pytheya.blogspot.com Webutation

৩০ জুন, ২০১২

Resurrection Day: পুনরুত্থানের পর মানুষের অনুভূতির স্বরূপ।


নশ্বর জগতে বাস করে অবিনশ্বর জগৎ তথা পরলোকে পুনরুত্থান দিবসে (Resurrection Day) মানুষের অনুভূতির স্বরূপ কেমন হবে তা ব্যাখ্যা করা বেশ জটিল। সুতরাং আমরা একটি রূপকের মাধ্যমে বিষয়টি বিচার করব। মনে করা যাক, সমগ্র মানব জাতি মাটির নীচে একটি গুহার মধ্যে বাস করছে। পৃথিবী পৃষ্ঠের আলোর দিকে গুহার একটি মুখ আছে। মুখটি ভূপৃষ্ঠ থেকে গুহা পর্যন্ত দীর্ঘ। এই গুহার মধ্যে সব মানুষ তাদের শৈশবকাল থেকেই রয়েছে। তাদের পা এবং গলা শেকল দিয়ে আবদ্ধ। ডানে, বাঁয়ে কিম্বা পিছনে মুখ ফেরাতে তারা অক্ষম। শেকল তাদের মাথার এরূপ সঞ্চালনকে আটকে রাখে। গুহার দেয়ালের দিকেই তাদের মুখ ঘোরানো। তাদের সম্মুখের দেয়ালকেই মাত্র তারা দেখতে পায়। এবার কল্পনা করি, তাদের পশ্চাতে মাটির উপরে গুহার বাইরে কিছুদূরে আগুন জ্বলছে। বন্দী মানুষ এবং বাইরের আগুন- এদু'য়ের মধ্যভাগে রয়েছে উঁচু একটি পথ। এই পথ ধরেই তৈরী হয়েছে নীচু একটা দেয়াল, একটি পর্দার মত,- যেমন ছায়া নৃত্যের নৃত্য শিল্পীর সামনে থাকে, যে পর্দার উপর শিল্পীরা তাদের পুতুলদের নাচ দেখায়।

গুহা ও বন্দী মানব।
এখন ধরি নীচু দেয়ালটির পথ ধরে একদল লোক চলে যাচ্ছে। তাদের হাতে বিভিন্ন রকমের বস্তু আছে; পাথর, কাঠ কিম্বা অন্য কিছুতে তৈরী নানা পাত্র, মূর্তি, পশুর প্রতিকৃতি। এরা কেউ কেউ কথা বলছে। কেউ নীরবে অগ্রসর হচ্ছে। আর এই শোভাযাত্রার ছবিটি আগুনের আলোতে গুহার মধ্যে তার দেয়ালে এসে প্রতিফলিত হচ্ছে।

আগেই বলা হয়েছে বন্দীরা আমাদেরই মত এবং তাদের মুখ দেয়াল গাত্রে ফেরানো। সুতরাং আলোর প্রতিভাসে তারা কেবল তাদের কিম্বা একে অপরের ছায়াই দেখতে পায়। এখন তাদের মাথা যদি তারা আদৌ সঞ্চালন করতে না পারে তাহলে ছায়া বৈ অপর কিছু তারা দেখতে পাবে না। আর এসময় বাইরে জনতার মিছিল যে সব দ্রব্যাদি হাতে করে নিচ্ছে তারও ছায়াই মাত্র তারা দেখতে পাচ্ছে।

এখন ধরি, বন্দীরা পরস্পরের সাথে আলাপ করছে। এই আলাপে তারা তাদের সম্মুখে দেয়ালের ছায়াকেই কি সত্য বস্তু বলে পরস্পরের নিকট উল্লেখ করবে না? তাছাড়া মনে করি, গুহার মধ্যে শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়। তাহলে বাইরের মিছিলের যে শব্দ গুহার মধ্যে প্রতিধ্বনিত হবে, সেই শব্দকে কি তারা তাদের সম্মুখের ছায়াদের উচ্চারিত শব্দ বলেই মনে করবে না? সুতরাং তাদের কাছে সত্য হচ্ছে প্রতিকৃতির ছায়া মাত্র। এখন দেখি, বন্দীরা যদি মুক্তি পায় এবং তাদের ভুল ভাঙ্গে তাহলে কি ঘটে।

 গুহা ও বন্দী মানব।
মনে করি, বন্দীদের মধ্যে কেউ একজন হঠাৎ মুক্তি পেয়ে উঠে দাঁড়াল এবং মুখ ঘুরিয়ে আলোর দিকে ছুটে গেল। এতে আলোর ঝলক তার চোখকে ধাঁধিয়ে দিল এবং সে চোখে তীব্র যন্ত্রণা বোধ করতে লাগল। সুতরাং যে প্রতিকৃতির ছায়া সে গুহার দেয়ালে দেখে এসেছে তার যথার্থ আকারকে প্রথমে সে দেখতেই পাবে না। এখন মনে করি কেউ তাকে বলল, সে পূর্বে যা দেখেছিল তা ছিল ভ্রান্ত এবং এখন চোখের ধাঁধা কেটে যাবার পর যা দেখছে তাই সত্য। এতে তার জবাব কি হবে?

আরও মনে করা যাক, তার প্রদর্শক তাকে তার সম্মুখের চলমান বস্তু সকলের নাম বলতে বলল। এতে নিশ্চয়ই সে বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে। তার মনে হবে, যে ছায়া সে পূর্বে দেখেছে সেই ছায়া বর্তমানের বস্তু থেকে অধিক সত্য।
এখন সে যদি সোজা আলোর দিকে তাকায় তাহলে তার চোখে আলোর আঘাতে যে যন্ত্রণা হবে তার ফলে মুখ ফিরিয়ে সে যে দৃশ্য অধিক স্পষ্ট বোধ হয় তাকে সে দেখবে এবং আলোর ঝলকে প্রদর্শিত বস্তুর চেয়ে এই বস্তুকে অধিক সত্য বলে মনে করবে।

এবার আরও কল্পনা করি, ধরি, তাকে গুহার মধ্য থেকে জোর করে সেই অমসৃণ পথ দিয়ে উপরে এনে সূর্য্যরে আলোতে ধরে রাখা হল। সূর্য্যরে তীব্র আলোয় চোখে নিশ্চয়ই তার তীব্র জ্বালা হবে। এত আলোতে বাইরের জগতের কোন বস্তুই সে দেখতে পাবে না। কারণ তার চোখকে বাইরের দৃশ্যে অভ্যস্ত হতে হবে। গোড়াতে ছায়াগুলিকেই সে ভাল দেখবে এবং শেষে বাইরের জগতের বস্তুকে দেখতে পাবে। সে এবার চাঁদের আলো, তাঁরার ঝিকিমিকি এবং নক্ষত্র খঁচিত আকাশের দিকে তাকাবে। দিনের সূর্য্যরে আলোয় চেয়ে রাত্রির আকাশ এবং তারার মালাকে সে ভাল দেখতে পাবে। সব শেষে সে সূর্য্যরে দিকেও তাকাতে পারবে। পানিতে তার প্রতিবিম্ব নয়, সূর্য্যরে বাস্তব অস্তিত্বকে সে দেখতে পাবে। তার বিষয় সে এবার চিন্তা করবে। এবং এই সিদ্ধান্ত করতে সক্ষম হবে যে, এই সূর্য্যরে কারণেই ঋতুর বৈচিত্র্য, বৎসরের পরিক্রমা। সূর্য্যই হচ্ছে দৃশ্য জগতের সবকিছুর শাসক। সে এবং তার সঙ্গীরা যা কিছু দেখতে অভ্যস্ত তার কারণ হচ্ছে সূর্য্য।

এবার আমরা কল্পনা করি, গুহার বন্দীশালা হচ্ছে আমাদের দৃশ্য জগৎ, মশাল মিছিলের আলো হচ্ছে সূর্য্য। আর গুহা থেকে উপরে ওঠাকে আমরা আত্মার মুক্তি অর্থাৎ বুদ্ধির জগতে আত্মার আরোহণ। এভাবে আমরা বিশ্বাস করতে পারি, জ্ঞানের জগতে উত্তমের ভাব আমরা সবার শেষেই মাত্র লাভ করতে পারি এবং উত্তমের সে জ্ঞান বিনা আয়েসে লাভ সম্ভব নয়। কিন্তু উত্তমের জ্ঞান যখন আমরা লাভ করি, তখন আমরা উপলব্ধি করি, উত্তমের ভাবই হচ্ছে সবকিছুর মূল। সুন্দর কিম্বা ন্যায়ের কারণই হচ্ছে উত্তম। উত্তমই হচ্ছে দৃশ্য জগতের আলোর মূল। উত্তমই হচ্ছে সত্য এবং বুদ্ধির মূল।

যারা উত্তমের এই রূপকে উপলব্ধি করতে পারে, তারা মানুষের বৈষয়িক জীবনে যে নিজেদের জড়িত করতে চাইবে না, এতে বিষ্ময়ের কিছু নেই। গুহার উপাখ্যানের ভিত্তিতে আমরা বলতে পারি, বন্দী মানুষের আত্মা নিয়ত সত্যের জগতে উর্দ্ধারোহণ করতে চায় এবং সেই উর্দ্ধজগতে আরোহণ করতে সক্ষম হলে আত্মা স্বাভাবিকভাবে সেই জগতেই বাস করতে চাইবে।

অন্যদিকে উত্তমের জ্ঞানলব্ধ মানুষ যখন আবার অজ্ঞানতার গুহার মধ্যে প্রত্যাবর্তণ করে তখন তার আচরণ যদি অদ্ভূত বলে বোধ হয় তাতেও বিষ্ময়ের কিছু নেই। কারণ, তার চোখ অন্ধকারে এখনও অভ্যস্ত হয়নি। তাই যে বন্দী মানুষ চরম ন্যায়ের জ্ঞান লাভ করেনি তার সঙ্গে জাগতিক আদালতে কিম্বা অন্যত্র, প্রতিরূপের ছায়ার সত্যতা অসত্যতা নিয়ে তাকে লড়াই করতে হয়। কিন্তু যখন তার চোখ অভ্যস্ত হবে তখন সে গুহার অধিবাসীদের চাইতে সকল বিষয়কে সহস্র গুণ স্পষ্ট দেখতে পাবে। তখন প্রতিকৃতির কোনটি কি এবং কোনটি কিসের প্রতিকৃতি তাও সে নির্ধারণ করতে সমর্থ হবে। কারণ সে সুন্দর, সত্য এবং উত্তমকে ইতিপূর্বে প্রত্যক্ষ করেছে।
যার সাধরণ জ্ঞান আছে সেই বুঝতে পারবে চোখের বিভ্রম দু‘রকমের। দু‘টি কারণে এর উদ্ভব। এর একটি কারণ হচ্ছে, অন্ধকার থেকে আলোতে বেরিয়ে আসা। অপরটি আলো থেকে অন্ধকারে যাওয়া। দেহের চোখের ক্ষেত্রে যেরূপ একথা সত্য, মনের চোখের ক্ষেত্রেও তেমনি একথা সত্য।

যারা বলে যে, অন্ধকে যেমন দৃষ্টি দান করা যায়, আত্মাকেও তেমনি জ্ঞান দান করা যায়। কথাটি এমন যেন আত্মার মধ্যে জ্ঞান না থাকলেও বাইরে থেকে জ্ঞান এতে আত্মার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া যায়। কিন্তু আমরা দেখেছি, জ্ঞানের ক্ষমতা অর্থাৎ শেখার শক্তি আত্মার মধ্যে থাকে এবং সমস্ত শরীরটাকে না ঘুরিয়ে আমরা যেমন আমাদের চোখটাকে ঘুরিয়ে পিছন দিকে দৃষ্টি দিতে পারিনে, তেমনি আত্মাকেও সমগ্রভাবে নশ্বর জগৎ থেকে অবিনশ্বর জগতের দিকে না ঘুরিয়ে, বিবর্তমান জগৎ থেকে অস্তিত্বের জগতে জ্ঞানের মাধ্যমে ঘুরিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। আত্মাকেও আলোতে অভ্যস্ত হতে হবে। অস্তিত্বের দৃশ্য সে ক্রমান্বয়ে দেখতে পাবে। পরিণামে সে উজ্জ্বলতম অস্তিত্ব অর্থাৎ পরম উত্তম তথা খোদাকেই দেখতে পাবে।

যখন কোন মানুষ কেবল মাত্র যুক্তির আলোতে, ইন্দ্রিয়ের কোনরূপ সাহায্য ব্যাতিরেকে পরম সত্ত্বাকে আবিস্কারের যাত্রা শুরু করে এবং বিরামহীনভাবে এই উদ্দেশ্য নিয়ে সে অভিযানে অগ্রসর হতে থাকে যে, বিশুদ্ধ যুক্তি দ্বারা পরম সত্যকে উপলব্ধি না করা পর্যন্ত তার যাত্রা সে থামাবে না, তাহলে দৃষ্টি যেমন দৃশ্যের শেষে সূর্য্যকে দেখেছে, তেমনি যুক্তি তার যাত্রা শেষে পরম সত্ত্বাকে অবলোকন করবে।

আমাদের গুহার বন্দীদের মুক্ত করে দিয়ে তাদের মুখকে ছায়া থেকে প্রতিকৃতির দিকে ঘুরিয়ে দেয়া হয়েছিল যে প্রতিকৃতি ছায়াগুলিকে নিক্ষেপ করেছিল এবং অগ্নির দিকেও তাদের দৃষ্টি পড়েছিল। গুহা থেকে তারপর বন্দীরা সূর্য্যরে আলোতে উঠে এসেছিল। এখানে তারা জন্ত্তু এবং উদ্ভিদ এবং সূর্য্যকে প্রথম দেখতে পাচ্ছিল না। তখন তারা পানির মধ্যে যথার্থ বস্তুর নিক্ষিপ্ত ছায়ার দিকে তাকাল। এ ছায়া যথার্থ বস্তুর ছায়া ছিল, আগুনের আলো দ্বারা নিক্ষিপ্ত প্রতিকৃতির ছায়া নয়। এই পরিক্রমেই আত্মার উত্তম চরিত্রকে ধাপে ধাপে পরম সত্য অবলোকনের দিকে অগ্রসর করে নিয়ে যাবে- যেমন করে আমাদের দেহের সব চাইতে অনুভবকারী ইন্দ্রিয় দৃশ্যজগতের সর্বাধিক উজ্জ্বল বস্তুকে ক্রমান্বয়ে এবং সর্বশেষে দেখতে সমর্থ হয়েছে।

সমাপ্ত।

উৎস: The Republic by Plato, Tr. by Benjamin Jowett.
ছবি: faculty.eashington.edu, iblog.stjschool.org.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন