pytheya.blogspot.com Webutation

১৫ ডিসেম্বর, ২০১২

Creator: সৃষ্টি এবং স্রষ্টা।


প্রত্যেক প্রকার বস্তুর পিছনে তার অনুরূপ একটি মূল সত্ত্বার অস্তিত্ব আছে। এই বস্তুর যা নাম সেই একই নামে আমরা তার সত্ত্বাকেও অভিহিত করি। একটা দৃষ্টান্ত দেয়া যাক। যেমন শয্যা এবং টেবিল; জগতে বিশেষ শয্যা এবং টেবিলের সংখ্যা অনেক আছে। কিন্তু এদের মূল সত্ত্বা দু‘টি। একটি হচ্ছে ‘শয্যা’ এবং অপরটি ‘টেবিল’। সূত্রধর অর্থাৎ এই সকল গৃহ সামগ্রীর যে তৈরী কারক, তৈরীর ক্ষেত্রে তার দৃষ্টি থাকে যে দ্রব্যটি সে তৈরী করবে তার মূল সত্ত্বার দিকে। সকল দ্রব্যের ক্ষেত্রেই এ কথা সত্য। কারণ কোন দ্রব্যের মূল সত্ত্বাকে কোন মানুষ তৈরী করতে পারে না।

এখন আমরা এমন একজন মানুষকে কল্পনা করি, যে সকল রকম কারিগরের তৈরী দ্রব্যই তৈরী করতে পারে। সুতরাং তাকে আমরা বিষ্ময়কররূপে দক্ষ লোক বলব। কিন্তু এমন কেউ যদি থাকে যার দক্ষতা কেবল কৃত্রিম দ্রব্যসামগ্রী সৃষ্টিতেই সীমাবদ্ধ নয়। সে উদ্ভিদ জগতের সকল উদ্ভিদ, পশু পাখী, মানুষ যে সৃষ্টি করতে পারে তাইই নয়, অধিকন্তু এই পৃথিবী, আকাশ, উর্দ্ধ এবং অধ:জগতের বস্তুসমূহ- সব সৃষ্টিরই সে কারিগর, তাহলে তার দক্ষতা কি বিষ্ময়ের বিষ্ময় নয়? এরূপ একজন শিল্পী কি থাকতে পারে? এবং সে উল্লেখিতভাবে কিম্বা অন্যভাবে এইসব কিছুর সৃষ্টি করতে সক্ষম? এক অর্থে যে কেউ এই সব কিছুকে সৃষ্টি করতে পারে। আর তা যে খুব কঠিন এমন নয়। বস্তুত: বিভিন্ন উপায়ে দ্রুতই করা যায় এবং দ্রুততম উপায়টি হচ্ছে একটি আরশি নিয়ে নিজের চারিদিকে ঘুরিয়ে আনা। মুহূর্তের মধ্যে দেখা যাবে সূর্য্য, তারকারাজি, পৃথিবী, সে নিজে, সকল পশু, উদ্ভিদাদি-ইত্যাদি সব কিছুই সে সৃষ্টি করে ফেলেছে। কিন্তু সেগুলি কেবল প্রতিচ্ছবি; যথার্থ বস্তু নয়। আর একজন চিত্রশিল্পী ঠিক এই ধরণেরই একজন কারিগর।

একজন শিল্পী যে বস্তু তৈরী করবে তা সত্যকার বস্তু নয়। তা যথার্থ বস্তুর একটি দৃশ্য বা প্রকাশ মাত্র। আর একজন সূত্রধর যে শয্যা তৈরী করে, তা শয্যার মূল সত্ত্বা বা অন্তরসত্ত্বা নয়, একটি বিশেষ শয্যাকেই সে তৈরী করে। অর্থাৎ সে তৈরী করে এমন কিছু, মূল সত্ত্বার সঙ্গে যার সাদৃশ্য আছে। কাজেই তার তৈরী বস্তুতে মূল সত্ত্বার ঘাটতি পড়তেই পারে। আর মূল বস্তু তৈরী করতে পারে একমাত্র বিধাতা।

সুতরাং শয্যার ক্ষেত্রে আমরা দেখছি তার তিনজন স্রষ্টা (Creator) রয়েছেঃ বিধাতা, সূত্রধর এবং শিল্পী। এর মধ্যে বিধাতা শয্যার মূল সত্ত্বা তৈরী করে দিয়েছেন। অন্য কোন সত্ত্বা তৈরী করেননি। তিনি যে কর্ম ব্যস্ততার জন্যে করেননি এমন নয়, তিনি করেননি কারণ, সেক্ষেত্রে দু‘টির মধ্যে চারিত্রিক মিল থাকত এবং দু‘টিই সদৃশ সত্ত্বার মূল হিসেবে পরিগণিত হত। সর্বজ্ঞ বিধাতা তা জানতেন বলেই কোন সদৃশ বস্তু সৃষ্টি না করে একটি মাত্র অনন্য মূল বস্তু তৈরী করেছেন। সুতরাং বিধাতা কেবল মূল সত্ত্বার স্রষ্টা, সূত্রধর সদৃশ সত্ত্বা আর শিল্পী এই দু‘জন যা তৈরী করে তা প্রকাশ করে মাত্র। অর্থাৎ এক্ষেত্রে শিল্পীর প্রকাশ, সত্য থেকে তিন প্রস্ত দূরত্বে অবস্থিত।

এখন বিচার্য এই- শিল্পী কি মূল সত্ত্বাকে প্রকাশ করে, না কারিগর যা সৃষ্টি করে তার প্রতিরূপ তৈরী করে, না কারিগরের সৃষ্টির বহি:রূপটিকে প্রকাশ করে। শয্যার কথাই ধরি, তাকে পার্শ্বদেশ, প্রান্তদেশ কিম্বা কোন কৌণিক অবস্থান থেকে দেখলে কিন্তু শয্যার চরিত্রের কোন পরিবর্তন হবে না, কেবল বিভিন্ন অবস্থান থেকে দেখাতে শয্যাটি বিভিন্ন রূপে দৃষ্ট হবে। অর্থাৎ শিল্পী বস্তু যেমন আছে তেমন প্রকাশ করার চেষ্টা করে না, সে কেবল সেই বস্তু যেমন দেখায় তেমনি প্রকাশ করে।

সুতরাং শিল্পীর প্রকাশ সত্য থেকে বহু দূরে অবস্থিত এবং শিল্পী যে কোন বস্তুরই প্রতিরূপ সৃষ্টি করতে পারে। এর কারণ তার দৃষ্টি বস্তুর বাহ্যরূপকে ভেদ করে কখনও তার অন্তসত্ত্বায় পৌঁছে না। যেমন- একজন শিল্পী, একজন পাদুকা প্রস্তুতকারী, একজন সূত্রধর কিম্বা অপর যে কোন কারিগরেরই প্রতিকৃতি সেগুলোর শিল্প নৈপুণ্যের কোন জ্ঞান ব্যতিরেকেই অঙ্কন করতে পারে।

এবার তাহলে আমরা বিষাদাত্মক কবিকূল শিরোমনি হোমারের বর্ণিত কাহিনী পরীক্ষা করে দেখি। লোকে তাদের সম্পর্কে বলে, তারা সকল নৈপূণ্যে দক্ষ; তারা ধর্ম এবং নীতির ক্ষেত্রেও সর্বজ্ঞ। কেননা একজন উৎকৃষ্ট কবিকে কোন বিষয়ে উত্তম রচনার জন্যে তাকে সে বিষয়ের সবকিছুই জানতে হয়। কিন্তু আমরা দেখেছি  হোমার এবং অন্যান্য কবিদের সৃষ্টি সত্য থেকে তিন প্রস্ত দূরে অবস্থিত; তা সত্যের ছায়ামাত্র, সত্য নয় এবং এ কারণে সত্যের জ্ঞান ব্যতিত এগুলি সৃষ্টি করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে।
এখন আমরা দেখব, সত্যিকার অর্থে হোমার মূল এবং তার প্রতিরূপ- উভয়কে জানতেন কি না।

আচ্ছা ধরি, কেউ কোন সৃষ্টির মূল এবং তার প্রতিরূপ- উভয়কেই জানে। তাহলে কি সে প্রতিরূপ সৃষ্টিতেই নিজেকে নিয়োজিত করবে? অবশ্যই নয়। বস্তুর প্রতিরূপ সৃষ্টিকারী যদি মূল বস্তুকেই জানে তবে সে মূল বস্তুর প্রতিই দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখবে তার প্রতিরূপের উপর নয়। তার উত্তম রচনার প্রশংসার স্মৃতির বদলে সে কাজের জন্যে প্রশংসিত হওয়ারই অধিক কামনা করবে। অপরের বৃহৎ কর্মের প্রশংসায় কাব্য কলা রচনার পরিবর্তে নিজেই সে বৃহৎ কর্মের নায়ক হবার কামনা করবে।

সুতরাং আমাদের বলতে হয় যে, হোমার থেকে শুরু করে কবিকূলদের কারোরই সত্যের যথার্থ কোন জ্ঞান নেই। যে বিষয়ে তারা আলোচনা করে তার অগভীর প্রতিরূপই কেবল তারা সৃষ্টি করতে সক্ষম। মানুষের কিসে মঙ্গল সে সম্পর্কে তাদের জ্ঞানের ক্ষেত্রেও একথা সত্য। যেমন-চিত্র শিল্পী, পাদুকা বলে যা মনে হয় তার চিত্রই অঙ্কন করে। অথচ সে কিম্বা তার চিত্রের দর্শকবৃন্দ কেউই পাদুকা প্রস্তুতের বিষয়ে কোন জ্ঞান রাখে না। তারা বস্তুর বর্ণ এবং আকার দ্বারাই তাকে বিচার করে। তেমনি একজন কবি শব্দের মাধ্যমে যে কোন কারিগরের একটি চিত্র তৈরী করতে পারে। অথচ সে তার ছবি তৈরী করা ব্যতিত তার সম্পর্কে কিছুই জানে না। কিন্তু তার শব্দের মাত্রা এবং ছন্দ এবং তার সঙ্গীন মানুষকে বিভ্রান্ত করবে। সাধারণ মানুষ যারা নিজেরা কবির মতই অজ্ঞ, যারা কেবল শব্দের ভিত্তিতেই কোন বিষয়কে বিচার করে তারা মনে করবে, এ কবির পাদুকা প্রস্তুত কারক কিম্বা যুদ্ধ পরিচালনা কিম্বা ইত্যকার সব বিষয় সম্পর্কেই গুরুতর বক্তব্য একটা কিছু রয়েছে। এরূপ প্রবল হচ্ছে কাব্যের স্বভাবগত যাদুর ক্ষমতা। কবির বক্তব্যকে আমরা যদি তার কাব্যিক বর্ণলেপ থেকে মুক্ত করে ফেলি, সাধারণ গদ্যে তাকে পরিণত করি, তাহলেই আমরা দেখব সে বক্তব্য কত মূল্যহীন। এ হচেছ সেই মূর্খের মত যার যথার্থ কোন সৌন্দর্য্য নেই; যৌবণের ফুটন্ত কূসুমই যার সৌন্দর্য্যরে একমাত্র নির্ভর।

আর একটা বিষয়। আমরা বলেছি -যে শিল্পী কোন বস্তুর প্রতিরূপ তৈরী করে সে বস্তুর সত্ত্বা জানে না, তার প্রকাশকেই মাত্র জানে। এর ব্যাখ্যায় অশ্বের লাগাম এবং বল্গার কথা ধরি, শিল্পী অশ্বের লাগাম এবং বল্গার ছবি তৈরী করতে পারে। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে এ বস্তুগুলি তৈরী করে কর্মকার এবং অশ্বের সাজ প্রস্তুতকারক। কিন্তু শিল্পী কি জানে বল্গা এবং লাগাম কিরূপ হওয়া আবশ্যক? বস্তুত: কর্মকার কিম্বা প্রস্তুতকারকও এ বিষয়টি জানে না। সে কথা জানে কেবলমাত্র অশ্বচালক, যে এদের ব্যবহারের জ্ঞান রাখে। এ কথা কি সব সময়ের জন্যে সত্য নয়? যে কোন বস্তুর ক্ষেত্রেই তিনটি প্রক্রিয়ার অস্তিত্ব আছে- তার ব্যবহার, তার সৃষ্টি এবং তার প্রতিসৃষ্টি। এবং কোন হাতিয়ার কিম্বা কোন প্রাণী বা কোন কার্য্য- তার গুণ, সৌন্দর্য্য এবং উপযোগীতা তাকে মানুষ কিম্বা প্রকৃতি যে ব্যবহারের জন্যে করেছে তার ভিত্তিতেই বিচার করা হয়।

তাহলে শিল্পী এবং তার সৃষ্ট প্রতিরূপ সম্পর্কে আমরা কি বলব? যে বস্তুর সে ছবি আঁকে, তার যথার্থতা কিম্বা অযথার্থতা সম্পর্কে তার কি প্রত্যক্ষ কোন অভিজ্ঞতা আছে? অথবা এমনকি আমরা বলতে পারি যে, যারা জানে তার কি আঁকা উচিৎ তাদের নির্দেশের উপর নির্ভর জনিত সঠিক ধারণা অন্তত: তার রয়েছে? না এর কোনটিই শিল্পীর নেই। সুতরাং শিল্পী যে বস্তুর ছরি আঁকে তার উত্তমতা কিম্বা অধমতা সম্পর্কে তার কোন জ্ঞান কিম্বা ধারণা থাকে না। ঠিক শিল্পীর মত করিও তার কাব্যের বিষয়ে সমভাবে অজ্ঞ।

সুতরাং বলা যায়- শিল্পী তার সৃষ্টির বিষষ সম্পর্কে অজ্ঞ কিম্বা সে সম্পর্কে তার জ্ঞান অতি নগন্য এবং তার এরূপ শিল্পের যথার্থ কোন মূল্য নেই। কেননা প্রতিরূপের এই সৃষ্টি সত্য থেকে তিন প্রস্ত দূরে অবস্থিত।

সমাপ্ত।

উৎস: The Republic by Plato Tr. by Benjamin Jowett.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন