pytheya.blogspot.com Webutation

২৪ ডিসেম্বর, ২০১২

Errors of Trinity: সারভেটাস ও তার বিতর্কিত গ্রন্থ।


১৫০৯ সালে স্পেনের ভিলাবুয়েভায় মাইকেল সারভেটাস (Michael Servetus) জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন স্থানীয় একজন বিচারক। সারভেটাসের জুয়ান ও পেড্রো নামে আরও দু'টি ভাই ছিলেন। তাদের মধ্যে জুয়ান ছিলেন একজন ক্যাথলিক পাদ্রী এবং পেড্রো ছিলেন আইনজীবি। স্কুলের পাঠ শেষ হলে সারভেটাস উচ্চশিক্ষার জন্যে স্পেন ত্যাগ করেন এবং তুলুজে (Toulouse) গমন করেন। ১৫২৬ সনে তিনি ইউনিভার্সিটি অব তুলুজ-এ আইন শাস্ত্রের উপর পড়াশুনো শুরু করেন। আইনের ডিগ্রী অর্জনের পর তিনি ইউনিভার্সিটি অব প্যারিসে চিকিৎসা শাস্ত্রের উপর অধ্যায়ন শুরু করেন। এখান থেকেই তিনি ১৫৩৪ খৃষ্টাব্দ ডাক্তারি ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তী বৎসরগুলোতে তিনি একজন কর্মজীবী চিকিৎসকে পরিণত হন।

মাইকেল সারভেটাস।
১৫২৭ খৃষ্টাব্দ স্পেনের চার্লস ২য় রোম আক্রমণ ও অধিকার করেন। এসময় চার্লসের বয়স ছিল পঞ্চাশ বৎসর। প্রথমেই তিনি পোপকে বন্দী করেছিলেন। কেননা তিনি চেয়েছিলেন পোপের মাধ্যমে জনগণকে তিনি নিজের অনুকূলে নিয়ে আসবেন। কিন্তু পরপরই তিনি উপলব্ধি করলেন যে, বন্দী অবস্থায় পোপের পক্ষে জনগণকে তার অনুকূলে প্রভাবিত করা সম্ভব নয়। সুতরাং তিনি পোপকে কিছুটা স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিয়ে মুক্ত করে দিলেন। এরপর তিনি পোপের দ্বারা অভিষিক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। সুতরাং সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অভিষেক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হল। কিন্তু তা রোমে অনুষ্ঠিত হল না। সাধারণের বিশ্বাস ছিল পোপ যেখানে রোমও সেখানে। রাজা অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেন বোলোনা (Bologna)-তে। সারভেটাস সেই জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করলেন। এ ঘটনার বর্ণনায় তিনি লিখেছেন-

“এটা ছিল এক জাঁকজমকপূর্ণ শোভাযাত্রা। রাজপুত্রদের কাঁধে চড়ে পোপ চলেছেন নগরের রাস্তা দিয়ে। ক্রুশ চিহ্ণের মত তার হাত দু’টি আড়াআড়ি স্থাপিত। উন্মুক্ত রাস্তার দু’ধারে দাঁড়িয়ে ভক্তবৃন্দ এমনভাবে নতজানু হয়ে তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছিল যে, যারা তার পায়ের জুতা চুম্বন করতে সক্ষম হচ্ছে, তারা অবশিষ্টদের চেয়ে নিজেদের ভাগ্যবান মনে করছে এবং ঘোষণা করছে যে, তাদের বহু মনস্কামনাই পূর্ণ হয়েছে এবং এবার বহু বৎসরের জন্যে তাদের নারকীয় যন্ত্রণার উপশম ঘটবে।” 

স্পেনের ভিলাবুয়েভায় সারভেটাসের বাড়ী।
পোপের প্রতি মানুষের এমন আচরণ ও মনোভাব অত:পর সারভেটাসকে ধর্মগ্রন্থ ও ধর্মীয় নেতাদের ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহী করে তোলে। অধিকন্তু ঐ সময় ক্যাথলিক, প্রোটেস্টট্যান্টদের মধ্যে বড় ধরণের রক্তপাত চলছিল। তরুণ সারভেটাস এত রক্তপাতে আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিলেন। তাছাড়া দেশে বিপুল সংখ্যক মুসলমান ও ইহুদী ছিল। প্রকাশ্যে রোমন ক্যাথলিক ধর্ম গ্রহণ এবং ত্রিত্ববাদের ফর্মুলার প্রতি আনুগত্য প্রকাশই ছিল ঐসময় তাদের সকলের জন্যে তরবারির আঘাত থেকে জীবন রক্ষার একমাত্র উপায়।

গভীরভাবে বাইবেল অধ্যয়ন ও পরীক্ষার পর সবিস্ময়ে সারভেটাস দেখতে পেলেন যে বাইবেলের শিক্ষার অংশ হিসেবে কোথাও ত্রিত্ববাদ নেই। তিনি আরো আবিষ্কার করলেন যে, চার্চ যা শিক্ষা দিচ্ছে বাইবেল সব ক্ষেত্রে তা সমর্থন করে না। পরে তিনি আরো আবিষ্কার করেন যে খৃষ্টানরা যদি মেনে নেয় যে, ঈশ্বর মাত্র একজনই, তাহলে খৃষ্টান ও মুসলমানদের মধ্যে বিরোধের অবসান হবে এবং উভয় সম্প্রদায় একত্রে শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। 

সুতরাং তরুণ সারভেটাস সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি যা খুঁজে পেয়েছেন বিশ্বকে তা জানাবেন। এই সংবেদনশীল অনভিজ্ঞ তরুণ তার অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে উপলব্ধি করলেন যে খৃষ্টান-মুসলমান সংঘাতের অবসানের লক্ষ্য সহজেই অর্জিত হওয়া সম্ভব যদি সংস্কারবাদী নেতাদের সাহায্য পাওয়া যায়। কারণ তারা ইতিমধ্যেই ক্যাথলিক চার্চ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। তার বিশ্বাস জন্মেছিল যে, নয়া প্রোটেষ্টান্ট চার্চগুলো একত্ববাদী হবে এবং তাদের সাহায্যে খৃষ্টান, ইহুদী ও মুসলমানরা একত্রে শান্তিতে বাস করতে সক্ষম হবে। 

তিনি সংস্কারবাদীদের বিখ্যাত নেতা ওয়েকলোমপাডিয়াসের (Oeclompadius) সাথে সাক্ষাতের জন্যে সুজারল্যান্ডের বাসল (Basle) গমন করেছিলেন। তার সাথে সারভেটাসের বেশ কয়েকবার বৈঠক হয়। তাদের আলোচনা প্রধানত: খৃষ্ট ধর্মের দু’টি রূপের ব্যাপারেই কেন্দ্রীভূত ছিল। বিশ্ব সৃষ্টির আগেই যিশুখৃষ্টের অস্তিত্ব ছিল, সারভেটাস এ বিশ্বাস বা ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি যুক্তি দেখান যে, ইহুদী নবীরা সর্বদাই “ঈশ্বরের পুত্র”সম্পর্কে কথা বলার সময় ভবিষ্যৎকাল ব্যবহার করেছেন। তিনি ১৫৩০ খৃষ্টাব্দ বাসল ত্যাগ করেন এবং জার্মানীর ষ্ট্রাসবুর্গ (Strassbourg) গমন করলেন। কিন্তু দেখলেন, সেখানে জীবিকা অর্জনের কোন পথ নেই। মূলত: জার্মান ভাষা না জানার কারণে সারভেটাস সেসময় তার বিদ্যা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন। বাধ্য হয়ে তিনি লিয়ঁ (Lyons) গমন করেন।

অবশেষে সারভেটাস বুঝতে পারলেন যে, ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে জনসাধারণকে প্রভাবিত করা সম্ভব নয়, তখন তিনি "দি এররস অব ট্রিনিটি" (The Errors of Trinity) গ্রন্থ রচনা ও মুদ্রণ করে তার মত প্রকাশ করলেন। ১৫৩১ খৃষ্টাব্দ এ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। এ বৎসরই 'টু ডায়ালগস অন ট্রিনিটি' (Two Dialogues on Trinity) নামে তিনি আরেকটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এ দু’টি গ্রন্থ সারা ইউরোপে ঝড় তোলে। স্মরণকালের মধ্যে এরকম গ্রন্থ রচনার দুঃসাহস আর কেউ দেখায়নি। বই দু’টি প্রকাশের ফল হল এই যে, চার্চ হন্যে হয়ে একস্থান থেকে আরেক স্থানে সারভেটাসকে খুঁজে বেড়াতে শুরু করল। সারভেটাস বাধ্য হয়ে তার নাম পরিবর্তন করলেন। ১৫৩২ খৃষ্টাব্দ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি ছদ্মনামে বেঁচে ছিলেন।

মাইকেল সারভেটাস।
সারভেটাস তার পুরোনো বন্ধু পিটার পালমিয়ের (Peter Palmier)-এর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পালমিয়ের তখন ছিলেন ভিয়েনার রোমান ক্যাথলিক আর্চবিশপ। সারভেটাস সেখানে ১৩ বছর বাস করেন। এ সময় তিনি তার চিকিৎসাবিদ্যা কাজে লাগানোর পূর্ণ সুযোগ-সুবিধা ও স্বাধীনতা পেয়েছিলেন এবং অচিরেই একজন খ্যাতিমান চিকিৎসক হয়ে ওঠেন।

এসময় সারভেটাস 'দি রেষ্টারেশন অব ক্রিশ্চিয়ানিটি' (The Restoration of Christianity) নামক আরেকটি গ্রন্থ রচনা করেন এবং সে পাণ্ডুলিপির একটি অগ্রিম কপি ক্যালভিনের কাছে পাঠান। বলাবাহূল্য, ক্যালভিনের সঙ্গে তার সর্বদাই চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ ছিল। যাইহোক, বইটি যখন প্রকাশিত হল, দেখা গেল তাতে রয়েছে মোট ৭টি অধ্যায়। এর মধ্যে প্রথম ও শেষ অধ্যায়টি সম্পূর্ণরূপে খৃষ্টধর্ম নিয়ে লেখা। পঞ্চম অধ্যায়ে ছিল ৩০ টি চিঠি যেগুলো সারভেটাস ও ক্যালভিনের মধ্যে বিনিময় হয়েছিল। 

'দি রেষ্টারেশন অব ক্রিশ্চিয়ানিটি' গ্রন্থের জন্যে সারভেটাস পুনরায় ক্যাথলিক ও প্রোটেষ্টাণ্ট খৃষ্টান উভয়েরই নিন্দার সম্মুখীন হন। উভয়পক্ষ গ্রন্থটি ধ্বংসের ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ হয়। ফলে আজ তার দু’টি মাত্র কপি ছাড়া আর কোন কপির কথা জানা যায় না। এ গ্রন্থের পুনর্মুদ্রণ হয় ১৭৯১ খৃষ্টাব্দ। কিন্তু এ মুদ্রণের সকল কপিও ধ্বংস করা হয়। উল্লেখ্য মার্টিন লুথারও ১৫৩৯ খৃষ্টাব্দ প্রকাশ্যে তার নিন্দা করেন। 

১৫৪৬ খৃষ্টাব্দ সারভেটাসকে লেখা এক চিঠিতে ক্যালভিন তাকে হুমকি দেন যে, সারভেটাস যদি কখনো জেনেভায় আসেন তাহলে তাকে জীবন নিয়ে ফিরতে দেয়া হবে না। সারভেটাস তাকে বিশ্বাস করেননি। ১৫৫৩ সনে তিনি জেনেভা এসে ক্যালভিনের সাথে সাক্ষাৎ করতে যান। তার বিশ্বাস ছিল তাদের মধ্যে মতের মিল সম্ভব। কিন্তু ক্যালভিন রোমান ক্যাথলিকদের দিয়ে তাকে গ্রেফতার করান। সারভেটাসকে ধর্মদ্রোহিতার দায়ে কারাগারে নিক্ষেপ করা হল। 

সারভেটাস চিকিৎসক হিসেবে জনপ্রিয় ছিলেন। তার কিছু প্রাক্তন রোগীর সাহায্যে তিনি কারাগার থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তিনি নেপলস (Naples) যাবার সিদ্ধান্ত নেন। জেনেভার মধ্য দিয়ে নেপলস যেতে হত। তিনি ছদ্মবেশ নিলেন। মনে করলেন, এ ছদ্মবেশ অন্যের চোখে ধুলো দেয়ার জন্যে যথেষ্ট হয়েছে। কিন্তু সেটা ছিল ভুল। শহরের মধ্য দিয়ে যাবার সময় তিনি ধরা পড়লেন এবং আরেকবার কারারুদ্ধ হলেন। এবার তিনি পালাতে পারেননি। তাকে বিচারের সম্মুখীণ হতে হল। 

সারভেটাসের বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগে বলা হয়েছিল -"এই ব্যক্তি, মাইকেল সারভেটাস তার গ্রন্থে ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসীদের, ত্রিত্ববাদী ও নাস্তিক বলে আখ্যায়িত করেছেন, আখ্যায়িত করেছেন ত্রিত্ববাদকে তিন মাথাওয়ালা এক শয়তান সদৃশ দৈত্য বলে; এভাবে তিনি বহুপ্রকার ধর্ম অবমাননার সাথে সাথে খৃষ্টধর্ম বিশ্বাসকে, ঐশ্বরিক ধর্মকে, বিশ্বাসহীন এবং ঈশ্বরহীন বলে ঘোষণা করেছেন। তার বক্তব্য এমন যেন-ক্যাথলিকগণ, ঈশ্বরের স্থানে তিন মাথাওয়ালা নরকের কুকুর হেডিসকে স্থাপন করেছে।" 

সারভেটাসকে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হচ্ছে।
আদালত তার রায়ে বলে- "যেহেতু অভিযুক্ত ব্যক্তি পবিত্র ত্রিত্ববাদের মহামহিম ঈশ্বরের বিরোধিতা করায় লজ্জা বা ভীতিবোধ করে না এবং একগুঁয়েভাবে বিশ্বে তার দূর্গন্ধযুক্ত ধর্মদ্রোহিতার বিষ ছড়ানোর চেষ্টা করেছে, সেহেতু এসব এবং অন্যান্য কারণে ঈশ্বরের চার্চকে এ ধরনের সংক্রমণ থেকে পবিত্র রাখতে এবং নষ্ট সদস্য থেকে মুক্ত করতে, আদালত অভিযুক্ত মাইকেল সারভেটাসকে শৃঙ্খলিত অবস্থায় গির্জায় নিয়ে খুঁটির সাথে বেঁধে তার বইয়ের সাথে তাকে পুড়িয়ে মারার চরম শাস্তি প্রদান করছে, যেন তার এ শাস্তি অন্যদের জন্যে ভবিষ্যতে উদাহরণ হয়ে থাকে।"

১৫৫৩ খৃষ্টাব্দ ২৬ অক্টোবর সারভেটাসকে চার্চে নিয়ে গিয়ে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল। এ ধরণের কাজে একদল অতি উৎসাহী লোক সবসময়ই থাকে। তারাই সবকিছু করল সোল্লাসে। এ যেন বিয়ের অনুষ্ঠানে বরের আগমন পরবর্তী উৎসব মুখর পরিবেশ। প্রথমে গন্ধক মাখানো খড় ও পাতার তৈরি একটি মুকুট সারভেটাসের মাথায় পরিয়ে দেয়া হল। তারপর “দি এররস অব ট্রিনিটি”র একটি কপি বেঁধে দেয়া হল তার কোমরে। অত:পর একটি খুঁটি মাটিতে পুঁতে তার সাথে লোহার শিকল দিয়ে শক্ত করে বাঁধা হল তাকে। এরপর দড়ি দিয়ে গলা ও ঘাড় পেঁচিয়ে এমন ভাবে বাঁধা হল যেন শুধুমাত্র তার পা মাটি স্পর্শ করতে পারে। সবশেষে পাতা সহ কাঁচা ওক ও অন্যান্য জ্বালানি কাঠ এনে তার পায়ের চারপাশে জড় করা হল। সবকিছু ঠিকঠাক মত শেষ হলে আনুষ্ঠানিকভাবে কাঠে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।

আগুন সারভেটাকে যন্ত্রণা দিল, কিন্তু মারাত্মকভাবে পোড়াতে পারল না। এ দৃশ্য দেখে কিছু নির্লিপ্ত দর্শক এসময় তার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠল এবং তার যন্ত্রণার অবসান ঘটাতে ত্বড়িৎ আরো জ্বালানি যোগ করল। 

সারভেটাস মৃত্যুর পূর্বে দু’ঘণ্টা ধরে যন্ত্রণায় মোচড় খাচ্ছিলেন। এসময় জ্বলন্ত আগুনের মধ্যে তার অবিচলতা বহু লোককে তার বিশ্বাসের অনুসারী হতে প্রেরণা জুগায়। এদেরই একজন তাকে বাচাতে না পরলেও তার বইটি উদ্ধার করেছিল। সেই আধ-পোড়া বইটি এখনও আছে। 

যে গ্রন্থ সারভেটাসের বিরুদ্ধে সহিংসতার কারণ হয়ে উঠেছিল, সেই "দি এররস অব ট্রিনিটি"-র কিছু অংশ- 

"---দার্শনিকগণ তৃতীয় একটি পৃথক সত্তার আবিষ্কার করেছেন। এটি প্রকৃতই অন্য দু’টি থেকে আলাদা। একে তারা বলেন তৃতীয় ঈশ্বর বা পবিত্র আত্মা, এভাবে তারা এক কল্পিত ত্রিত্ববাদের কৌশল উদ্ভাবন করেছেন, একের মধ্যে তিনের অস্তিত্ব। কিন্তু বাস্তবে তিন ঈশ্বর অথবা এক ত্রিসত্ত্বময় ঈশ্বরকে মিথ্যা বর্ণনার মাধ্যমে এবং একত্ববাদের নামে আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

---তাদের জন্যে এসব কথাকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করা, ৩টি অস্তিত্ব বর্তমান বলে মেনে নেয়া খুবই সহজ। কিন্তু অন্য যারা এটা বিশ্বাস করে না, তাদের সাথে এক্ষেত্রে সেই বিশ্বাস না করা ব্যক্তিদের পার্থক্য ও দূরত্ব রয়েছে এবং তারা এগুলো একই পাত্রে মুখ আটকে রেখেছে। যেহেতু আমি ‘ব্যক্তিগণ’ শব্দটির অপব্যবহার করতে অনিচ্ছুক সে কারণে আমি তাদের প্রথম সত্তা, দ্বিতীয় সত্তা ও তৃতীয় সত্তা নামে আখ্যায়িত করব, কারণ বাইবেলে আমি তাদের জন্য অন্য নাম খুঁজে পাইনি... তারা তাদের রীতি অনুযায়ী এদের ব্যক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে, তারা মুক্তকণ্ঠে এ সব অস্তিত্বের বহুত্বকে, সত্তার বহুত্বকে, মূলের বহুত্বকে, মর্মের বহুত্বকে স্বীকার করে। ঈশ্বর শব্দটিকে কঠোরভাবে গ্রহণ করার অর্থ তাদের ঈশ্বরের সংখ্যা একাধিক। 

---যদি তাই হয় তাহলে ৩ জন ঈশ্বর রয়েছে একথা যারা বলে সেই ট্রিওটোরাইটসদের (Triotorites) কেন দায়ী করা হবে? তাদের এত ঈশ্বরের মর্মার্থও তো একই এবং যদিও কিছু ব্যক্তি ৩ জন ঈশ্বরকে এক করা হয়েছে কথাটি বোঝাতে চাইবেন না, যদিও তারা এ শব্দটি ব্যবহার করেন যে তারা একত্রে গঠিত, এবং একথা যে, এ ৩টি সত্তা হতেই ঈশ্বর গঠিত। এরপর এটা সুস্পষ্ট যে তারা ট্রিওটোরাইটস এবং আমাদের তিনজন ঈশ্বর রয়েছেন।

---আমরা নাস্তিক হয়ে পড়েছি অর্থাৎ আমাদের কোন ঈশ্বর নেই। যেই মাত্র আমরা ঈশ্বর সম্পর্কে ভাবার চেষ্টা করি, আমাদের পাশে এসে দাঁড়ায় তিনটি অলীক মূর্তি যাতে আমাদের ধারণায় কোন ধরনের একত্ববাদ অবশিষ্ট না থাকে। ঈশ্বর ছাড়া আর কিছু নেই। কিন্তু ঈশ্বর সম্পর্কে চিন্তায় অক্ষম হলে, যখন আমাদের উপলব্ধিতে ত্রি-সত্তার সার্বক্ষণিক সংশয় বিরক্ত করতে থাকবে, আমরা চিরকালের জন্যে একটি ঘোরের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হব এবং মনে করব যে আমরা ঈশ্বরের চিন্তাই করছি। তারা যখন স্বর্গ লাভের জন্যে এ ধরনের স্বপ্ন দেখে, মনে হয় তারা আরেক জগতে বাস করছে। স্বর্গের রাজ্য এসব নির্বোধ কথাবার্তার ব্যাপারে কিছুই জ্ঞাত নন এবং ধর্মগ্রন্থ যে পবিত্র আত্মার কথা বলে তার অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন, যা তাদের অজানা। 

---ত্রিত্ববাদের এই বিষয়টি মুসলমানদের কাছে যে কতটা হাস্যকর তা শুধু ঈশ্বরই জানেন। ইহুদীরাও আমাদের এই কল্পিত ধারণার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেনি, তারা এই বোকামির জন্যে আমাদের উপহাস করে। তারা বিশ্বাস করে না যে, তারা যে যিশুখৃষ্টের কথা শুনেছে ইনিই তিনি। শুধু মুসলমান বা ইহুদীরাই নয়, এমনকি মাঠের পশুরাও আমাদের নিয়ে উপহাস করত, যদি তারা আমাদের এই উদ্ভট ধারণা বুঝতে পারত, কেননা ঈশ্বরের সকল সৃষ্টিই এক ঈশ্বরের অনুগ্রহ প্রার্থনা করে।

---তাই এই জ্বলন্ত মহামারি যেন যোগ করা হয়েছে এবং অতি কৌশলে সম্প্রতি আসা নয়া ঈশ্বরের বিষয় আরোপ করা হয়েছে যে ধর্ম আমাদের পূর্ব-পুরুষরা পালন করেননি। আমাদের উপর দর্শনের এ মহামারি এনেছে গ্রীকরা, আর আমরা তাদের কথায় বিশ্বাস স্থাপন করে দার্শনিক হয়ে পড়েছি। তারা ধর্মগ্রন্থের বানীর মর্মার্থ কখনোই বুঝতে পারেনি যা তারা এ প্রসঙ্গে উপস্থাপন করেছে।

---যীশুখৃষ্টকে আমি নবী বলে আখ্যায়িত করায় কিছু লোক তা নিয়ে কুৎসা রটনা করছে, কারণ তার যে সব গুণাবলি সেগুলো তারা বলে না, তাদের বিশ্বাস যে, যারা এ কাজ করে তাদের সবাই ইহুদী ও মুসলমান। ধর্মীয় গ্রন্থ ও প্রাচীন লেখকগণ তাকে নবী বললেও তাদের কিছু আসে যায় না। ---"

সারভেটাসের মৃত্যুতে তার এক অনুসারী কাসটিলো (Castillos) ক্ষোভের সাথে বলেছিল: 'কোন মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করে কোন মতকে প্রমাণ করা যায় না।'

এদিকে, সারভেটাসকে হত্যার পর, পরবর্তী বৎসর গুলোতে জেনেভার মানুষেরা তার একটি মূর্তি তৈরি ও স্থাপন করে তাদের শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে। একথা স্মরণীয়, ক্যালভিনের মৃত্যুর পর তার কোন মূর্তি তৈরি বা স্থাপিত হয়নি। কবি কাউপার (Cowper) সারভেটাসের এ ঘটনা স্মরণে লিখেছিলেন-

সারভেটাসের মনুমেন্ট, জেনেভা।
"তারা ছিলেন অপরিচিত
নির্যাতন তাদের টেনে আনল খ্যাতির শিখরে
এবং স্বর্গ পর্যন্ত তাদের ধাওয়া করল।
তাদের ছাই উড়ে গেল হাওয়ায় 
কেউ জানে না, কোথায় গন্তব্যে!
তাদের নামে কোন চারণ কবি
রচনা করে না অমর ও পবিত্র সংগীত।
আর ইতিহাস কত ক্ষুদ্র বিষয়েও মুখর
অথচ এ ব্যাপারে আশ্চর্য নীরব।"

সমাপ্ত।

উৎস: Jesus- A Prophet of God by Mohamed Ata-Ur-Rahim.
ছবি: Wikipedia,  excatholicsforchrist, gettyimages.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন