pytheya.blogspot.com Webutation

১২ ডিসেম্বর, ২০১২

Happiness: সুখ ও তার মাত্রা।


পৃথিবীতে মানুষ যা কিছু করে তা নিজের ও পরিবারের সুখের জন্যে। তাই আমরা এখন দেখব, সুখের মাপকাঠিতে কোন চরিত্রের মানুষ সবচেয়ে সুখী বা অন্য কথায় কোন চরিত্রের মানুষ সবচেয়ে অসুখী। আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি দুনিয়াতে পাঁচ চরিত্রের মানুষ বর্তমান। যথা- দার্শণিক, উচ্চাভিলাষী, কতিপয়ী, গণতন্ত্রী এবং স্বৈরতন্ত্রী চরিত্রের মানুষ। আমরা দেখব সুখের মাপকাঠিতে কার অবস্থান কোথায়?

আমরা বলতে পারি, দার্শণিক, উচ্চাভিলাষী, কতিপয়ী, গণতন্ত্রী এবং স্বৈরতন্ত্রী -এই পাঁচ প্রকার চরিত্রের উদ্ভবের ক্ষেত্রে এদের যে পর্যায়ক্রম, সুখের ক্ষেত্রেও তাদের সেই একই পর্যায়ক্রম এবং কেবল সুখের ক্ষেত্রে নয়, নৈতিক মূল্যের ক্ষেত্রেও এরা সেই ধারাক্রমই বহন করবে।

সুতরাং বলা যায়- ‘যে পরম ন্যায়বান, যে সবার চেয়ে উত্তম, সেইই সবচেয়ে সুখী। অর্থাৎ যে চরিত্র নিজেকে শাসন করতে সক্ষম, সেইই সবচেয়ে সুখী এবং যে চরিত্র প্রবৃত্তির অনুসারী সেই সবচেয়ে অন্যায়ী, সবচেয়ে অধম, সেইই সবার চেয়ে অসুখী। অন্য কথায়, দার্শণিক চরিত্রের মানুষ সবচেয়ে সুখী এবং স্বৈরতন্ত্রী চরিত্রের মানুষ সবচেয়ে অসুখী।’
এটা আমাদের প্রথম প্রমান।

দ্বিতীয় প্রমানঃ আত্মার স্বভাবের উপর আমাদের দ্বিতীয় প্রমান প্রতিষ্ঠিত। ব্যক্তির আত্মা তিনটি উপাদানে বিভক্ত। যথা-জ্ঞান, বিক্রম ও প্রবৃত্তি। এই উপাদানের প্রত্যেকটিরই নিজ নিজ আনন্দ, ইচ্ছা এবং নিয়ামক রীতি রয়েছে।

আমাদের খাদ্য এবং পানীয়ের ক্ষুধা, জৈবিক তাড়না এবং অনুরূপ চাহিদার প্রাবল্যের উৎস হচ্ছে আত্মার তৃতীয় উপাদান প্রবৃত্তি। একে আমরা ‘অর্থ কামনা’ বলে অভিহিত করতে পারি। কারণ, অর্থ দ্বারাই মাত্র এসব প্রবৃত্তিকে তৃপ্ত করা চলে। কাজেই তৃতীয় উপাদানের বৈশিষ্ট্যকে সংক্ষেপে প্রকাশ করে আমরা বলতে পারি, এর আনন্দ এবং ইচ্ছার লক্ষ্য হচ্ছে সংগ্রহ। অথবা বলতে পারি আত্মার এই উপাদানের লক্ষ্য হচ্ছে লাভ করা বা অর্থ উপার্জন করা।

তেমনি আত্মার যে উপাদানকে আমরা বিক্রম বলেছি, তার লক্ষ্য হচ্ছে সম্মান এবং সাফল্য লাভ। কাজেই আমরা যথার্থই বলতে পারি, বিক্রম সম্মান বা উচ্চাকাঙ্খাকে অন্বেষণ করে। আর একথাও স্পষ্ট যে, জ্ঞানের লক্ষ্য হচ্ছে সত্যের আবিস্কার। অর্থ বা সম্মানের প্রতি জ্ঞানের কোন আগ্রহ নেই। কাজেই আত্মার এ ভাগকে আমরা জ্ঞানের প্রেমিক বলে অভিহিত করতে পারি।

এর ভিত্তিতে আমরা বলতে পারি যে, এক শ্রেণীর মানুষের মধ্যে আত্মার এক একটি উপাদান প্রবল হয়ে দেখা দেয়। এ কারণেই আমরা মানুষকে মূলত: তাদের চরিত্রের নিয়ামক শক্তি- জ্ঞান, বিক্রম এবং প্রবৃত্তির ভিত্তিতে তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করেছি। প্রত্যেক শ্রেণীর অবশ্য উপযুক্ত ইচ্ছার দিকও আছে।

এখন যদি তিন শ্রেণীর প্রত্যেককে প্রশ্ন করা হয় তারা সুখী কিনা, তাহলে দেখা যাবে প্রত্যেক শ্রেণীই নিজেদের জীবনকে সবচেয়ে সুখী বলে প্রশংসা করছে এবং অপর শ্রেণীর জীবন অসুখী বলে নিন্দা করছে। দেখা যাচ্ছে, যার জীবনের লক্ষ্য অর্থ, নগত মূল্যের বাহক না হলে জ্ঞান বা সাফল্য তার কাছে একেবারেই মূল্যহীন। এবং যে উচ্চাভিলাষী সে অর্থ উপার্জন কিম্বা জ্ঞান যদি সম্মানের বাহক না হয় তাহলে তাকে স্থূল এবং মূল্যহীন বলে গণ্য করবে। এবং দার্শনিক, যে সর্বদা জ্ঞান এবং সত্যের অন্বেষণে রত, সে জ্ঞান এবং সত্যের তুলনায় আত্মার অপর উপাদানকে মূল্যের ক্ষেত্রে অনেক নীচে বলেই গণ্য করবে। এগুলিকে সে প্রয়োজনীয় বলে স্বীকার করবে বটে, কিন্তু অনিবার্য না হলে সে তাদেরকে বর্জন করতেও দ্বিধা করবে না।

এখন যদি আমরা নীতির প্রশ্ন না তুলে এই তিন প্রকার সুখকে (অর্থ, বিক্রম এবং জ্ঞান) যদি তিন প্রকার জীবনের সঙ্গে তুলনা করি, তাহলে সত্যের রূপটি কি হবে? আর এক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্তের জন্যে অভিজ্ঞতা, বুদ্ধি এবং যুক্তির অধিক উত্তম নিশ্চয় কোন উপায় নেই? সুতরাং যে তিন প্রকার মানুষের কথা আমরা বলেছি তাদের মধ্যে কোন শ্রেণীর উল্লেখিত তিন প্রকার সুখের সর্বাধিক অভিজ্ঞতা আছে?

জ্ঞানের সুখের ক্ষেত্রে অর্থ উপার্জনকারীর অভিজ্ঞতাকে নিশ্চয়ই দার্শনিকের অর্থ উপার্জনের সুখের অভিজ্ঞতার চেয়ে অধিক বলব না। দার্শনিক তার জীবনের শুরু থেকে অর্থ লাভের সুখের অভিজ্ঞতা স্বাভাবিকভাবেই লাভ করবে। এ অভিজ্ঞতা লাভ না করার কোন উপায় তার নেই। কিন্তু তাই বলে অর্থ উপার্জনকারী চরিত্রের এমন কোন অনিবার্যতা নেই যাতে তাকে সত্য উপলব্ধির সুখের অভিজ্ঞতা লাভ কিম্বা ভোগ করতেই হবে? বস্তুত: এমন লোকের যদি সত্য উপলব্ধিগত সুখের অভিজ্ঞতা লাভের ইচ্ছেও জন্মে তবুও তা লাভ করা তার পক্ষে কঠিন হবে।

তাহলে আমরা বলব, জ্ঞানের সুখ এবং অর্থের সুখ- এই উভয় সুখের অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে দার্শনিকের অবস্থা অর্থ উপার্জনকারীর চেয়েও উত্তম। কিন্তু সম্মানের প্রেমিক বা উচ্চাভিলাষীর সঙ্গে তুলনায় দার্শনিকের অবস্থান কোথায়? উচ্চাভিলাষীর জ্ঞানের সুখের যে অভিজ্ঞতা তার চেয়ে সম্মানের সুখের অভিজ্ঞতা নিশ্চয় দার্শনিকের কম নয়। কারণ, সম্মান সকলেই লাভ করে। দার্শনিক কিম্বা উচ্চাভিলাষী কিম্বা অর্থ উপার্জনকারী- যার যে লক্ষ্য সে যদি তা অর্জন করে তাহলে তাদের আপন আপন প্রশংসাকারীদের নিকট থেকে তারা সম্মান লাভ করে। কাজেই সকলেই জানে সম্মানের সুখ কি। কিন্তু সত্যকে জানার যে সুখ তা কেবল দার্শনিকই লাভ করতে পারে।

সুতরাং অভিজ্ঞতার দিক থেকে দার্শনিকের বিচার করার অধিকার সবার চেয়ে অধিক এবং তার ক্ষমতাও সবার চেয়ে বেশী এবং দার্শনিকই হচ্ছে একমাত্র ব্যক্তি যার মধ্যে অভিজ্ঞতার সঙ্গে বুদ্ধির যোগ সাধিত হয়। আর এ কার্য সাধনের জন্যে দার্শনিকেরই মাত্র প্রয়োজনীয় উপায়ও রয়েছে -যে উপায় অর্থাকাঙ্খী বা সম্মানাকাঙ্খী কারও নেই। সেই উপায় হচ্ছে যুক্তির মাধ্যম বা হাতিয়ার যা কেবল মাত্র রয়েছে দার্শনিকের।

কিন্তু সম্পদ এবং লাভ- এটাই যদি আমাদের বিচারের মাপকাঠি বা মাধ্যম হত তাহলে বলা যেত যে, অর্থ উপার্জনকারীর বিচারের মধ্যেই সর্বাধিক পরিমান সত্য নিহিত আছে। আবার মাপকাঠি যদি, সম্মান সাফল্য এবং সাহস হত তাহলে উচ্চাভিলাষীর ক্ষেত্রে একথা সত্য হত।

কিন্তু আমরা বিচারের মাপকাঠি বা মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছি অভিজ্ঞতা, বুদ্ধি এবং যুক্তিকে। তখন এটা অনুসিদ্ধান্ত যে, সত্যকে আমরা লাভ করতে পারব কেবলমাত্র দার্শনিকের বিচার এবং যুক্তির মাধ্যমে, অপর কোন উপায়ে নয়।

সুতরাং যে তিন প্রকার সুখের কথা আমরা উল্লেখ করেছি তার মধ্যে পরম সুখ হবে সেই সুখ যা আমাদের জ্ঞান লাভে সাহায্য করে এবং যে মানুষের নিয়ন্ত্রণ শক্তি রয়েছে সুখের এই উপাদানের উপর, সে অবশ্যই পরম সুখের জীবন যাপন করবে। এ কারণে আমরা দেখি, জ্ঞানী যখন নিজের জীবন সম্পর্কে কথা বলে, তখন সে আত্ম প্রত্যয়ের সঙ্গেই বলে। আর তার কাছে উচ্চাভিলাষীর জীবন অর্থাৎ সামরিক ধরণের জীবনকে পরবর্তী স্তরে স্থাপন করবে। কারণ, অর্থাকাঙ্খীর চেয়ে উচ্চাকাঙ্খীকে সে নিজের জীবনের নিকটতর বলে গণ্য করে। সুতরাং অর্থ লাভের সুখের স্থান সবার নীচে।

তৃতীয় প্রমান:  জ্ঞানীরা বলে- ‘জ্ঞানের সুখই হচ্ছে একমাত্র বিশুদ্ধ সুখ, অপর সকল সুখই হচ্ছে ভ্রম বা মায়া।’ এ প্রশ্নের সমাধান এবার হবে।

আমরা জানি, সুখ দু:খের বিপরীত। কিন্তু আমাদের এমন অবস্থা হয় না যেখানে আমরা সুখ কিম্বা দু:খ কোনটাই বোধ করিনে? কেউ যখন অসুস্থ হয়, তখন তার অনুভূতি কি? সে কি তখন মনে মনে এই বলে না- আহা! স্বাস্থ্যের চেয়ে সুখ নেই। কিন্তু অসুস্থ্য না হওয়া পর্যন্ত তার এই উপলব্ধি তার জন্মেনি। আবার যে বেদনা বা যন্ত্রণায় বিদ্ধ, তার কাছে যন্ত্রণা থেকে মুক্তির চেয়ে কোন সুখ নেই। সুতরাং বলা চলে সুখ ভোগের যেখানে বিরাম বা শেষ, সেখান থেকেই দু:খ বা বেদনার শুরু। তাই যদি হয় তাহলে বিরাম’ যাকে আমরা সুখ এবং দু:খের মধ্যবর্তী বলেছি, সেখানে সুখও যেমন, দু:খও তেমন। কিন্তু যে বস্তু এটাও নয় ওটাও নয়, সে দুটোই হতে পারে।

কিন্তু সত্য এই, সুখ এবং দু:খ- দুটোই হচ্ছে মনের ব্যাপার- আত্মার ব্যাপার। আর আমরা বলেছি, সুখ কিম্বা দু:খ কোনটা বোধ না করা হচ্ছে মনের একটা বিরামের অবস্থা। কিন্তু এটা নিশ্চয় আমাদের বলা ঠিক হবে না যে, দু:খের অভাব হচ্ছে সুখ কিম্বা সুখের অভাব হচ্ছে দু:খ। কেননা বিরামের অবস্থাকে আমরা সুখ বলি, ইতিপূর্বে যে দু:খ আমরা ভোগ করেছি তার সঙ্গে তুলনাক্রমেই। কিম্বা বিরামকে আবার দু:খ বলি, আমাদের যে সুখ গত হয়েছে তার সঙ্গে তুলনাক্রমে। কিন্তু যথার্থ সুখের পরিমাপে এর কোন অভিজ্ঞতা অর্থাৎ সুখ বা দু:খ থেকে বিরামের অভিজ্ঞতা, যথার্থ সুখ বা দু:খের অভিজ্ঞতা বলে গণ্য হতে পারে না। এমন অবস্থা অভিজ্ঞতার এক প্রকার ভ্রম।

এবার আমরা এমন কিছু সুখের বিচার করি যে সুখের পূর্বে দু:খ সংঘটিত হয়নি। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে ঘ্রাণের সুখ। এমন সুখ আমরা তীব্রভাবে বোধ করি। এ সুখ হঠাৎ আসে কোন দু:খের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই। কিম্বা এ সুখ যখন চলে যায় তখনও পিছনে কোন দু:খ রেখে যায় না। কাজেই এ কথা আমরা বিশ্বাস করতে পারি না যে, দু:খের অভাবই হচ্ছে বিশুদ্ধ সুখ কিম্বা বিশুদ্ধ দু:খ হচ্ছে সুখের অভাব। আর যে তীব্র সুখ আমরা দেহের মাধ্যমে বোধ করি তার বেশীর ভাগই এই ধরণের সুখ। দু:খের অভাব থেকেই আমরা এদের অনুভব করি। যেমন, আহারের যে সুখ তা আমরা ক্ষুধার পরেই বোধ করি। ক্ষুধার অভাবেই আহারের সুখের অনুভব। তেমনি যে সমস্ত সুখ এবং দু:খ আমরা কল্পণার ভিত্তিতে অনুভব করি তাদের ক্ষেত্রেও একথা সত্য। এর সর্বোৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত এমন-

যে জগতের মধ্যে আমরা বাস করি তার একটা উর্দ্ধদেশ, অধ:দেশ এবং মধ্যদেশ আছে। তাই যদি হয় তাহলে যে অধ:দেশ থেকে মধ্যদেশে উঠে আসে সে কি মনে করে না, সে উর্দ্ধদেশে আরোহণ করছে? আর এখান থেকে সে অধ:দেশের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কি মনে করবে না, সে যথার্থই উর্দ্ধদেশে অবস্থান করছে? কারণ যথার্থ উর্দ্ধদেশকে তো সে দেখেনি।

এবার মনে করি, সে আবার অধ:দেশে গমণ করল। এবার সে কি মনে করবে না সে অধ:দেশে গমন করছে? আর এ সিদ্ধান্ত তার অবশ্যই যথার্থ। কিন্তু তার এই উর্দ্ধ, অধ: এবং মধ্য সম্পর্কে সকল সিদ্ধান্তের ভিত্তি হচ্ছে অজ্ঞানতা। কারণ, সে জানে না যথার্থ উর্দ্ধ, অধ: কিম্বা মধ্যদেশ কি। তাই যদি হয় তাহলে এতে কি বিষ্ময়ের কিছু আছে যে, যারা সত্য সম্পর্কে অজ্ঞ তারা সুখ এবং দু:খ এবং সুখ ও দু:খের মধ্যবর্তী নিরপেক্ষ অবস্থা সম্পর্কে ভিত্তিহীন অভিমত পোষণ করবে? অনুরূপ অনেক বিষয় সম্পর্কেই তাদের ধারণা ভিত্তিহীন। তাই যখন তাদের উপর দু:খ আসে, তখন তারা দু:খ ভোগ করে এবং এ দু:খ তাদের যথার্থ দু:খ। কিন্তু আবার দু:খ শেষ হয়ে যখন একটা দু:খহীন অবস্থার সৃষ্টি হয় তখন সেই দু:খের অভাবটাকে সুখ বলে তারা বিশ্বাস করে। আসলে যথার্থ সুখের অজ্ঞতাই তাদের দু:খ এবং দু:খের অভাবের মধ্যে তুলনার মনোভাব সৃষ্টি করে। দু:খকে তারা দু:খের অভাবের সাথে তুলনা করে, যেমনভাবে সাদাকে যে কখনও দেখেনি সে ধূসরকে সাদা বলে কালোর সঙ্গে তুলনা করে।

ক্ষুধা, তৃষ্ণা যেমন দেহের ক্ষয় বা অভাবসূচক, তেমনি অজ্ঞতা এবং অন্ত:সার শুণ্যতাও আত্মার অভাব বা ক্ষয়ের সূচক এবং এ ক্ষয়ের পূরণ দেহের ক্ষেত্রে ঘটে খাদ্য দ্বারা এবং আত্মার ক্ষেত্রে ঘটে জ্ঞান দ্বারা। সুতরাং যে অধিকতর সত্য তার ক্ষয়ের পূরণে আমরা, যে কম সত্য তার ক্ষয়ের পূরণের চেয়ে অধিকতর সুখ লাভ করি। তাহলে অধিকতর সত্য কি? রুটি, মাংস, পানীয়-অর্থাৎ খাদ্য সামগ্রী? কিম্বা বিচার বিবেচনা, বুদ্ধি এবং জ্ঞান বা মনের অনুরূপ গুণাবলী? প্রশ্নটি এভাবেও করা যায়ঃ কে বেশী সত্য? যে অবিনশ্বরতার জগতে বাস করে এবং যার স্বভাব নিজের মধ্যে ধারণ করে সে, কিম্বা মৃত্যু এবং পরিবর্তণের জগতে যে বাস করে এবং তার স্বভাবর নিজের মধ্যে যে ধারণ করে সে? নিশ্চয়ই যে অবিনশ্বর জগতে বাস করে সেই অধিক সত্য এবং সত্য ও অবিনশ্বর সত্ত্বা- উভয়েরই অনিবার্য স্বভাব জ্ঞানের বৈশিষ্ট্য নিয়ে গঠিত। কাজেই সত্যের পরিমাণ যেখানে কম, সত্ত্বার পরিমানও সেখানে কম। সুতরাং যা দিয়ে আমরা দেহের প্রয়াজনকে পূরণ করি তার সত্যতা এবং যথার্থতা যা দিয়ে আমরা আত্মার অভাব পূরণ করি তার সত্যতা এবং যথার্থতার চেয়ে কম। আবার অভাব পূরণের উপায়গুলি যত অধিক সত্য হবে এবং যত অধিক সত্য হবে সেই অভাব পূরণের লক্ষ্য, তত অধিক যথার্থ হবে সেই অভাবের তুপ্তি।

এ থেকে স্বাভাবিকভাবেই এ কথাটি আসে, উপযুক্তভাবে অভাবের পূরণের ভিত্তিতে যদি আমরা আনন্দ বোধ করি তাহলে যত অধিক যথার্থ হবে আমাদের অভাবের পূরণ এবং তার উৎস, তত অধিক যথার্থ হবে আমাদের তৃপ্তি এবং সুখ। আবার আমাদের অভাব এবং তার পূরণ যত কম যথার্থ হবে, তত কম হবে তার ভিত্তিতে প্রাপ্ত সুখ।

তাহলে যাদের জ্ঞানের এবং উত্তমের অভিজ্ঞতা নেই, যারা কোন কর্তব্য সাধন না করে মিথ্যা সময় ক্ষেপন করে, তারা আমাদের এ দৃষ্টান্তের অধ:দেশ এবং মধ্যদেশের মধ্যেই কেবল বিচরণ করতে পারে। যথার্থ উর্দ্ধদেশে আরোহণ করা এবং যথার্থ তৃপ্তি বা বিশুদ্ধ আনন্দ লাভ করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা তাদের তুলনা করতে পারি চারণ ক্ষেত্রে মেষ শাবকের সঙ্গে। তাদের মুখ খাদ্যের মধ্যে। তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ চারণভূমির দিকে। খাদ্য দ্বারা তাদের উদরকে তারা পূর্ণ করে এবং জৈবিক আবেগে প্রজনন কার্য সাধন করে। তবু তারা অতৃপ্ত। অধিকতর খাদ্যের লোভে তারা পরস্পর পরস্পরকে তাদেরকে তাদের লৌহ আবৃত্ত ক্ষুর এবং শৃঙ্গ দ্বারা আঘাত করে এবং তারা পরস্পর পরস্পরকে হত্যা করে। তারা অতৃপ্ত; তারা অসুখী। তাদের পক্ষে সুখী হওয়া সম্ভব নয়। কারণ, তাদের সত্ত্বার যেটা অলীক অংশ এবং সে কারণেই যার তৃপ্তির কোন শেষ নেই, তাকেই তারা তৃপ্ত করতে চাচ্ছে।

কিন্তু এদের এই যে সুখ, এ-কি অসুখের সঙ্গে মিশ্রিত নয়? একি যথার্থ সুখের ছায়া মাত্র নয়? এ গুলির তীব্রতার সৃষ্টি হয় তুলনা থেকে এবং এরা মূর্খের মনে উন্মত্ত কামনার সঞ্চার করে।  তাহলে মানুষের চরিত্রের তেজ বা বিক্রম বা সাহস সম্পর্কে আমরা কি বলব? এখানেও কি সেই একই কথা অনিবার্যভাবে সত্য নয়? কারণ, কেউ যখন যুক্তিহীনভাবে সম্মান, সাফল্য বা উচ্চাকাঙ্খার পিছনে ছুটে চলে এবং এদের অতৃপ্তির কারণে পরস্পর পরস্পরের প্রতি ঈর্ষা, ক্রোধ এবং জিঘাংসায় পূর্ণ হয়ে ওঠে তখন তার ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য হয়ে দাঁড়ায়।

সুতরাং আমাদের লাভের কামনা এবং উচ্চাভিলাষ যদি জ্ঞান এবং যুক্তির নির্দেশ পালন করে এবং যদি তারা এমন আনন্দ ভোগ করতে চায়, যে আনন্দে জ্ঞানের অনুমোদন রয়েছে, তাহলে যে আনন্দ তারা লাভে সক্ষম হবে সে আনন্দ যথার্থ আনন্দ হবে। কারণ, সত্য তাদের সহায় এবং যার যা উপযুক্ত তাই হচ্ছে তার জন্যে সর্বোৎকৃষ্ট।

সুতরাং আত্মার মধ্যে যদি কোন দ্বন্দ্ব না থাকে এবং যদি সে দর্শণকে অনুসরণ করে তাহলে আত্মার যে উপাদানের যা করণীয় সে তাই করতে থাকবে এবং যার উপযুক্ত যে সুখ, সে সুখ সে লাভ করতে সক্ষম হবে এবং তখন এ সুখই তার জন্যে উপযুক্ত এবং সর্বোত্তম বলে গণ্য হবে। কিন্তু দর্শণ বা জ্ঞান না হয়ে অপর দু‘টি উপাদানের কেউ যদি আত্মার শাসক হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে এই শাসক যেমন নিজের উপযুক্ত সুখকে লাভ করতে সক্ষম হবে না, তেমনি সে অপর দু‘টি উপাদানকে সেই সুখের অন্বেষণে ছুটতে বাধ্য করবে, যে সুখ তাদের কারও জন্যে উপযুক্ত এবং উত্তম নয় এবং এমন অবস্থার উদ্ভব তো সেই উপাদানের কারণেই ঘটবে, যে উপাদানের অবস্থান হচ্ছে জ্ঞান থেকে সর্বাধিক দূরত্বে। আর যার অবস্থান জ্ঞান থেকে সর্বাধিক দূরত্বে, সে নিয়ম এবং শৃঙ্খলা থেকেও সর্বাধিক দূরত্বেই অবস্থিত।

আমরা বলেছি, উন্মত্ত এবং স্বৈরাচারী ইচ্ছার অবস্থান হচ্ছে নিয়ম এবং শৃঙ্খলা থেকে সর্বাধিক দূরত্বে এবং যুক্তিগত এবং নিয়মগত ইচ্ছার অবস্থান হচ্ছে সর্বাধিক নৈকট্যে। সুতরাং যে স্বৈরাচারী তার অবস্থান মানুষের যথার্থ এবং উপযুক্ত সুখ থেকে সর্বাধিক দূরত্বে এবং সে সবচেয়ে অসুখী জীবন যাপন করে। অন্যদিকে দার্শনিক সবচেয়ে সুখী জীবন যাপন করে।

সুতরাং আমরা জানলাম, দার্শনিক সবচেয়ে সুখী এবং স্বৈরাতন্ত্রী সবচেয়ে অসুখী জীবন যাপন করে। এখন আমরা দেখব, দার্শণিকের চেয়ে স্বৈরতান্ত্রিক প্রকৃতপক্ষে কত অধিক পরিমানে অসুখী।

সুখের প্রকার হচ্ছে তিনটি- এক প্রকার সুখ হচ্ছে যথার্থ সুখ। আর এক প্রকার হচ্ছে অলীক সুখ। অন্য প্রকার সুখ যা অলীক সুখেরও অধিক। যে স্বৈরাচারী সে বিধান এবং যুক্তিকে বর্জন করে অলীক সুখকেও অতিক্রম করে যায়। স্বৈরাচারী একদল দাসবৎ প্রবৃত্তির দ্বারা নিজেকে সর্বদা পরিবেষ্টিত রাখে। তার এই অধ:পতন বর্ণনার অতীত। তার অবস্থান দেখতে চাইলে আমরা বলতে পারি, কতিপয়ী থেকে শুরু করে ধারাক্রমে স্বৈরতন্ত্রীর অবস্থান হচ্ছে তৃতীয়। গণতন্ত্রীর অবস্থান হচ্ছে এদের উভয়ের মধ্যস্থলে এবং এ যুক্তি যথার্থ হলে, স্বৈরতন্ত্রীর সুখ কতিপয়ীর সুখের চেয়ে তিনগুণ অলীক। আবার কতিপয়ীর অবস্থান হচ্ছে দার্শনিক শাসক থেকে তৃতীয়। তাহলে যথার্থ সুখ থেকে স্বৈরতন্ত্রীর সুখের দুরত্ব অঙ্কের হিসেবে দাঁড়াচ্ছে তিনের তিন বা 33। সুতরাং স্বৈরতন্ত্রীর সুখ ও অলীক সুখের দুরত্ব সাধারণ সংখ্যার হিসেবে একটি অখন্ড সংখ্যা।

এবার সংখ্যাটিকে বর্গ করে তার ফলকে ঘনফলে পরিণত করলে যে ফল পাওয়া যাবে তাই হবে যথার্থ সুখ থেকে স্বৈরতন্ত্রীর সুখের দূরত্ব। আবার বিপরীতক্রমেও যদি ঘনফলটি তৈরী করি, তাহলেও দেখা যাবে, এই দু‘য়ের দূরত্বের পরিমাণ হচ্ছে এরূপ যে, দার্শনিক শাসক স্বৈরতন্ত্রীর চেয়ে (3*3)3 = ৭২৯ (সাত'শ উনত্রিশ) গুণ অধিক সুখী এবং স্বৈরতন্ত্রী দার্শনিকের চেয়ে ৭২৯ গুণ অধিক অসুখী।

সুতরাং সুখের ক্ষেত্রে উত্তম এবং ন্যায়বান যদি অধম এবং অন্যায়ীর চেয়ে এত অধিক পরিমাণে শ্রেয়, তাহলে নীতির সৌন্দর্য এবং মূল্যের ক্ষেত্রে তার শ্রেষ্ঠত্ব যে সীমাহীন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

সমাপ্ত।

উৎস: 'The Republic' by Plato. Tr. by Benjamin Jowett.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন