pytheya.blogspot.com Webutation

২৫ নভেম্বর, ২০১২

Banu Nadir: ইহুদি বনু নাজিরদের মদিনা থেকে নির্বাসনের কারণ।

নজদ এলাকায় রেল, যাকওয়ান, ওসাইয়া ও বনি আমের গোত্র বসবাস করত। বদর যুদ্ধের পর মদিনার এই প্রতিবেশী গোত্রসমূহের পক্ষ থেকে বনি আমের গোত্রের নেতা বারা আমের নবী মুহম্মদ সমীপে উপনীত হয়ে ইসলাম প্রচারকদেরকে তাদের মধ্যে গমন করতে প্রলুদ্ধ করলেন। তিনি নবীজীকে বলেছিলেন, ‘ও রসূলুল্লাহ! আমি নিজে এবং আমার এলাকাবাসী ইসলামের প্রতি আগ্রহী। আপনি আমাদের মধ্যে কিছু ইসলাম (Islam) প্রচারক পাঠালে আমরা ইসলাম গ্রহণ করব।’

বারা আমেরের কথায় নবীজী সেখানে কিছু প্রচারক পাঠাতে সিদ্ধান্ত নিলেন। এতে গমনে ইচ্ছুক সাহাবীদের অনেকে ঐ সকল এলাকাবাসী কর্তৃক তাদের অনিষ্টের আশঙ্কা তার কাছে ব্যক্ত করলেন। অতঃপর এই আশঙ্কার কথা তিনি বারা আমেরের কাছে তুলে ধরলে তিনি বললেন, ‘হে আল্লাহর রসূল! আমি আপনার পাঠান প্রচারকদের দায়িত্ব নিচ্ছি। আপনি বিনা দ্বিধায় তাদেরকে পাঠান।’
তার কথায় নবীজী আশ্বস্থ হয়ে ‘আসহাবে সুফফা’র সত্তুরজন কোরআন বিশেষজ্ঞ মুসলমানকে সেখানে পাঠিয়ে দিলেন।

বনি আমের গোত্রের দলপতি বারা আমেরের ভ্রাতুষ্পুত্র আবু আমের ছিলেন দ্বিতীয় গোত্র প্রধান। তিনি বারার মদিনায় আগমনের কিছু পূর্বে একবার নবীজী সমীপে হাজির হয়ে কতিপয় দাবী উত্থাপন করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘হে মুহম্মদ! আমার ও আপনার মধ্যে এই তিনটি বিষয়ের যে কোন একটি স্থির হওয়া প্রয়োজন-

ক) আপনি পল্লী এলাকার এবং আমি শহর এলাকার নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত থাকব।
খ) আপনার অবর্তমানে আমি আপনার স্থলাভিষিক্ত হব।
গ) এই দু‘টি প্রস্তাবের কোন একটিকে আপনি মেনে না নিলে আমি হাজার হাজার সৈন্য নিয়ে আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হব।

নবীজী আবু আমেরের প্রস্তাবের একটিও গ্রহণ করেননি। ফলে সে বিদ্বেষ নিয়ে মদিনা ত্যাগ করেছিল এবং নিজ গোত্রে ফিরে গিয়ে মুসলমানদের ধ্বংস সাধনের জন্যে প্রহর গুনছিল। 

এদিকে প্রচারকদের দায়িত্ব বারা আমের গ্রহণ করলেও নবীজী কিন্তু পরিপূর্ণ আশ্বস্ত ছিলেন না। সুতরাং তিনি প্রচারকদের হাতে আবু আমেরের উদ্দেশ্যে একটি চিঠিও প্রেরণ করেছিলেন। এই দলটি যখন রিবমাউনা নামক ছোট নদীর কাছে বনি আমের ও বনি সুলায়েমদের রাজত্বের মধ্যে এসে পৌঁছিল, তখন হারাম বিন মেলহান সঙ্গীদেরকে বললেন, ‘একজন সঙ্গীসহ আমি রসূলুল্লাহর চিঠি নিয়ে আবু আমেরের সাথে দেখা করি। আমরা ভালোয় ভালোয় ফিরে না এলে তোমরা আর সম্মুখে পা না বাড়িয়ে মদিনাতে প্রত্যাবর্তণ করবে।’

হারাম আবু আমেরের সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে বললেন, ‘আমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বাণী প্রচারে আপনাদের নিরাপত্তা পাব কি?’এ সময় আবু আমেরের ঈশারায় তার একজন অনুগত ব্যক্তি বর্শা দ্বারা হারামকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দিল। এ দেখে হারামের সঙ্গী পালিয়ে এসে অপেক্ষমানদেরকে তার হত্যার কথা বর্ণনা করলেন। তখন দলের সকলেই প্রত্যাবর্তণের সিদ্ধান্ত নিল।

অত:পর তারা যখন ফিরে যাচ্ছিল সেইসময় আবু আমেরের কয়েক‘শ অনুগত অস্ত্রধারী ব্যক্তি তাদেরকে ঘিরে ফেলল এবং আক্রমণ করে বসল। অগত্যা প্রচারক দল অস্ত্রধারণ করতে বাধ্য হল। কিন্তু অস্ত্র ছিল নগণ্য। আরবের ঐতিহ্য মোতাবেক তাদের সাথে কেবল একখান করে তরবারী ছিল। তাছাড়া তারা তো আর যুদ্ধের জন্যে আগমন করেনি, এসেছে ইসলাম প্রচারের জন্যে। সুতরাং এই সামান্য রসদ নিয়ে বিপুল সংখ্যক শত্রুর মোকাবেলা করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। ফলে একে একে তারা সকলেই নিহত হল একজন ব্যতিত। এই ব্যক্তি আমর ইবনে জামরী দল থেকে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিল।

বনি আমের গোত্রের আমের বিন তোফায়েল, আমর ইবনে উমাইয়া জামরীকে হত্যা না করে বন্দী করল- কেননা তার একটি ক্রীতদাস মুক্ত করার মানত ছিল। সুতরাং সে আমরের মাথার চুল কেটে মানত পূরণের উদ্দেশ্যে তাকে মুক্ত করে দিল।

ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া আমর ইবনে জামরী হেঁটে মদিনার দিকে অগ্রসর হতে লাগল। পথিমধ্যে একসময় স্বীয় ক্লান্তি দূর করতে সে এক বৃক্ষতলে আশ্রয় নিল। বৃক্ষছায়ায় পূর্ব থেকেই দু‘টি লোক বসে বিশ্রাম নিচিছল। এই দু‘ব্যক্তি নবীজীর সাথে শান্তি চুক্তি শেষে নিজ গোত্র মাঝে ফিরে যাচ্ছিল।

পারস্পারিক আলাপচরিতার একপর্যায়ে আমর জানতে পারল লোক দু‘জন বনি আমের গোত্রের বংশোদ্ভূত। যে এইমাত্র অবিশ্বাসী গোত্রের বিশ্বাসঘাতকতায় ৬৯ জন সঙ্গীর নৃশংস হত্যাকান্ড স্বচক্ষে দেখে এসেছে, সেই অবিশ্বাসী গোত্রের লোকদের মোকাবেলায় তার মনোবৃত্তি কি হবে তা অনুমান করা কারও পক্ষে কঠিন হওয়ার কথা নয়। তাছাড়া সে জানত না ঐ দু‘জন মুহম্মদের সাথে নিরাপত্তা চুক্তিতে আবদ্ধ। সুতরাং সে তৎক্ষণাৎ ঐ দু‘জনকে তার প্রাণের শত্রু মনে করল এবং প্রতিহিংসা গ্রহণ করতে বদ্ধপরিকর হল। কিন্তু তার কাছে কোন অস্ত্র নেই, সুতরাং সে ঐ দু‘জনের একজনের তরবারী হাতিয়ে নেবার মতলব করল। এই অভিলাষ পূরণে সে তাদের একজনের তরবারী দেখিয়ে তাকে বলল, ‘আপনার তরবারীটা তো খুবই সুন্দর! আমি কি হাতে নিয়ে একটু দেখতে পারি?’
সে বলল, ‘এতে আপত্তির কি আছে?’- তরবারীখানা তিনি আমরের হাতে দিল। 

আমর তরবারী হাতে নিয়েই তা কোষমুক্ত করে ফেলল। পরমুহুর্তেই তা দিয়ে সজোরে একজনের গর্দান লক্ষ্য করে আঘাত করল। এতে ঐ ব্যক্তির মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ছিঁটকে পড়ল। ঐসময় নিহতের সঙ্গী তীব্র অবিশ্বাস নিয়ে কর্তিত মস্তকের দিকে ক্ষণকাল তাকিয়ে রইল। অতঃপর সম্বিত ফিরে পেয়ে দৌঁড়ে পালানোর চেষ্টা করল। আমর পিছু ধাওয়া করে তাকেও হত্যা করল। তারপর সে তাদের উট দু‘টি ও অন্যান্য জিনিষপত্র নিয়ে দ্রুত মদিনার পথে যাত্রা করল।

আমর একসময় মদিনাতে এসে পৌঁছিল। অতঃপর সকল ঘটনা নবীজীকে অবহিত করল। যখন নবীজী প্রচারকদের হত্যাকান্ডের কথা জানতে পারলেন তখন তিনি দুঃখিত হলেন এবং যখন আমের গোত্রের লোক দু‘জনের হত্যাকান্ডের কথা জানতে পারলেন তখন তিনি আরও দুঃখিত হলেন।

যাহোক নিরাপত্তা প্রদত্ত নিহত ব্যক্তিদ্বয়ের আত্মীয়-স্বজনেরা প্রতিকারের দাবীদার। কিন্তু দু‘জনের রক্তঋণ দু‘শ উট প্রদানের ক্ষমতা মুসলমানদের নেই। কাজেই মুসলমান এবং সনদ গ্রহণকারী অন্যান্য লোকদের কাছ থেকে রক্তপণ সংগ্রহ করার আদেশ দেয়া হল। বনি নাজির, বনি কুরাইজা ও অন্যান্য গোত্রের লোকেরাও মুসলমানদের সঙ্গে সমভাবে এই পণ প্রদানের ব্যাপারে চুক্তিবদ্ধ ছিল। সুতরাং নবীজী কতিপয় শিষ্য সঙ্গে নিয়ে বনি নাজির গোত্রের লোকদের কাছে গেলেন এবং তাদের কাছে তাদের দেয় পণের ভাগ দাবী করলেন। নাজির গোত্র দেখল যে, মুহম্মদকে হত্যা করার এই একটা উপযুক্ত ক্ষণ। তাই তারা তাকে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার জন্যে অনুরোধ করল। এতে নবীজী একটি বাড়ীর দেয়ালের সঙ্গে পিঠ রেখে অপেক্ষা করতে লাগলেন।

এদিকে নাজির গোত্রের কতিপয় লোক গোপনে পরামর্শ করে স্থির করল, একজন লোক (ওমর ইবনে জাহস) প্রাচীরের উপরে উঠে একটা বড় পাথরখন্ড উপর থেকে গড়িয়ে নবীজীর উপর ফেলবে, যাতে তিনি নিহত হন। এসময় স্থানীয় বাসিন্দাদের কানাকানি লক্ষ্য করে নবীজী তাদের কু-মতলব আঁচ করলেন। অতঃপর জিব্রাইলের মাধ্যমে তিনি তাদের হত্যার অভিসন্ধি সম্পর্কে অবগত হলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ ইহুদিদের সন্দেহের উদ্রেক না করেই তার শিষ্যদের সেখানে রেখে অবিলম্বে সেইস্থান ত্যাগ করলেন। ইহুদিরা ভেবেছিল যে, তিনি বেশী দূরে যাননি এবং তাড়াতাড়ি ফিরে আসবেন। এভাবে নবীজী নিজেকে ও তার শিষ্যদেরকে প্রায় নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করলেন। এদিকে শিষ্যেরা তারজন্যে অনেকক্ষণ অপেক্ষা শেষে একসময় ফিরে এল।

পরবর্তীতে নবীজী উদারতাবশতঃ এমন একটা হীন ষড়যন্ত্রের পরও নাজির গোত্রের বিরুদ্ধে কোন প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। এমনকি তিনি যে তাদের ষড়যন্ত্রের বিষয়টা অবহিত হয়েছেন, তাও কখনও কোন আলোচনায় উল্লেখ করেননি। কিন্তু এতে বনি নাজিরদের স্বভাবের কোন পরিবর্তন হল না। তারা নুতন করে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হল।

বনি কাইনুকা গোত্র যেরূপ করেছিল বনি নাজির (Banu Nadir) গোত্র ঠিক একই অবস্থায় নিজেদের স্থাপন করল। তারা সম্পাদিত চুক্তি বহির্ভূত কাজে লিপ্ত হল। After the Battle of Badr, one of the Banu Nadir's chiefs Ka'b ibn al-Ashraf, went to the Quraish in order to lament the loss at Badr and to incite them to take up arms to regain lost honor writing poetic eulogy commemorating the slain Quraish notables; During his visit to Mecca, Ka'b concluded a treaty with Abu Sufyan, stipulating cooperation between the Quraysh and Jews against Prophet Muhammad. This was in contravention of the Constitution of Medina, of which the tribe led by Ka'b ibn al-Asharf was a signatory, which prohibited them from "extending any support" to the tribes of Mecca, namely Banu Quraish. 

Inspite all this, Ka'b ibn al-Ashraf, who was also a gifted poet, wrote a  later, he also wrote erotic poetry about Muslim women, which the Muslims found offensive as it also against constitution. loyalty to the constitution gives protection against treachery and the Constitution will not (be employed to) protect one who is unjust or commits a crime.

সুতরাং মুহম্মদ তার সম্পর্কে বলতে বাধ্য হলেন এমনটি যে- “He (Ka'b) has openly assumed enmity to us and speaks evil of us and he has gone over to the polytheists (who were at war with Muslims) and has made them gather against us for fighting" .He called upon his followers to take care of Ka'b.

পরপরই ঘটল এমন ঘটনা- নাজির গোত্রের কিছু ইহুদি মুহম্মদ সমীপে হাজির হয়ে বলল, ‘আপনি আমাদেরকে ইসলামের পথে আহবান করছেন-অথচ ধর্ম নিয়েই আমাদের ও আপনাদের মাঝে যত বিরোধ। আমরা একটা সমাধানে উপনীত হতে চাই। সুতরাং আপনি কয়েকজন সাহাবীসহ আমাদের মহল্লায় আসুন, আমরাও কয়েকজন আলেম নির্বাচন করি। আপনি তাদের সাথে কথাবার্তা বলুন। যদি তারা আপনার প্রচারিত ইসলামের সত্যতা উপলব্ধি করতে পারেন, তাহলে ইসলাম গ্রহণে আমাদের আর কোন আপত্তি থাকবে না।’

ইতিমধ্যে বনি কুরাইজা গোত্র মুসলমানদের সঙ্গে নুতন করে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হয়েছিল। মুহম্মদ বনি নাজিরকেও তদ্রুপ সন্ধিতে আবদ্ধ করতে চাইলেন। সুতরাং তিনি বললেন, ‘লিখিত ওয়াদা না দিলে আমরা তোমাদের মুখের কথায় বিশ্বাস করতে পারি না।’
তারা বলল, ‘আমাদের মধ্যে মতভেদ কেবল ধর্ম নিয়ে। সুতরাং এ ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারলে আমাদের মাঝে কোন বিরোধ অবশিষ্ট থাকে না। আমরা বিলক্ষণ ইসলাম গ্রহণ করব। সুতরাং কথিত সন্ধিপত্রের কোন প্রয়োজনীয়তা অবশিষ্ট থাকবে না।

বনি নাজির গোত্র নবীজীকে হত্যার এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নিয়েছিল। তারা পরামর্শ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল যে, তাদের আলেমরা পোষাকের মধ্যে অস্ত্র লুকিয়ে রাখবে এবং নবীজীর আগমনের পর প্রথম সুযোগেই তারা তাকে হত্যা করবে। কিন্তু তাদের এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে নবীজী কিছুমাত্র অবহিত ছিলেন না। সুতরাং তিনি তাদের এই প্রস্তাবে সম্মতি দিলেন।

নির্দিষ্ট দিনে নবীজী দু‘জন সাহাবীসহ বনি নাজিরদের মহল্লার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। যেহেতু ধর্ম নিয়ে আলোচনা সুতরাং কেউই সাথে আত্মরক্ষার জন্যে অস্ত্র নেয়া জরুরী মনে করলেন না। তারা কিছুদূর অগ্রসর হতে না হতেই পশ্চাৎদিক থেকে জনৈক আনসার ছুটতে ছুটতে এসে তাদের গতিরোধ করলেন এবং তৎক্ষণাৎ ইহুদিদের ষড়যন্ত্রের বিষযটি অবহিত করলেন।

মদিনার আওস ও খাজরাজ বংশ এবং ইহুদিদের মধ্যে বিবাহ প্রথা প্রচলিত ছিল। এই সূত্রে এই আনসার ভগ্নির, বনি নাজির গোত্রের এক বিশিষ্ট ইহুদির সাথে বিবাহ হয়েছিল। সে নবীজীকে হত্যা প্রচেষ্টার ঐ ষড়যন্ত্রের কথা জানতে পেরে গোপনে তার ভ্রাতাকে সবকিছু জানিয়ে দিয়েছিল। 

এই স্থানে বনু নাজিরদের বাসস্থান ছিল।
সমস্ত ঘটনা জানার পর নবীজী আর কালক্ষেপন করা সমীচীন মনে করলেন না। তিনি অনতিবিলম্বে দূত মারফত নাজির গোত্রকে বলে পাঠালেন- ‘তোমাদের সর্বপ্রকার ষড়যন্ত্র আর দুরভিসন্ধি সম্পর্কে আমরা সম্যক অবগত। দেশে বিরাজমান শান্তি-শৃঙ্খলা এবং জনগণের ধন-প্রাণ, মান-সম্ভ্রম বিপন্ন ও বিনষ্ট করার প্রচেষ্টার হেন পথ নেই যা তোমরা গ্রহণ করনি। আমরা পুনঃপুনঃ সন্ধির প্রস্তাব করা সত্ত্বেও তোমরা আমাদের প্রস্তাবের প্রতি কর্ণপাত করা প্রয়োজন অনুভব করনি।
-সুতরাং দেশ ও জনগণের স্বার্থে তোমাদেরকে মদিনায় অবস্থান করতে দেয়া আর সম্ভব নয়। তোমরা অনতিবিলম্বে মদিনা ত্যাগ করে তোমাদের পছন্দমত স্থানে চলে যাও।’

নবীজী নজির বিহীন উদারতা দেখিয়ে তাদেরকে দশদিন সময় মঞ্জুর করেছিলেন, যাতে এই হতভাগারা ধীরে-সুস্থ্যে শান্তভাবে অন্যত্র যাবার সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে পারে। আর বনি নাজির গোত্র মদিনা ত্যাগ করে চলে যেতে সম্মত ছিল। কিন্তু আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই তাদেরকে বাঁধা দিলেন। তিনি বললেন, ‘তোমরা এখানেই থাক, অন্যত্র যাবার প্রয়োজন নেই। আমার অধীনে দু‘হাজার যোদ্ধার একটি বাহিনী আছে। প্রয়োজনে তারা প্রাণ দেবে, কিন্তু তোমাদের গায়ে একটি আঁচড়ও লাগতে দেবে না।’
তখন বনি নাজিররা উবাইয়ের সমর্থনের উপর নির্ভর করে নবীজীকে একটা উদ্ধত উত্তর প্রদান করল। তারা তার আশ্বাসে প্ররোচিত হয়ে বলে পাঠাল-‘আমরা কোথাও যাব না। আপনি যা করতে পারেন করেন।’

সুতরাং নবীজী এক বাহিনী নিয়ে তাদেরকে চতুর্দিক থেকে অবরোধ করলেন। এতে তারা দুর্গের ফটক বন্ধ করে বসে রইল। আর আশা করতে লাগল আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের দু‘হাজার সৈন্যের সাহায্য, মদিনার বনি কুরাইজার এবং অন্যান্য ইহুদি গোত্রের সাহায্য অবিলম্বে এসে যাবে। সুতরাং তাদেরকে আর দেশত্যাগ করতে হবে না। কিন্তু তাদের এ আশা যে দূরাশায় পরিণত হতে পারে তা তাদের মনে একবারও উদয় হয়নি। 

নবীজী অতি ক্ষিপ্রতার সঙ্গে বনি নাজিরদের দূর্গ ঘেরাও করেছিলেন। এতে মুনাফেকরা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চুপসে গিয়েছিল। একে তারা স্বভাবগত ভীতু তদুপরি দলবদ্ধ হবার অবকাশ পায়নি। অন্যদিকে ইহুদি গোত্র বনি কুরাইজার পক্ষে বনি নাজিরদেরকে কোন সাহায্য করার সুযোগ অবশিষ্ট ছিল না। কেননা তারা মাত্র কয়েকদিন পূর্বে নবীজীর সাথে নুতন করে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হয়েছিল। সুতরাং ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে স্বজাতিকে সাহায্য করার সাহস তারা করেনি।

বনি নাজির গোত্রের আত্মসমর্পণ।
তোমরা যে কতক খেজুরগাছ কেটেছ আর কতক না কেটে রেখে দিয়েছে, তা তো আল্লাহরই অনুমতিক্রমে। এ এজন্যে যে, এদিয়ে আল্লাহ সত্যত্যাগী সম্প্রদায়কে অপদস্থ করবেন।-(৫৯:৫)

পূর্বের প্রস্তাব পুনরুজ্জীবিত করা হল, আর বনি নাজিররাও তাদের আবাসস্থল পরিত্যাগ করতে সম্মত হল। অস্ত্র-শস্ত্র ব্যতিত অন্যান্য যাবতীয় অস্থাবর সম্পত্তি সঙ্গে নিয়ে যাবার অনুমতি তাদেরকে দেয়া হল। পরিত্যাগ করার সময় তারা তাদের বাসগৃহসমূহ ধ্বংস করে ফেলল, যেন সেগুলি মুসলমানরা অধিকার ও ভোগ করতে না পারে। 

নবী মুহম্মদের আগমনপূর্ব মদিনায় যেসব স্ত্রীলোকের সন্তান বাঁচত না তারা মানত করত, যদি তাদের সন্তান বেঁচে থাকে তবে তাদেরকে ইহুদিধর্মে দীক্ষিত করবে। প্রচলিত এই প্রথার কারণে আনসারদের অনেক সন্তানই ইহুদি সমাজভূক্ত হয়ে পড়েছিল। বনি নাজির গোত্রের নির্বাসনকালে আনসার সম্প্রদায় তাদের এসব সন্তানদের মদিনা ত্যাগ করতে দিতে রাজী হল না। এতে ইহুদিরা বলল, ‘এরা তোমাদের সন্তান হলেও আমাদের সমাজভূক্ত। সুতরাং আমরা এদেরকে ছেড়ে যাব না।’

এরই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াত নাযিল হল- দ্বীন সম্পর্কে কোন জবরদস্তি নেই, সত্যপথ ও বিপথের মধ্রে সত্যপথ দেদীপ্যমান হয়ে উঠেছে।-(২:২৫৬)

-এই আয়াত নাযিল হবার পর নবীজী ঘোষণা করলেন, ‘মৃতবৎসা স্ত্রীলোকদের মানতের ফলে ইহুদি সমাজভূক্তরা সে সমাজে থাকা না থাকার ব্যাপারে স্বাধীন মতামতের অধিকারী।’
এরফলে ঐসব সন্তানেরা মদিনা ত্যাগ বা থেকে যাবার অধিকার প্রাপ্ত হয়।

এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ-‘তিনিই কিতাবীদের মধ্যে যারা বিশ্বাসী, তাদেরকে প্রথম সমাবেশেই তাদের বাসভূমি থেকে বের করে দিয়েছিলেন। তোমরা কল্পনাও করতে পারনি যে, ওরা নির্বাসিত হবে। আর ওরা মনে করেছিল, ওদের দুর্ভেদ্য দূর্গগুলো আল্লাহর বাহিনীর হাত থেকে ওদেরকে রক্ষা করবে। কিন্তু আল্লাহর শাস্তি এমন একদিক থেকে এল যা ওরা ধারণাও করতে পারেনি। আর ওদের অন্তরে তা ত্রাসের সঞ্চার করল। ওদের বাড়ীঘর ওদের নিজেদের হাতে ও বিশ্বাসীদের হাতে ধ্বংস হয়ে গেল।

‘আল্লাহ ওদেরকে নির্বাসন দেবার সিদ্ধান্ত না করলে পৃথিবীতে অন্য শাস্তি দিতেন; আর পরকালে ওদের জন্যে রয়েছে আগুনের শাস্তি। এজন্যে যে ওরা আল্লাহ ও তার রসূলের বিরুদ্ধাচারণ করেছিল। আর কেউ আল্লাহর বিরুদ্ধাচারণ করলে আল্লাহ তো শাস্তিদানে কঠোর।-(৫৯:২-৪)

‘কিতাবীদের মধ্যে যারা অবিশ্বাসী, তাদের সেইসব ভাই ব্রাদারদের বলে, ‘তোমাদের যদি তাড়িয়ে দেয়া হয় তবে আমরা অবশ্যই তোমাদের সাথে দেশত্যাগ করব এবং আমরা তোমাদের ব্যাপারে কখনও কারও কথা মানব না। আর যদি তোমরা আক্রান্ত হও, আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে সাহয্য করব।’ কিন্তু আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন, ওরা তো মিথ্যেবাদী। আসলে ওদের তাড়িয়ে দিলে মুনাফিকরা তাদের সাথে দেশত্যাগ করবে না, আর ওরা আক্রান্ত হলে এরা তাদেরকে সাহায্য করবে না, এমনকি সাহায্য করতে এলেও পিছুটান দেবে। অবিশ্বাসীরা কোন সাহায্যই পাবে না।

(মুসলমানেরা!) আসলে তাদের অন্তরে আল্লাহর চেয়ে তোমরাই বেশী ভয়ের কারণ। কেননা তারা এক নির্বোধ সম্প্রদায়, ফলে আল্লাহকে ভয় না করে তোমাদেরকে বেশী ভয় করে। এরা সকলে একযোগে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারবে না। এরা যুদ্ধ করবে কেবল সুরক্ষিত শহরের অভ্যন্তরে বা দূর্গপ্রাচীরের অন্তরালে থেকে। তবে এরা যখন নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করে তখন সে যুদ্ধ হয় প্রচন্ড। তুমি মনে কর ওরা ঐক্যবদ্ধ, কিন্তু ওদের মনের মিল নেই। এর কারণ এই যে, ওরা এক নির্বোধ সম্প্রদায়। -(৫৯:১১-১৪)

বনি নাজিররা তাদের স্বগোত্রীয়দের নিকট খায়বরে এক মরুউদ্যানের নিকট নির্বাসনে চলে গেল ৬০০ উটের বহর সাঁজিয়ে। এ উট বহর শোভাযাত্রা সহকারে মদিনা নগরীর মধ্যস্থল দিয়ে অত্রিক্রম করেছিল। যাত্রাকালে তারা তালে তালে বাজিয়ে গেল বাঁশী ও খঞ্জনী উল্লসিত হয়ে, উৎসবের আমেজে। 

আর নাজির রমনীরা তাদের প্রথিতযশা সৌন্দর্য়্য শেষবারে মত উপভোগোর সুযোগ দিয়েছিল মদিনাবাসীদের। তারা তাদের পরিমিত প্রসাধনীতে সজ্জিত নিজ নিজ মুখাবয়র অনাবৃত করে দিয়েছিল পথের দু’ধারে দাঁড়িয়ে থাকা ইমপ্রেসড জনতার অপলক দৃষ্টির সম্মুখে। তারা মোটেও কৃপণ ছিল না এ ব্যাপারে। মূল্যবান পোষাক ও অলংকরণের অপরূপ সাঁজে সজ্জ্বিত, লাস্যময়ী এসব রমনীরা উটের পিঠে করে চলে গেল মদিনাবাসীদের দৃষ্টির সম্মুখ দিয়ে গর্বিত অহংকারে- রানী ও রাজকন্যা রূপে। পেছনে, যাত্রাপথে পড়ে রইল তাদের শরীরে ব্যবহৃত মূল্যবান সুগন্ধীর সুখময় সৌরভস্মৃতি।  

বনি নাজিররা মদিনা ত্যাগ করে চলে গেল। ৪র্থ হিজরীর রবিউল আওয়াল মাসে এই নির্বাসন কার্যকরী হয়েছিল।

সমাপ্ত।
ছবি: Wikipedia, islamiclandmarks.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন