pytheya.blogspot.com Webutation

২ নভেম্বর, ২০১২

Ten Commandments: দশ আজ্ঞা।


তূরপাহাড় থেকে মূসা তার জাতির জন্যে তাওরাত কিতাব নিয়ে এসেছিলেন। অতঃপর তিনি তা ইস্রায়েলীদের সামনে পেশ করে বললেন, ‘আল্লাহ তোমাদের হেদায়েতের জন্যে এই কিতাব দান করেছেন।’ 

তূর পর্বত।
বনি-ইস্রায়েলীরা ছিল সন্দেহপ্রবণ, বক্রস্বভাবী। তারা বলল, ‘হে মূসা! এটা যে আল্লাহর কিতাব তা আমরা কিভাবে বুঝব? আল্লাহ আমাদের নিজেই বলে দিন যে, এটা তাঁর বাণী, তবেই আমরা বিশ্বাস করব? এরও তো সম্ভবনা রয়েছে যে, কিতাবটি তুমি নিজে লিখে আমাদের সামনে রেখেছ, আর আল্লাহ প্রদত্ত বলে চালিয়ে দিচ্ছ।’ 

এই আপত্তিতে মূসা বড়ই অস্বস্তিতে পড়লেন। তিনি ইস্রায়েলীদেরকে বললেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়! কেন তোমরা আমাকে কষ্ট দাও, যখন তোমরা জান যে, আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রসূল।’

কিন্তু ইস্রায়েলীরা কিতাবকে আল্লাহ প্রদত্ত বলে মানতে রাজী হল না। অতঃপর তারা যখন বক্রতা অবলম্বণ করল, তখন আল্লাহ তাদের অন্তরকে আরও বক্র করে দিলেন। আল্লাহ তো পাপাচারী সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শণ করেন না।

এ সংক্রান্ত কোরআনের আয়াতসমূহ-স্মরণ কর, যখন মূসা তার সম্প্রদায়কে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা কেন আমাকে কষ্ট দাও, অথচ তোমরা জান যে, আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রসূল।’ 
অতঃপর তারা যখন বক্রতা অবলম্বণ করল, তখন আল্লাহ তাদের অন্তরকে বক্র করে দিলেন। আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শণ করেন না।(৬১:৫)

ইস্রায়েলীদের অবিশ্বাস দেখে মূসা ব্যাথিত হলেন। এই নির্বোধ লোকেরা কি অপবাদই না তার উপর আরোপ করছে? তিনি সমস্যা সমাধানার্থে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন। আল্লাহ বললেন, ‘হে মূসা! বনি-ইস্রায়েলীদের মধ্যে থেকে নির্ভরশীল কিছু ব্যক্তিকে বেঁছে নিয়ে তূর পাহাড়ে যাও, আমি তাদেরকে আমার বাণী শুনিয়ে দেব, যাতে তাদের বিশ্বাস হয় এ আমারই কিতাব।’ 

মূসা বনি-ইস্রায়েলীদেরকে বললেন, ‘তোমরা তূর পাহাড়ে উপস্থিত হলে আল্লাহ নিজেই তাঁর বাণী তোমাদেরকে শুনিয়ে দেবেন। তোমরা এখানে কয়েক লক্ষ লোক। সকলে সেখানে সমবেত হয়ে ভীড় করার কোন অর্থ হয় না। বরং তোমাদের মধ্যে থেকে নেতৃস্থানীয় কিছু লোকসহ সেখানে উপস্থিত হওয়াকে শ্রেয় মনেকরি। তারা ফিরে এসে যদি এই কিতাবের সত্যতা সম্পর্কে সাক্ষ্য প্রদান করে, তবে একে আল্লাহর কিতাব বলে গ্রহণ করতে তোমাদের আর কোন আপত্তি থাকার কথা নয়।’ 
সকলে এই প্রস্তাব পছন্দ করল।  

মূসা ইস্রায়েলীদের মধ্যে থেকে নেতৃস্থানীয় সত্তুরজনকে বেঁছে নিলেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে পবিত্র করলেন। 
তিনদিন ধরে তারা নিজেদেরকে পবিত্র করেছিল।

মূসা প্রতিনিধিদেরকে নিয়ে তূরপাহাড়ের দিকে চললেন। সমস্ত পর্বত এসময় ধূম্রময় ছিল। যখন তারা পাহাড়ের নিকটবর্তী হলেন তখন সেখানে ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেল। এই ভূমিকম্পের কারণ ছিল এই যে, মূসা যদিও সাবধানতার সাথে প্রতিনিধি বাঁছাই করেছিলেন তথাপি তাদের মধ্যে এমন কিছূ লোকজন ছিল যারা গো-বৎসের পূজায় সামিল ছিল এবং তাদের কারও কারও অন্তরে গো-বৎস প্রীতি তখনও ছিল। 

মূসা বুঝলেন হয়ত: লোকেদের গো-বৎসের পূজার কারণে আল্লাহ এখনও নারাজ। আর তাই তিনি তাদেরকে এই ভূমিকম্পের মধ্যে ফেলেছেন। সুতরাং মূসা আকাশের দিকে দু‘হাত বাড়িয়ে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করলেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! ইচ্ছে করলে এর আগেই তুমি এদেরকে ও আমাকে ধ্বংস করতে পারতে, আমাদের মধ্যে যারা নির্বোধ তারা যা করেছে সেজন্যে কি তুমি আমাদেরকে ধ্বংস করবে? এ তো তোমার পরীক্ষা যা দিয়ে তুমি যাকে ইচ্ছে বিপথগামী কর আর যাকে ইচ্ছে সৎপথে পরিচালিত কর। তুমিই তো আমাদের অভিভাবক। সুতরাং তুমি আমাদেরকে ক্ষমা কর ও আমাদের প্রতি অনুগ্রহ কর। আর তুমিই তো সর্বশ্রেষ্ট ক্ষমাকারী। আর আমাদের জন্যে নিশ্চিত কর ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ। আমরা তো তোমার কাছেই ফিরে আসব।

মূসার এই প্রার্থণা শুনে যাদের অন্তরে দেবতাদের প্রতি তখনও মহব্বত ছিল তারা লজ্জিত হল ও তওবা করল। তখন ভূমিকম্প থেমে গেল। 

আল্লাহ মূসাকে জানালেন, ‘আমার শাস্তি যাকে ইচ্ছে দিয়ে থাকি। আমার অনুগ্রহ সে তো প্রত্যেক জিনিসে ছড়িয়ে আছে। তাই আমি তাদের জন্যে তা নিশ্চিত করি যারা সংযম পালন করে, যাকাত দেয় ও আমার নিদর্শণগুলোয় বিশ্বাস করে।’

মূসা সকলকে নিয়ে পর্বতের পাদদেশে এক নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে সমবেত করলেন। কোন অবস্থাতেই তাদেরকে আর সম্মুখে অগ্রসর হতে বা পর্বত স্পর্শ করতে অনুমতি দেয়া হয়নি।

এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ- ‘মূসা তার সম্প্রদায়ের মধ্যে থেকে সত্তুরজনকে আমার নির্ধারিত স্থানে সমবেত হবার জন্যে নির্বাচিত করল। তারপর ভূমিকম্প যখন তাদেরকে আঘাত হানল তখন মূসা বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! ইচ্ছে করলে এর আগেই তুমি এদেরকে ও আমাকে ধ্বংস করতে পারতে আমাদের মধ্যে যারা নির্বোধ তারা যা করেছে সেজন্যে কি তুমি আমাদেরকে ধ্বংস করবে? এ তো তোমার পরীক্ষা যা দিয়ে তুমি যাকে ইচ্ছে বিপথগামী কর আর যাকে ইচ্ছে সৎপথে পরিচালিত কর। তুমিই তো আমাদের অভিভাবক। সুতরাং তুমি আমাদেরকে ক্ষমা কর ও আমাদের প্রতি অনুগ্রহ কর। আর তুমিই তো সর্বশ্রেষ্ট ক্ষমাকারী। আর আমাদের জন্যে লিখে দাও (নিশ্চিত কর) ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ। আমরা তো তোমার কাছেই ফিরে আসব।’
(আল্লাহ) বললেন, ‘আমার শাস্তি যাকে ইচ্ছে দিয়ে থাকি। আমার অনুগ্রহ সে তো প্রত্যেক জিনিসে ছড়িয়ে আছে। তাই আমি তাদের জন্যে তা লিখে দেই যারা সংযম পালন তরে, যাকাত দেয় ও আমার নিদর্শণগুলোয় বিশ্বাস করে।’(৭:১৫৫-১৫৬) 

এক সময় তূর পাহাড়ে বজ্রনিনাদে একে একে দশ আজ্ঞা (Ten Commandments) ধ্বনিত হতে লাগল- 

- আল্লাহ ব্যতিত অপর কাউকে উপাস্য স্থির কোরও না।
- প্রতিমা পূজা কোরও না।
- অসৎ উদ্দেশ্যে আল্লাহর নাম নিয়ো না।
- বিশ্রামবারকে পবিত্ররূপে মান্য কোরও।
- পিতামাতাকে সমাদর কোরও।
- নরহত্যা কোরও না। 
- ব্যভিচার কোরও না। 
- চুরি কোরও না।
- প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে মিথ্যে সাক্ষ্য দিও না।
- প্রতিবেশীর কোন বস্তুতে লোভ কোরও না। 

-এ আওয়াজ চারিদিক থেকে সমভাবে ধ্বনিত হচ্ছিল। এসময় ইস্রায়েলীরা উপরে পর্বতে এবং আকাশের দিকে তাকিয়ে শব্দের উৎস খুঁজে ফিরল। কিন্তু তারা কাউকে দেখল না। তারা কেবল দেখল সমগ্র পর্বত ঘন ধোঁয়ায় ঢাকা। সুতরাং তাদের মনে জিজ্ঞাসা আর কপালে তার চিহ্ন ফুটে উঠল। তারা একে অপরের মুখ পানে চাইল। অত:পর মূসাকে বলল, ‘আল্লাহই জানেন এ কথা কে বলল! সুতরাং হে মূসা! কষ্মিনকালেও আমরা তোমাকে বিশ্বাস করব না, যতক্ষণ না আমরা আল্লাহকে প্রত্যক্ষ দেখতে পাব।’
দশ আজ্ঞা।
এই জগতে জীবিত অবস্থায় আল্লাহকে দেখার ক্ষমতা কারও নেই। কেননা তাঁর সত্ত্বা অসীম এবং মানুষের দৃষ্টি সসীম। সুতরাং মানুষের সসীম দৃষ্টি তাঁর অসীম সত্ত্বাকে চতুর্দিক থেকে বেষ্টন করে কখনও দেখতে পাবে না। তাই মূসা এবিষয়ে লোকদেরকে নিবৃত্ত করতে চেষ্টা করলেন, বললেন, ‘তোমাদের এই দাবী হটকারী ও মূর্খতাপূর্ণ। সুতরাং এ থেকে নিবৃত্ত হও। তাঁকে কেউ কখনও দেখতে পাবে না। দেখছ না ইতিপূর্বে আমি তাকে দেখতে চাওয়ায় তাঁর নূরের সামান্য তাজ্জ্বালীতে এ তূর পাহাড়ের একাংশ গলে পড়েছে।’

কিন্তু ইস্রয়েলীরা ছিল নিতান্তই বক্রস্বভাবী। তাই মূসার আবেদন তাদের হৃদয় গলাতে পারল না। তারা তাদের দাবীতে অনড় রইল। সুতরাং মূসা বিষয়টি ফয়সালার জন্যে আল্লাহর দরবারে আর্জি পেশ করলেন। আর তার এ আর্জি পেশ করার সাথে সাথেই সকলের উপর ঐশী রোষানল বর্ষিত হল। উপর থেকে বজ্রপাত এবং নীচ থেকে ভূ-কম্পন তাদেরকে পাকড়াও করল। এতে তারা সকলেই তৎক্ষণাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল- দৃশ্যতঃ মৃতে পরিণত হল। 

প্রচন্ড বজ্রপাতে মূসাও জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। পরে জ্ঞান ফিরে পেয়ে তিনি দেখতে পেলেন তূর পাহাড়ের পাদদেশ একটি মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। এতে তিনি বড়ই ব্যাথিত ও বিচলিত হলেন। কারণ এই লোকেরা ছিল বনি-ইস্রায়েলীদের বিশেষ বিশেষ লোক। অধিকন্তু, তিনি তাদের ছাড়া ফিরে গিয়ে জাতির লোকদের কাছে কি জবাব দেবেন? তারা এমনিতেই বক্র স্বভাবের; তারা তো তার বিরুদ্ধে অপবাদ দেবে যে, তিনি প্রতারণা করে তাদের নির্বাচিত নেতৃস্থানীয় লোকগুলোকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে ফেলেছেন। আর শুধু এতেই  তারা ক্ষান্ত হবে না বরং তারা তাকে হত্যা করে প্রতিশোধ নেবার জন্যেই প্রস্তুত হবে। তাই তিনি আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করলেন, ‘হে আল্লাহ! এরা নির্বোধ। তুমি তাদেরকে মাফ করে দাও। যদি তারা মৃত অবস্থায় এখানে পড়ে থাকে, আর আমি একা ফিরে যাই, তবে তো ইস্রায়েলীরা আমার বিরুদ্ধে অপবাদ দেবে। আর তারা তো পূর্ব থেকেই আমাকে সন্দেহের চোখে দেখে। তাদের কাছে জবাব দেবার মত আমার কিছুই নেই। সুতরাং তাদেরকে মাফ করে জীবিত করে দাও।’
আল্লাহ তো মহাক্ষমাশীল, দয়াময়। তিনি পুন:রায় তাদেরকে ক্ষমা করে জীবিত করে দিলেন যেন তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে। 

এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ-আমাদেরকে আল্লাহকে সাক্ষাৎ দেখাও।’(৪:১৫৩) এবং যখন তোমরা বলেছিলে- ‘হে মূসা! আমরা আল্লাহকে প্রত্যক্ষ না দেখা পর্যন্ত তোমাকে কখনও বিশ্বাস করব না।’ তখন তোমরা বজ্রাহত হয়েছিলে এবং তোমরা তা প্রত্যক্ষ করেছিলে। অতঃপর আমি মৃত্যুর পর তোমাদের পূনরুজ্জীবিত করলাম, যেন তোমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।’(২:৫৫-৫৬) 

সমাপ্ত।
ছবি: Wikipedia, biblebelievers.
বি:দ্র: The Ten Commandments (1956)-মুভিটি যারা দেখেন নাই, তারা দেখে ফেলেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন