pytheya.blogspot.com Webutation

৩০ নভেম্বর, ২০১২

Habib Nazzar: প্রেরিত ত্রয় ও হাবিব নাজ্জারের কাহিনী।


স্টিফেনের মৃত্যুর পর অত্যাচারের ভয়ে ঈসার শিষ্যগণ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছিল। এসময় শিষ্যদের দু‘জন ইন্তিকিয়া শহরের দ্বার প্রান্তে পৌঁছিল। এটি একটি উপকূলীয় শহর। প্রেরিত এই শিষ্যরা প্রান্তবর্তী দ্বার দিয়ে শহরে প্রবেশ করলে সর্বপ্রথমে হাবিব নাজ্জার (Habib Nazzar) নামক এক ব্যক্তির সাথে তাদের দেখা হল। নাজ্জার অর্থ ছুতোর। তাই ধরে নেয়া হয় এই হাবিব সম্ভবতঃ ছুতোর ছিল। 

হাবিব কুষ্ঠ রোগগ্রস্থ ছিল। এই রোগ থেকে মুক্তি লাভের জন্যে সে তার উপাস্যদের কাছে সত্তুর বৎসর ধরে প্রাণিপাত করেছে। কিন্তু আরোগ্য লাভ করতে পারেনি। তাই প্রেরিতদ্বয় যখন তাকে মূর্ত্তিপূজা ত্যাগ করে এক আল্লাহর উপাসনার দাওয়াত দিল, তখন সে বলল, ‘আপনাদের দাবী যে সত্য এর কোন প্রমাণ বা নিদর্শণ আছে কি?’
তারা বলল, ‘হ্যাঁ, আছে।’
তখন সে বলল, ‘আপনারা আমার এই ব্যাধি দূর করতে পারেন কি?’
তারা বলল, ‘যদি তুমি বিশ্বাস স্থাপন কর। আমরা ঈসা মসিহের নামে আমাদের পরওয়ারদেগারের কাছে দোয়া করব। তিনি নিশ্চয়ই তোমাকে রোগমুক্ত করবেন।’
সে বলল, ‘আমি সত্তুর বৎসর ধরে আমার দেবদেবীর কাছে দোয়া করেছি। কিন্তু কোন উপকার পাইনি।’
তারা বলল, ‘আমাদের রব সর্বশক্তিমান। তাঁর অনুমতিক্রমে ঈসা মসিহের নামে অনেকেই সুস্থ্য হয়েছেন।’
সে বলল, ‘আশ্চর্য তো!’
তারা বলল, ‘তুমি যাদেরকে উপাস্য স্থির করেছ, তারা মূর্ত্তিমাত্র- কারও উপকার বা অপকার করতে পারে না।’

একথা শুনে হাবিব তখনি ঈসা মসিহের প্রতি একই সাথে সর্বক্ষমতার অধিকারী মহান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করল। আর প্রেরিতদ্বয় তার রোগমুক্তির জন্যে ঈসা মসিহের নামে খোদার কাছে দোয়া করল। তারপর তারা শহরে প্রবেশ করল।

হাবিব নাজ্জার কয়েক দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ সুস্থ্য হয়ে গেল। তখন সে প্রতিজ্ঞা করল-‘আমি সারাদিনে যা উপার্জন করব তার অর্ধেক নিশ্চয়ই আমি খোদার পথে ব্যয় করব।’

এদিকে প্রেরিতদ্বয় শহরবাসীদের কাছে এক আল্লাহর উপাসনার দাওয়াত দিল। কিন্তু তারা তাদেরকে উপেক্ষা করল। এসময় ৩য় একজন প্রেরিত সেখানে এসে পৌঁছিল পূর্বের প্রেরিতদ্বয়কে শক্তিশালী করতে। তারপর তারা সকলেই অধিবাসীদের বলল, ‘আমরা অবশ্যই তোমাদের প্রতি প্রেরিত হয়েছি।’
 লোকেরা বলল, ‘তোমরা কেবল মিথ্যেই বলে যাচ্ছ।’

তাদের অবাধ্যতা ও প্রেরিতদের কথা অমান্য করার দরুণ জনপদে দূর্ভিক্ষ শুরু হয়ে গেল। ফলে অধিবাসীরা প্রেরিতদেরকে বলতে লাগল, ‘তোমরা অলক্ষুণে।’
তারা বলল, ‘তোমাদের অমঙ্গল তোমাদের সাথেই। আমরা তো কেবল তোমাদেরকে শুভেচ্ছা মূলক উপদেশই দিয়েছি।’
এরপর তারা খোদার উদ্দেশ্যে বলল, ‘হে খোদা, তুমি জান আমরা তোমার পয়গাম সুস্পষ্ট ভাবে এদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি।’

এলাকাবাসী প্রেরিতদেরকে হত্যার ষড়যন্ত্র করল। এদিকে হাবিব নাজ্জার যখন সংবাদ পেল যে, শহরবাসীরা প্রেরিতদেরকে মিথ্যেবাদী সাব্যস্ত করে তাদেরকে হত্যার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন সে আপন সম্প্রদায়ের প্রতি শুভেচ্ছা ও প্রেরিতদের প্রতি সহানুভূতির মনোভাব নিয়ে দ্রুত সম্প্রদায়ের মাঝে উপস্থিত হল এবং বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা প্রেরিতদের অনুসরণ কর। তারা সুপথপ্রাপ্ত। ভেবে দেখ, এরা দূর-দূরান্ত থেকে তোমাদেরকে উপদেশ দেবার জন্যে এসেছেন, সফরের কষ্ট সহ্য করেছেন, কিন্তু তোমাদের কাছ থেকে কোনরকম বিনিময় প্রত্যাশা করছেন না। এরূপ নিঃস্বার্থ লোকদের কথা চিন্তা-ভাবনার দাবী রাখে।

হে আমার সম্প্রদায়, যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং যার কাছে আমরা সকলেই প্রত্যাবর্তিত হব, আমি তাঁর উপাসনা না করে কি তার পরিবর্তে অন্যান্যদেরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করব?  আল্লাহ ব্যতিত অন্য উপাস্যের সুপারিশ আমার কোনই কাজে আসবে না এবং তারা আমাকে রক্ষাও করতে পারবে না। সুতরাং আমি নিশ্চিতভাবে আমার ও তোমাদের পালনকর্তা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলাম।’
লোকেরা মনে করল হাবিব নাজ্জার আগতদের চর। ফলে গোটা সম্প্রদায় তার শত্রু হয়ে গেল এবং সবাই তার উপর ঝাপিয়ে পড়ল। তারা পায়ের তলায় পিষ্ট করে তাকে হত্যা করে ফেলল। মৃত্যুর পর  আল্লাহর পক্ষ থেকে হাবিবকে বলা হল, ‘শান্তিময় জগতে প্রবেশ কর।’
এই অনুগ্রহ ও নেয়ামতসমূহ প্রত্যক্ষ করার পর হাবিব আক্ষেপ করে বলল, ‘হায়! আমার সম্প্রদায় যদি কোনক্রমে জানতে পারত যে, প্রেরিতদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের প্রতিদানে আমার পরওয়ারদেগার আমাকে ক্ষমা করেছেন এবং আমাকে সম্মানিতদের অন্তর্ভূক্ত করেছেন!’

এদিকে আল্লাহ হাবিবের সম্প্রদায়ের উপর গজব নাযিল করলেন। এই শাস্তি কার্যকর করতে তিনি আকাশ থেকে কোন বাহিনী অবতীর্ণ করেননি। আর এরূপ বাহিনী অবতরণ করান অবশ্য তাঁর রীতিও নয়। বস্তুতঃ এ ছিল এক মহানাদ। অতঃপর সঙ্গে সঙ্গে সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। মানুষের জন্যে আক্ষেপ যে, তাদের কাছে এমন কোন রসূলই আগমন করেনি যাদের প্রতি তারা বিদ্রুপ করে না। তারা কি প্রত্যক্ষ করেনি, তাদের পূর্বে আল্লাহ কত সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছেন যারা তাদের মাঝে আর ফিরে আসবে না। তাদের সবাইকে সমবেত অবস্থায় তাঁর দরবারে উপস্থিত হতেই হবে।’

এ সংক্রান্ত কোরআনের আয়াতসমূহ- তুমি তাদের কাছে সেই জনপদের অধিবাসীদের দৃষ্টান্ত বর্ণনা কর, যাদের কাছে প্রেরিতরা আগমন করেছিল। আমি তাদের কাছে দু‘জন প্রেরিত প্রেরণ করেছিলাম, অতঃপর ওরা তাদেরকে মিথ্যে প্রতিপন্ন করল। তখন আমি তাদেরকে শক্তিশালী করলাম তৃতীয় আরেকজনের মাধ্যমে। তারা সবাই বলল, ‘আমরা তোমাদের প্রতি প্রেরিত হয়েছি।’

তারা বলল, ‘তোমরা তো আমাদের মতই মানুষ, রহমান  আল্লাহ কিছুই নাযিল করেননি। তোমরা কেবল মিথ্যেই বলে যাচ্ছ।’
প্রেরিতরা বলল, ‘আমাদের পরওয়ারদেগার জানেন, আমরা অবশ্যই তোমাদের প্রতি প্রেরিত হয়েছি। পরিস্কারভাবে খোদার বাণী পৌঁছে দেয়াই আমাদের কাজ।’
তারা বলল, ‘আমরা তোমাদেরকে অশুভ অকল্যাণকর দেখছি। যদি তোমরা বিরত না হও, তবে অবশ্যই তোমাদেরকে প্রস্তর বর্ষণে হত্যা করব এবং আমাদের পক্ষ থেকে তোমাদেরকে যস্ত্রণাদায়ক শাস্তি স্পর্শ করবে।’
প্রেরিতরা বলল, ‘তোমাদের অকল্যাণ তোমাদের সাথেই। এটা কি এজন্যে যে আমরা তোমাদেরকে সদুপোদেশ দিয়েছি? বস্তুতঃ তোমরা সীমালংঘনকারী সম্প্রদায় বৈ নও।’
অতঃপর শহরের প্রান্তভাগ থেকে এক ব্যক্তি দৌঁড়ে এল। সে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা প্রেরিতদের অনুসরণ কর। অনুসরণ কর তাদের, যারা তোমাদের কাছে কোন বিনিময় কামনা করে না, অথচ তারা সুপথপ্রাপ্ত। আমার কি হল যে, যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং যার কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে, আমি তাঁর উপাসনা করব না? আমি কি তার পরিবর্তে অন্যান্যদেরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করব? করূণাময় যদি আমাকে কষ্টে নিপতিত করতে চান, তবে তাদের সুপারিশ আমার কোনই কাজে আসবে না এবং তারা আমাকে রক্ষাও করতে পারবে না। এরূপ করলে আমি প্রকাশ্য ভ্রষ্টতায় পতিত হব। আমি নিশ্চিতভাবে তোমাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলাম। অতএব আমার কাছ থেকে শুনে নাও।’
তাকে বলা হল, ‘শান্তিময় জগতে প্রবেশ কর।’
সে বলল, ‘হায়! আমার সম্প্রদায় যদি কোনক্রমে জানতে পারত যে, আমার পরওয়ারদেগার আমাকে ক্ষমা করেছেন এবং আমাকে সম্মানিতদের অন্তর্ভূক্ত করেছেন!’

আমি তার সম্প্রদায়ের উপর আকাশ থেকে কোন বাহিনী অবতীর্ণ করিনি এবং আমি (বাহিনী) অবতরণকারীও না। বস্তুতঃ এ ছিল এক মহানাদ। অতঃপর সঙ্গে সঙ্গে সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। বান্দাদের জন্যে আক্ষেপ যে, তাদের কাছে এমন কোন রসূলই আগমন করেনি যাদের প্রতি তারা বিদ্রুপ করে না। তারা কি প্রত্যক্ষ করে না, তাদের পূর্বে আমি কত সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছি যারা তাদের মাঝে আর ফিরে আসবে না। ওদের সবাইকে সমবেত অবস্থায় আমার দরবারে উপস্থিত হতেই হবে।(৩৬:১৩-৩২)

সমাপ্ত।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন