pytheya.blogspot.com Webutation

২৩ ডিসেম্বর, ২০১২

Spyridon: নিকাইয়ার সম্মেলন পথে বিশপ স্পিরিডন।


একত্ববাদ ও ত্রিত্ববাদ নিয়ে পলীয় চার্চ ও আঁরিয়ানবাদী চার্চের মধ্যে বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করলে সম্রাট কনষ্টানটাইন তার রাজ্যের শান্তি ও স্থিতি বজায় রাখার স্বার্থে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। কেননা, ইতিমর্ধ্যে অভিজ্ঞতা থেকে তিনি যে শিক্ষা লাভ করেছিলেন তা হল, প্রকাশ্যে কোন পক্ষ সমর্থন করা তার উচিত নয়। তাই তিনি সম্মেলন আহ্বান করার সিদ্ধান্ত নেন। একজন পৌত্তলিক হিসেবে তার অবস্থান তাকে এক বিরাট সুযোগ এনে দিয়েছিল। যেহেতু তিনি বিবাদমান কোন সম্প্রদায়েরই অনুসারী নন, সে কারণে তিনি একজন নিরপেক্ষ বিচারক হতে পারবেন। তার ধারণা হল, এর ফলে তখন পর্যন্ত বিশপরা যে সমস্যার সম্মুখীন ছিলেন, তা নিরসন হবে। কারণ এ ধরনের একটি বিষয়ের নিষ্পত্তিকারী হিসেবে একজন খৃষ্টানের সভাপতিত্বের বিষয়টি মেনে নেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। কনষ্টানটাইনের নেতৃত্বে বিশপদের এ সভাটি আজ কাউন্সিল অব নিকাইয়া (Council of Nicea) হিসেবে পরিচিত। 
বিশপ স্পিরিডন।
সভার জন্যে আমন্ত্রণ লিপি প্রেরণ করা হল। কনষ্টানটাইন রাজকীয় কোষাগার থেকে এর সকল ব্যয় ভার বহন করেন। দু’বিবদমান পক্ষের নেতৃবৃন্দ ছাড়াও অন্য যাদের আমন্ত্রণ জানানো হল, তারা সার্বিকভাবে তেমন জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তি না হলেও আধ্যাত্মিকতা ও ধর্মনিষ্ঠার জন্যে সুখ্যাত ছিলেন শুধু নয়, আলৌকিক ক্ষমতারও অধিকারী ছিলেন অনেকে। আমরা একটি ঘটনা দিয়ে ঐ আলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী একজনের কথা মূলত: এখানে বলব, তবে সর্বপ্রথমে সভায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যারা ছিলেন, তাদের কিছু ব্যক্তির সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেব যাতে আমরা তাদের মর্যাদা, ক্ষমতা ও প্রভাববলয় সম্পর্কে ধারণা পেতে পারি- 

কায়সারিয়ার ইউসেবিয়াস (Eusebius of Caesarea): ইনি হলেন খৃষ্টীয় ধর্মীয় ইতিহাসের জনক। তার গ্রন্থ হল বিভিন্ন বিবরণের প্রধান ভাণ্ডার যা খৃষ্টীয় ধর্মীয় ইতিহাসের চতুর্থ শতককে প্রথম শতকের সাথে সংযুক্ত করেছে। প্রভূত জ্ঞান ছাড়াও তার প্রভাব ছিল অত্যন্ত ব্যাপক। তিনি সম্রাটের দোভাষী, নামমাত্র যাজক ও পাপের স্বীকারোক্তি শ্রবণকারী ছিলেন। তিনি আঁরিয়াসের মতানুসারী ছিলেন এবং ফিলিস্তিনের অধিকাংশ বিশপের সমর্থন তিনি লাভ করেছিলেন। 

নিকোমেডিয়ার ইউসেবিয়াস (Eusebius of Nicomedia): তার আধ্যাত্মিক খ্যাতি সর্বত্র স্বীকৃত ছিল। তিনি আঁরিয়াসের সমর্থক ছিলেন। তার অলৌকিক ক্ষমতা ছিল। তিনি প্রথমে বৈরুতের বিশপ ছিলেন, পরে নিকোমেডিয়ায় বদলি হন। নিকোমেডিয়া তখন প্রাচ্যের রাজধানী ছিল। সম্রাটের ভগ্নীপতি ও প্রতিদ্বন্দ্বী লিসিনাস তার একজন ভাল বন্ধু ছিলেন। ফলে সম্রাটের বোন রাজকুমারী কনষ্টানটিনার (Constantina) উপর তার ব্যাপক প্রভাব ছিল। লিসিনাস সম্রাটের সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হন এবং প্রাণ হারান। স্বামীর মৃত্যুর পর কনষ্টানটিনা বসবাসের জন্যে রাজ প্রসাদে চলে যান। এভাবে কনষ্টানটিনার মাধ্যমে ও রাজ পরিবারের সাথে তার দূর সম্পর্কীয় আত্মীয়তার কারণে রাজদরবারে তার ভাল প্রভাব ছিল এবং তা কখনোই খর্ব হয়নি। শুধু তার প্রভাবেই সম্রাট কনষ্টানটাইন আঁরিয়াসের চার্চে খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করেন এবং শেষ পর্যন্ত একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী হয়েই মৃত্যুবরণ করেন। 

সেইন্ট স্পিরিডন চার্চ, ট্রিস্টে।
এথানাসিয়াস (Athanasius): বয়সে তরুণ এই ব্যক্তি ত্রিত্ববাদের কট্টর সমর্থক এবং কূট কৌশলী ছিলেন। বার্ধক্যে উপনীত বিশপ আলেকজান্ডার নিকাইয়ার সম্মেলনে নিজে যাবার পরিবর্তে প্রতিনিধি হিসেবে এথানাসিয়াসকে প্রেরণ করেন। 

হোসিয়াস (Hosius): ইনি ছিলেন সম্রাটের প্রধান সভাসদ। তার গুরুত্ব ছিল এখানে যে, তিনি পাশ্চাত্যে পলীয় চার্চের প্রতিনিধিত্ব করতেন। তিনি একজন ধর্মীয় পণ্ডিত হিসেবে স্বীকৃত ছিলেন। ইতিহাসে তিনি ‘মাননীয় প্রবীণ ব্যক্তি’ হিসেবে পরিচিত। উচ্চ চরিত্র বলের জন্যে তিনি সকলের কাছে সম্মানিত ছিলেন। 

পাটামন: তিনি একজন সন্ন্যাসী ছিলেন। 
ওসিয়াস: তিনি শুধু তার আচারনিষ্ঠতার কারণে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। 
নিকোলাসের মাইজার: ইনি ত্রিত্ববাদী ছিলেন। আঁরিয়াসের বক্তব্য দানের সময় ইনি তাকে ঘুসি মেরেছিলেন। 

আরও ছিলেন স্পিরিডন (Spyridon)। আসলে এই স্পিরিডন ছিলেন একজন অতি সরলমনা বিশপ। শিক্ষাগত জ্ঞান তার না থাকাতে তাকে অনেকে অমার্জিত বলে আখ্যায়িত করেন। প্রকৃতপক্ষে ঐ আমলে চার্চগুলোতে তার মত অশিক্ষিত বিশপদেরই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। তার প্রতি গভীরভাবে দৃষ্টি দিলে তিনি কী ধরনের মানুষ ছিলেন তা বুঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। তিনি ছিলেন একজন মেষ পালক। নিপীড়ন-নির্যাতন সত্ত্বেও তিনি তার বিশ্বাসে অটল ছিলেন। ধর্মের রাজনীতির ব্যাপারে তার জ্ঞান ছিল নগণ্য। তার প্রতি বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনা আরোপিত হওয়ার কারণে তিনি বিশপ নিযুক্ত হন। মর্যাদাপূর্ণ ঐ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরও তার সাধারণ ও গেঁয়ো বেশ-ভূষার কোন পরিবর্তন হয়নি। তিনি সব সময় পদব্রজে চলতেন। 

সেইন্ট স্পিরিডন চার্চ, কিংসফোর্ড।
পলীয় চার্চের অন্যান্য শিক্ষিত বিশপগণ যারা আচার আচরণে রাজবংশের মত ছিলেন, তারা তাকে পছন্দ করতেন না। নিকাইয়ার সম্মেলনে যোগদানের আমন্ত্রণ তিনি পেলে অন্যান্য বিশপগণ যারা তাকে চিনতেন নিশ্চিত ছিলেন যে, তিনি যথাসময়ে ঐ অধিবেশনে যোগ দিতে নিকাইয়া পৌঁছিতে পারবেন না। 

এদিকে স্পিরিডন যখন সম্রাটের কাছ থেকে আমন্ত্রণ পত্র পেলেন, তিনি উপলব্ধি করলেন যে, তিনি যদি যথাসময়ে পৌঁছিতে চান তাহলে তাকে খচ্চরের পিঠে সওয়ার হয়ে সফর করতে হবে। তিনি অন্যান্য বিশপদের মত দলবল না নিয়ে একজন মাত্র পরিচারক সঙ্গে নিয়ে যাত্রা করলেন। তারা দু’টি খচ্চরে চড়ে সফর করছিলেন। একটি রং ছিল সাদা, অন্যটির রং ছিল সাদা ও কালোয় মিশানো। এক রাতে তারা একটি সরাইখানায় আশ্রয় নেন। এ সময় সেখানে অন্যান্য বিশপরাও পৌঁছেন। ঐসব বিশপগণ যারা তাকে চিনতেন না বা চিনলেও নিশ্চিত ছিলেন না যে তিনি সম্রাট কনষ্টানটাইনের সভার আলোচনায় অংশ গ্রহণের জন্যে আদৌ যোগ্য কিনা, তারা এক হিংসামূলক পরিকল্পণা করল। পরদিন ভোরে সবাই যখন নিদ্রায় বিভোর, তখন তাদের কয়েকজন স্পিরিডনের দু’টি খচ্চরকে হত্যা করে অন্যান্যদের সাথে নিশ্চিন্ত মনে সরাইখানা ত্যাগ করেন। 

স্পিরিডনের দেহাবশেষ।
এদিকে সকালে স্পিরিডন ঘুম থেকে জেগে খচ্চরগুলোকে আহার করিয়ে সেগুলোর পিঠে জিন চাপাতে পরিচারককে নির্দেশ দিলেন। সে গিয়ে খচ্চরগুলোকে মৃত অবস্থায় দেখতে পেয়ে দ্রুত ফিরে এসে স্পিরিডনকে সেই দুঃসংবাদ দিল। ঐ বিশপগণ খচ্চর দু’টির মস্তক দেহ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিলেন। সবকিছু শুনে তিনি পরিচারককে প্রতিটি খচ্চরের দেহের কাছে সে গুলোর কর্তিত মাথা এনে রাখতে বললেন। পরিচারক ভুল করে এক খচ্চরের মাথা অন্যটির কাছে নিয়ে রাখল। যেইমাত্র সে মাথাগুলো খচ্চরগুলোর দেহের কাছে রাখল, সাথে সাথে সেগুলো জীবন লাভ করে উঠে দাঁড়াল। তারা তাদের যাত্রা আবার শুরু করলেন। কিছু সময় পরই তারা সেই বিশপদের দলকে অতিক্রম করলেন যারা ভেবেছিল যে স্পিরিডনকে তারা পিছনেই ফেলে দিয়েছেন, আর তিনি যথা সময়ে নিকাইয়া পৌঁছতে পারবেন না। তাদের বিস্ময় চরমে পৌঁছিল যখন তারা দেখল যে, সাদা খচ্চরটির মাথা সাদা কালো রং অন্যদিকে সাদা কালো রঙের খচ্চরটির মাথা সাদা।

যাইহোক, সভা শুরু হওয়ার কয়েকদিন আগেই সকল প্রতিনিধি নিকাইয়া পৌঁছেন। তারা ছোট ছোট দলে জড় হতেন এবং তাদের মধ্যে আসন্ন সভার বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে বিতর্ক হত। এসব সমাবেশে, যা সাধারণত জিমনাসিয়াম বা খোলা আকাশের নীচে অনুষ্ঠিত হত, গ্রীক দার্শনিকগণ তাদের যুক্তির বাণ ছুঁড়ে দিতেন এবং ব্যঙ্গ্য-বিদ্রুপ করতেন তবে তা আগত প্রতিনিধিদের বিভ্রান্ত করত না।

যাইহোক, এই সম্মেলন শেষ হয়েছিল প্যাগান সম্রাটের সুক্ষ্ণ চালে ধর্মীয় রাজনীতিতে পারদর্শীদের বিজয়ের মাধ্যমে, অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়ে, অনেক বিশপের হৃদয়ে রক্তক্ষরণের মধ্য দিয়ে।

সমাপ্ত।

ছবি: Wikipedia, full-of-grace-and-truth.blogspot, 123rf, commos.wikimedia.
উৎস: Jesus- A Prophet of Islam by Muhammad Ata-Ur-Rahim.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন