pytheya.blogspot.com Webutation

১৯ মার্চ, ২০১৩

Rabi’a al Basri: ক্ষণজন্মা এক নারী সূফী।

রাবেয়া আল বসরী (Rabi'a al Basri)-র জন্ম ইরাকের বসরায়, কায়েস বিন আদি গোত্রের এক শাখা গোত্র আল আতিকে। এ কারণে তাকে রাবেয়া al Adawiyya বা al Qaysiyya-ও বলা হয়। তার জন্মসন সুনির্দিষ্ট নয়। ধারণা করা হয় ৭১৩ থেকে ৭১৭ সনের মধ্যে কোন এক সময় তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি তার পিতামাতার ৪র্থ সন্তান। একারণে তার নাম রাখা হয় রাবেয়া অর্থাৎ ৪র্থ। তার পিতা ইসমাঈল ছিলেন হত দরিদ্র। যে রাত্রিতে তার জন্ম হয়, সেই রাতে তাদের গৃহে কুপি জ্বালানোর মত সামান্য তেলও ছিল না। তার মাতা প্রতিবেশী কারও কাছ থেকে কিছুটা তেল ধার করে আনতে তার পিতাকে অনুরোধ করেন। তার পিতা নিজের অভাব-অভিযোগের কথা খোদার কাছে ব্যক্ত করতেন বটে, কিন্তু প্রতিবেশী কারও কাছ থেকে কিছু চাইতে ভীষণ লজ্জা বোধ করতেন। তাই তিনি স্ত্রীকে খুশী করতে এসময় গৃহ থেকে বেরিয়ে গেলেও কিছু সময় বাইরে ঘোরাফেরা করে খালি হাতে ফিরে আসেন। তাকে শূন্য হাতে ফিরে আসতে দেখে বুদ্ধিমতী স্ত্রী সবই বুঝতে পারেন, তাই তাকে অধিকতর লজ্জায় ফেলতে কোন প্রশ্ন করেননি।

বর্তমান বসরা নগরী, রাতে।
এদিকে নিজের অক্ষমতা ও অপরগতার কথা খোদার কাছে ব্যক্ত করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েন ইসমাঈল। রাতে স্বপ্নে দেখেন এক ব্যক্তি তাকে বলছেন, তুমি পত্র মারফৎ বসরার আমীরকে জানাও যে সে নবীজীর নামে প্রতিদিন রাতে একশত ও প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে চারশত বার দুরুদ পাঠ করত, কিন্তু গত বৃহস্পতিবার সে তা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ কারণে সে যেন তোমাকে চার’শত দিনার সদকা হিসেবে দিয়ে দেয়।

সকালে ঘুম থেকে উঠে ইসমাঈল এই অদ্ভূত সপ্নের কথা স্ত্রীকে বললেন। সবশুনে স্ত্রী বলল, নিশ্চয়ই আমাদের এই সন্তান পূণ্যবতী। সুতরাং তুমি অবশ্যই পত্র নিয়ে আমীরের কাছে যাবে। ইসমাঈল যেতে অনিচ্ছুক ছিলেন, কিন্তু স্ত্রীর পীড়াপীড়িতে তিনি আমীরের বাটিতে গেলেন। ঐ সময় বসরার আমীর ছিলেন ঈসা জাদান (Isa Zadhan)।

ইসমাঈল তার পত্রটি একজন কর্মচারীর হাতে দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন। এদিকে আমীর ঐ অদ্ভূত পত্র মনোযোগ দিয়ে পড়লেন। কেউ তার একান্ত ব্যক্তিগত কোন কর্ম ব্যর্থতার কথা পত্র মারফত স্মরণ করিয়ে দিতে পারে -এ ছিল তার নিকট চরম বিষ্ময়ের। তিনি তৎক্ষণাৎ ইসমাঈলকে ডেকে নিয়ে তার হাতে ৪০০ দিনার অর্পণ করলেন এবং বললেন যে, আগামীতে যদি তিনি কখনও কোন কিছুর প্রয়োজন বোধ করেন, তবে যেন অনুগ্রহ করে আমীরকে তা একবার অবহিত করেন। 

প্রাপ্ত দিনারে রাবেয়াদের পরিবারের অভাব অভিযোগ সাময়িক দূর হল। কিন্তু কিছুদিন পর তার মাতা মারা গেলেন। তারপর সে কৈশর পেরুনোর আগেই তার পিতাও মারা গেলেন। এরপর এল দূর্ভিক্ষ। এলাকায় হানা দিল একদল দূর্বৃত্ত। তারা গ্রাম থেকে নারী ও শিশুদের ধরে নিয়ে বাজারে বিক্রি করে দিল। রাবেয়াকে কিনে নিল এক ধনী ব্যক্তি এবং তাকে গৃহস্থলীর কাজে লাগিয়ে দিল। গৃহকর্তার বাড়ীতে অনেক রাত পর্যন্ত খানা-পিনার আসর বসত। অত:পর গভীর রাতে আসর শেষে সকলে বিদায় নিলে রাবেয়ার ফুসরত মিলত। এরপর সে বাকী রাতটুকু প্রার্থনা ও মোনাজাতের মধ্যে অতিবাহিত করত। এমনিই চলছিল।

একদিন অনেক রাতে গৃহকর্তার ঘুম ভাঙ্গল। তিনি বাড়ীর বাইরে এসে পায়চারি করতে লাগলেন। হঠাৎ তার নজরে এল রাবেয়ার কুঠিরে আলো জ্বলছে। এতরাতে তার কুঠিরে আলো জ্বলছে দেখে তিনি অবাক হলেন। কৌতুহলী হয়ে তিনি এগিয়ে গেলেন। তারপর নিকটবর্তী হলে তিনি রাবেয়ার প্রার্থনার ক্ষীণ শব্দ শুনতে পেলেন। তিনি তার প্রার্থনায় মনোযোগ দিলেন। তার কানে ভেসে এল রাবেয়ার সকরুণ প্রার্থনা -"Lord! You know well that my keen desire is to carry out Your commandments and to serve Thee with all my heart, O light of my eyes. If I were free I would pass the whole day and night in prayers. But what should I do when you have made me a slave of a human being"?

গৃহকর্তা ফিরে এলেন। মেয়েটির ধর্মনিষ্ঠা তাকে বিষ্মিত করেছে। তিনি বাকী রাতটুকু তার চাল-চলন, আচার –আচরণের সাথে তার ধর্মনিষ্ঠা মিলিয়ে দেখলেন। এতে কোনভাবেই এমন একটি মেয়েকে দিয়ে বান্দীর কাজ করাতে তার বিবেক সায় দিল না। সুতরাং তিনি সকালে রাবেয়াকে ডেকে বললেন, ’তোমাকে দাসত্বের শৃংখল থেকে আমি মুক্ত করে দিলাম। তুমি স্বাধীন ভাবে যেখানে ইচ্ছে সেখানে চলে যেতে পার। আর যদি তোমার কোথাও যাবার জায়গা না থকে, তবে তুমি আমার এখানেও থাকতে পার, সেক্ষেত্রে তোমার যাবতীয় ব্যয়ভার আমার কাঁধেই থাকবে।’ 

নির্জনে একাকী খোদার নিকট অন্তর ঢেলে প্রার্থনা করার সাধ রাবেয়ার সব সময় ছিল। তাই তিনি বিনয়ের সাথে চলে যাবার ইচ্ছে প্রকাশ করলেন। গৃহকর্তা তার ইচ্ছেতে সম্মান জানিয়ে সম্মতি দিলেন। তবে রাবেয়া কোথায় গিয়েছিলেন তা পরিস্কার নয়। হয়ত: তিনি কোন মরু এলাকায় গিয়েছিলেন অথবা তার পিতৃবাড়ীতে ফিরে গিয়ে একাকী বাস করেছিলেন। অবশ্য জীবনের শেষ কয়েকটি বৎসর তার জেরুজালেমে কেটেছিল বলে জানা যায়।

রাবেয়া আজীবন কুমারী ছিলেন। তার সুনামের জন্যে অনেকেই তাকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এমনকি তার পাণিপ্রার্থীদের তালিকায় বসরার আমীরও ছিলেন। তবে সকল প্রস্তাবই রাবেয়া অতি বিনয়ের সাথে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন এ কথা বলে যে তিনি তার ইহলৌকিক এ ক্ষুদ্র জীবন তার সৃষ্টিকর্তার তরে উৎসর্গ করে দিয়েছেন।

রাবেয়ার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল দিকে দিকে। তার কিছু নি:স্বার্থ নারী ও পুরুষ সেবকও জুটে গিয়েছিল। সম্ভবত: এরাই তার প্রয়োজনীয় সকল কিছুর আঞ্জাম দিত। এদেরই একজন হলেন হাসান আল বসরী।

রাবেয়ার সম্পর্কে অনেক কথাই প্রচলিত আছে। এগুলোর অনেক কাহিনী মিথ বা অতিরঞ্জিত হলেও হতে পারে। যেমন এক কাহিনী- একবার রাবেয়া হজ্জ্বের উদ্দেশ্যে এক কাফেলার সাথে যাত্রা করেছিলেন। কিন্তু পথিমধ্যে মরুর দাবাদহে তার গাধা প্রাণত্যাগ করে। তার সঙ্গীরা ঐ সময় তার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু রাবেয়া তাদের সাহায্য গ্রহণ করেননি, খোদার প্রতি তার অগাধ আস্থা ও বিশ্বাসের কারণে। তিনি তপ্ত মরুর পথ ধরে পায়ে হেঁটেই রওনা দেন। একসময় দিক হারিয়ে ক্ষুধা ও ক্লান্তি  জনিত কারণে মরুর বুকে অচেতন হয়ে মুখ থুবড়ে পড়েন। পরে জ্ঞান ফিরলে উঠে পথ চলতে শুরু করেন। কথিত আছে এসময় কা'বাকে তুলে এনে তার সামনে হাযির করা হয়েছিল। তিনি তখন বলেছিলেন, ’আমি পাথরের এই গৃহ দেখতে আসিনি। আমি গৃহের মালিকের সাক্ষাতে এসেছি।’
যাইহোক, তিনি মক্কাতে পৌঁছান এবং হজ্জ্ব সম্পন্ন করেই ফিরে আসেন। 

রাবেয়া বসরীর সমাধি।
অনেক বুজুর্গ ও সূফী ব্যক্তি রাবেয়ার সাক্ষাতে আসতেন। একদিন এমনি দু’জন মুসাফির তার বাটীতে এলেন। তাদেরকে বসান হয়েছিল সমাদরের সাথে। অতিথি দু'জন ক্ষুধার্ত ছিলেন। তারা দেখলেন দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে কিন্তু গৃহকর্তী তাদের আপ্যায়নের কোন ব্যবস্থা করছেন না। একসময় তারা অধৈর্য্য হয়ে বলেই ফেললেন- ’মা খাবার কি কিছু আছে?’
রাবেয়া তখন একটি পাত্রে দু’খানি রুটি এনে তাদের সামনে তা রাখলেন। অতিথিরা বুঝতে পারছিলেন না রুটি দু’খানি তাদের দু’জনের নাকি একজনের। এ কারণে তারা কেউই রুটির দিকে হাত বাড়ালেন না।

এ সময়ই দ্বারদেশে এক ভিখিরী হাঁক দিল-’মা জননী বড়ই ক্ষুধার্ত, দু’দিন ধরে অনাহারে আছি।’
রাবেয়া এ সময় ঐ রুটি দু’খানি তুলে নিয়ে ঐ ভিখিরীকে দিয়ে দিলেন। এতে অতিথিদ্বয় অবাক হলেন।

কিছুসময় পর এক দাসী এক পাত্রে রুটি ও এক পাত্রে কিছু মাংস নিয়ে এসে বলল, ’আমার কর্ত্রী এগুলি আপনার জন্যে পাঠিয়েছেন।’
রাবেয়া রুটির পাত্রটি হাতে নিয়ে সেগুলি গুনে দেখলেন। তারপর দাসীকে বললেন, ’এগুলি আমার নয় তুমি ফিরিয়ে নিয়ে যাও।’
দাসী সেগুলি নিয়ে চলে গেল। অতিথিদ্বয় এ ঘটনায় আরো অবাক হলেন।

 Mount of Olives.
কিছুসময় পর ঐ দাসী আবার এল, বলল, ’তিনি আরও দু’খানি রুটি দিয়েছেন এবং বিনীতভাবে এগুলি আপনাকে গ্রহণ করতে অনুরোধ করেছেন।’
এবার রাবেয়া সেগুলি নিলেন এবং অতিথিদের তা থেকে খেতে দিলেন।
এসময় অতিথিদ্বয় নিজেদের কৌতুহল আর চাপা রাখতে পারলেন না। তারা সমস্বরে বললেন, ’মা, কেন আপনি প্রথমবার এগুলো ফিরিয়ে দিলেন এবং পরে তা গ্রহণ করলেন?’

রাবেয়া বললেন, ’আপনারা ক্ষুধার্ত জেনেও আমি আপনাদেরকে আপ্যায়ন করতে পারছিলাম না। কারণ, ঘরে মাত্র দু’খানি রুটি ছিল, যা দিয়ে আপনাদের দু’জনের ক্ষুধা নিবারণ সম্ভব ছিল না। তাই আমি আপনাদেরকে খেতে দেইনি। কিন্তু যখন আপনারা চেয়ে বসলেন, আমি তখন নিতান্ত বাধ্য হয়ে রুটি দু’খানি আপনাদের সম্মুখে রেখেছিলাম। ঐ সময়ই ভিখিরী এল এবং তার ক্ষুধার কথা জানাল। তৎক্ষণাৎ আমার মনে পড়ল, খোদা বলেছেন দানের দশগুন পাওয়া যাবে। আর আমি তা পাবার আশায় সঙ্গে সঙ্গে রুটি দু’খানি তাকে দান করে দিলাম। 

Christian Church of the Ascension.
তারপর ঐ দাসী রুটি ও মাংস নিয়ে এল। আমি তখন রুটি গুনে দেখলাম সেগুলি খোদা আমার জন্যে পাঠিয়েছেন কিনা তা জানতে। কিন্তু রুটি ছিল আঠারটা, সুতরাং আমি নিশ্চিত হলাম ঐ রুটি আমার নয়, তাই তা ফেরৎ পাঠিয়ে দিলাম। পরে যখন দাসী ফিরে এল আরও দু’খানি রুটি নিয়ে, তখন আমি তা গ্রহণ করলাম।’

রাবেয়া দীর্ঘদিন বেঁচে ছিলেন। অনেকের মতে মৃত্যুর সাত বৎসর পূর্বে তিনি জেরুজালেমে আসেন এবং মাউন্ট অলিভে বসবাস করতে থাকেন। অত:পর নব্বুয়ের কাছাকাছি বয়সে ১৮৫হিজরী বা ৮০১সনে পরলোক গমন করেন। তার ভক্তগণ একটা সমাধি সৌধ তৈরী করেন যার উপস্থিতি এখনও রয়েছে মাউন্ট অলিভের চূড়ায় অবস্থিত Christian Church of the Ascension-এর নিকটে। 

সমাপ্ত।
ছবি: Wikipedia.

1 টি মন্তব্য:

  1. যেই পূন্যাত্মা মহান নারীদের জীবনি আমাকে অত্যান্ত সম্মোহিত করেছে নিঃসন্দেহে তাপসী রাবেয়া বসরী তাদের একজন।এমন মহান একজন নারীর মহান ত্যাগের উছিলায় আল্লাহ আমার মত পাপীদের মাফ করুন......ধন্য তাপসী রাবেয়া......ধন্য তার মহান জীবন।

    উত্তরমুছুন