pytheya.blogspot.com Webutation

৫ ডিসেম্বর, ২০১২

Jesus: উর্দ্ধগমন নিয়ে ইহুদি মতানৈক্য।


বিশ্রামবারের পরদিন ছিল রবিবার। এ দিন প্রত্যুষে মগ্দালীনী মরিয়ম ঈসা (Jesus) মসিহের কবরটা দেখতে এল। এই প্রত্যুষে তার এই আগমনের কারণ কি? এ প্রশ্নের উত্তর একটাই- সম্ভবত: দাফনের উদ্দেশ্যে কাফন দিয়ে মোড়ানোর সময় সে মসিহের দেহে জীবনের লক্ষণ দেখেছিল। আর তাই তার শরীরে ম্যাসেজ করে তাকে দ্রুত সুস্থ্য করে তোলার জন্যেই সে বিশ্রামবার শেষে প্রত্যুষেই চলে এসেছিল। আর এ কথা কে না জানে, ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সে ছিল একজন প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী।

মরিয়ম এসে অবাক হল। দেখল কবরের মুখ থেকে পাথরটা সরান হয়েছে। সে দ্রুত কবরের মুখে গেল এবং ভিতরে উঁকি দিল। কিন্তু কাউকে সে দেখতে পেল না। প্রত্যুষের ঐ আলোতে সে যা দেখতে পেল তা হল- ঈসার দেহ মোড়ান হয়েছিল যে কাপড়গুলো দিয়ে তা এক স্থানে পড়ে রয়েছে, আর তার মাথা ঢাকা ছিল যে রুমাল দিয়ে তা অন্য একস্থানে গুটিয়ে রাখা হয়েছে। এ দেখে তার হৃদয় দু:খে ভারাক্রান্ত হল, আর সে কবর দ্বারে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগল। 

মসিহ ঈসার লাশ গেল কোথায়? এর উত্তরে বলা যায়- মগ্দালীনী মরিয়মের মত সম্ভবত: বাগানের মালীও তাকে কবরস্থ করার সময়ে তার দেহে জীবনের লক্ষণ দেখেছিল। আর তাই হয়ত: সে লোকেরা চলে যাবার পর সেইদিনই কবরের মুখ থেকে পাথরটা সরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে তার জ্ঞান ফিরে আসার অপেক্ষা করেছিল। অত:পর তার জ্ঞান ফিরে এলে সে তার শরীরে মোড়ান কাপড় খুলে ফেলে দ্রুত তার নিজের এক সেট পোষাক এনে তাকে পরিধানে সাহায্য করেছিল। আর মসিহ ঈসা পাহারাদার ও অন্যান্য ইহুদিদের কারণে নিরাপত্তার খাতিরে পরিপূর্ণ মালীর বেশ ধারণ করে ছিলেন। 

প্রত্যুষে মরিয়ম যখন কবরের মধ্যে উঁকি-ঝুকি দিচ্ছিল, ঈসা তখন বাগানের মধ্যেই ছিলেন। দূর থেকে একজন স্ত্রীলোককে ঐ প্রত্যুষে তার কবরের দ্বারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন। 

মরিয়ম কাঁদছিল, এই সময় পিছন থেকে ঈসা তাকে প্রশ্ন করল, ‘হে নারী, কাঁদছ কেন?’
সে বলল, ‘লোকে আমার প্রভুকে নিয়ে গিয়েছে। আর কোথায় নিয়েছে জানিনে।’

কিন্তু তৎক্ষণাৎ প্রশ্নকারীর কন্ঠ তাকে বিষ্মিত করল, এতো প্রভু ঈসার কন্ঠ! সে চমকে উঠে পিছনে ফিরে তাকাল। না তিনি নন, সাদা কাপড় পরিহিত এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছে- মালী, নিশ্চয় বাগানের মালী। সে তাকে বলল, ‘জনাব, আপনি যদি তাকে নিয়ে গিয়ে থাকেন, আমায় বলুন কোথায় রেখেছেন। আমি তাকে নিয়ে যাব।’ সে আবারও কবরের ভিতর উঁকি দিল।
এদিকে স্ত্রীলোকটি তার দিকে মুখ ফেরাতে ঈসা তাকে চিনতে পারলেন। এতো মরিয়ম! তাই এবার তিনি তাকে নাম ধরেই ডাকলেন, বললেন, ‘মরিয়ম! মৃতদের মধ্যে জীবিতের অন্বেষণ কেন করছ? তিনি ওখানে নেই, তিনি উঠেছেন।’
ঈসার একথা বলার অর্থ হল- কবরে থাকে মৃতরা, তিনি তো মারা যাননি, সুতরাং মরিয়ম কেন একজন জীবিত মানুষকে কবরে অর্থাৎ মৃতদের মাঝে অন্বেষণ করছে?
এদিকে ‘মরিয়ম’ এই নাম উচ্চারণ মাত্র মরিয়মও তাকে চিনতে পারল। ‘রব্বুণি’ বলে সে সঙ্গে সঙ্গে তার পদতলে লুটিয়ে পড়ল।

ক্রুসে বিদ্ধতার কারণে ঈসার সারা শরীরে ব্যাথা ছড়িয়ে পড়েছিল। তাই তিনি দু-কদম পিছিয়ে গিয়ে বললেন, ‘আমাকে স্পর্শ কোরও না।’ মাটিতে লুটিয়ে মরিয়ম সেসময় কাঁদছিল। একারণে ঈসা যেন তাকে সান্তনা দিলেন- ‘আমি এখনও উর্দ্ধে পিতার নিকটে যাইনি।’
মরিয়ম উঠে দাঁড়াল। ঈসা বললেন, ‘এখন যাও ও পিতরকে গিয়ে বল- ‘যেমন তিনি তোমাদেরকে বলেছিলেন, সেভাবে তোমরা তাকে দেখতে পাবে।’
মরিয়মের ধারণা ছিল ঈসা মারা যাননি। আর এখন তার ঐ ধারণা যে সত্য, তা দেখতে পেয়ে যারপর নাই আনন্দিত হয়েছিল। আর তাই ঈসার আদেশে সে তৎক্ষণাৎ শিষ্যদেরকে সংবাদটা দিতে অন্তরে তীব্র উত্তেজনা নিয়ে ছুটে চলল।

শিষ্যগণ জেরুজালেমের যেখানে অবস্থান করত মরিয়ম সেখানে এসে পৌঁছিল। এসময় সে ছিল ভীষণ উত্তেজিত। সে দেখল শিষ্যদের কয়েকজন কক্ষ মধ্যে বিক্ষিপ্ত ভাবে বসে শোক ও রোদন করছে। সে চিৎকার করে তাদের সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করল এবং দ্রুততার সাথে বলল, ‘তিনি জীবিত আছেন।’
সে ঘটনার পূর্ণ বিবরণ দিল। শিষ্যদের যারা সেখানে উপস্থিত ছিল তারা সকলেই তার কথা শুনল, কিন্তু তার ঐ কথাকে তাদের কেউই বিশ্বাস করল না। কেননা তাদের প্রায় সকলেই ছিল মূর্খ, যাদের পূর্ববর্তী নবীদের উপর অবতীর্ণ পবিত্র কিতাবের জ্ঞান ছিল সামান্যই।

শুক্রবার সন্ধ্যা ৬ট থেকে শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সময়কে বিশ্রামবার বলা হত। এই বিশ্রামবার শেষে রাতে শিমোন পিতর, থোমা, নথনেল, সিবদিয়ের দু‘পুত্র এবং আরও দু‘জন শিষ্য একত্রে ছিল। এসময় শিমোন পিতর বলল, ‘আমি মাছ ধরতে যাব।’
সঙ্গী সকলে বলল, ‘আমরাও তোমার সঙ্গে যাব।’

তিবরিয়া সাগর। নৌকা নিয়ে সারারাত্র তারা সাগরে জাল ফেলল, কিন্তু কিছুই ধরতে পারল না। অতি প্রত্যুষে তারা যখন তীরের কাছাকাছি ছিল এসময় তীর থেকে কেউ একজন চিৎকার করে তাদেরকে বলল, ‘বৎসেরা, তোমাদের কাছে কি খাবার কিছু আছে?’
তারা বলল, ‘না, নেই।’
তখন লোকটি বলল, ‘নৌকার দক্ষিণে জাল ফেল, পাবে।’
তারা সেইস্থানে জাল ফেলল। আর তাতে এত মাছ পড়ল যে, তারা তা টেনে তুলতে পারছিল না। এ দেখে শিষ্যরা ভীষণ অবাক হল এবং তীরের লোকটির ব্যাপারে তাদের কৌতুহল হল। এক শিষ্য এসময় পিতরকে বলল, ‘উনি প্রভূ।’
একথা শোনা মাত্র পিতর নৌকা থেকে পানিতে ঝাপ দিল, কেননা সে উলঙ্গ ছিল। তখন অন্যেরা জাল টেনে এনে কুলে তুলল। দেখা গেল জালে এক‘শ তেপ্পান্নটা বড় বড় মাছ রয়েছে। কিন্তু তাতে জালের কোথাও ছিঁড়ে নাই।
শিষ্যরা সকলে ঐ লোকটির কাছে এগিয়ে এল। দেখল এক পাশে আগুন জ্বালান হয়েছে। লোকটি তাদেরকে বললেন, ‘যে মাছ পেয়েছ তার থেকে কিছু আন।’

মাছ ভাজি হল, অত:পর রুটি সেঁকা হল। তারপর লোকটি তাদেরকে বললেন, ‘এসো, আহার কর।’
তিনি তাদের সকলকে ভাজা মাছ ও রুটি দিলেন এবং তারা আহার করল। কিন্তু ঐ সময় তাদের কারও এমন সাহস হল না যে তাকে জিজ্ঞেস করে- ‘আপনি কে?’ কারণ তারা স্পষ্টতই দেখতে পাচ্ছিল সম্মুখে বসা ঐ লোকটি আর কেউ নয়- স্বয়ং ঈসা।

গালীলে যারা ঈসাকে দেখেছিল তাদের সকলে ঐ দিন ঐ রবিবারেই জেরুজালেমে চলে এল। জেরুজালেমে তারা যেখানে মিলিত হত সেখানে সকলে একত্রিত হল। আগতরা গালীলের ঘটনা বিবৃত করল কিন্তু অন্যরা তা বিশ্বাস করতে পারল না। 

খাবার সময় হল। এসময় এগার শিষ্য ভোজন শেষ করে যখন পরস্পর কথোপকথোন করছে সেইসময় ঈসা সেখানে সেই উপরের ঘরে তাদের মাঝে উপস্থিত হলেন। আর তিনি তাদেরকে বললেন, ‘তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক।’
শিষ্যগণ এসময় মহাভীতু ও ত্রাসযুক্ত হয়ে মনে করল ভূত দেখছে। কেননা তারা ইহুদিদের ভয়ে নীচে প্রবেশ দ্বার বন্ধ করে রেখেছিল। আর তারা ছিল উপরের কক্ষে।

ঈসা এসময় তাদের মনের ভাব বুঝতে পেরে বললেন, ‘কেন উদ্বিগ্ন হচ্ছ? তোমাদের অন্তরে বিতর্কের উদয়ইবা কেন হচ্ছে? আমার হাত ও আমার পা দেখ, এ আমি স্বয়ং। আমাকে স্পর্শ কর, আর দেখ। কারণ আমাকে যেমন দেখছ, আত্মার এমন অস্থি মাংস নেই।’
তিনি হাত ও পা তাদের সম্মুখে মেলে ধরলেন।

শিষ্যগণের অধিকাংশ তখনও সন্দেহ মুক্ত হতে পারছিল না। তাদের কেউ কেউ তাকে স্পর্শ করে দেখল; তারা তার হাতের তালুর ছিদ্রের মধ্যেও তাদের আঙ্গুল দিয়ে পরীক্ষা করে দেখল। এতদসত্ত্বেও তাদের কারও কারও মনে অবিশ্বাস ছিল এবং কেউ কেউ আশ্চর্য্য জ্ঞান করছিল। ঈসা বুঝলেন তিনি যে জীবিত আর ক্রুশ বিদ্ধ হলেও তিনি যে মারা যাননি শিষ্যগণ তা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না। সুতরাং তিনি তাদেরকে বললেন, ‘তোমাদের কাছে এখানে কি কোন খাদ্য আছে?’

তখন তারা তাকে একখানি ভাজা মাছ দিল। তিনি তা নিয়ে তাদের সম্মুখেই খেলেন। এভাবে তিনি এটা প্রমান করলেন যে তিনি জীবিত। কারণ খাদ্য কেবল জীবিতের প্রয়োজন, মৃতের নয়।

অত:পর তিনি তার শিষ্যদেরকে বললেন, ‘সমস্ত জগতে ছড়িয়ে পড় এবং সকল সৃষ্টির মাঝে সুসমাচার প্রচার কর। আমার পিতা যে প্রতিজ্ঞা করেছেন তা আমি তোমাদের নিকট প্রেরণ করছি; কিন্তু যে পর্যন্ত না উর্দ্ধ হতে শক্তি প্রাপ্ত হও, সেই পর্যন্ত তোমরা এই নগরে অবস্থান কর। ইয়াহিয়া পানিতে বাপ্তিষ্ম দিতেন বটে, কিন্ত তোমরা পবিত্র আত্মায় বাপ্তিষ্মিত হবে, কিছু দিনের মধ্যে।’
তারা বলল, ‘প্রভু আপনি কি এই সময়ে ইস্রায়েলের হাতে রাজ্য ফিরিয়ে আনবেন?’
তিনি বললেন, ‘যে সকল সময় কি কাল পিতা নিজ কর্তৃত্বের অধীন রেখেছেন, তা তোমাদের জানবার বিয়য় নয়। কিন্তু পবিত্র আত্মা তোমাদের উপর এলে তোমরা শক্তি প্রাপ্ত হবে। আর তোমরা জেরুজালেমে, সমগ্র ইহুদিয়া ও শমরিয়াতে এবং পৃথিবীর প্রান্ত পর্যন্ত আমার স্বাক্ষী হবে।’

পরে তিনি শিষ্যদেরকে জৈতুনপর্বত পর্যন্ত নিয়ে গেলেন এবং হাত তুলে তাদেরকে আশীর্বাদ করলেন। তারপর তিনি আশীর্বাদ করতে করতে তাদের থেকে পৃথক হলেন এবং উর্দ্ধে নীত হতে লাগলেন। শিষ্যগণ উর্দ্ধে তার দিকে চেয়ে আছে। অত:পর একখানি মেঘ তাকে তাদের দৃষ্টিপথ থেকে আড়াল করল।

ঈসাকে ক্রুসবিদ্ধ করার বিষয়ে কোরআনের বক্তব্য এমন- এবং তারা তাকে (ঈসাকে) হত্যা করেনি ও তাকে ক্রুস বিদ্ধ করেনি। কিন্তু তাদের এরূপ মনে হয়েছিল। যারা এতে মতবিরোধ করেছিল, নিশ্চয় তারা এ সম্বন্ধে সংস্কার মুক্ত ছিল এবং এ সম্পর্কে অনুমানের অনুসরণ ব্যতীত তাদের কোন জ্ঞানই ছিল না। এটা নিশ্চিত যে, তারা তাকে হত্যা করেনি। পরন্ত আল্লাহ তাকে তাঁর কাছে উত্তোলন করেছেন আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময় এবং গ্রন্থানুগামীদের মধ্যে প্রত্যেকে তার মৃত্যুর পূর্বে তাকে বিশ্বাস করবেই। (৪:১৫৭-১৫৯)

ইহুদিরা প্রকৃত পক্ষে দু‘দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। একদল বিশ্বাস করল, অন্যরা অবিশ্বাসী রইল। অবিশ্বাসীরা আবার তিন দলে বিভক্ত ছিল। একদল তাকে কোনভাবেই বিশ্বাস করল না। কেননা তাদের মতে তিনি মূসার শরীয়তের অনেক কিছুই মানতেন না এবং নিজেকে খোদার পুত্র বলে দাবী করেছিলেন। আর এক দলের বক্তব্য ছিল- ‘তিনি খোদা ছিলেন এবং আসমানে চলে গিয়েছেন।’

অন্যরা বিশ্বাস করেছিল এভাবে- ‘তিনি খোদা ছিলেন না বরং খোদার পুত্র ছিলেন। এখন খোদা তাকে আসমানে উঠিয়ে নিয়েছেন এবং শত্রুদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।’

আর বিশ্বাসীদের বিশ্বাস ছিল এমন- ‘তিনি খোদাও ছিলেন না, খোদার পুত্রও ছিলেন না; বরং খোদার দাস ও রসূল ছিলেন। খোদা তাকে শত্রুদের কবল থেকে হেফাজত ও উচ্চ মর্তবা দান করার জন্যে আকাশে উঠিয়ে নিয়েছেন।’
এ সংক্রান্ত কোরআনের আয়াত- অতঃপর বনি ইস্রায়েলীর একদল বিশ্বাসস্থাপন করল এবং একদল অবিশ্বাসী হয়ে গেল। যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছিল, আমি তাদেরকে তাদের শত্রুদের মোকাবেলায় শক্তি জোগালাম, ফলে তারা বিজয়ী হল।(৬১:১৪)

সমাপ্ত।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন