pytheya.blogspot.com Webutation

১২ নভেম্বর, ২০১২

Purim: ইহুদিদের মধ্য মার্চ উৎসব পুরীম উপাখ্যান।



সম্রাট অহশ্বেরশ (Ahasuerus) তার রাজপ্রাসাদে রাজ্যের উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে একটি বিরাট ভোজের আয়োজন করলেন। ঐ ভোজসভায় রানী যোগদান করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করল। কেননা, রানীর জন্যে যে পোষাক নির্বাচন করা হয়েছিল, তা রানীর কাছে অশালীন বলে বিবেচিত হয়েছিল। ফলে সম্রাট রানীকে তার পদ থেকে পদচ্যুত করলেন। 

রানী ইষ্টের 
অতঃপর সম্রাট তার নূতন রানীর মনোনয়নে রাজ্যের সকল সুন্দরী কুমারী কন্যাদেরকে একত্রিত করতে আদেশ জারি করলেন। আর জাকজমকপূর্ণ এক অনুষ্ঠানে ঐ রাজ্ঞী পদপ্রার্থী সকল সুন্দরীদের মধ্য থেকে ইষ্টের (Esther) মনোনীত হল। কেননা এই অনিন্দ্য সুন্দরী কুমারী কন্যার দিকেই সম্রাট তার স্বর্ণদন্ড প্রসারিত করে দিয়েছিলেন।

এই ইষ্টের ছিল শুশনের মর্দখয় (Mordechai) নামক এক ইহুদির পালিত কন্যা। মর্দখয়ের কোন সন্তান না থাকায় সে তার ভ্রাতার কন্যা ইস্টেরকে নিজ কন্যা জ্ঞানে লালন-পালন করেছিল।

এদিকে ইষ্টের রানী মনোনীত হওয়ার ফলে ইহুদি মর্দখয়ের প্রভাব বেড়ে গেল এবং সে শীঘ্রই তার উপযুক্ততা এবং সতর্কতা প্রমাণও করল। 

সম্রাটের নপূংসকগণ সম্রাটকে হত্যা করার এক হীন ষড়যন্ত্র করল। আর মর্দখয় শার্লক হোমসের ভূমিকায় নেমে এই ষড়যন্ত্রের বিষয় আবিস্কার করে ফেলল। সে অনতি বিলম্বে সম্রাটকে তা অবহিত করল। সম্রাট দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করাতে ষড়যন্ত্রকারীরা গ্রেফতার হল। অতঃপর দ্রুত বিচারে তাদেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকরী করাও হল। রাজদরবারের ইতিহাস পুস্তকে এই ঘটনার বিবরণ যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে নথিবদ্ধ হল। পরবর্তীতে এ ঘটনা সম্রাটের অবশ্য আর স্মরণে রইল না।

সম্রাট অহশ্বেরশকে পরামর্শ দিচ্ছে হামান।
মর্দখয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল হামান (Haman) নামক এক ব্যক্তি। সে ছিল ধূর্ত, খুবই উচ্চাভিলাষী। শীঘ্রই সে সম্রাটের অনুগ্রহে দ্রুত পদোন্নতি লাভ করে একটি উচ্চপদে আসীন হল। এই পদ লাভের পর মর্দখয় ব্যতিত সকলেই তাকে শুভেচ্ছা জানাল। মর্দখয় হামানকে সম্মান না জানানোতে সে ভীষণ রেগে গেল এবং তাকে চিরশত্রু জ্ঞানে প্রতিশোধ নেবার সুযোগ খুঁজতে লাগল। সে জানতে পারল মর্দখয় একজন ইহুদি। তখন তার রাগ আর ক্ষোভ সমগ্র ইহুদি জাতির উপর গিয়ে পড়ল। সে রাজ্যের সমস্ত ইহুদিদের ধ্বংস করার এক অসৎ পরিকল্পণা করল। 

হামান একদিন সম্রাটকে বলল- ‘ইহুদিরা এদেশে এসেছিল শুণ্য হাতে। এখানে এসে অবৈধ ভাবে এদেশের জনগনকে শোষণ করে এখন তারা বিপুল বিত্ত বৈভবের অধিকারী। সংখ্যায় বলিয়ান এ জাতি এখন রাজ্যের জন্যেও অত্যন্ত বিপদজনক। সুতরাং দেশ এবং জনস্বার্থে সত্ত্বর তাদেরকে নির্মূল এবং তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা একান্ত প্রয়োজন।’

এই দ্বিমুখী প্রস্তাব অহশ্বেরশের দৃষ্টিতে শুধুমাত্র কথিত শত্রুদের হাত থেকে নিরাপত্তা লাভই নয়, প্রচুর ধন-সম্পত্তি লাভের বিষয় বলেও মনে হল। তাই দেরী না করে তিনি হামানের প্রস্তাবিত আদেশে অনুমোদন দিয়ে দিলেন। 
এভাবে হামান ইহুদিদের হত্যা, কিম্বা তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আইনগত কর্তৃত্ব লাভ করল। 

মর্দখয় রানী ইষ্টেরের সঙ্গে পরামর্শ করছেন।
মর্দখয় গভীর উদ্বেগের সঙ্গে এ বিষয়টি নিয়ে ইষ্টেরের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করল। সে ইষ্টেরকে বলেছিল যে, যদি এই বিষয়ে সে সম্রাটের কাছে তার স্বগোত্রীয় লোকদের পক্ষে অনুরোধ করে, তবে তাদের রক্ষা পাবার কিঞ্চিৎ আশা রয়েছে। সে এটাও উল্লেখ করেছিল যে- ‘আর কে জানে যে, তুমি এই প্রকার সময়ের জন্যেই রাজ্ঞীপদ পাওনি?’ 
ইষ্টের বলেছিল, ‘এরূপে আমি সম্রাটের কাছে যাব। তা ব্যবস্থা বিরুদ্ধ হলেও যাব, আর যদি বিনষ্ট হতে হয়-হব।’ 

ইষ্টের রাজদরবারে সম্রাটের সম্মুখে উপস্থিত হল। এই স্বেচছাচারী সম্রাট তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে হাসিমুখে স্বর্ণদন্ড প্রসারিত করলেন এবং তাকে তার অনুরোধ বর্ণনা করতে বললেন। তবে অন্য কিছু নয়, কেবল একটি ভোজসভায় যোগদানের জন্যে সম্রাট এবং হামানকে সরল আমন্ত্রণ জানাল রানী ইষ্টের।

মর্দখয়কে ঘোড়ায় চড়িয়ে নগরী প্রদক্ষিণ।
এদিকে হামান মর্দখয়কে দৃষ্টান্তমূলকভাবে বিনষ্ট করার পরিকল্পণা করল। সে মহা উৎসাহ নিয়ে পঁচাত্তুর ফুট উঁচু একটি ফাঁসির মঞ্চ নির্মাণ করল যেখানে সে মর্দখয়কে ঝুলিয়ে দেবার জন্যে সম্রাটের অনুমতি প্রার্থনা করবে। 

সেইরাতে সম্রাটের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটল। তিনি তখন রাজকীয় ইতিহাস পুস্তক আনতে আদেশ করলেন। সেটির পাঠ শুনতে শুনতে প্রথমবারের মত তিনি জানতে পারলেন যে, ইহুদি মর্দখয় কিভাবে তার জীবন রক্ষা করেছিলেন। তিনি আরও জানতে পারলেন যে এই কাজের জন্যে তাকে যথাযতভাবে সম্মানিত এবং পুরস্কৃত করা হয়নি। 

পরদিন ভোরে হামান যখন রাজদরবারে মর্দখয়ের মৃত্যুদন্ড অনুমোদন করানোর জন্যে এল, সম্রাট তখন তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘হে হামান! সম্রাট যার সমাদর করতে চান, তার প্রতি কি করা কর্তব্য?’ 

পুরীম উৎসব, জেরুজালেমের রাস্তার দৃশ্য।
স্বাভাবিকভাবে হামান ধরে নিল যে সম্রাট তাকেই সম্মানিত করার জন্যে পরিকল্পণা করেছেন। সুতরাং সে পরামর্শ দিল- ‘যেন সেই সমাদর প্রাপ্ত ব্যক্তিকে রাজকীয় বস্ত্র পরান হয়, তার মাথায় যেন মুকুট দেয়া হয় এবং তাকে যেন সম্রাটের উচ্চ পদস্থ লোকেরা ঘোড়ায় চড়িয়ে নগরীর ব্যস্ততম সড়ক প্রদক্ষিণ করায়।’ 

হামানের এই প্রস্তাবের সাথে সম্রাট একমত হলেন। সুতরাং তিনি তাকে মর্দখয়ের প্রতি অনুরূপ করতে আদেশ দিলেন।হামান হতবাক হলেও প্রতিবাদ করার সাহস পেল না। সম্রাটের আদেশ তো শিরোধার্য সর্বদাই।

মর্দখয় ও রানী ইষ্টেরের সমাধি
পরদিন ভোজসভায় ইষ্টের সম্রাটকে হামান কর্তৃক তার জাতিকে ধ্বংস করার দুষ্ট পরিকল্পণা সম্পর্কে অবহিত করল। সব শুনে অহশ্বেরশ ভীষণভাবে ক্রুদ্ধ হয়ে তৎক্ষণাৎ মর্দখয়ের জন্যে নির্মিত ফাঁসিকাষ্ঠে হামানকে ঝুলিয়ে দিতে আদেশ করলেন। 

ইতিমধ্যে ইহুদিদের বিনাশ করার জন্যে জারিকৃত আদেশনামা রাজ্যের বিভিন্ন অংশে পৌঁছে গিয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী সম্রাটের আদেশ রদ করা যেত না। সুতরাং ইষ্টেরের অনুরোধে অহশ্বেরশ আর একটি নতুন রাজাজ্ঞা লিখলেন, যাতে ইহুদিদেরকে আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অধিকার দেয়া হয়েছিল।

ঐ আদেশের বলে পরবর্তীতে ইহুদিরা অত্যন্ত প্রবলভাবে তাদের উপর হামলাকারীদের প্রতিরোধ করল। ফলে প্রায় পঁচাত্তুর হাজার হামলাকারী নিহত হয়েছিল। এভাবে ইহুদিরা পরিকল্পিত নিশ্চিত ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা পেল। 

এই উদ্ধার স্মরণ করার জন্যে প্রতি বৎসর মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে ইহুদিরা পুরীম (Purim) নামে একটি ভোজের উৎসব পালন করে থাকে।

সমাপ্ত।
ছবি: Wikipedia, wikimedia, zachmcintosh, artbible.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন