pytheya.blogspot.com Webutation

১ এপ্রিল, ২০১২

John: ইয়াহিয়ার জন্ম বৃত্তান্ত।


জাকারিয়া ঈমাম অবিয়ের দলের একজন ঈমাম ছিলেন। তার কোন সন্তানাদি ছিল না, কেননা তার স্ত্রী এলিজাবেথ ছিলেন বন্ধ্যা। একদিন তিনি যখন মেরীর খোঁজখবর নেবার জন্যে এবাদতখানা সংলগ্ন তার কক্ষে প্রবেশ করলেন, তখন দেখতে পেলেন মেরী ফল খাচ্ছে। তার খাওয়া এটা নতুন কিছু নয় কেননা যতদিন, যখনই তিনি মেরীর কক্ষে গেছেন, দেখেছেন তার কাছে নানাবিধ খাদ্য সামগ্রী। কিন্তু এখনকার ব্যাপারটা ভিন্ন এ কারণে যে, সে খাচ্ছে এমন এক ফল যা ঐ মৌসুমে পাওয়া যায় না। তিনি বিস্মিত হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে মরিয়ম! এসব তুমি কোথায় পেলে?’
সে বলল, ‘এগুলি আল্লাহর নিকট হতে। তিনি যাকে ইচ্ছে অপরিমিত জীবিকা দান করেন।’

জন দি ব্যাপটিস্ট (কাষ্ঠ নির্মিত)।
আল্লাহর শক্তি-সামর্থ্যরে উপর জাকারিয়ার পূর্ণ বিশ্বাস ছিল। কিন্তু অসময়ে ও অস্থানে দান করার তাঁর অপার মহিমা এই প্রথম তিনি প্রত্যক্ষ করলেন। তার কোন সন্তানাদি ছিল না। আর ইতিপূর্বে কখনও তিনি খোদায়ী মহিমা প্রত্যক্ষ করেননি। তাই এ যাবৎ সাহস করে একটি সন্তানের জন্যে কোন দোয়াও করেননি। কিন্তু এখন তার মনে সুপ্ত আকাঙ্খা জেগে উঠল। তিনি তার বৃদ্ধ বয়সের কথা এবং স্ত্রীর বন্ধ্যাত্বের কথা জেনেও তখনি সেখানে দাঁড়িয়ে দয়াময় আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করলেন- ‘হে আমার পালনকর্তা! তোমার কাছ থেকে আমাকে এক পুত-পবিত্র সন্তান দান কর- নিশ্চয় তুমি প্রার্থণা শ্রবণকারী। হে আমার পালনকর্তা, আমাকে একা রেখ না, তুমি তো উত্তম ওয়ারিস।’

অত:পর আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেছিলেন। তার স্ত্রীকে প্রসবযোগ্য করেছিলেন এবং দান করেছিলেন হযরত ইয়াহিয়াকে। এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ, এবং তিনি (আল্লাহ) তাকে জাকারিয়ার তত্ত্বাবধানে রেখেছিলেন, যখনই জাকারিয়া কক্ষে তার সঙ্গে দেখা করতে যেত, তখনই তার কাছে খাদ্য সামগ্রী দেখতে পেত, সে বলত- হে মরিয়ম! এসব তুমি কোথায় পেলে?’
জন দি ব্যাপটিস্ট।
সে (মরিয়ম) বলত- ‘ওগুলি আল্লাহর নিকট হতে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছে অপরিমিত জীবিকা দান করেন।’

সেখানেই জাকারিয়া তার পালনকর্তার কাছে প্রার্থণা করলেন, বললেন, ‘হে আমার পালনকর্তা! তোমার কাছ থেকে আমাকে পুত-পবিত্র সন্তান দান কর- নিশ্চয়ই তুমি প্রার্থণা শ্রবণকারী।(৩:৩৭-৩৮)

এবং জাকারিয়ার কথা স্মরণ কর, যখন সে তার পালনকর্তাকে আহবান করেছিল- ‘হে আমার পালনকর্তা আমাকে একা রেখ না। তুমি তো উত্তম ওয়ারিস। অতঃপর আমি তার দোয়া কবুল করেছিলাম; তাকে দান করেছিলাম ইয়াহিয়া এবং তার জন্যে তার স্ত্রীকে প্রসবযোগ্য করেছিলেন।(২১:৮৯-৯০)

ইয়াহিয়া মসজিদ, নাবলুস, প্যালেস্টাইন।
মেরী ছিল জাকারিয়ার স্ত্রী এলিজাবেথ এর সহোদরা হান্নার কন্যা। হান্নার স্বামী ইমরান ছিলেন এবাদতখানারই একজন ঈমাম। মেরী গর্ভে থাকা অবস্থায় তিনি মারা যান।

হান্না বন্ধ্যা ছিলেন এবং বৃদ্ধা বয়সে খোদার দয়ায় গর্ভবতী হওয়াতে তিনি তার সন্তানকে খোদার তরে উৎসর্গ করেছিলেন। এভাবে তার কন্যা স্তন্যত্যাগ করলে তিনি তাকে মানত পূর্ণ করতে এবাদতখানায় নিয়ে আসেন। তখন নি:সন্তান জাকারিয়া তাকে লালন পালনের ভার পান। কিন্তু তার এই পাওয়া সহজে হয়নি। কেননা এবাদতখানার বার ঈমামের প্রত্যেকেই মেরীকে লালন-পালনের ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন। তারা জাকারিয়ার আত্মীয়তার দাবী অস্বীকার করেছিলেন এবং বাদানুবাদে লিপ্ত হয়েছিলেন। কারণ খোদার নামে উৎসর্গীত শিশুটির লালন-পালনকে তারা খোদার এক বরকতময় সেবা বলে ধরে নিয়েছিলেন।

এই বিবাদের নিস্পত্তি করতে তারা ভাগ্যপরীক্ষা করেছিলেন। সে সময় ভাগ্য পরীক্ষা করা হত বেশ কয়েকটি পদ্ধতিতে। যেমন ডাইস নিক্ষেপ করে বা তীর ছুঁড়ে। মেরীর ক্ষেত্রে ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছিল এবাদতখানার পুকুরে কলম (তীর) ছোঁড়ার মাধ্যমে। শর্ত ছিল যার কলম বাতাসের বিপরীতে চলবে সেই মেরীর লালন-পালনের ভার লাভ করবেন। জাকারিয়া বিজয়ী হন এবং তার তত্ত্বাবধানে এবাদতখানা সংলগ্ন একটি কক্ষে মেরীর থাকার ব্যবস্থা হয়। এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াত- ‘মরিয়মের ভার কে গ্রহণ করবে-এর জন্যে তারা কলম (তীর) নিক্ষেপ করেছিল এবং তারা (জাকারিয়া ও অন্যরা) বাদানুবাদ করেছিল।(৩:৪৪)

একসময় প্রধান ঈমাম নিযুক্তির সময় আসন্ন হল। নিয়ম অনুসারে ঈমামদের মধ্যে ভাগ্য পরীক্ষার দ্বারা প্রধান ঈমাম নিযুক্ত হতেন। এবারও ভাগ্যপরীক্ষা হল। নির্বাচিত হলেন জাকারিয়া। তার এই পদ অধিগ্রহণের সময় হেরোদ ছিলেন ইহুদিয়া প্রদেশের শাসনকর্তা। 

ইয়াহিয়ার জন্মস্থানের উপর নির্মিত চার্চ।
একদিন জাকারিয়া যখন পবিত্রস্থানে ধূপ জ্বালাতে গেলেন, তখন বাইরে অনেক লোক প্রার্থণা করছিল। ধূপ জ্বালান শেষে তিনি ঐ নিভৃত কক্ষে প্রার্থনায় মগ্ন হলেন এবং পূর্বেরমত আল্লাহর কাছে আর্জি পেশ করলেন-‘হে আমার প্রতিপালক! নিশ্চয় আমার অস্থিপুঞ্জ শিথিল হয়ে গেছে এবং আমার মাথা শুভ্রতায় সমুজ্জ্বল হয়েছে। হে আমার প্রতিপালক! আমি তোমাকে আহবান করতে কখনও ক্লান্ত হইনি। আমি আশঙ্কা করি, আমার পরে আমার স্বগোত্ররা দ্বীনকে ধ্বংস করে দেবে? আমার স্ত্রী বন্ধ্যা, সুতরাং তুমি তোমার কাছ হতে আমাকে উত্তরাধিকারী দান কর। সে আমার উত্তরাধিকারীত্ব করবে এবং ইয়াকুব বংশের উত্তরাধিকারীত্ব করবে এবং হে আমার প্রতিপালক! তাকে মনোনীত কোরও।’

যখন জাকারিয়া কক্ষে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করছিলেন, তখন ফেরেস্তা জিব্রাইল ধূপবেদীর ডান দিক থেকে তাকে সম্বোধন করে বলল, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে ইয়াহিয়ার সুসংবাদ দিচ্ছেন। সে হবে আল্লাহর বাণীর সমর্থক; নেতা, জিতেন্দ্রিয় এবং পূণ্যবানদের মধ্যে একজন নবী।’ 

পুত্র সন্তানের সুখবর
আল্লাহ জানালেন, ‘হে জাকারিয়া, আমি তোমাকে এক পুত্র সন্তানের সুখবর দিচ্ছি, তার নাম হবে ইয়াহিয়া। এই নামে পূর্বে আমি কারও নামকরণ করিনি।’

খোদায়ী শক্তি-সামর্থের ব্যাপারে জাকারিয়ার মনে কোনরূপ সন্দেহ ছিল না। কিন্তু কৌতুহল হল মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। তাই তিনি বললেন, ‘হে আমার প্রতিপালক, কেমন করে আমার সন্তান হবে, যখন আমার স্ত্রী বন্ধ্যা ও আমি বার্ধ্যকের শেষসীমায় উপনীত।’

তিনি বললেন, ‘এরূপেই হবে। এভাবেই আল্লাহ যা ইচ্ছে তাই করেন। এ আমার জন্যে সহজসাধ্য। আমি তো পূর্বে তোমাকে সৃষ্টি করেছি যখন তুমি কিছুই ছিলে না।’
জাকারিয়া বললেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! কি দিয়ে আমি তা বুঝব? আমাকে একটি নিদর্শণ দাও।’
তিনি বললেন, ‘তোমার নিদর্শণ এই যে তিন দিন তুমি ইঙ্গিত ব্যতিত কথা বলতে পারবে না। আর তোমার প্রতিপালককে অধিকভাবে স্মরণ কর এবং প্রভাতে ও সন্ধ্যায় তাঁর মহিমা প্রচার কর।’
জাকারিয়া ইঙ্গিত ব্যতিত কথা বলতে পারছে না। 
এদিকে লোকেরা জাকারিয়ার জন্যে অপেক্ষা করছিল। এবাদতখানার পবিত্রস্থানে তার দেরী হচ্ছে দেখে তারা অস্থির হয়ে পড়ল। এসময় তিনি কক্ষ হতে বের হয়ে তার সম্প্রদায়ের কাছে এলেন ও ইঙ্গিতে তাদেরকে সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতে বললেন। লোকেরা যখন দেখল তিনি কোন কথা বলতে পারছেন না, তখন বুঝতে পারল পবিত্র স্থানে তিনি কোন দর্শণ পেয়েছেন। 

এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ-কাফ-হা-ইয়া আ‘ঈন-সাদ। এ তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহের বিবরণ তার দাস জাকারিয়ার প্রতি। যখন সে তার প্রতিপালককে নিভৃতে আহবান করেছিল। সে বলেছিল-‘হে আমার প্রতিপালক! নিশ্চয় আমার অস্থিপুঞ্জ শিথিল হয়ে গেছে এবং আমার মাথা শুভ্রতায় সমুজ্জ্বল হয়েছে;(১৯:১-৪) হে আমার প্রতিপালক! আমি তোমাকে আহবান করতে কখনও ক্লান্ত হইনি। আমি আশঙ্কা করি, আমার পরে আমার স্বগোত্ররা দ্বীনকে ধ্বংস করে দেবে? আমার স্ত্রী বন্ধ্যা, সুতরাং তুমি তোমার কাছ হতে আমাকে উত্তরাধিকারী দান কর। সে আমার উত্তরাধিকারীত্ব করবে এবং ইয়াকুব বংশের উত্তরাধিকারীত্ব করবে এবং হে আমার প্রতিপালক তাকে মনোনীত কোরও।’(১৯:৫-৬)

যখন জাকারিয়া কক্ষে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করছিল, তখন ফেরেস্তা তাকে সম্বোধন করে বলেছিল -নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে ইয়াহিয়ার সুসংবাদ দিচ্ছেন। সে হবে আল্লাহর বাণীর সমর্থক; নেতা, জিতেন্দ্রিয় এবং পূণ্যবানদের মধ্যে একজন নবী।’(৩:৩৯) 

জাকারিয়ার কোলে শিশু ইয়াহিয়া।
তিনি (আল্লাহ) বললেন, ‘হে জাকারিয়া, আমি তোমাকে এক পুত্রের সুখবর দিচ্ছি, তার নাম হবে ইয়াহিয়া; এ নামে পূর্বে আমি কারও নামকরণ করিনি।’
সে (জাকারিয়া) বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক, কেমন করে আমার পুত্র হবে, যখন আমার স্ত্রী বন্ধ্যা ও আমি বার্ধ্যকের শেষসীমায় উপনীত।’
তিনি বললেন, ‘এরূপেই হবে।(১৯:৭-৮) এভাবেই আল্লাহ যা ইচ্ছে তাই করেন।(৩:৪০) প্রতিপালক বললেন, ‘এ আমার জন্যে সহজসাধ্য। আমি তো পূর্বে তোমাকে সৃষ্টি করেছি যখন তুমি কিছুই ছিলে না।’(১৯:৯)

জাকারিয়া বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একটি নিদর্শণ দাও।’
তিনি বললেন, ‘তোমার নিদর্শণ এ যে তিন দিন তুমি ইঙ্গিত ব্যতিত কথা বলতে পারবে না। আর তোমার প্রতিপালককে অধিকভাবে স্মরণ কর এবং প্রভাতে ও সন্ধ্যায় তাঁর মহিমা প্রচার কর।’(৩:৪১)
অতঃপর সে কক্ষ হতে বের হয়ে তার সম্প্রদায়ের কাছে এল ও ইঙ্গিতে তাদের সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতে বলল।(১৯:১১)

জাকারিয়া বাড়ী ছিল ইহুদিয়া প্রদেশের পার্বত্য এলাকায়। ঈমাম কাজের পালা শেষ হয়ে গেলে তিনি বাড়ী চলে এলেন। তিনদিন পর তার জবান খুলে গেলে তিনি স্ত্রীকে সকল কথা বললেন। এসময় কৃতজ্ঞ হয়ে এলিজাবেথ বললেন, ‘আল্লাহ মহান। তিনি আমার দিকে দৃষ্টি দিয়েছেন।’

এলিজাবেথ একটি পুত্রসন্তান প্রসব করলেন।
এলিজাবেথ গর্ভধারণ করলেন এবং সময় পূর্ণ হলে একটি পুত্রসন্তান প্রসব করলেন। তার প্রতি খোদার এতবড় অনুগ্রহের কথা শুনে প্রতিবেশীরা ও আত্মীয়রা তার সাথে আনন্দে যোগ দিল। আর এলাকার লোকেরা এই বৃদ্ধ বয়সে বন্ধ্যা এলিজাবেথের সন্তান হওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে লাগল।  

ইস্রায়েলীদের নিয়ম মত আট দিনের দিন পুত্রটির খৎনা উপলক্ষে প্রতিবেশীরা ও আত্মীয়রা আবারও এল। এসময় অনেকে পুত্রটির নাম কি রাখা হবে এলিজাবেথের কাছে তা জানতে চাইল। তিনি তাদেরকে বললেন, ‘এর নাম ইয়াহিয়া।’ 

প্রতিবেশী ও আত্মীয়রা 'ইয়াহিয়া' (John) এই অভূতপূর্ব নামের সাথে পরিচিত ছিল না। তাই তারা বলল, ‘আপনার আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে তো কারও ঐ নাম নেই।’ 
তারা জাকারিয়ার কাছে জানতে চাইল, ‘আপনি কি নাম দিতে চান?’
তিনি বললেন- ‘ওর নাম ইয়াহিয়া।’ -এই উত্তর দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিলেন যে, তার নাম রাখা হবে না বা রাখা হয়ওনি, এ নাম পূর্ব নির্ধারিত- খোদা প্রদত্ত।

সমাপ্ত।
ছবি: Wikipedia, lindasbiblestudy.wordpress, paramedicgoldengirl.blogspot, christmaspirit, cyberbrethren.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন