pytheya.blogspot.com Webutation

২৯ ডিসেম্বর, ২০১২

Francis David: ট্রানসিলভানিয়ায় একত্ববাদী চার্চের প্রতিষ্ঠাতা।


ফ্রান্সিস ডেভিড (Francis David) ১৫১০ সনে হাঙ্গেরীর কালোজার (Kolozsar)-এ জন্মগ্রহণ করেন। প্রথমে তিনি জার্মানির উটেনবার্গে ও পরে ফ্রাঙ্কফূর্টে পড়াশুনো করেন। তিনি মূলত: ক্যাথলিক ধর্মের উপর পড়াশুনো করেছিলেন। যাহোক, পড়াশুনোর পাঠ চুকিয়ে কালোজার-এ ফিরে আসার পর তিনি এক ক্যাথলিক স্কুলের রেকর্ডার নিযুক্ত হন। এরপর তিনি প্রোটেষ্টাণ্টবাদীদের সাথে সহমত পোষণ করে ঐ স্কুল ত্যাগ করেন। অত:পর ১৫৫৫ সনে একটি লুথারপন্থী স্কুলের রেকর্ডার হন। লুথার ও ক্যালভিনের মধ্যে সংস্কার আন্দোলন নিয়ে ভাঙন দেখা দিলে তিনি ক্যালভিনের পক্ষ নেন। 

ফ্রান্সিস ডেভিড
সংস্কার তখনও ব্যাপক রূপলাভ করেনি।এ পরিবেশে অনুসন্ধানী চিন্তাকে তখনও নিষিদ্ধ করা হয়নি। খৃষ্টানধর্মের সকল পর্যায়ে আলোচনা অনুমোদিত ছিল। সংস্কারপন্থী চার্চ তখন পর্যন্ত কোন নির্দিষ্ট মতবাদ গ্রহণ করেনি এবং সে কারণে মুক্ত চিন্তার অবকাশ ছিল। এ পরিবেশে প্রতিটি মানুষ শুধু ঈশ্বরের কাছে জবাবদিহি করবে, এ মত প্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা ছিল। 

ডেভিডের জন্মস্থান কলোজার বর্তমানে।
যে দু’টি মত বিশ্বাস সাধারণ মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছিল তা হল- যীশুর ঈশ্বরত্ব ও ত্রিত্ববাদ। যুক্তি বহির্ভূত এ মত বিশ্বাসের ব্যাপারে ডেভিডের মনে আলোড়ন তুলেছিল। তিনি ভেবে পাচ্ছিলেন না যে, এ ব্যাপারগুলো বুঝার চেষ্টা না করেই যারা এ রহস্যে বিশ্বাসী তারাই ভাল খৃষ্টান হিসেবে গণ্য হয় কি করে! তিনি কোন বিশ্বাসকেই অন্ধভাবে গ্রহণ করতে রাজি ছিলেন না। তিনি ধীরে ধীরে এ সিদ্ধান্ত পৌঁছেন যে, যীশু ঈশ্বর নন। অত:পর তিনি পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মার পাণ্ডিতিক ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন এবং এক ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী হয়ে উঠেন।

Gyualafeharvar, Hungary.
ডেভিড যখন ধর্ম বিশ্বাস সম্পর্কে তার একটি ধারণা সূত্রবদ্ধ করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন, এ সময় ট্রানসিলভানিয়ার রাজা জন অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং চিকিৎসার জন্যে বণ্ড্রাটাকে তলব করেন। ডেভিড সেখানে অবস্থানকালে বণ্ড্রাটার সাথে সাক্ষাৎ করেন। ১৫৬৬ সনে বন্ড্রাটার সুপারিশে রাজা জন ডেভিডকে রাজদরবারে ধর্ম প্রচারক নিয়োগ করেন। এভাবে ডেভিড তৎকালে ধর্মীয় সমস্যাদি ব্যাখ্যা করার জন্যে রাজা কর্তৃক আহুত জাতীয় বিতর্কে একত্ববাদী দলের মুখপাত্রে পরিণত হন। 

রাজা জনের আমলে প্রথম ধর্মীয় বিতর্কসভা হয়েছিল ১৫৬৬ সনে জিউয়ালফিহেরভার (Gyualafeharvar)-এ। বিতর্কটি অমীমাংসিত ছিল। তবে রাজা জন বণ্ড্রাটা ও ডেভিডের যুক্তি-প্রমাণ প্রদর্শনে মুগ্ধ হয়েছিলেন। সে কারণে ১৫৬৭ সনে পরমত সহিষ্ণুতা সংক্রান্ত এক রাজকীয় ফরমান জারি করা হয়। এতে ঘোষণা করা হয়-'প্রতিটি স্থানে ধর্ম প্রচারকরা ধর্মপ্রচার করতে এবং তাদের উপলব্ধি অনুযায়ী গসপেলের ব্যাখ্যা করতে পারবেন এবং সমবেত ব্যক্তিরা যদি তা ভাল মনে করে তাহলে কেউ তাদের বাধা দিতে পারবে না এবং যাদের মতবাদ তাদের ভাল মনে হয় তারা সেই ধর্ম প্রচারককে রাখবে। কেউ ধর্ম প্রচারককে ঘৃণা করতে বা তার সাথে দুর্ব্যবহার করতে পারবে না... বিশেষ করে তার ধর্মমত প্রচারের জন্যে, কারণ ধর্ম বিশ্বাস ঈশ্বরের উপহার।’

১৫৬৮ সনে ঐ একই স্থানে দ্বিতীয় বিতর্ক সভাটি ডাকা হয়েছিল এ মতবিশ্বাস প্রমাণের জন্যে যে, বাইবেলে ত্রিত্ববাদ ও যীশুর ঈশ্বরত্বের কথা বলা হয়েছে কিনা। এই বিতর্কে বক্তা ডেভিডের যুক্তিতর্ক অসার প্রমাণ করতে বিরোধীরা ব্যর্থ হয়। বিতর্ক সভায় আসন্ন পরাজয় উপলব্ধি করে বিরোধীরা গালাগালি শুরু করে। এ ঘটনা রাজা জনকে ডেভিডের যুক্তি প্রমাণকেই খাঁটি বলে গণ্য করতে সাহায্য করে। দশ দিন ধরে বিতর্ক সভা চলে এবং তা একত্ববাদকে প্রতিষ্ঠিত করে। এ সময়ই মাইকেল সারভেটাসের গ্রন্থগুলো গোপনে ট্রানসিলভানিয়াতে এনে তা স্থানীয় ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশ করা হয়। সেগুলো ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলে। 

Nagyvarad, Hungary.
১৫৬৯ সনে হাঙ্গেরীর নাগিভারাদ (Nagyvarad)-এ তৃতীয় বিতর্ক সভা অনুষ্ঠিত হয়। রাজা স্বয়ং এ সভায় সভাপতিত্ব করেন এবং এতে রাজ্যের সকল উচ্চ পদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। এ বিতর্কে ডেভিড বলেন- 'রোমে পোপের ত্রিত্ববাদে আসলে ৪ অথবা ৫ জন ঈশ্বরের বিশ্বাস করা হয়। একজন মূল ঈশ্বর, ৩ জন পৃথক ব্যক্তি যাদের প্রত্যেককে ঈশ্বর বলা হয়ে থাকে এবং আরো একজন ব্যক্তি যীশু, যাকেও কিনা ঈশ্বর বলা হয়ে থাকে। যদিও ঈশ্বর শুধু একজন তিনি হচ্ছেন পিতা, যার থেকে এবং যার দ্বারা সবকিছু সৃষ্টি হয়েছে এবং যিনি সবকিছুর ঊর্ধ্বে। আর তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন তাঁর প্রজ্ঞায় এবং বাণীর মাধ্যমে। এই ঈশ্বরের বাইরে আর কোন ঈশ্বর নেই, তিনও নয়, চারও নয়, না ভাবার্থে না ব্যক্তিরূপে, কারণ কোন ধর্মগ্রন্থে ত্রয়ী ঈশ্বর সম্পর্কে কিছুই বলা হয়নি। 

চার্চের কথিত ঈশ্বর পুত্র যিনি কিনা ঈশ্বরের সত্তা থেকে সৃষ্টির শুরুতেই জন্মগ্রহণ করেছেন, তার কথা বাইবেলের কোথাও উল্লেখ নেই, কিংবা নেই ত্রিত্ববাদের দ্বিতীয় ঈশ্বরের কথা, যিনি উদ্ভূত ঈশ্বর থেকে এবং রক্তমাংসের মানুষ। এটা একান্তই মানুষেরই আবিষ্কার ও কুসংস্কার। আর সে কারণে তা প্রত্যাখ্যানযোগ্য। 

-যীশু নিজেকে সৃষ্টি করেননি, পিতা তাকে জন্ম দিয়েছেন। পিতা তাকে ঐশ্বরিক পন্থার মাধ্যমে জন্মদান করেছিলেন।
-পিতা তাকে পবিত্র করে পৃথিবীতে প্রেরণ করেন।
রাজা জন
-যীশুর সাথে ঈশ্বরের সম্পর্ক শুধু তাই যা ঈশ্বর তাকে প্রদান করেছেন। ঈশ্বর ঐশী সত্তার সব কিছুর ঊর্ধ্বে বিরাজমান। 
-ঈশ্বরের কাছে সময়ের পার্থক্য বলে কিছু নেই-তাঁর কাছে সমস্ত কিছুই বর্তমানকাল। কিন্তু ধর্মগ্রন্থে কোথাও এ শিক্ষা দেওয়া হয়নি যে যীশু সৃষ্টির শুরুতেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। 

এ বিতর্ক চলেছিল পাঁচ দিন ধরে। আর এটিও হয় সমাপ্তি মূলক। রাজা জন তার চূড়ান্ত ভাষণে ঘোষণা করেন যে, একত্ববাদীদের মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করা হবে। বিরোধী পক্ষ অর্থাৎ লুথারপন্থী দলের নেতা মেলিয়াসকে (Mrlius) হুঁশিয়ার করে দেয়া হল যে, তিনি যেন পোপের নির্দেশে কাজ না করেন, বই-পত্র পুড়িয়ে না দেন এবং জনগণকে বলপ্রয়োগে ধর্মান্তরিত না করেন।

এ ধর্মীয় বিতর্কের ফল হয় এই যে, কলোজার শহরের প্রায় সকল অধিবাসীই এক ঈশ্বরে বিশ্বাসী হয়ে উঠে। 

১৫৭১ সনে রাজা জন মারা যান। নতুন রাজা ষ্টিফেন রোমান ক্যাথলিকদের পক্ষ অবলস্বণ করেন এবং রাজা জনের সহিষ্ণুতার নীতি পরিত্যাগ করেন। মত প্রকাশের স্বাধীনতার নীতিও তিনি বাতিল করেন। ফলে একত্ববাদের অনুসারীদের জীবনযাত্রা বিপদসংকুল হয়ে পড়ে। কিন্তু ডেভিড ছিলেন অবিচল। তিনি জনসাধারণের মাঝে প্রচার অব্যাহত রাখলেন এবং প্রচারপত্রের মাধ্যমে চারদিকে ছড়িয়ে দিতে শুরু করেন-

-ঈশ্বরের কঠোর নির্দেশ হল যে কেউই স্বর্গ ও পৃথিবীর স্রষ্টা, পিতা ঈশ্বর ছাড়া আর কারো কাছে প্রার্থনা করতে পারবে না। 
-সত্যের শিক্ষাদাতা যিশুখৃষ্ট শিক্ষা দিয়েছেন যে স্বর্গীয় পিতা ব্যতীত আর কারো সাহায্য প্রার্থনা করা যাবে না। 
-প্রকৃত প্রার্থনার সংজ্ঞা হল যা মনে প্রাণে পিতার উদ্দেশ্যে নিবেদিত হয়।
-সাধারণ প্রার্থনার লক্ষ্যবস্তু পিতা, খৃষ্ট নন। 

ডেভা, যে শহরে ডেভিড আমৃত্যু কারাবন্দী ছিলেন।
ডেভিডকে গৃহবন্দী করার নির্দেশ দেয়া হয়। পরবর্তীতে তাকে গ্রেফতার করে একটি ধর্মীয় বিচার সভায় হাজির করা হয়। এসময় তিনি বলেছিলেন, 'বিশ্ববাসী যাই করার চেষ্টা করুক না কেন, ঈশ্বর এক- একথা সারা বিশ্বের কাছেই সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে।' 

এই বিচারে বণ্ড্রাটা একই সাথে প্রধান কৌসুলী এবং প্রধান সাক্ষীর ভূমিকা পালন করেন। বিচারে ডেভিডকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয় এবং একটি উঁচু পাহাড়ের উপর নির্মিত ক্যাসলের বন্দীশালায় তাকে রাখা হয়। তার সাথে কারো দেখা সাক্ষাৎ করাও নিষিদ্ধ ছিল। বন্দীশালায় ডেভিড ৫ মাস জীবিত ছিলেন। ১৫৭৯ সনের ১৫ই নভেম্বরে কারাকক্ষেই তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর একজন অপরাধীর মত কোন এক অজ্ঞাত স্থানে তাকে সমাহিত করা হয়েছিল।

ডেভিডের মৃত্যুর পর তার কারা কক্ষের দেয়ালে একটি কবিতা লিখিত দেখতে পাওয়া যায়। ঐ কবিতার অংশ বিশেষ-

কবিতার শুরুটা হয়েছে এভাবে-
’দু’টি দশক আমি নিষ্ঠার সাথে 
আমার দেশ ও প্রিন্সের সেবা করেছি
আমার বিশ্বস্ততা ছিল প্রমাণিত।
আমার অপরাধ কি যে আমি পিতৃভূমির কাছে ঘৃণিত?
তা হল শুধৃ এই: ঈশ্বর একজনই, তিনজন নন;
আমি এ উপাসনাই করেছি।’ 

আর সমাপ্তি টানা হয়েছে এভাবে-
’বজ্র নয়, ক্রুশ নয়, নয় পোপের তরবারি, নয় মৃত্যুর মুখ ব্যাদান
সত্যের অগ্রযাত্রা রোধ করে- নেই এমন কোন শক্তি
WC Gannett.
আমি যা অনুভব করেছি তাই লিখেছি
এক বিশ্বাস পরিপূর্ণ হৃদয় নিয়ে আমি কথা বলেছি
আমার মৃত্যুর পর ঘটবে পতন অসত্য মতবাদের।’

ফ্রান্সিস ডেভিডের সাথে মুসলমানদের যোগাযোগ ছিল কিনা সে ব্যাপারে জল্পনা-কল্পনা রয়েছে। তবে একথা ঠিক তার যতই নিন্দা বা সমালোচনা করা হোক না কেন, তাকে কখনোই একজন মুসলমান বলা হয়নি।

ডেভিডের একটি প্রধান সমালোচনা হল যে, যদি তার মত গ্রহণ করা হত, তাহলে ইহুদী ও খৃষ্টধর্মের মধ্যকার পার্থক্য দূর হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল এবং খৃষ্টধর্ম হয়ত: ইহুদী ধর্মের মধ্যে পুনরায় মিশে যেত। এমনকি বণ্ড্রাটাও ডেভিডকে বিদ্রুপ করতেন এ বলে যে তিনি ইহুদী ধর্মে ফিরে যাচ্ছেন। তিনি কখনই ডেভিডের যুক্তি খন্ডন করেননি, কিন্তু ইহুদীদের বিরুদ্ধে জনমতকে উসকে দিয়ে তিনি ডেভিডের মর্যাদা হানির চেষ্টা করেছিলেন।

WC Gannett বলেন, 'ফ্রান্সিস ডেভিডের গুরুত্ব এখানেই যে এক ঈশ্বরের প্রতি আস্থা ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে তিনি প্রেরিত পুরুষদের ধারাবাহিকতায় যীশুর আগে ও পরের কোন নবীর ঐতিহ্যকে অস্বীকার না করে যীশুর অবস্থান সমর্থন করেছেন। উপরন্তু তিনি জনগণকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, সত্য বিশ্বাস, ঈশ্বরে বিশ্বাস এবং যীশুর আদর্শ ও শিক্ষার অনুসরণ ও জীবন-যাপনই ইহকাল ও পরকালের জন্যে যথেষ্ট।'

সমাপ্ত।

উৎস: Jesus- A Prophet of Islam- by Muhammad Ata ur-Rahim.
ছবি: Wikipediarubylane, erdelyiutakon, steinerag.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন