pytheya.blogspot.com Webutation

২৮ নভেম্বর, ২০১২

Stephen: খৃষ্টের বাণী প্রচারে প্রথম বলি।


এই সময় যখন বিশ্বাসীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছিল, তখন গ্রীক ভাষাভাষী ইহুদিরা ইব্রীয়দের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আনল যে, দৈনিক পরিচর্য্যায় তাদের বিধবারা উপেক্ষিত হচ্ছে। তখন প্রেরিতগণ বিশ্বাসীদের ডেকে বলল, ‘আমরা যে খোদার বাণী ত্যাগ করে ভোজনের পরিচর্য্যা করি, এ ভাল নয়। সুতরাং হে ভ্রাতৃগণ, আপনাদের মধ্যে থেকে আত্মায় ও বিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ সাতজনকে বেঁছে নিন, তাদেরকে আমরা এই কাজের ভার দেব। আর আমরা প্রার্থণায় ও বাণীর প্রচারণায় নিবিষ্ট থাকব।’

এ কথায় সকলে সন্তুষ্ট হল এবং সাতজনকে মনোনীত করল। এরা হল- স্টিফেন, ফিলিপ, প্রখর, নীকানর, তীমোন, পার্মিনা ও নিকোলাই।

স্টিফেন (Stephen) যখন ধর্ম প্রচার শুরু করল তখন লিবর্ত্তীনদের সমাজগৃহের কিছু লোক, আর কিছু কুরীণীয়, আলেকজান্দ্রীয়, কিলিকিয় ও এশিয় লোক তাদের বিরুদ্ধাচারণ করতে লাগল। তারা তার উপর মূসা ও খোদার বিরুদ্ধে নিন্দার অভিযোগ আনল এবং সাধারণ লোক ও বৃদ্ধনেতাদের উত্তেজিত করে তুলল। সুতরাং স্টিফেনকে আটক করে মহাসভার সম্মুখে হাজির করল। তারা কিছু মিথ্যে সাক্ষী দাঁড় করিয়ে দিল। আর তারা তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সত্যতার স্বপক্ষে সাক্ষ্য দিল। সবকিছু শ্রবণ শেষে মহাঈমাম বলল, ‘এই সকল কথা কি সত্য?’

স্টিফেন।
তখন স্টিফেন ছোটখাট এক বক্তৃতা দিল। সে তার এই বক্ততায় জাতির ইতিহাস তুলে ধরার পাশাপাশি পূর্বপুরুষদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করল। সে বলল, ‘হে আমার ভ্রাতৃগণ, আমাদের আদি পিতা ইব্রাহিম হারোণে বসবাস করার পূর্বে যে সময়ে মেসপটেমিয়ায় ছিলেন, তখন খোদা তাকে দর্শণ দিয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি স্বদেশ হতে ও আপন জ্ঞাতি কুটুম্বদের মধ্যে থেকে বের হও এবং আমি যে দেশ তোমাকে দেখাই, সেই দেশে চল।’ তখন তিনি কলদীয় থেকে বের হয়ে হারোণে বসতি করলেন; অত:পর খোদা তাকে সেখান থেকে এই দেশে নিয়ে এলেন, যে দেশে আপনারা এখন বাস করছেন। কিন্তু এই দেশে খোদা তাকে অধিকার দিলেন না, এক পাদপরিমিত ভূমিও না; কিন্তু অঙ্গীকার করলেন, তাকে ও তার পরে তার বংশকে অধিকারার্থে তা তিনি দেবেন, যদিও তখন তার সন্তান হয়নি। 

আর খোদা বললেন যে- ‘তার বংশ পরদেশে প্রবাসী হবে এবং লোকে তাদেরকে দাসত্ব করাবে ও তাদের প্রতি চার‘শ বৎসর দৌরাত্ম করবে; আর তারা যে জাতির দাস হবে, আমিই তার বিচার করব।’ খোদা আরও বললেন- ‘তৎপরে তারা বের হয়ে আসবে এবং এই স্থানে আমার আরাধনা করবে।’ আর তিনি তাকে ত্বকচ্ছেদের নিয়ম দিলেন। আর এভাবে ইব্রাহিম ইসহাকের জন্ম দিলেন এবং অষ্টম দিনে তার ত্বকচ্ছেদ করলেন। পরে ইসহাক ইয়াকুবের এবং ইয়াকুব বারজন পিতৃকূলপতির জন্ম দিলেন। আর পিতৃকূলপতিরা ইউসূফের প্রতি হিংসে করে তাকে কূপে ফেলে দিল। তারপর সওদাগরেরা তাকে পেয়ে মিসরে নিয়ে বিক্রি করে দিল। কিন্তু খোদা তার সঙ্গে ছিলেন। তিনি তাকে বিজ্ঞান এবং স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিলেন। আর ফেরাউন তাকে তার মন্ত্রী নিযুক্ত করলেন। 

পরে সমস্ত মিসরে ও কনানে দুর্ভিক্ষ হল, বড়ই ক্লেশ ঘটল, আর আমাদের পিতৃপুরুষদের খাদ্যের অভাব হল। কিন্তু মিসরে শস্য আছে শুনে ইয়াকুব আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে প্রথমবার প্রেরণ করল। পরে দ্বিতীয়বার ইউসূফ ভ্রাতাদের সাথে পরিচিত হলেন। পরে ইউসূফ আপনার পিতাকে এবং আপন সমস্ত জ্ঞাতিকে নিজের কাছে ডেকে পাঠালেন। তাতে ইয়াকুব মিসরে গেলেন। পরে তার ও আমার পিতৃপুরুষদের মৃত্যু হল। আর তারা শিখিমে নীত হলেন এবং যে কবর ইব্রাহিম রৌপ্যমূল্য দিয়ে হমোর সন্তানদের নিকট থেকে ক্রয় করেছিলেন, তন্মধ্যে সমাহিত হলেন।

পরে খোদা ইব্রাহিমের নিকট যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, সেই প্রতিজ্ঞা ফলবার সময় সন্নিকট হলে, লোকেরা মিসরে বৃদ্ধি পেয়ে বহু সংখ্যক হল। অবশেষে মিসরের উপর এমন একজন ফেরাউন উঠলেন, যিনি ইউসূফকে জানতেন না। তিনি আমাদের জাতির সাথে চাতুর্যপূর্ণ ব্যবহার করলেন, তাদের সাথে দৌরাত্ম করলেন। তাদের কন্যা সন্তানদের জীবিত রেখে পুত্র সন্তানদের হত্যা করার আদেশ দেন। সেই সময় মূসার জন্ম হয়। তিনি তিন মাস পর্যন্ত মাতার কাছে লালিত-পালিত হলেন। পরে তাকে নদীতে ভাসিয়ে দিলে ফেরাউন স্ত্রী তাকে তুলে নিলেন এবং নিজ পুত্র জ্ঞানে লালন পালন করেন। আর মূসা মিসরীয়দের সমস্ত বিদ্যায় শিক্ষিত হলেন এবং তিনি বাক্যে ও কার্য্যে পরাক্রমী ছিলেন। 

পরে তার বয়স চল্লিশ বৎসর হলে আপন জাতিকে তত্ত্বাবধানের ইচ্ছে তার হৃদয়ে জাগ্রত হল। তখন একজনের প্রতি অন্যায় করা হচ্ছে দেখে তিনি তার পক্ষ নিলেন, সেই মিসরীয় ব্যক্তিকে আঘাত করে উপদ্রুতের সঙ্গে অন্যায়ের প্রতিকার করলেন। তিনি মনে করছিলেন, তার ভ্রাতৃগণ বুঝতে পেরেছে যে, তার হাত দিয়েই খোদা তাদেরকে পরিত্রাণ দিচ্ছেন; কিন্তু তারা বুঝল না। আর পরদিন তারা যখন মারামারি করছিল, তখন তিনি তাদের কাছে গিয়ে তাদেরকে নিত্তৃত করতে চেষ্টা করলেন, বললেন, ‘ওহে তোমরা পরস্পর ভ্রাতা, একজন অন্যের প্রতি অন্যায় করছ কেন?’
কিন্তু প্রতিবেশীর প্রতি যে অন্যায় করছিল সে তাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বলল, ‘তোমাকে অধ্যক্ষ ও বিচারকর্তা করে আমাদের উপর কে নিযুক্ত করেছে? কাল যেমন সেই মিসরীয়কে হত্যা করলে, তেমনি কি আমাকেও হত্যা করতে চাও?’

মূসা ভাবলেন তাহলে হত্যার বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেছে। আর তাই ভয়ে তিনি পালিয়ে  গেলেন এবং মিদিয়ন দেশে প্রবাসী হলেন। সেখানে তিনি বিবাহ করলেন। পরে চল্লিশ বৎসর পূর্ণ হলে সীনয় পর্বতের প্রান্তরে একটা ঝোপে অগ্নিশিখার ন্যায় খোদা তাকে দর্শণ দিলেন। মূসা যখন আরও নিকটবর্তী হলেন তখন এই বাণী ধ্বনিত হল-‘আমি তোমাদের পিতৃপুরুষ- ইব্রাহিম, ইসহাক ও ইয়াকুবের খোদা। এখন তোমার পা থেকে জুতো খুলে ফেল; কেননা যে স্থানে তুমি দাঁড়িয়ে আছ, তা পবিত্র ভূমি।
আমি মিসরে আমার প্রজাদের দুঃখ বিলক্ষণ দেখেছি, তাদের আর্তনাদ শুনেছি, আর তাদের উদ্ধার করতে নেমে এসেছি। এখন এসো, আমি তোমাকে মিসরে প্রেরণ করি।’

এই যে মূসাকে তারা অস্বীকার করেছিল, বলেছিল, তোমাকে অধ্যক্ষ ও বিচারকর্তা করে কে নিযুক্ত করেছে? তাকেই খোদা তাদের অধ্যক্ষ ও মুক্তিদাতা করে প্রেরণ করলেন।

অত:পর খোদা মিসরে, লোহিত সাগরে ও প্রান্তরে চল্লিশ বৎসর কাল নানাবিধ অদ্ভূত লক্ষণ  ও চিহ্নকার্য্য সাধন করে তাদেরকে বের করে নিয়ে এলেন। ইনি সেই মূসা, যিনি ইস্রায়েল সন্তানগণকে একথা বলেছিলেন- ‘খোদা তোমাদের জন্যে তোমাদের ভ্রাতৃগণের মধ্য হতে আমার সদৃশ একজন রসূল উৎপন্ন করবেন।’

 মোলক দেবতা।
খোদা তার এবং আমাদের পিতৃপুরুষদের সঙ্গে ছিলেন।পরে তিনি আমাদের জন্যে এক জীবন ব্যবস্থা আনতে তূর পর্বতে গমন করলে, আমাদের পিতৃপুরুষগণ পুন:রায় মিসরের দিকে ফিরতে চাইলেন এবং হারুণকে বললেন, ‘আমাদের নিমিত্ত দেবতা নির্মাণ কর, তিনিই আমাদের অগ্রে অগ্রে যাবেন, কেননা এই যে মূসা মিসর থেকে আমাদেরকে বের করে আনলেন, তার কি হল, আমরা জানি না।’

আর সেই সময় তারা একটা গোবৎস নির্মাণ করলেন এবং হারুণের নিষেধ সত্ত্বেও সেই মুর্ত্তির উদ্দেশ্যে বলি উৎসর্গ করলেন। আপনাদের হস্তকৃত বস্তুতে আমোদ করতে লাগলেন।খোদা অসন্তুষ্ট হলেন। তখন মূসা ফিরে এসে লোকদের জন্যে কান্নাকাটি করলে, তিনি তাদেরকে ক্ষমা করলেন এবং তার আবাস তাম্বু নির্মাণ করতে মূসাকে নির্দেশ দিলেন, আর নির্দেশমত তিনি তাঁর আবাস তাম্বু তৈরী করলেন। অত:পর আমাদের পিতৃপুরুষেরা তা প্রাপ্ত হয়ে ইউশূয়ার সাথে নিয়ে এলেন, আর যখন সেই জাতিগণের অধিকারে প্রবেশ করলেন, তখন সেই স্থানের সকলকে খোদা আমাদের পিতৃপুরুষদের সম্মুখ থেকে তাড়িয়ে দিলেন। সেই তাম্বু দাউদের সময় পর্যন্ত রইল। তিনি খোদার নিকট থেকে অনুগ্রহ প্রাপ্ত হলেন এবং তাঁর নিমিত্ত এক আবাস প্রস্তুত করতে চাইলেন। অত:পর তদীয় পুত্র শলোমন তাঁর জন্য এক গৃহ নির্মাণ করলেন। তথাপি যিনি পরাৎপর, তিনি হস্তনির্মিত গৃহে বাস করেন না। নবী ই‘শাইয়ের কিতাবে আছে-

‘স্বর্গ আমার সিংহাসন, পৃথিবী আমার পাদপীঠ;
প্রভু কহেন, তোমরা আমার জন্যে কিরূপ গৃহ নির্মাণ করবে?
অথবা আমার বিশ্রাম স্থান কোথায়?
আমার হস্তই কি এ সকল নির্মাণ করেনি?’----------(ই‘শাইয়া ৬৬:১)

খোদার তাম্বু, অত:পর তাঁর গৃহ তাদের মাঝে থাকা সত্ত্বেও আমাদের পিতৃপুষদের একদল মোলক ও রিফন দেবতার মূর্ত্তি গড়ে পূজা করল। তখন খোদা তাদেরকে তাদের গৃহ থেকে উচ্ছেদ করলেন এবং বাবিলে নির্বাসিত করলেন। অবশিষ্টরা এতেও পথে এল না, তারা নবী অরামিয়াকে বন্দী করল এবং মোলকের তাম্বু ও রিফন দেবতার তাঁরা তুলে বহন করল এবং  মিসরে গেল। আর অরামিয়ার নিষেধ সত্ত্বেও সেখানেও তারা ঐ সকল দেবতার উদ্দেশ্যে ঢালন উৎসর্গ চালিয়ে যেতে লাগল। আমাদের পিতৃপুরুষদের অবিশ্বস্ততার এইসব কীর্তিকলাপ সম্পর্কে নবী অমোষের কিতাবে উল্লেখ আছে। যেমন-

স্টিফেনকে পাথর ছুঁড়ে হত্যা করা হচ্ছে।
‘হে ইস্রায়েল কূল, 
প্রান্তরে চল্লিশ বৎসরকাল
তোমরা কি আমার উদ্দেশ্যে পশুবলি ও 
উপহার উৎসর্গ করেছিলে?
বরং তোমরা মোলকের তাম্বু ও রিফন দেবতার 
তাঁরা তুলে বহন করেছিলে;
সেই মূর্ত্তিদ্বয়, যা তোমরা পূজা করার জন্যে গড়েছিলে;
আর আমি তোমাদেরকে বাবিলের 
ওদিকে নির্বাসিত করব।’----------(অমোষ ৫:২৫-২৭)

শৌল বা পল।
হে আমার ভ্রাতৃগণ, তোমরা সর্বদা তোমাদের গ্রীবা শক্ত কর, আর তোমাদের হৃদয় ও কর্ণ তালাবদ্ধ করে রাখ, আর তোমরা রসূলদের প্রতিরোধ করে থাক; তোমাদের পিতৃপুরুষেরা যেমন, তোমরাও তেমনি। তোমাদের পিতৃপুরুষেরা কোন নবীকে তাড়না না করেছে? তারা তাদেরকেই হত্যা করেছিল, যারা পূর্বে সেই মসীহের আগমণ জ্ঞাপন করতেন, যাকে সম্প্রতি তোমরা শত্রুহস্তে সমর্পণ ও ক্রুসে দিয়েছ; তোমরাই দূতগণের দ্বারা আদিষ্ট ব্যবস্থা পেয়েছিলে, কিন্তু পালন করনি।’

উপস্থিত নেতৃবর্গ তার এসব কথায় ভীষণ ক্ষিপ্ত হল। তারা তাকে শহরের বাইরে নিয়ে গেল এবং সাক্ষীগণ আপন আপন বস্ত্র খুলে শৌল নামক এক ব্যক্তির পায়ের কাছে রাখল। তখন শৌল তাকে হত্যার অনুমোদন দিল। তারপর সকলে মিলে তাকে পাথর মারতে লাগল। এসময় স্টিফেন খোদার কাছে এই প্রার্থণা করতে লাগল, ‘হে আমার প্রভু, এদের বিপক্ষে তুমি এই পাপ ধরিও না।’

স্টিফেন নিহত হল।

সমাপ্ত।

ছবি: Wikipedia, jesus-is-savior, salesianity.blogspot.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন