pytheya.blogspot.com Webutation

২৬ ডিসেম্বর, ২০১২

Saint Paul: পলের প্রচারণা- একটি বিশ্লেষণ।


টারসাসের পল বা পৌল (Paul of Tarsus) কখনোই যীশুর সাথে সাক্ষাৎ করেননি, কিংবা যীশুর ঘনিষ্ঠ শিষ্যদের কারো সাথেই তিনি সংশ্লিষ্ট ছিলেন না। বরং যীশুর একজন বড় শত্রু হিসেবেই তিনি পরিচিত ছিলেন। তিনি ষ্টিফেন (Stephen)-কে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা সতর্ক দৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং তিনি সেই ক্রমবর্ধমান ভক্তদের একজন যিনি যীশুর অন্তর্ধানের পর তার অনুসারীদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন। 

টারসাসের পল।
পলের নিজের শিক্ষক জামালিয়েল ষ্টিফেনকে রক্ষা করার চেষ্টা করলে তাকেও পাথর ছুঁড়ে হত্যা করা হয়। জানা যায় যে পল, যাকে তখন সল (Saul) বলে ডাকা হত, সেসময় চার্চের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড অত্যাচার চালানোর জন্যে দায়ী ছিলেন। তিনি গির্জাগুলো ধ্বংস করেন এবং ঘরে ঘরে প্রবেশ করে নারী ও পুরুষদের টেনে হিঁচড়ে বের করে এনে কারাগারে হিসেবে নিক্ষেপ করেন।-(প্রেরিত ৮:১-৩) এ সম্পর্কে পল নিজেই বলেছেন- 'আপনারা শুনেছেন .....কি প্রচণ্ড অত্যাচার আমি চালিয়েছি ঈশ্বরের চার্চের উপর এবং সেগুলোকে ধ্বংস করেছি- আমি আমার স্বদেশীয় অনেকের চাইতে ইহুদী ধর্মের কাছ থেকে লাভবান হয়েছি, কারণ আমি আমার পূর্বপুরুষদের চাইতেও অনেক বেশি ধর্মান্ধ।' -(গালাতীয় ১:১৩-১৫)

পল যীশুর অনুসারীদের হুমকি প্রদান ও হত্যা চালিয়ে যেতে থাকলেন। তিনি প্রধান পুরোহিতের কাছে গেলেন এবং তার কাছে দামেশকের সিনাগগ গুলোর কাছে চিঠি লিখে দেওয়ার আবেদন জানালেন যাতে যীশুর অনুসারী কাউকে পাওয়া গেলে তা সে নারী বা পুরুষ যেই হোক না কেন, তাকে যেন জেরুজালেমে নিয়ে আসতে পারেন।-(প্রেরিত  ৯: ৪১) 
এই দামেশক যাত্রাপথে পল যীশুকে স্বপ্নে দেখেছিলেন এবং পরিণতিতে তার অনুসারীতে পরিণত হয়েছিলেন বলে কথিত আছে। 

এসব ঘটনাবলী সংঘটিত হওয়ার কিছুদিন আগে পল পোপিয়া (Popea) নাম্নি এক নারীকে বিয়ে করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এই মেয়েটি ছিলেন ইহুদীদের প্রধান ঈমামের আকর্ষণীয় ও উচ্চাকাঙ্খী কন্যা। তিনি পলকে পছন্দ করা সত্ত্বেও তার বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন ও রোমে গিয়ে অভিনেত্রী হন। 

মঞ্চ থেকে ধাপে ধাপে তার উন্নতি হতে থাকে এবং এক পর্যায়ে তিনি সম্রাট নীরোর শয্যা পর্যন্ত পৌঁছে যান। শেষপর্যন্ত তিনি তাকে বিয়ে করেন ও রোম সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞী হন। সুতরাং ইহুদী ও রোমান উভয়ের প্রতিই পলের বিতৃষ্ণ হয়ে ওঠার সংগত কারণ ছিল। মূলত: পোপিয়া কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর পল অত্যন্ত আবেগতাড়িত ও মানসিক বিপর্যয়কর অবস্থার মধ্যে ছিলেন। আর তাই ইহুদী ধর্মের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমর্থক হওয়ার পরিবর্তে তিনি তার বিরাট শত্রুতে পরিণত হন। এর পিছনে তার জীবনের এই সংকটেরই বড় ভূমিকা ছিল। 
দামেস্কের পথে পলের ধর্মান্তরিত হওয়া।
ধর্মান্তরিত হওয়ার পর পল দামেশকে যীশুর অনুসারীদের সাথে অবস্থান করেন এবং 'সরাসরি সিনাগগগুলোতে গমন করে যীশু ঈশ্বরের পুত্র' বলে প্রচার করতে থাকেন।-(প্রেরিত ৯:২০) এর ফলশ্রুতিতে তিনি সেই অত্যাচারের স্বাদ লাভ করতে শুরু করলেন যার সাথে নিকট অতীতে তিনি নিজেই জড়িত ছিলেন। তিনি যীশুকে ‘ঈশ্বরের পুত্র’ বলে আখ্যায়িত করায় তা ইহুদীদের ক্রুদ্ধ করে তুলে ছিল। যেহেতু তারা ছিল ঈশ্বরের একত্বে বিশ্বাসী। 

এরপর পল দামেশক ত্যাগ করেন। তিনি যীশুর অন্যান্য অনুসারীদের সাহচর্য সন্ধানের পরিবর্তে আরবের মরুভূমিতে গমন করেন। সেখানে তিনি ৩ বৎসর লুকিয়ে থাকেন। সম্ভবত এ নির্জনবাসেই তিনি যীশুর প্রচারিত শিক্ষার ভিত্তিতে নিজস্ব একটি রূপ তৈরির কাজ করেছিলেন। যেমন.-ইহুদী আইন প্রত্যাখ্যান। যীশু তার জীবন ব্যাপী একজন আচারনিষ্ঠ ইহুদীই ছিলেন এবং তিনি মুসার শিক্ষাকেই সর্বদা সমুন্নত রেখেছিলেন। কিন্তু পল এ সত্যকে অস্বীকার করেন। 

মরুভূমির নির্জনবাস শেষে পল জেরুজালেমে যীশুর শিষ্যদের কাছে আগমন করেন। তার আকস্মিক আগমনের ঘটনা বিস্ময় সৃষ্টির চাইতে সন্দেহ সৃষ্টি করে বেশি। পল যীশুর অনুসারীদের প্রতি যে নির্যাতন চালিয়েছিলেন, তার স্মৃতি তখনও তাদের মনে জাগরুক ছিল। একটি চিতাবাঘ কি তার শরীরের দাগ পরিবর্তন করতে পারে? যীশুর শিষ্যদের পক্ষে পলকে তাদের মধ্যে গ্রহণ করার কোন কারণ ছিল না। কেননা, তিনি যে তাদের উপর নির্যাতন চালিয়েছিলেন শুধু তাই নয়, তিনি আরো দাবি করেছিলেন যে, যীশুর শিক্ষা সম্পর্কে তিনি জ্ঞাত, অথচ তিনি তাকে কোনদিন দেখেননি ও তার সাথে কখনোই অবস্থান করেননি, এমনকি যীশুর ঘনিষ্ঠ শিষ্যদের সাথেও তার মেলামেশা ছিল না। যীশুর জীবিতকালে যারা তার ঘনিষ্ঠ সাহচর্য পেয়েছিলেন, তাদের কাছ থেকে কিছু জানা ও শেখার বদলে পল তাদের শিক্ষা প্রদান করতে চাইলেন। পল পরে গালাতীয়দের কাছে লেখা তার চিঠিপত্রে তার এ পদক্ষেপের যৌক্তিকতা বর্ণনা করে বলেন- 'ভাইসব, আমি এ মর্মে প্রত্যয়ন করছি যে, আমার দ্বারা প্রচারিত গসপেল কোন মনুষ্য রচিত নয়। আমি কোন মানুষের কাছ থেকে এটি লাভ করিনি কিংবা কেউ আমাকে এটা শিক্ষাও দেয়নি, এটি হল যীশুর প্রত্যাদেশ থেকে প্রাপ্ত।'-(গালাতীয় ১:১০-১২) 
এভাবেই পল যীশুর সাথে নিজের সম্পৃক্ততার দাবি করেন যা যীশুর সাহচর্য লাভকারী ঘনিষ্ঠ অনুসারীরা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। অবশ্য পল তাকে যে শিক্ষা দেয়া হয়েছে বলে দাবি করেন, তা স্বয়ং যীশুর মুখ থেকে তার শিষ্যদের শোনা শিক্ষার সাথে মিলিয়ে দেখা হয়নি। এটা বোঝা যায় যে তারা ধর্মান্তরের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেছিলেন এবং তার কথিত 'প্রত্যাদেশ' কে নির্ভরযোগ্য বলে গণ্য করেননি। অনেকে সম্ভবত: সন্দেহ করেছিলেন যে, তিনি যীশু অনুসারীর ছদ্মবেশে গুপ্তচর ছাড়া আর কিছু নন।

পলকে গ্রহণ করা হবে কিনা এ নিয়ে এক তিক্ত বিরোধের সৃষ্টি হয় এবং এর ফলাফল ছিল পূর্ব নির্ধারিত। এমতাবস্থায় জামালিয়েলের ছাত্র হিসেবে বার্নাবাস তার সহপাঠী পলের পক্ষে হস্তক্ষেপ ও প্রচারণা শুরু করেন। যীশুর অনুসারীদের সর্বসম্মত বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি পলকে তাদের দ্বারা গ্রহণ করান। পল অবশ্যই এ কথা উপলব্ধি করেছিলেন যে, শুধুমাত্র বার্নাবাসের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার বলেই তিনি গৃহীত হয়েছেন, নিজের প্রচেষ্টায় নয়। এর ফলে সম্ভবত: তিনি অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তাই, এ ঘটনার পরপরই তিনি টারসাসে, নিজের শহর ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অবশ্য এ কথাও জানা যায় যে তার জীবন বিপদাপন্ন হওয়ার কারণেই তিনি জেরুজালেম ত্যাগ করেছিলেন। 

এন্টিওক নগরী
নির্যাতনের কারণে যীশুর শিষ্যদের অনেকে এবং বহু অনুসারী দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েন। স্টিফেনকে হত্যার পর কিছু অনুসারী এন্টিওকের (Antioch) উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। তৎকালীন রোমান সাম্রাজ্যে রোম ও আলোকজান্দ্রিয়ার পর এটি ছিল তৃতীয় বৃহত্তম নগরী। 

এন্টিওক নগরীটি মূলত: গ্রীক সাম্রাজ্যের রাজধানী হবার পর থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসাবে বিকশিত হয়েছিল। এখানকার অধিবাসীগণ সম্পদের প্রাচুর্য্যে স্ফীত হয়ে বিলাসী জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। শীঘ্রই তাদের অধঃপতন ঘটে এবং এন্টিওক নৈতিকতাহীন জীবন-যাত্রার নগরী বলে কুখ্যাতি লাভ করে। 

এরকম একটি নগরে গায়ে শুধু কম্বল জড়ানো ক্ষুদ্র একদল আগন্তুক সহজ, সরল ও সততাপূর্ণ ঈশ্বর ভীতিপূর্ণ জীবন-যাপন শুরু করে। নৈতিকতাহীন জীবন যাপনে ক্লান্ত নগরবাসীরা তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ভিড় জমাতে শুরু করে। কিন্তু অধিকাংশ লোকের কাছেই তারা ছিল অবজ্ঞা ও উপহাসের পাত্র। তারা তাদেরকে ‘খৃষ্টান’ বলে ডাকত। সামান্য কিছু লোকের কাছে এ শব্দটি শ্রদ্ধা ব্যাঞ্জক ছিল বটে, কিন্তু অন্যদের কাছে এটি ছিল ঘৃণা ও অবজ্ঞার। এ সময় পর্যন্ত যীশুর অনুসারীরা নাজারিনি (Nazarene) নামেই পরিচিত ছিলেন। হিব্রু এ শব্দটির মূল অর্থ 'রক্ষা করা’ বা ‘প্রহরা দেওয়া।’ এ ভাবেই এ বিশেষণটি যীশুর শিক্ষার রক্ষক ও অভিভাবক হিসাবে তাদের ভূমিকার ইঙ্গিত বহন করছিল। 

এন্টিওক
এন্টিওকের ইহুদীরা দিনে তিনবার প্রার্থনা করত এবং প্রতিটি প্রার্থনায়, 'নাজারিনিদের উপর ঈশ্বরের অভিশাপ’প্রেরণ করত। ঐতিহাসিক প্রফেরী (Prophery), নাজারিনিদের জীবন-পদ্ধতিকে 'বর্বর, নতুন ও অদ্ভুত ধর্ম’ বলে বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে জেরোমের (Jerome) মতে খৃষ্টানগণ ’গ্রীক ভণ্ড ও প্রতারক’ বলে আখ্যায়িত হত। কেননা, গ্রীক মন্দিরের পুরোহিতরা যে আলখেল্লা পরিধান করতেন, তারাও সেই একই গ্রীক আলখেল্লা পরিধান করতেন। 
এ ধরনের বিরোধিতার সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও এ অদ্ভুত নবাগতদের কাছে লোকজনের আসা যাওয়া অব্যাহত ছিল এবং তাদের সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। লোকদের আগ্রহ দেখে উৎসাহিত হয়ে তখন তারা আশেপাশের পৌত্তলিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সত্যবাণী ও যীশুর শিক্ষা প্রচারের জন্যে একজন ধর্ম প্রচারককে সেখানে প্রেরণের জন্যে জেরুজালেমে খবর প্রেরণ করেন। যীশুর শিষ্যরা এ কাজের জন্যে বার্নাবাসকে মনোনীত করেন। বার্নাবাস এন্টিওক গমন করেন এবং অকল্পনীয় সাফল্য লাভ করেন। তার প্রচেষ্টায় 'বহু সংখ্যক লোক যীশুর প্রচারিত ধর্ম গ্রহণ করে'-(প্রেরিত, ১১:১৪)। 

এক বৎসর পর বার্নাবাস (Barnabas) অনুভব করলেন যে এন্টিওকের বাইরে তার কর্মকাণ্ড প্রসারিত করার সময় এসেছে। তার নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল যে এ কাজে পল তার ভাল সাহায্যকারী হবেন। তিনি টারসাস গমন করেন এবং পলকে নিয়ে ফিরে আসেন। এভাবে পল সেসব লোকের কাছেই ফিরে এলেন যারা তারই হাতে নির্যাতিত হয়েছিল। যাইহোক, পল পুনরায় বৈরিতা ও বিরোধিতার সম্মুখীন হলেন তার অতীত কর্মকান্ডের কারণে। এবারও বার্নাবাস হস্তক্ষেপ করলেন, ফলে এন্টিওকের যীশু অনুসারী সমাজে পল গৃহীত হলেন। বার্নাবাস তার সাবেক সহপাঠী পলের শুধু ভালটুকুই দেখতে পেয়েছিলেন এবং মনে করেছিলেন- যে ধর্মীয় আবেগ ও উদ্দীপনা তাকে একজন অত্যাচারীতে পরিণত করেছিল তা যদি যীশুর ধর্মীয় প্রচারের কাজে লাগান যায় তবে তিনি অসাধারণ ও অমূল্য অবদান রাখতে পারবেন।

কিন্তু যীশুর সকল অনুসারী এ দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একমত হতে পারেনি। পিটার সরাসরি পলের বিরোধিতায় অবতীর্ণ হন। পলের অতীত কার্যকলাপের কথা স্মরণ করে এ বৈরিতা আরো জোরাল হয়ে উঠার পাশাপাশি আরো দু’টি বিষয়ে মত পার্থক্য দেখা দেয়। যীশুর শিক্ষা কার কাছ থেকে গ্রহণ করা হবে এবং শিক্ষা দেয়া হবে সে ব্যাপারে তারা একমত হতে পারলেন না। পিটার মত প্রকাশ করেন যে, ইহুদীদের কাছে প্রচারিত ধর্ম পুনরুজ্জীবনের জন্যই যীশুর আগমন ঘটেছিল। সে কারণে তাঁর শিক্ষা শুধুমাত্র ইহুদীদের মধ্যেই প্রচার করা হবে। অন্যদিকে পল শুধু যে ইহুদী ও অন্যদেরসহ সকলের কাছেই ধর্ম প্রচারের পক্ষ মত প্রকাশ করেন তাই নয়, উপরন্তু বলেন যে যীশুর অন্তর্ধানের পর তিনি তার কাছ থেকে অতিরিক্ত নির্দেশনা লাভ করেছেন। তিনি আরো বলেন যে, সময় ও পরিস্থিতির দাবীর সাথে যীশুর শিক্ষার প্রয়োজনীয় সমন্বয় সাধন করতে হবে। 

বার্নাবাস উভয় পক্ষের মধ্যবর্তী অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি মত দিলেন যে তাদের শুধু সে শিক্ষাই দান করা উচিত যা যীশু শিক্ষা দিয়ে গেছেন। তবে তিনি বলেন, এ শিক্ষা তার কাছেই প্রচার করা উচিত যার এতে কল্যাণ হবে এবং যে সাড়া দেবে, সে ইহুদীই হোক আর অ-ইহুদীই হোক। বার্নাবাস ও পিটার যীশুর কাছ থেকে যে শিক্ষা লাভ করেছিলেন তাকে তারা ইহুদী ধর্মের (Judaism) অব্যাহত ও সম্প্রসারিত রূপ হিসাবেই গণ্য করতেন। তারা স্বয়ং যীশুর কাছ থেকে যা শুনেছিলেন তার সাথে পলের শিক্ষার যেখানে মিল ছিল না, সে অংশটি গ্রহণ করতে পারেননি। তারা বিশ্বাস করতেন যে পলের নয়া ধর্মমত সম্পূর্ণরূপেই তার একান্ত নিজস্ব সৃষ্টি। আলবার্ট শোয়েইটজার (Albert Shweitzer) তার 'Paul and his Interpreters' গ্রন্থে বলেছেন যে, পল কখনোই  তার গুরুর (যীশু) বাণী ও নির্দেশ প্রচার করেননি।

মনে হয়, বার্নাবাস আশা করেছিলেন যে, এ দুই চরমপন্থী নমনীয় হবেন এবং বিশেষ করে পল যীশুর অনুসারীদের সাহচর্য থেকে যীশুর শিক্ষার পূর্ণ উপলব্ধি ও রূপায়ণের মধ্য দিয়ে অর্জিত জ্ঞানের স্বার্থে নিজের ধারণা পরিত্যাগ করবেন। পলের প্রতি এ পর্যায়ে বার্নাবাসের সমর্থন যে কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা স্পষ্ট বোঝা যায়। কারণ বার্নাবাস ধর্ম প্রচারকারীদের সর্বসম্মত বিরোধিতার মুখে পলকে আশ্রয় প্রদান ও রক্ষা করেছিলেন। সম্ভবত এ কারণেই বার্নাবাসের জীবনের এ পর্যায়টি ধর্ম প্রচারকদের কর্মকাণ্ডে বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে। প্রেরিতদের কার্য্যাবলীতে বার্নাবাস ও পলের মধ্যে সম্পর্ক বিষয়ে বলা হয়েছে-
'এন্টিওকের চার্চে বার্নাবাস ও শিমোনের মত কতিপয় ধর্মগুরু ও শিক্ষক ছিলেন যাদেরকে সাইরিনের নাইজার (Niger of Cyrene) ও মানায়েনের লুসিয়াস (Lucius manaen) বলে আখ্যায়িত করা হত যাদেরকে হেরোদ দি টেট্রার্ক (Herod the Tetrarch) এবং সলের (Saul) সাথে প্রতিপালন করা হয়েছিল। যখন তারা ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা ও উপবাস করলেন তখন পবিত্র আত্মা বললেন: বার্নাবাস ও সলকে আমার সে কাজের জন্যে পৃথক কর যে কাজের জন্যে আমি তাদের আহবান করেছি।' (প্রেরিত, ১৩:১-২)
একত্রে কাজ করার জন্যে নির্বাচিত হওয়ার পর তারা বার্নাবাসের বোনের পুত্র জন মার্ককে নিয়ে যীশুর শিক্ষা প্রচারের জন্যে গ্রীস যাত্রা করেন। ইউসূফ বা যোসেফের ঔরসে জন্মলাভকারী মেরীর পুত্র জেমসকে এন্টিওকে যীশুর অনুসারীদের প্রধান নির্বাচিত করা হয়। পিটারও সেখানে থেকে যান। 
প্রচারে পল ও বার্নাবাস।
গ্রীসে আসার পর কয়েকটি স্থানে তাদের প্রতি পাথর নিক্ষেপ করা সত্ত্বেও এ দুই ধর্মপ্রচারক সামগ্রিক ভাবে সফল হন। সত্যানুসারী ব্যক্তি হিসেবে তাদের খ্যাতি দূর-দূরান্তরে ছড়িয়ে পড়ে। তারা যখন লুকাওনিয়া (Lucaonia) পৌঁছেন এবং একজন পঙ্গুকে রোগমুক্ত করেন তখন গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে,- "মানুষের ছদ্মবেশে ঈশ্বরগণ আমাদের কাছে নেমে এসেছেন। তারা বার্নাবাসকে জুপিটার (Jupiter) নামে এবং পলকে মার্কারিয়াস (Mercurius) নামে আখ্যায়িত করে। তখন জুপিটারের পুরোহিতরা..... গরু ও মালা নিয়ে তোরণ দ্বারে এল এবং সেগুলোকে জবাই করল। বার্নাবাস ও পল যখন এটা শুনতে পেলেন, তারা তাদের পোশাক ছিঁড়ে ফেলে কাঁদতে কাঁদতে লোকজনের কাছে দৌড়ে গেলেন। তারা বললেন . তোমরা এ সব কি করছ? আমরা তোমাদেরই মত সাধারণ মানুষ, আমরা তোমাদের কাছে ঈশ্বরের কথা প্রচার করতে এসেছি যিনি স্বর্গ, পৃথিবী ও সমুদ্র সহ বিশ্বমণ্ডলের সকল কিছু সৃষ্টি করেছেন।"-(প্রেরিত ১৪:১১-১৫) 
গ্রীসের অধিবাসীদের এই প্রতিক্রিয়া যদি স্বাভাবিক হয়ে থাকে তবে তা ছিল বাস্তব সমস্যার ইঙ্গিত বহনকারী যার সম্মুখীন হয়েছিলেন বার্নাবাস ও পল। একজন প্রকৃত ইহুদী যীশুর শিক্ষাকে মুসার প্রচারিত ধর্মেরই পুনর্ব্যক্ত রূপ বলে তাৎক্ষণিক ভাবে স্বীকার করবে। কিন্তু বহু মূর্তিপূজকের কাছেই সেটি নতুন ও অদ্ভুত এবং কিছুটা জটিল বলে মনে হবে। অধিকাংশ পৌত্তলিক তখন পর্যন্ত বহু ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিল। তারা মনে করত, ঈশ্বরগণ মানুষের সাথে অবাধ মেলামেশা করে, তাদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং মানব জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে ছিল তাদের একজন ঈশ্বরের অনুরূপ এবং এ অর্থে তারা যীশুকে গ্রহণ করতে সম্ভবত প্রস্তুত ছিল। যাহোক, যীশুর প্রকৃত শিক্ষা তাদের সকল ঈশ্বরকে নাকচ করে দেয় ও এক ঈশ্বরের কথা ব্যক্ত করে। বহু পুতুল পূজারির কাছেই এ কথা গ্রহণযোগ্য ছিল না। অধিকন্তু, যীশুর ধর্মশিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল আচরণ বিধি যা কেউ অনুসরণ করতে চাইলে তার জীবনধারাই পাল্টে যেত। এটা একজন ইহুদীর পক্ষেই সম্ভব ছিল, পৌত্তলিকের পক্ষে নয়। ইহুদীদের সুদখোর জাতি হিসেবে গণ্য করা হত, অ-ইহুদীদের সবাই তাদের অপছন্দ করত। 
'ইহুদী নয় এমন জনসমাজের মধ্যে ইহুদীদের প্রতি ঘৃণা এতই প্রবল ছিল যে তাদের যৌক্তিক বা প্রয়োজনীয় কিছু করতে দেখলেও যেহেতু ইহুদীরা সেটা করছে শুধু সে কারণেই জনসমাজ তা করতে অস্বীকৃতি প্রকাশ করত।'-(The Nazarene, John Toland, P-6)

এ পর্যায়ে পল গ্রীক জনসাধারণের রুচি অনুযায়ী যীশুর শিক্ষার সমন্বয় সাধন অত্যাবশ্যক বলে মনে করলেন। গ্রীস তখন ছিল রোমান সাম্রাজ্যের অংশ। রোমান দেবতা গ্রীকের দেবতাদের সঙ্গে সাদৃশ্যযুক্ত ছিলেন এবং তাদের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা ছিল গ্রীক দেবতাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের মতই একটি ধারণা। পল ইতিপূর্বে কিছুদিন রোমে কাটিয়েছিলেন এবং তিনি রোমান নাগরিক ছিলেন। সম্ভবত রোমান জীবনধারা তার নিজস্ব বিচারবোধকে প্রভাবিত করেছিল। রোমান সাম্রাজ্যের মধ্যে সাধারণ জনগণের উপর গ্রেকো-রোমান (Graeco-Roman) ধর্মের জোরাল প্রভাব সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন। এটা সুস্পষ্ট যে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে নিজেদের শিক্ষার পরিবর্তন ঘটান ছাড়া তাদের ধর্ম রীতি পরিবর্তন করা সহজ হবে না। 

অন্যদিকে বার্নাবাস জানতেন যে তার স্রষ্টার ইচ্ছা নয় যে তিনি তার আইনের এক বিন্দুমাত্র পরিবর্তন করেন। সে কারণে তিনি তার ধর্মমতের কোন পরিবর্তনের ব্যাপারে অনড় ছিলেন। খৃষ্টধর্ম প্রচারের এ পর্যায়ে বিতর্কের প্রধান উৎস অধ্যাত্ম দর্শন (Metaphysical) সম্পর্কিত ছিল না। বুদ্ধিজীবীদের সূক্ষ্ম যুক্তি, তর্ক ও চুলচেরা- বিশ্লেষণের বিকাশ আরো পরবর্তী কালের ঘটনা। বার্নাবাস ও পলের মধ্যে যে সব বিষয় নিয়ে মত পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছিল তা ছিল মানুষের প্রাত্যহিক জীবনধারা সম্পর্কিত। পল তাদের গ্রীসে আগমনের পূর্বে সেখানে প্রচলিত ও পালিত আচার প্রথার আকস্মিক পরিবর্তন ঘটাতে ইচ্ছুক ছিলেন না। তাই তিনি পশুর মাংস হালাল হওয়া সম্পর্কিত এবং পশু কুরবানি বিষয়ে মুসার বিধান পরিত্যাগের ইচ্ছা পোষণ করেন। এমনকি তিনি খতনা সংক্রান্ত ইব্রাহিমের প্রতিষ্ঠিত নিয়মও বাতিলের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। যীশুর শিক্ষার এসব দিক প্রবর্তন ও বাস্তবায়নে বাস্তব সমস্যার সম্মুখীন হওয়ার প্রেক্ষিতে পল ও বার্নাবাসের মধ্যকার ব্যবধান ব্যাপকতর হয়ে ওঠে। 
গ্রীসে কোন স্থানেই পল ও বার্নাবাস দীর্ঘদিন অবস্থান করেননি। ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যে যীশুর সামগ্রিক শিক্ষা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। এ কারণেই তারা প্রথমে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর শিক্ষা প্রদান করতেন। তাদের ইচ্ছা ছিল, পরবর্তীকালে ফিরে এসে পুনরায় তারা তাতে সংযোজন করবেন এবং আরো নির্দেশনা প্রদান করবেন। অবশ্য বার্নাবাস যীশুর সমগ্র শিক্ষা প্রচার করতে আগ্রহী ছিলেন, পল সেখানে প্রয়োজন মত প্রচারের পক্ষপাতী ছিলেন। কারণ তিনি তার নিজের যে নয়া ধর্মমত গড়ে তুলছিলেন, সেখানে সেগুলোর আর প্রয়োজন ছিল না। যাহোক, তারা যখন জেরুজালেম প্রত্যাবর্তনের করলেন, তখন উভয়ে পৃথক যুক্তিতে নিজ নিজ কর্মকাণ্ডের যৌক্তিকতা প্রদর্শন করেন। তারা যৌথভাবে যে সব অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়েছিলেন তারও বর্ণনা দেন। তা সত্ত্বেও তাদের মত পার্থক্য বহাল রইল এবং শেষপর্যন্ত তাদের পথ পৃথক হয়ে গেল।
’তাদের মধ্যে বিরোধ এত তীব্র হয়ে ওঠে যে তারা একে অপরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান এবং এর পর বার্নাবাস মার্ককে নিয়ে সাইপ্রাস সফরে যান যেটি ছিল বার্নাবাসের জন্মভূমি।’-(প্রেরিত, ১৫:৩৯-৪০)

অবশ্য এ ব্যাপারে অনেকে অনেক কথা বলেন, কারো কারো মতে- পল জন মার্ককে ভবিষ্যতে কোন সফরে সাথে নেয়ার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেন। অন্যদিকে বার্নাবাস তাকে সফর সঙ্গী করার ব্যাপারে চাপ সৃষ্টি করেন। আর এ কারণেই তাদের মধ্যে বিভেদ দেখা দেয়। যাইহোক না কেন, জন মার্কের বার্নাবাসের সফর সঙ্গী হওয়ার ঘটনা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে তার ও মামা বর্ণাবাসের ধর্ম বিশ্বাস একই ছিল। পল যে তাকে সঙ্গী রাখতে চাননি, সম্ভবত এটা তার অন্যতম কারণ। বাইবেলে এ বিষয়ের পর বার্নাবাসের কথা আর উল্লেখ করা হয়নি বললেই চলে। 
কৌতূহলের বিষয় যে প্রেরিতদের কার্য-এ উল্লেখিত আছে, 'পবিত্র আত্মা' (Holy Ghost) বার্নাবাসকে মনোনীত করলেও পল তাকে প্রত্যাখ্যান করেন। মনে হয়, পল উপলব্ধি করেছিলেন যে, তার আর বার্নাবাসের প্রয়োজন নেই। তার প্রথম দিনকার দিনগুলোতে যখন জানাজানি হয়ে যায় যে তিনি যীশুর সঙ্গী ছিলেন না তখন কেউ তার উপর আস্থাশীল ছিল না। কিন্তু যখন তিনি খৃষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করলেন, তখন বিষয়টি আগের মত থাকেনি। তার খ্যাতি এতটাই হয়েছিল যে তিনি কোন ভীতি বা প্রত্যাখ্যানের আশঙ্কা ছাড়াই নিজের ধর্মমত প্রচার করতে পারবেন বলে উপলব্ধি করেছিলেন। এমনকি যীশুর শিক্ষা বহির্ভূত কিছু প্রচার করলে বার্নাবাস তার বিরোধিতা করতে পারেন, এ ধরনের সম্ভাবনাকেও তিনি আমলে আনেননি।

উপরন্তু পল ছিলেন একজন রোমান নাগরিক। তিনি অবশ্যই রোমানদের ভাষা শিখেছিলেন। সম্ভবত তিনি গ্রীক ভাষাতেও কথা বলতেন। কারণ তিনি যে এলাকায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেখানকার সরকারী ভাষা ছিল গ্রীক। তিনি গ্রীসের খৃষ্টান সম্প্রদায়ের কাছে যেসব পত্র লিখেছিলেন তা অবশ্যই তাদের মাতৃভাষায় লেখা হয়েছিল। এর অর্থ তিনি গ্রীস ও সম্ভবত ইতালিতেও ভাষার কোন সমস্যা ছাড়াই সফর করেছিলেন। অন্যদিকে বার্নাবাস এ দু’ভাষার কোনটিই বলতে পারতেন না। জন মার্ক গ্রীক ভাষা জানতেন। তাই, গ্রীসে বার্নাবাসের প্রথম ধর্মপ্রচার সফরে তিনি তার দোভাষী হিসেবে কাজ করেছিলেন। বার্নাবাস যদি সেখানে একা যেতেন, তাহলে তার কথা কেউ বুঝতে বা তিনিও কারো কথা বুঝতে পারতেন না। সুতরাং মার্কের সাথে সফরে যেতে পলের অস্বীকৃতি ছিল বার্নাবাস যাতে তার সাথে ভ্রমণে না যান, সেটা নিশ্চিত করার প্রয়াস। দু’জনের পৃথক হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে ম্যাক গিফার্ট (Mc Giffert) তার  'A History of Christianity in the Apostolic Age' গ্রন্থে বলেছেন-
'বার্নাবাস, ইহুদী নয় এমন জনসমাজের মধ্যে যার ধর্ম প্রচারের কাজ জেরুজালেমে স্বীকৃতি লাভ করেছিল.... তার ফিরে আসা, নিজকে পৃথক করে নেয়া ছিল এক আশ্চর্য ঘটনা। সকল প্রকার আইন থেকে খৃষ্টানদের মুক্তিদানের পলের মতবাদের প্রতি বার্নাবাসের পূর্ণ সমর্থন ছিল না.....প্রেরিতদের কার্য-এর লেখক, পল ও বার্নাবাসের মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদের ঘটনাকে মার্ককে নিয়ে মত-পার্থক্যের পরিণতি বলে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু প্রকৃত কারণ নিহিত ছিল আরো গভীরে......খৃষ্টান হিসেবে পলের জীবন শুরুর পর গোড়ার দিকের বৎসরগুলোতে পলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও অন্তরঙ্গ যিনি ছিলেন, তিনি বার্নাবাস। বার্নাবাস জেরুজালেমের চার্চের সদস্য ছিলেন......তার বন্ধুত্ব পলের জন্যে ছিল অনেক বেশি কিছু এবং নিঃসন্দেহে তা খৃষ্টানদের মধ্যে পলের সুনাম ও প্রভাব বৃদ্ধিতে ব্যাপক অবদান রেখেছিল। খৃষ্টানদের মনে যখন পলের নির্যাতনের স্মৃতি জাগরূক ছিল সেই দিনগুলোতে বার্নাবাস পলের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন।' 
পলের প্রতি বার্নাবাসের মনোভাবের পরিবর্তন ঘটেছিল পলের সাথে সফরকালে অর্জিত অভিজ্ঞতার কারণে। পল তার মত পরিবর্তন করবেন এবং যীশুর একজন প্রকৃত অনুসারী হবেন বলে বার্নাবাস যে আশা পোষণ করেছিলেন, প্রথম সফরেই তা অপসৃত হয়েছিল। সম্ভবত, শুধুমাত্র ইহুদীদের উদ্দেশ্যে প্রচারিত ধর্ম প্রচারের চেষ্টার অসারতা এবং তা যে ফলপ্রসূ হচ্ছে না, তা উপলব্ধি করতে পেরে বার্নাবাস তা ত্যাগ করেন। তবে তার আগে পর্যন্ত জনসাধারণের মধ্যে যীশুর ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে সম্ভাবনা পরিলক্ষিত হয়েছিল। কিন্তু সে চেষ্টা চালানোর পর বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায় যে, তা সম্ভব ছিল না। সে তুলনায় এন্টিওকে তার সাফল্য ছিল অনেক বেশি। কেননা সেখানে জনসাধারণ যীশুর অনুসারীদের কাছে আগমন করে খৃষ্টধর্মে তাদের ধর্মান্তরিত করার অনুরোধ জানাচ্ছিল। পক্ষান্তরে তিনি ও পল গ্রীসে গিয়ে সেখানকার অধিবাসীদের খৃষ্টান হওয়ার আহবান জানাচ্ছিলেন। 
বার্নাবাস সাইপ্রাসের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার পর পল যা শুরু করেছিলেন, তা অব্যাহত রাখেন। তখন তার সাথে এমন অনেক খৃষ্টান ছিলেন যারা দীর্ঘদিন পলকে স্বীকার করে নেননি। পল তার দুর্বল অবস্থান সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। এ সময় তাকে যীশুর প্রেরিত ধর্ম প্রচারকারী বলে আখ্যায়িত করা হয়। অবশ্য তাতে যীশু জীবদ্দশায় তার সাথে তার সাক্ষাৎ না হওয়ার সত্যটির কোন পরিবর্তন হয়নি। যদিও তিনি যীশুর কাছ থেকে বাণী লাভ করেছেন বলে দাবি করেছিলেন, তা সত্ত্বেও জনসাধারণের মধ্যে ধর্ম প্রচারকালে যীশুর সঙ্গী ছিলেন, এমন একজন ব্যক্তিকে তার সাথে রাখা প্রয়োজন ছিল। কারণ একজন প্রত্যক্ষদর্শী সঙ্গী তার জন্যে এক অমূল্য সমর্থন এবং তার যুক্তির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিশ্বাসযোগ্যতা প্রদান করত। তিনি পিটারকে তার সাথে যোগ দিতে রাজি করান। 
এই দু’ব্যক্তি, যারা অতীতে ছিলেন পরস্পর ঘোর বিরোধী, তারা কি করে, একত্র হলেন তা এক বিস্ময়কর ব্যাপার। যাহোক, পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছিল। অনেকেই পলকে একজন খৃষ্টান হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন এবং তাকে আর সম্ভাব্য গুপ্তচর বা অত্যাচারী হিসেবে গণ্য করতেন না। গ্রীক দার্শনিক সেলসাস (Celsus) বলেন- 'এন্টিওকে উভয়ের মধ্যে মত পার্থক্যের মূল কারণ ছিল পিটারের জনপ্রিয়তায় পলের ঈর্ষা। কিন্তু পরে পলের নিজের খ্যাতি বৃদ্ধি পাওয়ায় পিটারের প্রতি তার ঈর্ষার অবসান ঘটে। তা ছাড়া খৃষ্টানদের প্রতি নিপীড়নও সম্ভবত তাদের দু’জনকে এক করার পিছনে কাজ করেছিল। সে সময় খৃষ্টানদের প্রতি রোমান ও তাদের সমর্থক ইহুদীদের নিপীড়নের মাত্রা ভয়াবহ রকম বৃদ্ধি পেয়েছিল। ইতিপূর্বে যীশুর কথিত বিচার ও ক্রুশবিদ্ধ করার সময় চাপের মুখে অথবা আশু বিপদের সম্মুখীন হওয়ার কারণে যীশুর সহচর থাকার কথা অস্বীকার করে পিটার তার দুর্বলতার পরিচয় দিয়েছিলেন। এখন তিনি যীশুর বাণীর কিছুটা রদবদলের ব্যাপারে পলের পদক্ষেপ আগ্রহভরে সমর্থন করলেন। আর তা সম্ভবত এ কারণে যে এ ধরনের পরিবর্তন নিপীড়নকে হ্রাস করবে।' 
সেই দিনগুলোতে পরিস্থিতি ছিল এমনই যে যীশুর বাণীর পরিবর্তন ও তাতে নতুন কিছু সংযোজন করা হল যাতে তা অ-ইহুদীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়, উপরন্তু তা যেন দেশের কর্তৃপক্ষের প্রতি আক্রমণাত্মক বা হুমকি জনক না হয়। বিশ্ব-জগতের স্রষ্টার বিধানের সাথে সংগতিপূর্ণ হোক বা না হোক, শাসকগণ ও তাদের আইনের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়ে প্রণীত এই নীতির কথা পিটারের প্রথম পত্রে (প্রেরিত ৩:১৩-১৮) বিধৃত হয়েছে-
'ঈশ্বরের দোহাই, তোমরা মানুষের আইন মান্য কর: সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালী হিসেবে রাজা বা গভর্নর যারই সে আইন হোক না কেন, তোমরা তা মান্য কর যা অন্যায়কারীদের শাস্তিদানের জন্যে এবং শাসকদের প্রশংসার জন্যে প্রণয়ন করা হয়েছে, তাতে রয়েছে কল্যাণ। এটাই ঈশ্বরের ইচ্ছা। এ ভাবেই তোমরা মূর্খ ব্যক্তিদের মূর্খতা থেকে মুক্ত হতে পারবে। তোমরা তোমাদের স্বাধীনতাকে বিদ্বেষ পরায়ণতার জন্যে ব্যবহার করনা। ঈশ্বরের ভৃত্য তোমরা সকল মানুষকে সম্মান কর। মানুষকে ভালোবাস। ঈশ্বরকে ভয় কর। রাজাকে সম্মান কর। ভৃত্যগণ! অন্তরে ভীতিসহ প্রভুর অনুগত হও, শুধু ভাল ও সৎ লোকদের প্রতিই নয়, অন্যায়কারীদের প্রতিও।'
পল পিটারের সাথে পশ্চিমে ভ্রমণ করেছিলেন। আন্তরিকতা ছাড়া ও বার্নাবাসের প্রভাব দমন করে তারা নয়া ধর্মমত এবং আপোসরফা হিসেবে সংযোজনকৃত আচরণ ও ব্যবহার বিধির ক্ষেত্রে তিনি অবশ্যই স্বল্প প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিলেন। রোমিয় (১৬:২০-২১)-এ তিনি বলেছেন- 'হ্যাঁ, এভাবেই আমি গসপেল প্রচারের জন্যে সংগ্রাম করেছি, যেখানে খৃষ্টের নাম নেই, যাতে আমাকে অন্য কারো ভিত্তির উপর নির্মাণ করতে না হয়। বরং যেমনটি লিপিবদ্ধ রয়েছে- যাদের কাছে তিনি বাণী প্রচার করেননি তারা দেখবে এবং তারা যা শোনেনি তা বুঝতে পারবে।'
পল যদি যীশুর প্রকৃত শিক্ষা প্রচার করতেন তা হলে অন্য ব্যক্তির ভিত্তি ঠিক তার মতই হত। তারা উভয়ে একই কাঠামো নির্মাণে নিয়োজিত ছিলেন। যে সব লোক প্রথমবারের মত পলের মুখ থেকে যীশু বা খৃষ্টের কথা জানতে বা শুনতে পারছিল, তাদের পক্ষে যেসব ধর্মপ্রচারকারী তখনও যীশুর শিক্ষা ধারণ করেছিলেন, তার সাথে তুলনা করে দেখা সম্ভব ছিল না। কার্যত: তারা যা জানছিল, তা ছিল শুধু পলের শিক্ষা। 
পল তার নিজের বাণী প্রচারের ক্ষেত্রে আপ্পোলোস নামক আলেকজান্দ্রিয়া থেকে আগত এক জ্ঞানী ইহুদীর ব্যাপক সাহায্য লাভ করেন। তিনি জনসাধারণের মধ্যে পলের মতবাদ প্রচারে বিপুল সাফল্য লাভ করেন। বলা হত, পল চারা রোপণ করেছিলেন এবং আপ্পোলোস (Appolos) তাতে পানি সিঞ্চন করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত এমনকি আপ্পোলোসও পলের সকল ধর্মীয় উদ্ভাবন মেনে নিতে পারেননি এবং বার্নাবাসের মত তিনিও তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। 
পল যীশুর শিক্ষা থেকে ক্রমশই বেশি করে দূরে সরে যেতে থাকেন এবং তিনি স্বপ্নে যার সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন বলে দাবি করেন সেই খৃষ্টের প্রতি অধিকতর হারে গুরুত্ব আরোপ করতে শুরু করেন। যীশুর ধর্মের পরিবর্তন সাধনের অভিযোগে যারা তাকে অভিযুক্ত করেন তাদের বিরুদ্ধে তার যুক্তি ছিল এই যে, তিনি যা প্রচার করছেন তার মূল হল যীশুর কাছ থেকে সরাসরি লাভ করা প্রত্যাদেশ। এটি পলকে ঐশী কর্তৃত্ব প্রদান করেছিল। এই কর্তৃত্বের সুবাদে তিনি দাবি করেন যে গসপেলের আশীর্বাদ শুধু ইহুদীদের জন্য নয়, বরং যারা এতে বিশ্বাস করবে তাদের সকলের জন্যেই। উপরন্তু তিনি একথাও বলেন যে, মুসার ধর্মের চাহিদাসমূহ শুধু অপ্রয়োজনীয়ই নয়, তা ঈশ্বরের কাছ থেকে তার কাছে সরাসরি যে প্রত্যাদেশ হয়েছে তার বিরোধীও বটে। তিনি বলেন, আসলে এগুলো অভিশাপ। এভাবে পল যীশুর অনুসারীদের সহ সকল ইহুদীকেই ক্রুদ্ধ করে তুললেন। কারণ তিনি তাদের উভয় ‘নবী’রই বিরুদ্ধাচরণ করছিলেন। এ থেকে বোঝা যায় যে কেন তিনি শুধু তাদের মধ্যেই তার শিক্ষা প্রচার করছিলেন যারা ইহুদীদের ঘৃণা করত এবং যীশুর সত্য সম্পর্কে অবগত ছিল না। 
পল এই বক্তব্য দিয়ে তার মতবাদের যৌক্তিকতা প্রমাণের চেষ্টা করেছেন- 'ভাইসব, তোমরা কি জান না (আমি বিধান সম্পর্কে জ্ঞাত লোকদের উদ্দেশ্যে বলছি) যে একজন মানুষ যতদিন জীবিত থাকে ততদিনই তার উপর আইনের নিয়ন্ত্রণ থাকে। স্ত্রীলোকের ক্ষেত্রে যার স্বামী আছে সে তার স্বামী জীবিত থাকা পর্যন্ত আইন দ্বারা তার সাথে বন্ধনে আবদ্ধ। কিন্তু যদি তার স্বামী মারা যায় তখন মৃত স্বামীর সাথে তার আইনের বন্ধন শিথিল হয়ে যায়। যদি তার স্বামী জীবিত থাকে এবং সে অন্য লোকের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় তখন তাকে ব্যভিচারিণী বলে আখ্যায়িত করা হবে। কিন্তু যদি তার স্বামী মারা যায় তা হলে উক্ত আইন থেকে সে মুক্ত। তখন সে অন্য কোন লোককে বিবাহ করলেও সে আর ব্যভিচারিণী হবে না। সুতরাং, হে আমার ভ্রাতৃগণ! খৃষ্টের মৃত্যুর সাথে সাথে তার আইনও তোমাদের ক্ষেত্রে মৃত। তার অর্থ তুমি অন্যকে বিবাহ করতে পার, এমনকি সে ব্যক্তিকেও যিনি মৃত্যু থেকে পুনরুজ্জীবিত হয়েছেন যাতে আমরা ঈশ্বরের জন্যে ফলপ্রসূ কাজ করতে পারি।'
তার এ বক্তব্য থেকে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, তিনি যীশু ও 'খৃষ্ট’ এর মধ্যে একটি পার্থক্য সৃষ্টি করেছেন। তার যুক্তি অনুযায়ী যে আইন যীশু ও তার অনুসারীদের মধ্যে বন্ধন সৃষ্টি করেছিল, তিনি মারা যাওয়ার পর তার প্রয়োজন ফুরিয়ে গিয়েছিল। তারা আর যীশুর সাথে নয়, খৃষ্ট এর সাথে 'বিবাহিত' যিনি অন্য এক আইন এনেছেন। সুতরাং এখন যীশু নয়, খৃষ্টের অনুসরণ প্রয়োজন। যদি কেউ যীশুর শিক্ষা মান্য করে তাহলে সে বিপথে চালিত হচ্ছে। এ যুক্তির সাথে তিনি প্রায়শ্চিত্ত ও প্রতিকারের নিজস্ব ধর্মমতের সংযোজন করে যে মতবাদ প্রণয়ন করেন তা যীশু কখনোই শিক্ষা দেননি। এটা এক বিরাট সাফল্য এনে দেয় যেহেতু অন্য কথায়-এতে প্রচার করা হচ্ছিল যে, একজন মানুষ তার যা খুশি তাই করতে পারে এবং সে তার কৃতকর্মের জন্যে অবশ্যম্ভাবী পরিণতির সম্মুখীন হবে না। যদি সে দিনের শেষে এ কথাটি বলে- 'আমি খৃষ্টে বিশ্বাস করি।' যাহোক, যে মূল ভিত্তির উপর পলের যুক্তি নির্ভরশীল ছিল তা ছিল মিথ্যা। কারণ যীশু ক্রুশবিদ্ধও হননি কিংবা পুনরুজ্জীবিতও হননি। পলের প্রায়শ্চিত্ত ও প্রতিকারের মতবাদ ছিল ভ্রান্তিপূর্ণ।
পলের যুক্তি প্রদর্শনের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি দেখা গিয়েছিল। এর ফলে শুধু যীশুর শিক্ষারই পরিবর্তন ঘটেনি, উপরন্তু তা যীশু কে ছিলেন সে বিষয়ে জনসাধারণের ধারণারও সম্পূর্ণ পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। তিনি লোকের মনে একজন 'মানুষ' থেকে একটি ধারণায় পর্যবসিত হন। কিছু লোক যীশুর পৃথিবীতে অবস্থান কালেই তার বাণী ও অলৌকিক কর্মকাণ্ডে বিস্ময় বিমুগ্ধ হয়ে তার উপর ঈশ্বরত্ব আরোপ করে। কেউ কেউ তাকে নবীদের চেয়ে বেশি কিছু বিবেচনা করত। তার কোন কোন শত্রু গুজব ছড়িয়ে দিয়েছিল যে তিনি ছিলেন 'ঈশ্বরের পুত্র।' এর উদ্দেশ্য ছিল ঈশ্বরের সাথে তাকে সংশ্লিষ্ট করার জন্যে গোঁড়া ইয়াহুদীদের তার বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলা। এ ভাবে তার অন্তর্ধানের আগেই তার প্রকৃত সত্তার একটি অলৌকিক রূপদান এবং তার উপর ঈশ্বরত্ব আরোপের একটি প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। খৃষ্টের এই কাল্পনিক রূপ যা যীশুর প্রচারিত শিক্ষাকে হয়তো বাতিল করে দেয়ার শক্তি রাখত, তা স্পষ্টতই কোন সাধারণ ব্যাপার ছিল না এবং অনিবার্যরূপে বহু মানুষই ঈশ্বর সম্পর্কে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। এ ভাবে এই কাল্পনিক রূপই উপাসনার বস্তু হয়ে দাঁড়ায় এবং ঈশ্বরের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে যায়। 
গ্রীসে পলের প্রচার।
একজন মানুষ থেকে যীশুর খৃষ্টরূপী ঈশ্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার এ ঘটনা গ্রীস ও রোমের বুদ্ধিজীবীদেরকে পল ও তার অনুসারীদের প্রচারিত ধর্মকে তাদের নিজস্ব দর্শনের সাথে অঙ্গীভূত করতে সক্ষম করে। তারা ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসী ছিলেন। এখন পলীয় চার্চের ধর্মমতের 'পিতা ঈশ্বর' ও 'ঈশ্বরের পুত্র' এর সাথে ত্রিত্ববাদের জন্য তাদের প্রয়োজন ছিল শুধু 'পবিত্র আত্মা' যোগ করার। কাল পরিক্রমায় এ দুটি চিত্র একটিতে অঙ্গীভূত হল এবং ত্রিত্ববাদের জন্ম ঘটল। এ সময় গ্রীসে বিরাজিত দার্শনিক ধারণা তাতে যেমন রং চড়াল, তেমনি গ্রীকভাষাও এ শিক্ষার প্রকাশকে প্রভাবিত করে এর অর্থকে সীমাবদ্ধ করে দিল। গ্রীক ভাষা গ্রিকদের দর্শনকে ধারণ করতে সক্ষম ছিল, কিন্তু যীশু যা বলেছিলেন তা ধারণের মত বিশালতা বা গভীরতা এ ভাষার ছিল না। তাই যীশুর একজন প্রকৃত অনুসারী যদি স্বচ্ছন্দে গ্রীক ভাষা বলতেও পারতেন, তবুও এ ভাষাতে যীশুর শিক্ষার সার্বিকতা প্রকাশ করতে পারতেন না। এ জন্য তাকে বার বার উপযুক্ত শব্দের সন্ধান করতে হত। যখন হিব্রু গসপেলগুলো গ্রীকে ভাষান্তরের সময় এল, এ সীমাবদ্ধতা তখন স্থায়ীরূপ গ্রহণ করল এবং শেষ পর্যন্ত হিব্রুতে লিখিত সকল গসপেল যখন ধ্বংস হয়ে যায়, তখন তা মোহরাঙ্কিত হয়ে গেল। 
যদিও পল প্রকৃত পক্ষে যীশুর ঈশ্বরত্ব বা ত্রিত্ববাদ প্রচার করেননি, তার প্রকাশ ভঙ্গি এবং তার কৃত পরিবর্তন এ উভয়ই ভ্রান্ত ধারণার জন্য দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছিল এবং ইউরোপে তার ধর্মমত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ প্রস্তুত করে দিয়েছিল। এটি সেই ধর্মমত যা মেরীকে 'ঈশ্বরের মাতা' হিসেবে গণ্য করার মত এক অসম্ভব স্থানে তাকে অধিষ্ঠিত করেছিল।
পল এ কথা বলে তার কর্মকাণ্ডকে যৌক্তিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন যে যীশু যে সময়ে বাস করতেন এবং তিনি নিজে যে সময়ের মানুষ-এ দু'য়ের মাঝে কোন সম্পর্ক নেই। সময়ের পরিবর্তন হয়েছে এবং এখন যে পরিস্থিতি বিরাজিত তাতে যীশুর শিক্ষা পুরোনো হয়ে গেছে, তা আর অনুসরণযোগ্য নয়। নৈতিকতার একটি নতুন ভিত্তি খুঁজে পাওয়ার জন্যে তখন এ যুক্তি প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। পল তখনকার বিরাজমান পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেছিলেন এবং তখন প্রয়োজন অনুযায়ীই তিনি তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের শিক্ষা প্রদান করেছিলেন- আমার সব কিছুই আইন সম্মত, কিন্তু আমি কারো ক্ষমতার অধীন নই। -(১ করিনথীয় ৭-১২)
পল শুধু মুসা ও যীশুকে প্রত্যাখ্যানই করেননি, তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন যে তার আইন তিনি নিজেই। স্বাভাবিক ভাবেই বহু লোকই সে কথা মেনে নেয়নি। পল তাদের জবাব দিয়েছেন এ বলে- যদি আমার মিথ্যার মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের সত্য ও গরিমা প্রকাশিত হয়ে থাকে তা হলে আমি কেন বিচারে পাপী হব?-(রোমীয় ৩:৭-৮)
পলের এই বক্তব্য থেকে দেখা যায়, যদিও তিনি জানতেন যে তিনি মিথ্যা বলছেন, পল মনে করতেন তর উদ্দেশ্যের জন্যে এটা যৌক্তিক। কিন্তু এটা বুঝা মুশকিল যে মিথ্যার মধ্য দিয়ে সত্য কিভাবে প্রকাশিত হয়। এ যুক্তি অনুযায়ী মানুষ যীশু যদি ঈশ্বরের সমকক্ষ হন তাতে যীশুর অনুসারীদের আপত্তির কি আছে?
পলের গ্রেফতার।
পল এমন এক ধর্মের জন্ম দিয়েছেন যা বিভিন্ন পরস্পর বিরোধী উপাদান দ্বারা পরিবেষ্টিত। তিনি ইহুদীদের একত্ববাদ গ্রহণ করেন এবং তার মধ্যে পৌত্তলিকদের দর্শন যুক্ত করেন। এই অদ্ভুত মিশ্রণের মধ্যে ছিল কিছু যীশুর শিক্ষা এবং কিছু ছিল যা পল খৃষ্টের কাছ থেকে লাভ করেছিলেন বলে দাবি করেছিলেন। পলের ধর্মতত্ত্বের ভিত্তি ছিল সমকালীন গ্রীক চিন্তাধারার আলোকে ব্যাখ্যাকৃত তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। যীশুর উপর ঈশ্বরত্ব আরোপ করা হয়েছিল এবং তার পবিত্র মুখে বসিয়ে দেয়া হয়েছি প্লেটোর (Plato) কথা। প্রায়শ্চিত্তের তত্ত্ব ছিল পলের মস্তিস্ক প্রসূত যা যীশু ও তার শিষ্যদের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল। এগুলোর ভিত্তি ছিল ‘আদি পাপ’, ‘ক্রুশবিদ্ধকরণ’ ও 'পুনরুজ্জীবন’-এ বিশ্বাস যার কোনটিরই কোন বৈধতা ছিল না। এ ভাবেই একটি কৃত্রিম ধর্মের সৃষ্টি হয়। তার নাম খৃষ্ট ধর্ম যা গাণিতিকভাবে উদ্ভট, ঐতিহাসিক ভাবে মিথ্যা, তবুও মনস্তাত্ত্বিক ভাবে আকর্ষণীয়। ধর্মীয় উন্মাদনা নিয়ে পল ধর্মের যে জমকালো মন্দির তৈরি করেছিলেন তার সবদিকেই তিনি দরজা নির্মাণ করেছিলেন। এর ফল হয়েছিল এই যে যারা প্রথমবারের মত তার খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করেছিল, তারা ইহুদী বা গ্রীক যাই হোক না কেন, তারা যখন সেই মন্দিরের মধ্যে প্রবেশ করল, তাদের এ ধারণাই দেয়া হল যে তারা সেই দেবতার প্রতিই শ্রদ্ধা নিবেদন করছে যাকে তারা সব সময় উপাসনা করে আসছে। পলের ভ্রান্ত ধারণার উদ্ভব ও প্রতিষ্ঠা লাভের পর যারা ভাবত যে তারা যীশুর অনুসরণ করছে, তারা তাদের অজান্তে যীশুর পরিবর্তে পলের ধর্মমতের অনুসারীতে পরিণত হল। 
হেইনজ জাহরনট (Heinz Zahrnt) পলকে 'যীশুর গসপেলের বিকৃতকারী' বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। ওয়ারডি (Werde) তাকে বর্ণনা করেছেন 'খৃষ্টান ধর্মের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা' হিসেবে। উভয় বক্তব্যেরই কিছু যৌক্তিকতা আছে। ওয়ারডি বলেন, পলের কারণে- ঐতিহাসিক যীশু ও চার্চের খৃষ্টের মধ্যে অসামঞ্জস্য এত বেশি প্রকট যে তাদের মধ্যে কোন ঐক্য খুঁজে পাওয়া একেবারেই কঠিন। শনফিল্ড (Schonfield) লিখেছেন-গোঁড়ামির (Orthodoxy) পলীয় ধর্মমত খৃষ্টান ধর্মের ভিত্তিরূপে গণ্য হয় এবং বৈধ চার্চ ধর্মবিরোধী বলে পরিত্যক্ত হয়।
এভাবে বার্নাবাস পরিগণিত হন প্রধান ধর্ম বিরোধীরূপে।

৫৭ সালর দিকে পল জেরুজালেম এসেছিলেন দরিদ্র খৃষ্টানদের জন্যে কিছু অর্থ সাহায্য নিয়ে। তারপর তিনি খৃষ্টানদের জন্যে প্রার্থনার জন্যে মন্দিরে যান। জেমস অবশ্য তাকে সতর্ক করেছিলেন যে তার জীবন সংশয় ঘটতে পারে, যেহেতু তিনি খৎনা করা সম্পর্কে ইহুদিদের শরীয়ত বিরুদ্ধ কথা বলেছেন। পল তার কথাকে অগ্রাহ্য করেন।

পলের শিরোচ্ছেদ।
শলোমনের মন্দিরে পৌঁছিলে জনতা তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছে আঁচ করে পল কৌশলে নিজেকে রোমান কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেন। তখন ইহুদিরা তাকে নিয়ে যাবার পথে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। রোমান কর্তৃপক্ষ তা জানতে পেরে রাতের আঁধারেই তাকে কায়সারিয়ার পথে রওনা করিয়ে দেয়। পল সেখানে দু'বৎসর জেলে রইলেন। তারপর ৫৯ সনে নুতন শাসক এলে তার কেসটি সচল হয়। গভর্নর তাকে জেরুজালেমে ফিরিয়ে নিয়ে তার কেসের সুরাহা করতে চাইলে পল তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং একজন রোমান হিসেবে তার অধিকার ও মর্যাদার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। সুতরাং তাকে রোমে পাঠান হয়।

পল রোমে পৌঁছেন ৬০ সনে এবং দু'বৎসর গৃহবন্দী থাকেন। এরপর কিভাবে রোমে পল মারা গিয়েছিলেন সেবিষয়ে যথেষ্ট তথ্য নেই। তবে ইগনেটিয়াসে লিখেছেন যে তিনি শহীদ হয়েছিলেন। ৬০ সনের মাঝামাঝিতে নীরোর শাসনামলে পল ও পিটারকে রোমে হত্যা করা হয়; পলকে শিরোচ্ছেদের মাধ্যমে এবং পিটারকে উল্টো ক্রুসবিদ্ধ করে। ইতিপূর্বে জেরুজালেমের চার্চকে গুড়িয়ে দিয়ে পিটারকে বন্দী করা হয়েছিল।
পলের খৃষ্টধর্ম গ্রীস হয়ে ইউরোপে প্রসারিত হয়েছিল। পলীয় চার্চ অত:পর রোমান ক্যাথলিক চার্চ নামে আখ্যায়িত হয়। 

সমাপ্ত।

উৎস: Jesus- A Prophet of Islam by Muhamed Ata-Ur-Rahim.
ছবি: Wikipedia, biblicalarchaeology, livius, numisology.

1 টি মন্তব্য:

  1. আপনার এই পোস্ট টি যথেষ্ট মনোযোগের সহিত পড়লাম। এই রকম কিছু লেখা আমি খুঁজে ফিরি। খ্রিষ্ট ধর্মের উপর আপনার পান্ডিত্তের জন্য আমি আরও লেখা আশা করব, যাই হোক অনেকটা হলেও ক্ষুধা মিটল। পোস্টের উপর সমালোচনায় আসলে বলতে হয়; পল, বারনাবাস এর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থান ও অঞ্চলে পরিভ্রমন এর সাল, ঐ সময় গুলতে তাদের বয়স, শেষ পরিনতিতে তাদের বয়স কত ছিল?
    এছাড়া ও কিছু বিষয়ে জানতে চাই-
    * খ্রিষ্ট কি?
    * গস্পেল কি?
    * পিটার কে?
    এছাড়া ও নতুন পোস্টের আবেদন- "যিশু কি সত্যি ক্রুশ বিদ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিলেন"। কেননা আমি যতদূর জানি ইহুদিদের বিশ্বাস বা নিয়মানুসারে যাদের মৃত্যু ক্রুশে হয় তারা মিথ্যা বাদী বা অভিশপ্ত আর একজন নবী হিসেবে ঈসা আঃ এর ক্রুশে মরণ তার অভিশপ্ততাই প্রমান করে।

    উত্তরমুছুন