pytheya.blogspot.com Webutation

২২ নভেম্বর, ২০১২

Jesus:মসিহের গ্রেফতার ও বিচার।


মহাঈমাম কাইফার বাড়ীতে প্রধান ঈমামেরা ও ইস্রায়েলী নেতারা একসঙ্গে সমবেত হয়ে ঈসা মসিহ (Jesus) কে গোপনে ধরে এনে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল। কিন্তু তাদের এই ষড়যন্ত্রের কথা ঈসা জানতে পেরে প্রকাশ্যে চলাফেরা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ফলে তাকে ধরতে পারা কঠিন হয়ে পড়েছিল। এসময় একদিন এহুদা ইস্কোরিয়োৎ- ঈসার বার শিষ্যের একজন, প্রধান ঈমাম ও অন্যান্য ঈমামদের কাছে গিয়ে বলল, ‘তাকে আপনাদের হাতে তুলে দিলে আপনারা আমাকে কি দেবেন ?’
প্রধান ঈমামেরা তার কথা শুনে আনন্দিত হল। তারা তিরিশটা রূপার টাকা গুনে তার হাতে তুলে দিল। তখন সেই টাকা নিয়ে সে চলে এল, আর সংগোপনে ঈসাকে ধরিয়ে দেবার সুযোগ খুঁজতে লাগল। 
ঈদুল মা‘তছ এর দিনে ঈদুল ফেসাখের ভোজের জন্যে ভেড়ার বাচ্চা জবেহ করা হত। শিষ্যেরা ঈসাকে বলল, ‘আপনার জন্যে ঈদুল ফেসাখের ভোজ আমাদের কোথায় প্রস্তুত করতে বলেন?’ 
তিনি বললেন, ‘তোমরা শহরের দিকে যাও। যখন শহরে ঢুকবে, তখন একজন লোককে এক কলসী পানি নিয়ে যেতে দেখবে। তার পিছন পিছন গিয়ে সে যে গৃহে ঢুকবে সেই গৃহের মালিককে বলবে, ‘গুরু, জানতে চেয়েছেন, যেখানে  তিনি তার শিষ্যদের সঙ্গে ঈদুল ফেসাখের ভোজ খেতে পারেন, সেই মেহমানখানা কোথায়?’ তখন সে তোমাদের উপরতলার একটা সাঁজান বড় ঘর দেখিয়ে দেবে, সেখানেই সমস্ত কিছু প্রস্তুত কোরও।’

তিনি যেমন বলেছিলেন, তারা গিয়ে সমস্ত কিছু সেরকমই দেখতে পেল এবং সেখানে ঈদুল ফেসাখের ভোজ প্রস্তত করল। সন্ধ্যায়, ঈসা তার বার জন শিষ্যদের সঙ্গে যখন সেখানে সমবেত ছিলেন, তখন শিষ্যরা তাদের মধ্যে ‘কে শ্রেষ্ঠ’ এই নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়ল। তখন ঈসা কিছু না বলে উঠলেন এবং উপরের বস্ত্র খুলে রাখলেন, আর একখানি গামছা নিয়ে কটি বন্ধ করলেন। পরে তিনি পাত্রে পানি ঢাললেন ও শিষ্যদের পা ধুয়ে দিতে লাগলেন এবং যে গামছা কটিবন্ধ করেছিলেন তা দিয়ে মুছে দিতে লাগলেন। এভাবে যখন শিমোন পিতরের পালা এল, তখন সে বলল, ‘প্রভু, আপনি কি আমারও পা ধুয়ে দেবেন?’

ঈসা বললেন, ‘আমি যা করছি, তুমি তা এখন বুঝবে না, কিন্তু পরে বুঝবে।’
সে বলল, ‘না, আপনি কখনও আমার পা ধুয়ে দিতে পারবেন না।’
তখন ঈসা বললেন, ‘যদি তোমাকে ধৌত না করি, তবে আমার সাথে তোমার কোন অংশ নেই।’
এতে সে বলল, ‘প্রভু তাহলে কেবল পা নয়, আমার হাত ও মাথা ধুয়ে দেন।’
তিনি বললেন, ‘যে স্নান করেছে, পা ভিন্ন তার আর কিছুই ধোবার প্রয়োজন নেই, সে তো সর্বাঙ্গে শুচি।’

পা ধোয়ান শেষ হলে তিনি পুন:রায় উপরের বস্ত্র পরিধান করে বসলেন এবং বললেন, ‘আমি তোমাদেরকে দৃষ্টান্ত দেখালাম। তোমাদের প্রতি আমি যেমন করেছি, তোমরাও যেন তদ্রুপ কর। 
‘কে শ্রেষ্ঠ’ যে ভোজনে বসে, না যে পরিচর্য্যা করে? যে ভোজনে বসে সেই কি নয়? কিন্তু আমি তোমাদের মধ্যে পরিচারকের ন্যায় রয়েছি। তোমাদের মধ্যে যে শ্রেষ্ঠ, সে কনিষ্ঠের ন্যায় হোক এবং যে প্রধান সে পরিচারকের ন্যায় হোক। 
সত্যি, সত্যি, আমি তোমাদেরকে বলছি, দাস নিজ প্রভু হতে বড় নয়, ও প্রেরিত প্রেরণকর্তা হতে বড় নয়।’
সকলকে নিয়ে ঈসা খেতে বসলেন। তারপর বললেন, ‘কষ্ট ভোগ করার আগে তোমাদের সঙ্গে ঈদুল ফেসাখের এই ভোজ খাবার আমার খুবই ইচ্ছে ছিল। কেননা যে পর্যন্ত খোদার রাজ্যের আগমন না হয়, সেই পর্যন্ত আমি আর এ ভোজন করব না।’ 

পরে তিনি একটা রুটি হাতে নিয়ে খোদাকে ধন্যবাদ দিয়ে ভাঙ্গতে শুরু করলেন এবং বললেন, ‘আমি তোমাদেরকে সত্যি বলছি, তোমাদেরই একজন আমাকে ধরিয়ে দেবে, আর সে এখন আমার সঙ্গে খাচ্ছে।’
শিষ্যেরা দুঃখিত হল এবং ভারাক্রান্ত হৃদয়ে একজনের পরে আরেকজন বলতে লাগল, ‘সে কি আমি, প্রভু?’ 

ঈসা রুটি টুকরো টুকরো করে সবাইকে দিতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, ‘সে তোমাদের এই বারজনেরই একজন।’ 
তিনি যখন এহুদাকে রুটির একটা টুকরো দিলেন, তখন সে তা নিয়েই বাইরে চলে গেল। তার গমন পথের দিকে ক্ষণকাল তাকিয়ে ঈসা বললেন, ‘আমি যাদের বেঁছে নিয়েছি, তাদের তো আমি জানি। কিন্তু পাক কিতাবের একথা তো পূর্ণ হতেই হবে- 

‘আমার যে মিত্র আমার বিশ্বাসপাত্র ও আমার রুটি খায়,
 সে আমার বিরুদ্ধে পাদমূল উঠিয়েছে।’----------(যবুর-৪১:৯)

ঈসা বললেন, ‘সন্তানেরা আর অল্পসময় আমি তোমাদের সঙ্গে আছি। তোমরা আমাকে খুঁজবে কিন্তু আমি যেখানে যাচ্ছি তোমরা সেখানে আসতে পারবে না।’
শিমোন পিতর- ‘প্রভু’ আপনি কোথায় যাচ্ছেন?’
ঈসা- ‘আমি যেখানে যাচ্ছি তুমি এখন আমার সাথে সেখানে যেতে পারবে না, কিন্তু পরে যেতে পারবে।’
পিতর- ‘প্রভু’ কেন এখন আমরা আপনার সঙ্গে যেতে পারিনে? আপনার জন্যে আমি আমার প্রাণও দেব।’ 
এ কথা শুনে ঈসা তার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সত্যিই কি তুমি আমার জন্যে প্রাণ দেবে? অথচ আমি তোমাকে সত্য বলছি, আজ প্রত্যুষের আগেই যে পর্যন্ত না তুমি তিনবার আমাকে অস্বীকার কর, কোন মোরগ ডাকবে না।’ 
পিতর জোর দিয়ে বলল, ‘যদি আমাকে আপনার সাথে মরতেও হয়, তবুও আমি কোন মতেই আপনাকে অস্বীকার করব না।’ 

শিষ্যদের সকলে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল। ঈসা তখন তাদেরকে বললেন, ‘তোমাদের হৃদয় উদ্বিগ্ন না হোক; খোদাতে বিশ্বাস কর, আমাতেও বিশ্বাস কর। আমার পিতার বাড়ীতে অনেক বাসস্থান আছে, যদি না থাকত তোমাদেরকে বলতাম; কেননা আমি তোমাদের জন্যে স্থান প্রস্তুত করতে যাচ্ছি। আর আমি যখন যাই ও তোমাদের জন্যে স্থান প্রস্তুত করি, তখন পুন:রায় আসব এবং আমার নিকটে তোমাদেরকে নিয়ে যাব; যেন আমি যেখানে থাকি, তোমরাও সেখানে থাক। আর আমি যেখানে যাচ্ছি, তোমরা তার পথ জান।’

থোমা- ‘প্রভু, আপনি কোথায় যাচ্ছেন, তা আমরা জানিনে, পথ কিসে জানব?’
ঈসা- ‘আমিই পথ ও সত্য জীবন; আমা দিয়ে না এলে কেহ পিতার নিকটে আসে না। যদি তোমরা আমাকে জানতে, তবে আমার পিতাকেও জানতে; এখন অবধি তাঁকে জানছ ও দেখেছ।’ 
ফিলিপ- ‘প্রভু, পিতাকে আমাদের দেখান, তাই-ই আমাদের যথেষ্ট।’
ঈসা- ‘ফিলিপ, এতদিন আমি তোমাদের সঙ্গে সঙ্গে আছি, তথাপি তুমি আমাকে কি জান না? যে আমাকে দেখেছে, সে পিতাকে দেখেছে; তুমি কেমন করে বলছ, পিতাকে আমাদের দেখান? তুমি কি বিশ্বাস কর না যে, আমি পিতাতে আছি এবং পিতা আমাতে আছেন? আমি তোমাদেরকে যে সকল কথা বলি, তা আপনা হতে বলিনে; কিন্তু পিতা আমাতে থেকে আপনার কার্য্য সকল সাধন করেন। 

আমার কথায় বিশ্বাস কর যে, আমি পিতাতে আছি এবং পিতা আমাতে আছেন; আর না হয়, সেই সকল কার্য্য প্রযুক্তই বিশ্বাস কর; সত্যি, সত্যি, আমি তোমাদেরকে বলছি, যে আমাতে বিশ্বাস করে, আমি যে সকল কাজ করছি, সেও করবে, এমনকি এসব থেকেও বড় বড় কাজ করবে; কেননা আমি পিতার নিকটে যাচ্ছি; আর তোমরা আমার নামে যা কিছু যাঞ্ছা করবে, তা আমি সাধন করব, যেন পিতা পুত্রে মহিমান্বিত হন।’

‘তোমরা যদি আমাকে মহব্বত কর, তবে আমার সমস্ত হুকুম তোমরা পালন করবে। আমি পিতার কাছে চাইব। আর তিনি তোমাদের কাছে চিরকাল থাকবার জন্যে আর একজন সাহায্যকারী পাঠিয়ে দেবেন। 
আহমদ নামের সেই সাহায্যকারী, যাকে পিতা আমার নামে পাঠিয়ে দেবেন, তিনিই সমস্ত বিষয়ে তোমাদের শিক্ষা দেবেন, আর আমি তোমাদের যা কিছু বলেছি সেই সমস্ত তোমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেবেন। 
যদি তোমরা আমাকে প্রেম করতে, তবে আনন্দ করতে যে, আমি পিতার নিকটে যাচ্ছি; কারণ পিতা আমা অপেক্ষা মহান।’

ঈসা বললেন, ‘আমি প্রকৃত দ্রাক্ষালতা এবং আমার পিতা কৃষক। আমাতে স্থিত যে কোন শাখায় ফল না ধরে, তা তিনি কেটে ফেলে দেন এবং যে কোন শাখায় ফল ধরে, তা তিনি পরিস্কার করেন, যেন তাতে আরও অধিক ফল ধরে।
তোমরা যদি আমাতে থাক এবং আমার বাক্য যদি তোমাদিগেতে থাকে, তবে তোমাদের যা ইচ্ছে হয় যাঞ্ছা কোরও, তোমাদের জন্যে তা করা যাবে।

পিতা যেমন আমাকে ভালবেসেছেন, আমিও তেমনি তোমাদেরকে ভালবেসেছি; তোমরা আমার ভালবাসায় অবস্থিতি কর। তোমরা যদি আমার আজ্ঞাসমূহ পালন কর, তবে আমার ভালবাসায় অবস্থিতি করবে, যেমন আমিও আমার পিতার আজ্ঞাসমূহ পালন করেছি এবং তাঁর ভালবাসায় অবস্থিতি করছি। এই সব কথা তোমাদেরকে বলেছি, যেন আমার আনন্দ তোমাদের মধ্যে থাকে এবং তোমাদের আনন্দ সম্পূর্ণ হয়।

আমি তোমাদেরকে যা কিছু আজ্ঞা দিচ্ছি, তা যদি তোমরা পালন কর, তবে তোমরা আমার বন্ধু। আমি তোমাদেরকে আর দাস বলিনে, কেননা প্রভু কি করেন দাস তা জানে না; কিন্তু তোমাদেরকে আমি বন্ধু বলেছি, কারণ আমার পিতার নিকটে যা যা শুনেছি, সবই তোমাদেরকে জ্ঞাত করেছি। তোমরা যে আমাকে মনোনীত করেছ, এমন নয়, কিন্তু আমিই তোমাদেরকে মনোনীত করেছি; আর আমি তোমাদেরকে নিযুক্ত করেছি যেন তোমরা গিয়ে ফলবান হও এবং তোমাদের ফল যেন থাকে; যেন তোমরা আমার নামে পিতার কাছে যা কিছু যাঞ্ছা করবে, তা তিনি তোমাদেরকে দেন।

জগৎ যদি তোমাদেরকে ঘৃণা করে, তোমরা তো জান সে অগ্রে আমাকে ঘৃণা করেছে। তোমরা যদি জগতের হতে তবে জগৎ আপনার নিজস্ব ভালবাসত; কিন্তু তোমরা তো জগতের নও, বরং আমি তোমাদেরকে জগতের মধ্যে থেকে মনোনীত করেছি, এই জন্যে জগৎ তোমাদেরকে ঘৃণা করে।

লোকে যখন আমাকে তাড়না করেছে, তখন তোমাদেরকেও তাড়না করবে; তারা যদি আমার বাক্য পালন করত, তোমাদের বাক্যও পালন করত। কিন্তু তারা আমার নামের জন্যে তোমাদের প্রতি এই সমস্ত করবে, কারণ আমাকে যিনি পাঠিয়েছেন, তাকে তারা জানে না। আমি যদি না আসতাম ও তাদের কাছে কথা না বলতাম, তবে তাদের পাপ হত না; কিন্তু এখন তাদের পাপ ঢাকার উপায় নেই।

যে আমাকে ঘৃণা করে, সে আমার পিতাকেও ঘৃণা করে। যেরূপ কার্য্য আর কেউ কখনও করেনি, সেইরূপ কার্য্য যদি আমি তাদের মধ্যে না করতাম, তবে তাদের পাপ হত না; কিন্তু এখন তারা আমাকে ও আমার পিতাকে, উভয়কেই দেখেছে এবং ঘৃণা করেছে।

যাকে আমি পিতার নিকট হতে তোমাদের কাছে পাঠিয়ে দেব, সেই আহমদ যখন আসবেন-তিনি আমার বিষয়ে সাক্ষ্য দিবেন। আর তোমরাও স্বাক্ষী, কারণ তোমরা প্রথম হতে আমার সঙ্গে সঙ্গে আছ। 

তোমাদের হৃদয় দুঃখে পরিপূর্ণ হয়েছে। তথাপি আমি তোমাদের সত্য বলছি, আমার যাওয়া তোমাদের পক্ষে ভাল, কারণ আমি না গেলে সেই সাহায্যকারী তোমাদের কাছে আসবেন না। কিন্তু আমি যদি যাই, তবে তাকে তোমাদের কাছে পাঠিয়ে দেব। আর তিনি এসে পাপের সম্বন্ধে, ধার্ম্মিকতার সম্বন্ধে ও বিচারের সম্বন্ধে জগৎকে দোষী করবেন।’ 

তোমাদেরকে বলার আমার আরও অনেক কথা আছে, কিন্তু তোমরা এখন সেসকল সহ্য করতে পারবে না। পরন্তু আহমদ নামের সেই যে রসূল আসবেন, তিনি তোমাদের পথ দেখিয়ে পূর্ণ সত্যে নিয়ে যাবেন। তিনি নিজ হতে কোন কথা বলবেন না, কিন্তু যা কিছু শুনেন তাই-ই বলবেন, আর যা কিছু ঘটবে তাও তিনি তোমাদেরকে জানাবেন। তিনি আমারই মহিমা প্রকাশ করবেন।
অল্পকাল পরে তোমরা আর আমাকে দেখতে পাবে না এবং আবার অল্পকাল পরে আমাকে দেখতে পাবে।

সত্যি সত্যি আমি তোমাদেরকে বলছি, পিতার নিকটে যদি তোমরা কিছু যাঞ্ছা কর, তিনি আমার নামে তোমাদেরকে তা দেবেন।’
এই পর্যন্ত বলে ঈসা সকলকে বললেন, ‘এখন উঠো, আমরা এ স্থান থেকে প্রস্থান করি।’

নিজের নিয়মমত ঈসা জৈতুন পাহাড়ের দিকে যেতে থাকলেন। তার শিষ্যেরা তার পিছনে পিছনে চলছিল। সেখানে পৌঁছিলে পর শিষ্যরা তাকে বলল, ‘এখন আমরা জানি এবং বিশ্বাস করি যে আপনি আল্লাহ প্রেরিত রসূল।’
তিনি বললেন, ‘এখন বিশ্বাস করছ? দেখ, সেইসময় আসছে, এমনকি উপস্থিত হয়েছে। যখন তোমরা দল ছাড়া হয়ে প্রত্যেকে নিজ নিজ জায়গায় চলে যাবে এবং আমাকে একাকী পরিত্যাগ করবে। কারণ পাক কিতাবে আছে-

‘পালককে আঘাত কর,
 তাতে পালের মেষগুলি ছড়িয়ে পড়বে।’---------(সখরিয় ১৩:৭)

তবুও আমি একা নই, কারণ পিতা আমার সঙ্গে আছেন। আমি তোমাদের এই সমস্ত বললাম, যেন তোমরা আমার সাথে যুক্ত আছ মনে করে মনে শান্তি পাও। এই দুনিয়াতে তোমরা কষ্ট পাচ্ছ, কিন্তু সাহস হারিও না, আমি দুনিয়াকে জয় করেছি।’

পরে ঈসা শিষ্যদের সঙ্গে নিয়ে গেৎ-শিমোনী নামে একটা জায়গায় গেলেন। তারপর শিষ্যদেরকে বললেন, ‘আমি ঐখানে গিয়ে যতক্ষণ প্রার্থনা করি ততক্ষণ তোমরা এখানে বসে প্রার্থনা কর যেন পরীক্ষায় না পড়।’ 

ঈসা পিতর আর সিবদিয়ের দু’পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন। তার মন দুঃখে ও কষ্টে ভরে উঠতে লাগল। তিনি বললেন, ‘তোমরা এখানেই আমার সঙ্গে জেগে থাক।’ 

কিছুদূরে ঈসা মাটিতে হাঁটু গেঁড়ে উপুড় হয়ে পড়লেন। তারপর এই প্রার্থনা করলেন, ‘খোদা, যদি তুমি চাও, তবে এই দুঃখের পেয়ালা আমার কাছ থেকে সরিয়ে নাও। তবুও আমার ইচ্ছে মত নয়, তোমার ইচ্ছেমতই হোক।’ 
তিনি শিষ্যদের দিকে ফিরে দেখলেন, তারা দু‘জনই ঘুমিয়ে পড়েছে। তিনি পিতরকে ডেকে বললেন, ‘এ কি! আমার সঙ্গে এক ঘন্টাও কি তোমরা জেগে থাকতে পারলে না? জেগে থাক ও প্রার্থনা কর যেন পরীক্ষায় না পড়।’

ঈসা দ্বিতীয়বার প্রার্থনা করলেন, ‘পিতা আমার, আমি গ্রহণ না করলে যদি এই দুঃখের পেয়ালা দূর না হয়, তবে তোমার ইচ্ছেই পূর্ণ হোক।’
তিনি ফিরে দেখলেন তারা আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। তখন তিনি তাদেরকে ডাকলেন, ‘ওঠো, কেমন করে তোমরা ঘুমাচ্ছ?’ 
তার ডাকে সাড়া দিয়ে তারা লজ্জিত হয়ে পড়ল।

ঈসা তৃতীয়বার প্রার্থনা করলেন, ‘পিতা, তুমি যে কাজ আমাকে করতে দিয়েছ, তা শেষ করে এই দুনিয়াতে আমি তোমার মহিমা প্রকাশ করেছি। যে কালাম তুমি আমাকে দিয়েছ, তা আমি তাদেরকে দিয়েছি। তারা তা গ্রহণ করে জানতে পেরেছে যে, আমি তোমার কাছ থেকেই এসেছি, আর বিশ্বাসও করেছে যে, তুমিই আমাকে পাঠিয়েছ। 
--আমি দুনিয়ার জন্যে অনুরোধ করছিনে কিন্তু যাদের তুমি আমার হাতে দিয়েছ তাদের জন্যেই অনুরোধ করছি। কারণ তারা তো তোমারই। 

--আমি আর এই দুনিয়াতে নেই। কিন্তু তারা তো এই দুনিয়াতে আছে। আর আমি তো তোমার কাছে আসছি, পবিত্র পিতা, তুমি আমাকে তোমার যে নাম (মসীহ) দিয়েছ সেই নামের গুনে এদেরকে রক্ষা কোরও। আমি যতদিন তাদের সঙ্গে ছিলাম, ততদিন তোমার দেয়া নামের গুণে আমি তাদেরকে রক্ষা করে এসেছি। আমি তাদের পাহারা দিয়েছি, তাদের মধ্যে কেউই বিনষ্ট হয়নি, কেবল যে দোযখী ছিল তার কথা আলাদা।’ 

--এখন আমি তোমার কাছে আসছি, আর আমার আনন্দে যেন তাদের অন্তর পূর্ণ হয়। সেজন্যে দুনিয়াতে থাকতেই এই সমস্ত কথা বলছি। তোমার কালাম আমি তাদের দিয়েছি। দুনিয়া তাদের ঘৃণা করেছে। কারণ আমি যেমন এই দুনিয়ার নই, তারাও তো তেমনি এই দুনিয়ার নয়। আমি তোমাকে অনুরোধ করছিনে, তুমি এই দুনিয়া হতে তাদের নিয়ে যাও। বরং অনুরোধ করছি যে, শয়তানের হাত থেকে তাদেরকে রক্ষা কর। 

--সত্য দ্বারা তোমারই উদ্দেশ্যে তুমি তাদেরকে আলাদা করে রাখ। তোমার কালামই সেই সত্য। আমি যে কেবল এদের জন্যে অনুরোধ করছি তা-না, যারা এদের কথার মধ্যে দিয়ে তোমার উপর ঈমান আনবে, তাদের জন্যেও অনুরোধ করছি, যেন তারা সকলে এক হয়।
--আমাকে যেমন তুমি মহব্বত কর তেমনি তাদেরকেও মহব্বত কোরও। আমি তাদের কাছে তোমাকে প্রকাশ করেছি যেন তুমি আমকে যেভাবে মহব্বত কর, সেরকম মহব্বত তদের অন্তরে থাকে, আর আমি যেন তাদের সঙ্গে যুক্ত থাকি।’

ঈসার অন্তরের এই অভিব্যক্তি সম্পর্কে যবুরে আছে-

‘হে আমার প্রতিপালক, তোমার অভীষ্ট সাধনে আমি প্রীত,
আর তোমার শরীয়ত আমার অন্তরে আছে।
আমি মহাসমাজে ধর্মশীলতার মঙ্গলবার্তা প্রচার করেছি;
দেখ, আমার ওষ্ঠধর রূদ্ধ কোরও না; হে খোদা, তুমি এ জ্ঞাত আছ।

আমি তোমার ধর্মশীলতা নিজ হৃদয় মাঝে সঙ্গোপন করিনি,
তোমার বিশ্বস্ততা ও তোমার পরিত্রাণ প্রচার করেছি;
তোমার দয়া ও সত্য মহাসমাজ হতে গুপ্ত রাখিনি।
হে খোদা, তুমিও আমা হতে আপন করুণা রুদ্ধ কোরও না;
তব দয়া ও তব সত্য সতত আমাকে রক্ষা করুক।---------(যবুর ৪০:৮-১১)

তৃতীয়বার প্রার্থনা শেষে শিষ্যদের কাছে ফিরে এসে তিনি বললেন, ‘এখনও তোমরা ঘুমাচ্ছ আর বিশ্রাম করছ? উঠ, চল আমরা যাই। দেখ, সময় এসে পড়েছে।’

ঈসা তার শিষ্যদের সাথে কিদ্রোণ নামে একটা খালের অপর পারে এলেন। এখানে একটি বাগান আছে। তিনি শিষ্যসহ এই বাগানে এলেন। এই পরিচিত জায়গাটিতে তিনি প্রায়ই তার শিষ্যদের সঙ্গে মিলিত হতেন।
প্রধান ঈমামেরা ও ফরীশীরা এহুদাকে একদল সৈন্য এবং কয়েকজন কর্মচারী দিয়েছিল। এহুদা তাদের সঙ্গে বাতি, মশাল আর অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে কিদ্রোণ খালের অপর পারের ঐ বাগানে উপস্থিত হল। 
নিজের উপর যা ঘটবে ঈসা তার সমস্তই জানতেন। এ সম্পর্কে যবুরে আছে-

‘আমা হতে দূরে থেক না, 
সঙ্কট আসন্ন, সাহায্যকারী কেউ নেই।
অনেক বৃষ আমাকে বেষ্টন করেছে, 
বাশনের বলবান বলদেরা আমাকে ঘিরেছে।
তারা আমার প্রতি মুখ খুলে হা করে,
বিদারক সিংহ যেন গর্জ্জন করছে।’ -------------(যবুর ২২:১১-১৩)

লোকজন দেখে ধীর পদক্ষেপে তিনি এগিয়ে এলেন। এদিকে এহুদা সোজা তার কাছে এগিয়ে এসে বলল, ‘হুজুর, সালাম।’ 
সে ঈসাকে চুমু দিল। 

এহুদা তার সঙ্গের লোকদের পূর্বেই বলেছিল, ‘যাকে আমি চুমু দেব, সে-ই সেই লোক, তোমরা তাকেই পাকড়াও কোরও এবং পাহারা দিয়ে নিয়ে যেও।’
এহুদার সঙ্গীরা এগিয়ে এল। ঈসার চারপাশে থাকা শিষ্যরা বুঝতে পারল কি হতে যাচ্ছে। এসময় আগন্তুক লোকদের উদ্দেশ্যে ঈসা বললেন, ‘আপনারা কাকে খুঁজছেন?’ 
তারা বলল, ‘নাসারথের ঈসাকে।‘ 
ঈসা বললেন, ‘আমিই তিনি।’
তার কথা শুনে তারা কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। 

ঈসা আবারও তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনারা কাকে খুঁজছেন?’
তারা এবারও বলল, ‘নাসারথের ঈসাকে।‘ 
ঈসা বললেন, ‘আমি তো আপনাদেরকে বলেছি যে, আমিই তিনি। যদি আপনারা আমারই খোঁজে এসে থাকেন তবে এদেরকে (শিষ্যদের দেখিয়ে) চলে যেতে দিন।’

মল্ক। মহা ঈমামের এক গোলাম। সে এবং তার সঙ্গে আগত কয়েকজন সৈন্য ঈসার দিকে এগিয়ে এল। তাদের হাতে রয়েছে লাঠি, ছোরা। পিতর ঈসার এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার কাছে একটা ছোরা ছিল। সে তৎক্ষণাৎ তার ছোরাটি বের করে তার এক আঘাতে মহাঈমামের গোলামের ডান কানটা কেটে ফেলল। এতে ঈসা অসন্তুষ্ট হয়ে তাকে বললেন, ‘তোমার ছোরা খাপে রাখ। পিতা আমাকে যে দুঃখের পেয়ালা দিয়েছেন, তা-কি আমি গ্রহণ করব না?’
এরপর লোকদেরকে তিনি বললেন, ‘আমি কি ডাকাত যে, আপনারা ছোরা ও লাঠি নিয়ে এসেছেন?’ 

সৈন্যরা এগিয়ে এসে ঈসাকে জাপটে ধরল। এসময় শিষ্যেরা সকলে দৌঁড়ে পালিয়ে গেল। পিতর খালি গায়ে চাদর জড়িয়ে ঈসার পাশেই ছিল। লোকেরা যখন তাকে ধরল তখন সে চাদর ছেড়ে দিয়ে খালি গায়েই পালিয়ে গেল।

সৈন্যরা প্রথমে ঈসাকে বাঁধল। এরপর তারা তাকে হাননের কাছে নিয়ে গেল। এই হানন ছিল মহাঈমাম কাইফার শ্বশুর। হানন ঈসাকে মহাঈমাম কাইফার কাছে পাঠিয়ে দিল। সেখানে আলেমেগণ ও বৃদ্ধ ঈমামেরা একত্রিত হয়েছিল। পিতর দূরে থেকে ঈসার পিছনে পিছনে মহাঈমামের উঠোন পর্যন্ত গেল এবং শেষে কি হয় তা দেখার জন্যে অন্দরে প্রবেশ করল। খুব শীত পড়ছিল। কর্মচারীরা একপাশে কাঠকয়লার আগুন জ্বেলে বসে বসে আগুন পোহাচ্ছিল। অন্দরে প্রবেশ করে পিতর তাদের সঙ্গে আগুন পোহাতে লাগল। 

প্রধান ঈমামেরা এবং মহাসভার সকলে ঈসাকে মৃত্যুদন্ড প্রদানের জন্যে তার বিরুদ্ধে স্বাক্ষ্যের খোঁজ করছিল। অনেকেই সাক্ষ্য দিয়েছিল কিন্তু তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া যেতে পারে এমন কোন সাক্ষ্যই মিলল না। 

ঈসা বাঁধা অবস্থায় চুপ করে বসেছিলেন, আর সবই তিনি শুনছিলেন ও দেখছিলেন। এই অবুঝ, নির্বোধ লোকদের মুক্তির জন্যে তিনি বসে বসে মনেপ্রাণে তখন খোদার কাছে প্রার্থনা করছিলেন। 

মহাঈমাম সকলের সামনে দাঁড়িয়ে ঈসাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি কোন উত্তরই দেবে না? তোমার বিরুদ্ধে এই লোকেরা এই সমস্ত কি সাক্ষ্য দিচ্ছে?’
ঈসা কিন্তু উত্তর না দিয়ে চুপ করেই রইলেন।

মহাঈমাম আবার তাকে বলল, ‘আমি তোমাকে খোদার কসম দিয়ে বলছি, তুমি আমাদের বল যে, তুমি সেই মসীহ কিনা?’ 
ঈসা বললেন, ‘আমি যদি বলি তবুও আপনারা কোনমতেই ঈমান আনবেন না এবং আপনাদের কিছু জিজ্ঞেস করলেও উত্তর দেবেন না।’ -প্রধান ঈমামের দিকে ফিরে তিনি বললেন, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন, আমিই মসীহ। তবে আমি আপনাদের এটাও বলছি, এরপর মসীহ খোদার ডান পাশে বসবেন- আর পরে আপনারা তাকে আসমানের মেঘে ভেসে আসতে দেখবেন।’

এসময় মহাঈমাম তার কাপড় ছিঁড়ে বলল, ‘এ কুফরী করল! আমাদের আর স্বাক্ষীর কি দরকার? (জনতার উদ্দেশ্যে) এখনই তো আপনারা শুনলেন সে কুফরী করল। আপনারা কি মনে করেন?’ 
তারা উত্তর দিল, ‘এ মৃত্যুর উপযুক্ত।’ 

এসময় কয়েকজন এগিয়ে এসে ঈসার গায়ে থুথু দিল। তারপর তাকে অপমানের চরম করল। কয়েকজন কাপড় দিয়ে তার মুখ ঢেকে ফেলল, তারপর পালাক্রমে তাকে ঘুসি মেরে বলতে লাগল, ‘এই মসীহ, বলত দেখি, কে তোকে মারল?’ 
সবশেষে পাহারাদাররা তাকে চাবুক দিয়ে পেটাতে লাগল। এসম্পর্কে নবী ই‘শাইয়ার কিতাব পূর্বেই জানিয়েছিল-

‘প্রভু খোদা আমার কর্ণ খুলেছেন,
অমি বিরুদ্ধাচারী হইনি।
আমি প্রহারকদের প্রতি আপন পৃষ্ঠ,
যারা দাঁড়ি উপড়েছে,
তাদের প্রতি আপন গাল পেতে দিলাম।
অপমান ও থু থু হতে
আপন মুখ আচ্ছাদন করলাম না।
কারণ, প্রভু খোদা আমাকে সাহায্য করবেন,
তাই আমি বিহবল হইনি।
তাইতো চকমকি পাথরের ন্যায়
আপন মুখ স্থাপন করেছি, 
আমি জানি যে আমি লজ্জিত হব না।
যিনি আমাকে ধার্মিক করেন, তিনি নিকটবর্ত্তী;
কে আমার সাথে বিবাদ করবে?’-------------(ই‘শাইয়া ৫০:৫-৮) 

পিতর নীচে উঠোনে বসে সবকিছু দেখছিল। দুঃখে তার অন্তরটা ফেঁটে যাচ্ছিল। এসময় মহাঈমামের একজন চাকরানী সেখানে এল। সে তাকে আগুন পোহাতে দেখল এবং ভালকরে তার দিকে তাকিয়ে দেখে বলল, ‘আপনিও তো ঐ নাসারতের ঈসার সঙ্গে ছিলেন।’ 
পিতর তার কথা অস্বীকার করে বলল, ‘তুমি কি বলছ তা আমি জানিওনে, বুঝিওনে।’ 

পিতর উঠে বাইরে দরজার কাছে চলে গেল। চাকরানীটি আবার তাকে সেখানে দেখে যারা সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল তাদেরকে বলল, ‘এই লোকটা ওদেরই একজন।’ 
পিতর আবার অস্বীকার করল। 
কিছুক্ষণ পরে যারা কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছিল তাদের মধ্যে থেকে একজন বলল, ‘নিশ্চয় তুমি ওদের একজন, কারণ তুমিও তো গালীলের লোক।’
পিতর নিজেকে মনে মনে অভিশাপ দিল এবং কসম খেয়ে বলল, ‘তোমরা যার সম্বন্ধে বলছ, তাকে আমি চিনিনে।’ 

তার কথা শেষ হতে না হতেই একটা মোরগ ডেকে উঠল। তখনই ঈসা মুখ ফিরিয়ে পিতরের দিকে চাইলেন। পিতরও চাইল, এতে যে কথা ঈসা তাকে বলেছিলেন তা তার মনে পড়ে গেল, ‘আজ মোরগ ডাকবার আগেই তুমি তিনবার আমাকে অস্বীকার করবে।’ 
পিতর ধীরে ধীরে অন্দর থেকে বাইরে বেরিয়ে এল, তারপর কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।

প্রধান ঈমামেরা খুব সকালে বৃদ্ধ নেতাদের, আলেমদের ও মহাসভার সমস্ত লোকদের সঙ্গে পরামর্শ করল। এরপর তারা ঈসাকে কাইফার কাছ থেকে রোমীয় প্রধান শাসনকর্তা পীলাতের প্রাসাদে নিয়ে গেল। তারা কিন্তু সেই প্রাসাদে প্রবেশ করল না, এই কারণে, যেন পাক পবিত্র থেকে ঈদুল ফেসাখের ভোজ খেতে পারে। 

পীলাত বাইরে তাদের কাছে এসে বললেন, ‘একে আপনারা কি দোষে দোষী করছেন?’ 
নেতারা - ‘এ যদি খারাপ কাজ না করত তবে আমরা তাকে আপনার কাছে আনতাম না।’ 
পীলাত- ‘তাকে আপনারা আপনাদের শরীয়ত মত বিচার করুন।’ 
নেতারা - ‘কিন্তু কাউকে মৃত্যুদন্ড দেবার ক্ষমতা তো আমাদের হাতে নেই।’

পীলাত আবার প্রাসাদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেন এবং ঈসাকে বললেন, ‘তুমিই কি ইস্রায়েলীদের রাজা?’ 
ঈসা- ‘আপনি কি নিজ হতেই এ কথা বলছেন, না অন্যেরা আমার বিষয়ে আপনাকে বলেছে?’ 
পীলাত- ‘আমি কি ইস্রায়েলী? তোমার জাতির লোকেরা আর প্রধান ঈমামেরা তোমাকে আমার হাতে দিয়েছে। এখন বল, তুমি কি করেছ?’ 
ঈসা- ‘আমার রাজ্য এই দুনিয়ায় না।’ 
পীলাত- ‘তাহলে তুমি কি রাজা?’ 
ঈসা- ‘সত্যের পক্ষে সাক্ষ্য দেবার জন্যে আমি দুনিয়ায় এসেছি। যে কেউ সত্যের পক্ষে সে আমার কথা শুনে।’
পীলাত- ‘সত্য কি?’-এ কথা বলে তিনি আবার বাইরে ইস্রায়েলী নেতাদের কাছে গিয়ে বললেন, ‘আমি ওর কোন দোষ দেখতে পাচ্ছিনে। তবে তোমাদের একটা নিয়ম আছে, ঈদুল ফেসাখের সময়ে আমি তোমাদের একজন কয়েদীকে মুক্তি দেই। তোমরা কি চাও যে, আমি একে মুক্তি দেই? নাকি বারাব্বাকে?’ -এই বারাব্বা বিদ্রোহের সময় একজনকে খুন করেছিল। 
‘এই দু‘জনের মধ্যে আমি কাকে ছেড়ে দেব?’ -পীলাত জানতেন ইস্রায়েলী নেতারা প্রতিহিংসার বশে তাকে ধরিয়ে দিয়েছেন।

প্রধান ঈমাম ও বৃদ্ধনেতারা লোকদের উসকিয়ে দিল, যেন তারা বারাব্বাকে চেয়ে নেয় আর ঈসাকে হত্যা করার কথা বলে। তখন সকলে চেঁচিয়ে বলল, ‘ওকে না, বারাব্বাকে। ও মৃত্যুর উপযুক্ত।’

তখন পীলাত ঈসাকে নিয়ে গিয়ে চাবুক মারার হুকুম দিলেন। সৈন্যেরা কাঁটা লতা দিয়ে একটা মুকুট  তৈরী করে ঈসার মাথায় পরিয়ে দিল। পরে তাকে বেগুনী রঙের কাপড় পরাল। এরপর তাকে বলতে লাগল, ‘ইস্রায়েলরাজ, মারহাবা।’ 
তাকে তারা চাবুক মারতে শুরু করল। 
এসময় খোদার উদ্দেশ্যে ঈসা প্রার্থণা করলেন, ‘হে খোদা, এদের ক্ষমা কোরও, কারণ এরা কি করছে না করছে তা জানে না।’
পীলাত আবার বাইরে এসে লোকদেরকে বললেন, ‘দেখ, আমি ওকে তোমাদের কাছে বের করে আনছি, যেন তোমরা বুঝতে পার আমি ওর কোন দোষ খুঁজে পাচ্ছিনে।’ 

ঈসাকে সেই কাঁটার মুকুট আর বেগুনী রঙের কাপড় পরা অবস্থায় বাইরে নিয়ে আসা হল। তখন পীলাত লোকদেরকে বললেন, ‘এই দেখ, সেই লোক।’
ঈসাকে দেখে প্রধান ঈমাম আর কর্মচারীরা চেঁচিয়ে বলল, ‘ক্রুসে দিন, ওকে ক্রুসে দিন।’ 
পীলাত বললেন, ‘তোমরাই ওকে নিয়ে গিয়ে ক্রুসে দাও, কারণ আমি ওর কোন দোষই দেখতে পাচ্ছিনে।’ 
ইস্রায়েলী নেতারা বলল, ‘মৃত্যুই তার জন্যে উত্তম, কারণ সে নিজেকে খোদার পুত্র বলে পরিচয় দিচ্ছে।’

পীলাত একথা শুনে ভয় পেলেন। তিনি আবার গিয়ে ঈসাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কোত্থেকে এসেছ?’
ঈসা কোন উত্তর দিলেন না। পীলাত বললেন, ‘তুমি কি আমার সঙ্গে কথা বলবে না? তুমি কি জান না যে, তোমাকে ছেড়ে দেবার বা ক্রুসে দেবার ক্ষমতা আমার আছে?’
ঈসা বললেন, ‘উপর থেকে আপনাকে ক্ষমতা দেয়া না হলে আমার উপর আপনার কোন ক্ষমতাই থাকত না।’ 

পীলাত ঈসাকে ছেড়ে দিতে চাইলেন। এতে ইস্রায়েলী নেতারা চেঁচিয়ে বলতে লাগল, ‘আপনি যদি এই লোকটাকে ছেড়ে দিন, তবে আপনি সম্রাট কৈসরের বন্ধু নন। সে নিজেকে রাজা বলে দাবী করেছে। আর যে কেউ নিজেকে রাজা বলে দাবী করে সে তো সম্রাট কৈসরের শত্রু।’

এই অভিযোগ শুনে পীলাত ঈসাকে নিয়ে ‘পাথরে বাঁধান’ নামে একটা জায়গায় ঈদুল ফেসাখের আয়োজনের দিন দুপুর বেলায় বিচারের আসনে বসলেন। ইব্রাণী ভাষায় এই জায়গাটিকে ‘গলগথা’ বলা হত।
পীলাত ইস্রায়েলী নেতাদের বললেন, ‘এই দেখ তোমাদের রাজা।’ 
এসময় তারা চিৎকার করে বলল, ‘দূর করুন, দূর করুন, ওকে ক্রুসে দিন।’ 
পীলাত- ‘তোমাদের রাজাকে কি আমি ক্রুসে দেব?’ 
ঈমামগণ- ‘সম্রাট কৈসর ছাড়া আমাদের আর কোন রাজা নেই।’

পীলাত যখন দেখলেন তিনি কিছুই করতে পারছেন না বরং গোলমাল আরও বাড়ছে, তখন তিনি পানি নিয়ে লোকদের সামনে হাত ধুয়ে বললেন, ‘এই লোকের রক্তের জন্যে আমি দায়ী নই, তোমরাই তা বুঝবে।’ 
লোকেরা বলল, ‘আমরা এবং আমাদের সন্তানেরা ওর রক্তের দায় বহন করবে।’ 
তখন পীলাত ক্রুসের উপর হত্যা করার জন্যে ঈসাকে তাদের হাতে দিয়ে দিলেন আর বারাব্বাকে মুক্তি দিলেন। 

ঈসার সাথে ক্রুসে দেবার জন্যে আরও দু‘জনকে সৈন্যদের হাতে দেয়া হয়েছিল। এভাবে কিতাবের এ কথা পূর্ণ হল-

‘তাকে পাপীদের সঙ্গে গোনা হল।’ -----------(ই‘শাইয়া ৫৩:৯)

সমাপ্ত।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন