pytheya.blogspot.com Webutation

২৮ ডিসেম্বর, ২০১২

Socianism: সোজিনি ও সোকিয়ানবাদ।


সোকিয়ানাসের প্রকৃত নাম ফাউষ্টো পাওলো সোজিনি (Fausto Paolo Sozzini)। অবশ্য অনেকে তাকে চিনেন Faustus Socinus বা Faust Socyn নামে। জন্ম ১৫৩৯ সনের ৫ই ডিসেম্বর সিয়েনা (Siena), ইটালিতে। তিনি তার পিতা-মাতার একমাত্র পুত্র সন্তান। তার জন্মের স্বল্পকাল পরেই, ১৫৪১ সনে তার পিতা আলেসান্দ্রো সোজিনি মারা যান। তার বাল্যকালের কিছুটা সময় বাউন্ডুলে কাটে। ১৫৫৬ সনে তার দাদা মারা যাবার সময় তাকে তাদের পারিবারিক সম্পত্তির এক চতুর্থাংশ দিয়ে যান। এই অর্থ তাকে স্বাবলম্বী করে। তার অসম্ভব মেধা ও বাগ্মিতা তাকে মাত্র ২৩ বছর বয়সেই জনসাধারণের কাছে 'সোকিয়ানাস' নামে পরিচিত করেছিল।

সোকিয়ানাস।
১৫৬১ সনে তিনি লিয়ঁ ও জেনেভা গমন করেন। ১৫৬৫ সনে তিনি ইটালিতে ফিরে আসেন।পরে তিনি ফ্লোরেন্স যান এবং ইসাবেলা দ্য মেডেসির অধীনে চাকুরি গ্রহণ করেন। ইসাবেলার মৃত্যুর পর তিনি ইটালি ত্যাগ করেন ও বাসিলে বসবাস করতে শুরু করেন। এখানে তিনি নিবিড়ভাবে বাইবেল পঠনে মনোযোগী হন। তরুণ পণ্ডিত সেখানে শীঘ্রই ধর্মতত্ত্বে আগ্রহীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। ১৫৭৮ সনে তিনি বেনামে একটি গ্রন্থ (De Jesu Christo Servatore) প্রকাশ করে গোপনে বিতরণ করেন।

ফাউষ্টো সোজিনির গ্রন্থটি পোলাণ্ডের রাজ দরবারের চিকিৎসক জর্জিও বণ্ড্রাটার (Giorgio Biandrata) হাতে পৌঁছে। বণ্ড্রাটা সোকিয়ানাসকে পোলাণ্ডে আসার আমন্ত্রণ জানান। সোকিয়ানাস আনন্দের সাথে তা গ্রহণ করেন। সেখানে তিনি স্বনামে লেখার স্বাধীনতা লাভ করেন। সোকিয়ানাসের মেধা ও মননে এবং চার্চের উপর তার লেখা প্রকাশিত হবার পর শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া ঘটল। তার বিরুদ্ধে চার্চ হূলিয়া জারি করল এবং ইতালিতে তার সহায়-সম্পদ বাজেয়াপ্ত হল।

সোকিয়ানাস গ্রেফতার হলেন এবং আদালত তাকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করার নির্দেশ দিল। কিন্তু সোকিয়ানাসের প্রতি জনসমর্থন এত বিপুল ছিল যে আদালত পরে তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। তবে অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে তাকে ঠান্ডা পানিতে ডুবিয়ে হত্যার রায় দেয়। ধর্মের বিরুদ্ধাচরণকারীদের জন্যে ক্যাথলিক চার্চীয় আইনে এ দু’টি বিধান ছিল যা 'জুডিকাম ডেই' (Judicum Dei) বা 'ঈশ্বরের বিচার' নামে আখ্যায়িত হত। 

সিয়েনা, ইটালি।
পানিতে ডুবিয়ে হত্যার এ শাস্তিতে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিকে সাগরের গভীর পানিতে নিক্ষেপ করা হত।এভাবে রায় কার্যকরীতে ক্যাথলিক যাজকগণ তাকে সাগরে নিক্ষেপ করে ফিরে এল। সোকিয়ানাস সাঁতার জানতেন না, কিন্তু যেভাবেই হোক তিনি প্রাণে বেঁচে যান।

১৬০৪ সনের ৪ঠা মার্চ সোকিয়ানাস মারা গেলেন। মৃত্যুর পর, ১৬০৫ সনে তার সব রচনা একত্র করে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করা হয়। গ্রন্থটি রোকোউ (Rokow)-তে প্রকাশিত হওয়ার কারণে এটি 'রাকোভিয়ান ক্যাথেসিজম' (Racovian Cathechism) নামে পরিচিত। পোলিশ ভাষায় প্রকাশিত এ গ্রন্থটি ইউরোপের প্রায় সকল ভাষায় অনুদিত হয়। তার মতাদর্শ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এবং তার ধর্মীয় চিন্তাধারা 'সোকিয়ানবাদ' (Socianism) নামে পরিচিতি লাভ করে।

 হারনাক তার 'আউটলাইনস অব দি হিষ্টরি অব ডগমা’ গ্রন্থে সোকিয়ানবাদের নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো উল্লেখ করেছেন-

-এতে রয়েছে ধর্মের বাস্তবতা ও বিষয় সম্পর্কিত প্রশ্নসমূহ সহজ করে তোলার এবং চার্চ প্রবর্তিত ধর্মের বোঝা প্রত্যাখ্যানের সাহস। 
-এটা ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে এবং খৃষ্টধর্ম ও প্লাটোনিজমের মধ্যে চুক্তির বন্ধন ভেঙে দিয়েছে। 
-এটা এ ধারণা ছড়িয়ে দিয়েছে যে ধর্মকে শক্তিশালী করতে হলে ধর্মীয় সত্যের বিবরণ সুস্পষ্ট ও উপলব্ধি যোগ্য হতে হবে। 
-এটা বাইবেলে যা নেই সেই প্রাচীন ধর্মমতের বন্ধন থেকে পবিত্র বাইবেলের অধ্যয়নকে মুক্ত করার চেষ্টা করেছে। কেউ একজন বলেছেন যে, 'সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা হল যাজকদের রাজস্ব।’ সোকিয়ানবাদ এ দু’টিকেই হ্রাস করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভূমিকা পালন করে। 

সোকিয়ানবাদ ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়লে নরউইচের বিশপ হল (Bishop Hall) খৃষ্টধর্মের চূড়ান্ত ধ্বংসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন। ১৬৩৮ সনে সোকিয়ানাসদের উপর নির্মম ও সংগঠিত নিপীড়ন শুরু হয়। তাদের সকল নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা সহ বহু লোককে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। ফুলার বলেন, 'সোকিয়ানবাদীদের এভাবে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার বীভৎস ব্যাপারটি সাধারণ মানুষকে স্তম্ভিত করে... এবং তারা ভাল চিন্তাগুলো এমনকি ধর্ম বিরোধীদের মতও সাদরে গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিল যারা রক্ত আখরে খঁচিত করেছিল নিজেদের ধর্ম বিশ্বাসকে।'
ওয়ালেস বলেন, 'সেজন্যই প্রথম জেমস আগুনে পুড়িয়ে হত্যার বদলে তাদের বই পুড়িয়ে দেয়ার অধিকতর কম ক্ষতিকর নীতি গ্রহণ করেছিলেন।'

১৬৫৮ সনে কঠোর আইন জারি হল। জনসাধারণকে- 'রোমান ক্যাথলিক ধর্ম গ্রহণ কর অথবা নির্বাসনে যাও'-এ দু'টি অপসনের মধ্যে যে কোন একটিকে বেছে নিতে বলা হয়। ফলে সোকিয়ানাসরা ছত্রভঙ্গ হয়ে সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে।

রাকোভিয়ান ক্যাথেসিজমে বিধৃত লেখায় সোকিয়ানাস 'প্রায়শ্চিত্ত মতবাদ' প্রত্যাখ্যান করে গোঁড়া খৃষ্টধর্মের মর্মমূলে আঘাত হেনেছিলেন। যীশু ক্রুশবিদ্ধ হননি কিংবা পুনরুজ্জীবিতও হননি, সুতরাং এ মতবাদ সম্পূর্ণরূপে ভিত্তিহীন। সোকিয়ানাস যীশুর জীবনের শেষ পরিণতি সম্পর্কে জ্ঞাত না থাকলেও তিনি প্রাপ্ত অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে এ মতবাদের অসারতা প্রমাণ করেছিলেন। 

সংক্ষেপে বললে, প্রায়শ্চিত্ত মতবাদের অনুসারীরা প্রচার করতে থাকে যে- 'আদমের প্রথম ভুল কাজের জন্যে মানুষ পাপী হয়ে জন্মগ্রহণ করেছে। যীশু তার ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে এ পাপ এবং খৃষ্টধর্ম গ্রহণকারী তার অনুসারী সকলের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করেছেন। গোঁড়া খৃষ্টধর্ম অনুসারে চার্চ হল একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও পবিত্র সমাজ যা যিশুখৃষ্ট মানুষের কাজের জন্যে তার প্রায়শ্চিত্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। শুধুমাত্র এ সমাজের মধ্যে থেকে এবং তার সেবার মাধ্যমে পাপী মানুষ ঈশ্বর লাভের পথ খুঁজে পেতে পারে। এ কারণে চার্চে বিশ্বাসী ব্যক্তি অন্যদের চাইতে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রাধিকার প্রাপ্ত।' 

সোকিয়ানাস-এর সবকিছুই প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, 'একজন মানুষ কোন মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই সরাসরি ঈশ্বরকে লাভ করতে পারে। আত্মার মুক্তির জন্যে খৃষ্টধর্ম নয়, সঠিক বিশ্বাস প্রয়োজন, অন্ধভাবে চার্চকে অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই।’

'প্রায়শ্চিত্ত মতবাদ' প্রত্যাখ্যান করে সোকিয়ানাস সমগ্র চার্চের কর্তৃত্ব ও অস্তিত্ব সম্পর্কেই প্রশ্নের সৃষ্টি করেন। প্রধানত: এই কারণেই ক্যাথলিক ও প্রোটেষ্টাণ্টরা সোকিয়ানাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যে পরস্পরের সাথে হাত মিলিয়েছিল। সোকিয়ানাস তাদের প্রায়শ্চিত্ত মতবাদ খণ্ডন করেন এভাবে-

’যিশুখৃষ্ট আদি পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য জীবন উৎসর্গ করেননি। গসপেলের বর্ণনা অনুযায়ী যীশু অল্প সময়ের জন্যে যন্ত্রণাভোগ করেন। মানুষকে যে অনন্তকালীন যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে তার সাথে তুলনায় স্বল্প সময়ের খুব তীব্র যন্ত্রণা কিছুই নয়। যদি এ কথা বলা হয় যে, এ যন্ত্রণা ছিল অতি ভয়ানক কারণ যিনি তা ভোগ করেন তিনি ছিলেন অনিঃশেষ, তথাপিও অনিঃশেষ ব্যক্তির যন্ত্রণাও অনন্ত যন্ত্রণার কাছে কিছুই নয়।

যদি স্বীকার করে নেয়াও হয় যে, যিশুখৃষ্ট প্রায়শ্চিত্ত করেছিলেন তাহলেও সৃষ্টিকর্তার ক্ষমা অথবা তার ক্ষমার জন্যে তার প্রতি মানুষের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের কথা বলা অসম্ভব, যেহেতু যে ব্যক্তি যীশুখৃষ্টের নামে দীক্ষিত হবে সৃষ্টিকর্তা তার পাপ ক্ষমা করার আগেই সে স্বংয়ক্রিয়ভাবে ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে যায়। এ মতবাদ অনুসরণ করার অর্থ-সৃষ্টিকর্তার আইন তার বান্দাদের জন্যে আর বাধ্য-বাধকতামূলক থাকে না। যেহেতু তার সকল পাপের ইতিমধ্যে পূর্ণ প্রায়শ্চিত্ত হয়ে গেছে। সুতরাং কোন ব্যক্তি তার যা খুশি করার স্বাধীনতা পেয়ে যায়। যেহেতু যীশুখৃষ্টের প্রায়শ্চিত্ত পূর্ণাঙ্গ ও অনন্ত, সুতরাং সকলেই তার আওতাভূক্ত। তাই চিরকালীন মুক্তি অবধারিত হয়ে যায়। অন্য কথায়, মানুষকে নতুন কোন শর্ত দেয়ার অধিকার ঈশ্বরের নেই। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে, সে কারণে সকল ঋণ গ্রহীতাই এখন মুক্ত। ধরা যাক, একদল লোক একজন জাগতিক ঋণদাতার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছে এবং কোন একজন তা সম্পূর্ণরূপে পরিশোধ করল। এরপর ঐ ঋণদাতার কি ওইসব ঋণ গ্রহীতার কাছে আর কোন দাবি থাকবে যারা আর তার কাছে ঋণী নয়?’

যীশু ঈশ্বর নন, একজন মানুষ, একথা ব্যক্ত করে সোকিয়ানাস পরোক্ষভাবে প্রায়শ্চিত্ত মতবাদ সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কোন ব্যক্তিই সমগ্র মানবজাতির অসৎ বা ভুল কাজের জন্যে প্রায়শ্চিত্ত করতে পারে না। এ সত্যটি এই কাল্পনিক মতবাদ খণ্ডন করার জন্যে যথেষ্ট।

সোকিয়ানাস জোর দিয়ে বলেছেন যে, 'যীশু একজন মরণশীল মানুষ ছিলেন। তিনি এক কুমারী মায়ের গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। তার জীবনের পবিত্রতার জন্যে তিনি অন্য সকল মানুষ থেকে পৃথক ছিলেন। তিনি ঈশ্বর ছিলেন না, কিন্তু ঈশ্বরের কাছ থেকে প্রেরণা পেয়েছিলেন। তার অলৌকিক দৃষ্টি ও শক্তি ছিল, কিন্তু তিনি তার স্রষ্টা ছিলেন না। ঈশ্বর মানবজাতির কাছে এক মিশনে তাকে প্রেরণ করেছিলেন।’

বাইবেলের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ সমূহের উদ্ধৃতি ও ব্যাপক ব্যাখ্যার মাধ্যমে সোকিয়ানাস এসব বিশ্বাসকে সমর্থন করেন। তার সূক্ষ্ম ও বলিষ্ঠ যুক্তি যীশুখৃষ্ট সম্পর্কে একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা প্রদান করে। তিনি বলেন, ’যীশু তার জীবনে সকল অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছেন। বিশ্ব সৃষ্টির আগে তার সৃষ্টি হয়নি। প্রার্থনার সময় যীশুর সাহায্য কামনা করা যেতে পারে যদি না ঈশ্বর হিসেবে তার উপাসনা করা হয়।’

সোকিয়ানাস দৃঢ়তার সাথে ব্যক্ত করেন যে, 'ঈশ্বর সর্বোচ্চ প্রভু। সর্বশক্তিমান তাঁর একমাত্র গুন নয়, তিনি সকল গুণের অধিকারী। ঈশ্বরের বিরুদ্ধে কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যায় না। সীমা-অসীমের পরিমাপ হতে পারে না। সুতরাং ঈশ্বর সম্পর্কে মানুষের সকল ধারণাই অপর্যাপ্ত এবং শুধু এ ধারণার উপর ভিত্তি করে ঈশ্বরের বিচার করা যায় না। ঈশ্বর স্বাধীন, স্ব-ইচ্ছা সম্পন্ন এবং মানুষের মস্তিষ্ক প্রসূত কোন আইনের তিনি আওতাধীন নন। তাঁর উদ্দেশ্য এবং তার ইচ্ছা মানুষের অগোচর। তিনি মানুষের এবং অন্য সকল বিষয়ের উপর সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব সম্পন্ন এবং সব কিছুই তাঁর ইচ্ছাধীন। তিনি অন্তরের অন্তস্থলে লুকিয়ে রাখা গোপন কথাটিও জানেন। যিনি ইচ্ছামত বিধি-বিধান তৈরি করেন এবং সৎকাজ ও অসৎ কাজের জন্যে পুরস্কার ও শাস্তি প্রদান করেন। ব্যক্তি হিসেবে মানুষকে ইচ্ছার স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে, কিন্তু কার্যত: সে ক্ষমতাহীন।’

সোকিয়ানাস বলেন, 'সকল কিছুর উপর সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী সত্তা একজনের বেশি হতে পারেন না। সুতরাং তিনজন সর্বশক্তিমানের কথা বলা অযৌক্তিক। ঈশ্বর একজনই, সংখ্যায়ও তিনি এক। ঈশ্বরের সংখ্যা কোন ক্রমেই একাধিক নয়। প্রতিটি ব্যক্তির নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক সত্তা রয়েছে। ঈশ্বর যদি সংখ্যায় তিনজনই হবেন তাহলে তিনটি স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তা ও থাকার কথা। যদি এটাই বলা হয় যে একটি মাত্র সত্তাই বিরাজমান তাহলে এটাও সত্য যে সংখ্যার দিক দিয়েও ঈশ্বর একজনই।’

সোকিয়ানাস যে যুক্তি দিয়ে ত্রিত্ববাদের বিষয় খণ্ডন করেছেন তা হল যীশুর একই সাথে দু’টি বৈশিষ্ট্য থাকা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, 'একই ব্যক্তির মধ্যে দু’টি বিপরীত গুণ বা বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন সত্তার সমাবেশ ঘটতে পারে না। আর এ ধরনের বৈশিষ্ট্যগুলো হল মরণশীলতা ও অ-মরণশীলতা, আদি ও অনাদি, পরিবর্তন ও পরিবর্তনহীনতা। আবার দু’টি বৈশিষ্ট্য যার প্রতিটি একটি পৃথক ব্যক্তিসত্তা গঠনে সক্ষম, এক ব্যক্তির মধ্যে তাদের সমন্বয় করা যেতে পারে না। তাই একজনের পরিবর্তে প্রয়োজনের তাগিদেই এক্ষেত্রে দু’ব্যক্তির উদ্ভব ঘটে এবং পরিণতিতে দু’জনই যীশুখৃষ্টে পরিণত হন। একজন ঈশ্বর, অন্যজন মানুষ।'

চার্চ বলে থাকে- 'যিশুখৃষ্টের ঐশ্বরিক ও মানবিক সত্তা রয়েছে যেমনটি মানুষ দেহ ও আত্মার সমন্বয়ে গঠিত।' সোকিয়ানাস এর জবাব দেন- 'উভয়ের মধ্যে তুলনা চলে না। কেননা একজন মানুষের ক্ষেত্রে দেহ ও আত্মা এমনভাবে সংযুক্ত যে, একজন মানুষ শুধু না আত্মা- না শরীর। শুধু আত্মা বা শুধু দেহ দিয়ে কোন মানুষ সৃষ্টি হয় না।পক্ষান্তরে ঐশীশক্তি নিজেই প্রয়োজনে একটি মানুষ সৃষ্টি করে। একইভাবে মানুষ নিজেও এক পৃথক ব্যক্তিকে সৃষ্টি করে।’

সোকিয়ানাস আরও বলেন, ‘শুধু তাই নয়, এটা বাইবেলের কাছেও গ্রহণযোগ্য নয় যে যীশুখৃষ্টের ঐশ্বরিক বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে। প্রথমত, ঈশ্বর যীশুকে সৃষ্টি করেছেন। দ্বিতীয়ত, বাইবেলের মতে তার সবই ঈশ্বরের দান। তৃতীয়ত, বাইবেলে সুষ্পষ্টভাবে আভাস দেওয়া হয়েছে যে যীশু সকল অলৌকিক ঘটনার উৎস হিসেবে তার নিজের বা কোন ঐশ্বরিক গুনের কথা উল্লেখ করেননি, বরং ঈশ্বরকেই এসবের উৎস বলে ব্যক্ত করেছেন। যীশু নিজেও ঈশ্বরের ইচ্ছার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।’

রেলান্ড (Reland) তার ‘হিষ্টারিকাল অ্যান্ড ক্রিটিকাল রিফ্লেকশনস আপন মোহামেডানিজম এণ্ড সোকিয়ানিজম’-গ্রন্থে 'রাকোভিয়ান ক্যাথেসিজম' সম্পর্কে বলেন- 'যিশুখৃষ্টকে ঈশ্বর বলে বিশ্বাস করার কথা যারা বলেন তা শুধু সঠিক যুক্তির বিপরীতই নয়, এমনকি তা পবিত্র বাইবেলেরও পরিপন্থী এবং যারা বিশ্বাস করে যে শুধু পিতাই নন, তার পুত্র এবং পবিত্র আত্মাও একই ঈশ্বরের মধ্যে ত্রয়ী সত্তা, তারাও মারাত্মক ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে... ঈশ্বরের সত্তা অত্যন্ত সহজ এবং সম্পূর্ণ একক। সুতরাং তারা যদি তিন স্বতন্ত্র ব্যক্তি হয়ে থাকেন তাহলে আরেকজন ঈশ্বরের কথা বলা একেবারেই পরস্পর বিরোধী এবং পিতা তার নিজস্ব সত্তায় একটি সন্তানের জন্মদান করেছেন বলে আমাদের প্রতিপক্ষের দুর্বল ক্ষুদ্র যুক্তি উদ্ভট ও অপ্রাসঙ্গিক... নিকাইয়ার কাউন্সিলের সময় পর্যন্ত সকল সময় এবং কিছু সময় পরও সমসাময়িকদের লেখায় পিতা ঈশ্বরকেই প্রকৃত ঈশ্বর বলে স্বীকার করা হত বলে দেখা যায়। যারা বিপরীত মতের অধিকারী ছিলেন, যেমন সাবেলিয়ান (Sabellian) এবং তার সমমনাদের প্রচলিত ধর্মমত বিরোধী বলে গণ্য করা হতো... যিশুখৃষ্ট বিরোধী চেতনা খৃষ্টীয় চার্চের মধ্যে সবচাইতে বেশি মারাত্মক ভুলের প্রচলন করেছে এই মতবাদে যে, ঈশ্বরের অত্যন্ত সহজ সত্তায় রয়েছে তিন জন স্বতন্ত্র ব্যক্তি, যাদের প্রত্যেকেই এক একজন ঈশ্বর এবং পিতাই শুধু একমাত্র প্রকৃত ঈশ্বর নন, পুত এবং পবিত্র আত্মাও অবশ্যই একই রকম ঈশ্বর। সত্যের এর চেয়ে অধিক অবাস্তব, অধিক অসম্ভব এবং অপলাপ আর হতে পারে না... খৃষ্টানরাও বিশ্বাস করে যে যীশুখৃষ্ট আমদের পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্যেই মৃত্যুবরণ করেছেন এবং আমাদের পাপের স্খালন করেছেন। কিন্তু এই মত মিথ্যা, ভ্রান্তিপূর্ণ ও ক্ষতিকারক।’

টোল্যান্ড তার 'দি নাজারেনিস' (The Nazarenes) গ্রন্থে বলেন-’সোকিয়ানাসের মতানুসারী এবং অন্যান্য একত্ববাদীরা অত্যন্ত আস্থার সাথে বলেন যে, যারা ইহুদী সম্প্রদায় ভুক্ত ছিল না তারাই খৃষ্টধর্মে তাদের সাবেক একাধিক ঈশ্বরবাদ ও মৃত মানুষকে ঈশ্বরত্ব আরোপের মতবাদ প্রচলন করেছে: এগুলোতে খৃষ্টধর্মের নাম বহাল রয়েছে কিন্তু বিষয়ের আমূল পরিবর্তন হয়ে গেছে এবং সকল মত ও প্রথার সাথে সংগতি রেখে নিজেদের স্বার্থে ও প্রয়োজনে এরা তা কাজে লাগাচ্ছে।’ 

এটা সুস্পষ্ট যে সোকিয়ানাসের রচনা ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়েছিল। তিনি জনসাধারণের কাছে যীশু কে ছিলেন এবং কী জন্য তিনি এসেছিলেন সে ব্যাপারে সঠিক চিত্রই শুধু তুলে ধরেননি, উপরন্তু মানুষের উপর চার্চ যে বিপুল ক্ষমতা প্রয়োগ করত, তার অধিকাংশই ধ্বংস করেছিলেন। সোকিয়ানাসের শ্রেষ্ঠত্ব এখানে যে তিনি এমন এক ধর্মমতের ধারক ছিলেন যা ছিল যৌক্তিক এবং বাইবেল ভিত্তিক। তার বিরোধীদের পক্ষে তার মতামত বাতিল করা সম্ভব ছিল না। যেমন- ১৬৮০ সনে রেভারেণ্ড জর্জ অ্যাশওয়েল (Ashwell) যখন দেখলেন যে সোকিয়ানাসের গ্রন্থগুলো তার ছাত্রদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়, তখন তিনি সোকিয়ানবাদের উপর একটি গ্রন্থ রচনার সিদ্ধান্ত নেন। সোকিয়ানাস সম্পর্কে তার মূল্যায়ন অত্যন্ত কৌতুহলোদ্দীপক-

'এ সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষক এক অত্যন্ত মহৎ ব্যক্তি যার মধ্যে সকল গুণের সমাবেশ ঘটেছিল এবং তিনি মানুষের শ্রদ্ধা ও প্রশংসা অর্জন করেছিলেন। যাদের সাথে তিনি কথা বলতেন তাদের সকলকেই তিনি মুগ্ধ করতেন। তিনি সকলের মনে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ছাপ রেখেছিলেন। তিনি তার প্রতিভার শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন করেছিলেন। তার যুক্তি বিন্যাস ছিল অত্যন্ত জোরালো, তিনি ছিলেন বিরাট বাগ্মী। তার সদ্গুণ সকলের কাছেই ছিল অসাধারণ। তার মহৎ চরিত্র ও জীবন ছিল উদাহরণযোগ্য এবং সে কারণেই তিনি মানুষের শ্রদ্ধা লাভ করেছেন।’ আর সমাপ্তি টেনেছেন এভাবে-'সোকিয়ানাস ছিলেন শয়তানের বড় ফাঁস বা ফাঁদ।’

তবে আজকের দিনে অধিকাংশ খৃষ্টানই সোকিয়ানাস সম্পর্কে রেভারেণ্ড অ্যাশওয়েলের স্ববিরোধী মন্তব্যের সাথে একমত নন। বরং যে নির্মমভাবে এই মতবাদ দমন করা হয়েছিল তাতে অনেকেরই সহানুভূতি উদ্রেক করে। 

সমাপ্ত।

উৎস: Jesus- A Prophet of Islam by Muhammad Ata-Ur-Rahim.
ছবি: Wikipedia.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন