pytheya.blogspot.com Webutation

১ এপ্রিল, ২০১৩

Christianity: খৃষ্টধর্মের বিবর্তনীয় সংকট।


যে কোন ধর্মেই তার বিশুদ্ধ রূপটি পরিদৃষ্ট হয় তার প্রথমাবস্থায় এবং পরবর্তীতে শুধু তার অবনতিই চোখে পড়ে। খৃষ্টধর্ম একত্ববাদে বিশ্বাস নিয়ে শুরু হয়েছিল, অত:পর সৃষ্টি হয় বিভ্রান্তি ও সংশয় যা মানুষকে মূল অবস্থা থেকে দূরে ঠেলে দেয়, সৃষ্টি হয় ত্রি-ঈশ্বরবাদ বা ত্রিত্ববাদ।

যীশুর অন্তর্ধানের পর ১ম শতাব্দী পর্যন্ত তাঁর অনুসারীরা একত্ববাদ অব্যাহত রাখতে পেরেছিলেন। এরাসমাস বলেন, যীশুর প্রত্যক্ষ অনুসারীরা একত্ববাদকে স্বীকার করেছিলেন যা কখনোই তাদের ব্যাখ্যা করতে হয়নি। কিন্তু যখন যীশুর শিক্ষা ছড়িয়ে পড়ল এবং চার্চের মধ্যে বিরোধ দেখা দিল, তখন জ্ঞানী ব্যক্তিরা তাদের তত্ত্বজ্ঞান ব্যাখ্যা করতে বাধ্য হন। এরপর তারা যীশুর শিক্ষা সামগ্রিক ভাবে হারিয়ে ফেলেন, তার সাথে সাথে একত্ববাদও হারিয়ে যায়।

The Shepherd.
৯০ সনের দিকে রচিত হয়েছিল ‘দি শেফার্ড অফ হারমাস’। 'দি শেফার্ড' (The Shepherd) ধর্মীয় পবিত্র গ্রন্থ হিসেবে মর্যাদা লাভ করেছিল। এ গ্রন্থে ১২টি ঐশী নির্দেশ ছিল- "সর্বপ্রথম বিশ্বাস করতে হবে যে খোদা (God) এক এবং তিনি সব কিছু সৃষ্টি করেছেন ও সেগুলোকে সংগঠিত করেছেন। তার ইচ্ছার বাইরে কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই এবং তিনি সবকিছু ধারণ করেন, কিন্তু তিনি নিজে অ-ধারণযোগ্য ......।" -(The Apostolic Fathers, EJ Goodspeed)

Theodor Zahn.
থিওডোর জায়ন (Theodor Zahn)- এর মতে ২৫০ সন অবধি খৃষ্টধর্মে বিশ্বাসের ভাষা ছিল এ রকম: “আমি সর্বশক্তিমান খোদায় বিশ্বাস করি।”-(Articles of the Apostolic Creed) ১৮০ থেকে ২১০ সনের মধ্যে ‘সর্বশক্তিমান’-এর পূর্বে ‘পিতা’ শব্দটি যুক্ত হয়। বেশ কিছু সংখ্যক চার্চ-নেতা এর তীব্র বিরোধিতা করেন। এ পদক্ষেপের নিন্দাকারীদের মধ্যে বিশপ ভিক্টর (Bishop Victor) ও বিশপ জেফিসিয়াসের (Bishop Zephysius) নামও রয়েছে। কারণ, তারা বাইবেলে কোন শব্দ সংযোজন বা বিয়োজনকে অচিন্ত্যনীয় অপবিত্রতা বলে গণ্য করতেন। তারা যীশুকে ঈশ্বরের (God) মর্যাদা প্রদানের প্রবণতারও বিরোধী ছিলেন। তারা যীশুর মূল শিক্ষানুযায়ী একত্ববাদের প্রতি অত্যন্ত জোর দেন এবং বলেন যে যদিও তিনি একজন নবী ছিলেন, তিনি অবশ্যই অন্য দশজন মানুষের মতই একজন মানুষ ছিলেন, যদিও তিনি ছিলেন তার প্রভুর অত্যন্ত অনুগ্রহ ধন্য। উত্তর আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ায় গড়ে ওঠা বহু চার্চ এই বিশ্বাসের ধারক ছিল।
Paul of Tarsus.
যীশুর শিক্ষা ক্রমশ বিস্তার লাভের পাশাপাশি তা একদিকে যেমন অন্যান্য সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসে অন্যদিকে ক্ষমতাসীনদের সাথে তার বিরোধ শুরু হয়। এসময় খৃষ্টধর্ম এসব সংস্কৃতিগুলো কর্তৃক অঙ্গীভূত ও গৃহীত হতে শুরু করে এবং এর ফলে শাসকদের নির্যাতন-নিপীড়নও হ্রাস পায়। বিশেষ করে গ্রীসে প্রথমবারের মত একটি নয়া ভাষায় ব্যক্ত হওয়া এবং এ সংস্কৃতির ধারণা ও দর্শনের সাথে অঙ্গীভূত হওয়া- এ উভয় পন্থায় খৃষ্টধর্মের রূপান্তর ঘটে। গ্রীকদের বহু-ঈশ্বরের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে বিশেষ করে টারসাসের পলের (Paul of Tarsus) মত কিছু ব্যক্তির যীশুকে নবী থেকে ঈশ্বরে উন্নীত করার পর্যায় ক্রমিক প্রয়াস ত্রিত্ববাদ (Trinity) সৃষ্টির ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা পালন করে। 
৩২৫ সনে নিকাইয়ার সম্মেলনে ত্রিত্ববাদকে গোঁড়া (Orthodox) খৃষ্টানদের ধর্ম বিশ্বাস বলে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এ ঘোষণায় স্বাক্ষর দানকারীদের মধ্যে কিছু লোক এতে বিশ্বাস স্থাপন করেননি। কারণ তারা বাইবেলে এর কোন ভিত্তি দেখতে পাননি। এই ঘোষণার জনক বলে যাকে বিবেচনা করা হয় সেই এথানাসিয়াসও (Athanasius) নিজে এর সত্যতা সম্পর্কে ততটা নিশ্চিত ছিলেন না। তিনি স্বীকার করেন যে, “যখনই তিনি তার উপলব্ধিকে যীশুর ঈশ্বরত্বের ব্যাপারে জোর করে নিবদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন, তখন তা কষ্টকর ও ব্যর্থ চেষ্টায় পর্যবসিত হয়েছে।” অধিকন্তু তিনি লিখে গেছেন চিন্তা প্রকাশে তার অক্ষমতার কথা। এমনকি এক পর্যায়ে তিনি লিখে গেছেন, “তিনজন নয়, ঈশ্বর একজনই।” ত্রিত্ববাদে তার বিশ্বাসের পিছনে কোন দৃঢ় ভিত্তি ছিল না, বরং তা ছিল কৌশল ও আপাত প্রয়োজনীয়তার কারণে। 
Emperor Constantine.
রাজনৈতিক সুবিধা ও দর্শনের ভুল যুক্তির ভিত্তিতে প্রদত্ত এ ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন রোমের পৌত্তলিক সম্রাট কনষ্টানটাইন (Emperor Constantine) যিনি কাউন্সিল অব নিকাইয়ার (Council of Nicea) সভাপতিত্ব করেছিলেন। ক্রমবর্ধমান খৃষ্টান সম্প্রদায় ছিল একটি শক্তি যাদের বিরোধিতা তার কাম্য ছিল না। তারা তার সাম্রাজ্য দুর্বল করে দিয়েছিল। সাম্রাজ্যকে শক্তিশালী করতে তাদের সমর্থন তার কাছে ছিল অত্যন্ত মূল্যবান। তাই, খৃষ্টান ধর্মকে নতুন রূপ দিয়ে তিনি চার্চের সমর্থন পাওয়ার আশা করেছিলেন এবং একই সাথে তিনি খৃষ্টধর্ম ও চার্চের মধ্যে সৃষ্ট বিভ্রান্তির অবসান ঘটাতে চেয়েছিলেন যেহেতু এটা ছিল তার সম্রাজ্যের মধ্যে সৃষ্ট বিরোধের অন্যতম কারণ। 
 
Arius.
অবশেষে কূট কৌশলের মাধ্যমে সম্রাট কনষ্টানটাইন আংশিকভাবে তার লক্ষ্য হাসিল করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তিনি সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনা হাসিলের পন্থা হিসাবে খৃষ্টধর্মকে ব্যবহার করতে চেয়ে সফল হন। জেরুজালেমের বদলে রোম পল-অনুসারী খৃষ্টানদের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।

যীশুর আসল শিক্ষার এই বিকৃতির অনিবার্য ফল হয়েছিল ত্রিত্ববাদকে গ্রহণ, কিন্তু তা কখনোই বিনা প্রতিবাদে হয়নি। ৩২৫ সনে যখন সরকারী ভাবে বহু ঈশ্বরবাদকে ‘অর্থোডক্স’ খৃষ্টানদের ধর্মরীতি হিসাবে ঘোষণা করা হয় তখন উত্তর আফ্রিকার খৃষ্টানদের এক নেতা আরিয়াস (Arius) সম্রাট কনষ্টানটাইন ও ক্যাথলিক চার্চের সম্মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, যীশু সর্বদাই স্রষ্টার একত্বের কথা ব্যক্ত করেছেন। কনষ্টানটাইন তার সর্বশক্তি ও বর্বরতা দিয়ে একত্ববাদের অনুসারীদের নির্মূল করার চেষ্টা চালান। কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন। পরিহাসের বিষয় যে, কনষ্টানটাইন নিজে একজন একত্ববাদে বিশ্বাসী হিসেবে মৃত্যুবরণ করলেও ত্রিত্ববাদ শেষ পর্যন্ত ইউরোপে খৃষ্টীয় মতবাদের ভিত্তি হিসেবে সরকারীভাবে গৃহীত হয়। এই মত মানুষের মধ্যে ব্যাপক বিভ্রান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, কারণ তাদের অনেককেই বলা হয়েছিল যে বোঝার কোন চেষ্টা না করেই এতে বিশ্বাস করতে হবে। কিন্তু মানুষ তার স্বভাব অনুযায়ী বুদ্ধির সাহায্যে নয়া ধর্মমতকে বিচার ও ব্যাখ্যার চেষ্টা করে যা বন্ধ করা সম্ভব ছিল না। 

সাধারণ ভাবে বলতে গেলে, এসময় তিনটি চিন্তাধারার জন্ম হয়। ১মটির প্রবক্তা ছিলেন সেইন্ট আগাষ্টাইন (St. Augustine) তিনি ৪র্থ শতাব্দীর লোক ছিলেন। তার অভিমত ছিল যে, ধর্মমতের সত্যতা প্রমাণ করা যায় না। কিন্তু তার ব্যাখ্যা করা যায়। ২য় চিন্তাধারার প্রবক্তা ছিলেন সেইন্ট ভিক্টর (St. Victor)। তিনি ছিলেন দ্বাদশ শতাব্দীর লোক। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ধর্মকে সুস্পষ্ট ভাবে প্রমাণিত ও বিশদভাবে ব্যক্ত- উভয়ই করা যায়। ৩য় ধারাটির জন্ম হয় চতুর্দশ শতাব্দীতে। এরা বলতেন, ত্রিত্ববাদের ব্যাখ্যা বা সত্যতা প্রমাণের অবকাশ নেই, বরং তা অন্ধভাবে গ্রহণ ও বিশ্বাস করতে হবে।
EJ Goodspeed.
যদিও শেষোক্ত এ মতবাদের তীব্র বিরোধিতা পরিহারের লক্ষ্যে যীশুর শিক্ষাদান সংবলিত গ্রন্থসমূহ সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস, লুকিয়ে ফেলা নতুবা পরিবর্তন করা হয়। তারপরও যে গ্রন্থগুলো টিকে ছিল সেগুলোতে যথেষ্ট সত্য অবশিষ্ট ছিল। তাই ত্রিত্ববাদে বিশ্বাস টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে ধর্মগ্রন্থের ভাষ্যের চেয়ে চার্চের নেতাদের ভাষ্যের উপর অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। ঘোষণা করা হয় যে, “ব্রাইড অব জেসাস” (Bride of Jesus) বা চার্চের জন্যে প্রদত্ত বিশেষ প্রত্যাদেশই হল এ মতবাদের ভিত্তি। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, পোপ একটি পত্রে ফ্রা ফুলজেনশিওকে (Fra Fulgention) ভর্ৎসনা করে লিখেছিলেন যে, “ধর্মগ্রন্থসমূহের প্রচার একটি সন্দেহজনক বিষয়। যে ব্যক্তি ধর্মগ্রন্থসমূহের সাথে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখবে সে ব্যক্তি ক্যাথলিক ধর্মকে ধ্বংস করবে।” পরবর্তী পত্রে তিনি ধর্মগ্রন্থসমূহের উপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে লিখেছেন- ... এগুলো এমনই গ্রন্থ যে কেউ যদি তা আঁকড়ে ধরে তবে সে ক্যাথলিক চার্চকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করবে।” -(The Apostolic Fathers, EJ Goodspeed)

যীশুর শিক্ষাকে কার্যকরভাবে পরিত্যাগের জন্য তার ঐতিহাসিক বাস্তবতা সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে অস্পষ্টতা বিপুলভাবে দায়ী। চার্চ ধর্মকে শুধু ধর্মগ্রন্থ থেকেই বিচ্ছিন্ন করেনি, তাকে কল্পিত এক যীশুর সাথে তালগোল পাকিয়ে ফেলে। আসলে যীশুর উপর বিশ্বাসের অর্থ এই নয় যে পুনরুজ্জীবিত খৃষ্টে বিশ্বাস করতে হবে। যেখানে যীশুর প্রত্যক্ষ অনুসারীরা তার আদর্শের ভিত্তিতে তাদের জীবন গড়ে তুলেছিলেন, সেখানে পল অনুসারী খৃষ্টানদের আদর্শ ছিল যীশুর কথিত ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার পরবর্তী জীবন। সেই কারণে যীশুর জীবন ও শিক্ষা তাদের কাছে আর গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।
যীশুর শিক্ষা থেকে চার্চ যত বেশি দূরে যেতে থাকে, চার্চের নেতারা তত বেশি জাগতিক স্বার্থ সংক্রান্ত বিষয়ে জড়িয়ে পড়তে থাকে। যীশুর শিক্ষা এবং চার্চ কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশার মধ্যে ব্যবধান অস্পষ্ট হয়ে আসতে থাকে ও একটির মধ্যে অপরটি মিশে যেতে শুরু করে। চার্চ রাষ্ট্র থেকে যতই নিজের পার্থক্যের উপর জোর দিতে থাকে, ততই ক্রমশ অধিকতর ভাবে রাষ্ট্রের সাথে জড়িয়ে যায় এবং একটি শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। প্রথমদিকে চার্চ রাজকীয় শক্তির অধীনে ছিল। কিন্তু যখন তা সম্পূর্ণরূপে আপোষ করে ফেলে তখন পরিস্থিতি উল্টে যায়। যীশুর শিক্ষা ও এই পথভ্রষ্টতার মধ্যে বিরোধিতা সবসময়ই ছিল। চার্চ যতই অধিক মাত্রায় ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে ততই ত্রিত্ববাদে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারীদের জন্যে পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি এজন্য মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেয়া শুরু হয়। যদিও লুথার রোমার চার্চ পরিত্যাগ করেন, তার বিদ্রোহ ছিল শুধু পোপের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে, রোমান ক্যাথলিক চার্চের মৌলিক ধর্মমতের বিরুদ্ধে নয়। এর ফল হল এই যে, তিনি একটি নতুন চার্চ প্রতিষ্ঠা করলেন এবং তার প্রধান হলেন। খৃষ্ট ধর্মমতের সকল মৌলিক বিষয়ই তাতে গৃহীত ও বহাল রইল। এর ফলে বেশ কিছু সংখ্যক সংস্কারকৃত চার্চ ও গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠা ঘটে, কিন্তু সংস্কার পূর্ববতী খৃষ্টধর্ম পূর্বাবস্থায়ই রয়ে যায়। পলীয় চার্চের এ দু'টি প্রধান শাখা এখন পর্যন্ত টিকে রয়েছে।
উত্তর আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ আরিয়াসের শিক্ষা গ্রহণ করেছিল। পরে সেখানে ইসলামের আগমন ঘটলে তারা সাথে সাথে ইসলাম গ্রহণ করে। কারণ তারা একত্ববাদী মতবাদের এবং যীশুর প্রকৃত শিক্ষার অনুসারী ছিল। তাই তারা ইসলামকে সত্যধর্ম হিসেবে স্বীকার করে নেয়। 
ইউরোপে খৃষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে একত্ববাদের সূতাটি কখনও ছিন্ন হয়নি। কার্যত: এ আন্দোলন শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং অতীত ও বর্তমানে স্থাপিত চার্চের অব্যাহত নির্মম নির্যাতন সত্ত্বেও তার অবসান হয়নি।

আজকের দিনে ক্রমশই বেশি সংখ্যক লোক এ ব্যাপারে সচেতন হয়ে উঠেছে যে যীশুর মূল শিক্ষার সাথে বর্তমান খৃষ্টান ধর্মের ‘রহস্যে’ বিশ্বাস স্থাপনের অবকাশ নেই বললেই চলে। বরং প্রমাণিত সত্য এই যে, ইতিহাসের যীশুর সঙ্গে চার্চের খৃষ্টের কোন সম্পর্ক নেই। চার্চের যীশু খৃষ্টানদের সত্যের পথে কোন সাহায্য করতে পারেন না।খৃষ্টানদের এই বর্তমান উভয় সংকট এ শতকের চার্চ ঐতিহাসিকদের লেখায় প্রকাশিত হয়েছে। এডলফ হারনাক (Adolf Harnack) যে মৌলিক অসুবিধার কথা উল্লেখ করেছেন তা এই যে, “৪র্থ শতক নাগাদ গসপেল গ্রীক দর্শনের মুখোশে আবৃত হয়। এই মুখোশ খুলে ফেলা এবং মুখোশের নীচে খৃষ্টধর্মের প্রকৃত সত্যের সাথে তার পার্থক্য প্রকাশের দায়িত্ব ছিল ঐতিহাসিকদের।” 

David Strauss.
তবে হারনাক এই দায়িত্ব পালনের অসুবিধার কথা উল্লেখ করেছেন এভাবে যে দীর্ঘকাল ধরে জেঁকে বসা ধর্মমতের মুখোশ উন্মোচন ধর্মের রূপকেই পাল্টে দিতে পারত: ”এ মুখোশ তার নিজস্ব জীবনী শক্তি অর্জন করেছিল। ত্রিত্ববাদ, খৃষ্টের দ্বৈত সত্তা, অভ্রান্ততা, এবং এ সব মতবাদের সমর্থনসূচক প্রস্তাবাদি ছিল ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ও পরিস্থিতির সৃষ্টি যা সম্পূর্ণ ভিন্নরূপে পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল তা সত্ত্বেও আগের বা পরের এই সৃষ্ট পরিবর্তিত শক্তি, এই মতবাদ, প্রাথমিক অবস্থার মতই বজায় ছিল, এ বুদ্ধিবাদিতা ছিল এক বদভ্যাস যা তিনি যখন ইহুদীদের কাছ থেকে পালিয়ে আসেন সে সময় খৃষ্টানরা গ্রীকদের কাছ থেকে লাভ করেছিল।”  

John Toland.
হারনাক তার অন্য একটি গ্রন্থে এ বিষয়টি বিশদ আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি স্বীকার করেন: ”...৪র্থ গসপেল (Gospel) ধর্ম প্রচারক জন থেকে উদ্ভূত নয় বা উদ্ভূত হওয়ার কথা বলে না। কারণ ধর্ম প্রচারক জন ঐতিহাসিক সূত্র হিসেবে গণ্য হতে পারেন না.... ৪র্থ গসপেলের লেখক সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করেছেন, ঘটনাবলীর পরিবর্তন ঘটিয়েছেন এবং সেগুলোকে অচেনা আলোয় আলোকিত করেছেন। তিনি নিজেই আলোচনা পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছেন এবং কাল্পনিক পরিস্থিতিতে মহৎ চিন্তাগুলো সন্নিবেশ করেছেন।”

Adolf Harnack.
হারনাক পুনরায় বিখ্যাত খৃষ্টান ঐতিহাসিক ডেভিড ষ্ট্রস (David Strauss) এর গ্রন্থের কথা উল্লেখ করেছেন। স্ট্রসকে তিনি শুধু ৪র্থ নয়, প্রথম তিনটি গসপেলের ঐতিহাসিক সুনাম ও বিশ্বাসযোগ্যতা ধ্বংসের জন্যেও দায়ী করেছেন।- (Tetradymus, John Toland)

অন্য ঐতিহাসিক জোহানেস লেহমানের (Johanes Lehman) মতে ৪টি গৃহীত গসপেলের লেখকরা ভিন্ন এক যীশুর বর্ণনা করেছেন যিনি ঐতিহাসিক বাস্তবতার দ্বারা পরিচিত যীশু নন। এর পরিণতি বা ফলাফল যিনি উল্লেখ করেছেন সেই হেইঞ্জ জাহরনট (Heinz Zahrnt)-কে উদ্বৃত করে লেহমান বলেন: ”ঐতিহাসিক গবেষণা যদি প্রমাণ করতে পারে যে ইতিহাসের যীশু ও প্রচারিত যীশুর মধ্যে মীমাংসার অযোগ্য পরস্পর বিরোধিতা রয়েছে এবং যীশুতে বিশ্বাস স্থাপনের মত সমর্থন স্বয়ং যীশুর মধ্যেই নেই, তাহলে সেটা তাত্ত্বিকভাবে শুধু মারাত্মক ভুলই হবে না, বরং এন. এ. জাহল (NA Jahl) যেমনটি বলেন, তার অর্থ দাঁড়াবে খৃষ্টীয় ধর্ম-দর্শনের অবসান। তবুও আমার বিশ্বাস, আমরা ধর্মতত্ত্ববিদরা এ থেকে নিষ্কৃতির পথ বের করতে পারব, কোন সময়ই আমরা যা পারিনি; তবে আমরা হয় এখন মিথ্যাচার করছি, নয় তখন করব।”-(Outline of the History of Dogma, Adolf Harnack). 

Heinz Zahrnt.
উপরোক্ত ক্ষুদ্র কয়েকটি উদ্ধৃতি থেকে একদিকে আজকের খৃষ্টধর্মের উভয় সংকট যেমন প্রকাশিত হয় অন্যদিকে জাহরন্ট্- এর বক্তব্যও অনেক বেশি গুরুতর কিছুর আভাস দেয়। সেটা এই যে, যীশুর শিক্ষা, চার্চের ভূমিকা ও তার অনুসারীদের বিষয়গুলো ঘনিষ্ঠভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তার শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য উপেক্ষিত অথবা বিলুপ্ত হয়েছে। এর উদাহরণ হিসেবে থিওডোর যায়ন চার্চের মধ্যকার তিক্ত বিরোধের উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন যে, রোমান ক্যাথলিক চার্চ গ্রীক অর্থোডক্স চার্চকে ভাল ও মন্দ উদ্দেশ্য সংযোজন ও বিয়োজনের মাধ্যমে পবিত্র গ্রন্থ পুনর্বিন্যাসের জন্যে অভিযুক্ত করে।

অন্যদিকে গ্রীকদের পাল্টা অভিযোগ রয়েছে যে, বিভিন্ন স্থানের ক্যাথলিকরা নিজেরাই মূল বাইবেল থেকে দূরে সরে গেছে। তবে তাদের এই বিভেদ সত্ত্বেও তারা উভয়ে মিলে যে সব খৃষ্টান গির্জার অনুসারী নয় তাদের সত্যপথ থেকে বিচ্যুত বলে অভিহিত এবং তাদের ঈশ্বরদ্রোহী বলে নিন্দা করে। অন্যদিকে ঈশ্বরদ্রোহী বলে আখ্যায়িত খৃষ্টানরা পাল্টা জবাবে ক্যাথলিকদের সত্যের জালিয়াতি করার জন্য অভিযুক্ত করে। যায়ন বলেন, প্রকৃত ঘটনা থেকে এসব অভিযোগের সত্যতা কি প্রমাণিত হয় না?

Erasmus.
যীশু স্বয়ং সম্পূর্ণরূপে বিস্মৃত। যারা যীশুর ব্যাপারে সচেতন এবং সর্বান্তঃকরণে তার মূল আদর্শে প্রত্যাবর্তন করে জীবন অতিবাহিত করতে চায়, তারা তা করতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ যীশুর প্রকৃত শিক্ষা ও আদর্শ আজ সম্পূর্ণরূপে অন্তর্হিত হয়েছে এবং তার পুনরুদ্ধারও সম্ভব নয়। এরাসমাস (Erasmus) এর বক্তব্য হল: ”ঐশী বিষয় সমূহে প্রাচীনদের জ্ঞান ছিল সামান্যই। ধর্ম আগে বাহ্যিক আচরণ নয়, অন্তরের বিষয় ছিল। ধর্ম যখন অন্তরের বদলে লিখিত রূপে এল, তখন তা প্রায় সর্বাংশে যত মানুষ তত ধর্মমতের রূপ গ্রহণ করল। খৃষ্টের ধর্মমত, যা প্রথমে কোন প্রভেদ জানত না, তা দর্শনের সাহায্য- নির্ভর হয়ে পড়ল। চার্চের পতনের এটাই ছিল প্রথম পর্যায়। -এভাবে চার্চ বাধ্য হল কথায় কি প্রকাশ করা যাবে না তা ব্যাখ্যা করতে। উভয় পক্ষই সম্রাটের সমর্থন আদায় করতে কৌশল গ্রহণ করে।”

এরাসমাস বলেন: "এ ব্যাপারে সম্রাটের কর্তৃত্বের প্রয়োগ ধর্মের প্রকৃত কোন সাহায্যে আসেনি...... যখন ধর্ম অন্তরের উপলব্ধি না হয়ে মুখের বুলিতে পরিণত হয়েছে, তখন পবিত্র বাইবেলের প্রকৃত শিক্ষা বিলুপ্ত হয়েছে। তারপরও আমরা মানুষকে তারা যা বিশ্বাস করে না তা বিশ্বাস করার জন্য, তারা যা ভালবাসে না তা তাকে ভালবাসার জন্য, তারা যা জানে না তা জানার জন্য তাদের বাধ্য করছি। যাতে বল প্রয়োগ করা হয় তা আন্তরিক হতে পারে না।”-(The Jesus Report, J Lehman, পৃ. ১১২)
এরাসমাস আরও বলেন, ”যীশুর প্রত্যক্ষ অনুসারীরা একত্ববাদকে স্বীকার করেছিলেন যা কখনোই তাদের ব্যাখ্যা করতে হয়নি। কিন্তু যখন যীশুর শিক্ষা ছড়িয়ে পড়ল এবং চার্চের মধ্যে বিরোধ দেখা দিল, তখন জ্ঞানী ব্যক্তিরা তাদের তত্ত্বজ্ঞান ব্যাখ্যা করতে বাধ্য হন। এরপর তারা যীশুর শিক্ষা সামগ্রিক ভাবে হারিয়ে ফেলেন, তার সাথে সাথে একত্ববাদও হারিয়ে যায়। তাদের একমাত্র আশ্রয় ছিল কিছু শব্দ ও গ্রীক দর্শনের পরিভাষা যার দৃষ্টি ছিল একত্ববাদ নয়, ত্রিত্ববাদের প্রতি। এভাবে বাস্তবতার প্রতি সহজ ও বিশুদ্ধ আস্থা এমন একটি ভাষায় স্থাপিত হল যা যীশুর কাছে ছিল অপরিচিত এবং তা যীশু ও পবিত্র আত্মাকে উপেক্ষা করে জন্ম দেয় ত্রিত্ববাদের। একত্ববাদে বিশ্বাস হারানোর অনিবার্য পরিণতি হিসেবে মানুষের মধ্যে দেখা দিল বিভ্রান্তি ও বিভেদ। 
যারা জানতে চান যে যীশু কে ছিলেন এবং আসলে তিনি কী শিক্ষা দান করেছিলেন তা জানার জন্যে এ উপলব্ধিটি যে কোন ব্যক্তির জন্যেই অত্যাবশ্যক। সেই সাথে এ কথাও জানা প্রয়োজন যে, মানুষ ত্রিত্ববাদেই বিশ্বাস করুক অথবা মুখে একত্ববাদের কথাই বলুক, তাদের কাছে যদি একজন নবীর দৈনন্দিন কার্যাবলী (যা তার শিক্ষার মূর্ত প্রতীক) সম্পর্কে অবহিত হওয়ার কোন উপায় না থাকে তখন তারা ক্ষতিগ্রস্তই হয়।” 

সমাপ্ত।
ছবি: Wikipedia, passionistnuns, knowmalta.webs, tribodejacob.blogspot.
উৎস: Jesus- A Prophet of Islam by Muhammad Ata ur-Rahim.

২টি মন্তব্য:

  1. আপনার ব্লগ আমার আজকে চোখে পরল।আমি সাধারনত সব বাংলা ব্লগ লিস্টেড করে রাখি।আপনার ব্লগটি খুব ভালো লাগল।
    তথ্যবহুল এই পোস্টটি পরে অনেক কিছু জানতে পারলাম।ধন্যবাদ আপানার সুন্দর ব্লগের জন্য।

    উত্তরমুছুন