নির্ধারিত কাল হয়ত: ঘনিয়ে এসেছে? এরপর আর কোন হাদিস দ্বারা তারা তবে বিশ্বাস করবে?”- (৭:১৮৫)

তাই ওমর বলেছিলেন- “নবীজীর নিকট থেকে কোনকিছু লিখে রেখ না, কোরআনই আমাদের জন্য যথেষ্ট।” -(সহীহ বুখারী, জিহাদ ১৭৬, জিজিয়া ৬, ইলম ৪৯, মার্জা ১৭, মেগাজি ৮৩, ইতিশাম ২৬: সহীহ মুসলিম, অসিয়া ২০,২১,২২; আরও সহীহ বুখারী,৭:৭০:৫৭৩; সহীহ মুসলিম, অধ্যায় ৬, বুক ১৩, নাম্বার ৪০১৬) এবং তাই, তিনি নিশ্চিত করেছিলেন লোকদেরকে প্রতিজ্ঞায় বাধ্য করতে যে, তাদের অধিকারে যে হাদিসই আছে তা তারা তার কাছে হাযির করবে। আদেশ মত লোকেরা জমা দিল যা তাদের কাছে ছিল। তিনি তখন ঐ সব হাদিসসমূহ জন সম্মুখে আগুনে পুড়িয়ে ফেলতে আদেশ করেন। -ইবনে সা’দ, আল তাবাকাত আল কুবরা, ভলিয়্যূম ৫, পৃষ্ঠা ১৪১।

আর আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর বলেছেন- আল্লাহর রসূল একদিন আমাদের কাছে এলেন এবং কথা বললেন এমনভাব্ যেন তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। তিনি বললেন, “যখন আমি থাকব না তখন খোদার কিতাব আঁকড়ে থেক, হারাম করে দিও যা এ হারাম করেছে এবং হালাল করে নিও যা এ হালাল করেছে।” -মুসনাদ, আহমদ ইবনে হাম্বল। -লক্ষ্যণীয়, এই হাদিসে নবীজী কোরআনকে আঁকড়ে ধরার বিষয়ে জোর দিয়েছেন, কিন্তু তিনি হাদিস ও সুন্নাহর বিষয়টি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছেন।

আমরা আরও জানি, খলিফা ওমর চারজন বিশিষ্ট সাহাবীর উপর হাদিস বর্ণনাতে নিষেধাজ্ঞা জারী করেছিলেন এবং তাদেরকে একপ্রকার গৃহবন্দী করে রেখেছিলেন। এরা হলেন- ইবনে মাসউদ, আবু আল দর্দা, আবু মাসউদ আল আনসারী, ও আবু যর আল গিফারী। -খতিব আল বাগদাদী; আল জাহাবী, তাজকিরা আল হুফজ্জা। এরা প্রত্যেকে ছিলেন খাঁটি মুমিন, কিন্তু এদের অপরাধ ছিল এরা অধিকহারে হাদিস বর্ণনা করতেন। 

আর ওমর আবু হুরায়রাকে মিথ্যেবাদী সাব্যস্ত করে হাদিস বর্ণনাতে তার উপরও নিষেধাজ্ঞা জারী করেছিলেন। এতে হুরায়রা ওমরের জীবিতকাল অবধি আর কোন হাদিস বর্ণনা করেননি সত্য, কিন্তু তার মৃত্যুর পর আবার শুরু করেন। আর তাতে আবু সালমা হুরায়রাকে জিজ্ঞেস করেন, “তুমি কি এমন অধিক হাদিস ওমর আল-খাত্তাবের সময়েও বলে বেড়াতে যেমন তুমি আজকাল বলে বেড়াচ্ছ?”

তিনি উত্তর দেন, “যদি আমি ঐ সময় এমন করতাম, ওমর খাত্তাব নিশ্চয়ই চাবকে আমার চামড়া তুলে ফেলতেন।”

যতদূর জানা যায়, ৩য় খলিফা ওসমান কখনও হাদিসের প্রতি গুরুত্ব দেননি। একবার হযরত আলী পুত্র মুহম্মদ একটা কাগজ নিয়ে খলিফার নিকট আসেন। ঐ কাগজে যাকাত সম্পর্কিত নবীজীর একটি হাদিস লিখিত ছিল। খলিফা ওসমান মুহম্মদকে বলেন, তুমি কি অনুগ্রহ করে আমাকে এসব হাদিস থেকে দূরে রাখবে।.-অধ্যাপক আল্লামা হাফিজ আসলাম জয়রাজপুরী; এবং আল শেখ আজহির বিন সালেহর উদ্ধৃতি।

আরও রয়েছে, খলিফা ওসমান এক শুক্রবারের খুতবায় মিম্বরে দাঁড়িয়ে একথা বলেছিলেন, “কারও হাদিস বর্ণনা করার অধিকার নেই, যেমন তা ছিল না আবু বকর ও ওমরের খেলাফতকালে।” -(ইবনে সা’দ, আল-তাবাকাত আল কুবরা).-আর নবীজীর সাহাবাগণের মধ্যে আবু বকর ও ওমরের অবস্থান কোথায় তা নিশ্চয়ই ব্যাখ্যা করা লাগবে না। তদুপরি আমরা নীচের হাদিসটি উল্লেখ করলাম এখানে- “যখন আমি থাকব না তখন আমার দু’জন সাথীকে অনুসরণ কোরও- আবু বকর ও ওমর।” -আল-তিরমিযি, হাদিস ৬২২১।

৪র্থ খলিফা আলী ইবনে আবু তালিব তার এক ভাষণে বলেছিলেন- “আমি তাদের প্রতি জোরালো আহবান জানাচ্ছি যাদের কাছে লেখা আছে রসূলুল্লাহর কাছ থেকে, তাদেরকে বাড়ী ফিরে যেতে এবং তা মুছে ফেলতে। তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা ধ্বংস হয়েছিল কারণ তারা তাদের প্রভুর কিতাবকে ফেলে রেখে, তাদের আলেমদের হাদিসকে অনুসরণ করছিল।” -সুনান আল-দারামী; মুখতাসার, জা’মি বায়ান-ইল-ইলম, পৃষ্ঠা ৩৩।

এত সবের পরেও তবে হাদিস গ্রন্থিত হল কিভাবে? এটা জানতে আমরা এখন নজর দেব হাদিস গ্রন্থণার ইতিহাসের প্রতি এবং তারপর দেখব সেগুলিতে হাদিসের নামে প্রকৃতই কি রয়েছে।

নবীজীর নিষেধাজ্ঞা তার মৃত্যুর পর বলবৎ ছিল পরবর্তী ২০০ বৎসর। By that time, the lies about the prophet Muhammad was widespread and the people deserted the Qur'an to look for Hadiths, that is when the Khalifa Omar Ibn Abdel-Aziz issued an order to permit the writing of Hadiths and Sunna thinking that he would put an end to the lies about the Prophet Muhammad. -কিন্তু খলিফার উদ্দেশ্য সৎ হলেও নবীজীর আদেশ ও কোরআনের শিক্ষার বিপরীতে তার এ নির্দেশ ঐ সময় সমালোচিত হয়েছিল বহু আলেম ও স্কলার দ্বারা।

যাইহোক, খলিফা ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের আদেশ নামা জারির পর হাদিস সম্বলিত অনেক কিতাব ও কারারীর আবির্ভাব হয়েছিল, যেমন- ইবনে গ্রেগ, মালিক ইবনে আনাস, মুহম্মদ ইবনে ইসহাক। এসবের মধ্যে সব থেকে বিখ্যাত হল মালিক ইবনে আনাসের আল মুয়াত্তা। এতে ছিল ৫০০টি হাদিস। ২য় শতকের শেষভাগে এল আহমদ ইবনে হাম্বলের মুসনাদ। এতে ছিল ৪০ হাজার হাদিস। আর ৩য় শতকের প্রথমার্ধে এল বিখ্যাত হাদিসের ছয়টি কিতাব যা "সহীহ সিত্তা" নামে পরিচিত। আজকের দিনে অধিকাংশ স্কলার এই কিতাবগুলিই ব্যবহার করেন। আর এগুলো হল-

১.  সহীহ বুখারী।
২.  সহীহ মুসলিম।
৩.  সুনান আবু দাউদ।
৪.  সুনান আল তিরমিযি।
৫.  সুনান আল-না'সাঈ।
৬.  সুনান ইবনে মা’যা।

নবীজী হাদিস লেখনীতে তার নিষেধাজ্ঞার আদেশ পরবর্তীতে কখনও রহিত না করলেও হাদিসের কিতাবগুলিতে এমন হাদিসও দেখা যায় যেগুলো এমন ধারণা দেবে যে, পরবর্তীতে হাদিস লেখনীর বিষয়ে তিনি তার সিদ্ধান্তের পরিবর্তন এনেছিলেন। যেমন- নবীজী আমর ইবনে আ’সকে আদেশ করেন সবকিছু লিখে রাখতে যা তিনি বলেন।-ইবনে হাম্বল ২/১৬২। এই বর্ণনাকারী আমর ইবনুল আ’স এর ব্যক্তি-চরিত্রের স্বরূপ আমরা পরবর্তীতে "ঈমাম হাসান ইবনে আলীর বাগ্মিতা।"  নামক আর্টিকেলে দেখতে পাব।

আর পিতাকে সাপোর্ট দিয়েছে পুত্র- আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আ’স বর্ণিত: “আমি নবীজীর কাছ থেকে যা শুনতাম তা লিখে রাখতে শুরিু করি। আমি তা করতাম মুখস্ত করার মানসে। কুরাইশগণ আমাকে বাঁধা দিল, বলল, “আল্লাহর রসূল একজন মানুষ বৈ তো নন, তদুপরি কি তুমি সবকিছু লিখে রাখছ যা তার কাছ থেকে শুনো: তিনি কথা বলেন রাগে এবং আনন্দে?”
সুতরাং আমি লিখে রাখা বন্ধ করলাম এবং বিয়ষটি নবীজীকে জানালাম। তিনি নিজ মুখের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করলেন এবং বললেন, “লেখ, যার হাতে আমার জীবন তিনি স্বাক্ষী, কেবল সঠিকটাই এ থেকে বের হয়ে আসে।” -সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৩৬৩৯।

তবে এসব বর্ণনা যে দূর্বল ও জাল হাদিস, তার প্রমান পাওয়া যায় উপরে উল্লেখিত খোলাফায়ে রাশেদীনের অবস্থান পর্যালোচনায় এবং রসুলুল্লাহর মৃত্যুর ৩০ বৎসর পর সংঘটিত নিম্নবর্ণিত এই ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে।

জায়েদ ইবনে সাবেত (নবীজীর ওহী লেখকদের মধ্যে অন্যতম) খলিফা মুয়াবিয়ার সাক্ষাতে যান (এ ঘটনা নবীজীর মৃত্যুর ৩০ বৎসরেরও অধিককাল পরের । অনেকে অবশ্য এমনও বলেছেন, এঘটনা ৩০ বৎসর পরের একথা হাদিসে লিপিবদ্ধ নেই। -এই জ্ঞানীগণ এটা লক্ষ্য করেন না যে, প্রমানের জন্য মুয়াবিয়া নামের আগে "খলিফা" শব্দই যথেষ্ট।) এবং তাকে নবীজীর সম্পর্কে একটা ঘটনার কথা শুনান। ঐ কাহিনী মুয়াবিয়ার বেশ পছন্দ হয় এবং তিনি কাউকে তা লিখে রাখার আদেশ করেন। কিন্তু জায়েদ বলেছিলেন, "আল্লাহর রসূল কখনও তার হাদিসের কোনকিছু লিখে না রাখার জন্যে আমাদেরকে আদেশ করেছেন।" -মুসনাদ, আহমদ ইবনে হাম্বল, সুনান আবু দাউদ, বুক ২৫, নাম্বার ৩৬৪০।

এবার প্রচলিত হাদিসগ্রন্থগুলিতে কি গ্রন্থিত হয়েছে তার স্বরূপ উন্মোচন করতে প্রথমেই আমরা দৃষ্টি দেব বিদায় হজ্জ্বে নবীজীর দেয়া সর্বশেষ ভাষণের প্রতি। এই ভাষণ আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত থেকে স্ব-কর্ণে শুনেছিলেন প্রায় ৬০ হাজার মুসলিম। তদুপরি এই ভাষণ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে মুসলিমদের মধ্যেও এবং দারুণ কৌতুহলী যাকিছু, তা হচ্ছে এসব বক্তব্যের সবগুলির যথোপযুক্ত প্রমান ও একাধিক স্বীকৃত দলিল রয়েছে। যেমন-

শিয়া মতে- “আমি তোমাদের জন্যে যা রেখে গেলাম যদি তা তোমরা ধরে থাক, তবে তোমরা কখন্ই বিচ্যূত হবে না, তা হল- আল্লাহর কিতাব ও আমার পরিবার।” -সহীহ মুসলিম ৪৪/৪, নাম্বার ২৪০৮; ইবনে হাম্বল ৪/৩৬৬; দারিমী ২৩/১, নাম্বার ৩৩১৯।

সুন্নী মতে-“আমি তোমাদের জন্যে যা রেখে গেলাম যদি তা তোমরা ধরে থাক, তবে তোমরা কখন্ই বিচ্যূত হবে না, তা হল- আল্লাহর কিতাব ও আমার সুন্নাহ।” -আল মুয়াত্তা, মালিক ইবনে আনাস, ৪৬/৩।

অন্য মতে- “আমি তোমাদের জন্যে যা রেখে গেলাম যদি তা তোমরা ধরে থাক, তবে তোমরা কখন্ই বিচ্যূত হবে না, তা হল- আল্লাহর কিতাব।” -সহীহ মুসলিম ১৫/১৯, নাম্বার ১২১৮; ইবনে মা’যা ২৫/৮৪; আবু দাউদ ১১/৫৬।

আর কেবল “আল্লাহর কিতাব”- এই ভার্সনটি সুন্নী ও শিয়া মুসলিমদের নিকট সমভাবে ঘৃণিত ও পরিত্যাজ্য। এটাই হচ্ছে একমাত্র ভার্সন যা একমত কোরআনে পুন: পুন: উল্লেখের যে, মুহম্মদের বার্তা কেবলমাত্র কোরআন। অনেক সুন্নী এবং শিয়া মুসলিম এমনকি জানে না যে, বিদায় হজ্জ্বের ভাষণের এমন একটি ভার্সনের অস্তিত্ব আজও রয়েছে দলিল-দস্তাবেজসহ। বাস্তবতা হচ্ছে এই যে, তারা কেউ জানতেও চায় না। সত্যিই সত্য বড় কঠিন, তবে নিশ্চয়ই দোযখের আগুণের শাস্তি হবে আরও বেশী কঠিন।

যাইহোক, বিদায় হজ্জ্বের এই ভাষণ থেকে কি প্রমাণিত হয়? এ এই যে, সর্বাধিক লোকের উপস্থিতিতে বলা হাদিসের বর্ণণা নিয়েও মুসলিমদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। তাহলে নবীজীর মৃত্যুর ৩০০ বৎসর পর সংগৃহীত হাদিসগুলোর বিষয়ে কি বলা যাবে, যখন ঐসকল হাদিসের উৎস তথা মূল বর্ণণাকারী অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একজন?

এ বিষয়ে তাই কোন মন্তব্য করার আগে আমরা সর্বপ্রথম হাদিস সংগ্রাহক ও সংকলনগুলোর প্রতি দৃষ্টি ফেরাই। আমরা জেনেছি-

ক). ঈমাম বুখারী, পূর্ণ নাম- আবু আব্দুল্লাহ মুহম্মদ ইবনে ইসমাঈল বুখারী হিজরী ২৫৬/২৬০ সনে জন্মগ্রহণ করেন এবং সমরখন্দে মারা যান। তিনি সংগ্রহ করেছিলেন ৬,০০,০০০টি হাদিস, কিন্তু গ্রহণ করেন ৭,২৭৫টি (পুনরুল্লেখ ব্যতিত ২,৬৩০ বা ২,৭৬২) হাদিস। অর্থাৎ বর্জনের হার ৯৯ শতাংশ।

খ). ঈমাম মুসলিম, পূর্ণ নাম- আবু আল-হুসেন আসাকির আদ-দীন মুসলিম ইবনে আল-হাজ্জাজ ইরানের নিশাপুর, হিজরী ২০৪ সনে জন্মগ্রহণ করেন এবং হিজরী ২৬১ সনে মারা যান। তিনি সংগ্রহ করেছিলেন ৩,০০,০০০টি হাদিস, কিন্তু গ্রহণ করেন ৪,০০০/৪,৩৪৮টি হাদিস। অর্থাৎ বর্জনের হার ৯৯ শতাংশ।

গ). ঈমাম তিরমিযি, আবু ঈসা মুহম্মদ ইবনে ঈসা আস-সুলাইমানী আদ- জরির আল-বাঘী আত-তিরমিযি হিজরী ২০৯ সনে জন্মগ্রহণ করেন এবং হিজরী ২৭৯ সনে মারা যান। তিনি সংগ্রহ করেছিলেন ৩,০০,০০০ টি হাদিস, কিন্তু গ্রহণ করেন ৩,১১৫টি হাদিস। অর্থাৎ বর্জনের হার ৯৯ শতাংশ।

ঘ). ঈমাম আবু দাউদ, পূর্ণ নাম- আবু দাউদ সুলাইমান ইবনে আল আ’সাত আল-আজদি আস-সিজিস্তানী ইরানের সিস্তানে হিজরী ২০২ সনে জন্মগ্রহণ করেন এবং হিজরী ২৭৫ সনে মারা যান। তিনি সংগ্রহ করেছিলেন ৫,০০,০০০ টি হাদিস, কিন্তু গ্রহণ করেন ৪,৮০০টি হাদিস। অর্থাৎ বর্জনের হার ৯৯ শতাংশ।

ঙ). ঈমাম ইবনে মা’যা, পূর্ণ নাম- আবু আদুল্লাহ মুহম্মদ বিন জায়েদ ইবনে মা’যা উত্তর ইরানের কাজদিনে হিজরী ২০৯ সনে জন্মগ্রহণ করেন এবং মারা যান হিজরী ২৭৩ সনে। তিনি সংগ্রহ করেছিলেন ৪,০০,০০০ টি হাদিস, কিন্তু গ্রহণ করেন ৪,০০০টি হাদিস। অর্থাৎ বর্জনের হার ৯৯ শতাংশ।

চ). ঈমাম নাসাঈ, পূর্ণ নাম- আহমদ ইবনে সুহাইব ইবনে আলী ইবনে সিনান আবু আবদ আর-রহমান আল-নাসাঈ ইরানের খোরাসানে জন্মগ্রহণ করেন এবং মারা যান হিজরী ৩০৩ সনে। তিনি সংগ্রহ করেছিলেন ২,০০,০০০ টি হাদিস, কিন্তু গ্রহণ করেন ৪,৩২১টি হাদিস। অর্থাৎ বর্জনের হার ৯৮ শতাংশ।

ছ). ঈমাম আহমেদ ইবনে হাম্বল, পূর্ণ নাম- আহমদ বিন মুহম্মদ বিন হাম্বল আবু আবদ আল্লাহ আল শায়েবানী ৭৮০ সন বা ১৬৪ হিজরী, ইরাকের বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৮৫৫ সন বা ২৪১ হিজরীতে মারা যান। তিনি সংগ্রহ করেছিলেন ৭,০০,০০০টি হাদিস, কিন্তু গ্রহণ করেন ৪০,০০০টি হাদিস। অর্থাৎ বর্জনের হার ৯৪ শতাংশ।

গ্রহণ ও বর্জণের হার থেকে এটা প্রমাণিত হয় যে, হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে এ সতর্কবাণীর “Do not narrate a tradition unless you are so certain as if you are certain of the sun's light!” -উল্লেখ থাকলেও তৎকালীন মুসলিমগণ তা মানেনি বরং নিজেদের স্বার্থে তারা ইচ্ছেমত হাদিসকে বিকৃত করেছিল। আর তাই নবীজীর তিরোধানের ২-৩’শ বৎসরের মধ্যেই দেশ তথা মুসলিম সাম্রাজ্য ছয়লাব হয়ে গিয়েছিল জাল হাদিসে। ফলে সংগৃহীত হাদিস থেকে সঠিকগুলো বাঁছাই করতে গিয়ে সংগ্রহকারীগণকে এই বিপুল পরিমাণ হাদিস বর্জন করতে হয়েছিল। এই নয় কি?

এখন আমরা দেখব গৃহীত সেই ১ শতাংশ সহী হাদিসের অবস্থা। তবে প্রথমেই বলে রাখা ভাল, সংগ্রহকারীগণের উদ্দেশ্য ছিল কল্যাণকর এবং প্রচেষ্টা ও পরিশ্রম ছিল সীমাহীন। তবে তাদের হাদিস গ্রহণের নীতিমালা বা বাঁছাইরীতি সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত ছিল একথা বলা চলে না। কেননা-বিশ্লেষণে আমরা দেখতে পাব, সংগ্রাহক কর্তৃক সহীহ তকমা লাগান হাদিসগুলোর মধ্যে যেমন রয়েছে কোরআন বিরূদ্ধ হাদিস, তেমনি রয়েছে হাদিস বিরুদ্ধ হাদিস বা এমন হাদিস রয়েছে যা সাধারণ জ্ঞানে বতিলযোগ্য, রয়েছে নবীজীর চরিত্রের উপর কলঙ্ক আরোপকারী হাদিস।

আবার কি পরিপ্রেক্ষিতে, কোথায়,কখন, কার কার উপস্থিতিতে (স্থান-কাল-পাত্র)হাদিসটি বর্ণিত হয়েছিল তার পূর্ণ বর্ণনা বা "শানে নযূল" প্রতিটি হাদিসের আগে-পিছে নেই। তাছাড়া অধিকাংশ হাদিসের উৎস তথা মূল বর্ণনাকারী একজনই অর্থাৎ সেগুলো "আহাদ" হাদিস, অথচ সংগ্রহকারীগণ এটা ভুলে গেছেন যে, সঠিকত্বের মাপকাঠিতে কেবল “খাঁটি মুমিন” বিবেচ্য বিষয় নয়, বিবেচ্য ৪ জন স্বাক্ষীও বটে। [কেউ কি ভেবে দেখেছেন কেন খোদা সত্যতার স্বীকৃতির জন্যে ৪জন স্বাক্ষীর কথা বলেছেন? বা দু্’জন নারীর স্বাক্ষ্য ১জন পুরুষের সমান হয়? এ কি এ কারণে যে, একজনকে মিথ্যে স্বাক্ষ্যে রাজী করানো গেলেও ৪জনকে করা কঠিন বা নারীর স্বাক্ষ্যে আধা সত্য থাকে? মানুষ এমন ধারণা কারে কারণ তারা শয়তানের কথা ভুলে যায়, ভুলে যায় তার প্রবৃত্তির কন্ট্রোল রয়েছে শয়তানের হাতে। অার মানুষের ঐ দূর্বলতাকে পুঁজিকরেই ইবলিস আত্মঅহংকারে বলতে পেরেছিল  “আমি তাদের সকলের সর্বনাশ করব।” মূলত: জ্বিণের জন্যে একজন নারীর তুলনায় দ্বিগুণ কঠিন একজন পুরুষের মস্তিস্ক কন্ট্রোল করা এবং একই সাথে একই বিষয়ে তারা ৪জন পুরুষকে স্বতন্ত্র্যভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ]

এ প্রসঙ্গে এখানে উল্লেখ করা হল ফাদাকের জমিখন্ড বিষয়টি- নবীজী ফাদাকের জমিখন্ড ফাতিমাকে উপহার দিয়েছিলেন। কিন্তু খলিফা আবুবকর ফাতিমা বর্ণিত এই হাদিস গ্রহণ না করে স্বাক্ষী হাজির করার নির্দেশ দেন।হযরত আলী এবং দাসী উম্মে আয়মন স্বাক্ষ্য দিলেও "যথেষ্ট নয়" বলে খলিফা তা বাতিল করে দেন।

আবার উৎস ও বর্ণনাকারী কোন একজনের গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনায় আনলেও উভয়ের গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশে পরিত্যাগ করা হয়েছে। আর তাই সর্বাপেক্ষা সহীহ বলে সুন্নী মুসলিম সমাজে স্বীকৃত বুখারীর কিতাবে একজন বালকও সাহাবী হিসেবে স্বীকৃত হয়ে তার বর্ণিত হাদিস (যেমন- আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস। সে নিতান্তই বালক ছিল নবীজীর জমানায় এবং সে কখনও সাহাবী হিসেবে স্বীকৃত হয়নি। কিন্তু বুখারী তাকে সাহাবী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তার অনেক হাদিস তার কিতাবে স্থান দিয়েছেন। অন্য যেসব নাবালগদের বর্ণিত হাদিস বুখারী তার কিতাবে স্থান দিয়েছেন তারা হল- আল নুমান ইবনে বশীর (৮ বৎসর), মাহমুদ ইবনে আল রবি (৫ বৎসর), আব্দুল্লাহ ইবনে আল জুবায়ের (৯ বৎসর), আল-হাসান ইবনে আলী (৮ বৎসর), আল-হোসেন ইবনে আলী (৭ বৎসর), ওমর ইবনে আবি মুসলিমা (৯ বৎসর)----ইত্যাদি। কে এই সকল শিশুদের নিকট থেকে তার ধর্ম গ্রহণ করতে চাইবে?), এমনকি স্বীকৃত মিথ্যেবাদী হিসেবে পরিচিত ব্যক্তি আবু হুরায়রার (দেখুন আমার আর্টিকেল: শিয়াগণের আবু হুরায়রা বর্ণিত হাদিস বর্জন করার কারণ।) বর্ণিত হাদিসও সমানভাবে স্থান পেয়েছে বুখারীর কিতাবে।

সর্বোপরি, সাধারণ জ্ঞানে একথা বলা যায় যে, কোন কাহিনী যা বর্ণিত হয়ে আসছে ২০০-৩০০ বৎসর ধরে ৬ থেকে ১০ জন ভিন্ন ভিন্ন মানুষের ধারাবাহিকতায়, তা কোনভাবেই সঠিক হতে পারে না। (আর যদি সত্য হয়, তাহলে ইবলিস কি করেছে ঐ ২০০ বৎসর? সে কি শীতনিদ্রায় ছিল?) আর এ কথা কে না জানে যে, সহী জিনিষের গায়ে সহী তকমা লাগানোর কোন প্রয়োজন পড়ে না। আর যদি প্রয়োজন পড়তই, তবে নিশ্চয় কোরআনের গায়ে সর্বপ্রথম তকমা পড়ত সহীর।

যাহোক, হাদিস সংগ্রকারীগণের সতর্কতা সত্ত্বেও এতসব ত্রুটিপূর্ণ হাদিস কেন গৃহীত হল? এটা জানতে প্রথমে আমরা দেখি হাদিস গ্রহণের ক্ষেত্রে সংগ্রহকারীগণের নিকট কোন কোন বিষয় মানদন্ড ছিল? অনেকের মতে এই মানদন্ড হল-"সাহাবী হলেই তার বর্ণিত হাদিস গ্রহণযোগ্য, কারণ তারা ছিলেন খাঁটি মুমিন, ফলে তাদের দ্বারা কোন ভুল বা ভ্রান্তি হওয়া সম্ভব ছিল না।" আর তাদের এ যুক্তি কি সত্যি গ্রহণযোগ্য? আমি তো মনেকরি প্রকৃত মুমিন ব্যক্তিকেই সহজে প্রতারণার জালে আটকান যায়, কারণ, সত্য ও সুন্দরের চর্চায় নিজেকে গন্ডিবদ্ধ করার কারণে জগতের খারাপ দিকগুলোর সাথে মুমিন ব্যক্তির প্রাকটিক্যাল পরিচয় থাকে না। আর থাকলেও কিছু আসে যেত কি? [বেনসিরার এক গল্পে আমরা দেখেছি, ভালমন্দের জ্ঞানে প্রখর ফেরেস্তাকে শেয়াল কিভাবে বোকা বানিয়ে ফেলে। বেনসিরার ঐ কাহিনীতে ছিল- সৃষ্টির গোড়ার দিকে খোদা যখন সকল সামুদ্রিক প্রাণী সৃষ্টি করলেন, তখন ফেরেস্তা আজ্রাইলের উপর ভার পড়ল সেগুলো পানিতে ডুবিয়ে দেবার। এভাবে সে যখন শেযালকে (বেনসিরার গল্প মতে শেয়াল সামুদ্রিক প্রাণী হিসেবে সৃষ্ট হয়েছিল) পানিতে ডুবিয়ে দিতে যাবে, তখন সে ভোঁ ভোঁ করে কান্না জুড়ে দেয়। এতে আজ্রাইল অবাক হয়ে তাকে তার কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে সে জানায় যে, বন্ধুর জন্যে সে কাঁদছে যাকে ইতিমধ্যে পানিতে ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে। আজ্রাইল তার কথায় আরো অবাক হয়, কিন্তু যখন শেয়াল তাকে সমুদ্রের ধারে নিয়ে গিয়ে পানির মধ্যে তার বন্ধুকে দেখিয়ে দিল, তখন আজ্রাইল পানিতে শেয়ালের প্রতিবিম্ব দেখে ইতিমধ্যেে একটা শেযালকে পানিতে ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে বুঝতে পেরে তাকে ছেড়ে দেয়।]

আবার- বুখারীর মতামতটিকে যদি আমরা সত্য ধরি, তবে এটা কিভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে যে, বুখারী, তার এমন ৪৩৪ জন মুমিনের হাদিস তার কিতাবে স্থান দিয়েছেন যাদেরকে মুসলিম বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে গ্রহণ করেননি।অন্যদিকে মুসলিম এমন ৬২৫ জন বর্ণনাকারীর হাদিস তার কিতাবে স্থান দিয়েছেন যাদেরকে বুখারী বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে গ্রহণ করেননি। -আল মুস্তাদারেক।

ই একটা উদাহরণ থেকেই কি এটা বলা যায় না যে, হাদিস গ্রহণের ক্ষেত্রে সর্বজন স্বীকৃত কোন মানদন্ড আসলেই ছিল না এবং সংগ্রহকারীগণের প্রত্যেকে কেবল তাদের নিজস্ব বুদ্ধি-বৃত্তি কাজে লাগিয়েছেন? আর তৎকালীন জ্ঞান-বিজ্ঞান আজকের দিনের মত অগ্রসরমান না হওয়াতে তারা সকল নিয়ম মেনে যাঞ্চাই-বাঁছাই শেষে সহীহ তকমাটি হাদিসের গায়ে লাগাতে ব্যর্থ হওয়াতে আজ আমাদের সম্মুখে ভুলে ভরা হাদিসসমূহ উপস্থাপিত হয়েছে?

আবার “সাহাবী হলেই তার বর্ণিত হাদিস গ্রহণযোগ্য, কারণ তারা ছিলেন খাঁটি মুমিন, ফলে তাদের দ্বারা কোন ভুল বা ভ্রান্তি হওয়া সম্ভব ছিল না” এই মতবাদে বিশ্বাসী সংগ্রহকারীগণ সাহাবীর সংজ্ঞা বুঝতে ভুল করাতেও ভুলে ভরা হাদিস সংকলিত হবার একটা বড় কারণ বলে আমাদের বিশ্বাস। আর তাই আমরা এখন সাহাবীর সংজ্ঞার দিকে নজর ফেরাব। বিভিন্ন মনীষীর মতে সাহাবীর সংজ্ঞা এমন-

ক). বুখারীর মতে: সাহাবী হচ্ছে সেই যে নবী মুহম্মদের সংস্পর্শে ছিলেন বা কেবল তাকে দেখেছেন। -এই সংজ্ঞা কিন্তু কোরআন সাপোর্ট করে না। কোরআনে মদিনার বহু মুনাফেক এবং দুষ্টু লোকের কাহিনী রয়েছে যারা নবীজীকে দেখেছে এবং তার বাণীও শুনেছে, কিন্তু তারা সাহাবা হিসেবে গণ্য হতে পারে না, যেমনটা বুখারী করেছেন।

আর বেদুইনদের মধ্যের যারা তোমার আশেপাশে আছে তাদের মধ্যে রয়েছে মুনাফেকরা, আবার মদিনার বাসিন্দাদের মধ্যেও-ওরা কপটতায় নাছোড়বান্দা। তুমি তাদের জানো না; আমরা ওদের জানি।..”-(৯:১০১)।

“মুনাফেকরা যখন তোমার কাছে আসে তখন তারা বলে, “আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমিই আল্লাহর রসূল।” আল্লাহ জানেন যে তুমি তাঁর রসূল, এবং আল্লাহ সাক্ষী দিচ্ছেন যে মুনাফেকরাই মিথ্যেবাদী।” -(৬৩:১)

“যদি মুনাফেকরা ও যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে তারা, আর শহরে গুজব রটনাকারীরা না থামে, তাহলে আমরা নিশ্চয়ই তোমাকে তাদের উপরে ক্ষমতা দেব, তখন তারা সেখানে তোমার প্রতি্বেশী হয়ে থাকবে না অল্পকাল ছাড়া-”-(৩৩:৬০)

খ). হাম্বলীর মতে: “যে কেউ নবীজীর সংস্পর্শে ছিলেন এক বৎসর, এক মাস, একদিন বা এমনকি এক ঘন্টা বা এমনকি কেবলমাত্র তাকে দেখেছেন, সাহবী হিসেবে গণ্য হবেন।” মূলত: তিনি বুখারীর মতটিতেই সমর্থন দিয়েছেন।

গ). হযরত ওমর পুত্র আব্দুল্লাহর মতে: “যে কেউ নবী মুহম্মদকে দেখেছেন এমনকি এক ঘন্টার জন্য হলেও এবং তিনি যদি সাবালক এবং সুপরিচিত মুসলিম হন, যিনি তার ধর্ম বোঝেন এবং তা মনেপ্রাণে গ্রহণ করেছেন, তবে তিনি সাহাবী হিসেবে গণ্য হবেন।” -অর্থাৎ এই মত অনুসারে, যারা নাবালক (বালেগ হয়নি) কিন্তু নবীজীর সঙ্গ লাভ করেছে, তারা সাহাবী হিসেবে গণ্য হবে না।

ঘ). আল তাবেয়ী সাঈদ ইবনে আল মুসীবের মতে: “কেবলমাত্র তারা, যারা নবী মুহম্মদের সংস্পর্শে ছিলেন দু’এক বৎসর, এবং তার সঙ্গী হয়ে যুদ্ধ করেছেন এক বা দু’টি, সাহাবা হিসেবে গণ্য হবেন।” আর ঈমাম আল-গাজ্জালী এই মতটিই গ্রহণ করেছেন।

উপরে উল্লেখিত সংজ্ঞা থেকেই পাঠকগণ নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন কেন বুখারীর কিতাবে ভুলে ভরা হাদিস গ্রন্থিত হয়েছে? কেন স্বীকৃত মিথ্যেবাদী ও নাবালকদের বর্ণিত হাদিস আমাদের সম্মুখে এসেছে?

এখন আমরা নজর দেব সহীহ সিত্তায় সংকলিত হাদিসের স্বরূপ। আর এ থেকে পাঠক অনুমান করতে পারবেন কি পরিমাণ অপপ্রচার ও অপভ্রংশ ইসলামে ঢুকে পড়েছে পিছনের দরজা দিয়ে। আর তাতে এ অনুধাবণে সহজ হবে, কেন খোদা তার কিতাব সংরক্ষণের ওয়াদা আমাদেরকে দিয়েছেন।

অনেক গূণীজন হাদিসের গুরুত্ব ব্যাখায় কোরআনের এ্ আয়াতটির উল্লেখ করেন- "Whatever the Messenger gives you, accept it, and whatever he forbids you, desist from it." -(59: 7) কোন ব্যক্তি যখন কোনকিছুর সমর্থণে কোরআনের আয়াত ব্যবহার করবে তখন আক্ষরিক অর্থ যাই হোক না কেন, তাকে সমর্থন কেবল সেই ব্যক্তিরই করা উচিৎ যে কি-না ঐ আয়াতটি অবতীর্ণের পটভূমি এবং বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতটির মধ্যে উপযুক্ত সামঞ্জস্যতা খুঁজে পাবে কেননা কোরআন সর্বশেষ ঐশী কিতাব হওয়ায় সেটির অনান্য কিছু বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এর আয়াতগুলো সাড়ে তেইশ বৎসর ধরে নবীজীর জীবনের সাথে জড়িয়ে থাকা কোন না কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অবতীর্ণ। আর এ কারণেই কেবল এটি পরিপূর্ণ জীবন-ব্যবস্থা -আমাদের মাঝে গর্বভরে এর অবস্থান  কেবল তার সত্য ও শূচিতার জন্যে বরং,উৎকৃষ্ট একজন ব্যক্তির জীবনকালীন সকল সমস্যার সমাধান করে আসার সার্টিফিকেট সাথে থাকার কারণে। যা হোক, এবার আসি আয়াতটির ব্যাপারে - আয়াতটিতে  খোদা  নবীজীর আশেপাশে থাকা ব্যক্তিবর্গ যারা কোরআনের বাণীকে অস্বীকার করছিল বা সেগুলো নবীজীর নিজের বলে প্রচার করছিল তাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন সেইসব বাণীকে গ্রহণ ও সেগুলোকে নিষিদ্ধ করে নিতে যা তিনি তাঁর রসূলের মাধ্যমে তাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। এ বাণী যেমন আলী বা আবু বকরের জন্যে প্রযোজ্য ছিল না, তেমনি প্রযোজ্য নয় আমাদের জন্যে, কারণ আমরা তো নবীজীকে এবং কোরআনকে গ্রহণ করেই মুসলমান হয়েছি।  প্রসঙ্গে ফিরি-

আবার অনেকে এমন দাবী করেন যে, কোরআনের ব্যাখ্যার জন্যে হাদিসের গ্রন্থগুলির প্রয়োজন রয়েছে। এর উত্তরে কেউ আবার বলবে- তাহলে তো স্বীকার করে নিতে হবে খোদার কিতাব incomplete, undetailed and imperfect যা সম্পূর্ণ কোরআন বিরোধী। এখন পরিস্থিতি জটিল হয়ে গেল দেখছি। কারণ আপাত:দৃষ্টিতে আমি দু’জনের কথাই সত্য আবার দু’জনের কথাই মিথ্যে দেখতে পাচ্ছি

অাবার অনেকে হাদিসের গুরুত্ব অনুধাবণে এমন কথাও বলেন- "কোরআনে নামাজ কায়েমের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, কিন্তু নামাজ আদায়ের নিয়ম-কানুন দেয়া হয়নি। আর আমরা সেটা পাই হাদিস থেকে।" এর উত্তরে বলা যায়, হাদিস সংগৃহীত হয়েছে নবীজীর মৃত্যুর তিন'শ বৎসর পর। তাহলে ঐ তিন'শ বৎসর কি মানুষ নিয়ম-কানুন মেনে নামাজ আদায় করেননি? নাকি ঐ তিন’শ বৎসর কোন মুসলমানের অস্তিত্বই ছিল না? অথবা কেউ কি এ কথা বলতে চান যে, নবীজীর মৃত্যুর তিনশত বৎসর পর সহীহ সিত্তার উৎপত্তি না ঘটলে আজকের দিনে পৃথিবীর বুক থেকে ইসলাম চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত?

হাদিসের কোরআন বিরুদ্ধতা:
ক). হাদিসের গ্রন্থগুলিতে এমন হাদিস রয়েছে যা কোরআন বিরুদ্ধ। উদাহরণ স্বরূপ-ব্যাভিচারী এবং ব্যাভিচারিনীর শাস্তি যা কোরআনের ২৪:২ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। হাদিস এ সম্পর্কে বলছে যে, ব্যাভিচারের মৃত্যুদন্ডের শাস্তির আয়াতটি নবীজীর জীবিতকালেই লিপিবদ্ধ হয়েছিল, কিন্তু তার মৃত্যুরপর বিবি আয়েশার গৃহে ছাগল প্রবেশ করে বালিশের নীচে রক্ষিত পার্চমেন্টে লেখা ঐ আয়াতটি খেয়ে ফেলায় তা কোরআন থেকে মুছে গেছে। -The parchment that the verse about stoning to death for adultery was written on was eaten and abrogated by a goat. -ইবনে মা’যা, নিকাহ, ৩৬/১৯৪৪; ইবনে হাম্বল ৩/৬১; ৫/১৩১, ১৩২, ১৮৩; ৬/২৬৯।

এখন প্রশ্ন হল, কিভাবে একটা perfect scripture -যা কিনা পূর্ণ হয়েছিল নবীজীর জীবিতকালেই, তার একটি আয়াত বাতিল হয়ে যায় একটা ছাগলের দ্বারা? 

এর উত্তরে বিখ্যাত স্কলার ইবনে কুতাইবা তার “Solving the Contradictions Among Hadith” পুস্তকে বলেছেন, “ছাগল একটি পবিত্র প্রাণী।” এতে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল: “খোদার ক্ষমতায় কেন বিশ্বাস করেন না?” তিনি উত্তর দেন- “তিনি আ’দ ও সামুদ জাতিকে ধ্বংস করেছিলেন, He is also able to destroy His revelations by using even a goat"! -এই বিখ্যাত মনীষী'র এমন উত্তর কি আদৌ গ্রহণযোগ্য?

আল্লাহ ও তাঁর রসূলের উপর অপবাদ আরোপ সম্বলিত এসব মিথ্যার সার্পোট হিসেবে আছে আরও মিথ্যে যাতে এমনকি জড়িত করা হয়েছে হযরত ওমরের নাম- “Because in the future some people will appear and deny the punishment of stoning, by claiming that they can not find it in the Qur'an, if I did not fear that people will say that Omar is adding to the Qur'an, I would add the stoning verse into the Qur'an.” -সহীহ বুখারী. ৯৩/২১; সহীহ মুসলিম, হুদুদ ১৬৯১; তিরমিযি, হুদুদ ৮/১৪৩১; আবু দাউদ ৪১/১। –অর্থাৎ, ওমর যদি মানুষকে ভয় না করে খোদাকে ভয় করতেন, তবে, "stoning verse" হাদিসের গ্রন্থগুলিতে "the verse eaten by a goat" হিসেবে স্থান পেত না।

যাইহোক, মূলকথা এসব হাদিস থেকে আমরা কি জানলাম? কেউ কি একথা বিশ্বাস করতে চান যে, "stoning verse" যা ছাগলে খেয়ে ফেলার দরুণ কোরআন থেকে বিলুপ্ত হয়েছে, তা বিচার-ব্যবস্থায় এখনও বৈধ? আর আয়াতের আক্ষরিক বিলুপ্তি ঘটলেও তার কার্যকরিতা এখনও আইনত: সিদ্ধ? -যদি তা হয়, তবে তার স্বপক্ষে যুক্তিটাইবা কি? সর্বোপরি, খোদা কোরআনে দেয়া তাঁর কিতাব সংরক্ষণের প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন, এই কি আমাদের বিশ্বাস করতে হবে?

এবার এই হাদিসটি দেখি- আমর বিন মায়মুন বর্ণিত: During the pre-lslamic period of ignorance I saw a she-monkey surrounded by a number of monkeys. They were all stoning it, because it had committed illegal sexual intercourse. I too, stoned it along with them. -সহীহ বুখারীভলিয়্যূম ৫৮, বুক ৫, নাম্বার ১৮। 

“আমর বিন মায়মূনের বর্ণনা অনুসারে: I was in Yemen. Amongst the female goats of my people, I saw that at a heightened place,a male monkey brought along a female monkey and slept while keeping her hand beneath his head. During this time, a young monkey came and signaled the female monkey. She softly removed her hand from beneath the male monkey's head and went with the young monkey. She fornicated with him and I was watching it. After that, the female monkey returned and was softly trying to put her hand back under the male monkey's head that he woke up bewildered and smelled her and then screamed. All the monkeys gathered thereafter. He would point towards her and scream constantly (i.e. she has committed adultery). At last the other monkeys went towards the right left and brought along that young monkey whom I recognized. They dug a hole for this young monkey and the female one and stoned them to death. So I saw monkeys stoning to death too besides the human race." -তাইছির-উল-বারী, ভলিয়্যূম ২, পৃষ্ঠা ৬২৬।

অবশ্যই বানরগণ কখনও শুনেনি বা পাঠ করেনি ব্যাভিচারের পাথর নিক্ষেপে হত্যার আয়াত এ কারণে যে, তারা অশিক্ষিত, উপরন্তু সেটি ইতিমধ্যেই বিলুপ্ত হয়েছে ছাগলে তা খেয়ে ফেলায়। তাহলে বুখারী এ হাদিস দিয়ে কি বুঝাতে চাচ্ছেন? এই কি যে, বানরগণও শরিয়া আইনের আওতাভূক্ত? আর যদি তাও হয়, তবে পাথর নিক্ষেপের পূর্বে স্ত্রীবানরটি যে বিবাহিত তা প্রমাণিত হয়েছে কি? লক্ষ্যণীয় এই যে, বুখারী স্ত্রী বানরটিকে হত্যা করলেও পুরুষটিকে রেহাই দিয়েছেন। কিন্তু অপরজন সুনিপুনভাবে উভয়েরই দন্ড বিধান করেছেন। এখানে উল্লেখ্য, হাদিসবেত্তাগণ ব্যাখ্যা করেছেন যে, এইসব বানর শনিবারে সীমালংঙ্ঘণকারী ইহুদীদের ঐ গোত্র যারা বানরে রূপান্তরিত হয়েছিল। আয়াতটি এই-

“এবং তোমাদের মধ্যে যারা সাব্বাথের নিয়ম লঙ্ঘণ করেছিল তাদের সম্পর্কে তোমাদের ইতিমধ্যে জানা হয়ে গেছে, আমরা তাদেরকে বলেছিলাম- “ঘৃণ্য বানর হয়ে যাও।” -(২:৬৫)

এই ব্যাখ্যা কি গ্রহণযোগ্য? আবার কেউ কেউ এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বানরের "নিকাহ প্রথা" নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এতে এখন এই প্রশ্ন দাড়ায়-বানরগণ আর কি কি শরীয়া আইন পালন করে থাকে?

খ). কোরআন খোদার স্বরূপ কেমন তা স্পষ্ট করেছে। যেমন- “কোন দৃষ্টি তাকে ধারণ করতে পারে না, কিন্তু সবকিছুই তাঁর দৃষ্টিতে রয়েছে। আর তিনিই সুক্ষ্মদর্শী, পূর্ণ ওয়াকিফহাল।”-(৬:১০৩) “... কিছুই তার সদৃশ নয়, ...” -(৪২:১১) আর যখন মূসা আল্লাহকে দেখতে চেয়েছিলেন, তিনি বলেছিলেন- “তুমি কখনই আমাকে দেখতে পাবে না।”-(৭:১৪৩)

আর হাদিসের গ্রন্থগুলিতে এ বিষয়ে কি আছে তা এবার আমরা দেখি-

১. আবু হুরায়রা বর্ণিত: আল্লাহর রসূল বলেন, “যদি কেউ তার ভাইয়ের সাথে মারামারি করে, তবে যেন সে তার মুখে আঘাত না করে এবং তাকে না বলে- “খোদা তোকে কুৎচ্ছিৎ করে দিক।” কারণ খোদা আদমকে তার নিজ সূরতে সৃষ্টি করেছেন।” -সহীহ মুসলিম, বুক ৩২, নাম্বার ৬৩২৫। -শায়খ আল-আলবানী এটাকে সহীহ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এখানে এটা বলে রাখা ভাল যে, বাইবেলে এমনই তথ্য রয়েছে। -দেখুন, জেনেসিস ১:২৬-২৭।

আরও রয়েছে- আবু হুরায়রা বর্ণিত: আল্লাহর নবী এমন বলেছেন: Allah, the Exalted and Glorious, created Adam in His own image with his length of sixty cubits, and as He created him He told him to greet that group, and that was a party of angels sitting there, and listen to the response that they give him, for it would form his greeting and that of his offspring. He then went away and said: Peace be upon you! They (the angels) said: May there be peace upon you and the Mercy of Allah, and they made an addition of "Mercy of Allah." So he who would get into Paradise would get in the form of Adam, his length being sixty cubits, then the people who followed him continued to diminish in size up to this day. -সহীহ মুসলিম, বুক ৪০, নাম্বার ৬৮০৯; মুসনাদ, আহমদ ইবনে হাম্বল।

উপরের হাদিসের অর্থ আল্লাহ আদমকে সৃষ্টি করেছেন তার নিজ অবয়বে। আর তাঁর রয়েছে মুখ, চোখ, হাত ও পা যেমন আদমের সেগুলো রয়েছে। অথচ, তাঁর আকার তাঁর একটি বৈশিষ্ট্য যার সাথে কোনরূপ সম্পর্ক নেই তাঁর সৃষ্টির বৈশিষ্ট্যের সাথে, just as His essence cannot be likened to their essence.

২. আবু হুরায়রা বর্ণিত: নবীজী বলেন, “স্বর্গ ও নরক তাদের প্রভুর উপস্থিতিতে বিবাদ করল। স্বর্গ বলল, “হে প্রভু! আমার সমস্যাটি কি যে কেবল গরীব ও বিনয়ী ব্যক্তি আমাতে প্রবেশে করবে?”
নরক বলল, “I have been favored with the arrogant people.”
সুতরাং আল্লাহ স্বর্গকে বললেন, “You are My Mercy” এবং নরককে বললেন, “You are My Punishment which I inflict upon whom I wish, and I shall fill both of you.” 

নবীজী আরও বলেন, “স্বর্গের ক্ষেত্রে (তা পূর্ণ হবে ভাল মানুষ দ্বারা) because Allah does not wrong any of His created things, and He creates for Hell (Fire) whomever He will, and they will be thrown into it, and it will say thrice, 'Is there any more?’, till Allah (will put) His Foot over it and it will become full and its sides will come close to each other and it will say, 'Qat! Qat! Qat! (Enough! Enough! Enough!). -সহীহ বুখারীভলিয়্যূম ৯, বুক ৯৩, নাম্বার ৫৪১

আনাস বিন মালিক বর্ণিত: নবীজী বলেন, “দোযখের আগুন বলতে থাকবে: “আরও কি আছে (দোযখে ঢোকার মত মানুষ)?” যতক্ষণ না সম্মান ও ক্ষমতার অধিকারী প্রভু তার পা তার উপর রাখেবেন। আর তখন সে বলবে,“Qat! Qat!, by Your Power and Honor.” আর তার বিভিন্ন অংশগুলো সেসময় কাছাকাছি চলে আসবে (অর্থাৎ সে সঙ্কূচিত হবে।)।-সহীহ বুখারীভলিয়্যূম ৮, বুক ৭৮, নাম্বার ৬৫৪

এইসব হাদিস থেকে আমরা কি জানলাম? দৃশ্যমান আকারের অংশ হিসেবে আল্লাহর বুক ও পা আছে, এমন কি তিনি পোষাকও পরিধান করেন। -এই কি?

৩. বুখারীতে এমন একটা হাদিস আছে যাতে বলা হয়েছে খোদা তাকে চিনতে বিশ্বাসীদেরকে তার পা দেখাবেন। “… When there remain only those who used to worship Allah (Alone), both the obedient ones and the mischievous ones, it will be said to them, 'What keeps you here when all the people have gone?

তারা বলবে, 'We parted with them (in the world) when we were in greater need of them than we are today, we heard the call of one proclaiming, “Let every nation follow what they used to worship,” and now we are waiting for our Lord.’ Then the Almighty will come to them in a shape other than the one which they saw the first time, and He will say, 'I am your Lord,' and they will say, 'You are not our Lord.' And none will speak: to Him then but the Prophets, and then it will be said to them, 'Do you know any sign by which you can recognize Him?' 

তারা বলবে, 'The Shin,' and so Allah will then uncover His shin whereupon every believer will prostrate before Him and there will remain those who used to prostrate before Him just for showing off and for gaining good reputation. These people will try to prostrate but their backs will be rigid like one piece of a wood (and they will not be able to prostrate) …” -সহীহ বুখারীভলিয়্যূম ৯, বুক ৯৩, নাম্বার ৫৩২s।

৪. আবু সাইদ বর্ণিত: একজন লোক নবীজীর কাছে এসে বলল, “আমার ভাইয়ের পাতলা পায়খানা হচ্ছে।”
নবীজী বললেন, “তাকে মধু পান করাও।”
লোকটি পুনরায় এল এবং বলল, “আমি তাকে পান করিয়েছি কিন্তু তাতে তো তার অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে।”
নবীজী বললেন, “আল্লাহ সত্য বলেছেন এবং তোমার ভাইয়ের পেট একটা মিথ্যে বলেছে।” -সহীহ বুখারী, ভলিয়্যূম ৭, বুক ৭১, নাম্বার ৬১৪।

গ). আবু বকরা বর্ণিত: উষ্ট্রের যুদ্ধের সময়, আল্লাহ আমাকে উপকৃত করেছেন একটা বাণীর মাধ্যমে (আমি নবীজীর কাছ থেকে শুনলাম)। যখন নবীজী এ খবর শুনতে পেলেন যে, পারস্যের লোকেরা খসরুর কন্যাকে তাদের রাণী নির্বাচিত করেছে, তিনি বললেন, “ঐ জাতি কখনও সফলতা লাভ করতে পারবে না যারা তাদের শাসক হিসেবে একজন নারীকে নির্বাচিত করে।” -সহীহ বুখারীভলিয়্যূম ৮৮, বুক ৯, নাম্বার ২১৯।

আবু বকরার নিকট থেকে কে এই হাদিস গ্রহণ করবে, যখন এই ব্যক্তি মিথ্যেবাদীতার কারণে জনসম্মুখে হযরত ওমর কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন? তাছাড়া এতে কোরাণিক সমর্থণ নেই।

আর যারা সতী-সাধ্বী নারীর বিরুদ্ধে অপবাদ রটায় এবং ৪জন স্বাক্ষী উপস্থিত করে না- তাদেরকে ৮০টি বেত্রাঘাতে চাবুক মার, আর তাদের থেকে সাক্ষ্য কখনই গ্রহণ করবে না- কারণ তারা সীমালঙ্ঘনকারী,” -(২৪:৪) 


বিবি আয়েশা কি উষ্ট্রের যুদ্ধের নেতৃত্ব দেননি? তাছাড়া আমরা কোরআন থেকে শেবার রানী বিলকিসের কথাও জানি, তিনি মুসলমান হয়েছিলেন এবং নারী হিসেবে একটা জাতির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। 

হাদিসের হাদিস বিরুদ্ধতা:
নিষিদ্ধ: জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ বর্ণিত: “আল্লাহর রসূল কাউকে চিৎ হয়ে পায়ের উপর পা তুলতে নিষেধ করেছেন। -সহীহ মুসলিম।
জায়েজ: এবাদা ইবনে তামীম বর্ণিত: তার পিতা বলেন যে, তিনি দেখেছেন যে আল্লাহর রসূল মসজিদে চিৎ হয়ে পায়ের উপর পা তুলে শুয়ে আছেন। -সহীহ মুসলিম।

২. নিষিদ্ধ: আবু হুরায়রা বর্ণিত: আল্লাহর রসূল বলেন, “দাঁড়িয়ে পান করবে না, যদি কেউ ভুলে এটা করে ফেলে, তবে সে যা পান করেছে তা বমি করে ফেলবে। -সহীহ মুসলিম, বুক ২৩, নাম্বার ৫০১৭, ৫০২০।
জায়েজ: ইবনে আব্বাস বলেন, “আল্লাহর রসূল জমজমের পানি পান করলেন যখন তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন....” -সহীহ মুসলিম।

৩. নিষিদ্ধ: “নবীজী কখনও দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করেননি।” -আহমদ ইবনে হাম্বল, ৬/১৩৬, ১৯২, ২১৩; সহীহ মুসলিম, বুক ২, নাম্বার ৫২২।
জায়েজ: “নবীজী দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করলেন।” -সহীহ বুখারী, ৪/৬০, ৬২।

অনেক বিজ্ঞ ব্যক্তি এর সাপোর্টে বলেন, জায়াগাটা ময়লা ফেলার স্থান ছিল। সেখানে বসে কাজ সারার স্থান না থাকাতেই নবীজী এটা করেছেন। অর্থাৎ ময়লা ফেলার স্থানে দাঁড়িয়ে কাজ সারা জায়েজ। এভাবে স্থান ভেদে যদি নিষিদ্ধ জিনিষ জায়েজ হয়, তবে তো দুষ্টু মুসলিম আমেরিকার বারে বসে মদ খাওয়া জায়েজ দাবী করতে পারে।

৪. নিষিদ্ধ: এক যুদ্ধে একজন স্ত্রীলোককে নিহত অবস্থায় পাওয়া গেল। সুতরাং নবীজী নারী এবং শিশু হত্যা নিষিদ্ধ করেন। -সহীহ বুখারী, ভলিয়ূম ৪, বুক ৫২, নাম্বার ২৫৮; সহীহ মুসলিম, বুক ১৯, নাম্বার ৪৩২০; সুনান অীাবু দাউদ, বুক ১৪, নাম্বার ২৬০৮; বাঘ’ঈ (Baghawi), সারাহ আল-সুন্নাহ, ১১/১১; বায়হাকি, ভিদে ই’লা ‍আল সুনান, ১২/৩১; আহমদ ইবনে হাম্বল; তিরমিযি।

জায়েজ: ইবনে আব্বাস বর্ণিত: “নবীজী যুদ্ধে নারী ও শিশু হত্যার আদেশ দেন।” -সহীহ বুখারী, ভলিয়ূম ৪, বুক ৫২, নাম্বার ২৫৬, জিহাদ/১৪৬; সুনানে আবু দাউদ ১১৩; সহীহ মুসলিম, বুক ১৯, নাম্বার ৪৩২১।

৫. আবু হুরায়রা বর্ণিত: “নামাজ রত ব্যাক্তির সামনে দিয়ে যদি কোন বানর, কাল কুকুর বা স্ত্রীলোক গমন করে, তবে তার নামাজ নষ্ট হয়ে যাবে।” -সহীহ বুখারী, ৪/১০২; হাম্বল ৪/৮৬। -আর এ হাদিসটি দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন বিবি আয়েশা এবং সত্য গোপনের জন্যে হুরায়রাকে দোষারোপ করেছেন।

আয়েশা বর্ণিত: “তোমরা আমাদেরকে (নারীদের) কুকুর, গাধার সমান করে ফেলেছ! আমি নিজে এ অবস্থায় ছিলাম যে, আমি চৌকির উপর শুয়ে থাকতাম আর নবীজী এসে চৌকির মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতেন। এভাবে আমি সামনে থাকা পছন্দ করতাম না। তাই আমি চৌকির পায়ের দিকে সরে গিয়ে চুপি চুপি নিজের লেপ থেকে বেরিয়ে পড়তাম।” -সহীহ বুখারী, খন্ড ১, পরিচ্ছেদ-৩৪০, হাদিস ৪৮৪; খন্ড ১, পরিচ্ছেদ-৩৪৩, হাদিস ৪৮৭; খন্ড ১, পরিচ্ছেদ-৩৪৯, হাদিস ৪৯৫।

৬. ইবনে আব্বাস বর্ণিত: নবীজী ওজু সম্পন্ন করতেন তার শরীরের অঙ্গগুলি কেবল একবার ধৌত করে।- সহীহ বুখারী, ভলিয়ূম ১, বুক ৪, নাম্বার ১৫৯।

আব্দুল্লাহ বিন জায়েদ বর্ণিত: নবীজী ওজু সম্পন্ন করতেন শরীরের অঙ্গগুলি দু’বার ধৌত করে।- সহীহ বুখারী, ভলিয়ূম ১, বুক ৪, নাম্বার ১৬০।

আব্দুল্লাহ বিন জায়েদ বর্ণিত: একবার নবীজী আমাদের কাছে এলে আমরা তার জন্যে পিতলের পাত্রে পানি নিয়ে এলাম। তিনি এভাবে ওজু করলেন: তিনি তার মুখমন্ডল তিন বার, হাত থেকে কনুই পর্যন্ত দু’বার ধৌত করলেন। তারপর তার ভিজা হাত মাথার উপর সামনে থেকে পিছনে হালকা ভাবে বুলিয়ে নিয়ে পুনরায় তা সামনে নিয়ে এলেন এবং তার পা ধৌত করেলেন (গোঁড়ালি পর্যন্ত)। -সহীহ বুখারী, ভলিয়ূম ১, বুক ৪, নাম্বার ১৯৬; -ইত্যাদি।

সাধারণ জ্ঞান-বিজ্ঞান বহির্ভূত হাদিস:
ক). বুখারীর কিতাবে গোসল অংশে এমন হাদিস রয়েছে- The Prophet Muhammad used to go by all his wives and have intercourse with them within one hour, day or night. and they were eleven wives. We asked, "How can he do it?" He said, “we were talking about the prophet given the sexual power of thirty men." -সহীহ বুখারী, ভলিয়ূম ৭, বুক ৬২, নাম্বার ১৪২ ও ভলিয়ূম ১, বুক ৫, নাম্বার ২৬৮।

আনাসের এই বর্ণনা গ্রন্থিত করার মাধ্যমে বুখারী নবীজীর উপর ”সুপারম্যান” তকমা লাগানোর চেষ্টা করেছেন। তা নইলে জ্ঞান-বিজ্ঞান বহির্ভূত এই হাদিস দ্বারা তিনি নবীজীকে কোন ধরণের সম্মান দিতে চাচ্ছেন? স্ত্রীদের সাথে সময় কাটান ছাড়া তার কি আর কোন কাজ ছিল না? অন্যদিকে, (১৪২ নম্বরের ক্ষেত্রে ২৬৮ নয়) ঐতিহাসিকভাবে নবীজীর একসাথে নয়জনের বেশী স্ত্রী কখনও ছিল না। আর এ থেকে কি এটাও প্রমাণিত হয় না যে, বুখারী হাদিসের বিষয়বস্তু তথা তথ্যের দিকে কোন মনোযোগ দেননি? 

ওয়াকিদি বর্ণিত: “আল্লাহর রসূল প্রায়শ: বলতেন, “আমি তাদেরই একজন ছিলাম সঙ্গমে যাদের পারদর্শিতা কম। তারপর আল্লাহ আমার কাছে একবাটি রন্ধন করা মাংস পাঠালেন। তা থেকে আমি খাবার পর আমি দেখলাম, যখনি আমি তা করতে চাই, তখনি তা করার সামর্থ্য আমার ফিরে এসেছে।” -ইবনে সা’দ, তাবাকাত আল কুবরা, ভলিয়ূম ৮, পৃষ্ঠা ২০০।

অবশ্য কেবল নবীজীর উপর নয়, সুপারম্যান তকমা নবী শলোমনের উপরও লাগান হয়েছে- Solomon deciding to go around 60, 70 or 90 of his wives in one night and declaring they will all give birth to children who will grow up to be horsemen and "fight in the cause of Allah". We are told that the angel Gabriel tells him to say "if Allah wills". However, Solomon does not listen and consequently ends up with one child only which one translator states was "a half man”. -সহীহ মুসলিম, নাম্বার ৪০৬৬; ৪০৭০। -এক রাত সমান ১০ ঘন্টা ধরলে, প্রতি স্ত্রীর কাছে ছয় মিনিট। এমন কাহিনী  কি বিশ্বাসযোগ্য?

খ). “দানবীয় একটা ষাঁড় তার পিঠের উপর পৃথিবীকে বহন করছে; যখন সে তার মাথা ঝাকায় তখনি একটা ভূমিকম্প হয়।” -(ইবনে কাছির ২/২৯;৫০/১) -সম্পূর্ণ বিজ্ঞান বহির্ভূত হাদিস নয় কি?

গ). “১০০ বৎসর পর পৃথিবীর বুকে নতুন জন্ম নেয়া কোন মানব সন্তান থাকবে না।” -সহীহ বুখারী, ভলিয়্যূম ১, হাদিস ৫৭৫ ও ভলিয়্যূম ১, বুক ৩, হাদিস ১১৬। এই হাদিসটি এখন হাস্যকর নয়কি? মজার ব্যাপার হচ্ছে বুখারী এই হাদিসটি সংগ্রহ করেছেন নবীজীর ২০০ বৎসর পর এবং সহীহ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

ঘ). আবু হুরায়রা বর্ণিত: নবীজী বলেন: “খোদা আদমকে সৃষ্টি করেন ৬০ হাত লম্বা ও ৭ হাত চওড়া।” -মুসনাদ অব আহম্মদ। -আর ঈমাম মালিক এই হাদিসের সহীত্বকে অস্বীকার করেছেন।

আবু হুরায়রা বর্ণিত: আল্লাহর রসূল এমন বলেছেন: আল্লাহ, the Exalted and Glorious, আদমকে সৃষ্টি করেন নিজ অবয়বে, ষাট হাত দৈর্ঘ্যের...।” -সহীহ মুসলিম, ভলিয়্যূম ৪, নাম্বার ৬৮০৯।

ঙ). আবু হুরায়রা বর্ণিত: আল্লাহর রসূল বলেন: “যদি ইহুদিরা (বনি ইস্রায়েল) না হত, খাবার কখনও নষ্ট হত না এবং মাংস কখনও পঁচে যেত না। আর যদি হাওয়া না হত, তবে কোন নারী তার স্বামীকে কখনও প্রতারণা করতে পারত না।” -সহীহ বুখারী; সহীহ মুসলিম।

এই হাদিসটি যেমন বিজ্ঞান বিরোধী, তেমনি বিরোধী কোরআন। আবু হুরায়রা হয়ত: তখন জানতেন না যে, জীবাণু বা ব্যক্টেরিয়ার কারণে খাদ্য-দ্রব্যের এই পচন ইহুদিদের সৃষ্টির আগে থেকেই হয়ে আসছে। আর স্বর্গ থেকে আদম-হাওয়ার বিতাড়নের কারণ যে হাওয়ার একক অপরাধ, তা কোরআন কখনও সুনির্দিষ্ট করে এককভাবে হাওয়াকে দোষারোপ করেনি। আর হাওয়ার অপরাধে সারা পৃথিরীর নারীদেরকে দোষারোপ করা কোরআনের মূলনীতি বিরোধী এবং খোদার ন্যায়বিচার পরিপন্থী নয় কি? (দেখুন, কোরঅান ৬:১৬৪)

চ). আয়েশা বর্ণিত: নবীজী বলেন, “দোযখের তাপ থেকেই জ্বর হয়, সুতরাং পানি দিয়ে জ্বর উপশম কোরও।” -সহীহ বুখারী, ভলিয়্যূম ৭, বুক ৭১, নাম্বার ৬২১।

রাফি বিন খাদিজ বর্ণিত: আমি শুনতে পেলাম আল্লার নবী বলছেন, “দোযখের তাপ থেকেই জ্বর হয়, সুতরাং পানি দিয়ে জ্বর উপশম কোরও।” -সহীহ বুখারীভলিয়্যূম ৭, বুক ৭১, নাম্বার ৬২২।

ছ). জাবির বিন আব্দুল্লাহ বর্ণিত: শুক্রবারে নবীজী একটা বৃক্ষে বা একটা খেজুর গাছে হেলান দিয়ে খুতবা দিতেন। তখন একজন আনসারী মহিলা বা পুরুষ বলল, “ও আল্লার রসূল! আমরা কি আপনার জন্যে একটা পুলপিট তৈরী করতে পারি?” 
তিনি উত্তর দিলেন “তোমাদের ইচ্ছে।”

সুতরাং তারা একটা পুলপিট তৈরী করল। তারপর যখন শুক্রবার এল, তখন তিনি পুলপিঠের দিকে এগিয়ে গেলেন (খুতবা দিতে)। খেজুর গাছটি শিশুর মত কাঁদতে লাগল! নবীজী নামলেন (পুলপিট থেকে) এবং সেটিকে জড়িয়ে ধরলেন। তখন ঐ গাছ যেটি শিশুর মত ফুঁফিয়ে কাঁদছিল, শান্ত হল। নবীজী বললেন, “এটি কাঁদছিল কারণ এর কাছা কাছিতে দেয়া ধর্মীয় জ্ঞান, যা সে শুনতে পেত, তা আর শুনতে পাবে না বলে।” -সহীহ বুখারী, ৪:৫৬:৭৮৪।

জ). আব্দুর রহমান বর্ণিত: “আমি মাসরুককে জিজ্ঞেস করলাম, “রাতে কে নবীজীকে জ্ঞাত করলেন জ্বীনদের সম্পর্কে যখন তারা কোরআন শুনছিল?” 
তিনি বললেন, “তোমার পিতা আব্দুল্লাহ আমাকে বলেছেন যে একটা গাছ নবীজীকে তাদের সম্পর্কে জানিয়েছিল।” -সহীহ বুখারী, ভলিয়্যূম ৫, বুক ৫৮, নাম্বার ১৯৯।

নবীজীর চরিত্রকে কলঙ্কিত করার অপচেষ্টা করা হাদিস:
ক). কোরআনে রয়েছে- নিশ্চয়ই আল্লাহর রসূলের মধ্যে তোমাদের জন্যে সর্বোত্তম আদর্শ রয়েছে।-(৩৩:২১), বা আর নিশ্চয়ই তুমি (নবী মুহম্মদ) সুমহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত।-(৬৮:৪) অন্যদিকে সহীহ বুখারীতে রয়েছে-

১. আয়েশা বর্ণিত: “নবীজী রোজার মধ্যে আমাদের সাথে সহবাস করতেন এবং আমাদেরকে গাঢ় চুম্বন দিতেন।” তারপর তিনি লাজুক হেসে চলে গেলেন। -সহীহ বুখারী, ভলিয়্যূম ১:৬৯১; নাম্বার ১৭৯৮ ও ১৭৯৯। 
- কোরআন এ কাজকে নিষিদ্ধ করেছে এবং নবীজী কখনও এমন কোন কাজ করেননি যা কোরআনের আদেশের বিরুদ্ধে।

২. খাওলা বিনতে হাকিম নিজেকে নবীর কাছে সমর্পন করলেন। আয়েশা বিষ্ময়ে চিৎকার করে উঠলেন, “স্ত্রীলোকটি একজন পুরুষের কাছে নিজেকে সমর্পন করতে লজ্জাবোধ করল না!” যাহোক, নবীজীর উপর সেসময় আয়াত অবতীর্ণ হতে শুরু করল। এতে আয়েশা অভিযোগ করলেন- “ও আল্লার রসূল! আমি তো দেখছি আপনার প্রভু আপনার ইচ্ছে পূরণে দেরী করেন না।” -সহীহ বুখারীভলিয়্যূম ৩নাম্বার ১০২।

আবার বুখারীর কিতাবে এমন হাদিসও রয়েছে- “You are neither hard-hearted nor of fierce character, nor one who shouts in the markets. You do not return evil for evil, but excuse and forgive.” -সহীহ বুখারীভলিয়্যূম ৬, বুক ৬০, নাম্বার ৩৬২। -আর নবীজীর এই চরিত্রের সাথে উপরের বা নীচের হাদিসে বর্ণিত চরিত্রের কোন মিল আছে কি?

৩. সর্বাপেক্ষা সুন্দরী জুনিয়াকে বাগানে নিয়ে আসা হল। নবীজী তার সঙ্গীদেরকে বাইরে অপেক্ষা করতে বলে খেজুরের গাছ দিয়ে তৈরী এক গৃহে প্রবেশ করলেন। প্রবেশ করেই তিনি জুনিয়াকে বললেন, “Give ur-self to me.”
তিনি বললেন, “কোন রানী কি নিজেকে একটা চোরের হাতে সমর্পন করতে পারে? I seek refuge with Allah against you.” -সহীহ বুখারীভলিয়্যূম ৩, নাম্বার ২৩৮। 

-বিবাহ বহির্ভূত যৌণ সম্পর্ক ব্যভিচার বলে স্বীকৃত। তাছাড়া এ কাজ শরীরকেও অপবিত্র করে ফেলে। আর বুখারী কোন বিবেচনা ছাড়াই নবীজীর উপর এ ব্যাভিচারের অপবাদ অরোপের চেষ্টা করেছেন এ হাদিসটি গ্রন্থিত করার মাধ্যমে।

খ). আয়েশা বর্ণিত:  The prophet was lying down with Aisha when his other wives sent Fatima first, then one of his wives to ask him for a matter of their business, so Aisha and the other wife get in argument and cursed each other so the prophet sided with Aisha and smiled and approved Aisha's revenge from his other wife. -সহীহ বুখারী, ভলিয়্যূম ৩; সহীহ মুসলিমভলিয়্যূম ৭।

The story is naive and insignificant but meant to place Aisha above all the other wives and completely showing the Prophet as careless man who was not shy from receiving people, even his daughter while in bed with his wife in a compromised position. He was shown in this fabricated Sahih Hadith to disobey the Qur'an and being unfair to all his wives as God commands in the Qur'an.

গ). স্ত্রীর সাথে সঙ্গম শেষে ধৌত করার বিষয়ে মুহম্মদ এক ব্যক্তির প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন। আয়েশা সেখানে বসে শুনছিলেন, মুহম্মদ উত্তর দিলেন, “আমি তো সব সময় এ করি এর (আয়েশা) সাথে এবং সরাসরি ধৌত করে ফেলি। -সহীহ মুসলিম, বুক ৩, অধ্যায় ২১, নাম্বার ৬৮৫।

কি লজ্জা! নবীজী তার যৌণ অভ্যাস নিয়ে কথা বলছেন বিবি আয়েশার উপস্থিতিতে কোন অস্বস্তি ছাড়াই। যৌণাচার এবং এ বিষয়গুলি স্বামী-স্ত্রীর পবিত্র বন্ধনের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ না করেও শিক্ষা দেওয়া যায়, বিশেষত: স্বামী যদি হন নবী মুহম্মদ। আমাদের প্রিয় নবীজীর এমন চরিত্র কি আমরা ভাবতে পারি?

আনাস বর্ণিত: উরায়না ও উকল গোত্রের কিছু লোক (ইসলাম গ্রহণের জন্যে) মদিনায় এলে তারা পীড়িত হয়ে পড়ল। নবীজী তাদেরকে (সদকার) উটের মূত্র ও দুধ পান করার নির্দেশ দিলেন। তারা চলে গেল। তারপর তারা সুস্থ্য হয়ে নবীজীর রাখালকে হত্যা করে ফেলল এবং উটগুলি হাঁকিয়ে নিয়ে গেল। এ খবর দিনের প্রথম ভাগেই এসে পৌঁছিল। তিনি তাদের পিছনে লোক পাঠালেন। 

বেলা বেড়ে উঠলে তাদেরকে (গ্রেফতার করে) আনা হল। তারপর তার আদেশে তাদের হাত-পা কেটে দেয়া হল। উত্তপ্ত শলাকা দিয়ে তাদের চোখ ফুঁড়ে দেয়া হল এবং গরম পাথুরে ভূমিতে তাদেরকে নিক্ষেপ করা হল। তারা পানি চাইছিল, কিন্তু দেয়া হয়নি। -সহীহ বুখারী, খন্ড ১, পরিচ্ছেদ ১৬৪, হাদিস ২৩৩; ৫৬/১৫২; মুসনাদ অব আহমদ, হাম্বল ৩/১০৭, ১৬৩।


-কি নিদারূণ নিষ্ঠুরতার অভিযোগ দয়াল নবীর উপর! এছাড়া এ হাদিস দিয়ে তার বিরুদ্ধে শরীয়ত অমান্যেরও অভিযোগ করা হচ্ছে। যে নবী তার কন্যার (জয়নবের) হত্যাকারীকে কোন মন্তব্য ছাড়া ক্ষমা করেছেন, তার বিরুদ্ধে সামান্য উট চুরির অপরাধে চরম নিষ্ঠুরতার অভিযোগ আনা হাদিসটি বুখারী ও আহমদ বিশ্বাস করে তা মুসলমানদের কাছে উপস্থাপন করছেন, ভাবা যায়?

ঙ). আয়েশা বর্ণিত: দু’ব্যক্তি রসূলুল্লাহর নিকট আগমন পূর্বক কোন এক ব্যাপারে তারা উভয়ে তার সাথে আলাপ করল। তবে তাদের আলাপের বিষয়বস্তু কি ছিল তা আমি জানি না। এক পর্যায়ে তাদের আলোচনায় নবীজী রাগান্বিত হয়ে উভয়ের উপর অভিশাপ দিলেন এবং গালি দিলেন। তারা চলে গেলে আমি বললাম, “ও আল্লার রসূল! এই লোক দু’টো কি ধরণের উপকার লাভ করল?” 
তিনি বললেন, “কেন তা জিজ্ঞেস করছ?”
আমি বললাম, “আপনি তাদেরকে অপমান করলেন ও অভিশাপ দিলেন।”
তিনি বললেন, “তুমি কি জান না, খোদার নিকট থেকে কি ধরণের প্রতিজ্ঞা আমি লাভ করেছি? আমি খোদাকে বলেছিলাম যে যদি আমি কখনও কোন মুসলিমকে অপমান করি বা অভিশাপ দেই তবে যেন তিনি তাকে অনুগ্রহ করেন ও পুরস্কার দেন।” -সহীহ মুসলিম, খন্ড ৮,পরিচ্ছেদ ৪৭, অনুচ্ছেদ ২৪, হাদিস ৬৪২৮।

-নবীজী এবং বিবি আয়েশার উপর কি নিদারূণ মিথ্যে আরোপ! নবী মুহম্মদ মানুষের প্রতি সমবেদনা ও তার নরম ব্যবহারের জন্য সুপরিচিত ছিলেন। তিনি সহজে রাগান্বিত হতেন না, কখনও কাউকে অপদস্থ করেননি এবং কাউকে কখনও অভিশাপ দেননি। He received the great testimony from God for being blessed with a great moral character, -(দেখুন, ৬৮:৪)

চ). জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ বর্ণিত: রসূলুল্লাহ (নব্যূয়তের পূর্বে) কুরাইশদের সাথে কা’বার (সংস্কারের) জন্যে পাথর তুলে দিচ্ছিলেন। তার পরনে ছিল লুঙ্গি। তার চাচা আব্বাস তাকে বললেন, “ভাতিজা! তুমি লুঙ্গি খুলে কাঁধে পাথরের নীচে রাখলে ভাল হত।” তিনি লুঙ্গি খুলে কাঁধে রাখলেন এবং তৎক্ষণাৎ বেহুস হয়ে পড়লেন। এরপর তাকে আর কখনও বিবস্ত্র অবস্থায় দেখা যায়নি। -সহীহ বুখারী, খন্ড ১, পরিচ্ছেদ ২৪৯, হাদিস ৩৫৭। 

-এ হাদিসটি দিয়ে বুখারী ঐ নবীকে নির্বোধ প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেছেন, যে নবী এ্ই কাবা সংস্কারের সময়ই হজরে আসওয়াদটি স্থাপন নিয়ে সংঘটিত বিবাদটি চরম বুদ্ধিমত্তার সাথে নিস্পত্তি করেছিলেন।

ছ). ইবনে ওমর বর্ণিত: “আল্লাহর রসূল আমাদেরকে কুকুর মেরে ফেলতে আদেশ করেন।” -আল মুয়াত্তা, মালিক ইবনে অানাস, নাম্বার ৫৪/৫/১৩; সহীহ বুখারী, ভলিয়ূম ৪, বুক ৫৪, নাম্বার ৫৪০। -এ হাদিস দিয়ে বুখারী খোদার সৃষ্টির এক প্রজাতিকে ধংস করার অভিযোগ আনছেন নবী মুহম্মদের উপর।

অাল্লাহর রসূল বলেন: “তোমরা সকল কাল কুকুর মেরে ফেলবে, কারণ সেগুলো শয়তান।” -ইবনে হাম্বল ৪/৮৫; ৫/৫৪।

জ). সহেল ইবনে সা’দ বর্ণিত: নবীজী বলেন: “বেহেস্তে প্রবেশ করবে ৭০ হাজার বা ৭০০ হাজার..” -সহীহ বুখারী, ভলিয়ূম ৪, বুক ৫৪, নাম্বার ৪৭০। আর এই সংখ্যা কেয়ামত পর্য়ন্ত যত মুসলিম দুনিয়াতে বাস করবে তাদের সংখ্যার তুলনায় অপ্রতুল নয় কি?

ঝ). বুরদা বর্ণিত: তার পিতা বলেন, আল্লাহর রসূল বলেন, “যখনই কোন মুসলিম মারা যায়, খোদা একজন ইহুদি বা খৃষ্টানকে দোযখের আগুনে ফেলে দেন।”- সহীহ মুসলিম, খন্ড ৮, পরিচ্ছেদ ৫১, অনুচ্ছেদ ৮, হাদিস ৬৮১১; ৬৮১২; ৬৮১৩। 

-মুসলিম কি নির্বোধ ছিলেন? শেষবিচারের না হওয়া পর্যন্ত কেউ বেহেস্ত বা দোযখে যেতে পারে না, এ সামান্য বোধও কি তার ছিল না।?

ঞ). আব্দুল্লাহ ইবনে আল-শাখের বর্ণিত: তার পিতা বলেন, “আমি আল্লাহর রসূলের সাথে নামাজ পড়ছিলাম এবং তাকে থুথু ফেলে তা বাম পায়ের গোড়ালী দিয়ে ঘষে ফেলতে দেখলাম।” -সহীহ মুসলিম।

ট). সহল বিন সা’দ আস- সাঈদী বর্ণিত: A man peeped through a hole in the door of Allah's Apostle's house, and at that time, Allah's Apostle had a Midri (an iron comb or bar) with which he was rubbing his head. So when Allah's Apostle saw him, he said (to him), "If I had been sure that you were looking at me (through the door), I would have poked your eye with this (sharp iron bar)." Allah's Apostle added, "The asking for permission to enter has been enjoined so that one may not look unlawfully (at what there is in the house without the permission of its people)." -সহীহ বুখারী, ভলিয়্যূম ৯, বুক ৮৩, নাম্বার ৩৮; সহীহ মুসলিম, অধ্যায় ৯, বুক ২৫, নাম্বার ৫৩৬৭ ও ৫৩৬৮।

আনাস বর্ণিত: A man peeped into one of the dwelling places of the Prophet. The Prophet got up and aimed a sharp-edged arrow head (or wooden stick) at him to poke him stealthily.-সহীহ বুখারীভলিয়্যূম ৯, বুক ৮৩, নাম্বার ৩৮এ; সহীহ মুসলিম, অধ্যায় ৯, বুক ২৫, নাম্বার ৫৩৬৯।

আবু হুরায়রা বর্ণিত: আবুল কাশিম বলেন, “যদি কোন ব্যাক্তি তোমার দিকে চোরা চাহনি দিতে থাকে তোমার অনুমতি ছাড়া এবং তুমি লাঠি দিয়ে খোঁচা মেরে তার চোখ আহত করে ফেল, তবে তুমি দোষী হবে না।” -সহীহ বুখারীভলিয়্যূম ৯, বুক ৮৩, নাম্বার ৩৯; সহীহ মুসলিমঅধ্যায় ৯, বুক ২৫, নাম্বার ৫৩৭০ ও ৫৩৭১। -এ হাদিস অনুসারে কোন নারীর দিকে চোরা চাহনি দেয়া সকল পুরুষের চোখ অন্ধ করে দেয়াও কি বৈধ হয়ে যায় না?

ঠ). আয়েশা বর্ণিত: নবীজী তাকে বিবাহ করেন যখন তার বয়স ছিল ৬ বৎসর এবং তিনি তার বিবাহ সূসম্পন্ন করেন যখন তার বয়স ছিল ৯ বৎসর। আর তিনি তার সাথে সংসার করেছিলেন ৯ বৎসর (অর্থাৎ তার মৃত্যু পর্য়ন্ত)।-সহীহ বুখারীভলিয়্যূম ৭, বুক ৬২, নাম্বার ৬৪।

- এটি নবীজীর কথা, কাজ বা তার অনুমোদিত কোন কর্ম নয়, তাহলে বিবি আয়েশার এ বক্তব্য দিয়ে বুখারী নবীজীকি কি ধরণের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন, কেউ বলবেন কি? 

আমরা বিশ্বাস করি, কোন নবী বা রাসূল অনৈতিক কোন কাজ করেননি। আর নবী মুহম্মদ! সে তো আরো অসম্ভব, কেননা তার নৈতিক চরিত্রের আল্লাহ প্রদত্ত সার্টিফিকেট রয়েছে। আর যদি সত্যিকার ভাবে তিনি ৬ বৎসরের আয়েশাকে বিবাহ করে্ই থাকেন তবে তার নিশ্চিত কোন যুক্তিযুক্ত কারণ ছিল। কেননা, নবীজীর জীবিত অবস্থায় এবং মৃত্যুর পরও সাহাবাগণ এ সুন্নাহ পালন করেনি এবং কোন মুসলমানও তা কখনও পালন করে না? আর তৎকালীন মক্কাবাসী, মুহম্মদের শত্রুগণ, নিদেনপক্ষে ইহদিদের একজনও কেন সমালোচনা করেনি তার বিবাহের, যদি তা অনৈতিক ছিল? সর্বোপরি ১০০ বৎসর আগেও তো আমাদের উপমহাদেশের সর্বত্র বাল্যবিবাহ প্রচলিত ছিল। (আর সত্যি বলতে কি, আমি যদি নিশ্চিত হ অমুক একজন আল্লার রসূল, তবে নাবালিকা কেন, আমার অনাগত সন্তানের সাথেও আমি ঐ রসূলের বিবাহ দিয়ে সম্পর্ক স্থাপনে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভাগ্যবান মনে করতাম।)

এই হচ্ছে নমুনা যে ভাবে হাদিসের গ্রন্থগুলি নবীজীকে চিত্রিত করেছে। যাকে কোরআন স্বীকৃতি দিয়েছে উত্তম নৈতিক চরিত্রের অধিকারী হিসেবে।

আরও কিছু হাদিসের নমুনা
আবু হুরায়রা বর্ণিত: “নবীজী বলেন, “আল্লাহ হাঁচি দেয়া পছন্দ করেন এবং হাই তোলা অপছন্দ করেন, যদি কেউ হাঁচি দেয় এবং আল্লাহর প্রশংসা করে তখন প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য যারা তা শুনবে, বলা, “ইয়ারহামুকাল্লাহ (আল্লাহ তোমার প্রতি ক্ষমাশীল হোন)। কিন্ত হাই তোর ক্ষেত্রে, তা আসে শয়তানের কাছ থেকে, সুতরাং প্রত্যেকে তা বন্ধ করার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। হাই তোলার সময় যদি কেউ বলে “হ”, শয়তান তাকে দেখে হাসবে। -সহীহ বুখারী, ভলিয়্যূম ৮, বুক ৭৩, নাম্বার ২৪২ ও ২৪৫; ভলিয়্যূম ৪, বুক ৫৪, নাম্বার ৫০৯।

আবু হুরায়রা বর্ণিত: নবীজী বলেন, “ইহুদি ও খৃষ্টানগণ তাদের চুলে রং করে না। সুতরাং তারা যা করে তার বিপরীতটা তোমার করা উচিৎ। -সহীহ বুখারী, ভলিয়্যূম ৭, বুক ৭২, নাম্বার ৭৮৬।

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বর্ণিত: নবীজীর সামনে এক ব্যক্তির সম্পর্কে আলোচনা করা হল- সকালবেলা পর্যন্ত সে ঘুমিয়েই কাটিয়েছে, নামাজের জন্যে (যথাসময়ে) জাগ্রত হয়নি, তখন তিনি (নবীজী) বললেন, শয়তান তার কানে প্রশ্রাব করে দিয়েছে। -সহীহ বুখারী, খন্ড ২, অনুচ্ছেদ ৭২৭, হাদিস ১০৭৮ ও ভলিয়্যূম ২, বুক ২১, নাম্বার ২৪৫; সহীহ মুসলিম।

আবু হুরায়রা বর্ণিত: নবীজী বলেন: “যদি তোমাদের কেউ হাই তোল, তবে তা বন্ধ করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করবে।কারণ, শয়তান প্রবেশ করে (মুখে)।” -সহীহ বুখারী; সহীহ মুসলিম, বুক ৪২, নাম্বার ৭১৩০।

আবু হুরায়রা বর্ণিত: নবীজী বলেন: “যখন কেউ ঘুম থেকে ওঠে, তখন সে তার নাসান্দ্র পরিস্কার করবে (মুখে পানি নিয়ে গার্গল ও নাসিকা পথে বের করা) তিন বার। কারণ শয়তান নাসান্দ্রে রাত কাটায়।” -সহীহ মুসলিম; সহীহ বুখারী, ভলিয়্যূম ৪, বুক ৫৪, নাম্বার ৫১৬।

আবু হুরায়রা বর্ণিত: নবীজী বলেন, “যখন আযান দেয়া হয়, শয়তান প্রচন্ড শব্দ করে রায়ূ ছেড়ে (পেঁদে) পালিয়ে যায় যাতে সে আযান শুনতে না পায়, যখন আযান শেষ হয় তখন সে আবার ফিরে আসে....” -সহীহ বুখারী, ভলিয়্যূম ১, বুক ১১, নাম্বার ৫৮২; সহীহ মুসলিম, খন্ড ২, পরিচ্ছেদ-৪, অনুচ্ছেদ ৮, হাদিস ৭৫৩।

আবু হুরায়রা বর্ণিত: “আল্লাহর রয়েছে ৯৯ নাম, অর্থাৎ একশ’র একটা কম, এবং যে সেগুলোর অর্থ বিশ্বাস করে এবং তদানুসারে কাজ করে, সে বেহেস্তে যাবে; আর Allah is Witr (one) and loves 'the Witr' (অর্থাৎ বেজোড় সংখ্যা)।” -সহীহ বুখারী, ভলিয়্যূম ৮, বুক ৭৫, নাম্বার ৪১৯; সহীহ মুসলিম, খন্ড ৮, চ্যাপ্টার ৫০, সেকশন ২, নাম্বার ৬৬২০।

আবু হুরায়রা বর্ণিত: আল্লাহর রসূল বলেন: “যদি কোন মাছি তোমার পানীয়ের মধ্যে পড়ে, তবে তাকে সম্পূর্ণ তাতে ডুবিয়ে দেবে, কারণ তার এক ডানাতে আছে রোগ এবং অপর ডানাতে আছে উপশম।” -সহীহ বুখারী, ভলিয়্যূম ৪, বুক ৫৪, নাম্বার ৫৩৭; ভলিয়্যূম ৭, বুক ৭১, নাম্বার ৬৭৩।

আবু হুরায়রা বর্ণিত: আল্লাহর নবী বলেন, “(দোযখের) আগুন তার প্রভুর কাছে অভিযোগ করে বলেছিল, “ও আমার প্রভু! আমার বিভিন্ন অংশ একে অপরকে খেয়ে ফেলে।” 
সুতরাং তিনি তাকে দু’টো শ্বাস নিতে বললেন, একটা শীতকালে এবং অন্যটি গ্রীষ্মকালে। আর এটাই হচ্ছে অসহ্য গরম ও কনকনে শীতের কারণ যা তোমরা পাও (আবহাওয়াতে)। -সহীহ বুখারী, ভলিয়্যূম ৪, বুক ৫৪, নাম্বার ৪৮২।

শয়তান ইসলামকে বিকৃত করতে হাদিসের কিতাবগুলির উপর কেমন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে তারই সামান্য কয়েকটি উদাহরণ এসব। তবে সন্তুষ্টি এই যে, কোরআন সর্বশক্তিমান খোদা কর্তৃক সংরক্ষিত। দেখুন-১৫:৯; ৪১:৪২।

উপসংহারে বলা যায়, সমগ্র হাদিস সাহিত্য এধরণের contradictions, inanities, scatology, absurdities, absolutely ridiculous statements, falderals (foolish nonsense)-এ পরিপূর্ণ, and uncalled for attacks on the pure, spotless, snow-white character of our Beloved Rasulullah. এ আমাদেরকে আরও দেখায় যে বিচার দিনে কেন রসূলুল্লাহ খোদার কাছে অভিযোগ জানাবেন যে, মুসলিমগণ কোরআনকে পরিত্যাগ করেছিল (হাদিস ও সুন্নাহ নয়)।

“আর এভাবে আমরা প্রত্যেক নবীর জন্যে সৃষ্টি করেছি শত্রু- মানুষ ও জ্বীণের মধ্যকার শয়তানদের, তারা একে অন্যেকে প্ররোচিত করে চমকপ্রদ বাক্য (যেমন: হাদিস ও সুন্নাহ) দ্বারা প্রতারণার উদ্দেশ্যে। আর তোমার প্রভু যদি ইচ্ছে করতেন, তবে তারা এ করত না। অতএব, ছেড়ে দাও তাদের, আর তারা যা মিথ্যে রচনা করে তা,- আর যারা পরকালে বিশ্বাস করে না, তাদের অন্তরাত্মা যেন এদিকে ঝুকে পড়ে, আর যেন তারা এতে খুশিও হয়, আর যেন তারা যা করে চলেছে তাতে যেন মশগুল থাকে।” -(৬:১১২-১১৩) 

আর রসূল বলবেন, “ও আমার প্রভু, নিশ্চয়ই আমার উম্মত এই কোরআনকে পরিত্যজ্য করে নিয়েছিল।” -(২৫:৩০) (কি পরিপ্রেক্ষিতে নবীজী ঐ সময় এ উক্তি করবেন তা জানতে আমার আর্টিকেল- পুনরুত্থান, শেষবিচার ও অনন্ত জীবনের উপাখ্যান পড়ুন)

সবশেষে আমরা একথা পরিস্কার ভাবে স্বীকার করব যে, একজন খাঁটি ও মুমিন মুসলমানের নিকট হাদিস ও সুন্নাহর গুরুত্ব অপরিসীম। কেননা, অনুসরণ করার জন্যে আদর্শ মানুষ হিসেবে খোদা নবীজীকেই আমাদের সম্মুখে উপস্থাপন করেছেন। তার সম্পর্কে কোরআনে এমনই আয়াত রয়েছে-

হে রসূল, নিশ্চয়ই আমি তোমাকে পাঠিয়েছি স্বাক্ষী স্বরূপ, সুসংবাদদাতা স্বরূপ এবং সতর্ককারী স্বরূপ এবং আল্লাহর দিকে আকর্ষণকারী স্বরূপ এবং আলোক বিচ্ছুরণকারী মশাল স্বরূপ।-(৩৩:৪৫-৪৬) এবং আমি তাকে নিখিল বিশ্বের জন্যে মূর্ত্তিমান করুণাস্বরূপ পঠিয়েছি।-(২১:১০৭) তিনি আল্লাহর রসূল এবং শেষ নবী।-(৩৩:৪০) নিশ্চয়ই আল্লাহর রসূলের মধ্যে তোমাদের জন্যে সর্বোত্তম আদর্শ রয়েছে।-(৩৩:২১), -ইত্যাদি।

এসব আয়াতই সুনিশ্চিত করে হাদিস ও সুন্নাহর গুরুত্ব। আর তাই জাল হাদিসের সাম্রাজ্য থেকে আমাদেরকে বেঁছে নিতে হবে সেই হাদিস ও  সুন্নাহ (নবীজীর নিজের উক্তি, কর্ম বা অনুমোদন) গুলি যা অপর হাদিসকে বিতর্কিত করে না, যা কোরআন বিরোধী নয়, যা (সঠিক ব্যাখ্যা ব্যতিত) সাধারণ জ্ঞান বিজ্ঞান বহির্ভূত নয়, যা কোরআনে করা নবীর প্রশংসায় কালিমা লিপ্ত করে না। 

আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, আমরা নিজ কানে নবীজীর কাছ থেকে হাদিসগুলো শুনিনি, এবং যারা হাদিসগুলো বর্ণনা বা সংগ্রহ করেছেন তারা কেউ নবী-রসূল নন তাই তাদের বর্ণিত বা সংগৃহীত জাল হাদিস গ্রহণ করতে কোন মুসলিম বাধ্য নয়। সুতরাং আমরা আমাদের জ্ঞান, বুদ্ধি, বিবেক এবং যুক্তি ব্যবহার করব সকল হাদিসের ক্ষেত্রে তা যত বড় সহীর তকমাই সেগুলোতে লাগান থাক না কেন।


“এ দাবী করা সঠিক হবে না যে, কোনরূপ বিচার-বিশ্লেষণ বা যাঁঞ্চাই বাছাই ছাড়াই বুখারীর সমস্ত হাদিস অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে যেভাবে তা রয়েছে।” -(তরজুমান উল কোরআন।)

"From the various hadiths that we read, no matter how close it may seem to the truth, the innocence of the hadith cannot go further than the innocence of the mind of its narrator. Neither must the hadith be taken to go beyond our belief. We must admit that this hadith cannot be the words of the Holy Messenger. Definitely, somewhere the narrator of this hadith has made a mistake. And in admitting this fact neither the sky is going to fall nor the ground will break apart."-(তফছির তরজুমান উল কোরআন, ভলিয়্যূম ২ থেকে উদ্ধৃত, পৃষ্ঠা ৪৯৯-৫০০).

তবে একথা বলা চলবে না বা এ ভেবে নবীজীকে অনুকরণ করা চলবে না যে, তিনি নবীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। কারণ, তা বলা বা করা হবে কোরআন ও হাদিস বিরুদ্ধ। যেমন, কোরআনে বলা হয়েছে- আমরা বিশ্বাসী হিসেবে রসূলগণের মধ্যে কোন পার্থক্য করব না।-(২:২৮৫) আর এর সমর্থণে অনেক হাদিসও রয়েছে। যেমন-

১. ইবনে আব্বাস বর্ণিত: নবীজী বলেন, “কারও একথা বলা উচিৎ নয় য়ে আমি ইউনূচ (Jonah) ইবনে মাত্তা থেকে উত্তম।” -সহীহ মুসলিম; সহীহ বুখারী, ভলিয়ূম ৪, বুক ৫৫, নাম্বার ৬০৮; ৬৫/৪,৫; হাম্বল ১/২০৫, ২৪২, ৪৪০।

২. আবু হুরায়রা বর্ণিত: একজন মুসলিম ও একজন ইহুদি বিতর্কে লিপ্ত হল। মুসলিম বলল, “আমি তাঁর নামে শপথ করে বলছি যিনি মুহম্মদকে বেঁছে নিয়েছেন সমগ্র বিশ্বের উপর।”
ইহুদি বলল, “আমি তাঁর নামে শপথ করে বলছি যিনি মূসাকে বেঁছে নিয়েছেন সমগ্র বিশ্বের উপর।”
তার কথা শুনে, মুসলিম লোকটি তার হাত তুলে ইহুদির গালে এক চড় লাগাল। তখন ঐ ইহুদি নবী মুহম্মদের কাছে গেল এবং অভিযোগ করল।

আল্লাহর রসূল বলেন, “আমাকে মূসার থেকে ভাল প্রতিপাদ্য কোরও না।”
লোকেরা জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে (কেয়ামতের দিন)। আর আমিই প্রথম ব্যক্তি যে জেগে উঠব এবং আমি মূসাকে খোদার সিংহাসন তথা আরশের পাশে দেখতে পাব। আমি জানি না তিনিও জ্ঞান হয়েছিলেন কি না এবং আমার পূর্বে জেগেছেন কি না বা থোদা তাকে তা থেকে মুক্ত রেখেছেন।” -সহীহ বুখারীভলিয়ূম ৩, বুক ৪১, নাম্বার ৫৯৫সহীহ মুসলিম.

৩. আনাস ইবনে মালিক বর্ণিত: একজন লোক আল্লাহর রসূলের নিকট এলেন ও বললেন, “নিশ্চয় আপনি মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম (Khayer Al-Baryeh)।”
আল্লাহর রসূল বললেন, “এ হয়ত: ইব্রাহিম- তার উপর শান্তি বর্ষিত হোক।”  -সহীহ মুসলিম।

৪. আবু সাঈদ আল-খুদরী বর্ণিত: আল্লাহর রসূল বলেন, “নবীদের মধ্যে পার্থক্য কোরও না।” -সহীহ মুসলিম।

সমাপ্ত।

উৎস:

Qur'an.
Taq-yeed Al-Ilm by Al-Khatib Al-Baghdadi;
Ulum Al-Hadith by Ibn Al-Salah;
Tareekh Tadween-e-Hadith by Shaykh Abdur Rasheed Nomani;
Introduction to Islam by Dr. Mohammad Hamidullah;
Jami 'al-bayan 'an ta'wil ay al-Qur'an by Muhammad ibn Jarir al-Tabari; 
al Tabaqat al-kubra by ibn Sa'ad;
Taiseer-ul-Baari, volume 2, Page 626;
Musnad by Ahmed Ibn Hanbal;
Solving the Contradictions Among Hadith by Ibn Qutayba;
Tadhkira al-Huffaz by al-Dhahabi;
Sunan al-Daramy;
Mukhtasar Jaame' Bayan-il-'Ilm pg 33;
Sahih Bukhari;
Sahih Muslim;
Sunan Abu Dawood;
Sunan al-Trimizi;
Sunan Al-Nasa'i;
Sunan Ibn Majah;
Tarjuman ul Qur'an, Volume 2, published by Zamzam Co, Lahore pg 499-500;
Sharh al-Sunnah of Baghawi,11/11;
Bayhaqi, vide I`la al-Sunan, 12/31;

1 টি মন্তব্য:

  1. Onek valo abong guruttopurno totho. Thanks ....
    apner blog e ekti chatbox lagale aro darun hoto. Chatbox nite dekhun FunnyCube

    উত্তরমুছুন