pytheya.blogspot.com Webutation

১৯ নভেম্বর, ২০১২

Id-ul Hanukkah: ঈদুল হানাকার পটভূমি।



আলেকজান্ডার যখন মৃত্যুবরণ করেছিলেন তখন তার উত্তরাধিকারী হওয়ার মত এমন কোন যোগ্য ব্যক্তি ছিল না যে তার বিজিত বিশাল সাম্রাজ্য একত্রে ধরে রাখতে পারে। তাই তার মৃত্যুর পর তাকে সমাধিস্থ করার পূর্বেই তার সেনাপতিদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়ে যায়। তার বিজিত সাম্রাজ্য অত:পর তার চারজন সেনাপতির মধ্যে ভাগ হয়ে গেল। এই সেনাপতিরা হলেন টলেমি, লাইসিয়াস, কাসেন্ডার এবং সেলুকাস। আর এই বিভাগগুলি ছিল পশ্চিমাঞ্চল অথবা গ্রীস, উত্তরাঞ্চল অথবা আর্মেনিয়া, পূর্বাঞ্চল অথবা সিরিয়া এবং দক্ষিণাঞ্চল বা মিসর। সেলুকাসের শাসনাধীনে সিরিয়া বা পূর্বাঞ্চলের অংশে পড়েছিল পাঞ্জাব, সিন্ধু, পারস্য ও প্যালেষ্টাইনের উত্তরাঞ্চল। টলেমীর শাসনাধীন দক্ষিণাঞ্চল বা মিসরীয় ভাগের অন্তর্ভূক্ত ছিল প্যালেস্টাইনের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চল। বস্তুতঃ প্যালেস্টাইন সেলুকাস এবং টলেমি এই দু’শক্তির মাঝে পড়েছিল।
 
সেলুকাস তার রাজ্যে গ্রীসের অনুরূপ নগর রাষ্ট্র গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়েছিলেন যার অন্যতম ছিল দজলা বা টাইগ্রিসে অবস্থিত সেলেওসিয়া। এখানে তিনি পশ্চিমা দেবদেবীদের মূর্ত্তি স্থাপন করেছিলেন এবং পশ্চিমা শিল্পকলা ও চিন্তাধারার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন।

আলেকজান্ডারের রাজ্য বিভাগের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই প্যালেস্টাইন মিসরের অধীনস্থ হয়। শাসক হিসেবে টলেমিসোটার প্রথম থেকেই ইহুদিদের প্রতি অত্যন্ত দুর্ব্যাবহার করেছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি ইহুদিদের উত্তম গুণগুলি স্বীকার করেন এবং সুবিবেচনা পূর্বক তাদের সঙ্গে ব্যাবহার করেন। বেশকিছু সংখ্যক ইহুদিদের উচ্চপদ প্রদান করা হয়েছিল। 

সেলুকাসসোটারের উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন ফিলাডেলফাস। তিনিও তাদের প্রতি সহৃদয় মনোভাব দেখিয়ে ছিলেন। এছাড়াও তিনি আলেকজান্দ্রিয়া নগরে সুবিখ্যাত লাইব্রেরী স্থাপন করেছিলেন। যা কয়েক শতাব্দী ধরে ভূ-মধ্য সাগরীয় অঞ্চলে সংস্কৃতি এবং শিক্ষার কেন্দ্রস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। খ্রীষ্ট পরবর্তী ৭ম শতকে এটি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। এসময়ই এখানে বিখ্যাত সেপ্টুয়াজিন্ট (হিব্রু থেকে গ্রীক ভাষায় বাইবেলের অনুবাদ) প্রস্তত হয়।

৩২৩ খ্রীঃপূঃ টলেমী যদিও প্যালেস্টাইন নিয়ন্ত্রণাধীনে আনতে সক্ষম হলেন, কিন্তু এই নিয়ন্ত্রণ কখনও সম্পূর্ণভাবে সংরক্ষিত হয়নি। সেলুসাইডীয়রা এবং টলেমীয়রা প্রায়ই পরম্পর পরস্পরের সাথে যুদ্ধ-বিগ্রহে রত থাকত।

আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পরবর্তী পঁচিশ বৎসরের মধ্যে জেরুজালেম সাতবার হস্ত বদল হয়েছে এবং এক‘শ পঁচিশ বৎসর ধরে প্যালেষ্টাইন টলেমীয়দের নামমাত্র নিয়ন্ত্রণ থাকাকালীন অবস্থায় বহুবার যুদ্ধ-বিগ্রহ হয়েছে। পরিশেষে ১৯৮ খ্রীঃপূঃ ব্যানিয়াসের যুদ্ধে টলেমীয়রা পরাজিত হলে সেলুসাইডীয়রা সূদীর্ঘ কালের জন্যে এই ছোট্ট দেশটি দখল করল। ইহুদিরা পুনঃরায় আরেক বিজয়ী জাতির অধীনস্ত হল।

১৯৮ খ্রীঃপূঃ টলেমীয়দের কাছ থেকে যখন প্যালেষ্টাইনের নিয়ন্ত্রণভার হস্তান্তর হয় তখন সেলুসাইডীয় রাজ্যের শাসক ছিলেন ৩য় এন্টিওকাস। ইহুদিদের প্রতি তার আচরণ কর্কশ ছিল না। তিনি টলেমীদের হাত থেকে মিসরও দখল করতে চেষ্টা করেন কিন্তু তাতে ব্যর্থ হন। ৪র্থ সেলুকাস ১৮৭ খ্রীঃপূঃ সিংহাসনে বসেন এবং ১৭৬ খ্রীঃপূঃ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। অতঃপর এন্টিওকাস এপিফ্যানিস ৪র্থ সেলুকাসের উত্তরাধিকারী হিসেবে সিংহাসনে বসার পর ইহুদিদের প্রতি কঠোর আচরণ করতে লাগলেন।

হানাকায় ব্যবহৃত বিভিন্ন মিনোরাত।
৪র্থ এন্টিওকাস এপিফ্যানিস (Antiochus IV Epiphanes), -বুদ্ধিমান ও এপিম্যানিস -স্থূলবুদ্ধি সম্সন্ন নামে পরিচিত ছিলেন। ক্ষমতাসীন হওয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যে তিনি জেরুজালেমে মহাধর্মীয়গুরু হিসেবে একজনকে নিয়োগ দিলেন। কিন্তু ইহুদিরা তাকে গ্রহণ করল না। ফলে এপিফ্যানিস অপর আর একজনকে মনোনয়ন দিলেন। কিন্তু ইহুদিরা তাকেও গ্রহণ করল না। একই ঘটনায় পুনঃরাবৃত্তিতে সম্রাট এবং প্রজাদের মধ্যে অসন্তোষজনক সম্সর্কের সৃষ্টি হল। এসময় ১৬৯ খ্রীঃপূঃ এন্টিওকাস মিসরে একটি সমরাভিযানে গেলেন। খবর এল যে তিনি এই অভিযানে নিহত হয়েছেন। ইহুদিরা তার মৃত্যুতে উৎসবে মেতে উঠল। অতঃপর জানা গেল যে খবরটা ছিল নিতান্তই ভিত্তিহীন। 
জেরুজালেমে ফিরে এসে এন্টিওকাস প্রতিশোধস্বরূপ ইস্রায়েলীদের উপর অত্যাচার করলেন এবং উপাসনালয় লুট করলেন। ফলে তিক্ততা আরও বৃদ্ধি পেল।

এন্টিওকাস ইহুদিদের উপর সাংঘাতিক দমননীতি চালাতে লাগলেন। গ্রীক মতবাদ গ্রহণে তাদেরকে বাধ্য করতে চেষ্টা করলেন। গোঁড়া ইহুদিদের যারা এই মতবাদ গ্রহণ করল না তাদেরকে কারারুদ্ধ করা হল, চল্লিশ হাজারের মত হত্যা করা হল এবং প্রায় সমসংখ্যকদের ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হল। এরপরও তিনি সিনাগগগুলিতে গুপ্তচর নিয়োগ করেছিলেন যেখানে ইহুদিরা বিশ্রামবারে মিলিত হত। 

এন্টিওকাস একেশ্বরবাদ ধ্বংস করার জন্যে বদ্ধপরিকর হয়েছিলেন। পূর্বেই এবাদতখানা লুন্ঠন করা হয়েছিল এবং এখন সর্বপ্রকার উৎসবাদি নিষিদ্ধ করা হল। আদেশ করা হল যেন তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাত পাঠ না করে, বিশ্রামবার পালন না করে অথবা ত্বকচ্ছেদ প্রথা পালন না করে। দু‘জন মহিলা তার আদেশ অমান্য করে তাদের পুত্রদের ত্বকচ্ছেদ করল। যখন এই সংবাদ সম্রাটের জানতে পারলেন তখন তাদের দু‘জনকে পুত্রদেরসহ গলায় দড়ি বেঁধে নগরীর রাস্তায় প্রদক্ষিণ করান হল। অতঃপর জনসম্মুখে নগর দেয়ালের উচ্চতম স্থান থেকে নীচে ছুঁড়ে ফেলে হত্যা করা হল।

 সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ইহুদা ম্যাক্কাবিয়াস।
মূসার শরীয়তের প্রতি এন্টিওকাস তার অবজ্ঞা প্রকাশ করার জন্যে, পশু উৎসর্গের বেদীতে একটি শুকর উৎসর্গ করলেন এবং তার মাংস রান্না করে এবাদতখানার সর্বত্র ছড়িয়ে দিলেন। অতঃপর তিনি এবাদতখানার প্রাঙ্গনে গ্রীক দেবতা জিউসের মূর্ত্তি স্থাপন করলেন। শরীয়তের প্রতি এই সমস্ত অসদাচারণগুলির বিরুদ্ধে প্রথম প্রথম প্রতিরোধ তেমন জোরালো ছিল না। কিন্তু ক্রমাগত আঘাতে তাদের প্রতিরোধ অগ্নিশিখার মত প্রজ্জ্বলিত হল।

নির্যাতনের এই অন্ধকারাচ্ছন্ন দিনগুলিতে, এন্টিওকাসের একজন প্রতিনিধি জেরুজালেমের এক ছোট্ট শহর মডেইনে এল, সম্রাট বা সম্রাটের দেবতাদের প্রতি প্রজাদের বাধ্যতা পরীক্ষার জন্যে। সে জিউসের একটি বেদী নির্মাণ করল এবং নেতৃস্থানীয় নাগরিক হিসেবে মত্তথিয়াস (Mattityahu) এবং তার পুত্রদের এই দেবতার পদতলে পশু উৎসর্গ করতে আদেশ করল। এজন্যে সে বিরাট পুরস্কার এবং সম্রাটের আনুকূল্য লাভের বিষয়ও ঘোষণা করল। 

বৃদ্ধ ধার্মিক মত্তথিয়াস বিজাতীয় এই দেবতার পদতলে পশু উৎসর্গ করতে অস্বীকার করল। তখন পুরস্কারের লোভে উপস্থিত একজন যুবক এই আদেশ পালন করতে অগ্রসর হলে মত্তথিয়াস তার ক্রোধ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে তৎক্ষণাৎ যুবককে এবং সম্রাটের প্রতিনিধিকে হত্যা করল। অতঃপর সে এন্টিওকাসের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষণা করল এবং একক সৃষ্টিকর্তার উপাসনাকারী সকলকে তারপক্ষ অবলম্বণ করতে আহবান জানাল। 
মত্তথিয়াস পরিণতি সম্সর্কে অবগত ছিল। সুতরাং সে পরিবারসহ পার্বত্য অঞ্চলে আত্মগোপন করল। 

মত্তথিয়াস পরিবারটিকে এ্যাসমনীয় বলা হত। এই উপাধি এসেছে এ্যাসনিয়াস থেকে, যে তাদের একজন পিতৃপুরুষ ছিল। পরবর্তীতে এই বংশটি ম্যাক্কাবীয় বংশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। 
মত্তথিয়াসের এই সাহসী পদক্ষেপের দরুন অনেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তার দলে যোগ দিল। ক্রমে ক্রমে সে একটি সুসংবদ্ধ সেনাদল গঠন করল এবং তার নেতৃত্বভার দিল সুযোগ্য পুত্র ইহুদার উপর। ইহুদা ম্যাক্কাবিয়াস ছিল প্রচন্ড উদ্যমী এবং সাহসী। পরবর্তীকালে সে অসাধারণ নেতৃত্বগুণ সম্পন্ন সমরনায়ক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করে।

ঈদুল হানাকা।
ইহদার বিদ্রোহ দমন করার জন্যে সম্রাট প্রথমে অপোলনিয়াসের নেতৃত্বে এক সেনাবাহিনী প্রেরণ করেছিলেন। শমরিয়ার কাছে এই সেনাদল ছাউনি ফেলল। ইহুদা অতর্কিত আক্রমণে গ্রীক বাহিনীর রসদ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন করে দিল। এতে অপোলনিয়াসের নেতৃত্বে সিরীয় বাহিনী ফিরে গেল। ইহুদা প্রচুর রসদ এবং যুদ্ধাস্ত্র এই যুদ্ধে লাভ করেছিল। 

পরবর্তীতে সেরনের নেতৃত্বে আর একটি বৃহৎ সিরীয় সেনাদল বৈৎ-হারোনের উপত্যকার মধ্যে দিয়ে জেরুজালেমের দিকে অগ্রসর হয়েছিল। কিন্তু ইহুদা তাদেরকে কৌশলে ফাঁদে ফেলে বিতাড়িত করেছিল। আবারও অনেক লুন্ঠন-দ্রব্য লাভ হল। পরবর্তীতে তিনজন সেনাপতির পঞ্চাশ হাজার সৈন্যর সম্মিলিত বাহিনী ইহুদাকে আক্রমণ করল। ইহুদা মাত্র ছয় হাজার সৈন্য নিয়ে তাদের লন্ডভন্ড করে দিল।

৪র্থবার সেনাপতি লাইসিয়াস ষাট হাজার সৈন্য নিয়ে আক্রমণে এল। হিব্রোণের উত্তরে ইহুদার নেতৃত্বাধীন ইস্রায়েলী যোদ্ধারা তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত করেছিল। এই পরাজয়ের পর দু’তিন বৎসর সিরিয় সৈন্যরা আর আক্রমণে এল না। এসময় (১৬৪ খ্রীঃপূঃ) ইহুদা ম্যাক্কাবিয়াস (Judas Maccabeus) সৈন্যদলসহ জেরুজালেমে প্রবেশ করলেন এবং এবাদতখানা থেকে সমস্ত বিজাতীয় দেবদেবীর মূর্ত্তি ও বেদী অপসারণ করে খোদার উদ্দেশ্যে পশু উৎসর্গের জন্যে নতুন বেদী স্থাপন ও এবাদতখানাটি মেরামত করল। ২৫শে ডিসেম্বর ১৬৫ খ্রীঃপূঃ এবাদতখানাটি এক খোদার উপাসনার জন্যে উৎসর্গ করা হল।

নূতন এই বেদীটি খোদার উদ্দেশ্যে উৎসর্গের দিনটিকে স্মরণ করে আট দিন ধরে এই ঈদুল হানাকা (Id-ul Hanukkahইব্রাণী হানাকা শব্দের অর্থ উৎসর্গ) উৎসবটি পালন করা হয়।
Happy Hanukkah!

সমাপ্ত।
ছবি: Wikipedia, kingjamesbibleonline

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন