pytheya.blogspot.com Webutation

১২ নভেম্বর, ২০১২

John the Baptist: নব্যুয়ত, প্রচারনা ও শিরোচ্ছেদ।

রোম সম্রাট তিবিরিয় কৈসরের রাজত্বের পনের বৎসরের সময়ে ইহুদিয়া প্রদেশের প্রধান শাসনকর্তা ছিলেন পন্তীয় পীলাত। এসময় হেরোদপুত্র হেরোদ আন্ত্যিপাস গালীল প্রদেশ ও তার ভ্রাতা ফিলিপ যিতুরিয়া প্রদেশ ও ত্রখোনীতিয়া শাসন করছিল। লুসানিয়ায় ছিলেন অবিলীনীর শাসনকর্তা, আর হান্না ও কাইফা ইস্রায়েলীদের মহাঈমাম ছিলেন। ঠিক এসময়ে মরু এলাকায় হযরত জাকারিয়ার পুত্র ইয়াহিয়া বা জন নব্যুয়ত লাভ করলেন। তার প্রতি খোদার নির্দেশ ছিল- ‘হে ইয়াহিয়া! তুমি এই কিতাব দৃঢ়তার সাথে গ্রহণ কর।’

ইয়াহিয়া বা জন দ্যা ব্যাপ্টিষ্ট।
হযরত ইয়াহিয়া উটের লোমের কাপড় পরতেন এবং তার কোমরে থাকত চামড়ার কোমর-বন্ধনী। আর তিনি ফড়িং ও বনমধু খেতেন। শৈশবেই আল্লাহ তাকে জ্ঞান দান করেছিলেন এবং দান করেছিলেন হৃদয়ের কোমলতা ও পবিত্রতা। আর তিনি ছিলেন সংযমী। 

এ সংক্রান্ত কোরআনের আয়াতসমূহ- আমি বললাম, ‘হে ইয়াহিয়া! তুমি এ কিতাব দৃঢ়তার সাথে গ্রহণ কর, আমি তাকে শৈশবেই জ্ঞানদান করেছিলাম এবং আমার নিকট হতে তাকে হৃদয়ের কোমলতা (ও মনের) পবিত্রতা দান করেছিলাম এবং সে ছিল সংযমী।’ (১৯:১২-১৩)

নব্যুয়ত লাভের পর হযরত ইয়াহিয়া জর্দান নদীর চারিদিকের সমস্ত এলাকায় গিয়ে প্রচার করতে লাগলেন, যেন লোকেরা পাপের ক্ষমা পাবার জন্যে এখনই পাপ হতে মন ফেরায় ও বাপ্তিষ্ম গ্রহণ করে। এই বাপ্তিষ্ম দেবার কারণেই ইয়াহিয়া (জন), জন দ্যা ব্যাপ্টিষ্ট (John the Baptist) নামে পরিচিত। নবী ই‘শায়ের কিতাবের বাণী এভাবে পূর্ণ হল-

‘মরুএলাকায় একজনের কন্ঠস্বর চীৎকার করে জানাচ্ছে-
‘তোমরা প্রভুর পথ ঠিক কর, তার রাস্তা সোজা কর।’
প্রত্যেক উপত্যকা পরিপূরিত হবে,
প্রত্যেক পর্বত ও উপপর্বত নিম্ন করা যাবে,
যা যা বক্র, সেসব সরল করা যাবে, যা যা অসমান, 
সেসব সমান করা যাবে এবং সমস্ত মর্ত্ত্য খোদার পরিত্রাণ দেখবে।’  ---(ই‘শাইয়া ৪০:১-৫)

জেরুজালেম, ইহুদিয়া এবং জর্দান নদীর চারপাশের লোকেরা সেইসময় ইয়াহিয়ার কাছে আসতে লাগল। তারা তাদের পাপ স্বীকার করল এবং তিনি জর্দান নদীতে তাদের বাপ্তিষ্ম দিলেন। 

ইয়াহিয়াকে শিরোচ্ছেদ করা হচ্ছে।
ইয়াহিয়া লোকদেরকে বললেন, ‘তোমরা যে পাপ হতে মন ফিরিয়েছ তার উপযুক্ত ফল তোমাদের জীবনে দেখাও। গাছের গোড়াতে কুড়াল লাগানই আছে। যে গাছে ফল ধরে না তা কেটে আগুনে ফেলে দেয়া হবে।’
লোকেরা তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আমাদের এখন করণীয় কি?’
ইয়াহিয়া- ‘বস্ত্রহীনকে বস্ত্র দাও, আর অন্নহীনকে অন্ন।’

কয়েকজন কর আদায়কারী বাপ্তিস্ম গ্রহণ করার জন্যে এসেছিল। তারা বলল, ‘হুজুর, আমরা কি করব?‘
ইয়াহিয়া- ‘আইনে যা আছে তার বেশী আদায় কোরও না।’ 
উপস্থিত কয়েকজন সৈন্য জিজ্ঞেস করল, ‘আর আমরা কি করব?’
ইয়াহিয়া- ‘জুলুম করে বা অন্যায়ভাবে দোষী সাব্যস্ত করে কারও কাছ থেকে কিছু আদায় কোরও না এবং নিজেদের বেতনেই সন্তুষ্ট থাক।’

ইস্রায়েলী নেতারা ইয়াহিয়ার বিষয়ে শুনেছিল। তারা জেরুজালেম শহর থেকে কয়েকজন ঈমাম ও লেবীয়কে তার কাছে পাঠাল। তারা এসে ইয়াহিয়ার কাছে প্রশ্ন রাখল, ‘আপনি কি ইলিয়াস?’ 
ইয়াহিয়া-  ‘না, আমি ইলিয়াস নই।’ 

ইয়াহিয়ার কর্তিত শির।
আগতরা তখন ভাবল হয়ত: ইনিই তিনি-অর্থাৎ মসিহ। তাই তারা বলল, ‘তাহলে আপনি কি সেই নবী?’ 
ইয়াহিয়া-  ‘না।’ 
তখন তারা বলল, ‘যদি আপনি মসীহও নন, ইলিয়াসও নন, তবে কেন আপনি বাপ্তিস্ম দিচ্ছেন?’
ইয়াহিয়া-  ‘আমার পরে একজন আসছেন- তিনি যেন ইস্রায়েলীদের কাছে প্রকাশিত হন, সেজন্যেই তো আমি পানিতে বাপ্তিস্ম দিচ্ছি। কিন্তু তিনি পাক রূহ ও আগুনে বাপ্তিষ্ম দেবেন। কূলা তার হাতেই আছে। তা দিয়ে তিনি তার ফসল মাড়াবার জায়গা পরিস্কার করে পাকা ফসল গোলায় জমা করবেন। কিন্তু যে আগুন কখনও নেভে না, তাতে তিনি তুষ পুড়িয়ে ফেলবেন।’
তারা বলল,‘পরিস্কার করে আমাদেরকে বলুন, আপনি কে? যারা আমাদেরকে পাঠিয়েছেন ফিরে গিয়ে তাদেরকে তো আপনার সম্পর্কে জানাতে হবে।’  
ইয়াহিয়া- ‘আমিই সেই কন্ঠস্বর, যার বিষয়ে নবী ই’শাইয়া বলেছেন-

‘মরু এলাকায় একজনের কন্ঠস্বর চীৎকার করে জানাচ্ছে
তোমরা প্রভুর পথ সোজা কর।’

শালীম নামে একটা গ্রামের কাছে ঐণোন নামে একটা জায়গায় তখন ইয়াহিয়া বাপ্তিস্ম দিচ্ছিলেন, কারণ সেই জায়গায় অনেক পানি ছিল আর লোকেরাও এসে বাপ্তিস্ম গ্রহণ করছিল। শিষ্যরা ইয়াহিয়াকে বলল, ‘হুজুর, ইহুদিয়াতে এক ব্যক্তি বাপ্তিস্ম দিচ্ছেন আর সকলে তার কাছে যাচ্ছে। তিনি অলৌকিক সব কর্মকান্ড করছেন আর লোকেরা তার কথা শুনছে।’
ইয়াহিয়া বললেন, ‘খোদা না দিলে কারও পক্ষে কোন কিছুই পাওয়া সম্ভব না। তোমরাই আমাকে বলতে শুনেছ যে আমি মসীহ নই, কিন্তু আমাকে তার আগে পাঠান হয়েছে। যার হাতে কন্যাকে দেয়া হয়েছে, সে-ই বর। বরের বন্ধু দাঁড়িয়ে বরের কথা শুনে এবং কন্ঠস্বর শুনে আনন্দিত হয় ঠিক সেইভাবে আমার আনন্দও আজ পূর্ণ হল।’

ইয়াহিয়ার সমাধি, দামেস্ক।
হেরোদ আন্ত্যিপাস তার ভ্রাতা ফিলিপের জীবিতাবস্থায় তার স্ত্রী হেরোদিয়াকে বিবাহ করেছিলেন। হেরোদিয়া ইয়াহিয়ার কাছে এই বিবাহের স্বীকৃতি চাইল। কিন্তু ইয়াহিয়া তা না করে ঘোষণা করলেন, ‘ভ্রাতার জীবিতবস্থায় ভ্রাতৃবধূকে বিবাহ করা অবৈধ।’-এই ঘোষণায় হেরোদিয়া রাগান্বিত হল। সে রাজকার্যের বিরোধিতা করার অপরাধে তাকে অভিযুক্ত করল। তার আদেশে রক্ষীরা ইয়াহিয়াকে বন্দী করে নিয়ে এল। সে তাকে হত্যা করতে চাইল কিন্তু হেরোদ তাতে বাঁধা দিলেন। কারণ ইয়াহিয়া যে একজন পবিত্র লোক তিনি তা জানতেন। তার কথা শুনবার সময়ে খুব অস্বস্তিবোধ করলেও তিনি তা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। কিন্তু এসময় তিনি তাকে মুক্তি দিতে চাইলেও হেরোদিয়ার জন্যে তা পারলেন না। স্ত্রীকে খুশী করতে তিনি তাকে কারাদন্ডের আদেশ দিলেন। তার এই আদেশে ইয়াহিয়াকে জেলখানায় অন্তরীণ রাখা হল।

ইয়াহিয়ার দু‘জন শিষ্য ঈসার কাছে এল। তাদের কাছ থেকে ঈসা জানতে পারলেন যে ইয়াহিয়াকে জেলখানায় বন্দী করে রাখা হয়েছে। এসময় অনেক রোগীকে তার কাছে আনা হয়েছিল, সুতরাং তিনি তাদেরকে সুস্থ্য করতে লাগলেন। এসব দেখে তারা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘যার আসার কথা আছে, আপনিই কি তিনি, না আমরা তার জন্যে অপেক্ষা করব।’

ঈসা তাদের কথার জবাব না দিয়ে একের পর এক রোগীকে সুস্থ্য করতে লাগলেন। যখন সকলকে সুস্থ্য করা শেষ হল তখন তিনি বললেন, ‘তোমরা তো নিজ চোখেই দেখলে অন্ধেরা দেখছে, খোঁড়ারা হাঁটছে, কুষ্ঠরোগীরা সুস্থ্য হচ্ছে, কালারা শুনছে, মৃতেরা বেঁচে উঠছে আর গরীবদের কাছে সুখবর প্রচার করা হচ্ছে। আর সেই ধন্য, যে আমাকে নিয়ে মনে কোন বাঁধা না পায়।’
সবকিছু দেখে শুনে শিষ্য দু‘জন চলে গেল।


হেরোদ তার জন্মদিনে তার সব রাজকর্মচারী, সেনাপতি, গালীল প্রদেশের প্রধান লোকদের জন্যে একটি ভোজের আয়োজন করলেন। হেরোদিয়ার এক কন্যা সেই ভোজসভায়
নাচ দেখিয়ে সকলকে সন্তুষ্ট ও মুগ্ধ করল।
হেরোদ মেয়েটিকে ডেকে বললেন, ‘অপূর্ব তোমার নাচ, আমি মুগ্ধ, বিমোহিত। বল, কি উপহার তুমি চাও? যা চাইবে তাই দেব।’
সে বলল, ‘যা চাইব, সত্যিই কি তা পাব?’
হেরোদ বললেন, ‘অবশ্যই।’
তখন সে ফিরে গেল। অতঃপর তার মা হেরোদিয়াকে গিয়ে বলল, ‘মা, আমি কি চাইব?’
হেরোদিয়া দেখল তার জন্যে এক সুবর্ণ সুযোগ এসেছে, সুতরাং সে বলল, ‘বাপ্তিস্মদাতা ইয়াহিয়ার মাথাটা চাও।’
মেয়েটি ফিরে এসে হেরোদকে বলল, ‘আমি এখনই বাপ্তিস্মদাতা ইয়াহিয়ার মাথাটা চাই।’

এই দাবী শুনে হেরোদ খুব দুঃখিত হলেন। কিন্তু ভোজে যারা দাওয়াত পেয়েছিলেন, সেইসব লোকদের সামনে তিনি ওয়াদা করেছিলেন। তাই মেয়েটিকে ফিরিয়ে দিতে পারলেন না। সুতরাং তিনি ইয়াহিয়ার মাথা কেটে আনার জন্যে একজন জল্লাদকে হুকুম দিলেন। জল্লাদ জেলখানায় গেল এবং ইয়াহিয়ার কাটা মাথাটা একটা থালায় করে নিয়ে এল। হেরোদ থালাটি মেয়েটির হাতে দিলে সে তা নিয়ে গিয়ে তার মাকে দিল।
এদিকে ইয়াহিয়ার মৃত্যুর খবর পেয়ে তার শিষ্যরা এসে লাশটি নিয়ে সমাধিস্থ করল।

সমাপ্ত।
ছবি: Wikipedia.


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন